লোটাকম্বল: ১.০৯ DARK IDOLATRY OF SELF

লোটাকম্বল: ১.০৯ DARK IDOLATRY OF SELF

১.০৯ DARK IDOLATRY OF SELF

টাকার কথা আসছে কেন হরিশঙ্কর? তুমি কি এই দালালটার কাছে টাকা ধার করেছিলে?

মাতামহ ব্যাপারটা বুঝতে চাইলেন। রঙ্গমঞ্চে আপাতত চরিত্ররা স্থির। চেয়ার পা উলটে পড়ে আছে যুদ্ধক্ষেত্রে মৃত অশ্বের মতো। থানইটের মতো কিছু কেতাব ইতস্তত বিক্ষিপ্ত। উত্তেজনায় মেসোমশাইয়ের ভুঁড়ি ইঞ্চিখানেক চুপসে যাওয়ায় কাপড়ের কষি আলগা হয়ে গেছে। টাইট করে বাঁধার চেষ্টা করছেন। কনক আর একটা ঝাড়ু এনে উবু হয়ে বসে কাঁচের কোয়া ঠেলে ঠেলে এক জায়গায় জড়ো করছে। পিঠের দিকে খোলা অংশে শাড়ির আঁচল লাগলে আরশোলা ভেবে চমকে চমকে উঠছে। মুকু চেষ্টা করছে বইয়ের র‍্যাকটাকে সোজা করার। বিধুজ্যাঠা শাসিয়েটাসিয়ে, কোর্টকাছারির ভয় দেখিয়ে পালিয়েছেন। মাতামহ বুকের কাছে ঠোঙাটি তখনও ধরে আছেন। অনেকক্ষণ লোভ সামলেছেন। আর পারলেন না। বেশ বড় সাইজের একটি বেগুনি বের করে সযত্নে দাতে কাটলেন। মুচুড় করে শব্দ হল।

মুকু ভূপাতিত চেয়ারটিকে খাড়া করেছে। পিতা সাবধানে পেছনে সরে গিয়ে চেয়ারে বসে পড়লেন। এতক্ষণ সব বেসামাল হয়ে গিয়েছিল। আবার হিসেবজ্ঞান ফিরে আসছে। মাতামহ। বিধুবাবুর বসে যাওয়া চেয়ারে বসলেন না। অপবিত্র হয়ে গেছে। পাশের আর একটা চেয়ারে বসলেন। মুখে বেগুনি, মাকালীর লাল জিভের মতো সামনে লকলক করছে।

মেসোমশাই কোমরের কষি কোনওমতে বাগে আনতে পেরেছেন। আর একটা চেয়ারে বসে তারও ওই একই প্রশ্ন, কী টাকা টাকা করছিল ওই স্কাউড্রেলটা!

মাতামহ বেশ সন্দেহের চোখে প্রশ্নকারীর দিকে তাকালেন। চোখ ঘুরে গেল কনক আর মুকুর ওপর দিয়েও। এরা আবার কারা? সংসারটা বেশ শ্মশানের মতো হয়ে ছিল! হঠাৎ শ্মশান জাগাতে এ কাদের আগমন? প্রশ্ন করলেন, আপনাকে তো ঠিক চিনলুম না? সঙ্গে সঙ্গে নিজের পরিচয় দিলেন, আমি হরিশঙ্করের শ্বশুরমশাই।

কী ট্রেনিং! মুকু আর কনক সঙ্গে সঙ্গে এগিয়ে এসে হেঁট হয়ে গড়াগড় তিনজনকে প্রণাম করে ঘরের মাঝখানে সোজা হয়ে দাঁড়িয়ে পড়ল। নৃত্যের একটা ছন্দ চলে গেল চোখের সামনে দিয়ে। মেসোমশাই বললেন, আমার মেয়ে।

মাতামহ একটা হাত বুকের কাছে আশীর্বাদের ভঙ্গিতে সাপের ফণার মতো তুলে ধরে বললেন, সে তো বুঝলুম, কিন্তু আমিটা কে?

পিতা বললেন, এঁকে আপনি আগে হয়তো দেখেননি, মেজদার ভায়রাভাই। পণ্ডিত মানুষ। ডাকসাইটে উকিল।

মাতামহ সঙ্গে সঙ্গে বললেন, কী, চলবে? বেগুনি, আলুর চপ, আলুর বড়া বা ফুলুরি?

আজ্ঞে, সবই তো সুস্বাদু, মুখরোচক। তবে আমি যে আবার অম্বলের রুগি!

মাতামহ হা হা করে হেসে বললেন, পুরুষমানুষের অম্বল? হরিশঙ্কর, শুনেছ? পুরুষমানুষের অম্বল! ও তো মেয়েদের অসুখ গো! অম্বল, মাথাধরা, গেঁটে বাত, বাধক। গরম তেলেভাজা না, খেলে তোমার ও ব্যামো সারবে না বাপু! সুখদা মোক্ষদা মা, আমার দিকে এসো তো!

