ঠাকুরবাড়ির অন্দরমহল

ঠাকুরবাড়ির অন্দরমহল

ঠাকুরবাড়ির মহিলাদের নিয়ে এখনও অনেক কৌতূহল আমাদের মনে জমে আছে। বাংলার নারীজাগরণের কথা ভালভাবে জানতে গিয়ে দেখলম, অধিকাংশ ক্ষেত্রেই জোড়াসাঁকোর ঠাকুরবাড়ির মহিলারা প্রধান ভূমিকা গ্রহণ করেছেন। একক বা সম্মিলিত উভয়ভাবেই তাঁরা এসেছেন অন্ধকার ঘরে হঠাৎ প্রদীপ জেলে দেবার মতো। পুরনো কাগজপত্র নেড়েচেড়ে দেখা যাচ্ছে, ঠাকুরবাড়ির মেয়েদের সম্বন্ধে এখনও অনেক কিছুই আমরা জানি না, অথচ ছাড়ানো-ছিটানো হলেও তথ্যের অভাব নেই। তাই এখানে বাংলার সংস্কৃতি জগতে তাদের যথার্থ ভূমিকা, নির্ণয় করার একটা প্রাথমিক চেষ্টা করা হল।

আলোচ্য বিষয়টি গুরুগম্ভীর ও যথেষ্ট গুরুত্বপূর্ণ হলেও আমরা কিছুটা সরস করে বলার চেষ্টা করেছি, যাতে সব ধরনের পাঠকই তা উপভোগ করতে পারেন। লেখাটি প্রথমে সংক্ষিপ্ত আকারে বার্ষিক সংখ্যা আনন্দবাজার পত্রিকায় প্রকাশিত হয়। তখন অনেকের আগ্রহ ও অভিনন্দনে উৎসাহিত হয়ে বিষয়টিকে আরো পর্ণাঙ্গ করার ইচ্ছা জাগে। বর্তমান গ্রন্থ তারই ফসল।

এই গ্রন্থ পরিকল্পনার কথা সর্বপ্রথম স্ত্রীরমাপদ চৌধুরীকে জানালে তিনি আমাকে উৎসাহিত করে ব্যাপক অনুসন্ধানের নির্দেশ দান করেন। তাঁর আগ্রহ, সক্রিয় সাহায্য ও প্রয়োজনীয় উপদেশ না পেলে কোনদিনই এ গ্রন্থ লেখা সম্ভব হত না।

কাজে নেমে সবচেয়ে বেশি সাহায্য পেয়েছি, যাঁদের নিয়ে লিখছি তাঁদের এবং তাঁদের আত্মীয়-স্বজনের কাছ থেকে। গ্রন্থের শেষে তাঁদের নাম উল্লেখ করেছি বলে এখানে আর পুনরুক্তি করা হল না। তাঁদের কাছে আমার কৃতজ্ঞতার শেষ নেই। তাঁরা এত অকৃপণভাবে সাহায্য না করলে বাংলার নারীজাগরণের এই ইতিহাস অলিখিত থেকে যেত। বিশ্বভারতীর রবীন্দ্রসদনে অবস্থিত প্রয়োজনীয় কাগজপত্র ব্যবহার করবার অনুমতি দান করেছেন উপাচার্য সুরজিৎ সিংহ মহাশয়।

গ্রন্থশেষে জোড়াসাঁকো ঠাকুরবাড়ির একটি বংশলতিকা দেওয়া হয়েছে। এই দীর্ঘ ও বিস্তৃত বংশলতিকা নির্মাণে সক্রিয় সাহায্য করেছেন ঠাকুরবাড়ির সকলেই। বিশেষভাবে সাহায্য পেয়েছি শ্রীকল্যাণি বন্দ্যোপাধ্যায়ের কাছ থেকে। বংশলতিক বিন্যাসে ধৈর্যের পরিচয় দিয়েছেন শ্রীসঞ্জয় দে, এদের সকলকে ধন্যবাদ জানাই। যথাসম্ভব চেষ্টা সত্ত্বেও সমস্ত নাম সংগ্রহ করতে না পারায় বর্তমান সংস্করণে কিছু কিছু, অসম্পূর্ণতা রয়ে গেল। আশা রাখি, পরবর্তীকালে সেই এটি সংশোধন করে নেওয়া সম্ভব হবে।
ভোরের আলো আকাশের সীমা ছাড়িয়ে সবে নেমে এসে পড়েছে বাড়ির ছাদে, অন্ধকারের আবছা ওড়নাটা তখনও একেবারে সরে যায়নি, এমন সময় শিশিরভেজা ঘাস মাড়িয়ে রুক্ষ পথের বুকে এসে নামে দুটো আরবী ঘোড়া। সদর। ছাড়িয়ে জোর কদমে এগিয়ে চলে গড়ের মাঠের দিকে। দারোয়ান কাজ ভুলে যায়। প্রতিবেশীরা হতভম্ব। রাজপথের লোকেরা অবাক। এ কী কাণ্ড? বিস্ময়ে গালে হাত দিয়ে তাকালে একে অপরের দিকে। সবাই চেয়ে আছে। কিন্তু সেদিকে তাকাবার সময় কই আরোহীদের। না, ভুল বলা হল বুঝি। দুজন আরোহী কোথায়? একজন যে অরোহিণী! আরোহিণী? চোখের ভুল নয়ত? কলকাতার রাস্তায় ঘোড়ায় চড়া মেয়ে? তাও মেমসাহেব নয়, বাঙালী। পথিকরা থমকে দাঁড়ায়। চোখ কপালে ওঠে পড়শিনীর। না, আর কোন ভুল নেই। ঐ তো আঁটসাঁট পোশাকে দৃপ্ত ভঙ্গিতে ঘোড়ার পিঠে বসে আছেন কাদম্বরী, ঠাকুরবাড়ির জ্যোতিরিন্দ্রনাথ ঠাকুরের স্ত্রী। ঘোড়ায় চড়ে বেড়াতে চলেছেন স্বামীর সঙ্গে, ময়দানের দিকে।

আজও মনে হয়, যেন গল্প শুনছি। তবু গল্প নয়, একেবারে সত্যি ঘটনা। চার দেওয়ালের গণ্ডি ছাড়িয়ে সব কিছুতে বড়-হয়ে-ওঠা এক আশ্চর্য মায়াপুরীর কথা। জোড়াসাঁকোর কর্কশ হৈ-হট্টগোলের মাঝখানে প্রায় হারিয়ে যাওয়া ছোট্ট একটা গলির শেষে যে সেকেলে মস্ত বাড়িটা দাঁড়িয়ে আছে, বাইরে থেকে তাকে বিশেষত্বহীন মনে হলেও বাংলার নবযুগের বিকাশ হয়েছিল এই ঠাকুরবাড়িতেই। ঝিমিয়ে-পড়া সমাজের বুকে একটার পর একটা আঘাত হেনে যারা তার জড়তা ঘোচাতে চেষ্টা করেছিলেন, তাদের অনেকেরই স্থায়ী ঠিকানা ছিল সেদিনকার জোড়াসাঁকো-ঠাকুরবাড়ি। পুরনো দিনের দু-চারটে পুথি-পত্র, পাঁচালী-কবিগান আর বিকৃত বাবু-কালচারের সংকীর্ণ খাতে দেশের শিল্প-সাহিত্য যখন কোনরকমে নিজেদের টিকিয়ে রেখে চলছে সেই সময়কার কথা। পশ্চিম দিগন্তের একটুখানি আলো এসে পড়ল পুবের আকাশে। সেই নবজাগরণ। লজ্জার মতো গোলাপী আভাটাই শেষে আগুন হয়ে উঠল একদিন। তার আকস্মিক উত্তেজনায় যখন অনেকে দিগভ্রান্ত, কেউ বা পথচ্যুত কিংবা বিদ্রোহী, তখন প্রথম ঊষার সবটুকু লালিমা নিজের গায়ে মেখে এই ঠাকুরবাড়িই সারা দেশের ঘুম ভাঙাবার ভার নিয়েছিল। তারই সামান্যতম নজির ওপরের ঐ গল্পের মতো ঘটনাটা।

কাগজপত্রের খুঁটিনাটি বিবরণের মধ্যে না গিয়ে রেনেসাঁসের সমসাময়িক ঘটনাগুলোর ওপর হালকা নজর বুলিয়ে নিলে দেখা যাবে তখনও তেমন কোন সমবেত চেষ্টা শুরু হয়নি। সর্বত্র শুধু তামসী রাতের গাঢ় ছায়া। তারই মধ্যে এখানে সেখানে দু-একটি প্রদীপ সবে জ্বলেছে, কোথাও বা সলতে পাকাবার আয়োজন চলছে। কিন্তু একটার সঙ্গে আরেকটার কোন যোগ নেই। নবজাগরণের পটভূমি থেকে ঠাকুরবাড়িকে সরিয়ে নিলে এই হবে সেকালের বাংলাদেশের খাটি ছবি। এইরকম দু-একটা প্রদীপের আলো সম্বল করে আমাদের জীবনে নব্য রেনেস কি আজকের রূপ নিয়ে আসত, না ষোড়শ শতকের চৈতন্য রেনেসাঁসের মতো স্মৃতি হয়ে থাকত কে জানে? সেইসব দুর্ভাগ্যের কথা ভেবে মাথাব্যথা করে লাভ নেই। আমরা শুধু বলতে চাই যে প্রাচ্য ও পাশ্চাত্ত্য ভাবসংঘাতের যুগে ঠাকুরবাড়িতেই প্রথম একটা সহিষ্ণু সমবায়িতার ক্ষেত্র গড়ে ওঠে। তাই সহজেই এ বাড়ির প্রতিটি মানুষের কল্পনায় ঢেউ তুলেছে পশ্চিমের সমুদ্র, ভাবনা ছুয়েছে হিমালয়ের শিখর। আধুনিক বাংলার সুরুচি ও সৌন্দর্যবোধের প্রায় সবটাই তো ঠাকুরবাড়ির দান। ছোট্ট একটা প্রশ্ন এসে পড়েই—ঠাকুরবাড়ির এই স্পর্শমণিটি কি রবীন্দ্রনাথ? স্বাভাবিকভাবেই মনে হবে তার কথা। শুধু ঠাকুরবাড়িকে কেন, সারা বাংলাদেশকে স্মরণীয় করে রাখার জন্যে যিনি একাই যথেষ্ট। তবু একথাও তো সত্যি, ঠাকুরবাড়ি কোনদিনই আর পাঁচটা সাধারণ বাড়ির মধ্যে আটপৌরে ধরনের ছিল না। অনেকদিন, সম্ভবতঃ দ্বারকানাথের আমল থেকেই এ বাড়িতে জীবনযাত্রার নিজস্ব একটা সংস্কার গড়ে উঠেছিল। প্রাচ্য ও প্রতীচ্যের কোন অনুভূতি, কোন চিন্তাই সেখানে বাধা পায়নি। তাই একই পরিবারে ব্রহ্মবিদ মর্যর সঙ্গে সিভিলিয়ান অফিসারের সহাবস্থান যেমন বেমানান হয়নি তেমনি কবি-সঙ্গীতজ্ঞ-নাট্যকার-শিল্পরসিক-দার্শনিক-চিন্তাবিদের একত্র সমাবেশও সম্ভব হয়েছিল।

এই সোনালি-সফল পর্বে ঠাকুরবাড়ির মেয়েরা আবছা পর্দার আড়ালে অস্পষ্ট আভাস হয়ে থাকেননি। নবযুগের ভিত গড়বার কাজে হাত লাগিয়েছিলেন। কখনও প্রত্যক্ষভাবে আবার কখনও পরোক্ষে—পুরুষের প্রতিভার প্রদীপে তেলসলতে যোগানোর দায়িত্ব নিয়ে। অবশ্য যত সহজে লেখা গেল ঘটনাটা তত সহজে ঘটেনি। মনুর বিধান এবং মুসলমানী আবরু রক্ষার তাগিদ অনেকদিন থেকেই মেয়েদের একেবারে ঘরের আসবাবপত্রে পরিণত করেছিল। ঠাকুরবাড়িতেও এ নিয়মের ব্যতিক্রম ঘটেনি। অন্দরমহলে নিঃসম্পর্কিত পুরুষ প্রবেশ করতেন না, বাইরে বেরোতে হলে মেয়েরা চাপতেন ঘেরাটোপ-ঢাকা পালকি। হাতে সোনার কাঁকন, কানে মোটা মাকড়ি, গায়ে লাল রঙের হাতকাঁটা মেরজাই-পরা বেহারার দল কাঁধে করে নিয়ে যেত। সঙ্গে সঙ্গে ছুটত দারোয়ান, হাতে লাঠি নিয়ে। ঘেরাটোপের রঙ দেখে শুধু বোঝা যেত কোন্ বাড়ির পালকি যাচ্ছে। জোড়াসাঁকো-ঠাকুরবাড়ির পালকির ঘেরাটোপ ছিল টকটকে লাল আর পাড়টা গাঢ় হলুদ। পাথুরেঘাটা-ঠাকুরবাড়িরটা ঘোর নীল আর ধবধবে সাদা পাড়। আর পাঁচটা বনেদি বাড়িরও এ রকম পালকি ছিল।

যাক সে কথা, মেয়েরা পালকি তো চাপতেন কিন্তু যেতেন কোথায়? কালেভদ্রে গঙ্গাস্নানে যাবার অনুমতি পেলে বেহারারা তো একেবারে পালকিশুদ্ধ, জলে চুবিয়ে অনত। এটাই ছিল সেকেলে দস্তুর। এছাড়া তারা মাঝে মাঝে যেতেন আত্মীয়-কুটুম্বের বাড়িতে বিয়ে-পৈতে-অন্নপ্রাশন-শ্রাদ্ধের মতো সামাজিক অনুষ্ঠানে। তখন পালকি একেবারে উঠোনে গিয়ে দাঁড়াত। জোভান্সাকোর পাঁচ নম্বর এবং ছ নম্বর বাড়ির মধ্যে দূরত্ব আর কতটুকু, তবু সেখানেও এবাড়ি-বাড়ি যেতে হলে মেয়েদের পালকি চাপতে হত। সুতরাং অসংখ্য বাধা-নিষেধের গণ্ডি পার হয়েই মেয়েদের এমনকি ঠাকুরবাড়ির মেয়েদের আত্মপ্রকাশ করতে হয়েছিল। সহজে হয়নি। প্রথমদিকে এ বাড়ির মেয়ে এবং বৌয়েদের অনেক কাঠখড় পোড়াতে হয়েছে, তাদের মধ্যে কয়েকজন সাহিত্য ও শিল্পক্ষেত্রে বিশেষ শক্তির পরিচয় রেখে গিয়েছেন, কিন্তু যাদের নাম বিশেষ ছড়িয়ে পড়েনি, পড়বার কারণও নেই, তাদের ভূমিকাও নেহাত কম ছিল না। চলবার বাধা-পথ তারা পাননি, পথ তাদের তৈরি করে নিতে হয়েছিল। খুব সোজা পথও প্রথম পথিকের কাছে দুর্গম। পরেও সেই ধারাটিকে নিরন্তর রসপুষ্ট করে বাঁচিয়ে রাখা কম কৃতিত্বের কথা নয়। সমাজের চোখরাঙানি উপেক্ষা করে ঠাকুরবাড়ির মেয়েরা যে জীবনের প্রতি ক্ষেত্রে পুরুষের পাশে এসে সম্মানের সঙ্গে মাথা উঁচু করে দাঁড়াবার সাহস অর্জন করেছিলেন, সেটাই পরম গৌরবের কথা। স্মৃতি-বিস্মৃতির অন্তরালে লুকিয়ে থাকা হারিয়ে-যাওয়া সেই মেয়েদের নিয়েই তো এ প্রসঙ্গের অবতারণা।

