দেবালয় থেকে বেরিয়ে এলো কাবার প্রহরী

দেবালয় থেকে বেরিয়ে এলো কাবার প্রহরী

‘তারা মুখের ফুৎকারে আল্লাহর আলোকে নিভিয়ে দিতে চায়। আল্লাহ তায়ালা তাঁর আলোকে পূর্ণরূপে বিকশিত করবেন যদিও মুশরিকরা তা অপছন্দ করে।’ (সূরা-ছফ, আয়াত নং-০৯)

যুগে যুগে মুশরিকরা আল্লাহর মনোনীত ধর্ম সার্বজনীন জীবন ব্যবস্থা ইসলামকে ধ্বংস করার কূটনৈতিক সর্বপ্রকার ঘৃণ্য অপতৎপরতা চালিয়েছে। কিন্তু তারা বিন্দুমাত্রও সফল হয়নি। কারণ মহান আল্লাহ তায়ালা কখনও তাঁর মনোনীত ব্যক্তিদের দ্বারা কখনও পরোক্ষভাবে বিধর্মীদের দ্বারা দ্বীন ইসলামকে মজবুত করেছেন শক্তিশালী করেছেন। আবার কখনও দেখা যায় আল্লাহ তায়ালা অনুগ্রহ করে নেতৃস্থানীয় কোন বিধর্মীকে ঈমানের আলোয় আলোকিত করার মত আশ্চর্যজনক ঘটনার অবতারণা করে ইসলামের চিরন্তন সত্যতার প্রমাণ জনসমক্ষে ফুটিয়ে তুলেছেন। বিগত কয়েকবছর পূর্বে দিল্লী থেকে প্রকাশিত উর্দ্দু পত্রিকা সাপ্তাহিক ‘নয়ী দুনিয়া’য় ভারতে সংঘটিত তেমনি একটি বিষ্ময়কর ঘটনা প্রকাশ করেছিল যা তৎকালীন সময়ে সারা বিশ্বে আলোড়ন সৃষ্টি করে।

বিগত শতাব্দীর শেষ দিকে ভারত বর্ষের মুশরিকরা মুসলমানদের উচ্ছেদের এক সুগভীর ষড়যন্ত্রে ছিল বিভোর। মসজিদ মাদ্রাসা জবরদখল, অগণিত আলেম-উলামা ও নেতৃস্থানীয় মুসলমানদের হত্যা, তাদের অতীত ইতিহাস ঐতিহ্য কৃষ্টি কালচার সভ্যতা-সংস্কৃতির বিকৃতি সাধনের অপচেষ্টা চলছে দূর্বার গতিতে। মুশরিকদের সীমাহীন অপপ্রচার ভয়ানক আগ্রাসী তৎপরতা অবর্ণনীয় নির্যাতন নিপীড়নের মাত্রা এমন পর্যায়ে পৌছেছিল যা ভাষায় বর্ণনা করা আদৌ সম্ভব নয়। আর প্রবাদ আছে ‘রাত যত গভীর ভোর ততই নিকটে।’ জাহেলিয়াতের ঘোর অমানিশা আর জাহান্নাম সদৃশ প্রতিকূল পরিবেশ যেখানেই বিদ্যমান সেখান থেকেই ইসলামের অতন্ত্র প্রহরীর আর্বিভাব ঘটে থাকে। ইসলামের প্রাথমিক যুগে কুফরী শক্তি কর্তৃক সাহাবায়ে কেরাম যখন চরমভাবে নির্যাতিত তখন রাসুলে পাক সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম আল্লাহর নিকট নিন্মোক্ত দোয়া করেন ‘হে আল্লাহ! এ দু’ব্যক্তি আবু জেহেল অথবা ওমর ইবনুল খাত্তাব হতে যে তোমার কাছে অধিক প্রিয় তার মাধ্যমে ইসলামকে শক্তিশালী কর’। তার এ পবিত্র দোয়ার বদৌলতেই ইসলাম বিরোধীদের মধ্যে অগ্রগণ্য হয়েও হজরত ওমর রাদ্বি: যেমন ইসলামের আলোয় আলোকিত হয়েছিলেন ঠিক তেমনি খোদ রাসুলে পাক সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামকে স্বপ্নযোগে দর্শন এবং তার মাধ্যমে ইসলামের দাওয়াত পেয়ে ভারতের শীর্ষস্থানীয় একজন হিন্দু ধর্মগুরুর স্বপরিবারে ইসলাম গ্রহণ সাম্প্রতিক সময়ে বিশ্বে সংঘটিত সর্বাপেক্ষা বিস্ময়কর ও আলৌকিক ঘটনা সমূহের মধ্যে অন্যতম।