কনক আর মুকু এগিয়ে গেল। যাক, দু’জনের আর একজোড়া নতুন নাম হল। মাতামহ ঠোঙাটি কনকের হাতে তুলে দিতে দিতে বললেন, বাঃ, বেশ মেয়েটি তো? একেবারে দুর্গাপ্রতিমা! আমার নাতিটার বিয়ে দিয়ে দিলে হয়। এই ভস্মলোচনের সংসারে একটি অন্নপূর্ণার বড় প্রয়োজন। মাতা চ পার্বতী দেবী পিতা দেবো মহেশ্বরঃ। বান্ধবা শিবভক্তাচ স্বদেশোভুবনয়ম।

ঠোঙাটা বুকের কাছে ধরে, মাথাটাকে তার ওপর গুঁজে, মুকুর পা মাড়িয়ে আমাকে ধাক্কা মেরে মাতা অন্নপূর্ণা ঘর ছেড়ে পালালেন। এই লাজুক লাজুক প্রস্তাবে বাচ্চা মহাদেবটিকেও কামরাঙার মতো মুখ করে, দেয়ালে পিঠ ঘষে ঘষে গুটিগুটি সরে পড়তে হল।

রান্নাঘরে গিয়ে দাঁড়াতেই কনক বললে, যাও! তোমার সঙ্গে কথা বলব না।

আমার তো আবার সবেতেই পাকামো! এই আহ্লাদে আটখানা, এই আবার বিষাদে ফুটিফাটা। এখন ভেতরটা নেত্য করছে।

কনক বসে বসে ঠোঙা থেকে তেলেভাজা বের করছে। চট করে আঁচলটা মাথায় তুলে দিলুম। মন ধমকে উঠেছিল, কী গ্রাম্য রসিকতা! হৃদয় শোনেনি, হাত বশে থাকেনি।

আর মা অন্নপূর্ণা! তিনি কপাত করে আমার হাত চেপে ধরে কটাস করে আঙুল কামড়ে দিলেন। মোস্ট আন-অন্নপূর্ণাসুলভ কর্ম। দৃশ্যটি মুকু দেখে ফেললেন এবং মৃদু হেসে বুঝিয়ে দিলেন, বেশ হচ্ছে। বিশেষজ্ঞের পরামর্শ নিতে হবে, কোনও মেয়ে যদি কটাস করে আঙুলের মাথা কামড়ে দেয় তা হলে তার কী অর্থ! সুখেন? না সুখেন নয়। আরও পবিত্র কেউ। যে এর ভেতরের রোমান্সটা চটকে বের করে দিয়ে বিশ্রী একটা দেহের স্বাদ ঢুকিয়ে দেবে না। মায়া? না, মায়াও নয়। তা হলে মাতামহকেই জিজ্ঞেস করব। প্রাণের কথা বলার মতো এমন প্রাণ আর কোথায় পাব!

মাছ আনা মাথায় উঠেছে। বসার ঘরে তিন সংসারী আলোচনায় বসেছেন। ব্যাপারটা যেমন আকস্মিক তেমনই কদর্য। পৃথিবীটা বড় অদ্ভুত জায়গা। একদিকে যেমন ভাল, আর একদিকে তেমনই খারাপ।

কী বলছে ব্যাটা? তোমার মেজদা টাকা ধার নিয়েছিল? মাতামহ আলুর চপ খেতে খেতে প্রশ্ন করলেন।

কোনও ডকুমেন্ট আছে? মেসোমশাইয়ের প্রশ্নের ওপর প্রশ্ন।

ওর আস্তিনে কী আছে ওই জানে। মাঝে মাঝে কেবল তড়পে যাচ্ছে। আমার পরামর্শ ছাড়া মেজদা জীবনে কোনও কাজ করেনি। সে এই লোফারটার কাছে টাকা ধার করতে যাবে, আমি বিশ্বাস করি না। অসম্ভব। ইমপসিবল। আর টাকা তাকে ধার করতে হবে কেন? তার কোনও অভাব ছিল? সে তো ধার দিয়েই ফতুর। ওই রাসকেল আমাকে বলে গেল, মেজদার মেরে আমি বড়লোক! ছি ছি কানে যেন গরম সিসে ঢেলে দিয়ে গেল। মেজদা যা রেখে গেছে, আমি কাকে দোব? দোবটা কাকে? কেউ তো নেই। মেজদার বংশই তো লোপাট হয়ে গেছে। আমি কি পার্সেল তার ওপরে পাঠাব!

মাতামহ বললেন, মেজকত্তা একটু খরচে ছিল। দানধ্যানও ছিল প্রচুর। তুমি সে তুলনায় বেশ হিসেবি।

এই রে, মরেছে রে! আমার মাতামহের এই এক যা দোষ! মনে যা এল, দুম করে বলে ফেললেন। মা ব্রয়াত সত্যমপ্রিয়ম। কে কার কথা শোনে! এইজন্যে যে অপ্রিয় হতে হয়, তা বোঝেন না। পিতা কঠিন মুখে তাকালেন, সংসারী মানুষকে একটু হিসেবিই হতে হয়। দিয়তাম, ভুজ্যতাম করলে আপনার ছেলেটির মতো অবস্থা হবে। আয় একশো, ব্যয় হাজার, পাঁচজনের কাছে হাত পেতে বেড়াও। বাইরে কোঁচার পত্তন, ভেতরে ছুঁচোর কেত্তন।

হ্যাঁ, তুমি ঠিক বলেছ। ব্যাটা যেন নবাব সিরাজউদ্দৌলা। রোজ মোগলাই খানা চাই। কানে আতর চাই। একপা হাঁটার ক্ষমতা নেই, গাড়ি চাই, সেবাদাসী চাই। বউয়ের কী তোয়াজ। ব্যাটা যেন বিল্বমঙ্গল! পরশুদিন একটা শাড়ি এল, দাম শুনলে চক্ষু চড়কগাছ, দুশো টাকা!

বেহিসেবি হওয়া যেমন ভাল নয়, আবার আপনার মতো ওয়ানপাইস ফাদারমাদার হওয়াটাও ঠিক নয়।

আরে দুর, আমার পাইসই নেই তো ফাদারমাদার। তোমার যেমন কথা!

