হারিয়ে পাওয়া

হারিয়ে পাওয়া

সিক্সে ভর্তি হবার পর মোটামুটি ক্লাসের কোনো মেয়েকেই আমার ভাল লাগলো না। না আচরণে, না কথাবার্তায়। দেখতেও আহামরি কেউ ছিল না। কোনো মেয়েকেই নম্র, ভদ্র মনে হয় নি। সারাক্ষণ ঝগড়া করার মোডে থাকতো। যেমন ছেলেরা বিদ্বেষ মনোভাবে মেয়েদেরকে নিতো। মেয়েরাও ঠিক একই জিনিস করতো। আমি বিদ্বেষ মনোভাব না নিলেও ছেলেদের একজন বলে আমার জন্য ও ছাড় নেই। ততোদিনে ক্লাসের সব মেয়েকে খুব ভাল করেও চেনা হয়ে গেছে। কেউই বন্ধুসুলভ আচরণ করতে চায় না।

ফেব্রুয়ারির মাঝামাঝি একদিনে নতুন মুখের একজন আসলো। দু’মাসে ক্লাসের সব মেয়েকে দেখতে দেখতে সব ছেলেই তেতো হয়ে গেছে। নতুন একজনকে দেখে সবার আগ্রহ তার দিকেই। বেশ সুন্দর দেখতে! কালো জাম্পারে মানিয়েছেও! অন্যসব মেয়েদের থেকে আলাদা মনে হলো। মনে হচ্ছে লোকাল নয়। এতদিন পর ক্লাসে এসেছে কেন? কোথায় ছিল এতদিন!

স্যার যখন রোল কল করে চার থেকে ছ’য়ে গিয়েছিলেন মেয়েটি তখন বলল, ” স্যার পাঁচ!”
ও’মা এতো দেখি আমার সেইম রোল! এই রোল নাম্বারটাই তো প্রথম ১৫-২০ দিন কল করার পর স্যার বিরক্ত হয়ে কল করা বাদ দিয়ে দিছিলেন। সবার নজর ওর দিকে। স্যার বললেন, ” তুমি কি এই স্কুলের স্টুডেন্ট? ”
সবাই হেসে উঠলো। মেয়েটি বিব্রতবোধ করলো। ব্যাগ থেকে একটা কাগজ বের করে স্যারের কাছে নিয়ে দিলো। বেশ কিছুক্ষণ স্যারের সাথে কথা বলল। আমি যতটা দূরে আছি সেখান থেকে আস্তে আস্তে কথা শুনা যাচ্ছে না। স্যার মুখের ভঙ্গিমা দেখে মনে হল মেয়েটা ঠিকভাবে বুঝাতে পেরেছে স্কুলে না আসার কারণ।

আমার কেন যেন ধীরেধীরে মেয়েটার প্রতি আগ্রহ বাড়তে লাগলো। ইচ্ছে হলো মেয়েটাকে ভাল বন্ধু বানাই। কিন্তু আমাদের ক্লাসে ছেলে মেয়েদের সাপেনেউলে অবস্থা। ছেলে মেয়ে ভাল বন্ধু হবে এটা দুঃস্বপ্ন। তার উপর আমি অন্য ছেলেদের মতো না। অল্প কথা বলি, চুপচাপ থাকি। যেকোন মেয়ের সাথেই কথা বলা অসাধ্য কাজ ঠিক মস্তবড় কাজের একটি মনে করি। তাই শুধুমাত্র মেয়েটির অজান্তে মেয়েটিকে দেখে যাই।
মাঝেমধ্যে চোখাচোখি হয়। কিন্তু সেটা একজন মানুষ আরেকজনের দিকে তাকানোর বিপরীতে তাকানো।

প্রথম সাময়িক পরীক্ষার আগ পর্যন্ত আমার ধারণা ছিল এক্সাম হলে ছেলে মেয়েদের একসাথে দিবে না। দিলেও কেন যেন মনে হচ্ছিলো মিতুর সাথে একই ডেস্কে পড়বে না। ওর নাম মিতু । আমি চেয়েছিলাম পড়ুক, কিন্তু আমি যা চাই-তা খুব কমই পাই।

ঠিকই আমার সাথে পড়ে নি কিন্তু বাম পাশের সারিতে আমার পাশের সাইডেই পড়লো। পাশাপাশি দূরত্ব কম থাকায় প্রায় কাছাকাছি সিট। আমার কাছাকাছি মিতু বসছে দেখে খুব ভাল লাগলো। কিন্তু পাশাপাশি বসেছে, এই যা। তাছাড়া আর কিছু নয়। মাথা নিচু করে এক্সাম দেয়। কারো সাথে কথা বলে না। কোনোদিকে তাকায় ও না। মোটামুটি সব পরীক্ষা এভাবে দিলো। সর্বশেষ পরীক্ষায় হঠাৎ করে আমাকে ডাক দিল। বলল, ” এই যে! ”
ডাক দিয়ে আমার দিকে তাকিয়ে আছে। আমাকে মিতু ডাকছে! বেশ কিছুক্ষণ অবাক চোখে তাকিয়ে রইলাম। আবার বলল, ” সেটের অংকটা দেখাবেন? সেটের অংক বুঝি না। আমি দেখেছি আপনি দিয়েছেন। ”
আমি দিয়েছি সেটা দেখে ফেললো! অথচ এখন ডাকার আগ পর্যন্ত কখনো মনে হয় নি তাকিয়েছিল। খুব এডভান্স!

