সাইলেনটিয়াম

সাইলেনটিয়াম

(১)
২০১৯ ( হিউস্টন স্পেস কন্ট্রোল সেন্টার,নাসা )

আর কয়েক মুহূর্ত। হিউস্টন মহাকাশ কেন্দ্রের নিয়ন্ত্রণ কক্ষে তিনশোজন বিজ্ঞানী একদৃষ্টে চেয়ে আছেন সামনের পর্দার দিকে। অয়ন নীরবে তার কম্পিউটারের মনিটারে চোখ রাখল। কেউ কোন কথা না বললেও তাদের হৃদপিণ্ডের শব্দ স্পষ্ট শুনতে পাচ্ছে সে। আর কিছুক্ষণের মধ্যেই মহাকাশযান “সর্সারার-১” মানুষের চেনা সৌরজগতের সীমানার বাইরে চলে যাবে। এই ঐতিহাসিক মুহূর্তের সাক্ষী থাকাটা তাদের প্রত্যেকের কাছে যত না আনন্দের, তার চেয়ে অনেক বেশি উৎকণ্ঠার।

মানুষের তৈরি কোনো স্পেস শাটল আজ পর্যন্ত যাত্রীসহ সৌরজগতের বাইরে পৌঁছতে পারেনি এর আগে। অনেক গবেষণা, অনেক ঝুঁকি, অনেক মানুষের সারাজীবনের পরিশ্রমের পরিণতি ঠিক করে দেবে আজকের এই মুহূর্ত। “সর্সারার-১” স্পেস শাটলের পাঁচজন অভিযাত্রীর ভবিষ্যৎও নির্ভর করছে এই মুহূর্তের ওপর।

ফিউয়েল প্রপালশান টিমের প্রধান ড্যানের উত্তেজিত গলা শোনা গেল, “সব ঠিকঠাক চলছে। হিসেবমত সর্সারার-১ আর মিনিট পাঁচেকের মধ্যেই হেলিওস্ফেয়ার ছাড়িয়ে আন্তর্নক্ষত্র অঞ্চলে চলে যাবে। নিউক্লিয়ার পাল্স ইঞ্জিন চালু করে দেওয়া হয়েছে এতক্ষণে। থ্রাস্টার্স পুশার প্যাডস ওয়ের ওয়ার্কিং ফাইন। “

ফিলিপ বলল, “সর্সারার-১ এর শেষতম বার্তা বলছে সব ঠিক আছে। দে মাস্ট বি গেটিং রেডি ফর দি জাম্প। “
ফিলিপের টিম সারাক্ষণ সর্সারার-১ এর সঙ্গে যোগাযোগ রেখে চলেছে। সঙ্কেত বিশ্লেষণ চলছে বিরামহীনভাবে। শুধু মানবসভ্যতাকে গভীর মহাকাশে পাঠানোই তাদের লক্ষ্য নয়, এই অভিযানের আসল কাজ আরম্ভ হবে সর্সারার-১ এর সৌরজগতের সীমানার বাইরে পৌঁছোবার পর।

আর এক মিনিট। কাউন্টডাউন শুরু হয়ে গেছে। অয়ন উদগ্রীব হয়ে অপেক্ষা করছে। গত উনিশ বছরের অপেক্ষা। নিজেদের জীবন আর বিপদের তোয়াক্কা না করে মানুষের ভবিষ্যৎএর স্বপ্ন দেখা কয়েকটা মানুষের সাফল্য। এই পদক্ষেপ হয় তাদের সন্ধান দেবে নতুন জগতের অথবা সর্সারার-১ চিরকালের মত হারিয়ে যাবে অন্তরীক্ষের অপরিসীম অন্ধকারে।

“দশ নয় আট সাত ছয় পাঁচ চার তিন দুই এক শূন্য.. দে হ্যাভ সার্টেইনলি মেড দি জাম্প। “
অয়ন একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলল। এবার অপেক্ষা করা ছাড়া কোনো উপায় নেই। সতেরো ঘন্টার আগে সর্সারার এর পাঠানো সিগন্যাল পাওয়ার কোনো উপায় নেই। লক্ষ লক্ষ মাইল দূর থেকে আসা সিগন্যাল আসতে সময় লাগে।
ক্রমে সময় কাটতে লাগল। একসময় পেরিয়ে গেল সতেরো ঘন্টা। প্রজেক্ট ম্যানেজার মার্ক অস্থির হয়ে পায়চারি করছে। বাড়তি সময়ের প্রত্যেক ঘন্টার সঙ্গে কন্ট্রোল সেন্টারে সকলে আস্তে আস্তে অধৈর্য হয়ে উঠছে। এখনো ফিলিপের টিম কোন রকম আপডেট দেয়নি। হঠাৎ মার্কের গলার স্বরে সচকিত হয়ে উঠল সবাই। মার্ক সকলের দিকে তাকিয়ে ক্লান্ত কণ্ঠে বলল, “সর্সারার-১ এর সঙ্গে কোনোরকম যোগাযোগ করা যাচ্ছে না। যতদূর মনে হচ্ছে সৌরজগতের সীমানা পেরিয়ে যাওয়ার সময়ে স্পেস শাটল এর যন্ত্রপাতি কোনভাবে খারাপ হয়ে গেছে ..অথবা ..অথবা কোন বিস্ফোরণে সর্সারার-১ ….” কথা শেষ করতে পারলেন না মার্ক। হাঁটু গেড়ে বসে পড়লেন। ভাঙা কণ্ঠে মাটির দিকে তাকিয়ে বলতে লাগলেন, “আমরা হেরে গেছি। আমরা হেরে গেছি।”
অয়ন অস্ফুটে বলে উঠল, “বাবা!”

 
১৯৮৫,ইসরো,ব্যাঙ্গালোর

মিটিং শেষ হতেই অমল দ্রুত পায়ে ঘরের বাইরে বেরিয়ে গেল। ততক্ষণে প্রফেসর নারায়ণন সিঁড়ি দিয়ে নামতে শুরু করেছেন। তার পিছনে সিঁড়ি দিয়ে নামতে নামতে অমল বলল, “কিন্তু স্যার, আমার মনে হয় এই প্রজেক্টটায় সময় দেওয়া উচিত। ফিজিক্সের নিয়ম ঠিক হলে আমরা এইভাবে অনেক তাড়াতাড়ি গভীর মহাকাশে পৌঁছতে পারি।”
তার কথা শুনে প্রফেসর নারায়ণন দাঁড়িয়ে পড়লেন। তারপর অমলের দিকে তাকিয়ে তার মাথায় হাত রেখে বললেন, “অমল, আমি জানি তুমি কতদিন ধরে গবেষণা করছ এই বিষয়টার ওপরে। কিন্তু তোমাকে বাস্তববাদি হতে হবে। আমরা সরকারি অনুদানে কাজ করি। সেখানে এরকম একটা গবেষণায় আমাদের কখনোই টাকাপয়সা দেওয়া হবে না যার কোনো প্রমাণ নেই। “

অমল উত্তেজিত হয়ে বলল, “কিন্তু স্যার, বৈজ্ঞানিক প্রমাণ তো অবশ্যই আছে। আইনস্টাইনের তত্ত্ব ঠিক হলে ব্ল্যাকহোল, ওয়ার্মহোল, টাইম ট্রাভেল সবই সম্ভব। গতানুগতিক জ্বালানির রকেট বানিয়ে আমরা কোনদিনই মহাকাশের রহস্য ভেদ করতে পারব না। এখন এই গবেষণা শুরু না করলে আমাদের আরও কয়েক শতাব্দী লেগে যাবে সৌরজগতের সীমানা ছাড়িয়ে যেতে।”

“অমল, সারা পৃথিবীর বিজ্ঞানীরা চেষ্টা করছে। নাসার তৈরি “ভয়েজার” তো সৌরজগত পেরিয়ে এগিয়ে যাবে আর কয়েক বছরে। চেষ্টা করলে আমরাও পারব। “

“স্যার, ভয়েজার মিশনে প্রায় নশো মিলিয়ান ডলার খরচ হয়েছে। এত টাকা আমরা খরচ করার কথা ভাবতেও পারি না। আর সৌরজগতের গন্ডি পেরোতে ভয়েজার এর প্রায় সাতাশ বছর আরো লাগবে। হাবল টেলিস্কোপে দেখা গ্যালাক্সিগুলো প্রায় লক্ষ লক্ষ আলোকবর্ষ দূরে। হাজার হাজার বছর লেগে যাবে যদি বা কোনদিন কোনো রকেট সেখানের উদ্দেশ্যে পাড়ি দেয়। মানুষ সশরীরে কোনদিনই আমাদের গ্যালাক্সির সীমানা ছাড়াতে পারবে না। অন্য রাস্তায় এগোতে হবে আমাদের স্যার, মানবসভ্যতার স্বার্থে। “

“তুমি অধৈর্য হচ্ছ। মহাকাশ বিজ্ঞান ছেলের হাতের মোয়া নয় এটা তোমার বোঝা দরকার। ধৈর্য রাখতে হবে। তোমার বয়স কম, তোমার কাছে অনেক সময় আছে। আমরা নিশ্চয়ই কোন একটা রাস্তা বের করে ফেলব। “
অমল মাথা নিচু করে দাঁত দিয়ে ঠোঁট কামড়াল। তারপর বলল, “আমাদের হাতে সময়ই তো নেই স্যার। প্রজেক্ট লংশট বলছে আদৌ কোনদিন যদি আমরা আমাদের সবচেয়ে কাছের গ্যালাক্সিতে পৌঁছতে পাওয়ার মত রকেট আর ইন্ধন তৈরি করতে পারি, আমাদের সেখানে পৌঁছতে সময় লাগবে এক লক্ষ বছর। সেটা অর্থহীন চেষ্টা হবে স্যর। না। আমাদের কাছে তত সময় নেই। ”

প্রফেসর নারায়ণন কোন উত্তর দিলেন না। অমলের কাঁধ চাপড়ে ম্লান হেসে হাঁটতে শুরু করলেন। অমল শুকনো মুখে দাঁড়িয়ে রইল করিডরে।

ব্যাঙ্গালোরে এসে অমলের প্রায় পাঁচ বছর হয়ে গেছে। ইসরোর গবেষণা ডিভিশনে চাকরি পাওয়ার পর থেকেই সে এস্ট্রোফিজিক্স নিয়ে কাজ করে এসেছে। মহাকাশের রহস্য ছোটবেলা থেকেই তাকে টানে। কত ক্ষুদ্র আমাদের এই পৃথিবী! সৌরজগতের নটা গ্রহের একটা। আমাদের সূর্যের মত আরো কুড়ি হাজার কোটি সূর্য আছে আমাদের আকাশগঙ্গা বা মিল্কিওয়ে গ্যালাক্সিতে। আছে তাদের নিজস্ব গ্রহ মন্ডল। এরকম আরও দশ হাজার কোটি গ্যালাক্সি আছে,হয়ত বা তারও বেশি। কোটি কোটি গ্রহ,উপগ্রহ,নক্ষত্রমন্ডল,তারা। মানুষ আর কোনটুকু জানতে পেরেছে!
প্রায় পঞ্চাশ বছর ধরে মহাকাশচর্চা করেও মানুষ সবচেয়ে নিকটবর্তী গ্রহে পৌঁছতে পারেনি এখনো। সৌরজগতের বাইরের জগতের অনুসন্ধান তো চিন্তার বাইরের ব্যাপার। অমল ধীরে ধীরে বুঝতে পেরেছে যে মহাকাশ নিয়ে গবেষণায়র ব্যাপারে তারা অনেক পিছিয়ে আছে। অসম্ভব মেধাসম্পন্ন বৈজ্ঞানিক আর শিক্ষক থাকা সত্ত্বেও অনেক গবেষণা আটকে যায় শুধুমাত্র ফান্ডের অভাবে। মহাকাশ স্টেশন তৈরি করা অথবা অন্যগ্রহে পাড়ি দেওয়ার স্বপ্ন অনেক পরের কথা, পৃথিবীর কক্ষে স্যাটেলাইট পাঠানোর জন্যেই অনেক ঝক্কি ঝামেলা পোহাতে হয় তাদের। অমল প্রায় বছরতিনেক আগে থেকে চেষ্টা করে যাচ্ছে তার একটা গবেষণা প্রজেক্টের অনুদানের জন্যে। কিন্তু প্রতিবারেই তাকে হতাশ হতে হয়। আস্তে আস্তে সে বেরিয়ে এল ক্যাম্পাসের বাইরে।

অমল পার্কের কাছে এসে একটা বেঞ্চিতে বসল। ইসরোর ক্যাম্পাসটা সুন্দর। অনেক বাগান আর ফুলগাছ আছে। পার্কের জমিতে নতুন ঘাস লাগানো হয়েছে। সেদিকে তাকিয়ে রইল সে। সবুজের ছোঁয়া লেগে ধীরে ধীরে তার মনটা হালকা হয়ে গেল। অমল অনেকক্ষণ ধরে বসে রইল সেখানে। তারপর উঠে নিজের কোয়ার্টারের দিকে এগিয়ে গেল সে। নিজের ঘরে পৌঁছে দেরাজ খুলে নাসা থেকে পাঠানো নীল রঙের খামটা বের করল অমল। সে মনস্থির করে ফেলেছে।

 ৩
২০২৬,হাথ্রন,ক্যালিফোর্নিয়া,স্পেসএক্স হেডকোয়ার্টার

ক্লাস থেকে বেরিয়ে নিজের অফিসে চলে এল অয়ন। খানিকক্ষণ দরজা বন্ধ করে সে চুপ করে দাঁড়িয়ে রইল, তারপর দেরাজের দরজা খুলে বের করে আনল একটা কার্ডবোর্ডের বাক্স। আজকে ১৭ই নভেম্বর। ছাব্বিশ বছর হয়ে গেল আজ। বাবার চিঠিগুলো হাতে নিয়ে একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলল অয়ন।

সাত বছর আগে সর্সারার প্রজেক্ট ব্যার্থ হওয়ার পর আর বেশিদিন নাসাতে কাজ করতে পারেনি অয়ন। হিউস্টন ছেড়ে এখানে এসে স্পেসএক্স কোম্পানিতে ট্রেনার আর সাইন্টিস্ট হিসেবে জয়েন করেছে সে। বাবা নাসাতে আসার আগে থেকেই সর্সারার প্রজেক্টের গবেষণা শুরু করেছিলেন। ন্যানোটেকনোলজি আর পারমাণবিক বিদারণের শক্তি কে কাজে লাগিয়ে কি করে স্পেসক্রাফ্ট তৈরি করা যায়,যাতে মানুষ সৌরজগতের বাইরের জগতে অভিযান চালাতে পারে। মানুষের তৈরি কোন রকেটের ইন্ধনে আগে এই পদ্ধতি ব্যবহার করা হয়নি। সৌরজগতের বাইরে গিয়ে অভিযান করতে গেলে যত জ্বালানি দরকার হয়,পৃথিবীতে তত জ্বালানিই নেই। যদি কোনক্রমে সেই জ্বালানি তৈরিও করা যায়,হাজার হাজার বছর লেগে যাবে মানুষের সৌরজগতের সীমানা ছাড়াতে। যারা মহাকাশযানের যাত্রী হয়ে অন্য জগতে অন্বেষণ করতে যাবে,তারা জীবিতকালে কোনদিন ফিরে আসতে পারবে না এই পৃথিবীতে।

অয়নের বাবা গবেষণা করে সিদ্ধান্ত নেন যে ন্যানোটেকনোলজির মাধ্যমে যদি লেসার রশ্মিকে জ্বালানি হিসেবে ব্যবহার করা যায় তাহলে রকেটের গতিবেগ অনেকটাই বেড়ে যাবে,কিন্তু সেই গতিবেগ এতটাই বেশি হবে যে মহাকাশ যাত্রীদের নানা সমস্যার মুখোমুখি হতে হবে,স্পেস রেডিয়েশনে তাদের শরীরে সমস্যা তো হবেই,তাছাড়া রকেটের যন্ত্রপাতি খারাপ হয়ে যাওয়াও অসম্ভব নয়,তাই মাঝে মাঝে ন্যানোচিপ লেসার ইঞ্জিন বন্ধ করে দিয়ে পারমাণবিক জ্বালানি ব্যবহার করে যানকে নিয়ন্ত্রণ করতে হবে । প্রোটোটাইপ ঠিক মতন কাজ করলেও নাসার কর্তৃপক্ষের সঙ্গে তার কয়েক বছর ধরে কথা কাটাকাটি চলেছে। এত বিপজ্জনক প্রজেক্টে অভিযাত্রীদের প্রাণের ঝুঁকি তো আছেই,তার চেয়েও বড় ব্যাপার হলো এরকম প্রজেক্টের জন্যে যে বিশাল অঙ্কের টাকা দরকার,সেইজন্যে সরকারকে রাজি করা। কিন্তু শেষ পর্যন্ত নাসা তার কথা শুনেছিল। এখন থেকেই বড় পদক্ষেপ না নিলে সৌরজগতের বাইরের রহস্য যে মানুষের কাছে ধাঁধা হয়েই থাকবে,সে বিষয়ে সকলেই একমত হয়েছিল। কিন্তু কে ভেবেছিল সর্সারার অভিযানের এই পরিণতির কথা?