অবশ্য নবজাগরণের অনুকূল হওয়ায় পাল তুলে এগিয়েছিলেন অনেকেই। প্রীশিক্ষায় উৎসাহী ছিলেন ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগর, মৃত্যুঞ্জয় বিদ্যালংকার ও আরো অনেকে। মহর্ষি দেবেন্দ্রনাথ ও তার পুত্রদের উৎসাহও কম ছিল না। সত্যেন্দ্রনাথ বিলেতে বসে বাড়ির সমস্ত কাঠের ঝরকা ভেঙে মেয়েদের স্বাধীনতা দেবার স্বপ্ন দেখতেন। হেমেন্দ্রনাথ বাড়ির মেয়ে-বৌদের নিয়ম করে লেখাপড়া শেখাতেন, জ্যোতিরিন্দ্রনাথ শোনাতেন দেশবিদেশের ভাল ভাল গল্প। শেখবার। তাগিদ ছিল মেয়েদেরও, নতুন কিছু করার সাহস এবং শক্তিও তাঁদের কম ছিল না।

তবু কেন এই একটি পরিবারের মেয়েরাই এতখানি স্বাধীনতা পেয়েছিলেন? পারিপার্শ্বিক অবস্থা বিচার করে মনে হয়, হিন্দুসমাজের বাধানিষেধ ও তার কড়াকড়ি ঠাকুরবাড়ির মেয়েদের খুব বেশি অসুবিধেয় ফেলতে পারেনি। কারণ। তৎকালীন হিন্দু ব্রাহ্মণদের চোখে ঠাকুরবাড়ি ছিল পিরালী—খানিকটা একঘরের মতো স্বতন্ত্র। তার ওপর দেবেন্দ্রনাথ ব্ৰাহ্মধর্ম গ্রহণ করলে শাসনের গিট আপনিই শিথিল হয়ে এসেছিল। আমাদের অনুমানের কারণ, প্রায়ই দেখা গেছে পিরালী ব্রাহ্মণের মেয়েকে বিয়ে করার পরে কোন ছেলে আর স্বগৃহে সসম্মানে ফিরে যেতে পারেননি। সত্যেন্দ্রনাথের স্ত্রী জ্ঞানদানন্দিনীর বাবা অভয়াচরণ মুখোপাধ্যায় রাগ করে বাড়ি থেকে চলে এসে ঘটনাচক্রে যশোরের পিরালী রায় বংশের মেয়েকে বিয়ে করেন। তার বাবা বিবাগী সন্তানের খোঁজ করতে করতে এসে যেই শুনলেন তার ছেলের সঙ্গে পিরালী বামুনের মেয়ের বিয়ে হয়েছে অমনি রাগে-দুঃখে ভেঙে পড়ে পৈতে ছিঁড়ে অভিশাপ দিয়ে গেলেন অভয়চরণ নির্বংশ হোক বলে। এমন উদাহরণ আরো আছে। মহর্ষির পঁচি জামাইয়ের মধ্যে চার জন ছিলেন ঘরজামাই। সবাই কুলীনের ছেলে। কিন্তু পিরালী ঘরে বিয়ে করে আর নিজেদের বাড়ির সঙ্গে সম্পর্ক রাখতে পারেননি। জ্ঞানদানন্দিনী শুনেছিলেন, একজনের বাপ গলির মোড়ে দাঁড়িয়ে ছেলেকে শাপ দিয়েছিলেন। আর যিনি ঘরজামাই হননি অর্থাৎ স্বর্ণকুমারীর স্বামী জানকীনাথ। ঘোষাল, তিনিও পিরালী দেবেন্দ্রনাথের কন্যাকে বিবাহ করে পৈতৃক সম্পত্তির অধিকার হারিয়েছিলেন সাময়িকভাবে। জ্যোতিরিন্দ্রনাথের বিয়ের সময়ও দেখা যাবে মহর্ষি লিখছেন, জ্যোতির বিবাহের জন্য একটি কন্যা পাওয়া গিয়াছে এইই ভাগ্য। কেন? না একে ত পিরালী বলিয়া ভিন্ন শ্রেণীর লোকেরা আমাদের সঙ্গে বিবাহেতে যোগ দেয় না তাহাতে আবার ব্রাহ্মধর্ম-অনুষ্ঠান জন্য পিরালীরা আমাদিগকে ভয় করে। অথচ জ্যোতিরিন্দ্রর বিয়ের সময় ধনে মানে শিক্ষায় যোগ্যতায় ঠাকুরবাড়ির সমতুল্য বাড়ি কলকাতায় কটাই-বা ছিল? তাই বলছিলুম, সমাজের অন্যান্য বাধা এ বাড়িতে শেকলের বাঁধন হয়ে ওঠেনি বরং তারই মধ্যে একটু ফাঁক রেখে গেছে। শৈথিল্যের অবকাশে গড়ে উঠেছিল ঠাকুরবাড়ির একেবারে নিজস্ব সংস্কৃতি, সকলের দেখে নকল করা নয়, নিজেরা নতুন কিছু করা।

সাহিত্য, সঙ্গীত বা শিল্পের দিক থেকে নতুন কিছু পাবার আগে প্রকৃতপক্ষে বাঙালী মেয়েরা ঠাকুরবাড়ির মেয়েদের কাছে পেল আত্মবিশ্বাসের শক্তি আর এগিয়ে যাবার একটি প্রশস্ত পথ। তাই তাদের ময়দানে ঘোড়া ছোটানো, কালাপানি পেরিয়ে বিলেত যাওয়া, লাট ভবনের নিমন্ত্রণ রাখা, আমেরিকায় বক্তৃতা দেওয়া, স্কুলে পড়া, ছবি আঁকা, গান গাওয়া, অভিনয় করা, বই লেখা, স্বদেশসেবা, সমিতি-প্রতিষ্ঠা সবই অর্থবহ হয়ে উঠেছে। সমাজের ধীর-স্থির বুকে নানা আকারের আন্দোলন তুলে বাঙালী মেয়েদের লজ্জাভীরু মনে সাহস জোগাবার জন্যেও এর দরকার ছিল। শুধু তাই নয়, কিশোর রবীন্দ্রনাথের জন্যে বাড়ির মধ্যে একটা সাহিত্যিক আবহাওয়া গড়ে তুলতেও তার দিদি-বৌদিদিরা দাদাদের চেয়ে কোন অংশে কম সাহায্য করেননি। আবার পরিণত বয়সে নৃত্য-গীত-অভিনয়সংক্রান্ত নিজস্ব ভাবনাকে রূপায়িত করবার সময়েও তিনি বারবার ডাক দিয়েছেন বাড়ির মেয়েদের। শুধু এই জন্যেও ঠাকুরবাড়ির মেয়েদের, কখনো কখনো সামান্য ভূমিকা থাকলেও ভুলে যাওয়া উচিত নয়। এ প্রসঙ্গে একটা আশ্চর্য ঘটনা চোখে পড়ে, প্রায় কাকতালীয়ের মতোই ঠাকুরবাড়ির মেয়েদের পূর্ণ আত্মবিকাশের ক্ষেত্রটা যেন সমস্ত রবীন্দ্রজীবনের সঙ্গে গাঁথা হয়ে গেছে। অথচ রবীন্দ্রনাথ সর্বত্র প্রাধান্য বিস্তার করেছেন তা নয়। স্বর্ণকুমারী-জ্ঞানদানন্দিনীর অভ্যুত্থান পর্বে রবীন্দ্রনাথ কিশোর আর এখনও যারা জাকম্পিত হাতে নিবুনিবু ঐতিহ্য প্রদীপের শিখাটিকে জ্বেলে রেখেছেন তারা পেয়েছেন অস্ত-রবির শেষ আশীর্বাদ!

একটু আগেই বলেছি যে, ঠাকুরবাড়িতে সমাজের প্রত্যক্ষ বাধা খুব বেশি ছিল না। কিন্তু কী সেই বাধা, যা এবাড়ির মেয়েদের অচল করে তোলেনি? সেকালে মেয়েদের জীবন কেমন করেই-বা কাটত? তখনকার দিনে মেয়েদের জীবন বিশেষ সুখে কাটত না। কয়েকশো বছরের পুথিপ্রমাণ আর দলিল দস্তাবেজের বস্তাপচা পুরনো সাক্ষীসাবুদ জড়ো না করেও এটুকু বুঝতে অসুবিধে হয় না যে, আমাদের সমাজে নারীসম্পর্কিত মূল্যবোধের প্রচণ্ড অবনতি হয়েছিল। পুরুষের কাছে সেদিন নারী ছিল জীবন্ত সম্পত্তি, শুধু ভাত-কাপড় দিয়ে পোষা বিনা মাইনের দাসীমাত্র। ইচ্ছের হাড়িকাঠে তাদের যতবার খুশি বলি দেওয়া চলত। সমাজের সমস্ত নিয়ম-শৃংখলা নারীর অঙ্গে পাকে পাকে জড়ানো শৃংখল হয়ে উঠেছিল খুব সহজে, কারণ সকল অনর্থের মূল অর্থ এবং অর্থোপার্জনের যাবতীয় উপায় ছিল পুরুষের হাতে। পিতার ধনে বা পতির ধনেও নারীর অধিকার স্বীকৃত হয়নি। মেয়েদের এই নিরুপায়তায় সুযোগ নিয়েই পুরুষেরা অধিকারের নামে অবাধে স্বেচ্ছাচার করে গেছেন। তাই দেখা যাবে উনিশ শতকে সমাজ সংস্কারের প্রধান কথাই ছিল নারীমুক্তি—আধুনিক অর্থে নয়, তখন নারীশিক্ষা, নারীর অধিকার এবং নারী প্রগতির দিকেই মনীষীদের দৃষ্টি পড়েছিল!

আসলে বাল্যবিবাহ, বহুবিবাহ, অসমবিবাহ, সতীদাহ প্রভৃতি গোটা কতক বড় বড় সামাজিক অত্যাচার ছাড়াও ছোটখাট অগুণতি বাধা মেয়েদের পায়ে বেড়ির মতো চেপে বসে ছিল। তার মধ্যে লেখাপড়া শেখা, জাম জুতো পরা, বাইরে বেরোনো, গান গাওয়া, গাড়ি চড়া, অনাত্মীয় পুরুষের সঙ্গে কথা বলা সবই পড়ে। আজ মনে হয় মেয়েরা তাহলে সারাদিন কী করত? ঘর-সংসার? সে তো এখনও করে। তবে? রাধার পরে খাওয়া আর খাওয়ার পরে রাধা নিয়েই কি জীবন কেটে যেত? বইয়ের পাতায় উদাহরণ খুঁজলে দেখা যাবে নিখাদ-নিনাদে একটা কথাই বাজছে, না-না-না। দীনবন্ধুর নীলদর্পণ নাটকের সরলতা বলেছিল, রমণীর মন কাতর হইলে বিনোদনের কিছুমাত্র উপায় নাই কেননা পাঁচজন সঙ্গিনী নিয়ে বাগানে যাওয়া, শহরে বেড়াতে যাওয়া মেয়েদের পক্ষে সম্ভব নয়। তাদের জন্যে কলেজ নেই, কাছারি নেই, সভাসমিতি নেই, ব্রাহ্মসমাজ নেই—বলতে গেলে কিছুই নেই। একেবারে নেই-রাজ্যের বাসিন্দাদের দিনগুলো কাটত কেমন করে? খুব যে কষ্ট হত তা নয়, সয়ে গিয়েছিল সবই। হঠাৎ ঠাকুরবাড়ি থেকে বয়ে আসা এক বালক সঞ্জীবনী হাওয়া এসে তাদের দুলিয়ে না দিলে হয়ত আরো অনেকদিন এমনি করেই কাটত, শুধু অবকাশ পেলে মাঝে মাঝে গুমরে উঠত ফাঁকা মন।

তবু খুব নিশ্চিত হতে না পারলেও মনে হয়, মেয়েরা সর্বত্র সমানভাবে নিশ্চেষ্ট জীবন যাপন করছিল না; তা কারুর পক্ষেই সম্ভব নয়, হলে একটিমাত্র বাড়ির মেয়েদের প্রভাবে সার্বিক জাগরণ কিছুতেই সম্ভব হত না। সলতে পাকাবার আয়োজন চলছিল, ঠাকুরবাড়ির মেয়েরা এনে দিলেন নবজাগরণের প্রদীপশিখাটিকে। একটু আগে যে অগুণতি বাধার কথা বললুম তার অনেক গুলোই ঠাকুরবাড়িতে মেনে চলা হত, তবে লেখাপড়া শেখার ব্যাপারে এ বাড়ির কর্তাব্যক্তিরা প্রথম থেকেই উদার ছিলেন। মেয়েদের লেখাপড়া শেখায় কোন বাধা তো দেনইনি বরং উপযুক্ত ব্যবস্থা করে দিয়ে উৎসাহ দিয়েছিলেন। দ্বারকানাথের পিতার আমল থেকেই এ বাড়ির মেয়েরা লেখাপড়া শিখতে শুরু করে বৈষ্ণবীর কাছে। এর সুফল পাওয়া গেল অচিরেই। এ বাড়ির পুরুষদের মতো মেয়েরাও বাংলাদেশের সমস্ত মেয়ের কাছে আদর্শ হয়ে রইলেন। চিরকালের জন্যে।

জোড়াসাঁকোর ঠাকুর পরিবারের পূর্বকথা আজ আর কারুর অজানা নেই। রূপকথার মায়াপুরীর মত রহস্যঘেরা বাড়িটি তো বহুদিন ধরেই সমস্ত বাঙালীর কৌতূহলের কেন্দ্রবিন্দু হয়ে আছে। পাজি-পুঁথি খুলে হয়ত আজ অনেকেই বলে দিতে পারবেন, সেই কবে পুরুষোত্তমের বংশধর পঞ্চানন এসেছিলেন কলকাতায় ভাগ্য ফেরাতে কিংবা তার নাতি নীলমণি কোন্ শুভক্ষণে কলকাতার এক প্রান্তে বসবাস শুরু করলেন। আমাদের প্রধান লক্ষ্য জোড়াসাঁকোর ঠাকুর বাড়ি। গৃহবিবাদ আর মন-কষাকষির ফলে মৃল কুশারী বা ঠাকুর পরিবার ক্রমেই নানা শরিকে ভাগ হয়ে যেতে শুরু করেছিল বেশ কিছুদিন ধরে। পাকাপোক্তভাব পৈতৃক বাড়ি ছেড়ে ১৭৮৪ সালের জুন মাস নাগাদ নীলমণি সপরিবারে চলে আসেন জোড়াসাঁকোতে। তখন এ অঞ্চল মেছুয়াবাজার নামে পরিচিত। নীলমণির ভাই দর্পনারায়ণ থেকে গেলেন পাথুরেঘাটায় সাবেকী বাড়িতেই। অবশ্য জোড়াসাঁকোর ঠাকুরবাড়ি সকলের দৃষ্টি আকর্ষণ করতে শুরু করে আরো কয়েক বছর পরে, প্রিন্স দ্বারকানাথের আমলে। ঠাকুরবাড়ির ঐশ্বর্য-প্রতিপত্তি-আড়ম্বর-শিল্পরুচি সব কিছুর মূলেই তিনি। অপরিমিত ধনসঞ্চয়ের সঙ্গে সঙ্গে তিনি চেয়েছিলেন পুব-পশ্চিমের মিলন ঘটাতে; সফল হয়েছিলেন তাতে সন্দেহ নেই, না হলে অন্য ধনীদের সম্বন্ধে যেমন বলবীর কিছু। থাকে না, তার সম্বন্ধেও সেইরকম কিছু বলার থাকত না। কিন্তু তার কথা থাক, আমরা অন্দরমহলের কথায় ফিরে আসি।