আমি অংকটা দেখালাম। ইচ্ছা হচ্ছিলো পুরো পেপারটাই দিয়ে দিতে। স্যার বাইরে গেছেন। যেকোনো সময় এসে যাবেন। ভয়ে দিলাম না। মাথানিচু করে অংক তুলছিল। আমি মুখের দিকে চেয়ে আছি। চোখগুলা খুব দারুণ, নিখুঁত কালো। হঠাৎ করে পেপারে টান অনুভব করলাম। স্যার এসে আমার আর মিতুর পেপার নিলেন। আমি চমকে গেলাম। মিতুও আতংকে স্যারের দিকে চেয়ে আছে।

সিক্সে উঠতে না উঠতেই এসব কাজ! নিশ্চিত ভবিষ্যৎ অন্ধকার।এরকম অনেক কথা শুনিয়ে দিলেন। কিছুক্ষণ দাঁড় করিয়ে রাখলেন। তারপরেও শান্ত হলেন না। আমাদের ডেকে নিলেন সামনে। তারপর বললেন, একে অপরের কান টেনে ধরে ধরে বলতে হবে আর জীবনে কখনো পেপার শেয়ার করবো না। সবাই হেসে উঠলো। স্যার থামিয়ে দিয়ে ধরতে বললেন। মিতুর ভাবনা যাই-ই থাক আমার কাছে বিষয়টা ভাল লাগছিল। আমি মিতুর দুই কান টেনে ধরলাম। আমার দিকে চোখ বড় করে তাকিয়ে আছে। স্যারের ধমকে আমার কান ধরলো। স্যার বললেন, ” শপথ করো, আমরা জীবনেও আর পেপার শেয়ার করবো না, নকল করবো না।”
আমরা তাই-ই বললাম। কান ছাড়ার আগে একটু জোরেই কানে টান দিলাম। চোখ লাল করে তাকালো। তারপর পেপার দিয়ে দিলেন।

এই ঘটনা পর ক্লাসের সবাই আমাদের দু’জনকে আলাদা চোখে দেখতে লাগলো। আমি এই ব্যাপারটা খুব উপভোগ করলেও মিতু খুব রাগতো। কেউ আকার ইঙ্গিত কিংবা কিছু আমাদের নিয়ে বললে মিতু বিরক্ত হয়ে মাথানিচু করে চুপ হয়ে যেতো।

ক্লাস সিক্স কেটে গেল এমন করে। সেভেনে উঠে মিতু টি.সি নিয়ে নেয়। শুনলাম ওর বাবার ট্রান্সফার হয়ে গেছে। আমাদের এলাকায় ট্রান্সফার হওয়াতে আমাদের স্কুলে ভর্তি হয়েছিল। আবার ট্রান্সফার হওয়াতে চলে গেল। কিছুদিনের জন্য আসলো। আমি অনেকদিন পর্যন্ত মিতুকে মনে রাখবো। দুইএকটা ছোট, ছোট ঘটনাগুলোর জন্য মনে রাখবো। মাধ্যমিক স্কুল জীবনে ক্লাসে বন্ধুসুলভ, নম্র-ভদ্র মেয়ে বলে কেউ একজন ছিল, যাকে নিয়ে আমার সাথে ফান করতো বন্ধুরা। এসব হয়তো দীর্ঘদিন মনে থাকবে। সবচে’ বেশি আনন্দের আর সবচে’ বেশি দুঃখের স্মৃতি সহজে ভুলা যায় না। মনে দীর্ঘদিন দাগ কেটে থাকে।

ধাপেধাপে জেএসসি, এসএসসি দিলাম। চারবছর হয়ে গেলেও মিতুর প্রতি আলাদারকমের একটা টান আছে, যার চুল পরিমাণ পরিবর্তন হয় নি। অল্প বয়সের ভালোলাগা যে এতো মারাত্মক হয় আমি ধারণাই করতে পারিনি। এলাকায় ভালো কলেজ থাকতেও জেলাশহরে গভ্ট কলেজে ভর্তি হলাম মিতুকে পাবার আশায়। শুনেছিলাম মিতুর বাবার ট্রান্সফার হয় জেলা শহরে। কিন্তু সায়েন্স, আর্টস, কমার্স সবক্লাসে অনুসন্ধান করেও কাঙ্ক্ষিত চেহারার মেয়েটিকে না পেয়ে খুব হতাশ হয়ে গেলাম। মনে হলো, আমি মিতুকে হারিয়ে ফেলেছি। ক্ষনিক সময়ের জন্য অতিথি পাখি হয়ে এসেছিল।আবার চলে গেল। পথ ভুলে গেছে। অন্য কোথায় নীড় খুঁজে নিয়েছে হয়তো। আমি এতো আগ্রহ দেখাই, মিতুর এতো আগ্রহ আছে কি না কে জানে? সবকিছু হয়তো কবেই ভুলেই গেছে!

