অজান্তে ভালবাসা

অজান্তে ভালবাসা

ঠাকুরগাঁও জেলার বিশিষ্ট শিল্পপতি আনিস চৌধুরীর একমাত্র কন্যা সেতু। আনিস চৌধুরী সেতুর বিয়ে দিতে চান তার বন্ধুর ছেলে ইমনের সাথে। ইমন তিন বছর জাপান থাকার পর এক মাস হলো দেশে ফিরে এসেছে।
সেতু ঠাকুরগাঁও সরকারী কলেজের উচ্চ মাধ্যমিক শ্রেণীর দ্বিতীয় বর্ষের ছাত্রী। এ বিয়েতে সে একেবারেই রাজী নেই কারণ ও ভালবাসে তারই কলেজের বি,এ চতুর্থ বর্ষের ছাত্র সোহেলকে। সোহেলকে ও ভীষণ ভালবাসে তাই তাকে ছাড়া এ জীবনে অন্য কোন পুরুষের কথা কল্পনাও করতে চায় না। বিয়ের কথা বলাতে ও সরাসরি ওর বাবার মুখের সামনে বলে দিয়েছে- বিয়ে যদি করতে হয় সোহেলকেই বিয়ে করবো, ওকে ছাড়া অন্য কাউকে বিয়ে করতে পারবো না। আনিস চৌধুরী মেয়েকে অনেক ভাবে বোঝান- দেখ, আকবর মিয়া একজন নামকরা স্মাগলার। একজন স্মাগলারের ছেলের সাথে তোর বিয়ে দিলে বন্ধু মহলে আমি মুখ দেখাতে পারবো না। সবচেয়ে বড় কথা হলো ওর বাবার স্বভার চরিত্র খুবই খারাপ। দুদিন পর সোহেল যে ওর বাবার মতই হবে এ বিষয়ে কোন সন্দেহ নেই। আমি জেনে শুনে কিছুতেই এরকম একটি ছেলের সঙ্গে তোর বিয়ে দিতে পারি না। লক্ষ্মী মা আমার, তোর ভালর জন্য বলছি ও ঘরে গেলে তুই কিছুতেই সুখি হতে পারবি না। আমার কথা শোন, পাগলামী করিস না ইমন ছেলেটা খুব ভাল ওকে বিয়ে করলে জীবনে সুখি হতে পারবি।

ও সুখ আমি চাইনা, আমি সোহেলকে চাই। ওকে ছাড়া আমি কিছুতেই বাঁচবো না। একজনের চরিত্র দিয়ে অন্যজনকে বিচার করতে নেই। ওর বাবা স্মাগলার, চরিত্রহীন তাই বলে তো ওকে দোষ দেয়া চলেনা। তুমি তো সোহেলকে দেখেছো, ও কত ভদ্র, অমায়িক? তুই যতই সোহেলের প্রশংসা করিস, তার সাথে তোর বিয়ে দিতে পারবো না। সমাজে আমার মান সম্মান আছে। থাকো তোমার মান সম্মান নিয়ে। বিয়ে যদি করতে হয় তাহলে সোহেলকেই বিয়ে করবো। ওর সাথে বিয়ে না দিলে আমি আত্মহত্যা করবো। এ কথা শুনে চৌধুরী সাহেব কিছুক্ষণ নিশ্চুপ থেকে এরপর বলেন, আমি অন্য দশটা বাবার মত নই। আত্মহত্যার ভয় দেখিয়ে কোন কাজ হবে না। সোহেলকে ছাড়া অন্য কোন ছেলের কথা বল আমি বিয়ে দিতে রাজী আছি, কোন আপত্তি করবো না। সোহেলের জন্য আমার কাছে শত অনুনয় বিনিনয়, কান্নাকাটি করেও কোন লাভ হবেনা। ওর জন্য মরতে চাও মরো, কোন বাঁধা দেব না। এই আমার শেষ কথা, দ্যাট ইজ ফাইনাল- “এই বলে আনিস চৌধুরী চলে যান।“

সেতু ভীষণ ভাবনায় পড়ে যায়। সর্বশেষ ফর্মূলা আত্মহত্যার কথা বলেও যখন কোন কাজ হলো না তখন বুঝে নেয় ডেডী কিছুতেই সোহেলের সঙ্গে ওর বিয়ে দেবে না। যা করার ওকেই করতে হবে। সোহেলকে পেতে হলে বাড়ি থেকে পালাতে হবে তাছাড়া অন্য কোন উপায় নেই। পালিয়ে বিয়ে করলে ডেডী একদিন না একদিন ওদের দুজনকে মেনে নেবে এতে কোন সন্দেহ নেই। শেষে অনেক চিন্তা ভাবনা করে বাড়ি থেকে পালিয়ে যাওয়া ওর বেস্ট মনে হলো।
আনিস চৌধুরীর কাছে মেয়ের মতি গতি একটু সন্দেহজনক মনে হতেই তিনি বাড়ির চাকর-বাকর সবাইকে কড়া হুকুম দিয়ে দিলেন- সেতুর দিকে সব সময় দৃষ্টি রাখতে। দাঁড়োয়ানদের বলে দেন, সেতুর বাড়ি থেকে বের হওয়া বন্ধ। ও কোন ভাবেই যেন বাড়ি থেকে বের হতে না পারে।

এভাবে চারদিকের খোলা পথগুলো এতো তাড়াতাড়ি বন্ধ হয়ে যাবে তা সেতু কল্পনাও করতে পারেনি। বিপদে ও সাহস না হারিয়ে সব সময় সুযোগ খুঁজতে লাগলো কিভাবে বাড়ি থেকে পালানো যায়। পালানোর কোন উপায় না দেখে শেষে একদিন খুব ভোরবেলা দোতলার গ্রীলের সাথে শাড়ি বেঁধে তা বেয়ে নিচে নেমে আসে। সঙ্গে কোন কাপড় চোপড় নেয়নি, শুধু মাত্র সাথে আছে একটি ভ্যানেটি ব্যাগ। তার মধ্যে নিয়েছে হাজার দশেক টাকা ও কিছু কসমেটিক জিনিসপত্র। চারদিকে চেয়ে দেখে কেউ নেই। আস্তে-আস্তে সামনের দিকে এগিয়ে যায়। বাড়ির বাউন্ডারি মাঝারি ওয়াল খুব কষ্টে পার হয়ে রাস্তায় এলো। রাস্তায় নেমে বাড়ির দিকে তাকায় কেউ তাকে ফলো করছে কিনা বা কেউ দেখে ফেলছে নাকি? কাউকে না দেখে একটা স্বস্তির নি:শ্বাস ফেলে এগিয়ে চলে সামনে। কিছুদুর গিয়ে সামনে একটি খালি রিক্সা দেখতে পেয়ে ডাক দেয় রিক্সাওয়ালাকে। রিক্সা থামলে তাতে চড়ে বসে। সরকারি কলেজের ছাত্রাবাসের সামনে রিক্সা থেকে নেমে রিক্সা ভাড়া দিয়ে ছাত্রাবাসের দিকে এগিয়ে যায়।

দোতলায় সোহেলের রুমের কাছে এসে থমকে দাঁড়ায় দরজায় তালা মারা দেখে। সেতুকে দেখে এক ছেলে এগিয়ে এসে বলল, সোহেল ভাইর কাছে এসেছেন বুঝি? জী। তিনি কোথায় দেখছিনা যে? আজ দুদিন হলো ঢাকায় গেছেন। ঢা-কা-য়। কোনদিন ফিরবে কিছু বলে গেছে কি? না বলেনি। তবে সপ্তাহ খানিক আগে ফিরবে বলে তো মনে হয়না। ঠিক আছে, আমি এখন আসি। সোহেল ভাই এলে কিছু বলবো কি? না, কিছু বলতে হবে না। সিঁড়ি বেয়ে নিচে নেমে এলো। ভীষণ খারাপ লাগলো ওর। সোহেলের ওপর ভীষণ রাগ হলো আজ কতদিন পার হয়ে গেল একটি বারের জন্যও সোহেল ওর কোন খোঁজ নেয়নি। এদিকে ঢাকা চলে গেল তা আবার ওকে না জানিয়ে। এখন ও কোথায় যাবে কি করবে? এতক্ষনে বাড়িতে নিশ্চয় হৈ চৈ কাণ্ড পরে গেছে। চারদিকে লোক বেড়িয়ে পড়েছে ওকে খোঁজার জন্য।

ও চিন্তা করে- এখন যদি বাড়িতে ফিরে যাই তাহলে সোহেলকে কোনদিনও বিয়ে করতে পারবো না। বাড়ি থেকে আর পালানো কল্পনাও করা যাবে না। শেষে ডেডীর পছন্দ করা ছেলে ইমনকে বিয়ে করতে হবে। না, এ হতে পারে না। সোহেলকে ভালবাসি, সোহেলকেই বিয়ে করবো। এ হৃদয়ে সে ছাড়া অন্য কারো স্থান নেই। আজ ওকে পেলে কোন সমস্যাই হতো না। সরাসরি কোর্টে গিয়ে আগে বিয়ের কাজটা সেরে ফেলা যেত। সোহেল এতে কোন আপত্তি করতো না বরং খুশিই হতো। এখন কি করা যায় চিন্তায় ওর মাথাটা খারাপ হয়ে যাবার যোগাড়। হঠাৎ মাথায় এক বুদ্ধি খেলে গেল। ও প্রায় দৌড়ে দোতলায় উঠে ছেলেটিকে জিজ্ঞাসা করলো- আচ্ছা, সোহেল ভাই ঢাকায় কোথায় আছে তার ঠিকানা জানেন? হ্যাঁ, জানি। উফ্‌ বাঁচালেন, বড় চিন্তায় ছিলাম। আপনি কি ঢাকায় যাবেন? না মানে যাবো না, একটা জরুরী টেলিগ্রাফ করে দেব। ও তাই বলেন। ছেলেটি ঠিকানা লিখে দিয়ে বলল, সোহেল ভাইকে বুঝি আপনার খুবই দরকার? জী। থ্যাঙ্ক ইউ, আমার খুব উপকার হলো। ধন্যবাদ দিয়ে লজ্জা দেবেন না, এটা আমার কর্তব্য। আচ্ছা ভাই আসি। ঠিক আছে।

দোতলা থেকে নেমে সেতু নির্জন রাস্তা দিয়ে আপন মনে হাঁটতে হাঁটতে ভাবে- ঢাকায় যাওয়াটা কি ঠিক হবে। সম্পূর্ণ অপরিচিত জায়গা তা ছাড়া একা মানুষ, গিয়ে আবার কোন বিপদে পড়ে কে জানে? আবার ভাবে- সেই দিন কি আর আছে। মেয়েরা আজ অনেক এগিয়ে গেছে, তারা আজ দেশ হতে দেশান্তরে পাড়ি দিচ্ছে। আর ও সামান্য ঢাকায় যেতে পারবে না এটা একটা কথা হলো। ঠিকানা যখন আছে তাহলে সোহেলকে খুঁজে পেতে তেমন কষ্ট হবে না। তাছাড়া যমুনা ব্রীজের কল্যাণে সকালে কোচে উঠলে বিকেলেই ঢাকায় পৌঁছতে পারবে। যদি সোহেলকে খুঁজে না পাওয়া যায় তাহলে রাতটুকু বড় কোন হোটেলে কাটিয়ে দেবে। শেষ পর্যন্ত সেতু ঢাকা যাওয়া চুড়ান্ত সিদ্ধান্ত নিয়ে নিল। একটি খালি রিক্সা দেখে তাতে চড়ে বলল, হানিফ কাউন্টার চলো। সাড়ে সাতটার সময় হানিফ কাউন্টারের সামনে এসে পৌঁছিল। রিক্সাভাড়া পরিশোধ করে কোচের টু সিটের জানালার পাশের একটি সিট নেয়। টিকিট কেটে যাত্রীদের বসার আসনে সোফার কোনায় ওড়না দিয়ে ভালভাবে মাথাটা ঢেকে বসে থাকে। বলা তো যায়না কখন কোন পরিচিত মানুষ দেখে ফেলে। আটটা পাঁচ মিনিটে ড্রাইভার কোচ ষ্টার্ট করে সেতু জানালার পাশে ডি-১ সিটে বসেছে। ও মনে মনে ভাবছে- পাশের সিটের লোক এখনো বসেনি, বসবে তো অবশ্যই কিন্তু লোক যে কেমন হয় তা কে জানে? স্বভাব চরিত্র ভাল হবে তো? অযথা বকবক করে সারা রাস্তায় কান ঝালাপালা করবে নাতো? টিকিট কাটার সময় ভেবেছিল দুটো সিট একাই নিতে কিন্তু লোকজন কি ভাববে তাই নেয়নি।

জেলা স্কুলের সামনে রাস্তার স্পিড ব্রেকারের কাছে কোচটা একটু স্লো হতেই এক সু-দর্শন হ্যান্ডসাম যুবক দৌড়ে এসে কোচে লাফিয়ে উঠে দ্রুত নিঃশ্বাস নিতে থাকে। একটু জিরিয়ে বলল, ভাগ্যটা ভাল আর একটু দেরি হলেই কোচটা মিস্‌ হতো। এই বলে পকেট থেকে টিকিট বের করে কয়েক পা এগিয়ে এসে সেতুকে বলল, আপনার পাশের সিটটি আমার, আমি কি বসতে পারি? সেতু বলল, আপনার ক্রয় করা সিট আপনি দাঁড়িয়ে থাকেন না বসে থাকেন আমি অনুমতি দেবার কে? কথা শুনে আশে পাশের সিটের লোকজন হেসে উঠে।যুবকটি লোকজনের হাসিতে কোন অপ্রস্তুত না হয়ে স্বাভাবিক ভাবে সিটে বসে পাশের সিটের এক যাত্রীকে বলে, জানেন ভাই আজকের এই দিনটি আমার জীবনের স্বরণীয় দিন হয়ে থাকবে।লোকটি একটু অবাক হয়ে বলল, কেন ভাই?

বাস, কোচ, ট্রেন যত কিছুতেই যাতায়াত করেছি কোনদিন কোন মেয়ের পাশে বসার সৌভাগ্য হয়নি। এই প্রথম কোন মেয়ের পাশে বসার সৌভাগ্য হলো তাও আবার অপরূপা সুন্দরী । তাই দিনটি কি আমার জন্য স্মরণীয় নয়?
লোকটি হেসে বলল, হ্যাঁ স্বরণীয়। সেতু রেগে বলল, ননসেন্স।যুবকটি বলল, জী ম্যাডাম কিছু বললেন। আমার মাথা। তা তো দেখতেই পাচ্ছি। ইডিয়ট কোথাকার। কি জ্বালাতনে পড়লাম। এতক্ষণ মনে করেছি সৌভাগ্য এখন দেখছি দুভার্গ্য। সারা রাস্তায় এখাবে গালি খেয়ে যেতে হবে দেখছি। ম্যাডাম মাফ করে দেওয়া যায় না। গায়ে পড়ে মেয়েদের সঙ্গে কথা বলতে লজ্জা করে না। যুবকটি ঢোক গিলে বলল, আমি আপনার গায়ে কখন পড়েছি। এখনই এ রকম মিথ্যে কথা বলছেন, আর একটু পড়ে না জানি আবার কি কি বলে বসবেন। চুপ করুন। বক্‌ বক্‌ না করে চুপ করে থাকতে পারেন না?যুবকটি চুপ মেরে বসে থাকে। খোচাবাড়ির পর থেকে প্রায় আধা মাইল পর্যন্ত একটি কালভার্ট ও রাস্তা মেরামতের কাজ চলছে। তাই কোচটা হেলে দুলে চলছে। কোচের বাম পাশ একটু বেশি হেলে যেতেই যুবকটি সেতুর উপর হেলে পড়ে।

সেতু ভীষণ রাগান্বিত হয়ে বলল, অসভ্য কোথাকার। গায়ের ওপর হেলে পড়ছেন কেন? সরি, আমি ইচ্ছে করে পড়িনি মানে কোচটা হেলে যেতেই এমন হলো। থাক আর কোচের দোষ দিতে হবে না। এবারের মতো মাফ করা হলো, এরপর গায়ের উপর পড়লে কিন্তু অপমান করে ছাড়বো। যুবকটি মাথা নীচু করে বলল, অপমানের আর বাকি রইলো কোথায়। কি বললেন? না, কিছুনা। কিছুক্ষণ পর কোচটির ডান পাশ হেলে যেতেই সেতু আঃ করে যুবকটির ওপর হেলে পড়ে। যুবকটি দু হাত বাড়িয়ে ওকে না ধরলে ও নির্ঘাৎ মাথায় ব্যথা পেত। সেতু একটু লজ্জিত হয়ে বলল, সরি। যুবকটি কিছু বলল না শুধু একটু হাসি দেয়। ভাঙ্গা রাস্তাটুকু পার হবার পূর্ব মুহুর্তে সেতু আবার যুবকটির গায়ের ওপর পড়ে। সেতু আবারও বলল, সরি। যুবকটি হেসে বলল, এবার বুঝলেন তো আপনার গায়ের ওপর তখন ইচ্ছে করে পড়েছি কি না? ইচ্ছে করে পড়েছেন না অনিচ্ছায় পড়েছেন তা আপনিই ভাল জানেন। দুবার নিজেই প্রমাণ পেয়ে কেন এ কথা বলছেন? দেখুন মেয়েদের ব্যাপার আলাদা। তারা সব সময় গাড়িতে জার্নি করেনা, এজন্য গাড়ির ঝাঁকুনিতে তারা ব্যালেন্স রাখতে পারে না। আপনারা পুরুষ মানুষ সব সময় গাড়িতে জার্নি করেন। সামান্য ঝাঁকুনিতে আপনি ব্যালেন্স রাখতে পারছেন না এটা কি করে এতো সহজে মেনে নেই। আপনি সত্যি করে বলুন তো কিছুটা ইচ্ছে করেই গায়ের ওপর পড়েছেন না?

বুঝেছি, আপনার সঙ্গে কথায় পারা যাবে না। থাক অনেক ঝগড়া হলো এবার দুজনে একটু পরিচিত হই, বলা যায় না আবার হয়তো কোনদিন দেখা হয়ে যেতে পারে বাসে বা ট্রেনে। তা মিস্‌ আপনার নামটা কি জানতে পারি? সুন্দরী মেয়ে দেখলেই বুঝি পরিচিত হতে ইচ্ছে করে। এভাবে কতজন মেয়ে সঙ্গে পরিচিত হয়েছেন। স্বভাব, চরিত্র দেখে মনে হচ্ছে গার্ল ফ্রেন্ডের অভাব নেই। দেখুন আপনি কিন্তু খুব বাড়াবাড়ি করছেন। এক, নিজের একটু রূপ আছে বলে আমাকে মানুষ হিসেবে দামই দিচ্ছেন না। দ্বিতীয়ত, আমার চরিত্রের ওপর অযথা কলঙ্কের দাগ দিচ্ছেন। মেয়েদের কিন্তু এতোটা বাড়াবাড়ি করা উচিত নয়। আপনি আমার পাশের সিটের লং জার্নির একজন যাত্রী। পাশের যাত্রীর সঙ্গে কথা বলা ও পরিচিত হওয়া এটাতো আমি কোন দোষের কিছু দেখিনা বরং কথা বলতে বলতে তাড়াতাড়ি সময় পার হয়ে যায়। আপনার পরিচয় দিতে যখন এতোই আপত্তি তা সরাসরি বললেই পারেন। এভাবে অপমান করাটা কি ঠিক ? সেতু কথার উত্তর না দিয়ে নরম গলায় বলল, আপনার নাম কি? আমার প্রশ্ন আমাকেই করছেন। উত্তরটা দিয়ে তারপর প্রশ্ন করলে ভালো হতো না। ও কথা থাক, মনে করুন আমিই আগে আপনার পরিচয় জানতে চাচ্ছি। ঠিক আছে বলছি। আমার নাম সাপিয়ার রহমান (আকাশ)। আকাশ-, এটা কি ক্ষেত্র বিশেষে নিজের দেয়া নাম।

নিজের দেয়া নাম হতে যাবে কেন। আমার মেঝ মামা নাম দিয়েছেন আকাশ। হঠাৎ নাম নিয়ে এ প্রশ্ন? না না এমনিই আর কি। আজকাল তো আবার ছেলেরা নিজেদের আসল নাম কালু মিয়া, লালু মিয়া লুকিয়ে রেখে মেয়েদের কাছে আকাশ, বাতাস, সাগর এসব নাম বলে থাকে তো সেটা মনে হতেই আপনি কি আমাকে সেই ধরনের ছেলে ভেবেছেন বিচিত্র কি, আপনাকে তো আমি চিনি না হতেও তো পারেন? কথা শুনে আকাশ মাথা চেপে ধরে মনে মনে বলল, কি সাংঘাতিক মেয়েরে বাবা। এর সাথে কথা বলাই তো বিপদ। মুখের সামনে কোন কথা বলতে বিন্দু মাত্র দ্বিধা নেই। কি ব্যাপার। আসল কথা বলাতে খুব খারাপ লাগছে বুঝি? খারাপ লাগতে যাবে কেন? কথা হলো এ বিষয়ে আপনারাই তো অগ্রণী ভূমিকা পালন করছেন। মানছি ছেলেরা ক্ষেত্র বিশেষে বলে থাকে কিন্তু আপনারা তো বাবা মায়ের দেয়া নাম হোসনে আরা, আম্বিয়া, ময়না, সখিনা এসব নাম একেবারে ঝেড়ে ফেলে দিয়ে তানি, দৃষ্টি, সৃষ্টি, চৈতী, ইতি, কথা, অন্যন্যা এসব নাম নিজেরাই সিলেক্ট করেন। এক সময় বাবা-মা তাদের দেয়া নাম প্রত্যাহার করে আপনাদের দেয়া নামে ডাকতে থাকে। বলুন কথাটা মিথ্যে আমি আজ পর্যন্ত এরকম কথা শুনিনি, তাই এ বিষয়ে আমার নলেজ কম। এতো সহজে পরাজয় মেনে নিলেন। কথা বার্তায় তো বোঝা যায় হার মানার পাত্রী আপনি নন? এখানে হার জিতের কোন প্রশ্নই আসে না। যে বিষয়ে শুনিনি, সে বিষয়ে তর্ক করতে যাবো কেন? আকাশ একটু আস্তে করে বলল, এইতো এবার লাইনে এসেছেন। কি বললেন? না কিছুনা। এরপর আর দু জনের মাঝে কথা হয় না।

কোচ বীরগঞ্জ কাউন্টারের সামনে এসে কয়েকজন যাত্রী উঠিয়ে চলতে থাকে। যেতে যেতে এক সময় রংপুর মর্ডানে এসে কোচ থামে ডিজেল নেবার জন্য। আকাশ কোচ হতে নেমে টয়লেট সেরে দোকান হতে একটি সিগারেট কিনে কোচ হতে প্রায় পনের বিশ হাত দুরে দাঁড়িয়ে সিগারেটের ধোঁয়া ছেড়ে মনে মনে আল্লাহকে উদ্দেশ্যে করে বলল, আল্লাহ্‌। কতকাল আর এভাবে ঢাকায় চাকুরির ইন্টারভিউ দিতে যাবো। ডিগ্রী পাশ করার পর এক বছর ধরে কত চাকুরির ইন্টারভিউ দেয়া হলো কিন্তু চাকুরিতো হচ্ছে না। এবার দয়া করে মুখের দিকে তাকাও। মা যে কষ্ট করে দুহাজার টাকা দিয়েছেন তা যেন বিফলে না যায়। ড্রাইভার কোচ স্টার্ট করার পরই সে কোচে উঠে। এগিয়ে যায় নিজ আসনের কাছে। মনে মনে ভাবে মেয়েটি হয়তো ওকে কিছু জিজ্ঞাসা করবে কিন্তু না, মেয়েটি সিটে হেলান দিয়ে চোখ বন্ধ করে আছে। আকাশও সেতুকে কিছু জিজ্ঞাসা না করে সিটে চুপচাপ বসে থাকে। প্রায় ঘন্টা খানিক সময় পার হয়ে গেল এর মধ্যে সেতু আর চোখ মেলে তাকায় না। এক সময় সেতু আকাশের ঘাড়ে হেলান দিয়ে দেয়। আকাশ কিছু বলল না, বুঝতে পারে মেয়েটি এখন গভীর ঘুমে আচ্ছন্ন তাই ওর ঘাড়ে হেলান দিয়ে ঘুমিয়ে পড়েছে। আকাশের ভীষণ ভাল লাগে এবং ঘুমও পায়। এক সময় সেও আস্তে আস্তে ঘুমিয়ে পড়ে সেতুর শরীরের সাথে হেলান দিয়ে।

