লোটাকম্বল: ১.০৪ NOTHING BEGINS AND NOTHING ENDS

লোটাকম্বল: ১.০৪ NOTHING BEGINS AND NOTHING ENDS

১.০৪ NOTHING BEGINS AND NOTHING ENDS

উনুনে আগুন পড়েছে। ধোঁয়া বের করার একটা কেরামতি আমার পিতাঠাকুরের উদ্ভাবনী মাথা থেকে এসেছে। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ শেষ হয়ে যাবার পর, ডিসপোজালে এখানে-ওখানে নানারকমের জিনিস বিক্রি হত। সেই পড়তি মালের আড়ত থেকে হরেকরকমের জিনিস কেনার একটা নেশা চেপে গিয়েছিল বেশ কিছুদিন। অনেক কিছুই এসেছিল, কাজেও লেগেছিল। সবচেয়ে কাজে লেগেছে জাহাজের একটা চিমনি। ঠ্যালাগাড়িতে লোড হয়ে সেই বস্তু যখন পাড়ায় ঢুকল, হাতি দেখার মতো ভিড় জমে গেল। কী তার বাহার! কালোর ওপর লালের ডোরা। ঠ্যালায় চেপে চিমনি চলেছে, পেছন পেছন চলেছে একপাল কুচোকাঁচা। হইহই ব্যাপার।

প্রতিবেশী রকে দাঁড়িয়ে প্রশ্ন করলেন, আজ দেখছি পেল্লায় জিনিস পেয়ে গেছ হরিশঙ্কর! ওটা কী?

দেখতেই পাচ্ছেন, জাহাজের চিমনি।

এবার তা হলে একটি মাস্তুল জোগাড় করে চাঁদ সদাগরের মতো ভেসে পড়ো জলে। মিস্ত্রিকে হুকুম হল, ফিট করে রান্নাঘরের ছাদে। দেখেই তার চক্ষুস্থির। ছাদ এ লোড নিতে পারবে না বাবু। ঘর নেমে আসবে। তুমি লোডের কী বোঝো হে। যা বলছি তাই করো, রোজ বুঝে নিয়ে সরে পড়ো। মিস্ত্রি বললে, এর ফঁদটা একবার দেখেছেন বাবু? ছাদের অতটা খাবলে তুলে নিলে, ছাদের আর থাকে কী? সবটাই তো চিমনি হয়ে গেল। বর্ষায় তো বান ডাকবে ঘরে। তা ঠিক, বলে ভাবতে বসলেন। চিমনি কিছুদিন পড়ে রইল আড় হয়ে একজোড়া দোয়েল এসে সংসাব পেতে বসল। বাচ্চাকাচ্চাও হল গুটিকয়েক। সকাল সন্ধেয় খুব গান শোনা গেল বছর খানেক। অবশেষে সেই চিমনি ছটকাটে সরু হয়ে দেয়াল ফুড়ে সোজা উঠে গেল আকাশে। আস্ত একটা পাঠাকে কাবাব বানানো যায় এমন একটি কড়া উপুড় হল উনুনের মুখে। কড়া যেদিন এল সেদিনও প্রতিবেশী বললেন, যাক, এতদিনে তা হলে পেলে। এইবার চিমনি ফিট করে ভেসে পড়ো সাত সমুদ্রের জলে।

চিমনি দিয়ে যেদিন ভলকে ভলকে ধোঁয়া উঠল আকাশে, সেদিন কী আনন্দ! জমিদারবাবু যেন পায়রা ওড়াচ্ছেন! ব্র্যাভো, ব্রাভো, হোয়াট এ গ্র্যান্ড সাকসেস! প্রতিবেশীরা দেখতে এলেন জনে জনে। একটা কল বানিয়েছ বটে হরিশঙ্কর, তোমার মাথা আছে! ব্যান্ডেজ করা ডান হাত তুলে। অভিনন্দনের প্রত্যুত্তর জানাচ্ছেন আহত হরিশঙ্কর হাসিমুখে। চিমনি ছাদে ওঠার আগে মোক্ষম একটি লাথি ঝেড়ে গেছে পিতার ডান হাতে।

সেই কড়া এখন আমাদের প্রায় কাত করে ফেলেছে। ভলভল করে ধোঁয়া উঠছে। কড়া বিদ্রোহ করে বসে আছে। টানা হ্যাঁচড়া চলেছে খুব। কনকের চুল ছুঁড়ে ধোঁয়া উঠছে। অবশেষে তিনি ঘাড়ে চাপলেন। চোখ লাল, জলে ভরা। কনক বলল, বাব্বাঃ, চোখে এখন সরষেফুল দেখছি।

কন্নকের চালচলন দেখে মনে হচ্ছে মনটা বেশ সাদা। খুব একটা অহংকার টহংকার আছে বলে মনে হয় না। সুখেনের থিয়োরিই ঠিক। যারা সুন্দর, তাদের সবকিছুই সুন্দর। বিপদ কটা-সুন্দরীদের নিয়ে। দেমাকে মাটিতে পা পড়ে না। ঠোঁট সবসময় উলটেই আছে, আমার ভাই দুধটুধ ভাল লাগে na। মা যখন রাতে শোবার আগে দুধ নিয়ে সাধাসাধি করে আমার কান্না পায়। যাদের দুধ জোটে না, তারা বেশ আছে! সুখেন বলে, মেলামেশা করতেই যদি হয় তো সাতপুরুষে বড়লোকের সঙ্গে মিশতে পারিস, একপুরুষে দেখলেই সাত হাত দূরে ছিটকে পালাবি।

আঁচলে চোখ মুছে কনক বললে, এইবার তোমার কোথায় কী আছে দেখিয়ে দাও। বেশি ঝামেলার দরকার নেই। শরীর আর বইছে না গো! একটু শুতে পারলে ভাল হয়।

আমি একটু-আধটু রাঁধতে পারি। যদি আপত্তি না থাকে!

