অগ্নিপুরুষ: ২.৫-৬ গিয়াকোমো অগাস্টিন

অগ্নিপুরুষ: ২.৫-৬ গিয়াকোমো অগাস্টিন

২.৫-৬ গিয়াকোমো অগাস্টিন

০৫.

কাজের মধ্যে রয়েছে গিয়াকোমো অগাস্টিন। কাজটা মোটেও কষ্টকর কিছু না। গত দুঘন্টা ধরে এক এক করে পুব মিলানের অনেকগুলো বারে ঢুকেছে সে, বেরিয়ে এসেছে দুএক মিনিট পর, প্রতিবার আরও ভারি হয়েছে হাতের লেদার ব্যাগটা। আজ বৃহস্পতিবার, আর বৃহস্পতিবার মানেই তার বসের টাকা জমা নেয়ার দিন।

ষাড় আকৃতির শরীরে ঘোড়া আকৃতির মুখ, স্বভাবটা গোঁয়ার-গোবিন্দ গণ্ডারের মত। একটু রাগ হলেই হাত চালিয়ে দেয়, লোকজনকে পিটিয়ে আনন্দ পায় সে। এই কাজের জন্যে উপযুক্ত লোক সে, কাজটা করেও নিখুঁতভাবে। তবে, একটু ধীরগতি; আর সব সময় একই রুটিন ধরে করে কাজটা।

মাঝরাতের দিকে বারগুলো থেকে টাকা আদায় শেষ করল অগাস্টিন। এবার ক্লাবগুলো ধরতে হবে। ঢিলে একটা জ্যাকেট পরে আছে সে, ফলে প্রকাণ্ড ধড় আরও বড় দেখাচ্ছে। জ্যাকেটের ভেতর, বগলের নিচে, শোল্ডার হোলস্টারে একটা বেরেটা পিস্তল রয়েছে। লেদার ব্যাগটা লম্বা, চেইন টেনে বন্ধ করা, এরই মধ্যে ভরে গেছে অর্ধেক।

পিসমেকার নাইটক্লাবের সামনে, নো, পার্কিং জোনে ল্যানসিয়া থামাল অগাস্টিন। নড়েচড়ে ওঠায় দুলতে শুরু করল গাড়ি, নেমে পেভমেন্টে দাঁড়াল সে। এই গাড়ি নিয়ে তার ভারি গর্ব। রঙটা মেটালিক সিলভার, স্টিরিও আছে, আছে মিউজিক্যাল হর্ন। ব্যাক-সিটের পিছনে, কার্নিসে বসে আছে একটা খেলনা পুতুল, গাড়ি আঁকি খেলে পুতুলের মাথা ওঠা-নামা করে, মনে হয় ঘন ঘন উঁকি দিয়ে পিছনের রাস্তা দেখছে। প্রিয় বান্ধবীর দেয়া উপহার।

এত দামি একটা গাড়ি, গাড়িটার ওপর তার এত দুর্বলতা, তবু দরজায় তালা দেয়ার বা ইগনিশন থেকে চাবি সরাবার গরজ নেই অগাস্টিনের। মিলানের প্রতিটি চোর-ছ্যাচড় জানে কে এই গাড়ির মালিক, জানে কেউ ছুঁলে তার আর রক্ষে নেই।

শিস দেয়া বন্ধ করে ক্লাবে ঢুকল অগাস্টিন, গলাটা সত্যি শুকিয়ে গেছে। কাজে বেরিয়ে সব সময় এই ক্লাবেই প্রথমবার গলা ভেজায় সে। ক্লাবের মালিক তাকে দেখেই বারটেণ্ডারের উদ্দেশে দ্রুত মাথা ঝাঁকাল। অগাস্টিন বারের সামনে পৌঁছুবার আগেই বারটেণ্ডার তার জন্যে কাউন্টারে আধ গ্লাস স্কচ হুইস্কি রাখল। গ্লাসে আয়েশ করে চুমুক দিল অগাস্টিন, ঠাণ্ডা চোখে এদিকে ওদিক তাকাল।

পিয়ানোর মৃদু শব্দের সঙ্গে তাল মিলিয়ে কয়েক জোড়া নারী-পুরুষ ধীর লয়ে নাচছে। পুরুষরা প্রায় সবাই মধ্য-বয়স্ক, ব্যবসায়ী; মেয়েগুলো হয় তাদের সেক্রেটারি, নয়ত গোপন প্রেমিকা–কারুরই বয়স পঁচিশের বেশি নয়। অত্যন্ত দামি ক্লাব এটা, শুধু ধনীলোকদের জন্যে। সুন্দরী কলগার্লরাও খদ্দের ধরার জন্যে আসে এখানে।

পাউডার রূম থেকে একটা মেয়েকে বেরিয়ে আসতে দেখল অগাস্টিন। বেশ লম্বা, মাথায় সোনালি চুল, খালি একটা টেবিলে বসে শ্যাম্পেনের গ্লাসে ছোট্ট করে। চুমুক দিল। ছোট করে কাটা ব্লাউজ, ব্রা ছিঁড়ে বেরিয়ে আসতে চাইছে স্তন। মেয়েটাকে আগে কখনও দেখেনি অগাস্টিন। ঠিক করল, কাল বিকেলে ওর সঙ্গে শোবে সে।

গ্লাসে শেষ চুমুক দিল অগাস্টিন, এক তাড়া নোট নিয়ে তার সামনে এসে দাঁড়াল ক্লাব-মালিক। তাড়াটা নিয়ে নোটগুলো গুনল অগাস্টিন, ব্যাগ খুলে টাকা রাখল ভেতরে, চেইন টেনে বন্ধ করে দিল ব্যাগ। মুখ তুলে টেবিলে বসা সুন্দরী। মেয়েটার দিকে চিবুক তাক করল সে, তার দৃষ্টি অনুসরণ করে ক্লাব-মালিকও মেয়েটার দিকে তাকাল।

খাসা জিনিস! নতুন, না?

হ্যা..মানে…জ্বী!

আমার ওখানে পাঠিয়ে দিয়ো। কাল বিকেল তিনটের সময়। মনে থাকবে?

বিনয়ে বিগলিত হয়ে গেল ক্লাব মালিক। সিনর!

পেভমেন্টে বেরিয়ে এসে তাজা বাতাসে বুক ভরে শ্বাস নিল অগাস্টিন, ল্যানসিয়ার দিকে এগোল। আরও একটু বেশি আলো থাকলে, কিংবা আরও যদি একটু সতর্ক থাকত সে, দেখতে পেত পুতুলের মাথাটা একটু একটু দুলছে।

গাড়িতে উঠে বসল অগাস্টিন, হাত বাড়াল ইগনিশনের দিকে। হঠাৎ ঘাড়ে শীতল ধাতব স্পর্শ পেয়ে স্থির হয়ে গেল হাতটা। ঠাণ্ডা একটা কণ্ঠস্বর শুনল সে, নোভড়া না!

ভয় নয়, রাগও নয়, কৌতুক মেশানো বিস্ময় বোধ করল গিয়াকোমো অগাস্টিন। তুমি জান আমি কে?

গিয়াকোমো অগাস্টিন। আর যদি একটাও কথা বল, ওটাই তোমার শেষ কথা হবে।

একটা হাত পিছন থেকে এগিয়ে এসে তার বা বগলের তলায় সেঁধিয়ে গেল, হোলস্টার থেকে বের করে নিল পিস্তলটা। একেবারে পাথর হয়ে গেছে অগাস্টিন, এতক্ষণে, ভয় পেয়েছে। পিছনের লোকটা তার পরিচয় জানে, টাকা ভরা ব্যাগটা সে নিতে আসেনি। উদ্দেশ্য ডাকাতি নয়। হয়ত গামবেরি গ্রুপের সঙ্গে গোলমাল। বেধেছে।

ভাবনা-চিন্তায় বাধা পড়ল। শান্ত, কিন্তু দৃঢ় কণ্ঠস্বর শোনা গেল আবার, এঞ্জিন স্টার্ট দাও, আস্তে আস্তে গাড়ি চালাবে। কারও দৃষ্টি আকর্ষণের চেষ্টা কোরো। কখন কোন দিকে যেতে হবে আমি বলব। কোন রকম চালাকি করতে গেলে সাথে সাথে মারা যাবে।

খুব সাবধানে গাড়ি চালাল অগাস্টিন। ষষ্ঠ ইন্দ্রিয় তাকে সতর্ক করে দিয়েছে, এ লোক মিথ্যে হুমকি দিচ্ছে না। নির্দেশ পেয়ে দক্ষিণ দিকে গাড়ি চালাল সে, শহর ছাড়িয়ে অনেকটা দূরে চলে এল। ধাক্কাটা সামলে নিয়েছে সে, দ্রুত চিন্তা ভাবনা চলছে মাথায়। এলাকার দখল নিয়ে যুদ্ধ বেধে থাকলে এতক্ষণে মারা যেত। সে, হয় ক্লাবের ঠিক বাইরে, নাহয় এইমাত্র পেরিয়ে আসা নির্জন শহরতলির কোথাও। গলার আওয়াজটা তাকে বিমূঢ় করে তুলেছে। ক্ষীণ একটু নিয়াপলিটান সুর আছে, আরও কি যেন আছে অথচ ধরতে পারছে না সে। আন্দাজ করল, লোকটা ইটালিয়ান নয়। তার চিন্তা নতুন খাতে বইতে শুরু করল। মাস কয়েক আগে তার বস, হিনো ফনটেলার সঙ্গে ইউনিয়ন কর্স-এর একটা গ্রুপের বিবাদ। বেধেছিল। মার্সেলেসের ওই গ্রুপের অভিযোগ ছিল, ড্রাগ শিপমেন্টে ফনটেলা নাকি কারচুপি করেছে। ওদের অভিযোগ কানে তোলেনি ফনটেলা, হুমকি দিয়ে চুপ করিয়ে দিয়েছিল। ওরা হয়ত হুমকি গ্রাহ্য করার বান্দা নয়। এতদিনে হয়ত তৈরি হয়েছে, এবার একহাত দেখাতে চায়। কিন্তু নিয়াপলিটান সুর কেন তাহলে?

আর অল্প দূরেই ভাইজেনটিনো! ওখানে পৌঁছবার আগেই একটা সাইড রোড ধরার নির্দেশ এল। এরপর মেঠো পথ। গাড়ি থেকে ওরা যখন নামবে, একটা ঝুঁকি নেয়া যায় কিনা দেখবে অগাস্টিন। তখন ওর ঘাড়ের ওপর পিস্তল থাকবে না। লোকটা কি জানে, তার এই বিশাল শরীরেও প্রয়োজনে বিদ্যুৎগতি খেলে যায়?

হেডলাইটের আলোয় নিচু একটা বাংলো দেখা গেল। এ-ধরনের সৌখিন কটেজ সাধারণত মিলানিজরা তৈরি করে, ছুটিছাটাতে এর্সে মেয়ে নিয়ে ফুর্তি করবে বলে। নির্দেশ পেয়ে বাংলোর পিছন দিকে গাড়ি নিয়ে এল অগাস্টিন। চাকার নিচে কাকর পেষার আওয়াজ।

থাম এখানে। হ্যাণ্ডব্রেক দাও। ইগনিশন অফ কর।

সামনের দিকে ঝুঁকল অগাস্টিন, ঠাণ্ডা পিস্তল তবুও ঘাড়ে লেগে থাকল। ধীরে ধীরে সিটে হেলান দিল সে। হঠাৎ করেই ঘাড়ের ওপর থেকে সরে গেল চাপটা। তার পেশীতে টান পড়ল, পরমুহূর্তে বিস্ফোরিত হল তার দৃষ্টি।

.

ধীরে ধীরে জ্ঞান ফিরে এল তার, মাথার পিছনে ব্যথা, দপ দপ করছে। ব্যথার জায়গাটা হাত দিয়ে স্পর্শ করার চেষ্টা করল সে, কিন্তু হাতটা নাড়তে পারল না। তার চিবুক বুকে ঠেকে আছে, দৃষ্টি পরিষ্কার হতে দেখল, বাঁ হাতটা চেয়ারের হাতার সঙ্গে টেপ দিয়ে আটকানো। অনেক কষ্টে মাথাটা ডান দিকে ফেরাল সে, একইভাবে টেপ দিয়ে আটকানো ডান হাতটাও। সারা শরীর একটা ঝাঁকি খেল, এক নিমেষে সব কথা মনে পড়ে গেছে। সন্ত্রস্ত, সেই সঙ্গে সতর্ক হয়ে উঠল। ধীরে ধীরে মাথা তুলে প্রথমে একটা কাঠের টেবিল দেখল। টেবিলের ওপর ছাড়াছাড়া ভাবে কয়েকটা জিনিস রাখা রয়েছে। একটা হাতুড়ি, বড় সাইজের দুটো ইস্পাতের পেরেক, পেরেকের পাশে ভারি একটা ছুরি, এক ফুট লম্বা একটা মেটাল রড। রডের এক প্রান্ত থেকে একটা ইলেকট্রিক কর্ড বেরিয়ে এসে টেবিলের কিনারা দিয়ে নেমে চোখের আড়ালে চলে গেছে। চোখ দুটো আরও একটু ওপরে তুলল সে। টেবিলের ওপারে, একটা চেয়ারে বসে আছে লোকটা। বয়স্ক লোক, চল্লিশ পয়তাল্লিশ বছর বয়স, চোখ দুটো কুঁচকে আছে। এই লোককে কোথায় যেন দেখেছে সে!

লোকটার সামনে, টেবিলের কিনারায়, খোলা একটা নোটবুক আর কলম রয়েছে, কলমের পাশে চওড়া এক রোল অ্যাডহেসিভ টেপ।

আমার কথা শুনতে পাচ্ছ?

মাথা ঝাঁকাল অগাস্টিন, ব্যথাটা বেড়ে গেল সঙ্গে সঙ্গে। যেই হও তুমি, এর জন্যে তোমাকে ভুগতে হবে।

তার কথা অগ্রাহ্য করে টেবিলের জিনিসগুলো ইঙ্গিতে দেখাল লোকটা। ভাল করে দেখ তোমার সামনে এগুলো কি রয়েছে, তারপর মন দিয়ে শোন।

কে তুমি? হিস হিস করে জিজ্ঞেস করল অগাস্টিন, ব্যথা সহ্য করার জন্যে। দাতে দাঁত চেপে আছে সে।

জবাব না দিয়ে লোকটা, বলল, অনেকগুলো প্রশ্ন করব। প্রতিটি প্রশ্নের পুরোপুরি উত্তর দেবে, আর সত্যি কথা বলবে।

ইউনিয়ন কর্স? অস্থির হয়ে জানতে চাইল অগাস্টিন। এ-ধরনের পরিস্থিতিতে শত্রুর পরিচয় না জানার চেয়ে বড় অশান্তি আর নেই।

উত্তর যদি মিথ্যে আর অসম্পূর্ণ হয়, টেপ খুলে তোমার বাঁ হাত টেবিলে রাখব, তারপর হাতুড়ি দিয়ে বুকে একটা পেরেক গাঁথব উল্টো পিঠে।

শিউরে উঠল অগাস্টিন। তোমাকে আমি আগে কোথাও দেখেছি–কোথায়?

