ক্রন্দসী

ক্রন্দসী

অকৃতজ্ঞ

আমার মৃত্যুর দিনে কৌতূহলী প্রশ্ন করে যদি-
সাধিলাম কি সুকৃতি, হব যার প্রসাদে অমর ?
মেনে নিও মুক্ত কণ্ঠে, নেই মোর পাপের অবধি ;
সারা ইতিহাস খুঁজে মিলিবে না হেন স্বার্থপর ।।

অজস্র ঐশ্বর্য মোরে অর্পিয়াছে সমুদার বিধি ;
ভুঞ্জেছি নিষ্কুন্ঠ মনে সে-সকলই প্রাপ্য ভেবে আমি ।
পেয়েছি অমিত সুধা আমন্থিয়া কালের বারিধি ;
করেছি তা আত্মসাৎ, শুধু বিষ কন্ঠে গেছে থামি ।।

দেখেছি এ-মরচক্ষে নটরাজ মহাশূন্যে নাচে;
শুনেছি পার্থিব কানে সে-নক্ষত্রনুপূরের ধ্বনি।
তথাপি আমার বীণা বাজায়েছে বেসুর পিশাচে ;
অধরার অনুনাদে সাড়া কভু দেয়নি ধমনী।।

ফাল্গুন অঙ্গনে মোর ছড়ায়েছে অশোক পলাশ।
দক্ষিণের বাতায়নে কৃষ্ণচূড়া হেনেছে বৈশাখ ।
জাগায়ে মেদুর মেঘে চপলার চকিত বিলাস
বিকচ কদম্বকুঞ্জে আষাঢ় দিয়েছে মোরে ডাক ।।

শেফালিরঞ্জিত হস্তে নবান্নের নৈবেদ্য এনেছে
অতিক্রমি কাশবন সিতাম্বর শ্যামল আশ্বিন ।
কাননে ছড়ায়ে সোনা উদাসী অঘ্রান চ’লে গেছে
পৌষের পাথেয় দিতে সর্বহারা হয়েছে বিপিন ।।

তথাপি অভাব মোর মিটে নাই মুহূর্তের তরে ;
অপব্যয়ী প্রকৃতির অরক্ষিত দানসত্র থেকে
অপহরি মহাবিত্ত আনিয়াছি বৎসরে বৎসরে
অন্তর্ভৌম কোষাগারে মরুলুপ্ত সুড়ঙ্গের পথে ।।

সে-উদার দৃষ্টান্তেও হয় নাই কার্পণ্য লজ্জিত,
সন্দেহের অবকাশ পায় নাই গৃধ্নুতা আমার।
ফিরেছি ধনীর দ্বারে অপলাপী চীবরে সজ্জিত,
বলেছি নাটকী স্বরে, বিশ্বে শুধু সত্য অবিচার ।।

অন্তরঙ্গ সখাসম ফুলধনু আমার ইঙ্গিতে
ফুটায়েছে পারিজাত হিমরুক্ষ তুঙ্গ তপোবনে ;
স্বয়ংবরা শৈলসুতা এসেছে কৌমার্য নিবেদিতে ;
টুটেছে দুঃস্বপ্ন মোর ব্রহ্মান্ডের মঙ্গলাচরণে ।।

তবু মোর নীল কন্ঠে উঠে নাই কামোদ ঝংকারি;
অনভ্যস্ত রসনায় উৎসরিত হয়নি দীপক ।
মোর প্রিয়সম্ভাষণে বিরহের আশঙ্কা সঞ্চারি,
অন্তরের দ্বার জুড়ে হেসেছে অশ্লীল বিদূষক ।।

গোপন বৈভব আমি ব্যক্ত কভু করিনি প্রিয়ারে ;
বুঝি নাই বিনিময়, বিনা বরে কুড়িয়েছি পূজা;
অভিব্যাপ্ত ক্ষুধা মম অবরোধে ঘিরেছে তাহারে ;
পরিতৃপ্তি বিতরিতে পারেনি স্বয়ং দশভূজা।।

নিমেষ না যেতে তাই ফুরায়েছে প্রথম আবেশ;
উন্মীলিত বিলোচন জ্বলিয়াছে বিপ্রবলব্ধ লোভে,
অচিরাৎ সে-আগুন কামেরে করেছে ভস্মশেষ ;
অপর্না সেজেছে চন্ডী আত্মহিতে মোর উপদ্রবে ।।

কেবলই চেয়েছি আমি, ক্ষতি কভু ছোঁয়নি আমারে ;
কোনওদিন বজ্রাঘাতে সর্বস্বান্ত করেনি উর্বশী ;
মোর তারাদীপাবলী মূলাধার অমার ফুৎকারে
কখনও যায়নি নিবে, ধংসমূক হয়নি ক্রন্দসী ।।

শিখিনি কদাচ আমি কাম্য যার নিশ্চিন্ত অমরা,
অনির্বাণ কুম্ভীপাকে হতে হয় তাহারে নিখাদ ।
শুধুই জঞ্জালে তাই ভরিয়াছি প্রাণের পসরা ;
গায়ত্রী জপেছি, কিন্তু শোনা গেছে নিরর্থ নিনাদ ।।

আমার মৃত্যুর দিনে, তাই যদি অলস জিজ্ঞাসু
মাগে শবপরিচিতি, বিনা ভাষ্যে বোলো তারে,সখা,-
জগতের কোনও কাজে লাগেনি এ-অখ্যাত গতাসু,
যায়নি অনাথ ক’রে কোনও মৌন হৃদয়-অলকা।।

উটপাখি

আমার কথা কি শুনতে পাও না তুমি ?
কেন মুখ গুঁজে আছো তবে মিছে ছলে ?
কোথায় লুকোবে ? ধু-ধু করে মরুভূমি ;
ক্ষ’য়ে-ক্ষ’য়ে ছায়া ম’রে গেছে পদতলে |
আজ দিগন্তে মরীচিকাও যে নেই ;
নির্বাক, নীল, নির্মম মহাকাশ |
নিষাদের মন মায়ামৃগে ম’জে নেই ;
তুমি বিনা তার সমুহ সর্বনাশ |
কোথায় পালাবে ? ছুটবে বা আর কত ?
উদাসীন বালি ঢাকবে না পদরেখা |
প্রাকপুরাণিক বাল্যবন্ধু যত
বিগত সবাই, তুমি অসহায় একা ||

ফাটা ডিমে আর তা দিয়ে কী ফল পাবে ?
মনস্তাপেও লাগবে না ওতে জোড়া |
অখিল ক্ষুধায় শেষে কি নিজেকে খাবে ?
কেবল শূণ্যে চলবে না আগাগোড়া |
তার চেয়ে আজ আমার যুক্তি মানো,
সিকতাসাগরে সাধের তরণী হও ;
মরুদ্বীপের খবর তুমিই জানো,
তুমি তো কখনো বিপদপ্রাজ্ঞ নও |
নব সংসার পাতি গে আবার, চলো
যে-কোনো নিভৃত কণ্টকাবৃত বনে |
মিলবে সেখানে অনন্ত নোনা জলও,
খসবে খেজুর মাটির আকর্শনে ||

ল্পলতার বেড়ার আড়ালে সেথা
গ’ড়ে তুলবো না লোহার চিড়িয়াখানা ;
ডেকে আনবো না হাজার হাজার ক্রেতা
ছাঁটতে তোমার অনাবশ্যক ডানা |
ভূমিতে ছড়ালে অকারি পালকগুলি
শ্রমণশোভন বীজন বানাবো তাতে ;
উধাও তাহার উড্ডীন পদধূলি
পুঙ্খে পুঙ্খে খুঁজবো না অমারাতে |
তোমার নিবিদে বাজাবো না ঝুমঝুমি,
নির্বোধ লোভে যাবে না ভাবনা মিশে ;
সে-পাড়াজুড়ানো বুলবুলি নও তুমি
বর্গীর ধান খায় সে উনতিরিশে ||