সেযুগে ঠাকুরবাড়ির মতো ধনী এবং অভিজাত বাড়ি বা পরিবার আরো অনেক ছিল। খুব কম করেও আমরা আরো ত্রিশটি পরিবারের উল্লেখ করতে পারি যারা ধনে-মানে ঠাকুরবংশের চেয়ে কোন অংশে হীন তো ছিলেনই না বরং আরো খ্যাতি লাভ করেছিলেন। পরবর্তীকালে এইসব পরিবারও নানাভাবে শিল্পরুচি কিংবা প্রতিপত্তির পরিচয় দিয়েছেন। তবু এতগুলি বাড়ির মধ্যে ঠাকুরবাড়ির মেয়েদের বেছে নেবার প্রধান কারণ প্রথম পর্বে এই বাড়িই ছিল সবার পুনরাবর্তিনী। অবশ্য পাথুরেঘাটা-ঠাকুরবাড়ির মেয়ে-বৌরাও যে ছিলেন তা নয় কিন্তু তারা স্থায়ী প্রভাব রেখে যেতে পারেননি।

ঠাকুরবাড়ির মেয়েদের মধ্যে স্বর্ণকুমারী ও জ্ঞানদানন্দিনীর নাম সকলেই জানে। তবু ইতিহাসেরও ইতিহাস থাকে, তাই তাদের পিতামহী দিগম্বরীকেও ভুলে যাওয়া উচিত নয়। সূর্যোদয়ের অনেক আগে যেমন উষার আলো ফুটে ওঠে, দিগম্বরীর ধর্মনিষ্ঠা এবং নির্ভীক তেজস্বিতার মধ্যেও তেমনি ঠাকুরবাড়ির নিষ্ঠা ও দৃঢ়তার ছাপটুকু চোখে পড়ে। যে যুগে মেয়েদের স্বামী বই গতি ছিল না সেই সময়ে দিগম্বরী কুলধর্মত্যাগী স্বামীকে ত্যাগ করা উচিত কি উচিত নয় জানতে চেয়েছিলেন শাস্ত্রজ্ঞ ব্রাহ্মণ পণ্ডিত সমাজের কাছে। সেই পুরুষশাসিত সমাজে তার একক প্রতিবাদ—তবু তিনি নিন্দায় জর্জরিত হননি। বরং হিন্দুসমাজ তাকে শ্রদ্ধার আসনে বসিয়েছিল।

কিন্তু তিনিই বা হিন্দু শাস্ত্রজ্ঞদের কাছে এমন একটা বিধান জানতে চেয়েছিলেন কেন? তিনি কি মুক্তি চেয়েছিলেন সাত-পাকে-বাঁধা বিবাহ বন্ধন থেকে, না, স্বামীর অবহেলা তার তীব্র অভিমানকে বড় বেশি আঘাত করেছিল? এই কেনর উত্তর খুঁজতে হলে বাস্তবে-অবাস্তবে মেশা দিগম্বরীর অলৌকিক জীবনের কথা জানতে হয়।

লোকে বলে, অপরূপ লাবণ্যময়ী দিগম্বরী এসেছিলেন ঠাকুরবাড়ির লক্ষ্মী হয়ে। যশোরের নরেন্দ্রপুরে তার জন্ম। মাত্র ছ বছর বয়সে দ্বারকানাথের ধর্মপত্নী হয়ে তিনি জোড়াসাঁকোর বাড়িতে এসে পা দিলে ঠাকুরবাড়ির শ্রীবৃদ্ধি হতে শুরু করে। দিগম্বরীর রূপ এখন প্রবাদে পরিণত হয়েছে। বোধহয় তখন থেকেই ঠাকুরবাড়ির মেয়েদের রূপের খ্যাতি। শোনা যায়, দিগম্বরীর মুখের আদলেই ঠাকুরবাড়ির জগদ্ধাত্রী প্রতিমা গড়া হত। প্রত্যক্ষদর্শীরা তাকে বলতেন, সাক্ষাৎ জগদ্ধাত্রী। বলবে নাই বা কেন? দুধে-আলতা মেশা গায়ের উজ্জ্বল রঙ, পিঠে একটাল কোঁকড়া কালো চুল, চাপাকলির মতো হাতের আঙুল, দেবী প্রতিমার পায়ের মতো দুখানি পা—মৃত্যুর পরে তাকে শ্মশানে নিয়ে যাবার সময় অনেকে তার পা দুটি থেকে এক অপূর্ব জ্যোতি বেরোতে দেখেছিল। অতুলনীয় রূপের সঙ্গে দিগম্বরীর ছিল প্রচণ্ড তেজ। শাশুড়ী অলকাসুন্দরীও এই ব্যক্তিত্বময়ী বৌটিকে সমীহ করে চলতেন।

আর দ্বারকানাথ?

স্ত্রীকে তিনি সত্যিই ভালবাসতেন। কিন্তু এ তো গল্প। গল্পই তো। গল্পই তো জীবন। তারই টানাপোড়েনে বোনা হয়েছে অন্দরমহলের বালুচরী আঁচলার নকশা, গৌরবময় নারীজাগরণের ইতিহাস।

তখনকার দিনে এঁরা ছিলেন গোঁড়া বৈষ্ণব। পাথুরেঘাটার ঠাকুররা ব্যঙ্গ করে বলতেন মেছুয়াবাজারের গোঁড়া। পেঁয়াজ ঢুকত না বাড়িতে। মাছ-মাংসের তো কথাই নেই। পাছে কুটনো-কোটা বললে হিংস্র মনোভাব জেগে ওঠে তাই বলা হত তরকারি বানানো। গৃহদেবতা লক্ষ্মীজনার্দনের নিত্যসেবা নিজের হাতে করতেন দ্বারকানাথ। পুজোর উপকরণ হয়ত যুগিয়ে দিতেন দিগম্বরী। নীলাম্বরী শাড়ির আঁচল-ঘেরা দুধে-আলতা মেশা সুন্দর মুখে ভক্তির আবেশ মাখা —যে দেখত শ্রদ্ধায় আপনিই নুয়ে পড়ত। না, সেদিন কোথাও বিরোধের কালো মেঘ বাষ্প হয়েও দেখা দেয়নি।

হঠাৎ ঝড় উঠল, কেঁপে উঠল যুগলের সংসার। ফাটল ধরল সনাতন হিন্দুয়ানীর ভিতে। মা লক্ষ্মীর পদ্মের অনেকগুলো পাপড়ি উড়ে এসে পড়ল দ্বারকানাথের ঘরে। আর ব্যবসায়িক সাফল্যের সঙ্গে সঙ্গে বিলাসিতা ও বাবুয়ানীর ছদ্মবেশ পরে নবযুগের ভাবনা বাসা বাঁধলে দ্বারকানাথের মনে। হিন্দু শাস্ত্রে বলা হয়েছে, বিধর্মীর সংস্পর্শে এলে দেহ অপবিত্র হয়। সেই নিয়ম অনুযায়ী দ্বারকানাথ যখন সাহেববোর সঙ্গে মেলামেশা শুরু করলেন তখন থেকে তাঁকে নিজের হাতে পুজো-করা ছাড়তে হল। নিত্য পূজা ও অন্যান্য ক্রিয়াকর্মের জন্যে তিনি আঠারজন শুদ্ধাচারী ব্রাহ্মণকে মাইনে দিয়ে সেই কাজে নিযুক্ত করলেন। শুধু তাই নয়, তিনি নিজে এর পরে ব্যবসায়িক কাজকর্মের প্রয়োজনে মাংস এবং শেরি খাওয়া অভ্যাস করলেন। দিগম্বরী ও দ্বারকানাথ বয়ে চললেন ভিন্ন খাতে।

প্রথম প্রথম দ্বারকানাথ বেপরোয়া খুশির প্রমোদে গা ঢেলে দেননি। যদিও উ এটি ছিল সেযুগের বিলাসী বাবুদের মতোই দিলদরিয়া। সেই সঙ্গে ছিল শিল্পরুচি। তাঁর বেলগাছিয়ার বাগানবাড়িতে ছিল নানারকম প্রমোদের আয়োজন। এক প্রহরের আমোদে কত যে ঐশ্বর্য নষ্ট হয়েছে তার সীমা নেই। নিজের মনের মতো জীবন-যাপন করবার জন্যে বাগানবাড়িটি তৈরি করেছিলেন দ্বারকানাথ। কী তার কারুকাজ। ফোয়ারা, সেতু, রঙিন টালি-ঘেরা বাগান, ঝাড়লণ্ঠন, বিলিতি আসবাবে নিজের রুচিমতো সাজালেন। তাঁর নতুন গৃহসঞ্চার-এর কথা ঘটাপটা করে ছাপাও হল সেদিনকার কাগজে। প্রকাণ্ড ভোজ, নাচ-গান, বিলিতি ব্যাণ্ডের সঙ্গে ভাঁড়ের সং-এরও আয়োজন হয়েছিল, আর মধ্যে একজন গোবেশ ধারণপূর্বক ঘাস চর্বণাদি করিল। সুতরাং দ্বারকানাথের বিলাসিতায় সেযুগের বাবুয়ানীর ছাপ পুরোমাত্রায় বজায় ছিল, তাতে সন্দেহ নেই।

এই বাড়িটি তৈরি হয় ১৮২৩ সালে। এসময় দ্বারকানাথ গভর্নমেন্টের দেওয়ান, পরে আরো উন্নতি হয়। প্রথমদিকে দিগম্বরীর চোখে এত পরিবর্তন ধরা পড়েনি। নিজের জপ-তপ ঠাকুরসেবা নিয়ে তিনি সদাব্যস্ত। ভরা সংসার। বড় ছেলে দেবেন্দ্রর সবে বিয়ে হয়েছে। ছেলের বৌ সারদাও এসেছেন যশোর থেকে। এখানে যে পিরালীবংশের অনেকেই থাকেন। ছ বছরের মেয়ে সারদা এসেছেন দক্ষিণডিহি থেকে। অন্য দিকে তাকাবার সময় কই? ভোর চারটে থেকে দিগম্বরীর পূজা শুরু হত। লক্ষ হরিনামের মালা জপ ছাড়াও তিনি নিয়মিতভাবে পড়তেন ভাগবত-রাসপাধ্যায়ের বাংলা পুঁথি। দয়া বৈষ্ণবী পড়ে শোনাতেন নানারকম ধর্মগ্রন্থ। পরাণ ঠাকুর তাঁর পুজোর উপচার ও রান্নার উপকরণ গুছিয়ে রাখত। দিগম্বরী স্বপাকে আহার করতেন। একাদশীতে খেতেন সামান্য ফলমূল।

মাঝে মাঝে শোনেন অনেক কথা। অনেকে অনেক কিছু বলে। কিছু শোনেন, কিছু মনে থাকে না, মালা জপতে জপতে ভুলে যান। মন বলে, এ সবই অহেতুক রটনা। কৃতী পুরুষের গায়ে কালি ছিটোবার সুযোগ কে না। খোঁজে? কিন্তু খুব বেশি দিন নিশ্চেষ্ট হয়ে থাকা সম্ভব হল না। ওদিকে বাগানবাড়িতে পানভোজন হাসিহল্লা চলে নিয়মিত। ঘরগুলো আলোতে, আরশীতে, মির্জাপুরের কার্পেটে, লাল জাজিমে, সবুজ রেশমে, ফুলের তোড়ায় ঝলমল করে। গুজব ছড়ায়। শেষে সবই শুনলেন দিগম্বরী, শুনলেন দ্বারকানাথের। ভোজসভায় নাকি মদের স্রোত বয়ে যাচ্ছে। শোনেন ছড়ার গান বাঁধা হয়েছে :

বেলগাছিয়ার বাগানে হয় ছুরিকাঁটার ঝনঝনি,
খানা খাওয়ার কত মজা আমরা তার কি জানি?
জানেন ঠাকুর কোম্পানী।

বাগবাজারের রূপচাঁদ পক্ষী অরো শোনালেন :

কি মজা আছে রে লাল জলে
জানেন ঠাকুর কোম্পানী।
মদের গুণাগুণ আমরা কি জানি।
জানেন ঠাকুর কোম্পানী।

প্রথমে বিশ্বাস হয়নি তবু নিঃসংশয় হবার জন্যে দিগম্বরী স্থির করলেন, তিনি স্বয়ং যাবেন সেই ম্লেচ্ছ ভোজসভায়। স্বচক্ষে দেখে আসবেন কোষ্টা সত্যি আর কোন্টা মিথ্যে। পতিব্রতা দিগম্বরীর এই অতর্কিত অভিযান চিরস্মরণীয়। বিপথগামী স্বামীকে ফেরাবার জন্যে তিনি নিজেই গেলেন, সঙ্গে রইল ভীতত্ৰন্তা তরুণী সারদা ও আরো কয়েকজন আত্মীয়। মনে ক্ষীণ আশা, যা শুনেছেন তা ভুল। এতদিনের চেনা মানুষ কি এভাবে বদলে যেতে পারে?

অন্দরমহল থেকে বেরিয়ে বেলগাছিয়ার বাগানবাড়িতে প্রবেশ করতে গিয়ে কুলবধূ দিগম্বরী কেঁপে উঠেছিলেন কিনা কে জানে। সেই ঐতিহাসিক মুহূর্তটিকে কেউ কোনভাবে ধরে রাখেনি। সত্যিই কি তিনি সেখানে যেতে পেরেছিলেন, পারিপার্শ্বিক ঘটনা তো তাই বলে চোখের সামনে দেখলেন, অলো-ঝলমলে ঘরে সাহেব-বিবিদের সঙ্গে একাসনে পানাহারে মত্ত তার স্বামী। এ কি দুঃস্বপ্ন! তাহলে যা শুনেছেন সব সত্যি! বুকটা যেন ভেঙে গুড়িয়ে গেল। তবু কর্তব্য ভোলেননি; বিপথগামী স্বামীকে ফিরিয়ে আনার জন্যে অনেক চেষ্টা অনেক কাকুতি-মিনতি করেছিলেন। কর্ণপাত করেননি দ্বারকানাথ।

অন্য মেয়ে হলে এ সময় কী করতেন? হয় কেঁদে-কেঁদে নিঃশেষে হারিয়ে যেতেন, নয়ত থাকতেন আপনমনে। যেমন থাকত সেকালের অধিকাংশ ধনী গৃহিণীরা। দিগম্বরী এর কোনটাই বেছে নিলেন না। তার মতে তেজস্বিনী নারীর কাছে ধর্ম আর কর্তব্য সবার আগে। তাই মনের দুঃখ মনে চেপে তিনি ব্রাহ্মণ পণ্ডিতদের মতামত চেয়ে পাঠালেন। কী করবেন তিনি? স্বামীকে ত্যাগ করে কুলধর্ম বজায় রাখবেন, না স্বামীর সহধর্মিণী হয়ে কুলধর্ম ত্যাগ করবেন? দ্বারকানাথ অবশ্য ধর্মত্যাগী নন। কিন্তু ম্লেচ্ছদের সঙ্গে যে। একত্রে খানা খায় তার আর ধর্মত্যাগের বাকী কী আছে? পণ্ডিতেরা ভাল করেই বিচার করলেন। বহু বিতর্কের পর উত্তর এল, স্বামীকে ভক্তি ও তাহার সেবা করা অবশ্য কর্তব্য তবে তাহার সহিত একত্র সহবাস প্রভৃতি কার্য অকর্তব্য।

পণ্ডিতদের রায় শুনে দিগম্বরী নিজের কর্তব্য স্থির করে নিলেন। শুধু সেবা। ছাড়া আর সব ব্যাপারে তিনি স্বামীর সঙ্গে সমস্ত সম্পর্ক ছিন্ন করলেন। অবশ্য বাইরের কেউ কিছু জানতে পারল না। কারণ তাঁর স্বামীভক্তি ছিল প্রবল। তিনি প্রতিদিন দ্বারকানাথের শয্যার কাছে গিয়ে মাটিতে একটি প্রণাম রেখে আসতেন। দ্বারকানাথ সম্পূর্ণ নির্বিকার। বৈষয়িক ব্যাপারে কিংবা অন্য কারুর প্রয়োজনে দিগম্বরী যখনই স্বামীর সঙ্গে কথা বলতে বাধ্য হতেন তারপরই সাত ঘড়া গঙ্গাজলে স্নান করে নিজেকে শুদ্ধ করে নিতেন। দিনরাতের বিচার ছিল না। দুঃসহ অত্যাচারের ফলে কয়েকদিনের জ্বরবিকারে নিবে গেল দিগম্বরীর জীবনদীপ। তার জ্যোতির্ময়ী মূর্তিটি শুধু অম্লান হয়ে রইল মহর্ষিপুত্রের আধ্যাত্মিক ধ্যান-স্মৃতিতে। দ্বারকানাথেরও কি মনে পড়েনি তেজস্বিনী দিগম্বরীকে? স্ত্রীর মৃত্যুর পরে তিনি বারবার অনুভব করেছেন গৃহলক্ষ্মীর অভাব; তাই তো যেদিন কার-টেগোর কোম্পানীর একটি মূল্যবান জাহাজ অকুল সাগরে ডুবে গেল সেদিন দ্বারকানাথের বুকভাঙা নিঃশ্বাসের সঙ্গে শুধু বেরিয়ে এল দুটি কথা, লক্ষ্মী চলিয়া গিয়াছেন, অলক্ষ্মীকে এখন আটকাইবে কে?