মেসোমশাই উসখুস করছিলেন। আলোচনা লাইন চেঞ্জ করে অজ্ঞাত দিকে চলেছে। পারিবারিক গোপনীয়তা বেরিয়ে আসছে। খক করে একবার কেশে চূড়ান্ত রায় দিলেন, হোয়েন দেয়ার ইজ নো ডকুমেন্ট, দেয়ার ইজ নো ক্লেম। যিনি ধার নিয়েছেন তিনি আর জীবিত নেই। একটা মানহানির মামলা ঠুকে দিন।

মাতামহ মহাউল্লাসে বললেন, এই তো আইন আমাদের পাশে, আমাদের কাত করে যাবে এক ব্যাটা দালাল! ঠুকে দাও, ঠুকে দাও। আমার জামাইকে আমি রিপ্রেজেন্ট করব।

কত টাকা দাবি করছে? মেসোমশাই আর একটু গভীরে যেতে চাইলেন।

পাঁচ হাজার। বলছে খেপে খেপে দিয়েছে। মেজদা মুদিখানায় কিছু ধার রেখে গিয়েছিল, হাজারখানেকের মতো। ভয়ে আমাকে বলেনি। সাধুখাঁ খাতা দেখাতেই আমি সঙ্গে সঙ্গে দিয়ে দিয়েছি, অফকোর্স উইথ এ প্রেয়ার, মেজদা, এবার তুমি যেখানেই জন্মাও, লম্বা হাত খাটো করার মতো এমন ভাই তোমার পাশে থাকবে না। তুমি সেই স্বভাব নিয়ে এসো, যে স্বভাব বলে, কাট ইয়োর কোট অ্যাকর্ডিং টু ইয়োর ক্লথ।

মাতামহ বললেন, মুদিখানার হাজার তুমি না দিলেও পারতে। ওরা তিন টাকাকে তিরিশ টাকা করে রাখে। ওসব হল বানানো খাতা।

তা বললে কি চলে? ও আপনি পারেন, আমি পারি না, আমার শাস্ত্র আলাদা। আর একটা ধার ছিল, অতি সামান্য। জানতেও পারতুম না, যদি না মেজদা স্বপ্নে এসে বলে যেতেন।

কীরকম? কীরকম? মাতামহ একেবারে হুমড়ি খেয়ে পড়লেন। পরকালের গন্ধ পেয়েছেন।

ভোররাতে মেজদা এলেন।

নিশ্চয়ই ট্রেন লেট ছিল। আমি এতকাল রেলকোম্পানির মালবাবু ছিলুম। লেট না থাকলে কোনও ট্রেন শেষরাতে হাওড়ায় ইন করে না।

আপনি ছিলেন মালবাবু, কথা বলছেন জলপাইবাবুর মতো।

অর্থ?

সুকুমার রায়। জল পাই আর জলপাই এক করে পাগল করে মেরেছিল। হচ্ছে স্বপ্নের কথা চলে গেলেন অন্য লাইনে, রেললাইনে।

বয়েস হরিশঙ্কর। বয়েস। বয়েসে বাতুল। তুমি বলো, বলো। লঙ্কা চিবিয়ে ফেলেছি। ব্লটিং পেপারে একটু চিটেগুড় পেলে জিভে সেঁটে ধরতুম।

কাশীর চিনি মিলতে পারে। চিটেগুড় পাবেন গুলিখোরদের আখড়ায়।

কনক চা নিয়ে এল না, এল মুকু। লজ্জা হয়েছে। বিয়ের কথায় মেয়েরা কেমন যেন মেদুর হয়ে যায়। আরে বোকা, ও তো মাতামহর ঠাট্টা। বৃদ্ধদের ওই তো রীতি। সুন্দরী মেয়ে দেখলেই একেবারে ফুলশয্যার ছবি আঁকা। লাল মেঝে। বাঘথাবা খাট। নীল কামুক মশারি। ফলাও সাদা চাদর। বিলাসী বালিশ। রজনীগন্ধার ছড়ি। যুঁইয়ের মালা বাজু বেয়ে জড়িয়ে মড়িয়ে মাতোয়ালা। ইন্দ্রিয়ে সুবাসের সুড়সুড়ি। ফরাসডাঙার ধুতি আর গরদের পাঞ্জাবি পরে প্যাঙা বসে আছে গ্যাট হয়ে। বত্রিশ ইঞ্চি বুকের ছাতি বেড়ে ছেচল্লিশ ইঞ্চি একটি প্রেমের তাকিয়াকে ধরবে বলে। আর পাকা মেয়েরা দরজার সামনে দাঁড়িয়ে সেই কঁচা অর্ঘ্যটিকে ভেতর দিকে ঠেলে দিচ্ছে, যাও না যাও, ওই যে বসে আছেন ঠুটো জগন্নাথ, জগন্নাথ স্বামী রসানন্দো রাধাসরসবপুরালিঙ্গনসুখখা। বৃদ্ধের চোখে হারিয়ে যাওয়া সেই অতীত রাতের ছবি। পাকা পেয়ারার মতো দিদিমার বদলে ঘরে একটা কাঠের সিন্দুক। কতদিন দেখেছি, মাতামহ সিন্দুকের গায়ে হাত বুলোত বুলোতে বলছেন, হ্যাঁগা, শেষপারানির কড়িটি তুমি রেখেছ তো!

যাক, চা এসে গেছে, বলে মাতামহ চায়ে একটা চওড়া চুমুক চালিয়ে বাপস বলে কাপ নামিয়ে রাখলেন। ঝালের জিভে গরম চা উত্তপ্ত শাবলের মতো ঢুকেছে। ভয়াবহ মুখে ফেলে আসা আলোচনার টুকরো তুলে নিলেন, শেষরাতে মেজকত্তা এলেন?

