স্পর্শ

স্পর্শ

তিন রাস্তার মোড়ে দাঁড়িয়ে আছে মাঝবয়সী একটা পাগলী। মাঝে মাঝে সে লাজহীন ভাবে কয়েকমিনিট লাগাতার হাসে, মাঝে মধ্যে কাঁদে, মাঝে মাঝে এলোপাথাড়ি ভাবে মাঝপথে ছুটে বেড়ায়। তাকে ঘিরে ছোট ছোট কিছু দুষ্ট ছেলেদের একটা ভীড় কম বেশি লেগে থাকে, দুষ্ট ছেলেদের দুষ্টুমিতে বিরক্ত হয়ে সে প্রায়ই তাদের পিছু পিছু ইট কিংবা পাথর নিয়ে ছুটে। পথচারীরা তার পাশ দিয়ে যাবার সময় বার বার উৎসুক দৃষ্টিতে তার দিকে তাকায়। উৎসুক লোকেদের মধ্যে আমিও একজন।

রোজ ক্লাসে যাবার সময় তার সাথে আমার দেখা হয়। কখনো কখনো কিছু বাজে লোক তার জামা ধরে টানাটানি করে, এতে যে তারা কি আনন্দ পায় বুঝি না, তাদের চোখে মুখে আনন্দের ঝলকানি দেখে খুব খারাপ লাগে। একদিন গিয়ে ঐ লোকেদের দু-চারটা কথা শুনিয়ে দিবো ভাবি কিন্তু আর বলা হয়ে ওঠে না।

কনকনে শীত, ঝুম বৃষ্টি কিংবা অসহ্য গরমেও পাগলীটাকে দেখা যায় উশকোখুশকো চুলে, নোংরা কাপড় পরে হেলে দুলে ছুটে বেড়াচ্ছে একবার ডানে একবার বামে। নির্ভীক যোদ্ধার মতনই সে নির্ভয়ে মেইন রাস্তার মাঝখান দিয়ে ছুটে চলে। তাকে দেখলে মনে হয় রাস্তাটা হয়তো তার নিজের অর্থে বানানো নতুবা তার বাবা শুধুমাত্র তার জন্যেই রাস্তাটা বানিয়ে দিয়ে গেছে, তার যেভাবে খুশি সেভাবেই সে চলবে কেউ তাকে বাঁধা দিতে পারবে না, অথবা পথটা তার

নিজের সম্পত্তি যা কিছু লোকেরা কোন একসময় দখল করে নিয়ে ভোগ করছে, সে তার দখল হয়ে যাওয়া সম্পত্তির একমাত্র দাবিদার, সম্পত্তির অধিকার আদায়ের জন্যে সে পথে নেমে পরেছে-
“হয়তো সম্পত্তি ফিরিয়ে দে, নয়তো জীবন নিয়ে যা”।

গাড়ি চালকেরা অসংখ্যবার হর্ণ বাজালেও সে তার মতনই এঁকেবেঁকে হেলে দুলে ছুটে চলে, তাকে দেখে মনে হতে পারে- সদ্য কয়েক বোতল মদ গিলে মাতাল হয়ে বাড়ি ফিরছে। পা গুলো তার ছন্নছাড়ার মতন একটার পর একটা পিচঢালা পথ স্পর্শ করে। হর্ণ বাজাতে বাজাতে বিরক্ত হয়ে শেষপর্যন্ত গাড়ি চালক তাকে পাশ কাটিয়ে যেতে বাধ্য হয়।

পাগলীটা মাঝে মাঝে আকাশের দিকে বিষন্ন মনে তাকিয়ে আপনমনে কি কি যেন অস্পষ্ট ভাবে বলে যেত, তাকে ওরকম ভাবে দেখে আমার এতো কষ্ট হতো ভাবতাম, একবার তাকে জিজ্ঞাস করবো, কি হয়েছে তোমার? ওমন করে আকাশের দিকে তাকিয়ে কি বলো? কিন্তু কখনো আর বলা হয় নি।

দিনকে দিন বাজে লোকগুলোর বাজে ব্যবহার বেড়েই চলেছে, কখনো তারা পানি ছুড়ে মারে, কখনো কখনো লাঠি দিয়ে বারি দেয়।

একদিন ক্লাসে যাবার সময় গাড়ি থেকে দেখলাম, কয়েকজন দোকানদার পাগলীটাকে চারদিক থেকে ঘিরে কেউ জামা ধরে টানছে, কেউ লাঠি দিয়ে বারি দিচ্ছে, গাড়ি থেকে নেমে গিয়ে থামাবো তার আগেই গাড়ি চলতে শুরু করল, সেদিনই মনে মনে ঠিক করলাম, আর কখনো এরকম দেখলে প্রতিবাদ করবো।

এরপর দিন থেকে পাগলী টাকে আর দেখি না। প্রতিদিন ক্লাসে যাবার সময় খুঁজি কিন্তু খুঁজে পাই না।

প্রায় পাঁচমাস পরের কথা, একদিন সকালে পত্রিকা পড়ছিলাম, পাতা উল্টাতে উল্টাতে শেষ পাতার একটা ছবিতে চোখ আটকে গেল- ছবির উপরে বড় করে লেখা-
“পাগলীর গর্ভে বাচ্চা”।
পাগলীর পেটে বাচ্চা

গল্পের বিষয়:
রোমান্টিক

Share This Post

সর্বাধিক পঠিত