ডুয়েট BA

ডুয়েট BA

রাত্রিকে বিয়ে করেছিলাম ভালোবেসেই।আমাদের পাঁচ বছরের একটা মেয়ে আছে।রাত্রি আমার ছেলেবেলার বন্ধু তাই নয় শুধু দুজন দুজনকে ভালোও বাসতাম।দুজনের ফ্যামিলির মতেই বিয়েটা হয়েছিলো।ওর ফ্যামিলিতে সবাই থাকলেও।আমার ফ্যামিলিতে শুধু আমার বাবা ছাড়া কেউ নেই।একদম ছোট বেলায় আমার মা মারা যায় আমার ভালোবাসার ভাগ কমে যাবে বলে বাবা আর বিয়ে করে নি।লেখাপড়া শেষ করে বাবার এজেন্সি ব্যবসাটা আমিই ধরেছি এখন।বাবাই আমাকে দায়িত্ব দিয়েছে আর বলে তার নাকি বয়স হয়েছে।বাবা বাড়িতেই থাকে।

একদিন রাত্রি আমাকে বললো হাসিব তোমার বাবার জন্য আমি ঘরের সব কাজ শেষে একটা সিরিয়ালও ঠিক দেখতে পারি না।উনি শুধু খবরের চ্যানেল নিয়ে বসে থাকে।

-তাহলে আমি কালই বাবার রুমের জন্য একটা এলইডি নিয়ে আসবো তোমার যখন এতোই ডিস্টার্ব হয়।
-এলইডি কিনে টাকা নষ্ট করার কি দরকার আবার মাসে মাসে ডিশ আর বিদ্যুৎ বিল বাড়বে।তুমি উনাকে খবরের কাগজ এনে দিলেই তো হয়।

-কি!আমার বাবা পড়বে বাসি খবর?আজকের সব তাজা খবর পড়বে আগামীকাল!আমি যেটা বলছি সেটাই হবে।
-যা ইচ্ছে তাই করো।

পরেরদিন রাত্রি বললো দেখো হাসিব তোমার বাবা আজ নয়নকে (আমাদের মেয়ের নাম নয়নতারা মিশু আদর করে ডাকি নয়ন) নিয়ে ঘুরতে বেড়িয়ে গেছিলো রাস্তায়।

-তো কি হয়েছে!
-উনি বয়স্ক মানুষ যদি উনার বেখেয়ালে আমার মেয়েটা হারাইয়া যাইতো!
-এতোই যদি বেখালি হতো তাহলে আমিও সেই কবেই হারাইয়া যাইতাম।
-আরে তখন উনি যুবক ছিলো এখন স্মৃতিশক্তি লোপ পেতে শুরু করছে।
-নিজে কি মেয়েকে সময় দাও?সারাদিনই তো সিরিয়াল নিয়ে বসে থাকো।আর বাবা ওকে নিয়ে বাইরের খোলা পরিবেশে ঘুরতে গেছে তাতে তোমার অসহ্য লাগছে!
-কি তোমার ওই বুড়ো বাপের জন্য আমাকে এতো কথা বললে!
-এরকম বাজে কমেন্ট করলে আগামীতে আরো বলবো।
-আমাকে ভালোবাসার আগে এমনকি বিয়ের আগে পর্যন্ত বলেছিলে আমাকে কষ্ট পেতে দিবে না।
-এটাও বলি নি যে সব বেয়াদপি প্রশ্রয় দিবো।
এরপর থেকে প্রতিদিন রাত্রির অভিযোগ ছিলো বাবাকে নিয়ে।একদিন বলে উনার হাত থেকে প্লেট পড়ে ভেঙ্গে গেছে।একদিন বলে বাজারের টাকা হারাইয়া ফেলছে।
-দেখো হাসিব এভাবে আমার চলবে না।
-কি হয়েছে?
-তুমি বলেছিলা বিয়ের পর আমাকে রাণীর মতো রাখবা।
-কষ্টে রেখেছি কই?