নাসার কাছ থেকে পাওয়া বাবার কাগজপত্রগুলো কোনদিন খুলেও দেখেনি সে। দেখার ইচ্ছেও হয়নি। বাবার সঙ্গে তার পরিচয় বলতে তার কয়েকটা পুরোনো ছবি আর ভিডিও। ২০০০ সালে যখন বাবা সর্সারার-এর দায়িত্ব নিয়ে পাড়ি দিয়েছিলেন মহাকাশে,তখন তার হাতেখড়িও হয়নি। তারপর একে একে চলে গেছিল উনিশটা বছর। মায়ের কাছ থেকেই বাবার গবেষণা আর কাজের কথা শুনেছিল,একসময় নিজে থেকেই সে উত্সাহী হয়ে উঠেছিল গভীর মহাকাশ সম্পর্কে। তারপর পড়াশুনা,স্কলারশিপ পেয়ে মার্কিন রাষ্ট্রে গিয়ে উচ্চশিক্ষা,নাসাতে যোগ দেওয়া সব কিছুতেই বাবার অনুপস্থিতিটা একরকম সয়ে গিয়েছিল তার। খালি রাতে কোনো কোনো দিন আকাশের দিকে তাকিয়ে তার মনে হত,বাবা মহাকাশের কোন প্রান্তে সর্সারার কে নিয়ে এগিয়ে যাচ্ছে নতুন কোন পৃথিবীর উদ্দেশ্যে।
বাবার কাগজপত্রগুলো উল্টেপাল্টে দেখছিল সে। এমন সময় একটা নীল রঙের খাম তার হাত থেকে পড়ে গেল। সেটা তুলে অয়ন দেখল যে সেটা প্রায় তিরিশ বছর আগেকার চিঠি,বাবার নাম আর ব্যাঙ্গালোর ইসরোর ঠিকানা লেখা আছে খামের ওপরে,কিন্তু যে পাঠিয়েছে তার কোন ঠিকানা নেই। কৌতুহলবশত খামটা খুলে ভিতরের চিঠিটা বের করল সে। চিঠিটা পড়তে পড়তে অয়নের ভুঁরু কুঁচকে গেল, মাথা দপদপ করতে লাগল। চিঠি শেষ করে সে কিছুক্ষণ স্থাণু হয়ে বসে রইল, তারপর নেট থেকে একটা নম্বর বের করে মোবাইলে ডায়াল করল।

 ৪
১৯৯৯,তিয়ানজিন,চায়না

টিপ টিপ করে বৃষ্টি হয়ে চলেছে। ল্যাম্পপোস্টের আলো যেন উজ্জ্বলতা হারিয়েছে আজ। রাস্তাঘাটে মানুষজনের আনাগোনা কমে এসেছে গভীর রাতে। সিগারেটে একটা টান দিয়ে হাতের ঘড়ির দিকে তাকালেন প্রফেসর ওয়াং। বিরক্তিতে তার ভুঁরু কুঁচকে গেছে। অনেকক্ষণ ধরে নির্দিষ্ট জায়গায় অপেক্ষা করছেন তিনি। কিন্তু এখনো কারো পাত্তা নেই।

সিগারেটে শেষ টান নিয়ে মাটিতে ফেলতেই একটা কালো গাড়ি রাস্তার মোড় থেকে এগিয়ে এল তাঁর দিকে। তার সামনে দাঁড়িয়ে পড়তেই গাড়ির দরজা খুলে গেলে। ভিতর থেকে লেদার জ্যাকেট পরা একজন মানুষ তাকে উদ্দেশ্য করে বলল, “প্রফেসর, ভিতরে উঠে আসুন।”

প্রফেসর ওয়াং বাক্যব্যয় না করে গাড়িতে উঠে বসলেন। গাড়ি ছেড়ে দিল। তিনি বিরক্তির গলায় বললেন, “মিগুয়েল,আমি এখানে প্রায় দেড়ঘন্টা ধরে অপেক্ষা করছি। তোমাদের কথার দাম না থাকতে পারে,কিন্তু আমার কাছে এখন প্রত্যেকটা মুহূর্ত অমূল্য।”

মিগুয়েল বলে লোকটা মাঝবয়সী। লম্বা চুল মাথার পিছনে টেনে বাঁধা,গালে একটা কাটা দাগ আছে। সে শান্ত স্বরে উত্তর দিল, “প্রফেসর,সরকারের নজর বাঁচিয়ে কাজ করা সোজা নয়। আপনি কি মনে করছেন সিআইএ আপনার গতিবিধি লক্ষ করছে না? একটু অসাবধান হলেই আমাদের এত বছরের পরিশ্রম এক মুহুর্তে নষ্ট হয়ে যেতে পারে।”
প্রফেসর ওয়াং চশমাটা খুলে কাঁচ মুছতে মুছতে বললেন, “আমি জানি মিগুয়েল। কিন্তু ঝুঁকি আমাদের নিতেই হবে। আর কয়েকদিনের ব্যাপার,ঝামেলাটা আমি প্রায় মিটিয়ে এনেছি। ছাড়ো ওই কথা, নন্দিনী তোমাকে কি খবর পাঠিয়েছে সেটি(SETI) থেকে?”

মিগুয়েল পকেট একটা পেজার বের করল। সেটা চালু করতে করতে বলল, “ক্রাইমিয়া আর টি 70 টেলিস্কোপ থেকে নিকটবর্তী নক্ষত্রমণ্ডলের উদ্দেশ্যে কসমিক কল বলে যে রেডিও সিগনাল নন্দিনীরা পাঠিয়েছিল,তার কোনো উত্তর তারা পায়নি। কিন্তু কয়েক বছর আগে পাঠানো একটা ন্যারো ব্যান্ড সিগনালের খুব ক্ষীণ একটা উত্তর তারা পেয়েছে…”

“কোথা থেকে?” প্রফেসর ওয়াং উত্তেজিত হয়ে প্রশ্ন করলেন।
“হাবল টেলিস্কোপে অদ্ভুৎ কয়েকটা ছবি তারা দেখতে পেয়েছিল বছর দশেক আগে। প্রায় আড়াই মিলিয়ন আলোকবর্ষ দূরে। সেই দিকে লক্ষ করেই তারা একটা ন্যারো ব্যান্ড সিগনাল পাঠিয়েছিল। সেখানে তারা একটা অদ্ভুত আলোক বিকিরণের নকশা দেখতে পাচ্ছে…”

প্রফেসর ওয়াং মিগুয়েলকে কথা শেষ করতে না দিয়ে বলে উঠলেন, “কোন নকশা মিগুয়েল? আলফা সেন্টরির কাছ থেকে আমরা যা নকশা দেখতে পেয়েছিলাম বারদুয়েক..”

“হ্যাঁ প্রফেসর, সেই একই নকশা। আলোর জ্যামিতিক নকশাগুলো একই কিন্তু এখানে কালো বিন্দুগুলো আকারে অনেক বড়।”

মিগুয়েলের হাত থেকে নন্দিনীর পাঠানো ছবির কপিগুলো হাতে নিয়ে দেখতে দেখতে প্রফেসর ওয়াংএর চোখ মুখ উদ্ভাসিত হয়ে উঠল। তিনি উত্তেজিত স্বরে বললেন, “এগুলো কী বুঝতে পেরেছ মিগুয়েল? এই দেখ, এই ছবিটা দশ বছর আগেকার। এগুলো সব পৃথক গ্যালাক্সি। আর এইবার এখনকার ছবিগুলো দেখো, এই দুটো গ্যালাক্সি এক হয়ে গেছে। দুটো গ্যালাক্সির সংযোগের আগের এই আলোর নকশাগুলো গ্র্যাভিটেশনাল ওয়েভস। কিন্তু দশ বছরে এই ঘটনা সম্ভব নয়। যদিও বা কোনো সুপারনোভা বিস্ফোরণের ফলে এরকম কিছু হয়, সেই ছবি আমরা দেখতে পাব কয়েক হাজার বছর পর। কিন্তু এখানে প্রায় লক্ষ লক্ষ বছরের দূরত্বে থাকা দুটো মহাকাশীয় ঘটনা দেখতে পাচ্ছি একই সঙ্গে আমরা। কিন্তু একটা জিনিস কমন,দুটো ছবিতেই এই কালো বিন্দুগুলো অবস্থিত।

মিগুয়েল হতভম্ব হয়ে তাকিয়ে আছে দেখে প্রফেসর ওয়াং অধৈর্য হয়ে বললেন, “তুমি বুঝতে পারছ না? কীসের টানে এই দুটো গ্যালাক্সি এক হয়ে গেল এত কম সময়ের ব্যবধানে? একটা গ্যালাক্সিতে লক্ষ কোটি তারা গ্রহ উপগ্রহ থাকে। দুটো গ্যালাক্সি এক হয়ে গেল কিন্তু একটা সংঘর্ষ হলো না কোনো তারা বা গ্রহের মধ্যে! কতটা শক্তিশালী আর সুনিয়ন্ত্রিত এই অভিকর্ষ তা বুঝতে পারছ? এ নিঃসন্দেহে ডার্ক এনার্জি মিগুয়েল। তুমি এখনো বুঝতে পারছ না ওই কালো বিন্দুগুলো কী?”

মিগুয়েল হতবাক হয়ে বলল, “কাল সেতু?”
প্রফেসর ওয়াং দু’হাতে তালি দিয়ে বললেন, “ইয়েস মিগুয়েল। টাইম ব্রিজ। এই কালো বিন্দুগুলো ডার্ক এনার্জি দিয়ে তৈরি ওয়ার্মহোল। মহাকর্ষের জোরে দুটো পৃথক গ্যালাক্সিকে এই ওয়ার্মহোল নিজের মধ্যে টেনে এনে একটা নতুন গ্যালাক্সি রচনা করেছে। একটা ওয়ার্মহোল দিয়ে যদি পুরো একটা গ্যালাক্সি এক সময় থেকে অন্য সময়ে চলে যেতে পারে,তাহলে বুঝতে পারছ কতটা বড় সেই ওয়ার্মহোল?”

মিগুয়েল হাঁ হয়ে প্রফেসর ওয়াং এর দিকে তাকিয়ে ছিল। সে এবার কিন্তু কিন্তু করে প্রশ্ন করল, “কিন্তু প্রফেসর,ডার্ক এনার্জি আর ওয়ার্মহোল কি বাস্তবে সম্ভব? আমরা এত চেষ্টা করেও ডার্ক ম্যাটার বা ডার্ক এনার্জি তৈরি করতে পারিনি।”

“আমরা বাস্তবে পারিনি বলেই যে সম্ভব নয় তা তো নয় মিগুয়েল। কোনো আলো বা বিকিরণ নির্গত না করলেই সেটা ডার্ক ম্যাটার,হয়ত তারা এমন কোনো শক্তি নির্গত করে যা সম্পর্কে আমাদের ধারণা নেই। হয়ত কেন, আমার বিশ্বাস এরকম কোন শক্তিই বেঁধে রেখেছে সারা ব্রহ্মান্ডকে। ডার্ক এনার্জি মহাকর্ষকে নিয়ন্ত্রিত করতে পারে, আলোকে বিকৃত করতে পারে। দে আর চেঞ্জিং দি ইউনিভার্স এট অল টাইম মিগুয়েল।”

প্রফেসর ওয়াংএর চোয়াল শক্ত হয়ে এল। তিনি গম্ভীর হয়ে বললেন, “অমল ঠিক বলেছিল মিগুয়েল। আলফা সেন্টরির কাছে এই নকশা দেখার প্রায় পাঁচ বছর পর আমরা আমাদের পাঠানো রেডিও ওয়েভ সিগনালের উত্তর পেয়েছিলাম। একবার,নয় বারবার। আমাদের সঙ্গে কেউ যোগাযোগ করতে চাইছে,কিন্তু পৃথিবীতে বসে আমাদের প্রযুক্তি ব্যবহার করে আমরা কিছুতেই ওদের সঙ্গে কথা বলতে পারব না। আলোর গতিবেগে চললেও তাদের সিগনাল পেতে আমাদের অনেক দেরি হয়ে যাবে। আমাদের এই সিদ্ধান্ত নিতেই হবে।”

 
২০২৬,SETI(Search for Extraterrestrial Intelligence)হেডকোয়ার্টার,ক্যালিফোর্নিয়া

“অয়ন!”
অয়ন চমকে উঠে দেখল তার সামনে এসে দাঁড়িয়েছেন এক মাঝবয়সী ভদ্রমহিলা। সে উঠে দাঁড়িয়ে অভিবাদন জানিয়ে বলল, “হ্যাঁ। আমি অয়ন।”

তার দিকে কিছুক্ষণ তাকিয়ে ভদ্রমহিলা বললেন, “আমি নন্দিনী। এস।”
নন্দিনীর পিছনে হাঁটতে হাঁটতে অয়নের মনে নানা প্রশ্ন খেলা করছিল। গত দুদিনে এমন অনেক কথা সে জানতে পেরেছে যা সম্পর্কে তার আগে কোন ধারনাই ছিল না। SETI সম্পর্কে সে আগে জানত ঠিকই কিন্তু তার বাবার কাজের সঙ্গে যে ভিন্নগ্রহী গবেষণার যে কোন যোগাযোগ আছে, সেসম্পর্কে সে কিছু জানতে পারেনি কোনদিন।
সিকিউরিটি পেরিয়ে একটা শীতাতনিয়ন্ত্রিত ঘরে এসে বসলো তারা। নন্দিনী অয়নের দিকে তাকিয়ে বলল, “তুমি নাসাতে সর্সারার প্রজেক্টে ছিলে?”

অয়ন ঘাড় নাড়ল। নন্দিনী কৌতুহলী হয়ে প্রশ্ন করলেন, “কোন টিমে?”
“ফিউয়েল প্রপালশান এন্ড ডেটা সিমুলেশন”
নন্দিনী চেয়ারে হেলান দিয়ে বসে প্রশ্ন করলেন, “তোমার ফোন পেয়ে আমি সত্যি অবাক হয়েছিলাম অয়ন। তুমি যে অমলের মতনই মহাকাশ নিয়ে গবেষণা করছ, এটা কাকতালীয় নিশ্চয়ই নয়। জিনের একটা ব্যাপার থাকেই। কী জানতে চাও তুমি?”

অয়ন বলল, “আমি বাবার কাজ সম্পর্কে যতটা জানি,সেটা তার নাসার গবেষণা জড়িত। একটা বেসরকারী সংগঠনের সঙ্গে যে তার যোগাযোগ ছিল আমার কোনো ধারণা ছিল না। আর চিঠিতে লেখা যোগাযোগের নামটা তো আপনার। আপনি তো SETI তে কাজ করেন। এটা সরকারী সংগঠন বলেই জানি। আমার সব গোলমাল হয়ে যাচ্ছে…”

নন্দিনী ঠান্ডা গলায় বললেন, “আমি এখন আর এখানে কাজ করি না অয়ন, আমি স্বাধীনভাবে কয়েকটা প্রজেক্টে এদের সাহায্য করি মাত্র। তোমার অনেক কিছুই জানার কথা নয়। আমি তোমাকে বলতামও না, যদি তুমি স্পেস সায়েন্টিস্ট না হয়ে শুধুমাত্র ওর ছেলে হতে। কিন্তু এই জগতের মানুষ বলেই হয়ত তোমার জানা দরকার। কিন্তু তোমাকে আমায় কথা দিতে হবে, তুমি কাউকেই এই কথা বলতে পারবে না।”

অয়ন মাথা নাড়ল। নন্দিনী বললেন, “নব্বই এর দশকে যখন আমি SETI তে কাজ করতে শুরু করি,আমাদের অনেক কাজেই নাসার সাহায্য নিতে হত। অনেক সময় আমরা নাসার জনসন স্পেস সেন্টার থেকেই কাজ করতাম। বহু লোকের সঙ্গেই আমাদের চেনা ছিল। প্রফেসর ওয়াং বলে একজন আমার মেন্টরই হয়ে উঠেছিলেন সেই সময়। তখন হাবল টেলিস্কোপে নতুন নতুন গ্রহ,নক্ষত্র,গ্যালাক্সির ছবি উঠছে রোজ। নানান ফ্রিকোয়েন্সিতে ন্যারো ব্যান্ড সিগনাল পাঠিয়ে দেখা হত যদি কোনদিন কোনো সিগনালের উত্তর আসে।

এমন সময় নাসাতে Sorcercer বলে একটা প্রজেক্ট লঞ্চ করা হল ১৯৯২ সালে। লক্ষ্য, মানুষকে সৌরজগতের বাইরে পাঠানো। প্রফেসর ওয়াং সেই প্রজেক্টের প্রধান বৈজ্ঞানিক ছিলেন। কিন্তু কিছুদিন পরেই তাঁর সঙ্গে মতের পার্থক্য শুরু হয় নাসার ম্যানেজমেন্টের।”

“কেন?” অয়ন প্রশ্ন করল।
“সেটা বলা কঠিন। তিনি ন্যানোটেকনোলজি নিয়ে কাজ করছিলেন। প্রফেসর ওয়াং নাসা ম্যানেজমেন্টকে বোঝানোর চেষ্টা করেন যে যত তাড়াতাড়ি সম্ভব বেশ কয়েক হাজার ছোট ন্যানো প্রোব বানিয়ে রওনা করে দিতে। তার সঙ্গে পুরোদস্তুর ভাবে কাজ করা হোক ওয়ার্প ড্রাইভ নিয়ে, যাতে মানুষ আলোর গতিকে ছাড়িয়ে যেতে পারে। তিনি আগেই বেশ কয়েকটা অভিনব প্রোটোটাইপ মডেল তৈরি করেছেন। তিনি যুক্তি দিলেন যে এত ধীর গতিতে গবেষণা আর রকেট লঞ্চ চলতে থাকলে মানুষ কোনদিনই পৃথিবীর বাইরে প্রাণের সন্ধান খুঁজে পাবে না। একটা প্রজেক্টে কোটি কোটি ডলার খরচ হওয়ার প্রধান কারণ নতুন প্রযুক্তি ব্যবহার করতে না চাওয়া। অতিরিক্ত নিরাপত্তার জন্যেই সময় আর পয়সা যত যাচ্ছে, তত কাজ হচ্ছে না। তার সঙ্গে নাসার ঠোকাঠুকি ক্রমেই বাড়তে লাগল। শেষ পর্যন্ত তিনি সেখান থেকে ইস্তফা দিয়ে দেন। সর্সারার প্রজেক্টের সঙ্গেও তার কোন সম্পর্ক থাকে না।”

“তারপর?”
“প্রফেসর ওয়াং পৃথিবীর নানা বৈজ্ঞানিককে নিয়ে একটা বেসরকারী স্পেস গবেষণা সংগঠন আরম্ভ করেন। ভালো ভালো বৈজ্ঞানিক, মেধাবী ছাত্রদের নিয়ে শুরু করেন গবেষণা। পৃথিবীর নানা প্রান্তে নানা স্পেস এজেন্সির তার সঙ্গে যোগাযোগ করতে শুরু করে। কিন্তু আদতে তিনি বৈজ্ঞানিক। তাঁর মাথায় তখন ঘুরছে কী করে সৌরজগতের বাইরে গিয়ে প্রাণের সন্ধান করা যায়। কয়েকবছর পরেই তিনি আড়ালে চলে গিয়ে কয়েকজন সহকারীকে নিয়ে গোপনে একটা গবেষণা শুরু করেন।”
“কী গবেষণা?”