দুপুরে কোচ এসে পৌঁছে নগরবাড়ি ঘাটে। কিছুক্ষণ পরই ফেরীতে কোচ উঠে। এর মধ্যে একবার কোচের টায়ার পাল্টানো হয়েছে তবুও সেতুর ঘুম ভাঙ্গেনি, আকাশের মাঝে মধ্যে ঘুম ভেঙ্গেছে। ঘাটে প্রচুর লোকের সমাগম । তাই লোকজনের সোরগোল ও ফেরীর হর্ণের শব্দে আকাশের ঘুম ভেঙ্গে যায়। চোখ মেলে দেখে কোচের ভেতর সামান্য কয়েকজন লোক বসে আছে। বুঝতে পারে, কোচের লোকজন কেউ ফেরীর কেবিনে বসে খাওয়া-দাওয়া করছে, কেউ ছাদে দাঁড়িয়ে হাওয়া খাচ্ছে, কেউ হয়তো ফেরীর এদিক ওদিক ঘোরাফেরা করছে। ওর খুব ক্ষিধে পেয়েছে, কেবিনের ভিতর গিয়ে ভাত খেতে খুব ইচ্ছে করছে কিন্তু এমন সুখময় স্থান ত্যাগ করে যেতে মন চাইছে না। তাছাড়া যাবে কিভাবে? মেয়েটি দুহাত দিয়ে ওর গলা জড়িয়ে ধরে পরম তৃপ্তিতে ঘুমিয়ে আছে। ও এখন উঠে দাঁড়াতে গেলেই মেয়েটির ঘুম ভেঙ্গে যাবে এতে কোন ভুল নেই। এ চিন্তা করে আর স্থান ত্যাগ করে না। ফেরী হর্ণ বাজিয়ে চলতে শুরু করে নগরবাড়ি ঘাট হতে আরিচা ঘাটের উদ্দেশ্যে। হঠাৎ সেতুর ঘুম ভেঙ্গে যায়। চোখ মেলে যখন দেখতে পেল ও আকাশকে জড়িয়ে ধরে ঘুমিয়ে আছে। মুহুর্তেই দেরি না করে আকাশকে ছেড়ে দিয়ে ওড়নাটা বুকের ওপর ঠিকঠাক করে বলল, সরি, আই এ্যাম রিয়েলী ভেরী সরি। জানেন, গাড়িতে আমার মোটেই ঘুম আসেনা। তিন রাত ধরে আমার ভাল ঘুম হয়নি তাই আজ এমন ভাবে ঘুমিয়ে পড়েছি। আপনি কিছু মনে করেননি তো? না না কিছু মনে করতে যাবো কোন দুঃখে বরং কি যে খুশি হয়েছি তা বলে বোঝাতে পারবো না। সারা রাস্তায় যদি এভাবে যেতেন তাহলে আরো খুশি হতাম। অসভ্য, ইতর, বদমাইশ।

এতো গালি দিলেন যে? গালি দেব না তো কি করবো, একশো বার গালি দেব। আপনার গায়ের সাথে হেলান দিয়ে যখন ঘুমিয়ে পড়েছি তখন আমাকে সরিয়ে দেননি কেন? এখন বুঝতে পেরেছি আমার এতো ঘুম আসার পেছনে আপনার হাত আছে। মিস্‌ আপনার ভাগ্য খুব ভাল যে, আমাকে পাশের যাত্রী হিসেবে পেয়েছেন। সেতু ব্যঙ্গ সুরে বলল, তাই নাকি? শুধু তো ঝগড়া করতেই শিখেছেন মাথায় তো বুদ্ধি রাখেননি। একটু বুঝলে একথা বলতেন না, বিনা দ্বিধায় তা স্বীকার করে নিতেন। যেভাবে মৃত মানুষের মতো ঘুমিয়ে ছিলেন, আমার জায়গায় অন্য কেউ হলে ঠিকই টের পেতেন। “এই বলে আকাশ চুপ করে থাকে।”  কি ব্যাপার চুপ করে আছেন যে বলুন আমাকে কি, খেয়ে ফেলতো?যদি খাওয়া যেতো তাহলো ঠিকই খেয়ে ফেলতো। কিভাবে বলি বলতে তো আমারই লজ্জা করছে। সব বুঝেও যখন না বোঝার ভান করে আমার মুখ থেকে শুনতে চান, ঠিক আছে বলছি। অন্য কোন যাত্রীকে এভাবে জড়িয়ে ধরে ঘুমে অচেতন হয়ে পড়ে থাকলে সে নিজের দেহের ক্ষুধাটা মেটাতো পারতো না ঠিকই কিন্তু আপনার উপর দিয়ে প্রাণের ক্ষুধাটা অবশ্যই মিটিয়ে নিত।

কথা শুনে সেতু লজ্জায় মাথা নত করে থাকে। ও ঠিকই এতক্ষণ বুঝতে পারেনি আকাশ ওকে কি বোঝাতে চাইছে। বুঝতে পেরে চিন্তা করে দেখে কথাগুলো মিথ্যে নয়। সে কথা ভাবতেই শরীরটা একটু কেঁপে উঠলো। নিজের উপর ধিক্কার দিয়ে মনে মনে বলল, কেন যে অযথা তর্কগুলো করতে গেল। মাথা নীচু করে যে উত্তর দিন। আমার কথা কি বুঝতে পেরেছেন নাকি আর একটু বুঝিয়ে বলবো? সেতু কথার উত্তর না দিয়ে চারদিকে তাকিয়ে বলল, আমরা কোথায় এসেছি। গাড়ি যাচ্ছে না কেন? গাড়ি ঠিকই যাচ্ছে। তবে তাকে নিয়ে যাওয়া হচ্ছে। তার মানে? মানে হলো আমরা এখন ফেরীতে আছি। সেতু ফেরীর কথা শুনে আৎকে উঠে বলল, ফেরী! ফেরী এলো কোথা থেকে! আমি কিছুই তো বুঝতে পারছি না। যমুনা ব্রীজ থাকতে কেন ফেরী দিয়ে যাওয়া হচ্ছে? আকাশ বলল, ম্যাডাম আপনি গত দুমাসে কি কোন দৈনিক পত্রিকা দেখেছেন। দেখেছি তবে তেমন ভাবে নয়। কেন বলুন তো, যমুনা ব্রীজ কি ভেঙ্গে গেছে? ভাঙ্গেনি, ফাটল ধরেছে। এটা তো অনেক দিন আগের কথা। এরপরও তো বাস, ট্রেন চলতো। চলতো ঠিকই কিন্তু কেউ মেরামত করেনি। দীর্ঘ দিন ফাটল মেরামত না করার ফলে যখন দেখে ব্রীজ ভেঙ্গে যায় যায় অবস্থা তখন মেরামতের জন্য হাত দিয়েছে। দুমাস হতে চলল কাজ চলছে তাই ফেরীতে যাওয়া। এবার ফেরীতে যাবার কারণ বুঝতে পেরেছেন।

বুঝতে পেরেছি। কিন্তু একটা জিনিস মাথায় ঢুকছে না। ওরা এতোদিন ব্রিজটি মেরামত করেনি কেন? আপনি যেমন জানেন না দুমাস ধরে ফেরী চলছে। তেমনিভাবে যমুনা ব্রীজের কর্তৃপক্ষও এতোদিন জানতো না যে ব্রীজটিতে ফাটল ধরেছে তাই মেরামত করেনি। আপনি ব্রীজ নিয়ে চিন্তা করতে থাকুন আমি ততক্ষনে পেটের চিন্তাটি দুর করে আসি। এই বলে আকাশ উঠে দাঁড়ায়।  এ্যাই শোনেন, আমার বুঝি ক্ষিধে পায়নি। আমাকে ছেড়ে যাচ্ছেন কেন? আকাশ অবাক কন্ঠে বলল, আপনি আমার সঙ্গে কেবিনে গিয়ে ভাত খাবেন? সেতু কাঁধে ব্যাগ ঝুলিয়ে বলল, আপনার কি কোন অসুবিধা আছে এনি প্রোবলেম। কোন অসুবিধা নেই। আপনি আমার সঙ্গে যাবেন এটাতো আমার সৌভাগ্য, চলুন। দুজনে ফেরীর দোতলায় উঠে খাবারের কেবিনে বসে ভাত খেল। খাওয়া শেষ হতেই আকাশ প্যান্টের পকেট হতে টাকা বের করে ওয়েটারকে বিল পরিশোধ করে। সেতু রেগে বলল, আপনি বিল দিলেন কেন? আমি আপনাকে ডেকে এনেছি আমি বিল দেব। টাকা আপনি ফেরত নিন। আমি আপনার টাকায় খাবার খেয়ে ঋণী হয়ে থাকতে চাইনা।

বিল দিয়ে দিয়েছি এখন ফেরত নিতে গেলে কেমন দেখায়। অসুবিধা নেই, কোনদিন যদি আবার আমাদের দেখা হয়ে যায় তখন আমাকে খাইয়ে দেবেন ঋণটা শোধ হয়ে যাবে।  যদি কোনদিন দেখা না হয়? বাংলাদেশটা খুব ছোট আবার দেখা হওয়াটা খুবই স্বাভাবিক আমি মনে করি। ওয়েটার বিল কেটে রেখে বাকি টাকা দিয়ে গেল। আকাশ সেতুকে বলল, এখানে বসে থেকে আর কি করবেন চলুন ফেরীর ছাদে গিয়ে দাঁড়িয়ে গল্প করি, যদি আপনার কোন আপত্তি না থাকে? আপত্তি নেই। আমিই বরং আপনাকে কথাটা বলতাম। দুজনে উঠে দাঁড়ালো। সেতু বলল, আপনি কি স্মোকিং করেন? হ্যাঁ করি, তবে চেইন স্মোকার নয়। একটু দাঁড়ান। এই বলে সেতু কেবিনের কোণে পান সিগারেটের দোকানে গিয়ে এক প্যাকেট বেনসন সিগারেট কিনে নিয়ে এসে আকাশের দিকে বাড়িয়ে বলল, নিন। আকাশ অবাক হয়ে বলল, আমার জন্য সিগারেটের প্যাকেট? হ্যাঁ। আমি আপনার ঋণী হয়ে থাকতে চাইনা তাই নিয়ে এলাম। এই প্যাকেট নিলে তো উল্টো আপনার কাছে ঋণী হয়ে থাকবো। সেতু আকাশের হাতে সিগারেটের প্যাকেট গুজে দিয়ে বলল, কথা না বাড়িয়ে চলুন উপরে যাই। দুজনে সিড়ি বেয়ে ছাদের কর্ণারে গিয়ে দাঁড়ায়। সেতু নদীর পানির দিকে তাকিয়ে বলল, পানির ঢেউটা কত সুন্দর। অনেক দিন পর এতো সুন্দর দৃশ্য দেখছি। আমার ভীষণ ভাল লাগছে আপনার কেমন লাগছে? আকাশ সিগারেটের প্যাকেট খুলে একটা সিগারেট জ্বালিয়ে ধোঁয়া ছেড়ে বলল, আপনি আছেন বলে আমারও ভাল লাগছে। পূর্বের বার বার দেখা জিনিসগুলোতে নতুনত্ব খুঁজে পাচ্ছি।

সেতু হেসে বলল, একটা ব্যক্তিগত প্রশ্ন জিজ্ঞাসা করবো। একটা কেন হাজারটা করুন। আপনার কোন প্রেমিকা আছে? আকাশ দীর্ঘশ্বাস ছেড়ে বলল, এককালে ছিল এখন নেই। বলুন না আপনার সেই প্রেমিকার কথা সময়টা দ্রুত কেটে যাবে। বলতে ইচ্ছে করছে না। এই প্রসঙ্গ থাক, অন্য প্রসঙ্গ নিয়ে আলোচনা করুন।  লাভ ষ্টোরী শুনতে আমার খুব ভাল লাগে। বলুন না, প্লিজ। আকাশ সিগারেটের ধোঁয়া ছেড়ে বলতে শুরু করে- যখন অষ্টম শ্রেণীতে পড়ি তখন পাশের বাড়ির এক মিষ্টি মেয়ে স্বপ্নাকে নিয়ে স্বপ্ন দেখতে শুরু করি। নবম শ্রেণীতে উঠার পর অনেক সাধনা করে স্বপ্নার মন জয় করি। ওর জীবন মরনের সাথী বানায় আমাকে, আমার জীবন মরনের সাথী হলো সে। একদিন যদি দুজন দুজনার সাথে দেখা না হয় সে রাতে ঘুমই হতো না কারো, এমন গভীর প্রেম ছিল আমাদের। প্রায় মাস ছয়েক পর দু ফ্যামিলীর সবাই জেনে যায় আমাদের সম্পর্কের কথা। বাবা আমার দু’গালে চড় মেরে কড়া নির্দেশ দেয়- এই বয়সে প্রেম। আজ প্রথম বারের মতো তোকে ক্ষমা করা হলো। এরপর যদি স্বপ্নাকে নিয়ে একটা কথা শুনি তাহলে সঙ্গে সঙ্গে তোকে বাড়ি থেকে তাড়িয়ে দেব।

এদিক স্বপ্নার মা স্বপ্নাকে খুব মারধোর করেন। বাড়ি থেকে আর ওকে বের হতে দেন না। বাড়ির কাজের মেয়ে স্বপ্নাকে স্কুলে পৌঁছে দিয়ে আসে আবার ছুটির পর সঙ্গে নিয়ে আসে। রাস্তায় আমি দাঁড়িয়ে থাকি, স্বপ্না করুণ দৃষ্টিতে শুধু আমার দিকে তাকিয়ে থাকে। এক সময় স্বপ্না কাজের মেয়েকে হাত করে ফেলে। পাঁচ দশ মিনিট ওর সঙ্গে কথা বলে চলে আসি। এভাবে দিন চলতে থাকে। আমি ক্লাস টেনে উঠি স্বপ্না নাইনে উঠে। আগের চেয়ে আমরা কথা বলা খুব কমিয়ে দেই। চিঠির মাধ্যমে চলতে থাকে প্রেম। একদিন স্বপ্না চিঠিতে জানায় রাত ঠিক এগারোটার সময় ওদের বাড়ির পেছনের বাগানে দেখা করতে। আমি সময় মতো হাজির হই। স্বপ্না আমাকে জড়িয়ে ধরে ভীষণ কাঁদতে থাকে। ওর কান্না দেখে অবাক হয়ে বলি- এতো কাঁদছো কেন, কি হয়েছে তোমার?একটু শান্ত হয়ে ও যে কথা বলল, তা শুনে আমার অজ্ঞান হয়ে যাবার মতো অবস্থা। ওর বাবা নাকি হঠাৎ করে ওর বিয়ে ঠিক করে ফেলেছে। এক সপ্তাহ পর বিয়ে। দুহাতে মাথা চেপে ধরে মাটিতে বসে বলি, স্বপ্না তোমাকে ছাড়া আমি বাঁচবো না। আমি এখন কি করবো বলে দাও?

স্বপ্না আমার মাথায় হাত বুলিয়ে বলল, তোমার মতো আমারও তো একই অবস্থা। আমার মাথায় এক বুদ্ধি এসেছে। এখন তোমার উপর সবকিছু নির্ভরশীল। লক্ষ্মীটি, আমি যা বলবো সেই মতে কাজ করবে। একশো বার করবো। চলো দুজনে পালিয়ে যাই। কথা শুনে আমতা-আমতা করে বলি, পালিয়ে যাবো কিন্তু আমার কাছে যে কোন টাকা নেই। ঠিক আছে ভেবোনা হাতে তো কয়েকটা দিন সময় আছে, টাকার ব্যবস্থা করবোই। স্বপ্না আমার গলা জড়িয়ে ধরে বলল, তুমি খুব ভালো। টাকার জন্য তোমাকে কিছু ভাবতে হবে না। আমার কাছে বারশো টাকা আছে, আর মায়ের সব গহনাগুলো চুরি করে নিয়ে যাবো। ফজরের আযানের পর পরই আমি বাগানে এসে এই জায়গায় অপেক্ষা করবো তুমি দেরি না করে চলে আসবে। একটু অবাক হয়ে বলি, কালই পালিয়ে যাবো। দুএকটা দিন দেরি করলে হতো না? স্বপ্না জ্ঞানী ব্যক্তির মতো বলল, আমি ভেবে চিন্তেই বলছি এসব বিষয়ে দেরি করে লাভ নেই। দেরি করলে শেষে ঝামেলা বেঁধে যায়। আমি আর কথার বিরোধীতা না করে বলি, ঠিক আছে তোমার মতামতই চুড়ান্ত। তুমি কোন চিন্তা করোনা, ফজরের আযানের পর পরই বাগানে চলে আসবো ।

প্রায় দেড় ঘন্টা সময় ওর কাছে অতিবাহিত করে চলে এলাম বাড়িতে। প্রয়োজনীয় জামা-কাপড় ব্যাগের মধ্যে পুরে শুয়ে পড়ি। ফজরের আযান কানে যেতেই ধরফড়িয়ে ঘুম হতে উঠে প্যান্ট, শাট পড়ে ব্যাগ নিয়ে পা টিপে টিপে হেঁটে ছিটকানী খুলে চোরের মত বেড়িয়ে পড়ি। ওদের বাগানে এসে দেখি ব্যাগ হাত স্বপ্নাকে। স্বপ্না আমাকে দেখে খুশিতে আত্মহারা হয়ে জড়িয়ে ধরে সারা মুখে চুমোতে ভরিয়ে দিয়ে বলল, মার সব গহনাগুলো নিয়ে এসেছি প্রায় আট-দশ ভরি স্বর্ণ হবে। চলো দেরি না করে এখনই বেড়িয়ে পড়ি। বলি, কোথায় যাবো? স্বপ্না বলল, দুরে বহু দুরে চলে যাবো এই ঠাকুরগাঁও ছেড়ে। দুজনে প্রায় বিশ মিনিট হেঁটে এক রিক্সা পেলাম। রিক্সায় দুজনে উঠে ঠাকুরগাঁও রোড ট্রেন ষ্টেশনের দিকে যেতে থাকি। সাড়ে ছ টার সময় ষ্টেশনে এসে পৌঁছি। রিক্সা ভাড়া মিটিয়ে দিয়ে ষ্টেশনের চেয়ারে বসে বলি, স্বপ্না এই যে লাইনে থেমে আছে ট্রেনটা। এটা ছাড়বে আটটার সময়। যাবে পাবর্তীপুর পর্যন্ত। কত দূর যাওয়া যায় বলো তো? ও বলল, পথ ঘাট সম্পর্কে আমার কোন অভিজ্ঞতা নেই। তোমার যা ভাল মনে হয়, তাই করো।

ওর থেকে টাকা নিয়ে পাবর্তীপুর যাবার দু টো টিকিট কেটে এনে বলি, পাবর্তীপুর যাবার টিকিট কেটেছি। সেখানে পৌঁছে ভাল একটা হোটেলের রুম ভাড়া নিয়ে একদিন থেকে পরের দিন আবার বাড়িতে ফিরে আসবো। স্বপ্না বলল, বাড়িতে ফিরে যাবো তবে কয়েকদিন পর। এতো তাড়াতাড়ি একদিন পর বাড়িতে ফিরে গেলে নাও মেনে নিতে পারে। হেসে বলি, তোমার মাথায় দেখি খুব বুদ্ধি। ও বলল, মোটামুটি তবে তোমার মত নয়। টিকিটের নাম্বার অনুযায়ী ট্রেনের জ নং কামড়াতে ২৭/২৮ সিটে দুজনে বসি। কিছুক্ষণ পর পাউরুটি, জেলি ও এক বোতল মিনারেল পানি কিনে এনে দুজনে খেতে শুরু করি। স্বপ্না একটু পাউরুটি মুখে দিয়ে পানি খেয়ে বলল, পেটে খুব ক্ষিধে আছে কিন্তু একদম খেতে ইচ্ছে করছে না।  কেন? ফিস ফিস করে ও বলল, আমার না খুব ভয় করছে। বার বার মনে হচ্ছে এই বুঝি কেউ এসে পড়লো। ট্রেনটা না ছাড়া পর্যন্ত শান্তি পাচ্ছি না। মরার ট্রেন যে কখন ছাড়বে। আমার বুকটা ভীষণ কাঁপছে। এমনভাবে কোনদিন কাঁপেনি। তুমি একটু বুকে হাত দিয়ে দেখ, হাত দিলেই তা অনুভব করতে পারবে। একটু লজ্জিত হয়ে বলি, হাত দিয়ে দেখতে হবে না আমি এমনিই বুঝতে পারছি।

আমাদের কামড়াতে লোকজনের ভীড় খুব কম। যে কয়েকজন যাত্রী আছে তা দূরে দূরে। কিছুক্ষণ পর পর দু চার জন করে যাত্রী উঠছে। ও হাত বাড়িয়ে আমার ডান হাতটা বুকের মাঝে ধরে বলল, বুকটা খুব কাঁপছে না?
প্রথম খুব লজ্জা পেলাম পর মুহূর্তে ওর বুকের কম্পন অনুভব করে বিস্মিত হয়ে হাত ছাড়িয়ে বলি, তুমি এতো টেনশন করছো কেন? ও দীর্ঘশ্বাস ছেড়ে বলল, মেয়ে হলে বুঝতে কেন এতো টেনশন করছি। তুমি আমার কাঁধে হেলান দিয়ে শুয়ে থাকো দেখবে টেনশন অনেকটা কমে যাবে। ও আমার কাঁধে হেলান দিয়ে চোখ বন্ধ করে থাকে। দেখতে দেখতে সময় পার হতে থাকে। এক সময় ট্রেন ছাড়ার ঘন্টা পড়ে। ট্রেন ছাড়ার ঘন্টা শুনে স্বপ্না কাঁধ থেকে মাথা তুলে বলল, ঘন্টা শুনে আমার বুক কাঁপা বন্ধ হয়েছে গেছে। এখন খুব ভাল লাগছে। কথা শেষ হতেই স্বপ্নার মামা ও তিন চার জন যুবক আমাদের সামনে এসে ঘিরে দাঁড়ায়। স্বপ্না আত্মচিৎকার দিয়ে বলল, মামা-আপনি?