সে যুগের পরিপ্রেক্ষিতে দিগম্বরী যে সাহস দেখিয়ে গিয়েছিলেন তার ছেলের বৌয়েদের মধ্যে সেই তেজ, সেই শক্তি দেখা যায়নি। দেবেন্দ্রনাথের স্ত্রী সারদার সমস্ত কাজকর্মই ছিল স্বামীকেন্দ্রিক। বরং গিরীন্দ্রনাথের স্ত্রী যোগমায়ার মধ্যে শাশুড়ির সনাতন ধর্মনিষ্ঠার অনেকটাই লক্ষ্য করা গেছে। দেবেন্দ্রনাথের ছোট ভাই নগেন্দ্রনাথের স্ত্রী ত্রিপুরা সুন্দরী, তিনি এসেছিলেন অনেক পরে।

সারদা এবং যোগমায়ার প্রসঙ্গে আরো একটা কথা বলা চলে যে তারা কিছু লেখাপড়া শিখেছিলেন। মনে হয়, তখনও ধনী সচ্ছল পরিবারের মেয়েরা নিয়মিত লেখাপড়া শিখতেন। মাইনে-করা বৈষ্ণবী এসে শিশুবোধক, চাণক্যশ্লোক, রামায়ণ, মহাভারত পড়াত। আর কলাপাতায় চিঠি লৈখা মকস করাত। এ নিয়ম যে শুধু ঠাকুরবাড়িতে ছিল তা নয়, অনেক বাড়িতে ছিল। সারদা এবং যোগমায়াও পড়তে পারতেন, শুধু তারা নন, বাড়ির অন্যান্য মেয়েরাও লেখাপড়া জানতেন। বই পড়লে বিধবা হবার ভয় কোনদিনই তাদের ছিল না। সম্ভবতঃ গ্রামাঞ্চলে এই জাতীয় বিধিনেষেধ চলত।

সারদা অবসর সময়ে প্রায়ই একটা না একটা বই খুলে বসতেন। সংস্কৃত রামায়ণ, মহাভারত পড়ে শোনাবার জন্যে মাঝে মাঝে ডাক পড়ত ছেলেদের। হাতের কাছে অন্য কোন বই না থাকলে অভিধানখানাইখুলে বসতেন। যোগমায়াও নানারকম বই পড়তেন। মালিনী আসত বটতলা থেকে ছাপা বইয়ের পসরা নিয়ে। সেখান থেকে বেছে বেছে বই কিনতেন মেয়েরা। নরনারী, লয়লা-মজনু, হাতিমতাই, আরব্য রজনী, লাম্বল টেল, পাল ও বর্জিনিয়া—সবই জোগাড় করেছিলেন যোগমায়। তার স্বামীর লেখা কাব্যোপন্যাস কামিনীকুমারও থাকত মালিনীর পসরায়। আর থাকত মানভঞ্জন, প্রভাস-মিলন, কোকিল দূত, অন্নদামঙ্গল, রতিবিলাপ, বস্ত্রহরণ, গীতগোবিন্দ, গোলেবকাওলী, বাসবদত্তার মতো কিছু বই। যোগমায়া বেশ ভালই বাংলা জানতেন। সত্যেন্দ্রনাথের ভাষায় তিনি ছিলেন আমাদের একপ্রকার শিক্ষয়িত্ৰী।

সারদা এবং যোগমায়া দুজনের কথাই জানতে ইচ্ছে করে কিন্তু জানার খুব সুবিধে নেই। ধর্মশীলা বৌদুটির জীবন বয়েছিল দুটি খাতে। সরলপ্রাণ। কামদয়া সারদা মহর্ষি স্বামীর সহধর্মিণী হবারই চেষ্টা করেছিলেন যদিও এ পর্মের প্রতি তার কোন আকর্ষণ বা আসক্তি ছিল বলে মনে হয় না। আমরা

কে যে রূপে দেখি সেটি সতী-সাধ্বী পতিব্রতার সনাতন রূপ। দেবেন্দ্রনাথের জন্যে তার ভাবনার সীমা ছিল না। একবার শ্রাবণ মাসের ভরা বর্ষায় তিনি গঙ্গাভ্রমণে বেরোলে কঁদতে কাঁদতে সারদাও ছোট ছোট ছেলেদের নিয়ে স্বামীর সঙ্গী হয়েছিলেন, আমাকে ছাড়িয়া কোথায় যাইবে? যদি যাইতেই হয়, তবে আমাকে সঙ্গে করিয়া নাও। হিমালয়ে রবীন্দ্রনাথকে দিয়ে চিঠি লেখানোর ঘটনাটি তো সবাই জানে। স্বামীর মঙ্গলের জন্যে ব্রহ্মোপাসনা এবং হিন্দুমতে পূজার্চন কোনটিতেই তার কিছুমাত্র আপত্তি ছিল না।

জ্ঞানদানন্দিনীর পুরাতনী কথা পড়ে আরো জানা যায় সারদা বেশি নড়াচড়া করতে পারতেন না। সংসারের নিত্যকাজ দেখাশোনা করবার প্রয়োজনও হত না। একখানি তক্তপোষের ওপর তিনি বসে থাকতেন আর দাসীরা ছেলের বৌয়েদের রূপটান মাখাত তার সামনে বসে। শুধু দেবেন্দ্রনাথ বাড়ি ফিরলে সারদা নিজে রান্নাঘরে গিয়ে বসে থাকতেন। জ্ঞানদানন্দিনী বলেছেন, আমার। মনে পড়ে বাবামশায় যখন বাড়ি থাকতেন আমার শাশুড়িকে একটু রাত করে ডেকে পাঠাতেন, ছেলেরা সব শুতে গেলে। আর মা একখানি পোয়া সুতি শাড়ি পরতেন, তারপর একটু আতর মাখতেন। এই ছিল তার রাত্রের সাজ।

সত্যি কথা বলতে কি, ঠাকুরবাড়িতে সারদার ছবিটি খুব স্পষ্ট নয় কিন্তু বড় স্নিগ্ধ। ভাবতে ভাল লাগে, তিন তলায় পঙ্খের কাজ-কর একটি ঘরে, মেঝেতে কার্পেট পাতা, সেই ঘরে বসে আছেন সারদা বালুচর শাড়ি পরে। ঘরের কোণে জ্বলছে একটি প্রদীপ, সেই আলোয় জ্বলজ্বল করছে সাদা চুলের মাঝে টকটকে লাল সিঁদুর। কত লোক আসছে যাচ্ছে, প্রশংসা করছে তাঁর জ্ঞানী গুণী ছেলেমেয়েদের, মায়ের লজ্জারুণ মুখে গভীর সুখের আবেশ—কিন্তু পাছে কেউ দেখে, দেখে ভাবে গরবিণী, তাই ছেলেমেয়েদের প্রশংসা শুনলেই মাথাটি নীচু করে নিচ্ছেন কুণ্ঠাভরে।

যোগময়ার ছবিটিও কম সুন্দর নয়। তাঁকে আমরা শুধু পুরনো কথার মধ্য দিয়ে পেয়েছি। তার গায়ের রঙ ছিল সোনার মতো আর পাশ দিয়ে। চলে গেলে গা দিয়ে যেন পদ্ম গন্ধ ছড়াত। দেবেন্দ্রনাথ ব্ৰাহ্মধর্ম গ্রহণ করার পরে বাড়িতে লক্ষ্মীজনার্দনের নিত্য পূজা বন্ধ করতে উদ্যত হলে যোগমায়া চাইলেন গৃহদেবতা লক্ষ্মীজনার্দনকে। তাই হল। যোগমায়া দুই ছেলে ও দুই মেয়েকে নিয়ে উঠে গেলেন দ্বারকানাথের বৈঠকখানাবাড়িতে। সেই থেকে জোড়াসাঁকোর ঠাকুরবাড়ি দুটি বাড়িতে পরিণত হয়; তবে দুই বাড়ির পুরুষদের মধ্যে মতের অমিল বা মনের অমিল কখনো হয়নি। এই ঘটনার পর দুই পরিবারের মেয়েদের গতিবিধি অবশ্য স্বাভাবিক রইল না, শুধু পলাপার্বণে দেখাসাক্ষাৎ ঘটত।
যোগমায়ার সঙ্গে যোগাযোগ ছিন্ন হওয়ায় মহর্ষির ছেলেমেয়েরা খুব দুঃখ পেয়েছিলেন। বড় মেয়ে সৌদামিনীর দুঃখই যেন বেশি। তিনি স্বামী পুত্র কন্যা নিয়ে জোড়া কোর বাড়িতেই জীবন কাটিয়েছেন। কাকীমা ছিলেন তার সুখ-দুঃখের সঙ্গিনী। এবার মহর্ষিপরিবারের সব ভার পড়ল একা সৌদামিনীর ওপর। বাংলা দেশে স্ত্রীশিক্ষা প্রসারের একেবারে গোড়ার দিকে সৌদামিনী একটি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা নিয়েছিলেন যদিও এর জন্যে তাঁর নিজের কৃতিত্ব খুব বেশি ছিল না।

আগেই বলেছি, ঠাকুরবাড়ি এবং আরও পাঁচটা সম্ভ্রান্ত পরিবারে মেয়েদের লেখাপড়া শেখানো হত। গ্রামাঞ্চলে সে সুযোগ ছিল না। দু-একজন দুঃসাহসিকা ছাড়া কেউ সাহস করে পুঁথিপত্র নিয়ে বসতে পারত নাকি? মনে তো হয় না। সুদূর পল্লী গ্রামের গৃহবধূ রাসসুন্দরী একটু-আধটু লেখাপড়া শিখেছিলেন। তিনি ঠাকুরবাড়ির কেউ নন, এমনকি এই পরিবারের সংস্পর্শেও আসেননি তবু বাঙালী মেয়েদের মধ্যে তিনিই লিখেছিলেন প্রথম আত্মজীবনী। এই প্রথম নিজের কথা লেখার মতো বিশেষ ঘটনাটি আমরা ঠাকুরবাড়িরই কোন মহিলার কাছে আশা করেছিলুম। যাইহোক, রাসসুন্দরীর পক্ষে লেখাপড়া শেখা সহজ ছিল না, ঘরের দরজা বন্ধ করে শিখতে হত। না হলে শোনা যেত বৃদ্ধদের খেদোক্তি, বুঝি কলিকাল উপস্থিত হইয়াছে দেখিতে পাই। এখন বুঝি মেয়েছেলেতে পুরুষের কাজ করিবেক। এতকাল ইহা ছিল না। একালে হইয়াছে। এখন মাগের নামডাক। মিনসে জড়ভরত। এই তিক্ত মন্তব্য শুনতে শুনতে রাসসুন্দরীর মনে হত, যেন বিদ্যার আর কোন গুণ নাই, বিদ্যায় কেবল টাকা উপার্জন হয়। রাসসুন্দরীর মতো লুকিয়ে লুকিয়ে পড়তে হয়েছে সত্যেন্দ্রনাথের স্ত্রী জ্ঞানদানন্দিনীর মাকেও। তিনি রাত্রিবেলা দরজা বন্ধ করে হিসেব কিতেব চিঠিপত্র লিখতেন। শিবনাথ শাস্ত্রীর মা গোলকমণি দেবীও নানা উপায়ে লেখাপড়া শিখেছিলেন। পাবনার প্রমথ চৌধুরীর দিদি প্রসন্নময়ী তো ছোটবেলায় বালকবেশে কাছারি বাড়িতে সরকারের কাছে পড়তে যেতেন। তার পিসীদের মধ্যে তিনজন ভগবতী, কৃষ্ণসুন্দরী ও মৃন্ময়ী বেশ লিখতে পড়তে পারতেন কিন্তু ছোট পিসী বালবিধবা কাশীশ্বরী ছিলেন পণ্ডিত মহিলা। ছোট ছেলেমেয়েরা তার কাছে লেখাপড়া শিখতে যেত। প্রসন্নময়ী লিখেছেন, কাশীশ্বরী তীর্থ ভ্রমণ করিয়া হঠি তর্কালঙ্কার সাজিয়া মুণ্ডিত মস্তকে গ্রামে ফিরিয়া আসিয়া এক পাঠশালা খুলিয়া বসিলেন। এ প্রসঙ্গে হটি বিদ্যালঙ্কার, হটু বিদ্যালঙ্কার কিংবা চণ্ডীচরণ তর্কালঙ্কারের মেয়ে দেবময়ীর কথাও স্মরণীয়। কিন্তু এদের ব্যতিক্রম হিসেবেই ধরা হত। বেশির ভাগ মেয়েই লেখাপড়ার সুযোগ পেতেন না।

তুলনামূলকভাবে কলকাতার অবস্থা বেশ ভাল। সেখানে পালা করে বৈষ্ণবী এসে লেখাপড়া শেখাত। কিছুদিন পরে বৈষ্ণবীর স্থান গ্রহণ করে ইংরেজ গৃহশিক্ষিকারা। রাজা নবকৃষ্ণ, রাধাকান্ত দেববাহাদুর, ব্রহ্মানন্দ কেশবচন্দ্র সেন, প্রসন্নকুমার ঠাকুর, রাজা বৈদ্যনাথ রায় নিজেদের অন্তঃপুরে লেখাপড়া শেখাবার ব্যবস্থা করেছিলেন। তবে সে শিক্ষা নিভৃতে, অন্তরালে। প্রসন্নকুমারের মেয়ে হরসুন্দরী ও পুত্রবধূ বালাসুন্দরী নানা বিদ্যায় পারদর্শিনী হয়ে ওঠেন। অকালমৃত্যু না হলে হয়ত জ্ঞানেন্দ্রমোহন ঠাকুরের স্ত্রী বালাসুন্দরীই বাংলা দেশে স্ত্রী-স্বাধীনতার সূচনা করে যেতেন। বৈদ্যনাথ রায়ের স্ত্রীকে পড়াতে সেন্ট্রাল ফিমেল স্কুলের মিসেস উইলসন। ঠাকুরবাড়িতেও বিদেশিনী শিক্ষয়িত্ৰী মিস গোমিস এসেছিলেন, কিন্তু বাড়ির মধ্যে এ ধরনের শিক্ষয়িত্ৰী রাখার মধ্যে বিশেষ সাহসের কিছু ছিল না।