আর্টসে পড়া একটা মেয়েকে আমি কিছুদিন ধরে ফলো করছি।আমার কেন যেন মনে হয় এই সেই মিতু। মিতুই লাগে! নিয়মিত কলেজে আসে না বলে ঠিকভাবে দেখতেও পাচ্ছি না। সায়েন্সে পড়ায় অন্য বিভাগে তেমন যাওয়া হয় না। যাস্ট বাংলা আর ইংলিশ ক্লাসে একত্রে হয়। মিতুর মতো চালচলন লাগে। চুপচাপ ক্লাসে থাকে। ছেলেদের দিকে তাকায় না বললেই চলে। অবশ্য আমি নিশ্চিত নয় ও যে মিতু। চেহারায় বেশ পরিবর্তন লাগে। আগের ছোট মায়াবী মুখটা আর এই মুখটায় অনেকখানি পরিবর্তনের ছোঁয়া। অনেক বেশি পরিপূর্ণ। নিখুঁত কালো চোখগুলো নিখুঁততা ধরে রেখছে। সিক্সে যে একবছর পেয়েছিলাম তখন দেখেছিলাম একমাত্র অংকে একটু কাঁচা। সেইজন্যই কি আর্টস নিছে?

আমার ধারণা ভুল করে এই মেয়ে মিতু নাও হতে পারে। কাছাকাছি চেহারার দেখতেও তো হতে পারে! হতে পারে এই মেয়ে মিতুর আত্মীয়! ধ্যাত! কি যা-তা ভাবছি!

কিভাবে ও’র সাথে যোগাযোগ করা যায় সেই চেষ্টাই করতে থাকলাম। ইতোমধ্যে ক্লাসের সবার সাথে ভালভাবে বুঝাপড়া হয়ে গেল। ফ্লার্ট একটা ছেলে আছে। ক্লাসমেটের সুবিধা নিয়ে ওকে বললাম ওই মেয়েটির নাম যেকোনভাবে সংগ্রহ করতে।

কিন্তু মেয়েটি বেশ ক’দিন ধরে আসছে না। আমার খুব অস্বস্তিতে দিন কাটতে লাগলো। পেয়ে ধন হারালাম নাকি! আবার ট্রান্সফার নিয়ে নিলো না তো!

না ট্রান্সফার নেয় নি। প্রথম সাময়িক পরীক্ষার প্রথম পরীক্ষার দিন কলেজে ঢুকতেই হঠাৎ গেইটে দেখা হল। আমার পাশাপাশি হয়ে কলেজে ঢুকছে। আমি বড় রকমের দুশ্চিন্তা থেকে রেহাই পেলাম। আনন্দে নাচতে ইচ্ছে হচ্ছে। যাক ট্রান্সফার নেয় নি! কথা বলতে ইচ্ছে হলেও বলতে সাহস হচ্ছে না।যদি মিতু না হয়! অপরিচিত মেয়েকে কখনো কল করিনি। কখনো প্রয়োজনও পড়ে নি। কিন্তু অতিরিক্ত উদ্দীপনায় মুখ থেকে অস্ফুট স্বরে “মিতু” শব্দ উচ্চারিত করলাম। করেই অন্যদিকে চেয়ে হাটতে লাগলাম। মেয়েটি যেন থমকে দাঁড়ালো। আমিও দাঁড়িয়ে গেলাম। আমার আপাদমস্তক দেখতে লাগলো। সামনে থেকে কে যেন বলল, ” এই মিতু শোন এদিকে।”
সেই কথায় কথায় আমার দিকে বারকয়েক তাকিয়ে চলে গেল। আমি একইভাবে একদৃষ্টিতে যাওয়া দেখলাম।
হুম। এই সেই মিতু। যার জন্য চারবছর ধরে অপেক্ষা! সারাক্ষণ চিন্তায় চেতনায় এই মেয়েকে রাখা!
মিতুর ওরকমভাবে তাকানোই বলে দেয় আমাকে হয়তো ভুলে নি, মনে রেখেছে।