আমি জানি এই ধ্বংসের দায়ভাগে
আমরা দুজনে সমান অংশিদার
অপরে পাওনা আদায় করেছে আগে,
আমাদের ‘পরে দেনা শোধবার ভার |
তাই অসহ্য লাগে ও-আত্মরতি |
অন্ধ হ’লে কি প্রলয় বন্ধ থাকে ?
আমাকে এড়িয়ে বাড়াও নিজেরই ক্ষতি |
ভ্রান্তিবিলাস সাজেনা দুর্বিপাকে |
অতএব এসো আমরা সন্ধি ক’রে
প্রত্যুপকারে বিরোধী স্বার্থ সাধি :
তুমি নিয়ে চল আমাকে লোকোত্তরে,
তোমাকে বন্ধু আমি লোকায়তে বাঁধি ||

জাতিস্মর

নাথু সংকটে হাঁকে তিব্বতী হাওয়া ।
প্রাকৃত তিমিরে মগ্ন চুমলহরি ।
ছঙ্গু-সায়রে কার বহিত্র যাওয়া
অপর্ণ বনে দিয়েছে রহস ভরি ।।

সুহৃদ আগুন নিবে গেছে গৃহকোণে ;
শ্রান্তসাথীরা স্বপনে আপনহারা ;
আমি শুধু বসে তুষারিত বাতায়নে
প্রহরে প্রহরে গুণি খসে কত তারা ।।

অঙ্গ তুহিন, তপ্ত আমার মাথা,
ক্লান্ত, তথাপি নিদ্রা আসে না ডাকে ;
বাণীহীন কোন্‌ অনাদি বিষাদগাথা
গুঞ্জরে বিস্মরণের ফাঁকে ফাঁকে ।।

হিমানীবিজন এই দুর্গম দেশে,
মনে হয় যেন, কে আমার অনুগামী ;
হয়তো বা আমি ভুলে গেছি আজ কে সে,
কিন্তু ভোলেনি তারে অন্তর্যামী ।।

বিগত জনমে, এই পর্বতশিরে,
এমনই নীরব প্রাগিতিহাসিক রাতে
শিকার সমাপি এসেছিনু ঘরে ফিরে
মৃগের বদলে তাহারে কি ল’য়ে সাথে ?

মিনতি আমার প্রথমে ধরেনি কানে ;
কুতিল ভ্রুকুটি মোছেনি ললাটে ত্বরা ;
তার পরে কেন – তা কেবল সেই জানে-
অযাচিতে হল সহসা স্বয়ংবরা ।।

চ্যুত বল্কলে নিবে গেল দীপখানি ;
বাহিরের হিম মুকুরিল দ্রব চোখে ;
হঠাৎ তাহার লঘু ভাস্বর পাণি
খুঁজিল আমারে প্রাক্তন নিরালোকে ।।

আবার কি তার আদিম নিমন্ত্রণী
আহ্বানে মরে অমৃতের অভিসারে ?
কাঁদে সেদিনের প্রণব প্রতিধ্বনি
প্রতন গিরির গহ্বরকারাগারে?

পুরাণপুরুষ ছাড়া পাবে নিমেষে কি?
মাটির মানুষ মিলিবে মাটির সনে?
বিদগ্ধ প্রাণী, এ কি মরীচিকা দেখি ?
ফিরিব প্রভাতে পরিচিত পরিজনে ।।

মৌল আকূতি মরমেই যাবে ম’রে।
জনশুন্যতা সদা মোরে ঘিরে রবে।
সামান্যাদের সোহাগ খরিদ ক’রে
চিরন্তনীর অভাব মিটাতে হবে ।।

বর্বর বায়ু চিরায়ু অচলচূড়ে
মুছে দিবে মোর অশুচি পায়ের রেখা ।
মার্জিতরুচি জনপদে ,বহু দূরে,
ভিড়ে মিশে আমি ভেসে যাব একা একা ।।