তারপর ছুরিটা দিয়ে তোমার আঙুল কাটব, লোকটা বলে চলেছে, একটা। একটা করে।

ছুরির দিকে তাকাল অগাস্টিন।

ভয় নেই, রক্ত পড়ায় তুমি মারা যাবে না, বলল লোকটা। একটা আঙুল। তুলে মেটাল রডটা দেখাল সে। এটা একটা শোল্ডারিং-আয়রন। কাটা আঙুল জোড়া লাগিয়ে ঝালাই করে দেব ক্ষতগুলো।

দরদর করে ঘামছে অগাস্টিন। লোকটা সাপের মত ঠাণ্ডা চোখে তাকিয়ে আছে তার দিকে, চেহারায় নির্লিপ্ত ভাব।

তবু যদি কথা না বল, তোমার ডান হাত ধরব। এরপর পা, প্রথমে…

অনেক নিষ্ঠুর লোকের মত, গিয়াকোমো অগাস্টিনও আসলে কাপুরুষ। লোকটার চোখের দিকে তাকিয়ে থাকতে থাকতে সে উপলব্ধি করল, শুধু ভয়। দেখাচ্ছে না, এই লোক প্রতিটি কাজ করে দেখাবে। কিন্তু কেন? কে ও? কোথায়। ওকে দেখেছে সে?

অসহায় বোধ, করল অগাস্টিন, রেগে উঠে ভয় তাড়াবার চেষ্টা করল। জাহান্নামে যাও তুমি! খেঁকিয়ে উঠল সে, অশ্লীল গাল পাড়তে শুরু করল। কিন্তু আচমকা চুপ মেরে গেল সে, লোকটা উঠে দাঁড়িয়েছে।

টেপের রোল হাতে নিল লোকটা। খানিকটা খুলে ছিঁড়ল, এগিয়ে এল টেবিল ঘুরে।

কিছু বলার জন্যে মুখ খুলল অগাস্টিন, কিন্তু আওয়াজ বেরুবার আগেই তার। মুখে চেপে বসল টেপ। আলোর একটা ঝলকের মত লাগল লোকটার ডান হাত, পেটে প্রচণ্ড ব্যথা অনুভব করল অগাস্টিন, চোখে শর্ষে ফুল দেখল। দ্বিতীয় ঘুসিটা লাগল চোয়ালে, চেয়ারের পিঠে থেঁতলে গেল আহত মাথা।

কোনরকমে জ্ঞানটুকু থাকল তার, সারা শরীর অবশ, স্নায়ুগুলো ভোতা। অস্পষ্টভাবে বুঝল তার বাঁ হাত মুক্ত করা হয়েছে, টেনে লম্বা করা হয়েছে সামনের দিকে। এক মুহূর্ত পর অসহ্য যন্ত্রণায় তার শরীর ধনুকের মত বেঁকে গেল, জ্ঞান। হারাল সে।

দ্বিতীয়বার জ্ঞান ফেরার পর মাথার দপদপে ব্যথাটা অনুভব করল না। অগাস্টিন। মনে হল বা হাতে আগুন জ্বলছে। চোখ খুলে হাতের দিকে তাকাল সে, টেবিলের ওপর চিৎ করে রাখা। তালু ফুটো করে টেবিলে গেঁথে রয়েছে পেরেকটা। আঙুলের ফাঁক গলে গড়িয়ে নামছে রক্ত, টেবিলের ওপর কয়েক জায়গায় জমেছে। বেশ অনেকটা করে।

চোখে দেখা দৃশ্যটা অবিশ্বাস করতে চাইল তার মস্তিষ্ক, কিন্তু এক চুল নড়তেই তীব্র ব্যথার পাগল করা ঢেউ একের পর এক আছড়ে পড়তে শুরু করল সারা শরীরে। টেপ দিয়ে মোড়া মুখ থেকে ভোতা একটু গোঙানির আওয়াজ বেরুল। চোখ দেখে বোঝা যায়, আতঙ্ক তাকে গ্রাস করেছে। নিষ্ঠুরতা নয়, অগাস্টিনকে আতঙ্কিত করে তুলেছে লোকটার শান্ত-নির্লিপ্ত ভাব-ভঙ্গি–একজন মানুষকে কষ্ট দিচ্ছে অথচ সে-ব্যাপারে তার কোন অনুভূতি নেই, এমনকি ব্যাপারটা উপভোগও করছে না।

ঠাণ্ডা চোখ দুটোর দিকে আবার তাকাল সে। পলক নেই, একবারও পলক, ফেলতে দেখেনি ওকে। এখনও কোন ভাব নেই চেহারায়। আবার লোকটা চেয়ার ছাড়ল, টেবিল ঘুরে এগিয়ে এল। শিউরে উঠে আহত পশুর মত পিছিয়ে আসার ব্যর্থ চেষ্টা করল অগাস্টিন। লক্ষণ দেখে বোঝা যায়, বুদ্ধি লোপ পাচ্ছে তার। ঘন। ঘন মাথা নাড়ার মানে হল নিঃশব্দে করুণা ভিক্ষা চাইছে। গলার ভেতর ঘড়ঘড় আওয়াজ। লোকটা মুঠো করে ধরল তার মাথার চুল। মাথাটা স্থির করে রেখে একটানে খুলে নিল মুখের টেপ। বমি করতে শুরু করল অগাস্টিন; কিন্তু সেদিকে খেয়াল না দিয়ে নিজের চেয়ারে গিয়ে বসল ও।

থরথর করে কাঁপছে অগাস্টিন, ভয়ে আর ব্যথায়।

একটু শান্ত হতে অনেক সময় নিল ঘোড়ামুখো। ঘাম, চোখের পানি, বমি আর রক্ত, তার শরীর থেকে তরল পদার্থ বেরিয়ে যাচ্ছে। পেরেক গাঁথা বা হাত, শোল্ডারিং-আয়রন, আর ছুরি–পালা করে এই তিনটের দিকে ঘুরে বেড়াচ্ছে তার। দৃষ্টি। মুখের থুথু আর ফেনা গিলে নিয়ে কথা বলল সে, কোন রকমে শোনা গেল, কি চাও তুমি?

নোটবুক টেনে নিয়ে কলমটা খুলল ও। লুবনা কিডন্যাপিং দিয়ে শুরু কর।

মুহূর্তে চেহারাটা মনে পড়ল অগাস্টিনের।

.

এক ঘন্টার বেশি ধরে জেরা চলল। শুধু একবার, হিনো ফটেলার প্রসঙ্গ উঠতে, ইতস্তত করল অগাস্টিন; কিন্তু হাতের কলম রেখে রানা আবার চেয়ার ছাড়তে যাচ্ছে দেখে গড় গড় করে জবাব দিতে শুরু করল সে।

কিডন্যাপের ঘটনা দিয়ে শুরু করল সে। গাড়িটা চালাচ্ছিল অগাস্টিন। প্রথমেই সে হড়বড় করে বলে নিল, বডিগার্ডকে গুলি করেছিল এলি, সে নয়। বাকি দুজন ছিল চারিন আর সাইমিয়ানো, গুলি খাবার সঙ্গে সঙ্গে মারা যায়।

দাবি করা টাকা সম্পর্কে কিছুই জানে না অগাস্টিন। ওদেরকে শুধু নির্দেশ দেয়া হয়, নির্দিষ্ট একটা সময়ে, নির্দিষ্ট একটা জায়গা থেকে মেয়েটাকে তুলে নিয়ে এসে নিগুয়াডা-র একটা বাড়িতে আটকে রাখতে হবে।

শুরুতেই গোটা ব্যাপারটা লেজেগোবরে হয়ে যায়। হিনো ফনটেলা ওদেরকে অভয় দিয়ে বলেছিল মেয়েটার সুঙ্গে একজন বডিগার্ড থাকবে বটে, কিন্তু সে তেমন। কোন কম্মের নয়, ওদের জন্যে, কোন সমস্যার সৃষ্টি করবে না। চারিনের ওপর নির্দেশ ছিল, ফাঁকা দুটো গুলি করবে সে, তাহলেই বডিগার্ড ভয় পেয়ে পালাবে। কাজেই ওরা সবাই কাজটাকে হালকাভাবে নিয়েছিল, কেউই তেমন সতর্ক ছিল না।

মেয়েটাকে রেপ করল কে?

এলি, সঙ্গে সঙ্গে জবাব দিল অগাস্টিন। চারিন মারা যাওয়ায় তার মাথায় আগুন ধরে যায়, ঘনিষ্ঠ বন্ধু ছিল ওরা। তাছাড়া, ছোট মেয়েদের ওপর বরাবরই তার খুব লোভ। এই মেয়েটা আবার ধস্তাধস্তি করার সময় তার মুখে খামচি দেয়… নার্ভাস ভঙ্গিতে জিভের ডগা দিয়ে শুকনো ঠোঁট ভেজাল সে।

আর তুমি? শান্ত সুরে জিজ্ঞেস করল রানা। তুমি ওকে রেপ করনি?

অনেকক্ষণ চুপ করে থাকল অগাস্টিন, তারপর অনেকটা যেন নিজের অজ্ঞাতসারেই ওপর নিচে মাথা দোলাল, কথা বলার সময় কাঁপা কাঁপা লাগল তার কণ্ঠস্বর, হ্যাঁ…মানে, এলির পর। ভাবলাম যা হবার তা তো হয়েই গেছে, তাই আমিও… টেবিলের ওপর দিয়ে যমদুতের দিকে তাকাল সে। স্থির পাথর হয়ে আছে রানা। অগাস্টিনের মনে হল, লোকটার মন যেন এখানে নেই, অন্য কোথাও চলে গেছে। আবার শুরু হল জেরা।

আর কেউ?

মাথা নাড়ল অগাস্টিন। মেয়েটার সঙ্গে আমরা এই দুজনই ছিলাম। সময় কাটতে চাইছিল না, সাংঘাতিক একঘেয়ে লাগছিল–আমরা ভেবেছিলাম দুএক দিনের মধ্যে সব ঝামেলা শেষ হয়ে যাবে, কিন্তু দাবির টাকা নিয়ে কি যেন একটা গোলমাল দেখা দেয়, বাড়িটায় আমরা দুহপ্তা আটকা পড়ে গেলাম।

তাই তোমরা ওকে বারবার রেপ করলে?

ধীরে ধীরে নিচু হল অগাস্টিনের মাথা, চিবুক বুকে ঠেকল, ঘামে চকচক করছে চওড়া কপাল। অস্ফুট, কর্কশ শোনাল তার গলা, হ্যাঁ..মানে, তেমন কিছু করার ছিল না আমাদের আর মেয়েটা ছিল খুব সুন্দরী…।

ধীরে ধীরে নিস্তেজ হয়ে এল তার কণ্ঠস্বর, মুখ তুলে দেখল টেবিলের ওপার থেকে তার দিকে তাকিয়ে আছে মৃত্যুদূত।

ফনটেলা? সে কি বলল?

উনি খেপে যান। মেয়েটা মারা গেল, সে তো আমাদের কোন দোষ না, স্রেফ একটা দুর্ঘটনা। কিন্তু উনি কোন কথাই শুনলেন না। প্রত্যেকের আমাদের দশ। মিলিয়ন লিরা করে পাবার কথা ছিল, কিন্তু উনি আমাদের কিছুই দিলেন না।

নরম সুরে জিজ্ঞেস করল রানা, টাকা দিল না–ব্যস, এইটুকুই শাস্তি?

অগাস্টিনের চিবুক থেকে ফোঁটায় ফোঁটায় ঘাম পড়ছে বুকে, মাথা ঝাঁকাল। সে। একদিক থেকে আমরা ভাগ্যবান, কারণ বস্ ফনটেলার ভাগ্নে হয় এলি। আমাকে শাস্তি দিলে ভাগ্নেকেও দিতে হয়, তাই ব্যাপারটা নিয়ে বেশি বাড়াবাড়ি করলেন না।

কলম তুলে নিল রানা। হ্যাঁ, মৃদু গলায় বলল ও। ভাগ্যবানই বটে। এবার এলি সম্পর্কে বল।

এলি সম্পর্কে যা কিছু জানে অগাস্টিন, সব বের করে নিল রানা। কারা তার বন্ধু, তার গতিবিধি, তার অভ্যেস কিছুই বাদ দিল না। এরপর হিনো ফনটেলা। প্রসঙ্গ। একে একে সব জেনে নিল রানা।

জেরার এক পর্যায়ে অগাস্টিন অভিযোগ করল, হাতের ব্যথা সে আর সহ্য করতে পারছে না।

আর বেশি দেরি নেই, আশ্বাস দিয়ে বলল রানা। এবার ডন বেরলিংগার আর ডন বাকালার কথা বল।

কিন্তু এই মহারথীদের সম্পর্কে তেমন কিছুই জানে না অগাস্টিন। যতদূর শুনেছে, ডন বাকালা তার ভিলা কোলাসি থেকে কদাচ বের হন। না, অগাস্টিন তাঁকে কখনও দেখেনি।

তবে আমার বস সিনর ফনটেলা ভিলা কোলাসিতে ঘন ঘন যান, প্রতি মাসে একবার তো বটেই। বসু রোমেও যান, ডন বেরলিংগারের কাছে।

আর কোন প্রশ্ন নেই। নোটবুক বন্ধ হল, ক্যাপ লাগানো হল কলমে।

অগাস্টিনের আতঙ্ক মাথাচাড়া দিতে শুরু করল। আবার সে কথা বলছে, বক বক করে যাচ্ছে বেরলিংগার আর বাকালাকে নিয়ে, কিন্তু তার কথায় রানার আর। কোন আগ্রহ নেই। ধীরে ধীরে উঠে দাঁড়াল ও, হাত ঢোকাল জ্যাকেটের ভেতর। ওর হাতে পিস্তল দেখে অগাস্টিনের বকবকানি থেমে গেল। এখন সে তার শরীরে কোথাও কোনরকম ব্যথা অনুভব করছে না। তার সামনে দাঁড়িয়ে পিস্তলের মাজলে। সাইলেন্সর ফিট করছে রানা, সম্মোহিতের মত সেদিকে তাকিয়ে আছে সে। টেবিল। ঘুরে এগিয়ে এল রানা। ওর চেহারায় কোন ভাব নেই, ঠাণ্ডা চোখে নির্লিপ্ত দৃষ্টি।

সাইলেন্সর লাগানো পিস্তলটার দিকে তাকিয়ে থাকল অগাস্টিন, ওটাকে তার বেটপ আর কুৎসিত লাগল। দেখল, পিস্তলটা ওর দিকে ভোলা হল। এগিয়ে। আসছে, এগিয়ে আসছে!

চোখের পাপড়িতে পিস্তলের স্পর্শ পেল অগাস্টিন। চোখ বন্ধ করল সে। তার বন্ধ ডান চোখের ওপর চেপে বসল ঠাণ্ডা ইস্পাত। শেষবারের মত ভারি কণ্ঠস্বর শুনতে পেল সে।

নরকে যাচ্ছ, অগাস্টিন-ওখানে তোমার সঙ্গে আর সবার দেখা হবে।

.

গিদাস-এ ভিড় দেখলে মনে হবে, সুপুরুষ আর সুন্দরীদের মেলা বসেছে। শুক্রবার দুপুরের পরিচিত পরিবেশ, ঢিলেঢালা ভাব নিয়ে লাঞ্চে বসে ভোজন রসিকরা গালগল্প করছে।

পিছনের অ্যালকোভ টেবিলে একা বসে খাচ্ছেন বার্নাদো গুগলি। বাইরে। কোথাও খেতে বসলে সংখ্যায় দুজন হওয়া চাই, প্রাচীন এই আপ্তবাক্যে বিশ্বাসী। তিনি–কিন্তু, খাচ্ছেন আজ একা।

সুদর্শন চেহারাই তাকে আর সবার চেয়ে আলাদা করে তোলে। কাপন ম্যাগ্রো, খাচ্ছেন তিনি, অন্যান্য টেবিল থেকে রূপসী মেয়েরা চোরা চোখে বারবার দেখে নিচ্ছে তাঁকে। সুন্দরভাবে কাটা গাঢ় খয়েরি স্যুট পরে আছেন, আকাশি নীল শার্ট, সঙ্গে চওড়া তামাটে লাল সিল্ক টাই। কাফ লিঙ্ক আর প্যাটেক ফিলিপ হাতঘড়ি থেকে বিচ্ছুরিত হচ্ছে আলো।

একটু সরু, রোদে ঝলসানো মুখ; প্রায় ঈগলের মত খাড়া নাক। এমনকি পুরুষরাও একবার তাকালে দ্বিতীয়বার না তাকিয়ে পারছে না। সবার মনেই কৌতূহল, কি উনি? সফল একজন অভিনেতা, প্রখ্যাত কোন ফ্যাশন ডিজাইনার, নাকি ইন্টারন্যাশনাল প্লে-বয়?