থাক আর বেঁধে দরকার নেই। তোমার কেরামতি পরে দেখা যাবে।

মাছ ছাড়া সবই আছে। সুব্যবস্থার শেষ নেই। ফর্দ করে বাজার হয়। তেল, নুন, মশলাপাতি সারা মাসের মতো মজুত। লেবেল-আঁটা ঝকঝকে টিনে পরিষ্কার পরিচ্ছন্ন তাকে পাশাপাশি ক্যাটালগ মিলিয়ে অবস্থান করছে। লাইব্রেরির বইয়ের মত। ঝালের দিকে ঝাল, মিষ্টির দিকে মিষ্টি। চিনি, মোটা, মাঝারি, মিহি দানার, ভেলি, কাশীর চিনি। লাইন দিয়ে চলেছে ডালের কৌটো। এমন মানুষকে দেখিয়েই লোকে বলে, বিয়ে হলে তোমার বউ বড় সুখে থাকবে হে। আর কী হবে! সবই তো শেষ হয়ে গেছে। মা তোতা আর ফিরে আসবে না। কনককে দেখে মনটা কেমন যেন করে উঠছে। স্বপ্নে পুরনো ঘটনা মানুষ দৃশ্য দেখা দিয়ে ভেসে চলে যায়। মায়ের চেহারা আমার মনে নেই। যাঁরা দেখেছেন তাদের বর্ণনা থেকে একটা সাদৃশ্য তৈরি হয়েছে কল্পনায়। আমার মা বোধহয় কনকের মতোই দেখতে ছিলেন। পাতলা পাতলা পায়ের চেটো, ছিপছিপে গড়ন, কোমর-ছাপানো চুল। আমি অবশ্য ভোলামামার মতো আমার মা এসেছেন, আমার মা এসেছেন বলে চিৎকার করব না। ভোলামামার এই পাড়াতেই বাস। মাছের ভেড়ি আছে। রোজ রাত বারোটার সময় মদ খেয়ে বাড়ি ফেরেন। মামি রোজই ঝাটাপেটা করেন। এক এক ঘা ঝাটা পড়ছে পিঠে, মামা চিৎকার করছে, আমার মা এসেছে, মা। মায়েরা যেমন ছেলেকে মুখপোড়া বলে, মামিও তেমনি মামাকে মুখপোচ্ছা। বলেন, ঠিক ওই সময়টিতে। পাড়ার গিন্নিবান্নিরা সেই স্ত্রীলোকটিকে সোহাগ করে বলেন, আহা তোমার কী ভাগ্য মা, রোজই ঝেটিয়ে স্বামীকে ঘরে তুলতে হয়। তবে এই গ্রীষ্মের দুপুরে কোনও এক রমণীর চলনে বলনে অতীতের দিন ফিরে এসেছে মনে করে মন যদি সুখী হতে চায়, তোক না!

এই হল তোমার গিয়ে আলু। কনক হিসেব মেলাচ্ছে। পটল, কুমড়ো, তেঁড়স, ঝিঙে, করলা, বরবটি, পেঁপে, কাঁচকলা, মোচা, ঘোড়, কিছুই দেখছি বাকি নেই। ও বাবা, ডুমুরও রয়েছে দেখছি। তুমি কী খাবে?

আমার যে-খানা পাকানো আছে সে খানা দেখলে কনক ঘাবড়ে যাবে। যেমন তার বর্ণ, তেমনি তার গন্ধ।

আমার আছে রুগির ঝোল আর গলা ভাত। সবে পেটের অসুখ থেকে উঠেছি তো!

তা হলে আমিও ঝোল ভাত করে ছেড়ে দিই।

ডিম আছে।

না ডিম চলবে না গো। বাবার আবার অনেক বায়নাক্কা। ডিম খেলে মানুষের পেট গরম হয়। পেট গরম হলে মাথা গরম হয়। ডিম না খেয়ে বাবার মাথা যে কত ঠান্ডা হয়েছে দু-এক দিনের মধ্যেই টের পাবে। যাক উনুন ধরতে ধরতে চানটা সেরে ফেলা যাক। তোমাদের চানের ঘর?

নীচে। চৌবাচ্চায় জল আছে। পাতকো থেকে টাটকা তুলে নেওয়া যায়।

তা হলে আমিই আগে যাই।

মুকু বেড়াতে বেড়াতে এপাশে চলে এসেছে। এরই মধ্যে চুলটুল খুলে ফেলেছে। হাতে একটা চিরুনি। পেছনটা রুপো বাঁধানো। চুলের ডগা ধরে খেচাত খেচাত করে বারকতক আঁচড়ে বললে, বাড়িটা বেশ নির্জন, না রে দিদি?

জন্তুজানোয়ারও আছে। রাত আসুক দেখতে পাবি।

ওপাশ থেকে ডাক ভেসে এল, মুকু, মুকু, আমার সুটকেসের চাবি কোথায়, মুকু, আমার সুটকেসের চাবি কোথায়?

আসি, বলে মুকু চলে গেল। এরা দু’বোনই কেউ ডাকলে আসি বলে উত্তর দেয়। গলার স্বরও বেশ মিষ্টি।

আর কী কী ভাল ভাল জিনিস স্বভাবে লুকিয়ে আছে কে জানে? আমার পিতাঠাকুর প্রথমে মুগ্ধ হবেন, তারপর আমার স্বভাবের খুঁত বের করে, এই উৎকৃষ্ট উদাহরণের পাশে ফেলে আমাকে নীচে নামাতে নামাতে মনুষ্যাধম জন্তু বলে, তলায় একটি রেখা টেনে দেবেন।

পেছন মহল ছেড়ে বার মহলে এসে দেখা গেল এলাহি ব্যাপার। বিশাল ট্রাঙ্কের ডালা খোলা। তার মধ্যে শুধু বই আর বই। জামা, কাপড়, জুতো, ছাতা, লাঠি, চশমা, তোয়ালে, গামছা, ধরাশায়ী। সৈনিকের মতো চারপাশে ছড়ানো। একটা সুটকেস মুখ ভার করে পড়ে আছে একপাশে। তার সামনে থেবড়ে বসে আছে মুকু।

মেসোমশাই হাঁটুতে চাপড় মারতে মারতে বললেন, তুমি আজকাল ভীষণ কেয়ারলেস হয়ে যাচ্ছ মুকু। আমার বেশ মনে আছে তোমাকে আমি চাবিটা দিয়েছি। দেবার সময় এ কথাও বলেছি, দেখো হারিয়ো না যেন।

মুকু খুব ধীর গলায় বললে, সব চাবিই ঠিক রইল, আর ওটাই হারিয়ে গেল?

