গার্লফ্রেন্ড না বিড়ম্বনা

গার্লফ্রেন্ড না বিড়ম্বনা

রতন আগে আমাদের রুমমেট ছিল। এখন থাকে পাশের রুমে। আজ হঠাৎ বিকেলে আমাদের রুমে এসে ফ্লোরের মধ্যে চার হাত পা চারদিকে ছড়িয়ে দিয়ে শুয়ে পড়লো। জিজ্ঞেস করলাম কি হয়েছেরে তোর? রতন লম্বা একটা দীর্ঘশ্বাস টেনে বলল, আল্লাহগো রক্ষা করো! আর পারি না!রক্ষা করো মাবুদ! আমরা সকলেই উদগ্রীব হয়ে রতনকে জিজ্ঞেস করলাম কাহিনী কি?  রতন পানির বোতল থেকে ডুক ডুক করে কিছুক্ষণ পানি পান করার পর কয়েকদিনের ঘটনা মিলিয়ে যা বিবরণ দিলো তার সারসংক্ষেপ করলে ব্যাপারটা যা দাঁড়ায় তা হলো এই: মনে কর অনেকের প্রেম পিরিতি দেইখা আমার নিজেরও একটুখানি শখ হইছিলো প্রেম করার। তা সাইকোলজি ডিপার্টমেন্টের অলিতাকে কে বলতেই সে রাজি হয়ে গেলো। আমিও আরকিওলজির ছাত্র। মনে মনে ভাবলাম মনের মধ্যে খোঁড়াখুঁড়ি! মন্দ হবে না! শুরু হলো আমাদের প্রেম।  সেদিন অলিতা কইলো,

-বাবু শোনো?
-বলো
-আমার তো কাজিনের বিয়ে।
-ভাল তো। যাবা।
-একটু কেনাকাটা ছিল। তুমি কি কাল সময় দিতে পারবা একটু?
-একশ বার।

তারপর সকাল দশটা থেকে শুরু হলো ঘোরাঘুরি। মনে কর যে আমি দোযখে যাইতেও রাজি আছি কিন্তু কোন মেয়ের সাথে শপিং এ যাইতে আর রাজি না। নিউমার্কেট, চন্দ্রিমা, গাউছিয়া তারপর আরো জানি কত জায়গায় ঘুরলো আমার ওত মনে নাই। মনে আছে কেবল ঘড়িতে তখন তিনটা বাজে।এত জায়গায় ঘোরাঘুরি করে সে কিনতে পারছে কেবল একটা লিপস্টিক। ক্ষুধায় আমার পেট চো চো করতেছে। মনে হইতেছে আমগো মেসে খালা যে ডাল রান্না করে সে ডাল দিয়াও আমি তিন প্লেট ভাত গোগ্রাসে গিলা ফেলতে পারব। কিন্তু এই মেয়ের সেদিকে কোনো খেয়ালই নাই। শেষে আমি নিজেই পকেটের মায়া ত্যাগ করে বললাম, অলিতা পাখি?

-বলো বাবু
-দুপুর গড়িয়ে বিকেল হচ্ছে। চলো কিছু খেয়ে নেই।
– বাবু আমার না খুব ফুচকা খেতে ইচ্ছে করছে। চলো ফুচকা খাই।

মনে কর সারাজীবনে এই ফুচকা ছাড়া কেউ কোনোদিন বিষ খাইতে দিলেও আমি আপত্তি করি নাই। সেই ফুচকার প্লেট থেকে একটা করে ফুচকার দলা মুখে দিতেছি আর মনে হইতেছে যদি ইটের ভাটা থেকে সদ্য পোড়ানো একটা ইট ভেঙ্গে কয়েক টুকরো করে তার থেকে এক টুকরা ইট এনে এই মেয়েটার কপালে রেখে কাঠফাটা রোদের মধ্যে পশ্চিম দিকে দাঁড় করাইয়া রাখতে পারতাম। এর মধ্যে আবার অলিতা বলতেছে,

-বাবু খেতে খুব দারুণ। তাই না?
-হুম, খুব মজা।
-আমি না আরেক প্লেট খাব। মনে মনে কই, খা! তুই তোর জন্মের খাওয়া খা। মুখে বলি,

-সোনা পাখি তুমি বেশি খেলে তো বাসায় গিয়ে ভাত খেতে পারবে না। তোমার আম্মু মানে আন্টিকে কি বলবে?
-এই তুমি আমার আম্মুকে আন্টি বলছ কেন?
-কি বলব?
-আম্মা বলবা। আমার আম্মু তো অনেক ফ্রি আমার সাথে। তোমার আমার ব্যাপারে সব কিছু শেয়ার করব আম্মুর সাথে।
-ওহ, আচ্ছা। ঠিক আছে লক্ষ্ণী।