আজ্ঞে হ্যাঁ! তিনি এলেন উত্তরের দরজা দিয়ে।

হ্যাঁ, ওই দিকেই যে হিমালয়! নো কমেন্টস। এটা জিওগ্রাফির ক্লাস নয়। দিস ইজ প্যারাসাইকোলজি। বাবা, কতরকমের প্যারা আছে গো! প্যারাটাইফয়েড, প্যারাচুট, প্যারালিসিস, প্যারাগ্রাফ, প্যারামর্শ।

প্যারামর্শটা কী?

পরামর্শকে একটু বাঁকা পথে চালালেই প্যারামর্শ। উকিলরা যা দেয় তা হল প্যারামর্শ। ওই প্যারামর্শর ঠেলাতেই সারাজীবন কোর্টের খোঁটায় কলুর বলদের মতো ঘুরেই চলেছি, মামলার তেলে আমার উকিল বন্ধুবিহারী দিন দিন চকচকে হচ্ছে। মাগের গতর দেখলে সুন্দরবনের কেঁদোর জিভে জল আসবে।

মাগ ছাড়া অন্য শব্দ মাথায় এল না?

আহা, ওই যার চেহারা তাকে আমি কেমন করে রমণী বলি? একটা মানানসই শব্দ বলতে হবে তো? তুমি সবেতেই যদি চটে যাও তা হলে তো বোবা হয়েই থাকতে হয়। তা হলে তুমি রামকৃষ্ণের ওপর রাগো, রামপ্রসাদের ওপর রাগো। আমি তো তাও মাগি বলিনি! রামপ্রসাদ বলে আমার কোষ্ঠী, শুদ্ধ সেই তারাবেশে। মাগি জানে না যে মন কপাটে খিল দিয়েছি কত কষে।

আপনি অফুল।

নিশ্চয়ই কোনও বিলিতি ফুল। কুন্দ, কমল, বকুল, বেল, যুঁই, জবা, ঘেঁটুর দলে নয়। বুঝেছি খুব বিরক্ত হচ্ছ। কী করি বলো, সারাদিন কথা বলার লোক পাই না। ছেলে ওল্ডফুল বলে মুখ বেঁকিয়ে সরে পড়ে। দেখেশুনে পুত্রবধূ নিয়ে এলুম। ছেলে সরে পড়ল ফুসলে নিয়ে। বড়লোকের মেয়ে, ছেলে শ্বশুরের সেরেস্তায় বন্ধক পড়ে গেল। বউ বললে, ওঠো তো ওঠো বোসো তত বোসো। সঙ্গী আমার কেউ নেই হরিশঙ্কর। দেয়াল, বেটির ছবি, দোরগোড়ার নারকোল গাছ, গোটাকতক কাক, আর আমার এই সুদের সুদ নাতি। মেরে তাড়াবে তাড়াও। তোমারই রকে গিয়ে বসব। লোকে বলবে জামাই শ্বশুরকে ঘাড়ধাক্কা দিয়ে বের করে দিয়েছে। জানো, গত তিনদিন আমার পেটে দানাপানি পড়েনি। কেউ একবার জিজ্ঞেস করেনি, বুড়ো, তুমি কিছু খেয়েছ? দোতলায় মোগলাই, একতলায় হরিমটর। মাতামহ চোখ রগড়ালেন। সঙ্গে সঙ্গে উঁহু করে হাত সরালেন, বাপস জ্বলে গেল, আঙুলে আলুর চপের লঙ্কা লেগে ছিল।

পিতার প্রশ্ন, দানাপানি জোটেনি কেন?

আর বলল কেন? সে আর এক দুঃখের কথা। এখন সই করতে গেলে হাত কাঁপে। যতবার টাকা তোলার ফর্মে সই করি, পোস্টমাস্টার বলে সই মিলছে না। সাক্ষী ধরে আনুন। শেষে জিজ্ঞেস করলুম, মশাই আমি তা হলে কোন শালা? সইয়ের আমি, না আমার সই!

আজ থেকে আপনি আমার এখানে খাবেন। যদ্দিন আমি বেঁচে থাকব। তবে একটা অনুরোধ, যতদূর সম্ভব হুগলি জেলার ওই গ্রাম্য শব্দগুলো ব্যবহার না করার চেষ্টা করবেন। শুনলেই আমার পিত্তি চটে যায়। মনে থাকবে?

মাতামহ বাধ্য ছেলের মতো মাথা নাড়লেন। গালে জলের রেখা। দুঃখ আর লঙ্কা নিংড়ে বের করেছে।

মেসোমশাই বললেন, আমারও একটা প্রতিবাদ আছে। উনি একটু আগে উকিলদেরও একহাত নিয়েছেন। বলেছেন আমরা মক্কেলকে যা দিই তা হল প্যারাম। মক্কেল মেরে, তেল বের করে আমাদের চেকনাই। হাইলি অবজেকশনেবল।

মাতামহ জল-ভরা চোখে হেসে উঠলেন। কানন দেবীও এমনটি পারবেন না। অনেকটা রোদ আর বৃষ্টির মতো। হাসতে হাসতে বললেন, তোমাকে বলিনি গো। তুমি তো আমাদের ঘরের উকিল। ঘরকা মুরগি ডাল বরাব্বর। অনেকদিন আগে বিভক্তির শ্লোক মুখস্থ করেছিলুম, প্র, পরা, অপ, সম, নি, অভি, দুর, বি৷ হরিশঙ্করের প্যারার সঙ্গে মেলাতে গিয়েই কথায় কথা বাড়ে, টাকায় বাড়ে সুদ। ও কিছু না। তোমাকে আমি কিছু বলিনি।

মুরগি বলাটা মনে হয় উপযুক্ত হল না, যতই হোক হিন্দুর ছেলে!