পরাবর্ত

ছুটেছে গৈরিক পথ নির্বিকার সন্ন্যাসীর মতো
নির্গুণ নির্বাণভরা, নিরাকার শূন্যের অন্বেষে ;
নিরাশ্রয় আঁখিপাখী নিশাক্রান্ত,অশক্ত,আহত,
ঘুরে মরে দিশে দিশে মরুময় অজানা বিদেশে ;
যে-বিরল পান্থদল ওই দূরে দিগন্তের পটে
চিত্রার্পিত করেছিল মানুষের বিরাট সাধন,
তাদের মৃন্ময় মূর্তি ধুয়ে গেছে বৃষ্টির ঝাপটে ;
পলাতক চক্রবালে উল্লসে ধূলার আবর্তন ;
সমুদ্যত ভবিতব্য জগদ্দল নৈঃশব্দ্যের ভারে
দলিছে দুর্বার দর্পে অতীতের চারণসংগীত ;
রুদ্রের নয়নদগ্ধ মদনের প্রেত বারেবারে
করে যেন বজ্রাগ্নিতে অনুতপ্ত ভ্রমের ইঙ্গিত ;
বিক্ষিপ্ত নৈরাশকণা পুঞ্জীভূত হয়ে ঘন মেঘে
হানিছে জীবনাকাশে বিরঞ্জন আঁধার সমতা ;
আত্মধিক্কারের ঘূর্ণি রিক্ত বক্ষে ধেয়ে আসে বেগে ;
ঝ’রে পড়ে লক্ষ ধারে ভারাতুর,নির্লজ্জ মমতা ।।

ঊষার মাহেন্দ্রক্ষণে, পৌত্তলিক প্রথম ফাল্গুনে,
ভাবিলি মনোজ্ঞা ব’লে যে-অচেনা অবগুণ্ঠিতারে
দূর থেকে দেখে শুধু, কেবল নিরর্থ নাম শুনে
ফিরিলি ছায়ার মতো এতদিন যার অনুসারে,
আজি সেই মোহিনীর জরাজীর্ণ, প্রচ্ছন্ন স্বরূপ
ব্যক্ত হয়ে থাকে যদি বিদ্যুতের নির্দয় আলোকে ;
বৈহাসিক অবিশ্বাসী ঢালে যদি বিষাক্ত বিদ্রূপ
স্বর্গচ্যুত কৈশোরের অভিব্যাপ্ত অরুন্তুদ ক্ষতে ;
তবুও কেমনে, কবি , অস্বীকার করিবি সুন্দরে ;
বলিবি অলীক পদ্ম,সত্য শুধু পঙ্কমূল তার ?
গরিমারে মিথ্যা জেনে নি:সংশয়ে কহিবি কি ক’রে
লঘিমাই সনাতন, বস্তুবিশ্ব শুধু ধ্বংসসার ?
সংগীতের রসায়নে চেয়েছিলি করিতে নির্মাণ
সমুচ্চ সুবর্ণলঙ্কা ;আসুরিক সে-মহাপ্রয়াস
ধূমাঙ্কিত ব্যর্থতায় হয়ে থাকে যদি অবসান,
তবে ভস্মমসিপাতে স্বাক্ষরিত কর্‌ সর্বনাশ ।।

তুই মূঢ়, বরেছিলি অনিশ্চিত –বক্রতা-বিহীন,
প্রাসাদনিবৃত্ত, ঋজু, স্থিরলক্ষ্য প্রশস্ত সরণী,
আদিম বন্যতা যার পূর্বগামী করিল মসৃণ,
যার হিংসা, প্রতিহিংসা বক্ষ পেতে রোধিল অগ্রণী ।
কনককণিকা-খচা,চেয়েছিলি, সান্দ্র অবচ্ছায়া,
নিয়ন্ত্রিত শাল্মলীর মর্মরিত প্রবীণ বীথিকা,
মলয়বীজনস্নিগ্ধ, নিরাপদ প্রগতির মায়া,
পুষ্পের আশীষ-বৃষ্টি, বিহঙ্গের বন্দনাগীতিকা ।
তুই চেয়েছিলি,লোভী,পথপার্শ্বে বিস্মিত নয়ন,
উৎসবের পীতাম্বর,করতালি কঙ্কনমুখর,
সম্মুখে মঙ্গলঘট, রক্তধ্বজ বিজয়তোরণ,
পশ্চাতে ধ্বংসের ধূলি, নির্জিতের ক্ষীণ কণ্ঠস্বর ।।