-ছাই রাখছো রাণীর মতো।তোমার বাবার প্রতিদিন নতুন নতুন আইটেমের খাবার খাওয়ার শখ জাগে।আর আমাকে তা বানিয়ে দিতে হয়!কেনো!আমাকে কি তোমার ঘরের রাণীর যায়গায় চাকরানি হয়ে থাকতে হবে।

-এতে তো তোমার আরো ভালো লাগার কথা।বাবাকে ভালোবেসে রান্না করে দিতে খারাপ লাগার কি আছে!বরং আত্মতৃপ্তি হওয়ার কথা!

-না!আমার এসব একদম অসহ্য লাগে।
-তা লাগবেই তো।তোমার কথা হচ্ছে ঘরটাকে নিজ হাতে গুছাবে না শুধু বসে বসে সিরিয়াল সো দেখতে পারলেই ভালো!

-এমন হলে আমি তোমার ঘর করবো না থাকো তুমি তোমার বাবাকে নিয়ে।যেদিন তোমার বাবাকে বৃদ্ধা আশ্রমে দিয়ে আসবে সেদিন তোমার কাছে আসবো।আমি গেলাম বাপের বাড়ি।

কখন যে বাবা এসে আমাদের রুমের সামনে দাঁড়িয়ে ছিলো বুঝতেই পারলাম না।

-আমি বুঝতে পারছি মা আমার জন্যই তোমাদের সাংসারিক সমস্যাবলী।হাসিব তুই আমাকে বৃদ্ধাশ্রমে দিয়ে আসবি।আসলে আমারও এখানে একা একা ভালো লাগে না।বোরিং লাগে।ওখানে যদি সমবয়সী বন্ধু পাই তাহলে ভালোই লাগবে।আর তুই তো প্রায়ই আমায় দেখতে যাবি আমার সমস্যা হবে না।বউমা ঠিকই বলেছে তুই কালই আমাকে আশ্রমে দিয়ে আসবি।

-বাবা!
-কোনো কথা নয়!যা বলছি তাই হবে।আমি জানি তুই আমার সব কথা শুনবি।

 

পরেরদিন সন্ধ্যায় বাড়ি ফিরে বাবাকে নিয়ে বের হলাম।
এখন আমার ভাবনায় শুধু বাবা!আমি এখন ভাবছি বিল গেটস,মার্ক জুকারবার্গ,স্টিভ জবস,নিউটন,এরিষ্টটল,মাশরাফি,লিওনেল মেসি,ওসাইন বোল্ড কিংবা দেশসেরা আর্মি অফিসারদের কথা এদের কথা।যখন এদের বাবারা ছোট বেলায় হাত ধরে হাটা শিখিয়েছলেন তখন কি সেই বাবারা জানতে পেরেছিলো যে তাদের ছেলেরা এতো বড় দায়িত্বগুলা নিবে!তাদের সেই ছোট কাঁধগুলা প্রত্যেকটা বাবার যোগানো সাহস পেয়েই তো এতো চওড়া হয়েছে।প্রত্যেকটা বাবাই তো তার ছেলের অনেক বড় হওয়া নিয়ে সাহস আর সাপোর্ট দিয়ে যায়।বাবাদের মতো আদর্শবান হতে হলে আগে বাবা হতে হয়!একটা BA কমপ্লিট করা ছেলে যখন একটা চল্লিশ বছর বয়স্ক রিক্সাওয়ালাকে বলে যাবি?

তখন ওই রিক্সাওয়ালা বলে কোথায় যাবেন?