এ কথার মানে? তার মানে তুমি বলতে চাইছ, আমি মিথ্যে কথা বলছি! তোমাকে না দিয়ে বলছি দিয়েছি। আমি তোমার চোখে এত হীন, এত নীচ! তা হলে তো আমার আর বেঁচে থাকা চলে না। আমার আত্মহত্যাই করা উচিত। তোমার মা ঠিকই বলে, মেয়েরা কখনও আপনার হয় না।

মুকুর মুখ চুন। কনক কিছু বলব বলব করেও বলার সাহস পাচ্ছে না। মেসোমশাই টেবিলের ওপর থেকে টুপিটা তুলে নিলেন। মনে হয় টুপি পরেই আত্মহত্যা করবেন। যেতে হলে সেজেগুঁজেই যাওয়া ভাল। আমাদের পাড়ার গবা গামছা পরে গলায় দড়ি দিয়েছিল। মহিলারা। দেখতে ছুটলেন। ফিরে আসতে আসতে বললেন, মুখপোড়া ভারী অসভ্য। কুমুদবাবু ফুলশয্যার পোশাকে গলায় মালাটালা পরে কলকাতার ভাল হোটেলে ঘর ভাড়া নিয়ে বিষ খেয়ে মারা গেলেন। নীল চিঠির কাগজে লিখে গেলেন, চিন্তামণি, আমার এই দেহখানি তুলে ধরো, তোমার ওই দেবালয়ের প্রদীপ করো। ইতি, কুমুদের লাশ। কে এই রমণী! সবাই বললে, ফিমের হিরোইন।

টুপিটা তুলতেই কনক কলম্বাসের আমেরিকা আবিষ্কারের গলায় বললে, ওই তো আপনার। চাবি।

মেলোমশায় ভূত দেখার মতো চমকে উঠলেন। রিঙে লাগানো ছোট দুটি চাবি। মুকু ফোঁস করল। কপাল ক্রমশ হাঁটুর দিকে ভাঙছে। পিঠ নুয়ে পড়ছে। ফুলে ফুলে উঠছে। মেসোমশাই বললেন, বয়েস বাড়ছে, বয়েস। কিচ্ছু করার নেই। এজলাসে উঠে বাদী বিবাদী নাম ভুল হয়ে যায়। ছ’বার কোঁত পেড়ে আজকাল শিবস্তোত্র পড়তে হয়। বাতে ধরেছে। তবু কান্না! কনক, আমার হয়ে ক্ষমা চেয়ে নাও। বলো, টু আর ইজ হিউম্যান, টু ফরগিভ ডিভাইন।

কনক মুকুর পিঠে হাত রেখে বললে, কী হচ্ছে কী? শুধু শুধু কাঁদছিস কেন?

দিদির কথায় ফল উলটো হল। মুকু হাপরের মতো ফুলতে লাগল আর সাপের মতো হিসহিস।

বাড়ি ভরে গেছে মেয়েলি জিনিসপত্রে। লম্বা লম্বা শাড়ি নেমে গেছে দোতলা থেকে একতলায়। তারে ঝুলছে সায়া, ব্লাউজ। বারান্দায় হিল-তোলা জুতোচুল বাঁধার ফিতে, মাথার কাটা, সেফটিপিন, মাথায় মাখার তেল, সাবান। সারা বাড়িতে একটা মেয়েলি গন্ধ। জানি না বাবা, পিতাঠাকুর ফিরে এসে কী মূর্তি ধরবেন। একটা নয়, দু-দুটো মেয়ে। ছোট হলে কথা ছিল না, বেশ বড়সড়। অতিথিরা খাওয়াদাওয়া সেরে দক্ষিণের ঘরে একটু কাত হয়েছেন। দীর্ঘ ট্রেনভ্রমণের ক্লান্তি কাবু করে ফেলেছে। মেসোমশাইয়ের নাক ডাকছে মিঠে সুরে। যতটুকু জানা গেল, এঁরা মাসখানেক থাকবেন। মুকু বি এ পরীক্ষা দেবে, কনকের হবে চিকিৎসা। টনসিলে বেচারা বড়ই ভুগছে। কনক বি এ পাশ করে বসে আছে। আরও পড়বে না বিয়ে দিয়ে দেওয়া হবে, এই নিয়ে দোটানা চলছে। পড়লে ফিলজফি নিয়ে এম এ করবে। অসম্ভব ভাল রাঁধে। এত সুন্দর ঝোল বেঁধেছিল, মুখে লেগে আছে এখনও। ওই সেই সংগীতের মতো। পিতা রান্নার থিয়োরি খুব ভালই জানেন, প্র্যাকটিক্যালে কনকের কাছে গোহারান হারবেন।

আমিও শুয়ে পড়েছি। আরাম হারাম হ্যাঁয় নোটিশটি আপাতত উলটে রেখেছি মনের দেয়ালে। যেখানে শুয়ে আছি, সেখান থেকে কনক আর মুকুর পা দেখা যাচ্ছে। মেসোমশাইয়ের ভুড়িটি ওঠানামা করছে নিশ্বাসের তালে তালে। নির্জন দুপুরে আড় হয়ে শুয়ে শুয়ে যুবকের যুবতীর সুডৌল পদযুগল দর্শন সম্পর্কে শাস্ত্রের কী সাবধান বাণী আছে জানি না। চোখ যদি অনবরতই ওদিকে চলে যেতে চায় তা হলে আমি কী করতে পারি। বিল্বমঙ্গল হয়ে যাব? রে চক্ষু, এই কাটার খোঁচায় দিলুম তোর বারোটা বাজিয়ে। সে মনের জোর আমার নেই। বাঁ দিকের দেয়ালে ক্যালেন্ডারে কেষ্টঠাকুর বসে আছেন কদমতলায় নধর একটি গাভীর গলা জড়িয়ে। সেদিকে তাকাতে কী হয়! দ্বারকা মথুরা হয়ে সোজা কুরুক্ষেত্রে চলে যাও না কেন! সেখান থেকে ঠেলে ওঠো মহাপ্রস্থানের পথে। মন যার লোভী সে হবে সন্ন্যাসী! কুঁজোর চিত হয়ে শোবার শখ। একবার করে ক্যালেন্ডারের দিকে ঘাড় ঘোরাচ্ছি, ঘাড় অটোম্যাটিক ঘুরে যাচ্ছে উলটো দিকে। লাল মেঝের ওপর দিয়ে চিনি-লোভী পিঁপড়ের মতো দৃষ্টি গুটিগুটি গিয়ে ঠেকছে সঠিক স্থানে। পা। পা থেকেই কি পাপ শব্দ এসেছে। ভাষাতত্ত্ববিদরা বলতে পারেন। সায়ার সামান্য অংশ, শাড়ির পাড়। চিত্ত বড় চঞ্চল হয়ে উঠছে। যে নিজেকেই নিজে সামলাতে পারে না, সে সামলাবে জগৎ! এই বড় বড় চোখে তাকিয়ে। কামিনীকাঞ্চনাসক্ত তাবৎ মানবকুলকে স্তম্ভিত করে ফেলবে! দ্বিতীয় বিবেকানন্দ হয়ে পৃথিবী কাঁপাবে! কুলকুণ্ডলিনী জেগেছে ঠিকই তবে তিনি সহস্রারে না উঠে নীচের দিকে নেমে বসে আছেন। ভিমরুলের চাকে খোঁচা। এই তো গত পরশু দিনই পড়লুম, শ্রীরামকৃষ্ণ বলছেন কামিনীকাঞ্চন ভোগ। যে-ঘরে আচার, তেঁতুল আর জলের জালা, সে ঘরে বিকারের রোগী থাকলে মুশকিল। আমি কি বিকারের রোগী! তিন দিন আগে আমাশার রোগী। আজ দেখছি বিকারের রোগী! মনের কোনও উন্নতি হয়নি। অহংকার চূর্ণ বিচূর্ণ হয়ে গেল। আহা, ছি ছি।

