লেটার বক্স

লেটার বক্স

১. মানুষ মনে মনে কত কথাই বলে

মানুষ মনে মনে কত কথাই বলে। বলবেই। কখনো নিজেকে, কখনো অন্যকে। মানুষের সেই অনুচ্চারিত ভাষা কখনো কখনো ছায়া মূর্তি ত্যাগ করে জীবন্ত রূপ নেয়-কথায় বা চিঠিতে।

আশেপাশে হাতের কাছে যাদের পাওয়া যায়, শুধু তাদের সঙ্গেই আমরা কথা বলি। বলতে পারি। কিন্তু কজন মানুষকে হাতের কাছে পাওয়া যায়? নাকি সম্ভব? কত আত্মীয়-বন্ধু প্রিয়জনই তো দূরের বাসিন্দা। দূরের প্রবাসের এইসব মানুষদের সঙ্গেই তো বেশী কথা বলতে মন চায় কিন্তু তা কী সম্ভব?

এই দূরের মানুষদের সঙ্গে কথা বলার লোভেই আমরা চিঠি লিখি। হাজার হোক চিঠি তো শুধু অক্ষর দিয়ে গড়া দু চারটে বাক্যের সমাবেশ নয়। চিঠি হচ্ছে মানুষের মনের দর্পণ প্রাণের প্রতিবিম্ব।

রথের মেলায় কিছু মানুষ হারিয়ে যায়। সমবেদনশীল মানুষের সাহায্যে কিছু কিছু পথভ্রষ্ট মানুষ আবার আপন ঘরে ফিরে আসেন। কাউকে আবার থানা-পুলিসের শরণাপন্ন হতে হয়। তবুও কী সবাই ঘরে ফেরার সৌভাগ্য লাভ করে?

না। সম্ভব নয়। কেউ কেউ চিরদিনের জন্য, চিরকালের জন্য হারিয়ে যান। যাবেই।

মানুষের মত চিঠিপত্র ও যে পথভ্রষ্ট হয়, ঘরে ফেরার পথ খুঁজে পায় না এবং তাদের নিয়েও যে এত কাণ্ড হয়, তা কী আগে জানতাম? সেদিনের সে অঘটন না ঘটলে হয়তো কিছুই জানতে পারতাম না। অনেক দিন আগেকার কথা। আমি তখন পঁচিশ টাকা মাইনের রিপোর্টার। তবু সব রকম খবর সংগ্রহে আমার উৎসাহের সীমা নেই। রবীন্দ্রজয়ন্তী, মনুমেন্টের পাদদেশের বিশাল জনসমাবেশ থেকে লালবাজার-রাইটার্স বিল্ডিং সব-কিছু কভার করি। আরও কত কি।

সেদিন ছিল বিরোধী দলগুলির রাইটার্স অভিযান। তখন ষোল আনায় এক টাকা হতো বলেই বোধ হয় রাজনৈতিক দলের সংখ্যাও কম ছিল। এখন একশটি আণ্ডা-বাচ্চা নিয়ে এক টাকায় সংসার বলেই বোধ হয় সব রাজনৈতিক দলগুলিই অনেক ছানা প্রসব করেছে। তাইতো তখন তিন-চারটে বিরোধী দল-হুঁঙ্কার দিলে সাড়ে ছফুট লম্বা চীফ মিনিস্টারেরও হৃদকম্প হতো। তাছাড়া তখন গণতন্ত্র সমাজতন্ত্রের ফুলঝুরি এত ছড়িয়ে ছিটিয়ে পড়েনি বলেই বোধ হয় বিরোধী দলগুলির অভিযানকে রাজভবন অতিক্রম করে রাইটার্স বিল্ডিং এর অনেক কাছে আসতে দেওয়া হতো।

সেদিন এই রকমই এক সরকার-বিরোধী অভিযানকে পুলিস বাধা দিল ওল্ড কোর্ট হাউস স্ট্রিটের প্রায় উত্তর সীমান্তে মিশন রোর কাছাকাছি, লালদীঘির একটু দূরে। তখন ঐ ওল্ড কোর্ট হাউস স্ট্রীটই ছিল কলকাতার রাজনৈতিক কুরুক্ষেত্র। কখনও দুচারটে জ্বালাময়ী ভাষণ ও সরকারের দরবারে স্মারকলিপি পেশ করেই বিক্ষোভের পরিসমাপ্তি ঘটত। কখনও আবার শুরু হতো দক্ষদজ্ঞ।

চোখের নিমেষেই দপ করে জ্বলে উঠল আগুন। প্রথমে এলো পাথাড়ি কাঁদানে গ্যাস কয়েক মুহূর্ত পরেই গুলী। পর পর কয়েক রাউণ্ড। হাজার হাজার লোকের দৌড়াদৌড়ি হুড়োহুড়ির মাঝখানে আমিও চোখে একটু জল দেবার জন্য পাগলের মত এদিক ওদিক করছি। হঠাৎ খেয়াল হল ডি-এল-ও অফিসের সিঁড়ির একপাশে এক ফলওয়ালার পরিত্যক্ত জলের পাত্র পড়ে আছে। দৌড়ে গিয়ে দেখি, কে বা কারা সে জলের পাত্র আগেই নিঃশেষ করেছে। সমস্ত পৃথিবীটা অন্ধকার দেখছি। ঠিক সেই চরম মুহূর্তে হঠাৎ চিৎকার, এই খোকা, গুলী খেয়ে মরবে। শীগগির ভিতরে এসো। এর পরেই কে যেন আমাকে একটানে অফিস ঘরের ভিতরে টেনে নিয়েই বকুনি, পলিটিক্স করতে গিয়ে কী মরবে?

আমি পলিটিক্স করি না। আমি রিপোর্টার।

রিপোর্টার?

হ্যাঁ।

ব্যস! সেই সেদিন থেকে উনি আমার শৈলেনদা। আমার তখন কতই বা বয়স! বড় জোর উনিশ-কুড়ি। আর শৈলেনদা তখন পঞ্চাশের ঘরে তবু কেমন একটা প্রীতির বন্ধন গড়ে উঠল। রাইটার্স লালবাজারে বেশী কাজ না থাকলে মাঝেমাঝেই চলে যাই ঐ ডি-এল-ও অফিসে শৈলেনদার কাছে চা টোস্ট খাই গল্প করি। আস্তে আস্তে ওর গোয়বাগানের বাড়িতেও যাতায়াত শুরু হল।

বুঝলে বাচ্চু, মানুষ ভাবে এক, হয় আর এক। কী ভেবেছিলাম আর কী হল!

ছাদে বসে চা-মুড়ি খেতে খেতে শৈলেনদা একবার বহু দূরের আকাশের কোলে দৃষ্টি ঘুরিয়ে এনে বললেন, খুব ইচ্ছে ছিল অধ্যাপক হব কিন্তু সারাটা জীবনই এই ডি-এল-৪ অফিসে কাটিয়ে দিলাম।

রথের মেলায় হারিয়ে যাওয়া মানুষের মত পথভ্রষ্ট দিশাহারা চিঠি পত্রকে তার গন্তব্য স্থানে পৌঁছে দেবার জন্য সিপাহী বিদ্রোহের ও কুড়ি বছর আগে জন্ম নেয় ডি-এল-ও ডেড লেটার অফিস। যুদ্ধের বাজারের কণ্টক্টর অ্যালবার্ট ঘোষ যেমন আবার অঘোরনাথ ঘোষ হয়েছেন, ডি-এল-ও অফিসেরও নতুন নামকরণ হয়েছে। এখন এর সরকারী নাম অর-এল-ও। বিটান লেটার অফিস! তবে শৈলেন দাদাদের মত পুরানো আমলের সবাই বলেন ডি-এল-ও।

শৈলেনদা চায়ের কাপে এক চুমুক দিয়ে একটু ম্লান হেসে বললেন, ন্যাট্রিক পরীক্ষা দিয়ে রচি বেড়াতে গিয়েই সব গড়বড় হয়ে গেল।

কেন?

আমার মেজ জ্যেঠু রাঁচী হেড পোস্ট অফিসের পোস্টমাস্টার ছিলেন। বিরাট কোয়াটার্স। চারদিকে কত খোলামেলা জায়গা। কলকাতায় তো বিশেষ খেলাধুলা করতে পারতাম না, রাচী আমার খুব ভাল লাগত।

শৈলেনদা একটু থেমে এক গাল মুড়ি আর এক চুমুক চা খেয়ে আবার বলেন, জেঠুর দু ছেলেই তখন কলেজে পড়ে। ওরা কলেজে গেলে আমি রোজ পোস্ট অফিসেই বেশ কিছু সময় কাটাতাম।

সেদিনও শৈলেনদা পোস্ট অফিসের এদিক-ওদিক ঘোরাঘুরি করতে করতে হঠাৎ সটিং-এর ওখানে যেতেই একজন সটার ওর হাতে একটা খাম দিয়ে বললেন, দেখতে খোকাবাবু এই ঠিকানাটা পড়তে পারে। কিনা।

চিঠিটার উপর দিয়ে বেশ কয়েকবার চোখ বুলিয়ে নিয়ে উনি আস্তে আস্তে বললেন, মো-বাবা-দু…

ওর মুখের কথা শেষ হবার আগেই দুজন সটার প্রায় একসঙ্গে বলে উঠল, হা, হা, মোরাবাদীই হোগা।

বাস! এই অপাঠ্য ঠিকানা উদ্ধারের খ্যাতির কৃপায় শৈলেনদাকে বেজেই দু পাঁচটে ঠিকানা পড়ে দিতে হয়। সপ্তাহ খানেকের মধ্যেই শৈলেনদা সটিং সেক্সনের সবার বিশেষ প্রিয়পাত্র হয়ে উঠলেন। ওঁর দু-এক ঘণ্টা সময় এখানে বেশ কেটে যায়।

দু ইজ দিস বয়?

বিনা মেঘে বজ্রঘাতও এর চাইতে ভাল। স্বয়ং পারিটেনডেন্ট বঅ পোস্ট অফিস লিভিংস্টোন সাহেবের কথা শুনেই সটিং সেক্সনের সবার মুখ শুকিয়ে গেল।

পোস্টমাস্টার কৃপাসিন্ধু চৌধুরী খুব ভালভাবেই জানতেন, পোস্ট অফিসের মধ্যে এবং বিশেষ করে সটিং সেক্সনে ভ্রাতুস্পুত্রের আগমন ঠিক হয়নি। তবু তিনি সাহস সঞ্চয় করে বললেন, স্যার, ও আমার ভাইপো। এ কদিনের মধ্যেই অপাঠ্য ঠিকানা উদ্ধারের একজন এক্সপার্ট হয়ে গেছে।

ইজ ইট! মিঃ লিভিংস্টন হাসতে হাসতে সর্টারদের দিকে তাকিয়ে জিজ্ঞেস কবলেন, টুমাদের মত করে?

সব সর্টাররা এক সঙ্গে ঘাড় কাত করে বলল, জী হুজুর!

ব্যাস! আর এক-মুহূর্ত দেরি না। মিঃ লিভিংস্টোন সঙ্গে সঙ্গে পোষ্টমাষ্টার সাহেবকে বললেন, ভাইপোকে নিয়ে তুমি কলকাতায় মিঃ মুর-এর সঙ্গে দেখা করবে। আমি ওকে আগে থেকে বলে রাখব। হি মাস্ট জয়েন ডি-এল-ও।

সেদিন কৃপাসিন্ধু চৌধুরীর সেকি আনন্দ! উল্লাস! ভ্রাতুষ্পুত্রকে নিয়ে কোয়ার্টার্সে ফিরেই চিৎকার করে গিন্নীকে বললেন, শুনছ! স্বয়ং লিভিংস্টোন সাহেব বাদলের চাকরির ব্যবস্থা করে দিলেন। এই সব সাহেবদের অধীনে চাকরি করেও আনন্দ।

চৌধুরী গিন্নী পান-দোক্তা লাঞ্ছিত দন্ত বিকশিত করে বললেন, বল কি গো!

ওরে বাপু হ্যাঁ! এ হচ্ছে ইংরেজের বাচ্চা! পাকা জহুরী। এরা এক মিনিটে ধরতে পারে কাকে দিয়ে কি হবে। কৃপাসিন্ধুবাবু একটু চাপা হাসি হেসে বললেন, এই ক্ষমতা না থাকলে ওরা পৃথিবী ব্যাপী সাম্রাজ্য চালাচ্ছে কী করে?

চৌধুরী গিন্নী শৈলেনদার মাথায়-মুখে হাত দিয়ে বললেন, সুখে থাক বাবা! বাবা-মাকে সুখী কর।

এবার কৃপাসিন্ধুবাবু শৈলেনদার দিকে তাকিয়ে বললেন, তোর মত ভাগ্যবান লাখে একজন হয় না। সাহেবের মান রাখিস বাবা! তা না হলে আমি মুখ দেখাতে পারব না।

২. অতীতের ডি-এল-ও আজকের আর-এল-ও

অতীতের ডি-এল-ও আজকের আর-এল-ও সত্যি এক বিচিত্র অফিস। হাজার-হাজার লাখ-লাখ চিঠিপত্র-পার্শেল-প্যাকেটের ঠিকানা উদ্ধার করতে না পারায় পোস্ট অফিস থেকে পাঠিয়ে দেওয়া হয় এই দপ্তরে।…রাম লখন সিং, ৫২ লরী, ক্লীব ইসষ্ট্রিট, কলকাতা। হিন্দীতে লেখা এই ঠিকানা দেখে পোস্ট অফিসের সর্টাররা কোন কিছু বুঝতে না পারলেও আর-এল-ও অফিসে নতুন করে ঠিকানা লিখে দেওয়া হয়-রাম লখন সিং, বামার লরী, ক্লাইভ স্ট্রিট ( নেতাজী সুভাষ রোড ), কলকাতা।

ক্রশ স্ট্রীটের ঠিকানার বহু চিঠিতেই লেখা থাকে -X স্ট্রীট। অথবা অনেক ছেলেছোকরার দল বন্ধুবান্ধবকে শুধু নম্বর দিয়ে ঠিকানা লিখে পাঠায়–

নাম-4, 1, 21, 4/20, 15, 16, 14, 15
গ্রাম–2, 1, 18, 11, 21, 1, 1, 15, 10, 15,
পোঃ- 19, 1, 21, 18, 4।
উড়িষ্যা।

আর-এল-ও অফিস চোখের নিমেষে ঠিকানাটি করে লিখে দেয়–

DAUD TONPO
Vill–BARKULA GOJO
P.O.–SARDA
Dist-SUNDARGARH ( ORISSA)

কোন কোন চিঠিতে আবার লেখা থাকে -চাকাই ব্রিস্ট। আর এল-ও লিখে দেয় –চক্র বেড়িয়া… গ্রামগঞ্জ থেকে একটু ইংরেজী জানা অনেকেই লেখে ছাম মার্কেট স্ট্রীট। আসলে ওটা শ্যামবাজার স্ট্রীট।

নানা রকমে গাইড আর কর্মীদের তীব্র সাধারণ জ্ঞানের দ্বারাই অধিকাংশ পথভ্রষ্ট চিঠিপত্তব সঠিক জায়গায় পৌঁছে যায়। তবে সব সময় কখনই নয়।

এই আর-এল-ও অফিস নিয়ে শৈলেনদার সঙ্গে গল্প করতে আমার খুব ভাল লাগে। লাগবে না কেন? আমরা জানি, পোষ্ট কার্ড–ইনল্যাণ্ড খামে চিঠি লিখে আমরা ডাকবাক্সে ফেলি। তারপর? দুদিন আগে বা পরে সে চিঠি পৌঁছে যায় সঠিক ঠিকানায়। প্রয়োজনে উত্তর এসে যায় যথা সময়ে। কার কোন চিঠি হারিয়ে গেল তা নিয়ে আমাদের মাথাব্যথা কী?