এ সময় তোড়জোড় চলছিল মেয়েদের জন্যে একটা ভাল স্কুল খোলার। ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগর ছাড়াও এ ব্যাপারে উৎসাহ ছিল রাজা দক্ষিণারঞ্জন মুখোপাধ্যায়, রামগোপাল ঘোষ, মদনমোহন তর্কালংকার, ও আরো অনেকের। তাঁরা মেয়েদের জন্য স্কুল খোলার পক্ষপাতী ছিলেন। বাধা এসেছিল প্রচণ্ডভাবে। এই গেল গেল রবের মধ্যেই স্থাপিত হয়েছিল বেথুন স্কুল। অবশ্য প্রথমে স্কুলের নাম ছিল হিন্দু ফিমেল স্কুল। দেশীয় পণ্ডিতদের সাহায্যে স্কুলটি স্থাপন করেন ভারতহিতৈষী জন এলিয়ট ড্রিঙ্কওয়াটার বীটন। স্কুলটি প্রথমে খোলা হয়েছিল রাজা দক্ষিণারঞ্জনের সুখিয়া টীটের বাড়ির বৈঠকখানায়। এই স্কুলেই পড়তে এসেছিলেন পাঁচ বছরের ছোট্ট মেয়ে সৌদামিনী। সেটা ১৮৫১ সাল। তার দু বছর আগে ১৮৪৯ সালের সাতই মে হিন্দু ফিমেল স্কুল প্রতিষ্ঠা হয়েছে। খুব স্বাভাবিক ভাবেই আমরা আশা করতে পারি ঠাকুরবাড়ির কোন মেয়ে তার প্রথম ছাত্রী হবেন। তা কিন্তু হয়নি। এই স্কুলের প্রথম দুটি ছাত্রী মদনমোহন তর্কালংকারের দুই মেয়ে কুন্দমাল ও ভুবনমালা। মেয়েদের স্কুলে পাঠাবার জন্যে তাঁকে নিজের গ্রামে সমাজচ্যুত হতে হয়। ঐ দুজনের সঙ্গে আরো উনিশটি মেয়ে স্কুলে ভর্তি হন।

কিন্তু সামাজিক ঝড় উঠতে দেরি হল না। এসব ঝড় তোলে খবরের কাগজেরা। সমাচার চন্দ্রিকা নানারকম ওজর আপত্তি তুলেছিল। সরলমতি বালিকাদের স্কুলে পাঠানো উচিত নয়, তাতে ব্যভিচার সংঘটনের শংকা আছে। কামাতুর পুরুষেরা সুযোগ পেলেই তাহাদিগকে বলাৎকার করিবে, অল্পবয়স্ক বলিয়া ছাড়িয়া দিবে না, কারণ খাদ্যখাদক সম্বন্ধ। অথচ হিন্দু ফিমেল স্কুলের গেও মেয়েদের স্কুল ছিল। ১৮১৯ সালের মে-জুন নাগাদ খোলা হয় জুভেনাইল স্কুল। প্রথমে ছাত্রী ছিল আটটি, পরে দাঁড়ায় বত্রিশটিতে! পরে ভিজ সোসাইটি অনেক কাজ করে। ১৮২১-এ মেরী এ্যান কুক কলকাতায় এসে কতকগুলো অবৈতনিক স্কুল খোলেন। একবছরের মধ্যেই তিনশো মেয়ে লেখাপড়া শুরু করে। ১৮৭২-এ এই সংখ্যা দাঁড়ায় ছশোতে। শ্রীরামপুর, ঢাকা, বীরভূম, চট্টগ্রামেও মেয়েদের স্কুল খোলা হল। ১৮৪৭ সালে প্রথম হিন্দু ছাত্রীদের জন্যে খোলা হয় একটি স্কুল, কলকাতার কাছেই বারাসতে। তবু নতুন স্কুলটি নিয়ে যথেষ্ট হৈ চৈ হল। এমন কথাও লেখা হল যে, যারা ঐ স্কুলে মেয়েদের পড়তে পাঠাচ্ছেন তাঁরা মান্য ও পবিত্র হিন্দু কুলোদ্ভব নাও হতে পারেন। দেখতে দেখতে বেথুনের ছাত্রী সংখ্যা কমে গিয়ে দাঁড়াল সাতটিতে। বিপক্ষদলও চুপ করে ছিলেন না এমনকি সংবাদ প্রভাকর পর্যন্ত এসব উক্তির প্রতিবাদ জানাল। কে মান্য আর কে মান্য নন সে নিয়েও তর্ক চলতে লাগল, তবু কাগজের তর্কাতর্কি এক জিনিষ আর বাস্তবে ঘটে আর এক জিনিষ। ধনীমানী সম্ভ্রান্ত ব্যক্তিরা ইতস্ততঃ করতে লাগলেন। দু-একটা উদাহরণের প্রয়োজন হলে ডাক পড়ল সৌদামিনীর। পাঁচ বছরের সুন্দর ফুটফুটে মেয়েটি পেশোয়াজ পরে খুড়তুত বোন কুমুদিনীর সঙ্গে স্কুলে যাবার জন্যে তৈরি হল। দেবেন্দ্রনাথ সৌদামিনীকে স্কুলে পাঠালেন শুধু দৃষ্টান্ত দেখাবার জন্যে। তিনি জানতেন তার দেখাদেখি আরো অনেকে নিজের মেয়েদের স্কুলে পাঠাবেন। তার অনুমানে ভুল হয়নি। ১৮৫১ সালের জুলাই মাসে সৌদামিনী স্কুলে ভতি হলেন বাঙালী মেয়েদের পড়াশোনার পথ সহজ করে দেবার জন্য। বিপত্তি? হ্যাঁ, তাকে নিয়েও বিপদ হয়েছিল বৈকি। তার ধবধবে ফর্সা শ্বেত পাথরের মতো গায়ের রঙ দেখে একবার পুলিশ এসে ধরেছিল চুরি-করা ইংরেজ মেয়ে ভেবে।

সৌদামিনীর লেখাপড়া ঠিক কতটা এগিয়েছিল জানা যায়নি। মহর্ষি পরিবারে তিনি ছিলেন গৃহরক্ষিতা অর্থাৎ গৃহের রক্ষয়িত্ৰী। সমস্ত কিছু দেখাশোনা করে তার হাতে সময় থাকত কম। শুধু কি দেখাশোনা? বোনেরা কোথাও যাবে, তাদের নিখুত করে চুল বেঁধে দিতে হবে। বাড়িতে কোন উৎসব হবে, সুন্দর করে ফুল কেটে আলপনা দিতে হবে। সব দিকে মহর্ষির সতর্ক দৃষ্টি। তাই বিশাল পরিবারের আদর্শ গৃহিণী হয়ে সৌদামিনী অন্যদিকে নজর দিতে পারতেন না। তার নিজের লেখা বলতে দু-একটি ব্ৰহ্মসঙ্গীত আর একটি মাত্র স্মৃতিকথা পিতৃস্মৃতি ছাড়া আর কিছুই পাওয়া যায়নি। তোমারে পূজিব অকিঞ্চন গানটি হয়ত অনেকেই শুনেছেন। পিতৃস্মৃতিও দুষ্প্রাপ্য নয়। পড়ে মনে হয়, ইচ্ছে করলে সৌদামিনী আরও অনেক কিছুই দিতে পারতেন কিন্তু দিয়েছেন শুধুমাত্র কয়েকটি সেকেলে ছবির টুকরো। বেথুনে পড়ার কথাই যারা যাক না। সৌদামিনী লিখেছেন :

কলকাতায় মেয়েদের জন্য যখন বেথুন স্কুল প্রথম স্থাপিত হয় তখন ছাত্রী। পাওয়া কঠিন হইল। তখন পিতৃদেব আমাকে এবং আমার খুড়তুত ভগিনীকে সেখানে পাঠাইয়া দেন। হরদেব চাটুজ্জ্যেমশায় আমার পিতার বড় অনুগত ছিলেন, তিনিও তাহার দুই মেয়েকে সেখানে নিযুক্ত করিলেন। ইহা ছাড়া মদনমোহন তর্কালংকার মহাশয় ও তাঁহার কয়েকটি মেয়েকে বেথুন স্কুলে পড়িতে পাঠাইয়া দেন। এইরূপে অল্প কয়েকটি মাত্র ছাত্রী লইয়া বেথুন স্কুলের কাজ। আরম্ভ হয়।

এ যেন শুধুই খবর। তফাৎ এই যে, এ কথা তৃতীয় ব্যক্তির রিপোর্ট না হয়ে বেথুনের একেবারে প্রথম দিকের একটি ছাত্রীর লেখা নিজের কথা। অথচ সৌদামিনী কত খবরই না দিতে পারতেন। বেথুনে-পড়া মেয়েদের নিয়ে তো কম ছড়া আর প্রহসন লেখা হয়নি। বলাবাহুল্য সৌদামিনীকেও কতকটা বিরুদ্ধ আবহাওয়ার মধ্যে দিয়েই এগোতে হয়েছে। যেমন হায়-হায় করে উঠলেন গুপ্ত কবি যত ছুড়িগুলো তুড়ি মেরে কেতাব হাতে নিচ্ছে যবে। তখন এ. বি. শিখে বিবি সেজে বিলাতি বোল কবেই কবে। যদিও ঈশ্বর গুপ্ত স্ত্রীশিক্ষা বিরোধী ছিলেন না বরং উৎসাহীই ছিলেন বলা চলে। লেখা শুরু হল বেথুনে-পড়া। অতএব বিপথগামিনীদের নিয়ে নানারকম প্রহসন—স্বাধীন জেনানা, বৌবাবু, পাশ করা মাগ, শিক্ষিত বউ, মাগ-মুখো ছেলে, শ্ৰীযুক্তা বৌবিবি, পাশ-করা আদুরে বৌ, কলির মেয়ে ও নব্যবাবু, বরবদল, পণ্ডিত মেয়ে, ফচকে ছুঁড়ির কীর্তিকাণ্ড, হুড়কো বৌ-এর বিষমজ্বালা, কলির বৌ হাড়-জ্বালানী, মাগসর্বস্ব, বেহদ্দ বেহায়া, মেয়েছেলের লেখাপড়া আপনা হতে ডুবে মরা—নামের শেষ আছে! বিষয়বস্তু সবারই এক, বক্তব্যও একটাই, গেল গেল সব গেল। সব লেখা হয়েছে পঞ্চাশ বছর পরে। এমন কি বিশশতকের গোড়ার দিকেও। সৌদামিনী যে এই জাতীয় সামাজিক বাদানুবাদের খবর রাখতেন না তা নয়। তাঁর লেখা থেকেই জানতে পারি জোড়াসকোয় মহর্ষিভবনের কম্পাউণ্ডের ওপারেই ছিল দেবেন্দ্রনাথের পিসতুত ভাই চন্দ্রবাবুর বাড়ি। ঠাকুরবাড়ির মেয়েরা খোলা ছাদে ঘুরে বেড়াচ্ছে দেখে তিনি একদিন এসে বললেন, দেখ দেবেন্দ্র, তোমার বাড়ির মেয়েরা বাহিরে, খোলা ছাতে বেড়ার আমরা দেখতে পাই, আমাদের লজ্জা করে। তুমি শাসন করিয়া দাও না কেন? সৌদামিনী জানিয়েছেন, আমাদের বাড়িতে যখন দুর্গোৎসব ছিল ছেলেরা বিজয়ার দিনে নৃতন পোশাক পরিয়া প্রতিমার সঙ্গে সঙ্গে চলিত—আমরা মেয়ের। সেইদিন তেতলার ছাদে উঠিয়া প্রতিমা বিসর্জন দেখিতাম, তখন বংসরের মধ্যে সেই একদিন আমরা তেতলার ছাদে উঠিবার স্বাধীনতা পাইতাম। উদারপন্থী দেবেন্দ্রনাথ এর মধ্যে কোন দোষ দেখতে পাননি, তার চেয়েও বড় কথা তিনি বুঝেছিলেন দিন-বদলের পালা শুরু হয়েছে। তাই হেসে বলেছেন, আমি আর কিসের বাধা দিব। যাহার রাজ্য তিনিই সমস্ত ঠিক করিয়া লইবেন।

তবে সৌদামিনীর পিতৃস্মৃতি পড়ে দেবেন্দ্রনাথকে নব্যপন্থী ভাবলে ভুল করা হবে। যতক্ষণ না ছেলেমেয়েরা মন্দের দিকে যাচ্ছে ততক্ষণ কিছু বলতেন না। হিন্দু সমাজের বহু সংস্কার তিনি ব্রাহ্ম হয়ে ও নিষ্ঠার সঙ্গে পালন করেছেন। বিধবা বিবাহ, অসবর্ণ বিবাহ, মেয়েদের অবাধ স্বাধীনতা কোনটাই তার সমর্থন পায়নি। আবার পারিবারিক প্রথা বা স্ত্রী-আচরাকে নির্মূল করার জন্যেও তার কোন আগ্রহ ছিল না। কারণ তিনি জানতেন, এই সব তুচ্ছ প্রথা আর আচারের তলা দিয়ে বয়ে চলেছে বাঙালীর নিজস্ব প্রাণধারা, ওপর থেকে টান দিলে তার মূল যাবে ছিঁড়ে, রস যাবে শুকিয়ে। তখনকার পরিস্থিতিতে স্থির মস্তিষ্কে এই ধরনের চিন্তা করে দুটো বিপরীতমুখী স্রোতের মধ্যে দিয়ে সংসার তরণীখানিকে পার করে নিয়ে যাওয়াই ছিল অসাধারণ কৃতিত্বের কথা। সুখের বিষয়, দেবেন্দ্রজীবনের অনেক অন্তরঙ্গ ছবিই আমরা সৌদামিনীর প্রবন্ধ থেকে পেতে পারি। যেমন পিতৃঋণ শোধ করার পরে দেবেন্দ্রনাথ সামান্যতম ঋণকেও ভয় করতেন। সৌদামিনী তাঁর পিতৃস্মৃতিতে লিখেছেন :

তিনি সামান্য পরিমাণ দেনাকেও অত্যন্ত ভয় করিতেন। তাঁহার ছেলের কেহ ঋণ করিয়া তাহাকে সাহায্যের জন্য ধরিলে তিনি বলিতেন, আমি কি চিরদিন কেবল ঋণ শোধই করিব? মহর্ষির ব্যয় সংকোচের কথাও আছে, তিনি একবারে চারি আনা মূল্যের অধিক সামগ্রী আহার করিতেন না। যাহার পিতার ডিনার তিন শত টাকার কমে হইত না। তিনি চারি আনা মূল্যের ডিনার খাইয়া তৃপ্ত হইতেন।…সমস্ত গাড়িঘোড়া বিক্রয় করিয়া ফেলিলেন, কেবল বাটির মহিলাদিগের যাতায়াতের জন্ঠ একটিমাত্র পালকি রাখিলেন। সৌদামিনী না জানালে এর অনেক কথাই জানা যেত না কোনদিন।

সৌদামিনীর ছোট বোনেদের মধ্যে সুকুমারী অল্প বয়সে মারা গিয়েছিলেন। কিন্তু তিনিও তার দিদির মতো একটি ঐতিহাসিক ঘটনার সঙ্গে নিজে কোন ভূমিকা না নিয়েও জড়িয়ে পড়েছেন। দেবেন্দ্রনাথ সুকুমারীর বিয়ে দিয়েছিলেন ব্রাহ্মধর্ম অনুসারে অর্থাৎ বিবাহ অনুষ্ঠানে শালগ্রাম শিলা বর্জন করে। তখনও ব্রাহ্মবিবাহ আইন প্রচলিত হয়নি। সুকুমারীর বিয়েই প্রথম ব্রাহ্মবিবাহ। এই বিয়ে হয় ১৮৬১ সালের ২৬শে জুলাই। তার আগে ব্রাহ্মদের গার্হস্থ্য জীবনের কোন কাজে স্বতন্ত্র অনুষ্ঠান পদ্ধতি প্রস্তুত করা হত না। এই বিয়ে নিয়ে প্রচণ্ড আলোড়ন শুরু হয়। অনেকে এ বিয়েকে অসিদ্ধ বলে মনে করতেন। এভাবে মেয়ের বিয়ে দেওয়া এবং হিন্দুমতে পিতৃশ্রাদ্ধ না করায় দেবেন্দ্রনাথ তার আত্মীয়-পরিজনদের কাছ থেকে আরোই দূরে সরে গেলেন।

