প্রীতি উপহার: ২১-২৩. কী করে সন্তান গঠন করতে হয়

প্রীতি উপহার: ২১-২৩. কী করে সন্তান গঠন করতে হয়

২১-২৩. কী করে সন্তান গঠন করতে হয়

একবিংশ পরিচ্ছেদ

কুলসুম বলিলেন–কী করে সন্তান গঠন করতে হয় তা তোমাকে জানতে হবে। মায়ের দোষে ছেলে বড় ও ছোট হয়। ছেলে বেয়াদব এ কথা যেন কেউ না বলে। সন্তানের বেয়াদবির জন্য বাপ এবং বেশি করে মা দায়ী। মা যেমন মানুষের ভক্তির পাত্র, তার কাজ। এবং দায়িত্বও তেমনি বেশি। শুধু কাঁদলেই ছেলে বড় হবে না (বড় অর্থ বয়সে বড় নয়,)। ছেলেকে বড় করতে হলে মাকে বিচক্ষণ ও চিন্তাশীল হতে হবে। ছেলের পাঁচ বৎসর পর্যন্ত মা-ই তার চরিত্র গঠন করবেন। তারপর ছেলের অভিভাবক পিতা।

হালিমা জিজ্ঞাসা করিলেন–ছেলের জন্য মা কেন দায়ী?

কুলসুম : ছেলে সর্বদা বাল্যকালে মার কোলে পালিত হয়। মা’র কথা, ব্যবহার শিশু অনুকরণ করে। মার মন যদি উন্নত হয়, তার কথা, এবং আলাপ জ্ঞানপূর্ণ হয়, শিশুর স্বভাব, চরিত্র এবং মনও বাল্যকাল হতে উন্নত ধরনের হতে থাকে। মা যদি বাচাল ও মূর্খ হন, ছেলেও ঠিক তেমনি হবে। মার মুখে ছেলে বড় বড় কথা শিখতে পারে, মার কাছে শিশু নীচতা ও মূর্খতার দান পায়। মা যদি যুক্তির সঙ্গে কথা বলেন, শিশুও যুক্তির সঙ্গে কথা বলতে শেখে। মা শিশুর কাছে একটা জীবন্ত জ্ঞান-ভাণ্ডার, যা পড়বার জন্যে শিশুকে ‘ক’ ‘খ’ শিখতে হয় না। কাগজের ক’ ও ‘খ’ না শিখেও শিশু উপযুক্ত মাতার সঙ্গ-শক্তিতে জ্ঞানে বড় হতে পারে।

পুরুষানুক্রমে মায়ের রুচি ও চরিত্র সন্তানের স্বভাবে প্রতিফলিত হয় বলে অশিক্ষিত লোকেও বংশ-গৌরব করে থাকে। অনেক সময় এই বংশ গৌরব মিথ্যা ভড়ংয়ে পরিণত। হয়, এও ঠিক।

সন্তানের উন্নতির কথা ভাববার আগে মা নিজের জ্ঞান, রুচি ও চরিত্র মার্জিত করতে চেষ্টা করবেন।

মা’র মানসিক শক্তি স্বাধীনতাবোধ ও ব্যক্তিত্ব সন্তানের চরিত্রে ফুটে ওঠে, সন্তানের মনকে স্বাধীনতাবোধসম্পন্ন করতে এবং তার ব্যক্তিত্ব গড়ে তুলবার জন্যে মাকে মানসিক বল সংগ্রহ করতে হবে।

অনেক সময় খুব শিশু বয়সেই সন্তানকে পড়তে বাধ্য করা হয়। এ ভালো নয়। এতে শিশু পড়াশুনাকে ঘৃণা করতে শেখে।

অনেকক্ষণ বসিয়ে শিশুকে ‘ক’ ‘খ’ শিখাবে না। হাঁটবার সময়, কথা বলবার সময় অক্ষর চেনাবে।

একদিন হতে এক সপ্তাহ ধরে মাত্র একটি করে অক্ষর শেখাতে হয়, কিছু হচ্ছে না বলে ধৈর্যহারা হয়ো না। অক্ষর শেখা হলে, প্রতিদিন ১০/১৫ মিনিট করে বই নিয়ে বসতে অভ্যস্ত করবে। খুব বাল্যকালে ছেলেকে পড়াবার জন্যে স্কুলে পাঠাবে না। স্কুলে শিশুর পক্ষে ৩/৪ ঘণ্টা এক জায়গায় বসে থাকা খুব কঠিন। এই নির্যাতনে শিশুর মন ভিতরে ভিতরে নিষ্ঠুর ও নিচ হতে থাকে। স্কুলে যদি পড়া অপেক্ষা খেলার ব্যবস্থা বেশি থাকে, তাহলে শিশুকে স্কুলে পাঠান যেতে পারে।

শিশুরা ছোটকালে বড় লোভী হয়। এ সম্বন্ধে জননীদের বিশেষ সাবধানতা আবশ্যক। লোকে কি বলবে ভেবে ভয় করো না। অন্যে যা ভাবে ভাবুক। শিশুর লোভকে একটা অপরাধ বলেই মনে করতে হবে। লোভের জন্য ছেলেমেয়েকে শাস্তি দিতে হবে।

কোনো ব্যক্তির মনস্তুষ্টির জন্য সন্তানকে মারতে নেই। এতে নিজেই অসম্মান হয়; ছেলেমেয়ে ছোট হলেও তাদের সম্মানে বাপের সম্মান বাড়ে, বিনা কারণে ছেলেপেলের অসম্মান করবে না।

বাল্যকাল হতেই ভাইবোনদের মধ্যে ভাই-এ ভাই-এ, বোন-এ বোন-এ যাতে সদ্ভাব স্থাপিত হয়, সেদিকে যেন লক্ষ থাকে। ঝগড়া করলে এক ভাইকে অন্য ভাই-এর ও এক বোনকে অন্য বোন-এর কপাল চুম্বন করতে বলবে।

এই প্রসঙ্গে একটা অন্য কথা মনে পড়ে গেল–অন্তঃসত্তা হলে স্ত্রীরা সাধারণত অযত্নের ভয়ে মায়ের বাড়ি চলে যান। এটা রমণী-জীবনের একটা মস্ত ভুল। বিয়ের পর স্ত্রীকে ছেড়ে থাকা স্বামীর পক্ষে অন্যায়, এ কথা আমাদের দেশের মানুষ বোঝে না। স্ত্রীর কর্তব্য সর্বদা স্বামীর কাছে থাকা, বিশেষ করে ছেলেপেলে হবার সময়। শিশু অবস্থাতেই সন্তান যদি বাপের কোলে পিঠে মানুষ হবার সুবিধে না পায় তাহলে সে সন্তানের উপর বাপের মায়া হয় না-এ কথা অতি সত্য। এই প্রসঙ্গে আরও একটি কথা বলে নিই। মেয়ের বিয়ের পর মেয়ের বাপ মেয়েকে স্বামীর বাড়ি হতে মাঝে মাঝে নিয়ে যান। মাঝে মাঝে ২/৩ দিনের জন্যে বাপের বাড়ি যাওয়া মন্দ না, বাপ যে ছেলেপেলে না হওয়া পর্যন্ত ঘন ঘন মেয়ে নিয়ে যান, তার কারণ হচ্ছে জামাই-এর প্রতি শ্রদ্ধা ও অনুরাগ বাড়ান।

স্বামীকে ছেড়ে বাপের বাড়িতে বসে থাকা মেয়েদের একটা ভয়ানক বোকামি। যুদ্ধক্ষেত্র ছাড়া স্ত্রীর সর্বদা স্বামীর সঙ্গে থাকাই আবশ্যক। আজকাল যে দিন পড়েছে তাতে পুরুষের মনকে পবিত্র রাখার জন্যে নারীকে সর্বদা স্বামীর পাশে থাকতে হবে। পরদার বাড়াবাড়িতে স্বামীর সঙ্গে বিদেশ ভ্রমণ মুসলমান নারীর পক্ষে কিছু অসুবিধা, কিন্তু বর্তমান এই যন্ত্র যুগে বেঁচে থাকতে হলে এই পরদাটাকে একটুখানি ছিঁড়ে ফেলতে হবে। পিঞ্জরাবদ্ধ পাখি হয়ে শূন্যে বাস করা সম্ভব, মানব সমাজে নয়। নিজে সতী হয়ে পুরুষকে কাজে ও চিন্তায় সকল সময় নির্মল করে রাখাও স্ত্রীর জীবনে একটা বড় কাজ। পুরুষের চরিত্রবলের খুব অভাব; অধিকাংশ পুরুষের কাজে না হোক চিন্তায় পাপ ও দুর্বলতা জড়িয়ে আছে। এটা হয়তো তার স্বভাব, সুতরাং এর জন্যে তাকে দোষ দেওয়া চলে না। প্রাণহীন মিঠাই এর দলা অপেক্ষা মরে যাওয়াই ভালো। কাকে ছোঁ মেরে নিয়ে পালাবে। নারী নিজের মর্যাদা ও চরিত্রের মূল্য নিজেই বুঝুক, সঙ্গীন তলোয়ারধারী পাহারাওয়ালাদের পেছনে কোষাগারে প্রাণহীন রূপার পিঠা হয়ে থাকলে চলবে না।

যা বলেছিলাম-ছেলেমেয়েরা যাতে লোকের সঙ্গে ভদ্রভাবে কথা বলে, সেদিকে দৃষ্টি রাখা চাই। যদি সন্তানকে ভদ্রতা শিখান তাহলেই সে ভদ্র হয়ে ওঠে। শিশুকালে ছেলেমেয়ের সঙ্গে ৪/৫ বৎসর পর্যন্ত খুব সম্ভ্রম করে কথা বলা ভাল। মা বলে ডাকলে ‘জি’ বলা উচিত। এতে ছেলেমেয়েরা শিশু বয়সেই ভদ্র হয়ে ওঠে। বাপ-মা ছেলের সঙ্গে যেমনভাবে কথা বলেন, যেমন করে ব্যবহার করেন সন্তানেরাও তেমনি করে কথা বলতে ও লোকের সঙ্গে ব্যবহার করতে শেখে।

পোশাক-পরিচ্ছেদ সম্বন্ধে আমাদের ছেলেমেয়েরা যেন স্বজাতীয় বৈশিষ্ট্যতা হারিয়ে না ফেলে। ইংরেজ মহিলারা যে পোশাক পরেন এটা কিন্তু মুসলমানদের পোশাক। তবে বর্তমানে হাঁটুর উপরে মেয়েদের পোশাক সেটা কিন্তু নয়। মেয়েকে মেমের পোশাক দিতে বলছি, এ মনে করো না। নারীদের টুপি পরাও ইসলাম সভ্যতা। ছেলের মতো মেয়ের পোশাক কোনো প্রকারেই হওয়া উচিত নয়।

হিন্দু ছেলেমেয়েরা বাল্যকাল হইতেই মানুষকে ঘৃণা করতে শেখে। সঙ্গদোষে নিজের ছেলেমেয়ের, যেন তেমনি রুচি বিকৃতি না ঘটে। মানুষকে ঘৃণা করা পাপ ও অন্যায়, ছেলেমেয়েকে এটা বুঝিয়ে দিতে হবে। এতে জাতির অকল্যাণ হয়। পৃথিবীর কোনো মানুষের স্পর্শে মুসলমান বা অন্য কোনো জাতির পানি বা ভাত নষ্ট হয় না, এ কথাও তাকে বলতে হবে। পৃথিবীতে একমাত্র হিন্দুরাই এই রোগে ভুগছে।

সন্তানকে বাল্যকাল হতে বীরত্ব শেখাতে হবে। কুকুর, বিড়াল ও শেয়ালের ভয় দেখাবে। বাঘকে মেরে এস, বন্দুক তলোয়ার নিয়ে লড়াই করতে যাও প্রভৃতি কথা বললে ছেলের মনের সাহস হয়, পরন্তু আত্মমর্যাদাজ্ঞান বাড়ে–সে কাপুরুষ ও দুর্বল হয় না।

শিক্ষক ছেলেমেয়েকে মারলে, অনেক অশিক্ষিত মা বাপ বিরক্ত হন। শিক্ষক বা কোনো মঙ্গলাকা ব্যক্তি যদি ছেলেমেয়েকে মারেন, বিরক্তি প্রকাশ করবে না।

শিক্ষক ছেলেমেয়েকে বিশেষ কোনো অপরাধে খুব প্রহার করলেও কিছু মনে করবে না। ছেলেমেয়ের কোনো কোনো ভুলকে ক্ষমা করতে হবে, কখন তাকে ভালবাসতে হবে, সে চিন্তাশীল শিক্ষক জানেন। ছেলেমেয়েকে মেরে ফেলা তার উদ্দেশ্যে নয়। না মেরে কাজ চললে তিনি কোনো ছেলেমেয়েকে মারেন না। প্রহার করে তার আনন্দ হয় না কিংবা ঐভাবে তিনি বীরত্বের পরিচয় দেন না।

সন্তানরা যে বই পড়ার উপযুক্ত তাই তাকে পড়তে দিও, লোভ করে ধৈর্য হারিয়ে বেশি পড়তে দিও না। তাতে তার জীবন মাটি হোক। গৃহে অবিবাহিতা শিক্ষক রাখবে না। বিচক্ষণ শিক্ষকই সন্তানের চরিত্র গঠনে সাহায্য করতে পারেন। রাত-দিন পড়বার জন্য শিক্ষক দরকার নেই। শিশুকে অনবরত পড়তে বাধ্য করবে না। তাতে তারা ভিতরে ভিতরে বিদ্রোহী হয় এবং প্রতারণা করবার স্বভাব তৈরি হয়। প্রবীণ শিক্ষকের সংস্পর্শে থাকলে ছেলের মন উন্নত হয়; তার ধারণাশক্তি ও দৃষ্ট প্রসার লাভ করতে থাকে।

কোনো প্রবীণ শিক্ষকের বাড়িতে যদি ছেলেকে .খা যায়, তাহলে বড় ভালো হয়। রাত-দিন পড়বার জন্যে ছেলে সেখানে থাকবে না। হাসি, খেলা, নৃত্য, চীৎকার যদি ছেলে করে, তা যেন ছেলে শিক্ষকের সামনেই করে।

শিশুর শয়তানী ও উল্লাস চীৎকার দেখে বিরক্ত হবে না; তাই বলে ঘরের মধ্যে বিছানার উপর মারামারি-শয়তানী ও ভালো নয়।

ছেলে যেন বাবু না হয়ে ওঠে। তাকে দিয়ে অনবরত কাজ করানো ভালো। তার দ্বারা হীন ও ছোট কাজ করাতে লজ্জা বোধ করবে না।

ছেলেদের গায়ে কখনও সাহেবি পোশাক দেবে না। সাহেবি পোশাক দিতে ঘৃণাবোধ করবে। এতে ছেলে নিজেকে ও নিজের জাতিকে ছোট ভাবতে শেখে।

ছেলেমেয়েরা অনেক সময় অন্ধকারে হাঁটে; কুকুর-বিড়াল দেখে ভয়ে চীকার করে ওঠে; ফলে নানা ব্যাধি হবার সম্ভাবনা।

অত্যধিক মুরুব্বী ভক্তি, কথায় কথায় পায়েল ধুলা মাথায় নেওয়ায় ছেলে-মেয়েদের, মন দুর্বল হয়ে ওঠে। সে মনে করে তার নিজের কোনো মূল্য নেই।

অনুন্নত সমাজ মানুষকে অত্যধিক বিনয়ী ও ভদ্র করে রাখতে চায়। বাড়িতে যদি কোনো প্রতিবেশীর ছেলেমেয়ে আসে, ছেলেমেয়েকে তার হাত ধরে সমাদর করে বসাতে শিক্ষা দেবে।

বাপকে ছেলেমেয়ে যেন ভয় করে, সে দিকে মায়ের দৃষ্টি থাকা চাই। বাপের চরিত্রবল থাকলে সন্তান তাকে ভয় করবেই। যে মায়ের চরিত্রবল নাই সে মাকে ছেলেমেয়ে ভালো করে না।

নিম্নলিখিত কারণে ছেলেমেয়ে মাকে ভয় করে না, এমনকি বার্ধক্যে মায়ের অযত্ন করে।

১. মায়ের চরিত্রবলের অভাব।

২. মা যদি কথায় কথায় সামান্য কাজে বা তুচ্ছ কারণে ছেলেমেয়ের উপর লাঠি নিয়ে ওঠেন।

৩. মা যদি বাচালতার পরিচয় দেন।

৪. একই সময় কোনো হুকুম দেওয়া এবং তৎক্ষণাৎ দ্বিতীয় হুকুম দেওয়া।

৫. ছেলেমানুষের মতো ছেলেমেয়ের সঙ্গে অনবরত রাগারাগি করা।

৬. সর্বদা নিজে না খেয়ে সন্তানকে খাওয়ান; এর ফলে ছেলেমেয়ে মনে করে–মা মোটেই খায় না বা তার খাবার কোনো প্রবৃত্তি নেই। মা অপরাধিনী, সে শুধু খাওয়াতে পরাতে এবং ভালবাসতে এসেছে, ভালবাসা পেতে বা খেতে তিনি জানেন না।

৭. সন্তানের সামনে স্বামীর সঙ্গে ঝগড়া করা; স্বামীর কর্তব্য নয় ছেলেমেয়ের সামনে স্ত্রীর সঙ্গে কখনও কোনো বচসা করেন।

৮. প্রথমেই রেগে কোনো হুকুম দেওয়া। আগে কোনো কথা না বলেই হঠাৎ ছেলেমেয়ের উপর রেগে ওঠা। এতে মায়ের ভয়ঙ্কর অসম্মান হয়। সন্তানের সঙ্গে হামেসা রাগারাগি করা বড়ই ভুল। তার বহু দুর্বলতাকে ক্ষমা করতে হবে। ছেলেমেয়েকে হামেসা কথায় প্রহার করলে, সে অমানুষ ও পিশাচ হয়ে ওঠে। তার অনেক অন্যায় মেনে নিতে হবে।

৯. বুদ্ধিমান ও সেয়ানা হবার আগে অর্থাৎ ৫/৬ বৎসর বয়স পর্যন্ত শিশুর কাছে কোনো বক্তৃতা দেবে না। বক্তৃতা ও জ্ঞানের কথাকে শিশুরা প্রলাপ মনে করে। কারণ দেখিয়ে ছেলেমেয়েকে কোনো কাজ করতে বলবে না, কারণ দেখালে সেও কারণ দেখাতে চেষ্টা করে, অবাধ্য হবার পথ খোঁজে। সোজা হুকুম দেবে। তাহলে কাজ হবে।

