সাগর কন্যা

সাগর কন্যা

অই উঠ ঘুম থেকে।অামরা তো চলে এসেছি।(অভ্র)
>>কই এসেছি??(বিজয়)
>>তোর শ্বশুড়বাড়ি।(অভ্র)
>>তাই নাকি!!(বিজয়)
>>অালসামি বাদ দিয়ে তাড়াতাড়ি উঠ।(অভ্র)
>>অার একটু অাগে ডেকে দিবি না।(বিজয়)
এতক্ষণ কথা হচ্ছিলো অভ্র অার বিজয়ের মধ্যে।
কলেজ লাইফ থেকে ওরা দুজন খুব ভালো বন্ধু।বিজয়ের অনেক জোরাজোরিতে কক্সবাজার ঘুরতে এসেছে ওরা।বিজয় কোনদিনও কক্সবাজার অাসে নি।
হঠাৎ করে ওর কক্সবাজার যাওয়ার ভীষণ ইচ্ছা হলো।
১ সপ্তাহ পর সেমিস্টার ফাইনাল।তাই অার কেউ রাজি হচ্ছিলো না এই সময় কক্সবাজার ঘুরার জন্য।
বিজয় তাই শেষ ভরসা হিসেবে অভ্রকে রাজি করিয়েছে।কক্সবাজারে দুই দিন ঘুরার পরিকল্পনা তাদের।

১ম দিন সমুদ্রসৈকত সহ নানা জায়গায় ঘুরলো তারা।
২য় দিন বিকালে শেষবারের মতো অাবার সৈকতে অাসলো তারা।

কিছুক্ষণ ঘুরাঘুরি করলো তারা।অভ্র এর অাগেও কয়েকবার কক্সবাজার এসেছে।তাই তার তেমন বেশি অাগ্রহ নেই।
অন্যদিকে বিজয় বেশ উৎসাহের সাথে সামুদ্রিক সৌন্দর্য উপভোগ করছিলো।
কিছুক্ষণ পর…….

>>কীরে তুই কই হাওয়া হয়ে গেলি?(অভ্র)
>>কোথাও না এমনি একটু ঐদিকে।(বিজয়)
>>হাতে কী ওটা তোর??(অভ্র)
>>কিছু না, কিছু না।(বিজয়)
>>চল অাজ রাতে কক্সবাজার শহরটা ঘুরবো।সকালে একবারে বাসে উঠে চলে যাবো।(অভ্র)
>>দেখি কী করা যায়।(বিজয়)
>>দেখি মানে কী?? তুই কী করতে চাস?(অভ্র)
>>একজনকে খুঁজতে হবে রে অামার।
>>কাকে?
>>এই দেখ এটা।(একটা ঘড়ি দেখিয়ে)
>>লেডিস ওয়াচ তুই কোথায় পেলি?
>>সাগর তীরের বেঞ্চের ওপর।
>>কার এটা?
>>এটা যার তাকেই তো খুঁজতে হবে।
>>মানে কী।একটু বুঝিয়ে বলতো।
>>অাজ বিকালে সমুদ্র তীরে বেঞ্চের ওপর একটা মেয়ে বসে ছিলো।তুই খেয়াল করিস নি?
>>কতো মেয়েই তো ছিল সাগরতীরে।

>>ছিলো। কিন্তু ও ছিলো অন্যরকম।ঠিক যেনো এক মায়াবী সাগরকন্যা।বিকাল
বেলার অালোতে তাকে অসাধারণ লাগছিলো রে অনেক।
>>কীরে তুই কী প্রেমে পড়েছিস নাকি??
>>জানি না রে।মনে হয় লাভ এট ফার্স্ট সাইট

>>দেখ ভাই এমনিতেই পরীক্ষা সামনে রেখে অাসছি ঘুরতে।তুই অাবার নতুন কোন কিছু শুরু করিস না।পরীক্ষায় একদম ডাহা ফেল করবি তাইলে।

>>অামি তাকে খুঁজে বের করবো যে করেই হোক।
>>হারালো কেমনে যে খুঁজে বের করবি??