আমাদের মাথাব্যথা না থাকলেও আর-এল-ও অফিসের মানুষদের মাথাব্যথা আছে বৈকি। তা না হলে শক্তি চৌধুরী কী মার অপারেশনের আগে পৌঁছতে পারতেন? যদি ঠিকানা উদ্ধার করতে না পারেন, তাহলে আপনারা কী করেন? আমি শৈলেনদাকে প্রশ্ন করি।

প্রয়োজনে আমরা চিঠি খুলি পড়ি। যদি ঐ চিঠি পড়ে ঠিকানা উদ্ধার করা সম্ভব হয়, তাহলে তো ভালই কিন্তু যদি তা না হয়, তাহলে যিনি চিঠি লিখেছেন, তাকেই ফেরৎ পাঠিয়ে দিই।

যদি তার ঠিকানা থাকে, তবেই তো?

সে তো একশবার।

তার মানে অনেক মানুষের অনেক চিঠিও আপনানের পড়তে হয়?

তা হয় বৈকি!

কথাটা বলেই শৈলেনদা একটু আনমনা হয়ে গেলেন। দূরের আকাশের কত অসংখ্য ছোট-বড় খ্যাত-অখ্যাত তারকা দেখে একটা চাপা দীর্ঘশ্বাস ফেলে বললেন, যারা আমাকে চেনে না, জানে না, জীবনে কোনদিন দেখেনি ও দেখবে না, তাদের কতজনেরই কত কি জানলাম!

…স্নেহের খোকা, আমি জানি এই চিঠি পেয়ে তুই অবাক হয়ে যাবি। কোনদিন কাউকে চিঠিপত্র লিখি না, দরকারও হয় না। যার বাপের বাড়ি, শ্বশুর বাড়ি পাশাপাশি গ্রামে, যার ভাইবোনের। পর্যন্ত আশেপাশের গ্রামেই থাকে, সে কাকে চিঠি লিখবে? এর আগে কবে কাকে চিঠি লিখেছি, তা মনেও পড়েনা। তবু তোকে চিঠিলিখছি। লিখতে বাধ্য হচ্ছি। না লিখে উপায় নেই। বেশ কিছুদিন ধরেই ভাবছি তোকে চিঠি লিখব কিন্তু নানা কারণে তা সম্ভব হয়নি। সারা দিনরাত্তির সংসারের হাজার কাজ নিয়ে এত ব্যস্ত থাকি যে সত্যি সময় পাই না! তাছাড়া তোর অফিসের নাম-ধাম-ঠিকানা কিছুই জানা ছিল না। সবাইকে বলতেও পারি না। শেষ পর্যন্ত অনেক কষ্ট করে তোর অফিসের নাম জেনে এই চিঠি লিখছি। আশা করি দুএকদিন দেরী হলেও এ চিঠি তোর হাতে পৌঁছবে।

আজ তিন বছর তুই দেশ ছাড়া। এর মধ্যে একদিনের জন্যও দেশে আসিসনি। কোনদিন আসবি কিনা তাও জানি না। মাঝে মাঝে মনে হয়, তুই জীবনে এদিকে না এলেই ভাল হয় কিন্তু তোকে আর দেখতে পাব না ভাবলেও আমার মাথা ঘুরে যায়, চোখে জল আসে। তোকে একবার দেখার জন্য মন বড়ই আকুলি-বিকুলি করে কিন্তু তা কী করে সম্ভব? কে আমাকে নিয়ে যাবে? বা যেতে দেবে? আমি যে দাসী, কপর্দক শূন্য। সর্বোপরি আমি যে বাল্যবিধবা। এ সংসারে যার স্বামী-পুত্র নেই, অর্থ নেই, যাকে শ্বশুর-ভাসুরের দাসীবৃত্তি করে এক টুকরো কাপড় আর দুমুঠো অন্নের সংস্থান করতে হয় তার আবার ব্যক্তিগত ইচ্ছা।

এইত কদিন আগেকার কথা। হঠাৎ শ্বশুরমশাই আমাকে বললেন, হ্যাঁগো ছোট বৌমা, তোমার একটা গরদের কাপড় আছে না?

হ্যাঁ, খোকা মাস্টারী করে আমাকে যে গরদের কাপড়টা দিয়েছিল…

আছে কিনা তাই বল। খোকা-খুকীর কথা তো আমি জানতে চাইনি।

বারান্দায় বসে পান-দোক্তা চিবুতে চিবুতে শাশুড়ী-ঠাকরুণ বাঁকা চোখে একবার ছোট বৌকে দেখে নিয়ে স্বামীকে বললেন, আঃ! তুমি চটছ কেন? খোকা ছাড়া ছোট বউয়ের আপনজন কে আছে?

এবার উনি একটা চাপা দীর্ঘশ্বাস ফেলে বললেন, যার জন্য আমরা গ্রামে মুখ দেখাতে পারি না, সেই খোকার কথা আমাদের শুনতেই হবে।

শ্বশুরমশাই গিন্নীর কথার কোন জবাব না দিয়ে শুধু বললেন, তুমি তো ঐ কাপড়টা ব্যবহার কর না। তাই বলছিলাম, এবার থেকে ঐ কাপড়টা পরে আমি নারায়ণ পূজা করবো।

যক্ষের ধনের মত আমি ঐ কাপড়টা রোজ রাত্তিরে একবার বুকের মধ্যে জড়িয়ে ধরে মনে করতাম, তোকেই যেন জড়িয়ে ধরেছি। যাই হোক কাপড়টা দেবার পর আমি আর কিছুতেই চোখের জল আট কাতে পারলাম না। ব্যস! ঐ চোখের জল দেখেই শাশুড়ী দপ করে জ্বলে উঠলেন, ওরে বাপু গ্রামের লোক এমনি এমনি বদনাম দেয় না। নিজের পেটের ছেলে না হলে এত দরদ আসে কোথা থেকে।

খোকা, সত্যি বলছি ঐ কয়েক ফেঁটা চোখের জল ফেলার জন্য আমাকে যে কি অপমান সহ্য করতে হয়েছিল, তা শুধু ভগবানই জানেন। মনের দুঃখে আমি পুরো দুটো দিন মুখে একটা দানা পর্যন্ত দিইনি, দিতে প্রবৃত্তি হয়নি। পরে মেজ পিসী আমাকে টেনে নিয়ে জোর করে খাইয়ে দিয়ে বলল, ওরে হতভাগী, না খেয়ে থাকবি কোন্ দুঃখে রে? এ বাড়ির জমিজমায় কী তোর স্বামীর ভাগ ছিল না? দশটা না, পাঁচটা না, তোর একটা পেটের খাবারও কী সে ভাগ থেকে হয় না?

ঐ মেজ পিসীর জন্য আমি এখনও বেঁচে আছি কিন্তু আজ তোকে আমি জানতে বাধ্য হচ্ছি, মেজ ভাসুরের যা মতিগতি তাতে আমি কতদিন বেঁচে থাকতে পারব, তা ঠিক বলতে পারি না। তোকে আমি পেটে ধরিনি ঠিকই কিন্তু তোর মা তোর জন্মের পর পরই ধনুষ্টঙ্কারে মারা যাবার পর তাকে কোলে তুলে নিয়েই আমি সদ্য বৈধব্যের যন্ত্রণ। ভুলেছিলাম। এ বিশ্ব-সংসারে তুই-ই আমার একমাত্র আপনজন। শুধু তোর কাছেই আমার সব দুঃখের কথা বলতে পারি বলেই জানাচ্ছি, মেজ ভাসুর বিপত্নীক হবার পর থেকেই আমার সম্পর্কে বড় বেশি আগ্রহী হয়ে উঠেছেন কিন্তু ওর ঐ অহেতুক আগ্রহ দেখে আমার ভীষণ ভয় হয়। হাজার হোক তুই আমার প্রাণপ্রিয় সন্তান। তাছাড়া তুই বড় হয়েছিস। তোকে বেশি কি আর লিখব। শুধু জেনে রাখ, আমি জীবনে কোন অন্যায় করিনি এবং করব না। আমার পরম শ্রদ্ধেয় মেজ ভাসুর মশাই যদি সম্মান ও সৌজন্যের সীমা লঙ্ঘন করেন, তাহলে আমি তা নীরবে মেনে নিতে পারব না। শুধু এইটুকু জেনে রাখ, তোর মা কোন কলঙ্ক নিয়ে এ পৃথিবীতে একদিনের জন্য ও বাঁচবে না।…

শৈলেনদা অনেকক্ষণ চুপ করে থাকার পর বললেন, চিঠিটা পড়ে মাথা ঘুরে গেল কিন্তু কিভাবে ঐ ভদ্রমহিলার খোকার কাছে চিঠিটা পৌঁছে দেবার ব্যবস্থা করব, তা ভেবে পেলাম না।

কেন? ঠিকানা ছিল না?

ঠিকানা ঠিক থাকলে কী চিঠি আমাদের কাছে আসে? মনে মনে বলি, তাইত।

উনি একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলে বললেন, তবুও আমরা অনেকে মিলে অনেক চেষ্টা করেও ওকে চিঠিটা পোঁছে দিতে পারলাম না।

চিঠিটা কী ফেরত পাঠালেন?

না, সে ঠিকানাও চিঠিতে ছিল না। চিঠিটা জিয়াগঞ্জে পোস্ট করা হয়েছিল কিন্তু আর কিছু জানা গেল না।

আমি চুপ করে থাকি কিন্তু চোখের সামনে এক অসহায় বিধবার বেদনার্ত মুখের ছবি ফুটে ওঠে।

অনেকক্ষণ চুপ করে থাকার পর শৈলেনদা বললেন, দশ-পনর দিন পর হঠাৎ খবরের কাগজে দেখি, জিয়াগঞ্জের কাছেই গঙ্গার জলে এক মধ্যবয়সী বিধবার মৃতদেহ পাওয়া গেছে।

যা আশঙ্কা ছিল, তাই সত্যে পরিণত হল। হিংস্র দানবের লালসার শিকার হল আরও একটি বিধবা কিন্তু তাতে সমাজ-সংসারের কি আসে-যায়?

জানো বাচ্চু, ঐ ভদ্রমহিলার সঙ্গে আমাদের কোন সম্পর্ক না থাকলেও খবরের কাগজে ঐ রিপোর্ট পড়ার পর আমরা যেন পরমাত্মীয় বিয়োগের ব্যথা অনুভব করেছিলাম।

৩. ঠিকানা ঠিকই ছিল
ঠিকানা ঠিকই ছিল। বাড়ির নম্বর, রাস্তার নাম, পোস্ট অফিস, জেলা–সব ঠিক ছিল। পিয়ন যথা নিয়মে চিঠি পৌঁছে দেয় নির্দিষ্ট ঠিকানায়। অন্তত আশা করা যায়। কখনো যে ভুল হয় না, তা নয়। ভুল হয় বৈকি। তাই বোধহয় হয়েছিল। তা না হলে আবার ডাক বাক্সে দেবে কেন? এবার পিয়ন একটু সতর্ক হয়েই চিঠি পৌঁছে দিল চিঠিতে লেখা ঠিকানায়। সে চিঠি পরের দিনই আবার ডাক বাক্সে ফিরে এল।

এবার পিয়ন চিঠি বিলি করতে গেলেই গৃহস্বামী বললেন, আরে মশাই, এ বাড়িতে বিকাশ চৌধুরী বলে কেউ থাকে না। এ চিঠি ফেরত নিয়ে যান।

খামের চিঠি। হাতে লেখা ঠিকানা। খামের কোথাও পত্রদাতার নাম-ঠিকানা লেখা নেই। সাধারণতঃ থাকে না। ব্যবসা-বাণিজ্য প্রতিষ্ঠানের চিঠি হলে খামের এক জায়গায় লেখা থাকত If undelivered, please return to…

শেষ পর্যন্ত সে চিঠি এসে হাজির আর-এল-ওতে। শৈলেনদার হাতে এমনি আরও একটা খামের চিঠি এল। চিঠি দুটো হাতে নিয়ে শৈলেনদার একটু খটকা লাগল। দুটি খামের ঠিকানাই কী একই মানুষের লেখা?

না, না, তা কি করে সম্ভব? একটা চিঠি পোস্ট হয়েছে শ্রীরামপুরে অন্যটি গোবরডাঙা। শ্রীরামপুরের চিঠিটা ফেরত এসেছে বেহালা থেকে, অন্যটি উত্তরপাড়া থেকে এই ধরনের চিঠিপত্রকে পত্ৰলেখককেই ফেরত পাঠাতে হয়। অথবা দেবার চেষ্টা করা হয়। অনেক সময় খামের বাইরে প্রেরকের নাম-ঠিকানা না থাকলেও চিঠির মধ্যে নাম ঠিকানা পাওয়া যায় এবং সে জন্যই শৈলেনদা চিঠি দুটো খুললেন।

এ্যা!