১০. অনবরত ছেলেমেয়েকে ঠোনা দিতে নেই।

১১. মারবার সময় কোনো কথা বলবে না। শুধু একটি কথায় তার অপরাধটা কী জানিয়ে দেবে। যখন তখন মারবে না, মারলে বেশি করে মারবে। চিক্কণ কঞ্চি ছাড়া কিল ঘুষি দেবে না। অসতর্ক আঘাতে শিশু হঠাৎ মরে যেতে পারে। একই বিষয় নিয়ে কখনও বারে বারে গালি দিও না। মারবার সময় কথা বললে মারার মূল্য নষ্ট হয়। শাসন বা প্রহার থেমে থেমে হওয়া বড় দোষের। ছেলেমেয়েকে সোজা কথায়, বাজে কথা না। বলে হুকুম দেবে, বাজে কথা বলা দোষ। ছেলেমেয়েকে আদর করা, সোহাগ করা, এতে ছেলেমেয়ের ভিতর মনুষ্যত্বের বীজ অঙ্কুরিত হতে থাকে। ছেলেমেয়ে যদি রাগ করে, তবে মারবার এক ঘণ্টা পরে তাকে ডেকে খাওয়াবে।

মারবার অব্যবহিত পরে আদর করলে মারবার ফলনষ্ট হয়। সাধাসাধি দরকার নেই। খাবার জন্য ডাকবে অর্থাৎ গম্ভীরভাবে খেতে বলবে, আর ভোজনটা পরিপাটি করে দেবে।

ছেলেমেয়েকে প্রথমেই যাও না, খাও না, করে কথা বলবে না। প্রথম যেতে বলবে, না শুনলে বলতে পার ‘যাও না’। ‘যাও না’ এরূপ করে হুকুম দিতে নেই। প্রথম কোনো কাজ করতে বলো না, শুনলে, জিজ্ঞাসা করো–তোমাকে অমুক বললাম, না শুনবার কারণ কী? তাতেও যদি ছেলেমেয়ে কথা না শোনে তাহলে আপাতত তখনকার মতো চুপ থাকাই শ্রেয়। যে কাজ করতে ছেলেমেয়ে নিতান্ত নারাজ, তা করবার জন্যে তাকে জোর জবরদস্তি করো না। সব কাজেই চিন্তা ও বিচক্ষণতার পরিচয় দিতে হবে। ছেলেমেয়ে ছাড়া পরিবারের অন্য কারো দ্বারা কোনো কাজ করাতে ইচ্ছা হলে, নিজের ইচ্ছা জানাবে, না শুনলে রাগারাগি করো না। চিন্তাহীন, পাগল মনের দ্বারা কোনো কাজই হয় না, কাউকে চালানো যায় না।

ছেলেমেয়ে লেখাপড়া শিখল না, সে বদমাইশ ও শয়তান হয়ে উঠেছে, তার জন্য ছেলেমেয়ে অপেক্ষা বাপ-মাই বেশি দায়ী। অনুন্নত ও অশিক্ষিত বাপ-মায়ের ছেলেমেয়ে সাধারণত শিক্ষিত ও বড় হয় না। বাল্যকাল হতেই ছেলেমেয়েগুলি বাপ-মায়ের অদুরদর্শিতা, মানসিক শক্তির অভাবে অবাধ্য ও হীন হয়ে ওঠে। ছেলেমেয়েকে মানুষ ও বড় করে তোলার জন্যে বড় মনের দরকার। মূর্খ বাপ মায়ের ছেলেমেয়েও ভীত হয়।

ছেলেমেয়ের উপর বেশিরকম অত্যাচার করলেই সে মানুষ হয়ে ওঠে না, তার স্বাভাবিক চপলতা দেখে বিশেষ বিরক্ত হবে না। সে হাসুক, খেলা করুক–কী ক্ষতি? দৌড়াক, মাছ ধরুক, গাছে চড়ুক, সে বর্ষাকালে পানির মধ্যে ডুবোডুবি করুক। সে যে খোকা–সে কেবল আনন্দ চিন্তা ও ভাবশূন্য একটা কেমন শক্তি-তার আনন্দ থাকবে না?

অবশ্য বেশি শয়তানি ভালো নয়।

অত্যধিক শাসন-অত্যাচারে ছেলেমেয়ে কালে চরিত্রহীন ও লম্পট হয়ে ওঠে। ছেলেমেয়ের বাপ-মায়ের স্নেহ-মায়া পাপের কথা ভাবতে অবসর পায় না। বাপ-মায়ের কাছে নিরন্তর আঘাত পেলে সে সুখ ও শান্তির জন্য জঘন্য পথের আশ্রয় খোঁজে।

ছেলেমেয়ের বয়স যখন ১৪/১৫ বৎসর তখন তাদের দিয়ে দিবারাত্রি কাজ করাবে, নইলে রক্ষা নেই। এই বয়সে ছেলেমেয়ে গোপন পাপ করতে শেখে। সোনার হৃদয় পাপ কলঙ্কে ছাই হয়ে যায়। তার জীবনীশক্তি নষ্ট হতে থাকে। খবরদার ছেলেমেয়ের সঙ্গে এই সময় কোনো খারাপ ব্যবহার করো না, অশ্রদ্ধা ও উপহাসের সঙ্গে তার দুর্বলতা ও অন্যায় কাজ নিয়ে কোনো আলোচনা বা ভর্ৎসনা করো না। তোমার সহানুভূতি, তোমার গভীর স্নেহ ও পুণ্য শক্তির প্রভাবে সে পাপকে জয় করতে শিখুক।

ছেলেকে ১৪/১৫ বৎসরের সময় কোনো জ্ঞানী মানসিক শক্তিশালী পণ্ডিতের কাছে রাখা ভালো। এই সময় অনবরত দেহ ও মনে কাজ হওয়া দরকার। পড়বে এবং সঙ্গে কাজ করবে, মায়ের সঙ্গে সাংসারিক কাজ করলেও তার সময় কাটে, বাপের সঙ্গে সঙ্গে থাকাও উত্তম।

ছেলে যদি বদনায় করে শিক্ষকের পায়খানার পানি দিয়ে আসে, কোনো ক্ষতি নেই। কাঠ ফাড়া ও মাটি টানা অর্থাৎ কঠিন কাজ করা বড়ই ভালো। বাড়ির পার্শ্বে একটা বাগান থাকা উচিত, যেখানে ছেলেমেয়েরা কাজ করতে পারে। নিজের তৈরি কাজের প্রতি তাদের। মমতা হয়; বাজে পাপ কথা ভাববার সময় পায় না।

পাড়ার কোনো কোনো বদমাইশ ছেলে ছোট শিশুকে কু-পথে নেবার চেষ্টা করে। এমনকি অনেক অবিবাহিত যুবক শিক্ষকেরও এই দোষ থাকতে পারে। যাদের সঙ্গে বয়সের বিশেষ তারতম্য আছে তাদের সঙ্গে ছেলে মেয়েকে মিশতে দেবে না বা একসঙ্গে শুতে দেবে না। এমন কি দুই ভাইকে এক সঙ্গে শুতে দেওয়া ঠিক নয়।

সন্ধ্যার পর ছেলে যেন বাইরে না থাকে, সেজন্যে তাম্বি চাই। সর্বদা ছেলেমেয়েকে চোখে চোখে রাখা দরকার। তবে ছেলেমেয়ে যেন না বুঝতে পারে, তার উপর কড়া পাহারা চলছে, তাকে সন্দেহ করা হচ্ছে, এতে তার বেশি রকম অধঃপতন হতে পারে।

যে জিনিসই ছেলে বাইরে হতে ঘরে আনে, যে বয়সেই হোক, মায়ের হাতে তুলে দিতে তাকে শিক্ষা দেবে। কোনো জিনিস নিয়ে ছেলেমেয়েরা যেন নিজে নিজে কামড়া কামড়ি না করে। সামান্য জিনিস হলেও মাতা ছেলে মেয়ের মধ্যে বণ্টন করে দেবেন।

চিনি, মিছরি, আম, এসব ছেলেমেয়েরা নিজ হাতে নিয়ে যেন না খায়। সব জিনিস মা দেবেন। সামান্য জিনিস বলে অবহেলা করা ঠিক নয়। এর মধ্যে শিক্ষা আছে।

ছেলেমেয়ের সামনে স্বামী স্ত্রীতে ঝগড়া করো না। বাপ ছেলেমেয়েকে কোনো হুকুম দিলে ভালো হোক মন্দ হোক মায়ের চুপ থাকাই উচিত। যখন তখন একটা বিরুদ্ধ কথা বলবে না। এতে ছেলেমেয়ের বাপ-মা কারও উপর শ্রদ্ধা থাকে না। পরী ছেলেমেয়েকে কোনো কথা বললে স্বামীরও কোনো কথা বলা ঠিক নয়।

ছোট শিশুদের হাত-পা ধুয়ে না শোবার, আর মুখ না ধুয়ে খাবার অভ্যাস আছে। পা ধুয়ে বিছানায় যেন তারা না চড়ে। ছেলেমেয়েরা ছোটকালে যার তার কাছে ইচ্ছামতো বেয়ারিং পত্র লেখে। টের পেলেই বকুনি দেবে। বেয়ারিং পত্র লেখা অভদ্রতা। চিঠি-পত্র লেখা দোষের নয় বরং ছেলেমেয়েকে ছোট-বড় আত্মীয়-স্বজনের সংবাদ রাখতে চিঠি লিখে তাদের খোঁজ নিতে উৎসাহ দেওয়া উচিত।

ছেলেমেয়েকে মাঝে মাঝে আত্মীয়-স্বজনের বাড়িতে পাঠানো দরকার। নইলে বড় হলে সে প্রাণহীন হয়ে ওঠে। আত্মীয়-বন্ধুর জন্যে তার মনে বেদনা জাগে না।

সেয়ানা হলে ছেলে ঘুষ খেয়ে মানুষের কাছ থেকে ফাঁকি দিয়ে মিথ্যা করে টাকা আনবে, এই ইচ্ছা নিয়ে তাকে লেখাপড়া শিখিও না। অনেক মা ছেলে যাতে অত্যাচার ও মিথ্যে করে পয়সা উপায় করতে সক্ষম হয় এ জন্যে রোজা রাখেন নামাজ পড়েন। এ সমস্ত মা বড় নীচ ও মূর্খ। মা হয়ে ছেলেকে অন্যের মায়ের বুকে ছুরি চালাতে বলা কি ভালো?

খেয়ে থাক, তবু ছেলেকে অন্যায় করে পয়সা উপায় করতে বলো না। হারাম রুজি খাওয়া সুদ গ্রহণের চেয়ে খারাপ কাজ। দেশের মৌলবীরা কেবল কোরানের অক্ষর নিয়ে টানাটানি করছেন, ভাবের ধার ধারেন না। তারা সুদখোরকে ঘৃণা করেন, কিন্তু অত্যাচারী ঘুষখোরের বাড়ি খেতে লজ্জা বোধ করে না। ঘুষখোর শুধু নিজের পেট ভরে তোলে; সে নীচ হৃদয়, অসরল ও অত্যাচারী, সে চোর ও মানুষের অবমাননাকারী, সুদখোর অপেক্ষা সে ছোট লোক।

ছেলেমেয়ে বড় হয়ে মানুষের মঙ্গল করবে, সে জ্ঞানী ও চরিত্রবান হবে এই শুভ ইচ্ছা নিয়ে ছেলেমেয়েকে লেখাপড়া শিখাবে। কোনো নীচ কল্পনা নিয়ে লেখাপড়া শিখাতে ইচ্ছা করলে খোদা তাকে বড় করবেন না। লেখাপড়া শিখে ছেলে একজন নীতি-জ্ঞানহীন মানুষ হয়ে উঠুক এরূপ ইচ্ছা করা ভালো মায়ের কাজ নয়। বড় কল্পনা অনেক মা-ই পোষণ করেন না, ছেলে শয়তান ও ঘুষখোর হলে বহু মা নিজের সুবিধায় অসন্তুষ্ট হন না বরং সন্তুষ্ট হন। আশ্চর্যের বিষয় এই সব মা নামাজ-রোজা করেন, তৃপ্তির সঙ্গে তসবিহ গনেন।

পরকালে মুক্তি পাবো, বেহেশতে যাবো, এ আশাও রাখেন!

মনে বড় কল্পনা নিয়ে ছেলেমেয়েকে জ্ঞানের পথে তুলে দাও, ছেলেমেয়েরা নিশ্চয়ই বড় হবে, সঙ্গে সঙ্গে বহু অর্থ ও সম্মান লাভ হবে। অর্থ ও সম্মানের কথা ভাবাও বিশেষ ভালো নয়–সেটা আপনা আপনি হবে। কর্তব্যের খাতিরে ছেলেমেয়েকে লেখাপড়া শেখাবে।

সেয়ানা পুত্রের সঙ্গে ভালো ব্যবহার করা উচিত। কর্কশ কথায় মহাজনদের মতো ছেলের কাছ থেকে টাকা চেয়ো না। নাতি-নাতনী ও পুত্রবধূকে ঘৃণা করলে ছেলের মন হাত ছাড়া হয়ে যায়। মানুষের মায়ের প্রতি যেমন কর্তব্য আছে স্ত্রীর প্রতিও তেমনি একটা কর্তব্য আছে। ছেলে বাপ-মাকে মনে মনে অত্যন্ত ভালবাসে, দুর্ব্যবহারের দ্বারা তাকে পর করে দিও না।

ছেলের বউকে কষ্ট জ্বালা দেওয়া মহাপাপ, কারণ সে এক দুর্বলা নারী, তার উপর আশ্রিতা। আশ্রিত শত্রুকেও সম্মান করা নিয়ম, অত্যাচারে খোদা নারাজ হয়।

বাপ-মা যদি দুর্ব্যবহার করেন, তবে সন্তানের উচিত তা সহ্য করা। স্বামী ও ছেলেপেলে কর্তব্য কথা বলার অবসর আমার এখানে নেই।

ছেলে যদি বাপ-মাকে না-বলে বিয়ে করে তাহলে কিছুমাত্র ক্রোধ প্রকাশ করো না। ক্রোধ প্রকাশ করলে বিপরীত ফল ফলবে। ছেলের বিবাহিত পত্নীকে তখন তখন নিয়ে আসবে। বয়স্ক ছেলেমেয়ের বিয়ে করবার অধিকার আছে। খোদার দেওয়া বিধানে বিরক্তি প্রকাশ করে লাভ নাই।

পুত্রবধূর সঙ্গে ভালো ব্যবহার করবে। তাকে উপহাস করো না, বধূর বাপ কি দিয়েছে, দিয়েছে সে কথা তুলো না। মিষ্টি কথায়, মধুর ভাষায় বধূকে আদব-কায়দা শেখাবে। সদ্ব্যবহার, মিষ্টি কথা এবং ধৈর্যের ফল, মনে হয় একটু দেরিতে ফলছে, কিন্তু এই ভাবেই ভালো ফল ফলে থাকে।

ছেলেকে মনের শান্তি হারিয়ে পরের চাকরি করতে উৎসাহ দিও না। যারা চাকরি করে না, সেই সব দেশের সাধারণ মানুষের মর্যাদা কম নয়-একথা কঠিন ভাষায় ছেলেকে বলে দিতে হবে। কৃষি এবং ব্যবসা অসম্মানের জিনিস নয়, একথাও তাকে জানাতে হবে। মুষ্টিমেয় সাহেবী পোশাকপরা রাজকর্মচারীরাই আদর্শ মহাপুরুষ, একথা ছেলে যেন না ভাবে। ছেলেকে আরও বলবে, মানুষ নিজে সম্মানের পিতা। নিজের সম্মান নিজেকে রচনা করতে হবে; পরের কাছে সম্মান নেই। শিক্ষিত নৈতিকশক্তিসম্পন্ন মানুষ যে কাজই করুক, যেখানেই দাঁড়াক, সেইখানেই তার সম্মান।

অনেক অপদার্থ লোক অন্যায় ক্ষমতার মালিক হয়ে নিজেকে কতগুলি লোকের কাছে সম্মানী করে তোলে সত্য, সেই সব যথেচ্ছারী, দাসচরিত্র অত্যাচারী সম্মানের জন্য ছেলের লালায়িত হওয়া ঘৃণার বিষয়। অসন্তুষ্ট পীড়িত-প্রাণ মানুষের উপর কর্তৃত্ব করতে ঘৃণা বোধ কর উচিত।

এক ভাই পড়ে গেলে বা আঘাত পেলে অন্য ভাই যেন তাকে সহানুভূতি দেখায়। ভালবেসে সহানুভূতি দেখাতে শিক্ষা দেবে।

ছেলেপেলে যদি পড়ে যায় বা হাত কেটে ফেলে, তাহলে ওমা কি হল বলে কেঁদে উঠ। কী হয়েছে, কিছু হয় নি, তুমি তো বীর-এইরূপ ধরনের কথা বলা ভালো। ছেলেপেলেকে মোটা কাপড় তৈরি করে দেবে। মোটা তহবন বা পাজামা ভালো, তারা যদি ময়লা কাপড়ে বেড়ায় তাহলে লজ্জাবোধ করা উচিত নয়। শিশুদের ময়লা কাপড়ে থাকার দোষ নেই। ১৪/১৫ বৎসর পর্যন্ত ছেলেমেয়েকে মোটে বাবু হতে না দেওয়া উচিত। সঙ্গীদের চটক দেখে অনেক সময় আবদার করবে, কিন্তু সে আবদার সহ্য করতে হবে।

বছর বছর ঈদের সময় কিছু কিছু ভালো জিনিস কিনে দিও। বিলাসদ্রব্য মোটেই ব্যবহার না শিখান ভালো। ছেলেমেয়েকে ভালো খেতে দিও-বাবু হবার পথ পরিষ্কার করে দিও না। কাপড়-চোপড় পরেই মানুষ শ্ৰেষ্ঠ হয় না–একথা তাকে মাঝে মাঝে বুঝিয়ে দেওয়া উচিত। কোনো ভালো কাপড়-চোপড়পরা লোকের সামনে ছেলেমেয়েরা অনেক সময় নিজেদের দীন মনে করে–এটা খারাপ। ছেলের মনের শান্তি যাতে অক্ষুণ্ণ থাকে সেদিকে লক্ষ থাকা আবশ্যক।

ছেলের বিয়ে হলে প্রস্তাব করবার আগেই ছেলেকে বিদেশে বউ নিয়ে যেতে বলবে। সংসারের অবস্থা খারাপ হলে বা অন্য কারণ থাকলে সেয়ানা ছেলে নিজে যা কর্তব্য মনে। করে, করবে।

সংসারের অবস্থা ভালো হলে দরিদ্র ছেলের উপর ট্যাক্স বসিও না। ছেলের কর্তব্য বুদ্ধির উপর নির্ভর করবে; সেয়ানা ছেলের সঙ্গে মারামারি ঝগড়া করলে ফল খারাপ হয়। অবস্থা ভালো হলে, ছেলেকে দুই-চার টাকার জন্য গোলামি করে, উৎকোচ নিয়ে নীচতার পরিচয় দেওয়ার চেয়ে বাড়ি থেকে স্বাধীনভাবে শাক-ভাত খাওয়া ভালো।