>>অারে অামি তো অনেকক্ষণ দূর থেকে তাকিয়ে অাছি।হঠাৎ দেখি চলে যাচ্ছে বেঞ্চ থেকে।দৌড়ে গিয়ে দেখি একটা হাত ঘড়ি বেঞ্চে পড়ে অাছে।অামি হাত ঘড়িটা হাতে নিলাম। কিন্তু পড়ে দেখি ভিঁড়ের মধ্যে কোন দিকে যেনো চলে গেলো।বিকেলবেলা মানুষ গিজগিজ করছিলো সাগরতীরে।অনেকক্ষণ দৌঁড়াদৌড়ি করে খুঁজলাম কিন্তু কোথাও পেলাম না।

>>নাম টাম কিছু জানিস??
>>দেখলাম ই প্রথম। নাম অামি জানবো কী করে বল।
>>তো এখন অামরা কী করবো??
>>যেভাবেই হোক অামি খুঁজে বের করবো।
>>তুই কী পাগল হয়ে গেছিস।নাম জানা নেই।কোন ধারণা নেই এমন একটা মানুষকে কীভাবে খুঁজে বের করবি।
>>জানি না।তবে যেভাবেই হোক অামি খুঁজে বের করবো।
>>দেখ পাগলামি করিস না।চল হোটেলে ফিরে যাই।
এরকম কতো সাগরকন্যা অাসে এখানে।তুই তাকে খু্ঁজে পাবি না।অার খোঁজার কোন রাস্তাও তো নেই।

>>একটা রাস্তা অাছে।
>>কী??

>>এই ঘড়িটা।
>>এই ঘড়ি দিয়েই বা তুই কীভাবে খুঁজবি??
>>চেষ্টা করবো।নিশ্চই খুঁজে পাবো।অার পৃথিবীটা তো গোল। অাশা করি অাবার তার দেখা পাবো।
>>দেখ জীবনটা কোন সিনেমাার কাহিনী নয়।এখানে তুই যা ভাববি তা হবে না।
>>হতেও তো পারে নাকি??
>>দেখ পরীক্ষা বাদ দিয়ে অাসছি ঘুরতে।কাল চলে যেতে হবে।চল অাজাইরা চিন্তা বাদ দিয়ে ঠিকমতো ভালো করে ঘুরে সকালে ফিরে যাই।
>>কিন্তু মেয়েটার কী হবে??
>>কী যন্ত্রণা!! তোর নিজের কী হবে সেটা ভেবেছিস নাকি ভালো করে।অার এভাবে কাউকে খোঁজা যায় না।লাইফে তুই মাত্র একবার দেখেছিস তাকে।দুই দিন পর তো চেহারাই ভুলে যাবি।
>>এই চেহারা অামি কখনও ভুলবো না।স্পষ্ট মনে অাছে অামার।
>>কী মুশকিলে পড়লাম এবার তোকে নিয়ে।
>>তোর প্রব্লেম হলে তুই কাল সকালে নাহয় চলে যা।
>>এটা কেমন কথা বললি??একসাথে এসেছি একা চলে যাবার জন্য নাকি।
>>তো এভাবে বলছিস কেনো??
>>অারে অামি তো বাস্তব কথা বলছি।অামি যদি পাড়তাম অামি তো এখনই তোর জন্য মেয়েটাকে খুঁজে এনে দিতাম।কিন্তু এভাবে অামরা কেম্নে খুঁজবো তুই-ই বল।
>>লাগবো না তোর সাহায্য।তুই বেটা পরীক্ষা দে গিয়ে যা।
>>অারে অাজব তো তুই কোন এক সাগরকন্যা না জলকন্যা দেখে বন্ধুর সাথে এমন করছিস।

বিজয় হেঁটে চলে যাচ্ছে।অার অভ্র অবাক হয়ে দাঁড়িয়ে অাছে।বিজয় কখনো কোন মেয়ের প্রেমে পড়ে নি এর অাগে।এমনকি মেয়েদের সাথে তেমন ভালো করে কথাও বলতো না।অভ্র সবই জানে।
বিজয়ের সাথে পরিচয় হবার পর কোন কাজই তারা একা করে নি।বিজয় সমুদ্রপাড়ে বসে পড়লো।