ভাবতে ভাবতে কখন যে দৃষ্টির অগোচরে চলে গেল খেয়াল করি নি। কোথায় এক্সাম দিতে পারে? কোথায় সিট পড়লো? মিতু কোথায় এক্সাম দিচ্ছে ভাল করে খোঁজ করতে পারলাম না। এক্সাম শুরু হওয়ার সময় হয়ে গেছে। তাই ব্যর্থ হয়ে নিজের সিট খুঁজে পরীক্ষা কক্ষে চলে আসলাম।

প্রথম সাময়িক পরীক্ষাই তো নাকি! একটা এক্সামে সম্পূর্ণ উত্তর না দিলেও চলবে। সম্পূর্ণ উত্তর দিতে গেলে তিন ঘণ্টা লেগে যাবে। এর ফাঁকে মিতু এক্সাম শেষ করে চলে যেতে পারে।
দুই ঘণ্টায় ৬৫ এরমতো উত্তর করে রুমে থেকে বের হয়ে গেলাম। পিওন একজনকে পেয়ে বললাম, কোথায় আর্টসের মেয়েদের পরীক্ষা হচ্ছে। সে সোজা সামনের দিকে একটা ভবন দেখিয়ে দিলো তিনতলায়। যাক পেলাম খুঁজে!

ভবনের নিচে দাঁড়িয়ে রইলাম। যখন মিতু আসবে তখন কি বলবো? শুধু কি দেখার জন্য দাঁড়িয়ে আছি! বলবো কি, ” মিতু আমি তোমার ক্লাস সিক্সের ফ্রেন্ড।”
না এগুলা না। বলবো, ” মিতু আমি তোমার ক্লাস সিক্সের ক্লাসমেট ছিলাম। শুভ্র। চিনছো আমাকে?
অনেক মেয়ে বের হওয়ার কিছুক্ষণ পর মিতু ও ওর ফ্রেন্ডরা বের হলো। এমন অনুভূতি হল যেন মনে হচ্ছিলো,” অনেক আপন তবুও পর”
কথা বলতে বলতে আমাকে পাশ কাটিয়ে যেয়েই আবার থেমে আমার দিকে ঘুরে দাঁড়ালো। আমি কি বলবো সব ভুলে গেছি। আমার কিছু বলতে হলো না। মিতুই বলল।
” শুভ্র না তুমি? ”
আমি বড় নিঃশ্বাস একটা পেলাম। চিনে ফেলেছে। আমার মতো মিতু ও আমাকে মনে রাখছে। অনেক বড় খুশির খবর আমার জন্য।
” কোন ডিপার্টমেন্টে ভর্তি হলে?”
আবার মিতু বলল। আমি বললাম, ” সায়েন্স। অনেকদিন পর দেখলাম। ”
কথাটা বলে হাসলাম। “হুম” বলে মিতু ও হাসলো। মিতু ওর ফ্রেন্ডদের সাথে পরিচয় করে দিয়ে, ” আসি আরেকদিন কথা হবে।” বলে চলে গেল।

একটু কথা বলেই চলে যাওয়াতে রাগ করি নি। এতো বছর পর আবার পেয়েছি এটাই অনেক বেশি। অনেক বড় পাওয়া। আমি মিতুকে হারিয়ে ফেলি নি।

শেষ এক্সামের দিন আরো একবার দেখা হলো। মিতুকে সম্ভবত খুব বিজি লাগছে। ফ্রেন্ডদের সাথে কথা বলে বলে বের হচ্ছে। কথা বলতে বলতে আমার দিকে একবার তাকালো। কিন্তু ব্যস্ত চোখগুলো মুহূর্তেই পথ খুঁজে নিলো সামনের দিকে। ইচ্ছা করছিল যেয়ে কথা বলি। কি বলতে পারি? এখন তো আর কিছু বলার নাই। তাই আর সাহস হল না।

আমি অবাক হলাম ভেবে মিতুকে নিয়ে এতো কথা জমেছিল। এখন কিছুই মনে পড়ে না। মনে হচ্ছে অনেকদিন পর হঠাৎ করে এভাবে দেখা হবে আর কৌশলাদি বিনিময় করে বিদায় বলা হবে। কোনো আলাদা টান নেই। নেই ভাবনার মাঝেও। ভাবনায় ঢুকানোও হবে না।
আমি এরকম তো চাই নি!