বিবাহিত ছেলে দূরদেশে থাকলে হামেসা বাড়ি আসবার জনে পীড়াপীড়ি করো না; কারণ বড় লোক না হলে ভ্রমণ খরচা সংগ্রহ করাও তার পক্ষে অনেক সময় কঠিন হয়ে পড়ে। সম্ভব হলে নিজে যেয়ে ছেলের কাছে থাকবে।

বাল্যকাল হতে ছেলেকে গৃহস্থালীর কাজ শিক্ষা দেওয়া উচিত। মাঝে মাঝে সংসারের চাপ তার ঘাড়ে দেওয়া ভালো। ভুল হবে বলে ভীত হতে নেই, সংসার কার্যে অভিজ্ঞতা থাকলে ভবিষ্যতে বিপন্ন হতে হয় না।

বিদেশে ছেলেকে শান্তিহীন পত্র দিও না। পত্রের ভাষা সর্বদা মিষ্টি ও মধুর হওয়া উচিত। মুখে যাই বল, পত্রে কোনো কু-কথা লিখো না। ছেলে যখন স্কুলে পড়তে থাকে তখন তাকে সাংসারিক বেদনা ও অপর অভিযোগের কথা কিছু বলো না, তাতে তার পড়ার ক্ষতি হবে।

শীতকালে ছোট ছেলেমেয়েরা আলস্যে গায়ে কাপড় দেয় না, ফলে পড়বার সময় ভালো পড়তে পারে না; অসুখ হয়। সন্ধ্যার সময় যাতে ছেলেমেয়েরা গায়ে জামা দেয়, তা দেখবে।

ছেলেমেয়েকে খুব বাল্যকালে মুখে মুখে দোয়া দরুদ শেখাতে হয়, নইলে জীবনে আর তা শেখা হবে না।

শিশু পড়া না বুঝলে বা না পড়লে উগ্র হয়ো না, বারে বারে বুঝিয়ে দিতে হবে। তোমার উগ্রমুখ দেখে ছেলেমেয়েও লোকের সঙ্গে কথা বলবার সময় উগ্র ও কঠিন হয়ে উঠবে, যা অত্যন্ত দোষের। তার বুদ্ধিও লোপ পাবে।

ছেলেমেয়েকে পড়বার সময় নিজে আগে আগেই পড়া বলে দিও না। তাকে জিজ্ঞাসা করবে, তার চিন্তাশক্তি জাগিয়ে তোলবার জন্য তাকে উত্তর দেবার সময় দেবে সেই পড়বে, নিজে বেশি কিছু বলো না, তাতে ছেলেমেয়ের বুদ্ধি ও চিন্তাশক্তি অবশ হয়ে যায়।

অপরিণত বুদ্ধির ছেলেমেয়ে যদি তার শিক্ষক বা অভিভাবকের নিন্দা করে তা বিশ্বাস করো না।

অনেক মেয়েলোক সতীনের ছেলেমেয়েকে নানা রকমে ছোট হীন করতে চেষ্টা করেন। স্বামী যদি ভুল করে আবার বিয়ে করে, তবে তাকে ভালবেসে ঘরে তুলে নিও। ঝগড়া-বিবাদ করা উচিত নয়। নিজের দুঃখ নিজের মধ্যে পুষে রাখাই ভালো। কিছু প্রকাশ করো না। সতীনের ছেলে মেয়েকে ঘৃণা করো না, চিরদিন সমান যায় না। সতীনের দাবিকে মুছে ফেলতে চেষ্টা করা অমানুষের কাজ।

বাড়ির ছেলে-মেয়েরা অনেক সময় শিয়রে বাতি জ্বালিয়ে শুয়ে থাকে এতে অনেক সময় বিপদ হয়।

কোনো কোনো ছেলেমেয়ে ভালো জিনিস খেয়েছে বলে অন্য ছেলেমেয়েদের কাছে বড়াই করে। কাপড়ের, আহারের বংশের মর্যাদা ও ধনদৌলতে বড়াই করতে দেখলে ছেলেমেয়েকে গালি দেবে। এটা বড় দোষের কথা, পতনের পূর্ব সূচনা।

ছেলেমেয়ে কোনো অপরাধ করলে নিজে যাই বল না; কখনও পরের কাছে তার নিন্দা করো না। অপরের কাছে ছেলেমেয়ের চরিত্র সমালোচনা করলে নিজেরও সম্মান নষ্ট হয়। ছেলেমেয়েকেও বড় বেদনা দেওয়া হয়। সে ভিতরে ভিতরে বিদ্রোহী ও হীন হয়ে যায়।

ছেলেমেয়েদের দুপুরবেলা বাড়ির উঠোনে বা সন্ধ্যাকালে ঘরের মধ্যে বা বিছানার উপর চীৎকার লাফালাফি ও মারামরি করতে দেবে না। সোরগোল ও লাফালাফি করবার জন্য স্থান না থাকলে, উঠোনেই করবে।

শিশুরা অনেক সময় পথের উপর এবং পুকুরের ভিতর পায়খানা করে শুচি হয়-এর জন্য সাবধান থাকবে।

ছেলেমেয়েরা অনেক সময় বাইরে জুতো-কাপড় ফেলে আসে সেদিকে মায়ের লক্ষ থাকা চাই। যখন ছেলেমেয়ে বাড়িতে ঢোকে তখনই তার দিকে তাকিয়ে দেখো, যে জিনিস নিয়ে বাইরে গিয়েছিল তা নিয়ে ফিরে এসেছে কিনা।

ছেলেমেয়েকে হিম, ঝড়, বৃষ্টি, বাতাস, সহ্য করাতে একটু শিক্ষা করানো ভাল। একেবারে ননীর পুতুল করে তোলা অন্যায়। একটু বাতাসে ছেলের ঠাণ্ডা না লাগে, একটু বৃষ্টিতে ছেলের নিউমোনিয়া যেন না হয়।

ছেলেমেয়েদের যদি হজম হয় তাহলে যত পার খেতে দেবে। বাল্যকালে শরীর যদি একবার ভালো হয়ে যায়, তাহলে সে শরীর আর কোনো কালে নষ্ট হবে না। শিশুদের মাংস, দুধ ও যথেষ্ট ডিম খেতে দেবে। এতে তাদের শরীরে শক্তি হবে। ছোট শিশুকে যথেষ্ট দুধ প্রভৃতি পুষ্টিকর খাদ্য খেতে না দিলে কালে শরীর ভেঙ্গে যায়, অনেক সময় স্বাস্থ্য হারিয়ে মরে যায়। সংসারের অবস্থা ভালো না হয় তাহলে ছেলেমেয়েদের খাবারের জন্য স্বামীকে কিছু বলবে না। অবস্থা ভালো হলে শুধু ছেলেমেয়ে বলে নয়, সকলেই ভালো খাওয়া উচিত! জীবন ধারণের জন্য ভালো টাটকা মাছ, মাংস, ঘি, দুধ ও ডিম প্রধান সহায়; শুধু মাছ ও শাক খেয়ে বেঁচে থাকা কঠিন; মাংসের পরে দুধ খেতে নেই। ছেলেমেয়ে সেয়ানা হলে তাদের স্বতন্ত্র থাকবার জায়গা করবে। তাদের প্রতি তাতে অবজ্ঞা প্রদর্শন করা হয় না।

ছেলেমেয়ের সামনে তৃতীয় ব্যক্তির চরিত্র সমালোচনা করবে না। ছেলে মেয়েরা মায়ের কাছ থেকেই পরনিন্দা ও পরিচর্যা শেখে। ছেলেমেয়েরা যার যার কাপড় জামা সেই যেন ব্যবহার করে। একজনের জামা কাপড় নিয়ে যেন অন্যে টানাটানি না করে।

ছেলেমেয়েরা আলস্য করে শীতকালে স্নান করে না। স্নান না করলে মনের অবনতি ঘটে।

ছেলেমেয়েকে গালি দিতে হলে সর্বদা সভ্য ও ভদ্র ভাষায় দেবে। ছেলে মেয়েরা অভদ্র। নীচু ভাষা বাপ-মার কাছ থেকেই শেখে।

শিশুদের জন্যে মায়ের পার্শ্বে আলাদা বিছানা ও লেপের ব্যবস্থা করবে, তাতে তারা মাকে কম বিরক্ত করবে।

রাত্রি ১০টা হইতে প্রাতঃকাল পর্যন্ত শিশুদের মোটেই কিছু খেতে না দিতে অভ্যাস করবে। ভয়ের কোনো কারণ নেই, বরং শরীর ভালো থাকে। খাওয়া-দাওয়া সম্বন্ধে তাদের জন্যে একটা নিয়ম থাকা চাই। নিয়ম করে নিলে পূর্বে যে ফিডিং বোতলের কথা বলেছি, সে সব জঞ্জালের দরকার হবে না। কাঁদলেই মুখে মাই দিতে হবে, তার কোনো মানে নেই।

ছোট শিশুকে ছয় মাস বয়স হতেই কাপড় পরাতে হবে, নইলে ভবিষ্যৎ জীবনে তার স্বাস্থ্যভঙ্গ হয়।

শিশুদের নাকে শ্লেষ্ম জমলে তখন তখন মুছিয়ে দেবে, সেই অবস্থায় তারা যেন কারো কাছে খাবার না চায়।

বড় ছেলের দেখাদেখি ছোট ছেলেমেয়েরা অনেক সময় পানিতে নেমে পড়ে। ছোট ছেলেমেয়েকে পানির কাছে না যেতে দেওয়া উচিত। পানির মধ্যে ছেলেদের উৎসাহ ক্রীড়াও না দেখতে দেওয়া উচিত।

ছোট ছেলেমেয়ে জামা-কাপড়ে পেশাব করলে তখন তা শুকাতে দেবে, ফেলে রাখবে না।

প্রতিবেশী বাড়িতে মুরগী বা ছাগল জবেহ হতে থাকলে ছেলেমেয়েরা সেখানে যেন আনন্দ না করে।

ছেলেমেয়েদের মধ্যে বড় ভাই বা বোনের, ছোটদের সামনে যাতে অসম্মান না হয়। সেদিকে নজর চাই। বড় ভাই অন্যায় করলে তার শাস্তি হবে না তা বলছি না; একটু আড়ালে হওয়া ভালো।

ছেলে-মানুষ বোঝে নাবড় হলে সেরে যাবে একথা ছেলেমেয়ের সামনে কখনও বলবে না।

শিশুর নাগালের বাইরে ঘরের জিনিসপত্র রাখবে; ছোট ছেলেমেয়ে জিনিস নষ্ট করে ফেলবে তার জন্য বচসা করা বৃথা। অতি ক্ষিপ্র হস্তে তাদের হাত থেকে জিনিস-পত্র কেড়ে নেবে। দেরি করলেই বিপদ!

স্ত্রীর অসাবধানতায় শিশুরা অনেক সময় অনেক ক্ষতি করে।

ছেলেমেয়েরা কারো অসাক্ষাতে বা কারো কথা বলতে হলে, যেন অসম্মানের সঙ্গে না বলে। ‘গিয়েছে’, ‘এসেছে’, ‘বলেছে’–এরূপ করে না বলে ‘গিয়েছেন ‘এসেছেন’ এরূপ করে বলতে বলবে।

ছোট শিশুকে স্কুলে ৫/৬ ঘণ্টা আবদ্ধ করে না রাখতে দিয়ে, যদি বাড়িতে রাখা যায় তাই ভালো। বাড়িতে কু-সঙ্গের ভয় থাকলে স্কুলেই পাঠাতে হবে। অবস্থায় কুলোলে সারাদিন ছেলেদের নিয়ে থাকবার জন্য বাড়িতে একজন শিক্ষক রেখে দেওয়া উচিত। শিশু সারাদিন পড়বে বা এক জায়গায় অধিকক্ষণ আবদ্ধ হয়ে থাকবে সে জন্যে নয়।

শিশুকে খেতে দেবার সময় কখনও জিজ্ঞাসা করো না–কী খেতে চাও মাছ খাবে, না ভাজি খাবে, না দুধ খাবে–এরূপ ধরনের কথা জিজ্ঞাসা করতে নেই। যা ইচ্ছা খেতে দেবে। সব জিনিস খেতে দিলে কি ক্ষতি? অমুক জিনিস খাবে, না অমুক জিনিস–বললে ছেলেমেয়ে খারাপ মেজাজের হয়ে ওঠে।

ছেলেপেলেকে অনবরত সমালোচনা করবে না। হরদম তাম্বি করলে, ভুল ধরলে, তার ব্যক্তিত্ব নষ্ট হয়ে যাবে। তাকে স্বতন্ত্র রকমের জ্ঞান ও উপদেশ দেওয়া বেশি ভালো। তার ভিতরের অন্যায় ও খারাপ কাজের প্রতি ঘৃণা কর। নিজের সংশোধন সে নিজে করবে। এ নীতি সকলের সম্বন্ধেই সত্য।

ছেলেমেয়েকে বেশি ঔষধ খাওয়ান দোষ। তাতে তার স্বাস্থ্যভঙ্গ হতে পারে।

মেয়েলোকের প্রশ্রয় পেয়ে অনেক সময় ছেলেমেয়েরা তামাক খেতে শিখে একেবারে নষ্ট হয়ে যায়। কোনো সন্তানকে সামনে তামাক খেতে দেখলে, উগ্র হয়ে ওঠা উচিত।

ছেলেমেয়েরা কারো নিন্দা করলে চোখ গরম করবে। তাদের কথা বিশ্বাস করা মূর্খতা।

“তুমি মিথ্যা বলেছ”-এরূপ কথা ছেলেমেয়েদের সামনে কখনও বলবে না। ছোট ছেলেমেয়ে হোক, বড় ছেলেমেয়ে হোক, তাদের স্বাস্থ্যের প্রতি বিশেষ নজর রাখবে। সন্তানের অসুখ হলে চিকিৎসার ব্যবস্থা করতে কখনও কৃপণতা করো না। দরিদ্র পরিবার হলে স্বতন্ত্র কথা।

সন্তানের কাজের কখনও কঠিন সমালোচনা করো না, তাতে খারাপ ফল হয়। অন্যায় কাজ করলে প্রথমে শুধু অসন্তোষ প্রকাশ করাই নিয়ম।

সন্তানকে স্কুলে দিয়ে সর্বদা শিক্ষকের কাছ থেকে দৈনিক পড়া সম্বন্ধে সংবাদ গ্রহণ করতে ভুলবে না।

ছেলেমেয়ে যদি পড়াশুনা ভালো না চালাতে পারে; তাহলে তাকে নিচের সহজ বই পড়তে দেবে। ধৈর্য হারিয়ে শক্ত বই পড়তে দিয়ে কখনও তার জীবন মাটি করো না।

ছেলেমেয়ে অল্প নম্বর পেয়ে প্রমোশন পেলে তাদের নিচেই বই পড়তে দেবে। উপরে যেতে দিবে না।

যদি সন্তানের বুদ্ধি কম বলে মনে হয়, তাহলে এক বৎসর বা দু বৎসর তাকে নানা প্রকার শিশু পাঠ্য বই পড়তে দিও। তার ভিতরে বিবেক ও বিচক্ষণতার সৃষ্টি হবে। ফলে তার কঠিন বিষয় বোঝবার ক্ষমতা লাভ হবে।

বন্ধের সময় ছেলেপেলেকে বাড়ি আসবার জন্য চাকর থাকলে চাকর পাঠিয়ে দেবে বা কোনো লোক পাঠাবে।

অবশ্য নিতান্ত খারাপ না হলে, ছেলেকে কখনও পরের বাড়ি থেকে পড়তে দিও না। এতে ছেলের মন ছোট হয়ে যায়; ভবিষ্যৎ জীবনে তার কর্ম করবার বা সাহস করে সত্য কথা বলবার ক্ষমতা থাকে না। বিদেশে সন্তানের খাওয়া-দাওয়া, সুখ-সুবিধার দিকে বিশেষ দৃষ্টি রাখা চাই।

সন্তানের জন্য বাড়িতে যদি শিক্ষক থাকেন, তবে তাকে অসম্মান করো না; নিরন্তর তার কাজকে সমালোচনা করে তার ব্যক্তিত্ব নষ্ট করো না। সন্তানের সামনে মাষ্টারকে অসম্মান করলে ছেলেমেয়ের লেখাপড়া হবে না।

ছোট শিশুর জন্য পাহলোয়ানদের মতো ৮/১০টি নেংটি তৈরি করে নিও। শিশু সন্তান কাকেও নেংটা থাকতে দেবে না। ছোট ছেলেমেয়েদের সর্বদা নেংটি পরতে বাধ্য করা উচিত। এতে ছেলেমেয়েদের নৈতিক শক্তি বাড়ে।

ছেলেমেয়েরা খাওয়া-দাওয়া নিয়ে যেন মোটেই কামড়া-কামড়ি না করে, এক ভাই বোন আর এক ভাই বোনকে না দিয়ে নিজে খেতে চেষ্টা করলে তাকে বলবে, নিজে না খেয়ে পরকে খাওয়াই ভালো। বার বার সন্তান যদি খাওয়ার ব্যাপারে নীচতার পরিচয় দেয়, অন্য ভাই বা বোনদের কথা না ভেবে নিজের পেটের কথা বা নিজের সুবিধার কথা। বেশি ভাবে, তাহলে তাকে প্রহার করবে। সন্তান যদি হাঁড়ি বা পেয়ালা হতে সব মাছ বা ডিম তুলে খেয়ে শেষ করতে চায়, তাহলে থাকে নিষেধ করবে। পরের কথা না ভেবে, নিজের বিষয়ে বেশি করে ভাবার অভ্যাস ভালো নয়, এতে বড় হলে সে নীচ ও স্বার্থপর হবে। অনেকে মনে করে ছেলেমেয়ে বড় হলে তার সকল দোষ সেরে যাবে, এটা ঠিক কথা নয়।

সন্তান সেয়ানা হলে তার চিন্তা ও ভাবকে অবহেলার চোখে দেখো না। তাকে সম্মান করবে। ছেলেমেয়ে যা হতে চায়, তাতেই তাকে উৎসাহ দেবে, নইলে সন্তানের জীবন মিথ্যা হয়ে যাবে। অনেক বাপ-মা সন্তানকে জোর করে নিজের ইচ্ছামতো পথে চালাতে চান, এর শেষ ফল খারাপ। সন্তান বড় হলে সে বুদ্ধিমান হয়, কিন্তু কোনো মাতা-পিতা সন্তানকে চিরকালই বোকা ও অপদার্থ মনে করেন। ছেলেমেয়ে বুদ্ধিমান হলে বাপ-মার সন্তুষ্ট হওয়া উচিত। চিরকাল সন্তান বোকা থাকবে এরূপ মনে করা অন্যায় এবং বাপ-মার পক্ষেই অগৌরবের বিষয়। সন্তানকে অনবরত বোকা বললে বাস্তবিক সে বোকা হয়ে যায়, তার মনুষ্যত্ব নষ্ট হয়।