এই বলে আকাশ থামে। দীর্ঘশ্বাস ছেড়ে একটা সিগারেট জ্বালিয়ে ধোঁয়া ছেড়ে বলল, এরপর কি হলো তা আর বলার অপেক্ষা রাখেনা। বাবা ছিল ভীষণ জেদী। বাড়ির পেয়ারা গাছের ডালে আমাকে ঝুলিয়ে ইচ্ছামত লাঠিপেটা করে গায়ে লাল পিঁপড়ার বসা ভেঙ্গে দেন। স্বপ্নার উপর অবশ্য কোন টরচারিং হয়নি। লোকমুখে আমার শাস্তির কথা শুনে এমনিতেই অজ্ঞান হয়ে গিয়েছিল। বিয়ের দিন অজ্ঞান হয়েছিল তিনবার। আকাশ একটু থেমে তারপর বলল, জীবনের প্রথম ভালবাসার সেই মিষ্টি মেয়েটিকে আজো ভুলতে পারিনি। একাকী উদাস মনে কিছু ভাবলেই স্বপ্নার কথা মনে পড়ে। এখনো মাঝে মধ্যে আমার মনটা অজান্তে তাকেই ভালবাসে। সেতু বলল, বিয়ের পর স্বপ্নার সঙ্গে আপনার দেখা হয়নি। বিয়ের এক বছর পর্যন্ত ওর সঙ্গে আমার কোন কথা হয়নি। যখনই শুনি স্বপ্না শ্বশুড় বাড়ি থেকে এসেছে তখনই বাড়ি থেকে বের হয়ে যাই। রাত এগারোটা বারোটার দিকে ঘরে ফিরি। আবার সকালে বাড়ি থেকে বের হয়ে যেতাম। কখনো বেড়াতে চলে যেতাম। আমাদের ঘটনাটা স্বপ্নার শ্বশুড় বাড়ির লোকজন জানতো তাই তারা খুব কমই স্বপ্নাকে বাবার বাড়ি পাঠাতো। বাড়িতে এলেও তিন চার দিনের বেশি থাকতে পারতো না। এখন স্বপ্নার সঙ্গে দেখা হলে অনেক কথাই হয় কিন্তু সেই অতীত নিয়ে কোন কথা হয়না। ওর দুটি মেয়ে হয়েছে। স্বামী নিয়ে বেশ সুখেই আছে। স্বপ্না এখন একদম আদর্শ গৃহিনী হয়ে গেছে। আমার অনেক কথা হলো এবার আপনার কথা বলুন।

সেতু একটু চিন্তা করে মুচকি হেসে বলল, আমি আপনার মতো লাভ করিনি তাই আমার বলার কিছু নেই। আপনি অবাক হচ্ছেন হয়তো আমার এই জীবনে এখনো প্রেম আসেনি কেন? আসলে অনেক হ্যান্ডসাম সুদর্শন যুবকই আমাকে অফার দিয়েছিল কিন্তু মনের মতো পথ চলার সাথী খুঁজে পাইনি বলে এখনো প্রেমের পথে অগ্রসর হইনি।
– ভালই করেছেন। প্রেম সম্পূর্ণ ডিপেন্ট করে মনের উপর। মনকে এডজাষ্ট না করে যদি মন দেয়া হয়, সে প্রেম কিন্তু টেকেনা। খুব তাড়াতাড়ি সে প্রেম ভেঙ্গে যায়। ও ভাল কথা আপনার পরিচয়টা কিন্তু এখনো দেননি।
– আমি সেতু, মধ্যবিত্ত পরিবারের সন্তান। পরিচয় দেবার মত তেমন কিছু নেই। ঠাকুরগাঁও সরকারি কলেজে সেকেন্ড ইয়ারে পড়ছি। আর্টস নিয়ে পড়াশোনা করছি। মাথা ভারি ছাত্রী, পড়াশোনায় তেমন উন্নতি নেই। এ হলো পরিচয়, আপনি কত দূর পড়াশোনা করেছেন? গত বছর ডিগ্রী পাশ করেছি। আমিও সাধারণ মধ্যবিত্ত ঘরের ছেলে। ডিগ্রী পাশ করেই চাকুরীর ধান্দায় নেমে পড়তে হয়েছে। বর্তমানে যে চাকুরির অবস্থা, এ পর্যন্ত প্রায় বিশ পঁচিশটা চাকুরির ইন্টারভিউ দিয়েছি কিন্তু একটা চাকুরিও হয়নি। আজও যাচ্ছি ঢাকায় একটা সরকারি চাকুরির ইন্টারভিউ দিতে। জানিনা কপালে কি আছে। আপনিও তো ঢাকায় নামবেন, তা কি করতে যাচ্ছেন? সেতু আমতা-আমতা করে বলল, আমিও আপনার মতই ঢাকায় যাচ্ছি চাকুরির ইন্টারভিউ দিতে। ভালই হলো। আমরা দুজন দেখছি একই পথের যাত্রী। আপনি কোথায় চাকুরীর ইন্টারভিউ দিতে যাচ্ছেন। একটি এনজিওতে ইন্টারভিউ দিতে যাচ্ছি। কোন এনজিও? ইয়ে মানে- ব্র্যাক।

আমিও একবার ব্র্যাকে ইন্টারভিউ দিতে গিয়েছি ক্রেডিট প্রোগাম পদে। কোন কাজ হয়নি। বাংলাদেশটা ভরে গেছে এনজিও দিয়ে। ভেবেছি চাকুরিটা বুঝি হলোই। ইন্টারভিউ দিতে গিয়ে আমার মাথায় হাত। পল্লী গ্রাম থেকে শুরু করে শহরের আনাচে কানাচের কোন ছেলে মেয়ে মনে হয় বাদ নেই এতো উপচে পড়া ভীড়। নিম্নে হাজার খানেক ছেলে- মেয়ে এসেছিল ইন্টারভিউ দিতে। সকাল থেকে অপেক্ষা করে করে দুপুরের পর ইন্টারভিউ দিয়েছি। বলুন, এতো ছেলে মেয়ের ভীড়ে চাকুরি কি হয়। আপনি যে কথা শোনালেন, বড় ভয় পাইয়ে দিলেন আমাকে। মনে হচ্ছে শুধু শুধু ঢাকায় যাচ্ছি ইন্টারভিউ দিতে। এতো যখন প্রার্থী নিশ্চয় চাকুরীটা হবে না। আকাশ হেসে বলল, আরে আপনি আমার কথাতে আশা ছেড়ে দিচ্ছেন কেন। আমি যখন ইন্টারভিউ দিয়েছি তখন হাতে গোনা কয়েকটা কালো মেয়ে ছাড়া সব মেয়েই চান্স পেয়েছে। এনজিওগুলোতে তো মেয়েদের অগ্রাধিকার বেশি। মেয়েদের কোঠা পূরণ হবার পর ছেলেরা চান্স পায়। সেতু হেসে বলল, দোয়া করবেন চাকুরীটা যেন হয়। আমি আপনার জন্য দোয়া করছি আপনিও আমার জন্য দোয়া করবেন। আচ্ছা দোয়া করবো। চলুন নীচে নেমে আমাদের কোচে গিয়ে বসি, ঘাটের প্রায় কাছাকাছি এসে পড়েছি। আপনি যান আমি একটু পরে আসছি।

সেতু ফেরির ছাদ থেকে নেমে কোচে গিয়ে বসে। আকাশ সিগারেট ধরিয়ে সেতুকে নিয়ে চিন্তা করতে থাকে- দেখে তো মনে হয়না কোন মধ্যবিত্ত ঘরের মেয়ে, পোশাক দেখে তো মনে হয় ধনির মেয়ে। না, না তা হতে যাবে কেন? যদি ধনির মেয়ে হতো তাহলে তো আমাকে চাকুরির কথা বলতো না। হয়তো কোন ধনির মেয়ে ওর বান্ধবি। বান্ধবির পোশাক ধার নিয়ে ইন্টারভিউ দিতে যাচ্ছে এটাই হবে। মেয়েটি ছাত্রী হিসেবে খারাপ নয়। খারাপ ছাত্রীরা খুব কমই নিজেদের দূর্নাম করে, ভাল ছাত্রীরাই সাধারণত নিজেদের দূর্নাম করে। মেয়েটি যেমনি চালাক তেমনি সাহসি বোঝা যায়। ঢাকায় নিশ্চয় ওর কোন আত্মীয় আছে। আত্মীয় থাকলেও সাহসি না হলে এ রূপ নিয়ে একা একা ঢাকা যায়। ও বলল, আজ পর্যন্ত প্রেম করেনি কথাটা সত্যি কি না মিথ্যে কে জানে? সুন্দর রূপের মেয়েরা সাধারণত প্রেমে বেশি আগ্রহি, আবার তারা প্রেম করতে না চাইলেও প্রেম তাদের জীবনে খুব তাড়াতাড়ি এসে যায়। ধেৎ স্বপ্না কে নিয়ে অযথা কেন ভাবছি।

আর মাত্র কিছুক্ষণ ও আমার সঙ্গে আছে এরপর তো দুজন দুদিকে চলে যাবো। কোনদিন হয়তো দেখা হতেও পারে না হতেও পারে। দেখা হলেও ঠিকমত আমার সঙ্গে কথা বলবে না, এমন কি চিনতেও অস্বীকার করতে পারে তা ওর স্বভাব চরিত্রেই বোঝা যায়।। গাড়ীতে যে ব্যবহারগুলো করেছে তা কি এতো সহজে ভোলা যায়। ওর এই স্বভাব চরিত্রগুলো পাল্টাতে অনেক সময় লাগবে। আকাশ আর একটা সিগারেট জ্বালায়। সিগারেটটা শেষ করে তারপর ছাদ থেকে নেমে কোচে গিয়ে বসে। আরিচা ঘাটে ফেরিএসে ভিড়লো। নগরবাড়ি ঘাট হতে আরিচা ঘাটে ফেরি আসতে সময় লাগে আড়াই ঘন্টা। ঘাট পার হবার পর ড্রাইভার দ্রুত গতিতে গাড়ি চালাতে থাকে। সেতু বেশির ভাগ সময় জানালার দিকে তাকিয়ে ছিল তাই দুজনের বেশি কথা হলো না। মাঝে মাঝে আকাশ যদি কিছু জিজ্ঞাসা করতো সেতু হ্যাঁ বা না সূচকভাবে কথার উত্তর দিতো, কখনো শুধু মাথা নাড়তো। তাছাড়া গাড়ির শব্দে কারো কথা তেমন স্পষ্ট শোনা যেত না। সন্ধ্যার সময় কোচ এসে পৌঁছল শ্যামলীর কলেজ গেটে স্থাপিত হানিফ কাউন্টারে। কোচ হতে একে একে সকল যাত্রি নামে। সেতু কোচ হতে নেমে সোজা চলে যেতে থাকে।

আকাশ সেতুর পেছনে যেতে যেতে বললো, সন্ধ্যা হয়ে গেছে রাস্তাঘাটের কথা বলা যায় না, যদি কিছু মনে না করেন তাহলে আপনাকে আত্মীয়র বাড়িতে পৌঁছে দিয়ে আসি। সেতু ঘুরে দাঁড়িয়ে বলল, আপনাকে কে বলল, আমি আত্মীয়র বাড়িতে যাচ্ছি? ঢাকায় আমার কোন আত্মীয় নেই। কথা শুনে আকাশ বিস্মিত কন্ঠে বলল, বলেন কি! রাতে তাহলে কোথায় থাকবেন হোটেলে? হোটেলে থাকি বা যেখানে খুশি সেখানে থাকি আপনাকে কি বলতে হবে। আপনার কাজে আপনি যান, আমাকে নিয়ে আপনাকে ভাবতে হবে না। ‘এই বলে সেতু হাঁটতে শুরু করে।’ এতো তাড়াতাড়ি মেয়েটি পাল্টে যাবে তা আকাশ কল্পনাও করতে পারেনি। দ্রুত হেঁটে সেতুর সামনে দাঁড়িয়ে বলল, আপনি আমাকে বিশ্বাস করতে পারেন। এভাবে আপনাকে একা রেখে যেতে আমার বড়ই বিবেকে বাঁধছে যেহেতু আপনি আমার জেলার বাসিন্দা। আপনাকে কষ্ট করে হোটেল খোঁজ করতে হবেনা, আমার পরিচিত ভাল ভাল কয়েকটা হোটেল আছে। চলুন, সেগুলোর একটিতে আপনাকে থাকার বন্দোবস্ত করে দিয়ে আসি। রাতে থাকতে আপনার কোন অসুবিধা হবে না। এই উপকারটুকু আমাকে করতে দিন।

সেতু রেগে চোখ বড় বড় করে বলল, আমি ছোট খুকি নই, ভাল মন্দ বোঝার বয়স আমার হয়েছে। আপনাকে কোন উপকার করতে হবে না, দয়া করে পিছু ছাড়ুন। কোচে চড়ার পরই সারা রাস্তায় টেনশনে ভুগেছি এখন আরো বেশি টেনশন। এর উপর আপনি জ্বালাতন করছেন। এখন আপনাকে একদম সহ্য করতে পারছি না, ভালোয়-ভালোয় কেটে পড়ুন নইলে কিন্তু লোকজন ডেকে গণধোলাই খাওয়াবো। ‘এই বলে শ্যামলীর কলেজ গেটের রাস্তা ধরে এগুতে থাকে।’ আকাশ চিন্তা করে দেখে, যে মেয়ে মুহূর্তেই পাল্টে যেতে পারে সে মেয়েকে বিশ্বাস করা বড় কঠিন। বলা যায়না লোকজন ডেকে গণধোলাই খাওয়াতেও পারে। এটা এই মেয়ের পক্ষে নিশ্চয় বিচিত্র কিছু নয়। এই সব চিন্তা করে আকাশ সেতুর পেছনে গেল না। সেতু কিছুদূর গিয়ে একবার পেছনে তাকিয়ে তারপর হেঁটে হেঁটে রাস্তার পাশে সিমেন্টের এক বেঞ্চে গিয়ে বসে। হাতের সাইড ব্যাগটার চেইন খুলে চিরুনী ও মিনি আয়না ও কসমেটিক দ্রব্যাদি বের করে ব্যাগটা পাশে রেখে হালকা সাজগোছ করতে লাগল। আকাশ নিজের গন্তব্য স্থলে যাবার জন্য পা বাড়ায় হঠাৎ ওর মনে খটকা লাগে- সেতু কেন ওর সাহায্য নিতে চাইছে না। কেন ও একা একা থাকত চাইছে নিশ্চয় এর মধ্যে কোন রহস্য লুকিয়ে আছে। আমার এখন তো কোন কাজ নেই। সেতু কোথায় যায় কি করে এখন এটাই ফলো করি।

সেতু যেন ওকে না দেখতে পারে তাই রাস্তার অপর পাশ দিয়ে হেঁটে হেঁটে এক পানের দোকানের সামনে দাঁড়ালো। একটা সিগারেট জ্বালিয়ে সেতুর দিকে দৃষ্টিপাত করলো। হঠাৎ দেখে এক যুবক পা টিপে টিপে সেতুর পাশে এসে দাঁড়িয়ে এরপর হাত বাড়িয়ে সেতুর সাইড ব্যাগটি নিয়ে দিল দৌড়। তা দেখতে পেয়ে আকাশ ঘাড়ের ব্যাগটি হাতে নিয়ে কোন রকমে রাস্তা পার হয়ে উর্দ্ধশ্বাসে চোরের পিছু পিছু দিল দৌড়। চোরটি প্রাণপনে দৌড়ে এক চিকন গলি দিয়ে ঢুকে পড়লো। আকাশ আর তাকে খুঁজে পেল না। চোরকে না পেয়ে আকাশ পুনরায় দৌড়ে সেতুর কাছে এসে হাঁপাতে হাঁপাতে বলল, শালাকে ধরতে পারলাম না, গলির ভিতর দিয়ে কোনদিকে যে হাওয়া হয়ে গেল টেরই পেলাম না। আপনার ভুলের জন্য এমন হলো নইলে এমন হতো না। সেতুর যে ব্যাগ চুরি হয়েছে তা ও মোটেই টের পায়নি। আপন মনে ও ঠোঁটে লিপিস্টিক দিতে থাকে। আকাশকে দেখে রেগে বলল, লজ্জা করে না আপনি আবার এসেছেন। এসে পাগলের মতো কি যা তা কথা বলছেন, যান এখান থেকে।
হায়রে দুনিয়া যার জন্য করি চুরি সেই বলে চোর। গাড়ি ঘোড়ার দিকে না তাকিয়ে চোরের পেছনে কি দৌড়ই না দিলাম শুধু মাত্র আপনার ব্যাগের জন্য।

সেতু কথা শুনে পাশে তাকিয়ে দেখে যখন দেখে ব্যাগ নেই, সঙ্গে সঙ্গে আত্মচিৎকার দিয়ে বলল, আমার ব্যাগ! আমার ব্যাগ কোথায়? ও এতক্ষণ পর বুঝি আপনার হুশ এলো। মিস্‌, দশ মিনিট সময় অতিবাহিত হলো ব্যাগ চুরি হয়ে গেছে। আপনার সামনে দিয়ে ঝড়ের বেগে কি জন্য দৌড়ে গেলাম তা কি তখন বুঝতে পারেননি? সেতু আকাশের হাত ধরে বলল, আপনার দোহাই লাগে আমার ব্যাগটা উদ্ধার করে দিন। ঐ ব্যাগের মধ্যে আমার টাকা পয়সা, ঠিকানা সব আছে। মোট কথা ঐ ব্যাগ ছাড়া আমি একেবারে অচল। প্লিজ, আপনি কিছু করুন। এটা ঢাকা শহর। আমি কেন, আমার বাবাও যদি আসে তবুও চুরি হয়ে যাওয়া ব্যাগ উদ্ধার করতে পারবে না। আপনার অসাবধানতার জন্যই ব্যাগটা চুরি হলো। এখন আমার করার কিছু নেই। ব্যাগের মধ্যে কত টাকা ছিল? সেতু দীর্ঘশ্বাস ছেড়ে কাঁদো-কাঁদো গলায় বলল, টাকার জন্য আমার তেমন দুঃখ নেই। দুঃখটা হচ্ছে ব্যাগের মধ্যে মিরপুরের এক নিকট আত্মীয়র ঠিকানা ছিল। আপনাকে মিথ্যে বলেছি, ঢাকায় কোন চাকুরীর ইন্টারভিউ দিতে আসিনি, এসেছি সেই আত্মীয়র কাছে।

আমি এখন কি করবো, কিভাবে তার কাছে যাবো? এর আগে সেই আত্মীয়র বাড়িতে যাননি? আপনি দেখছি বোকার মতো কথা বলছেন। যদি এর আগে সেই আত্মীয়র বাড়িতে যাওয়া হতো তাহলে তো ঠিকানার কোন দরকার ছিল না। আমি যে এখন কি করবো, মাথায় কিছুই ঢুকছে না। যখন ঠিকানাটা নিই তখন খুব টেনশনে ছিলাম তাই ঠিকানাটা ভালভাবে পড়িনি। ঠিকানাটা বেশ বড় শুধু প্রথম আর শেষ লাইনটি মনে আছে। মোঃ গোলাম সারোয়ার, মিরপুর-১০। আচ্ছা কষ্ট করে খোঁজ করলে সেই ব্যক্তিকে কি খুঁজে পাওয়া যাবে না। মিরপুর দশে গিয়ে দেখতে পাবেন শত শত গোলাম সারোয়ার আছে। ঢাকায় পুরো ঠিকানা নিয়েই কাউকে খোঁজ করতে এসে হাঁপিয়ে উঠে। সে হিসেবে আপনারটা তো কল্পনাও করা যায় না। আপনি আমার একটু উপকার করবেন। কি উপকার? সাভার থেকে দক্ষিণে আমার ছোট চাচা আছেন। শেষ বার যাওয়া বছর তিনেক হবে, বাড়ি খুঁজতে কোন অসুবিধা হবে না। আপনি দয়া করে আমাকে সেখানে পৌঁছে দিন। সাভারে যাওয়াটা কি আপনার খুবই জরুরি।

হ্যাঁ জরুরিই তো, সাভারে না গিয়ে এখন কি করবো? আপনাকে একটা উপদেশ দিই শুনবেন। বলুন? ঘন্টা খানেক পর এখান থেকে ঠাকুরগাঁও যাবার কোচ ছাড়বে। আপনি সেই কোচে উঠে ঠাকুরগাঁও ফিরে যান। অসম্ভব। এক্ষনই ঠাকুরগাঁও ফিরে যাবার কোন প্রশ্নই উঠেনা। সাভারে চাচার বাড়িতে কয়েকদিন থেকে তারপর ফিরে যাবার চিন্তা ভাবনা করবো। আপনার কাছে টাকা আছে? ইয়ে টাকা তো নেই। সব টাকা ভ্যানেটি ব্যাগের মধ্যে ছিল। আপনি আমাকে সাভারে পৌঁছে দিন, টাকার জন্য ভাববেন না। আংকেলের কাছ থেকে টাকা নিয়ে আপনাকো দিয়ে দেব। এ নিয়ে পরে ভাবা যাবে। চলুন, খুব ক্ষিধে পেয়েছে আগে হোটেলে কিছু খেয়ে আসি। আপনি যান, আমার ক্ষিধে নেই। যা হবার হয়েছে তার জন্য শরীরকে কষ্ট দেবার কোন মানে হয়না, চলুন খেয়ে আসি। এক কথা বারে বারে বলা আমি পছন্দ করিনা। আপনার ক্ষিধে পেয়েছে খেয়ে আসুন, আমার ক্ষিধে লাগেনি। আকাশ মনে মনে বলল, মেয়েটিকে এখনো চেনা গেল না। কখনো ভাল থাকে, কখনো পাল্টে যায়। এতো বিপদের মধ্যে পড়েও দেমাগ কমেনি। বাস্তব জীবনটা যে কি তা মনে হয় কোনদিন উপলব্ধি করেনি। এখন ছেড়ে চলে গেলেই হাড়ে হাড়ে টের পাবে বাস্তব কাকে বলে। থাক, ছেড়ে চলে যাবার দরকার নেই দেখি কোথাকার পানি কোথায় গিয়ে গড়ায়।

কি এতো চিন্তা করছেন। ভাবছেন সাভারে গিয়ে আপনাকে টাকা দেব না। ছিঃ ছিঃ কি পাগলের মতো কথা বলছেন। এখান থেকে সাভারে যেতে সামান্য কিছু খরচ হবে এর জন্য আপনাকে অবিশ্বাস করবো এটা ভাবলেন কি করে। আমি ভাবছি আপনাকে এখানে রেখে হোটেলে গিয়ে একা খাবো এটা কেমন দেখায়। আপনার যখন ক্ষিধে নেই তবুও চলুন না এখানে না দাঁড়িয়ে থেকে বসে থাকবেন। যেতে পারি খাবারের জন্য জোড়াজুড়ি করতে পারবেন না। আচ্ছা করবো না, চলুন। কিছু দূর হেঁটে সামনেই এক সাধারণ রেস্তরায় ঢুকে খালি টেবিল দেখে দু’জনে বসে। ওয়েটার টেবিলের কাছে এসে বলল, কি খাবেন? আকাশ বলল, পুরি আর মিষ্টি। ওয়েটার কিছুক্ষণ পর দু’টি প্লেটে চারটি পুরী ও অন্য দুটি প্লেটে মিষ্টিসহ টেবিলে দিয়ে যায়। সেতু রেগে বলল, বলেছি না ক্ষিধে নেই। খেয়ে দেখুন না, গরম গরম পুরি মিষ্টি দিয়ে খেতে খুব ভাল লাগবে। আপনার ভাল লাগে আপনি খান, আমি খাবো না। এই বলে সেতু তার সামনে রাখা পুরি ও মিষ্টির প্লেট আকাশের সামনে ঠেলে দিল।

আকাশ আর খাবারের জন্য জোড়াজুড়ি না করে মুচকী হেসে একাই সব খেয়ে নেয়। খাওয়া শেষে বলল, আমার একটা বিষয়ে একটু চিন্তা লাগছে?  কি বিষয়? কাল সকাল দশটায় আমার চাকুরীর ইন্টারভিউ। রাতে থাকবো রামপুরা এক ফেন্ডের কাছে। আপনাকে এখন যদি সাভারে পৌঁছে দিতে যাই রামপুরা ফিরে আসতে অনেক রাত হবে। এতো রাতে ফিরলে রাস্তায় তো ছিনতাইকারীদের ভয় থাকবে। এর জন্য এতো চিন্তা করছেন। রাতটুকু আংকেলের বাসায় কাটালেই তো সমস্যার সমাধান হয়ে যায়। একটু সকাল সকাল ঘুম থেকে উঠে খাওয়া-দাওয়া সেরে বাসে চড়লেই দশটার আগেই মতিঝিলে পৌঁছতে পারবেন। হ্যাঁ বুদ্ধিটা মন্দ নয়। এতে কিছুটা সমস্যার সমাধান হয়। চলুন আর দেরি না করে রওনা দেই। চলুন। রাত নয়টার সময় সেতু ও আকাশ সাভারে এসে পৌঁছে। গাড়ি থেকে নেমে আকাশ বলল, রাত্রি তো মোটামুটি অনেক হলো। এখান থেকে আপনার আংকেলের বাড়ি কতদূর? বেশি দূর নয়। রিক্সায় যেতে আধঘন্টা সময় লাগবে।

আকাশ একটি খালি রিক্সা ডেকে তাতে দুজনে চড়ে বসে। কিছু দূর যাবার পর আকাশ বলল, আপনার আংকেল তো আমার পরিচয় জানতে চাইবে তখন কি পরিচয় দেবেন? কত কিছু সম্পর্ক আছে, একটা বানিয়ে বলবো। এ নিয়ে আপনাকে কিছু ভাবতে হবে না। আপনার আংকেল কি করেন? এক্সপোর্ট ইমপোর্টের ব্যবসা। পয়ত্রিশ মিনিট পর তারা গন্তব্য স্থলে এসে পৌঁছে। আকাশ রিকসা ভাড়া মিটিয়ে রিক্সাওয়ালাকে বিদায় করে। সেতু একটি দোতলা বিল্ডিং দেখিয়ে বলল, এটা আমার আংকেলের বাড়ি। ‘এই বলে হাঁটতে থাকে, পিছু পিছু আকাশ চলল।’ বাড়ির সদর গেটের সামনে এসে সেতু থমকে দাঁড়ায়। আকাশ বলল, কি হলো থামলেন যে গেটে নক করুন। সেতু কথার উত্তর না দিয়ে মূর্তির মতো দাঁড়িয়ে থাকে। সেতুকে দাঁড়িয়ে থাকতে দেখে আকাশ নিজেই গেটে নক করে। ভেতর থেকে কোন সাড়া শব্দ না পেয়ে বলল, কি ব্যাপার বাড়ির লোকজন কি সব মারা গেল নাকি? সেতু আহত গলায় বলল, নক করে কোন লাভ নেই। দেখতে পান না গেটে কত বড় তালা ঝুলছে। তালা দেখে আকাশ বিস্মিত কন্ঠে বলল, সদর গেটে তালা মারা, তার মানে বাড়িতে কোন লোকজন নেই। এখন তাহলে কি হবে?