পিতার মুখ দেখে মনে হল ভীষণ বিরক্ত হয়েছেন। কথার জালে ক্রমশই এমন জড়িয়ে পড়ছেন কীভাবে যে কেটে বেরিয়ে আসবেন ভগবানই জানেন। আঙুল তুলে মাতামহকে বললেন, আপনি অনেকটা গেঞ্জির মতো। কোনা ধরে টান দিলেই হল, ফড়ফড়, ফড়ফড় খুলেই চলেছেন। ওর জন্যে আমি যেমন এক নব-সারমন-অন-দি মাউন্ট তৈরি করছি, আপনার জন্যও সেইরকম একটা তৈরি করতে হবে।

ওই একটাতেই হবে হরিশঙ্কর। আবার নতুন করে খাটবে কেন?

খাটতেই হবে। দু’জনের দু’রকম নেচার। আপনার জন্যে পয়লা উপদেশ হবে, কম কথা বেশি। আহার। খাবার না দেখলে ঠোঁট ফাঁক হবে না।

আঃ, চমৎকার চমৎকার! তুমি আমাদের হিন্দু যিশু, তোমাকে শিশুর মতো কোলে তুলে আমার ধেই ধেই করে নাচতে ইচ্ছে করছে। প্রেমদাতা নিতাই বলে গৌরহরি, হরিবোল। হরি হরয়ে নমঃ কৃষ্ণ-যাদবায় নমঃ। যাদবায় মাধবায় কেশবায় নমঃ। মাতামহ মাথা নেড়ে নেড়ে সুর করে গাইতে লাগলেন। পিতা তড়াক করে চেয়ার ছেড়ে লাফিয়ে উঠে বললেন, অ্যাবসলিউটলি ব্যাড টেস্ট। নাম। নিয়ে ব্যঙ্গ।

গান থেমে গেল। সরল মুখে মাতামহ বললেন, কেন, শাক্ত কি মাঝে মাঝে বৈষ্ণব হতে পারে না?

কেন পারবে না? সব ধর্মেরই শেষে মৃত্যু। তা বলে আপনি আমার নাম নিয়ে সুর করে হরি হরায় নমঃ, হরি হরয়ে নমঃ করবেন? অত্যন্ত কুরুচির পরিচয়।

আরে এ হরি সে হরি নয়। ইনি সেই লোকনাথং ত্রিলোকেশং পীতাম্বরধরং হরিম। তুমি তো শুধু হরি নও, হরি আর শঙ্কর একসঙ্গে পাটিসাপটা হয়ে বসে আছ। রেগে আছ তো, তাই বুদ্ধিবৈকল্য। হয়েছে। না বাবা, তোমার সামনে আর বসব না। কী বলতে কী বলে ফেলব!

মাতামহ উঠে দাঁড়ালেন। কোলের ওপর থেকে গোটাকতক মুড়ি মেঝেতে ছিটকে পড়ল। ভয়ে ভয়ে মুড়ির দানা ক’টা মেঝে থেকে নিচু হয়ে তুলতে তুলতে বললেন, তোমার কোনও কথাই শোনা হল না।

আপনিই তো সব ভন্ডুল করে দিলেন।

আচ্ছা বেশ, আমি যদি এখন একটাও কথা না বলে চুপ করে লক্ষ্মীছেলের মতো বসি!

চেষ্টা করে দেখুন।

মাতামহ চেয়ারে বসে মেঝে থেকে কুড়োনো মুড়ির একটা দানা মুখে পুরলেন। কার সামনে কী কাজ। পিতার নজর সর্বত্র, আরে ছিঃ ছিঃ। আপনি ওই মেঝের মুড়ি দাতে কাটছেন, ছি ছি ছিঃ। দেশে এত বড় দুর্ভিক্ষ চলেছে জানতুম না তো! কদিন না খেয়ে আছেন?

মেঝেটা তো বেশ পরিষ্কার হরিশঙ্কর।

আরে একটু আগেই ওখানে বিধু নেচে গেছে। যান, মুখ ধুয়ে আসুন। আপনাকে দেখছি এবার কোমরে ঘুনসি বেঁধে, দড়ি দিয়ে খাটের সঙ্গে বেঁধে রাখতে হবে, দামড়া গোপালের মতো। দ্বিতীয় শৈশব শুরু হয়ে গেছে।

একদিন তোমারও হবে। না, না, হবে না, হবে না। মুখ ফসকে বেরিয়ে গেছে।

স্তম্ভিত ঘরে মাতামহ মুখ ধুয়ে ফিরে এলেন। চেয়ারে বসলেন ধীরে ধীরে, যেন শব্দ না হয়। শুভ্র ব্যাকব্রাশ করা চুলে জল হাত বুলিয়েছেন। ধবধবে সাদা ভুরু জলে ভিজে ভিজে। তপঃক্লিষ্ট মুখ অদ্ভুত প্রসন্ন। কেঁচার খোঁটে মুখ মুছতে মুছতে বহু দূর থেকে বললেন, নাও শুরু করো।

কথা বলার ধরনে বেশ বোঝা যায়, দেহ ঘরে, মন উড়ে চলে গেছে বহু দূরে। আমাদের ছাতে বহুকাল ধরে এক খণ্ড কাঠ পড়ে আছে। জলে ভেজে, রোদে পোড়ে, শীতে শুকোয়, হিম খায়, বসন্তের বাতাস পায়। এর নাম নাকি সিজনিং। কাঠ ধীরে ধীরে লোহা হয়ে উঠছে। মাতামহকে। দেখলে, আমার সেই কাঠের টুকরোটার কথা মনে পড়ে। Seasoned Sailor returns from the Seven Seas/ His eyes speak of Cyclones/ Hairs bleached white.