বাপ-মায়ের উৎসাহ পেলে সন্তান সাগর লঙ্ঘন করতে পারে। বাপ-মার বুদ্ধির দোষে আবার বহু বড় বড় জীবন মাটি হয়ে যায়।

সন্তান যা করতে চায় না, যা হতে চায় না, তা করতে বা হওয়াতে বাধ্য করো না। সন্তানের কোনো সঙ্কল্প সাহায্য করবার আগে তার সঙ্কল্প সত্য ও দৃঢ় কিনা দেখতে হবে। সঙ্কল্প ও কাজ আলাদা কথা। ছেলেমেয়েরা অনেক সময় মিথ্যা উৎসাহ প্রকাশ করে থাকে।

সন্তান যদি চরিত্রবান হয়, সে যদি উৎকোচ গ্রহণ করতে ঘৃণা বোধ করে, সে যদি গোলামি করতে না চায়, তবে অসন্তুষ্ট হয়ো না।

সে কিন্তু দরিদ্র হয়ে থাকতে পারে, কিন্তু ছোট ও অবহেলিত হয়ে থাকা ভালো লোকের ধর্ম নয়। বড় হওয়া তার স্বভাব। সে বড় হবেই।

সন্তান ঘুষখোর ও শয়তান নীচ-হৃদয় ও গোলাম না হলে যে বাপ-মা অসন্তুষ্ট হন, তারা বড় ছোট।

কুলসুম বলিলেন-বাপ মার দোষেই জগতের পনর আনা দোজখে যাবে। মানুষের নৈতিক অধঃপতন কারণ মাতাপিতার নীচ প্রবৃত্তি ও জঘন্য রুচি।

কতকগুলি লোক আছেন, তাঁরা বলে থাকেন–মুক্তির প্রধান কারণ পিতৃ-মাতৃ ভক্তি। এ কথা কিন্তু সর্বদা মিথ্যা। পবিত্র, জীবন, জ্ঞান এবং সূক্ষ্ম কর্তব্য-বোধই মুক্তির শ্রেষ্ঠতম দাবি। মাতা-পিতাকে ভক্তি করতে যেয়ে যদি নিজের মাথায় মূর্খতা পতন ও পাপের ডালি তুলে নিতে হয় তবে সেরূপ ভক্তিতে কী লাভ? তুমি চোর বদমাইশ অত্যাচারী ও মূর্খ–তোমার পিতৃ-মাতৃ ভক্তির মূল্য কি? তুমি যদি মানুষ হও তোমাকে শ্রেষ্ঠ পিতৃ-মাতৃ ভক্ত বলা হবে।

মাতা-পিতার দুর্বলতা সন্তানের যথাসম্ভব মেনে নেওয়া উচিত। সেটাও কম মনুষ্যত্ব নয়, উগ্রভাবে তাদের সঙ্গে তর্ক করা অসভ্যতা। শান্তভাবে ভালো উদ্দেশ্যে কথা বলা যেতে পারে।

মাতাপিতাকে অন্যায় রকমে কষ্ট দেওয়া পাপ এবং কাপুরুষতা।

সন্তান বয়স্ক হলে যদি সে কোনো অন্যায় করে ফেলে, তবে কোনো কথা বলো না। সে যদি কোনো ভুল করে ফেলে, তাকে উৎসাহ দিয়ে বলবে–কিছু হয় নাই–চল অগ্রসর হও। সন্তানের ভুল তার গতিরোধ করবে না। শিক্ষিত ছেলে যে পথে হাঁটতে চায়, তাকে সেই পথে ভীম বেগে চলতে বলবে। উৎসাহ দেবে, তাকে পাগল বলো না, তাতে নিজের ‘ এবং ছেলের দুয়েরই ক্ষতি হবে। সন্তান যা বলে, যা ভাবে তা সত্য কি না ভেবে দেখো! সন্তান যদি তোমার চেয়ে অপেক্ষাকৃত জ্ঞানের কথা বলে, তবে আনন্দ প্রকাশ করবে।

সেয়ানা সন্তানকে জ্ঞানদানে মাতাপিতা বন্ধু মনে করেন, সন্তানকে সম্মান করেন–তাতে তাঁদের অসম্মান হয় না। সন্তান তো নিজেরই প্রতিকৃতি।

কি বড় কি ছোট–কাউকে প্রথমে কঠিন ভাষা বলো না। শুধু সন্তান বলে নয়–প্রথম সম্বোধনেই কারো সঙ্গে কঠিন কথা ব্যবহার করতে নেই। বেশি কঠিন কথার ফল সম্পূর্ণ বিপরীত হয়। প্রথমে গম্ভীর হয়ে শুধু নিজের অসন্তোষ প্রকাশ করবে–অপরাধী তাতেই শরমে মরে যাবে।-শেষ মুহূর্তে বা নিতান্ত অপারগ হলে-কঠিন কথা বলো বা একটা কঠিন ব্যবহার করো। যে নিতান্ত নরপিশাচ, কঠিন কথা না বলে তার সঙ্গে সম্বন্ধ ত্যাগ করা উচিত।

ছোট ছেলেমেয়ের সম্মুখে কখনও দাঁত-মুখ খিঁচিয়ে কথা বলো না-শান্ত, ধীর ও গম্ভীরভাবে কথা বলা উচিত। মুহূর্তে মুহূর্তে সন্তানের সঙ্গে রাগ করলে, তাদের মন বড় না হয়ে ছোট হতে থাকে। বাপ-মার কাছ থেকে ছেলেমেয়েরা যে রূপ ব্যবহার পায় তারাও লোকের সঙ্গে তেমনি ব্যবহার করে।

সন্তানকে মাঝে মাঝে মেঝেতে খাড়া করে দিয়ে বক্তৃতা দিতে বলবে। মায়ের চেষ্টা ও ইচ্ছায় সন্তান কালে একজন ভালো বক্তা হতে পারে। বক্তা হওয়া জীবনের অন্যতম শ্রেষ্ঠ গুণ। যারা বক্তা নয়, তারা অনিচ্ছা সত্ত্বেও কাপুরুষ হয়ে পড়ে। সত্য কথা বলবার সাহস সঞ্চয় করা প্রত্যেকের জন্য ফরজ।

সন্তানকে বক্তা করে তোলা বড় উত্তম। এজন্য সাধনা চাই। বক্তৃতাকালে ধীর ও স্বাভাবিক হলেই সফল হওয়া যায়।

ছেলেমেয়েদের ১০-১২ বৎসর বয়স হলে অর্থাৎ কিছু বুদ্ধি হলে, তাদের সভার উপদেশপূর্ণ বক্তৃতা শোনাবে। পাড়া-প্রতিবেশী ছেলেমেয়েকে একত্র করে যদি তাদের মধ্যে উপদেশপূর্ণ বক্তৃতা দেওয়া যায়, তাহলে যে উপকার হয়, তা দশ বছর বই পড়িয়ে হয় না। ছোট বড় সকলের কাছেই বক্তৃতা উপকারী।

সন্তান যদি কারো বিরুদ্ধে নিন্দা করে, তবে হঠাৎ তা বিশ্বাস করা ঠিক নয়। তার অভিযোগ যদি সত্য বলে প্রমাণিত হয়, তাহলে বিবেচনা করে যা করতে হয় করবে।

তামাসা বা খেলার ছলে, সন্তানকে মুহূর্ত বিলম্ব না করে আজ্ঞা পালন করতে অভ্যস্ত করবে। ছোট ছেলেমেয়ে তখন আজ্ঞা পালন না করলে, অনেক সময় বিলম্ব না করে শাস্তি দেওয়া উচিত। একটু বড় হলে এ নিয়ম খাটে না, বারে বারে শাস্তিদান এবং ক্রোধ প্রকাশ নিষেধ।

ছেলেমেয়ে তামাক খেলে, সেজন্য বেদম প্রহার করো না-তাকে বলবে এ কাজটা খারাপ। ছেলেমেয়ের এরূপ কাজ খুব দুঃখের বিষয় বটে, কিন্তু বেদম প্রহার করলে তার চরিত্রের আরও পতন হতে পারে। সে ভাববে, না জানি এইসব কু-জিনিসে কি মধু না আছে।

ছেলেপেলেকে তামাক সাজতে বলা বা হুক্কা আনতে বলা নিষেধ।

ছেলেমেয়েদের বসন্ত প্রভৃতি ছোঁয়াচে রোগে অধীর হয়ে অবিবেচনার পরিচয় দেওয়া উচিত নয়। সর্বদা স্বতন্ত্র করে রাখবে।

হোমিওপ্যাথিক ‘ভরিওলিনাম’ নামক ঔষধ খেলে বসন্ত হয় না।

সন্তানকে গালি না দিয়ে বা লজ্জা না দিয়ে কাজটা অন্যায় তা বলে দিতে হবে। এ সব ব্যাপারে শাসন বা গালি শিক্ষকদের হাত হতেই হওয়া উচিত।

মেয়েদের সাজসজ্জা করতে দোষ নেই, বরং না করাই দোষের।

ছেলেমেয়ের শিক্ষক দুর্বলচিত্ত হলে ছেলেমেয়েদের চরিত্রের উন্নতি হয় না। যে শিক্ষক-শিক্ষিকা সন্তানকে শাসন করতে ভয় করেন না, যে শিক্ষক শিক্ষয়িত্রী ছাত্র-ছাত্রীর মাতাপিতাকে ভয় করেন, সে শিক্ষক-শিক্ষিকার দ্বারা সন্তানের ভালো শাসন হয় না।

ছেলেপেলে যেন মায়ের বিনা অনুমতিতে কখনও কোথাও না যায়। ইচ্ছামতো ছেলেমেয়েরা যেখানে সেখানে গেলে, তাদের স্বভাবে নানা দোষ ঢুকবার সম্ভাবনা। দোষ ঢুকুক, চাই না ঢুকুক, বিনা অনুমতিতে ছেলেমেয়েদের বাইরে ঘুরে বেড়ান দোষের। ছেলেমেয়েদের জন্য বাড়িতে কতকগুলি আকর্ষণ সৃষ্টি করতে হবে, মিষ্টি ভাষায় বাড়িতে থাকতে বলা চাই, এজন্য হরদম তাম্বি নিষেধ।

উত্তম পুষ্টিকর খাদ্য হলে, অল্প ব্যায়ামেই শরীর ভালো থাকে। ছেলেমেয়ের আহারের প্রতি বিশেষ নজর চাই। সকলের জন্যেই পুষ্টিকর খাদ্য আবশ্যক-নইলে শুধু ব্যায়াম করলে শরীর থাকে না। পুষ্টিকর খাদ্য না খেয়ে, কঠিন ব্যায়াম করলে কঠিন পীড়া হয়। অবসন্ন পেশিগুলো খাদ্য না পেলে হৎপিণ্ড ও ফুসফুস হতে অন্যায় রকমে খাদ্য সংগ্রহ করে। ফলে হৃৎপিণ্ড ও শরীরের অতি উপকারী যন্ত্রগুলি দুর্বল হয়ে ব্যাধি আক্রমণের পথ প্রশস্ত করে দেয়। মাংস ডিম, দুধ, ঘি, এই সবই ভালো খাদ্য। মুরগি ও পায়রার মাংস উপকারী। বাজারের মিষ্টান্ন খেয়ে লাভ নাই। পুষ্টিকর খাদ্য ব্যতীত স্বাস্থ্য রক্ষা করা সম্ভব নয়। ওষুধ খেয়ে শরীরকে শক্তিশালী করবার চেষ্টা মূর্খ।

ছেলে-মেয়েকে মাঝে মাঝে বাপ, মা এবং বড় ভাই-বোনকে আদর করে খাওয়াতে শিক্ষা দেওয়া ভালো। এতে শিশু উদার-হৃদয় ও পরার্থ হয়ে উঠবে। নিজের সুখের কথা

অপেক্ষা অন্যের সুখের কথা ভাববার অভ্যাস বাপ-মাকেই শিক্ষা দিতে হবে।

সন্তান কারো কাছে অপরাধ করলে সে যদি বিচার প্রার্থনা করে, তবে নিজের সন্তান বলে কখনও তাকে মাফ করো না। ছেলেমেয়ে কু-কাজে অনেক সময় প্রশ্রয় দিয়ে সর্বনাশ করেন। মায়ের দোষে বহু সন্তানের জীবন মাটি হয়ে যায়। কেউ সংশোধন করতে পারে না। ছেলেপেলেদের সব ভাই-বোন সব সময় এক সঙ্গে বেড়ান উচিত। যার যার মতে বেড়ালে বিশেষ ভয়ের সম্ভাবনা। দলে দলে একসঙ্গে বেড়ালে কু-পথে যাওয়ার ভয় থাকে না।

সন্তানদের পতন আরম্ভ হয়েছে এরূপ সন্দেহ হলে তাদের সহানুভূতিভরা প্রাণে বলবে–তুমি সুন্দর, তুমি পবিত্র। তোমাকে কি কেউ দুষ্ট কথা বলে থাকে, বাপ?–তোমাকে। কি কেউ খারাপ কাজ করতে বলে? সেই সব দুষ্টদের তুমি ঘৃণা করো, কারণ, তুমি ভালো–তাদের চেয়ে বড়। মানুষ অনেক সময় কু-কাজ করে–নিরুপায় হয়ে মানসিক শক্তির অভাবে যদিও সে কাজকে ঘৃণা করে। বন্ধুর মতো সন্তানের ভিতরে পাপ ও অন্যায়ের প্রতি ঘৃণা সৃষ্টি করবে। তার মানসিক শক্তিকে সহানুভূতির দ্বারা প্রবল করে তুলতে হবে। তখন তখন সন্তান সংশোধিত হতে না পারে, কিন্তু সে ফিরে আসবেই। গম্ভীরভাবে বন্ধু বেশে পাপ হতে ছেলেপেলেকে রক্ষা করবার জন্য তাদের পার্শ্বে দাঁড়াতে হবে।

সন্তানের অভিমান ও ক্রোধ দেখে অনেক সময় ধৈর্য ধারণ করা উচিত। সন্তানেরা পরস্পরের মধ্যে শ্রদ্ধার সঙ্গে কথা বলবে—’তুই-তুই’ বা ‘রে-রে’-করে কথা বললে বিরক্তি প্রকাশ করবে।

মানুষের পেছনে বিক্রম প্রকাশ করতে ছেলেমেয়েদের নিষেধ করবে, যা বলার আছে। তা সামনে প্রকাশ করার জন্য বলবে। –বড় ছেলে বা মেয়েদের কথা ও কাজ সমালোচনা করা নিষেধ। তাতে তাদের উন্নতি না হয়ে ক্ষতি হয়। সোজাসুজি তখন তখন দোষের অনবরত সমালোচনা হতে থাকলে, বিশেষ লাভ হয় না। বরং এরূপ সমালোচনাকে বড় হীনআসন পেতে হয়। মানুষের ভিতরে স্বতন্ত্র রকমের অন্যায়ের ঘৃণা সৃষ্টি কর, দোষের কথা মোটই না ভেবে, তাকে শুধু জ্ঞান দিতে থাক, তাকে মহত্ত্ব ও পুণ্যের কথা শুনাও, তাকে ভালবাস, তাকে লেখাপড়া শেখাও তার মনকে উন্নতি করতে চেষ্টা কর, তার ভুল আপনা আপনি ঝরে পড়বে। মানুষকে এই ভাবেই বড় করা যায়।

ছেলেকে বর্তমানযুগে ব্যবসায়ী করতে চেষ্টা করা উচিত। শুধু রাজকর্মচারী ছাড়া দেশের আর কারো সম্মান নেই, একথা মনে করা ভুল। সাধারণ দেশবাসী ও ব্যবসায়ীদের সম্মান রাজকর্মচারীদের চেয়ে বেশি একথা আমাদের দেশের লোক বোঝে না। কারণ আমরা ছোট, আমরা ছোট হয়ে গিয়েছি, তাই আমরা নিজকে নিজে বড় মনে করতে শিখি, নাই। রাজকর্মচারী দেখে ছেলে-মেয়ে যেন ভয়ে কাঁপতে না থাকে, রাজকর্মচারীদের সঙ্গে ছেলে করমর্দন করবে, তাদের সেজদা করতে ছেলেমেয়েকে একদম নিষেধ করবে। রাজকর্মচারীরা দেশের লোকের চাকর-একথা ছেলেমেয়েকে বলে দিতে হবে। স্বাধীনভাবে ব্যবসা করে ছেলে কোটি কোটি টাকা উপায় করতে পারে–এরূপ বিশ্বাস মনে পোষণ করা উচিত। একটা ছোট হীন দারোগাগিরি চাকরির জন্য লালায়িত হওয়া রোজা করা কি দারুণ অসম্মানের কথা নয়? সন্তানেরা চাকরির জন্য কাউকে খোশামোদ করো না। নবাব সাহেব বা নবাব সাহেবের বেগমের সাথে সই পাতিও না।

সন্তানদের গায়ে খুব বেশি ছেঁড়া-ফাটা জামা না দেওয়াই উচিত-এটা দীনতার বিবৃত চিত্র।

বৎসর শেষে প্রমোশনের সময় ছেলেমেয়েরা বই কেনার নাম করে অনেক টাকা নিয়ে যায়। তা ছাড়া অন্য সময়েও সন্তান একথা ওকথা বলে ফাঁকি দিয়ে মার কাছ থেকে টাকা চায়। উপযুক্ত কারণ থাকলে টাকা না দেওয়া ভালো নয়। ষোল সতেরো বছরের সন্তানকে স্বাধীনভাবে টাকা পয়সা নিয়ে কোথাও থাকতে দেওয়া অনুচিত।

সন্তানকে সর্বদা সত্য কথা বলতে উৎসাহ দেবে। শত অপরাধ করেও সত্য সন্তান যদি সত্য কথা বলে, কিছু বলো না, চুপ করে থেকো।

সন্তান যদি লজ্জাজনক কাজ করে ফেলে, তাহলে তার সঙ্গে বিশেষ রাগারাগি করো না, বুঝিয়ে দিও। এরূপ কাজ অন্যায় ও খারাপ। সন্তান যাতে লজ্জা পায় এরূপ কাজ করা মাতা পিতার কর্তব্য নয়। ছেলেমেয়ের নিন্দা ও কুৎসা কখনও তৃতীয় ব্যক্তির নিকট করো না।

ছেলে শিক্ষার জন্যে যেমন আমরা ব্যস্ত হই মেয়ের শিক্ষার জন্যে তেমনি করে ব্যস্ত হতে হবে।