আজি সে-সুখের নিদ্রা অকস্মাৎ তুতিল কি, কবি?
গোলাপী নেশায় ভরা রুদ্ধ আঁখি ফুটিল সহসা?
বিবর্ণ দিনের দীপ্তি মুছে দিল সে-চলন্ত ছবি,
ভাতিল দৈনিক দৈন্য , ঘুচিল সে-দয়ালু তমসা ?
বুঝিলি কি আচম্বিতে সাঙ্গ তোর স্বপণপ্রয়াণ,
সে নহে তো শোভাযাত্রা, যৌবনের শবযাত্রা সে যে;
তাই নাই পুষ্পবৃষ্টি, বন্দীদের উচ্চ জয়গান ;
নিরিক্ত প্রস্তরপথ দগ্ধ তাই স্পন্দমান তেজে ?
সরল বিস্ময় টুটে অন্তর্দৃষ্টি ফুটিল কি চোখে ;
বুঝিলি এ-বাটে যারা লঘু পায়ে গেছে তোর আগে,
তারা নয় অতিনর; আত্মহারা গড্ডলিকা তোকে
অভিযুক্ত করে গেছে উদ্‌ভ্রান্তির মৌল দায়ভাগে ;
তাই তোর বৈজয়ন্তী দর্শকের বিদ্রূপ জাগায়,
বিপ্রলব্ধ অনুযাত্র শঙ্খনাদে রহে নিরুত্তর ;
প্রতীকীর অশ্বমেধ শুধু শুন্যে অধিকার পায়,
নিশ্চিন্ত স্বর্গের হাস্যে অপ্রতিষ্ঠ ত্রিশঙ্কু অমর ?

কোন জন্মান্ধের কাছে শিখেছিস, ওরে অন্ধ কবি,
ব্রহ্মান্ডনেমীর কেন্দ্র্র বৃত্তিবদ্ধ, বিকল মানুষ ;
প্রাণের প্রথম প্রৈতি তার মনোবাসনার ছবি ;
জন্মমৃত্যুপরম্পরা শুধু তার করুনা, পৌরুষ ;
উদ্দাম অভীপ্সা তার মূর্ত লক্ষ তারার কম্পনে ;
তার দীর্ণ দীর্ঘশ্বাস বাতাহত বেণুতে ফুকারে ;
তার আকস্মিক খুশি শ্রাবণের নৈশ বরিষণে ;
মুমুক্ষু বিদ্রোহ তার চৈত্রে স্তব্ধ জলদে হুংকারে ;
বেতস বিরহমূক সদা তার মুখস্পর্শ মাগে ;
লুতায় মানিনী যূথী, কণ্ঠাশ্লেষ না পেয়ে, ধূলায় ;
অনঙ্গের লক্ষ্যভেদে মধুমাসে সে যদি না জাগে,
বিধাতা প্রমাদ গণে, চরাচর ম’রে,ঝ’রে যায় ;
অব্যক্তির গর্ভ হতে রহস্যের নিত্য নিরুদ্দেশে
উধাও সে ধূমকেতু দীপ্র সেতুসংরচন করে :
এই মুগ্ধ মায়াবাদ কিনিতে কি নি:স্ব হলি শেষে,
বোঝাই সোনার তরী রেখে এলি বিদেহনগরে ?

কুশের ফুৎকারজাত বুদ্বুদের স্ফটিকমণ্ডলে
বিচ্ছুরিত বর্নচ্ছটা অন্তর্হিত হলে মহাকাশে
সনির্বন্ধ শিশু যথা ডুবে যায় অশ্রুর অতলে,
বিশ্বের বৈচিত্র্য খোঁজে আপনার ভাবালু বিলাসে ;
তুই ও তেমনই কবি ভেবেছিলি চির চিরন্তন
কালাবর্ত পরিস্ফীত, পরজীবী রঙের স্বপ্নেরে।
ফুরাল তাহার বেলা ; ঝেড়ে ফেলে সংহত ক্রন্দন,
ফিরে যা সংসারে পুন ক্রন্দসীর ঊষরতা ছেড়ে ।
অজ্ঞাত সিন্ধুর মর্মে, জাদুকরী অধরা যেখানে
উৎকর্ণ অর্ণবপোত ধ্বংস করে অপ্সর সংগীতে,
সেথা বাঁধি নিজ দেহ,মুদি চক্ষু, অবরুদ্ধ কানে
পারায়ে যা পরিচিতা সুন্দরীরে বরমাল্য দিতে ।।