সেতু কেঁদে উঠে বলল, আমি এখন কি করবো কোথায় যাবো? প্লিজ কাঁদবেন না, আমি ভালভাবে সিওর হয়েনি বাড়ির লোকজন কোথায় গেছে। এমনও তো হতে পারে আশে পাশের কোথাও বেড়াতে গেছে? ‘ এই বলে আকাশ পাশের বাড়ির দরজায় নক করে।’কিছুক্ষণ পর এক বয়স্ক ভদ্রলোক দরজা খুলে বেড়িয়ে এসে বলল, কাকে চাই? এতো রাতে বিরক্ত করার জন্য ক্ষমা চাইছি। দয়া করে বলবেন কি, আপনার পাশের বাড়ির লোকজন সব কোথায় গেছে? চৌধুরী সাহেব আপনার কে হন? আমার আংকেল। ও আচ্ছা। তারা আজ স্বপরিবারের সবাই কক্সবাজারে গেছেন। কোনদিন ফিরবেন? তা বলতে পারবো না। সম্ভবত তিন-চার দিন দেরি হবে। ধন্যবাদ, আসি আস্‌ সালামালাইকুম। ওয়ালেইকুম আস্‌ সালাম। আকাশ সেতুর কাছে এসে সব বলল, কথা শুনে সেতু কান্না জড়িত কন্ঠে বলল, আমি এখন কি করবো? কি আর করবেন, বুঝেন এখন কেমন লাগে। তখন অহংকার না দেখিয়ে আমার সাহায্যটা নিলে এ বিপদে পড়তে হতো না। সেই সাহায্য তো নিলেন বিপদে পরার পর। মানুষকে বিশ্বাস করতে শিখুন। সব মানুষকেই অবিশ্বাস করতে নেই। যাক যা হবার হয়েছে। পূর্বের কথা তুলে আর কষ্ট দিতে চাইনা। এখানে আর দাঁড়িয়ে না থেকে আসুন আমার সাথে। সেতু কাঁপা কাঁপা গলায় বলল, আমাকে নিয়ে কোথায় যাবেন? কথা শুনে আকাশ রেগে বলল, যেখানে খুশি সেখানে নিয়ে যাবো। আমার সাথে যদি যেতে মন চায় তবে চলুন নয়তো এখানে দাঁড়িয়ে থাকুন। ‘এই বলে হাঁটতে থাকে।’

কথার মধ্যে সেতু একটা অশুভ ইঙ্গিত যেন খুঁজে পেল। তাই ও থমকে দাঁড়িয়ে ভাবতে লাগল, এখন ও কি করবে কোথায় যাবে? এমন নির্জন রাতে সম্পূর্ণ অচেনা অজানা এক ইয়াং ছেলের সাথে এই রূপ যৌবন নিয়ে যাওয়া অবশ্যই নিরাপদ নয়। না গিয়ে অন্য তো কোন উপায় নেই। এখানে দাঁড়িয়ে থাকলে স্থানীয় মাস্তান ছেলেদের দ্বারা ক্ষতিটা যে কি পরিমাণ হবে ভাবতেই গা শিউরে উঠলো। আকাশকে কিছুটা হলেও বিশ্বাস করা যায়। তাছাড়া তার দ্বারা ক্ষতির পরিমাণটাও কম কিন্তু এই নির্জন রাতে অন্য কাউকে তো বিন্দু মাত্র বিশ্বাস করা যায় না। আবার কুকুরের ভয় তো আছেই। কুকুরের কথা মনে হতেই এক দৌড়ে আকাশের কাছে গেল। আকাশ সেতুর দিকে একবার তাকিয়ে হাঁটতে শুরু করে। সেতুও সাথে হাঁটতে লাগল। প্রায় বিশ মিনিট হাঁটার পর সেতু বলল, উহ্‌ মা আর হাঁটতে পারছি না। পা খুব ব্যাথা করছে। রিক্সাটা ছেড়ে কি ভুলই না হলো। কি আর করা, রিক্সা না পাওয়া পর্যন্ত এভাবে কষ্ট করে হাঁটতে হবে। এক কাজ করুন, পায়ের হিল জুতা খুলে হাতে নিয়ে হাঁটুন তাহলে ব্যাথা কম পাবেন।

সেতু যেন এতোক্ষণ এ কথার অপেক্ষাতেই ছিল। তাড়াতাড়ি হিল জুতা খুলে হাতে নিয়ে হাঁটতে থাকে। আবার প্রায় দশ মিনিট হাঁটার পর সেতু রাস্তায় বসে বলল, আমার পক্ষে আর হাঁটা সম্ভব নয়। আকাশ অবাক হয়ে বলল, না হাঁটলে তো এই রাস্তায় রাত কাটাতে হবে। আপনি যাই বলেন। আমার পক্ষে আর হাঁটা সম্ভব নয়, খুবই ক্লান্ত হয়ে পড়েছি। এমন সময় একটি খালি রিক্সা আসতে দেখে আকাশ যেন হাফ ছেড়ে বাঁচে। রিক্সাওয়ালা কাছে আসতেই হাত উঠিয়ে রিক্সা থামায়। রিক্সাওয়ালা বলল, আপনারা কই যাবেন? আকাশ বলল, ভাল একটি আবাসিক হোটেলে নিয়ে চলো।উঠেন স্যার ভাল হোটেলে নিয়া যামু। দুজনে রিক্সায় উঠে বসে। কিছুদূর যাবার পর আকাশ আস্তে করে সেতুকে বলল, ডন্ট মাইন আমি হোটেলে আপনাকে তুমি করে বলবো। আচ্ছা। প্রায় বিশ মিনিট পর একটি তিনতলা বিল্ডিং এর সামনে রিক্সা থামায়। রিক্সাওয়ালা দোতলা বিল্ডিংটি দেখিয়ে বলল, ঐ যে হোটেল। এই হোটেল খুব নামকরা। থাকতে কোন অসুবিধা হইবো না। আকাশ রিক্সাওয়ালাকে ভাড়া একটু বেশিই দেয়। রিক্সাওয়ালা টাকা নিয়ে সালাম জানিয়ে চলে গেল।

আকাশ সিঁড়ি বেয়ে দোতলায় উঠতে লাগল। সেতু অনিচ্ছা সেত্বও বাধ্যবাধকতা হয়ে আকাশের পিছু পিছু চলতে লাগল। আকাশ হোটেলের ম্যানেজারকে বলল, রুম খালি পাওয়া যাবে? যাবে। ভাল একটি রুম দিন। ভাল রুম দিচ্ছি। কয়দিনের জন্য বুক করবেন? দু দিনের জন্য। ঠিকানা বলুন। আকাশ ঠিকানা বলল। ম্যানেজার ঠিকানা লিখে বলল, ম্যাডাম আপনার কি হন? স্ত্রী। ও আচ্ছা। খাতার এখানে সই করুন। আকাশ খাতায় সই করে ভাড়ার টাকা মিটিয়ে দেয়। ম্যানেজার একজন ওয়েটারকে বলল, বর্ডারদের রুমে পৌঁছে দাও। ওয়েটার বলল, আসেন স্যার। আকাশ ও সেতু ওয়েটারের সাথে হাঁটতে লাগল। ১১৭ নং রুমের কাছে এসে তালা খুলে ওয়েটার আকাশের হাতে চাবি দিয়ে বলল, এই রুম আপনাদের।

আকাশ পকেট থেকে বিশ টাকা বের করে ওয়েটারকে দেয়। ওয়েটার কলিং বেলের সুইচ দেখিয়ে বলল, কোন প্রয়োজন হলে আমাকে ডাক দেবেন। ঠিক আছে এখন যাও তাড়াতাড়ি আমাদের জন্য খাবার নিয়ে আসো। চার প্লেট ভাত, দুপিস খাসির মাংস, সবজি আর ডাল। আচ্ছা স্যার। ‍‌‍‌এই বলে ওয়েটার চলে গেল।“ ওয়েটার চলে যেতেই সেতু অগ্নিমূতি ধারণ করে বলল, আপনার সাহস তো কম নয়। কোন সাহসে আপনি হোটেলের ম্যানেজারের কাছে আমাকে স্ত্রী বলে পরিচয় দিলেন? আকাশ হাতজোড় করে বলল, প্লিজ আস্তে কথা বলো। সেতু গলার ভয়েজ আরো বাড়িয়ে বলল, কেন আস্তে কথা বলবো। আমি আপনার বিয়ে করা বউ নাকি যে আস্তে কথা বলবো। আমার কথার উত্তর দিন, কেন আপনি ম্যানেজারের কাছে বললেন আমি আপনার স্ত্রী। আকাশ বুঝতে পারে ও দাঁড়িয়ে থাকলে সেতু ঝগড়া করতে থাকবে। তাই তাড়াতাড়ি ব্যাগ খুলে লুঙ্গী পড়তে পড়তে মৃদু হেসে বলল, কেন বলেছি তা যদি বুঝতে তাহলে ঢাকায় এসে তোমার ভ্যানেটি ব্যাগ হারাতো না। এটা কিন্তু প্রশ্নের উত্তর হলো না। প্লিজ আমাকে একটু সময় দাও আমি বাথরুম থেকে ফ্রেশ হয়ে আসি। এরপর তোমার বিস্তারিত সব প্রশ্নের উত্তর দেব।

এতো করে যখন রিকোয়েষ্ট করলেন ঠিক আছে সময় দিলাম। যান তাড়াতাড়ি বাথরুম থেকে আসুন। আকাশ বাথরুম গিয়ে বেশ সময় কাটিয়ে তারপর এলো। এসে দেখে ওয়েটার টেবিলে খাবার দিয়ে গেছে। কোন কিছুই যেন হয়নি এমন ভাব নিয়ে তোয়ালে দিয়ে হাত মুখ মুছতে মুছতে বলল, সেতু তাড়াতাড়ি বাথরুম থেকে ফ্রেশ হয়ে এসো, খুব ক্ষিধে পেয়েছে এখনই খেতে বসবো। খাওয়া-দাওয়ার আগে কোন ঝগড়া নয়, কথায় বলে- ‘পেট শান্তি তো দুনিয়া শান্তি।’ আগে পেট পুরে খাবো-দাবো তারপর ঝগড়া করবো, কি বলো? সেতু মুখ ভেংচিয়ে বাথরুমে প্রবেশ করে। প্রায় দশ মিনিট পর বাথরুম থেকে বেড়িয়ে এসে দেখে আকাশ ভাত খাওয়া শুরু করে দিয়েছে। তোয়ালে দিয়ে হাত মুখ মুছে আয়নার সামনে দাঁড়িয়ে চিরুনি দিয়ে হালকাভাবে একটু চুল আঁচড়িয়ে খাবার টেবিলের চেয়ারে বসে বলল, আপনি দেখছি সমাজ ছাড়া লোক। সামান্য দশটা মিনিট সময় সহ্য হলো না। সরি, খুব ক্ষিধে পেয়েছে তাই বসে পড়েছি নাও অযথা কথা না বাড়িয়ে খাওয়া শুরু করো। সেতুরও ভীষণ ক্ষিধে পেয়েছে তাই কথা না বাড়িয়ে প্লেটে হাত ধুয়ে খেতে বসলো। আকাশ খাওয়া শেষ করে খাটের পাশে চেয়ারে বসে একটা সিগারেট জ্বালালো। কিছুক্ষণ পর সেতু খাওয়া শেষ করে খাটে এসে বসলো। সেতুর খাওয়া শেষ হলে আকাশ কলিং বেল চাপ দিল কিছুক্ষণ পর ওয়েটার এসে থালা প্লেট গোছাতে গোছাতে বলল, স্যার আর কিছু লাগবে? না কিছু লাগবে না।

আকাশ উঠে গিয়ে দরজা বন্ধ করে আবার চেয়ারে এসে বসে বলল, প্লিজ একটু মনোযোগ সহকারে আমার কথাগুলো শোন তারপর তোমার কথা বলো। আমি যদি তখন ম্যানেজারের কাছে তোমাকে স্ত্রী বলে পরিচয় না দেই তাহলে হোটেলের রুম ভাড়া পাওয়া তো দূরের কথা, তোমাকে নিয়ে ভীষণ ঝামেলায় পড়তে হতো। আপন বোন বলে পরিচয় দেবো তার তো কোন উপায় নেই কারণ আমাদের দুজনের চেহারায় বিন্দুমাত্র মিল নেই। মামাতো বোন, ফুপাতো বোন বা বান্ধবী বলে পরিচয় দেব তাহলে বুঝবে আমরা পালিয়ে এসেছি। এটা বুঝতে পারলে ম্যানেজার আমাদের কাছে মোটা অংকের টাকা চাইবে, যদি তা না দেই তাহলে পুলিশ ডেকে আনবে। অতএব বুঝতে পারছো কেন তোমাকে স্ত্রী বলে পরিচয় দিয়েছি। সেতু কিছুক্ষণ নীরব থেকে এরপর বলল, হ্যাঁ এবার বুঝেছি। এখন রাতে আমি কি পরে শোব তার ব্যবস্থা করুন। কি ব্যবস্থা করবো, আমার ব্যাগে লুঙ্গী, শার্ট ও গেঞ্জি এসব আছে, পড়লে এসব পড়তো পারো। সেতু ব্যাগ খুলে লুঙ্গী আর গেঞ্জী বের করে বলল, কোন উপায় নেই যখন এগুলোই পরি। ‘এই বলে বাথরুমে চলে গেল।’

আকাশ বিছানা ঝেড়ে মশারী খাটের অর্ধেক অংশে টাঙ্গালো অর্ধেক ফাঁকা রাখলো। সেতু বাথরুম থেকে বের হলো। সেতুকে দেখে আকাশ হেসে বলল, তোমাকে এখন যা লাগছে না একেবারে নায়িকাদের মতো। কথা শুনে সেতু মৃদু হেসে তারপর মশারীর দিকে তাকিয়ে অবাক হয়ে বলল, মশারীটা এভাবে টাঙ্গানো কেন? কারণ আছে যেহেতু আমরা অবিবাহিত বলা যায় না ইনকেস কোন দুর্ঘটনা ঘটে যেতে পারে তাই আমাদের দূরত্ব বজায় রেখে শোয়া উচিত। তুমি শোবে মশারীর ভিতরে আমি শোব মশারীর বাইরে। তাই মশারীটা এভাবে টাঙ্গানো দূরত্বের জন্য। সেতু লজ্জা মিশ্রিত কন্ঠে বলল, একই তো বিছানা মশারীর এপার আর ওপার, দূরত্ব রইলো কোথায়। আমি বিছানায় একাই শোব, যদি তা না মানেন তাহলে নিচে বিছানা করে দিন নিচে শোব। কোন পার্টনার নিয়ে বিছানায় আমি শুতে পারবো না। আকাশ উত্তেজিত গলায় বলল, তোমার অনেক জ্বালাতন মুখ বুজে সহ্য করেছি, আর নয়। এখন শোবার যে ব্যবস্থা করেছি সেটাই তোমাকে মেনে নিতে হবে। ইচ্ছে হলো মানো নইলে সারারাত দাঁড়িয়ে থাকো। আমার জায়গায় আমি ঘুমিয়ে পড়লাম। গুড নাইট। ‘এই বলে আকাশ লাইট অফ করে দিয়ে ডিম লাইট জ্বালিয়ে মশারীর বাইরে শুয়ে পড়লো।

সেতু অনেকক্ষণ দাঁড়িয়ে থাকার পরও যখন আকাশের কোন সাড়াশব্দ পেল না তখন বাধ্য হয়ে আস্তে- আস্তে হেঁটে খাটের কাছে গিয়ে আলতোভাবে মশারীটা উঠিয়ে ভেতরে ঢুকলো। বিছানায় ও প্রায় ২৫/৩০ মিনিট সময় বসে থাকলো। আকাশের কোন নড়াচড়া না দেখে চোখ খোলা রেখে বালিশে মাথা দিয়ে বিছানায় শুয়ে পড়লো। বুক তার কাঁপতে লাগল তীব্রভাবে। ভাবতে থাকে- এখন যদি আকাশ মশারীটা উঠিয়ে ওর দেহের উপর ঝাঁপিয়ে পড়ে দেহটা ইচ্ছেমত ভোগ করে ও কিছুই করতে পারবে না, কোন বাঁধা দিতে পারবে না। কারণ চিৎকার করে বাঁধা দিতে গেলে হোটেলের লোকজন ছুটে আসবে। এরপর লোকজন তাদের দুজনকে সোপর্দ করবে থানায়। থানায় সোপর্দ করলেই পরদিন পেপার পত্রিকায় দুজনের ছবি ছাপা হবে তার নীচে থাকবে নানা অশ্লীল কথা। “সাভারের পান্থ নিবাস হোটেল হতে প্রেমিক-প্রেমিকাকে অসামাজিক কার্যকলাপ অবস্থায় পুলিশ গ্রেফতার করেছে।” নয়তো থাকবে “সাভারের পান্থ নিবাস হোটেলে জনগণ খদ্দেরসহ এক পতিতাকে আটক করে থানায় সোপর্দ্দ করেছে।” এরকম নানা আজে বাজে কথা ভাবতে ভাবতে এক সময় সেতু ঘুমিয়ে পড়ে।

সেতুর ঘুম ভাঙ্গে সকাল নয়টার দিকে। ঘুম হতে জেগে পাশে তাকিয়ে দেখে আকাশ নেই। ভেবে নেয় হয়তো বাথরুমে গেছে। এরপর নিজের শরীরকে অক্ষত অবস্থায় দেখে আল্লাহকে ধন্যবাদ জানায়। মৃদু হেসে মনে মনে বলল, ধেৎ আকাশকে নিয়ে রাতে কত আজে বাজে কল্পনাই না করেছি। সত্যি আকাশ ছেলেটা খুবই ভাল। এমন চরিত্রের মানুষ সচরাচর খুব কমই দেখা যায়। নি:স্বার্থ ভাবে আকাশ ওর উপকার করছে। এরপর বিছানা ছেড়ে বাথরুমের দিকে তাকিয়ে দেখে দরজা খোলা। দ্রুত পায়ে বাথরুমের ভেতর উঁকি মেরে আকাশকে না দেখে চমকে উঠে। চারদিকে তাকাতেই দেখতে পেল আকাশের ব্যাগ নেই এবং তার জামা-কাপড়ও নেই। তা দেখে বুকটা ভীষণভাবে কেঁপে উঠে। টেবিলের দিকে তাকিয়ে দেখতে পেল টেবিলের ওপর খাবার দেয়া। হঠাৎ দেখতে পেল খাবার প্লেটের পাশে একটি চিঠি এবং কিছু টাকা। চিঠি দেখে বিদ্যুৎ বেগে গিয়ে তা খুলে পড়তে থাকে।

সেতু, শুভ সকাল। তুমি যখন এ চিঠি পাবে তখন আমি তোমার থেকে অনেক দূরে। তোমার নিশ্চয় স্বরণ আছে, আজ আমার মতিঝিলে একটা সরকারী চাকুরীর ইন্টারভিউ। পরীক্ষা যে কেমন হয় এই টেনশনে রাতে আমার একদম ঘুম হয়নি। তাই খুব সকালে ঘুম হতে উঠেছি। গোসল সেরে জামা কাপড় পড়ে হোটেলের ম্যানেজারের কাছে গত রাতের খাবারের বিল পরিশোধ করেছি এবং টেবিলের ওপর তোমার জন্য যে খাবার আছে তারও বিল পরিশোধ করা। ম্যানেজার ও ওয়েটারকে বলেছি তুমি তাদের না ডাকা পর্যন্ত কেউ তোমাকে ডিস্টার্ব করবে না। চিঠির সাথে কিছু টাকা দিলাম। এ টাকা দিয়ে তুমি ঠাকুরগাঁও চলে যাবে। এটা আমার অনুরোধ। গোসল সেরে বা হাত মুখ ধুয়ে খাওয়া-দাওয়া করে একটু জিরিয়ে এরপর রাস্তায় ওভার ব্রিজের নীচে চলে আসবে। এখান থেকে সরাসরি কলেজগেট যাবার অনেক বাস পাবে। বাসে চড়ে কলেজগেট নেমে হানিফ কাউন্ডারে গিয়ে ঠাকুরগাঁও যাবার টিকিট কাটবে। কাউন্টারে বলবে- মহিলা যাত্রীর সঙ্গে সিট দিবেন। তারা মহিলা যাত্রীর সঙ্গেই সিট দিবে। যদি তা না পারে তাহলে শ্যামলী এসে রাহবার, বাবলু বা এবি কাউন্টারে গিয়ে টিকিট কাটবে।

আমাকে তুমি ক্ষমা করো তোমার কাছ থেকে পালিয়ে এলাম বলে। কি আর করবো এছাড়া যে অন্য কোন উপায় ছিল না, তাই পালিয়ে এলাম। কারণ যে মানুষের মাঝে বিশ্বাস নেই, সততা নেই, অহংকারে হৃদয় ভরা তার সাথে বসবাস করার চেয়ে না করাই ভাল। তুমি যে আমাকে বিন্দুমাত্র বিশ্বাস করোনি তার প্রমাণ রাতে পেয়েছি। আর এ জন্যই তোমার কাছ থেকে পালিয়ে গেলাম। তুমি খাটের কাছে দাঁড়িয়ে ছিলে প্রায় আধ ঘন্টা এরপর মশারীর ভিতর বসে ছিলে আধ ঘন্টা। তারপর বিছানায় শুয়েও তোমার দুচোখে প্রায় এক দেড়ঘন্টা পর্যন্ত ঘুম আসেনি। শুধু বিছানার এপাশ ওপাশ করে সময় পার করেছো আর খুব টেনশনে ভুগেছো। ভেবেছো তোমার ইজ্জত আমি হনন করবো। এতোটা নীচ ও জঘন্য চরিত্রের অধিকারী আমি নই যতটা তুমি ভেবেছো। রাতে স্বপ্নে অনেক কথা বলেছো।

স্বপ্নে যে কেউ এতো কথা বলে তা তোমার কথা না শুনলে বিশ্বাসই করতাম না। স্বপ্নে বলেছো- ‘সোহেল, সোহেল তুমি কোথায়, তোমার জন্য আমি বাড়ি থেকে পালিয়ে ঢাকা এসেছি।’ এর কিছুক্ষণ পর আবার বলেছো- ‘আকাশ নামের একটি ছেলে আমার ইজ্জত নিচ্ছে তুমি আমাকে বাঁচাও।’ তারপর প্রায় দশ মিনিট অতিবাহিত হবার পর বলেছো- ‘ডেডী তুমি যদি সোহেলের সঙ্গে আমার বিয়ে না দাও তাহলে কিন্তু আত্মহত্যা করবো আরও অনেক অসমাপ্ত কথা বলেছো। সেতু, স্বপ্নে যারা কথা বলে তাদের অবচেতন মন কিন্তু সব সময় সত্য কথাটাই বলে। এতেই হানড্রেড পার্সেন্ট সিওর হয়ে নিলাম আমার প্রতি তোমার বিশ্বাস কতটুকু। তোমার সাথে যদি দশটা রাতও একই বিছানায় কাটাই তারপরও তুমি আমাকে বিশ্বাস করতে পারবে না। তা তোমার আচরণেই বুঝে নিয়েছি। যাই হোক- তোমার ভালবাসার গভীরতা দেখে মুগ্ধ হলাম। সোহেল নামের ছেলেটির ভাগ্য খুব ভাল বলতে হয়। কারণ তোমার মত প্রেমিকা পাওয়া বড়ই ভাগ্যের ব্যাপার। তোমার ভালবাসার কাছে আমার স্বপ্নার ভালবাসা তুচ্ছ। স্বপ্নার ভালবাসা ছিল নীরবতা, সে শুধু নীরবে জ্বলে পুড়ে শেষ হয়ে যেত প্রতিবাদ করতো না। ও যদি প্রতিবাদ করতো তাহলে আমাদের ভালবাসায় স্বার্থকতা আসতো। তোমার ভালবাসায় প্রতিবাদ আছে। দোয়া করি তোমার ভালবাসা যেন স্বার্থক হয়।
বিশেষ আর কি- তোমার বিন্দুমাত্র উপকার করে থাকি তাহলে তার বিনিময়ে আমাকে একটু দোয়া করো আমার চাকুরিটা যেন হয়। জান সেতু, আমার একটা চাকুরিটা খুবই প্রয়োজন যা বলে তোমাকে বোঝাতে পারবো না।
ইতি আকাশ