রাস্তায় দাঁড়িয়ে বাজখাঁই গলায় সুখেন চিৎকার করছে, পিন্টু, পিন্টু। একটা গলা করেছে বটে। যেমন ষাঁড়ের মতো চেহারা, তেমনি গলা। স্কুলে পণ্ডিতমশাই সুখেনের নাম রেখেছিলেন, সুখেন ষণ্ড। দিবাস্বপ্ন চটকে গেল। মেসোমশাই ধড়ফড় করে উঠে বসে বললেন, কে, কে? উঠবেনই তো। গলা শুনে মরা মানুষও উঠে বসবে। জানলার ধারে গিয়ে বলছি, দাঁড়া দাঁড়া, মেসোমশাই। আমাকে ঠেলে সরিয়ে দিয়ে মেঘগর্জনের সুরে বললেন, অসভ্যের মতো চেঁচাচ্ছ কেন, রাসকেল! মেরে মুখ ছিঁড়ে দোব। সুখেন কেমন যেন হয়ে গেল। এই ধরনের আকাশবাণীর জন্যে প্রস্তুত ছিল না! এ আবার কে রে বাবা! বোঝে ঠ্যালা! বাবারও যেমন বাবা থাকে, যাঁড়ের ওপরেও ষাঁড় থাকে।

আমাকে প্রশ্ন করলেন, ছেলেটি কে? তোমার বন্ধু?

আজ্ঞে হ্যাঁ।

ইডিয়েট।

কনক আর মুকু দু’জনেই উঠে এসেছে চোখ রগড়াতে রগড়াতে। পৃথিবীর সমস্ত পিতাই যেন ষড়যন্ত্র করে বসে আছেন৷ বজ্রের মতো কঠোর। দাদু না হওয়া পর্যন্ত কোমল হব না। স্রেফ চাবকে যাও। মেয়েদের এক ধমক লাগালেন, ওখানে কী, ওখানে। যাও ভেতরে যাও। জানোয়ার দেখোনি?

ধমক দিয়ে ভালই করেছেন। আমার সমর্থন আছে। সুখেনের সামনে সুন্দরীদের না বেরোনোই উচিত। যেমন করেই হোক সুখেন ভাব জমাবে। উভয়পক্ষ ক্রমশই জমাট হয়ে উঠবে। অন্য কেউ আর পাত্তা পাবে না।

সুখেন বলে, তোমরা যে যাই বলল, আমার জন্ম মেয়েদের জন্যেই। খেদিই হোক, বঁচিই হোক, অপ্সরাই হোক, সব আমার। বেশ হয়েছে ব্যাটা। চেঁচা গাঁক গাঁক করে।

নীচে নেমে দরজা খুলতেই সুখেন বললে, লোকটা কে রে?

মেসোমশাই।

রাস্তায় দেখা হোক, একদিন পেছন থেকে কাছা খুলে দিয়ে পালাব।

খুলে দেখ না! জজসাহেব। ঘানি ঘুরিয়ে ছেড়ে দেবেন।

মেয়েদুটো কে রে? নিচু ফিসফিসে গলায় সুখেন জানতে চাইল।

মেসোমশাইয়ের মেয়ে।

সুখেন সামান্য দমে গেল। সুর পালটে বললে, জজসাহেবের মেজাজ এইরকম না হলে মানায় না। কত মারাত্মক মারাত্মক আসামিকে ফাঁসিতে লটকাতে হয় বল? চল, ওপরে চল, প্রণাম করে ক্ষমা চেয়ে নিই।

তুমি যাও ডালে ডালে। তোমাকে আমি চিনি না! মাতামহের গান, থেকে থেকে যেন মাগো লুচির গন্ধ পাই। আর একটু ভয় না দেখালে সুখেন ঠেলেঠুলে ওপরে উঠে পড়বে, তারপর ব্যাপার কোথায় গিয়ে ঠেকবে কে জানে? আকাশপ্রদীপ হয়ে বসে থাকবে। যেমন করেই হোক সুখেনকে ঠেকাতে হবে।

প্রণাম করার চেষ্টা আর কোরো না। ভীষণ রাগী মানুষ। আইনের কোন ধারায় ফেলে দেবেন জীবনটাই নষ্ট হয়ে যাবে। এই তো সকালে যখন এলেন, পেছন পেছন পুলিশের দুটো গাড়ি এল। এরই মধ্যে বড় দারোগা তিন বার সেলাম বাজিয়ে গেলেন। এই রকে বোসো। এখন মাসখানেক আর এ বাড়ির ত্রিসীমানায় ঘেঁষার চেষ্টা কোরো না।

সুখেন মন খারাপ করে রকে বসে পড়ল। বাইরে গ্রীষ্মের দাবদাহ। বেলা পড়ে এসেছে। পথে লম্বা লম্বা ছায়া। উত্তাপ কিন্তু এতটুকু কমেনি। ঢোকার গলিতে এই রকটি বেশ ঠান্ডা। ভেতর বাড়ি থেকে লম্বা একটা নর্দমা এই পথেই বাইরে চলে গেছে। একটু-আধটু গন্ধ নাকে এলেও গ্রীষ্মের দুপুর কাটাবার বড় ভাল জায়গা। বসে বসে প্রাণের কথা মনের কথা বলো নিশ্চিন্ত আরামে। সুখে বললে, দেশলাইটা আন না একবার।

দেশলাই? তুই এখানে সিগারেট খাবি নাকি?