স্বপ্নযোগে স্বপরিবারে রাসূলে পাক সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের নিকট ইসলাম গ্রহণকারী ও সৌভাগ্যবান ব্যক্তির নাম ড. শিব শক্তি স্বরূপজী মহারাজ ধর্মাচার্যূ আদ্য শক্তিপীঠ। বিংশ শতাব্দীর মাঝামাঝি সময়ে মথুরার এক আচার্য ব্রাহ্মণ পরিবারে জন্ম গ্রহণ করেন তিনি। তার পিতা হিন্দু ধর্মালম্বীদের অন্যতম তীর্থস্থান বৃন্দাবন আশ্রমের প্রধান পুরোহিত ছিলেন। রক্ষণশীল পিতার তত্ত্বাবধানে আশ্রমের পরিবেশে প্রাথমিক ও মাধ্যমিক শিক্ষা সমাপ্ত করে এলাহাবাদ বিশ্ববিদ্যালয় থেকে øাতকোত্তর ডিগ্রি লাভ করেন। অতঃপর সুদীর্ঘ আট বছর ইংল্যান্ডের অক্সফোর্ড ইউনিভার্সিটিতে পৃথিবীর দশটি ধর্মমত নিয়ে তুলনামূলক গবেষণা করে ডক্তরেট ডিগ্রি লাভ করেন। এরই মধ্যে ড. শিব শক্তির প্রখর মেধা বাগ্মিতা অপূর্ব বিশ্লেষণ ক্ষমতা ও চিন্তা শক্তির সুক্ষ্মতার যশ:খ্যাতি সমগ্র বিশ্বে ছড়িয়ে পড়েছিল। রোমের খ্রিস্টান পাদ্রী তাকে রোমে নিয়ে যান। কিন্তু অনেক লোভনীয় অফার দিয়েও তাকে আটকে রাখতে পারেননি। তিনি দেশে প্রত্যাবর্তন করেন। হিন্দুরা বিপুল অভ্যর্থনার মাধ্যমে তাকে বরণ করে এবং তাদের শীর্ষস্থানীয় কয়েকটি আশ্রমের প্রধান পুরোহিতের দায়িত্ব অর্পণ করা হয় এবং তিনি যথাযথ ভাবে তার উপর অর্পিত দায়িত্ব পালন করতে শুরু করেন। ড. শিব শক্তি যেমন ছিলেন তার সময়ের বিশ্ব হিন্দু পরিষদের সর্বোচ্চ ব্যক্তি, তেমনি সমকালীন হিন্দুদের নেতৃস্থানীয় ধর্মীয় ব্যক্তিত্ব জগতগুরু শঙ্কারাচার্য, রাম গোপাল, গুরু গোয়ালকর, প্রমুখের মধ্যে সর্বাধিক বিদ্বান এবং মেধাবী। অন্তত তেরটি ভাষায় সুপন্ডিত ড. শিব শক্তির জাগতিক জ্ঞান, মেধা, কর্মদক্ষতা, ক্ষুরধার যুক্তি উপস্থাপনের কৌশল ও কর্মশক্তি লক্ষ্য করে বিশ্ব হিন্দু সম্প্রদায় সমগ্র বিশ্বে বিশেষ করে প্রাশ্চাত্যে হিন্দু ধর্মের প্রচার প্রসারে তিনি বলিষ্ট ভূমিকা রাখবেন বলে তারা ছিল চরম আশাবাদী। অথচ আল্লাহ রাব্বুল আলামীনের অভিপ্রায় ছিল অন্য রকম। তার মাধ্যমে হিন্দু ধর্মের নয় বরং ইসলামের হাতকে শক্তিশালী করাই ছিল অভিপ্রায়। কিভাবে এ আশ্চর্যজনক ঘটনা। কিভাবে ইসলাম ধর্মে দীক্ষিত হলেন এ প্রশ্নের জবাবে ড. শিব শক্তি বলেন-সে এক আশ্চর্যজনক ঘটনা। আমি ভারতসহ সারা বিশ্বের প্রায় অর্ধশত কোটি হিন্দুদের শীর্ষস্থানীয় ধর্মগুরু এবং পরম শ্রদ্ধাভাজন ভগবান ছিলাম। তারা আমাকে ধর্মাচার্য ভগবান বলে সম্বোধন করত। কিন্তু কিভাবে জাগতিক সকল সম্মান মর্যাদা এবং ভগবানের সোনার সিংহাসন ছেড়ে চরমভাবে নির্যাতিত মজলুম মুসলমানদের কাতারে এসে শামিল হলাম তা বর্ণনা করতে গিয়ে আমি আবেগ প্রবণ হয়ে পড়ি। অক্সফোর্ড ইউনিভার্সিটিতে পৃথিবীর প্রধান দশটি ধর্মমত নিয়ে তুলনামূলক গবেষণা কালে ইসলাম ধর্মের পবিত্র ধর্মগ্রন্থ আল কোরআন অধ্যয়নের সুযোগ হয়েছিল। তাছাড়া ইসলামকে পরিপূর্ণভাবে জানার জন্য আরবী ভাষাও আয়ত্ব করেছিলাম। আর এটাই ছিল আমার জীবনের মোড় পরিবর্তনের সূচনা। আমি যতই ইসলাম ধর্মের মৌলিক গ্রন্থগুলো অধ্যয়ন করছি ততই যেন এক এক করে আমার অন্তরের কালো পর্দাগুলো সরে যাচ্ছিল। আর নিজের অলক্ষ্যেই ইসলাম ধর্মের প্রতি আমার এক অজানা আকর্ষণ সৃষ্টি হয়েছিল। তবে নিজের পৈতৃক ধর্মমত সম্পর্কে আমার ভক্তিও বিশ্বাসে তখনো কোন ফাটল সৃষ্টি হয়নি বরং পূর্ণ নিষ্ঠার সাথেই আমার উপর অর্পিত দায়িত্ব সুচারুরূপেই পালন করে যাচ্ছিলাম। অবশেষে এলো সেই মাহেদ্রক্ষণ। একরাতে আমি এবং আমার বিদূষী স্ত্রী পাশাপাশি রুমে শয়ন করেছিলাম। রাতের শেষ প্রহরে স্বপ্নে দেখলাম কুৎসিত একদল লোক আমাকে হাকিয়ে নিয়ে যাচ্ছিল আর আমি প্রাণ ভয়ে ভীত সন্ত্রস্ত হয়ে দৌড়াচ্ছিলাম। আশে পাশে আমাকে উদ্ধারকারী কোন লোক না দেখে ভয়ে আমি হতবিহবল হয়ে পড়েছি। এমন সময় অদৃশ্য অথচ নুরানী দু’টি পবিত্র হাত আমাকে থামিয়ে দিল। চেয়ে দেখলাম দিব্যকান্তি বিশিষ্ট জ্যোর্তিময় স্বর্গীয় এক মহাপুরুষ আমার সামনে দাঁড়ানো। মুহুর্তেই আমার সকল ভয় দূর হয়ে গেল। এক মহাপুরুষ আমার সামনে দাঁড়ানো। মুহুর্তেই আমার সকল ভয় দুর হয়ে গেল। তন্ময় হয়ে কৃতজ্ঞচিত্তে তার দিকে চেয়ে থাকলাম। আমার অভিভূত অবস্থা উপলব্ধি করে নিকটে দাঁড়ানো অপর এক ব্যক্তি বললেন; তুমি তাকে চিনতে পারছে না? ইনিইতো মানবতার মুক্তির দূত শেষ নবী হজরত মুহাম্মদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম। আমি তখন খুশিতে, আবেগের আতিশয্যে উদ্বেলিত হয়ে পড়ি। তনুমনে তখন এক অদ্ভূত অনুভূতি। কি করব ভেবে স্থির করতে পারছিলাম