না, না, এ দুটি চিঠি কখনই দুজনের লেখা নয়–একই মানুষের লেখা। নিশ্চয়ই! একশবার! হাজার-হাজার লক্ষ-লক্ষ মানুষের হাতের লেখা দেখতে দেখতে এমনই অভ্যস্ত হয়ে গেছেন যে ভুল হতে পারে না। কিন্তু… তবু শৈলেনদার খটকা লাগে। একই মানুষের লেখা। একই দিনে পোস্ট করা কিন্তু কোথায় শ্রীরামপুর আর কোথায় গোবরডাঙা। নাকি ইনি শ্রীরামপুরে বাস করেন ও গোবরডাঙায় চাকরি-বাকরি ব্যবসা-বাণিজ্য করেন? অথবা গোবরডাঙা থেকে শ্রীরামপুরে যাতায়াত করেন?

আপন মনেই মাথা নাড়েন শৈলেনদা। ঠিক বিশ্বাসযোগ্য মনে হয় না।

পরের চিঠি পড়তে কিছু কিছু মানুষের আগ্রহ-উৎসাহের সীমা নেই। মেয়েদের হস্টেলের বিগত যৌবনা প্রৌঢ়া সুপারিনটেনডেন্ট ছাত্রীদের চিঠি পড়ার সময় নিজের অতীত জীবন বেমালুম ভুলে যান। সদ্য বিবাহিত-বিবাহিতদের চিঠিপত্র পড়তেও বহুজনের আগ্রহ দেখা যায় কিন্তু আর-এল-ও রিটার্ন লেটার অফিসের কর্মীদের মধ্যে এই ধরনের উৎসাহ বা আগ্রহ নেই। হওয়া সম্ভব নয় পেটের দায়ে, চাকরির খাতিরে বাধ্য হয়ে যাদের নিত্য অন্যের চিঠি পড়তে হয়, তাদের কী এ বিষয়ে উৎসাহ থাকতে পারে?

তাইতো শৈলেনদা চিঠি দুটো টেবিলের উপর রেখে সুকুমারদার ঘরে চা খেতে গেলেন। ফিরে এসেও সিগারেট ধরিয়ে বেশ কিছুক্ষণ কাটাবার পর প্রায় অনিচ্ছার সঙ্গেই একটা চিঠি পড়তে শুরু করেন।

দুচার লাইন পড়ার পরই শৈলেনদা সিগারেট ফেলে দিয়ে হঠাৎ খুব মনোযোগ দিয়ে চিঠিটা পড়লেন। বার বার বেশ কয়েকবার। যতবার পড়েন ততবারই সন্দেহ আরও বাড়ে। মনে হল কি যেন অঘটন ঘটতে যাচ্ছে। তাইতো চিঠিটা আবার আস্তে আস্তে পড়তে শুরু করেন।…

প্রিয় সন্তু, আগামী মাসের তিন তারিখ থেকে আমাদের পাড়ার জগদীশ সরকারের মেয়ে শিউলি আর তার বর ধ্রুব জলদাপাড়া ফরেস্ট বাংলোয় দশ দিন থাকবে। আমি এই মাসে ২৮ তারিখ থেকে মিঃ ও মিসেস বিমল ব্যানার্জী নামে ঐ ফরেস্ট বাংলোয় একটা ঘর এক সপ্তাহের জন্য রিজার্ভ করেছি।

তুই ছোট বৌদিকে নিয়ে ২৭ তারিখে দার্জিলিং মেলে রওনা হবি এবং ২৮-এ অবশ্যই ওখানে পোঁছবি। ৪ তারিখে বিকেলে তোর বাংলো ছাড়বি ও সবাই জানবে তোরা রাত্রের ট্রেনে কলকাতা রওনা হবি। তুই কাছাকাছি কোথাও গা ঢাকা দিয়ে কাটাবার পর রাতে একটা থেকে দেড়টার মধ্যে কাজ শেষ করবি। ঠিক সময় হাতের কাছেই জীপ থাকবে। তারপর আমার দায়িত্ব।

২৫ তারিখে দুপুরে ১২টা ১০ মিনিটে খদ্দরের পায়জামা-পাঞ্জাবি জওহর কোর্ট পরা একটা ছেলে হাওড়া স্টেশনের কফি কর্নারে ঢুকবে। ও যে টেবিলে বসবে তোর লোকও যেন সেই টেবিলে বসে ও ওঠার সময় ব্রীফকেস বদলাবদলি হবে। ঐ ব্রীফকেসে সম্প্রতি গঙ্গায় ধরা খুব ভাল ইলিশমাছ ছাড়াও রেলের টিকিট, ফরেস্ট বাংলো রিজার্ভেশানের কাগজ ও দশ দিস্তা নতুন কাগজ থাকবে।

চিঠি এখানেই শেষ। চিঠির নিচে কোন নাম নেই। শুধু লেখা আছে–ইতি তোর প্রিয় বন্ধু!

শৈলেনদা আর এক মুহূর্ত সময় নষ্ট না করে অন্য চিঠিটা পড়েন…

বিকাশ, গত সপ্তাহে গঙ্গায় যে ইলিশ ধরা পড়েছে, সেটা আর দশ দিস্তা নতুন কাগজ একটা ব্রীফকেসে ভরবে। তারপর ঐ ব্রীফকেস নিয়ে ২৪ তারিখ বিকেল ৩টা ১৫ মিনিটের সময় ইডেনগার্ডেনের ক্লাব হাউসের গেটে আসবে। ওখানে ধুতি-শার্ট পরা এক ভদ্রলোক ইসারা করলে তার পিছন পিছনে যাবে ও সুবিধা মত জায়গায় ব্রীফকেসটি ওকে দিয়ে দেবে।

এ চিঠি এখানেই শেষ কিন্তু এর নিচে নাম আছে–ইতি নন্দ।

দুটি চিঠির কোনটিতেই পত্ৰপ্রেরকের ঠিকানা ছিল না এবং থাকলেও এ চিঠি আর-এল-ও অফিস থেকে পত্রপ্রেরকের কাছে পাঠানো হতো না।

শৈলেনদা আপনমনে কথা বলতে বলতে একটু থামতেই আমি জিজ্ঞেস করি, চিঠি দুটো আপনাদের অফিসে এল কেন?

উনি একটু হেসে বললেন, আসলে সন্তুর নামের নিচে বিকাশের ঠিকানা লেখা ছিল।

আবার বিকাশের নামের নিচে বুঝি সন্তুর ঠিকানা লিখেছিল।

হ্যাঁ।

যাই হোক, তারপর কী হল?

চিঠি দুটো সঙ্গে সঙ্গে আমরা লালবাজারের গোয়েন্দা বিভাগে পাঠিয়ে দিলাম।

শৈলেনদা এবার একটা সিগারেট ধরিয়ে দুএকটা টান দেবার পর বললেন, আর দুটো দিন দেরি হলেই সর্বনাশ হয়ে যেত।

আসল ব্যাপারটা কী ছিল?

কী আর ব্যাপার? গুণ্ডা-বদমাইসা যা করে আর কি! নাম ঠিকানা ঠিক থাকলে ঐ ধ্রুব বেচারী প্রাণ হারাত আর শিউলিকে নিয়ে নন্দ ব্যাঙ্গালোর চলে যেত।

তাই নাকি?

তবে কী?

ধ্রুব কী অপরাধ করেছিল যে…

আমার কথার মাঝখানেই উনি বলেন, নন্দ বিখ্যাত গুণ্ডা ও বদমাইস ছিল। ও নেপাল থেকে আফিঙ স্মাগলিং করে এনে বিদেশে পাচার করত। এই কাজের জন্য ও একদল মেয়েকে রেখেছিল। শৈলেনদা একটু হেসে বললেন নন্দ এই মেয়েগুলোর সঙ্গে স্ফুর্তিও করত।

কিন্তু ধ্রুব?

বলছি, বলছি।

আমি আর প্রশ্ন করি না! শৈলেনদা আবার বলে যান, আমি চুপ করে শুনি।

নন্দর এইসব কাজ-কারবারের জন্য পাড়ার লোকজন অত্যন্ত বিরক্ত বোধ করলেও প্রকাশ্যে ওর বিরুদ্ধে কিছু বলতে সাহস করতেন না কিন্তু শেষ পর্যন্ত আর সহ্য না করতে পেরে বেচুবাবু একদিন নিজে গিয়ে পুলিশকে খবর দিয়ে তুলকালাম কাণ্ড করে দিলেন।

তিন বছর প্রেসিডেন্সী জেলে কাটিয়ে আসার কিছুদিন পরই নন্দ হঠাৎ একদিন শিউলিকে দেখেই পাগল হয়ে উঠল। ব্যস! পরদিন ও বেচুবাবুকে গিয়ে বলল আপনার শিউলির সঙ্গে আমার বিয়ে দিন।

ঐ লম্বা চওড়া বেচুবাবু সঙ্গে সঙ্গে ওর গালে ঠাস করে একটা চড় মেরে বললেন, জবাব পেয়েছ?

নন্দ মাথা ঘুরে পড়ে যেতে যেতে নিজেকে কোন মতে সামলে নিয়ে শুধু বলল, সুদে-আসলে এর জবাব দেব।

তোমার মত পুচকে গুণ্ডাকে বেচু সরকার ভয় করে না।

সত্যি বেচু সরকার ওকে ভয় করতেন না। শিউলির বিয়ের দিন নন্দ দুজন সাগরেদকে সঙ্গে নিয়ে হামলা করতে এসে এমন শিক্ষা পেয়েছিল যে তা সে জীবনে ভুলতে পারবে না।

শৈলেনদা এক নিঃশ্বাসে সব বলে যান।

আমি জানতে চাই, নন্দ কি বেচুবাবুর মেয়ে-জামাইকে খুন করার প্লান করেছিল?

মেয়েকে না, শুধু জামাইকে খতম করার প্ল্যান করেছিল। জামাইকে শেষ করে মেয়েকে নিয়ে উধাও হবার মতলব ছিল।

পুলিস ধরে ফেলেছিল নিশ্চয়ই?

ধরেছিল মানে? রাবণের গুষ্টিকে ধরেছিল। তারপর তো কেঁচো খুঁড়তে সাপ বেরুল।

তার মানে?

দেখা গেল, নন্দ সন্তুকে দিয়ে আগে আরও দুটো মার্ডার করিয়েছে। তাছাড়া কলকাতা পোর্টে আসার সময় কিছু বিদেশী জাহাজ ডায়মণ্ডহারবারের ওদিকে গঙ্গার জলে বাক্স ভর্তি রিভলবার ফেলে দেয় ও বিকাশ সেসব নিয়ে ব্যবসা করে।

আমি একটু হেসে বললাম, ঐ রিভলবারকেই বুঝি চিঠিতে গঙ্গার ইলিশ বলেছে?

শৈলেনদা একটু হেসে বললেন, হ্যাঁ, আর দশ দিস্তা নতুন কাগজ মানে নতুন দশ হাজার টাকার বাণ্ডিল।

কয়েক বছর ধরে এই মামলা চলেছিল। দায়রা জজের রায়ের বিরুদ্ধে ওর। হাইকোর্টে আপিল করেছিল কিন্তু কিছু লাভ হয়নি। সন্তু অর নন্দ যাবজ্জীবন কারাদণ্ডে দণ্ডিত হয়ে এখনও প্রেসিডেন্সী জেলে রয়েছে।

শৈলেনদা এই মামলার অন্যতম সাক্ষী ছিলেন। দায়রা জজ ও হাইকোর্টের মহামান্য বিচারপতি ওঁর ভূয়সী প্রশংসা করেছিলেন। বিচারপতিদের প্রশংসার জন্য কিছু মাইনেও বেড়েছিল!

আর?

শৈলেনদা এখন বেচুবাবুর পরমাত্মীয়। আর শিউলি তো কাকু বলতে অজ্ঞান।

এ সংসারে কখন কোথায় যে অঘটন ঘটবে, তা কেউ জানে না, জানতে পারে না।

 

৪. আমরা চিঠি লিখি, ডাকবাক্সে ফেলি
আমরা চিঠি লিখি, ডাকবাক্সে ফেলি। কিছু কিছু চিঠি ঠিক সময়ে ঠিক মানুষের কাছে পৌঁছে যায়। কিছু চিঠি নানা ডাকখানার মোহরে ক্ষত-বিক্ষত হয়ে কয়েক দিন পর যথাস্থানে হাজির হয়। কিছু কিছু চিঠিপত্র আরও কিছুদিন ডাক বিভাগের আদর-আপ্যায়ন উপভোগ করার সৌভাগ্য লাভ করে। এসব চিঠিপত্রের ঠিকানায় লাল-কালো কালি দিয়ে কাটাকুটি থাকে কিন্তু কে বা কারা এই কাটাকুটি করে ঠিকানা সংশোধন করার দায়িত্ব বহন করেন, সে খবর আমরা রাখি না। রাখার প্রয়োজনও অনুভব করি না।

শীতের রাতে যেসব রেলযাত্রী লেপ মুড়ি দিয়ে দীর্ঘ পথ অতিক্রম করেন, তারা কী গার্ডসাহেব বা ড্রাইভারের রাত্রি যাপনের কাহিনী জানেন! নাকি জানতে চান? আমরা নিজেদের কাজটুকু হলেই খুশী কিন্তু কে বা কারা এই কাজ সম্পন্ন করল, তা জানতে, বুঝতে চাই না।

দুর্ঘটনাক্রমে শৈলেনদার সঙ্গে আমার আলাপ-পরিচয় না হলে হয়তো আমিও জানতে পারতাম না, আর-এল-ও অফিসের অন্দরমহলে কে বা কারা নীরবে কত হারিয়ে যাওয়া মানুষকে আবার আমাদের কাছে এনে দিচ্ছেন। খামের উপর ঠিকানা ছিল শ্রীদাশু দাস, গগন ডাক্তারের বাগান, পাইকপাড়া, কলকাতা। না, পাইকপাড়া পোস্ট অফিসের কেউই গগন ডাক্তারের বাগান কোথায় তা খুঁজে পেল না। আশেপাশের কয়েকটি পোস্ট-অফিসেও চিঠিটা পাঠানো হল, ওদের ওখানেও গগন ডাক্তারের বাগানের হদিস পাওয়া গেল না।

এবার চিঠিটিকে ফেরত পাঠাবার পালা কিন্তু কোথায় ফেরত পাঠাবে? অগতির গতি আর-এল-ও। রিটার্ন লেটার অফিস।