সৌদামিনী-সুকুমারীর বোন স্বর্ণকুমারী বাংলাসাহিত্যে প্রথম সার্থক লেখিকা। অবশ্য স্বর্ণকুমারীর আরো একজন দিদি ছিলেন শরৎকুমারী নামে। তিনি রান্নাঘর এবং রূপচর্চাকেই প্রাধান্য দিয়েছিলেন। স্বর্ণকুমারীর ছোট বোন শম রীও দু-একটি ক্ষেত্রে অভিনয় করা ছাড়া বিশেষ কিছুই করেননি। কিন্তু স্বর্ণকুমারী যেন সব দিক থেকে এক বিরল ব্যতিক্রম। তার সোনলি ছটায় Fরবাড়ির অন্দরমহল আলোকিত। স্বর্ণকুমারীর সাফল্য ও কৃতিত্বের সঙ্গে ওতপ্রাতভাবে জড়িয়ে আছেন আরো একজন মহিলা, তিনি ঠাকুরবাড়ির মেজো বৌ জ্ঞানদানন্দিনী। যদিও তিনি এ বাড়ির মেয়ে নন, বিবাহসূত্রে এসে পড়েছেন ঠাকুরবাড়ির অঙ্গনে। কিন্তু ঠাকুরবাড়ির কৃতিত্ব ও ঐতিহ্য থেকে তাঁকে আলাদা করে দেখবে কে? এখানকার শিক্ষাদীক্ষা চিন্তাভাবনা সব কিছুর সঙ্গেই যে তিনি জড়িয়ে-মিশিয়ে আছেন। সত্যি কথা বলতে কি, জ্ঞানদা নন্দিনীই তো সবার আগে সবরকম বাধা-নিষেধের বেড়া টপকে বৃহত্তর জগতে এসে মেয়েদের মুক্তির পথ খুলে দিয়েছেন। তারপর পর্দা আর আবরু ঘোচাতে মেয়েদের বিশেষ বেগ পেতে হয়নি। তাই স্বর্ণকুমারীর সঙ্গে, বা বলা যায় তার আগেই জ্ঞানদানন্দিনীর প্রসঙ্গ সেরে নেওয়া যেতে পারে। তবে এঁদের কাউকেই আলাদা করে দেখা যায় না কারণ এরা এসেছেন একই সময়ে, একই সঙ্গে এবং একই পরিবারের সদস্য হয়ে।

জ্ঞানদানন্দিনী মহর্ষি পরিবারের মেজো বৌ। স্বাভাবিকভাবেই বড় বৌয়ের কথা মনে পড়বে। দার্শনিক দ্বিজেন্দ্রনাথের স্ত্রী সর্বসুন্দরীর ভূমিকা ঠাকুরবাড়িতে খুব স্পষ্ট হয়ে উঠতে পারেনি। এক-একজনের লেখায় তিনি হঠাৎ-হঠাৎ উঁকি মেরে গেছেন চওড়া লাল-পেড়ে শাড়ির পাড় থেকে। ঘোমটার সীমানা বুঝি চিবুক ছাড়িয়ে উঠত না তাই তার ছোটখাট দেহটি একেবারে মিশে গেছে অন্দরমহলের থামের আড়ালে। তার স্বল্পায়ু জীবনের অধিকাংশই তো কেটেছে। পরের সেবায়। শাশুড়ী-ননদ-জা আত্মীয়স্বজন সবাইকে আপন করে নিতে নিতে এবং ছেলেমেয়েদের দেখাশোনা করতে করতে তিনি হারিয়ে গিয়েছিলেন বিরাট পরিবারের অসংখ্য মানুষের মধ্যে। সেকালে তো মেয়েদের জীবন এমনি করেই কাটত। কিন্তু জ্ঞানদানন্দিনী হারিয়ে ফুরিয়ে যাবার মতো মেয়ে ছিলেন না। তীক্ষ্ণ জেদী একরোখা মেজাজ ও অদম্য প্রাণ প্রাচুর্য নিয়ে তিনি মেয়েদের অগ্রগতির অনেকটা পথই খুলে দিয়েছিলেন। সব কাজে সহায় ছিলেন তাঁর স্বামী, প্রথম ভারতীয় আই. সি. এস. অফিসার সত্যেন্দ্রনাথ ঠাকুর।

জ্ঞানদানন্দিনীর বাবা গৌরীদান করেছিলেন সাত বছরের মেয়েকে। তখন তার অক্ষর-পরিচয় সবে শুরু হয়েছে গ্রামের পাঠশালাতে। তারপর সবার যা হয় তাই হল। পুতুলখেলার ঘর সাজাতে সাজাতে নিজেই একদিন মোমের পুতুলটি সেজে ঢুকে পড়লেন রাজবাড়ির মতো সদর-অন্দর-দেউড়ি-দালানওলা বিরাট বিশাল ঠাকুরবাড়িতে। পায়ে গুজরি-পঞ্চম, মাথায় এক গলা ঘোমটা। সেই ঘোমটাখানি হয়ত দুহাতে সন্তর্পণে তুলে ধরে ভীত-চকিত হরিণীর দুটি কাজলটানা ব্যাকুল চোখ বারবার পথ খুঁজেছিল পিছন ফিরে চাওয়ার। বলাবাহুল্য পায়নি। ঠাকুরবাড়ির কোন্ বৌ তার পূর্ব জীবনের সংস্কার মনে রাখতে পেরেছে? কিন্তু এগিয়ে যাবার জন্যে নতুন পথ খুঁজে পেয়েছিলেন জ্ঞানদানন্দিনী। সে একটা ইতিহাস!

শুধু প্রথম ভারতীয় সিভিলিয়ান অফিসার নয়, বাংলার স্ত্রী-স্বাধীনতার পথিকৃৎ সত্যেন্দ্রনাথ তার লজ্জাবতী বালিকাবধূটিকে সব বিষয়ে ভারতীয় নারীর আদর্শ করে তুলতে চেয়েছিলেন। বিলেতে গিয়ে তিনি দেখলেন স্বাধীনচেতা বিদেশিনীদের। ঘরে-বাইরে তাদের অবাধ বিহার—স্বচ্ছন্দ, সুন্দর, সাবলীল। কই কোথাও তো ছন্দপতন ঘটছে না। সব গেল সব গেল রব তুলে রসাতলে যাচ্ছে না বিলিতি সমাজ। তাহলে? যে মেয়েরা জীবন-উদ্যানের পুষ্প তাদের আলো-বাতাস থেকে বঞ্চিত করে ঘরের মধ্যে শুকিয়ে মারলে কি মঙ্গলের সম্ভাবনা?

সত্যেন্দ্র স্বপ্ন দেখতে শুরু করলেন। তিনি অন্তঃপুরের ঝরকা ভেঙে ফেলছেন, তার স্ত্রী এসেছেন কালাপানি পাড়ি দিয়ে বিলেতে। মন জাগবার আগেই মনের মানুষ বলে তার পরম আদরের জ্ঞেনুমণি যাকে বরণ করে নিয়েছেন, জগৎসভায় স্বয়ম্বরা হয়ে সকলের মধ্যে বেছে নিয়ে তাকেই আবার পরিয়ে দিচ্ছেন প্রেম-পারিজাতের বরণমালা। শুরু হল স্ত্রীকে গড়ে তোলার সাধনা। লেখা চলল চিঠির পর চিঠি।

তোমার মনে কি লাগে না আমাদের স্ত্রীলোকেরা এত অল্প বয়সে বিবাহ করে যখন বিবাহ কি তাহারা জানে না, ও আপনার মনে স্বাধীনভাবে বিবাহ করিতে পারে না। তোমার বিবাহ তো তোমার হয় নাই, তাহাকে কন্যাদান বলে। তোমার পিতা কেবল তোমাকে দান করিয়াছেন। সাগর পার থেকে আসা চিঠি জ্ঞানদানন্দিনীর কানে কানে শোনায় নতুন খবর :

আমরা স্বাধীনতাপূর্বক বিবাহ করিতে পারি নাই। আমাদের পিতামাতারা বিবাহ দিয়াছিলেন। জ্ঞানদানন্দিনীর বুক কাঁপে, কি বলতে চায় চিঠি, তুমি যে পর্যন্ত বয়স্ক, শিক্ষিত ও সকল বিষয়ে উন্নত না হইবে, সে পর্যন্ত আমরা স্বামী-স্ত্রী সম্বন্ধে প্রবেশ করিব না। এসব চিঠির উত্তরে জ্ঞানদানন্দিনী কি লিখতেন কে জানে? তার লেখা একটি চিঠিও পাওয়া যায়নি। সত্যেন্দ্রর চিঠিতে অন্তরঙ্গ সম্বোধন থাকলেও তার ভাষা কেতাবী ধরনের সাধুভাষা, হয়ত সে সময় দাম্পত্য পত্রালাপের ভাষাও সাধুভাষাই ছিল। হেমেন্দ্রনাথকেও সাধুভাষা ব্যবহার করতে দেখা গেছে, তবে রবীন্দ্রনাথ চিঠি লিখতেন মুখের ভাষায়। এক একটি চিঠিতে ঝরে পড়ত সত্যেরে মনের কথা :

এখানে জনসমাজে যাহা কিছু সৌভাগ্য, যাহা কিছু উন্নতি, যাহা কিছু সাধু সুন্দর, প্রশংসনীয়—স্ত্রীলোকদের সৌভাগ্যই তাহার মূল।…আমার ইচ্ছা তুমি আমাদের স্ত্রীলোকের দৃষ্টান্তস্বরূপ হইবে কিন্তু তোমার আপনার উপরই তাহার অনেক নির্ভর।

অবশ্য সত্যেন্দ্রর স্বপ্ন সফল হল না সেবারে। দেবেন্দ্রনাথ তাঁর প্রস্তাব সরাসরি নাকচ করে দিলেন। সব ইচ্ছে কি পূর্ণ হয়? বাড়ির বৌ রইলেন বাড়ির মধ্যেই। তাঁর পড়াশোনা নতুন করে শুরু হল সেজ দেওর হেমেন্দ্রনাথের কাছে। বাড়ির অন্য মেয়ে-সৌদের সঙ্গে লজ্জায় জড়সড় হয়ে ঘোমটা টেনে বসতেন জ্ঞানদানন্দিনী, হেমেন্দ্রর এক একটা ধমকে চমকে চমকে উঠতেন। এমনি করেই তার পড়া এগোল মাইকেলের মেঘনাদবধ কাব্য পর্যন্ত।

ইতিমধ্যে দেবেন্দ্রনাথ আর একটি উল্লেখযোগ্য কাজ করে ফেললেন। মেয়েদের শিক্ষা ঠিকমতো এগোচ্ছে না দেখে তিনি তাদের পড়াবার জন্যে ব্রাহ্মসমাজের নবীন আচার্য অযোধ্যানাথ পাকড়াশীকে গৃহশিক্ষক হিসাবে নিয়োগ করেন। সেই প্রথম একজন অনাত্মীয় পুরুষ ঠাকুরবাড়ির অন্তঃপুরে প্রবেশ করলেন। তিনি বাড়ির ছোট ছোট মেয়ে এবং বৌয়েদের স্কুলপাঠ্য বইলি বেশ যত্ন করে পড়াতেন। এসময় কেশবচন্দ্র সেন কিছুদিন সপরিবারে ঠাকুরবাড়িতে আশ্রয় নিয়েছিলেন। এভাবে মেয়েদের লেখাপড়া শেখানোর পদ্ধতিটি তার খুব ভাল লেগেছিল।

জ্ঞানদানন্দিনীর সাধনার নেপথ্য ইতিহাসটি খুব পরিষ্কার নয়। সবাই জানি, তিনি স্বামীর স্বপ্নকে সফল করেছিলেন। কিন্তু কী সেই স্বপ্ন? মেয়েরা পুরুষের পাশে এসে দাঁড়াবেন শিক্ষায় যোগ্যতায় সমমর্যাদা নিয়ে, এই তো। আজকের দিনে এর গুরুত্ব অনুভব করাও শক্ত। কারণ জ্ঞানদানন্দিনী যা করেছেন তা এমনিতে হয়ত খুব কষ্টকর নয় কিন্তু প্রথম কাজ হিসাবে অসম্ভব রকমের কঠিন। আজ যখন শুনি, তিনি প্রথম বাঙালিনী, যিনি বাড়ি থেকে বেরিয়েছিলেন তখন সবটাই হাস্যকর বলে মনে হয়। কী এমন শক্ত কাজ? সাহসেরই বা দরকার। কী? এ নিয়ে এত হৈচৈ করারই বা কী আছে? তবু হৈচৈ হয়েছিল।

সত্যেন্দ্রনাথ বিলেত থেকে ফিরলেন। তাঁর কর্মস্থল ঠিক হল মহারাষ্ট্র। এখন, সে যুগের নিয়ম ছিল ছেলেরা চাকরি করতে বাইরে যেত, ছেলের বৌ থাকত শ্বশুরবাড়িতে। সত্যেন্দ্র স্ত্রীকে কর্মস্থলে নিয়ে যাবার জন্যে অনুমতি চাইলেন। তিনি থাকবেন প্রবাসে, আর চার দেয়ালের অন্ধকূপে বন্দিনী হয়ে থাকবেন জ্ঞানদানন্দিনী? তাও কি হয়? অনেক দুঃখ পেয়েছেন তিনি। প্রগতিবাদী ছেলের বদলে তাকেই সহ করতে হয়েছে সমস্ত পারিবারিক অবাঞ্ছিত পরিস্থিতিকে। জ্ঞানদানন্দিনীকে লেখা সত্যেরে দু-একটা চিঠি থেকে আভাস পাওয়া যায় যে তার মায়ের সঙ্গে জ্ঞানদানন্দিনীর সম্পর্ক মাঝে মাঝে তিক্ত হয়ে উঠত। মহর্ষি-পত্নী তার মেজ বৌমাটির সঙ্গে কথাও বন্ধ করে দিতেন। সত্যেন্দ্রনাথের মেয়ে ইন্দিরার অপ্রকাশিত আত্মকথার পাণ্ডুলিপি শ্রুতি ও স্মৃতিতে দেখা যাবে সত্যেন্দ্র বিলেত গিয়েছেন বলে তার মা মেজ বৌয়ের গয়না দিয়ে তাঁর নিজের দুই মেয়ের বিয়ে দিয়েছিলেন। এই গয়না নেওয়ার প্রকৃত কারণ যাই হক না কেন, মনে হয় অর্থাভাব নয়, কারণ পরে মহর্ষি এ কথা শুনে খুন রাগ করেন ও জ্ঞানদানন্দিনীকে একটি হীরের কন্ঠি গড়িয়ে দেন। অবশ্য জ্ঞানদানন্দিনীর গয়নার ওপর কোন ঝোঁক ছিল না, তিনি শুধু ভালবাসতেন পলার গয়না পরতে। যাক সে কথা। এবার সত্যেন্দ্রর প্রার্থনা মঞ্জুর হল। মহর্ষি বাধা দিলেন না।

আপত্তি অবশ্য উঠেছিল। বাড়ির বৌ বাইরে যাবে কী? কোন বাড়ির বৌ কি গেছে? তা কি কখনো হতে পারে? বাড়ির পুরুষেরাও যে যখন তখন অন্দরমহলে যেতে পারে না। বিয়ের আগে পর্যন্ত বাইরেই থাকে, বিয়ের পর মশন একখানা আলাদা শোবার ঘর হয় তখন রাতে শুতে আসে। নাহলে বহির্জগতের ছোঁয়া-বঁচানো অন্তঃপুরের শুচিতা নষ্ট হবে যে। এই সাবেকী কালের নড়চড় হত না কোন বাড়িতে। ধিক্কারের ঘূর্ণীঝড় উঠল। মা গেকার মতো আরেকবার ধমক লাগালেন ছেলেকে, তুই মেয়েদের নিয়ে মেমেদের মতে গড়ের মাঠে ব্যাড়াতে যাবি নাকি? সত্যেরে মনে হয় কীই-বা এমন ক্ষতি হয় তাতে? এই পর্দা প্রথা আমাদের নিজস্ব নয়, মুসলমানী রীতির অনুকরণ। তাছাড়া ঠাকুরবাড়িতে কয়েদখানার মতো নবাবী বন্দোবস্তের দরকারই বা কী?