“সেটা আমিও ঠিক জানি না, তবে আমার মনে হয় তিনি ওয়ার্প শাটল পাঠিয়ে গভীর মহাকাশে অনুসন্ধান করতে চাইছিলেন এলিয়েন ইন্টেলিজেন্স না ভিন্নগ্রহীদের সঙ্গে।”
অয়ন ভুঁরু কুঁচকে বলল, “এলিয়েন? আপনার এরকম মনে হয় কেন?”
“কারণ তিনি নাসা আর SETI থেকে মহাকাশে পাঠানো রেডিও সিগনাল ইন্টারসেপ্ট করতে চেষ্টা করছিলেন। তার সঙ্গে সবরকম সম্পর্ক চুকিয়ে ফেলে বেশিরভাগ সরকারী সংগঠন। রটে যায় প্রফেসর ওয়াং রাশিয়ার সঙ্গে চক্রান্ত করে মারাত্মক কোন অস্ত্র বানানোর পরিকল্পনা করছেন,যাতে পৃথিবীর যাবতীয় ইনফরমেশন সিস্টেম মুহুর্তে হ্যাক করে ফেলা যায়। প্রফেসর ওয়াং এর খোঁজ শুরু করে সিআইএ আর এফবিআই এর লোকেরা, কিন্তু তিনি ততদিনে নিরুদ্দেশ হয়ে গেছেন।”

“কিন্তু আপনার সঙ্গে তার যোগাযোগ ছিল?”
নন্দিনী মৃদু হেসে বলেন, “হ্যাঁ। কাজটা যদিও বিপজ্জনক ছিল। আমি প্রফেসরকে ভালো করেই চিনতাম। আমার বিশ্বাস ছিল তিনি লুকিয়ে গবেষণা করে যাচ্ছেন মানুষের ভবিষ্যতের খাতিরে। মহাকাশ থেকে পাঠানো বিশেষ কোনো সিগনাল বা ছবি পেলে আমি তাকে জানতাম। এমন সময় তিনি আমাকে বলেন অমলের কথা। তার সঙ্গে তিনি যোগাযোগ করতে চান। আমিই অমলের সঙ্গে তার যোগাযোগ করিয়ে দি।”
“তখন তো বাবা নাসায় কাজ করছে।”

“না,নাসার কাছ থেকে অফার পাওয়া সত্ত্বেও সে মনস্থির করে উঠতে পারেনি। তখন সে কাজ করছে ইসরোতে। অমলও তখন ন্যানোটেকনোলজি আর নিউক্লিয়ার পাল্স প্রপলশন নিয়ে কাজ করছে, কিন্তু কোথাও না কোথাও অমল মনে মনে জানত যে এই প্রযুক্তি ব্যবহার করতে যে বিশাল অর্থের প্রযোজন পড়বে তাতে একটা অভিযান সফল না হলে এই প্রযুক্তির ভবিষ্যত নিয়ে বিশাল একটা প্রশ্নচিহ্ন লেগে যাবে। মহাকাশের রহস্য আমরা কোনদিনই জানতে পারব না। আর একটা উপায় আছে, কিন্তু বাস্তবে সেটা সম্ভব কি না, সেটা কেউই হাতে কলমে করে দেখাতে পারেনি।”

“কোন উপায়ের কথা বলছেন?”
“টাইম ব্রিজ। তুমি নিশ্চয়ই দেশকাল আর আইনস্টাইন রোসেন ব্রিজের সম্পর্কে জানো!”
অয়ন মাথা নাড়ল। কোয়ান্টাম ফিজিক্সে দেশকাল একটা গোড়ার ধারনা, কিন্তু অনেকেই সেটা বুঝতে পারে না। খুব সহজ করে বলতে গেলে আমরা স্পেস বলতে কোন অবস্থানের বিন্দুকেই বুঝি, কিন্তু যেকোন দূরত্ব অতিক্রম করতে গেলেই একটা সময় লাগে। সেটা হেঁটে গেলে একরকম, গাড়িতে করে গেলে একরকম। আমাদের যদি কোনো দূরত্ব কোনদিন অতিক্রম করতেই না হয়,সময়ের কোন দরকারও পড়বে না। কিন্তু যদি আমরা একটা জায়গা থেকে অন্য জায়গায় যেতে চাই, আমাদের সময়কেও অতিক্রম করতে হয় অবস্থানের সঙ্গে। পৃথিবী আসলে এতটাই ছোট যে দূরত্বকে আমরা আমাদের নিজেদের মত ঘড়ির সময় দিয়ে মেপে দিয়েছি। কিন্তু মহাকাশে যে কোনো দুটো বিন্দু এতটাই দূরত্ব থাকে যে প্রতিটা বিন্দুর সঙ্গে একটা সময় জড়িয়ে থাকে। হয়ত মহাকাশে পৃথিবী আর অন্য কোনো গ্যালাক্সির গ্রহ কোটি কোটি বছরের সময়ের অন্তরালে আছে। সময় এখানে পুরোটাই আপেক্ষিক। সে চোখ ছোট করে নন্দিনীকে বলল, “আপনি কি ওয়ার্মহোলের কথা বলছেন?”

নন্দিনী বললেন, “ঠিক বলেছ। যদি দেশকালের মধ্যে একটা সুড়ঙ্গ তৈরি করা যায় হয়ত আমরা অনেক কম সময়ে গভীর মহাকাশে এক জায়গা থেকে অন্য জায়গায় চলে যেতে পারি। অমলের বিশ্বাস ছিল সে সত্যিকারের একটা ওয়ার্মহোল তৈরি করতে পারবে সময় পেলে। কিন্তু তার দুর্ভাগ্য,সেই গবেষণা করার জন্যে কোনো রকম সাহায্যই সে পায়নি।”

অয়ন চুপ করে শুনছিল। সে বলল, “তারপর?”
“প্রফেসর ওয়াং অমলের কাজের সম্পর্কে জানতেন। একটা বিশেষ উদ্দেশ্যে তিনি অমলের সঙ্গে দেখা করেন। দুজনে একে অপরের সঙ্গে কথা বলেই বুঝতে পারে যে তারা একই স্বপ্নের পিছনে দৌড়চ্ছে। এর পরেই অমল ইসরো ছেড়ে নাসায় কাজ করতে শুরু করে, কিন্তু আসলে তারা দুজনেই কয়েকটা গোপন গবেষণার অংশীদার ছিল বলে আমার বিশ্বাস।

“কিন্তু বাবা নাসায় কাজ করার সময় অন্য কোন গবেষণা চালাবে কী করে? সর্সারার অভিযানের মত দায়িত্বপূর্ণ কাজে সেটা কি সম্ভব?” অয়ন অবিশ্বাসের কন্ঠে বলল।

নন্দিনী তার দিকে খানিকক্ষণ তাকিয়ে থাকলেন। তারপর আস্তে আস্তে বললেন, “বাকিটা তুমি প্রফেসর ওয়াং এর কাছেই শুনো। তোমাকে ওঁর ঠিকানা দিচ্ছি, উনি হয়ত তোমার জন্যেই অপেক্ষা করে আছেন অনেক বছর ধরে।”
অয়ন হতভম্বের মত তার দিকে তাকিয়ে রইল।


২০০০,প্রিন্সেপ ঘাট,কলকাতা,ভারতবর্ষ
বিকেলের পড়ন্ত আলোতে অপলক দৃষ্টিতে গঙ্গার দিকে তাকিয়ে ছিল অমল। দিনের শেষে পাখির ঝাঁক ঘরে ফেরার পথে। অনেক,অনেক বছর পর এই শহরে এসেছে সে। হয়ত বা শেষবারের জন্যে।
পিছনে একটা শব্দ হতেই অমল পিছনে ফিরল। প্রফেসর ওয়াং নিঃশব্দে দাঁড়িয়ে আছেন। মুখে একটা হাসি টেনে এনে অমল বল, “কেউ ফলো করেনি তো?”
প্রফেসর হেসে মাথা নাড়লেন। তারপর বললেন, “ছেলেকে দেখলে? কত বয়স হল?”
অমল চোখ থেকে চশমাটা নামিয়ে রেখে বলল, “তিন।”
“অমল, তুমি নিশ্চিত এছাড়া আর কোনো উপায় নেই? যদি আমরা ব্যার্থ হই, সব শেষ হয়ে যাবে। আমাদের সারাজীবনের গবেষণা, তোমার স্যাক্রিফাইস, কোনো কিছুর মূল্য থাকবে না।”
“আর কোনো উপায় নেই প্রফেসর। একমাস পরে লঞ্চ। নাসার কথামত আমার কাছে মাত্র পাঁচ বছর সময় আছে সৌরজগতের সীমানা ছেড়ে বেরিয়ে যাওয়ার পর। যদি আদৌ সবকিছু ঠিকঠাক ভাবে হয়,সর্সারার ফিরে আসতে পঁয়তাল্লিশ বছরেরও বেশি লেগে যাবে পৃথিবীর সময়ের হিসেবে। আমাদের অভিজ্ঞতার কথা হয়ত মানুষকে খানিকটা উদ্বুদ্ধ করবে কিন্তু বাস্তবে মহাকাশচর্চায় মানুষ যেখানে ছিল সেখানেই থেকে যাবে।”
“কিন্তু অমল, আলোর চেয়ে বেশি গতির কথা ওয়ার্প ড্রাইভে আছে। ধর কয়েক বছরের মধ্যে আমরা জেনে ফেললাম সেই রহস্য…”
অমল প্রফেসর ওয়াং এর কাঁধে হাত রেখে বলল, “প্রফেসর আপনি তো জানেন, ওয়ার্প ড্রাইভ বানানোর জন্যে দেশকালকে বাঁকাতে হয়। আসলে আলোর কোনো গতি নেই, কোনো এক অদৃশ্য শক্তি বাস্তবে সারা মহাকাশের দেশকালকে পরিচালনা করছে। অনন্ত গতিতে বয়ে চলেছে এই মহাবিশ্ব। অনেকটা সমুদ্রের ঢেউয়ের মত বয়ে চলেছে অনন্ত সময়, ওয়ার্প ড্রাইভ তাকে পরিচালনা করে এগিয়ে যাওয়ার একটা পথ। কিন্তু সেটা জানতে হলে আমাদের নেগেটিভ এনার্জি তৈরি করতে হবে। হয়ত সম্ভব, কিন্তু আমাদের হাতে যে সময় নেই প্রফেসর!”
“অমল, এটা তুমি কর না। তোমার পরিবার আছে। ছেলে আছে। মিগুয়েলকে এই দায়িত্বটা নিতে দাও। সে একা। সে পারবে।”
অমল আকাশের দিকে তাকিয়ে বলল, “মিগুয়েল যে দায়িত্বটা নিয়েছে সেটা কম গুরুত্বপূর্ণ নয় প্রফেসর। ভুলে যাবেন না, সে একসঙ্গে বায়োকেমিস্ট এবং নিউরোবায়োলজিস্ট। তার ভরসাতেই আমরা এই সিদ্ধান্ত নিতে পেরেছি। এটা রিলে রেস প্রফেসর, সকলকে নিজের কাজটা ঠিক করে করতে হবে। অনেকটা পথ এখনো বাকি আছে আমাদের সামনে।”
প্রফেসর ওয়াং ইতস্তত করে বললেন, “কিন্তু অমল…”
অমল তাঁকে কথা বলার সুযোগ না দিয়ে জড়িয়ে ধরল। তারপর গঙ্গার জলস্রোতের দিকে তাকিয়ে বলল, “দেখা হবে..”


২০২৭,বার্সেলোনা অটোনমা ইউনিভার্সিটি,বার্সেলোনা,স্পেইন

“তুমি অয়ন?” অয়ন চমকে উঠে দেখল তার সামনে এসে দাঁড়িয়েছে লম্বা বয়স্ক একজন মানুষ। মাথার চুল পিছনে পনিটেল করে বাঁধা, গালে একটা কাটা দাগ। অয়ন মাথা নাড়তেই লোকটা তার হাত ধরে বলল, “আমি প্রফেসর মিগুয়েল। ইউ লুক লাইক ইওর ফাদার। এস, প্রফেসর ওয়াং তোমার জন্য অপেক্ষা করছেন।”

বার্সেলোনা অটোনমা ইউনিভার্সিটিতে যে এতবড় গবেষণা পরিকাঠামো আছে অয়নের সেসম্পর্কে কোনো ধারণা ছিল না। সে গ্র্যাজুয়েশন অব্দি ভারতে পড়াশুনা করেছে। সেও অনেক বছর হয়ে গেল। আজকাল বেশিরভাগ ভালো বিশ্ববিদ্যালয়ে নানা ধরণের গবেষণা করার ব্যবস্থা থাকে। পৃথিবীর নানান সংগঠনের সঙ্গে চুক্তি করা থাকে বলে গবেষণার পাশাপাশি ছাত্ররা অর্থ উপার্জন করতে পারে বিশ্ববিদ্যালয়ের ক্যাম্পাস থেকেই। প্রফেসর ওয়াং যে তার পুরো গবেষণা ইউনিটকে বার্সেলোনাতে নিয়ে এসেছেন, সেই সম্পর্কে নন্দিনী তাকে জানিয়েছিল। পুরোনো ঝামেলা কাটিয়ে উঠে তার কম্পানি আজকাল নানান দেশের মহাকাশ সংস্থাদের সঙ্গে একজোট হয়ে গবেষণা করছে অত্যাধুনিক প্রযুক্তি নিয়ে। তার কথা মত প্রফেসর মিগুয়েলের সঙ্গে যোগাযোগ করেছিল সে। কিছুদিন পরেই এখানে আসার নিমন্ত্রণ পায় সে।

একটা লম্বা প্যাসেজ পার হয়ে, ফিজিক্স ডিপার্টমেন্টের ঝাঁ চকচকে বাড়ির পাশ দিয়ে তারা চলে এল বায়োকেমিস্ট্রি বিভাগে। সামনের ঘরে তার জন্যে দাঁড়িয়েছিলেন প্রফেসর ওয়াং। বয়সের দরুন তাঁর চেহারা একটু খারাপ হয়ে গেলেও হাসিটা একইরকম আছে। তাকে বুকে জড়িয়ে ধরে প্রফেসর ওয়াং আর্দ্রকন্ঠে বললেন, “ওয়েলকম মাই সন,ওয়েলকম।”

প্রফেসর ওয়াং আর মিগুয়েলের সঙ্গে মিনিট দশেক কথা বলেই অয়নের প্রাথমিক দ্বিধাভাবটা চলে গেল। অয়ন বুঝতে পারল, তাকে দেখে নিজের অজান্তেই বাবার কথা মনে পড়ে যাচ্ছে এঁদের। প্রফেসর ওয়াং তো কয়েকবার তাকে ভুল করে “অমল” বলে ডেকেই ফেললেন। কিছুক্ষণ কথা বলার পর প্রফেসর ওয়াং অয়নকে বললেন, “তোমার বাবার কাজের সম্পর্কে তুমি কী জানো অয়ন?”

অয়ন দুজনের দিকে তাকিয়ে বলল, “আমি নন্দিনীর কাছে শুধু এইটুকুই জেনেছি যে বাবা আপনাদের সঙ্গে একটা গোপন গবেষণায় জড়িয়ে ছিলেন। কিন্তু এর চেয়ে বেশি আমি আর কিছুই জানি না।”

প্রফেসর ওয়াং চেয়ার ছেড়ে উঠে দাঁড়ালেন। তারপর শূন্যে দৃষ্টি রেখে বললেন, “ইউ ডিজার্ভ টু নো এভরিথিং অয়ন। তোমার বাবা যা স্বপ্ন দেখেছিল, সেই স্বপ্নের জন্যে যে কতটা ত্যাগ স্বীকার করেছে, সেই কথা আমরা কয়েকজন ছাড়া কেউই জানে না। জানানোর উপায়ও ছিল না।”

অয়ন কোন কথা না বলে তাঁর দিকে জিজ্ঞাসু দৃষ্টিতে তাকিয়ে রইল। নিজেকে সংযত রাখলেও তার মনে তোলপাড় চলছে। একগাদা প্রশ্ন ভিড় করে আছে সেখানে। বাবার জগৎ সম্পর্কে যে সে প্রায় কিছুই জানত না,সেই বোধটা তাকে কুরে কুরে খাচ্ছে কয়েক মাস ধরে।

প্রফেসর ওয়াং তার চোখে চোখ রেখে বললেন, “তুমি জানো সর্সারার প্রজেক্টের উদ্দেশ্য কী ছিল?”
“আন্তর্নক্ষত্র অঞ্চলে মানুষকে পাঠিয়ে গভীর মহাকাশ সম্পর্কে তথ্য সংগ্রহ করা। সৌরজগতের বাইরে ভয়েজার বা হরাইজনের মতন যান গেছে ঠিকই কিন্তু মানুষ নিজে এর আগে এই সীমানা ছাড়ায়নি। সর্সারার প্রজেক্টের মাধ্যমে নাসা চেষ্টা করেছিল যাতে অন্তত কয়েকজন মানুষ সেই কাজ করতে পারে।”

“কিন্তু তারপর? কতদিন তাদের থাকার কথা ছিল গভীর মহাকাশে?”
অয়ন বলল, “সেটা আমি ঠিক জানি না। আমাদের জানানো হয়েছিল সেখানে একটা নির্ধারিত সময় কাটানোর পর সর্সারার এর সঙ্গে যোগাযোগ করে তাকে ফিরে আসতে বলা হবে।”

প্রফেসর ওয়াং বললেন, “পাঁচ বছর অয়ন। পাঁচ বছর সময় ছিল অমলের কাছে। তুমি হয়ত জানো না, এই প্রজেক্ট সৌরজগতের বাইরে মানুষকে পাঠানোর উদ্দেশ্যে ছিল না, অমলের তৈরি করা ন্যানোটেক রকেট আর নিউক্লিয়ার পাল্স প্রপলশন সেখানে ঠিক করে কাজ করছে কি না, সেটা যাচাই করাই আসল উদ্দেশ্য ছিল তাদের।”
অয়ন মাথা নেড়ে বলল, “না না!তা হতে পারে না। তাহলে তো আগেই সেই টেস্ট করা যেত মহাকাশে রকেট পাঠিয়ে….”