বিকালের সূর্যটা অস্ত যাচ্ছে ধীরে ধীরে।
কিছুক্ষণ পর অভ্র গিয়ে বিজয়ের কাঁধে হাত রাখলো অার বললো,,
“চল।তোর সাগরকন্যাকে খুঁজে বের করবো।যাবি না??”
>>অাচ্ছা চল(মুচকি হেসে)।কিন্তু কীভাবে শুরু করবো বল তো।(বিজয়)
>>অামার মনে হয় অাশেপাশের হোটেলগুলোতে যদি যাই।তাহলে হয়তো দেখা পেতেও পারি।
>>অাচ্ছা চল।

রাত প্রায় সাড়ে ১১ টা

>>এ রাতের বেলা এভাবে কেমনে কী করি বল?অার হোটেল ম্যানেজারদের তো পরিচয় বলতে হবে।তবে না তারা কিছু বলতে পারবে।এভাবে ঘড়ি দেখিয়ে দেখিয়ে খুঁজে তো রীতিমতো হাসির পাত্র হচ্ছি।(অভ্র)
>>কী অার করবো বল(বিজয়,কিছুটা হতাশ হয়ে)
>>চল হোটেলে ফিরে যাই।অার সকালের টিকিট ক্যান্সেল করে দিচ্ছি।দেখি কাল সকালে হয়তো কিছু একটা করতে পারবো।(অভ্র)
>>চল তাহলে সকালেই বরং খুঁজি(বিজয়)

পরেরদিন সকালে…
>>কীরে কী করবি?অাজ তো হোটেল ছেড়ে দিতে হবে।
(অভ্র)
>>চল সাগর পাড়ের দোকান অার শহরের মার্কেটগুলো তে খুঁজবো।এই ঘড়িটা হয়তো সেখান থেকে কেনা হতে পারে।(বিজয়)
>>চল তবে।একেবারে ব্যাগ ট্যাগ নিয়েই বেড়িয়ে পড়ি।(অভ্র)
প্রায় বিকেল বেলা…
>>অামার তো মনে হয় সব ঘড়ির দোকান ঘুরে ফেলেছি।(অভ্র)
>>হুম।অনেক দোকানে তো হিসাব-ই রাখে না জিনিসপত্র ক্রয়ের।(বিজয়)
>>তো এবার কী করবি??কক্সবাজার তো খোঁজা শেষ।এবার সম্পূর্ণ বাংলাদেশ, সেখানে না পেলে পুরো বিশ্ব।(অভ্র)
>>সন্ধ্যার টিকিট কনফার্ম করে ফেল।বিকালে একবার সমুদ্রতীরে খুঁজবো।(বিজয়)

কিছুক্ষণ পর

>>তুই এই পাশে খোঁজ অার অামি ঐ পাশটা দেখছি।(বিজয়)
>>অাজব তো অামি কি চিনি নাকি!!(অভ্র)
>>ওহ্ তাইতো।চল দুজনেই খুঁজি।(বিজয়)
দুজনে মিলে অনেকক্ষণ খুঁজলো।কিন্তু সমুদ্রস্রোত অার জনস্রোতের ভীঁড়ে তারা কোন সাগরকন্যাকে খুঁজে পেলো না।

তারপর বিষন্ন মনে বিজয় ফিরে যাবার সিদ্ধান্ত নিলো।
ঢাকায় অাসার পরও বিজয় নানাভাবে তার সেই সাগরকন্যাকে খোঁজার চেষ্টা করলো।ঢাকার সব ছোট বড় ঘড়ির দোকানগুলোতে খোঁজ নিলো।কিন্তু কোথাও কোনভাবে তার ন্যূনতম খোঁজও মিললো না।
এর মধ্যে প্রায় ১ বছর হতে চললো।এই এক বছরে বিজয় অারও ৪-৫ বার কক্সবাজার গিয়েছে।
সেই ঘড়িটা হাতে নিয়ে বসে থেকেছে বেঞ্চগুলোতে।
কিন্তু তার সাগরকন্যার দেখা মিলে নি।প্রতিবারই সে হতাশ হয়ে ফিরে গেছে।
চেহারাটা মনের মধ্যে গেঁথে নিয়ে,পৃথিবীটা গোল এই ১টা অাশায় হাতে ঘড়িটা নিয়ে সে খুঁজে বেড়ায় এক অপরিচিতাকে।

