শেষ কথা

শেষ কথা

বিশাল কালো টেবিলের একপাশে মাঝবয়সী একজন মহিলা বসে আছেন, তার। সামনে একটা ক্রিস্টাল রিডার। তার কাছাকাছি আরো বেশ কিছু নানাবয়সী মানুষ। টেবিলের অন্যপাশে নিকি চুপ করে বসে আছে।

মাঝবয়সী মহিলা হাত দিয়ে তার চুলগুলোকে পেছনে সরিয়ে বলল, নিকি। ক্রিনিটি নামে যে রোবটটি তোমার দেখাশোনা করতে সে তার দিনলিপি আমাদের দিয়েছে। তোমাকে কিভাবে বড় করা হয়েছে তার সব। খুঁটিনাটি সেখানে আছে। বিশেষ করে পঞ্চম মাত্রার রোবটের ষড়যন্ত্র তুমি যেভাবে বানচাল করেছ, যেভাবে তাদের ধ্বংস করে পৃথিবীর মানুষকে রক্ষা করেছ সেই বিষয়গুলো আমরা খুঁটিয়ে খুঁটিয়ে দেখেছি। তোমার চিন্তাভাবনার ধরন, কাজের প্রকৃতি, বাস্তব বুদ্ধি ধৈর্য এবং সাহস দেখে আমরা মুগ্ধ হয়েছি।

নিকি চুপ করে কথাগুলো শুনল, কোনো উত্তর দিল না। মাঝবয়সী মহিলা চেয়ারে হেলান দিয়ে বলল, তুমি নিশ্চয়ই জান পৃথিবীর বিভিন্ন জায়গায় হিমঘরে লুকিয়ে রাখা মানুষদের জাগিয়ে তোলা শুরু হয়েছে। দেখতে দেখতে আমরা কয়েক হাজার মানুষের একটা সম্প্রদায় হয়ে যাব। এই মানুষদের জীবন পদ্ধতি পরিচালনার জন্যে আমাদের একটা সুপ্রিম কাউন্সিল গঠন করা প্রয়োজন। সেখানে এগারজ সদস্য থাকবে, আমরা তোমাকে তার একজন সদস্য হিসেবে মনোনয়ন দিতে চাই। যদিও তোমার বয়স মাত্র সাত কিন্তু আমরা সবিস্ময়ে আবিষ্কার করেছি যে তোমার মানসিক পরিপক্কতা আমাদের সমান সমান। আশা করছি তুমি আমাদের জন্যে এই দায়িত্বটি পালন করবে।

নিকি বলল, আমি?

মহিলাটি মুখে হাসি ফুটিয়ে বলল, হ্যাঁ তুমি। পৃথিবীতে মানুষকে ঠিকভাবে বাঁচিয়ে রাখতে হলে আমাদের খুব গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্ত নিতে হবে। আমরা কী নিউক্লিয়ার শক্তি ব্যবহার করব না নবায়নশীল শক্তির দিকে যাব। মহাকাশ গবেষণায় কতোটুকু শক্তি দেব, শিক্ষা কিভাবে হবে, পরিবেশের। সাথে সম্পর্ক কেমন হবে—সব ব্যাপারে তোমার মতামত নিতে হবে। তোমাকে পূর্ণ সদস্যের মর্যাদা দেওয়া হবে। তুমি সব ধরনের সহযোগিতা, বাসভবন–

নিকি মাঝখানে বাধা দিয়ে বলল, তোমাদের সাহায্য করতে আমার কোনো আপত্তি নেই। কিন্তু–

কিন্তু কী?

আমি তো খুব ব্যস্ত, তাই তোমাদের সময় দিতে পারব না।

মধ্যবয়স্কা মহিলাটি ভুরু কুঁচকে বলল, তুমি কী নিয়ে ব্যস্ত?