চিঠিটা খুলেই শৈলেনদা অবাক। শুধু চিঠি না, সঙ্গে একশ টাকার দুটি নোট। চিঠির উপরে পত্রপ্রেরকের বোম্বের ঠিকানা ছিল ঠিকই কিন্তু তবু শৈলেনদা সঙ্গে সঙ্গে চিঠিটা ফেরত পাঠালেন না। ভাবলেন, হয়তো এই টাকাটি দাশুবাবুর খুবই জরুরী দরকার। চিঠিটি ফেরত পাঠালে তো তিনি টাকাটি পাবেন না। তাই নানা কথা ভাবনা চিন্তা করার পর শৈলেনদা চিঠিটা পড়লেন।…

শ্রদ্ধেয় দাশুদা, আমার নাম মনীষা। উকিল প্রমথনাথ বন্দ্যো পাধ্যায়ের যে মাতৃহীন শিশুপুত্র চন্দন আপনার স্নেহ-ভালবাসার জোরে বড় হয়, তিনি আমার স্বামী। চন্দনকে আপনি নিশ্চয়ই ভোলেননি। আপনাকেও আমার স্বামী জীবনে ভুলতে পারবেন না। বিয়ের পর থেকেই ওঁর কাছে আপনার কথা শুনেছি। উনি সব সময় বলেন, পাঁচ বছরের শিশু মৃত্যু কি, তা তো জানে না। তাই আমিও ঠিক বুঝতে পারিনি, মা মারা গিয়েছেন। বাবা আর দাশুদার কথা মত আমি ভাবতাম, মা সত্যি সত্যি ভগবানের কাছে বেড়াতে গিয়েছেন। কিন্তু সে যাইহোক, দাশুদা চব্বিশ ঘণ্টা আমাকে এমন করে আগলে রাখতেন যে আমি মার অভাব অনুভব করার সুযোগ পেতাম না।

চিঠিতে আর কত কথা লিখব? আপনি বোধহয় জানেন না, আপনার সেই চোখের মণি চন্দন বাবা পড়াশুনা করার জন্য বহুকাল বিদেশে ছিলেন। লেখাপড়া শেষ করে ওখানে চাকরিও করেছেন। আমিও তখন বিদেশে থাকি এবং ওখানেই আমাদের বিয়ে হয়।

আমার স্বামী যখন বিদেশে পড়াশুনা করছিলেন, তখনই আমার শ্বশুরমশাই হঠাৎ মারা যান এবং তার জিনিসপত্র তিন কাকার বাড়িতে চলে যায়। তাই আমার স্বামী অনেক চেষ্টা করেও বহুকাল আপনার ঠিকানা যোগাড় করতে পারেননি। আমরা বছর দেড়েক আগে এ দেশে ফিরেছি এবং মাত্র কয়েকদিন আগে আমার শ্বশুরমশায়ের একটা পুরানো ডায়েরীতে আপনার একটা ঠিকানা পেয়েই এই চিঠি লিখছি।

আমার স্বামীই আপনাকে চিঠি লিখতেন কিন্তু তিনি হঠাৎ জরুরী কাজে দিন দশেকের জন্য বিলেত যাওয়ায় আমিই চিঠি লিখছি

আমার স্বামী লেখাপড়া শিখে নিজের পায়ে দাঁড়াবার বহু আগেই বাবা-মাকে হারিয়েছেন এবং তাদের সেবা-যত্ন করার কোন সুযোগ পেলেন না। তাইতো ওঁর ঐকান্তিক ইচ্ছা আপনি আমাদের কাছেই থাকুন। তাছাড়া আপনি তো বোধহয় বিয়েও করেননি। আমাদের মনে হয়, এখানে থাকলে অআনার কোন কষ্ট বা অসুবিধা হবে না। আপনার চন্দন বাবার কথা তো বাদই দিচ্ছি। আপনাকে কাছে পেলে আমিও তো মনে করব শ্বশুরের সেবা করছি।

আপনি শুনে নিশ্চয়ই সুখী হবেন যে আমাদের একটি পুত্র সন্তান আছে। আমাদের জন্য না হলেও এই দাদুভাই-এর জন্য আপনি নিশ্চই যথাশীঘ্র সম্ভব আমাদের কাছে চলে আসবেন। আপনার আসার খরচ বাবদ এই সঙ্গে ২০০,০০ টাকা পাঠালাম এবং রওনা হবার আগে অবশ্যই কাউকে দিয়ে আমাদের একটা টেলিগ্রাম পাঠাবেন। আমরা নিশ্চয়ই স্টেশনে উপস্থিত থাকব।

আপনার প্রতীক্ষায় রইলাম।

চিঠিটা পড়ে শৈলেনদা আপন মনেই হাসেন। হাসবেন না? চিঠিটা পড়েই বুঝতে পারেন, এই দাশু নিশ্চয়ই প্রমথ উকিলের বাড়িতে কাজ করতেন এবং ইনি যে চন্দনবাবুকে পুত্র তুল্য স্নেহ করতেন সে বিষয়ে কোন সন্দেহ নেই। আজকাল অধিকাংশ ছেলেমেয়েই তাদের বাবা-মাকে দেখে না। যেসব ছেলেমেয়েরা জীবনে উন্নতি করে, তারা যেন বাবা-মাকে আরও বেশি অপছন্দ করে। ব্যতিক্রম আছে বৈকি কিন্তু এরা যেন বিরল ব্যতিক্রম।

মনীষার চিঠির উপরের দিকে এক পাশে ওদের মালাবার হিলস এর ঠিকানা ছাপা। বাড়িতে দুটি টেলিফোন আছে। সুতরাং শৈলেনদা সহজেই বুঝতে পারেন, চন্দনবাবু শুধু প্রতিষ্ঠিত না, অত্যন্ত সুপ্রতিষ্ঠিত। হয়তো বিরাট কোন কোম্পানীর ডিরেক্টর। স্বামী-স্ত্রী দুজনেই যে উচ্চশিক্ষিত, সে বিষয়েও কোন সন্দেহ নেই। অতীত দিনের একজন গৃহভৃত্যের জন্য এরা এত ব্যাকুল?

নিজের মনের প্রশ্নের উত্তর নিজেই দেন। হবে না? সত্যিকার শিক্ষিত মানুষ কি কখনও অকৃতজ্ঞ হয়?

শৈলেনদা আরও কয়েকবার চিঠিটা পড়লেন। না পড়ে পারলেন না। সারা মন আনন্দে খুশিতে ভরে গেল। হবে না? এ সংসারে মানুষের দৈন্য দেখতে দেখতে কে ক্লান্ত না? তাইতো অকস্মাৎ কোন উদার মহৎ প্রাণের সন্ধান পেলে মন নিশ্চয়ই খুশিতে ভরে যাবে।

এইসব কথা বলতে বলতে হঠাৎ উনি একটু থামেন। তারপর বললেন, বুঝলে বাচ্চু, চিঠিটা নিয়ে মহা সমস্যায় পড়লাম।

কেন?

শুধু পাইকপাড়া না, আশেপাশের সব পোস্ট অফিসই দেখেছে ওদের এলাকায় গগন ডাক্তারের বাগান বলে কোন অঞ্চল নেই।…

ওর কথার মাঝখানেই আমি বলি, কলকাতার উত্তর-দক্ষিণ দুদিকেই এককালে অনেক বাগানবাড়ি ছিল ঠিকই কিন্তু পাটিশানের পর সেসব জায়গায় কত ঘরবাড়ি উঠেছে যে..

এবার উনি আমার কথার মাঝখানে বাধা দিয়ে বললেন, ঠিক ঠিক। নতুন রাস্তাঘাট দোকান-বাজার ঘরবাড়ি হাউসিং এস্টেট ইত্যাদি যা কিছু হয়েছে, তা তো ঐসব বাগানবাড়ি বা জমিদারদের বিরাট বিরাট বাড়ি-টাড়ির জায়গাতেই হয়েছে।

আমি মাথা নেড়ে বললাম, হ্যাঁ।

শৈলেনদা একটু হেসে বললেন, লালবাজারের গোয়েন্দাদের মত কর্পোরেশন ইমপ্রুভমেন্ট ট্রাস্ট অর গভর্নমেন্টের হাউসিং ডিপার্টমেন্টে খোঁজখবর নিতে নিতে গগন ডাক্তারের বাগানের খবর জুটে গেল। আরও একটু খোঁজ নিতেই বেরিয়ে গেল, ওখানকার পুরানো বস্তি বাসীদের কোথায় কোয়ার্টার্স দেওয়া হয়েছে।…

তারপর ঐ কোয়ার্টসগুলোতে খোঁজ নিতেই… উনি আমার দিকে তাকিয়ে মাথা এদিক-ওদিক দুলোতে দুলোতে মুচকি হেসে বললেন, ওহে শ্ৰীমান, এ খবরের কাগজের রিপোর্টারী না যে কিছু একটা লিখে দিলেই হল।

আমি শুধু হাসি।

হঠাৎ শৈলেনদা গম্ভীর হয়ে বললেন, সমস্ত খোঁজখবর নেবার পর ঐ অঞ্চলের একজন সিনিয়র পোস্টাল ইন্সপেক্টরকে সঙ্গে নিয়ে আমি নিজেই মনীষার চিঠি নিয়ে হাজির হলাম দাশুবাবুর আস্তানায়।

মুহূর্তের জন্য একটু থেমে একটা চাপা দীর্ঘশ্বাস ফেলে উনি আমার দিকে তাকিয়ে বললেন, সত্যি বলছি বাচ্চু, সেদিনের কথা আমি জীবনেও ভুলব না।…

পাকা তিন-চারতলা বাড়ির কয়েকটি ব্লক। অতীতদিনের কয়েক শ বস্তিবাসীকে এখানে ঠাঁই দিয়ে সরকার মহৎ কাজ করলেও এই আধুনিক নরক দেখে শৈলেনদার মাথা ঘুরে যায়। কচি-কাঁচা থেকে বুড়োবুড়ি মানুষ আর বেড়াল-কুকুর-গরু-ছাগল আর শুয়োরের এমন মিলে-মিশে অবাধ স্বাধীনতাভোগের এমন বিরল দৃশ্য দুনিয়ার আর কোথাও আছে বলে মনে হয় না। এমন স্বর্গরাজ্যে দাশু দাসকে আবিষ্কার করা খুব সহজসাধ্য হয়নি।

জানো বাচ্চু, মাঠের এক পাশে একটা ভাঙা খাঁটিয়ায় বৃদ্ধকে দেখেই বুঝলাম, মৃত্যু ওর সামনে এলে উনি বোধহয় তাকে দুহাত দিয়ে জড়িয়ে ধরবেন।

আমি বললাম, যেসব বুড়োবুড়িকে পরের দয়ায় বেঁচে থাকতে হয়, তাদের সবার অবস্থাই ঐ রকম।

যাইহোক আমি ওকে চিঠিটা পড়ে শোনাতেই উনি হাউহাউ করে কাঁদতে কাঁদতে বললেন, আমি জানতাম, আমার চন্দনবাবা আমাকে ভুলে যেতে পারে না, পারে না, পারে না।

আমি কোন কথা বলি না। চুপ করে ওর কথা শুনি। শৈলেনদা আবার বলেন, তারপর ঐ চিঠি আর টাকা হাতে নিয়ে পাগলের মত চিৎকার করে বললেন, ওরে, আমার চন্দনবাবার বউ চিঠি লিখেছে, টাকা পাঠিয়েছে। আমি আর এখানে থাকব না। আমি বোম্বাই চলে যাব। শৈলেনদা আবার একটু থামেন। তারপর বললেন, সত্যি বলছি বাচ্চু, পরশপাথরের ছোঁয়ায় যেমন লোহালঙ্কড়ও সোনা হয়, মনীষার ঐ চিঠিটা পেয়ে ঐ মৃত্যুপথযাত্রী মানুষটাও যেন আনন্দে খুশিতে যৌবনের দিনগুলোতে ফিরে গেল।

আমি একটু হেসে বললাম, ভালবাসার পরশপাথরের ছোঁয়ায় সবকিছুই সম্ভব।

ঠিক বলেছ ভাই।

 

৫. বাটা কোম্পানীর এক সেলসম্যান
ছোটোবেলায় আমাদের পাড়ায় বাটা কোম্পানীর এক সেলসম্যান থাকতেন। তিনি পথে-ঘাটে হাটে-বাজারে আত্মীয়-স্বজন বন্ধু-বান্ধব দের বাড়িতে বিয়ের নেমন্তন্ন খেতে গিয়েও সব সময় সবার পায়ের দিকে তাকিয়ে দেখতেন, কে কি জুতো পরেছেন।

পাড়ার সবাই ওকে নিয়ে ঠাট্টা করতেন। কেউ বলতেন, শম্ভুদা নিশ্চয়ই শুভদৃষ্টির সময় বোদির মুখের দিকে না তাকিয়ে পায়ের দিকে তাকিয়েছিলেন।

সঙ্গে সঙ্গে আরেকজন ফোঁড়ন কেটে বলতেন, তার চাইতেও বড় কথা বৌদিকে খালি পায়ে দেখেই উনি বুঝেছিলেন, পাঁচ নম্বর লাগবে।

শম্ভুদা শুভদৃষ্টির সময় সত্যি সত্যি বৌদির পায়ের দিকে তাকিয়ে ছিলেন কিনা অথবা তাকে খালি পায়ে দেখে দুঃখ পেয়েছিলেন কিনা, তা আমি জানি না। তবে তার দৃষ্টি যে সর্বত্র সব সময় নিম্নগামী ছিল, সে বিষয়ে কোন সন্দেহ নেই।

তখন শম্ভুদাকে দেখে অবাক হতাম। মনে হত উনি কি অদ্ভুত মানুষ।

এখন জেনেছি, এই বিশ্ব-সংসারের অধিকাংশ মানুষই শম্ভুদা! কেউ পায়ের জুতো দেখেন, কেউ বা অন্যকিছু।

আমাদের মনোরঞ্জনবাবু মাস্টারমশাই সব সময় বলতেন, আমাদের দেশে মাস্টারদের সম্মান নেই বলেই তো দেশের এই দুর্গতি! ওরে বাপু, মাষ্টারমশাইরাই তো জাতিকে সত্যিকার উন্নত করতে পারেন। জজ-ম্যাজিস্ট্রেট বা ব্যবসাদার দিয়ে কী দেশের সত্যিকার উন্নতি হয়?