শেষে অলিতাকে আবার বাসায় এগিয়ে দিতে হবে। জজ কোর্টের সামনে দিয়ে হাটছিলাম। কোর্টের সামনে দেখি একজন উকিল অনেকগুলো কোর্ট ফাইল হাতে নিয়ে মক্কেল গোছের দুজন লোকের সাথে দাঁড়িয়ে আছে। আমাদের দিকে কেমন বড় বড় চোখ করে তাকিয়ে আছে লোকটা।

অলিতা চুপি চুপি বলল আমাকে, আমার আব্বু সালাম দাও। আমি বললাম, আসসালামু আলাইকুম আব্বা। এতগুলো ফাইল হাতে নিয়ে দাঁড়িয়ে আছেন। আপনার তো কষ্ট হচ্ছে। দেন আমার হাতে দেন। অলিতার আব্বা আমার দিকে এমনভাবে তাকালো মনে হলো আমি ভিনগ্রহের কোন এলিয়েন। অলিতা দেখি চোখ গরম করে আমার দিকে তাকিয়ে আছে। কিছুটা দূরে এগিয়ে এসে অলিতা বলল, তুমি আমার আব্বুকে এতগুলো লোকের সামনে অপমান করলা? মনে মনে বলি, তোর আব্বাকে আব্বা ডাকলেও অপমান হয়! আমি এখন যাই কোথায়! মুখে বলি, অলিতা সোনা তুমি তো তোমার আম্মুকে আম্মা ডাকতে বললা। আমি ভাবলাম তোমার আব্বুকেও তাহলে আব্বা ডাকা উচিত। তারপর অনেক কষ্টে আবার অলিতার রাগ ভাঙিয়ে বাসায় পৌছে দিয়ে আমিও বাসায় ফিরছি। বিশ্বাস কর সিঁড়ি বেয়ে বেয়ে সাততলায় উঠে কেবলই নিজের রুমে এসে বিছানায় শরীর এলিয়ে দিছি ওমনি আবার অলিতার ফোন,

-বাবু তুমি কোথায়?
-বাসায়
-শোনো?
-বলো
-আমার ফোনে তো ব্যালেন্স শেষ।

আমি আগে খেয়াল করিনি। এখন তো ইন্টারনেট প্যাক কিনতে পারছি না। আবার নিচেও যেতে পারছি না। তুমি একটু পাঠিয়ে দাও, প্লিজ। মনে কর তারপর সিঁড়ি দিয়া নামছি আবার উঠছি। দিলাম ব্যালেন্স পাঠাইয়া। তারপর তোদের সাথে আড্ডা দিতে দিতে রাত প্রায় দুটো বাজল। বিছানায় গিয়ে ঘুমাইলাম আড়াইটায়। ঘুমডা কেবল গাঢ় হইতেছে। রাত তিনটার দিকে অলিতা আবার ফোন দিছে,

-বাবু ঘুমাইতেছ? মনে মনে বলি, না! কুতকুত খেলতেছি। মুখে বলি, উঁহু! শুইছিলাম মাত্র।
-বাবু আমার না ঘুম আসছে না। আবার ভালও লাগছে না কিছু।
-তাহলে তুমি ফেসবুক চালাও
-ফেসবুকে না আমার চ্যাট লিস্টে একজনও নেই এখন।
-ওহ! তাহলে আমি আসতেছি। দুজনে চ্যাট চ্যাট খেলব কেমন?
-বাবু রিরক্ত হচ্ছ?
-না। শান্তি লাগছে খুব। তুমি এত রাতে ফোন দিয়েছো।

তারপর আবার ভোর পাঁচটায় আমার মামাতো ভাই ফোন দিয়া কইতাছে, ভাই রাতে ডাকাতি হইছে আমগো বাড়িতে। আব্বাকে বেধড়ক মারছে ডাকাতরা। টাকা পয়সায় সব নিছে। এই টুকু কথা বলতে বলতেই আবার মনে কর অলিতা কম করে হলেও ৫ বার ফোন দিছে। অলিতাকে কল ব্যাক করে বললাম কি হয়েছে সোনা?

-তুমি আমাকে বাদ দিয়ে কার সাথে কথা বলো? কার সাথে প্রেম কর আর?
-কারো সাথে না। আমার মামার বাড়ি ডাকাতি হয়েছে। ওখান থেকে ফোন দিয়েছিলো।
-আমি বিশ্বাস করি না। মিথ্যুক। আমি আবার ফোন রেখে দিয়ে মামাতো ভাইকে ফোন দিলাম।
-মামা কি বাইচ্যা আছে না মইরা গেছে?
-তুমি এইগুলা কি কও ভাই?
-বাইচ্যা থাকলে একটা ছবি দে।
-ক্যান?
-দেখি কোন পত্রিকায় নিউজ করানো যায় কিনা?
-দিতেছি।

তারপর মনে কর এই ছবি অলিতার ফোনে পাঠাইয়া সকাল ৬টায় আমি কেবল ঘুমাইছি। সকাল ৯ টার দিকে আবার অলিতার ফোন।