“না,অয়ন। যেত না। তুমি ফিউয়েল প্রপলশান এ কাজ করেছ,তুমি নিজেই জানো কতটা সময় আর অর্থ ব্যয় হয় এরকম একটা ফিউয়েল ইঞ্জিন তৈরি করতে। কেমিকাল জ্বালানির রকেটে সেটা সম্ভব। যতটা অর্থ ব্যয় করে সর্সারার তৈরি করা হয়েছিল, একবার ব্যার্থ হলে এই প্রযুক্তি চিরকালের মত বর্জন করতে হত। আমিই অমলকে নাসাতে জয়েন করতে বলেছিলাম। আমি একসময় নিজে এই নিয়ে অনেক কাজ করেছি নাসাতে,কিন্তু অমল আমার গবেষণাকে যেভাবে এগিয়ে নিয়ে গেছে সেটা আমি নিজে কোনদিনই পারতাম না। সে ন্যানোটেকনোলজির সঙ্গে নিউক্লিয়ার জ্বালানির যেভাবে সংযোগ ঘটিয়েছে,আমার মনে হয় আজও কেউ সেটা পারবে না। অমল নিজে এই ফিউয়েল প্রপালশনের আবিষ্কর্তা বলেই তাকে সর্সারার এ রাখতে বাধ্য হয়েছিল সকলে,যাতে ইঞ্জিনে কোনো ত্রুটি হলে সেটা সে মেরামত করতে পারে।”

“কিন্তু…”
“অমলের প্ল্যানমাফিক সৌরজগতের গন্ডির ভিতরে সে আশি শতাংশ ন্যানোলেসার ব্যবহার করে রকেট চালাবে, নিউক্লিয়ার ফিউয়েল ব্যবহার করবে সৌরজগত থেকে বেরোবার পর। নিউক্লিয়ার ফিউয়েল প্রপালশানএ যতটা গতিবেগ অর্জন করা যাবে, তাতে অনেক বেশি দূরত্ব অতিক্রম করবে তারা। কিন্তু পৃথিবীর সময়ের নিয়মমাফিক যদি সে পাঁচ বছর সেই গতিতে মহাকাশে থাকত,সেই সময়ে আসলে পৃথিবীতে কয়েকশো বছর কেটে যেত,হয়ত তারও বেশি।”

অয়ন মুহ্যমান হয়ে বসে রইল। তারপর আস্তে আস্তে বলল, “টাইম ডিলেশান…কিন্তু তাহলে এরকম সিদ্ধান্ত নেওয়ার কারণ কী? পাঁচজন অভিযাত্রীর জীবন….”

প্রফেসর ওয়াং নিস্তব্ধতা ভেদ করে বললেন, “পাঁচজন নয় অয়ন। শুধু অমল। কেউ যায়নি তার সঙ্গে। যারা এই অভিযানের কথা জানত তারা সকলেই বুঝেছিল যে অমল কোনদিনই ফিরবে না। সে নিজেও এই কথা জানত। তার কথাতেই এই মিথ্যে রটানো হয়েছিল, কয়েকজন নকল অভিযাত্রীর প্রোফাইল তৈরি করে, তাদের আওয়াজ রেকর্ড করে সকলকে বিশ্বাস করানো হয়েছিল যে অমল একা নেই, তার সঙ্গে আরো চারজন আছে। অমল স্বেচ্ছায় মহাকাশে চিরনির্বাসন নিয়েছিল।”

অয়নের চোখ থেকে কখন যেন জল গড়াতে শুরু করেছে। সে শার্টের আস্তিনে চোখ মুছে ধরা গলায় বলল, “বাবা …বাবা জানত? সব জানা সত্ত্বেও….”

“হ্যাঁ অয়ন। সব জেনেই সে এই সিদ্ধান্ত নিয়েছিল। তার বাড়ি, আত্মীয়, ছেলে সবাইকে ছেড়ে অনন্তে পাড়ি দিয়েছিল অজানার রহস্য জানতে।”

অয়ন একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলল, “কিন্তু কী লাভ হল এতে ডক্টর? অনিবার্য মৃত্যর পথে এগিয়ে গিয়েও সর্সারার চিরকালের মত হারিয়ে গেল মহাকাশে। বিস্ফোরণের পর আমরা বহু চেষ্টা করেও তার সঙ্গে যোগাযোগ করতে পারিনি…”

প্রফেসর ওয়াং অয়নের কাঁধে হাত রেখে বললেন, “সর্সারার এ কোনরকম বিস্ফোরণ হয়নি অয়ন। অমল ইচ্ছে করেই পৃথিবীর সঙ্গে যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন করে দিয়েছিল।”

“কী বলছেন আপনি? বাবা এমন কেন করবে?” অয়ন উত্তেজিত হয়ে বলল।
“কারণ এই প্ল্যান আমরা সকলে একসঙ্গেই করেছিলাম। নাসার সাহায্য না নিলে এই অভিযান আমরা কোনদিনই করতে পারতাম না। অথচ তাদের কথামত চলতে হলে আমাদের উদ্দেশ্য সফল হত না।”

“কী উদ্দেশ্য?”
প্রফেসর ওয়াং একটা চেয়ার টেনে বসলেন। তারপর বললেন, “তুমি এলিয়েন ইন্টেলিজেন্স সম্পর্কে কী জানো অয়ন?”

“তেমন কিছুই নয়, এইটুকুই জানি যে এত বছর ধরে মহাকাশে নানান কম্পাঙ্কের বেতার তরঙ্গ পাঠিয়েও আমরা সেরকম কোনো উত্তর পাইনি। যতদুর মনে হয় “ফার্মি প্যারাডক্স” ঠিকই বলেছিল। হাজার হাজার কোটি গ্যালাক্সিতে যদি একাংশেও প্রাণের সঞ্চার হয়ে থাকে,আর তাদের মধ্যে অন্তত কয়েকজন প্রজাতিও প্রযুক্তিতে এগিয়ে থাকে আমাদের চেয়ে তাহলে কোন না কোন ভাবে তারা আমাদের সঙ্গে দেখা করত, নাহয় তাদের যান দেখতে পাওয়া যেত মহাকাশে। হাবল টেলিস্কোপের মাধ্যমে এখন লক্ষ লক্ষ আলোকবর্ষ দুরের ছবিও পাওয়া যায়। যতদুর মনে হয় পৃথিবী ছাড়া ব্রহ্মাণ্ডে আর কোথাও প্রাণীজগত নেই।”

অনেকক্ষণ পর প্রফেসর ওয়াং-এর মুখে হাসি দেখতে পেল অয়ন। তিনি বললেন, “কিন্তু অয়ন, তুমি এরকম ভাবছ কেন যে আমরা বিজ্ঞানকে যেভাবে দেখি, ভিনগ্রহীরাও সেইভাবেই দেখবে, রেডিও ফ্রিকোয়েন্সিতে আমাদের সিগনাল পাঠাবে, আমাদের মত স্পেসশাটল-এ মহাকাশচারণ করবে! হয়ত তাদের শরীর, তাদের প্রযুক্তি একেবারে অন্যরকম, যা সম্পর্কে আমাদের কোন ধারনাই নেই! হয়ত তাদের শরীরের উপাদান, তাদের ব্যবহৃত শক্তি আমাদের জ্ঞানের পরিধির বাইরে! আর সেইজন্যেই হয়ত তাদের সঙ্গে আমাদের যোগাযোগ তৈরি হয়নি।”

অয়ন এবার অস্ফুটে বলে উঠল, “আপনি ডার্ক এনার্জির কথা বলছেন? আপনি বলছেন পৃথিবীর বাইরের জীবরা ডার্ক্ম্যাটারে তৈরি হতে পারে? কিন্তু …বাস্তবে সেটা কী করে সম্ভব প্রফেসর?”

প্রফেসর ওয়াং উত্তেজিত হয়ে বলে উঠলেন, “এইখানেই তো আমরা মাত খেয়েছি অয়ন। এত বছর ধরে স্পেস গবেষণা করলেও মানুষের বিশ্বাস করতে আত্মসম্মানে লাগে যে যতটা আমরা জানি, তার চেয়ে অনেক বেশি জিনিস জানি না। যতটা আমরা জানতে পেরেছি, সেই দৃশ্যমান ব্রহ্মাণ্ডের ব্যাসই হল বিরানব্বই বিলিয়ান আলোকবর্ষ। তার বাইরে তো আমরা কল্পনাও করতে পারি না। সকলেই জানে অয়ন যে মহাকাশের সীমনা আরো ছড়াচ্ছে। কোন একটা অদৃশ্য শক্তি চালিত করছে কোটি কোটি গ্যালাক্সি, গ্রহ, সূর্য, উপগ্রহকে…প্রতি মুহুর্তে কোথাও একটা সৌরজগত তৈরি হচ্ছে, কোথাও হয়ত বা মহাবিস্ফোরণ হয়ে তৈরি হচ্ছে অন্য ইউনিভার্স। এই সবই ডার্ক এনার্জির জোরে। ডার্ক ম্যাটার আমাদের চেনা কোন চেহারার শক্তি বিকীরণ করে না। একমাত্র গ্র্যাভিটির সঙ্গে ডার্ক এনার্জির একটা যোগাযোগ আছে। আর তার ফলে তারা আলোকে চালনা করতে পারে।”

অয়ন ঘামতে শুরু করেছে। সে বলল, “আমার সব গোলমাল হয়ে যাচ্ছে প্রফেসর। আমি কিচ্ছু বুঝতে পারছি না….”
প্রফেসর ওয়াং মিগুয়েলের দিকে তাকালেন। সে এবার বলল, “তোমাকে খুব সংক্ষেপে ব্যাপারটা বলছি অয়ন। আমাদের সবচেয়ে কাছের তারামণ্ডল প্রক্সিমা সেন্টরি স্টেলার সিস্টেমে তিনটে সূর্য আছে। আলফা সেন্টরি বি সূর্যের সৌরজগতে কোন গ্রহ না থাকলেও সেখান থেকে আমরা অনেকদিন ধরে একটা আলোর নকশা লক্ষ করছিলাম। আমাদের দিক থেকে বেতারসঙ্কেত পৌঁছনোর সঙ্গে সঙ্গেই সেই আলোর নকশা দেখতে পাওয়া যায়। প্রায় তিরিশ বছর ধরে এই একই ঘটনা লক্ষ করেছি আমরা। এই একই নকশা দেখতে পেয়েছি আমরা মহাকাশের অন্যান্য জায়গা থেকেও। প্রফেসর ওয়াং এর ধারণা এই নকশাগুলো আসলে মহাকর্ষ তরঙ্গ। কোন একটা বিশেষ ডার্ক এনার্জি আলোকে আকর্ষিত করে এই নকশা তৈরি করে আমাদের কিছু জানাতে চাইছে।

“প্রক্সিমা সেন্টরি তে মানুষের সশরীরে পৌঁছনোর কোনো সম্ভাবনাই ছিল না তিরিশ বছর আগে। এখনো নেই। এই রহস্যের সমাধানের জন্যে দরকার দিনের পর দিন এই এনার্জি ফর্মের সঙ্গে কথা চালিয়ে যাওয়ার। কিন্তু তাহলে প্রক্সিমা সেন্টরিতে একটা যান পাঠাতে হয়। সেটা অবাস্তব। নাসা কিংবা অন্য কোনো দেশের কোনো মহাকাশ দফতর এ-রকম কোন অভিযানে সায় দেবে না।

কিন্তু অমল ব্যাপারটার গুরুত্ব বুঝতে পেরেছিল। সে আমাদের প্রস্তাব দেয় যে সে একাই সর্সারার নিয়ে এগিয়ে যাবে প্রক্সিমা সেন্টরিতে আর সেখানে থেকে সিগনাল পাঠিয়ে যোগাযোগ করার চেষ্টা করবে সেই এনার্জি ফর্মের সঙ্গে, সে তারা এলিয়েনই হোক বা অন্য কিছুই হোক! কিন্তু নাসার সঙ্গে যোগাযোগ রাখলে এই কাজ করা অসম্ভব। অতএব এই অভিযান সেই অর্থে আইন মেনে করা হবে না। অমল তখন সিদ্ধান্ত নেয়, সৌরজগতের সীমানা ছাড়িয়ে গেলেই সে পৃথিবীর সঙ্গে সমস্ত যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন করে দেবে। আমরা তাকে অনেক বুঝিয়েছিলাম এই পাগলামি না করতে। কিন্তু ছেলেটা কারো কথাই শোনেনি। তার মতে এটাই একমাত্র পথ।”

“তারপর?”
এবারে প্রফেসর ওয়াং বললেন, “কিন্তু তাতেও আমাদের উদ্দেশ্য সফল হত না। অমল যদি সেখানে গিয়ে ডার্ক এনার্জির রহস্য জানতেও পারে,আমরা সেই তথ্য কোনদিন জানতে পারব না। অমল যদি বা কোনদিন ফিরে আসে, ততদিনে পৃথিবীতে কেটে যাবে অনেক বছর। সেই জন্যে আমরা একটা নিউক্রোবায়োলজিকাল এক্সপেরিমেন্ট নিয়ে কাজ করতে আরম্ভ করি। মিগুয়েল এটা আবিষ্কার করার জন্যে প্রায় চল্লিশ বছর ধরে কাজ করেছে। তুমিই ব্যাপারটা বল, মিগুয়েল।”

মিগুয়েল বলল, “আমি খুব সহজে তোমাকে ব্যাপারটা বুঝিয়ে দিচ্ছি। মহাকাশে হাজার হাজার বছর ধরে আলোর কাছাকাছি গতিতে যদি কেউ ছোটে, তাহলে তার নিজের বয়স হয়ত একশও হবে না। এই ধর গিলেস-৮৭৬, আমাদের সবচেয়ে কাছের নক্ষত্র যার নিজের একটা গ্রহমন্ডল আছে আমাদের সৌরজগতের মত, তার দূরত্ব ১৫ আলোকবর্ষ। কোন অভিযাত্রী যদি সেখানে যেতে চায়, জীবিত অবস্থায় সে কোনদিন পৃথিবীতে ফিরতে পারবে না। সেই প্রযুক্তি আমরা এখন তৈরি করতে পারিনি। কিন্তু ধর তার প্রত্যেকটা অভিজ্ঞতা ধরে রাখা থাকে একটা কম্পিউটারে, তাহলে পাঁচশ বছর পর ফিরলেও সেটা আগামী প্রজন্মকে গবেষণার একটা রাস্তা দেখাবে। অনেক চেষ্টা করে আমরা একটা উপায় বের করেছি। তুমি নিশ্চয়ই ক্রায়জেনিক স্লিপ- এর কথা জানো?”

অয়ন উত্তর দিল, “হ্যাঁ, যাতে ধমনীর ভিতর থেকে জল বের করে বিশেষ কয়েকটা রাসায়নিকের সাহায্যে অনেক বছর ধরে মানুষের দেহকে একই অবস্থায় ঘুম পাড়িয়ে রাখা যায়। কিন্তু বাস্তবে ব্যাপারটা নিয়ে এখনো গবেষণা চলছে।”

মিগুয়েল বলল, “ঠিক। আমরা একটা কৃত্রিম নিউরল নেটওয়ার্কের প্রোগ্রাম তৈরি করেছি যেটা একটা ছোট্ট যন্ত্রের মাধ্যমে মানুষের মস্তিষ্কের হুবহু একটা প্রতিকৃতি তৈরি করতে পারে কম্পিউটারে। মনে কর, তোমার মাথায় একটা যন্ত্র পরিয়ে দিলাম আর সেই যন্ত্রে তোমার মস্তিষ্কের প্রতিটা গতিবিধি নথিভূক্ত হতে থাকল। কয়েক মাসের মধ্যেই এই প্রোগ্রাম সেই তথ্য বিশ্লেষণ করে দেখবে যে বিশেষ কোন অবস্থায় তোমার মস্তিষ্ক কি সিদ্ধান্ত নেয়! দরকার পড়লে তুমি যন্ত্রের একটা বিশেষ অংশ সক্রিয় করে সেটাকে ক্রায়জনিক স্টেটে নিয়ে যেতে পারবে। সেক্ষত্রে যতক্ষণ তুমি এই যন্ত্রটা পরে থাকবে তোমার ব্রেন ঠিক ভাবে চললেও তোমার শরীর আংশিক ভাবে ক্রায়জনিক স্টেটে থাকবে,মনে তোমার বয়স বাড়বে খুব ধীরে। দরকার পড়লে দেহের মৃত্যুর পর এই প্রোগ্রাম সেই ব্যক্তির নিজস্ব ব্রেনের মতনই এগিয়ে নিয়ে যাবে মহাকাশযানকে। নির্দিষ্ট গন্তব্যে পৌঁছনোর পর সেই যন্ত্রের মাধ্যমে লোকে জানতে পারবে অভিযানের যাবতীয় তথ্য আর অভিজ্ঞতা যা সঞ্চিত আছে সেই ব্যক্তির মাথায়। আবার অন্য কোন অভিযাত্রী সেই একই যন্ত্রের মাধ্যমে তার আগের অভিজ্ঞতা গ্রহণ করতে পারবে তার মস্তিষ্কে।”

এইবার প্রফেসর ওয়াং অয়নের দিকে তাকিয়ে বললেন, “এই যন্ত্রের একটা প্রোটোটাইপ অমলের কাছে ছিল। হয়ত প্রক্সিমা সেন্টরিতে পৌঁছে সে যোগাযোগ করতে পেরেছে সেই ডার্ক এনার্জির সঙ্গে,হয়ত অনুসন্ধান করেছে প্রাণের,রহস্য উদঘাটন করেছে অন্য কোন পৃথিবীর…কিন্তু আমাদের সঙ্গে সে যোগাযোগ করতে পারবে না।”
অয়ন প্রফেসর ওয়াংএর চোখে চোখ রেখে বলল, “আপনি কি বলতে চাইছেন যে বাবা..”