নিজের সন্তানদের অন্ন যোগাড় করতেই আজ সে তিনচাকার পায়ে চাপা গাড়ি চালায়।কর্ম সরঞ্জাম বলে ওটাকে ওই বাবাটা রিক্সা মনে করে না।উড়োজাহাজ মনে করে।আর এই জন্যই হয়তো বাবাদের লাজ থাকে না!একটা BA সার্টিফিকেট নিয়ে আপনি একটা বাবাকে তুই বলতে পারলে ওই বাবার তাহলে দুইটা BA সার্টিফিকেট আছে!আসলে বাবারা এমনই!ডুয়েট BA সার্টিফিকেট মিলেই বাবার মতো আদর্শবান হওয়া যায়।এই জন্যই BA BA ইকুয়েলটু BABA!বাবা হওয়া ছাড়া কেউই সে সার্টিফিকেটের সাধ ভোগ করতে পারে না।আর কাগজের সার্টিফিকেট দিয়ে তোমার জ্ঞান-আদর্শ মাপা যায় না।শুধু ক্লাস টপকানো আর ভালো রেজাল্টটাই মাপা যায়।নৈতিক শিক্ষা নয়।
যাই হোক বাবাকে নিয়ে যাওয়ার সময় গাড়িতে বসে চোখেরজল টলমল করছে।ছোটবেলায় বাবা এভাবেই নিজে গাড়ি চালিয়ে আমাকে স্কুলে নিয়ে যেতো আর আমি আজ নিজে তাকে নিয়ে যাচ্ছি আশ্রমে!আজ মনে পড়ছে কারো লিখে যাওয়া সেই বাণীটা,ভাই-বাবা রক্তের বাঁধন,ছিন্ন যদি হয় নারীরই কারণ!

ডান পাশের জানালা দিয়ে তাকালে সেই মাঠ যেখানে সকালে বাবার হাত ধরে মর্নিং ওয়াকে যেতাম আর বিকেলে স্মৃতিঘেরা ময়দানে বাবার সাথে খেলতাম আর বাবাকে ব্যাটিং না দিয়েই দৌড়ে বাড়ি এসে বসে বসে থ্রি ফ্রেন্ডস কার্টুন দেখতাম।আমি আর বাবা ছিলাম একপ্রকার এখনকার টম এন্ড জেরির মতো ছিল।আমি আর উনি ছাড়া বাসায় কেউ না থাকলেও ছিলো আনন্দের হই হুল্লোর!সারাদিন একে অন্যের সাথে ঠুকাঠুকি চলতই!মাঝে মাঝে মনে হয় কার্টুনটা কি আমাদেরকে নকল করে বানাইছে নাকি!কারণ একটাই,বাবা বুঝতে দিতে চাইতো না আমি একা!তিনি চিরকাল আমাকে এটাই শিখিয়েছেন উনিই আমার মা উনি আমার বাবা।

আমার ভাবতেই লজ্জা লাগছে আমি এমন বাবাকে আশ্রমে দিতে যাচ্ছি!

যেতে যেতে দেখলাম বাবার চোখে পানি টলমল!

-বাবা।
-হুম।

-আমি তোমাকে ওখানে ছেড়ে ভালো থাকতে পারবো না।তুমিই তো বলতে যতদিন বেঁচে থাকবে আমার হাত ধরে রাখবে।

-ধুর বোকা তা হয় নাকি এখন তোর হাত ধরার জন্য রাত্রি আছে তো!

-আচ্ছা ওর হাত ধরেছিলাম ক্লাস সেভেন থেকে বিয়ের পর আরো ছয় বছর আমি ওর হাত ধরেছি ১৫ বছর হলো কিন্তু তুমি আমার হাত ধরেছো ত্রিশ বছরের বেশি তুমি কি করে ছেড়ে দিতে পারো?

বাবা চশমাটা খুলে চোখ দুটো মুছে বললো।তাতে কি ভালো তো থাকবি!কেউ একজন তো ধরেছে তোর হাতটা!

-আমি চাই না বাবা।তুমি না বলতে তুমি আমার বাবা-মা দুইটাই?
-হুম।
-তাহলে বাসায় চলো।আমি আমার বাবাকে আশ্রমে দিয়ে এসেছি।সাথে করে যাকে নিয়ে যাবো সে আমার মা।
-হাসিব।
-হুম বাবা।

বাবাকে আমি কখনোই ওইখানে দিয়ে আসতে পারবো না।আমার মন মানবে না।তাই একটা রেস্তোরাঁয় ডিনার করে বাবাকে নিয়ে বাসায় ফিরে এলাম।

আর বাবাকে বাবার রুমে ঢুকিয়ে বাইরে থেকে নক করে দিয়ে রাত্রিকে নিয়েই ওই রাতে রওনা দিলাম।বাবা সামনে থাকলে ওটা করতে পারতাম না।তাই বাবাকে আটকে দিলাম।