পিতা শুরু করলেন, রাত প্রায় ফিকে হয়ে এসেছে। ভোরের মেটে আলোয় মেজদা উত্তরের দরজা খুলে এলেন। গায়ে সাদা উত্তরীয়। আমার মাথার সামনে এসে দাঁড়ালেন। মেজদা তুমি? মুখে অপূর্ব হাসি। মানুষের মুখে অমন হাসি দেখা যায় না। স্বর্গীয় হাসি। তুমি কেমন আছ মেজদা? বললেন, সে তোমাকে বোঝাতে পারব না হরি। না থেকেও থাকার আনন্দ। এলে বুঝতে পারবে। সে এক মহাসম্মেলন। তুমি কি আবার আসবে? মেজদা বললেন, আপাতত নয়। তোমাকে একটা কথা বলার জন্যে আজ এলুম। ওই যে কেবল মুচি, যাবার দু-তিন দিন আগে ওকে দিয়ে আমার চটির স্ট্র্যাপটা সেলাই করিয়েছিলুম। পয়সা দিয়ে যেতে পারিনি। বড় ভাল মানুষ। কোনওদিন চাইবে না। তুমি সকালেই গিয়ে দেনাটা শোধ করে এসো। আলমারিতে আমার চশমার খাপে স্যাময় লেদারের তলায় টাকা আছে। পুরোটাই দিয়ে দিয়ো।

আর কিছু জিজ্ঞেস করার আগেই মেজদা নিমেষে অদৃশ্য হয়ে গেলেন। ঘুম ভেঙে গেল। ফুটো দিয়ে সূর্যের আলো এসে পড়লে যেমন হয়, সেইরকম একটা রুপোলি রেখা ক্রমশ গুটোতে গুটোতে বহু দূরে চলে গেল। সারাঘরে সুন্দর গন্ধ। আমি একজন কেমিস্ট। অমন গন্ধ পৃথিবীর কোনও আতরে খুঁজে পাইনি। জানি না ব্রহ্মকমলের কেমন গন্ধ!

মাতামহের চোখ বড় বড় হয়ে উঠেছে। মেসোমশাই বিলেত-ফেরত ব্যারিস্টার। মুখ দেখে মনের ভাব বোঝার উপায় নেই। সামনে ঝুঁকে পড়ে মাতামহ বললেন, তারপর কী হল!

আলমারি খুললুম। চশমার খাপ। সত্যিই টাকা রয়েছে। একটা দশটাকার নোট। সকাল হল। কেবলকে জিজ্ঞেস করলুম। সাধুসন্ত মানুষ। কিছুতেই স্বীকার করবে না। শেষে বললে, হ্যাঁ, মেজবাবু জুতো সারিয়েছিলেন। তবে সে পয়সা আমি আর কিছুতেই নিতে পারব না। স্বপ্নের কথা বলতেই কেঁদে আকুল। একজোড়া সোয়েডের নিউকাট দেখিয়ে বললে, ওই দেখুন, মেজকত্তার জুতো। তৈরি হল, পরা আর হল না। এই তো মানুষের জীবন! টাকা কী হবে? সেই টাকা দশটা ফ্রেমে বাঁধাই করে দোকানে ঝুলিয়ে রেখেছে। সেই মেজদা বিধুর কাছে টাকা ধার করেছেন আমাকে। বিশ্বাস করতে হবে?

মেসোমশাই বললেন, একটা মানহানির মামলা ঠুকে দিই। আর দেরি নয়। ফার্স্ট, থানায় একটা ডায়েরি করে আসতে হবে।

না। মামলা-মকর্দমা নয়। আমি টাকাটা ওর নাকের ডগায় ছুঁড়ে ফেলে দোব।

সেকী? মাতামহ আর মেসোমশাই দুজনেই একসঙ্গে চিৎকার করে উঠলেন।

পাঁচ হাজার টাকার চেয়ে আমার কাছে আমার ইজ্জত অনেক মূল্যবান। ওর জন্যে, ওর জন্যেই আমি ওই জোচ্চোরটা যা চায় তাই দোব।

পিতা দূর থেকে আমাকে বারকতক আঙুলের খোঁচা মারলেন।

মেসোমশাই বললেন, এর মধ্যে ও আসছে কী করে?

ভবিষ্যতে কেউ যেন না বলতে পারে, তোমার বাবা চোর ছিল, জোচ্চর ছিল, চরিত্রহীন ছিল। দেয়ালে যখন ঝুলব, তখন দেবতার মতো ঝুলব। পৃথিবীর আদর্শ পিতাদের তিল তিল নিয়ে আমি হব তিলোত্তম। কোনওদিন ওর মনে যেন এই ক্ষোভ দেখা না দেয়, আমার পিতা যা বলতেন তা করতেন না। হি ওয়াজ এ বান্ডল অফ প্যারাডক্স। দেবদেবীতে আমার বিশ্বাস নেই, দেবচরিত্রে আমার বিশ্বাস আছে। আমার চরিত্রই আমার গর্ব। সেই গর্বের ছোঁয়া লাগবে আমার 91698 1691 All over the land they will be telling of Dugald Stewart. Mothers will teach their children to be men by him. High will his name be with the teller of few teles. There are things greater than death. Dugald Stewart-এর জায়গায় হরিশঙ্কর। পাঁচ হাজার টাকা নাথিং বাট স্ক্র্যাপ অফ পেপারস।

শুনুন, শুনুন হরিদা, সেন্টিমেন্ট ভাল, সেন্টিমেন্টাল হওয়া ভাল নয়। রামকৃষ্ণ বলেছেন, ফোঁস করবে। সেটি ছেড়েছ কী মরেছ। চরিত্র এক জিনিস, দুর্বলতা আর এক জিনিস। ভীরুতা কি ভাল? মেসোমশাই বেশ গম্ভীর মুখে বললেন।

ভয়? যে ঈশ্বরকে ভয় করে না, যে শয়তানকে ভয় পায় না, জীবনের সিংহদুয়ারে যে একা প্রহরীর মতো সারাজীবন খাড়া তার অভিধানে ভয় শব্দের স্থান নেই বিনয়দা।

আছে আছে, সাবকনসাসে’ লুকিয়ে আছে বদনামের ভয়, চরিত্রহননের ভয়। It is the dark idolatry of Self/Which, when our thoughts and actions once are donel Demands that man should weep, and bleed, and groan/Seek not glories that are in heaven.