আসলে তিনি একজন পুলিস অফিসার। যদিও তার মা, একজন অভিজাত মহিলা, কথাটা শুনে নাক কোঁচকাবেন, তড়িঘড়ি শুদ্ধ করে দিয়ে বলবেন, কারাবিনিয়ারিতে ও একজন কর্নেল। কথাটা সত্যি। মাত্র আটত্রিশ বছর বয়সে এই পদে খুব কম অফিসারই উঠতে পারে।

বার্নাদো গুগলি পুলিসের চাকরি বেছে নেয়ায় সবচেয়ে বেশি আঘাত পেয়েছিলেন তার মা। ছেলেকে তিনি চেনেন, জানেন রাজনীতি বা ব্যবসার লাইনে গেলে ছেলে তার জাদু দেখিয়ে দিত। একইভাবে তার বড় ছেলেও তাকে হতাশ করে। ডাক্তারী পড়া শেষ করে। সে এখন একজন সফল সার্জেন। মায়ের ধারণা, পেশাটা মন্দ নয়, কিন্তু বড়ই নিরস। এরচেয়ে পুলিসের চাকরি তবু ভাল। বার্নাদো গুগলি নিজেও মাঝে মধ্যে ভাবেন, কারাবিনিয়ারিতে তিনি কেন এলেন। হয়ত তার অ্যাডভেঞ্চার-প্রিয় মনই এর জন্যে দায়ী। কিংবা অন্যায়ের ভেতর কখনও কখনও ন্যায় থাকলেও সেদিকে কারও কোন খেয়াল থাকে না দেখে তার বিবেক বিদ্রোহ করে ওঠে, তাই এ পথ বেছে নিয়েছেন–সাধ্যমত চেষ্টা করে দেখবেন এ ব্যাপারে কিছু করা যায় কিনা।

তাঁর শত্রুরাও একবাক্যে স্বীকার করবে, তিনি একজন ভাল পুলিস অফিসার। সততা, এবং ব্যক্তিগত বিশাল সয়-সম্পত্তি থাকায় দুর্নীতি তাকে স্পর্শ করতে পারেনি। ক্ষুরের মত ধারাল বুদ্ধি, অঢেল প্রাণচাঞ্চল্য, আর মানুষের মন বোঝার। দুর্লভ ক্ষমতা তাঁকে একজন সফল পুলিস অফিসার হিসেবে গড়ে তুলেছে।

তাঁর জীবনের চারটে দুর্বলতার একটা হল এই চাকরি। বাকি তিনটে–ভাল। খাবার, সুন্দরী মহিলা, আর ব্যাকগ্যামন। বার্নাদো গুগলির দৃষ্টিতে আদর্শ একটা দিন বলতে বোঝায়ঃ দিনের শুরুতেই তদন্তে নেমে চমকপ্রদ একটা সূত্র আবিষ্কার, দুপুরে মিলানের সেরা কোন রেস্তোরাঁয় লাঞ্চ, বিকেলে অফিসে বসে গুরুত্বপূর্ণ ফাইল পাঠ, তারপর রাতে মনের মত ডিনারের জন্যে নিজের হাতে রান্নাবান্না, সেই রান্না মনের মত কোন সুন্দরী মেয়েকে খাওয়ানো, সেই মেয়ের অন্তত এইটুকু বুদ্ধি। থাকতেই হবে যাতে ব্যাকগ্যামন খেলায় দুএকবার সে তাকে ভড়কে দিতে পারে এবং সবশেষে, মেয়েটিকে নিয়ে বিছানায় যাওয়া।

গত চার বছর চাকরি জীবন তার ভালই কেটেছে। তিনি অনুরোধ করেছিলেন, কর্তৃপক্ষ সাড়া দিয়ে তাঁকে নতুন একটা ডিপার্টমেন্টে বদলি করেছেন। এই ডিপার্টমেন্ট সংঘবদ্ধ অপরাধীদের পিছনে লেগে আছে। অর্গানাইজড ক্রাইমের ধরন, আর মাহাত্ম বোঝার জন্যে কঠোর পরিশ্রম করেছেন। তিনি, মাসের পর মাস ফাইল পড়েছেন, এবং মাফিয়া চক্রের জটিল সাংগঠনিক গোপনীয়তা সম্পর্কে যতই জেনেছেন ততই বিস্মিত হয়েছেন।

তাঁর প্রথম তিন বছর কেটেছে গবেষণায়। তথ্য সংগ্রহ করেছেন, সেগুলো যাচাই করেছেন, ভুল হলে বাতিল করেছেন, একটার সঙ্গে আরেকটা মিলিয়েছেন, তথ্যের সঙ্গে যোগ করেছেন নাম আর চেহারা। দক্ষিণ এবং উত্তরের শহরগুলো থেকে আসা ঘটনাপ্রবাহের মধ্যে মিল খুঁজেছেন–মিলানের একটা নারী ব্যবসায়ী। চক্রের সঙ্গে কালাব্রিয়ার মদ চোলাইকারী দলের বা নেপলসের ড্রাগ-স্মাগলারদের। কি সম্পর্ক জানতে চেষ্টা করেছেন।

তিন বছর পর ইটালিয়ান মাফিয়া সম্পর্কে একজন বিশেষজ্ঞ হয়ে উঠলেন বার্নাদো গুগলি। মাফিয়ার বাইরে থেকে মাফিয়া সম্পর্কে তার চেয়ে বেশি কেউ জানে না। তাঁর সহকারী, ক্যাপ্টেন কোসিমা পাধানি একবার ঠাট্টা করে বলেছিল, তিনি যদি কখনও দল বদল করেন, প্রথম দিনই নতুন কাজের সঙ্গে নিজেকে মানিয়ে নিতে পারবেন।

গত এক বছর ধরে এই জ্ঞান কাজে লাগাচ্ছেন গুগলি। হুকুমদখল করা জমির ক্ষতিপূরণ সংক্রান্ত একটা জালিয়াতির ঘটনা তদন্ত করতে গিয়ে রেগিয়োর ডন। ব্যামবিনো ফেটুচিনিকে তিনি কোণঠাসা করে ফেলেন। এক শ্রেণীর সরকারী কর্মচারীর যোগসাজশে গরীব মানুষদের বিস্তর জমি হুকুমদখল করায় ফেটুচিনি, তাদেরকে নামমাত্র ক্ষতিপূরণ দেয়া হয়, তারপর সমস্ত জমি আরও একশো গুণ কম দরে নিলামে কিনে নেয় সে। দুবছরের জেল হয় তার। মাস কয়েক ধরে। মিলানের প্রধান দুটো পরিবারের ওপর নজর রাখছেন গুগলি, এ-দুটোর কর্তা হল। ডন গামবেরি, আর ডন ফনটেলা। নারী-ব্যবসা, ড্রাগ স্মাগলিং, আর ছিনতাই, এই তিন ধরনের অপরাধের সঙ্গে জড়িত ওরা। ধীরে ধীরে প্রমাণ আর সাক্ষী যোগাড় করছেন গুগলি। ওদের টেলিফোনে আড়িপাতা যন্ত্র ফিট করেছেন, ওদের দলে ঢুকিয়ে দিয়েছেন নিজের লোক, কর্তাদের ওপর নজর রাখার ব্যবস্থা করেছেন। দুএক বছরের মধ্যে তার হাতে যথেষ্ট প্রমাণ জমা হবে, আশা করছেন দুচারটে রুই-কাতলাকে আটকাতে পারবেন তিনি, তাদের মধ্যে সম্ভবত গামবেরি আর। ফনটেলাও থাকবে।

এদের বিরুদ্ধে লেগে থাকা তার জন্যে অনেক সহজ হয়ে গেছে, কারণ সাধারণ মানুষ এখন অত্যাচারী মাফিয়ার বিরুদ্ধে সোচ্চার। যদিও অনুকূল পরিবেশ তৈরি হতে এখনও অনেক দেরি। কারাদণ্ড এদের জন্যে কোন শাস্তিই নয়, অর্থাৎ আইন পাল্টানো দরকার। সাক্ষী পাওয়া এখনও সাংঘাতিক কঠিন, আরও, কঠিন সাক্ষীর নিরাপত্তা নিশ্চিত করা। তবে, একটু একটু করে পরিস্থিতি ভাল হচ্ছে। বড় ধরনের কোন অপরাধ হতে দেখলেই মাফিয়ার বিরুদ্ধে আরও একটু বেশি খেপছে মানুষ।

লাঞ্চের পর তরুণী এক অভিনেত্রীর কাছে যাবেন। কাল সন্ধের এক পার্টিতে মেয়েটির সঙ্গে পরিচয়। জাপানী পুতুলের মত গড়ন, ছোটখাট, চোখ ধাঁধানো রূপ। খুশির খবর, মেয়েটি ব্যাকগ্যামন খেলে। তাঁকে দাওয়াত দিয়েছে, দুএক দান খেলা হবে। সেই আনন্দেই আজ তিনি লাঞ্চে বসে ডেজার্টের জন্যে জিলাটো ডি টুটি ফুটি-র অর্ডার দিয়ে ফেললেন।

মিষ্টি খাবার মুখ তাঁর, বিশেষ করে ফল আর আইসক্রীমের সঙ্গে মিষ্টি খেতে খুবই ভালবাসেন। কিন্তু যে লোক শরীরের যত্ন নেয়, সে কখনও পেটে চর্বি জমতে দিতে পারে না, তাই হপ্তায় মাত্র রোববারে ডেজার্ট খান তিনি। সত্যি বলতে কি, নিজেকে তিনি চিট করছেন, কারণ আজ মাত্র শুক্রবার। আসলে বিকেলে মেয়েটার সঙ্গ পাবেন এই আনন্দে উদার হয়ে পড়েছেন তিনি।

হেডওয়েটার এগিয়ে এল। কিন্তু ডেজার্টের বদলে তার হাতে ফোনের রিসিভার। আপনার অফিস, কর্নেল।

কথা বলল কোসিমো পাধানি, তাঁর সহকারী। কিছুক্ষণ শোনার পর তিনি বললেন; আধ ঘন্টার মধ্যে পৌঁছে যাব ওখানে। টেবিলে রিসিভার রেখে হেড ওয়েটারকে ডাকলেন তিনি, গাম্ভীর্যের সঙ্গে ডেজার্টের অর্ডার বাতিল করে দিলেন। এরপর তিনি ফোন করলেন তরুণী অভিনেত্রীকে, আজ ওঁদের দেখা হচ্ছে না। মেয়েটার কথায় মনে হল, মনঃক্ষুণ্ণ হয়েছে সে। তাকে সান্ত্বনা দিয়ে গুগলি। জানালেন, রোববারে তাঁর অ্যাপার্টমেন্টে ওর জন্যে নিজের হাতে ডিনার তৈরি করবেন তিনি। বিল মেটাবার সময় হেডওয়েটারকে বললেন, কাপন ম্যাগ্রোতে রোজমেরী একটু বেশি হয়ে গেছে।

.

মিলান তুরিন মটর ওয়ের পাশেই একটা ডোবা, রাস্তা থেকে ত্রিশ মিটার দূরে। অনেকগুলো নর্দমা চারদিক থেকে এসে নেমেছে এই ডোবায়। আবর্জনার ওপর চিৎ হয়ে ভাসছে গিয়াকোমো অগাস্টিনের লাশ। রাস্তার পাশে একটা অ্যাম্বুলেন্স আর কয়েকটা পুলিস কার দেখা গেল। স্ট্রেচারের ওপর ভাঁজ করা রয়েছে বড়সড় কালো একটা প্লাস্টিক ব্যাগ। একজন পুলিস ফটোগ্রাফার ঘুরেফিরে ছবি তুলছে।

সহকারী পাধানির পাশে দাঁড়িয়ে লাশের দিকে তাকিয়ে আছেন গুগলি, ঠোঁটের কোণে ব্যঙ্গ মেশানো ক্ষীণ একটু হাসির রেশ। একজন কালেক্টরকে কালেক্ট করা হয়েছে, তাই না?

কাল রাতে কোন এক সময়, বলল পাধানি। লাশ পাওয়া গেছে ঘন্টাখানেক আগে।

চোখে একটা মাত্র বুলেট, দীর্ঘশ্বাস ফেলে বললেন গুগলি। ব্যস, ফুরিয়ে গেল সব।

হ্যাঁ একেবারে ক্লোজ রেঞ্জ থেকে। লাশের মুখের দিকে আঙুল তুলল। পাধানি। চোখের চারপাশে পোড়া দাগ। ঠিক পাতার ওপর মাজল চেপে ধরে ট্রিগার টানা হয়েছে।

এ যেন খুনীর ব্যক্তিগত প্রতিশোধ। ওর হাতে কি হয়েছিল?

তীক্ষ্ণ চোখে লাশের হাতের দিকে তাকাল পাধানি। ফুটো করা হয়েছে। হাতটা। কাঁধ ঝাঁকাল সে। কি দিয়ে বলতে পারব না।

ফটোগ্রাফার এসে তার প্রাথমিক কাজ শেষ করল। একজন পুলিস এগিয়ে এসে জানতে চাইল, কর্নেল, লাশ এবার নিয়ে যেতে পারি?

হ্যাঁ, বললেন গুগলি। যত তাড়াতাড়ি সম্ভব প্যাথোলজিস্টের রিপোর্ট চাই আমি।

পানির ওপর আধ হাত পুরু হয়ে আবর্জনা জমে আছে, লাশ তাই ডোবেনি। ডোবার কিনারায় দাঁড়িয়ে একজন অ্যাম্বুলেন্স কর্মী প্লাস্টিক ব্যাগের ভেতর লাশ ঢোকাতে শুরু করল। নিজের গাড়ির দিকে এগোলেন গুগলি, পিছু নিল পাধানি।

আপনার কি ধারণা, স্যার, আবার একটা যুদ্ধ শুরু হল?

গাড়িতে হেলান দিয়ে দাঁড়ালেন গুগলি, মনে মনে এই হত্যাকাণ্ডের ব্যাখ্যা পাবার চেষ্টা করছেন। তিনটে সম্ভাবনা দেখতে পেলেন তিনি। এলাকার দখল নিয়ে যুদ্ধ শুরু করতে পারে ফনটেলা আর গামবেরি। এর সম্ভাবনা খুবই কম, কারণ। ব্যবসায়িক স্বার্থেই শহরটাকে তারা নিজেদের মধ্যে নিখুঁতভাবে ভাগ করে নিয়েছে, কেউ কারও ব্যাপারে নাক না গলিয়ে চুটিয়ে ব্যবসা করে যাচ্ছে ওরা। তাছাড়া, যুদ্ধ করতে হলে প্রথমে বেরলিংগার, তারপর বাকালার সম্মতি আদায় করতে হবে ওদের, কিন্তু এই মুহূর্তে তারা কোন যুদ্ধ চায় না। আরেকটা সম্ভাবনা, আদায়করা টাকা হয়ত মেরে দিচ্ছিল অগাস্টিন, ব্যাপারটা ফাস হয়ে যায়। কিন্তু এ-ও প্রায় অসম্ভব। পনেরো বছর ধরে এই কাজ করছে অগাস্টিন। লোকটা হয়ত বোকা ছিল, কিন্তু তার বিশ্বস্ততা সম্পর্কে কখনও কোন প্রশ্ন ওঠেনি। আরেক হতে পারে, কাজটা বাইরের কারও।

কে সে?