হিন্দুরা মেয়ে হলে ভয়ে কাঁপতে থাকে। মুসলমানদের ছেলে এবং মেয়ের কোনো। তফাৎ নেই। মেয়েকেও ছেলের মতো লেখাপড়া শিখতে হবে। আজকাল টাকার লোভে লোকে সন্তানকে লেখাপড়া শিখায়; আসলে কারো ধর্ম ভয় নেই। কোরানের হুকুমও কেউ মানে না। মেয়েকে বাল্যকালে হুনর, হিকমত এবং শিল্প শেখাবে, কি জানি ভবিষ্যৎ জীবনে তার কপাল যদি খারাপ হয়, তাহলে তাকে পথে ভাসতে যেন না হয়।

মেয়েকে অর্থ ও জমাজমি লিখে দিলেও শিক্ষা ও বহির্জগৎ সম্বন্ধে জ্ঞান ব্যতীত সে তা রক্ষা করতে পারে না। অনেক মেয়েই জানে না, কলকাতা কোনো মানুষের নাম, না কোনো স্থানের নাম। জেলা কাকে বলে, মহকুমা ও রাজধানী কাকে বলে-মেযেকে-শেখাতে হবে! ক্রিমিনাল কোর্ট, সিভিল কোর্ট থানা রেজিষ্ট্রারী অফিস কাকে বলে এসবও মেয়েকে জানান চাই। আমাদের দেশ কোথায়; পৃথিবীটা কেমন এ সমস্ত জিনিস যেন মেয়ের মনে শুধু কল্পনার, জিনিস হয়ে না থাকে। শিক্ষিতা মেয়েই মানুষের মতো মানুষ সন্তান প্রসব করতে সক্ষম।

অনেক স্থানে বোরকা পরতে হয়। বোরকা পরতে হলে লক্ষ্ণৌতে এক রকম বোরকা পাওয়া যায়, তা মেয়ের জন্য একটি কিনবে। এ বোরকা গায়ে দিয়ে পাড়াগাঁয়ের বোরকা পরিহিতা মেয়েদের ন্যায় একটা ঝুড়ির মতো চেহারা হয় না। লক্ষ্ণৌ-এর বোরকার আরও উন্নতি হওয়া আবশ্যক। এখনও তা পরে হাতে-পায়ের স্বাধীন মুক্ত ব্যবহারের সুবিধা হয় না। কিন্তু তবুও সেগুলি বোরকার আরও উন্নতি না হওয়া পর্যন্ত ব্যবহার করতে পারা যায়। দেখতে মন্দ নয়। ছোট থাকতেই মেয়েকে সর্বত্র পাঠাবে। জগৎ ও মানুষের মধ্যে না গেলে। মানুষের বিকাশ হয় না লেখাপড়ার উন্নতি হয় না, জ্ঞান পূর্ণ হয়ে ওঠে না। বই পড়ার চেয়ে চোখে দেখে আমরা অনেক কিছু শিখতে পারি। চোখে কিছু না দেখে, পুরুষ সমাজ যদি শুধু বই পড়েই বিদ্যা খতম করতো তা হলে তারা একপাল গাধা হয়ে থাকতো। বাল্যকাল হতেই মেয়েকে বাইরে শহরে, রাজধানী, কোর্টে রাস্তায় এবং সভায় পাঠাবে। অন্তঃপুরে পিঞ্জিরাবদ্ধ হয়ে থাকবার অভ্যাস যদি একবার হয়ে যায়, তাহলে জীবনে আর বের হওয়া যাবে না। বাল্যকাল হতেই মেয়েকে বাইরের সঙ্গে সংস্রব করে দেবে; সে পুরুষের মতোই একটা শক্তি হয়ে উঠবে। বর্তমান সময়ে সভ্য জাতির সঙ্গে প্রতিযোগিতা আমাদের করতে হবে, নইলে জাতি হিসাবে ছোট ও দুর্বল হয়ে পড়তে হবে, বেঁচে থাকা কঠিন হবে; উভয়কে কাজ করতে হবে; নইলে জীবন সংগ্রামে পৃথিবীর উন্নত জাতির কাছে আমরা হেরে যাবো।

চরিত্র হারাবার কোনো ভয় নেই। পুরুষ কি নিজের চরিত্র শহরে যেখানে শত বিলাসিনী রূপ মেলে পথের পাশে দাঁড়িয়ে থাকে সেখানে বীরের মতো পাপকে উপহাস করে ঘুরে বেড়ায় না?

পাড়ার অন্যান্য মেয়ের সঙ্গে মেয়েকে কথা বলতে শিখতে উৎসাহ দেবে। ছেলে যেমন ছেলেদের সঙ্গে মেশে, মেয়েও তেমনি মেয়েদের সঙ্গে মিশবে। মানুষের সঙ্গে না মিশলে মানুষের বুদ্ধিশক্তি বাড়ে না।

মেয়েকে খবরের কাগজ এবং মাসিক পত্রিকার গ্রাহক করে দেবে। মেয়েকে মানুষ করবার কাজ মা-বাপের, স্বামীর নয়। অনেক অপদার্থ মা-বাপ মেয়ের শিক্ষার ভার স্বামীর ঘাড়ে চাপিয়ে দিয়ে কাপুরুষের মতো সরে দাঁড়ান।

মেয়েদের মাঝে মাঝে বৈঠক করে সভাসমিতি করতে এবং বক্তৃতা দিতে উৎসাহ দিও। হায়দ্রাবাদে মেয়েরা দোকান দেয়, বেড়াতে বের হয়। স্যার সৈয়দ আমীর আলী তাঁর ইতিহাসে লিখেছেন, ইসলামের প্রথম যুগের আরব মহিলারা কোনো বোরকা ব্যবহার করতেন না, মেয়েরা গান গাইতেন, তাতে কোনো দোষ হতো না। খলিফা ওমর রাস্তায় থেকে অনেকে সময় সেই গান শুনতেন।

ছেলেমেয়েরা বড় ভাই বা বোনকে বা মুরুব্বীদের বাঘের মতো ভয় করুক–এটা ভালো নয়। সন্তানের সুবুদ্ধি ও বিবেক জাগাতে চেষ্টা করবে। সে যেন তার বিবেককে বেশি ভয় করে।

ছেলেমেয়েরা যেন ব্যক্তিত্বহীন একটা মাংসপিণ্ড না হয়ে ওঠে, ব্যক্তিত্ব অর্থ বিদ্রোহ নয়। সন্তান মুরুব্বীদের অবাধ্য হোক বা তাদের অশ্রদ্ধা করুক এ বলছি না। সৈনিকেরা নিজের ব্যক্তিত্ব না হারিয়েও সেনাপতির আদেশে কামানের সম্মুখে প্রাণ দেয়।

ব্যক্তিত্ব গড়ে তুলতে চেষ্টা করবে। এর অর্থ–সন্তান যেন সত্য অপেক্ষা মানুষের হুমকিকে বেশি ভয় না করে, কারো সম্মুখে যে নীচ ও হীন হয়ে না দাঁড়ায়, কারো সঙ্গে কথা বলতে তার গলা না কাপে। ভয়ে অনিচ্ছায় সে যেন না হাসে বা কাঁদে, প্রয়োজন হলে। প্রতিবাদ করতে ভয় না পায়, অনুগ্রহ বা কারো কৃপা দৃষ্টি লোভে কুকুরের নীচতায় কারো কাছে মাথা নত না করে।

ছোট ছেলেমেয়েকে মাঝে মাঝে ক্ষেপা কুকুরে কামড়ায়। সাবধান, পল্লীগ্রামের আনাড়ী বৈদ্যের ওষুধে শান্ত হয়ো না। ক্ষেপা কুকুরের নিচের চোয়াল ঝুলে পড়ে, মাথায় তার কখনও কখনও ঘা থাকে–অনবরত মুখ হতে লালা নির্গত হতে থাকে, চোখ দুটি লাল হয়, লেজটি ঝুলে থাকে, এরূপ কুকুরে কামড়ালে আর রক্ষা নেই। কুঁড়েমি করে বাড়িতে বসে সর্বনাশ করো না, মহকুমা বা জেলার ম্যাজিষ্ট্রেট জানাতে হয়! তিনি সরকারি খরচে হসপিটালে পাঠাবার ব্যবস্থা করে দেন। ভালো পোষা কুকুরে কামড়ালে বা আঁচড়ালে বিশেষ ভয়ের কারণ নেই। তবুও সাবধান হওয়া ভালো। বিশেষ বিবেচনা করে দেখবে কুকুরটি ভালো কি ক্ষেপা। কোনো ডাক্তারের পরামর্শ নেওয়া ভালো। কামড় দেবার পর এক সপ্তাহের মধ্যে যদি কুকুর পাগলা হয়, তাহলে বিশেষ ভয়ের কারণ থাকে। ক্ষেপা। কুকুরকে কিছু খেতে দিলে সে খায় না বলে মনে হচ্ছে-সাবধান খুব সাবধান।

সন্তানকে সাপে কামড়ালে তৎক্ষণাৎ দংষ্ট্র স্থানের উপর দিয়ে বাঁধের উপর বাঁধ দেবে। দংশিত স্থান চাকু দিয়া কেটে ফেলবে-মায়া করেছ কি সর্বনাশ হয়েছে।

একটা কথা জানি। এক ভদ্রলোক ছেলে নিয়ে রাত্রে শুয়েছিলেন। ঘুমঘোরে একটা সাপ এসে ছেলের হাত কামড়েছিল। ছেলের চীৎকার শুনে বাপ জাগলেন। অন্ধকারেই হাত দিয়ে দেখলেন, সাপটি হাতের সঙ্গে তখনও লেগে আছে। কিছুতেই ছাড়ছে না। বাপ সাপের গা চেপে ধরে টেনে দূরে ফেলে দিলেন। তারপর কাপড়ের পাড় ছিঁড়ে হাতের উপর বাঁধনের উপর বাঁধন দেওয়া হল। ক্রমে বহু লোকজন সেখানে জমা হল। কতকগুলি ডাক্তারও এলেন। আশ্চর্যের বিষয় তারা কেউ কিছু বললেন না, কেবল হা-করে চেয়ে রইলেন। সাপটিকে ইত্যবসরে মেরে ফেলা হয়েছিল।

একজন প্রবীণ ডাক্তার বললেন–এ সাপের বিষ নেই–অতএব সন্তানকে আর কষ্ট দিয়ে লাভ কি? বাঁধন খুলে দাও–ভোর হতে এখনও বিলম্ব আছে। ছেলেটি একটু ঘুমোক,–তখন। সকলে বারান্দার উপর বসেছিল। বাধনের যাতনায় ছেলে একটু একটু কাঁদছিল।

হায়, বন্ধন খোলামাত্র সোনার সুন্দর ছেলেটি কাত হয়ে ঘুমিয়ে পড়লো। মুহূর্তের দেরি সইল না। ছেলেটি চিরদ্রিায় অভিভূত হল। সকলে নির্বাক, স্তব্ধ ও স্তম্ভিত হয়ে গেল। হায়! দুর্ভাগ্য, ভুল!

ছোট ছোট ছেলেপেলেকে দেখলেই আদর করবে। ভবিষ্যৎ কালে সে তোমার পায়ের ধুলা নেবে বলে তাকে আদর করো না, সে মানুষ হোক, দেশ সেবক হোক এই কামনা করো। সন্তানের পায়ের কোনো স্থান থেকে রক্ত পড়লে তাৰ্পিন তেল দিয়ে এঁটে বেঁধে দিও। কাটা ঘায়ে পানি-পট্টি দিও। আগুনে পা পুড়ে গেলে চুনের পানি ও নারিকেল তেল লাগাবে। হাত ভাঙ্গলে দুই পার্শ্বে কাঠ দিয়ে শক্ত করে বেঁধে দিলে হাড় জোড়া লাগে। কোনো বিষ ছেলে-মেয়ের পেটে গেলে তৎক্ষণাৎ বমি করাবে। গরম পানিতে লবণ মিশিয়ে খাওয়ালে বমন হয়। বোলতা কামড়ালে পেঁয়াজ বেঁটে লাগিও।

সন্তানদের বিছানায় মুতা একটা ব্যারাম। হোমিওপ্যাথিক ওষুধ খাওয়ালে সহজে আরোগ্য হয়।

হালিমা জিজ্ঞাসা করিলেন–ছেলেমেয়েকে কিরূপ স্থানে বিয়ে দেওয়া উচিত?

কুলসুম বলিলেন, জ্ঞান ও চরিত্রের সেবা না করে শুধু হছব নছব (সম্বন্ধ) করে নিজের বংশমর্যাদা বাড়াতে চেষ্টা করা লজ্জার বিষয়। সাধারণের কাছে ছোট লোক আখ্যার ছাপ মাথায় নিয়ে তথাকথিত ভদ্রলোকের সঙ্গে সম্বন্ধ করা ভালো কাজ নয়। সামনে সামনে সম্বন্ধ হওয়া ভালো। এক শ্রেণীর লোক আছে, তারা পাপকে ঘৃণা করে না–জ্ঞান ও চরিত্রকে সম্মান করে না, শুধু সাদীর দ্বারা সম্মান অর্জন করতে চেষ্টা করে–এরা কৃপার পাত্র। আত্মমর্যাদা নিয়ে স্বাধীনভাবে দাঁড়ানই সম্মান। সম্মান নিজের ভিতর–নিজের সম্মানের মালিক নিজে।-এ জিনিস ভিক্ষা করবার নয়। স্বাধীনচিত্ত লোক তথাকথিত বড়লোক ও বড় ঘরের কন্যাকে বিয়ে করতে অপমান বোধ করেন। তোমার প্রীতি-উপহার বইখানিতে যে সংস্কৃত শ্লোকটি লেখা আছে, তার অর্থ–যে নিজের নামে পরিচিত সে উত্তম, যে পিতার নামে পরিচিত সে অধম, যে মামার নামে পরিচিত সে অধম, যে শ্বশুরের নামে পরিচিত সে অধমের অধম।

আবার কহিলেন–অমুক ছোট লোকের মেয়ে বা ছেলে, এ কথা বলা পাপ ও অনৈসলামিক। যেখানে জ্ঞান ও চরিত্র সেখানেই সম্বন্ধ করবে। পণ্ডিত ব্যক্তিকে ছোট লোক বলা পাপ-হউক তার আত্মীয়-স্বজন ছোট, বিয়ের পর মেয়ের স্বামীকে সর্বদা আদর-যত্ন করা উচিত। জামায়ের সেবার কোনোরূপ অসুবিধা যেন না হয়।

কুলসুম আবার বলিলেন, ছেলে যদি দূর দেশে যেতে চায়, আঁখিজলে বুক ভাসিও না। মায়ের অঞ্চলের নিধি হয়ে বাড়িতে থেকে চিরকাল দুঃখ, অসম্মান ও দারিদ্র্য-জ্বালা সহ্য করা মূখের কাজ। ছেলেকে প্রয়োজন হলে মিশর, জাপান, চীন, রাশিয়া, ইউরোপ ও আমেরিকাতে পাঠাতে চেষ্টা করবে। এতে ভয়ের কোনো কারণ নেই।

ছেলে বিদেশী ভাষায় পরীক্ষায় ফেল করলে কাদাকাদি করা ভালো নয়। পাসের জন্য রোজা রাখা, সিন্নি মানত করা মূর্খতা। একবার ফেল করেছে তাতে কি ক্ষতি, পরের বারে সে সফল হবে। কোনো বিশেষ বিষয়ে ছেলেমেয়ে যদি কাঁচা থাকে, তবে সেজন্য প্রাইভেট শিক্ষক রাখবে। পাস না করেও চেষ্টা করলে ছেলেমেয়ে শ্রেষ্ঠ ও বড় লোক হতে পারে। পরীক্ষায় ফেল করলে তার জীবন মাটি হয়ে গেল, এমন কোনো কথা নয়। তাকে চরিত্রবান জ্ঞানী করতে পারলেই যথেষ্ট, আর কিছুই দরকার নেই।

ছেলেমেয়েকে খুব বাল্যকাল হতেই বাপকে শ্রদ্ধা করতে শেখাবে–তুমি যেমন শেখাবে তেমনি সে শিখবে। বড় হলে তাদের নতুন করে কিছু শেখান যায় না। ছেলেমেয়েকে মাঝে মাঝে পায়খানায় নিজের জন্য পানি দিয়ে আসতে বলবে। শীতকালে সকাল বেলা পানি গরম করতে বলবে। মিষ্টি কথায় মধুর ব্যবহারে পুত্র কন্যাকে বাল্যকাল হতেই সেবাকার্য শিক্ষা দেবে-বৃদ্ধকালে, বিপদকালে হাসিমুখে পূর্বের অভ্যাস মতো তারা তোমাদের সেবা করবে। তাতে তাদের কোনো কষ্ট হবে না। হাসিমুখে প্রিয়তম বাপ-মাকে তারা সেবা করবে।

ছোট ছেলেপেলেকে উপুড় হয়ে শুতে দেখলে নিষেধ করবে। বলবে উপুড় হয়ে শোওয়া দোষ, আর কিছু না। মাঝে মাঝে বাড়ির ছেলেমেয়েদের হাতে ২/১টি পয়সা কিছু কিনে খাবার জন্যে দেবে। শুধু ছেলেমেয়ে নয়, চাকর-দাসীকেও মাঝে মাঝে কিছু দেওয়া উচিত। পয়সা নেই এ কথা বলো না।

বিয়ের পর ছেলেমেয়েকে স্বাস্থ্য সম্বন্ধে কোনো অশ্লীল উপদেশ দিও না।

.

দ্বাবিংশ পরিচ্ছেদ

কুলসুম বলিলেন-সংসার করতে হলে, ছেলেমেয়ে, আত্মীয়-স্বজন নিয়ে বাস করতে গেলে আরও কতকগুলি বিশেষ দরকারি কথা তোমাকে জানতে হবে।

হালিমা কহিলেন-বলুন ভাবি।

কুলসুম : ঘরের মেঝে ভিজে হওয়া বড় দোষের, এরূপ হলে শরীর নানা ব্যাধিতে আক্রান্ত হয়। আর্দ্র মেঝেতে শুকনো মাটি বা বালি ছড়িয়ে দিয়ে উপরে চাটাই বা মাদুর পেতে দিতে হয়।

মাঝে মাঝে বর্ষাকালে অনেক ছেলেমেয়ে পানিতে ডোবে। আমার মনে হয়, অনেক স্থানে তাজা সন্তানকে মরা মনে করে লোকে দাফন করে।

হালিমা কহিলেন–কি ভয়ানক কথা।

কুলসুম : ভয়ানকই বটে।

হালিমা : মানুষ মরলে চেনাই যায়, এতে আর ভুল হবার কি আছে?