দারোগাবাবুরা চব্বিশ ঘণ্টাই চোর-ডাকাত খুন-জখম-রাহাজানি লুঠপাট-বলাৎকার নিয়ে ব্যস্ত ও বিব্রত থাকেন বলে শুভবুদ্ধিসম্পন্ন মানুষকে বিশেষ খুঁজে পান না। ডাক্তারবাবুদের ধারণা, সবাই কোন না কোন রোগে ভুগছেন। উকিলবাবুরা ভাবতেই পারেন না, কোর্ট কাছারি না করেও সংসারে থাকা যায়। ডেনটিস্টদের একটাই দুঃখ, দেশের লোকজন দাঁতের যত্ন নিতে শিখল না। অর্থাৎ আমরা সবাই এক একজন শম্ভুদা! অনন্ত বৈচিত্র্যময় বিশ্ব-সংসারের মানুষও কম বৈচিত্র্যে ভরা নয় কিন্তু আমরা কজন সেই অজানা জগতের খবর রাখি?

একদিন কথায় কথায় শৈলেনদা বললেন, চাকরি পাবার পর প্রথম দিকে খুবই মন খারাপ লাগত।

কেন?

উনি একটু হেসে বললেন, এই মাটির পৃথিবীর উপর দিয়ে হাঁটা চলা করার সময় কি আমরা স্বপ্নেও ভাবতে পারি, আমাদের পায়ের নিচের মাটিতেই সোনা রুপো হিরে ছড়িয়ে আছে?

আমি মাথা নেড়ে বলি, ঠিক বলেছেন।

নানা রকম হাতের লেখা পড়তে আমার ভাল লাগলেও প্রথম প্রথম এই একঘেয়েমির কথা ভেবেই বিরক্তবোধ করতাম।

উনি আরও কি বলতে যাচ্ছিলেন কিন্তু আমি ওঁকে বাধা দিয়ে বললাম, কিছুদিন পরে বুঝি বুঝলেন, ঐ অসংখ্য চিঠিপত্রের জঙ্গলের মধ্যেই বহু সম্পদ ছড়িয়ে আছে?

ঠিক বলেছ ভাই। উনি মুহূর্তের জন্য আনমনা হয়ে কি যেন একটু ভাবেন। তারপর বলেন, এই চিঠিপত্র ঘাটাঘাটি করতে করতে কত মানুষের কত ভাল-মন্দ সুখ-দুঃখের কথা যে জানলাম তার হিসেব করতে গেলেও মাথা ঘুরে যায়।

তা তো বটেই। পিয়ন খটখট্‌ কড়া নেড়েই দরজার সামনে একটা চিঠি ফেলে দয়েই একটু জোর গলাই বললেন, চিঠি!

পিয়নের ঐ কড়া নাড়ার শব্দটি অত্যন্ত পরিচিত। তাই তো

পিয়নের মুখের কথা বেরুতে না বেরুতেই ভদ্রমহিলা ঘর থেকে বেরিয়ে এসেই চিঠিটা হাতে তুলে নেন। কার চিঠি? অমল সান্যাল?

উনি তাড়াতাড়ি এগিয়ে পাশের বাড়ির দরজার সামনে গিয়ে পিয়নের হাতে চিঠিটা ফেরত দিয়ে বললেন, আমাদের বাড়িতে তো অমল সান্যাল বলে কেউ নেই।

পিয়ন ঠিকানাটা আরেকবার দেখে নিয়ে বললেন, কিন্তু ঠিকানা তো আপনাদের বাড়িরই দেখছি।

হ্যা ঠিকানা তো আমাদের বাড়িরই কিন্তু এ বাড়িতে তো শুধু আমরাই থাকি।

পিয়ন চিঠিটি ব্যাগের মধ্যে ভরে রেখে এগুতে এগুতেই বললেন তা তো জানি।

পনের-কুড়ি দিন পরের কথা। পিয়ন খট খট করে কড়া নেড়েই চিঠিটা দরজার সামনে ফেলে না দিয়ে শুধু বললেন, চিঠি!

ভদ্রমহিলা ঘর থেকে বেরিয়ে আসতেই পিয়ন ওর হাতে আগের মতই একটা মোটা খাম দিয়ে বললেন, এ চিঠি কি রাখবেন?

ভদ্রমহিলা চিঠি হাতে নিয়ে প্রায় আপন মনেই বিড়বিড় করে বলেন, অমল ব্যানার্জী? চিঠিটা আবার পিয়নের দিকে এগিয়ে দিতে দিতে বললেন, না ভাই, এখানে অমল বলেও কেউ থাকে না।

কয়েকদিন পরে আবার একটা চিঠি। অশোক মুখার্জী। এবার ভদ্রমহিলা না হেসে পারেন না। বলেন, এ তো ভারী মজার ব্যাপার শুরু হয়েছে। যাদের সঙ্গে আমাদের কোন সম্পর্ক নেই কোনকালে যাদের নাম শুনিনি, শুধু তাদেরই চিঠি আসতে শুরু করেছে।

এবারও পিয়ন চিঠিটা ফেরত নেন কিন্তু অপর্ণাকে জিজ্ঞেস করেন, এসব চিঠি চৌধুরীবাবুর বন্ধু-বান্ধবের না তো?

অপর্ণা এক গাল হাসি হেসে বলেন, অশেষ তো পাটনার ছেলে, চাকরি করে বোম্বের এক ফার্মে। তাছাড়া ওকে ঘুরে বেড়াতে হয় আসাম-ত্রিপুরা-মণিপুর-নাগাল্যাণ্ডে। পিয়নের মনে খটকা লাগলেও মুখে কিছু বলেন না। অন্য বাড়ির দিকে দুএক পা এগিয়ে উনি আবার পিছিয়ে এসে অপর্ণাকে বলেন, চিঠি তো কয়েকদিন পোস্টাফিসে পড়েই থাকবে, তাই একবার চৌধুরীবাবুকে জিজ্ঞেস করে দেখবেন, যদি চিঠিটা ওঁর বন্ধু-বান্ধবের হয়…

উনি তো কদিন আগেই গোহাটি গেলেন, দশ-বারো দিনের আগে কখনই ফিরবেন না।

সব চিঠিগুলো এসে হাজির হয় রিটার্ন লেটার অফিসে শৈলেনদার টেবিলে। যথারীতি চিঠি খুলেই পত্রদাতার ঠিকানা বের করার চেষ্টা করতে হয় ওঁকে।…

আমার অনেক অনেক আদরের তুমি, দার্জিলিং থেকে লেখা তোমার চিঠিখানা পেয়ে যে কি আনন্দ হল, তা লিখে জানাবার ভাষা আমার জানা নেই। সারাদিনে চার-পাঁচবার চিঠিটা পড়েও মন ভরল না বলে রাত্রে শুয়ে শুয়ে বহুবার চিঠিটা পড়লাম। তুমি যে আমাকে কত গভীর ভাবে ভালোবাসে, তা আবার নতুন করে উপলব্ধি করলাম এই চিঠি পড়ে।

মা মারা যাবার পর পরই দাদু-দিদা আমাকে ওদের কাছে নিয়ে এলেন। তখন ঠিক ছিল, আমি একটু বড় হয়ে বাবার কাছে ফিরে যাব কিন্তু মা মারা যাবার বছর খানেকের মধ্যেই বাবা আবার বিয়ে করায় আমাকে আর উনি নিজের কাছে নিয়ে যেতে পারলেন না। তাছাড়া দাদু-দিদাও আমাকে ছাড়লেন না। দাদু-দিদার কাছে খুবই আদর-যত্নে মানুষ হয়েছি কিন্তু তবুও কোথায় যেন একটা শূন্যতার বেদনা-জ্বালা অনুভব করতাম। আমি দাদু-দিদার চোখের মণি ছিলাম ঠিকই কিন্তু তবু মাঝে মাঝে মা-বাবা ভাই-বোনের সান্নিধ্য ভালবাসার জন্য মন বড় ব্যাকুল হয়ে উঠত। পাঁচজনের সংসারে মানুষ হইনি বলে আমি কোনদিনই বিশেষ কারুর সঙ্গে মেলামেশা করতে পারতাম না। স্কুল-কলেজ-ইউনিভার্সিটিতে আমার কোন বন্ধু ছিল না বললেই হয়। তবু পড়াশুনা আর দাদু-দিদার সঙ্গে হাসিঠাট্টা গল্পগুজব করে দিন বেশ কাটত। এম. এ পরীক্ষার রেজাল্ট বেরুবার কদিন আগেই দাদু মারা গেলেন। দাদুর শরীর বরাবরই খারাপ ছিল তবু কখনও ওঁর শরীর একটু বেশি খারাপ হলেই দিদা খুবই অস্থির হয়ে উঠতে ও আমাদের ফ্যামিলী ফিজিসিয়ান ডাঃ বসুকে ডেকে পাঠাতেন ডাঃ বসুকে ঘরে ঢুকতে দেখলেই দাদু একটু হেসে বলতেন, আপনি আবার কষ্ট করে এলেন কেন? এরকম শরীর খারাপ তো আমার প্রায়ই হয়। আবার দাদু একবার আড় চোখে আমাকে ও দিদাকে দেখে নিয়ে বলতেন, আমার বুড়ী বউ কিছুতেই বিশ্বাস করে না আমার যুবতী স্ত্রী এম. এ. পাস না করা পর্যন্ত আমার কোথাও যাওয়া সম্ভব নয়। সত্যি, দাদু কথার খেলাপ করেননি।

যাইহোক দাদুর মৃত্যুর পর আমি জীবনে প্রথম অনুভব করলাম, কাউকে ভাল না বেসে ভুল করেছি কিন্তু ভালবাসার মানুষ কী চাইলেই পাওয়া যায়?

শুনেছি, জন্ম-মৃত্যু-বিয়ের ব্যাপারে কেউ আগে থেকে কিছু বলতে পারে না। এভাবে হঠাৎ যে আমার বিয়ে হবে, তা আমি স্বপ্নে ভাবিনি। তোমাকে দিদার এত ভাল লেগেছে যে কি বলব। তাছাড়া দিদা বার বার আমাকে একটা কথা বলেছেন, দ্যাখ দিদিভাই, তোর মত অমল ভাইও বাপ-মায়ের আদর পায়নি জ্যেঠা-খুড়োর কাছে মানুষ হয়েছে। তাইতো বলছি, ও তোকে ভালবাসায় ভরিয়ে দেবে। দিদিভাই, তুইও ওর জীবনের সব দুঃখ ঘুচিয়ে দিস।

বিয়ের পর যে কদিনের জন্য আমরা একসঙ্গে থেকেছি, তার মধ্যেই আমি বুঝেছি, দিদা ঠিকই বলেছেন। সত্যি ঐ কটা দিন তুমি এমন আদর-ভালবাসায় আমাকে ভরিয়ে দিয়েছ যে তার স্বাদ, মধুর স্মৃতি আমি জীবনে কোন দিন ভুলতে পারব না।

তোমার কলকাতার কাজ কবে শেষ হবে? জানি, কাজ শেষ হবার পর এক মুহূর্তও তুমি ওখানে থাকবে না। তুমি আমার কাছে ছুটে আসবে। খাওয়া-দাওয়া ঠিক মত করছ তো? আর হ্যাঁ, দিদার পরামর্শ মত উকিল দাদু দুটি ব্যাঙ্ককেই জানিয়ে দিয়েছেন, তোমার সঙ্গে আমার বিয়ে হয়েছে। ব্যাঙ্ক ও নানা জায়গায় তোমার আমার নতুন করে সই করতে হবে। তুমি এলেই সেসব কাজ সেরে ফেলতে হবে।

তুমি আমার অনেক আদর-ভালবাস-চুমু নাও। ইতি–

শুধু তোমারই শিখা

নিছক নববিবাহিতার প্রেমপত্র। পড়তে ভালই লাগত। মনে মনে দুজনের জন্যই সমবেদনা অনুভব কবেন শৈলেনদা কিন্তু পাটনার কোন ঠিকানায় এ চিঠি ফেরত পাঠাবেন?

চা-সিগারেট খেয়ে কিছুক্ষণ কাটাবার পর শৈলেনদা এবার অমল ব্যানার্জীর চিঠিটা খোলেন।…

আমার প্রিয়তম অমল রাজা! সত্যি বলছি, সব যেন স্বপ্নের মধ্যে ঘটে গেল। আমি এখনও সে স্বপ্নের নেশায় বিভোর হয়ে আছি। খবরের কাগজে বিজ্ঞাপন দিয়ে আমার কোন দিদির বিয়ে হয়নি। আমার দুই জামাইবাবু খুব ভাল হয়েছেন বলে মা সব সময় বাবাকে বলতেন, খবরের কাগজে বিজ্ঞাপন দেওয়া ছেলে-মেয়ে কখনই ভাল হয় না। আমার দিদিরাও সব সময় মার মত সমর্থন করেছে। তাই বাবা যখন আমার বিয়ের জন্য চারদিকে খোঁজখবর করেও পছন্দমত পাত্র পাচ্ছিলেন না, তখনও মা বাবাকে খবরের কাগজে বিজ্ঞাপন দিতে দেননি। এমন সময় হঠাৎ ছোট কাকা তোমার বিজ্ঞাপনটি বাবাকে পাঠালেন। বাবা কোন মন্তব্য না করে ছোট কাকার চিঠি আর বিজ্ঞাপনটি মাকে দিলেন। সবকিছু কয়েকবার পড়ার পর মা বললেন, এত উচ্চশিক্ষিত ছেলে, তার উপর বিদেশে থাকে। একটা চিঠি লিখে তো দেখ।

ব্যস! পনেরো দিনের মধ্যে তোমার-আমার বিয়ে হয়ে গেল! এখন তোমার মত জামাই পেয়ে বাবা-মার গর্ব দেখে কে!

যাই হোক হানিমুনের দিনগুলির প্রতিটি মুহূর্তের স্মৃতি আমি সারাজীবন রোমন্থন করব। সত্যি, তোমার ভালবাসায় আমিও এমন পাগল হয়ে উঠেছিলাম যে সে কথা মনে করলেও লজ্জায় মুখ লাল হয়ে উঠছে? অবার ভাবি, পাগলামি করেছি তো বেশ করেছি। তোমার সঙ্গে নিশ্চয়ই পাগলামি করব। তাছাড়া তুমিই তো আমাকে পাগল করে তুলেছিলে।

তুমি কলকাতার কাজ শেষ করে তাড়াতাড়ি চলে এসো। এখানে দুতিন দিন না থাকলে এত জিনিসপত্তর ঠিকঠাক করবে কে? তাছাড়া তুমি তো দিল্লী হয়ে বোম্বে যাবে। বোম্বেতে কী তোমার কোন কাজ আছে? ওখানে কোন কাজ না থাকলে বোম্বের বদলে দিল্লী থেকেই তো আমরা সোজা নিউইয়র্ক যেতে পারি। নিউইয়র্ক যাবার পথে আমরা দুটি দিন কি লণ্ডন আর প্যারিসে কাটাব না?