কেন?

কাঁধ ঝাঁকালেন গুগলি, গাড়িতে উঠে বসলেন। সহকারীর প্রশ্নের উত্তর না দিয়ে বললেন, অগাস্টিনের ফাইল চাই আমি। গত বাহাত্তর ঘন্টায় আড়িপাতা যন্ত্রে। যা ধরা পড়েছে সব লিখে আমার কাছে পাঠাবে।

হাতঘড়ির ওপর চোখ বুলিয়ে একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলল পাধানি।

গুগলি বললেন, সন্ধেয় কোন প্রোগ্রাম থাকলে বাতিল করে দাও। তার। চেহারায় অস্বস্তির একটা ছায়া পড়ল। আমারটা আমি আগেই বাতিল করে দিয়েছি। এক সেকেণ্ড চিন্তা করলেন তিনি। রেড লিস্টে যারা আছে তাদের ওপর নজর রাখার ব্যবস্থা আরও জোরদার কর।

এঞ্জিন চালু হল। জানালা দিয়ে মুখ বের করে বললেন, অফিসে দেখা হবে।

একদৃষ্টে তাকিয়ে থেকে গাড়িটার চলে যাওয়া দেখল পাধানি। তিন বছর ধরে ওঁর সহকারী হিসেবে কাজ করছে সে। প্রথম দিকে, প্রায় পুরো একটা বছর ধরে, এই মানুষটার কাছ থেকে পালিয়ে যাবার একটা ঝোঁক ছিল তার মধ্যে। কিন্তু বদলি হতে চাইলে সঙ্গত কারণ দেখানো চাই।

কর্নেল গুগলিকে যে সে পছন্দ করেনি তা নয়। ভদ্রলোক তাকে শুধু ভয়ঙ্কর। একটা অস্বস্তির মধ্যে ফেলে দিয়েছিলেন। কিন্তু বদলির আবেদন জানাবার জন্যে। কোন কারণই সে খুঁজে বের করতে পারেনি। তার শ্লেষ মেশানো মন্তব্য, হঠাৎ কঠোর হয়ে ওঠা, নায়কসুলভ সুন্দর চেহারা, এমনকি বংশ গৌরবও পাধানির জন্যে কোন সমস্যার সৃষ্টি করেনি। তার অস্বস্তি লাগার কারণ ছিল, একজন সিনিয়র কারাবিনিয়ারি অফিসারকে যা কিছু মানায় না বলে তার ধারণা, সেগুলো সবই রয়েছে কর্নেলের মধ্যে। বলা কঠিন পাধানি হয়ত নিজেও জানে না যে সে সম্ভবত ঈর্ষা করে তাঁকে।

দুটো কারণে পালিয়ে যাবার ঝোঁকটা তার মন থেকে দূর হয়ে যায়। এক বছর। কাজ করে হঠাৎ পাধানি তার বসের তীক্ষ্ণ বুদ্ধি আর অসাধারণ স্মরণশক্তির পরিচয় পেয়ে যায়। এই গুণ দুটো কর্নেলের মধ্যে আগে থেকেই ছিল, কিন্তু এতদিন তার চোখে পড়েনি। দ্বিতীয় কারণ ছিল, তার বোন। ডাক্তারী পড়ার জন্যে কাটানযারো ইউনিভার্সিটিতে ভর্তি হতে চায় সে, তার রেজাল্টও ভাল, কিন্তু ওপর মহলের কারও সঙ্গে ওদের পরিবারের দহরম-মহরম ছিল না। তার আবেদন। বিবেচনা না করেই বাতিল করে দেয়া হয়। পাধানির ঠিক মনে নেই, কথায় কথায় অফিসে হয়ত ঘটনাটা বলেছিল সে। কোথাও কিছু নেই, এক হপ্তা পর পাধানির বোন ইউনিভার্সিটি থেকে একটা চিঠি পেল, কর্তৃপক্ষ তাদের সিদ্ধান্ত বদলেছেন। ইউনিভার্সিটিতে ক্লাস শুরু করার পরই শুধু তার বোন জানতে পারে, কে এক প্রফেসর গুগলি, নেপলসের কারদারেলি হাসপাতালের সিনিয়র সার্জেন, তার ব্যাপারে নাকি সুপারিশ করেন।

প্রসঙ্গটা একদিন তুলল পাধানি।

বিস্মিত দেখাল কর্নেলকে। বললেন, কি আশ্চর্য! তুমি আমার সঙ্গে কাজ কর, তোমার সুবিধে-অসুবিধে আমি দেখব না তো কে দেখবে!

বদলি হবার চিন্তাটা সেই মুহূর্তে বাতিল করে দেয় পাধানি। কর্নেল উপকার করেছেন বলে নয়। তাঁর প্রকাশভঙ্গিটা ওর ভাল লেগেছিল। তুমি কাজ কর আমার সঙ্গে, আমার জন্যে নয়।

তারপর দুবছর ধরে চমৎকার একটা টিম হিসেবে কাজ করছে ওরা। এখনও আগের মতই আছেন কর্নেল, তাঁর বিদ্রুপাত্মক মন্তব্যের ধার এতটুকু কমেনি, মাঝেমধ্যে অসম্ভব একগুঁয়ে হয়ে ওঠেন, এবং কোনরকম দ্বিধা না করেই বলা যায়। বয়সের সঙ্গে সঙ্গে আরও যেন সুপুরুষ ও সুদর্শন হয়ে উঠেছেন তিনি। কিন্তু। ভেতরের মানুষটাকে এখন বুঝতে পারে পাধানি, সেই সঙ্গে তাঁর কিছু কিছু অভ্যেস আর আচরণ অনুকরণ করতে চেষ্টা করে। খাওয়া-দাওয়ার ব্যাপারে আগের চেয়ে খুঁতখুঁতে হয়ে উঠেছে, বেশি ভাড়া দিয়ে ভাল ফ্ল্যাটে থাকে, সুন্দরী মেয়েদের সঙ্গে নরম ব্যবহার করে। শুধু ব্যাকগ্যামন খেলাটা তার ধাতে সয় না।

.

প্যাথোলজিস্টের রিপোর্টটা জটিল পরিভাষার সাহায্যে লেখা, তাই প্রথমে একবার পড়ে নিয়ে সহজ করে পরিবেশন করছে পাধানি। মৃত্যুর সময়ঃ মাঝরাত থেকে সকাল ছটা, তেরো তারিখ।

রিভলভিং চেয়ারে দোল খেতে খেতে গুগলি জানতে চাইলেন, পিসমেকার থেকে মাঝরাতে বেরোয় ও, ঠিক?

মাথা ঝাঁকাল পাধানি, ডেস্কের এ-ধারে একটা চেয়ারে সিধে হয়ে বসে আছে। সে। তাই তো বলছে ওরা। কিন্তু রেডসানে পৌঁছায়নি সে। পিসমেকার থেকে ওখানেই তার যাবার কথা ছিল।

পড়।

মৃত্যুর কারণঃ বুলেট ঢুকে ব্রেন ছাতু করে দিয়েছে। গুলি করা হয় ডান। চোখের ওপর পিস্তল ঠেকিয়ে। চোখের চারপাশে গানপাউডারের দাগ ছিল। মাথার পিছন দিকে বড় একটা গর্ত করে বেরিয়ে গেছে বুলেট, তারমানে বড় ক্যালিবারের। নরম নাকের বুলেট ছিল ওটা।

হাতের কথা কি লিখেছে? আগ্রহের সঙ্গে জিজ্ঞেস করলেন গুগলি।

ধারাল, কিংবা উঁচাল কিছু হাতের উল্টো পিঠে গাঁথা হয়, সেটা তালু ফুটো করে অপরদিকে বেরোয়। কাঠের সূক্ষ্ম গুড়ো পাওয়া গেছে তালুতে, সম্ভবত সমতল কোন টেবিলে চেপে ধরা হয়েছিল হাতটা (কাঠের গুঁড়ো ল্যাবরেটরিতে পাঠানো হয়েছে)। জমাট বাঁধা রক্তের পরিমাণ দেখে আন্দাজ করা যায়, মৃত্যুর দুঘন্টা আগে ফুটো করা হয় হাত।

চেয়ারে হেলান দিলেন গুগলি, ঠোঁটে বিদ্রূপ মেশানো ক্ষীণ একটু হাসি। যীশুর মত ক্রুশ বিধে মরার মধ্যে গৌরব আছে, একটুর জন্যে সেই গৌরব থেকে বঞ্চিত হয়েছে অগাস্টিন।

মুচকি একটু হেসে রিপোর্টের ওপর চোখ বুলাল পাধানি। লাশের হাত-পা, আর মুখে আঠা পাওয়া গেছে, সম্ভবত অ্যাঢেসিভ টেপ লাগানো হয়েছিল। কাগজটা ভাঁজ করল সে।

চোখ বন্ধ করে বসে আছেন গুগলি, গভীর চিন্তায় মগ্ন। মন্তব্য শোনার জন্যে ধৈর্য ধরে অপেক্ষা করছে পাধানি।

পিসমেকার ছেড়ে বেরুবার পরপরই অগাস্টিনকে তুলে নিয়ে যাওয়া হয়, বললেন গুগলি। নির্জন কোথাও নিয়ে গিয়ে চেয়ারে বসিয়ে টেপ দিয়ে আটকানো হয় হাত-পা। নিশ্চয়ই কিছু প্রশ্ন করা হয় তাকে, জবাবে সন্তুষ্ট না হয়ে হেঁদা করা হয় তার হাত। সব কথা আদায়ের পর ওরা তাকে গুলি করে, তারপর লাশটা ডোবায় ফেলে চলে যায়।

মন দিয়ে শুনছে পাধানি।

ঝুঁকে ডেস্কের ওপর থেকে একটা ফাইল টেনে নিয়ে খুললেন গুগলি, চোখ। বুলালেন কাগজে। সেন্ট্রাল স্টেশনের কাছে আজ বেলা দুটোয় অগাস্টিনের। ল্যানসিয়া পাওয়া গেছে, তাতে গুরুত্বপূর্ণ কিছু ছিল না, শুধু একটা ওয়ার্নিং সিস্টেম বাদে।

ভুরু প্রায় কুঁচকে উঠল পাধানির। ওয়ার্নিং সিস্টেম, স্যার?

জাপানি পুতুলটার কথা বলছি। ওটা একটা স্প্রিং লাগানো পুতুল, গাড়িতে কেউ চড়লে ঘন ঘন ওপর-নিচে দোলার কথা। ক্লাবে বেশিক্ষণ ছিল না অগাস্টিন, কাজেই যখন বেরিয়ে এল, তখনও একআধটু দুলছিল পুতুলটা। আততায়ী মাত্র। কিছুক্ষণ আগে উঠেছিল তার গাড়িতে।।

কিন্তু অগাস্টিন পুতুলের দোল খাওয়া লক্ষ করেনি…

ভুলের খেসারত কিভাবে দিয়েছে দেখলেই তো। মাফিয়া সদস্যরা। টেলিফোনে কে কি আলাপ করেছে জানার জন্যে আরেকটা ফাইল খুললেন গুগলি। বেশি কিছু আশা করেন না তিনি, কারণ ফোনে আড়িপাতা যন্ত্র ফিট করা গোটা দেশেই আজকাল অতি সাধারণ একটা ব্যাপার হয়ে দাঁড়িয়েছে, ফলে যাদের ফোনে জিনিসটা ফিট করা হয় তারাও ব্যাপারটা জেনে ফেলে।

ফাইলের কাগজে চোখ বুলাচ্ছেন গুগলি, পাধানি মৃদু কণ্ঠে বলল, তেমন কিছু নেই–আজ সকালে শুধু অগাস্টিনের খোঁজে ওরা সবাই সবাইকে ফোন করতে শুরু করে।

ফাইলটা বন্ধ করে রেখে দিলেন গুগলি। একটাই সম্ভাবনা দেখতে পাচ্ছি ইউনিয়ন কর্স। ড্রাগসের চালান নিয়ে ওদের সঙ্গে ফনটেলার একটা গোলমাল বেধেছিল। হুমকি-ধামকি দিয়ে ফনটেলা ওদেরকে চুপ করে যেতে বাধ্য করলেও, রাগ পুষে রেখেছিল ওরা। সুযোগ পেয়ে ছোবল দিয়েছে। এ যদি সত্যি হয়, খুন এখন একটার পর একটা ঘটতেই থাকবে, আর ঘটবে নির্দিষ্ট একটা প্যাটার্ন নিয়ে। গ্রুপের খুদে একটা খুঁটিকে তুলে নিয়ে গিয়ে বড়গুলোর গতিবিধি সম্পর্কে তথ্য আদায় করেছে ওরা। যে-কোন মুহূর্তে ব্যাপক হামলা শুরু হয়ে যেতে পারে।

পাধানি কিছু বলতে যাবে, তাকে বাধা দিলেন গুগলি। কিন্তু একটা জিনিস মিলছে না, পাধানি। চোখে গুলি করল কেন? এ তো ব্যক্তিগত আক্রোশের পরিচয়। ওই চোখ দিয়ে অগাস্টিন কিছু দেখেছিল, তার এই দেখাটা যেন পছন্দ করেনি খুনী। উঁহু, এর সঙ্গে ইউনিয়ন কর্সের সম্পর্ক আছে বলে মনে হয় না…।

ব্যক্তিগত শত্রুতার জের বলছেন? সংশয় প্রকাশ করল পাধানি। কিন্তু সার্ভেইল্যান্স রিপোর্ট হল, আজ সকাল থেকে ফনটেলা আর তার লোকেরা সাংঘাতিক সতর্ক হয়ে গেছে। প্রত্যেকের জন্যে আরও বেশি করে বডিগার্ড, আস্তানাগুলোয় কড়া পাহারা, বাইরে কেউ এক রকম বেরুচ্ছেই না…।

হ্যাঁ। চিন্তিত দেখাল কর্নেলকে। এ-সব লক্ষণ দেখে বোঝা যায়, ইউনিয়ন কর্সকেই ভয় পাচ্ছে ওরা। দ্রুত সিদ্ধান্ত নিলেন তিনি। মশিয়ে দ্য জিলাম্বুকে ফোনে পাওয়া যায় কিনা দেখ দেখি।

ইটালিতে যেমন মাফিয়া, ফ্রান্সে তেমনি ইউনিয়ন কর্স। ইউনিয়ন কর্সের প্রধান ঘাঁটি মার্সেলেসে। কর্নেল গুগলির মত একই পদমর্যাদার পুলিস অফিসার দ্য জিলাম্বু দক্ষিণ ফ্রান্সে কাজ করেন। দুজনের মধ্যে ভাল সম্পর্ক রয়েছে, অনেকদিন থেকে পরস্পরকে সাহায্য-সহযোগিতা দিয়ে আসছেন। বেশ কয়েকটা কনফারেন্সে দেখা-সাক্ষাৎও হয়েছে ওদের।

কিন্তু দ্য জিলাম্বু কোন সাহায্য করতে পারলেন না। কিছুই শোনেননি তিনি। তবে বললেন, এর পিছনে যদি ইউনিয়ন কর্স থাকে, তারা সম্ভবত কর্সিকা থেকে গানম্যান ভাড়া করেছে। প্রতিশ্রুতি দিয়ে বললেন, তিনি সজাগ থাকবেন, কিছু টের পেলেই সঙ্গে সঙ্গে জানাবেন কর্নেলকে।

.