চিঠি পড়ে সেতুর দু’ চোখে অশ্রু ঝরতে লাগল। কেঁদে- কেঁদে বলল, আকাশ তুমি আমাকে ভুল বুঝে এভাবে কেন চলে গেলে? তুমি শুধু আমার বাহিরের রূপটা দেখলে, ভেতরেরটা দেখলে না। তুমি যদি মেয়ে হতে তাহলে আমার মত তুমিও একই আচরণ করতে। মেয়েদের সবচেয়ে বড় সম্পদ হলো ইজ্জত। তা যদি একবার চলে যায় তাহলে তার আর কোন মূল্য থাকে না। তোমার প্রতি আমার অগাধ বিশ্বাস জন্মেছে সকালে। তুমি দশটা রাতের কথা বলেছো। শুধু সকালে আমার সঙ্গে কথা বললে এ ধারণাটা তোমার সম্পূর্ণ পাল্টে যেত। আমার ভেতরের রূপটা যে কেমন তা তুমি দেখে যেতে পারলে না, এটা আমার দুর্ভাগ্য। আমি অন্তর থেকে দোয়া করছি তোমার চাকুরীটা যেন হয়।

আকাশ তুমি খুব ভাল যা বলে শেষ করা যাবে না। তোমাকে যে মেয়ে স্বামী হিসেবে বরণ করবে সে খুব ভাগ্যের জোরেই তোমাকে পাবে। তোমার সাথে আমার আগে কেন দেখা হলো না। সোহেল যদি আমার জীবনে না আসতো তাহলে এ হৃদয়ের মনি কোঠায় শুধু তুমিই স্থান পেতে। সোহেল আছে বলেই তোমার সাথে খারাপ আচরণ করেছি, পাছে যদি তোমার প্রতি দূর্বল হয়ে পড়ি এজন্য। তুমি চলে যাওয়াতে মনে হচ্ছে আমি কি যেন একটা হারালাম। হৃদয়ে শুন্যতা অনুভব করছি। জানিনা কেন এমন হচ্ছে। এই বলে বিছানায় উপুর হয়ে অঝরে কাঁদতে থাকে সেতু। কাঁদতে-কাঁদতে এক সময় ঘুমিয়ে পড়ে। প্রায় দেড়ঘন্টা পর ঘুম হতে উঠে। বালিশের দিকে তাকিয়ে দেখে চোখের পানিতে বালিশ প্রায় অর্ধেক ভিজে গেছে। ও যে এতো কেঁদেছে তা দেখে ভীষণ অবাক হয়ে গেল। এ রকম কান্না আজ সে দ্বিতীয় বার কাঁদলো এ জীবনে। প্রথম বার কেঁদেছিল মায়ের মৃত্যুর পর।

নিজেকে প্রশ্ন করে- আকাশ ওর কি হয়, কেন সে আকাশের জন্য এতো কাঁদলো? অনেক চেষ্টা করে কোন উত্তর খুঁজে পেল না। এরপর বাথরুম গিয়ে গোসল সেরে ড্রেস পড়ে আয়নার সামনে দাঁড়ালো। ভালভাবে চুল আচড়িয়ে খাবার টেবিলে এসে বসলো। পেটে প্রচন্ড ক্ষিধে কিন্তু খেতে ইচ্ছে করলো না। অনিচ্ছা সত্ত্বেও অল্প খাবার খেলো।
খাবার শেষে খাটে হেলান দিয়ে চিন্তা করতে থাকে- হোটেল তো আজকের জন্যও বুক করা। এখন ও কি করবে, বাড়িতে ফিরে যাবে নাকি আজ হোটেলে থাকবে? ঢাকায় থেকে ও আর কি করবে, কার জন্য থাকবে। আকাশের কথা মতো বাড়িতে ফিরে যাওয়া বুদ্ধিমানের কাজ। ওকে না পেয়ে বাড়িতে যে এখন কি ভয়াবহ অবস্থা কে জানে?
অনেক চিন্তা-ভাবনা করে বাড়িতে ফিরে যাওয়াই স্থির সিদ্ধান্ত হলো। সিদ্ধান্ত নেবার পর কলিং বেল চাপ দিলো। কিছুক্ষণ পর ওয়েটার দরজায় এসে নক করলো।

সেতু বলল, কামিং।ওয়েটার রুমে প্রবেশ করে টেবিলের খাবারের থালা প্লেট গোছাতে- গোছাতে বলল, ম্যাডাম যদি কিছু মনে না করেন তাহলে একটা কথা বলতাম। কি কথা বলো। হোটেলে কাজ করার অভিজ্ঞতা আমার তিন বৎসর। এই অভিজ্ঞতা থেকে বলছি। আপনাদের বিয়ে মনে হয় এখনো হয়নি। আপনারা বাড়ি থেকে পালিয়ে এসেছেন। যদি অনুমানটা সঠিক হয় নিঃদ্বিধায় সব কিছু খুলে বলতে পারেন। আমি আপনার উপকার ছাড়া অপকার করবো না। শুধু একটু বকশিস দিয়ে খুশি রাখবেন। যতদিন ইচ্ছে এখানে থাকেন কোন অসুবিধা হবে না। কথা শুনে সেতু প্রথমে ঘাবড়ে যায় পরে নিজেকে সামলে নিয়ে হাসিমুখে বলল, আপনার অনুমান অনেকটা সঠিক। আমরা এক প্রকার পালিয়ে এসেছি বলা চলে। তবে বিয়ে আমাদের হয়েছে সেটা কোর্ট ম্যারেজ করে। ও আচ্ছা, আচ্ছা। একই কলেজে দু’জনে পড়াশোনা করি জানাশোনাতে সম্পর্কে গড়ে উঠে। দু’জন দু’জনাকে ভীষণ ভালবাসি। আকাশের বাবা খুব ধনী, আমরা গরীব বলে আমার সাথে বিয়ে দিতে একেবারেই রাজী নন।

অন্য জায়গায় তিনি ছেলের জন্য পাত্রী ঠিক করেছেন। আমি আকাশকে অনেক বুঝিয়ে সুঝিয়ে কোর্ট বিয়ে করেছি। বুদ্ধিমানের কাজ করেছেন। এখন আপনার শ্বশুড় দু’দিন আগে হোক আর দু’দিন পরে হোক বাড়িতে তুলবেই। আচ্ছা, সকাল সকাল আপনার হাজবেন্ড ব্যাগ নিয়ে ম্যানেজারকে বিল পরিশোধ করে কোথায় গেল?  মিরপুরে গেছে।  কেন?  মিরপুরে আমার হাজবেন্ডের ফুপু আছে। সেখানে গিয়ে ফুপুর হাত-পা ধরে যদি মানাতে পারে এই জন্য গেল। আমাকে নিয়ে গেল না যদি ফুপু রাগ করে। এখন ফুপুকে ম্যানেজ করে তারপর আমাকে নিয়ে যাবে। বাঃ আপনাদের দেখছি খুব বুদ্ধি। অনেক কথা হলো, ওদিকে আবার কোন রুমে ডাক পড়েছে কিনা কে জানে। আমি এখন আসি কোন কিছুর প্রয়োজন হলে জানাবেন। আচ্ছা জানাবো। ওয়েটার চলে গেল। ওয়েটার চলে যাবার পর সেতু যেন হাফ ছেড়ে বাঁচে।

নিজেই বিস্মিত মনে মনে বলল, এতোগুলো মিথ্যে কথা ও অনর্গল ভাবে বলল কিভাবে? ভাবলো, ওয়েটার যখন ওদেরকে সন্দেহ করেছে, ম্যানেজারও যে সন্দেহ করেনি এটা না ভেবে পারা যায় না। ম্যানেজার নিশ্চুব আছে তার ব্যবসার খাতিরে। আকাশ যদি এখন থাকতো একটা কথা ছিল। যেহেতু কাছে নেই, অতএব বলা যায় না আরও কত প্রশ্নের উত্তর ওকে যে দিতে হয়। তাই দেরি না করে এক্ষনই হোটেল ত্যাগ করা বুদ্ধিমানের কাজ। আয়নার সামনে দাঁড়িয়ে ভালভাবে চুল আঁচড়িয়ে রুম হতে বের হলো। হোটেলের কাউন্টারের সামনে দিয়ে যাবার সময় লক্ষ্য করে হোটেলের ম্যানেজার এবং তার আশে পাশে বসা কয়েকজন লোক ওর দিকে তীক্ষ্ণ দৃষ্টিতে তাকিয়ে আছে। তাদের তাকানো দেখেই বুঝতে পারে ওকে নিয়ে নিশ্চয় কোন কথা হচ্ছে। হোটেল হতে সিঁড়ি দিয়ে নিচে নেমে এদিক ওদিক তাকিয়ে এরপর রাস্তায় এসে বাসের জন্য অপেক্ষা করতে থাকে। কিছুক্ষণ পর একটি বাস এসে থামার পর হেলপার চিৎকার দিয়ে ডাকতে থাকে- এই গাবতলী-গুলিস্থান, গাবতলী-গুলিস্থান। যাত্রী উঠতে থাকে। তাদের সাথে সেতুও বাসে চড়ে।

সিটে বসে আকাশের কথা খুব মনে পড়তে লাগল। আকাশ কাছে থাকলে এতো তাড়াতাড়ি ও বাড়িতে ফিরে যেতো না। দু’তিন দিন হোটেলে থেকে এরপর বাড়িতে ডেডীর কাছে টেলিফোন করে বলতো- “ডেডী, সোহলের সঙ্গে আমার বিয়ে দিতে তুমি রাজী না হওয়া পর্যন্ত আমি বাড়ি ফিরবো না।” যদি বিয়ে দিতে রাজী না হতো তাহলে আরো কয়েক দিন থাকলে এরপর অবশ্যই ওর ডেডী রাজী হতো সোহেলের সঙ্গে বিয়ে দিতে। বাস শ্যামলী পার হবার পরই ও কলেজ গেটে নেমে পড়ে। রাস্তা পার হয়ে হানিফ কাউন্টারে এসে ঠাকুরগাঁও যাবার টিকিট কাটে আকাশের কথামতো পাশে মহিলা যাত্রী দেবার শর্তে। কাউন্টারের লোক রাজি হয়। সেতু টাকা দিয়ে টিকিট নিয়ে বলল, কোচ ছাড়তে কতক্ষণ দেরি।  আর মাত্র এক ঘন্টা পর। ঠিক আছে আসি।  এই বলে কাউন্টার থেকে বের হয়ে হেঁটে হেঁটে এক রেস্তরায় গিয়ে বসে নাস্তা করার জন্য। নাস্তা খেতে খেতে এক সময় খেয়াল হলো এ রেস্তরায়ই গতকাল ও আর আকাশ সামনের ঐ টেবিলে বসেছিল আজ তা শুধু স্মৃতি। খাবার শেষে বিল পরিশোধ করে রেস্তরা হতে বাইরে এসে দাঁড়িয়ে চিন্তা করে- বাড়িতে যখন ফিরে যাচ্ছি ডেডীর কাছে একটা ফোন করা দরকার। ডেডী নিশ্চয় আমার চিন্তায় পাগল হবার মত অবস্থা। একটা টেলিফোন করলে ডেডী নিশ্চিন্ত থাকতেন। কিছু দূর হেঁটে একটা ফোন ফ্যাক্সের দোকানে যেয়ে ঠাকুরগাঁও টেলিফোন করে- সেতুর বাবা টেলিফোন উঠিয়ে বলল, হ্যালো, আনিস চৌধুরী বলছি। কে বলছেন? ডেডী, আমি সেতু।

মা সেতু আমার, তুই কেমন আছিস। ঠাকুরগাঁও এর এমন কোন জায়গা নেই যেখানে তোর খোঁজ করিনি। তুই তাড়াতাড়ি বাড়ি চলে আয়। আমি তোর চিন্তায় ভীষণ অস্থির হয়ে আছি। অনেক চিন্তা-ভাবনা করে দেখলাম তোর সুখই আমার সুখ। তাই সিদ্ধান্ত নিয়েছি সোহেলের সঙ্গেই তোর বিয়ে দেব। সত্যি ডেডী। হ্যাঁ সত্যি বলছি। তুই তাড়াতাড়ি চলে আয়। তুই এখন কোথায়? ঢাকায়। ঢা- কা-। ডেডী আমার জন্য কোন চিন্তা করো না। আমি কিছুক্ষণ পরই হানিফ কোচে ঠাকুরগাঁও রওয়ানা দেব, তুমি কোন চিন্তা করোনা। রাখি ডেডী। এই শোন সেতু টেলিফোন রেখে দোকানদারকে বিল পরিশোধ করে কোচে গিয়ে বসে। মনটা একটু খারাপ লাগে তার বাবার সাথে ভালভাবে কথা বলতে পারেনি বলে। ভালভাবে কথা বলতে গেলে টেলিফোন বিল বেশি উঠবে তাই তাড়াতাড়ি লাইন কেটে দিয়েছে। পৃথিবীতে টাকার প্রয়োজন যে কতখানি ঢাকায় এসে জীবনে প্রথম উপলব্ধি করতে পেরেছে। সিটে হেলান দিয়ে চোখ বন্ধ করে সোহেলকে নিয়ে নানা কথা ভাবতে-ভাবতে এক সময় ঘুমিয়ে পড়ে। কোচ ছাড়ার পূর্ব মুহুর্তে ওর ঘুম ভেঙ্গে যায়। পাশের সিটে দেখে এক বয়স্ক মহিলাকে। মহিলা বলল, তুমি কি একা সাথে কেউ নেই। না আন্টি কেউ নেই।

কোচ কলেজগেট হতে ঠাকুরগাঁও এর উদ্দেশ্যে রওনা হলো। পথে মহিলার সাথে আলাপ করে বেশ সময় পার হলো ওর। কোচ ঠাকুরগাঁও এসে পৌঁছে বিকেল চারটার সময়। সেতু কোচ হতে নেমে দেখে ওর ডেডী কারের সামনে দাঁড়িয়ে অপেক্ষা করছে। ও দৌড়ে গিয়ে বাবাকে জড়িয়ে ধরে কেঁদে উঠে বলে, ডেডী আমাকে তুমি ক্ষমা করে দাও। আমি আর কোনদিন এভাবে বাড়ি থেকে পালাবো না। আনিস চৌধুরী সেতুর মাথায় হাত বুলিয়ে বলল, পাগলী মেয়ে এভাবে কেউ বাবাকে কষ্ট দেয়। এরপর তিনি চারদিকে তাকিয়ে বলেন, সোহেল কোথায় ওকে যে দেখছি না। সেতু কান্না থামিয়ে বলল, আমি ঢাকায় সোহেলের সঙ্গে দেখা করার জন্যই গিয়েছি কিন্তু ওর সাথে দেখা হয়নি। আনিস চৌধুরী বিস্মিত কন্ঠে বললেন, সেকি! ঢাকায় তাহলে তুই কার কাছে ছিলি। সে অনেক কথা ডেডী। বাড়িতে যেয়ে সব বলবো। আচ্ছা, এখন চল। দু’জনে কারের পেছনের সিটে বসে। ড্রাইভার বাড়ি অভিমুখে কার চালাতে থাকে। বাড়িতে ফিরে আনিস চৌধুরী বলেন, তুই এখন ভীষন টায়ার্ড। এখন শুয়ে বিশ্রাম কর পরে সব কথা শোনা যাবে। আচ্ছা।

সকালে ব্রেকফাষ্টের পর সেতু ওর বাবাকে বলতে থাকে- কোচে আকাশের সাথে কিভাবে পরিচয় হলো, কলেজগেটে ভ্যানেটি ব্যাগ চুরির ঘটনা, হোটেলে আকাশের সাথে থাকা, একে একে সমস্ত ঘটনা খুলে বলল। সব শুনে আনিস চৌধুরী বলেন, উফ্‌ আর ভাবতে পারছি না। তুই যে এতোটা বোকা মেয়ে তা তো জানা ছিল না। ঢাকায় মাস্তান, চিটার বাটপারের অভাব নেই। যদি তোর কিছু একটা হতো। সমাজে আমার মান সম্মান সব ধুলোয় মিশে যেত। ভাগ্যিস আকাশ ছেলেটির সাথে দেখা হয়েছিল বলে রক্ষ্যে। তোর কথা শুনে বুঝতে পারছি ছেলেটির মধ্যে কোন লোভ-লালসা নেই। আমি এরকম একটি ছেলে অনেক দিন হতে খুঁজছি। আকাশের বাড়ি যখন ঠাকুরগাঁয়ে ছ’মাস পর হোক আর এক বছর পরই হোক একদিন না একদিন ওর দেখা পাবো। দেখা হলেই ওকে বাড়িতে নিয়ে আসবো। ওকে আমারও ভীষণ দরকার। ওর সাথে আমার কিছু বোঝাপড়া আছে। গালমন্দ করবি নাকি? কি করবো তা আমার মনেই আছে। ওর জন্য অনেক চোখের পানি ব্যয় করেছি আনিস চৌধুরী মৃদু হেসে বলল, ও বুঝেছি আর বলতে হবে না। সেতু রাগ দেখিয়ে বলল, কি বুঝেছো? ইয়ে মানে, না না কিছু বুঝিনি। আমার অফিসে যাবার সময় হয়েছে আজ আর তোর কলেজে যাবার দরকার নেই। বাড়িতে বিশ্রাম কর।

সেতু নরম গলায় বলল, ডেডী তুমি কি সত্যিই সোহেলের সাথে আমার বিয়ে দেবে? আনিস চৌধুরী বলল, বিয়ে না দিয়ে উপায় আছে। তুই তোর নিজের সিদ্ধান্তই অটল। বিয়ে না দিলে আবার পালিয়ে যাবি। কি দরকার আর হয়রানি হবার, মান সম্মান নষ্ট করার। দেখি দু’ এক মাসের মধ্যেই সোহেলের সঙ্গে তোর বিয়ে দেব। ‘ এই বলে তিনি হন হন করে হেঁটে চলে গেলেন।’ সেতু বলল, ডেডী তুমি আমার উপর যতই অভিমান করো আমি সোহেলকেই বিয়ে করবো। তুমি শুধু শুধু সোহেলের উপর রেগে আছো। ওর চরিত্র খারাপ নয়। এমন কি আমাদের ধন সম্পদের প্রতিও ওর বিন্দু মাত্র লোভ নেই। ও জীবনের চেয়ে বেশি ভালবাসে আমাকে। ওর ভালবাসায় আজ পর্যন্ত আমি কোন খাদ খুঁজে পাইনি। ওকে বিয়ে করবো না তো কাকে বিয়ে করবো। পরদিন সেতু যথানিয়মে কলেজে যায়। ওকে দেখে ওর দু’বান্ধবী দিপা আর পিংকী ছুটে এলো। দিপা বলল, তোর সাথে আমাদের জরুরী কিছু কথা বলার আছে। তুই আজ কলেজে না এলে আমরা তোর বাসায় যেতাম। তাই নাকি? হ্যাঁ। চল ঐ নারিকেল গাছের নিচে গিয়ে বসি সেখানে নিরিবিলি ভাবে সব বলবো। আচ্ছা চল।তিনজনে হেঁটে নারিকেল গাছের নিচে গিয়ে বসে। সেতু বলল, জানিস একটা খুব ইন্টারেস্টিং খবর আছে।

পিংকী বলল, কি খবর?  শুনলে তোরা ভীষণ খুশি হবি। আমার জিদের কাছে ডেডী হার মেনে এখন সোহেলের সঙ্গে বিয়ে দিতে রাজী হয়েছে। একথা শুনে পিংকী আর দিপা মুখ ভার করে থাকে। তা দেখে সেতু বলল, কিরে, এতোবড় একটা সু-খবর দিলাম আর তোরা তা শুনে মুখ ভার করে আছিস যে? পিংকী বলল, দিপা কি বলে শোন। তা শুনলে তোর বিয়ের সাধ মিটে যাবে। সেতু বিস্মিত কন্ঠে বলল, সোহেলের কিছু হয়েছে? দিপা বলল, ওর কিছু হয়নি, যা হবার তোরই হয়েছে। তার মানে- আমি তো কিছুই বুঝতে পারছি না। কি বলবি সরাসরি বল। পিংকী বলল, আমি তো প্রথমেই সেতুকে বলেছি সোহেলের হাবভাব আমার ভাল ঠেকছে না। ওর বিষয়ে সব কিছু ভালভাবে জেনে নে। তখন কে শোনে কার কথা। সোহেলের মত নাকি ভাল ছেলেই হয় না। সেতু রেগে বলল, তোরা আর আমাকে পাগল করিস না তো, কি হয়েছে তাড়াতাড়ি বল। দিপা বলল, সোহেল তোকে ভালবাসে না, ভালবাসে তোদের ধন সম্পত্তিকে। তোকে বিয়ে করলে তোদের সমস্ত ধন সম্পত্তির মালিক ও হবে, এজন্যই তোকে ভালবাসে।

আমি এটা বিশ্বাস করিনা। এর প্রমাণ কি? সোহেলের সঙ্গে প্রথমে তো পিংকীর পরিচয় ছিল। এর পরতো তোর সাথে পরিচয়। পিংকী তো তোর চেয়ে কম সুন্দর না। ও পিংকীকে না ভালবেসে তোকে কেন ভালবাসতে গেল। আহাঃ ভালবাসা ডিপেন্ট করে সম্পূর্ণ মনের উপর। অনেক ক্ষেত্রে দেখা যায়, একটি ছেলের অনেক সুন্দরী বান্ধবী থাকা সত্ত্বেও সে ভালবেসে বিয়ে করে একটি কালো মেয়েকে। এখানেই প্রশ্ন জাগে একটি সেটি হলো- কেন? ভালবাসার সংজ্ঞায় এই ‘কেন’র কোন উত্তর নেই। দিপা বলল, এতো সংজ্ঞা দিয়ে বোঝাতে হবে না, তোদের মত পিংকী ধনী নয় এজন্য পিংকীকে ভালবাসেনি। তুই তো সোহেলকে কত অপমান করেছিস তার কোন হিসেব নেই। একমাত্র ধন সম্পত্তির লোভেই ও সমস্ত অপমান নীরবে হজম করেছে তবুও তোর পিছু ছাড়েনি। আস্তে-আস্তে তোর মন জয় করেছে। রূপ দেখে সবাই প্রেমে পড়েনা। সোহেল আমার মাঝে এমন কিছু হয়তো দেখেছে যার জন্য ভালবেসেছে। সম্পত্তির লোভে ও আমাকে ভালবেসেছে এটা আমি বিশ্বাস করি না।

বিশ্বাস অবিশ্বাস তোর কাছে। আমাদের কথা এখনো শেষ হয়নি। সোহেলের ক্লাসে ওর উপস্থিতি নেই বললেই চলে। ও সব সময় বন্ধু-বান্ধব নিয়ে ব্যস্ত থাকে। মাঝে মধ্যে তিন-চারদিনের জন্য হাওয়া হয়ে যায়। ওর কাছে কিন্তু কোন সময় টাকা পয়সার কমতি নেই। ও মাঝে মধ্যে কোথায় যায়, কি করে, এতো টাকা-পয়সার উৎস কোথায়, কখনো কি এটা চিন্তা করেছিস? সেতু একটু চিন্তিত হয়ে বলল, না তো। বললে তো তোর বিশ্বাস হবে না। সোহেল ড্রাগ, হেরোইনের ব্যবসা করে এবং নিজেও এটার প্রতি আসক্ত। সেতু রেগে উঠে দাঁড়িয়ে বলল, অসম্ভব। আমি এসব কিছুই বিশ্বাস করিনা। সব তোদের বানানো কথা। পিংকী সেতুর হাত ধরে বলল, আমরা তোর স্কুল জীবনের বান্ধবী। আমরা কি তোর মন্দ চাই বল। আমাদের উপর অযথা রাগ করিস না। চুপ করে বসে আগে সব কথা শোন। সেতু মুখ ভার করে বলল, আর কি বলবি বল। দিপা বলল, এবার যা বলবো তা শুনলে তোর মাথা খারাপ হয়ে যাবে। সোহেল একজন খারাপ চরিত্রের ছেলে। ও যে কত মেয়ের জীবন নষ্ট করেছে তার হিসেব নেই। সেতু একথা শুনে আঙ্গুল উঁচিয়ে বলল, দেখ দিপা আর একটা যদি সোহেলের নামে বাজে কথা বলিস তাহলে তোর সঙ্গে আমার চিরদিনের মতো সম্পর্ক এখানেই শেষ করে ফেলবো।