১ বছর পর হঠাৎ একদিন অভ্র এসে বলে..
>>চল বিজয় একটা বিয়ের দাওয়াতে যাই।অামাদের একটু দূরের এক অাত্মীয়ের বিয়ে।মা-বাবা যেতে পারবে না।না গেলেও খারাপ দেখায়।তাই অামাকে যেতে বললো।কাছেই এক কমিউনিটি সেন্টারে।
একা যেতে ভালো লাগে না।তুই সাথে চল।(অভ্র)

>>চল।ফ্রি তে বিয়ে খেয়ে অাসি।গিফট তো অার অামার দেয়া লাগবে না।(বিজয়)

খাবার শেষ করে অভ্র গেলো গিফট দিতে।বিজয় দাঁড়িয়ে অাছে এক পাশে।বিয়ের কনেকে অানা হলো পার্লার থেকে।অাজকাল পার্লার থেকে কাউকে অানা হলে তার অাগের চেহারার সম্পূর্ণ বিলুপ্তি ঘটে।
কিন্তু কনের চেহারাটা চেনা চেনা লাগছে বিজয়ের।

কোন মারাত্মক ভুল না হলে এটাই তার ১ বছর অাগে দেখা সেই সাগরকন্যা।বিজয় কয়েকবার ভালো করে দেখে নিলো।নাহ্! এতো বড় ভুল তো হওয়ার কথা না।যে চেহারাটা ১ বছর ধরে প্রতি মুহূর্তে মনে পড়েছে এটাই তো সেই কাঙ্ক্ষিত চেহারা।বিজয় কী করবে কিছু ই বুঝতে পারছে না।

>>কাজ শেষ।চল চলে যাই।(অভ্র)
>>দোস্ত সাগরকন্যাকে পেয়েছি।(বিজয়)
>>কী বলিস!! কোথায়?? চল তাহলে যাই তার কাছে।(অভ্র)
>>ভুল জায়গায় পেলাম রে তাকে।(বিজয়)
>>মানে??
>>মানে এই বিয়েতে যে কনে সেজে বসে অাছে সেটাই অামার সাগরকন্যা।
>>তুই কোন ভুল করছিস না তো??
>>নাহ্ এতো বড় ভুল কী করে করি বল।
>>দাঁড়া তবে।অামি ওদের সাথে কথা বলে দেখছি।
>>দাঁড়া অভ্র।পাগলামি করিস না।এখানে একটা হইচই বাঁধবে তাহলে।
>>কিন্তু তোর সাগরকন্যা তো অন্যের হয়ে যাবে তাহলে।
>>কোনকালে তো অামমার ছিলো-ই না।
>>অাচ্ছা দাঁড়া অন্তত অামি একটাবার নিশ্চিত হতে পারি কি না দেখি যে এটাই তোর সাগরকন্যা কি না।

কথাটা বলে অভ্র দৌঁড়ে গেলো।বিজয় থামানোর চেষ্টা করলো।বিজয় জানে এটাই তার সাগরকন্যা।
কিছুক্ষণ পর অভ্র মলিনমুখে ফিরে এলো……

>>অনেক কষ্টে কনের বান্ধবীদের কাছ থেকে জানতে পারলাম এই মেয়েই গতবছর কক্সবাজার গিয়েছিলো ঘুরতে।(অভ্র)

>>অামি দেখেই চিনেছি।(বিজয়)

>>এখনও সময় অাছে কিছু একটা করি চল।(অভ্র)
>>ধুর পাগল দরকার নেই।ওটা একটা মরীচিকা ছিলো।(বিজয়)
>>দাঁড়া নামটা জেনে অাসি অন্তত।
>>কী দরকার নাম জানার।অামার কাছে সাগরকন্যা হয়েই নাহয় থাকলো চিরজীবন।
>>ঘড়িটা ফেরত দিবি না??
>>নাহ্।ওটা সাগরকন্যার স্মৃতি হিসেবে সাগরের কাছে রেখে অাসবো।
>>তুই বড় অদ্ভূত রে।
>>পৃথিবীটা অামার চেয়েও বড় অদ্ভুত।ইশ্ পৃথিবীটা যদি গোল না হতো তাহলে সাগরকন্যার সাথে দ্বিতীয়বার অার দেখা হতো না।

গল্পের বিষয়:
রোমান্টিক

Share This Post

আরও গল্প

সর্বাধিক পঠিত