এ ইউনিয়ন কর্স না হয়েই যায় না, ডন বাকালার গম্ভীর, কর্কশ গলা গমগম করে উঠল।

পালার্মোয় আতুনি বেরলিংগারের সঙ্গে বৈঠকে বসেছে ডন বাকালা। রোম থেকে এইমাত্র এসে পৌচেছে বেরলিংগার। ডন বাকলার স্টাডিরূমে তার দুজন প্রধান উপদেষ্টাও রয়েছে, ট্যানডন আর বোরিগিয়ানো। ডন আতুনি বেরলিংগারকে একটু চিন্তিত আর আড়ষ্ট দেখাচ্ছে–কারণ, মিলান সরাসরি তার নিয়ন্ত্রণে রয়েছে, ওখানে কিছু ঘটলে সব দায়-দায়িত্ব তাকেই বহন করতে হবে।

কিছুদিন থেকে একের পর এক ভুল করে যাচ্ছে ফনটেলা, বলল সে। আমি তাকে বলেছি,-ড্রাগস স্মাগলিঙের ব্যাপারটায় ফরাসীদের ঠকানো বোকামি হয়ে গেছে তার। ওকে নিয়ে মুশকিল হল, মাঝে-মধ্যে অতি চালাক হয়ে ওঠে। ওটাই শেষ শিপমেন্ট ছিল, এরপর ব্যাংকক থেকে ড্রাগস আনার ব্যবস্থা হবে, মোটা একটা দাও মারার সুযোগটা তাই ছাড়েনি।

ট্যানডন মন্তব্য করল, কোন কাজই সুষ্ঠভাবে করতে পারছে না। কিডন্যাপিঙের ঘটনাটা ভাবুন একবার। একে একে সবার দিকে তাকাল সে। নিশ্চয়ই মনে আছে আপনাদের–আভান্তি পরিবারের মেয়েটার কথা বলছি। তাকে, রাস্তা থেকে তুলে আনার সময়ই গোটা ব্যাপারটা লেজেগোবরে হয়ে গেল। তারপর, কি অন্যায়, গাড়ির ভেতর মারা গেল মেয়েটা। সাধারণ মানুষ এধরনের ঘটনা খুব খারাপভাবে নিচ্ছে। ঘটনাটার পর চারদিক থেকে চাপ আসতে শুরু করে।

এবার বোরিগিয়ানোর পালা। হ্যাঁ, বিশেষ করে ওই কাজটা সুষ্ঠুভাবে সারা উচিত ছিল। আর, যারা দায়ী, দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি হওয়া উচিত ছিল তাদের। ওদের একজন ফনটেলার ভাগ্নে, তাই সে কোনরকম শাস্তি না দিয়ে শুধু টাকার ভাগ থেকে বঞ্চিত করল ওদের। চেহারায় বিষাদ নিয়ে মাথা নাড়ল সে। ব্যবসার মধ্যে শৃংখলা না থাকলে চলে কি করে! আমার মনে হয় ফনটেলা বোধহয় নরম হয়ে পড়েছে।

বেরলিংগার মাথা ঝাঁকাল। ওই কাজটায় অগাস্টিনও ছিল। সত্যি কথা বলতে কি, ওটা ছিল একটা বোকা পাঠা।

সবাই যে যার কথা শেষ করে এবার ডন বাকালার দিকে ফিরল, উনি এখন কি বলেন। ডন বাকালা মানুষটা মাঝারি গড়নের, কিন্তু ধড়টা চওড়া আর নিরেট। বুলেট আকৃতির মাথায় ছোট করে ছাটা কাঁচাপাকা চুল। এই মুহূর্তে তার চেহারায় কোন ভাব নেই। ভারি, কর্কশ কণ্ঠস্বর, কিন্তু শান্ত। নির্দেশ দেয়ার সময় কখনও তাকে উত্তেজিত হতে দেখা যায় না।

ট্যানডন, তুমি যদি ফ্রান্সে গিয়ে বেলোরির সাথে কথা বল, আমি খুশি হব। এটা যদি ওরা শুরু করে থাকে, আমি চাই ওদের সাথে তুমি একটা সমঝোতায় আসবে। ব্যাখ্যা করে বলবে, লোক ঠকানর ব্যবসায়ে আমরা নেই। ফনটেলা যদি কোন অন্যায় করেই থাকে, ক্ষতিপূরণ দিতে বাধ্য করা হবে তাকে। হঠাৎ একটু তীক্ষ্ণ হল তার কণ্ঠস্বর, কিন্তু ক্ষমা চাইবে না। বুঝিয়ে দেবে আপস করতে চাইছি ভয়ে নয়, আমরা সম্মানিত লোক বলে, আর ব্যবসায় কারচুপি পছন্দ করি না বলে।

কালই আমি রওনা দেব, রোম হয়ে, বলল ট্যানডন।

কিন্তু নেতাদের নেতা মাথা নাড়ল। না। দুতিন দিন অপেক্ষা করে। ওরা যেন ভেবে না বসে গোলমাল শুরু হতে না হতেই নাভসি হয়ে পড়েছি আমরা।

বোরিগিয়ানোর দিকে ফিরল বাকালা। মিলানে গিয়ে ফনটেলার সাথে কথা বল তুমি। তাকে বলবে, আমরা অসন্তুষ্ট। ভবিষ্যতে যেন তার কাজে বিশৃঙ্খলা না দেখি। আর, বেলোরিকে তার ক্ষতিপূরণ দিতে হবে।

বাকালা এবার বেরলিংগারের দিকে ফিরল। সিনর, আমি জানি, ফনটেলা আপনার সরাসরি নিয়ন্ত্রণে রয়েছে। তবু অন্তত এই ব্যাপারে ধমকটা তার আমার কাছ থেকেই পাওয়া দরকার।

সায় দিয়ে সামান্য একটু মাথা দোলাল বেরলিংগার।

বাকালা আবার ট্যানডনের দিকে ফিরল। কাজটা তুমি গোপনে সারবে। আমি চাই না গামবেরি জানুক ফনটেলা এখন আর আমাদের গুড বুকে নেই। জানলে তার মাথায় হয়ত কুবুদ্ধি গজাবে। তাছাড়া, সব মিলিয়ে মিলানের পরিস্থিতি ভালই। কথা শেষ করে বেরলিংগারের দিকে তাকাল, সমর্থন জানিয়ে আবার সামান্য একটু মাথা দোলাল বেরলিংগার।

বলল, পরস্পরের ব্যাপারে ওরা নাক গলায় না, সেজন্যেই মিলানের পরিস্থিতি শান্ত রয়েছে সেটা নষ্ট করা ঠিক হবে না।

বৈঠকের ফলাফলে ডন বাকালা খুশি। উঠে গিয়ে কর্কটেল কেবিনেটের সামনে দাঁড়াল সে। নিজের হাতে সবাইকে স্কচ হুইস্কি পরিবেশন করল। মার্টিনি হলে ভাল হত, ভাবল বেরলিংগার। কিন্তু ডন বাকালা তার গ্লাসে বিষ ঢেলে। দিলেও হাসিমুখে সেটুকু তার গিলতে হবে।

.

নেপলস, শনিবার সকাল। টেরেসে বসে কফি খাচ্ছে রেমারিক। দরজা খোলার আওয়াজ পেয়ে ঘাড় ফেরাল সে, দেখল, খবরের কাগজ নিয়ে এগিয়ে আসছে ফুরেলা। টেবিলের ওপর কাগজটা রাখল ছেলেটা, আঙুল দিয়ে একটা খবরের দিকে রেমারিকের দৃষ্টি আকর্ষণ করল। অগাস্টিন নামে এক লোক খুন হয়েছে, গুলি করে মারা হয়েছে তাকে। ধারণা করা হচ্ছে, অর্গানাইজড ক্রাইমের সঙ্গে জড়িত ছিল লোকটা। মাত্র এই কলাইনের খবর। খুন-খারাবির শহর মিলান, দুএকজন খুন হলে কাগজগুলো তেমন গুরুত্ব দেয় না। পড়া শেষ করে মুখ তুলল রেমারিক, বলল, তারমানে ব্যাপারটা শুরু হয়েছে। জিনিস-পত্র সব গুছিয়ে রাখ, কাল তুমি গোজোয় চলে যাচ্ছ।

.

০৬.

দুবার গড়ান দিয়ে বিছানা থেকে নেমে দাঁড়াল সিনেল এলি, মাথার ওপর হাত তুলে আড়মোড়া ভাঙল। বেডসাইড টেবিল থেকে হাতঘড়ি নিয়ে ডায়ালে চোখ বুলাল–মাত্র দশটা বেজেছে। ন্যাংটো অবস্থাতেই জানালার সামনে গিয়ে দাঁড়াল সে। পর্দা সরিয়ে নিচের অন্ধকার রাস্তায় তাকাল। তার কালো আলফা রোমিও ঠিক নিচেই পার্ক করা রয়েছে, এতটা ওপর থেকে শুধু বারুন-এর ভাঁজ করা কনুই সহ। হাতের, খানিকটা দেখা যায়, ড্রাইভারের জানালা দিয়ে বেরিয়ে আছে। সন্তুষ্ট হয়ে পর্দা ছেড়ে দিল সে, জানালার দিকে পিছন ফিরল। বিছানায় শুয়ে তার দিকে তাকিয়ে আছে মেয়েটা। চোখাচোখি হতে জিভের ডগা সামান্য একটু বের করে। এদিক-ওদিক নাড়াল এলি।

কেমন লাগছে, লক্ষ্মী সোনা? আদুরে গলায় জিজ্ঞেস করল সে। তোমাকে খুশি করতে পেরেছি তো?

যাহ, অসভ্য! লালচে হয়ে উঠে বলল মেয়েটা, এলির সুঠাম নগ্ন শরীরের ওপর চোখ। তোমার কি এখুনি না গেলেই নয়? জানতে চাইল সে। বড়জোর এক ঘন্টা, তার বেশি কোন দিন থাক না–একা একা থাকতে কি যে একঘেয়ে। লাগে আমার!

তোমার মত মেয়ে না থাকলে জীবনটা আমার কাছেও একঘেয়ে লাগত, ভাবল এলি। মনে মনে খুশি আর তৃপ্ত সে, আবার একই সঙ্গে একটা অস্বস্তিও বোধ করছে। খুশি এইজন্যে যে এই বয়সেও পনেরো বছরের একটা মেয়েকে সন্তুষ্ট করতে পারে সে। আর অস্বস্তির কারণ হল, এমন ভাব দেখাচ্ছে মেয়েটা যেন তার। ওপর ওর একটা অধিকার জনে গেছে।

কাপড় পরতে শুরু করে এলি ভাবল, কেউ যদি অল্পবয়েসী গার্লফ্রেণ্ড পছন্দ করে, এ-ধরনের ছেলেমানুষি আচরণ মেনে না নিয়ে তার কোন উপায়ও নেই। কাপড় পরে বিছানায় বসল সে, মেয়েটার বুকে হাত দেয়ার জন্যে ঝুঁকল। কিন্তু একটা গড়ান দিয়ে দূরে সরে গেল মেয়েটা। অস্বস্তি আরও একটু বাড়ল এলির।

সুখে থাকলে ভূতে কিলায়, বলল সে। এত সুন্দর একটা জায়গায় রেখেছি। তোমাকে, প্রচুর টাকা দিচ্ছি খরচ করতে–নাকি বেটোলায় ফেরত যেতে চাও?

মেয়েটার কোন জবাব নেই। বিছানা থেকে উঠে ড্রেসিং টেবিলের সামনে দাঁড়াল এলি। চট করে সিদ্ধান্ত নিয়ে ফেলল, এটাকে বাদ দিয়ে নতুন আরেকটা যোগাড় করতে হবে। অর্গানাইজড ক্রাইমের এমন একটা পজিশনে রয়েছে সে, নারীদেহ উপভোগের রাক্ষুসে ক্ষুধা মেটানো তার জন্যে কোন সমস্যাই নয়। মামা। ফনটেলার অনেক রকম ব্যবসা, তার মধ্যে নারী-ব্যবসাটা সে-ই দেখাশোনা করে।

দেশের সব জায়গা থেকে বড় শহরগুলোয় আসে ওরা। আসে টাকা, উজ্জ্বল ভবিষ্যৎ আর উত্তেজনার লোভে। পনেরো থেকে বিশের মধ্যে বয়স ওদের, দুনিয়া সম্পর্কে কোন ধারণাই নেই। এখানে-সেখানে ধাক্কা খেয়ে শেষ পর্যন্ত বোকা। মেয়েগুলো এলি আর তার সহকারীদের খপ্পরে পড়ে। মেয়েগুলোকে ওরা বার, ক্লাব আর ব্রথেলে চাকরি দেয়–সব চাকরির একটাই শর্ত, দেহদান করতে হবে। এই শর্ত সহজে কেউ মেনে নিতে চায় না, কিন্তু পরিস্থিতির চাপে পড়ে সবাইকেই এক সময় মেনে নিতে হয়। এদের মধ্যে থেকে কাউকে মনে ধরলে, সে যদি খুব সুন্দরী আর অল্পবয়েসী হয়, নিজের ব্যবহারের জন্যে তাকে আলাদা করে রাখে এলি। কিছুদিন তাকে নিয়ে মৌজ করে, তারপর বাতিল করে আরেকটা খুঁজে নেয়।

কালই এটাকে মিজানোর হাতে তুলে দেবে সে, ঠিক করল এলি। মিজানো পাকা লোক, হপ্তাখানেকের মধ্যে মেয়েটাকে ড্রাগে আসক্ত করে তুলবে–তখন। অর্গানাইজেশনের ওপর ভরসা না করে আর উপায় থাকবে না সুন্দরীর।

নিজের ওপর সন্তোষ বোধ করল, এলি। ভাবাবেগকে প্রশ্রয় না দিয়ে সিদ্ধান্ত নিতে পারাটা জরুরি। একটা সমস্যা অবশ্য তৈরি হল নতুন একটা মেয়ে। যোগাড় করতে হবে। এবারেরটা আরও কমবয়েসী হলে ভাল হয়। বয়স যত বাড়ছে, ততই আরও অল্প বয়েসী মেয়েদের দিকে ঝুঁকে পড়ছে সে। ওরা যে মেয়েটাকে কিডন্যাপ করেছিল, তার কথা মনে পড়ল..হ্যাঁ, শালা, মেয়ে ছিল বটে একখানা! কচি বলে কাকে! শরীরটা সবে মাত্র টসটসে হতে শুরু করেছিল। দেখ কাণ্ড, ওর কথা ভাবতেই উত্তেজিত হয়ে পড়ছে সে। মুহূর্তের জন্যে ইচ্ছে হল, আবার বিছানায় ওঠে। কিন্তু না, মামা তাকে এগারোটার সময় তৈরি থাকতে বলে। দিয়েছে। পালার্মো থেকে বোরিগিয়ানো এসেছে, নিশ্চয়ই অগাস্টিনের খুন হওয়া নিয়ে আলোচনা করবে। ফরাসীরা খেপেছে, তাদেরকে ঠাণ্ডা করার ব্যাপারটা নিয়েও আলাপ হবে।

বিছানার কিনারায় বসে জুতো পরছে এলি। ইউনিয়ন কর্স-কে নিয়ে ভাবছে। সে। কি যে একটা উটকো ঝামেলায় পড়া গেল! অন্তত কিছুদিন সবাইকে সাবধানে থাকার নির্দেশ দিয়েছে মামা। তারমানে বডিগার্ড ছাড়া চলাফেরা করা যাবে না। সঙ্গে একটা লেজুড় রাখা ভারি অস্বস্তিকর। তবে তার ভাগ্যটা ভাল, বারুন তার ব্যক্তিগত ব্যাপারে আগ্রহ দেখায় না। তাছাড়া, বারুনকে তার বডিগার্ড। হিসেবে পাঠানয় বোঝা গেল, দিনে দিনে তার গুরুত্ব আর মর্যাদা বাড়ছে। আত্মপ্রশংসায় কয়েক মুহূর্ত বুঁদ হয়ে থাকল এলি। তার ধারণা, এই উন্নতির মূলে। রয়েছে তার বুদ্ধি। অগাস্টিনের চেয়ে অনেক বেশি চালাক-চতুর সে। ওটা তো ছিল। এক নাম্বার গবেট আর ভোতা। দুহপ্তা একটা বাড়িতে অগাস্টিনের সঙ্গে আটকা পড়েছিল সে, ঘটনাটা মনে পড়ায় গম্ভীর হয়ে উঠল এলি। লুবনা নামের সেই কচি মেয়েটা ছাড়া একঘেয়েমি দূর করার আর কোন উপকরণ ছিল না।

উঠে দাঁড়িয়ে শোল্ডার হোলস্টার পরল এলি, তাতে পিস্তল ভরল। জ্যাকেট পরার সময় দেখল, মেয়েটা তাকিয়ে আছে তার দিকে।

আবার কখন আসবে তুমি? অভিমানের সুরে জিজ্ঞেস করল মেয়েটা।

বিছানার ওপর ঝুঁকে পড়ে মেয়েটার ঠোঁট আলতোভাবে চুমু খেল এলি। কাল, মুখে হাসি টেনে বলল সে। আজ বেশিক্ষণ থাকতে পারলাম না, কাল তার ক্ষতিপূরণ দেব–বাইরে লাঞ্চ খেতে নিয়ে যাব তোমাকে। তারপর, আমার এক বন্ধুর সঙ্গে পরিচয় করিয়ে দেব।

ছোট অ্যাপার্টমেন্টের দরজা খুলল সে, বেরিয়ে এল ল্যাণ্ডিঙে। ভারি একটা কণ্ঠস্বর শুনল, এলি। ঘুরতে শুরু করল এলি, জ্যাকেটের ভেতর হাত ঢুকিয়ে দিয়েছে। সত্যিই বুদ্ধি রাখে সিনেল এলি। দেখার সঙ্গে সঙ্গে জিনিসটা চিনতে পারল সে–একটা শটগানের কালো ব্যারেল, একেবারে চোখের সামনে। তারপরই সাদা আর হলুদ রঙের রিস্ফোরণ ঘটল।

.