বেশ, এর ও উত্তর আছে, We have no wings, we cannot soar. But we have feet to scale and climb. দেখতে দোষ কী, কতটা ওঠা যায়, হায়ার, স্টিল হায়ার।

চেয়ারে শরীর এলিয়ে দিয়ে মাতামহ বললেন, বেশ জমেছে হে? তবে বাংলায় হলে খুলত ভাল।

মাতামহের তারিফে বিশেষ কেউ কান দিলেন না। এজলাসে দুই বাঘা উকিল যেন সমানে সমানে লড়ছেন। আসামি হল মানুষের চরিত্র। পিতা বললেন, তা হলে একটা ঘটনা শুনুন।

আবার ঘটনা? মাতামহ টানটান হয়ে বসলেন।

দেরাদুন থেকে ট্রেনে ফিরছি। আমি ওপরের বাঙ্কে। ওপরের বিপরীত বাঙ্কে আমার এক বন্ধু। তার নীচে একটি ছেলে। একেবারে নীচের বাঙ্কে একজন বাঙালি মহিলা। মহিলার বিপরীতে হ্যাটকোট পরা এক প্রৌঢ় মানুষ। আমার নীচের বাঙ্ক খালি।

মাতামহ বললেন, সব গুলিয়ে গেল। তোমরা কে যে কোথায়?

আপনার আর বুঝে কাজ নেই। মডেল তৈরি করে না দেখালে আপনি বুঝতে পারবেন না। সে ইনটেলিজেন্স আপনার নেই। আমারও সে সময় নেই।

কে কোথায় আছ বুঝতে পারলে ভাল হত।

থাক। যা বুঝলেন তাইতেই সন্তুষ্ট থাকুন। ট্রেন চলছে। প্রৌঢ় ভদ্রলোক হলেন কিশোরটির পিতা।

কেমন করে জানলে? মাতামহের বাগড়া।

পিতার ধমক, আবার আপনি কিন্তু শর্ত ভেঙে পূর্বের অবস্থায় ফিরে চলেছেন।

মাতামহ অপরাধীর মুখে বললেন, স্বভাব যায় না মলে।

ট্রেন চলেছে। বিপরীত বাঙ্কে শুয়ে থাকা আমার বন্ধু কেমন যেন উসখুস করছে।

প্রথমে কারণটা বুঝতে পারিনি। আমার বাঙ্ক থেকে আমি ছেলেটিকে দেখতে পাচ্ছি, আর সেই মহিলাকে দেখতে পাচ্ছি। অস্বাভাবিক কিছু চোখে পড়ছে না। মহিলা বসে আছেন জড়োসড়ো হয়ে। আমার বন্ধু হঠাৎ তড়াক করে বাঙ্ক থেকে লাফিয়ে নেমে পড়ল। নেমেই সেই সায়েবি পোশাক পরা লোকটির কলার চেপে ধরল, রাসকেল। খুবই অশ্লীল ব্যাপার। আমার নজরে পড়ার কথা নয়, বন্ধুর নজরে পড়েছে, লোকটা হল একজিবিশনিস্ট।

সে আবার কী? মাতামহ জানতে চাইলেন।

সে একটা অসুখ, এর বেশি কিছু বলা সম্ভব নয়।

ছোঁয়াচে?

মানসিক ব্যাধি। মহিলা বাঙালি। আমাদের বললেন, আপনারা দয়া করে আমার পাশে বসুন। কলকাতা পর্যন্ত যাব। একা ভীষণ ভয় করছে।

তোমরা চেন টেনে লোকটাকে নামিয়ে দিলে না কেন? আইন আছে, পাগল, ছাগল, ছোঁয়াচে রোগী, কেরোসিন, বারুদ, মাতাল, ট্রেনে ট্রাভেল করতে পারবে না। ঘাড়ধাক্কা দিয়ে নামিয়ে দাও।

মাতামহ এমনভাবে বললেন, যেন ট্রেন চলছে, ঘটনা ঘটছে।

পিতা আবার শুরু করলেন, আমরা ওপর থেকে নীচে নেমে এসে সেই মহিলার দু’পাশে বসলুম। কথায় কথায় জানা গেল, মহিলার স্বামী দেরাদুনে সম্প্রতি মারা গেছেন। ফিরে চলেছেন। কলকাতায় নতুন জীবন শুরু করতে। বিবাহিত জীবন মোমবাতির মতো গলে গলে নিবে গেছে। চার বছরেই সব শেষ। মানুষ কী জীব দেখুন। লালসার জিভ লকলক করে বেরিয়ে এলেই হল। চেক-ভালভ বলে কিছু নেই। এরাই আবার গর্ব করে বলে, অমৃতস্য পুত্রা।

মাতামহর প্রতিবাদ, একটা মানুষ দেখে সব মানুষকে গালাগাল দিয়ো না। গরলের পুত্র একটা-দুটো, অমৃতের পুত্ৰই বেশি। তা ছাড়া তুমি তো বললে, লোকটা অসুস্থ! কী যেন অসুখ। বললে? ও রোগের নাম বাপের জন্মে শুনিনি।