তাঁর এসব ভাল লাগে না। লাগে না বলেই তো কয়েক বছর আগে সেই হাস্যকর-হালকা অথচ দুঃসাহসিক কাজটি করতে পেরেছিলেন। এখন ভাবলেও হাসি পায়। বিয়ের কিছুদিন পরের কথা। সত্যেন্দ্রের তখন অল্প বয়স–ঘোর র‍্যাডিক্যাল। সব কাজের সঙ্গী প্রাণের বন্ধু মনোমোহন ঘোষ। হঠাৎ একদিন তার ইচ্ছে হল বন্ধুর স্ত্রীকে দেখবার। এমন কি অপরাধ?

সত্যেন্দ্র রাজী। কিন্তু দেখাবেন কি করে? জ্ঞানদানন্দিনীর বাইরে যাবার জো নেই, অন্য পুরুষও অন্দরে আসতে পারবে না। এমন কি পুরুষ ভৃত্যও না। তাহলে? দিনরাত অনেক শলা-পরামর্শ ফন্দি-ফিকির খাটিয়ে শেষে একটা ব্যবস্থা হল। সে যেমনি দুঃসাহসিক তেমনি রোমাঞ্চকর। জ্ঞানদানন্দিনীর মুখেই শোনা যাক:

ওঁরা দুজনে পরামর্শ করে একদিন বেশি রাতে সমান তালে পা ফেলে বাড়ির ভেতরে এলেন। তারপরে উনি মনোমোহনকে মশারির মধ্যে ঢুকিয়ে দিয়ে নিজে শুয়ে পড়লেন। আমরা দুজনেই মশারির মধ্যে জড়োসড়ো হয়ে বসে রইলুম; আমি ঘোমটা দিয়ে একপাশে আর তিনি ডোম্বলদাসের মতো আরেক পাশে। লজ্জায় কারো মুখে কথা নেই। আবার কিছুক্ষণ পরে তেমনি সমান তালে পা ফেলে উনি তাকে বাইরে পার করে দিয়ে এলেন।

খুব সহজ ছিল না ব্যাপারটা। দেউড়ি দালান পার হয়ে সবার চোখ এড়িয়ে বন্ধুকে আনতে হয়েছিল অন্দরমহলে। পদে পদে ধরা পড়ার সম্ভাবনা সত্ত্বেও সত্যেন্দ্র যে এতদুর এগিয়েছিলেন সে শুধু তিনি প্রগতিবাদী ছিলেন বলে।

এবার তো মহর্ষি স্বয়ং অনুমতি দিয়েছেন। মন খুশিতে টইটুম্বুর। প্রাণে খুশির তুফান উঠেছে। সত্যেন্দ্র স্ত্রীকে বোম্বাই নিয়ে যাবেন, স্ত্রী-স্বাধীনতার দ্বার খোলবার এক মহা সুযোগ উপস্থিত। গোছগাছ শুরু হয়ে গেল। কিন্তু জ্ঞানদানন্দিনী কি পোশাক পরে বাইরে বেরোবেন? ঘরের কোণে বন্দী মেয়েদের সাজপোশাক নিয়ে এতদিন কেউ মাথা ঘামায়নি, শুধু একখানি শাড়ি পরলেই চলে যেত। নিজের পুরনো কথা বলার সময় জ্ঞানদানন্দিনী জানিয়েছেন, শীতকালে তারা এই শাড়ির ওপর জড়াতেন একটি করে চাদর। পুরাতনী থেকে আমরা এরকম আরো অনেক খুঁটিনাটি খবর পেয়েছি। কিন্তু মনে প্রশ্ন থেকে গেছে, এতদিন পর্যন্ত বাঙালী মেয়েরা অন্য কোন পরিচ্ছদ ব্যবহার করতেন না কেন? সত্যিই কি তাঁরা শাড়ি ছাড়া আর কিছুই পরতেন না। বাংলাদেশে বেশ অনেকদিন ধরেই মুসলমান শাসন শুরু হয়েছিল। নবাব-হারেমের দু-একটা ছবিতে মেয়েদের বেশ রুচিশোভন পোশাক পরতেও দেখা গেছে। সেই পোশাকটি কি বাঙালী মেয়েরা গ্রহণ করতে পারতেন না? সাধারণতঃ দেখা গেছে বাঙালী পুরুষদের চলায়-বলায় পোশাকে-আশাকে রুচিতে-বিলাসে সর্বত্রই মুসলমানী ছাপ পড়েছে। তাহলে মেয়েরা কেন বাদ পড়লেন? পেশোয়ার্জের ব্যবহার তো ছিল। যাই হোক, জ্ঞানদানন্দিীর জন্যে তখনকার মত ফরাসী দোকানে ফরমাশ দিয়ে বানানো হল কিম্ভুতকিমাকার ওরিয়েন্টাল ড্রেস। পরাও খুব কষ্টকর। জ্ঞানদাননিনী তো নিজে নিজে পরতেই পারলেন না। তবু ঐ পরেই কানরকমে তৈরি হলেন! প্রথমবারের এই পরিচ্ছদ-সমস্যা জ্ঞানদানন্দিনীকে এত বিব্রত করেছিল বলেই তিনি মেয়েদের সাজপোশাক নিয়ে ভাবতে শুরু করেন। আধুনিক বাঙালী মেয়েদের রুচিশোভন সাজটি তার সেই চিন্তার ফসল। সে আরো পরের কথা। আপাততঃ যাত্রার কথাটা সেরে ফেলি।

সত্যেন্দ্র প্রস্তাব করলেন, বাড়ি থেকেই গাড়িতে ওঠা যাক। এবারও সবাই ছি ছি করে উঠতে দেবেন্দ্রনাথও রাজী হলেন না। সেকালে মেয়েদের গাড়ি চড়া ভারি নিন্দনীয় ব্যাপার ছিল। তিনি বললেন, মেয়েদের পালকি করে যাবার নিয়ম আছে তাই রক্ষা করা হোক। অসূর্যস্প কুলবধু কর্মচারীদের সামনে পায়ে হেঁটে দেউড়ি পেরোবে এতটা ভাবতে বোধহয় মহর্ষিরও ভাল লাগেনি। সাবেকী পালকি জ্ঞানদানন্দিনীকে বোম্বাইগামী জাহাজে চাপিয়ে দিলে। এই শেষ। এরপরে তিনি আর কোনদিন পালকি চাপেননি।

বোম্বাইয়ে পুরো দুবছর কাটিয়ে অপরূপ বেশবাসে সেজে জ্ঞানদানন্দিনী আবার যেদিন কলকাতার মাটিতে পা দিলেন প্রকৃতপক্ষে সেই দিনটিতেই শুরু হল বাঙালী মেয়েদের জয়যাত্রা। তখন সবে সত্তরের দশক আরম্ভ হয়েছে! সর্বত্র বইছে এক উন্মাদনার হাওয়া। তবে বাংলাদেশে পর্দার কড়াকড়ি শিথিল হতে সময় লেগেছিল। ততদিন যে জ্ঞানদানন্দিনীকে একাই সব লাঞ্ছনা-গঞ্জনা সইতে হয়েছে তা নয়, তার সঙ্গী হয়েছিলেন ঠাকুরবাড়ির অন্য মেয়েরা, এবং কয়েকজন ব্রাহ্মিক। মহিলা। অবশ্য যেদিন তিনি বোম্বাই থেকে ফিরলেন সেদিন তার পাশে কেউ ছিল না। স্বর্ণকুমারী সেই মুহূর্তটিকে একটি কালির আঁচড়ে জীবন্ত করে তুলেছেন, ঘরের বৌকে মেমের মতো গাড়ি হইতে সদরে নামিতে দেখিয়া সেদিন বাড়িতে যে শোকাভিনয় ঘটিয়াছিল তাহা বর্ণনার অতীত। বাড়ির পুরনো চাকরদের চোখ দিয়ে দরদর করে নেমে এসেছিল অশ্রুধারা। নিজের পুরনো ঘরটিতে ফিরেও জ্ঞানদানন্দিনী যেন একঘরে হয়ে রইলেন। সমবেদনায় করুণ স্বর্ণকুমারী দেখতেন বাড়ির অন্যান্য মেয়েরা বধূঠাকুরাণীর সঙ্গে অসংকোচ খাওয়া-দাওয়া করিতে বা মিশিতে ভয় পাইতেন। এই রকম পবৃিস্থিতিতে জ্ঞানদানন্দিনীর আচার-আচরণ দুঃসাহসিক বৈকি।

তিনি সত্যন্দ্রনাথের কথামতো গেলেন লাটভবনে, নিমন্ত্রণ রাখতে। সেখানে তাকে দেখে সবাই প্রথমে ভেবেছিলেন ভূপালের বেগম, কারণ তিনিই তখন একমাত্র বেরোতেন। ভোজসভায় ছিলেন পাথুরেঘাটার প্রসন্নকুমার ঠাকুর। তিনি তো ঘরের বৌকে প্রকাশ্য রাজসভায় আসতে দেখে রাগে-লজ্জায় দৌড়ে পালিয়ে গেলেন। আগে কোনো হিন্দু রমণী গভর্ণমেন্ট হাউসে যাননি। এখনই বা যাবার দরকার কি ছিলো? সে কথা সনাতনপন্থীরা বুঝবেন কি করে? বুঝেছিলেন সত্যেন্দ্রনাথ। তাই পুলকিত হয়ে লিখেছেন, সে কী মহাব্যাপার! শত শত ইংরেজ মহিলার মাঝখানে আমার স্ত্রী সেখানে একমাত্র বঙ্গবালা! যতই হৈচৈ হোক না কেন রোগটা বড় ছোঁয়াচে। একটি দুটি করে আরো দরজা খুলতে শুরু করল।

জ্ঞানদানন্দিনী যে শুধু মেয়েদের পথের কাঁটা ঘুচিয়েছিলেন তা নয়, পুরুষের মনের বাধাও অনেকটা দূর করেছিলেন। প্রত্যক্ষ প্রমাণ জ্যোতিরিন্দ্রনাথ। সমবয়সী এই দেওরটি তার অত্যন্ত স্নেহের পাত্র। কিন্তু প্রথমে জ্যোতিরিন্দ্র নব্যপন্থী ছিলেন না বরং একটু রক্ষণশীল ছিলেন বড় দাদা দ্বিজেন্দ্রনাথের মতো। কেশব সেনকে ব্যঙ্গ করে প্রহসন লেখার মধ্যেই তার মনোভাবটি ধরা পড়েছিল কিন্তু মেজ দাদা আর মেজ বৌঠানের সাহচর্য তাঁকে নিয়ে গিয়েছিল নতুন পথে।

জ্ঞানদানন্দিনী আমাদের ঠিক কী দিয়েছিলেন সেটা সবার কাছে তেমন স্পষ্ট নয়। বাঙালী নারীর পথিকৃৎ হবার জন্যে তাকে আরো এগোতে হয়েছে। তিনি একাকিনী দু-তিনটি শিশু নিয়ে সাত সমুদ্র পাড়ি দিয়ে বিলেত গিয়েছিলেন। যেখানে একলা যেতে ছেলেদেরও বুক কেঁপে উঠত। কালাপানি পার হয়ে বিলেত যাওয়া, বাপরে সে কি সহজ কথা! দু-দুজন কৃতী পুরুষ, রামমোহন আর দ্বারকানাথ গেলেন বিলেতে, কিন্তু ফিরলেন কই? সত্যেন্দ্রকে পাঠাবার সময়েই সবাই ভেবে অস্থির হয়েছিল, আর এ তো বাড়ির বৌ! যৎসামান্য ইংরেজী বিদ্যের পুজি নিয়ে সে কালাপানি পাড়ি দিলে কোন্ সাহসে? প্রসন্নকুমারের পুত্র প্রথম বাঙালী ব্যারিষ্টার জ্ঞানেন্দ্রমোহন ঠাকুর জাহাজঘাটে এসে তো হতবাক। অস্ফুটে শুধু বললেন, সত্যেন্দ্র এ কী করলেন? নিজে এলেন না।

এক এক সময় মনে হয় জ্ঞানদানন্দিনী বিলেত গিয়েছিলেন কেন? শুধু সত্যেন্দ্রর সেই অচরিতার্থ যৌবন স্বপ্ন সফল করবার জন্যে, না সব বিষয়ে ভারতীয় নারীর আদর্শ হয়ে ওঠার জন্যে? বেশ অবাক লাগে যখন শুনি তিনি বিলেত গিয়েছিলেন শুধু স্ত্রী-স্বাধীনতার সঙ্গে পরিচিত হতে দেশে ফিরি তিনি তার অভিজ্ঞতাকে কাজে লাগাতে পেরেছিলেন। খুলে দিয়েছিলেন সম্ভাবনাময় নতুন উষার স্বর্ণদ্বার। অবশ্য এ কথার অর্থ এই নয় যে আর কেউ সে সময় কিছুমাত্র করেননি বা চালচলনে বিদেশিয়ানা নিয়ে আসেননি। রামবাগানের দত্ত পরিবারের তরু ও অরু লেখাপড়া শিখতে বিদেশে গিয়েছিলেন। গিয়েছিলেন মেরী কার্পেন্টারের অনুরোধে রাজকুমারী বন্দ্যোপাধ্যায়ও। আরো দু-চার জনকে খুঁজে পাওয়া যাবে না তা নয়, তবে তারা বাঙালী-সংস্কৃতির সঙ্গে ঠিক যেন মিশে যাননি। পুরোপুরি সাহেব হয়ে-যাওয়া পরিবারগুলোর সঙ্গে দেশের হৃদয়ের যোগ কম ছিল। তাই আন্দোলন সৃষ্টি করেছিলেন জ্ঞানদানন্দিনী।

সর্বপ্রথম ঠাকুরবাড়ির মেয়েদের সঙ্গে যোগ দিয়েছিলেন ব্রাহ্ম সমাজের মেয়েরা। কিছুদিন ধরেই ব্রাহ্ম সমাজ-মন্দিরে মেয়েরা যোগ দেবার অনুমতি পেয়েছেন। তাঁরা বসতেন চিকের আড়ালে স্বতন্ত্র আসনে। হঠাৎ ১৮৭২ সাল নাগাদ কয়েকজন আচার্যকে জানালেন তারা তাদের বাড়ির মেয়েদের নিয়ে পর্দার বাইরে বসতে চান। যেমন কথা তেমন কাজ। অন্নদাচরণ খাস্তগির ও দুর্গামোহন দাস তাদের স্ত্রী ও মেয়েদের নিয়ে এসে বসলেন সাধারণ উপাসকদের মধ্যে, পুরুষদের সঙ্গে। এতে অন্যান্য ব্রাহ্মদের আপত্তি ছিল না। কেশব সেন বাধ্য হয়ে পর্দা ছাড়াই মেয়েদের উপাসনা-মন্দিরে বসবার অনুমতি দিলেন। এইভাবে প্রকাশ্যে পর্দার বিরোধিতা শোনা গেল। জগদানন্দ মুখোপাধ্যায় ১৮৭৯ সালে প্রিন্স অব ওয়েলসের সঙ্গে নিজের পরিবারের মহিলাদের সাক্ষাতের অনুমতি দিলেন। সে নিয়েও কত কাণ্ড হল!