ধৈর্যের বাঁধ ভেঙে পড়ার উপক্রম হয়েছে বার্নাদো গুগলির। অভিনেত্রীর ভাগ্য অস্বাভাবিক ভাল। মেয়েটা খেলে চমৎকার, খেলার সূক্ষ্ম কিছু কলা-কৌশলও জানা আছে তার, এ-সবই তিনি স্বীকার করেন, কিন্তু তার সঙ্গে পাঁচটা খেলার তিনটেতেই জিততে হলে অবশ্যই ভাগ্য দরকার। ছক্কাগুলো নেড়ে সবুজ পশমী আচ্ছাদনের ওপর ফেললেন তিনি, বিড়বিড় করে বললেন, ছক্কা! কিন্তু একটা দুই, আর একটা এক হল। ধেত্তেরি! হতাশায় তার চেহারা কালো হয়ে গেল। চেহারায়। সহানুভূতি নিয়ে তার দিকে তাকিয়ে হাসল মেয়েটা-দক্ষ একজন অভিনেত্রী।

এবার মেয়েটার পালা। দাতে দাঁত চেপে অপেক্ষা করছেন গুগলি। সবগুলোয় জিততে না পারলেও, ছয়টা খেলায় তিনটেয় জিতে সমান সমান তাকে হতেই হবে, তা না হলে ওকে নিয়ে বিছানায় ওঠার প্রশ্নই ওঠে না। অহঙ্কারে ঘা লাগছে, মর্যাদা হুমকির সম্মুখীন হাজার হোক তিনি একজন এক্সপার্ট। চট করে একবার ঘড়ির ওপর চোখ বুলিয়ে নিলেন। প্রায় এগারোটা।

সন্ধেটা কিন্তু শুরু হয়েছিল সুন্দরভাবে। মেয়েটা যখন ঘরে ঢুকল, মনে হচ্ছিল আগুনের লাল শিখা তাকে জড়িয়ে আছে। ড্রেসটা পছন্দ হয় তার–ছোট করে। ছাটা, একটু ঢিলেঢালাভাবে গায়ে ফিট হয়েছে। ছক্কা ফেলার জন্যে যতবার ঝুঁকেছে মেয়েটা, প্রতিবার তার ভরাট স্তনের অনেকটা দেখতে পেয়েছেন তিনি। দেখেছেন, আর মনে মনে অস্থিরতায় ভুগেছেন। এই অস্থিরতার জন্যেই প্রথম দিকের খেলাগুলোয় মন লাগাতে পারেননি।

রান্নাবান্না আগেই সেরে রেখেছিলেন। কচি ভেড়ার মাংসের সঙ্গে ডিম আর। লেমন সস। শ্যাম্পেন আর হুইস্কি। ভোজন পর্ব শেষ হয়, স্বভাবতই জিলাটো ডি। টুটি ফুটি দিয়ে। তার হাতের রান্না খেয়ে এক কথায় মুগ্ধ হয় তরুণী অভিনেত্রী। তার ভাব দেখে গুগলি উপলব্ধি করেন, এরপর শুধু যদি তিনি ব্যাকগ্যামন খেলায় জিততে পারেন তাহলেই কেল্লা ফতে, ওকে বিছানায় ভোলা কোন সমস্যাই হবে না।

তার পালসের গতি বেড়ে গেল। ছয় দরকার ছিল মেয়েটার, কিন্তু ছক্কায় দেখা যাচ্ছে তিন আর এক। এখন শুধু যদি তার একটা ছয় পড়ে, জেতার সম্ভাবনা। শতকরা আশি ভাগ। আর এবার জিততে পারলে, দশ মিনিট লাগবে ওকে বিছানায় তুলতে…

অনেকক্ষণ ধরে নেড়ে ছক্কা ছুঁড়লেন তিনি। ছক্কা! উল্লাসে চেঁচিয়ে উঠলেন। কিন্তু তার চিৎকার চাপা পড়ে গেল টেলিফোনের কর্কশ আওয়াজে।

.

আলফা রোমিওর পাশে দাঁড়িয়ে আছে পাধানি। সামনেই একটা পুলিস ভ্যান, জেনারেটার সহ। গোটা দৃশ্যটা ফ্লাডলাইটের আলোয় আলোকিত হয়ে আছে। গাড়ি থেকে নামলেন গুগলি। অত্যন্ত অসন্তুষ্ট দেখাচ্ছে তাঁকে। পনেরো মিনিট আগে যখন তিনি ফোনে কথা বললেন, তখনকার মতই বদরাগী লাগল। পাধানির। সঙ্গে চোখাচোখি হতে হুম করে একটা শব্দ করলেন, যেন সবকিছুর জন্যে পাধানিই দায়ী।

গাড়ির ভেতর উঁকি দিলেন গুগলি।

বারুন, তাঁর পাশ থেকে পাধানি বলল, এলি ওপরে।

এভাবেই ওকে পাওয়া গেছে? গুগলি জানতে চাইলেন।

না, জবাব দিল পাধানি। হুইলের পিছনে, ড্রাইভিং সিটে বসানো ছিল লাশ, জানালা দিয়ে বেরিয়ে ছিল ভাজ করা কনুই। টহলে এসে একজন পুলিস তাকে গাড়ি থেকে বেরুতে বলে। যখন বেরুল না, লোকটা তখন দরজা খোলে। লাশটা তার গায়ের ওপর ঢলে পড়ে, ইউনিফর্মে রক্ত লেগে যা তা অবস্থা।

আলফা রোমিওর ভেতর আবার তাকালেন গুগলি। সামনের সিটের ওপর। পড়ে আছে লাশ, ওদিকের দরজায় ঠেকে রয়েছে মাথা। সিট, ড্যাশবোর্ড আর মেঝেতে রক্ত দেখা যাচ্ছে। বারুনের চিবুকের নিচে, গলায়, বিশাল একটা গর্ত, সেটা থেকে এখনও একটু একটু রক্ত ঝরছে।

চোখ-মুখ বিকৃত করে ঘুরে দাঁড়ালেন গুগলি। কি করুণ মৃত্যু, অথচ এ ধরনের মৃত্যু এদের প্রাপ্য নয় সে-কথা বলা যাবে না। চল, ওপরে যাই।

একপাশে দাঁড়িয়ে আছে একজন ফিঙ্গারপ্রিন্ট এক্সপার্ট, তাকে আবার কাজ শুরু করার ইঙ্গিত দিয়ে বসের পিছু নিল পাধানি।

তিন তলার ল্যাণ্ডিঙে চিৎ হয়ে পড়ে রয়েছে এলি। একটা তোয়ালে দিয়ে তার কাধ আর মাথা ঢেকে রাখা হয়েছে, এক সময় তোয়ালেটা সাদা ছিল। পুলিস। বিভাগের ফটোগ্রাফার তার ক্যামেরা খাপে ভরে ঘুরে দাঁড়াল।

অ্যাপার্টমেন্টের দরজা খোলা, ল্যাণ্ডিং থেকে বেডরূমে দৃষ্টি চলে। বিছানায়, একটা মেয়েকে বসে থাকতে দেখলেন গুগলি। মেয়েটার পরনে কিছু আছে বলে মনে হল না, গাঁয়ে শুধু একটা চাদর জড়ানো। তার পাশে বসে একজন পুলিস। নোটবুকে কি যেন লিখছে। লেখার ফাঁকে ফাঁকে চাঁদরের ফাঁক দিয়ে ভেতরে তাকাচ্ছে সে, তবে কারও চোখে ধরা পড়ে যাওয়ার ভয়ে খুব সাবধান।

মেয়েটাকে দেখিয়ে পাধানি বলল, গার্লফ্রেণ্ডের সাথে সময় কাটিয়ে বেরিয়ে যাচ্ছিল এলি।

বিড়বিড় করে গুগলি বললেন, তাহলে তো বলতে হয় আমার চেয়ে ভাগ্যবান। ও। ঝুঁকে তোয়ালের একটা কোণ তুললেন তিনি। তা বোধহয় না, আবার অস্কুটে বললেন, ছেড়ে দিলেন তোয়ালের কোণ। এলির ক্ষতবিক্ষত চেহারা দেখে মাথার ভেতরটা ঝা ঝা করে উঠল।

শটগান, বলল পাধানি। একেবারে কাছ থেকে।

মাথা ঝাঁকালেন গুগলি, রক্ত-লাল তোয়ালের দিকে তাকিয়ে আছেন। ক্ষীণ। একটু হাসির রেখা ফুটে উঠল তার ঠোঁটে। প্যাথোলজিস্টের রিপোর্টে কি লেখা হবে বুঝতে পারছি–ম্যাসিভ ব্রেন ড্যামেজ…ঘাড় ফিরিয়ে একবার বেডরূমের দিকে তাকালেন তিনি। কি জান তুমি?

যা জানে, সব বলে গেল পাধানি। এই অ্যাপার্টমেন্ট ছিল এলির-প্রেম নিকেতন। অ্যাপার্টমেন্টটা অনেক দিন থেকে ভাড়া নিয়ে রেখেছিল এলি, কিন্তু মেয়ে বদল হত ঘন ঘন। এখানে সে প্রায় রোজ রাতেই একবার করে আসত। কিছুদিন হল, অগাস্টিন খুন হবার পর থেকে, বারুনকে বডিগার্ড হিসেবে নিয়ে। আসত, তার জন্যে গাড়িতে অপেক্ষা করত বারুন। বারুনের গলা এদিক থেকে ওদিক পর্যন্ত কেটে ফেলে খুনী, তারপর লাশটাকে ড্রাইভিং সিটের ওপর খাড়া করে বসিয়ে দেয়। রাস্তাটা ওখানে অন্ধকার, পথিকরা গাড়ির দিকে তাকালেও কিছু বুঝতে পারার কথা নয়। বারুনকে খুন করে এখানে উঠে আসে খুনী, এলির জন্যে অপেক্ষায় থাকে। লোকটা সম্ভবত ঢোলা একটা কোট পরে ছিল, শটগানটা তারই নিচে লুকানো ছিল। এলি দরজা খুলে বেরিয়ে আসতেই তার মুখের ওপর দুটো ব্যারেল বিস্ফোরিত হয়।

মেয়েটা কিছু দেখেনি? জানতে চাইলেন গুগলি।

না, বলল পাধানি। বয়স একেবারেই কম, কিন্তু খুব একটা বোকা নয়। বিস্ফোরণের আওয়াজ শোনা মাত্র বালিশের তলায় মুখ লুকিয়েছিল, পুলিস না। আসা পর্যন্ত ওভাবেই শুয়েছিল। ওপরতলার দিকে একটা আঙুল তাক করল সে। আওয়াজ শুনে চারতলা থেকে এক মহিলা নেমে এসেছিলেন, ল্যাণ্ডিঙে এলিকে ৬ পড়ে থাকতে দেখে চিৎকার জুড়ে দেন। স্বাভাবিক। মাথার অর্ধেকটাই উড়ে গেছে এলির। এই তো মাত্র মিনিট কয়েক আগে মহিলার চিৎকার থেমেছে। আমাদের কে যেন আছে তার সঙ্গে, শান্ত করার পর একটা জবানবন্দি নেবে।

ব্যাপারটা ইন্টারেস্টিং, মন্তব্য করলেন গুগলি।

জ্বী?

একটু আগে তুমি একবচন ব্যবহার করে বললে-খুনী একজন কেন? দুজন, বা আরও বেশি লোক নয় কেন?

কাধ ঝাঁকাল পাধানি। কি জানি এ স্রেফ আমার একটা অনুভূতি। কেন যেন মনে হচ্ছে, অগাস্টিন, আর এদের দুজনকে একই লোক খুন করেছে।

স্রেফ অনুভূতি, কিন্তু অত্যন্ত যুক্তিসঙ্গত, বলে খোলা দরজা দিয়ে অ্যাপার্ট মেন্টের ভেতর ঢুকলেন গুগলি। তরুণ পুলিস তাকে আসতে দেখে উঠে দাঁড়াল, এগিয়ে এসে থামল তার সামনে, নোটবুকে চোখ রেখে পড়তে শুরু করল।

পাননা বেলি, বয়স পনেরো, বেটোলা থেকে এসেছে–সম্ভবত বাড়ি থেকে পালিয়ে। ছয় হপ্তা আগের হারানো বিজ্ঞপ্তিতে নামটা থাকতে পারে, এলির সঙ্গে তখন থেকেই ছিল ও।

মেয়েটার দিকে তাকালেন গুগলি। ভাজ করা হাঁটুর ওপর চিবুক ঠেকিয়ে বিছানায় বসে আছে, চেহারায় সন্ত্রস্ত একটা ভাব। ওকে বল জিনিস-পত্র গুছিয়ে নিয়ে তৈরি হোক, হেডকোয়ার্টারে যেতে হবে। ওর সম্পর্কে আরও জান, তারপর ওকে হারানো মেয়েদের বিভাগে পাঠিয়ে দাও। মিলানে যতদিন থাকবে, চব্বিশ ঘন্টা প্রোটেকশন দিতে হবে ওকে।

বেডরূম থেকে বেরিয়ে এলেন গুগলি, তার পিছনে বন্ধ হয়ে গেল দরজাটা। কি মনে করে আবার তিনি বেডরুমের দরজা ঠেলে ভেতরে উঁকি দিলেন, তরুণ পুলিস লোকটাকে শুকনো গলায় বললেন, তুমি বরং বাইরে দাঁড়িয়ে ওর জন্যে অপেক্ষা কর। হতাশ তরুণ মুখ কালো করে বেরিয়ে এল বাইরে।

পাধানি তার পাশে এসে দাঁড়াল। মনে হয় পুরোদস্তুর একটা যুদ্ধ শুরু হতে যাচ্ছে।

মাথা ঝাঁকালেন গুগলি, অন্যমনস্ক। ইউনিয়ন কর্স–শটগান আর ছুরি ওদের প্রিয় অস্ত্র। তবু একটা কিন্তু থেকেই যায়।

কিন্তু, স্যার?