আমি চেয়েছি, মিতুকে সারাজীবনের জন্য কাছে পেতে। কখনো হারাতে নয়। আমার কি বলা উচিৎ,” মিতু আমি তোমাকে পছন্দ করি!”
মিতু যদি বলে পছন্দ করে না। ওভাবে আমাকে নিয়ে ভাবে নি। কিছুদিন একসাথে ক্লাস করা তারপর চারবছর পেরিয়ে যাওয়ার পর হঠাৎ দেখা। সেখানে কিভাবে ভালবাসা থাকতে পারে যেখানে অল্প বয়সের ক্লাসমেট!
অদ্ভুত ভাববে। আমাকে অদ্ভুতই ভাববে!
আমার প্রতি আলাদা ফিলিংস যে নেই-তা বুঝা গেছে আজকের আচরণে। অবশ্যই কথা বলতে আসতো। হাই, হ্যালো অন্ততপক্ষে বলে যেতো। যদি আলাদা টান থাকতো।

রাতে ফেসবুক চালাচ্ছিলাম। ফ্রেন্ড সাজেশনে ” monalisa mitu” আইডিটা দেখতে পেলাম। আইডিতে ঘুরে নিশ্চিত হলাম এটা মিতু। বর্তমান প্রোফাইল পিকের আগেরটাতে নিজের ছবি দেওয়া। ভালভাবে পরিচিত, ক্লোজ হওয়ার জন্য ফেসবুকের দ্বিতীয়টি নেই। রিকোয়েস্ট পাঠিয়ে দিলাম। আমার পিক না দেওয়া থাকলেও নাম আর ইনফো দেখে চিনতে অসুবিধা হবে না। বিশ মিনিট পরে ও’র আইডি থেকে ম্যাসেজ আসলো।
” তুমি কি শুভ্র?”
” হুম। ”
” প্রথমে চিনতে পারি নি। পরে আইডির ইনফরমেশন চ্যাক করে বুঝলাম তুমিই। আমি অপরিচিত কাউকে এক্সেপ্ট করি না তো সেইজন্য। তো কি খবর? ”
” এক্সেপ্ট এখনো করো নি! ”
” ওহ সরি! চিনে ম্যাসেজ দিয়ে নিশ্চিত হয়ে এক্সেপ্ট করবো বলে লেইট। ”
” ইট্স ওকে। নাম্বারটা দেওয়া যাবে?”
কি বলে ফেললাম এটা! মিতু যদি নাম্বার না দেয় তাহলে! ক্লোজ ফ্রেন্ড হলে একটা কথা ছিল। একদম ভুল করলাম।
মিতু বলল, ” কেন?”
বড় বিব্রতকর অবস্থায় পড়লাম। স্কুল জীবনের ফ্রেন্ড নাম্বার চাইলো আর এই কথার উত্তর যদি হয় “কেন!”। তাহলে আর কিছু বলার থাকেনা। আমি সিন করে আর কিছু বলিনি।

এক্সাম শেষ তাই বাড়িতে চলে গেলাম। অনেকদিন ধরে বাড়িতে যাওয়া হয় না। ফিরলাম এক মাস পর। মিতুর উপর রাগ করে আর এফবিতে আসি নি। অবশ্য এই রাগ করা অমূলক, যুক্তিহীন। অতীতের ক্লাসমেট বলে দেখা হলে হাই, হ্যালো বলা যায়। এফবিতে দু’একটা কথা বলা যায়। কিন্তু নাম্বার দিয়ে পীরিতির গল্প করা যায় না। যদি সেইরকম চিন্তা না থাকে।

ক্লাসে এসে প্রথম দিনই মিতুকে দেখতে পেলাম ওর ফ্রেন্ডদের সাথে ভবনের বারান্দায় কথা বলছে। এভাবেই দূরে থেকে দেখে যেতে হবে। অপ্রয়োজনে কাছে যাওয়া যাবে না। কথা বলা যাবে না।

আমি একটা টার্গেট করলাম, আমি ও’কে সহজে ছাড়বো না। যার জন্য অনেক ত্যাগ স্বীকার করলাম তার কাছ থেকে এতো সহজে সরে পড়লে কি চলে? মিতু কাউকে ভাল না বাসলে পিছু পিছু লেগে থাকবো। মিতুর মুখ থেকে যেদিন শুনবো আমি যেন সরে যাই।সেইদিন সরবো, এর আগে নয়।

রাতে অনেকদিন পর এফবিতে ঢুকে দেখি মিতুর দুইটা ম্যাসেজ। প্রথমটা ছিল, ” মিলি, পুষ্পাদের সাথে যোগাযোগ আছে কি না”। দ্বিতীয়টা ছিল, ” এই যে এফবিতে নাই কেন?”।
মিলি,পুষ্পা ছিল সিক্সে মিতুর ক্লোজ ফ্রেন্ড। ম্যাসেজ দিলাম, ” না। যোগাযোগ নেই। কেমন আছো?”
একটিভ ছিল না। ম্যাসেজ দিতেই একটিভ হয়ে গেল। ডাটা অন ছিল সম্ভবত।
” ওহ। ভালই আছি। ০১৭……..। ”
” এটা কার নাম্বার?”
” আমার।”
আজ হঠাৎ করে নাম্বার দিলো। আমার কাছে অদ্ভুত লাগলো। তারপরেও নাম্বার পেয়ে খুব ভাল লাগলো।
” হঠাৎ দিলে যে!”
” এমনি।”
” ওহ।”