যদিও আত্মার ঐক্য অসম্ভব সে- জড়জগতে,
সুলভ সমানধর্মী তবু সেথা নিরবধি কালে;
আকর্ষণ,বিকর্ষণ তুল্যমূল্য সে-স্বতন্ত্র পথে,
সান্নিধ্য,দূরত্ব মিথ্যা,ভেদ নাই আকাশে পাতালে;
ব্যতিক্রম,অপচার নিষিদ্ধ সে-নৈরাজ্যে নিশ্চয়,
পরিণতি স্বত:সিদ্ধ, অনিবার্য স্বায়ত্তশাসন ;
সেখানে সম্পূর্ণ বৃত্ত, শুধু ভগ্ন কুটিলতা নয়,
অতীত অসার স্বপ্ন, ভবিষ্যৎ অসত্য ভাষণ;
সেখানে অনন্ত বাহ্য; সে-অসীমে অণুও শ্রদ্ধেয়,
সংক্রান্তি সংক্ষিপ্ততম, অগ্রগতি অপচয়হীন,
ভ্রান্তি শুধু আপেক্ষিক, নির্বিকার প্রকৃতি প্রমেয়,
প্রলয় অভাবনীয়, সর্বনাশে নির্মিত নবীন।
শূন্য যেথা শুন্য নয়, ভারাতুর সংসক্ত তড়িতে,
প্রসার সহস্রমুখী, হরিহর মুক্তি আর কারা,
হয়ত একদা সেথা মণিময় অমারজনীতে
পাবি,কবি, অকস্মাৎ অজানিত দয়িতের সাড়া ।
সেথা কি অগুরুর গর্ভে সুকুমারী কোনও নীহারিকা
নিজের অজ্ঞাতসারে আগন্তুক দৈবেরে বহে না,
বেদে কিংবা ইতিহাসে নেই যার কোষ্ঠীপত্র লিখা,
শুধিবে যে- ক্ষেমংকর প্রবঞ্চিত মানুষের দেনা ?
কিন্তু তোর ভাগ্যগুনে সে-আশাও যদ্যপি না মেটে,
অহৈতিক অনিশ্চয়ে অবশেষে হারায় প্রমিতি ;
বিস্ফোটক বস্তুবিশ্ব যায় যদি বিপ্রকর্ষে ফেটে,
বিশৃঙ্খল বিসংবাদে ভ’রে ওঠে আবার অমিতি,
পরিব্যাপ্ত পরমাণু নিপাতন প্রচারে নিখিলে,
হিরণ্ময়ের ক্ষয়ে সীসকের পরমায়ু বাড়ে,
কেবল আদিম জাড্য প্রাথমিক মাৎস্যন্যায় মিলে
সমষ্টির অভিসন্ধি নিঃসহায় ব্যষ্টিরে সংহারে ;
তবেই বুঝিবি ওই নিরপেক্ষ নক্ষত্রনিচয়,
নিপট কপট ওরা,শুধু নাম, জনশ্রুত নাম ;
মাটিই একান্ত সত্য,আর সব বৃথা বাক্যব্যয়,
সহস্র ইন্দের শবে রত্নপ্রসূ এই মর্ত্যধাম ।
হয়ত সে-শুভদিনে মরণের তুঙ্গ চূড়া হতে
সিদ্ধির ষোড়শ কলা কেড়ে নেবে বামন মানুষ ;
সুন্দরের পদরেখা ধরা দেবে ধূলাঢাকা পথে ;
আবার সপ্তম স্বর্গে স্থান পাবে ধর্মিষ্ঠ নহুষ ।।

সমাপ্তি

বরষাবিষন্ন বেলা কাটালাম উন্মন আবেশে |
জনশূণ্য হৃদয়ের কবাট উদ্ঘাটি’,
স্মরণে চলাচল করিলাম সহজ, সরল |
দৃষ্টিহারা নেত্রপাতে দেখিলাম সন্নত আকাশে
এইমতো আর-এক দিবসের ছবি |
অবিশ্রান্ত বৃষ্টির বিলাপে
শুনিলাম সে কণ্ঠের স্নেহসম্ভাষণ |
অর্গলিত বাতায়নে ঝটিকার নিরর্থ আক্রোশে
বিচ্ছেদবিধ্বস্ত হিয়া বাখানিলো ক্ষুব্ ধ অক্ষমতা
নির্বিকার, নিরুত্তর, রুক্ষ বিধাতারে ||