এরকম হবার কথা নয়। বড় বেশি রিয়্যাক্ট করছে ওরা। যতটা না উদ্বিগ্ন তারচেয়ে বেশি বিমূঢ় দেখাল তাকে। চারদিক থেকে হামলা শুরু হয়ে গেলে অবস্থা কি দাঁড়াবে ভাবতেও ভয় হয়। এলির লাশের দিকে তাকালেন তিনি। ওকে কোথায় পাওয়া যাবে অগাস্টিনের কাছ থেকে জেনে নিয়েছিল ওরা। ভাবছি। আর কি জেনেছে…।

যা জানতে চেয়েছে সবই গড়গড় করে বলে গেছে…।

আমার হাতে পেরেক গাঁথলে আমিও বলতাম। একটা দীর্ঘশ্বাস ফেললেন গুগলি। কিন্তু ওদের প্রশ্নগুলো কী ছিল?

এলির লাশ প্রাস্টিক ব্যাগে ভরা হল, দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে দেখল ওরা। তারপর ঘুরে দাঁড়ালেন গুগলি, কাঁধের ওপর দিয়ে বললেন, অফিসে এসো, অনেক কাজ।

.

এবার খবরের কাগজগুলো আগ্রহী হয়ে উঠল। বাহাত্তর ঘন্টার মধ্যে তিনটে খুন, গুরুত্ব না দিয়ে আর পারা যায় না। বার এবং বিছানা থেকে ডেকে নেয়া হল ক্রাইম রিপোর্টারদের, ঘটনা সম্পর্কে বিস্তারিত তথ্য যোগাড় করে রিপোর্ট তৈরির নির্দেশ পেল তারা। সবাই অন্ধকারে রয়েছে, কাজেই সবচেয়ে সহজ সিদ্ধান্তে পৌঁছুল খুনগুলোর জন্যে ইউনিয়ন কর্সই দায়ী। পরদিন সকালের কাগজগুলোয় বড় বড় হেডিংয়ে ছাপা হল, ইটালিয়ান মাফিয়া চক্রের সঙ্গে ফ্রেঞ্চ ইউনিয়ন কর্সের যুদ্ধ শুরু হতে যাচ্ছে। আন্তর্জাতিক অপরাধের নিন্দা করা হল। সম্পাদকীয়তে লেখা। হল, আইন শৃংখলা পরিস্থিতির এই অবনতি মেনে নেয়া যায় না।

ওপরমহল থেকে বার্নাদো গুগলির ওপর চাপ আসতে শুরু করল। জেনারেল, তার বস, বললেন, কিছু একটা করা দরকার। ইটালিয়ান ক্রিমিন্যালরা নিজেদের মধ্যে মারামারি করবে, সেটা যথেষ্ট খারাপ; কিন্তু অন্য দেশের লোকেরা এসে ওদেরকে মেরে রেখে যাবে, এ অত্যন্ত মর্যাদা হানিকর।

গোজোয়ও পৌঁছুল খবরটা। বিশালদেহী বিদ্রোহী হাতে একটা কাগজ নিয়ে রুচিতাস-এ ঢুকল। কিন্তু, ক্ষতি কি, গুফো, অক্লান্ত, হাজির–ওরা সবাই রয়েছে। বারে। ওদেরকে ইঙ্গিতে কাছে ডাকল বিদ্রোহী। সবাই এক জায়গায় জড়ো হতে হাতের কাগজটার ভাঁজ খুলে টেবিলের ওপর ফেলল সে। হুমড়ি খেয়ে পড়ল সবাই।

তারপর জল্পনাকল্পনা শুরু হল। এখানেই কি এর সমাপ্তি? প্রতিশোধ সম্পূর্ণ। হয়েছে হাসানের?

নেপলসে রেমারিক, আর মার্সেলেসে গগলও খবরটা পড়ল। ওরা জানে, মাত্র শুরু করেছে রানা।

.

উদ্বিগ্ন তো বটেই, প্রচণ্ড রেগেও আছে হিনো ফনটেলা। উদ্বিগ্ন এই জন্যে যে তার লোকদের মেরে ফেলা হয়েছে। আর রেগে গেছে ডন কালার ধমক খেয়ে। গোটা ব্যাপারটা তার মনে গভীর বিতৃষ্ণার জন্ম দিয়েছে। ডন বাকালাকে কোনদিনই পছন্দ হয়নি তার। লোকটা নেতাদের নেতা হলে কি হবে, মাফিয়া সাম্রাজ্যের ভালমন্দে তার তেমন কোন গুরুত্বপূর্ণ অবদান বা ত্যাগ নেই। পালার্মোর কাছে। নিজের ভিলায় বসে থাকে, কালেভদ্রে বের হয় কি হয় না, কোন রকম বিপদের ভাগিদার হতে রাজি নয় সে, কিন্তু সব কিছু থেকে লাভের ভাগিদার হওয়া তার। চাই-ই। ফনটেলা ভাবল, বেজন্মা রাজনীতিকদের সঙ্গে ওই হারামজাদার কোন পার্থক্যই নেই।

গাড়িতে বসে দাঁতে দাঁত চাপল ফনটেলা, ট্যানডনের মেসেজটা মনে পড়ে গেছে আমরা তোমার প্রতি অসন্তুষ্ট। বেজন্মা, বুড়ো শিয়াল, মনে মনে গাল। পাড়ল সে। বাকলার সঙ্গে বেরলিংগারের খাতির রয়েছে, তা না হলে কড়া একটা পাল্টা জবাব দিত সে। মুশকিল হল, কূটনীতির চাল চেলে ইটালির প্রায় সবগুলো মাফিয়া পরিবারকে হাত করে রেখেছে বাকালা। তার বিরুদ্ধে কথা বললে কারও সমর্থন পাওয়া যাবে না। শালা বানচোত সত্যিকার একজন পলিটিশিয়ান।

বুধবারের রাত, বিয়ানকো গ্রামে যাচ্ছে ফনটেলা, মায়ের সঙ্গে বসে ডিনার খাবে। মায়ের সুপুত্র সে, বুধবার রাতে মাকে একবার দেখতে যাবেই। কোন কারণে যদি যেতে না পারে, আরেক বুধবার পর্যন্ত অপরাধ বোধে জর্জরিত হয়। না গেলে মা-ও খুব রেগে থাকে, আর মা রেগে গেলে ফনটেলার মত লোকও তাকে সামলাতে পারে না।

সতর্কতা অবলম্বনে কোন খুঁত রাখা হয়নি, অন্তত ফনটেলার সেই রকমই। ধারণা। তার গাড়ির সামনে আর পিছনে বডিগার্ড ভর্তি আরও দুটো গাড়ি রয়েছে। ওরা সবাই সশস্ত্র, জানে, যে-কোন মুহূর্তে যে-কোন দিক থেকে বসের ওপর হামলা হতে পারে।

আর শালার ওই নোংরা ইউনিয়ন কর্স, ভাবল ফনটেলা। সামান্য চল্লিশ মিলিয়ন লিরার শোকে একেবারে উন্মাদ হয়ে উঠেছে। যাই হোক, টাকাটা নিয়ে তার লোক খুব তাড়াতাড়ি মার্সেলেসে যাচ্ছে, ক্ষতিপূরণ দেয়া হয়ে গেলে তাকে আর কোন টেনশনে ভুগতে হবে না।

ঝড়ের বেগে বিয়ানকো গ্রামে ঢুকল কনভয়টা। টেরেস সহ বিশাল বাড়ি, ফনটেলার মা এত বড় বাড়িতে একাই থাকে। তৃপ্তি আর গর্ব অনুভব করল ফনটেলা, মা জননীকে সুখে রেখেছে সে। বুড়ি মার যত্ন নেয়ার জন্যে চার-পাঁচজন চাকরাণী আছে, মার নিজের পছন্দ করা মেয়েলোক তারা, কারও বয়সই পঞ্চাশ পঞ্চান্নর কম নয়। গাড়িগুলো থামতেই লাফ দিয়ে নামল বডিগার্ডরা, রাস্তায় পা ফেলার আগেই জ্যাকেটের ভেতর হাত ঢুকে গেছে। অতি নাটুকে আচরণ, ভাবল ফনটেলা। এমনকি ইউনিয়ন কর্সের ইতর জানোয়ারগুলোও ব্যবসায়িক জটিলতার মধ্যে পরিবারগুলোকে টেনে আনে না।

সবাই এখানে অপেক্ষা কর, নির্দেশ দিল সে, এতগুলো সশস্ত্র বডিগার্ড সঙ্গে নিয়ে মার সঙ্গে দেখা করতে এসে অস্বস্তি বোধ করছে সে। দুঘন্টার বেশি লাগবে না আমার।

লোকটা ছোটখাট, কিন্তু অবাধে চর্বি জমতে দিয়েছে শরীরে, সিঁড়ির ধাপকটা টপকাতে রীতিমত হাঁপিয়ে উঠল সে। করিডর ধরে ধীর পায়ে এগোল, জানে, ছেলেকে একান্তভাবে কাছে পাবার জন্যে চাকরাণীদের ছুটি দিয়ে দিয়েছে মা। প্রতি বুধবারেই তাই দেয়। দরজা খোলাই রয়েছে, কিন্তু কবাট ভিড়ানো।

রাগে কটমট করে তাকাল মা। কিছু বলার চেষ্টা করল না, কারণ তার মুখ। টেপ দিয়ে আটকানো রয়েছে। একটা চেয়ারে বসে রয়েছে বুড়ি, চেয়ারের সাথে টেপ দিয়ে হাত আর পা-ও আটকে রাখা হয়েছে। বয়স্ক এক লোক, চোখে কঠিন। দৃষ্টি নিয়ে, দাঁড়িয়ে রয়েছে চেয়ারের পাশে। লোকটার হাতে একটা শটগান। ব্যারেলটা ছোট, সেটা বুড়ির কাঁধে ঠেকে আছে। আর মাজুল জোড়া বুড়ির বা কান ছুঁয়ে আছে।

একটু শব্দ কর, শান্ত সুরে বলল লোকটা। সাথে সাথে এতিম হয়ে যাবে।

ফনটেলাকে নির্দেশ দেয়া হল, দেয়ালের দিকে মুখ কর, হাত দুটো দুদিকে লম্বা করে দেয়ালে তালু ঠেকাও, পা ফাঁক করে দাঁড়াও। নির্দেশ পালন করল। ফনটেলা। লোকটা এগিয়ে এল, কিন্তু পায়ের আওয়াজ হল না। ফনটেলা ভাবল, কে হতে পারে লোকটা? শটগানের ব্যারেল সজোরে আঘাত করল তার মাথায়, জ্ঞান হারাল সে।

হিসেব করা বাড়ি, খানিক পরই জ্ঞান ফিরে এল ফনটেলার। মাথায় অসহ্য ব্যথা অনুভব করল সে, কিন্তু কাতর শব্দগুলো গলা থেকে বেরুতে পারল না, মুখে টেপ লাগানো রয়েছে। এরপর দুই হাঁটু, আর দুই গোড়ালি এক করে টেপ জড়ানো হল। বাড়ির পিছন দিকটা একবার দেখে এল রানা, ফিরে এসে ডন ফনটেলাকে তুলে নিল কাঁধে।

বাড়ির পিছনে নেই কেউ। অশ্লীল গালিগালাজ করল ফনটেলা–নিজেকে। এমন বোকামি মানুষ করে! অপমান লাগছে তার, রাগ হচ্ছে নিজের ওপর। একজন। মাত্র লোক তাকে কাবু করে ফেলল! সে যেন অবোধ, অসহায় একটা শিশু, কাঁধে। করে তুলে নিয়ে যাচ্ছে!

বাড়ির পিছনে কাঁকর ছড়ানো রাস্তা, রাস্তার ওপর খয়েরি রঙের একটা ভ্যান, পাশের দরজাটা ভোলা। ফনটেলাকে ছুঁড়ে ফেলা হল ভ্যানের ভেতর। আরামখেকো শরীরটা থেতলে গেল। দরজা বন্ধ করল রানা, কোন আওয়াজ হল না। কয়েক সেকেণ্ড পর স্টার্ট না নিয়েই গড়াতে শুরু করল ভ্যান। ফনটেলার মনে পড়ল, ঠিক এখানটা থেকেই ঢালু হয়ে নেমে গেছে রাস্তাটা। অতি নাটুকে দেহরক্ষীদের কথা ভাবল সে। কত কাছে রয়েছে ওরা, কিন্তু কিছুই টের পেল না। নিজেকে অভিশাপ দিল সে। এখন আর রাগ নয়, ভয় হচ্ছে। তার চোখ বাঁধা। হয়নি। ভ্যানের গায়ে লেখাটা দেখেছে সে–বিনো গারবাল্ডি, ভেজিটেবল ডিলার। লেখাটার বিশেষ কোন তাৎপর্য আছে কিনা ধরতে পারেনি সে, তবে লেখাটা। তাকে দেখতে দেয়ায় বুঝতে পারছে, এটা একটা ওয়ান ওয়ে জার্নি; যাচ্ছে, কিন্তু ফিরে আসবে না সে।

অনেকটা দূরে, অনেকটা নিচে নেমে এসে স্টার্ট নিল ভ্যান। এতদূর থেকে দেহরক্ষীরা এঞ্জিনের আওয়াজ শুনতে পাবে না, পেলেও কিছু সন্দেহ করার নেই তাদের। সময় বয়ে চলল। ভ্যান ছুটছে–খুব একটা দ্রুতগতিতে নয়, আবার শম্বুকগতিও বলা চলে না। এখনও গ্রাম এলাকায় রয়েছে ওরা, তবু লোকটা কারও দৃষ্টি আকর্ষণ করতে চায় না।

হাত-পা আড়ষ্ট হয়ে এল ফুনটেলার। তারপর ব্যথা করতে শুরু করল। ভ্যানের মেঝেতে কতক্ষণ পড়ে আছে সে, বলতে পারবে না। মাত্র দুঘন্টা, পেরিয়েছে, অথচ তার মনে হল সকাল হতে আর বেশি দেরি নেই। সারারাত ধরে গাড়ি চালিয়ে কোথায় তাকে নিয়ে যাওয়া হচ্ছে? এখন আর তার হাত-পায়ে ব্যথা নেই, অসাড় হয়ে গেছে। ফনটেলার বুদ্ধি লোপ পায়নি, কিন্তু মাথা ঘামিয়েও উদ্ধারের কোন উপায় দেখতে পাচ্ছে না সে।