আস্তে আস্তে মিতুর সাথে অনেকটুকু ফ্রি হতে পেরেছি। এখন মিতুকে তুই করে ডাকি, ইনবক্সে প্রত্যেকদিন আড্ডা দেই। হাই স্কুলের ফ্রেন্ডরা মিলে খোলা গ্রুপ চ্যাটে সেই সিক্সের মতো ফ্রেন্ডরা আমাদের নিয়ে মজা করে। মিতু রাগে না তবে চুপচাপ দেখে। অবশ্য মিতুকে গ্রুপে এড দেওয়ার পর প্রথম প্রথম ওদের এমন আচরণে লেফট নিতো প্রায়ই। ” সিক্সে পেপার দেখানোর জন্য কান ধরার ঘটনাটির জন্য মজা করে ওরা,এগুলা নিয়ে সিরিয়াস হলে পুরাতন ফ্রেন্ডদের সাথে ভুল বুঝাবুঝি ছাড়া আর কিছু হবে না।”
এমন অনেক কথা বুঝিয়ে আবার এড দিতাম। সবাই সরি বললেও কিছুদিন পর আবার ফ্রেন্ডরা শুরু করে দিতো। নীরব দেখাই ভাল মনে করে মিতু প্রতিবাদ করা বাদ দিয়ে দেয়।

তবে গতকাল রাতে পুষ্পা সাংঘাতিক রকমের কথা বলে ফেলেছিল। যার কারণে মিতু লেফট নিয়ে নেয় হার্ড কথা বলে। পুষ্পা বলছিলো, ” আচ্ছা গ্রুপবাসী, শুভ্র – মিতুর বিবাহ বন্ধনে আবদ্ধ হতে কতো দেরি পাঞ্জেরী! ”
মিতু বলল, ” তোমরা জানি না কি ভাবো, এতদিন অনেক কিছু বলেছো কিছু মনে করেও করি নি। তবে আজ সেটা লিমিট ক্রস করে ফেলেছে। শুভ্র আমার ভাল বন্ধু, তোমরা যেমন। বন্ধু বলে যা ইচ্ছা বলবে তা তো নয়! যাইহোক বিদায়!”

পুষ্পার সাথে ভাল বন্ধুত্ব তাই সহজে আবার এক হয়ে যাবে। কিন্তু সমস্যা আমাকে নিয়ে। তাই মিতু যে আমার সাথে কথা বলা বাদ দিয়ে দিবে আমি একরকম আন্দাজ করে ফেলেছি এবং সেটা হয়েছেও। ইনবক্সে ম্যাসেজ দিয়ে বুঝিয়েছি ঘটনাটার ব্যাখা অন্যভাবে। সিনই করি নি।

এর মাঝে এইচএসসি পরীক্ষা হয়ে গেল মিতু কথা বলেনি এখনো। ইনবক্সে অনেকগুলো ম্যাসেজ দিয়েছিলাম। পরে সিন করলেও কথা বলে নি। কলেজে এসে এড়িয়ে চলার চেষ্টা করতো। এইচএসসি এক্সামের সময় পাশাপাশি হল পড়েছিল। বাইরে বের হবার সময় দেখা হলেও কথা বলে নি। আমি সরে যেতাম। কিন্তু মিতুর সাথে কথাই বলতে পারছিলাম না কোনোভাবে। তাই মনে হল সরে পড়ার দরকার নেই। ভাল করে এর শেষ দেখে যাব।

মিতু বাংলা বিষয়ে অনার্সে ভর্তি হলো। একই সাবজেক্ট নিয়ে আমিও ভর্তি হলাম। উদ্দেশ্য মিতুকে চোখেচোখে রাখা। সাবজেক্ট চয়েজগুলা জানানোর কৃতিত্বটা মিতুর ক্লোজ ফ্রেন্ড রেসির। প্রথম ক্লাসে আমাকে দেখে মিতু অবাক হয়ে গেল।

রাতে ফেসবুকে ঢুকে মিতুর ম্যাসেজ দেখে অবাক হয়ে গেলাম। কতদিন পর কথা বলল!
বলল,” আমার পিছে পিছে পড়ে আছিস এখনো? আমাকে পছন্দ করলে ভুল করছিস। আমি তো তোকে জাস্ট ফ্রেন্ড ভাবতাম। কিন্তু এরকম হবে জানতাম না। জানলে এখানে ভর্তিই হতাম না। ধ্যাত! তোর কারণে আর ক্লাস সম্ভবত নিয়মিত কর‍তে পারবো না! ”

ম্যাসেজটা পড়ে খুব হতাশ হয়ে গেলাম। এবার আমার উত্তর পাওয়া হয়ে গেল। হয়ে বাসবে নয়তো সরে যেতে বলবে, তারপর যাবো। এবার পুরষ্কার পাওয়া হয়ে গেল। রাগ করে আমার আইডিটাই ডিলেটশনে পাঠিয়ে দিলাম।