প্রফেসর ওয়াং শান্ত কন্ঠে বললেন, “আমার বিশ্বাস অয়ন,অমল আজও মহাকাশে অপেক্ষা করে আছে। তার সারা জীবনের গবেষণা যাতে মানুষের কাজে লাগে। আমরা স্থির করেছিলাম তিরিশ বছর পর গিয়ে আমরা তার সঞ্চিত অভিজ্ঞতা নিয়ে কাজটাকে এগিয়ে নিয়ে যাব। এই অভাবনীয় দায়িত্ব সে পালন করছে আজও। অনন্ত মহাকাশের কোন প্রান্তে,একা……

অয়ন আর কোন কথা শুনতে পেল না। শুধু একটা কথা তার মাথায় বেজে যেতে লাগল, “বাবা বেঁচে আছে, বাবা বেঁচে আছে…..”

 পর্ব (২)

২০২৯,তিয়াংঅং২১ আন্তর্জাতিক স্পেস স্টেশন

“পিসিএ১ টু বেস! কম চেক। স্যুট হ্যাচ বন্ধ হয়েছে। ”
“ভালো পিসিএ১। যেতে পার। ”
“পিসিএ১ টু বেস! দি ক্যাপসুল নিডস টু বি চেক্‌ড্‌ রাইট নাউ। আমি বাইরে যাচ্ছি।”

“বেস বলছি। অনুমতি দেয়া হল। কুড়ি মিনিট সময় পাবে অয়ন। শুভযাত্রা।”
পিসিএ১ ক্যাপসুলের দরজা খুলে রোভারে লাগানো সিঁড়ি ধরে বেরিয়ে এল অয়ন। স্পেসসুট আর ফিল্ড হেলমেট পরে নিয়েছে সে। কোমরে আটকানো দড়ি ছাড়তেই সে এক লাফে বেশ খানিকটা এগিয়ে গেল পিছনের দিকে। তাকে যতটা তাড়াতাড়ি সম্ভব ফিউয়েল ক্যাপসুলের সমস্যাটা ঠিক করতে হবে। যতদুর মনে হচ্ছে পুশার প্যাডের যন্ত্রপাতিতে কিছু অসুবিধে হওয়ায় তাপ-পারমাণবিক শক্তি তরঙ্গ তৈরি হলেও ইঞ্জিন সেটা ব্যবহার করে এগিয়ে যেতে পারছে না।

মহাকাশে হাঁটবার সময় যেটা সবচেয়ে বেশি অনুভব করে অয়ন, সেটা হলো এখানকার নিস্তব্ধতা। স্পেস স্টেশন বা শাটলের ভেতরে থাকার সময় সেই শূন্যতাটা বুঝতে পারা যায় না, কিন্তু মেরামতির কাজে যখন স্পেসসুট পরে নিকষ কালো আকাশে বেরিয়ে আসে সে,নিজের নিঃশ্বাসের শব্দেরও অনুরণন হয় তার কানে।

মহাকাশ বিজ্ঞান নিয়ে কাজ করলেও কোনদিন মহাকাশচারণের প্রশিক্ষণ নেওয়ার দরকার পড়েনি অয়নের। দু’বছর আগে প্রফেসর ওয়াং আর প্রফেসর মিগুয়েলের সঙ্গে দেখা করার পর থেকে এই অভিযানে থাকার জন্যে তার প্রশিক্ষণ শুরু হয়েছিল। যদিও তারা দুজনেই তাকে বহুবার বারণ করেছিল আসন্ন এই অভিযানের বিপদ আর অনিশ্চয়তার কথা বলে, কিন্তু অয়ন আগাগোড়া জেদ ধরে বসেছিল। কিছুতেই তাকে টলাতে পারা যায়নি। সব কিছু জানার পর সে হাতের ওপর হাত দিয়ে বসে থাকতে পারবে না।

প্রথমদিকের উত্তেজনা আর আবেগ সময়ের সঙ্গে সঙ্গে থিতিয়ে এসেছিল, তার জায়গা নিয়েছিল অদ্ভুত একটা জেদ আর দায়িত্ববোধ। এই অভিযান শুধু অমলের জন্যে নয়, এর উদ্দেশ্য অনেক বড়। একসময় অয়নের মনে হয়েছিল, এই অভিযানের মধ্যে দিয়ে সে রোজ বাবাকে একটু একটু করে চিনতে পারছে। অয়নের প্রশিক্ষণ শুরু হয়েছিল পৃথিবীতেই। প্রচন্ড মানসিক চাপের মধ্যেও যেন সিদ্ধান্তে একচুল ভুল না হয়। সময়ের সঙ্গে সঙ্গে অয়নের নার্ভ শক্ত হয়েছে,শারীরিক ক্ষমতা বেড়েছে,কাজ হয়েছে নির্ভুল।

প্রফেসর ওয়াং যে গত পঁচিশ বছর ধরে এই অভিযানের প্রস্তুতি নিতে কোনরকম খামতি রাখেননি সেটা একটু একটু করে বুঝেছে অয়ন। চায়না সরকারের সঙ্গে হাত মিলিয়ে তৈরি করেছেন নিউক্লিয়ার পাল্স প্রপলশন রকেট, আবিষ্কার করেছেন নানা অত্যাধুনিক যন্ত্র। তিয়াংঅং২১ আন্তর্জাতিক স্পেস স্টেশন থেকে অয়নদের মহাকাশযান ছাড়তে আর মাত্র দু’দিন বাকি।

ফিউয়েল ক্যাপসুলের কাছে গিয়ে সার্কিট বোর্ডটা খুলল অয়ন। ভিতরে গিজ গিজ করছে যন্ত্রপাতি। শেষ মুহুর্তে ইঞ্জিনের এই গন্ডগোল তার মোটেই ভালো লাগছে না। মন দিয়ে হাতের কব্জিতে লাগানো যন্ত্রের সাহায্যে বোর্ডটা পরীক্ষা করতে লাগল সে। তারপর মাইক অন করে কন্ট্রোল সেন্টারের সঙ্গে কথা বলতে লাগল।

“পিসিএ১ টু বেস!দিস ইজ অয়ন। দি গ্রিড ইস ননফানকসানিং। সেন্ড মি দ্য ইঞ্জিনিয়ারিং ডায়াগ্রাম ইন ডেটাবেস।”
“দিস ইস বেস। রজার দ্যাট। সেন্ডিং ইউ দ্য ডায়াগ্রাম।”

কব্জিতে খোলা বোর্ডের ছবি দেখে ঝামেলাটা ধরতে পারল অয়ন। আইসির চাপে কেব্‌ল্‌ ছিঁড়ে কয়েকটা ছোট যন্ত্র খারাপ হয়ে গেছে। বেশিক্ষণ সময় লাগবে না।

“বেস টু পিসিএ১। ইউ লিসেনিং?”
“ফল্ট ক্লিয়ার। কেবলস ডান। ইন্সটলিং আপডেট অন গ্রিড। ”
“কাম ব্যাক ইমিডিয়েটলি। স্পেস ডেবরিস আলফা মুভিং টুওয়ার্ডস দ্য বেস। এক্ষুনি ফিরে এস অয়ন।” বেস থেকে অলিভারের গলা শোনা গেল।”

এক সেকেন্ডের জন্যে অয়ন আতঙ্কে কেঁপে উঠল। আপডেট ইনস্টল হতে এখনো তিরিশ সেকেন্ড বাকি। গত তিরিশ বছরে পৃথিবীর কক্ষে কয়েক লক্ষ মানব নির্মিত উপগ্রহ অবস্থিত করা হয়েছে। একটা সময়ের পর বাতিল আর অকেজো স্যাটেলাইটের ভাঙা অংশগুলো পাক দিতে থাকে পৃথিবীকে একইভাবে বছরের পর বছর ধরে। অনেক বছর আগে “গ্রেভিটি” বলে একটা সিনেমা দেখেছিল অয়ন, সেখানে ভাঙা টুকরোগুলো এসে আঘাত করেছিল মহাকাশচারীদের। আজকাল অবশ্য সে ভয় অনেক কম, ২০২০ সালে এম্বার ইয়ং বলে উনিশ বছরের মেয়ে সিয়ার ট্র্যাক বলে একটা আর্টিফিসিয়াল ইন্টেলিজেন্স প্রোগ্রাম তৈরি করে যার ফলে স্পেস ডেবরিসদের গতিপথ আগে থেকেই অনুমান করা যায়।

অয়ন মাথা তুলে দেখল অন্ধকার আকাশে ঝড়ের গতিতে ধেয়ে আসছে হাজার হাজার ধাতুর ছোট বড় টুকরো, কিন্ত এই ঝড়ের কোনো শব্দ নেই।

“অয়ন,গেট টু দ্য কভার। ইনিশিয়েটিং ল্যাংইটার ক্যাপচার ২২৫১..”
“কপি দ্যাট।”
একটানে প্যানেল থেকে কার্ডটা বের করে বড় বড় লাফে দরজার দিকে এগিয়ে গেল অয়ন। ততক্ষণে তার মাথার পাশ থেকে অসম্ভব গতিতে ছোটবড় ভাঙা স্যাটেলাইটের টুকরো বেরিয়ে যাচ্ছে। একটা বড় টুকরোর সঙ্গে ধাক্কা লাগলেই সে অবাধ গতিতে এই ঝড়ের টানে মহাকাশের অন্ধকারে হারিয়ে যাবে। যত তাড়াতাড়ি সম্ভব পিসিএ ক্যাপসুলের দরজা খুলে ভিতরে ঢুকে গেল।

“পিসিএ টু বেস। ইনিসিয়েট দ্য জাঙ্কইটার। ”
পরক্ষণেই একটা ঝাঁকুনির শব্দের সঙ্গে অয়ন দেখল হাজার হাজার স্যাটেলাইটের ভাঙা টুকরো দিক পরিবর্তন করে আইএসএস এর পিছন দিকে ছুটে গেল। অয়ন স্বস্তির নিশ্বাস ফেলল। জাঙ্কইটার ইঞ্জিন আবিষ্কার করার কৃতিত্ব লেই ল্যাং বলে চায়নার এক বৈজ্ঞানিকের। এই ইঞ্জিন ইলেক্ট্রোম্যাগনেটিক আকর্ষণে মহাকাশে ঘুরতে থাকা স্পেস ডেবরিদের খেয়ে ফেলে তাদের রকেটের জ্বালানিতে পরিণত করে।

কিছুক্ষণ পর আবার ক্যাপসুল থেকে বেরিয়ে অয়ন কালো আকাশের দিকে তাকাল। গত দেড় মাসে এই এক দৃশ্য সে বহুবার দেখেছে,কিন্তু প্রতিবারই সে সামনে থেকে চোখ ফেরাতে পারে না। তার চোখের সামনে ঝলমল করছে বিশাল পৃথিবী। সহসা অয়নের মনে পড়ল, আর একদিন বাকি!তার পর এই দৃশ্য সে আদৌ কোনদিন দেখতে পাবে কি না তার কোন নিশ্চয়তা নেই।

 ২
২০২৯,ট্রেলব্লেজার স্পেসশাটল, মহাকাশ

অয়নরা যাত্রা শুরু করেছে চার দিন আগে। তার সঙ্গে আরো তিনজন এই স্পেসশিপে চলেছে তার সঙ্গে। ক্যাপসুল কম্যুনিকেটর (ক্যাপকম) অলিভর, রোবটিক্স ইঞ্জিনিয়ার ইচিকা আর ডক্টর জস। ডক্টর জস এর আগেও মহাকাশে অভিযান করেছেন। অয়নের কাজ হল ফিউয়েল ইঞ্জিন আর গতিপথের হিসেব রাখা।

প্রফেসর ওয়াং আর প্রফেসর মিগুয়েল তাদের সঙ্গে যোগাযোগ রেখে চলবেন প্রতি মুহুর্তে। বিদায় নেওয়ার মুহুর্তে অয়নের কোন ভাবান্তর না হলেও প্রফেসর ওয়াং আর মিগুয়েল দুজনেই চোখের জল আটকাতে পারেনি। প্রফেসর ওয়াং তাকে বুকে জড়িয়ে শুধু বললেন, “গড ব্লেস ইউ মাই সন। আমার বিশ্বাস,তোমরা পারবে। ”

মিগুয়েল প্রত্যেকের সঙ্গে হাত মিলিয়ে বললেন, “ট্রেলব্লেজারে যেরকম প্রযুক্তি আমরা ব্যবহার করেছি,আগে কোন রকেটে কেউ ব্যবহার করেনি। তোমাদের প্রত্যেকের কানের পিছনে একটা করে ছোট চিপ লাগিয়ে দেওয়া হয়েছে,ব্রেন সিমুলেশন যন্ত্রের সঙ্গে এর যোগাযোগ আছে। যতদিন না তোমরা ক্রায়জেনিক স্টেটে যাচ্ছ, এই চিপ কখনো খুলবে না। আর একটা দরকারি কথা…তোমরা আলোর অর্ধেক গতিতে এগিয়ে যাবে এমনিতে। দরকার পড়লে তোমরা গতি অনেক বেশি বাড়িয়ে দিতে পার, কিন্তু মনে রেখো আলোর গতির যত কাছাকাছি তোমরা যাবে, তোমাদের সময়ের তুলনায় পৃথিবীতে অনেক বেশি সময় কেটে যাবে। হয়ত তুমি কুড়ি বছর পর ফিরে এসে দেখলে পৃথিবীতে কেটে গেছে পাঁচশ বছর।”

টাইম ল্যাপ্সের কথা অয়নদের কারোরই অজানা নয়। আলোর অর্ধেক গতিতে সময়ের ফারাক ততটা বেশি হবে না যতটা হবে আলোর গতির নব্বই শতাংশ গতিতে এগিয়ে গেলে। এই অভিযানে যতটা সাহস দরকার, তার চেয়েও অনেক বেশি দরকার ধৈর্য। সময় খোয়াতে তারা কেউই রাজি নয়।

রকেটের সবাই একে অপরের সঙ্গে আগে থেকে পরিচিত। পৃথিবীর কক্ষপথ থেকে বেরিয়ে তারা এখন মঙ্গল গ্রহের দিকে অগ্রসর। আলোর অর্ধেক গতি অর্জন করতে এখনো তাদের দিন দশেক সময় লাগবে। ক্যাপকম অলিভার পৃথিবীর সঙ্গে যোগাযোগ রেখে চলেছে। তাদের অভিযানের জন্যে বিশেষ একটা দল গঠন করা হয়েছে পৃথিবীতে। এই দলের নাম PCEPAG (Proxima Centauri Exploration Program Analysis Group) প্রফেসর মিগুয়েলের তত্বাবধানে এই বিশেষ কমিটি কাজ করবে।

পৃথিবীর কক্ষপথ ছাড়িয়ে এগিয়ে যাওয়াতে তেমন কোন অসুবিধে হয়নি তাদের। ডক্টর জস ইতিমধ্যে তাদের সকলের বায়োমেড ডেটা নিয়ে নিয়েছেন। মহাকাশে আরো এগিয়ে গেলে স্পেস রেডিয়েশানের ফলে অনেক সময় মানুষের শরীরে নানা সমস্যা দেখা যায়। কিন্তু তার চেয়েও বেশি প্রভাব ফেলে দিনের পর দিন ধরে একইভাবে একটা সীমিত জায়গার মধ্যে বন্ধ থাকা। অনেক সময় প্রিয় বন্ধুর মুখও দেখতে ভালো লাগে না। এই একাকিত্ব স্বাভাবিক ভাবেই মানুষের কর্মক্ষমতাকে আঘাত করে,মানসিক ভাবে অনেকেই অসুস্থ হয়ে পড়ে। তাই একঘেয়েমি এড়ানোর জন্যে মহাকাশচারীরা গান শোনে,সিনেমা দেখে,বই পড়ে,নানারকম গেমস খেলে নিজের মধ্যে।

এই ক’দিনে অবশ্য সেরকম কোন অসুবিধে কারোই হয়নি। তারা সকলেই বেশিরভাগ সময় কাটিয়েছে বাইরের দৃশ্যের দিকে চেয়ে থেকে। ছবি দেখা আর নিজের চোখের দেখার মধ্যে একটা পার্থক্য তো থাকেই। কুচকুচে কালো আকাশ,তার মধ্যে অগুনতি গ্রহনক্ষত্র জ্বলছে। এ ছাড়াও পৃথিবীর নানান দেশ থেকে আসা স্যাটেলাইট দেখতে পাওয়া যায়। এই দৃশ্য যে নিজে না দেখেছে, তাকে লিখে বোঝানো মুস্কিল। ঘন্টার পর ঘন্টা সময় যে কোথা থেকে চলে যায়,বুঝতে পারা যায় না।

কাজকর্ম অবশ্য বেশ গতিতে এগোচ্ছে। রকেটের গতিপথ ঠিক করে দেওয়া হয়েছে। আগামী কয়েক সপ্তাহের মধ্যে তারা মঙ্গল গ্রহকে ছাড়িয়ে এগিয়ে যাবে বৃহস্পতির দিকে। চারটের কোন ইঞ্জিনে এখনো অব্দি কোন গোলমাল হয়নি। কোন দরকার পড়লে ইচিকার সাহায্য নিতে হবে। যাত্রার মাঝপথে রোবটের সাহায্য না নিয়ে ইঞ্জিনের যন্ত্রপাতি মেরামত করা প্রায় অসম্ভব ব্যাপার,যখন তারা প্রচন্ড গতিতে এগিয়ে চলেছে সামনে। অটোমেটিক রোবটের সাহায্যে রকেট চলাকালীন অবস্থাতেও সব ধরণের “প্যাচ” বা মেরামত করা আজকাল সহজ হয়ে গেছে। ইঞ্জিন থামিয়ে স্পেস স্যুট পরে নিজেরা বেরিয়েও কাজ করা যায় বটে, কিন্তু তাতে সেই এক গতি অর্জন করতে আবার বেশ খানিকটা সময় লেগে যায়।

ইচিকা দলের একমাত্র মেয়ে, বয়স চব্বিশ হলেও সে রোবটিক্স নিয়ে কাজ করছে গত পনেরো বছর ধরে। তার হাসিমুখ দেখে মনেই হয় না সে এরকম বিপজ্জনক একটা অভিযানে চলেছে। দলের বাকিদের মধ্যে অলিভারের সঙ্গে অয়নের অনেকদিন থেকেই পরিচয়। অলিভার ফিলিপিন্সের ছেলে। কমুনিকেশন নিয়ে কাজ করেছে বহুদিন। তার মত যোগ্য ক্যাপকম পাওয়া সত্যিই ভাগ্যের ব্যাপার। কাজের ব্যাপারে সে করিত্কর্মা তো বটেই,এ ছাড়াও অলিভার প্রচন্ড সাহসী। দলের শেষ সদস্য় ডক্টর জস বয়সে তাদের চেয়ে খানিকটা বড় হলেও চেহারায় তেমন মনে হয় না। মাঝে মাঝেই অয়ন তাকে গম্ভীর হয়ে চোখ বন্ধ করে চিন্তা করতে দেখেছে,কিন্তু কথা বলার সময় তার মুখে হাসি লেগেই আছে।
অয়ন খেয়াল করেছে এই কদিনেই ট্রেলব্লেজারের হ্যাবিটেট কন্টেনারকে তার নিজের বাড়ির মত মনে হতে শুরু করেছে। কৃত্তিম বাস্তব বা ভার্চুয়াল রিয়েলিটি ব্যবহার করে এই ক্যাপসুলটা এরকম ভাবে তৈরি করে হয়েছে যে অনেকটা পৃথিবীর বাড়ির মতনই বই রাখার জায়গা, রান্নাঘর, ফ্রিজ, টিভি সবই আছে।
সেদিন লাঞ্চের পর সময় কাটানোর জন্যে সে একটা বই খুলে পড়তে শুরু করেছে মাত্র। কয়েক পাতা পড়তেই তার কানে লাগানো মাইক্রোফোন রিসিভারে ইচিকার উত্তেজিত গলা শুনতে পেল অয়ন, “এক্ষুণি একবার কন্ট্রোল রুমে এস অয়ন। কুইক!”