-বাবু শোনো?
-বলো।
-আমি না স্যরি।
-কেন?
-তোমার মামাকে এমনভাবে মেরেছে আর আমি কি সব আজেবাজে সন্দেহ করেছি।
-ঠিক আছে সোনা।আমি না আর একটু ঘুমাব এখন। রাখি?
-না। শোনো! এইদিকে তো ঝামেলা হয়ে গেছে।
-কি ঝামেলা?
-আমি কাল যে লিপস্টিক কিনলাম ওটা তো আমার ড্রেসের কালারের সাথে ম্যাচ করে না।
-বলো কি? করে না?
-না।
-এখন কি করবা?
-আজকে আবার তোমাকে নিয়ে একটু খুঁজতে বের হবো।

লাফ দিয়া ঘুম থেকে উঠে দেখি মেসের খালা কিচেনে রান্না করতাছে। খালারে ডাক দিয়া কইলাম খালা আমার কপালডা একটু ভাল কইরা চাইয়া দেহেন তো?

-ক্যান বাপধন?
-এই কপালে কি আপনার আম্মা সইবে কিনা সেইডাই চিন্তা করতাছি।

তারপর মনে কর আবার লিপস্টিক খোঁজা শুরু হইলো। দুপুর দুইটা পর্যন্ত খুঁইজ্যাও কালার একবারে ম্যাচ করে এমন পাওয়া গেল না। ফ্রান্সিস বেকন একখান কথা কইছিলো, নারী লগে নিয়া থাকলে জ্ঞানী হওয়া যায় না। বেকনের সেই কথার মর্ম হারে হারে টের পাইলাম সেদিন। তারপর আবার মনে কর কাহিনী অন্য আরেকটা হইয়া গেল। সেটা হলো লিপস্টিক খুঁজতে খুঁজতে অলিতার একটা ড্রেস পছন্দ হইয়া গেল। আমাকে দেখাইয়া বলে,

-বাবু ড্রেসটা সুন্দর না?
-হু, সুন্দর।
-কিন্ত দাম তো সাড়ে চার হাজার টাকা।
-হু।
-আমি না আজকে বেশি টাকা নিয়ে বের হইনি। আমি কি জানতাম ড্রেসটা পছন্দ হবে আমার?
-নাহ
-এখন তো আমার ড্রেসটা কিনতে ইচ্ছে করছে খুব।

কিন্তু আমার কাছে মাত্র দেড় হাজার টাকা আছে।তুমি কি আমাকে তিন হাজার টাকা দিতে পারবা? মনে কর আমি এক মাসের টিউশনির তিন হাজার টাকা মানে এক হাজার টাকার তিনটা কড়কড়া নোট বাসা থেকে নিয়া বের হইছিলাম। সেটা আবার কি মনে কইরা অলিতার বলছিলাম। তারপর আর কি? সেই তিনটা কড়কড়া নোট গচ্ছা দিতে হলো। মনে মনে কইলাম খাল কাইটা কুমির আনছি। কোন হালায় যে পিরিতি করবার কইছাল। তারপর মনে কর ড্রেসটা কেনা শেষ হলে অলিতা বলল,

-বাবু আমার না আইসক্রিম খেতে ইচ্ছে করছে দিলাম আবার ৯০ টাকা গচ্ছা। আইসক্রিম খাওয়া শেষ হতে না হতেই আবার বলতেছে, বাবু ওই যে দেখো ইডেন কলেজের সামনে আচার বিক্রি করছে। আমার না আচার খেতে ইচ্ছে করছে। মনে মনে কই জন্মের খাওয়া খাবি কিনে কিনে খাস না ক্যান! মুখে বলি,

-আচ্ছা পাখি। তারপর মনে কর রিকশা নিছি। বাসায় ফিরব। কইলাম
-সোনা পাখি তোমাকে না একটা কিস করতে ইচ্ছে করছে খুব। করি?
-কি!
-হু
-শোনো আমার সাথে এসব চলবে না।
-তুমি আমাকে দুই দিন ধরে যে খাটুনি খাটাইতেছ একটা রিকশাওয়ালাও কিন্তু সামান্য একটা কিসের জন্য এত খাটাখাটতি করতে রাজি হতো না।
-কি! তুমি কি বললা?
-কিছু না।
-না! তুমি আবার বলো। তোমার রুচি এত খারাপ? যাও তোমার সাথে ব্রেক আপ!

মনে কর তারপর আবার কিছুক্ষণ অনুনয় বিনয় করে আবার রাগ ভাঙাই অলিতার আর বলি যদি বিয়ের পর কুমারী মাতা মেরির মতন তোমারও আমার স্পর্শ ছাড়া বাচ্চা হতো তাহলে সেটাই সবচেয়ে ভাল হতো। অলিতা আমার নাক টিপে দিয়ে বলে গুড বয়! তারপর এইমাত্র বাসায় ফিরতেই অলিতা আবার ফোন দিয়ে বলতেছে বাবু তোমার ফেসবুকের পাসওয়ার্ড টা দাও তো।

গল্পের বিষয়:
রোমান্টিক

Share This Post

আরও গল্প

সর্বাধিক পঠিত