তুমি তাড়াতাড়ি এসো। তোমাকে ছাড়া আর এক মুহূর্তেও আমার ভাল লাগে না। তাছাড়া রাত্তিরে তোমার অভাব এত অনুভব করি যে কিছুতেই স্থির হয়ে ঘুমুতে পারি না। আমার অনেক আদর ও প্রণাম নাও।

–তোমার আদরের কৃষ্ণা

তৃতীয় চিঠিটার দুচার লাইন পড়েই শৈলেনদা সামনের টেবিলের দিকে তাকিয়ে বললেন, হ্যাঁগো মানিকদা, এ তো ভারী মজার ব্যাপার দেখছি।

মানিকবাবু এই সেক্সেনের ইনচার্জ। উনি একটু মুখ তুলে বললেন, কী আবার মজার ব্যাপার হল?

শৈলেনদা হাসতে হাসতে বললেন, একই ঠিকানা থেকে তিনটে চিঠি ফেরত এসেছে। আর তিনটে চিঠিই সদ্য বিবাহিতা তিনটি মেয়ের লেখা।

একই লোককে লেখা?

দুটি চিঠিই অমল নামের দুজনকে লেখা আর

পাশ থেকে বলাই ঘোষাল জিজ্ঞেস করলেন, একই ঠিকানায় একই নামের দুজনকে লেখা মানে?

শৈলেনদা বললেন, শুধু উপাধি আলাদা।

মানিকবাবু জিজ্ঞেস করলেন, থার্ড চিঠিটা কাকে লেখা?

অন্য নামের এক ভদ্রলোককে। কিন্তু তিনিও অন্য দুজনের মত বিয়ে করে কিছুদিন বউয়ের সঙ্গে ঘর করার পর কিছুদিনের জন্য কলকাতা এসেছেন।

তা কি করে হয়?

তাইতো আমার অদ্ভুত লাগছে।

দেখি তো চিঠিগুলো।

মানিকবাবু খুব মন দিয়ে তিনটে চিঠি দুতিনবার পড়লেন। কি যেন ভাবলেন। তারপর বললেন, বুঝলে শৈলেন, ব্যাপারটা আমার ভাল লাগছে না।

শৈলেনদা সঙ্গে সঙ্গে ওকে সমর্থন করে বললেন আমারও ব্যাপারটা ভাল লাগছে না।

মানিকবাবু বললেন, এ চিঠিগুলো ফেরত যাবে না।

অনেক বছর আগেকার কথা। তবু শৈলেনদার সবকিছু স্পষ্ট মনে আছে। সিগারেটে একটা লম্বা টান দিয়ে আমার দিকে তাকিয়ে বললেন, কেঁচো খুঁড়তে খুঁড়তে সাপ বেরিয়ে পড়ল।

আমি প্রশ্ন করি, তার মানে?

বেশীদিন না, দিন দশেকের মধ্যেই সব জানা গেল ও কেষ্টবাবু ধরা পড়লেন। কথাটা বলেই উনি একটু হাসলেন।

আমি জিজ্ঞেস করি, কী জানা গেল?

কেষ্টবাবুর কীর্তি-কাহিনী।

কেষ্টবাবু মানে?

ওরে বাপু, কলির কেষ্ট! হঠাং শৈলেনদার মুখ থেকে হাসির চিহ্ন উবে গেল। দুদিকের চোয়াল শক্ত হল। ওর চোখের দিকে তাকাতেও আমার ভয় হল। একটু পরে বললেন, ও হারামজাদা এক একটা শহরে এক একটা নাম-ধাম পরিচয় দিয়ে ভাল ভাল মেয়েদের বিয়ে করত।…

বলেন কী?

হ্যাঁ ভাই, তবে আর বলছি কি! কোথাও পরিচয় দিত আমেরিকায় থাকে ও ইউনিভার্সিটিতে পড়ায়, কোথাও বলত, বিলিতি কোম্পানির এরিয়া ম্যানেজার, কোথাও আবার অন্যকিছু বলত।

কী সর্বনাশ।

কটা মেয়ের সর্বনাশ করেছিল জানো?

কটা?

পাঁচটা।

ইস!

শৈলেনদা ঠোঁটের কোণে একটু হাসির রেখা ফুটিয়ে বললেন, ঐ জানোয়ারটা যেদিন পুলিশের হাতে ধরা পড়ল, তার পরদিনই ওর আরও একটা বিয়ে হবার কথা ছিল। ওটাহলেই হাফ ডজন হয়ে যেত।

মেয়েটি খুব জোর বেঁচে গেছে।

কিন্তু ঐ পাঁচটা মেয়ের কথা ভাবতে গেলেই আমার মাথা ঘুরে ওঠে! একজন তো আত্মহত্যাই করেছিল।

তাই নাকি?

তবে কী? এ আঘাত সবাই সইতে পারে?

ঐ অপর্ণা কী পাঁচজনের একজন?

হ্যাঁ।

 

৬. এ সংসারে আমরা সবাই
এ সংসারে আমরা সবাই মনে করি, সবকিছু জানি। সাধারণতঃ মানুষ–মানুষ এতই অহংকারী হয় যে, সে কিছুতেই স্বীকার করবে না, খুব সামান্য বিষয়েই তার জ্ঞান বা অভিজ্ঞতা আছে, অধিকাংশ বিষয়েই সে অন্ধকারে। অহংকার আমারও ছিল। খবরের কাগজের রিপোর্টর বলে নিজেকে প্রায় সবজান্তাই মনে করতাম।

টুকটাক হোঁচট খেলেও শৈলেনদার সঙ্গে পরিচয় হবার পরই প্রথম বুঝলাম, এই দুনিয়ার মনুষ্য চরিত্র সম্পর্কে আমি কত অনভিজ্ঞ। শুধু মনুষ্য সম্পর্কে কেন, এই বিশ্ব-সংসারে কোথায় কত কি ঘটে, তারই বা কতটুকু খবর রাখি?

পোস্ট অফিস পুলিসের গোয়েন্দা দপ্তর নয়। কোন লুকোচুরির ব্যাপার এখানে নেই। সবকিছুই সবার সামনে হয়। চিঠিপত্র, রেজেষ্ট্রী, পার্সেল, মনি অর্ডার। এমনকি সেভিংস ব্যাঙ্কের কাজ কারবারের মধ্যে কোন রহস্য বা লুকোচুরির ব্যাপার নেই। তবু চোখের সামনের এই কাজকর্মের মধ্যেও কখনো কখনো কত বিস্ময়কর ঘটনা ঘটে যায়।

আর-এল-ও, রিটার্ন লেটার অফিসে শুধু চিঠিপত্রই আসে না। রেজেস্ট্রী, ইন্সিওরড, চিঠি-প্যাকেট-পার্সেল, মনি অর্ডার ও আরও কত কি আসে কিন্তু তাই বলে প্যাকেট বা পার্সেলের মধ্যে বোমা? না, আমি স্বপ্নেও ভাবিনি।

অতি সাধারণ একটি ছেলে। বস্তিবাসী। হয়ত কোন কলকারখানায় সামান্য কাজ করে। অথবা আশেপাশে কোন পানবিড়ির দোকান চালায়। বয়স বড় জোর বাইশ-তেইশ কিন্তু স্বাস্থ্য বেশ ভাল। হঠাৎ দেখলে মনে হয় সাতাশ-আঠাশ। বোম্বে মার্কা হিরোদের মত মাথায় লম্বা লম্বা চুল। দাড়ি না থাকলেও গোফ রেখেছে লম্বা-চওড়া এক কথায় হঠাৎ দেখলে মনে হয় গুণ্ডা, মস্তান।

পিয়ন জগদীশ সরকার এ অঞ্চলে চিঠিপত্র-রেজেস্ত্রী-মনি-অর্ডার ইত্যদি বিলি করছেন বিশ-বাইশ বছর কিন্তু মনে পড়ে না ওদের বাড়িতে একটা পোস্টকার্ড এসেছে। তারপর হঠাৎ একদিন ঐ অসীমের নামে রেজেস্ট্রী বুকপোস্টে একটা বইয়ের বাণ্ডিল এসে হাজির। পিয়ন জগদীশবাবু একটু অবাকই হন কিন্তু সেকথা তো প্রকাশ করতে পারেন না! সই করিয়ে প্যাকেট ওর হাতে তুলে দেন। প্যাকেটটা হাতে পেয়ে অসীমের খুশি দেখে জগদীশবাবুর বিস্ময় হয় কিন্তু সে বিস্ময় প্রকাশ করেন না।

জগদীশবাবু অন্যদিকে পা বাড়াতেই অসীম ওকে ডাক দেয়, দাঁড়ান, দাঁড়ান!

উনি পিছন ফিরে তাকাতেই অসীম একটু এগিয়ে তাড়াতাড়ি ওর হাতে পাঁচটা টাকা দেয়। পিয়ন ওর মুখের দিকে একবার তাকিয়ে টাকাটা পকেটে রেখে অন্যদিকে পা বাড়ান।

দিন দশ-পনের পরে আবার একটি প্যাকেট। তবে বুক পোস্টের প্যাকেট নয়, রেজিস্টার্ড পার্সেল। অসীম খুশি হয়ে জগদীশবাবুর হাতে পাঁচ টাকা দেয়।

এর পর থেকে চিঠি না, মনি অর্ডার না, অসীমের নামে নিয়মিত প্যাকেট আর পার্সেল আসে এবং জগদীশবাবুর অদৃষ্টেও কিছু কিছু প্রাপ্তিযোগ ঘটে।

তারপর হঠাৎ একদিন একটা পার্সেল ডেলিভারী দিতে গিয়ে জগদীশবাবু অসীমকে পান না। ঐঘর থেকেই একজন মধ্যবয়সী ভদ্র লোক বেরিয়ে এসে বললেন, অসীম বলে তো এখানে কেউ থাকে না।

গত কয়েক মাস ধরে যে ছেলেটি এখানে থাকত, সেই ছেলেটিই তো অসীম।

ভদ্রলোক হেসে বলেন, কি বলছেন আপনি? যে ছেলেটিকে এখানে রেখে আমি দেশে গিয়েছিলাম, তার নাম তো হৃদয়।

হৃদয়? জগদীশবাবু যেন গাছ থেকে পড়েন।

হ্যাঁ, হ্যাঁ, হৃদয়। ওর বাবার নাম শ্রীনিবাস। এই শ্রীনিবাস আমার গ্রামের দোকানের দেখাশুনা করে।

জগদীশ একটু ভাবেন। তারপর বলেন, আচ্ছা সেই হৃদয়কে একটু দেখতে পারি?

তাকে তো আমি বাজারে পাঠিয়েছি।

এখুনি আসবে?

না, না, একটু দেরি হবে। এইতো তাকে পাঠালাম।

শেষে জগদীশবাবু বলেন, কাল এই সময় তাকে থাকতে বলবেন।

ভদ্রলোক একটু হেসে বলেন, তা বলব কিন্তু বাড়ির চাকরের নামে বইয়ের বাণ্ডিল বা পার্সেল আসে, তা তো বাপের জম্মে শুনিনি।

পরের দিন হৃদয়কে দেখে জগদীশবাবু অবাক! হা ভগবান! অসীম বলে, এই তো এত কাল সব প্যাকেট পার্সেল নিয়েছে।

হৃদয় ওরফে অসীম ইসারা-টিসারা করেও জগদীশবাবুর কাছ থেকে প্যাকেটটা হস্তগত করতে পারেনি। উনি প্যাকেট ফেরত নিয়ে চলে গেলেন।

প্যাকেটটি নিয়ে মহা সমস্যায় পড়লেন পোস্ট অফিসের বাবুরা। পার্সেলটি রেজেষ্ট্রী করা হয়েছে ধানবাদ হেড পোস্ট অফিস থেকে কিন্তু যিনি এটি পাঠিয়েছেন তার নাম-ঠিকানায় আছে–অবিনাশ, হ্যারিসন রোড, কলকাতা-১। হ্যারিসন রোডে লক্ষ লক্ষ লোকের বাস এবং তার মধ্যে কত শত অবিনাশ রয়েছে, তার কি ঠিকঠিকানা আছে?

শেষ পর্যন্ত অগতির গতি আর-এল-ও।

বুঝলে বাচ্চু, ঐ প্যাকেটের মধ্যে একটা পিস্তল ছিল।

বলেন কি দাদা?

হ্যাঁ ভাই, ঠিককথাই বলছি।

তারপর আপনারা ঐ পিস্তল নিয়ে কি করলেন?

শৈলেনদা একটা সিগারেট ধরিয়ে লম্বা টান দিয়ে বললেন, আমরা আর কি করব? পুলিশকে খবর দেওয়া হল।

যত অনভিজ্ঞই হই, তবু তো রিপোর্টার। তাই কাহিনীর শেষটুকু শুনে স্বস্তি পাই না। জিজ্ঞেস করি, তারপর কি হল, তা কি জানেন?

শৈলেনদা একটু থেমে সিগারেটে আবার একটা টান দিয়ে বললেন, সবকিছু জানতে পারিনি ঠিকই কিন্তু কিছু কিছু জেনেছিলাম বৈকি!

আমাকে আর প্রশ্ন করতে হয় না। উনি নিজেই বলে যান, আমরা শুধু এইটুকু জানতে পারি, ঐ ছেলেটার নাম অসীমও না, হৃদয়ও না। ওর নাম অন্য কি যেন ছিল। তার চাইতে বড় কথা ছেলেটি মোটেও ঐ ভদ্রলোকের চাকর ছিল না।…

বলেন কী?

উনি একটু হেসে বলেন, হ্যাঁ বাচ্চু, ছেলেটি বি. এ. পাস ছিল এবং পলিটিক্স করত।

আচ্ছা! আর ঐ ভদ্রলোক কি ছিলেন জান?

কী?

শৈলেনদা হেসে বললেন, মূৰ্ছা যাবে না তো?