কেন, কী হয়েছে?

আমাকে বাড়িছাড়া করতে চাস? সিগারেটের গন্ধ ওপরে উঠবে, তারপর আমার কী হবে?

তুই দেখছি ভয়ে ভয়েই মরলি। মায়ের আঁচল-ধরা ছেলে দেখেছি, বাপের এমন কাছা-ধরা ছেলে দেখিনি! তোর ওই মেয়েলি মিনমিনে স্বভাবটা ছাড়া পৃথিবীটা অনেক অনেক বড়। পুরুষ হয়ে জন্মেছিস সবরকমের অভিজ্ঞতা না হলে পরে ওই বেচারার মতো পড়ে পড়ে মার খাবি সারাজীবন। তোর বাবাই তোর মাথাটি খেয়েছেন। মা-মরা ছেলে মা-মরা ছেলে বলে আগলে আগলে এমন একটি বস্তু তৈরি করেছেন, এরপর শাড়ি পরিয়ে কপালে টিপ এঁকে কারুর পুত্রবধূ করে সাত পাকে ঘুরিয়ে না দেন।

তোর মতো এঁচড়ে পেকে লাভ নেই।

তুমি আর এঁচড়টি নেই ভাই। মেঘে মেঘে মন্দ বেলা হয়নি। তুমি একটা খাজা কাঁঠাল। খবর পেয়েছি, বেশ সিঙ্কিং সিঙ্কিং ড্রিঙ্কিং ওয়াটার হচ্ছে।

তার মানে?

মানে? তুই আজকাল রেগুলার ওই পোডড়া মন্দিরটায় যাস কেন?

কোন পোড়ো মন্দির?

কিছুই যেন জানিস না, না? বিন্দুবালার শীতলাতলায়?

সাধন ভজন করতে।

এত দেবদেবী থাকতে মা শীতলা! কস্মিনকালে তুই কোনও শীতলাসিদ্ধ মহাপুরুষের নাম ইতিহাসে পেয়েছিস? কালী, তারা, শিব, দুর্গা, শোনা গেছে। তা, মা শীতলা তো সামনে বসে আছেন। গাধার পিঠে, ঝাটা হাতে, তুমি ব্যাটা পেছন দিকে বিন্দুবালার দাওয়ায় গিয়ে ওঠো কেন? ওখানে তোমার কী মধু আছে?

কোনও মধুই নেই।

মারব ব্যাটা এক থাপ্পড়। ছায়া আর মায়ার নাম শুনেছিস?

বিন্দুবালার ভাইয়ের মেয়ে। কেন কী হয়েছে? কেউ কোথাও নেই তাই পিসির কাছে মানুষ হচ্ছে। তাতে খারাপ কী হয়েছে?

ওদের কিছুই খারাপ হয়নি, হয়েছে তোর। তুই এবার দয়ে পড়ে মজবি। মজবি কী, রিপোর্ট বলছে মজে গেছিস।

সেকী রে? ছায়া তো পিসির মতো গেরুয়া ধারণ করে সন্ন্যাসিনী হয়েছে। আর মায়া? অতি সাদাসিধে ভাল মেয়ে।

ঘুঘু তুমি ভিটে দেখেছ, এইবার ফঁদ দেখবে। সে ফাঁদে পড়লে তোমার পিতারও ক্ষমতা নেই টেনে বের করেন। ওই মা শীতলার গাধা হয়ে দাওয়ায় বাঁধা থাকবে।

আরে রাখ!

নাবালক ছেলে, বাড়ি বসে হেঁশেল ঠেলিস, মেয়েরা যে কী কল বুঝবে সেদিন, যেদিন ছায়া, মায়া আর বিন্দুবালা একসঙ্গে চেপে ধরবে।

জানিস, আমি মেয়েদের পায়ের দিকে ছাড়া আর কোনও দিকে তাকাই না?

পা বেয়েই সুড়সুড় করে পিঁপড়ে ওপর দিকে ওঠে। ব্যাধ কাঠির ডগায় আঠা মাখিয়ে পাখি ধরে, জানিস তো?

সুখেন খুব খানিকটা জ্ঞান দান করে উঠে পড়ল। নতুন নেশা ধরেছে, সিগারেট। এখানে বসে অন্যান্য দিন গোটা তিনেক কেঁকা হয়ে যেত। ছাদে উঠে উত্তর দিকের আলসেতে দাঁড়িয়ে পাশের বাড়িতে টোপ ফেলার চেষ্টা হত। অনেকদিন ধরেই চেষ্টা চলছে। আমার জন্যেই বিশেষ সুবিধে করতে পারছে না। সুখেন ব্যায়াম করে ভাগবে, কান ধরে নিলডাউন হব আমি। মেয়েটিও কম যায় না। মা আরও সাংঘাতিক। সেই যে শ্রীরামকৃষ্ণ বলছেন, মেয়েদের ঢং বেশ বুঝতে পারতুম। তাদের কথা, সুর নকল করতুম। কড়ে রাঁড়ি বাপকে উত্তর দিচ্ছে যা-ই। বারান্দায় মাগিরা ডাকছে, ‘ও তোপসে মাছওলা’। নষ্ট মেয়ে বুঝতে পারতুম। বিধবা সেজে সিঁথে কেটেছে আর খুব অনুরাগের সঙ্গে গায়ে তেল মাখছে। লজ্জা কম, বসবার রকমই আলাদা। আমিও আজকাল বুঝতে পারি ঠাকুর। ঈশ্বরকে চিনতে পারি না, হয়তো পারব একদিন, আর একটু ঝড়ঝাঁপটা খাই, মেয়েছেলের ব্যাপারস্যাপার বেশ ভালই বুঝি। উত্তরের ওই বাড়িটি বড় সুবিধের নয়। ওদিককার ছাতে পিতাঠাকুরের চন্দ্রমল্লিকার চাষ আবাদ। গোটা পঞ্চাশ টব বসানো আছে। তিনি ও তল্লাটে যান ছাতা মাথায় দিয়ে। তারস্বরে ইংরেজি কবিতা আবৃত্তি করতে করতে। কুহকিনীর হাত থেকে যেন শেক্সপিয়ারই রক্ষা করবেন, ক্যানস্ট দাও নট মিনস্টার টু এ মাইন্ড ডিজিজড। প্লাক ফ্রম দি মেমারি এ রুটেড সরো। একবার নিচু হয়ে বসতে পারলে শেক্সপিয়রের ছুটি। তখন গাছেদের সঙ্গে নানা সমস্যার আলোচনা। সবই তাদের জগতের। নাঃ তোমাকে আর বাড়তে দিলে না মানু। বুরুশ দিয়ে পাতার পিঠ থেকে গুঁড়ি গুঁড়ি কালো পোকা ঝাড়েন আর বলেন, ব্লাডি বাগারস।