তাড়াতাড়ি কোমর থেকে বেল্ট খুলে উঠে পড়ল অয়ন। হ্যাবিটেট ক্যাপসুলের মাধ্যাকর্ষণ কিছুক্ষণের জন্যে বন্ধ রাখা হয়েছে। শূন্যে ভেসে ভেসে সে এগিয়ে গেল কন্ট্রোল রুমের দিকে। সেখানে পৌঁছতেই ইচিকা উত্তেজিত হয়ে বলল, “লুক ইন দ্য টেলিস্কোপ।”

টেলিস্কোপে চোখ লাগাতেই অয়নের হৃদস্পন্দনের গতি কয়েক গুণ বেড়ে গেল। তার চোখের সামনে লক্ষ লক্ষ রঙিন আলো ছোটাছুটি করছে,দেখে মনে হচ্ছে যেন দুটো জ্বলন্ত হরিণের ওপর বসে দুই ধনুর্ধর আর হরিণদুটো শিং উঁচিয়ে লড়াই করছে একে অপরের সঙ্গে। আলোর ফুলকি ঠিকরে বেরোচ্ছে তাদের শরীরের নানান জায়গা থেকে। শুধু হরিণদের শিঙের মধ্যে একটা জায়গায় ঘন কালো অন্ধকার। নানা নক্ষত্র তীরবেগে ছুটে যাচ্ছে সেই অন্ধকারে। দৃশ্যটা ক্রমে ছোট হয়ে আসছে। সহসা অয়নের দম বন্ধ হয়ে গেল উত্তেজনায়। সে যা ভাবছে সেটা কি সত্যি হতে পারে?

“তুমি যা ভাবছ তাই ঠিক অয়ন।” পিছন থেকে অলিভরের কন্ঠস্বরে সে চমকে পিছনে তাকাল।

“স্যাগেটেরিয়াস ডোয়ার্ফ…” অস্ফূটে বলতে পারল অয়ন।

“হ্যাঁ। আমি পৃথিবীতে এই ছবি পাঠিয়েছিলাম। তাদেরও একই মত। আমাদের আকাশগঙ্গার সঙ্গে সংঘর্ষের ফলেই এই অভিকর্ষ তরঙ্গের আলোর রোশনাই দেখতে পাওয়া যাচ্ছে।”

অয়নের বুকের মধ্যে একটা দামামা বাজছে। স্যাগেটেরিয়াস ডোয়ার্ফ ইলিপ্টিকাল গ্যালাক্সি যে গত এক দশকের বেশি সময় ধরে ধরে আমাদের আকাশগঙ্গা অথবা মিল্কিওয়ে গ্যালাক্সির সঙ্গে ধাক্কা খাচ্ছে বৈজ্ঞানিকেরা সেটার একটা হালকা আভাস পেলেও প্রমাণ পায়নি। অয়নেরা যেই দৃশ্য দেখেছে সেটা লক্ষ লক্ষ বছরের মধ্যে একবার হয়। স্যাগেটেরিয়াস ডোয়ার্ফ আকারে অনেক ছোট হওয়ায় তার সঙ্গে সংঘর্ষের ফলে আকাশগঙ্গার কোন পরিবর্তন হবে না ঠিকই কিন্তু আবহমান মুহুর্তে একটা নতুন ইউনিভার্স তৈরি হচ্ছে। ইচিকা উত্তেজিত হয়ে বলল, “তার মানে,তার মানে ওই কালো কেন্দ্রবিন্দুটা…”

“বলা মুশকিল। হয়ত ব্ল্যাকহোল। স্যাগেটেরিযাস ডোয়ার্ফ গ্যালাক্সির ব্ল্যাকহোল,” অয়ন উত্তর দিল।

 ৩
২০২৯,ইউরোপা থেকে ৫০০০০ মাইল দুরে

গত আট দিন কেটে গেছে ঝড়ের বেগে। অবিরাম কাজ করতে হয়েছে অয়নদের সকলকেই। প্রক্সিমা সেন্টরিতে পৌঁছোন প্রধান উদ্দেশ্য হলেও অয়নদের আরো কয়েকটা মিশন আছে। মঙ্গল গ্রহে অভিযান চালালেও মানুষ বৃহস্পতি,শনি আর অন্যান্য জায়গায় পৌঁছতে পারেনি। অনেক জায়গায় রোবট পাঠিয়েছে ঠিকই,কিন্তু মানুষের নিজের বুদ্ধি আর যন্ত্রের তফাতটা নাকচ করে দেওয়া চলে না। কিন্তু প্রতিটা জায়গায় অভিযান চালানোও সম্ভব হবে না,ট্রেলব্লেজার এর ইঞ্জিন এর গতিবেগ কমিয়ে আনতে যতটা সময় লাগে,বার বার ইঞ্জিন থামালে আলোর অর্ধেক গতিতে পৌঁছনোয় অনেক সময় লেগে যাবে,সে ক্ষেত্রে নিউক্লিয়ার পাল্স পুশিং প্যাডের ওপর চাপ পড়বে অনেক বেশি।

প্রফেসর ওয়াং তাই জন্যে খুব হিসেব করে মাত্র কয়েকটা জায়গা সার্ভে করতে বলেছেন অয়নদের দলকে। সেই সমস্ত জায়গাই এই সূচিতে জায়গা পেয়েছে যেখানে প্রাণের সম্ভাবনা সবচেয়ে বেশি। তার মধ্যে অন্যতম হল বৃহস্পতি গ্রহের উপগ্রহ ইউরোপা। যতদুর জানা গেছে আমাদের সৌরজগতে একমাত্র এই উপগ্রহে দাঁড়াবার মতন জমি আছে। সিলিকেট রক দিয়ে তৈরি এই জমি, তাছাড়াও জল পাওয়ার সম্ভাবনা আছে ইউপাতে। যতদুর মনে হয়,ইউরোপায় একটা সমুদ্র আছে।

ইচিকা রোভার কন্ট্রোল তার হাতে তুলে নিয়েছে। তিনটে রোভার নামানো হবে ইউরোপার মাটিতে। তার মধ্যে নানাধরনের রোবট আছে। ঠিক করা হয়েছে অয়ন আর ইচিকা নামবে ইউরোপাতে আর বাকি দুজন কন্ট্রোল রুম থেকে যোগাযোগ রাখবে ওদের রোভার প্রোবের সঙ্গে।

ডক্টর জোস ইচিকা আর অয়নকে সাবধান করে দিলেন, “কোন অবস্থাতেই রেডিয়েশান স্যুট খুলবে না।”
অয়ন আর ইচিকা মাথা নাড়ল। বৃহস্পতির পরিবেশ এখনো ঠান্ডা হয়নি, মাটির নীচে টগবগ করে ফুটতে থাকা লাভা আর রেডিওঅ্যাক্টিভ পদার্থের ক্ষয়ের ফলে ক্রমাগত রেডিয়েশন নির্গত হতে থাকে এর পরিবেশে। তার সঙ্গে আছে বিশাল বিশাল আগ্নেয়গিরি। বিশেষ প্রযুক্তি ব্যবহার না করলে বৃহস্পতির কাছাকাছি এলেই তাদের রকেট ছাই হয়ে যেত।

অয়ন আট ইচিকা গিয়ে তাদের নির্দিষ্ট রোভারে গিয়ে উঠল। সামনে দেখতে পাওয়া যাচ্ছে বিশাল এক গ্যাসের আবরণ।

“অয়ন,আমরা গ্যালিলিয়ান মুনের রেডিয়াসে এসে গেছি। গেট রেডি।”
বলার সঙ্গে সঙ্গেই সাঁই সাঁই করে ট্রেলব্লেজারের ডান পাশে বিশাল একটা উপগ্রহ দেখতে পাওয়া গেল। ইচিকা মুগ্ধদৃষ্টিতে সেদিকে তাকিয়ে থেকে বলল, “ক্যালিসটো। ”অয়ন দেখল উপগ্রহটাকে দেখে মনে হচ্ছে যেন উত্সব হচ্ছে। সারা উপগ্রহটা জগমগ করছে আলোর রোশনাইতে। ইচিকা তাকে প্রশ্ন করল, “ওই আলোগুলো কীসের?”
অয়ন ততক্ষণে ব্যাপারটা বুঝতে পেরেছে। সে বলল, “ওগুলো আলো নয়,আগ্নেয়গিরি। ”
“ও মাই গড।” ইচিকা ভয়ার্ত গলায় বলল।

বৃহস্পতির উনসত্তরটা উপগ্রহের মধ্যে বেশিরভাগ উপগ্রহতেই সর্বক্ষণ অগ্ন্যুৎপাত হচ্ছে আগ্নেয়গিরি থেকে। তাদের মধ্যে সবচেয়ে বড় হল গ্যালিলিয়ান পরিবারের চারটে উপগ্রহ, আইও, ইউরোপা, গেনিমেড আর ক্যালিসটো।
ইচিকা আর অয়ন হেলমেট পরে তৈরি হয়ে নিল। তারপর মাইক অন করে অলিভরকে বলল, “আর সেভেন ডেল্টা ইন রেডি পজিশন। কনফার্ম লোকেশন।”

ওদিক থেকে অলিভারের গলা শুনতে পেল তারা, “লোকেশন কনফার্মড। আমরা গেনিমেড এর কক্ষ পথ পেরিয়ে গেছি। গেট রেডি। কাউন্টডাউন স্টার্ট ইন ওয়ান মিনিট।”

নিশ্বাস বন্ধ করে অপেক্ষা করতে লাগল তারা। এরপর কি হবে সেটা শুধু অনুমান করা যায়,কিন্তু জোর করে কিছু বলা যায় না। চাঁদ ছাড়া আজ পর্যন্ত কোন গ্রহে উপগ্রহে মানুষের পা পড়েনি। সেই অর্থে তারা প্রথম। এমনও হতে পারে ইউরোপাতে নামমাত্র তাদের যন্ত্রপাতি খারাপ হয়ে গেল,অথবা স্পেস স্যুট কাজ করল না। না জানা যে কোনো বিপদের মোকাবিলা করার জন্যে এত দিন ধরে তারা তৈরি হয়েছে,আজ পরীক্ষার পালা।

“কাউন্টডাউন স্টার্টস। টেন নাইন এইট সেভেন সিক্স ফাইভ ফোর…”
অয়ন এক মুহুর্তের জন্যে চোখ বন্ধ করল। তারপর চোখ খুলে ইচিকার দিকে তাকালো।

“থ্রি টু ওয়ান….”
একটা ঝাঁকুনির সঙ্গে অয়ন বুঝতে পারল রকেট থেকে বেরিয়ে তাদের ছোট রোভারটা এগিয়ে চলেছে সামনের উপগ্রহের দিকে। এখন ইউরোপাকে পরিষ্কার দেখতে পাচ্ছে তারা। মনে হচ্ছে সাদা বিশাল গোলকের মধ্যে খয়েরি রং দিয়ে কেউ আঁকিবুঁকি কেটেছে। যতটা সামনে এগোতে লাগল তারা বিস্ময়ে তাদের চোখ বড় হতে লাগল। নিজের গ্রহ ছাড়া আর কোন মহাকাশীয় গ্রহউপগ্রহ তারা এত কাছ থেকে দেখেনি। সাদা আস্তরণটা কি জমি আর সারা উপগ্রহ জুড়ে বরফের চাদর পাতা আছে?

ইচিকার দিকে তাকিয়ে অয়ন বলল, “আমাদের যত তাড়াতাড়ি সম্ভব রোভার আর ফাইভ আর আর সিক্স এর গতিপথ ঠিক করে দেওয়া উচিত। তাহলে সার্ভে করতে সময় অনেক কম লাগবে। তিনটে রোভার এক জায়গায় ল্যান্ড করানোর কোন মানে হয় না।”ইচিকা ঘাড় নেড়ে তার কথায় সায় দিল। তারপর মাইকে অলিভারকে বলল, “আর সেভেন ডেল্টা টু বেস। উই আর চেঞ্জিং দি ডিরেকশন অফ আর ফাইভ এন্ড আর সিক্স। অল কমান্ড ইনপুট এনাবল্ড।”
“কপি দ্যাট। গো অ্যাহেড। ”

খট খট করে বোতাম টিপে ইচিকা কাজ শুরু করে দিল। দুটো রোভারের গতিপথ আর ল্যান্ডিং কমান্ড ঠিক করে ইচিকা অয়নকে বলল, “লেটস গেট রেডি ফর দ্যা ল্যান্ডিং।”

অয়ন মাথা নেড়ে অলিভারকে জানিয়ে দিল সেই কথা। রোভারের সামনে থেকে ঘন গ্যাসের আস্তরণ সরে গেছে। এখন ইউরোপার জমিকে স্পষ্ট দেখা যাচ্ছে। ধবধবে সাদা সেই জমি। আর মিনিট পাঁচেক।

“আর সেভেন ডেল্টা টু বেস। রেডি ফর ল্যান্ডিং।”
অলিভারের গলা শুনতে পাওয়া গেল, “রজার দ্যাট। গুড লাক।”
থ্রাসটার চালিয়ে কন্ট্রোল নিজের হাতে নিল অয়ন। কিছুক্ষণের মধ্যেই তারা নামতে শুরু করল। সামনে প্রশস্ত উঁচুনিচু প্রান্তর দেখতে পাওয়া যাচ্ছে। ইচিকা ল্যান্ডিং কমান্ড দিয়ে ততক্ষণে বাকি দুটো রোভারকে মাটিতে নামিয়ে দিয়েছে। আরেকটা ঝাঁকুনির সঙ্গে তারা বুঝতে পারল,তাদের রোভারও ইউরোপার মাটি স্পর্শ করেছে।
সিট বেল্ট খুলে দরকারি সব জিনিস দেখে নিল তারা দুজন। তারপর রকেটের উদ্দেশ্যে সন্দেশ পাঠাল।
“আর সেভেন ডেল্টা টু বেস। অল রোভার্স ল্যান্ডেড ফাইন। উই আর গেটিং রেডি ফর প্রসপেকটিং।”
ঐদিকে থেকে অলিভারের উচ্ছ্বসিত গলা শোনা গেল, “রজার দ্যাট। ওয়েল ডান। হ্যাভ ইউ চেক্‌ড্‌ এভরিথিং?”
“অল ইন প্লেস। আর সেভেন ইন স্ট্যান্ডার্ড পজিশন। সেমি অটোনমাস রোভার্সরা সাইট স্ক্যান করতে শুরু করবে এইবার। উই আর গোয়িং আউট উইথ আর সেভেন হিউমোনয়েড রোবটিক ইউনিটস।”

“গো অ্যাহেড। অল দ্য বেস্ট।”
এক্স স্যুট আর ফিল্ড হেলমেট পরে নিয়েছে অয়ন। ইচিকা আগেই তৈরি হয়ে তাদের হিউমোনয়েড রোবটদের সক্রিয় করছে। দরকার পড়লে এরা অনেকটা দূরত্ব অতিক্রম করে অনুসন্ধান চালিয়ে যেতে সাহায্য করবে। প্রেসার হ্যান্ডল ঘুরিয়ে রোভারের দরজা খুলল অয়ন। তারপর বাইরে পা রাখল।

কয়েক পা হেঁটে গেল সে। ইচিকা ততক্ষণে বেরিয়ে এসেছে। সে হেলমেটের ভিতরে থাকা ট্রান্সমিটারের মাধ্যমে অয়নকে বলল, “রোবট চারটেকে কোন দিকে পাঠাব সাইট স্ক্যান করতে?”