-কোথায় নিয়ে যাচ্ছো!ছাড়ো হাসিব।লাগছেতো আমার!
-তোমার বাপের বাড়ি।কারণ এই বাড়ি আমার বাবার এখানে বাবা থাকবে আমি তার আশ্রিতা মাত্র!
জোড় করেই রাত্রিকে টেনে গাড়িতে তুলে নিয়ে গেলাম ওর বাপের বাড়ি।
-কি হয়েছে বাবা ওকে এতো রাতে যে নিয়ে আসলে!নয়ন কোথায়?
-নয়ন আমার কাছে থাকবে।আপনার মেয়েকে আপনি রাখেন।
-কি হয়েছে?
-অনেক কিছু।আমি আপনার মেয়েকে আমার ঘরে নিতে পারবো না।
-কিন্তু বিয়ের আগে যে বলেছিলে ওকে সুখে রাখবে!এ কেমন সুখ!
-আপনার ছেলের বউ যদি বলে আপনাকে বৃদ্ধাশ্রমে রেখে আসতে আর আপনার ছেলে যদি আপনাকে রেখে আসে তাহলে আপনি কতটা মানতে পারবেন?
-মানতে পারবো না।
-আপনাদের মেয়ে তেমনই বলছে!
-কিরে রাত্রি।
-আমার আর কিছু বলার নেই আমি আসি।আপনাদের মেয়েকে আপনারাই বুঝে নিন।

পরেরদিন নয়ন আমাকে জিজ্ঞাস করছে বাবা বাবা মা কোথায়?
-মা নেই।
-কেনো নেই?
-তোমাকে কেউ যদি বলে তোমার পাপাকে তোমার থেকে দূরে কোথাও রেখে আসতে তাহলে তুমি কি করবে?
-আমি তাকে বকবো।
-তোমার মা আমার পাপাকে দূরে দিয়ে আসতে বলছিলো।
-আমিতো দাদুর সাথে সারাদিন খেলি দাদু চলে গেলে আমি কার সাথে খেলবো?
-এই জন্যই মা কে তোমার নানুর বাড়ি রেখে এসেছি।
-ওকে পাপা।
-মা আসবে কখন?
-জানিনা।হয়তো আসবে না।
মনে মনে ভাবছি এমন একটা বাবার জন্য আমি হাজারটা রাত্রিকে বিসর্জন দিতে পারি।
-হাসিব।
-বলো বাবা।
-কাজটা মোটেই ঠিক করিস নি!
-কি কাজ?
-যা রাত্রিকে নিয়ে আয়।
-আমি পারবো না।

সন্ধ্যায় অফিস (এজেন্সি অফিস) থেকে ফিরে দেখি রাত্রি বাসায়।আমি ওর দিকে না তাকিয়ে সোজা বেলকনিতে যেয়ে চেয়ারে বসে আছি।পিছন থেকে রাত্রি আমার কাঁধে হাত রাখলো।

-এখানে এসেছো কেনো?

-সরি।বাবা আমাকে নিয়ে এসেছে।আমাকে ক্ষমা করে দাও হাসিব আসলে আমার ভুল হয়ে গেছে।আমি তখন বুঝতে পারছি বাবাদের কষ্টটা যখন অভিমানে কাল আমার বাবা আমার সাথে একটা কথাও বলে নি অথচ আমি তার সামনেই ছিলাম।আর বাবার ভালোবাসাটা তখন অনেক গভীরভাবে ফিল করছি যখন তোমার বাবা আমাকে আমাদের ওখান থেকে আনতে গেলেন!

-হুম।বাবারা এমনই হয় রাত্রি।এই জন্যই বাবারা ডুয়েট BA.
-হুম ঠিক বলেছো।আচ্ছা আমি যাই তোমার আর বাবার জন্য চা করে নিয়ে আসি।আর কাল স্পেশালি বাবার ফেভারিট চিংড়ি আর খিচুড়ি রান্না করবো।
-হুম।আমাদের এই ভালোবাসা আঁটুট থাকুক।

গল্পের বিষয়:
রোমান্টিক

Share This Post

সর্বাধিক পঠিত