Nothing begins, and nothing ends.
That is not paid with moan.
For we are born in other’s pain
and perish in our own.

মাথায় মাথায় তিনটে ম্যাগনাম সাইজের বউ। গতর যেন ফেটে পড়ছে। তেমনই বেশবাস। সখি আমায় ধরো ধরো। মালা পরো পরো। পুরুষ একজন। কদাচিৎ তাঁকে দেখা যায়। ঘাড়ে শাঁস বের করা চুলের ছাঁট। ঠোঁটদুটো পুরুপুরু। সিল্কের পাঞ্জাবি। দিশি ধুতি। তিনি যেন সবসময় এলিয়েই আছেন। মুখ সদাসর্বদাই হাসিতে তুবড়ে তাবড়ে আলুর পুতুল। সুখেন ঠিক জলেই চার করেছে। মাছের নাম জবা। বেশ খেলিয়ে মাছ। আমার তাতে কাঁচকলা। বেল পাকিলে কাকের কী? তবে এটাও ঠিক, এদিকে এত বড় একটা ছাত পড়ে থাকতে আমারই বা কী দরকার ঘেঁষটে ঘেঁষটে ওই উত্তরে যাবার? বিকেলে রোদ পড়ে এলে ঝারি নিয়ে ফুলগাছে জল দেওয়া আমার একটা ডিউটি। মাথা নিচু করে সেই কর্মটি সমাধা করে সরে পড়লেই হয়! তা হলে অত বারেবারে, আড়ে আড়ে তাকানো কেন? এ আবার কেমনতর ব্রহ্মচারী! ওই জবাসুন্দরীর জন্যে পিতাকে একদিন নির্ভেজাল মিথ্যে বলেছি। গাছে এসেছে ফুল। তার নাম স্নোবল। চুলে আয়েশ করে চিরুনি চালাতে চালাতে জবা নিজে থেকেই বললে, কী সুন্দর হয়েছে! ব্যস, আর যায় কোথায়? মনের সাঁকো নড়ে ঝপাত করে জলে। ফুলের ব্যাখ্যানা হল পনেরো মিনিট। জবা হেসে হেসে, চোখ বড় বড় করে, ছোট ছোট করে, মাথার ওপর হাত ঘুরিয়ে চুল বাঁধতে বাঁধতে, খোঁপা করতে করতে শুনে গেল। যেন কতই মনোযোগী চন্দ্রমল্লিকার ছাত্রী! লাল ব্লাউজ আর হাত তোলাতুলির শোভা দেখতে দেখতে কুপোকাত। কোথায় ব্রহ্ম, কোথায় আদি অনন্ত! স্রোতের মুখে কুটো। সেয়ানা মন মাঝেমধ্যে খোঁচা মারছে, অ্যায়, কী হচ্ছে! আর একটা মন সঙ্গে সঙ্গে ধমকে উঠছে, চোপ। একে বলে সৌন্দর্যের শিল্পীসুলভ কদর। নারীর সৌন্দর্য। কালিদাস বড়, না লোমপাদ মুনি বড়? র‍্যাফেল, দাভিনচি, না স্বামী অঘোরানন্দ! ঈশ্বর তা হলে মহিলাদের সৃষ্টি করেছিলেন কেন?

বাসশ্চিত্ৰং মধু নয়নয়োর্বিভ্রমাদেশ দক্ষং
পুষ্পেদ্‌ভেদং সহকিশলয়ৈর্ভুষণানাং বিকল্পান্‌।
লাক্ষারাগং চরণকমলন্যাসযোগ্যঞ্চ

কী বর্ণনা! আমার পিতাও তো এই রচনায় মুগ্ধ, বিমুগ্ধ, তড়িতাহত। কালিদাস, দি গ্রেট পোয়েট বলে আত্মহারা হয়ে যান। রূপ বর্ণনা মহৎ, রূপ দর্শন লাম্পট্য, এ যুক্তি কি জজে মানবে? তুই মনের আনন্দে তারিয়ে তারিয়ে জবাকে দেখ।

তন্বী শ্যামা শিখরদশনা পবিম্বাধরোষ্ঠী মধ্যে ক্ষ্যামা চকিতহরিণীপ্রেক্ষণা নিম্ননাভিঃ শ্রোণীভারাদলসগমনা স্তোকনা স্তনাভ্যাং খেয়োদাত, বৃষকাষ্ঠ অধরপণ্ডিতও এই অংশটি আবৃত্তি করতে করতে রসে হাবুডুবু রাজভোগের মতো হয়ে যেতেন। কই ফণিবাবুকে কি কেউ এমন করে দেখে কাব্য করবেন,

নধরকান্তি ঘটোৎকচং
তিন তিসি লোটাগদানং।
সগুমফ গোলাকারং
টাকান্বিত তিন্তিড়িবৃক্ষং ॥

সেই জবাসুন্দরীকে সম্মোহিত হয়ে একটি স্নোবল উপহার দিয়ে ফেলেছিলুম। জীবনে প্রথম এবং আপাতত শেষ পাপকার্য। গভীর রাতে চোখ বুজলেই জবাসুন্দরীর রক্তরাঙা উন্নত ব্লাউজ। সূর্যের দিকে কিছুক্ষণ তাকিয়ে চোখ বুজলেই জবাকুসুমসঙ্কাশং, ঠিক সেই অবস্থা। অনুশোচনায় মরি আর কী? এ কী অধঃপতন। জবাকে কুসুম দেবার এত মালী ছিল যে আমার মতো কৃশকায় খেকুরে ছাদমালীকে আর মনেই রইল না। সেই ঘটনা থেকে বুঝেছিলুম, আমি একটি বোকাপাঁঠা। হয় বৃষকাষ্ঠ, না হয় কাঠিয়াবাবা হবার জন্যে জন্মেছি।