কুলসুম : মানুষকে অনেক সময় মরা বলে ভ্রম হয়। কিন্তু আসলে তারা মরে না। আচ্ছা বল দেখি, কেমন করে মানুষ মরেছে বোঝা যায়?

হালিমা : নিশ্বাস যখন চলে না, হাত-পাগুলি যখন শক্ত হয়ে যায়, দৃষ্টি স্থির তখনই জানা যায় মানুষ মরেছে।

কুলসুম : তোমার ধারণা ভুল। অনেক সময় দেহে প্রাণ থাকা সত্ত্বেও মানুষের এই অবস্থা হয়। মরা মানুষ পুনরায় বাঁচবার কাহিনী অনেক শোনা যায়। নিশীর রাত্রে গোরস্থানে বা নদীর ঘাটে অনেক মরা মানুষ আবার বেঁচে ওঠে। অশিক্ষিত গ্রাম্য লোকেরা ভূত মনে করে প্রাণভয়ে পালায়। এইসব খোদার অনুগ্রহপ্রাপ্ত পুনরুজ্জীবিত মানুষের মাথায় কত লাঞ্ছনা ও অত্যাচারের বোঝা চাপিয়ে দেওয়া হয়।

হালিমা : কী করে ঠিক বোঝা যায় যে মানুষ মরেছে?

কুলসুম : কয়েকটি ভালো পরীক্ষা আছে। একটি ২ চ্ছ আগুনেও মৃতদেহ ফোস্কা হয় না। কোনো কোনো তথাকথিত মৃতদেহ ৭/৮ দিন পর্যন্ত প্রাণ থাকে। আহা খোদার কি মহিমা!

হালিমা : পানিতে ছেলে ডুবলে কি করতে হবে?

কুলসুম : চৈতন্যহীন শিশুর চৈতন্য আনা যায় কিনা, তার চেষ্টা করতে হবে। চিৎ করে শোয়াবে। পিঠের নিচে একটা বালিশ দিয়ে বুকটা মাথা হতে কিছু উঁচুতে রাখবে তার পর মাথার দিকে বসে শিশুর হাত দুখানি কনুইয়ের উপর ধরে লম্বা করে একসঙ্গে মাথার দিকে নিয়ে আসবে, তারপর আবার বুকের দিকে নিয়ে হাত দু’খানি ভঁজ করে বুকের পার্শ্বে লাগাবে। এইরূপ ঘন্টা ধরে করবে, আর এক কথা–ঐ সঙ্গে মুখের ভিতর থেকে জিভ বের করে টেনে ধরে রাখতে হয়, এইরূপ করলে শীঘ্র শ্বাসক্রিয়া হবার সম্ভাবনা। পঁচিশ মিনিটের বেশি পানিতে থাকলে কোনো আশা নাই।

বাড়ির কাউকেও সাপ কামড়াইলে দংষ্ট্র স্থানের উপরে অবিলম্বে ২/৩টি বাঁধ দিতে হয়। হালিমা শিহরিয়া উঠিয়া কহিল–ভাবি আমার বড় ভয় হচ্ছে, ওকথা আমি শুনতে চাই নে।

কুলসুম : না শুনলে চলবে না। সংসারে বাঁচতে হলে আমাদের নিরন্তর সতর্ক থাকতে হবে।

হালিমা : তা তো ঠিক।

কুলসুম : সাপে আমাদের দেশে দরিদ্র লোককেই বেশি কামড়ায়। বাড়ির চারদিক সর্বদা সাফ রাখতে হয়–এদিকে প্রত্যেক গৃহস্থের বিশেষ মনোযোগ চাই। বাড়ির ধারে . জঙ্গল বড়ই আপত্তিজনক।

রাস্তায় যখন আলোক জ্বলে এইরূপ করে বাড়িতে সারারাত্রি না হোক, ১০/১১টা পর্যন্ত বড় বাতি জ্বালানো উচিত, যাতে বাড়িখানি আলোকময় হয়ে ওঠে। বাড়ির রাস্তাগুলি ইটের কুচি দিয়ে বাঁধিয়ে নেওয়া উচিত। ঘরের পার্শ্বে বহু শিকরবিশিষ্ট গাছ থাকাও অন্যায়। ঘরের মেঝে অবস্থায় কুলোলে ইট ও সিমেন্ট দিয়ে বাঁধিয়ে নেওয়া উচিত। যাক, যা বলছিলাম–সাপে কামড়ালে বাঁধ দিয়ে দংষ্ট্র স্থানের মাংস ছুরি দিয়ে কেটে ফেলবে, তারপর গরম পানি দিয়ে ক্ষতস্থান ধুয়ে, সেখানে পটাশ-পারম্যাঙ্গানেট লাগিয়ে দেবে। এ ওষুধ শহরে বা মহকুমার ডাক্তারদের কাছে পাওয়া যায়। সাপে কামড়িয়েছে কিনা সন্দেহ হলে মরিচ খেতে দেওয়া উচিত। সাপ কামড়ালে মরিচের তীব্রতা জিভে লাগে না।

কুলসুম : আবার বলিলেন,-ঘরে কতকগুলি ওষুধ রেখে দেওয়া উচিত। এক বাক্সে হোমিওপ্যাথিক ওষুধ এনে ঘরে রেখে দেওয়াই সুবিধা।

হালিমা : বড় শহর হতে ওষুধ এনে ঘরে রাখা অনেকের পক্ষে অসুবিধা ও অসম্ভব। বুড়িরা তো অনেক ওষুধ জানেন।

কুলসুম : আমিও জানি। যদি মনে করে রাখতে পার তাহলে মোটামুটি ব্যাধির ওষুধের কথা বলছি। এসব ওষুধ আমাদের ঘরের কোণায় বা বেনেদের কাছে পাওয়া যায়। ওষুধের কথা বলবার আগে আমি আরও একটি দরকারি কথা বলে নিচ্ছি।

হালিমা : কী কথা?

কুলসুম : কারো গায়ে যদি আগুন ধরে যায়, তবে কখনও হতবুদ্ধি হবে না। কখনও আগুন নিয়ে তাকে লাফাতে বা দৌড়াতে দেবে না। কাপড়-জামা খুলতে চেষ্টা করা বৃথা। কাপড়ে আগুন ধরলে হাতে আগুন ঠেসে ধরে বিশেষ লাভ হয় না।

হালিমা : আগুনে পুড়ে মরা বড় সাংঘাতিক কথা।

কুলসুম হাই ফেলিয়া বলিলেন–খোদা যেন কাকেও এমন দুর্ঘটনার মধ্যে না ফেলেন। একটু নীরব থাকিয়া কুলসম আবার বলিলেন–ক্ষেপা কুকুর কামড়ালে কী করতে হয়। আগেই বলেছি। আরও একটু বলি,-কামড়ান মাত্র, লোহা লাল করে দংষ্ট্র স্থানে ঠেসে ধরবে। ফিউমিং নাইট্রিক এসিড লাগালেও বিশেষ উপকার হয়। যাই হোক, সেই যে শহরের হাসপাতালের কথা বলেছি, সেখানেই কারো বাধা না শুনে যাওয়া উচিত। সব টাকা গভর্নমেন্ট হতে পাওয়া যায়। সে টাকা দেশের লোকেরই, সুতরাং তার উপর সকলেরই দাবি আছে। ভালো কুকুরে কামড়ালে কিছু হয় না।

শরীরের কোনো জায়গা হতে রক্ত পড়তে থাকলে সেখানে ন্যাকড়া পোড়ার ছাই লাগবে; অনেকক্ষণ চেপে ধরাও মন্দ নয়। ঠাণ্ডা জলে আহত স্থান অনেকক্ষণ ডুবিয়ে রাখলেও রক্ত বন্ধ হয়!

কাউকে বোলতায় কামড়ালে মধু গুড় লাগাতে বলবে। পেয়াজের রস দেওয়া ভালো।

কেউ দেশলাইয়ের কাঠি বেশি চুষলে বমি করিয়ে ফেলানো উচিত। ছেলেপেলেদের ঘরে ম্যাচ বাক্স লুকিয়ে রাখাই নিয়ম।

চোখে কিছু পড়লে চোখ রগড়ান নিষেধ। তীক্ষ্ণ কোনো পদার্থ পড়লে ডিমের সাদা ভাগ চোখে দেওয়া মন্দ না। চোখে দু’টি চাল দিয়ে চোখ বুজে শুয়ে থাকা ভালো। চোখে চুন পড়লে লেবুর রসের পানি দেবে; শুধু পানি চোখে দেবে না।

কেউ হঠাৎ অচৈতন্য হলে ঘরের দরজা-জানালা খুলে চোখেমুখে শীতল পানি ঝাঁপটা দিতে হয়। হুঁশের জন্য বলপ্রয়োগ করবে না। স্বামীর বা কারো ভয়ানক বিষম লাগলে হাঁচতে বলবে।

জ্বর বা ব্যাধি শেষে অরুচি হলে পুরানো কচি ডালিমের রস, জীরের গুড়ো, চিনি, মধু ও ঘি একসঙ্গে মিশিয়ে মুখে রাখলে অরুচি থাকে না।

বাড়ির কারো ভালো পরিপাক না হলে হরিতকি পুড়িয়ে সৈন্ধব লবণ, বিট লবণ ও বোয়ান সমভাগ করে বাটবে। তারপর আধ তোলা বা এক তোলা বড়ি করে খাবার পরে গরম পানির সঙ্গে খেতে বলবে। এতে বেশ পরিপাক হবে। এসব জিনিস হাটে বেনেদের কাছে পাওয়া যায়।

কারো যদি কোনো আঙুল ফুলে ওঠে ও জ্বালা করে তাহলে তাকে একটি কচি বেগুনের ভিতর লবণ ভরে তার মধ্যে ফোলা আঙ্গুল কয়েক ঘণ্টা ভরে দিয়ে রাখতে বলবে।

আমাশয় হলে পুরানো তেঁতুল চিনি ও মর্তমান কলা এক সঙ্গে মিশিয়ে খেতে হয়, তাতে আমাশয় সেরে যায়।

হালিমা হঠাৎ বলে উঠলেন–ভাবি, উকুনের কোনো ওষুধ আছে? কুলসুম বলিলেন-চাঁপা ফুলের পাতায় রস মেখে শুকালে উকুন মরে যায়। ময়লা জমে সময় সময় কান বন্ধ হয়ে যায়।

কুলসুম আবার বলিলেন–ছেলেমেয়েরা অনেক সময় কান পাকায় ভোগে। রোজ সকাল কানে ২/৩ ফোঁটা কচি বাছুরের চোনা দিলে কান পাকা সারে। ক্রিমি হলে আনারসের পাতার রস একটু সামান্য চুন দিয়ে মিশিয়ে খেতে হয়।

কুলসুম হালিমাকে জিজ্ঞাসা করিলেন–আর কিছু শুনবে নাকি?

হালিমা : বলুন।

কুলসুম : বহেড়া বেঁটে ঘি-এর সঙ্গে গরম করে খেলে গলার বেদনা কমে। বেশি নয় ২/৩টি বহেড়া হলেই হবে। বহেড়া বেনেদের থলের মধ্যে থাকে।

চোখ উঠলে ছটাকখানেক ঠাণ্ডা পানিতে একটুখানি লবণ দিয়ে সেই পানিতে ২/৩ বার চোখ ধুলে বিশেষ শান্তি হয়।

নারিকেলের শিকড় থেঁতো করে পানিতে সিদ্ধ করে তাই দিয়ে কুলি করলে দাঁতের গোড়া শক্ত হয়। অনেক প্রৌঢ় মহিলার দাঁত নড়ে।

কুলসুম বলিলেন–তোমার ভাই যখন পড়তেন তখন একবার ফোড়ার যন্ত্রণায় অস্থির হয়েছিলেন। আমি পুরানো তেঁতুল আর একটা জবা ফুল বেঁটে সেখানে দেওয়াতে ফোড়াটি ফেটে গেল। সাবান আর চিনি এক সঙ্গে চটকিয়ে ফোঁড়ার মুখে দিলেও ফোড়া পাকে। যুবতীদের মুখে ব্রণ হলে তাতে একটু তাজা চুন দিতে হয়, নইলে মুখ ব্যথা করে, হাত দেওয়া যায় না।

অনেক সময় নির্দোষ বাগি হয়। মাদার (শিমুল) গাছের আঠা আর একটু নুন তুলায় করে ফোলা স্থানে দিয়ে কোনো গরম কাপড় দিয়ে বেঁধে রাখবে বাগি একদিনেই বসে যাবে।

কোনো কোনো স্থানে যদি মচকে যায় আর ব্যথা করে, তাহলে চুন আর হলদি বাটা এক

সঙ্গে করে গরম করবে-তারপর বেদনা স্থানে প্রলেপ দেবে। এতে বেশ উপকার হবে।

মেয়েদের মাঝে মাঝে ভারি মাথা ধরে–রাই বা দারুচিনি বেঁটে কানের পাটিতে দিতে হয়।

মুখে ঘা হলে ভেড়ার দুধ লাগাতে পারলে সেরে যায়। কিন্তু ভেড়া পাওয়া তো মুশকিল। বেলের পাতা চিবালে উপকার হয়।

পেট ব্যথার বেশি কোনো ওষুধ আমি জানি নে। হোমিওপ্যাথিক কলোসিস্থ, ম্যাগনেসিয়া, ফস, আর্সেনিক প্রভৃতি ওষুধে যাতনা হতে অব্যাহতি পাওয়া যায়।

কুলসুম বলিলেন–অনেক সময় ঘরে চিনি মিছরির গন্ধে পিঁপড়ে ওঠে। মিছরির পাত্রের সঙ্গে কর্পূর দিলে পিঁপড়ে আসে না।

.

এয়োবিংশ পরিচ্ছেদ

কুলসুম বলিলেন–প্রিয় হালিমা, তোমার বিয়ের দিন চলে এসেছে, আমার কথা বলা শেষ হয়েছে। আর কয়েকটি কথা বলেই আমি শেষ করব।

বাড়িতে কেউ মরলে মাথা ভাঙ্গাভাঙ্গি করে কেঁদো না। আঁখিজল নির্জনে ফেলবে। লোকে যেন না দেখে। মরণে খুব বেশি দুঃখ করা গোনাহ। মরণকে উপহাস করতে হবে। এ জগৎকে প্রাণের সঙ্গে মিথ্যা মনে করা বা কর্তব্য সম্পাদনে জগৎকে মিথ্যা মনে করা উচিত নয়।

আরও শোন–দেখ অনেক সময় বন্ধুর জন্যে পরিবারে অশান্তির সৃষ্টি হয়। স্বামী ও শ্বশুর শাশুড়ীর মধ্যে মনোমালিন্য আরম্ভ হয়। অভাব, মূর্খতা ও অনুন্নত মনই এইসব মনোমালিন্যের কারণ। অনেক সময় অনেক মাতা সন্দেহ করেন, বিবাহের পর তার স্থান ছোট হয়ে গেল। পুত্র আর তেমনি করে মাতাকে ভালবাসে না। এই সন্দেহ বড়ই মারাত্মক। শাশুড়ীর উপর খুব শ্রদ্ধা রাখবে; স্বামীকে খাওয়াবার আগে সর্বদা শ্বশুর শাশুড়ীকে খাওয়াবে। উপহার ও অর্থ দিয়ে শ্বশুর-শাশুড়ীকে নিজেদের ভালবাসা ও বশ্যতা জানাবে।

শ্বশুরবাড়িতে বধূর সম্মান না হলে অনেক সময় বধূরা স্বামীর কাছে তার শ্বশুর শাশুড়ীকে খেলো করতে চেষ্টা করেন। নিজের সম্মান না হলেও স্বামীর কাছে কোনো কথা

বলাই শ্রেয়। নারীর দুঃখের শেষ নেই। স্নেহ, মমতা, প্রীতি, অনুরোধের আদান-প্রদানই পরিবারের শান্তির কারণ। একজন অন্যজনের দোষকে সর্বদা ক্ষমা করবে, প্রত্যেকে প্রত্যেকের ভাবের প্রতি শ্রদ্ধা পোষণ করবে, কেউ কারোর উপর অত্যাচার করবে না, তাহলেই পরিবারের মঙ্গল হয়। সুখ, শান্তি ও উন্নতি বাড়ে।

কুলসুম আবার বলিলেন-দেখ, ইংরেজি শিক্ষার সঙ্গে সঙ্গে আমাদের নবীন যুব সমাজ ও পুরাতন বৃদ্ধ সমাজের ভিতর একটা দ্বন্দ্ব বেঁধে উঠেছে। প্রাচীনেরা যা ভাবেন, নবীনেরা তার উল্টা কথা বলেন। নবীনের চিন্তা সম্পূর্ণ নতুন রকমের; জীবন ও সমাজ সম্বন্ধে তার যে ধারণা তা শূন্যে প্রাচীন উপহাস ও অবজ্ঞা করেন, ফলে বহু পিতা-পুত্রে মনোমালিন্য হয়। বহু পরিবারে অশান্তির আগুন জ্বলে ওঠে। ওর মীমাংসা কী তা বলা কঠিন। উভয়ে উভয়ের উপর খড়গহস্ত না হয়ে, প্রত্যেক প্রত্যেকের কথা সম্বন্ধে ভেবে দেখা উচিত। একে অন্যকে বুঝতে চেষ্টা করতে চাই। তাহলেই বোধ হয় একটা মীমাংসা হতে পারে। প্রাচীনেরা যদি নবীনের কাছে কিছু শেখার থাকে তাতে প্রাচীনেরই গৌরব, তাতে প্রাচীনের লজ্জার কারণ নেই, কারণ প্রাচীনের বুক ভেঙ্গে নবীন বের হয়।

নিজের বা পরিবারের আকস্মিক কোনো বিপদ হলে যে-কোনো ডেপুটি ম্যাজিষ্ট্রেটের সঙ্গে দেখা করা যায়, এ কথা জেনে রাখা উচিত। চুপ করে থাকা নিষেধ। আইন একটা নূতন জিনিস নয়। বুদ্ধিই শ্রেষ্ঠ আইন। সাধারণ বুদ্ধি নিয়ে লোকের সঙ্গে কথা বললেই জয় হবে।

আর একটি কথা, বাড়ি যাতে দেখতে সুন্দর হয় তা দেখবে, কতকগুলি ঘর হিজিবিজি করে তুলে রাখা ঠিক নয়। বাড়িগুলি সর্বদা চতুষ্কোণ আকার হবে। সামনে ফুলের বাগান থাকবে, শ্যামপুষ্পচ্ছাদিত একটা ছোট ক্ষেত থাকাও নিতান্ত উচিত।

বাড়িতে ধান মাড়াবার জন্য একটা স্বতন্ত্র স্থান পাকা করে বাধিয়ে নেওয়া ভালো। বাড়ির ভিতরকার উঠোনে খানিকটা স্থান ইট দিয়ে বাঁধিয়ে নিয়ে সেখানে ধান শুকান যেতে পারে।