এতো ভালবেসে, এতো বছর ধরে ভালবেসেও যখন মূল্য পাওয়া যায় না তখন প্রতিনিয়ত এক, একটি বুক চেপে ধরা দীর্ঘনিশ্বাসের সাক্ষী হতে হয়।

তিনমাস পর একদম ইনকোর্স পরীক্ষায় হাজির হলাম। সবকিছু স্বাভাবিক করতে দীর্ঘদিন মিতুর সামনে না আসাই উপযুক্ত মনে করলাম। এই তিনমাসে অনেকভাবে চেয়েছি মিতুকে ভুলে যেতে। কতটা ভুলতে পেরেছি জানি না। তবে এখন মনে করার চেষ্টা করলে মনে পড়ে। মনে না আনলে সময় কাটিয়ে দিতে পারি। মিতুকে পেতেই হবে এমন ভাবনা ভুল বলে দিব্যি স্বীকার করে দিতে পারি। নিজের আচরণে নিজেই অবাক হয়ে যাই।
আমি সত্যি কি সেই শুভ্র যে মিতুকে ভালবেসেছিল!

ইনকোর্স এক্সামে এসে সম্পূর্ণ ক্লাসে মিতুকে খুঁজে পাই নি। হঠাৎ রুমে এক্সাম ফাইল নিয়ে ঢুকলো। সবার শেষে মিতু, তার আগে আমি। তাই আর সিট না পেয়ে পিছনের দিকে মিতু এসে আমাকে দেখে চমকে উঠলো। আমার পিছনেই বসতে হলো। তিনমাস পর মিতুকে দেখলাম। একটু শুকিয়ে গেছে। শুকিয়ে গেলেও চেহারার পরিবর্তন বুঝা যায় না। সৌন্দর্য কমে নি একটু ও!

আমি খুব গুরুত্ব সহকারে না তাকালেও মিতু প্রায়ই আমার দিকে জিজ্ঞাসু দৃষ্টি তাকাতে লাগলো। সম্ভবত মনের মাঝে কিছু প্রশ্ন জমে আছে। থাক জমে! সব প্রশ্নের উত্তর খুঁজতে নেই। কিছু কিছু প্রশ্নের উত্তর ব্ল্যাংক আসে।
সবগুলো পরীক্ষা দিয়ে ভাবতে লাগলাম আর ক্লাস করবো কি না!

আট, নয় মাস বাকি ফাইনাল এক্সামের। এই ক’টা দিন আমাদের এলাকার কলেজে ক্লাস করতে পারি। এখানে ক্লাস করলে আমি মিতুর মায়ায় পড়ে যাবো। আবার নতুন করে মিতুর প্রেমে পড়ে যাব।মিতুর কাছ থেকে নতুন করে আর অবহেলা পেতে চাই না। হয়তো আমার থেকে অনেক ভাল ছেলে মিতু কামনা করে। আমি বাড়িতে চলে আসি।

কিছুদিন পর হাই স্কুলে আমাদের ব্যাচের পুনর্মিলনী অনুষ্ঠানে যাওয়ার জন্য ফ্রেন্ডদের থেকে ইনভাইট পেলাম। অনেকদিন ধরে পুরাতন কিছু বন্ধুদের দেখি না। মিস দিতে মন চাইলো না।

যেয়ে পুষ্পার পাশে মিতুকে বসা দেখে অবাক হয়ে গেলাম। মিতু আসবে এমন টা আশা করি নি, আশা করা অনর্থক। আমাদের ব্যাচের হলেও সিক্সে শুধু পড়েছে। এসএসসি দেয় নি আমাদের সাথে। আমাকে দেখে পুষ্পা হেসে বলল, ” কি রে কেমন আছিস? দিনকাল কেমন যাচ্ছে?”
” ভালই। তোর?”
” ভাল।”

মিতু শাড়ি পরে এসেছে। বেশ ভাল লাগছে! আমার দিকে আড়চোখে একবার তাকালো। আমি একটু লেইট করেই আসলাম। তাই ওদের পিছনেই বসতে হলো। কিছুক্ষণ চুপচাপ মোবাইল চালাচ্ছিলাম। পুষ্পা বলল, ” ওই তোর সাথে না মিতুর খুব জরুরি কথা আছে।”
পুষ্পা হাসলো। পুষ্পার গায়ে ধাক্কা দিয়ে মিতু বলল, ” ওই আজেবাজে কথা বললে উঠে যাব।”
আমি কিছু বলি নি। ওদের কথা শুনে যাচ্ছিলাম। পুষ্পা আবার বলল,” বাব বাহ! তুই-ই তো বললি…!”
পুষ্পা কথা সম্পূর্ণ করার আগেই মিতু উঠে অন্যজায়গায় চলে গেল। পুষ্পার কথার আগা-মাথা কিছুই বুঝলাম না। আমি কিছু বলার আগেই পুষ্পা বলল, ” মিতুকে নিয়ে আস।যা।”
” আমি কেন আনবো? আমার দরকার নাই।”
” তোকেই আনতে হবে। প্লিজ যা।”
” আরে বুঝ কথা। আমি তো মিতুর সাথে কথা বলি না। ”
” তবুও!”
” ওকে।”