হ্রদের উপরে একটা গাছ থেকে আমরা একটা মোটা দড়ি ঝুলিয়েছি, সেই দড়ি ধরে ঝুল খেয়ে আমরা পানিতে লাফ দিই। ভারি মজা হয় এখন। আগে তো শুধু আমি আর ত্রিপি ছিলাম—এখন আমাদের সাথে কুশ, লিবান, রিহা, ক্রন, নুশা, রিশ, ক্রিপাল এরা সবাই আছে। এখন আরো অনেক বেশি মজা হয়। সে জন্যে খুব ব্যস্ত।

মধ্যবয়স্কা মহিলাটি বিস্ফারিত চোখে নিকির দিকে তাকিয়ে রইল, আস্তে আস্তে বলল, গাছ থেকে দড়ি।

নিকি মাথা নাড়ল, বলল, হ্যাঁ। মাঝে মাঝে খুব ঝামেলা হয়। কুশ হচ্ছে অসম্ভব দুষ্টু, সেদিন রিহাকে ধাক্কা দিয়ে পানিতে ফেলে দিয়েছে। অনেক রকম সমস্যা।

অনেক রকম সমস্যা?

হ্যাঁ। সবাই আমার জন্যে অপেক্ষা করছে।

মধ্যবয়স্কা মহিলা আস্তে আস্তে মাথা নেড়ে বলল, হ্যাঁ নিকি, আমি বুঝতে পারছি তুমি খুবই ব্যস্ত। এবং তোমাকে অনেক ধরনের সমস্যার সমাধান করতে হয়। আমরা তাহলে তোমাকে আটকে রাখব না।

নিকি লাফ দিয়ে চেয়ার থেকে উঠে বলল, আমি কি তাহলে যেতে পারি?

হ্যাঁ। তুমি যেতে পার।

নিকি বলল, তোমাদের অনেক ধন্যবাদ। তারপর কেউ কিছু বোঝার আগে দরজা খুলে ছুটে বের হয়ে গেল। ঘরের সবাই জানালা দিয়ে বাইরে তাকাল, দেখল সাত বছরের একটা শিশু মাঠের ভেতর দিয়ে ছুটে যাচ্ছে। ছুটতে ছুটতে সে তার সার্ট খুলে হাতে ধরে মাথার উপর ঘোরাতে ঘোরাতে চিৎকার করে করে নাড়ছে, তার সজীব দেহ সূর্যের আলোতে চকচক করছে।

ঘরের ভেতর বসে থাকা মানুষগুলো একজন আরেকজনের দিকে তাকিয়ে অপরাধীর মতো একটু হাসল। কমবয়সী একজন বলল, আমরা মনে হয় এখনো বেঁচে থাকার অর্থ কী সেটা বুঝে উঠতে পারি নি।

মধ্যবয়স্কা মহিলাটি বলল, না। পারি নি।

এই ছেলেটা পেরেছে।

হ্যাঁ। এই ছেলেটা পেরেছে।

ক্রিনিটি খুঁড়িয়ে খুঁড়িয়ে একটু এগিয়ে গিয়ে একটা উঁচু ঢিবির উপর দাঁড়িয়ে দূরে তাকিয়ে থাকে। হ্রদের উপর একটা গাছ থেকে মোটা একটা দড়ি ঝুলিয়ে দেওয়া হয়েছে, সেখান থেকে ঝুলে ঝুলে অনেকগুলো শিশু পানিতে ঝাঁপিয়ে পড়ছে। এতো দূর থেকেও তাদের আনন্দ ধ্বনি স্পষ্ট শোনা যায়।

ক্রিনিটি দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে শিশুগুলোকে দেখে। একই দৃশ্যের পুনরাবৃত্তি হচ্ছে দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে দেখার কোনো অর্থ নেই। কিন্তু ক্রিনিটি সরে যেতে পারে না, সে মন্ত্রমুগ্ধের মতো তাকিয়ে থাকে। বিশেষ করে যখন নিকির একটা উল্লাস ধ্বনি শুনতে পায় তার ভেতরে কোনো একটা কিছু ঘটে যায়।

কী ঘটে সে বুঝতে পারে না। সম্ভবত তার কপোট্রনে কোনো এক ধরনের টি ঘটেছে।

নিকি বলে এই ত্রুটির নাম হচ্ছে ভালোবাসা। নিকি নেহায়েত ছেলেমানুষ, শুধু তার মুখ থেকেই এরকম পুরোপুরি যুক্তিহীন, অর্থহীন, হাস্যকর এবং ছেলেমানুষী কথা শোনা সম্ভব।

শুধু তার মুখ থেকেই।

গল্পের বিষয়:
রোমান্টিক

Share This Post

আরও গল্প

সর্বাধিক পঠিত