সংসারে অনেক বিপদ ও কষ্টের কারণ এসে জোটে, সে সমস্ত কথা চিন্তা করে শরীর নষ্ট করা ভুল।

মেয়ে বিয়ে দিলে জামাই বা বৈবাহিক যখনই মেয়ে নিতে আসেন তখনই তাকে যেতে দেবে। মেয়ে না দিয়ে কখনও অভদ্রতার পরিচয় দিও না।

পাড়া-প্রতিবেশীর বাড়িতে কুটম্ব বা শিক্ষিত ভদ্রলোক এলে তাকে দাওয়াত করে খাওয়ান ভালো। অবস্থায় না কুলোলে দরকার নেই। দুধ, দই বা ক্ষীর খাবার থাকলে অতিথি বা যে কেউ হোক আগেই সামনে দিতে হয়। খাওয়া শেষ হয়ে গেলে সেসব হাজির করাই উচিত।

শ্বশুর-শাশুড়ী বুড়ো হয়ে গিয়েছেন বলে কখনও মনে করো না–তাদের খাবার পরবার কোনো ইচ্ছা নাই, তারা কেবল মৃত্যুর কথা ভাবেন, এ কথা ভেবো না। বধূর হাতে প্রাণ ভরে খাবেন বলে অনেক শ্বশুর-শ্বাশুড়ী জীবন ভরে আশা করে থাকেন, সুতরাং তাদের খাবারের প্রতি বিশেষ নজর চাই। শ্বশুর-শাশুড়ীর জন্য স্বামীকে বিদেশ থেকে মাঝে মাঝে নানাপ্রকার ফলমুল, বিস্কুট, হালুয়া, ও কেক আনতে বলবে। অল্প হলেও তাদের নানা সুস্বাদু জিনিস খাওয়াবে–এতে তারা কত সুখী যে হন, তা ভাষায় প্রকাশ করে বলা যায় না। খাবার সময় কখনও ছেলেপেলেকে তাঁদের কাছে যেতে দেবে না।

স্বামীকে বলল, যেখানে বাধা দেওয়া দরকার সেখানে যেন তিনি বাধা দেন, যেখানে ঘাড় শক্ত করা দরকার, সেখানে যেন তিনি কাপুরুষের মতো ঘাড় নরম না করেন। বাধা

দিলেই মৃত্যু হয়, ঘাড় নরম করলেই বেশি করে অসম্মান হয়। তাই বলে একগুঁয়েমি ভালো নয়।

নারী চরিত্রে একগুঁয়েমি ভাবটা অনেক সময় বড় প্রবল। সংসারের যত রকম খরচই। হোক না, কখনও বাজার খরচের টাকা কাউকে দেবে না। কেউ মাথায় লাঠি মারলেও এ টাকা ঘর থেকে বের করতে নেই। বাজার খরচ ভেঙ্গে ঋণ পরিশোধও নিষেধ। সোজা। বলে দিও, না খেয়ে মরতে পারি নে।

আর একটা বিশেষ কথা–যেমন করে তোক টাকা কিছু জমাতে হবে। কি জানি, স্বামীর যদি কোনো বিপদ হয়, পয়সার জন্যে যেন মানুষের দ্বারে দ্বারে ঘুরতে না হয়। পয়সার জন্যে যেন নীচ ব্যক্তির কাছে অন্যায়ের সম্মুখে মাথা নত করতে না হয়। অন্যায় ও নীচতাকে মেনে নিয়ে এবাদতে লাভ কী?

বর্তমানকালে স্বামীকে পরের গোলামি না করে কোনো স্বাধীন কাজ করতে বলা উচিত; গোলামিতে স্বামী-স্ত্রীর দুইয়েরই অসম্মান।

অপরিচিত স্থানে যেয়ে কোনো হীন কাজ করে যদি স্বামী উন্নতির পথ করে নিতে পারে সেও ভালো। চরিত্র হারিয়ে অর্থ উপার্জন নিষেধ।

অপ্রয়োজনে বা সময়ের পূর্বে কোনো কথা বলতে নেই; তাতে বধূর বদনাম হয়।

স্বামীকে সেবা করতে যদি কষ্ট হয়, তাহলে স্বামীর সেবার জন্যে নিজে দূরে থেকে, একটা সুন্দরী কোমলাঙ্গী বালিকা দাসী নিযুক্ত করো, সে তোমার স্বামীর সেবা করবে। তাহলে দু’দিনেরই বুঝবে স্বামীর সেবায় কী আনন্দ।

জোর করে কারো কাছ থেকে দাওয়াত আদায় করতে নেই। ছেলেমেয়েকে বাদ দিয়ে স্বামীকে যদি কেউ দাওয়াত করে, তবে সে জন্য অসন্তুষ্ট হওয়া ভালো নয়। দাওয়াত না করলে ছেলেমেয়েকে ছোট বলে স্বামীর সঙ্গে পাঠানো উচিত নয়।

অর্থশালী লোক অপেক্ষা জ্ঞানী ও পণ্ডিত ও সাহিত্যিক, সুধীদের প্রতি বেশি শ্রদ্ধা পোষণ করা উচিত, নইলে আত্মার অবনতি হয়।

স্বামী খেতে চাইলে তৎক্ষণাৎ তাঁকে খেতে দেবে। যাই থাক না, যত্ন করে খাওয়াবে।

স্বামী কোনো কারণে অসন্তুষ্ট হলে অসন্তোষের কারণ জিজ্ঞাসা করবে এবং তা দূর করতে চেষ্টা করবে। আপন মনে চুপ করে থাকতে নেই।

পরের চিঠি কখনও পড়তে নেই। পিয়ন বাড়িতে চিঠি দিয়ে গেলে মালিকের কাছে পাঠিয়ে দিতে কখনও ভুলবে না। ছেলেদের কাছে ডেকে চিঠি ফেলে দিতে বললে অনেক সময় তারা বইয়ের ভিতরেই রেখে দেয়। এ যেন মনে থাকে।

পিয়ন চিঠি দিয়ে গেলে অনেক সময় মালিককে তা কখনও দেওয়া হয় না, এর মত নীচতা আর নেই।

মেয়েরা অনেক সময় দোষ করে অচেতন পদার্থের উপর ক্রোধ করেন। নিজে দোষ করে ‘দুরো’ ‘ছাই’ এই সমস্ত কথা বলো না।

স্ত্রীকে যেন দুইবার করে কোনো কথা না বলতে হয়। কতকগুলি মেয়ে আছেন তাঁরা কোনো কথা বললেই ‘কী বললেন’–বলে পুনরায় প্রত্যেক কথা শুনতে ইচ্ছা করেন। কথা প্রথমবারেই শুনতে চেষ্টা করা উচিত।

ধোয়া কাপড় বা অলঙ্কার পরে মনে যেন কোনো অহঙ্কার না আসে।

ঘরের মেঝেতে যেন কোনো প্রকার ময়লা না জমে। মুরগি যাতে ঘরে না ঢোকে সেজন্য রেলিং নিয়ে বা বেড়া দিয়ে ঘরের বারান্দা ঘিরে রাখবে। কতকগুলি মুরগি আছে, তারা আদৌ ঘরে ঢোকে না। ঘরের মধ্যে মুরগি পায়খানা করলে তখন তখন ছাই দিয়ে দূর করে ফেলে দেবে। একটা ছোট এক ইঞ্চি পরিমাণ খুরপো তৈরি করে নেওয়া ভালো। যে সমস্ত মুরগি অনবরত ঘরে ঢোকে, সেগুলি না পোষাই উচিত।

স্বামী রাগ করে কোনো কাজ করতে অগ্রসর হলে, মিষ্ট ভাষায় তাকে সে কাজ না। করতে অনুরোধ করবে। বোকার মতো চুপ করে থেকো না।

বাড়িতে একটা ছোট লাইব্রেরি থাকা নিতান্ত দরকার। বাজে অকেজো বইতে লাইব্রেরি ভর্তি করা ঠিক নয়। ভালো ভালো বই পড়লে পরিবারের বড়ই কল্যাণ হয়।

কেউ যদি কোনো বই নিয়ে যায়, খাতায় তার হিসাব রাখবে, নইলে বই হারিয়ে যাবেই। নিজে গুছিয়ে, খোঁজ করে না রাখলে হারাবেই, বই নিয়ে ফেরত না দেওয়া মানুষের স্বভাব। এজন্য রাগ করা বৃথা।

খবরের কাগজের গ্রাহক হতে কখনও ভুলো না। খবরের কাগজ না পড়া–জগতের খবর না রাখা, চরম অসভ্যতা।

একটা বিশেষ কথা মনে রেখো মানুষের পনের আনা ব্যাধি তাড়াতাড়ি খাবার দরুণ হয়। কখনও তাড়াতাড়ি খাওয়া উচিত নয়। পরিবারের সকলে গল্পে আলাপে একসঙ্গে একঘণ্টা বসে খাওয়া উচিত।

শীতকালের জন্য গরম কাপড়-চোপড়ের ব্যবস্থা হওয়া বড়ই দরকার। শীতে মানুষের শক্তি ও আয়ু ক্ষয় হয়। যেমন করেই হোক পরিবারের প্রত্যেকের জন্য যথেষ্ট কাপড়ের বন্দোবস্ত চাই। কাপড় যদি না জোটে, তা হলে তুলা দিয়ে গায়ের কাপড় ও জামা তৈরি করে নেওয়া উচিত। গায়ের কাপড়ের জন্যে অন্য খরচ না হয়, তাও ভালো।

অতিথি অভ্যাগতদের জন্য অন্দর বা বাইর বাড়িতে একই রকমের বরতনের ব্যবস্থা করবে। কারো জন্য চমৎকার থালা, তারই পার্শ্বে লোকের জন্য অপেক্ষাকৃত মন্দ বরতন দেওয়া অভদ্রতা। সকলের জন্য একই রকমের বিছানা চাই। কারো জন্যে গদি তোষক, কারো জন্যে মন্দ বিছানার বন্দোবস্ত করলে ভদ্রলোকের এবং ভদ্রমহিলাদের অপমান করা হয়। খেতে বসিয়ে কাউকে বিশেষভাবে আদর-যত্ন করবার দরকার নেই। খাবার জিনিসপত্র পেয়ালায় পূর্ব হইতে ঠিক করে রাখা উচিত। নইলে কাউকে আগে দিতে হয়, কাউকে বসিয়ে রাখতে হয়। দশজনকে তুলে একজনকে সম্মান জানানো প্রাচীন লোকদের রীতি।

যাদের দাওয়াত করবে তারা বাড়িতে এলে তাদের অভ্যর্থনার জন্য বিশেষ করে একজন লোক নিযুক্ত করবে। নইলে তাদের অসম্মান করা হয়। চীনা মাটির বাসনে ভদ্রলোক হওয়া যায়–এ ধারণা কিন্তু ঠিক নয়। বিদেশী জিনিসে ভদ্র না হয়ে গাছের পাতা এবং মাটির বাসনপত্র দিয়ে অভদ্র নাম অর্জন করা ভালো।

হাত মুখ ধোবার জন্যে অতিথিদের চিলমচী দেবার দরকার নেই। সকলের জন্যে বারান্দায় পানি রেখে দেওয়া উচিত। চিলমচীতে কেউ হাত ধুইয়ে দিলে বেশি সম্মান হয়-এ বিশ্বাস করা বিশেষ প্রশংসাজনক বলে মনে করি না।

জোর করে জীবনের অভাব সৃষ্টি করো না, এ ভাবেই মানুষের বহু দুঃখ বাড়ে।

কাজ শেষ হলে জিনিসপত্র যেখানে সেখানে টান দিয়ে ফেলা, তারপর যখন আবার দরকার হয় তখন সেই জিনিসের জন্য সারাদিন ছুটোছুটি করা বড়ই দোষ। দরকার অ দরকারে সব জিনিস যথাস্থানে ঠিক করে রাখা উচিত। শৃঙ্খলা সভ্যতার লক্ষণ।

স্ত্রীলোকের ব্যক্তিত্ব অর্জন করা সংসার কার্যে অভিজ্ঞতা লাভ করা দরকার। কারণ, কে জানে জীবনে কোন সময় কি বিপদ হয়! মাঝে মাঝে স্বামীকে ছুটি দিয়ে সংসার কার্য নিজে চালাতে চেষ্টা করা উচিত।

মেয়ে মানুষের যত্রতত্র গমনে সমাজ বাধা না দিলেও ধর্ম বাধা দেয়, এ আমার মনে হয় না। বর্তমানে যে অবরোধ প্রথার চলতি হয়েছে, তাতে মুসলমান রমণীর পক্ষে জগতে অন্তত বর্তমানে বেঁচে থাকা কঠিন। হযরত মোহাম্মদের (সঃ) অনেক পরে এই কু-প্রথা স্থায়ীভাবে নারীর গলা চেপে ধরেছে।

পরিবারের সুবিধার জন্য বাড়িতে একটা হোমিওপ্যাথিক বাক্স থাকা ভালো। ছেলেপেলে নিয়ে পল্লীগ্রামে এবং শহরেও অনেক সময় বড় বিপদে পড়তে হয়। কথায় কথায় ডাক্তার ডাকা কঠিন, তাছাড়া হাতুড়ে ডাক্তারের এলোপ্যাথিক ওষুধ খেলে শেষ শরীর খারাপ হয়ে পড়ে।

জীবনের সব সময় মানুষকে চরিত্র, জ্ঞানে ও অর্থে বড় করতে চেষ্টা করা উচিত, কারণ সেটাই ধর্ম। মানুষকে জ্ঞানের কথা শোনান, বই পড়তে উপদেশ দেওয়া বড় ভালো। মাঝে মাঝে পাড়ার মেয়েদের নিয়ে সভা করা ভালো।

মূর্খ ও দুর্বৃত্ত মানুষের কথা ও ব্যবহারে হঠাৎ উগ্র হতে নেই, ধৈর্য সহ্যগুণ ছাড়া মানুষকে বড় করা যায় না। মানুষের জঘন্য দুর্বলতা দেখে ক্রুদ্ধ হলে চলবে না, মনে করতে হবে–মানুষের এটা স্বভাব।

কারো কোনো কথা বা কাজের কঠিন সমালোচনা করতে নেই; কার মধ্যে কি সত্য আছে তা বোঝার ক্ষমতা অনেক সময় আমাদের থাকে না।

অবুঝ ও অপদার্থ লোকের সঙ্গে ভালো কথা নিয়ে তর্ক করাই ভাল। তাতে নিজের সম্মান নষ্ট হয়। মূর্খ আত্মীয়-স্বজনের সঙ্গেও কোনো ভালো কথা নিয়ে তর্ক করতে নেই; তাতে ভালো হয় না।

প্রতিবেশীর দুঃখ-বেদনায় সর্বদা সহানুভূতি দেখান চাই। মানুষের দুঃখ-বেদনা বোধ আবশ্যক।

যে কথা শুনে বা যে কাজে গম্ভীর হওয়া আবশ্যক তাতে হাসবে না, তাতে ছেলেমি পরিচয় দেওয়া হয়।

কারো-মন-সন্তোষের জন্য কখনও কোনো অন্যায় কথা বলবে না, সত্য কথা শুনে কেউ রাগে রাগুক।

পরিবারের, সাহিত্যের সঙ্গে যোগ থাকা চাই-ই-চাই। যে পরিবারের সাহিত্যের সঙ্গে সংস্রব থাকে, তাদের কোনো কালে পতন হয় না। ছেলে বুড়ো সকলেরই বই খবরের কাগজে মাসিক পত্রিকা পড়বার অভ্যাস থাকা উচিত।

বিদেশী ভাষা পরীক্ষায় অকৃতকার্য, জীবন মাটি হয়ে গেল, এরূপ যেন মনে করো না। পরীক্ষায় ফেল করেও মানুষ দেশমান্য হতে পারে। জীবনের উন্নতির পথ কোনো বাইরের বাধাতে রুদ্ধ হতে পারে না। সাহিত্যের ভিতর দিয়ে মানুষ সকল অবস্থায় জ্ঞান ও শক্তি অর্জন করতে পারে। একথা পরিবারের সকলেরই বিশ্বাস করা উচিত।

ঘরের মেঝেতে কখনও মাদুর পেতে রেখে দিতে নেই। উঠে যাবার সময় মাদুর গুছিয়ে বেড়ার ধারে হেলান দিয়ে রাখা নিয়ম।

বাড়িতে কোনো অতিথি এলে তাকে অতি সমাদরে গ্রহণ করবে। অব্যশ স্বামী অমত করলে সে অবস্থায় উপায় নেই। অতিথিকে পরের বাড়ি দেখিয়ে দেওয়া ভালো নয়।

স্বামী দূরে গেলে কখনও কোনো ভালো জিনিস তৈরি করতে নেই। তৈরি করলে যত্ন করে স্বামীর জন্যে তুলে রাখবে। স্বামী দূরে থাকলে ভালো জিনিস তৈরি করলে স্বামী অসন্তুষ্ট হন, তা বলছি নে।

ফাতেহা উপলক্ষে বহু মানুষ খাওয়ানোতে কোনো সার্থকতা নেই। ফাতেহার দ্বারা বেহেশতে যাওয়া সম্ভব, এ বিশ্বাস না করাই ভালো। বহু টাকা ফাতেহায় ব্যয় না করে কোনো সৎ কাজে সে টাকা ব্যয় করবে। মসজিদ প্রতিষ্ঠা করলেই খুব বেশি পুণ্য হবে-এ কথা মনে করা ভুল। লাইব্রেরি প্রতিষ্ঠা, অনাথ আশ্রম খোলা, নিরাশ্রয় বিধবার জন্য সাহায্য করা উত্তম। না খেয়ে, উলঙ্গ থেকে, মূর্খ হয়ে কী করে লোকে মসজিদে যাবে?