সুখেন একটা ভাল কথা মনে করিয়ে দিয়ে গেল। অনেকদিন হয়ে গেল, মায়া এক শিশি কালি চেয়েছিল। মেয়েটি খুব সুন্দর ছবি আঁকে। হাতের লেখা যেন ছাপার অক্ষর। যখন কাজ করে পাশে বসে দেখতে বড় ভাল লাগে। কেমন করে আঁকছে, রং করছে, লিখছে। পরনে কনট্রোলের লালপাড় সাদা শাড়ি, গেরুয়া ব্লাউজ। পিঠে ছড়ানো রুক্ষ চুল। কেমন একটা শিল্পী শিল্পী চেহারা। সুখেনের সবেতেই পাপ। আমার কেউ কোথাও নেই। ছায়া মায়া তো আমার বোনের মতো। ছায়া আমার চেয়ে বয়েসে ঢের বড়। মুখে বড় বড় বসন্তের দাগ। গেরুয়া নিয়েছে। তার সঙ্গে কারুর কোনও প্রেম, ভালবাসা, বিয়ে হতে পারে? সুখেন শুধু একটা কথাই জানে, যন্তর। ওর বাবার উচিত ছেলের শ’খানেক বিয়ে দিয়ে একটা আড়তে এক বছর বন্ধ করে রাখা। আমার পিতা যেমন রাত বারোটার সময় গলায় ডান্ডা পুরে এক জার মোরব্বা খাইয়েছিলেন জোর করে।

মায়াকে আজ এক দোয়াত কালো কালি দিয়ে আসতেই হবে। দেবার মতো আমার আর কী আছে? পিতার ধনে পোদ্দারি। নানা জিনিস তৈরি তার হবি। লেখার কালি তৈরি তার মধ্যে একটি। বড় কঠিন কাজ। সবচেয়ে দুরূহ কেরামতি হল কালো কালি তৈরি। এতটুকু তলানি পড়বে না, ঝরনা কলমের মুখ দিয়ে সূক্ষ্ম ধারায় বেরোতে থাকবে অবিরাম। বিলিতি কালির কাছাকাছি নিয়ে যেতে হবে, স্টিফেনস সক্রিপ, কুইঙ্ক, ওয়াটারম্যান, সোয়ান। সারি সারি বোতল, মুখে ফেঁদল আর বিভিন্ন ঘনত্বের ফিল্টার পেপার। সারাদিন চুঁইয়ে চুঁইয়ে পড়ছে পরিশ্রুত কালি। নির্জন নিঃস্তব্ধ ঘরে কান পাতলে শোনা যাবে বিলুপতনের শব্দ, টুপ টুপ। এমন সব উপমা মাঝে মাঝে মনে আসে যা কালিদাসের পিতাও ভাবতে পারবেন না। বিশাল পালঙ্কে সময় শুয়ে আছে। ডান হাত ঝুলে আছে পালঙ্কের পাশে। তলায় একটি পাত্র। ধমনী চিরে গেছে ধারালো অস্ত্রে। রক্তের বিন্দু পড়ছে ফেঁটা ফোঁটা। পাণ্ডুর হয়ে আসছে শরীর। দিন যায় দিন যায়। গ্রিক পদ্ধতিতে সময়ের আত্মহত্যা। এর নাম কালি-ঘর। মাটির গামলায় বেদানার ভোলা আর হরীতকী পচছে। তাকে তাকে অসংখ্য শিশি। কোনও কোনও শিশি মৃত্যুর মতো নীল, খুনির মতো লাল। চিনির দানার মতো শুভ্র জরানো এক ধরনের পদার্থ, অকজ্যালিক অ্যাসিড। বাদামি ট্যানিক অ্যাসিড। ঝুলের আবরণে হরেক শিশি বসে আছে মৃত্যুর পরোয়ানা নিয়ে। ঘরটা তেমন আলোকিত নয়। শীতের শেষ দ্বিপ্রহরে ঢুকলে মনে হবে প্রেতাত্মা নৃত্য করে চলেছে নূপুর পায়ে।

মায়ার জন্যে কালি আমাকে চুরি করতে হবে। এ শিশি থেকে একটু, ও শিশি থেকে একটু। এ চুরিতে নীতির প্রশ্ন নেই। অর্থ নয়, অলংকার নয়, সামান্য তরল পদার্থ। বিদ্যার্জনের প্রয়োজনে লাগবে। তা ছাড়া একটা গর্বও আছে। আমার পিতা কী না পারেন? আমি সামান্য হলেও তিনি অসামান্য। কত কী পারেন, যা কেউ পারে না।

শিশিতে কালি ঢালাচালি চলছে, কনক এসে ঘরে ঢুকল। নীচে কী করছিলে এতক্ষণ? এঁদো স্যাঁতস্যাঁতে গলিতে?

ওই যে আমার এক বন্ধু এসেছিল, সুখেন।

বেশ দেখতে ছেলেটিকে। কেমন সুন্দর স্বাস্থ্য। তোমার যদি ওইরকম হত। একটু চেপে খাওয়াদাওয়া করো না! দুধ, ঘি, মাখন। সকালে তোমার খাওয়া দেখলুম তো! পাখির আহার!

হুম!