অয়ন কোনো কথা না বলে আঙুল দিয়ে তার দৃষ্টি আকর্ষণ করল আকাশের দিকে। সেদিকে তাকিয়ে ইচিকার চোখ বড় বড় হয়ে গেল,সে কোন কথাই বলতে পারল না।

পৃথিবীর মাধ্যাকর্ষণের মাত্র তের শতাংশ থাকার দরুণ ইউরোপাতে আকাশের কোন রং নেই, এখানে হাওয়া চলে না। কিন্তু প্রায় সারা আকাশ জুড়ে বৃহস্পতি গ্রহ দেখতে পাওয়া যাচ্ছে। দেখে মনে হচ্ছে প্রকান্ড একটা জ্বলন্ত নক্ষত্রের মধ্যে বালির ঝড় উঠেছে। ঘন গ্যাসের আস্তরণের কারণে মায়াবী এক রূপকথার দৃশ্য তৈরি হয়েছে আকাশে। কিন্তু জমি বলতে শুধু সাদা বরফের অসমতল প্রান্তর দিগন্ত অব্দি চলে গেছে।

কয়েক মুহূর্ত সময় নিয়ে অয়ন ইচিকাকে বলল, “নাসার কথামত সর্সারার অভিযানের সময় বাবা এখানে নামেনি ঠিকই, কিন্তু এখানে অনুসন্ধান করার জন্যে একটা প্রোব নামানো হয়েছিল। সময়ের অভাবে বেশি কিছু জানা যায়নি। আর ফাইভ আর আর সিক্স জমির ওপরে সমীক্ষা চালাবে। আমার মনে হয় রোবটগুলোকে ওই পশ্চিমের নিচু জায়গাটায় ড্রিল করতে বলা হোক।”

ইচিকা ভুঁরু কুঁচকে বলল, “নাসা ২০২০ সালে যে ইউরোপা ক্লিপার অভিযান শুরু করেছিল তারা এখনো এখানে পৌঁছতেই পারেনি। জমির ওপরে অনেক ছবি অবশ্য আগেই নেওয়া হয়ে গেছে। তুমি কি করতে চাইছ সেটা বোধহয় বুঝতে পারছি।” রিমোট কন্ট্রোলের সাহায্যে কমান্ড দিয়ে রোবট চারটেকে নিয়ে এগিয়ে চলল তারা।

ততক্ষণে উপগ্রহের অন্য প্রান্ত থেকে অন্য দুটো প্রোব ক্যামেরা আর অন্যান্য যন্ত্রের সাহায্যে ডেটা পাঠাতে শুরু করেছে। অয়ন অনুভব করল মাধ্যাকর্ষণ কম হওয়া সত্ত্বেও হাঁটতে যে খুব একটা সুবিধে হচ্ছে তা নয়।

কিছুক্ষণের মধ্যেই বরফের টিলাগুলো পেরিয়ে কাজ শুরু করে দিল তারা। রোবট চারটে যথেষ্ট উন্নত,আগে থেকে কম্যান্ড দেওয়াই আছে। জায়গা মেপে নিয়ে চারটে ভিন্ন বিন্দুতে গর্ত খোঁড়া করা শুরু হল। অয়ন ইচিকাকে বলল,

“চল,আমরা একটু জায়গাটা মেপে আসি।”
ইচিকা সায় দিল।
বরফের টিলাগুলো খুব একটা উঁচু নয়। অনেক জায়গায় বরফের ওপর ফাটল দেখতে পাওয়া যাচ্ছে। কোন কোন জায়গায় সেই ফাটল পাতাল পর্যন্ত চলে গেছে। ইচিকা হাঁটতে হাঁটতে বলল, “অনেকটা আন্টার্কটিকার মত, তাই না?” অয়ন হেলমেটের পিছন থেকে হেসে বলল, “যদি না আকাশের কথাটা ভুলে যাও?”

সত্যিই তাই। এখানকার কুচকুচে কালো আকাশ জুড়ে থাকা বৃহস্পতির দিকে তাকালেই স্পষ্ট বোঝা যায় এ আমাদের পৃথিবী নয়। এই দৃশ্য যতটা সুন্দর,ততটাই ভয়াবহ।

কিছুক্ষণ পরে মাইকে অলিভারের গলা শোনা গেল, “বেস টু আর সেভেন। আর ফাইভ আর আর সিক্স তাদের যাবতীয় তথ্য পাঠিয়ে দিয়েছে। প্রায় তিরিশ ফুট অব্দি খুঁড়ে দেখা হয়েছে। ইউ ওয়ান্ট টু সেট এনাদার পেরিমিটার?”
অয়ন মাইকে বলল, “পসিটিভ। মুভ আর সিক্স চার্লি ফাইভ হান্ড্রেড মিটার ফ্রম কারেন্ট পজিশন। গেট হিউমনোয়েড রোবটস টেক ফ্লাইট টু ক্যাপচার পিকচারস। আর ফাইভ ডেল্টা,মুভ টু এসেস কোর অফ মুন।”
“রজার দ্যাট। অয়ন,ইচিকা,তোমরা আর কতক্ষণ থাকতে চাও। আমরা এইখানে অনেক বেশি সময় দিতে পারব না।”

“কপি দ্যাট। আর দু ঘন্টা। আর সেভেন রোবটস আর ড্রিলিং ফর স্ক্যানিং। আমাদের এই জায়গাটার একটা থ্রী ডায়ামেনশাল মডেল তৈরি করতে হবে। সেটা করতে যতটুকু সময় লাগবে সেইটুকুই আমরা এখানে থাকব। ”ইচিকা জানালো।

অলিভারের সঙ্গে কথা বলে কয়েক পা এগোতে না এগোতেই অয়নের পায়ের নীচে মাটি কাঁপতে লাগল প্রচন্ড জোরে। ইচিকার দিকে চেয়ে উদিগ্ন হয়ে যে বলল, “ভূমিকম্প!এক্ষুণি ফিরতে হবে। ”

তিন লাফে দুজনেই বরফের টিলা থেকে নেমে এসে ল্যান্ডিং সাইটের দিকে দৌড়তে শুরু করল। ততক্ষণে সামনের জমিগুলোর ফাটল থেকে প্রচন্ড গতিতে জল বেরোতে শুরু করেছে। ভয়ার্ত চোখে তারা দেখল জল ফুটছে, ধোঁয়া বেরোচ্ছে জলের গা থেকে। আগ্নেয়গিরির লাভার মত লাফিয়ে সেই জল কয়েকশো ফুট ওপর অব্দি পৌছে যাচ্ছে। দৌড়তে দৌড়তে ইচিকা বলল, “ইটস দ্য ড্রিল। আমাদের নিশ্চয়ই মাটি খোঁড়ার সময় কোন আটকে থাকা ওয়াটার বডিকে আঘাত করেছে।” অয়ন ও দৌড়তে দৌড়তে উত্তর দিল, “ইচিকা, এটা ড্রিলিং-এর জন্যে হয়নি। একটা জায়গায় আঘাত হলে সেখান থেকে জল বেরোত, এখন সারা প্রান্তর জুড়ে এই তান্ডব হত না। এখনই এখান থেকে পালাতে হবে। এই জলে নানা রকম রেডিওএক্টিভ ধাতু মিশে আছে। লেট্‌স্‌ মুভ আউট নাউ। ”

টিলা থেকে নামতে নামতে ইচিকা মাইকে চিৎর করে বলল, “অলিভার। মুভ আর ফাইভ এন্ড আর সিক্স রাইট নাউ ফ্রম সারফেস। আই কান্ট ডেলিভার কমান্ড কোড।”

অভিজ্ঞ অলিভার কোন কথা প্রশ্ন করল না। শুধু উত্তর এল, “রজার। কমান্ড কনফার্মড। দে আর আউট। গেট ব্যাক ইমিডিয়েটলি।”

ততক্ষণে অয়ন হিউমোনয়েড রোবটদের তাদের রোভারে ফেরত পাঠিয়ে দিয়েছে কমান্ড লক করে। তাদের পায়ের গোড়ালি পর্যন্ত ততক্ষণে জল বইতে শুরু করেছে। বরফের প্রান্তর আর বোঝা যাচ্ছে না জলে। মনে হচ্ছে তারা সমুদ্রের ওপর দাঁড়িয়ে আছে আর টাইফুনের মতন অসংখ্য ফুটন্ত জলস্তম্ভ তাদের ঘিরে ধরেছে।

দৌড়োতে দৌড়োতে আতঙ্কিত চোখে অয়ন দেখল সহসা তাদের পায়ের তলায় জল জমতে শুরু করেছে। রোভার এখনো খানিকটা দুরে। ইচিকা চিৎর করে অয়নকে বলল, “অয়ন,আমি এগোতে পারছি না।”

অয়ন দেখল ইচিকার গোড়ালি অব্দি শক্ত পাথরের মত বরফ জমে গেছে মুহুর্তের মধ্যে। শত চেষ্টা করেও সে এগোতে পারছে না। সে কোমর থেকে আইস এক্স বের করে ঘা মারতে লাগল সেখানে। বরফ খানিকটা আলগা হতেই অয়ন ইচিকাকে বলল, “যত জোরে পারো দৌড়ও। রোভারে গিয়ে ইঞ্জিন স্টার্ট কর।”

ইচিকা দৌড় লাগল। ততক্ষণে হাঁটু অব্দি জমা শক্ত বরফে আটকে গেছে অয়ন। আইস এক্স কোমরে রেখে এবার সে আরেকটা যন্ত্র বের করল। সেটায় চাপ দিতেই নীল রঙের আগুনের একটা শিখা বেরিয়ে তার পায়ের চারদিকের বরফকে গলাতে শুরু করল। কয়েক মুহুর্তের মধ্যে অয়ন বেরিয়ে আসতে পারল বটে কিন্তু ততক্ষণে চারদিকে অদ্ভুত এক কান্ড শুরু হয়েছে। অয়নের কানে ইচিকার চিত্কার ভেসে এল, “রান….”

অয়ন কোনদিকে না তাকিয়ে রোভারের দিকে দৌড়তে শুরু করল। রোভারের পায়াগুলো শক্ত বরফে আটকে গেছে। সে ভিতরে পৌছতেই ইচিকা এক মুহুর্তের মধ্যে দরজা বন্ধ করে দিয়ে ইঞ্জিন থ্রাসটার চালু করার কমান্ড দিল মেশিনে। আগুনের তাপে বরফ গলিয়ে যখন অয়নদের রোভার জমি ছাড়ল ততক্ষণে ইউরোপার শুভ্র প্রান্তর জুড়ে একটা রঙিন আগুন খেলা করছে। অয়নের বার্নার থেকে বেরোনো আগুনের নীল রশ্মি বরফের নীচে ছড়িয়ে গেছে যতদুর চোখ যায়,কিন্তু তাতে বরফ গলছে না। বরং মনে হচ্ছে বরফের নীচে দিয়ে একটা নীলরঙা ড্রাগন ঘুরপাক খাচ্ছে। জলস্তম্ভগুলো জমে নারকেল গাছের মত উঁচু হয়ে গেছে।

একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলে অয়ন বলল, “ইচিকা,তুমি ঠিক আছ?”
ইচিকা সেই কথার উত্তর না দিয়ে উত্তেজিত স্বরে অয়নকে বলল, “এটা কী হল অয়ন?”
অয়ন ছোট হতে থাকা ইউরোপার দিকে তাকিয়ে ছিল। কিছুক্ষণ সময় নিয়ে সে বলল, “পুরো ইউরোপা জুড়ে বরফের তলায় একটা ফুটন্ত সমুদ্র আছে। আমার মনে হয় আমাদের সমুদ্রের জোয়ার ভাটার মতন এখানেও যখন জোয়ার হয়,সেই ফুটন্ত জল ওপরে উঠে আসতে চায় কিন্তু সমুদের ওপরের স্তর আগেই বরফাবৃত। তাই ফোয়ারার মত অনেক জায়গা থেকে জল উঠে আসে। এখানকার তাপমাত্রা এতটাই কম যে জল কয়েক মুহুর্তের মধ্যেই বরফে পরিণত হয়। এই জমে যাওয়া জলস্তম্ভগুলোই পরে বরফের টিলাতে রূপান্তরিত হয়। প্রতিদিন এই ভাবে ইউরোপার ওপরের প্রান্তর বদলে যাচ্ছে।”

ইচিকা মাথায় হাত দিয়ে বলল, “তোমার কথাই ঠিক। যতদুর মনে হয় ভূমিগত জলে নানা রকম জ্বলনশীল গ্যাস মিশে আছে,সেই জন্যেই তোমার আগুনের ছোঁয়া লেগে সেই আগুন বরফের প্রান্তরের নীচে ছড়িয়ে গেছে।”
অয়ন ভেবে দেখল কথাটা ঠিকই। তার ভাগ্য ভালই বলতে হবে। আগুনের ছোঁয়া লেগে যদি বরফে বিস্ফোরণ হত তাহলে আর দেখতে হত না। ইচিকার দিকে তাকিয়ে সে দেখল সে হতাশ হয়ে নীচের দিকে তাকিয়ে আছে। অয়ন প্রশ্ন করল, “কি হলো ইচুকা?”

ইচিকা আস্তে আস্তে বলল, “ছোটবেলা থেকে শুনে আসছি যে আমাদের সৌরজগতে ইউরোপাতেই প্রাণের সম্ভাবনা সবচেয়ে বেশি। জল আছে,জমি আছে। আজকের অভিজ্ঞতার পর ইউরোপাতে মানুষের বসতির সম্ভাবনা চিরকালের মত মুছে গেল। এখানে কোন প্রাণ থাকতে পারে না। হয়ত ভবিষ্যতে কোনো সময়ে এখানে কোন ভাবে মানব বসতি হতে পারে,কিন্তু এই মুহুর্তে সেটা সম্ভব নয়।”

 8
২০২৯,টাইটান,শনিগ্রহের উপগ্রহ

দুদিন হল অয়নরা এসে ক্যাম্প করেছে টাইটানে। ইউরোপার বিভীষিকাময় অভিজ্ঞতা তারা একটু একটু করে কাটিয়ে উঠেছে। প্রফেসর ওয়াং এর পাঠানো বার্তা পড়ে তারা একটু হলেও সান্ত্বনা পেয়েছে। তিনি সকলকে বলেছেন যে কোনক্রমেই নিরুৎসাহ না হতে। তাদের উদ্দেশ্য অনেক মহৎ,অনেক পথ বাকি আছে। ইউরোপা এই যাত্রার প্রথম পদক্ষেপ,এখন জানা অজানা কত বিপদ, কত সাফল্য, কত ব্যার্থতা তাদের অপেক্ষায় আছে। মানুষের ভবিষ্যত লিখতে চলেছে তারা,এখনি হতাশ হওয়া কোনমতেই চলবে না।

ইউরোপার পর তাদের গন্তব্য টাইটান। শনিগ্রহের এই উপগ্রহকে নিয়ে ছোটবেলা থেকে নানা মাইথলজিকাল গল্প শুনে আসছে সকলেই। প্রচন্ড শীত থাকা সত্ত্বেও টাইটানে অনুকুল আবহাওয়া আছে মানববসতির জন্যে। আছে জল,হাইড্রকার্বন আর প্রচুর পরিমাণে নাইট্রোজেন। স্পেস রেডিয়েশান ও মাধ্যাকর্ষণ অনেক কম। তাই সহজেই টাইটানে মানুষ উড়ে বেড়াতে পারে। সেই স্বাদ অবশ্য এই দুদিনে অয়নরাও পেয়েছে। দুটো রোভারে নেমে এসে তারা টাইটানের ওপর একটা অস্থায়ী ক্যাম্প করেছে দিন কয়েকের জন্যে। সৌরজগতের সীমানার ভিতর এটাই তাদের শেষ ঠিকানা। এরপর থেকে আরম্ভ হবে অবিরাম যাত্রা,যা চলতে থাকবে বছরের পর বছর।

এখানের তিনদিনের ছুটি যতটা টাইটানের প্রস্পেকটিং করার জন্যে, ততটাই মন ও মাথাকে খানিকটার জন্যে হলেও বিশ্রাম দেওয়ার জন্যে।

অলিভার তাদের জন্যে তৈরি হাওয়া দিয়ে ফোলানো বসবাসের জায়গায় ভিতরে ঢুকে টিনের স্যালমন মাছ রান্না করছে। সে রান্না করতে ভালোবাসে। কিন্তু এই যাত্রায় তাদের রান্নার সুযোগ হয়ত কমই আসবে। ডক্টর জস আর ইচিকা তাদের রোবটদের নিয়ে বেরিয়েছে উত্তর দিকে। কাল টাইটানের মাটিতে পা দিয়েই তারা বুঝেছিল, এখানের মাটি হল নরম বালির মতন। পায়ের চাপে অনেকটা গর্ত হয়ে যায় প্রতিবার। কাছাকাছির মধ্যে তিনটে তরল মিথেনের লেকও দেখতে পেয়েছে তারা। কিন্তু সবচেয়ে আশ্চর্যের ব্যাপার হল এখানকার মহাকর্ষ। এক লাফে হনুমানের মত উড়ে যাওয়া যায় সহজেই। প্রথমদিনে এসে তাদের মধ্যে লাফালাফির হিড়িক পড়ে গিয়েছিল। ছোটদের মতন আনন্দে হাওয়ায় পাক দিতে দিতে হেসে ফেলেছিল অয়ন। এখন তাদের দেখলে কে বলবে তারা জীবনের ঝুঁকি নিয়ে মহাকাশ অভিযানে বেরিয়েছে?