ওঁর কথায় আমিও হাসি। বলি, মূর্ছা যাব কেন?

ঐ ভদ্রলোক পুলিসের গোয়েন্দা ছিলেন।

তাই নাকি?

শৈলেনদা মাথা নেড়ে বললেন, হ্যাঁ।

ঐ রিটার্ন লেটার অফিসে বসে ভারতীয় ডাক ও তার বিভাগের সেবা করতে দশের ও দেশেরও কত কি জানা যায়।

জান বাচ্চু, প্যাকেট-পার্সেলের মধ্যে বোমা-পিস্তল-পাইপ ছাড়াও আরও কত কি পাওয়া যায়।

কত কি মানে?

খুন করা মানুষের এক টুকরো হাত-পা পর্যন্তও আমরা পেয়েছি।

বলেন কী দাদা?

শৈলেনদা মাথা নেড়ে বললেন, হ্যাঁ ভাই, সত্যি কথাই বলছি।

আমি তাড়াতাড়ি একটু হেসে বলি, আমি কি বলছি আপনি মিথ্যে কথা বলছেন?

উনি গম্ভীর হয়ে বললেন, নাসিকে এক ব্যবসাদারের মেয়েকে রেপ করে খুন করা হয়। তারপর ঐ খুনী মেয়েটির বডিকে তিরিশ-বত্রিশ টুকরো করে এক একটা টুকরো দেশের এক এক জায়গায় ফলস ঠিকানায় পাঠায়। ইস্!

ইস্ করছে কি! মানুষ কি না পারে?

তা ঠিক। একটু থেমে জিজ্ঞেস করি, লোকটা ধরা পড়েছিল?

হ্যাঁ, ফাঁসীও হয়েছিল।

শৈলেনদার কাছে আর-এল-ও অফিসের গল্প শুনতে শুনতে সত্যি মুগ্ধ হয়ে যাই। ঘণ্টার পর ঘণ্টা ওঁর কথা শুনি। বৌদি খেতে দিয়ে বার বার না ডাকলে আমাদের হুঁশ হত না। একদিন তো শৈলেনদার কথা শুনতে শুনতে ঘড়ি দেখার কথা মনেই পড়েনি। যখন আমাদের বৈঠক শেষ হল, তখন রাত প্রায় একটা। সে কাহিনী আমি কোনদিন ভুলব না।…

ইন্সিওর্ড পার্সেলটা ঠিক ঠিকানাতেই গিয়েছিল কিন্তু মেয়েটির মা পিয়নকে বললেন, না, এ পার্সেল আমার মেয়ে নেবে না।

পিয়ন জিজ্ঞাসা করলেন, তবে কী এই পার্সেল ফেবত পাঠিয়ে দেব?

ভদ্রমহিলা বেশ রাগ করেই বললেন, যা ইচ্ছে করুন, মোট কথা এ পার্সেল আমরা নেব না।

পিয়নের সঙ্গে মাকে এত কথা বলতে দেখে একটি সদ্য বিবাহিত মেয়ে ভদ্রমহিলার পাশে এসে দাঁড়িয়েই জিজ্ঞেস করল, কী ফেরত দিচ্ছ মা?

ভদ্রমহিলা কিছু বলার আগেই পিয়ন ওকে বললেন আপনার নামের এই পার্সেলটা।

মেয়েটি একটু ব্যস্ত, একটু অবাক হয়েই জিজ্ঞেস করল, কেন মা? এই পার্সেলটা নেবে না কেন মা?

ভদ্রমহিলা বেশ রূঢ় হয়েই বললেন, কোথাকার কে পাঠিয়েছে, তার নেই ঠিক! যে যা পাঠাবে, তাই আমরা নেব নাকি?

মার কথায় মেয়েটি একটু অবাক হয় কিন্তু মুখে কিছু বলে না।

এবার ওর মা প্রায় আনমনেই বলেন, কার মনে কি মতলব আছে, তার কি কোন ঠিকঠিকানা আছে!

পিয়ন আবার প্রশ্ন করেন, তাহলে এটা ফেরত পাঠাব তো?

হ্যাঁ, হ্যাঁ, ফেরত দিন।

পিয়ন পকেট থেকে কলম বের করে লেখেন, রিফিউজড।

এবার মেয়েটি ওর মাকে জিজ্ঞেস করল, মা, এটা কে পাঠিয়েছেন।

কে এক অরূপ মুখার্জী!

বাপির কোন বন্ধু না তো?

না, না, কোন জন্মেও নাম শুনিনি।

পার্সেলটি ফেরত গিয়েছিল অরূপ মুখার্জীর ঠিকানায়। সেখানে গিয়ে জানা গেল, হা, উনি কদিনের জন্য এই হোটেলে ছিলেন কিন্তু দুতিন দিন আগেই চলে গেছেন।

বাড়ির ঠিকানা?

খাতা খুলে ম্যানেজারবাবু বললেন, শুধু লেখা আছে দার্জিলিং।

পার্সেল কলকাতা থেকে ভুবনেশ্বর ঘুরে গেল দার্জিলিং।

সেখানে কিছুদিন বিশ্রাম নেবার পর পার্সেলটি শেষ পর্যন্ত আর এল-ওতে হাজির।

শৈলেনদা বললেন, পার্সেলটি খুলেই ঘোষদা অবাক!

কেন?

ওর মধ্যে একটা দামী ডায়মণ্ডের নেকলেস, একটা অত্যন্ত পুরনো সিঁদুরের কৌটো আর একটা বিশ-পঁচিশ পাতার চিঠি দেখে ঘোষদা অবাক!

আমি চুপ।

শৈলেনদা বলেন, ঘোষদা চিঠিটা পড়ার পর আমাদের সবাইকে ডেকে চিঠিটা শুনিয়েছিলেন।…

মা অনুরাধা, সবার আগে তুমি আমার প্রাণভরা স্নেহাশিস নাও।

জানি না তোমাকে আমার চিঠি লেখার অধিকার আছে কিনা কিন্তু স্নেহ-ভালবাসা মানুষের এমনই এক রকম সম্পদ যা ন্যায়-অন্যায় উচিত-অনুচিত সময়-অসময় মানতে জানে না। তোমাকে দেখতে, কাছে পেতে, আদর করার জন্য মন অনেক সময়ই ব্যাকুল হয়েছে, কিন্তু মা, তুমি তো জান, এ সংসারে শুধু হৃদয়ের তাগিদে জীবনের জটিল-কুটিল পথে চলা যায় না। সম্ভব নয়। নানা পারিপার্শ্বিক অবস্থার চাপে আমরা সবাই নিজের মনকে উপেক্ষা করি। আমিও করেছি, না করে পারিনি। বাধ্য হয়ে করেছি। তবে বিনিময়ে কখনও বিনিদ্র থেকেছি রাতের পর রাত, কখনও আবার সবার আড়ালে চোখের জল ফেলেছি। সত্যি বলছি মা, মাঝে মাঝে শুধু তোমাকে একটু দেখার জন্য পাগল হয়ে উঠেছি। স্নেহ-ভালবাসার আতিশয্যে তোমার কোন ক্ষতি না হয় ভেবেই পাগলামি করতে গিয়েও থমকে দাঁড়িয়েছি। নিজেকে সংযত করেছি, করতে বাধ্য হয়েছি। তবে রক্ত-মাংসের কোন মানুষই সব সময় সংযত থাকতে পারে না, কিছুতেই পারে না। আমিও পারিনি। কদাচিৎ কখনও ছুটে গেছি তোমার স্কুলের সামনে, কলেজের সামনে। কোনদিন তোমাকে দেখেছি, কোনদিন দেখিনি।

ঠিক পঁচিশ বছর আগে দশই ডিসেম্বর তুমি এই পৃথিবীর আলো প্রথম দেখেছিলে। তাইতো প্রতি বছর ঐ দশই ডিসেম্বর এলেই তোমাকে একটু দেখার জন্য পাগল হয়ে উঠি। একবার আমি কি করেছিলাম জানো?

অনেক টফি আর চকোলেট কিনে সোজা চলে গেলাম তোমাদের স্কুলে। সেদিন কোন কারণে তোমাদের হেডমিস্ট্রেস মিসেস রায় স্কুলে আসেনি। তাই তোমাদের প্রতিমাকে বললাম, আমার নাম অরূপ মুখার্জী। আমি বোম্বে থাকি কিন্তু জরুরী কাজে দুতিন দিনের জন্য কলকাতা এসেছি। আজ আমার মেয়ের জন্মদিন কিন্তু ওকে কাছে পাচ্ছি না বলে

আমি এক নিশ্বাসে কথাগুলো বলেছিলাম। এবার উনি আমাকে বললেন, আগে আপনি বসুন।

হ্যাঁ, তারপর বসে বললাম, আমার মেয়ে ক্লাস ফাইভে পড়ে। তাই যদি আপনি দয়া করে অনুমতি দেন তাহলে আপনাদের স্কুলের ক্লাস ফাইভের মেয়েদের আমি একটু টফি-চকোলেট দিতাম।

প্রতিমাদি অবাক হয়ে আমাকে দেখে নিয়ে বললেন, চলুন, আমার সঙ্গে।

সেদিন ওর সঙ্গে তোমাদের ক্লাসে গিয়েছিলাম। তোমার হাতেও টফি-চকোলেট দিয়েছিলাম, মুগ্ধ হয়ে দুচোখ ভরে তোমাকে দেখে ছিলাম কিন্তু মন চাইলেও মুখ দিয়ে একটি শব্দ বের করিনি। তোমার কী সেদিনের কথা মনে আছে?

সেদিন তুমি দশ বছরে পা দিলে! আমার জীবনের সে এক অবিস্মরণীয় দিন!

তুমি যখন কলেজে-ইউনিভার্সিটিতে পড়াশুনা করেছ, তখনও আমি তোমাকে দেখেছি। তবে সব সময়ই দূর থেকে। কখনও কখনও অবশ্য খুব কাছ থেকেই তোমাকে দেখেছি কিন্তু ভয়ে ভয়ে। কিসের ভয়ে জানো? তোমার মার ভয়! সে যদি কোন কারণে আমাকে তোমার কাছাকাছি দেখত, তাহলে নিশ্চয় কিছু অঘটন ঘটত। যাই হোক কফিহাউসে তুমি যখন বন্ধুবান্ধুবদের সঙ্গে তর্ক-বিতর্ক হাসি-ঠাট্টা করতে তখন তোমাকে দেখে তোমার কথাবার্তা শুনে আমার মন ভরে যেত। ঐ কফিহাউসের আড্ডায় তোমার একটা কথা আমি জীবনেও ভুলব না। বেশ মনে আছে, ওথেলো আর ডেসডিমনার ভালবাসা নিয়ে তোমাদের আলোচনা শুরু হয়েছিল। আলোচনা একটু জমে ওঠার পরই ওথেলো ডেসডিমনা হারিয়ে গেল। প্রেম ভালবাসা নিয়ে তোমাদের তর্ক জমে উঠল। সেদিন সব আলোচনার শেষে তুমি বলেছিলে, যে ভালবাসার দ্বারা প্রিয়জনের কল্যাণ হয় না, তা কখনই ভালবাসা না!

কথাটা শুনে আমি মুগ্ধ হয়ে যাই এবং তোমরা সবাই চলে যাবার পরও আমি ওখানে স্থবিরের মত বসে বসে তোমার কথাটাই ভেবেছি ঘন্টার পর ঘণ্টা।

এই দীর্ঘ পঁচিশ বছরের মধ্যে অনেক সময় ভেবেছি, তোমার কাছে ছুটে যাই, তোমাকে আদর করি, জড়িয়ে ধরি, কোলে তুলে নিই। তুমি একটু বড় হবার পর বহুবার ভেবেছি, তোমাকে আমার চোখের জলের ইতিহাস বলি কিন্তু তা পারিনি। শুধু এই কথা ভেবে নিজেকে সংযত রেখেছি যে যদি আমার আবেগ-ভালবাসার আতিশয্যে তোমার কোন ক্ষতি হয়, তাহলে সে দুঃখ আমি সহ্য করতে পারব না। তুমি যখন এম. এ. পড়ার জন্য ইউনিভার্সিটিতে ভর্তি হলে, তখন মনে হয়েছিল, না, না, আর দেরি করব না। এখন তুমি বড় হয়েছ, তোমার বিচার-বুদ্ধি হয়েছে, ভাল-মন্দ ন্যায়-অন্যায় বিচার করতে শিখেছ। সুতরাং আর দেরি করব কেন? না, তখনও পারিনি। তখনো অতি কষ্টে নিজেকে সংযত করেছি কিন্তু মা, আর যে পারছি না। বোধ হয় সময়ও বেশি নেই।

তাছাড়া আজ তুমি বিবাহিতা। যে সহপাঠীকে তুমি জীবনসঙ্গী হিসাবে গ্রহণ করেছ, সেই সুদীপও অত্যন্ত আদর্শবান ও বুদ্ধিমান ছেলে। আজ তুমি শুধু তোমার বাবা-মার সন্তান না, তুমি সুদীপের স্ত্রী। তাইতো আজ তুমি এই পৃথিবীর, এই সংসার ও মানুষজন সম্পর্কে নিজস্ব মতামত গ্রহণ করার অধিকারিণী এবং সেই সাহসেই আজ তোমাকে প্রথম চিঠি লিখছি।

মাগো, এত দীর্ঘ ভূমিকার জন্য তুমি আমাকে ক্ষমা কর। তবে শুধু এইটুকু মনে রেখ, আমি দুঃখী, চির দুঃখী। আমি সারাজীবন শুধু চোখের জলই ফেললাম। এই পৃথিবীর কারুর বিরুদ্ধে আমার অভিযোগ নেই। এই পৃথিবী, এই সংসারের জন্য আমরা সবাই কি উপযুক্ত? না, তা হতে পারে না। আজ আমি মনে মনে বিশ্বাস করি, আমি শুধু হতভাগ্য না, আমি একটি ব্যর্থ, অপদার্থ জীব মাত্র।