অনেক সময় গ্রামে অংশ করে ছাগল জবেহ হয় এই উৎসবে যোগ দেবে না।

স্বামী কোনো কাজ করতে বললে বিবেক ও ধর্মবিরুদ্ধ না হলে তা করা উচিত। তাতে যদি নিজের কোনো ক্ষতি হয়, তা স্বীকার করে নিতে হবে।

দরিদ্র প্রতিবেশী কোনোও গৃহস্থালীর জিনিস চাইলে কখনও বলতে নেই, নাই।

সংসারের কাজ করলে পরিশ্রম করলে অসম্মান হয় এ যেন কখনও মনে না আসে। যারা অপদার্থ ও দুর্বল-হৃদয়, তারাই এই কথা মনে করে। যে মর্যাদায় দারিদ্র্য আনে, তা পরিত্যাজ্য।

জীবনে কখনও কোনো কাজে পরের উপর নির্ভর করে বসে থেকো না, তাতে লাভ হয় না। বন্ধুর পক্ষেও বন্ধুর গরজ বোঝা কঠিন।

সুযোগের আশায় ভবিষ্যৎতের পানে চেয়ে থাকতে নেই; সুযোগের আশায় বসে থাকলে হয়তো জীবনে আদৌ সুযোগ আসে না।

টাকা অপেক্ষা পয়সার উপর যার নজর বেশি, সে-ই জীবনে উন্নতি লাভ করে। বেশি লোভ করলে আদৌ কিছু হয় না।

ধীরে ধীরে কিন্তু অনবরত যে অগ্রসর হতে যায়, সে-ই অগ্রসর হতে পারে, অন্য লোকের পক্ষে আদৌ অগ্রসর হওয়া সম্ভব কিনা জানি নে।

ভালো আহারে টাকা অপব্যয় হয়, এ মনে করতে নেই।

দেশ-দশের কাজের জন্যই এ জীবন-সর্বদা এই কথা মনে করতে হবে। ভোগ বিলাসের জন্য কোনো কাজ নেই। জীবনকে একেবারে নীরস ও আনন্দহীন করা কিন্তু খারাপ।

প্রত্যেক মানুষের একটা মূল্য আছে–এ কথা সে বিশ্বাস করুক। এ বিশ্বাসের মধ্যে উন্নতি নিহিত। এই বিশ্বাস যে করে, সেই বাঁচে। স্বাতন্ত্র, বৈশিষ্ট্যতা, বিশিষ্টতা ও ব্যক্তিত্বের মধ্যে মানুষের জীবন।

আজ যা নতুন ও বর্তমান বলে মনে হচ্ছে, কাল তা প্রাচীন ও সুদূর অতীতের কথা বলে মনে হবে।

যাদের অবস্থা খারাপ, তাদের বাড়িতে আতিথ্য গ্রহণ করতে নেই।

ঘরগুলি যত বড় হয় ও জানালাযুক্ত হয় ততই ভালো। ছোট ঘরে বাস করবে মন ছোট হয়ে যায়। জীবনে অবসাদ আসে।

সালাম ও নজর স্বরূপ কারো কাছ থেকে টাকা নিতে নেই–এটা ছোট মনের কাজ।

প্রতিকার বা সংশোধনের ব্যবস্থা না করে শুধু অনবরত দুঃখ প্রকাশ করা অনেক মেয়ের স্বভাব। যেমন করে কর-পথে একটা কাটা রয়েছে, সেটাকে না সরিয়ে ফেলে অনবরত হাঁটার অসুবিধা প্রকাশ করা অন্যায়।

তোমার চেয়ে যারা অল্পবুদ্ধির লোক, তাদের সঙ্গে তা বলতে খুব হুঁশিয়ার হবে–তোমার রহস্য বা তোমার সরল কথায় অকারণে অনেক সময় তারা ভয়ানক রেগে যেতে পারে–বিনা কারণে শত্রু হতে পারে!

বাপ ও শ্বশুর ছাড়া কোনো পুরুষকে সম্মান জানাবার জন্যে নারীর আসন ছেড়ে উঠতে নেই। কোনো পুরুষকে সালাম করাও নারীর পক্ষে অবৈধ। নারী সর্বদাই পুরুষের সম্মানের পাত্র, বিশেষ কারণ না থাকলে কোনো পুরুষের সঙ্গে আগে কথা বলবার দরকার নেই।

পরমাত্মীয় ছাড়া কোনো পুরুষের সামনে হাসবে না।

অনেক মেয়ে মনে করেন–দুই একখানা উপন্যাস পড়তে পারলেই লেখাপড়া শেষ হলো এটা ভুল ধারণা। ইতিহাস, ভূগোল, অঙ্ক, বিজ্ঞান, সাহিত্য, ব্যাকরণ প্রভৃতি সকল বিষয়ে জ্ঞানলাভ না করতে পারলে, লেখাপড়া শেখার কোনো মূল্য নেই। ভূগোল ইতিহাসের জ্ঞান ছাড়া, লেখাপড়ায় কোনো লাভ হয় না। খবরের কাগজ মাসিক পত্রিকা, বইপুস্তক রীতিমতো ভাবে না পড়লে মেয়েরা জাতি ও সন্তান গঠন কার্যে কোনো কিছু করতে পারেন না। তাদের মনের উন্নতি হবে না। স্বামীর ভাব ও চিত্তকে বোঝা যাবে না, সংসার ও পরিবার শ্রীময় হয়ে উঠবে না। অশিক্ষিত স্ত্রীলোক যেমন নিজে ছোট; যারা তাদের স্পর্শে আসে তারাও হীন ও ছোট হয়ে যায়।

মানুষকে ভক্তির দ্বারা জয় করতে চেষ্টা না করে, আত্মমর্যাদাবোধ ও প্রীতির দ্বারা জয়। করাই ভদ্রতা ও মনুষ্যত্ব।

যা সত্য তাই করবার স্বাধীনতার জন্যে জগতে লড়াই বাঁধে, ভয়ে মিথ্যে মেনে নিলে মৃত্যু হয়।

বাঙালি পরিবারে অনেক বাড়িতে বৃষ্টি বাদলার দিনে উঠোনে বড় কাদা ও ময়লা জমে, এটা বড় দোষের।

নিজের শানশওকাত, গহনা ও কাপড় দেখাবার জন্যে কোনো ভদ্র মহিলাকে দাওয়াত করে বাড়িতে আনবে না।

দামি খাট পালঙ্ক কিনে, বিলাসিতার পরিচয় দিয়ে অনেক পরিবার ধ্বংস হয়ে যায়। এইসব জিনিসের দ্বারা পরিবারের সম্মান বাড়াতে চেষ্টা করা ভুল। অনুন্নত সমাজে অনেক সময় বাইরের সাজসজ্জা দরকার হয়ে পড়ে–এ কথা ঠিক, কিন্তু অবস্থা বুঝে না চললে জীবনে দুঃখ হয়। বাইরের শানশওকাতে মনে অহঙ্কার আসা পাপ।

মনের অসন্তোষ প্রকাশ করতে হলে খোলা শান্তভাবে গম্ভীর ভাষায় তা করবে, লাঠি নিয়ে উঠতে হবে না। ভয়ানক উগ্র হয়ে যাওয়া বা প্রথমেই কাউকে ভয়ঙ্কর গালি দিলে ফল হয় না। কোনো কাজে বা কথায় সহজে ক্রুদ্ধ হয়ে ওঠা ছেলেমি।

নিতান্ত গোবেচারী, অত্যন্ত বিনয়ী লোককে খুব শ্রদ্ধার চোখে না দেখা উচিত। যে মানুষ কিছু বিদ্রোহী, সমালোচক সকল কথাই মাথা নত করে মেনে নেয় না,–যে নিজের দাবির কথা জানায়–সেই উপযুক্ত লোক। যে মানুষ বেশি দ্ৰ, সে নিজেকে ছোট করে এবং যার প্রতি ভদ্রতা দেখায়, তাকেও ছোট করে। সন্তুষ্ট অবিদ্রোহী মানুষের শেষ-মৃত্যু ও অসম্মান। অপ্রয়োজনে দিগ্বিদিক জ্ঞানশূন্য হয়ে খামাখা কারো সঙ্গে ঝগড়া-বিবাদ করা, কারো প্রতি অসন্তোষ পোষণ করা বড় দোষের।

তর্ককালে কখনও রাগবে না, হাসবেও না। নিতান্ত খোলা কথা শুনেও শান্তভাবে উত্তর দেবে।

যতদিন বেঁচে থাকা যায় বই-পুস্তক পড়তে হবে, জগতের খবর রাখতে হবে, নইলে আত্মা অবনত হতে থাকে। মানুষের সঙ্গে সঙ্গে ব্যবহারের ও কাজে কামে চিন্তায় কোনোটি ঠিক কোনোটি অঠিক ভালো করে বোঝবার জন্য আমাদের বই পড়তে হবে। নিজেকে

পণ্ডিত ও সম্পূর্ণ মনে করে বই পড়া কোনো সময়ে ইস্তফা দিলে চলবে না।

চিন্তাশূন্য পাঠে লাভ হয় না। যে চিন্তা করে সেই বেশি পণ্ডিত।

কোনো কোনো লোক বলে থাকে–নারীর পড়াশুনার দরকার নেই, তারা সাধারণত অল্পশিক্ষিত লোক। কোনো কোনো অপদার্থ নরপিশাচ বলে থাকে–চাষারাই লেখাপড়া শিখে ভদ্র হতে চেষ্টা করে।

মানুষের সঙ্গে কথা ও ব্যবহারে সর্বদা স্বাভাবিক হবে, এটা বিশেষভাবে স্মরণ করে রাখতে হবে।

পরের অনুগ্রহ বেঁচে থাকার মতো কষ্টের কারণ আর নেই।

কোনো লোক উপহাস বা ঠাট্টা করে বললেও রাগবে না! উপহাসকেই উপহাসরূপে গ্রহণ না করে ধীরে ও শান্তভাবে উত্তর দেবে। মূর্খ বলে ঘৃণা করে থাকা সব সময় ঠিক নয়, পাপী-মূর্খকে সত্যপথে আনা উত্তম কাজ।

কোনো মানুষকে কোনো নতুন কথা বলা তার অজানা বিষয় বোঝাতে হলে কখনও উগ্র হয়ো না, বিশেষ ধৈর্য চাই–গাধা, মূর্খ এই সমস্ত কথা বললে, ফল খারাপ হয়। শিশু ও ছেলেপেলে সম্বন্ধেও এই কথা সত্য।

প্রত্যেক মানুষের একটা বিশেষত্ব ও স্বাতন্ত্র্য আছে। কখনও ইচ্ছা করো না–কোনো মানুষ তার সমস্ত বিশেষত্ব হারিয়ে তোমার মতো হতে পারে। কথায় কথায় ছোটর

সমালোচনা করলে অন্যায় কাজ করা হয়। কি ছোট কি বড় সকলেই বিবেক বুদ্ধির দোহাই। দিয়ে কথা বলে। ডেস্পট ও অটোক্রাটের কথা ও কাজ মূল্যহীন!

ভক্তির দ্বারা এ জগতে বেঁচে থাকা যায় না। স্বাধীনতা ও নিজের মূল্যই জীবন। আনাড়ী ও অপদার্থ লোককে কখনও বেশি সম্মান করবে না–তাদের ভালবাসলে, সম্মান করলে তাদের অধঃপতন হবে।

কর্তব্যের জন্যে প্রাণ অসীম যন্ত্রণা চেপে রাখতে হবে। অসীম ধৈর্য ছাড়া মানুষকে বড় করা যায় না।

মনে অনিচ্ছায় কোনো কাজ করতে নেই। অল্প অল্প করে করলেই কাজ হয়। যা তুমি ভালো করে জান, যা স্বাভাবিক বলবে ও করবে। এইরূপ করলে সিদ্ধি লাভ হয়, অন্যথা হয় না।

কারো পদচুম্বন করে বা দয়া ভিক্ষা করে জীবন বাঁচাতে চেষ্টা করো না, বস্তুত এইভাবে বাঁচতে পারা যায় না। মানুষকে বেশি ভক্তি জানান পাপ।

অনেক পুরুষ বিয়ের পর অন্ধের মতো হীনস্বভাব পত্নীর মতো হীন হয়ে যান, অনেক সৎস্বভাবা নারীও হীনপ্রবৃত্তির স্বামীর স্পর্শে এসে হীন হয়ে যায়। কুচরিত্র স্বামীর সঙ্গে বাইরে ঝগড়া না করে, তাকে মিষ্টি কথায় সংশোধন করতে চেষ্টা করবে।

যৌবনের ভালবাসায় স্বামীর নীচস্বভাব হয়ে যাওয়া ঠিক নয়। মানুষের এই ভাবের পতন যার পর নাই ঘৃণিত। যেকোনো কাজই হোক না, তা তোমার অনায়ত্ত নয়। সাহসের সঙ্গে একটু একটু করে আয়ত্ত করতে চেষ্টা কর। পাহাড় দেখে ভীত হয়ো না, একটু একটু করে আঘাত কর,-পাহাড় ধুলা হয়ে তোমার গায়ে পড়বে। পরের চোখে না দেখে নিজের চোখে দেখার মধ্যে সফলতা আছে।

অনুগ্রহ লাভের আশায় কারো কাছে প্রাণের গোপন দুঃখের কথা বলতে নেই।

দেশের লোক ছোট ও হীন হলেও তাকে ঘৃণা করো না। যতদিন না তারা বড় হচ্ছে। ততদিন আমরাও বড় হতে পারবো না। ভিতরের দৃষ্টি জ্ঞান ছাড়া কোনো ধর্মপুস্তক মানুষকে বা জাতিকে ধ্বংস হতে বাঁচিয়ে রাখতে পারে না।

অপ্রিয় সত্যের পরিবর্তে নির্দোষ মিথ্যা বলা উচিত। সত্যটি ঠিক অপ্রিয় কিনা, এ বিষয়ে বিবেচনা চাই। শিশু ও অবোধের কাছেও অনেক সময় নির্দোষ মিথ্যা বলা বিশেষ আপত্তিজনক নয়।

মানুষকে অনেক সময় নিজের গুণ বুঝতে দিতে হবে, নইলে তাদের কাছে তোমার সম্মান হবে না; তাই বলে আত্মপ্রকাশ সব সময় ভালো নয়। নিজের গুণ অন্যকে কাজের খাতিরে জানানো দরকার।

কোনো কোনো লোকের সামনে চুপ করে থাকা উচিত। মূর্খ ক্ষমতাশালী ব্যক্তির সামনে জ্ঞানের কথা বললে তারা রাগে।

মানুষকে বড় করতে হলে, অনেক সময় তাকে প্রশংসা করতে হয়।

জনমত, পুণ্যশক্তি বা আর্থিক প্রভা ব্যতীত জগতে টেকা যায় না। জনমত ও পুণ্যশক্তির মূল্যই বেশি। বাঁচবার জন্য অর্থ, না হয় জনমত সৃষ্টি করতে হবে।

অবাধ্য ও বেগানা লোককে আস্তে আস্তে তোমার শক্তি উপলব্ধি করিও। হঠাৎ তাকে বাধ্য করতে চাইলে সে বিদ্রোহী হবে। কারো সঙ্গে ‘তুই’ ‘তুই’ করে কথা না বলাই ভালো। মানুষ যতই ছোট ও হীন হোক না, কাউকে ছোটলোক বলে গাল দিও না। এরূপ করা পতিত জাতির অভ্যাস-অধঃপতিত মানুষের স্বভাব।

মানুষকে গালি দিয়ে বেদনা দিয়ে কখনও বড় করতে যেয়ো না। পরিশ্রম বৃথা হবে। অন্যায় কথা শুনে বা অন্যায় কাজ দেখে প্রয়োজনমতো মিষ্টি বিনয়-নম্র বা উগ্র ভাষায় প্রতিবাদ করা চাই। যে ভুল করে–তার এবং নিজের অর্থাৎ উভয়েরই মঙ্গল এতে নিহিত আছে। অন্যায়ের প্রতিবাদ না করা পাপ ও মূর্খতা।

দুর্বলচিত্ত ব্যক্তিরা এক পক্ষের কথা শুনেই প্রকাশ করে।

অতি আত্মীয়ও কোনো অভিযোগ করলে, ঠিক কি না, চিন্তা করে দেখে নিতে হবে।

কেউ কোনো অন্যায় করলে, তা সাধারণকে জানিয়ে দেওয়া উচিত। জনসাধারণের ঘৃণা ও সমালোচনা সহ্য করা কঠিন। অস্ত্র অপেক্ষা জনমতের শক্তি প্রবল।

সেধে দেওয়া দান গ্রহণ না করা দোষ।

অনুগ্রহ দৃষ্টি লাভ করবার আশায় জীবনে কখনও কারো সেবা করতে নেই। মনুষ্যত্বের খাতির ছাড়া অন্য কোনো লোভে মানুষের সেবা করা নিষেধ।

ধনী ব্যক্তিদের ব্যাধিশৰ্যাপার্শ্বে উপস্থিত হলে, লোকে সন্দেহ করে বলে থাকে এই ব্যক্তির সেবা ও সহানুভূতি তোষামোদ ছাড়া আর কিছু না।

যে সম্মান আদায় করে না, তাকে মানুষ সম্মান করে না। মানুষের স্বভাব প্রভুত্বপ্রিয়তা, সে যতই কেন সাম্যের কথা মুখে বলুক না। মানুষের এই কুস্বভাবকে জোর করে ভাঙ্গতে হবে।

মানুষের সঙ্গে শান্তভাবে বুঝিয়ে কথা বললে বেশি কাজ হয়। মূর্খ ও অপদার্থের কথায় উত্তর দেওয়া অনেক সময় অপমানজনক মূখের কটু কথা হাসির সঙ্গে গ্রহণ করাই ভালো।

বয়সে বুড়ো অপেক্ষা জ্ঞানের বুড়ো মানুষের মূল্য বেশি।

কুলসুম বলিলেন–প্রিয় হালিমা, অনেক কথা বলেছি। কথার কি অন্ত আছে? মানুষের ভিতরটা উন্নত হলে পরের কথার জন্য অপেক্ষা করতে হয় না। সে নিজেই নিজের পথ ঠিক করে নেয়। বাঁধাধরা নিয়ম নারীকে, এমনকি কোনো মানুষের সমাজকে বড় করে রাখতে পারে না। দৃষ্টিই মানবজীবনের প্রধান অবলম্বন।

কুলসুম হালিমার গলা ধরিয়া বলিলেন-প্রার্থনা করি, আল্লাহ, তোমাকে আদর্শ বধূ করেন।

হালিমা জিজ্ঞাসা করিলেন-বধূ জীবনের কথা শুনলাম। স্বামী ও শ্বশুর-শ্বাশুড়ীর কি কোনো কর্তব্য নেই?

কুলসুম : আছে–প্রত্যেকের আছে। তাঁদের মঙ্গলকামী বন্ধু যাঁরা, তাঁরাই তাদের কর্তব্য কথা শোনাবেন। হালিমা আঁখিজলে কহিলেন–ভাবি, আশীর্বাদ করুন বধূ জীবনের কর্তব্যগুলি যেন সর্বাংশে পালন করতে পারিনারী জীবনকে সার্থক করে তুলতে সমর্থ হই।

আগের পর্ব :
০১-০৫. বসন্তের নূতন বাতাসে
০৬-১০. আবদুল গণি শহরে
১১-১৫. স্বামীর বাড়িতে বিশেষ সতর্কতা
১৬-২০. স্ত্রীকে স্বামীর মত নিয়েই চলতে হবে

গল্পের বিষয়:
উপন্যাস
DMCA.com Protection Status
loading...

Share This Post

আরও গল্প

সর্বাধিক পঠিত