দিপা বলল, সেতু তুই আমাকে ভুল বুঝিস না। আমি একটা কথাও বানিয়ে বলিনি। আমার সোহরাব আংকেলকে তো চিনিস। তিনি সিআইডি। তিনি আমাকে সব কথা বলেছেন- প্রমাণের অভাবে তিনি সোহেলকে গ্রেফতার করতে পারছেন না। তবে তিনি আশা রাখেন খুব তাড়াতাড়ি সোহেলকে গ্রেফতার করতে পারবেন কারণ ওদের দলে নাকি একটু ভাঙ্গন শুরু হয়েছে। আমার কথা বিশ্বাস না করলে চল সোহরাব আংকেলের কাছে যাই। গেলে শুনবি তিনি এগুলো কথা বলবেন। তুই পিংকীকে জিজ্ঞাসা কর, আমি তো সোহেলের কথা একদম বিশ্বাস করিনি। বলেছি- আংকেল আপনি যে সোহেলের কথা বলছেন এ সোহেল এমন হতেই পারে না। শেষে আংকেল- আমাকে বিশ্বাস করানোর জন্য একটি ফাইল বের করে দেখান। সেই ফাইলে দেখি সোহেলের ছবি। আংকেল আমাকে বলেছেন এ গোপনীয় কথা যেন কাউকে না বলি। এ কথা শুনে সেতু দু’হাতে মাথা চেপে ধরে বলল, উঃ আমি আর ভাবতে পারছি না। এমন একটি দুঃচরিত্র ছেলের সাথে এতদিন প্রেম করে আসছি। ওর এতো দু:স্কর্মের একটি বিষয়ও টের পাইনি।

পিংকী বলল, টের পাবি কিভাবে। ওর সাথে তো তোর সম্পর্কই মাত্র চার মাস। একটি মানুষকে মোটামুটি ভাবে চিনতে গেলেও কমপক্ষে ছ’মাস লাগে। পৃথিবীতে মানুষকে চেনা বড়ই কঠিন ব্যাপার। সোহেল অদ্ভুত চরিত্রের ছেলে। ওকে চিনতে গেলে কমপক্ষে তোর এক বছর লাগবে। সেতু বলল, তোরা সোহেলকে যতই খারাপ ভাবিস না কেন, ওর একটা সাইড আমার প্রশংসা করতে হয়। সেটা হলো- ওর সাথে কত নির্জন জায়গায় বসে গল্প করেছি ওর রুমে কত ঘন্টার পর ঘন্টা সময় পার করেছি। ও ইচ্ছে করলে অনায়াসে আমার ক্ষতি করতে পারতো কিন্তু ওর সে রকম দৃষ্টিই দেখিনি। দিপা বলল, ওর দৃষ্টি তো তোর দেহের দিকে ছিল না। দৃষ্টি ছিল তোদের সম্পত্তির দিকে। তুই যেন ওকে গভীরভাবে ভালবাসিস, বিশ্বাস করিস এজন্যই ও তোর সাথে ভাল ব্যবহার করেছে। সেতু বলল, বড় বাঁচা বেঁচে গেছি। আচ্ছা এখন কি করা যায় বলতো। সোহেল এখন ঢাকায় আছে। ও ঢাকা থেকে ফিরে এলেই তো আমার কাছে ছুটে আসবে। ভালবাসার দাবি নিয়ে সামনে দাঁড়াবে, কথা বলবে। তখন ওকে আমি কিভাবে ফিরিয়ে দেবো, ফিরিয়ে দিলে শেষে যদি আমার কোন ক্ষতি করে।

পিংকী বলল, অনেক সুযোগ পাবার পরও যেহেতু সোহেল তোর কোন ক্ষতি করেনি, তাই ক্ষতি করার কোন সম্ভাবনা নেই। তাছাড়া এখনতো তুই সচেতন, ও ক্ষতি করার চেষ্টা করলেও করতে পারবে না। ওকে তো একেবারে দূরে সরাতে পারবি না, আস্তে-আস্তে দূরে সরিয়ে দে। দিপা বলল, পিংকী ঠিকই বলেছে। আস্তে-আস্তে সোহেলকে দূরে সরাতে হবে। ওকে একদম বুঝতে দিবিনা যে, তুই ওকে আর ভালবাসিস না। আগে যেভাবে নির্জন জায়গায়, ওর রুমে গিয়ে গল্প করতি এখন আর তা করবি না। ওর সাথে ডেটিং একেবারেই বাদ। কলেজে বা কোনখানে ওর সাথে দেখা হলে ব্যস্ততা দেখাবি, দু’চারটা কথা বলেই আলাপ শেষ করবি। সেতু বলল, আচ্ছা তাই হবে। তোদের কথামতই চলবো। চল ক্লাসের সময় হয়ে আসছে ক্লাসে যাই। দিপা আর পিংকী বলল, আচ্ছা চল। তিনজনে দাঁড়িয়ে হাঁটতে থাকে ক্লাস রুমের অভিমুখে। শেষ বিকেলে সেতু বাগানে ফুল গাছে পানি দিচ্ছে। এমন সময় হন্তদন্ত হয়ে দিপা আর পিংকী সদর গেট পেরিয়ে বাড়িতে প্রবেশ করে।

সেতু এ সময় বান্ধবীদের বাড়িতে আসতে দেখে অবাক হয়ে বলল, কিরে তোরা হঠাৎ এই সময়ে। তোদের মুখ চোখ এমন দেখাচ্ছে কেন, কিছু হয়েছে? পিংকী বলল, বড় একটি দুঃসংবাদ আছে। সেতু আৎকে উঠে বলল, কি দুঃসংবাদ? দিপা বলল, সোহেল পুলিশের হাতে দুটা গুলি খেয়েছে। একটি রানে আরেকটি পিঠে লেগেছে। অবস্থা ওর গুরুতর, সদর হাসপাতালে আছে। সেতু কান্নাজড়িত কন্ঠে বলল, দিপা এ কি কথা শোনালি। আমি যে আর ঠিক থাকতে পারছি না। আমাকে তাড়াতাড়ি হাসপাতালে নিয়ে চল। পাগল নাকি? হাসপাতালে পুলিশ, সিআইডি, সাংবাদিক গিজ গিজ করছে। সেখানে গেলে সোহেলকে দেখতেও পারবি না শুধু শুধু নানা প্রশ্নের সম্মুখিন হতে হবে। যতই প্রশ্নের সম্মুখিন হতে হোক। তবুও আমি ওর কাছে যাবো।

পিংকী বলল, তুই তো সকালে কলেজে বললি সোহেলকে আর ভালবাসিস না তাহলে এখন কেন ওর কাছে যাবি।
সোহেল যতই খারাপ ছেলে হোক। ও আমার জীবনের প্রথম ভালবাসা। ওকে ভালবাসি আর নাই বাসি। ওর এতবড় একটা বিপদের দিনে প্রেমিকা হিসেবে নয়, বন্ধু হিসেবে তো পাশে দাঁড়ানো উচিত। দিপা বলল, ঠিক আছে চল। তাড়াতাড়ি তৈরি হয়ে নে। তোরা একটু বাগানের চেয়ারে বস, আমি ঝটপট তৈরী হয়ে আসছি। এই বলে সেতু এক প্রকার দৌড়ে ওর নিজের রুমে গেল। তাড়াতাড়ি ড্রেস চেঞ্জ করে নিচে নেমে ড্রাইভারকে গাড়ী বের করতে বলল। ড্রাইভার বলল, আপা কোথায় যাবেন। হাসপাতালে যাবো। সোহেল পুলিশের হাতে গুলি খেয়েছে। বলেন কি। পুলিশ কেন সোহেলকে গুলি করেছে? আমি জানিনা। তাড়াতাড়ি এখন হাসপাতালে চলো। তিনজন কারে চড়ে বসলো। কার চলতে থাকে। সেতু বলল, দিপা পুলিশ ওকে কেন গুলি করেছে।

দিপা বলল, পুলিশ গোপন সূত্রে খবর পেয়ে নাকি গতকাল রাতে হলপাড়ায় অভিযান চালিয়ে ইসাহাক, মিঠু ও রাশেদ নামের তিনজন ছেলেকে গ্রেফতার করে। তিনজনের ইনফরমেশন মোতাবেক আট গ্যালারীর এক চায়ের হোটেলে সোহেলের শরীর তল্লাশী করে হাফ কেজি হোরোইন পায়। এস, পি ওকে গ্রেফতার করতে উদ্যত হলে ও এস,পি কে ধাক্কা মেরে ফেলে দিয়ে উর্দ্ধশ্বাসে দৌড় দেয়। দৌড় দিতে দিতে লাশকাটা ঘরের পেছন দিয়ে যাবার পর দেখতে পায় কবরস্থানের সামনে থেকে কয়েকজন পুলিশ ছুটে আসছে। তা দেখে ও কোন উপায় না পেয়ে শেষে টাঙ্গন নদীতে ঝাঁপ দেয়। পুলিশ সোহেলকে অনেক বার হুঁশিয়ার সংকেত দিয়ে বলে, সোহেল তুমি আত্মসমর্পণ করো নইলে আমরা গুলি চালাতে বাধ্য হবো। সোহেল ওদের কথা না শুনে সাঁতরাতেই থাকে। এরপর সোহেলকে একটা গুলি করে। তারপরও সে থামে না। শেষে আরেকটি গুলি করে। সে গুলিতে ও নিস্তেজ হয়ে পড়ে।

সেতু দীর্ঘশ্বাস ছেড়ে বলল, সোহেল তুমি কেন এসব কাজ করতে গেলে। দিপা তোর কি মনে হয় ও বাঁচবে।
দুটা গুলি লেগেছে বাঁচার সম্ভাবনা খুবই কম। তবুও বলা যায় না বেঁচে উঠতেও পারে। অনেকে তিন চারটা গুলি খেয়েও বেঁচে যায়। তোরা দোয়া কর যেন সোহেল বেঁচে উঠে।  আচ্ছা। হাসপাতালে আসার পর তিনজন কার হতে নেমে তাকিয়ে দেখে চারদিকে অনেক পুলিশ দাঁড়িয়ে আছে। ওরা তিনজন হাসপাতালের বারান্দায় উঠে সামনের দিকে হাঁটতে লাগল। কিছুদূরে যাবার পর দিপা লক্ষ্য করে ওর সোহরাব আংকেল বারান্দার এক কোণে কয়েকজন পুলিশের সাথে দাঁড়িয়ে গল্প করছে। দিপা তাড়াতাড়ি তার সামনে যেয়ে বলল, আংকেল সোহেল এখন কেমন আছে? তিনি ওদেরকে দেখে অবাক হয়ে বলল, সোহেলের অপারেশন হচ্ছে তুমি এখানে কেন এলে। তা আবার বান্ধবীদের নিয়ে। সোহেল তোর কিছু হয় নাকি? আংকেল, এই যে আমার বান্ধবী সেতু। সোহেল ওর ঘনিষ্ট বন্ধু। তাই সোহেলকে দেখার জন্য আমাকে আর পিংকীকে সাথে নিয়ে এসেছে। প্লিজ আংকেল সোহেলের অপারেশনের পর ওর সাথে সেতুর একটু দেখা করার ব্যবস্থা করে দেন।

অপারেশন শেষ হোক, আমি দেখা করার ব্যবস্থা করে দেব। তোমরা ঐ চেয়ারে বসে অপেক্ষা করো। আচ্ছা। ‘এই বলে তিনজন অপারেশন থিয়েটারের সামনের চেয়ারে গিয়ে বসে। প্রায় বিশ মিনিট পর অপারেশন থিয়েটার হতে ডাক্তার বের হলেন। ডাক্তারকে দেখে দিপার আংকেলসহ তিন চার জন অফিসার ডাক্তারের কাছে ছুটে এসে বলল, ডাক্তার সাহেব কি খবর? অপারেশন সাকসেসফুল। কিন্তু পেশেন্টের অবস্থা খুবই নর্মাল। আশা করছি তিন চার ঘন্টার মধ্যেই জ্ঞান ফিরে আসবে। আপনাদের কাছে একটা রিকোয়েষ্ট। জ্ঞান ফেরার পর পেশেন্টকে কোন বিরক্ত করবেন না। কমপক্ষে তাকে দুদিন বিশ্রামে থাকতে দিন। অফিসার বলল, ঠিক আছে ডাক্তার সাহেব আমরা রোগীকে দুদিনের মধ্যে কোন বিরক্ত করবো না। ডাক্তার তাদেরকে ধন্যবাদ জানিয়ে চলে গেল। এর কিছুক্ষণ পর দুজন নার্স ও একজন ডাক্তার বেডে করে অপারেশন থিয়েটার হতে সোহেলকে নিয়ে বের হলো। দিপা, পিংকী ও সেতু বেডের সাথে সাথে যেতে থাকে। সেতু দেখলো সোহেলের মুখে অক্সিজেন দেয়া, চোখ মুখ ফ্যাকাশে হয়ে গেছে।

সোহেলকে ১২ নং কেবিনে রাখা হলো। চারজন পুলিশ অস্ত্র হাতে কেবিনের সামনে দাঁড়িয়ে পাহাড়ায় দাঁড়ালো।
দিপা, পিংকী, সেতু কেবিনের বাইরে দাঁড়িয়ে থাকে। সেতুর আংকেল কেবিনের ভেতর প্রবেশ করে। কিছুক্ষণ পর তিনি বের হয়ে সেতুকে বলল, সোহেলের জ্ঞান ফিরতে অনেক দেরি। তোমরা এতক্ষণ হাসপাতালে থেকে কি করবে। এক কাজ করো, একেবারে সকালে এসে ওকে দেখে যেও। দিপা বলল, ঠিক আছে আংকেল সকালে আসবো। কিন্তু সকালে এলে যদি সোহেলের সঙ্গে আমাদের দেখা করতে না দেয়। দেখা করতে দেবে। যে কেউ এলেই সোহেলের সঙ্গে দেখা করতে পারবে, শুধু একটু সিষ্টেম মেনটেন করতে হবে। সেটা হলো ডিউটি অফিসারের অনুমতি নিতে হবে। আমি ডিউটি অফিসারকে বলে রাখবো। তোমরা যখন আসবে তখনই ওর সাথে দেখা করতে পারবে, কোন অনুমতি লাগবে না। দিপা বলল, আংকেল আমরা তাহলে এখন আসি। আচ্ছা যাও। তিনজনে সালাম জানিয়ে হাসপাতাল হতে বের হয়ে কারে বসে। কার চলতে থাকে। ড্রাইভার বলল, আপা এখন কোথায় যাবেন? আর কোথাও যাবো না, সোজা বাড়িতে চলো। দিপা বলল, সেতু আমাকে বাড়ির সামনে নামিয়ে দিস।

এখন আমাদের বাড়িতে চল। পরে তোদেরকে ড্রাইভার বাড়িতে পৌঁছে দেবে। আজ রাতে তিনজনে একসাথে ডিনার করবো। পিংকী বলল, বাড়িতে চিন্তা করবে তো। কোন চিন্তা করবে না। বাড়িতে টেলিফোন করে দিবি। দরকার হলে টেলিফোনে আমিও আন্টিকে রিকোয়েষ্ট করবো। আচ্ছা। কার এসে সেতুদের বাড়িতে প্রবেশ করে। কার হতে তিনজনে নেমে সেতুর রুমে প্রবেশ করে। সেতু বলল, তোরা তোদের বাড়িতে টেলিফোন কর আমি বুয়াকে খাবারের কথা বলে আসি। দিপা বলল, আচ্ছা যা। সেতু চলে গেল। দিপা আর পিংকী ওদের বাড়িতে টেলিফোন করে। এর কিছুক্ষণ পর সেতু রুমে প্রবেশ করে খাটে বসে। দিপা বলল, তোরা যাই বলিস সোহেলের দেখি কৈ মাছের প্রাণ। দুটা গুলি খেয়েও বেঁচে গেল। ভাগ্যটা ওর খুব ভাল বলতে হয়।

পিংকী বলল, তা ঠিক। কিন্তু এখন ওর কি হবে। জেলের ঘানি টানতে টানতে জেলেই ওর জীবন শেষ হয়ে যাবে।
দিপা বলল, সোহেলের কিছুই হবে না দেখে রাখিস। ওর বাবার টাকা আছে উপর লেভেলে নাকি বড় ধরনের লিংকও আছে। হাইকোর্ট করে কিছুদিনের মধ্যেই ওকে জামিনে বের করে আনবে। দেখবি এরপর টাকা ছিটিয়ে কেস কোন দিকে নিয়ে যাবে তার ঠিক নেই। ‘ এই বলে সেতুর দিকে তাকিয়ে বলল, কি রে তুই এতো মনমরা হয়ে আছিস কেন, তোর আবার কি হলো? সোহেলকে দেখে খুব খারাপ লাগছে রে। হাসপাতাল হতে আসতে ইচ্ছে করছিল না। আমার মনটা যেন কেমন করছে। মনে হয় সোহেল বাঁচবে না। ওর সবচেয়ে বড় বিপদ কেটে গেছে। অপারেশন তো সাকসেসফুল হলো। শোন, সফল অপারেশন হবার পর খুব কম রোগীই মারা যায়। আচ্ছা, সোহেলকে নিয়ে তোর এতো টেনশন কেন? বুঝেছি এখনো তুই ওকে ভুলতে পারিসনি, তোর হৃদয় জুড়ে ও আছে।

সেতু দীর্ঘশ্বাস ছেড়ে বলল, না রে এতোকিছু জানার পর হাতে নাতে প্রমাণ পেয়ে আর তো কিছু বলার অপেক্ষা রাখে না। ওর প্রতি আমার যা ভালবাসা ছিল আজ তা সব কর্পূরের মত উড়ে গেছে। ও যদি কোন পতিতাকে নিয়ে ধরা খেত তবুও ওর প্রতি আমার ভালবাসা থাকত। মনে করতাম বয়সের দোষে বা বন্ধুদের পাল্লায় পড়ে এমনটি হয়েছে। কিন্তু এখন ও যা করেছে তার কোন ক্ষমা নেই। দেশের সবচেয়ে বড় সম্পদ হলো যুব সমাজ। যুবকরা বৃদ্ধ মা-বাবার একমাত্র ভরসা, আশ্রয় স্থল। সেই যুবকদেরকে ও নেশা খাইয়ে ধীরে ধীরে মৃত্যুর দিকে ধাবিত করছে। এরকম দেশদ্রোহী ও জঘন্য মানুষের সাথে আমার কেন, কোন মানুষেরই সম্পর্ক রাখা উচিত নয়। সোহেল আমার হৃদয় হতে বন্যার পানির মত ধুয়ে মুছে সাফ হয়ে গেছে। হৃদয়ে জমেছে উর্বর পলি। সেই পলিতে আমার অজান্তে একজন ভালবাসার বৃষ্টি ছিটিয়ে দিয়ে গেছে। তা টের পাইনি। এখন তা মর্মে মর্মে অনুভব করছি। ‘এই বলে সেতু এক ধ্যানে ঘরের দেয়ালে শাখরুখ খানের একটি পোষ্টারের দিকে তাকিয়ে থাকে।’ কথা শুনে দিপা চোখ ইশারা করে পিংকীকে বোঝায়, তুই কিছু জানিস? পিংকী মাথা নেড়ে বোঝায়, ও কিছু জানে না।

দিপা সেতুর পিঠে হাত দিয়ে বলল, তুই তো আচ্ছা মানুষ। আমরা তোর ঘনিষ্ট বান্ধবী হয়েও কিছু জানিনা। কে সেই ভাগ্যবান ব্যক্তি যে তোর হৃদয়ে ভালবাসার বৃষ্টি ঝরিয়ে দিয়ে গেছে? তার নাম আকাশ। থাকে ঠাকুরগাঁও জেলায় এর বেশি কিছু জানিনা। ‘ এই বলে সেতু কিছুক্ষণ নীরব থেকে তারপর আকাশের সাথে কিভাবে পরিচয় হলো, ঢাকায় যাবার পর কি ঘটলো, একে একে সমস্ত ঘটনা খুলে বলল। দিপা বলল, তোর কথা শুনে আকাশকে আমারও ভালবাসতে ইচ্ছে করছে। এমন ছেলে পাওয়া বড়ই ভাগ্যের ব্যাপার। তোর ব্যবহার ও রকম করা উচিত হয়নি। একমাত্র তোর ব্যবহারের কারণেই ও তোর থেকে দূরে পালিয়ে গেছে। পিংকী বলল, আকাশের ঠিকানাটা যদি জেনে রাখতি তাহলে ওকে পাওয়া কঠিন কোন ব্যাপার ছিল না। চরম ভুল তো ওখানেই করেছি। ঠিকানাটা জানা থাকলে কমপক্ষে ওর কাছে গিয়ে উপকারের কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করে আসা যেত। এখন আমি কি করবো, তোরা বলে দে। আকাশকে কোথায় খুঁজে পাবো? দিপা বলল, আমরা কি করবো। তুই এখন থেকে প্রেমের সাধনা কর। যদি তোর সত্যিকারের প্রেম হয় তাহলে একদিন না একদিন আকাশকে খুঁজে পাবি।

দিপা বলল, এক কাজ করলে কেমন হয়। তুই পেপারে আকাশের জন্য বিজ্ঞাপন ছাপিয়ে দে। “আকাশ, তোমার সাথে খারাপ আচরণের জন্য আমি অনুতপ্ত। তুমি একটি অসহায় মেয়েকে অনেক উপকার করেছো। এ জন্য তোমাকে শত কৃতজ্ঞতা জানাই। তুমি যেখানেই থাকো তাড়াতাড়ি আমার সাথে দেখা করো। তোমার অপেক্ষায় রইলাম। ইতি, সেতু। ‘ এরপর তোর ঠিকানা দিবি। ব্যাস দেখবি, কয়েকদিনের মধ্যেই আকাশ তোর সামনে হাজির হবে। দিপা বলল, পিংকীর বুদ্ধিটা মন্দ না। কি, এ কাজ করবি? না এটা করবো না, ঠিকানা থাকবে যে। ঠিকানা থাকলে ডেডীর সম্মান হানী হবে। অন্য কোন বুদ্ধি বের কর।  বুয়া এসে বলল, আপা মনিরা খাইতে চলেন। টেবিলে খাওন রেডি করছি। সেতু বলল, চল খেতে যাই অনেক রাত হলো। দিপা ও পিংকী উঠে বলল, চল। তিনজনে গিয়ে খেতে বসলো। খেতে খেতে দিপা বলল, কাল সকালে কি হাসপাতালে যাবি? হ্যাঁ যাবো। আমি যে যেতে পারবো না। কলেজ মিস করলে অসুবিধা হবে। পিংকী বলল, আমিও হাসপাতালে যেতে পারবো না কলেজে যাবো।

ঠিক আছে, আমি একাই হাসপাতালে যাবো। দিপা বলল, রাগ করলি নাকি? রাগ করবো কেন, এটা রাগ করার কোন প্রসঙ্গ হলো। শোন, আমি যা বলেছি মনে আছে তো, ভাল দেখে একটা বুদ্ধি বের করবি। দুজনে বলল, আচ্ছা বুদ্ধি বের করবো। খাওয়ার পর্ব শেষ হবার পর দিপা আর পিংকী সেতুর সাথে হেঁটে দোতলা হতে নেমে কারে গিয়ে বসলো। সেতু ড্রাইভারকে ভালভাবে ওদের বাড়িতে পৌঁছে দিতে বলল। দিপা আর পিংকী সেতুকে বিদায় জানিয়ে চলে গেল। আট সকালবেলা সেতু কার যোগে হাসপাতালে যায়। সোহেলের রুমের সামনে দেখতে পায় চারজন পুলিশ দাঁড়িয়ে পাহাড়া দিচ্ছে। ও তাদের সামনে দাঁড়িয়ে বলল, এক্সকিউজ মি, ভেতরে যেতে পারি, সোহেলের সঙ্গে দেখা করবো।  একজন পুলিশ বলল, আপনার নাম কি সেতু? জী। ঠিক আছে যান।