দীর্ঘ চিঠির শেষের দিকে উনি লিখেছিলেন, ধনীর ঘরে জন্মে সুখ পেলেও শান্তি পাইনি। আনন্দময় হয়নি আমার শৈশব-কৈশোরের দিনগুলি। ছোটবেলায় মাতৃহীন হলে কি কোন শিশু বা কিশোরের জীবন মধুর হতে পারে? তবু জীবন এগিয়ে চলল। তারপর একদিন সরকার জমিদারী-প্রথা বিলোপ করলেন ও সঙ্গে সঙ্গে জ্ঞাতিদের শত্রুতাও চরমে উঠল। বাবা সবকিছু হারিয়েও নির্বিবাদে সেক্সপিয়ার চর্চা নিয়ে মেতে রইলেন। তারপর একদিন শুধু ফার্স্ট ডিভিশান না, তিনটে লেটার পকেটে করে প্রেসিডেন্সী কলেজে ভর্তি হলাম। দেখতে দেখতে প্রেসিডেন্সী কলেজের দিনগুলোও কেটে গেল। বাবা জোর করেই বিলেত পাঠালেন। বাবাকে শুধু বৃদ্ধা বিধবা পিসীর ভরসায় রেখে সাত সমুদ্র পাড়ি দেবার একটুও ইচ্ছা ছিল না কিন্তু বাবার ইচ্ছাকে অগ্রাহ্য করতে না পেরে সত্যি সত্যি একদিন বোম্বে থেকে পি. অ্যাণ্ড ও লাইনের জাহাজে চড়লাম। বিলেত বাসের মেয়াদ শেষ করে কলিকাতায় ফিরে দেখি, বাবা মৃত্যুশয্যায়। বোধ হয় আমার জন্যই অপেক্ষা করছিলেন।

জানো মা, বাবার মৃত্যুর দিন পনেরো পর আবিষ্কার করলাম, তিনি আমার পাত্রীই শুধু নির্বাচন করেননি, বিয়ের দিনও পাকা করে গেছেন। না, ঐ দিনই আমার বিয়ে হয়নি কিন্তু ঐ পাত্রীর সঙ্গেই আমার বিয়ে হল। সেটা সাতাশ বছর আগেকার কথা। যাকে আমি বিয়ে করি তিনি শুধু সুন্দরী ছিলেন না, উচ্চশিক্ষিতাও ছিলেন এবং ওর বাবা আমার বাবার বিশেষ বন্ধু ছিলেন।

অত্যন্ত দুঃখের কথা আমার বিবাহিত জীবন দীর্ঘস্থায়ী হয়নি। বিয়ে করলেই কি ভালবাসা হয়? ছন্দপতনের সঠিক কারণটা আজো আমি জানি না। শুধু এইটুকু জানি, আমার স্ত্রীকে আমি সুখী করতে পারিনি এবং তিনি যেদিন আমার বন্ধন থেকে মুক্তি চেয়েছিলেন, সেদিন আমি নীরবে সম্মতি জানিয়েছিলাম। তারপর একদিন আমার স্ত্রী তার শিশুকন্যাকে কোলে নিয়ে চলে গেলেন। মাগো, সেদিনের সেই শিশুকন্যাটি আর কেউ নয়, তুমি!

আমি তোমার জন্মদাতা হলেও তোমার পিতৃপরিচয় দেবার সাহস বা অধিকার আমার নেই। সবাই জানেন, তুমি ডাঃ সন্তোষ রায়ের কন্যা। আমিও জানি, তিনি তোমাকে পিতৃত্বের স্নেহ-ভালবাসায় ভরিয়ে দিয়েছেন এবং সেজন্য আমিও তার কাছে আজীবন কৃতজ্ঞ থাকব।

আমার পরলোকগতা মার ইচ্ছা পূরণের জন্যই এই চিঠি লিখছি। বাবা এই নেকলেসটা আমাকে দিয়ে বলেছিলেন, তোমার প্রথম সন্তান পুত্র হলে, তোমার পুত্রবধূকে এইটি দিও। আর যদি প্রথম সন্তান কন্যা হয়, তাহলে তার বিয়ের সময় এই নেকলেসটা তাকে দিও। মার ইচ্ছা পূরণের জন্যই এই নেকলেসটা তোমাকে পাঠালাম।

আর একটি কথা। এ সংসারে আমার মেয়াদ আর খুব বেশি দিনের নয় বলেই মনে হচ্ছে। তোমাকে দেবার মত আমার বিশেষ কিছুই নেই। তাছাড়া আমার কী অধিকার? তবু বলছি, গ্রাচুইটি প্রফিডেন্ট ফাণ্ডের যা কিছু ইউনিভার্সিটি থেকে পেয়েছি, তার অর্ধেকেরও বেশি চিকিৎসার জন্য ব্যয় করেছি। আগামী সপ্তাহে ভেলোর যাচ্ছি অপারেশনের জন্য। সে জন্যও বেশকিছু ব্যয় হবে। তবু কিছু থাকবে বৈকি। যা থাকবে, তা তোমার সন্তানের জন্য আশীর্বাদ হিসেবে রেখে দেব। স্টেট ব্যাঙ্কের গড়িয়াহাট বাঞ্চে সব নির্দেশ দেওয়া আছে। যদি তোমার ও সুদীপের আপত্তি থাকে তাহলে ব্যাঙ্ক এই টাকা রামকৃষ্ণ মিশনে পাঠিয়ে দেবে।

তোমরা দুজনে আমার প্রাণভরা ভালবাসা নিও।

শৈলেনদা থামলেন।

আমিও চুপ।

কিছুক্ষণ পরে উনি বললেন, এই চিঠিটার কথা আমরা কেউ কোনদিন ভুলব না।

কেন?

উনি একটু ম্লান হাসি হেসে বললেন, যেদিন সকালের কাগজে দেখলাম, ভেলোরে অধ্যাপক অরূপ মুখার্জীর মৃত্যু হয়েছে, সেইদিনই অনুরাধা আর তার স্বামী ঐ পার্সেলটার খোঁজে আমাদের অফিসে এসে হাজির।

বলেন কী?

হ্যাঁ ভাই।

তারপর?

তারপর ঐ পার্সেলটা বুকের মধ্যে জড়িয়ে ধরে অনুরাধার কি কান্না।

 

৭. পুরানো কাগজপত্র ঘাঁটাঘাঁটি করতে
পুরানো কাগজপত্র ঘাঁটাঘাঁটি করতে করতে শৈলেনদার শ্রাদ্ধের কার্ডটা হাতে পেয়েই আজ আমার ওঁর কথা মনে পড়ল। উনি বহুকাল আগেই রিটায়ার করেছিলেন এবং সব রিটায়ার্ড লোকজনদের মতই উনিও রিটায়ার করার পরই অফিসের গল্প বেশি করতেন।

বৌদি সারাজীবন ধরে ঐসব গল্প শুনেছেন বলে অনেক সময়ই বিরক্ত হয়ে ওঁকে বলতেন, ঐ অফিসের গল্প ছাড়া কি আর কোন বিষয়ে কথা বলতে পার না?

শৈলেনদা হাসতে হাসতে জবাব দিতেন, ওহে সুন্দরী, এই চিঠি পত্রের মানুষগুলোকে নিয়েই তো জীবন কাটালাম। ওদের নিয়ে ছাড়া আর কাদের নিয়ে গল্প করব?

সারা জীবন ওদের নিয়েই গল্প করে। বৌদি দু পেয়ালা চা আমাদের সামনে রেখে ফিরে যাবার সময় একবার আমার দিকে তাকিয়ে একটু হেসে বলেন, এমন শ্রোতা বহুকাল পাও না, তাই বলে যাও।

শৈলেনদার সামনে বৌদি যাই বলুন, আমাকে একলা পেলেই উনি বলতেন, সত্যি বলছি বাচ্চু, তোমার দাদার কাছে এইসব ঘটনা না শুনলে ভাবতেই পারতাম না, সংসারে এত ঘটনা ঘটে।

তা তো বটেই।

এ সব অনেক দিন আগেকার ঘটনা। তারপর এই বিশ্বসংসারে কত কি দেখলাম, শুনলাম! তবু শৈলেনদার কাছে শোনা সব কাহিনী মনে না থাকলেও অনেক কাহিনীই ভুলিনি। বোধহয় কোনদিনই ভুলব না।

জানো বাচ্চু, হঠাৎ একদিন এক অত্যন্ত সৌখীন ভদ্রলোক আমাদের অফিসে এসে এক কুখ্যাত বেশ্যাপল্লীর একটা ঠিকানা বলে খোঁজ করলেন, প্রমোদ রায়চৌধুরীর নামের কোন চিঠি ফেরত এসেছে কি?

চিঠিপত্রের খোঁজে লোকজনও কি আপনাদের অফিসে হাজির হয়?

এখনকার কথা বলতে পারি না কিন্তু তখন মাঝে মাঝে কিছু লোক আসতেন।

আচ্ছা তারপর কি হল?

ও নাম-ধাম, কোথা থেকে চিঠি আসবে ইত্যাদি জানার পর জিজ্ঞেস করা হল, আপনি যখন ঐখানেই আছেন, তখন চিঠি ফেরত এল কেন?

উনি জবাব দিলেন?

উনি একটু মুচকি হেসে বললেন, ও-পাড়ার সবাই আমাকে মেজ কর্তাবাবু বলে জানে। আসল নাম কেউই জানে না। তাই বোধহয় কেউ বলেছে, আমি ওখানে নেই।

যাই হোক দু তিনদিন খোঁজাখুঁজির পর প্রমোদ রায়চৌধুরীর নামের একটা চিঠি পাওয়া গেল ও উনি আবার এলে ওর হাতে দেওয়া হল। চিঠিটা পড়েই উনি পাগলের মত চিৎকার করে উঠলেন, আপনারা সবাই জেনে রাখুন, আমি মলিনার ছেলে, অঘোর রায়চৌধুরীর বিবাহিতা স্ত্রীর ছেলে না!

শৈলেনদা ও তার সহকর্মীরা সবাই ওর কাণ্ড দেখে অবাক হয়ে জিজ্ঞেস করলেন, কি ব্যাপার? আপনি পাগলের মত চিৎকার করছেন কেন?

আমি চিৎকার করব না? পাটনা হাইকোর্ট জাজমেন্ট দিয়েছে, আমি মলিনার ছেলে!

আর মানে?

তাহলে শুনুন!

অতীত দিনের বিহারের বিখ্যাত জমিদার কুমুদকান্তি রায়চৌধুরীর ছেলে জমিদার হবার পর পরই সরকার জমিদারী তুলে দিলেন কিন্তু কুমুদকান্তির নাতি অঘোরকান্তি রায়চৌধুরী চাষবাস ব্যবসা-বাণিজ্য করে আবার কোটিপতি হয়েছেন। এই অঘোরকান্তির তিন পুত্র। প্রমোদবাবুই বড় ছেলে। প্রমোদবাবুর জন্মের প্রায় পনের বছর পর ওর মেজভাইয়ের জন্ম। এর বছর তিনেক পরে ছোট ভাইয়ের জন্ম। বহু ধনদৌলত ভূ-সম্পত্তি রেখে অঘোরবাবু পরিণত বয়সেই মারা গেলেন এবং ওর মৃত্যুর পরই শুরু ভ্রাতৃবিরোধ। তারপর যথারীতি কোর্ট-কাছারি। শেষ পর্যন্ত পাটনা হাইকোর্ট।

দুজন মহামান্য বিচারপতি এক মত হয়ে রায় দিয়েছেন, সন্দেহা তীতভাবে প্রমাণিত হয়েছে যে মলিনা শুধু দাসী ছিল না, সে একজন বারবনিতাও ছিল এবং অর্থ বা অলঙ্কারের বিনিময়ে সে বহুজনকেই নিজের দেহ দান করত। এই কথাও প্রমাণিত হয়েছে যে মলিনার সঙ্গে কোন পুরুষের কোনদিনই আনুষ্ঠানিক বিয়ে হয়নি। তবে সেই সঙ্গে আমরা মুক্ত কণ্ঠে স্বীকার করব যে বৈজ্ঞানিক পরীক্ষা নিরীক্ষা ও পারিপার্শ্বিক অবস্থার দ্বারা নিঃসন্দেহে প্রমাণিত হয়েছে, প্রমোদের জন্ম মলিনার গর্ভে ও অঘোরকান্তিই তার জন্মদাতা।…

আর?

প্রমোদ নাবালক হলে তার ভরণপোষণ ও শিক্ষাদীক্ষার জন্য নিশ্চয়ই অর্থের ব্যবস্থা করা হতো কিন্তু তিনি শুধু সাবালকই না বেশ বয়স্কও হয়েছেন। তাই অঘোরকান্তির ব্যবসা-বাণিজ্য বা পারিবারিক সম্পত্তির আয় থেকে তাকে কিছুই দেবার প্রয়োজন নেই। তবে তিনি জীবিতকালে রায়চৌধুরী পরিবারের মূল বসত-বাড়িতে থাকতে পারবেন ও তার জন্য তাকে কোন ভাড়া বা ট্যাক্স দিতে হবে না।

গুড বাই জেন্টলমেন! গুড বাই!

আগের মতই চিৎকার করে প্রমোদবাবু নাটকীয় ভঙ্গীতে সবার কাছ থেকে বিদায় নিয়ে ডালহৌসীর ভিড়ে মিশে গেলেন।

পরের দিন সকালে কলকাতায় সব খবরের কাগজেই ছোট্ট একটি খবর বেরুল

শুক্রবার সন্ধ্যায় জনৈক প্রমোদ রায়চৌধুরী (৪৮) হাওড়া পুলের উপর থেকে গঙ্গায় ঝাঁপ দিয়ে আত্মহত্যা করেন।

পুলিস সূত্রে বলা হয় যে, মৃত ব্যক্তির পকেটের একটি চিঠি ও হাতের আংটি থেকে জানা যায় যে উনি বিহারবাসী। চেহারা ও পোশাক-পরিচ্ছদ দেখে মনে হয়, উনি কোন ধনী পরিবারের লোক।

পুলিস আরও জানায় যে মৃত ব্যক্তির স্বহস্ত লিখিত একটি কাগজ ওর পকেটে পাওয়া যায় এবং তার থেকে জানা গেছে সোনাগাছির এক বারবনিতার কাছেই উনি থাকতেন। ঐ বারবনিতার ঘরে ওর যেসব টাকাকড়ি-ঘড়ি-আংটি ইত্যাদি আছে তা ওর ছোট ভাইদের কাছে পাঠিয়ে দিতে পুলিসকে অনুরোধ করা হয়েছে।

মৃতদেহটি ময়না তদন্তের জন্য পাঠান হয়েছে।

গল্পের বিষয়:
উপন্যাস

Share This Post

আরও গল্প

সর্বাধিক পঠিত