জানি না পুষ্পা এতো আগ্রহ দেখাচ্ছ কেন আমাদের ব্যাপারে। তবে পুষ্পার জোরাজুরিতে মিতুকে ডাকতে গেলাম। জানি না কথা বলা উচিৎ কি না। তবুও কেন যেন ইচ্ছে হল মিতুর সাথে কথা বলি। খুব ইচ্ছে!
মিতুর পাশে যেয়ে বললাম, ” জায়গায় আসো।”
মিতু চমকে তাকালো। চোখেমুখে হাসির আভা ফুটে উঠলো। আমি ওর মুখের দিকে তাকাতে পারছি না। কেমন অস্বস্তিকর বোধ হচ্ছে।
আমার পিছু পিছু আসলো। চুপচাপ বসলো। কোনো কথা বলল না।
পুষ্পা হঠাৎ বলল, ” মিতু কি হয়েছে তোর। এমন করছিস কেন। শরীর খারাপ?”
আমি চমকে উঠলাম। কি হলো আবার মিতুর। অসুস্থ হয়ে গেল নাকি!
” না। ”

এইটুকু বলে মিতু উঠে দাঁড়ালো। চোখ মুছে স্টেজের দিকে গেল। মিতু কাঁদছিল নাকি! কেন কাঁদবে? মিতু মাইক্রোফোনের সামনে গেল। স্টেজ এখনো ঠিকঠাক করা হচ্ছে। সুতরাং মাইক্রোফোনে এখন কিছু বলার সময় আসে নি। সবাই অবাক হয়ে তাকালো। মিতু মাইক্রোফোনের সামনে মুখ এনে বলল,” আচ্ছা ফ্রেন্ডস, ভালবাসার মানুষটির উপর রাগ, অভিমান করে দূরে থাকা কি ঠিক?”
সবাই মাথা নেড়ে বলে উঠলো, ” না।”
” কিন্তু আমাকে যিনি ভালবাসেন তিনি তো আমার থেকে দূরে থাকেন। ”
সবাই সমস্বরে বলে উঠলো, ” কেন?”
” তাকে আমি ভুল বুঝেছি। তার ভালবাসা গুরুত্ব দেই নি। আমি বিরাট ভুল করেছি। ”
চোখ মুছে আবার মিতু বলল,” ফ্রেন্ডস, আমার কি করা উচিৎ? ”
” সরি বলো।”
সবাই এবার চিৎকার দিয়ে বলল।
মিতু আমার দিকে এবার সরাসরি তাকালো। মিতুর দেখাদেখি সবাই আমার দিকে তাকালো। মিতুর কথাগুলো শুনে হার্টবিট অনেক বেশি বেড়ে গেল। মুহূর্তের মধ্যে সবকিছু ঝাপসা লাগলো।
মিতু বলল, ” I’m extremely sorry shuvro. Please forgive me. I love you!”

সবাই জোরে হাত তালি দিয়ে উঠলো। নিজের অজান্তে আমিও হাততালি দিতে থাকলাম। আমি কোনোভাবেই বিশ্বাস করতে পারছি না আমার জন্য এমন সারপ্রাইজ অপেক্ষা করছে। কোনোভাবেই না!
ঝাপসা হওয়া চোখ মুছে আমি দাঁড়ালাম। মিতু আমার দিকে প্রবল আকাঙ্ক্ষা নিয়ে তাকিয়ে আছে। আমার মুখ থেকে কিছু শুনবে। সবাই উৎসুক হয়ে আছে আমি কি করবো। হুম বলবো আমি।বলতে হবে আমাকে।

যা যা হয়েছে আমি সব ভুলে গিয়েছি মিতু। তোমাকে ভুলি নি। তোমাকে ভুলতে পারি না। দেহ থেকে যেমন মনকে আলাদা করা যায় না। তেমনি তোমার থেকে আমাকে আলাদা করা যায় না। দীর্ঘ আটবছরের মধ্যে ঘটে যাওয়া ধূলিময় সকল স্মৃতি মুছে দিয়ে এক হওয়ার সময় এসেছে। রাগ, অভিমান ভুলে এক হওয়ার সময় এসেছে। হারিয়ে পাওয়া ভালবাসা আগলে রাখার সময় এসেছে!

গল্পের বিষয়:
রোমান্টিক

Share This Post

আরও গল্প

সর্বাধিক পঠিত