সেতু রুমের ভেতর প্রবেশ করে দেখে সোহেলের জ্ঞান ফিরেছে। চোখ মেলে তাকিয়ে আছে। ও মৃদু পায়ে হেঁটে বেডের কাছে একটি টুলে বসলো। সেতুকে দেখে সোহেল বলল, কেমন আছো? মোটামুটি ভাল আছি, তুমি কেমন আছো?  দেখতেই তো পারছো কেমন আছি। সেতু কিছুক্ষণ নীরব থেকে এরপর বলল, আচ্ছা পৃথিবীতে এতো ব্যবসা থাকতে তুমি কেন এই জঘন্য পথে নামতে গেলে। তোমার যখন এতো টাকার দরকার ছিল আমাকে বলতে, আমি টাকা দিতাম। সেতু আমি জানি টাকার জন্য তোমার কাছে হাত বাড়ালে নিরাশ হতাম না। কিন্তু তোমার কাছ হতে টাকা নিয়ে জীবনে প্রতিষ্ঠিত হবো এতোটা নীচ আমি নই। তা বুঝলাম। কিন্তু তোমার প্রতিষ্ঠিত হবার কি দরকার। তুমি তো প্রতিষ্ঠিতই আছো। তোমার বাবার টাকার তো কমতি নেই। তাঁর থেকে টাকা নিয়ে তুমি যে কোন বিজনেস করতে পারতে। এ কালোবাজারী ব্যবসায় কেন নামলে। আসলে তুমি হচ্ছো সেই ধরনের ছেলে যারা চেয়ে খেতে লজ্জা করে কিন্তু চুরি করতে দ্বিধাবোধ করেনা।

সেতু তুমি জাননা আমি আমার নিজের সিদ্ধান্তে অটল। বাবার অনেক টাকা থাকতে পারে কিন্তু সেটা আমার নয়, আমি এ নীতি বিশ্বাস করি। তাই রাতারাতি ধনী হবার জন্য এ পথে নেমেছিলাম। টাকাও বেশ কিছু হাতে করেছি। তোমাকে পাবার পর বন্ধু-বান্ধব ও পার্টিকে বলে দিয়েছি আর এ বিজনেস করবো না। তারা আমাকে অনেক বুঝিয়েছে কিন্তু তাদের কোন কথায় কর্ণপাত করিনি। ব্যবসা ছেড়ে দেবার পর পার্টিদের অনেক অনুরোধে শেষ বারের মতো এই হাফ কেজি হেরোইন ডেলিভারী করার আগেই ধরা খেয়ে গেলাম। অনেকটা ছবির কাহিনীর মতো। সেতু, তুমি আমাকে ক্ষমা করে দিও। আর এ পথে নামবো না। তুমি তোমার মন হতে আমাকে মুছে ফেলো না। একটি বার আমাকে সুযোগ দাও। সোহেল, তোমাকে আমি তখনই মন থেকে মুছে ফেলেছি যখন আমার বান্ধবীদের মুখে তোমার অনেক কু-কৃত্তির কথা শুনেছি। তুমি হয়তো বলবে তোমাকে ভালবাসিনা তাহলে হাসপাতলে কেন দেখতে এলাম। এসেছি, লম্পট হোক, দুঃচরিত্র হোক, সে তো আমার জীবনের প্রথম ভালবাসার মানুষ। তার এই বিপদের দিনে বাড়িতে স্থির হয়ে কিভাবে থাকি। তাই হাসপাতালে ছুটে এসেছি একনজর দেখতে। তবে এসেছি প্রেমিকা হিসেবে নয়, বান্ধবী হিসেবে। সোহেল মৃদু হেসে বলল, তোমার বান্ধবীরা নিশ্চয় আমার নামে অনেক খারাপ কথা বলেছে। কি কি বলেছে শুনি একটু।

কি আর শুনবে। বান্ধবীরা তো আর মিথ্যে বলেনি। ভাগ্য ভাল, আমার চোখের সামনে যে কালো পর্দা ছিল তা ওরা ঠিক সময়ে সরিয়ে দিয়েছে। তুমি একজন লম্পট, দুঃচরিত্র, মাতাল তোমার অপরাধের তালিকার শেষ নেই। তুমি আমার সাথে ভালবাসার মিথ্যে অভিনয় করেছো। আমাকে ভালবাসনি, বেসেছো আমার ডেডীর ঐশ্বর্য্যকে। সুযোগের অপেক্ষায় ছিলে আমার ক্ষতি করার আর ডেডীর সম্পত্তির গ্রাস করার জন্য। সোহেল একথা শুনে করুন কন্ঠে বলল, সেতু তুমি আমাকে যত অপবাদ দাও আমি তা মাথা পেতে নেব। তুমি আমাকে না ভালবাসো তাতে দুঃখ নেই কিন্তু এ মিথ্যে অপবাদ আমাকে দিও না। কোন লোভে পড়ে তোমাকে ভালবাসিনি, সত্যিকার ভালবেসেছি তোমাকে। আমার ভালবাসায় কোন খাদ নেই।  দুষ্ট লোকের মিষ্টি কথা। ঐ মিষ্টি কথায় আমি ভুলছি না। তোমাকে একনজর দেখতে এসেছি, দেখে গেলাম। তোমার সাথে আমার যা সম্পর্ক ছিল মনে করবো এটা একটা এক্সিডেন্ট।

সেতু ভুল মানুষ একেবারেই করে বারে বারে নয়। তোমাকে ভালবাসা আমার জীবনের সবচেয়ে বড় ভুল। আর এমন ভুল হবেনা। আমার হৃদয় জুড়ে আছে এখন অন্য কেউ। অজান্তে ভালবেসেছি আকাশ নামের একটি ছেলেকে। তার মাঝে লোভ নেই, লালসা নেই, উদার মনের অধিকারী। তুমি আকাশের কাছে একেবারে নগণ্য। আসি, আর যেন আমাদের মাঝে দেখা না হয়। ‘ এই বলে সেতু হাঁটতে লাগল।’সোহেল পিছু ডাকতে লাগল, সেতু তুমি আমার একটি কথা শোন। আমাকে এভাবে ভুল বুঝে চলে যেও না। আমি তোমাকে ছাড়া বাঁচবো না। সেতু- সেতু সেতু গট গট করে হাসপাতাল হতে বের হয়ে ওদের কারে চড়ে ড্রাইভারকে বলল, বাড়িতে চলো। কার চলতে লাগল। বাড়িতে আসার পর কার হতে নেমে সেতু নিজের রুমে প্রবেশ করে খাটে শুয়ে কাঁদতে থাকে। কাঁদতে- কাঁদতে এক সময় ঘুমিয়ে পড়ে। এক ঘন্টা পর সেতুর ঘুম ভাঙ্গে দিপা আর পিংকীর ডাকাডাকিতে। ও ঘুম হতে জেগে দিপা আর পিংকীকে দেখে অবাক হয়ে বলল, কি রে তোরা এখানে, কলেজে যাসনি? পিংকী বলল, যেতে চেয়েছি কিন্তু যাওয়া হলো না। কেন? দিপা বলল, কলেজে যাবার জন্য তৈরি হয়েছি। হঠাৎ মনে হলো সোহেলের কথা। ও কেমন আছে তা জানার জন্য হাসপাতালে ফোন করি। হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ ফোনে যা বলল তা শুনে আর ঠিক থাকতে না পেরে পিংকীকে ওর বাসা হতে ডেকে এনে ছুটে এলাম তোর কাছে। চল দেরি না করে হাসপাতালে যাই। হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ কি বলেছে? বলেছে সোহেল বেড হতে উঠার চেষ্টা করেছিল মনে হয় এর ফলে সেলাই ফেটে গিয়ে ওর অবস্থা আংশকাজনক। প্রচুর রক্তক্ষরণ হচ্ছে।

কথা শুনে সেতু ঘড়ির দিকে তাকিয়ে হেসে বলল, আমি এক ঘন্টা আগে হাসপাতালে ওকে সুস্থ দেখে ওর সাথে ঝগড়া করে আমাদের ভালবাসার সম্পর্ক ছিন্ন করে এলাম। তোকে ফোনে মিথ্যে কথা বলেছে, ওর কিছুই হয়নি। রোগীর অবস্থা কখন কেমন হয় তা তো কারো পক্ষে বলা সম্ভব নয়। আমি বিশ মিনিট আগে ফোন করেছি। বলা যায় না সিরিয়াস অবস্থা হতেও পারে। তাছাড়া হাসপাতাল হতে কেন এরকম একটি মিথ্যে কথা বলবে। না, না আমার মন বলছে ওর অবস্থা ঠিকই সিরিয়াস, এক কাজ কর হাসপাতালে ফোন কর। কোন প্রয়োজন নেই। ওর প্রতি একটি কর্তব্য ছিল তা ওকে দেখে এসে কর্তব্য পালন করেছি। এখন ও মারা যাক বা বেঁচে থাক তা আমার দেখার বিষয় না। আমার হৃদয়ের পাতা হতে ও একেবারে মুছে গেছে। তোদের যদি মন চায় তাহলে তোরা ওকে হাসপাতালে যেয়ে দেখে আসতে পারিস, আমি যাবো না। পিংকী বলল, এভাবে কথা বলা তোর শোভা পায় না। তুই সোহেলকে ভালবাসবি না ভালকথা। আমরাও বলি ভালবাসবি না। তাই বলে ওর মৃত্যু কামনা করবো। ও তোর কি এমন ক্ষতি করেছে যার জন্য তুই মৃত্যু কামনা করলি? সেতু একটু রেগে বলল, কোথায় ওর মৃত্যু কামনা করছি। বললাম- ও মারা যাক বা বেঁচে থাক তা আমার দেখার বিষয় না।

ঐ তো একই কথা হলো। কাউকে এতোটা ঘৃণা করে এভাবে কথা বলা উচিত না। এমনও তো হতে পারে- সোহেলকে আমরা যতটা খারাপ ভাবছি আসলে ও তা নয়। তখন কি হবে তোর মানসিক অবস্থা।  আচ্ছা বাবা, আমি এরকম কথা বলার জন্য ক্ষমা চাইছি। আর কখনো এরকম কথা মুছে উচ্চারণ করবো না। চল আর ঝগড়া না করে এবার হাসপাতালে যাই। দিপা বলল, একটা টেলিফোন করে গেলে ভাল হোত না।  দাঁড়া এক্ষনি টেলিফোন করছি। সেতু টেলিফোন সেটের দিকে এগিয়ে গেল। ড্রায়াল করে লাইন পেয়ে সালাম জানিয়ে সোহেল কেমন আছে জিজ্ঞেস করে। একথা বলার পর কয়েক সেকেন্ড পর সেতুর হাত হতে রিসিভার পড়ে যায়। হাত হতে রিসিভার পড়ে যেতেই দিপা আর পিংকী উদ্বিগ্ন কন্ঠে বলল, সোহেলের কি খবর? সেতু ডুকরে কেঁদে উঠে বলল, সোহেল আর এ পৃথিবীতে নেই, পাঁচ মিনিট আগে মারা গেছে। একথা শুনে দিপা আর পিংকীর মনটা ভীষণ খারাপ হয়ে গেল। দিপা দীর্ঘশ্বাস ছেড়ে বলল, কলেজে আমি, পিংকী, সালমা, জলি তোর প্রসঙ্গ নিয়ে সোহেলের সঙ্গে কত ইয়ার্কী করেছি কোনদিন ও আমার সাথে বা বান্ধবীদের সাথে খারাপ আচরণ করেনি। শুধু আংকেলের কাছে শুনতে পেলাম সোহেল খারাপ, তাছাড়া কারো কাছে ওর ভাল ছাড়া মন্দ শুনিনি। সোহেলের মুখটা এখনো দুচোখে ভাসছে। এতো তাড়াতাড়ি সে মারা যাবে দুটা গুলি লাগার পরও তা কল্পনা করিনি।

সেতু কেঁদে কেঁদে বলল, ও আমার জন্যই মারা গেছে। সকালে আমি যদি ওর সঙ্গে সম্পর্ক ছিন্ন না করি তাহলে এতো তাড়াতাড়ি মারা যেত না। আমিই ওর মৃত্যুর জন্য দায়ী। দিপা বলল, এতোটা ভেঙ্গে পড়িস না। ওর হায়াত ছিল না তাই মারা গেছে। নিজেকে এতোটা অপরাধী ভাবিস না? পিংকী বলল, অপরাধী ভাবার কারণ আছে। সোহেলের হৃদয় সেতুর কাছে ছিল। সেতু সেই হৃদয়কে ক্ষত-বিক্ষত, টুকরো-টুকরো করে ওকে ফিরিয়ে দিয়েছে। এতো বিরহের জ্বালা ও সইতে পারেনি, এটাও তার মৃত্যুর কারণ হতে পারে। এজন্য কিন্তু সেতুই পারত পক্ষে দায়ী?  তুই ঠিক বললি পিংকী, আমার অপরাধের শেষ নেই। মৃত্যুর আগে সোহেলকে একটু শান্তি দিতে পারলাম না। উঃ কি যন্ত্রণা নিয়েই না সোহেল মারা গেল। আমার ঘাড়ে যে তখন কি ভুত চেপেছিল, আমি কেন বলতে গেলাম ওকে আর ভালবাসি না। ও সম্পূর্ণ সুস্থ হতো এরপর বলতাম। তোদের কথা যদি ধরতাম তাহলে ভাল হতো। এতো তাড়াতাড়ি বলার কি দরকার ছিল। ‘ এই বলে সেতু ভীষণ ভাবে কাঁদতে থাকে।’

দিপা আর পিংকী সেতুকে অনেক বুঝিয়ে ওর কান্না থামায়। এরপর তিনজন মিলে হাসপাতালে যেয়ে সোহেলের মৃতদেহ দেখতে যায়। মৃত দেহ দেখে সবার চোখেই অশ্রুতে ভরে উঠে। সোহেলের মায়ের কান্নাতে আকাশ বাতাস ভারী হয়ে উঠে। সে হৃদয় বিদারক দৃশ্য ওরা আর দেখতে না পেরে চলে আসে বাড়িতে। সোহেল মারা যাবার পর সেতুর ওপর বেদনার ছায়া পড়ে অনেকটা। নিজেকে অপরাধী ভেবে একমাস পর্যন্ত ও ভালভাবে খেতে পারেনি, ঘুমাতে পারেনি, শুধু সোহেলের কথা কল্পনা করেছে। এরপর আস্তে- আস্তে সময়ের সাথে সাথে সোহেলকে ভুলে যায় কিন্তু আকাশকে ভুলতে পারে না। ওর সারা হৃদয় জুড়ে সর্বক্ষণ বিরাজ করে আকাশ। কলেজের অনেক সু-দর্শন, হ্যান্ডসাম যুবক সেতুকে পাবার জন্য পাগল হয়ে উঠে। ওকে অফার দেয় কিন্তু ও অফার গ্রহণ করে না। সবাইকে খালি হাতে ফিরিয়ে দেয়। ঠাকুরগাঁও শহর এলাকা থেকে শুরু করে গ্রাম-গঞ্জেও আকাশকে খুঁজে বেড়ায় কিন্তু তবুও ওর দেখা পায় না। খুঁজতে- খুঁজতে এক সময় পরিশ্রান্ত হয়ে খোঁজাখুঁজি বাদ দেয়।

দেখতে- দেখতে কেটে যায় ছয় মাস। আনিস চৌধুরী সেতুকে বিয়ে দেবার জন্য পাত্র দেখতে শুরু করেন কারণ তার পছন্দের পাত্র বন্ধুর ছেলে ইমন বিয়ে করে ফেলেছে। তাই নতুন করে পাত্র খুঁজতে থাকেন। একথা সেতু জানতে পারে সরাসরি ওর বাবাকে জানায়। আমি এখন বিয়ে করবো না। যখন সময় হবে নিজেই তোমাকে বিয়ের কথা বলবো। আমার বিয়ে নিয়ে তোমাকে ভাবতে হবে না। আনিস চৌধুরী বলল, আচ্ছা মা তোর কথাই রইলো। তবে যা করবি একটু চিন্তে ভাবনা করেই করবি। ঠিক আছে ডেডী। এর কিছু দিন পর দিপার বড় ভাইয়ের বিয়ে ঠিক হলো দিনাজপুর জেলার সেতাবগঞ্জে। বিয়েতে প্রায় একশো জন বরযাত্রী গেল। বরযাত্রীতে দিপার বান্ধবী যায় পাঁচজন। এরা হলো সেতু, পিংকী, সালমা, জলি ও কাজল। বরযাত্রী পৌঁছে বেলা ১.৩০ মিনিটে। খাওয়া-দাওয়ার পর দিপা তার বান্ধবীদের নিয়ে ঘুরতে বের হলো।

মায়ের সাথে পূর্বে দিপা এখানে এসেছে তাই রাস্তাঘাট চেনা আছে। সেতু বলল, ঘুরতে যাবি কোথায়? এই সামনেই রেল ষ্টেশন। চল রেলষ্টেশনে ঘুরে আসি। এই কথাতে সব বান্ধবীরা রেল ষ্টেশনের দিকে ঘুরতে গেল। ষ্টেশনে আসার পর ট্রেন লাইনের ওপর দিয়ে একেক জন হাঁটতে থাকে। হাঁটতে-হাঁটতে পিংকী বলল, আমার মনে একটা দুঃখ এখনো ট্রেনে চড়িনি। সালমা বলল, আমিও চড়িনি। দিপা একথা শুনে বলল, তাই। আমি আজই তোদের দুজনের আশা পূরণ করবো। পিংকী আর সালমা অবাক হয়ে বলল, কিভাবে?  আজ আমরা সেতাবগঞ্জ হতে ঠাকুরগাঁও মাইক্রোতে না যেয়ে ট্রেনে করে যাবো। সেতু বলল, ট্রেনে গেলে তোর আব্বা-আম্মা রাগ করবে না। রাগ করতে পারে। তবে সোহরাব আংকেল রাজী হলে কেউ রাগ করবে না। চল সোহরাব আংকেলকে গিয়ে ধরি। পিংকী বলল, ট্রেন কখন আসবে। দিপা ঘড়ির দিকে তাকিয়ে বলল, ট্রেন আসতে এখনো পৌনে এক ঘন্টা দেরি আছে। চল তাড়াতাড়ি আংকেলের কাছে যাই। সবাই বলল, চল।

সকলে বিয়ে বাড়িতে এসে দেখে বিয়ে পড়ানো শেষ। দিপা তার বান্ধবীদের সাথে নিয়ে ওর আংকেলকে জানাল ওরা ট্রেনে করে ঠাকুরগাঁও ফিরবে। প্রথমে তিনি অসম্মতি জানান। শেষে সকলের জোড়াজুড়িতে তিনি রাজি হন। দিপা বান্ধবীদের সাথে প্লাটফর্মে এলো। সকলের টিকেট কেটে ট্রেনের জন্য অপেক্ষা করতে থাকে। ট্রেন আসার পর সবাই ট্রেনে চড়ে। মুখোমুখি সিটে ওরা বসেছে। সালমা আর পিংকী জানালার পাশে বসেছে। ট্রেন হুইসেল বাজিয়ে ধীরে ধীরে সেতাবগঞ্জ প্লাটফর্ম হতে এগিয়ে চলল ঠাকুরগাঁও অভিমুখে। দিপা আর সেতু পাশাপাশি বসে আছে। কিছুক্ষণ পর দিপা টয়লেটে যায় সেতুকে সাথে নিয়ে। সেতু টয়লেটের দরজার সামনে দাঁড়িয়ে থাকে। এক সময় এদিক ওদিক তাকাতেই দেখতে পেল আকাশ সিটে বসে গভীর মনোযোগ সহকারে পেপার পড়ছে। আকাশকে দেখে ওর হৃদয়ে কালবৈশাখী ঝড় বইতে শুরু করে। হেঁটে গিয়ে যে আকাশের সাথে কথা বলবে সে শক্তিটুকু পর্যন্ত ও হারিয়ে ফেলে। একেবারে পাথরের মূর্তির মত স্থির হয়ে গেল।

দিপা টয়লেট হতে বের হয়ে দেখতে পায় সেতু সামনের সিটের এক যুবকের দিকে এক ধ্যানে তাকিয়ে আছে। তা দেখে ও সেতুকে মৃদু ধাক্কা দিয়ে বলল, কিরে এভাবে এক ধ্যানে তাকিয়ে কি দেখা হচ্ছে।  ইয়ে মানে- দিপা ওকে খুঁজে পেয়েছি। কাকে? আকাশকে খুঁজে পেয়েছি। ঐ যে পেপার পড়ছে ওটাই আকাশ। দিপা বিস্মিত কন্ঠে বলল, তুই চিনতে ভুল করিসনি তো? বিন্দু মাত্র না, সত্যি বলছি। তাহলে দেরি কেন, যা গিয়ে কথা বল। আমার হাত, পা, বুক সবই কাঁপছে। হেঁটে গিয়ে যে ওর সামনে দাঁড়াবো সে শক্তিটুকু শরীরে পাচ্ছি না। প্লিজ, তুই আমার হয়ে একটা কাজ কর না। আকাশকে গিয়ে বল, আমি ওকে ডাকছি। না বাবা আমি পারবো না। আমার খুব ভয় করছে। এই সামান্য কাজটিতে তোর এতো ভয়। তুই না খুব সাহসী মেয়ে। একথা শুনে দিপা একটু চিন্তা করে বলল, ঠিক আছে যাচ্ছি। ‘এই বলে ও আকাশের সামনে যেয়ে বলল, Excuse me, আপনার পেপারটা কি একটু পড়তে পারি? আকাশ সেতুর দিকে তাকিয়ে বলল, Why not, এই নিন।

দিপা পেপারটি হাতে নিয়ে বলল, Thank you. Don’t mine আপনার নাম কি আকাশ? সম্পূর্ণ অপরিচিত। চেনা নেই, জানা নেই এমন একটি মেয়ের মুখে নিজের নাম শুনে ভীষণ আশ্চর্য হয়ে যায় আকাশ। ঢোক গিলে কোন রকমে বলল, জী হ্যাঁ কিন্তু আপনাকে তো আমি ঠিক চিনলেন না, এই তো। আমিও আপনাকে চিনি না। ঐ যে টয়লেটের পাশে মেয়েটি দাঁড়িয়ে আছে সে আপনাকে ডাকছে। আসি- এই বলে দিপা ওর নির্দিষ্ট সিটে গিয়ে বসে। এ কথাতে আকাশ টয়লেটের দিকে তাকাতেই দেখতে পায় সেতু ছল ছল চোখে ওর দিকে তাকিয়ে আছে। তা দেখে ও বিলম্ব না করে সিট হতে উঠে সেতুর কাছে গিয়ে বলল, আমি স্বপ্ন দেখছি না তো? স্বপ্ন আপনি নয় আমি দেখছি। এখনো বিশ্বাস হচ্ছে না যে, আপনি আমার সামনে দাঁড়িয়ে আছেন। শরীরে চিমটি কেটে দেখুন তাহলে বিশ্বাস হবে। ‘এই বলে আকাশ হাসতে থাকে। এরপর হাসি থামিয়ে বলে,’ কেমন আছো? আমি এক রকম ভাল আছি। আপনি খুব ভাল আছি। এদিকে কোথায় গিয়েছিলে? সেতাবগঞ্জ বিয়ে খেতে। ও। এই বলে দুজনে নীরব হয়ে রইলো। পাশ দিয়ে কয়েকজন যাত্রী এ কামরা হতে অন্য কামরা গেল। নীরবতা ভেঙ্গে সেতু বলল, আপনি আমাকে হোটেলে একা রেখে চলে গেছেন তাতে তেমন দুঃখ পাইনি।

এই বলে দুজনে নীরব হয়ে রইলো। পাশ দিয়ে কয়েকজন যাত্রী এ কামরা হতে অন্য কামরা গেল। নীরবতা ভেঙ্গে সেতু বলল, আপনি আমাকে হোটেলে একা রেখে চলে গেছেন তাতে তেমন দুঃখ পাইনি। সবচেয়ে বড় দুঃখ পেয়েছি আপনি তো জানেন আমি ঠাকুরগাঁও সরকারী কলেজে পড়ি। কলেজে এলেই আমার সঙ্গে দেখা করতে পারতেন কিন্তু আজ এতগুলো মাস পার হয়ে গেল তবুও আপনি আমার সঙ্গে একটু দেখা করলেন না। কি এমন অন্যায় করেছি আপনার কাছে। ‘কথা গুলো সেতু কান্নাজড়িত কন্ঠে বলল।’