না। তিনি তার পবিত্র দু’টি হাত মোবারক আমার দিকে বাড়িয়ে দিলেন এবং বললেন পড়; ‘আশহাদু আল্ লা ইলাহা ইল্লাল্লাহু ওয়াআন্নাকা মুহাম্মাদার রাসুলুল্লাহ’ এই বলে তিনি কালেমা পাঠ করতে লাগলেন। তার পবিত্র আহ্বান আমি উপেক্ষা করতে পারলাম না। আমিও তার সাথে উক্ত কালেমা পাঠ করতে লাগলাম। অতঃপর তিনি আমাকে স্বীয় বুকের সাথে জড়িয়ে ধরলেন এবং হমিশ্রিত স্বরে বললেন; যাও: এবার তোমার দেশের লোকদের ইসলামের দিকে আহ্বান করো। আমি তখনো কিংকর্তব্যবিমূঢ় হয়ে তার সম্মুখে দাঁড়িয়ে আছি। পবিত্র স্বপ্ন ভেঙ্গে গেল। বিস্ময়কর ঘটনা এই যে, আমার পরম বিদুষী স্ত্রী ও একই সময়ে অনুরূপ স্বপ্ন দেখলেন। পরস্পরের নিকট যখন স্বপ্ন বৃত্তান্ত বর্ণনা করছিলাম তখন হৃদয়ের মনিকোঠায় এ কল্পনা ভেসে ওঠেছিল যে, আমরা যেন হজরত মুহাম্মদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের নিকট ইসলাম গ্রহণকারী প্রথম যুগের মুসলমান। এ ভারতবর্ষে ইসলামের সেই সোনালী অতীতকে ফিরিয়ে আনার কাজে আমাদেরকে আত্মনিয়োগ করতে হবে। আর এ আন্দোলনের একজন নগন্য কর্মী হিসেবে স্বয়ং রাসুলে পাক সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম আমাকে নির্বাচিত করেছেন। আল্লাহ রাব্বুল আলামীনের এ অপার অনুগ্রহের শুকরিয়া সারা জীবন আদায় করেও শেষ করতে পারব না। মনে হচ্ছে আমি এ দেশের সবচেয়ে সৌভাগ্যবান ব্যক্তি। বর্তমানে আমি, আমার স্ত্রী ও একমাত্র কন্যা পরিপূর্ণ মুসলমান। আমার নাম মোহাম্মদ ইসলামুল হক, স্ত্রীর নাম খাদীজা এবং কন্যার নাম আয়েশা।

মুসলমানদের এ চরম সংকটময় দুর্দিনে এমন একজন শীর্ষস্থানীয় হিন্দু ধর্মগুরু সকল সম্মান মর্যাদা বিপুল ঐশ্বর্য ছেড়ে নির্যাতিত মজলুম মুসলমানদের পাশে এসে দাঁড়ালেন। কৃতজ্ঞচিত্তে এ কথা স্বীকার করতেই হবে যে, তিনি খোদ রাসুলে পাক সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের পক্ষ থেকে মুসলমানদের জন্য এক তোহফা বিশেষ। ড. মোহাম্মদ ইসলামুল হকের নিজের ভাষায়-ছিলাম ভগবান; এখন প্রকৃত মানুষ হয়েছি। আর ভারতীয় মুসলমানদের অভিব্যক্তি ‘দেবালয় থেকে বেরিয়ে এলো কাবার প্রহরী’।

গল্পের বিষয়:
ধর্মীয়
DMCA.com Protection Status
loading...

Share This Post

সর্বাধিক পঠিত