স্বাস্থ্য তুলে কথা বললে উত্তর এক অক্ষরেই হওয়া উচিত। শরীর ছাড়া পৃথিবীতে আর যেন কিছুই নেই। এ যেন গো-হাটায় গোরু বিক্রি। নধর গাভীটির দিকে সবাই দৌড়োবে। দাম উঠবে চড়চড় করে। শাস্ত্র বলছেন, দেহটা কিছুই নয়। আসল হল আত্মা। সে বাবা এমন জিনিস, আগুনে পোড়ে না, জলে গলে না, ধারালো অস্ত্র দিয়ে কাটা যায় না। নাও, কী করবে করো। মেয়েদের। কথাবার্তাই যেন কেমন কেমন। চুল-ওলটানো ফচকে ছোঁড়া দেখে চোখ ট্যারা হয়ে গেল। কী? না, শরীর! সাতটা বাঘে রুল অফ থ্রি-র হিসেবে রোজ এক ঘণ্টা করে খেলে তিন দিনে সুখেন ফুরোবে। আর আমাকে? বাঘ দেখেও দেখবে না। এক যদি কোনও এয়োস্ত্রী বাঘ কাটোয়ার ভঁটা ভেবে একটু। চিবিয়ে দেখে। তাতে হয়েছেটা কী! সুখেনের ভেতর দেখো, আর আমার ভেতর দেখো! শ্রীচৈতন্যদেবের চেহারা কি গোয়বাগানের ব্যায়ামবীরের মতো ছিল! শ্রীরামকৃষ্ণ পেটরোগা ছিলেন। সারদা মা কাঁচকলার ঝোল ভাত বেঁধে খাওয়াতেন। বুদ্ধদেব কি রোজ গুপেগুড়ার মতো। মুগুর ভাজতেন। পুণ্যের শরীর একরকম, পাপের শরীর আর একরকম। মেয়েরা বোঝে না কেন?

কনক উবু হয়ে আমার গা ঘেঁষে বসল। বসল তো ভারী বয়েই গেল। আমি তো আর সুখেন নই যে ভেতরটা জল থেকে তোলা মাছের মতো ছটফট করবে। আমি তো আগমার্কা ঘি। কোনও ভেজাল নেই। খুব বেসামাল হয়ে পড়লে, একবার শুধু বলব, মা বিপত্তারিণী, রক্ষা করো। গেল, গেল বুঝি সব রসাতলে। কনক ফিসফিস করে বললে, কী হচ্ছে কী এসব? সারি সারি বোতল।!

কালি ফিল্টার হচ্ছে।

কী হবে এত বোতল বোতল কালি?

লেখা হবে।

বাব্বা, মহাভারত লেখা হয়ে যাবে যে! আমার কলমে একটু ভরে দেবে? দেখি কেমন কালি!

এ জিনিস বাজারে মিলবে না। ঝুল কালো। নিবে আটকায় না। যে-কাগজে লিখবে সে কাগজে ভাগ্যের লিখনের মতো চিরস্থায়ী হয়ে যাবে।

বাঃ, পাক্কা সেলসম্যান ভাস্করবাবুর মতো কথা বলতে পারছি। একটুও আটকাচ্ছে না। পিতার ইচ্ছে কালি যদি কালীর মতো দাঁড়িয়ে যায় মহাদেবের বুকে, মহাদেব মানে বাঘমার্কা সাদা কাগজ, আর লজ্জায় যদি জিভটি না বেরোয়, তা হলে নেমে পড়বেন ব্যবসায়। নামও ঠিক, ইলিসিয়াম ইঙ্ক। আমি হব সেলসম্যান। দোকানে দোকানে অফিসে অফিসে ঘুরব। লেখার কালি দিয়ে শুরু করে, স্ট্যাম্প প্যাড় ইঙ্ক, মার্কিং ইঙ্ক, শেষ হবে ছাপার কালিতে।

কনকের সোনার কলমে কালি ভরা হল। এমন কলম আমি জীবনে দেখিনি। নাম লেখা আছে। পার্কার। এঁরা বেশ বড়লোক। চালচলন, সঙ্গের জিনিসপত্র, চেহারা, দেখলেই বোঝা যায় মেসোমশাই লক্ষ্মী এবং সরস্বতী দুই দেবীরই কৃপা লাভ করেছেন।

মাটির যে-গামলাটায় বেদানার খোলা আর হরীতকী পচছিল সেটা হঠাৎ নড়ে উঠল। কনক বললে, ওই দেখো জ্যান্ত কালি। ভুড়ভুড় করছে।

ও অমন হয়, ফার্মেন্টেশন হচ্ছে তো। নিজের জ্ঞান জাহির করতে পেরে বেশ গর্ব হল। গামলা থেকে কী একটা লাফিয়ে উঠে আবার গবাত করে গামলাতেই পড়ে হাবুডুবু খেতে লাগল। কনক বললে, ওই দেখো কালির ন্যাজ বেরিয়েছে।

দু’জনেই গামলার দিকে ঝুঁকে পড়লুম। কালির আবার ন্যাজ কী রে বাবা! পিতা চেয়েছিলেন বিলিতি কোয়ালিটি। তিনি তো ন্যাজ চাননি। ফিল্টার করলে লাল বাদ যাবে কি! বাঁদরকে ফিল্টার করলে মানুষ হবে? ডারউইন সায়েব বেঁচে থাকলে একটা বেয়ারিং চিঠি লিখতুম।

আমিও তো আর এক পণ্ডিত। অনেক ভেবেচিন্তে বললুম, এটা হল সেই ব্যাপার বুঝলে কনক, জলে বিচিলি ভিজিয়ে রাখলে দিনকতক পরে ছোট ছোট সাদা সাদা ন্যালবেলে পোকা হয়, মাছের খাদ্য। কেমন হয় তো?

কী জানি, হয়তো হয়।

কী জানি মানে? আমি নিজে করে দেখেছি। আমার একটা গোল্ডফিশ ছিল। বেড়ালে খেয়ে না ফেললে আজ কত বড় হত। বেদানা কাবুলে জন্মায়, হরীতকী সাধুদের আহার। কাবুলিদের চেহারা দেখেছ? সাত ফুট বাই পাঁচ ফুট। সেই বেদানার খোলা পচে যে পোকা হবে তার আকার আকৃতি একটু বড়সড়ই হবে। এ তো কমন সেন।

আমার থিসিসও শেষ হল আর সেই কাবুলিপোকা তিড়িং করে এক লাফ মেরে, পড়বি তো পড় কনকের কোলে।

ওরে বাব্বা, খেজুর, বলে কনক উলটে পড়ল। সেই পা! পা থেকেই পাপ। পরিপূর্ণ তিনটি বোতল সুন্দরীর পদাঘাতে তিন গুন্ডার মতো তিন দিকে ছিটকে গেল। একেই বলে, ধর্মের কল বাতাসে নড়ে। পিতৃদেবকে রাতে কী কৈফিয়ত দোব?

গল্পের বিষয়:
উপন্যাস

Share This Post

আরও গল্প

সর্বাধিক পঠিত