সেতুর এতটা পরিবর্তনে আকাশ অবাক না হয়ে পারলো না। বলল, আমার খুব ইচ্ছে ছিল তোমার সাথে দেখা করার কিন্তু ইচ্ছে থাকা সত্ত্বেও দেখা করতে পারিনি, কারণ কি জানো। সেদিনের সেই মতিঝিলে পানি উন্নয়ন বোর্ডের চাকুরীর ইন্টারভিউয়ে ‘অফিস সহকারী’ পদে আমার চাকুরী হয়েছে। সেতু হাসোজ্জল মুখে বলল, সত্যি। হ্যাঁ। আল্লাহ আমার মুখের দিকে তাকিয়ে এ চাকুরীতে নিরাশ করেনি। তোমার দোয়া কাজে লেগেছে। আমার চাকুরীর কর্মস্থল হলো বান্দরবন। নতুন চাকুরি আর বাড়ি অনেকদূর বলে এতোদিন ছুটি নেইনি। এই প্রথম দশ দিনের ছুটি নিয়ে ঠাকুরগাঁও ফিরছি। প্লান ছিল তোমার সাথে দেখা করার। Good luck বলতে হয় তার আগেই ট্রেনে দেখা হয়ে গেল। আপনিও দেখি আমাকে খুব মনে রেখেছেন। সেতুকে রাগানোর জন্য বলল, মনে রাখবো না আবার। যার সঙ্গে জীবনের প্রথম এক রাত একই বিছানায় কাটানো হলো তাকে কি এতো তাড়াতাড়ি ভুলে থাকা যায়। এ কথাতে সেতু ভীষণ লজ্জা পেল। লজ্জা মিশ্রিত কন্ঠে বলল, সেদিনের ব্যবহারের জন্য সত্যি আমি অনুতপ্ত। প্লিজ, আমাকে ক্ষমা করে দিবেন।

আকাশ আশা করেছিল কথাগুলো বলার পর সেতু ওকে ইতর, বদমাইশ, লম্পট ইত্যাদি বলে গালি দেবে। কিন্তু গালি না দিয়ে ক্ষমা চাইতে দেখে এবার বুঝতে পারে সেতুর অনেক পরিবর্তন হয়েছে। তাই বলল, না না ক্ষমা চাওয়ার কি আছে। আসলে ভুল আমার হয়েছে। পরে চিন্তা করে দেখেছি, আমি যদি তোমার মতো মেয়ে হতাম তাহলে আমিও ওরকম ব্যবহার করতাম। সেদিন ওভাবে চলে আসার জন্য আমিও অনুতপ্ত। আচ্ছা তোমার বাড়িতে ফিরতে রাস্তায় কেন অসুবিধা হয়নিতো। না না কোন অসুবিধা হয়নি। সেতু একটা জিনিস লক্ষ্য করেছো। কি? সামনের যাত্রীগুলো কিভাবে আমাদের দিকে ফ্যাল ফ্যাল ভাবে তাকিয়ে আছে, তাই না? সেতু আড়চোখে যাত্রীদের দিকে তাকিয়ে বলল, হ্যাঁ কিন্তু তাতে কি হয়েছে? তোমার লজ্জা করছে না। তেমন না। তাছাড়া লজ্জা করে কি হবে তারা তো আমার পরিচিত কোন ব্যক্তি নয়। ট্রেন হতে নামার পর কে কোথায় চলে যাবে তার ঠিক থাকবে না। ওদের লজ্জা করে কি হবে। তারা কি ভাবছে জানো।

কি? ভাবছে তুমি আর আমি হয়তো প্রেমিক-প্রেমিকা। একথা শুনে সেতু লজ্জায় মাথা নীচু করে থাকে। তা দেখে আকাশ বলল, সরি, কথাটা মুখ ফসকে বেড়িয়ে গেছে। চলো ক্যান্টিনে যাই। সেখানে চা খাবো আর গল্প করবো। দাঁড়িয়ে থাকতে- থাকতে পা ব্যথা করছে। কি যাবে যাওয়া যায়। দাঁড়ান বান্ধবীদেরকে বলে আসি।  তোমার বান্ধবীদের সাথে পরিচয় করিয়ে দেবে না।  আসুন পরিচয় করিয়ে দিচ্ছি। আকাশ সেতুর সঙ্গে যেয়ে সব বান্ধবীদের সাথে পরিচয় হলো। পরিচয় পর্ব শেষ হবার পর পিংকী বলল, ঠাকুরগাঁও জেলার এমন কোন জায়গা নেই যেখানে সেতু আপনাকে না খুঁজেছে। আপনাকে খুঁজতে মাঝে মাঝে ওর সঙ্গে আমরাও যেতাম। সেতু পিংকীর দিকে চোখ বড় বড় করে চেয়ে বলল, এই চুপ। দিপা বলল, সেতুর মুখে আপনার কথা শুনে শুনে খুব দেখার ইচ্ছে ছিল। আজ সে ইচ্ছেটা পূরণ হলো। সালমা বলল, এবারও পালাবেন নাকি? আকাশ হেসে বলল, না না আর পালাবো না। চলুন সবাই মিলে ক্যান্টিনে যাই চা, নাস্তা খেয়ে আসি। দিপা বলল, না না এখন আমরা যাবো না। আপনারাই খেয়ে আসুন। আমরা পরে খাবো। ঠিক আছে। সেতু চলো আমরা যাই।  চলুন।

সেতু আকাশের হাত ধরে ট্রেনের দুটা বগী পার হয়ে ক্যান্টিনে এলো। ক্যান্টিনে লোক খুবই কম। ও পাশে তিনজন শুধু কাষ্টমার বসে আছে। দুজনে জানালার পাশে ফাঁকা টেবিলটিতে বসলো। ওয়েটার এসে বলল, কি খাবেন? সেতু কি খাবে? কিছু খেতে ইচ্ছে করছে না, চা খাই।  চা না কোক খাই। এই দুটা কোক নিয়ে আসো। ওয়েটার দুটা কোক এনে টেবিলে রাখে। দুজনে নীরব ভাবে কোক খেতে থাকে। নীরবতা ভেঙ্গে আকাশ বলল, ও ভাল কথা। তোমার সোহেলের কি খবর? এ কথা বলাতে সেতু খাওয়া বন্ধ করে ওড়নাটা দু চোখে চেপে ধরে কেঁদে উঠে। আকাশ কান্না দেখে বলল, এই সেতু কাঁদছো কেন, কি হয়েছে? সেতু তবু কাঁদতে থাকে। আকাশ আলতো ভাবে সেতুর মাথায় হাত বুলিয়ে বলল, প্লিজ সেতু কাঁদেনা। লোকজন নানা কিছু ভাবছে। আমি বুঝতে পেরেছি সোহেল তোমাকে আঘাত দিয়ে দূরে চলে গেছে। সেতু চোখ মুছে বলল, হ্যাঁ সে দূরে চলে গেছে। তবে বহুদূরে যেখান হতে কোনদিন কেউ আর ফিরে আসে না। আকাশ তা শুনে বিস্মিত কন্ঠে বলল, বলো কি! সরি, অজান্তে তোমাকে কষ্ট দেয়ার জন্য। সোহেল কিভাবে মারা গেল? সে অনেক কথা সংক্ষিপ্ত সময়ে তা বলে শেষ করা যাবে না। আগামীকাল আপনার হাতে কি কাজ আছে? এতদিন পর বাড়িতে ফিরছি কাজ তো আছেই। কেন বলতো? আগামীকাল আপনি আমার সঙ্গে দেখা করতে পারবেন?

কেন পারবো না। বলো কখন কোথায় দেখা করতে হবে। আমি ঠিক সময়ে চলে আসবো। আগামীকাল বিকেল ঠিক চারটার সময় সেনুয়া ব্রীজে আমার সঙ্গে দেখা করবেন। আপনার সঙ্গে অনেক কথা আছে। বিশেষ জরুরী হলো সোহেলের কথা আপনাকে সব খুলে বলবো। আসতে আবার ভুলে যাবেন না তো? মাথা খারাপ ভুলবো কেন? ও ভাল কথা, চটপট আপনার ঠিকানাটা বলুন তো? আকাশ হেসে বলল, ঠিকানা বলতে হবে না। ‘এই বলে ম্যানিব্যাগ থেকে একটি কার্ড বের করে’ এই নাও আমার ঠিকানা। সেতু কার্ডটি নিয়ে বলল, হাসলেন কেন? তোমাকে নতুন করে দেখছি, তাই। চলো এবার উঠা যাক, ঠাকুরগাঁও ষ্টেশনের প্রায় কাছাকাছি এসে পড়েছি। সেতু দাঁড়িয়ে বলল, চলুন। দুজনে তাদের পূর্বের কামরাতে ফিরে এলো। ট্রেন থামে ঠাকুরগাঁও রোড ষ্টেশনে। আকাশ ট্রেন হতে নামে। সেতু তার বান্ধবীদের সঙ্গে নামলো। এরপর আকাশ ওদের কাছ থেকে বিদায় নিয়ে রিক্সাতে উঠে। সেতু ও তার বান্ধবীরা আকাশকে বিদায় জানাল।

বিকেল চারটা বাজার পাঁচ মিনিট আগেই সেতু সেনুয়া ব্রীজের কাছে নামল রিক্সা হতে। ভ্যানেটি ব্যাগ হতে টাকা বের করে রিক্সা ভাড়া পরিশোধ করে এদিক ওদিক তাকিয়ে আকাশকে খুঁজতে লাগল। আকাশকে না পেয়ে ঘড়ির দিকে তাকিয়ে দেখে পাঁচ মিনিট কম চারটা বাজে। সময়টুকু পার করার জন্য ও পায়চারী করতে লাগল। ও পড়েছে গোলাপী কালারের থ্রি পিস। মুখে হালকা মেকআপ করেছে, ঠোঁটে গোলাপী লিপিষ্টিক। অপূর্ব সুন্দর লাগছে ওকে। আশে আশের অনেক লোকজনই ওর দিকে চোখ মেলে তাকিয়ে রয়েছে। অপেক্ষার প্রহর খুবই বিরক্তিকর। চারটা দশ বাজে তবুও আকাশের দেখা নেই। খুব রাগ হলো আকাশের উপর। এতো করে বলার পরও কেন যে সে আসছে না তার কারণ খুঁজে পেল না। অস্থির ভাবে পায়চারী করতে করতে ভাবলো আধ ঘন্টার মধ্যে যদি না আসে তাহলে ও আকাশের বাড়ি যাবে। এই কথা ভাবছে এমন সময় একটি মটর সাইকেল ওর পাশে ব্রেক কষে থামে। মটরসাইকেলের আওয়াজ শুনে পাশে তাকিয়ে দেখতে পেল মটর সাইকেলে বসে হাসোজ্জল মুখে ওর দিকে তাকিয়ে আছে আকাশ।

সেতু গম্ভীর মুখে বলল, আপনার দেখি সময় জ্ঞান বলতে নেই। চারটা পনের বাজে এখন বুঝি আসার সময় হলো। দেরি হবার জন্য সত্যি আমি দুঃখিত। ফ্রেন্ডদের সাথে কথা বলাতে একটু দেরি হয়েছে। ঘড়ির দিকে তাকিয়ে যখন দেখি দেরি হয়ে গেছে ওমনি এক ফ্রেন্ডের কাছ থেকে মটর সাইকেল নিয়ে ছুটে এলাম। থাক আর সাফাই গাইতে হবে না। এবার দয়া করে মটর সাইকেল হতে নামুন। ও সরি। ‘ এই বলে তাড়াতাড়ি মটর সাইকেল ব্রীজের পাশে ষ্ট্যান্ড করে সেতুর সাথে হাঁটতে থাকে। সেতু যেতে যেতে বলল, কোথায় নীরব ভাবে বসা যায়? এদিক তো লোকজন বেশি। চলো আর একটু সামনে গিয়ে রাস্তার পাশেই বসি। চলুন। দুজনে কিছুদূর হেঁটে একটি নির্জন জায়গায় বসে। বসার পর দুজনেই নীরব ভাবে একে অপরের দিকে তাকিয়ে থাকে। নীরবতা ভেঙ্গে আকাশ বলল, কি ব্যাপার একেবারে চুপ হয়ে রইলে যে কিছু বলো? ও হ্যাঁ। আমি আপনাকে কেন ডেকে এনেছি মনে আছে তো? হ্যাঁ মনে আছে। তোমার সোহেলের কথা বলার জন্য ডেকেছো।

আজ আমি এখানে বসে আপনার সাথে গল্প করছি এটা কার জন্য হয়েছে জানেন, সোহেলের জন্য।  তাই নাকি? হ্যাঁ। সোহেলকে খোঁজার জন্য যদি ঢাকায় না যেতাম তাহলে কোনদিনও আপনার সাথে আমার দেখা হতো না। ‘এই বলে সেতু একটু থামে তারপর বলতে শুরু করে’- সোহেলের সঙ্গে আমার প্রথম দেখা হয় কলেজে। কলেজের দোতলায় ক্লাস করে সিঁড়ি দিয়ে নীচে নামছি। বান্ধবীরা সবাই আমার আগে নীচে নেমে গেছে তাই ওদের নাগাল ধরার জন্য তাড়াতাড়ি সিঁড়ি দিয়ে নামতেই পা পিছলে পড়ে যেতে উদ্যত হই। চোখ বন্ধ করে চিৎকার দিতেই কোথা থেকে সোহেল এসে দুহাত বাড়িয়ে আমাকে জড়িয়ে ধরে। চোখ মেলে যখন দেখি সোহেলের কোলে আমি। ভীষণ লজ্জা পাই। আমাকে বিপদের হাত থেকে বাঁচানোর জন্য কোন রকমে ওকে ধন্যবাদ জানিয়ে দিলাম দৌড়। কিছু দূর যাবার পর ফিরে তাকিয়ে দেখি সোহেল এক দৃষ্টিতে আমার দিকে তাকিয়ে আছে।

এরপর সোহেল আমার প্রতি ভীষণ আকৃষ্ট হয়ে গেল। বান্ধবীদের মুখে শুনি- সোহেল নাকি আজ পর্যন্ত কলেজের এবং বাহিরের কোন মেয়ের প্রেমে পড়েনি আমিই নাকি প্রথম ওর জীবনে। কিছুদিন পর ও আমার বান্ধবী দ্বারা প্রস্তাব পাঠায়। আমি সরাসরি মানা করে দেই। কিন্তু ও আমার পিছু ছাড়ে না। রাস্তা-ঘাটে কলেজে যেখানে যাই সেখানেই সোহেল ভুতের মতো এসে উপস্থিত হয়। কোনদিন আমাকে হুমকীও দেয়নি খারাপ কথাও বলেনি। একদিন ও সরাসরি জানিয়ে দিল- আমি যদি ওকে না ভালবাসি তাহলে ও আমার জন্য জীবন বিসর্জন দেবে কলেজ প্রাঙ্গনে। ওর ভালবাসার গভীরতা দেখে এক সময় আমিও ওকে ভালবাসতে শুরু করি। থামে সেতু তারপর বলতে লাগল ঢাকায় যাবার কারণ। ঢাকা থেকে এসে সোহেলের নামে বান্ধবীদের মুখে শোনা কথাগুলো। সোহেলের গুলি লাগার কারণ এবং মৃত্যুর কথা, একে একে সব বলে কাঁদতে শুরু করে এই বলে- আমিই সোহেলের মৃত্যুর জন্য দায়ী। আমিই দায়ী। আকাশ সেতুর মাথায় হাত বুলিয়ে বলল, কেঁদে আর কি হবে। যে চলে গেছে সে তো আর কোনদিন ফিরে আসবে না।

তুমি যে ভীষণ অনুতপ্ত হয়েছো এটা দেখে সোহেলের আত্মা শান্তি পাবে। সেতু চোখ মুছে বলল, আমাকে একটা বুদ্ধি দিনতো। আমি সোহেলের স্মৃতি ধরে রাখতে চাই, এটা কিভাবে সম্ভব। আকাশ একটু চিন্তা করে বলল, বিয়ের পর তোমার যদি কোন ছেলে সন্তান হয় তাহলে তার নাম রেখ সোহেল। এর নাম ধরে সন্তানকে যখনই ডাকবে তখনই তোমার সোহেলের কথা মনে পড়বে। আমার মনে হয় স্মৃতি ধরে রাখার জন্য এটা একটা উৎকৃষ্ট পন্থা। আমি সোহেলের স্মৃতি ধরে রাখার জন্য তাই করবো। চলো এখন তাহলে উঠি। বেলা তো এখনো ডোবেনি, এখনই বাড়ি ফিরে যাবেন? আরে না। চলো দুজনে চটপটি খাই। মন্দ হয় না চলুন। দুজনে বেশ সময় নিয়ে চটপটি খেলো। এরপর আকাশ মটরসাইকেলে সেতুকে পেছনে নিয়ে মটর সাইকেল ষ্ট্যার্ট করে। আকাশ বলল, কোথায় যাবো? আপনার যেখানে খুশি সেখানে চলুন। আকাশ মটরসাইকেল চালাতে চালাতে বলল, সেতু এখন থেকে তুমি আমাকে আপনি করে না বলে তুমি করে বলবে। সেতু অবাক হয়ে বলল, কেন? ভালবাসার মানুষকে আপনি করে বললে একটু দুরের বলে মনে হয়।

সেতু রেগে উঠে বলল, আমি কি আপনাকে ভালবাসি নাকি যে তুমি করে বলবো? আমি কিন্তু সরাসরি কথা বলতে পছন্দ করি। কি দরকার আর ভনিতা করার। তোমার চোখ, মুখ, ঠোঁট সবই বলছে তুমি আমাকে ভালবাসো, শুধু লজ্জার কারণে তা মুখ ফুটে বলতে পারছো না। সেতু মৃদু হেসে বলল, অসম্ভব এ মিথ্যে কথা। কে বলল আমি আপনাকে ভালবাসি। ও, তাহলে এটাই সত্যি তুমি আমাকে ভালবাসো না। জী, ভালবাসিনা এটাই সত্যি কথা। ঠিক আছে সত্য বলছো না মিথ্যে বলছো তা এখনই প্রমাণ হবে। সেতু অবাক হয়ে বলল, কিভাবে? ঐ যে সামনে একটি ট্রাক আসছে, দেখছো? দেখছি। ট্রাক কাছে আসা মাত্রই আমি চোখ বন্ধ করে থাকবো। তুমি যদি সত্যি কথা বলে থাকো তাহলে কিছুই হবে না। যদি মিথ্যে কথা বলে থাকো তাহলে ঐ ট্রাকের সাথে আমাদের মটরসাইকেল এক্সিডেন্ট হবে। এ কথা শুনে সেতু আকাশকে দুহাত দিয়ে জাপটে ধরে চিৎকার করে বলল, আমি মিথ্যে বলেছি, আমি সত্যিই আপনাকে ভালবাসি।

আকাশ হাঃ হাঃ করে হেসে বলল, দেখলে তো কেমন একটি ভয় দেখিয়ে তোমার কাছ থেকে একদিনেই সত্যি কথাটা জেনে নিলাম। সেতু আকাশের পিঠে দড়াম করে এক কিল বসিয়ে দিয়ে বলল, তুমি না খুব ইয়ে। কি? তোমার মাঝে ধৈর্য্য শক্তি বলতে কিছু নেই। গতকাল এসে আজকেই বলছো ভালবাসার কথা। দুটা দিনও পার হতেও দিলে না। আরে বোকা আমার হাতে সময় খুব কম। মাত্র দশ দিনের ছুটি নিয়ে এসেছি। দেখতে- দেখতে দশ দিন চলে যাবে। তাই দেরি না করে তাড়াতাড়ি বলে দিলাম। কবরস্থান পার হবার পর মটর সাইকেল যাচ্ছে নির্জন রাস্তা দিয়ে। সেতু আকাশকে নিবিড়ভাবে জড়িয়ে ধরে বলল, আমি আর তোমাকে কোথাও যেতে দেব না। এমন কি এতদূরে চাকুরিও করতে দেব না। আকাশ হেসে বলল, চাকুরি না করলে বিয়ের পর তোমাকে কিভাবে খাওয়াবো। সে চিন্তা তোমাকে করতে হবে না। ডেডীকে তোমার কথা বলেছি। ডেডী বলেছে তার ফার্মেই তোমাকে চাকুরী দেবেন। কি বললে, তোমার ডেডীর ফার্ম! হ্যাঁ। তোমার ডেডীর নাম কি? আনিস চৌধুরী।

এই নাম শুনে আকাশ মটরসাইকেল থামিয়ে বিস্মিত কন্ঠে বলল, তুমি বিশিষ্ট শিল্পপতি আনিস চৌধুরীর মেয়ে? হ্যাঁ। কি ব্যাপার তুমি ডেডীর নাম শুনে এভাবে চমকে উঠলে যে?কেবল তো চমকে উঠেছি বাকি আছে অজ্ঞান হবার। তার আগে তুমি তাড়াতাড়ি মটরসাইকেল থেকে নেমে বিদায় হও। আকাশ! এসব কি বলছো? আকাশ নিজের মাথার চুল টেনে বলল, বাংলা কথা বোঝনা, কি বলছি। আমি কিন্তু এখন কেঁদে ফেলবো। কাঁদো বেশি করে কাঁদো কেবল তো শুরু। শালার, কপালটাই খারাপ। এই মেয়ে- প্রেম করার আগে পরিচয় দিতে পারলে না। আমার ডেডী কি করেছে বলবে তো? কিছুই করেনি। তোমার সাথে আমার আকাশ-পাতাল পার্থক্য। তোমার ডেডী কখনই আমার মতো গরীব সন্তানকে তার মেয়ের জন্য পাত্র হিসেবে মেনে নেবেন না। এটা অসম্ভব। সেতু একথা শুনে হেসে বলল, ও এই কথা। শোন, গতকাল রাতেই তোমার কথা ডেডীকে বলেছি। তোমাকে বিয়ে করবো এটাও ডেডীকে Advance জানিয়ে দিয়েছি।

বাঃ খুব ভাল করেছো। এরপর তোমার ডেডী বলল, আকাশকে বাড়িতে নিয়ে আসবি, বলেছে না। হ্যাঁ বলেছে। এরপর জানো কি হবে? কি? তোমার সাথে বাড়িতে যাবো। তোমার ডেডী এক বিফ্রকেস টাকা দিয়ে বলবে, বাবা এটা নিয়ে যাও আর আমার মেয়েকে চিরদিনের জন্য ভুলে যাও। না না এটা তো নাটক বা সিনেমা না, এতো টাকার রিস্ক তোমার বাবা নিবেনা কারণ যদি আমি টাকাটা নিয়ে নেই। সে অন্য একটা কাজ করবে, সেটা হলো- আমাকে খালি একটি বিফ্রকেস ধরিয়ে দিয়ে বলবে, যাও বাবা এই সামান্য বিফ্রকেসটা যেদিন তুমি টাকা দিয়ে পূর্ণ করে আনতে পারবে সেদিনই তোমার সাথে সেতুকে বিয়ে দেব। তারপর। আমি খালি বিফ্রকেস হাতে নিয়ে তোমাকে বাই বাই জানিয়ে টাকা জোগাড় করতে চলে যাবো বান্দরবন। হাঃ.. হাঃ… বান্দরবনে এতো টাকা কিভাবে পাবে? পাবো।

পঁচিশ বছর চাকুরী করে সেই রিটায়ার্ডের টাকা বিফ্রকেসে ভরে আনিস চৌধুরীর কাছে যাবো। গিয়ে দেখবো কেউ কথা রাখেনি আমি খালি বিফ্রকেস হাতে নিয়ে তোমাকে বাই বাই জানিয়ে টাকা জোগাড় করতে চলে যাবো বান্দরবন। হাঃ.. হাঃ… বান্দরবনে এতো টাকা কিভাবে পাবে? পাবো। পঁচিশ বছর চাকুরী করে সেই রিটায়ার্ডের টাকা বিফ্রকেসে ভরে আনিস চৌধুরীর কাছে যাবো। গিয়ে দেখবো কেউ কথা রাখেনি সেতু দুহাত দিয়ে আকাশের গলা জড়িয়ে ধরে বলল, ডেডীর সাথে কথা বললে বুঝবে তিনি কত ভাল। ডেডী বলেছে তোর পছন্দই আমার পছন্দ। আকাশকে আমার কাছে নিয়ে আসবি। ওর সাথে কথা বলে খুব তাড়াতাড়িই তোদের বিয়ের ব্যবস্থা করবো। সত্যি। সেতু আকাশের নাকের ওপর অনামিকা আঙ্গুলটি খাড়া করে চেপে ধরে বলল, এই- একশো ভাগ সত্যি।

(সমাপ্ত)

গল্পের বিষয়:
উপন্যাস

Share This Post

আরও গল্প

সর্বাধিক পঠিত