না শোনাই ভাল? কিছু অসুখ আছে যার ওষুধ হল লাঠি। লাঠৌষধি। ব্রায়োনিয়া নয়, অ্যাকোনাইট নয়, পটপটি নয়। লালসার দাওয়াই হল শাশুড়ি-ছ্যাঁকা। জিভটি টেনে বের করো, আর খুন্তিকে লাল করে পুড়িয়ে ছ্যাঁকা।

তুমি আমাকে বলছ না তো হরিশঙ্কর? পান্তুয়া দেখলে যে আমার নোলা সকসক করে ওঠে।

এ নোলা সে নোলা নয়। এ হল নোলকের নোলা। প্রস্টেট থেকে বেরিয়ে এসে কুলকুণ্ডলিনীতে সুড়সুড়ি দেয়। মানুষ তখন সারমেয়ের মতো জিভ বার করে হ্যাঁ হ্যাঁ করতে থাকে। অমৃতের পুত্র উদম হয়ে হেঁচকি তোলে। সময় নেই, অসময় নেই, স্থান কাল-পাত্রের বিচার নেই। আমার পাখিই ভাল, আমার পাখিই ভাল। সূক্ষ্ম আহার, সূক্ষ্ম বিয়োগ, দুটি ডিম। একটু তা। লাল-ঠোঁট বাচ্চা। পালকের বাহার। অনন্ত আকাশ। গান, শুধু গান। দ্বিপদ প্রাণী যখন চতুষ্পদ হয়ে যায় তখন ব্যাপারটা এত ভালগার হয়ে দাঁড়ায়? আমাদের ভোলা ষাঁড় অনেক অনেক ডিগনিফায়েড।

মেসোমশাই সামান্য অধৈর্য হয়ে বললেন, এখনও কিন্তু উপসংহারে এলেন না।

ও হ্যাঁ। ঠিকই তো। মানুষের ব্যবহারে বড় বিচলিত হয়ে পড়েছিলুম। যা বোঝাবার জন্যে এই গল্পের অবতারণা, তা হল, সেই হ্যাটকোটধারী পশুমানবটি কুপেতে আর বসতে পারলেন না, বাইরের প্যাসেজে দাঁড়িয়ে রইলেন। অনেক রাতে বাথরুমে যাবার পথে প্যাসেজের শেষ প্রান্তে পিতা-পুত্রকে মুখোমুখি দেখলুম। ছেলে বাপকে জিজ্ঞেস করছে, হোয়াট হ্যাভ ইউ ডান ফাদার?

গলায় অভিমান, অভিযোগ। ফাদার ফাম্বল করছে। ইউ হ্যাভ ডান সাম রং। হোয়াই, হোয়াই? হোয়াই? হোয়াই? গলা ভেঙে এসেছে কান্নায়। আমি চাই না, আমি চাই না আমার পুত্র, জীবিত আমি মৃত আমির সামনে পঁড়িয়ে অভিযোগের আঙুল তুলে বলে, কেন, কেন তুমি এমন কাজ করতে গেলে? আমার চরিত্রের অর্কিড হাউসে ও ঝুলতে থাকবে হিমালয়ের সৌন্দর্য নিয়ে। সেই কারণেই আমি বিধুকে পাঁচ হাজার টাকা দোব।

সেকী? মেসোমশাই, মাতামহ, দুজনেই আবার চিৎকার করে উঠলেন। এ যেন সাতকাণ্ড রামায়ণ শুনে সীতা কার বাবা বলে চিৎকার করে ওঠা।

সেকী টেকি নয়, ডিসিশন ইজ ডিসিশন।

মাতামহ বললেন, হরিশঙ্কর, তোমারও ওই লাঠৌষধি। বিধুকে তুমি টাকা দিয়ে দেখো!

মেসোমশাই বললেন, এ হল আইনের অবমাননা। লোকটাকে আমি জালিয়াতি কেসে ফেলে যাবজ্জীবন করে ছাড়ব ভেবেছিলুম। আপনি বাদ সাধলেন। কিল খেয়ে কিল হজম করে পুত্রবধূর৷৷ কয়েকদিন পরেই আপনি শ্বশুর হবেন, আপনার এ কী ভীরুতা।

মাতামহ বললেন, ও হবে শ্বশুর? শ্বশুর হলুম আমি। এ জিনিস দ্বিতীয় আর পাবে না। মেয়ে নেই আমার জামাই আছে। আর তার ঘাড়ে বসে লুচি চলছে, মালপো চলছে। দু’বার তীর্থভ্রমণও হয়ে গেছে।

মেসোমশাই চেয়ার ছেড়ে উঠতে উঠতে বললেন, বাথরুমে বসে ঠান্ডা মাথায় আর একবার চিন্তা করুন হরিদা।

চিন্তা? পিতা হাসলেন। পাঁচ হাজার টাকা আমাকে বেঁধে ফেলার আগেই লোহা গরম থাকতে থাকতেই হাতুড়ি মারব। মন বড় দুর্বল। আমি ক্যাশবাক্স খুলব, এখুনি টাকা বের করব, এখুনি দিয়ে আসব। কে জানে? মন বড় দুর্বল। মন বড় অপলকা। পিতা ক্যাশবাক্সর দিকে এগোতে লাগলেন। তা না হলে রক্ষক ভক্ষক হয়ে যায়?

তার মানে? পইতের চাবিটি হাতে ধরে পিতা ঘাড় ঘুরিয়ে তীক্ষ্ণ হাসি হেসে বললেন, ওই যে আমার ট্রেনের বন্ধু!

গল্পের বিষয়:
উপন্যাস

Share This Post

সর্বাধিক পঠিত