এক সময় থামল ভ্যান। বন্ধ হল এঞ্জিন। পাশের দরজা খুলে গেল। খুব শান্তভাবে, এবং সহজ ভঙ্গিতে আবার তাকে কাঁধে তোলা হল। চারদিক অন্ধকার হলেও, আকাশের গায়ে বড় বড় গাছের কাঠামো, সাদা চুনকাম করা ছোট একটা বাংলো দেখতে পেল সে। তাকে কাঁধে নিয়ে দরজার সামনে দাঁড়াল কিডন্যাপার। পায়ের ঠেলা দিয়ে দরজার কবাট খুলল। মেঝেতে নামানো হল তাকে, মোটেও যত্নের সঙ্গে নয়। খুট শব্দের সঙ্গে জ্বলে উঠল আলো। ফনটেলা নড়ল না, শুনতে পেল তার কিডন্যাপার ঘরের ভেতর হাঁটাহাঁটি করছে। কয়েক মিনিট পর পায়ের আওয়াজ এগিয়ে এল, পাজরে লাথি খেয়ে চিৎ হয়ে গেল ফনটেলার শরীর। সিলিঙের দিকে মুখ করে আছে সে, পাশে দাঁড়ানো কিডন্যাপারকে প্রায় সিলিং পর্যন্ত লম্বা বলে মনে হল তার। হাঁটু মুড়ে তার পাশে বসল লোকটা, ফনটেলার পা। থেকে জুতো জোড়া খুলে নিলু। তারপর খুলল হাঁটু আর গোড়ালির টেপ। ইচ্ছে বা শক্তি, কোনটাই অবশিষ্ট নেই, ধস্তাধস্তির চিন্তা বাদ দিয়ে অসাড় পেশী ডলে রক্ত চলাচল সহজ করার চেষ্টা করল সে। পিঠের নিচে টেপ দিয়ে আটকানো হাত দুটো চাপা পড়ে আছে, সারা শরীরে টনটনে ব্যথা। এবার শুধু ভয় নয়, অজানা একটা আতঙ্ক গ্রাস করতে উদ্যত হল তাকে। তার বেল্ট খুলে নিল কিডন্যাপার, চেইন। টেনে ঢিলে করল ট্রাউজার। কিডন্যাপারের একটা হাত তার পিছনে চলে গেল, সামান্য একটু উঁচু করা হল তার শরীর, টেনে কোমর থেকে নামানো হল ট্রাউজার। আর আণ্ডারপ্যান্ট। কিডন্যাপার উঠে দাঁড়াল। আবার একটা লাথি খেয়ে উপুড় হল, ফনটেলা। তার পা দুটো যথাসম্ভব দুদিকে টেনে ফাঁক করা হল। কি ঘটতে যাচ্ছে। কিছুই বুঝতে পারছে না ফনটেলা। তার আতঙ্ক বাড়তেই থাকল। নিতম্বে। কিডন্যাপারের হাতের স্পর্শ পেল সে। দুই নিতম্ব টান দিয়ে ফাঁক করা হচ্ছে। তীক্ষ্ণ একটা ব্যথায় কুঁকড়ে গেল সে, গোঙানির ভেতা আওয়াজ হল গলার ভেতর, পা দুটো মেঝের ওপর ঘন ঘন আছাড় খেতে লাগল।

একটু পরই স্থির হয়ে গেল ফনটেলা। কানের পিছনে ঘুসি খেয়ে জ্ঞান হারিয়েছে সে।

.

আবার জ্ঞান ফিরল ফনটেলার। তীক্ষ্ণ কোন ব্যথা অনুভব করছে না, শুধু আড়ষ্ট একটা ভাব, ভীষণ অস্বস্তিকর।

তার সামনে কাঠের একটা টেবিল। টেবিলের ওপর, ঠিক মাঝখানে নয়, একটু বা দিক ঘেঁষে, খুদে একটা ফুটোকে ঘিরে শুকনো, কালচে দাগ দেখল ফনটেলা। সেই রিপোর্টটা মনে পড়ে গেল–অগাস্টিনের হাতে পেরেক গাঁথা হয়েছিল। শিউরে উঠল সে। দরদর করে ঘামছে। টেবিলের ওদিকে বসা কিডন্যাপারের দিকে তাকাল। লোকটার চেহারায় কোন ভাব নেই, শুধু চোখে কঠিন দৃষ্টি। কিডন্যাপারের সামনে টেবিলের ওপর খোলা নোটবুক ছাড়াও আরও কয়েকটা জিনিস রয়েছে, পুরানো আমলের একটা অ্যালার্ম ঘড়িও দেখা যাচ্ছে।

ঘড়িতে বাজে নয়টা দুই।

আমার কথা শুনতে পাচ্ছ?

অস্বস্তিকর আড়ষ্ট ভাব নিয়ে মাথা দোলাল ফনটেলা। তার হাত আর পা চেয়ারের সঙ্গে বাঁধা থাকলেও, মুখ থেকে খুলে নেয়া হয়েছে টেপ। কিন্তু তবু সে কথা বলল না–বয়স আর অভিজ্ঞতা, দুটোই অগাস্টিনের চেয়ে বেশি তার।

সামনের দিকে ঝুঁকে টেবিল থেকে একটা মেটাল সিলিণ্ডার তুলে নিল কিডন্যাপার, জিনিসটার দুপ্রান্ত ঢালু। প্যাঁচ ঘুরিয়ে সিলিণ্ডারটা খুলল ও, দুই অংশের গভীর গর্ত দুটো ফনটেলাকে দেখাল। এটা একটা চার্জার। সাধারণত কয়েদীরা দামি কিছু জিনিস লুকাবার কাজে ব্যবহার করে টাকা, ড্রাগস, এই সব। শরীরের ভেতর লুকানো থাকে এটা–রেকটামে।

চেয়ারে বসা অবস্থায় আরও একটু কুঁকড়ে ছোট হয়ে গেল ফনটেলা। আড়ষ্ট ভাব..কারণটা মনে পড়ে গেল। খয়েরি রঙের কি যেন একটা হাতে নিল কিডন্যাপার, দেখে মনে হল প্লাস্টিসিন। বলল, প্ল্যাস্টিক-হাই এক্সপ্লোসিভ। জিনিসটা সিলিণ্ডারের এক অংশের গর্তে ভরল সে, আঙুলের চাপ দিয়ে ভাল করে ভেতরে ঢোকাল।

এটা একটা ডিটোনেটর। কিডন্যাপারের হাতে ছোট একটা, গোল, ধাতব বস্তু দেখল ফনটেলা, এক প্রান্ত থেকে একটা সূচ রেরিয়ে আছে। সঁচটা প্লাস্টিকের ভেতর গেঁথে দেয়া হল। আর এটা একটা টাইমার। আরেকটা গোল জিনিস, দুটো কাটা সহ। কাটা দুটো ডিটোনেটরের বাইরের দুই সকেটে ঢোকানো হল, তারপর সিলিণ্ডারের দুই অংশ এক করে প্যাঁচ লাগানো হল।

সিলিণ্ডারটা দুআঙুলে ধরে একটু ওপরে তুলল কিডন্যাপার। এটা আর এখন শুধু একটা চার্জার নয়, বোমাও। খুব ছোট, কিন্তু ভারি শক্তিশালী।

বোকার মত তাকিয়ে আছে ফনটেলা। একবার মনে হল, এসব সত্যি নয়, স্বপ্ন দেখছে। কিন্তু স্বস্তিকর ভুলটা এক সেকেণ্ডও টিকল না। একটা ঢোক গিলল সে, কপাল বেয়ে ঘামের একটা ফোঁটা চোখে পড়ায় মাথা ঝাঁকাল।

বোমাবাজিতে অভিজ্ঞ লোক তুমি, তোমাকে আর নতুন কি শেখাব আমি। বুঝতেই পারছ, জিনিসটা আধুনিক বিজ্ঞানের অবদান। দশ বছর আগে এ-ধরনের একটা বোমার ওজন হত এক কিলোরও বেশি। কিডন্যাপারের ঠাণ্ডা, কঠিন দৃষ্টি ফনটেলার মুখের ওপর যেন গেঁথে আছে। ঠিক এই রকম একটা বোমা পেছন দিয়ে ঢুকিয়ে দিয়েছি তোমার শরীরের ভেতর। সময় বেঁধে দেয়া হয়েছে, দশটার সময় ফাটবে।

ঝট করে অ্যালার্ম ক্লকের দিকে তাকাল ফনটেলা। নটা সাত।

শান্ত সুরে পরিস্থিতি ব্যাখ্যা করল কিডন্যাপার। ফনটেলাকে কিছু প্রশ্নের। উত্তর দিতে হবে। উত্তরগুলো সে যদি সঠিকভাবে দেয়, দশটা বাজার আগে, তাহলে হয়ত বোমাটা শরীর থেকে সরিয়ে ফেলার অনুমতি পাবে সে।

কিন্তু ফনটেলা বুঝল, তাকে মিথ্যে আশ্বাস দেয়া হচ্ছে। শেষ পর্যন্ত তাকে খুন করা হবেই।

কিডন্যাপার আরও বলল, আর সবার মত হয়ত ফনটেলাকে মেরে ফেলা হবে।, তাকে হয়ত ওর পরে অন্য কাজে লাগবে। ফনটেলা বিশ্বাস করল না। অগত্যা, নির্লিপ্ত একটা ভাব দেখিয়ে কাঁধ ঝাঁকাল কিডন্যাপার, চুপ করে বসে। থাকল–যেন তার কোন তাড়া নেই।

অ্যালার্ম ক্লক কিট কিট করছে। ঘন ঘন নিঃশ্বাস ফেলছে ফনটেলা। ঘরে আর কোন শব্দ নেই। পেটের ভেতর মোচড় অনুভব করল সে, ল্যাট্রিনে গিয়ে পেট খালি করতে পারলে ভাল হত। কিন্তু কিডন্যাপারকে বললে লোকটা হাসবে। মোচড়টা বাড়তে বাড়তে এক সময় অসহ্য হয়ে উঠল, শরীরের আর সব ব্যথার কথা মনে থাকছে না। নটা বাইশ মিনিটে মচকাল ফনটেলা। ভেবে দেখেছে, উত্তর দিলে নতুন কিই-বা তার হারাবার আছে।

বল, কি জানতে চাও।

কলমটা তুলে নিয়ে ক্যাপ খুলল কিডন্যাপার। আতুনি বেলিংগার, আর বাকালা সম্পর্কে জানতে চাই আমি। কিন্তু সবচেয়ে আগে জানতে চাই, একজন বুদ্ধিমান লোক হয়ে ওই মেয়েটাকে কিডন্যাপ করতে গেলে কেন তুমি? ওর বাপের হাতে তখন টাকা ছিল না জেনেও?

নটা তিপ্পান্ন মিনিটে উত্তর দেয়া শেষ করল ফনটেলা। কলমে ক্যাপ লাগাল। কিডন্যাপার, নোটবুক তুলে নিয়ে উঠে দাঁড়াল। কয়েক সেকেণ্ড ফনটেলার দিকে তাকিয়ে থাকল সে, তারপর পিছন ফিরে দরজার দিকে এগোল। ফনটেলার ইচ্ছে হল পিছু ডাকে, বলে, আমি তো তোমার সব প্রশ্নেরই উত্তর দিয়েছি, এবার বোমাটা আমাকে বের করতে দাও। কিন্তু অভিজ্ঞ লোক, জানে, শত অনুরোধেও এই লোককে নরম করা যাবে না।

একটু পর ভ্যানের আওয়াজ পেল ফনটেলা। তার আরেকবার মনে হল, এ সব স্বপ্ন। ভ্যানের আওয়াজ ধীরে ধীরে মিলিয়ে গেল দূরে। এখন শুধু অ্যালার্ম ক্লকের টিক টিক শোনা যাচ্ছে।

ফনটেলা চেঁচাল না, বা ধস্তাধস্তি করল না। স্রেফ শক্ত হয়ে বসে থাকল চেয়ারে, একদৃষ্টে তাকিয়ে আছে ডায়ালের দিকে। নটা আটান্ন মিনিটে পাগল হয়ে। গেল ফনটেলা, তার মন আর মাথা কাজ করছে না। কিন্তু বোমাটা ঠিক সময়েই কাজ করল। বিদ্যুৎবেগে সিলিঙের দিকে উঠে গেল ডন ফনটেলা।

রানা তখন ভ্যান নিয়ে অনেক দূরে চলে গেছে, বিস্ফোরণের আওয়াজ ওর কানে পৌঁছল না। তবে হাতঘড়ির দিকে তাকিয়ে কাটায় কাটায় দশটা বাজতে দেখে ঠোঁটের কোণে ক্ষীণ একটু হাসি ফুটে উঠল। বিড়বিড় করে বলল ও, আমি জেগে আছি, লুবনা, আমি জেগে আছি।

.

অন্ধকার বারান্দা। রেলিং ধরে দাঁড়িয়ে রয়েছে তরুণী। পাশে বার্নাদো গুগলি, অভিনেত্রীর একটা হাত নিজের হাতে তুলে নিলেন তিনি। ছোট্ট, নরম ফুল। একটু চাপ দিলেন, কিন্তু পাল্টা সাড়া পেলেন না। হতাশার একটা ঢেউ বয়ে গেল সারা শরীরে, একটা দীর্ঘশ্বাস চাপলেন।

বশীকরণের সমস্ত মন্ত্র, মন ভোলানর যাবতীয় কৌশল প্রয়োগ করা হয়েছে। কোন সন্দেহ নেই, অভিনেত্রীকে মুগ্ধ করতে পেরেছেন তিনি। তরুণী নিজের মুখেই স্বীকার করেছে, কোন পুরুষমানুষের মধ্যে এতগুলো গুণ একসঙ্গে দেখেনি সে। অথচ আসল কাজের বেলায় ওর তরফ থেকে কোন সাড়া পাচ্ছেন না তিনি। অসাধারণ সুন্দরী মেয়ে, ভয়টা সেখানেই, এদের দেমাকের কথা কেউ কিছু বলতে পারে না। তিনি প্রস্তাব দিলে হঠাৎ যদি খেপে যায়, যদি খারাপভাবে নেয় ব্যাপারটাকে! তাই চাইছেন, প্রস্তাবটা ওর তরফ থেকে আসুক। এ-সব বিষয়ে। সরাসরি কথা হয় না, তিনি জানেন। আভাসে-ইঙ্গিতে, ঠারেঠোরে সারে মানুষ। সেজন্যই সুযোগ তৈরি করে দিচ্ছিলেন তিনি–এইবার নিয়ে তিনবার তিনি ওর হাতে হাত রাখলেন।

কিন্তু কই, ওঁর হাতের ভেতর মেয়েটা তো একটা আঙুলও নাড়ল না।

সন্ধেটা চমৎকারভাবে শুরু হয়েছিল। আজ আবার দাওয়াত করে নিজের। বাড়িতে আনিয়েছেন তিনি অভিনেত্রীকে। নিজের হাতে রান্না করে পরিতৃপ্তির সঙ্গে খাইছেন ওকে। মেয়েটা রান্নার প্রশংসায় পঞ্চমুখ হতে দেখে তার মনের আশা, তুঙ্গে উঠে যায়। এরপর ব্যাকগ্যামন খেলায় দ্রুত পর পর তিন বার জিতে নিঃসন্দেহে ধরে নেন, একবার শুধু আভাস দিলেই তার সঙ্গে বিছানায় উঠবে অভিনেত্রী।

হতাশায় ভুগছেন গুগলি, এই সময় তার হাতের ভেতর নড়ে উঠল অভিনেত্রীর হাত। সামান্য একটু চাপ, কিন্তু কি পরম সুখ! তিনিও আবার একটু চাপ দিলেন, পরীক্ষা করে নিঃসন্দেহ হতে চাইলেন। পাল্টা চাপ দিয়ে মেয়েটা বলল, চল, ঘরে যাই!

গর্ব আর সুখ অনুভব করলেন গুগলি। মেয়েটার, হাত ধরে ঘরে ফিরে এলেন তিনি। একবার সুইচবোর্ডের দিকে তাকালেন, তারপর মেয়েটার চোখে–আলো নেভাবার অনুমতি চাইছেন। অভিনেত্রী তাঁর গা ঘেঁষে দাঁড়াল। তার ঠোঁটের দিকে মুখ নামালেন গুগলি। এই সময় বিনা মেঘে বজ্রপাতের মত ঝন ঝন শব্দে বেজে উঠল ফোনটা।

গল্পের বিষয়:
উপন্যাস
DMCA.com Protection Status
loading...

Share This Post

আরও গল্প

সর্বাধিক পঠিত