এলো সন্ধ্যা রক্তবরিষণ ;
দিনান্তের মুমূর্ষু বর্তিকা
প্রাকনির্বাপণ দীপ্তি প্রজ্বলিত করিল সহসা
প্রাণের অন্তিম শক্তিব্যয়ে ;
তার পর অন্তরে বাহিরে
অন্ধকার বিস্তারিল শবপ্রাবরণী ||

মনে হ’লো আশা নাই
মনে হ’লো ভাষা নাই পিঞ্জরিত ব্যর্থতা বলার |
মনে হ’লো
সংকুচিত হ’য়ে আসে মরণের চক্রব্যূহ যেন |
মনে হ’লো রন্ধ্রচারী মুষিকের মতো
শটিত জঞ্জালকণা কুড়ায়েছি এতকাল ধ’রে
কৃপণের ভাণ্ডারে ভাণ্ডারে ;
এইবার ফুরায়েছে পালা,
ঘাতক যন্ত্রের কারা অবরুদ্ধ হ’লো অবশেষে ;
এইবার উত্তোলিত সম্মার্জনীমূলে
পিষ্ট হবে অচিরাৎ অকিঞ্চন উঞ্ছবৃত্তি মম ||

সৃষ্টিরহস্য

আয়ুর সোপানমার্গ বহু কষ্টে অতিক্রম করি
উন্মুক্ত মৃত্যুর প্রান্তে ঊর্ধ্বমুখে দাঁড়ায়েছি এসে ;
সিন্ধুর ভাস্বর আঁখি খোঁজে মোরে নিম্নে নিরুদ্দেশে ;
আমার আরতিদীপ মহাশুন্যে সাজায় শর্বরী ।।

সম্মুখে নিখিল নাস্তি, পৃষ্ঠদেশে মৌল নীরবতা ;
প্রশান্তি দক্ষিণে, বামে ; জনহীন, অন্তর,বাহির।
তবু কার আবির্ভাবে কণ্টকিত আমার শরীর ;
অবচেতনার তলে গুমরে কী জাতিস্মর কথা?

তবে কি বিরাট শূন্য শূন্য নয়, সাগরের প্রেত ;
উদ্বেল বিক্ষোভ তার পরিণত বিদেহ ঈথারে?
তবে কি দুর্মর মর্ত্য ক্রন্দসীতে ক্রন্দন বিথারে;
শস্যের মিসরী শবে উপ্ত সম্ভাবনার সংকেত ?

নির্লিপ্ত আলোর দ্বীপ নয় ওই দিব্য নীহারিকা,
কালের প্রপাতে মগ্ন বাসনার ভাসমান ফেনা ?
অবচ্ছিন্ন তারারাশি, ওরা চিরদিনকার চেনা
পশুদের স্থুল সত্তা, লালসার মূর্ত বিভীষিকা ?

নাই নাই মৌন নাই, সর্বব্যাপী বাঙ্‌ময় জগৎ ;
নির্বাণ বুদ্ধির স্বপ্ন, মৃত্যুঞ্জয় জ্বলন্ত হৃদয় ;
হয়ত মানুষ মরে, কিন্তু তার বৃত্তি বেঁচে রয় ;
জন্ম হতে জন্মান্তরে সংক্রমিত প্রত্ন মনোরথ ।।

কপোল কল্পনা ত্যাগ ; নিরাসক্তি অসাধ্যসাধন;
অনন্তপ্রস্থান মিথ্যা ; সত্য শুধু আত্মপরিক্রমা ;
বিদ্রোহে স্বাতন্ত্র্য নাই ; মুক্তি মানে নিরুপায় ক্ষমা ;
সৃষ্টির রহস্য মাত্র আলিঙ্গন, পুনরালিঙ্গন।।

গল্পের বিষয়:
কবিতা

Share This Post

আরও গল্প

সর্বাধিক পঠিত