অয়ন ক্যাম্পের বাইরে বেরিয়ে হাঁটাহাঁটি করছিল। গাব্দা গোব্দা স্পেস স্যুট পরেও হাঁটতে খারাপ লাগে না তার। সব কিছু ঠিক থাক থাকলে তাদের সঙ্গে থাকা হিউমোনয়েড সাবম্যারিন রোবট আজ অনুসন্ধান শুরু করবে মিথেন লেকের গভীরে নেমে। একটা ব্যাপারে তাদের কোন সন্দেহ নেই। টাইটানে প্রাণ যদি নাও থেকে থাকে,এখানের পরিবেশে প্রচুর পরিমাণে জ্বলনশীল গ্যাস আর ফসিল ফিউয়েল পাওয়া যায়। পৃথিবীতে যেভাবে জ্বালানির অভাব দেখা দিচ্ছে,ভবিষ্যতে এখান থেকে পৃথিবীতে জ্বালানি সরবরাহ করলে অনেক সমস্যার সমাধান হবে। জ্বলনশীল গ্যাস থাকলেও অক্সিজেন না থাকার কারণে আগুন জ্বালানোর কোন উপায়ই এখানে নেই।

এমন সময় অয়নের কানে লাগানো মাইকে ডক্টর জসের গলা শোনা গেল, “দিস ইস
আর ফাইভ। অয়ন,অলিভার,আমার কথা শুনতে পাচ্ছ?”
অয়ন বলল, “কপি ডক্টর জস। আপনার কথা শুনতে পারছি। অল ইন লাইন দেয়ার?”
“ইস্টপ সাবম্যারিন ইনিশিয়েটেড। রিপজিশন এন্ড অবটেইন ভিসুয়াল্স। আমরা একটা আশ্চর্য জিনিস দেখতে পাচ্ছি লেকের গভীরে অয়ন। তুমি আর অলিভার এক্ষুণি এখানে চলে এস।”
“হোয়াট ইস ইট ডক্টর?” অলিভারের গলা শুনতে পেল অয়ন।
“আই কান্ট এক্সপ্লেইন ইট। তোমরা এখনি চলে এস।”

অলিভারকে নিয়ে চার লাফে হাওয়া কেটে অয়ন যখন উত্তরের মিথেন লেক লিগেরিয়া মারের সামনে পৌঁছলো তখন আকাশে শনিগ্রহের বলয়গুলো স্পষ্ট হয়ে উঠেছে। লেকটা বিশাল,এপার ওপার দেখা যায় না,লেক না বলে সমুদ্র বললে খুব একটা বাড়াবাড়ি হবে না। ইচিকা আর ফাইভ রোভারের কন্ট্রোল স্ক্রিনের সামনে বসে চিন্তিত দৃষ্টিতে তাকিয়ে ছিল সামনে। ওদের দুজনকে আসতে দেখেই সে উঠে দাঁড়ালো। প্রফেসর জস তাদের বললেন, “স্ক্রিনে

একটু দেখে বলবে এই জিনিসটা দেখে তোমাদের কি মনে হচ্ছে?”
ইচিকা অলিভারের দিকে তাকিয়ে বলল, “ই স্টপ প্রায় ঘন্টা দুয়েক আগে লিগেরিয়ার গভীরে নেমেছে,তারপর থেকে ক্রমাগত রেডার ইমেজ পাঠাচ্ছে আমাদের। কয়েকটা স্টিল ছবিও পাঠিয়েছে। আমরা বুঝে উঠতে পারছি না লেকের মধ্যে এই জিনিসটা কী? কোন কোন ছবিতে দেখা যাচ্ছে কিন্তু কোন কোন ছবিতে এটার কোন চিহ্ন নেই। তোমাদের কি মনে হয়?”

অয়ন আর অলিভার স্ক্রিনের ওপর ঝুঁকে পড়ল। ইচিকা ঠিকই বলেছে। একের পর এক ছবিতে দেখে ব্যাপারটা স্পষ্ট বোঝা যাচ্ছে, একটা আকৃতি কয়েকটা ছবিতে আছে, আবার কয়েকটাতে একেবারে উবে গেছে।

অলিভার মন দিয়ে দেখে বলল, “আইসবার্গ বা হিমশৈল জাতীয় কিছু কি হতে পারে?
ডক্টর জস চিন্তিত মুখে বললেন, “লেকের গভীরে হিমশৈল? কোন কিছুর সম্ভাবনাই উড়িয়ে দেওয়া যায় না। কিন্তু এই ব্যাপার টাইটানে নতুন নয়।”

সকলে অবাক হয়ে তার দিকে তাকালো। অয়ন প্রশ্ন করল, “কি বলতে চাইছেন ডক্টর জস?”
ডক্টর জস একটু সময় নিয়ে বললেন, “ব্যাপারটা বোধহয় তোমাদের জানা নেই। ২০১৩ সালে ক্যাসিনো প্রোব বলে যন্ত্রচালিত রোভার যখন টাইটানের অনেক ছবি তুলে নিয়ে গিয়েছিল তখনও নাসাতে এই ব্যাপারটা লক্ষ করেছিল বৈজ্ঞানিকেরা। ক্রাকেন,লিগেরিয়া আর পুঙ্গা এই তিনটে লেকেই একই ব্যাপার। কয়েকটা ছবিতে একটা আকৃতি দেখা যাচ্ছে,কিন্তু কয়েকটাতে সেই জিনিসটা বেমালুম ভ্যানিশ হয়ে গেছে। যদিও ক্যাসিনো প্রোব লেকের গভীরে না নেমে শুধু ওপর থেকেই ছবি তুলেছে কিন্তু তাও এই ব্যাপারটা নিয়ে বৈজ্ঞানিক মহলে হইচই হয়েছিল বেশ কয়েকদিন। জেসন হাফগার্টনর বলে যে বৈজ্ঞানিক এই নিয়ে গবেষণা করছিলেন,তিনি ওই বিন্দুটাকে নাম দেন ম্যাজিক আইল্যান্ড বা ম্যাজিক ব্লব।”

ইচিকা উত্তেজিত কন্ঠে বলল, “কিন্তু তাহলে আসলে ব্যাপারটা কী দাঁড়াল? জিনিসটা আসলে কী?”
কিছুক্ষণের জন্যে কেউই কথা বলল না। যেই সম্ভাবনাটা মাথায় আসছে সেটা সত্যি হলে কি কি হতে পারে সেই ভেবেই হয়ত কথাটা সমক্ষে বলতে অসহজ হয়ে উঠেছিল সকলেই। শেষ পর্যন্ত অয়ন নীরবতা ভেঙে বলল, “জিনিসটা যদি জীবন্ত কোন কিছু হয়?”

সকলের মনে একই কথা ঘুরছিল। দলের মধ্যে একটা উত্তেজনা ছড়িয়ে গেছে। ডক্টর জস ঘন ঘন আঙুল মটকাচ্ছেন। ইচিকা মুখ হাঁ হয়ে আছে। অবশেষে অলিভার বলল, “পৃথিবীর বাইরে প্রাণের সন্ধান করা আমাদের প্রধান উদ্দেশ্যর মধ্যে একটা। কোন জীবন্ত প্রাণীর পক্ষেই এরকম জায়গা বদলানো সম্ভব। এখনো যদিও জোর দিয়ে কিছু বলা যাচ্ছে না,ব্যাপারটা আমাদের ভালো করে খতিয়ে দেখতে হবে।”

সকলেই সায় দিল তার কথায়। ইচিকা বলল, “যদি সত্যি এটা কোন প্রাণী হয়ে থাকে তাহলে আমাদের অতিরিক্ত সাবধানতা অবলম্বন করা উচিত।” অয়ন মাথা নাড়ল। মহাকাশে প্রাণের সন্ধান পাওয়া যতটা উত্তেজনার,ততটাই ভীতিকর। যতক্ষণ না অনুসন্ধান শেষ হচ্ছে,কোন কিছুই জোর দিয়ে বলা ঠিক হবে না।

ইস্টপ বলে মাত্র একটা হিউমোনয়েড সাবম্যারিন প্রোব আছে তাদের সঙ্গে। তিনটে লেকের জলে একটা সাবম্যারিনের সাহায্যে অনুসন্ধান করা অসম্ভব। আলোচনা করে ঠিক করে শুধু লেক লিগেরিয়ার জলেই সন্ধান করা হবে। বেসক্যাম্প থেকে ছোট একটা ইমফ্লেটেবল তাঁবু আর দরকারী জিনিসপত্র নিয়ে এল অয়ন আর ইচিকা। ততক্ষণে ক্যাপকম অলিভার পি সি পি এ জি কে বার্তা পাঠিয়ে দিয়েছে।

ইচিকা বলল, “তিন ঘন্টার বেশি একসঙ্গে ইস্টপ কাজ করতে পারবে না। বাকি রোবটরা ততক্ষণে সাইট স্ক্যানের কাজ করে নিক। এরপর কি হতে পারে কেউ জানে না।”

প্রথম ধাপে সাবম্যারিন জলে নামিয়ে রেডার ছবির পাশাপাশি বাবা ধরনের তরঙ্গ পাঠানো শুরু করল তারা। একশ পঞ্চাশ কিলোমিটার গভীর এই বিরাট লেকের পুরোটা ধরে অনুসন্ধান করা তাদের পক্ষে কোনভাবেই সম্ভব নয়,একটা বিশেষ জায়গা পেরিমিটার তৈরি করে সেখানে শুরু হলো অনুসন্ধান। যদি কোনো জীবিত প্রাণী সত্যি থেকে থাকে,আগামী চব্বিশ ঘন্টার মধ্যে কোন না কোন ভাবে এই পরিধির মধ্যে তাদের যাওয়া আসা হতেই পারে।
সময় কাটতে লাগল। ইচিকা ঠায় রোবট কন্ট্রোল হাতে নিয়ে বসে আছে। প্রফেসর জস আর অলিভার উদ্বিগ্ন মুখে চেয়ে আছে জলের দিকে,যেন এই কোন বিশালাকায় দৈত্যের মত প্রাণী উঠে আসবে লেকের তলা থেকে।
অলিভার বলল, “পরজীবী বা মাইক্রোঅর্গানিস্মএর কারনেও মিথেন তৈরি হয়। তাহলে পরজীবীর মত ছোট ছোট জীব এখানে থাকা অসম্ভব নয়।”

ডক্টর জস বললেন, “সেই সম্ভাবনা টাইটানে অনেকটাই কম। পৃথিবীর মাইক্রোঅর্গানিস্মের অনেকটাই সেখানে পাওয়া অক্সিজেনের কারণে। এই লেকে জল নেই,অক্সিজেনও নেই। ভেবে দেখ,তোমার সামনে একটা জ্বলনশীল তরলের সমুদ্র, কিন্তু তুমি দেশলাই কাঠি ফেললেও এখানে আগুন জ্বালাতে পারবে না অক্সিজেনের অভাবে।”
ডক্টর জসের কথা শুনে হঠাৎ অয়নের মাথায় একটা বুদ্ধি খেলে গেল। এক লাফে ইচিকার কাছে পৌঁছে সে বলল, “আমাদের কাছে অক্সিজেন ফ্লেয়ার আছে?” ইচিকা কিছু বুঝতে না পেরেও মাথা নেড়ে হ্যাঁ বলল। ততক্ষণে তার পিছনে অলিভার আর ডক্টর জস এসে দাঁড়িয়েছে। ডক্টর জস প্রশ্ন করলেন, “কী হয়েছে অয়ন? অক্সিজেন ফ্লেয়ার লাগবে কেন?”

অয়ন তাদের দিকে তাকিয়ে উত্তেজিত গলায় বলল, “ভেবে দেখুন ডক্টর জস,রেডার ইমেজ ছাড়া আমাদের কাছে কিছুই নেই। যদি সত্যি এটা কোন প্রাণী হয়ে থাকে, তাহলে তার চলাফেরা আমাদের যন্ত্রে ধরা পড়ছে না। একমাত্র উপায় যদি আমরা লেকের পেরিমিটারে আগুন জ্বালিয়ে দিতে পারি। সেই আগুনে প্রাণীটা পালানোর চেষ্টা করবে,অথবা উঠে আসবে ডাঙায়। আর কিছু না হলেও স্টিল ক্যামেরাতে পরিষ্কার দেখা যাবে তাকে?”
ইচিকা আতঙ্কিত স্বরে বলল, “তুমি জানো অয়ন তুমি কী বলছ? মিথেনের লেকে আগুন জ্বালালে এক মুহুর্তে সমস্ত সমুদ্র জ্বলতে শুরু করবে। যদি কোন অন্য প্রাণী থেকেই থাকে মুহুর্তের মধ্যে পুড়ে ছাই হয়ে যাবে। তা যদি নাও হয়,যদি সেই প্রাণী ভয় পেয়ে আরো গভীরে চলে যায়,আমাদের রেঞ্জের বাইরে চলে গেলে তার কোন প্রমাণই পাওয়া যাবে না।”

অয়ন তার দিকে তাকিয়ে বলল, “ইচিকা,তুমি আসল কথাটাই ভুলে যাচ্ছ উত্তেজনাতে। এখানে অক্সিজেন নেই, আগুন ছড়িয়ে যাওয়ার কোন প্রশ্নই ওঠে না। আমরা একটা বিশেষ জায়গায় অক্সিজেন ফ্লেয়ার দিয়ে সেখানে নিয়ন্ত্রিত আগুন জ্বালাব। কোন ঝামেলা হলে অক্সিজেন ফ্লেয়ার বন্ধ করে দিলেই আগুন নিজেই নিভে যাবে।”
অলিভার এবার বলল, “অয়নের কথায় যুক্তি আছে, কিন্তু আগুন জ্বালালেই যে সেই প্রাণীকে দেখা যাবে তার কোন নিশ্চয়তা নেই। এত বড় লেকে সে যে কোন জায়গায় থাকতে পারে। সেক্ষত্রে আমরা কী করব?”

ডক্টর জস উত্তর দিলেন, “সেই সম্ভাবনা কম। আমরা সকালে প্রায় চার ঘন্টা ধরে লেকের তলায় রেডারে ছবি তুলেছি। জিনিসটা যাই হোক,সে একটা বিশেষ জায়গার ভিতরেই আছে বলে আমার ধারণা। আমাদের হাতে বিশেষ সময় নেই। কাজ শুরু করে দেওয়া যাক,কি বল?”

সকলেই সম্মতি দিল। ইচিকা রোভারের ভিতর থেকে সাবম্যারিনের কমান্ড লক করতে লাগল। অয়ন হাতঘড়ি দেখল,দেড় ঘন্টা হয়ে গেছে। আগামী দেড় ঘন্টায় কোন ফল না হলে সাবম্যারিনকে ওপরে আসতেই হবে। অক্সিজেন ফ্লেয়ার আকস্মিক মহাকাশ দুর্ঘটনার ক্ষেত্রে অভিযাত্রীদের প্রাণ বাঁচানোর জন্যে ব্যবহার করা হয়। একবারে কাজ না হলে বাকি ফ্লেয়ারগুলো এই কাজে কোনমতেই ব্যবহার করা যাবে না।

“মোবাইল কোর ড্রিল রিং ইস ডিসকানেক্টেড ফ্রম ইস্টপ। প্রিসিডিং টু লিগেরিয়া থ্রি হান্ড্রেড মিটারস টু শুট ইমেজেস। পেরিমিটার লকড। ফ্লেয়ার্স রেডি। ইনিসিয়েট ইগনিশন সিকোয়েন্স। রিএকটিভ মোমেন্ট ইমিডিয়েট। ”
অয়নদের দিকে একবার তাকিয়ে ইচিকা সাবম্যারিনের অক্সিজেন ফ্লেয়ার শুরু করে দিল। সকলে সাবম্যারিন থেকে পাঠানো লাইভ ভিডিওর ওপর ঝুঁকে পড়েছে। ইচিকা বোতাম টিপতেই লেকের ভিতরে আগুন জ্বলে জায়গাটাকে আলোকিত করে দিল। কিন্তু এই আগুন পৃথিবীর মতন নয়,এতে একটা নীলাভ সবুজ ভাব আছে। ইচিকা একদৃষ্টিতে ভিডিও স্ক্রিনের দিকে তাকিয়ে অক্সিজেন লেভেল কন্ট্রোল করে যাচ্ছে।

এখন লেকের তলাটা পরিষ্কার বোঝা যাচ্ছে। কোন বুদ্বুদ নেই,গাছপালা নেই,শ্যাওলা নেই,শুধু মিথেনের সমুদ্র। অয়ন ইচিকাকে বলল, “সাবম্যারিন আরেকটু এগিয়ে নিয়ে যাও। কোন মুভমেন্ট দেখলে অক্সিজেনের প্রেসার বাড়িয়ে দিও।”

ইচিকা সেইমত এগিয়ে নিয়ে গেল সাবম্যারিন। ক্রমে তারা সকলেই দেখতে পেল লেকের তলায় দেখতে পাওয়া যাচ্ছে একটা পাহাড়। সেই পাহাড়ের গায়ে অসংখ্য ছোট বড় গর্ত।

ডক্টর জস চেঁচিয়ে উঠে বললেন, “ও মাই গড। দেয়ার ইস এনাদর ওয়র্ল্ড আউট দেয়ার।”সুড়ঙ্গ। ছোট বড় নানা সুড়ঙ্গ বুঝতে পারা যাচ্ছে হালকা আগুনের আভায়। তার একেকটা এত বড় যে দুজন তিনজন মানুষ একসঙ্গে ঢুকতে পারে। অধীর আগ্রহ আর উত্তেজনার মধ্যেও ইচিকার হাত একবারের জন্যেও কাঁপেনি। অয়ন ইচিকার উদ্দেশ্যে বলল, “ওই সুড়ঙ্গের মুখে আগুনটা দাও। আগুনের তেজটা আরেকটু বাড়িয়ে দাও।”

ইচিকা সেই কথা মত সুড়ঙ্গেরমুখে আগুন ফেলতেই একটা গুম গুম করে আওয়াজ শুরু হলো। সঙ্গে সঙ্গে একটার পর একটা বিস্ফোরণ শুরু হলো সুড়ঙ্গের ভিতরে। লাল নীল সবুজ আলোর ছটার বিচ্ছুরণে অয়নদের চোখ ধাঁধিয়ে গেল। সহসা ঝড়ের মত একটা অদৃশ্য কিছু এসে ধাক্কা মারলো সাবম্যারিনে। ভিডিও আবছা হতে শুরু করেছে। ইচিকা এর মধ্যেই চিৎকার করে বলল, “ঐটা কি?”
আগামী সংখ্যায় সমাপ্য

গল্পের বিষয়:
উপন্যাস

Share This Post

আরও গল্প

সর্বাধিক পঠিত