বাইরে বেরোবার জন্যে জ্ঞানদানন্দিনী বাঙালী মেয়েদের দিলেন একটি রুচিশোভন সাজ। অবশ্য দেশী ধাঁচে শাড়ি পরা যে খারাপ ছিল তা নয় তবে তাতে সৌষ্ঠব ছিল না। বোম্বাইয়ে গিয়ে তিনি প্রথমেই জবরজং ওরিয়েন্টাল ড্রেস বর্জন করে পাশী মেয়েদের শাড়ি পরার মিষ্টি ছিমছাম ধরনটি গ্রহণ করেন। নিজের পছন্দমতো একটু অদল-বদল করে জ্ঞানদানন্দিনী এই পদ্ধতিটাকেই বজায় রাখলেন। স্বর্ণকুমারীর ছোট মেয়ে সরলা দেখেছিলেন ছোটবেলায় তার মা এবং মেজমামী দেশে ফিরলেন নতুন ধাঁচের শাড়ি পরে, বাড়িশুদ্ধ সব মেয়েই সেটি গ্রহণ করতে ব্রাহ্মিকারাও তার প্রতি আকৃষ্ট হলেন।

বোম্বাই থেকে অনা বলে ঠাকুরবাড়িতে এই শাড়ি পরার ঢংয়ের নাম ছিল বোম্বাই দস্তুর কিন্তু বাংলাদেশে তার নাম হল ঠাকুরবাড়ির শাড়ি। জ্ঞানদানন্দিনী বোম্বাই থেকে ফিরে এ ধরনের শাড়ি-পরা শেখানোর জন্যে কাগজে বিজ্ঞাপন দিয়েছিলেন। অনেক সম্ভ্রান্ত ব্রাহ্মিকা এসেছিলেন শাড়ি-পরা শিখতে, সবার আগে এসেছিলেন বিহারী গুপ্তের স্ত্রী সৌদামিনী। অবশ্য তখনও তার বিয়ে হয়নি। শাড়ির সঙ্গে জ্ঞানদানন্দিনী শায়া-সেমিজ-ব্লাউজ-জ্যাকেট পরাও প্রচলন করেন। এ প্রসঙ্গে মনে রাখা দরকার, অন্যান্য ব্রাহ্মিকারাও বাইরে বেরোবার সাজের কথা ভাবছিলেন। মনোমোহন ঘোষের স্ত্রী সরাসরি গাউন পরতেন। ঠাকুরবাড়িতেও ইন্দুমতী পরতেন গাউন। কিন্তু সব বাঙালিনী গাউন পরতে রাজী নন বলে দুর্গামোহন দাসের স্ত্রী ব্ৰহ্মময়ী পরতেন একটা জগাখিচুড়ি-মার্কা পোশাক। জ্যোতিরিন্দ্রনাথ যেমন স্বদেশী পোশাক তৈরি করবার জন্যে পাজামাতে কেঁচা আর সোলার টুপির সঙ্গে পাগড়ির মিশ্রণ ঘটিয়েছিলেন তেমনি ব্রাহ্মিকার মেমসাহেবদিগের গাউনের উপরিভাগে আঁচল জুড়িয়া এক প্রকার আধা বিলাতি আধ দেশী। পরিচ্ছদ সৃষ্টি করেন। বোম্বাই দস্তুর নতুনত্বের গুণে সবাইকে আকৃষ্ট করল। তবে এতে মাথায় আঁচল দেওয়া যেত না বলে প্রগতিশীলার একটি ছোট টুপি পরতেন। তার সামনেটা মুকুটের মতো, পেছনে একটু চাদরের মতো কাপড় ঝুলত। জ্ঞানদানন্দিনীর টুপি পরা ছবি আমি দেখিনি তবে মাথায় শাড়ির আঁচলে ছোট্ট ঘোমটা টানা প্রবর্তন করেন তার মেয়ে ইন্দিরা, তখন সাবেকী ধরনে শাড়ি পরার গৌরব আবার ফিরে এসেছে।

এখনকার আধুনিকারা যে ভাবে শাড়ি পরেন সেই ঢংটি জ্ঞানদানন্দিনীর দান নয়। বোম্বাই দস্তুর-এ যেসব অসুবিধে ছিল সেগুলো দূর করবার চেষ্টা করেন কুচবিহারের মহারাণী কেশব-কন্যা সুনীতি দেবী। তিনি শাড়ির ঝোলানো অংশটি কুঁচিয়ে ব্রোচ আটকাবার ব্যবস্থা করেন। তার সঙ্গে তিনি মাথায় পরতেন স্প্যানিশ ম্যাটিলাজাতীয় একটি ছোট্ট ত্রিকোণ চাদর। তার বোন ময়ূরভঞ্জের মহারাণী সুচারু দেবী দিল্লীর দরবারে প্রায় আধুনিক শাড়ি পরার টংটি নিয়ে আসেন। এটিই নাকি তার শ্বশুরবাড়ির শাড়ি পরার সাবেকী ঢং। বাস্তবিকই উত্তর ভারতের মেয়েরা, হিন্দুস্থানী মেয়েরা এখনও যে ভাবে সামনে আঁচল এনে সুন্দর করে শাড়ি পরে তাতে ঐ ধরনটিকেই বেশি প্রাচীন মনে হয়। বাঙালী মেয়ের অধিক স্বাচ্ছন্দ্যগুণে এটিকেই গ্রহণ করলেন তবে জ্ঞানদানন্দিনীর আঁচল বদলাবার কথাটি তারা ভোলেননি তাই এখন আঁচল বাঁ দিকেই রইল। কিছুদিন মেমেদের হব স্কার্টের অনুকরণে হব করে শাড়ি পরাও শুরু হয় তবে অত আঁটসাট ভাব সকলের ভাল লাগেনি। শাড়ির সঙ্গে সঙ্গে উঠল নানান। ফ্যাশানের লেস দেওয়া জ্যাকেট ও ব্লাউজ। রবীন্দ্রনাথের ভাষায়, বিলিতি দরজীর দোকান থেকে যত সব ছাঁটকাটা নানা রঙের রেশমের ফালির সঙ্গে নেটের টুকরো আর খেলো লেস মিলিয়ে মেয়েদের জামা বানানো হত।

এই বিচিত্রবেশিনীরা সাধারণ হিন্দু সমাজের চোখে ছিলেন যোগেন বসুর মডেল ভগিনীর মতো বিচিত্র জীব। জ্ঞানদানন্দিনী নিজে অবশ্য এ বিষয়ে কিছু বলেননি তবে তার দুই ননদ সৌদামিনী আর স্বর্ণকুমারীর রচনা থেকে জানা যায় তাদের পথ মোটেই কুসুমাস্তীর্ণ ছিল না। তারা যখন সেমিজ, জামা, জুতো, মোজা পরে গাড়ি চড়ে বেড়াতে বেরোতেন তখন চারদিকে ধিক্কারের ঘূর্ণীঝড় উঠত। শুধু ধিক্কার নয়, শাড়ির সঙ্গে জ্যাকেট পরে বাইরে বেরোলে তাদের বিলক্ষণ হাস্যভাজন হতেও হত। হিন্দুদের সেলাই-করা জামা পরে কোন শুভ কাজ করতে নেই। তাই পোশাক-পরিচ্ছদ নিয়ে আরো কিছুদিন গণ্ডগোল চলেছিল। তবে যুগ বদলেছে, তাই মুসলমানী পোশাককে তাঁরা যেমন অন্তঃপুরে ঢুকতে দেননি তেমনি করে ব্রাহ্মিকাদের পোশাককে বাধা দিতে পারলেন না। নতুন ধরনের শাড়ি পরার ঢংএর নামই হয়ে গিয়েছিল ব্রাহ্মিক। শাড়ি। তবে বিয়ে-টিয়ের সময় সনাতন নিয়মই চলত। গগনেন্দ্রনাথ ১৯০১ সালে যখন তাঁর ন বছরের মেয়ে সুনন্দিনীকে সম্প্রদান করতে যাচ্ছেন তখনও বরপক্ষের একজন আপত্তি জানিয়ে বলেন, সেলাই-করা কাপড় পরে তো মেয়ে সম্প্রদান হয় না। গগনেন্দ্র যখন গৌরীদানই করছেন তখন আর নিয়মটুকু মানতে দোষ কি? গগনেন্দ্র জানতেন সে কথা। ঠাকুরবাড়ির ছেলে হলেও তাঁর বাড়িতে সনাতন হিন্দু নিয়মই চলে আসছে। তাই তিনি স্বভাবসিদ্ধ উদারভঙ্গিতে হেসে বলেছিলেন, দেখুন মেয়ের গায়ে কোন জামা নেই। সত্যিই তো! সমবেত বরযাত্রীরা দেখলেন মেয়ের গায়ে জামা নেই বটে তবে শাড়িটা এমন কায়দায় পরানো হয়েছে যে জামা নেই বোঝাই যায়নি। শিল্পী গগনেন্দ্র নিজস্ব পরিকল্পনা দিয়ে মেয়েকে সাজিয়েছিলেন। কনে সাজাবার এই ঢংটি সবার খুব পছন্দ হয়েছিল।

বেশবাসে আধুনিকতা আনা ছাড়াও জ্ঞানদানন্দিনী আর দুটি জিনিসের প্রবর্তক—বিকেলে বেড়াতে বেরোনো আর জন্মদিন-পালন। এ দুটিই তিনি বিলেত থেকে আমদানী করেছিলেন। ছেলে ও মেয়ের জন্মদিনে বাড়ির সমস্ত ছোটরা নিমন্ত্রিত হত। আমোদ-প্রমোদে জ্ঞানদানন্দিনী চাকরবাকরদেরও বঞ্চিত করতেন না। সুরেন্দ্রের জন্য বর্ষাকালে তাই সে সময় বাড়ির সব ভৃত্যের জন্যে আসত ছাতা আর ইন্দিরার জন্ম শীতকালে তাই পরিচারকেরা পেত একখানি করে কম্বল। জ্ঞানদানন্দিনীর উৎসাহেই সরলা-হিরন্ময়ীরা প্রথম রবীন্দ্র জন্মোৎসব পালন করেন সত্যেরে ৪নং পার্ক টীটের বাড়িতে। সেই উৎসবের দিন জানা গেল জ্যোতিরিন্দ্রের জন্মদিনও কাছাকাছি কোন এক তারিখে। পরের বছর থেকে জ্ঞানদানন্দিনীর উৎসাহে তারও জন্মদিন পালনের ব্যবস্থা হয়। তবে এই অনুষ্ঠানে জন্মতিথির সংখ্যা অনুসারে মোমবাতি জ্বালানো শুরু করেন স্বর্ণকুমারীর বড় মেয়ে হিরন্ময়ী।

জ্ঞানদানন্দিনীর ব্যক্তিস্বাতন্ত্রের আরো একটু পরিচয় আছে। সত্যেন্দ্র বোম্বাই থেকে কলকাতায় ফিরে আসার পরে জ্ঞানদানন্দিনী একান্নবর্তী ঠাকুরবাড়িতে যৌথ পরিবারের একজন হয়ে থাকতে চাননি। তিনিই প্রথম জোড়াসাঁকোর বাড়ি ছেড়ে অন্য বাড়িতে উঠে যান স্বামী-পুত্র-কন্যাকে নিয়ে। বাঙালী জীবনে এর আগে এই স্বাতন্ত্র্য দেখা যায়নি। তখন মেয়ের বিয়ে হলে জামাইকেও ঘরজামাই করে রাখা হত এবং তাদের জন্যে আলাদা মহলের ব্যবস্থা হত। আমাদের আধুনিক জীবনের পারিবারিক ছকটি জ্ঞানদানন্দিনীই নিজের হাতে গড়ে দিলেন। এটি ভাল না মন্দ সে বিতর্কে না গিয়েও বলতে পারি পারিবারিক গণ্ডির ছোট সীমাকেই আমরা ভালবাসতে শুরু করেছি। তবে জোড়াসাঁকো থেকে চলে এলেও ঠাকুরবাড়ির সঙ্গে জ্ঞানদানন্দিনীর যোগ কিছুমাত্র শিথিল হয়নি। পারিবারিক যে কোন কাজে তার অপরিসীম উৎসাহ ছিল। যখন যার যা প্রয়োজন নিঃসংকোচে গিয়ে দাঁড়িয়েছেন মেজ বৌয়ের কাছে। কিশোর। রবীন্দ্রনাথ বিলেতে গিয়ে উঠবেন কার কাছে? না, মেজ বৌঠানের কাছে। জোড়াসাঁকোয় প্রফুল্লময়ী বুক-ভরা কান্নার বোঝা নামিয়ে হাল্কা হবেন কার কাছে? না, মেজদির কাছে। রেণুকা অসুস্থ, মাতৃহীন দুটি শিশুকে রবীন্দ্রনাথ কোথায় রেখে যাবেন? কেন, জ্ঞানদানন্দিনী তো রয়েছেন। অবনীন্দ্রকে ছবি আঁকার উৎসাহ দিলেন কে? কে আবার, জ্ঞানদানন্দিনী! প্রতিমার জন্যে আর্টের টিচার খুঁজে দেবেন কে? জ্ঞানদানন্দিনী ছাড়া আর কে আছে? সব দায়িত্ব সব ভার তাকে দিয়ে সবাই নিশ্চিন্ত।

শুধু বড়দের নয়, ছোটদের কথাও অত বড় বাড়িতে জ্ঞানদানন্দিনী ছাড়া আর কেই-বা ভেবেছেন। তাদের মধ্যে সুপ্ত প্রতিভার সন্ধান করে তাদের জাগাবার চেষ্টাও তিনি কম করেননি। বাড়ির ছোট ছেলেমেয়েদের জড়ো করে তিনি একটা পত্রিকা বার করলেন বালক নামে। সুধীন্দ্র, বলে, সরলা, প্রতিভা, ইন্দিরা অনেকেরই সাহিত্যচর্চার প্রথম হাতে-খড়ি হয় বালকে। স্বয়ং সম্পাদিকা অর্থাৎ জ্ঞানদানন্দিনী নিজে অবশ্য লিখেছিলেন একটিমাত্র রচনা। তিনি কনটেমপোরারি রিভিউ থেকে ডেবাগোরিও মোগ্রিয়েভিং-এর সাইবেরিয়া থেকে পলায়নের রোমাঞ্চকর কাহিনীটি অনুবাদ করেন আশ্চর্য পলায়ন নামে।

শুধু পত্রিকা প্রকাশ নয়, ছেলেদের ছবি আঁকায় উৎসাহ দিয়ে জ্ঞানদানন্দিনী বসিয়েছিলেন একটা লিথো প্রেস। বেশির ভাগ খরচ দিতেন তিনি নিজে। ছোটদের জন্যে তার আরো একটি দান আছে। নাতি সুবীরেন্দ্রের জন্যে দুখানি রূপকথাকে নাট্যরূপ দিয়েছিলেন তিনি। সাত ভাই চম্পা ও টাক ডুমাডুম। রূপকথাকে নাট্যরূপ দেওয়া শক্ত, বিশেষ করে দ্বিতীয়টিকে। কিন্তু শিশুমনে এর আবেদন অপরিসীম। জ্ঞানদানন্দিনী এত সুন্দর করে শিয়ালের নাক কাঁটার গল্প বলেছেন যে বহুশ্রুত গল্পটিকেও বারবার শুনতে ইচ্ছে করে, আর মনে হয়, আহা, সব রূপকথাগুলো কেন র হাতের ছোঁয়ায় নতুন হয়ে উঠল না। শিয়াল যখন বলে—ওগো না গো না-তোমার কিছু ভয় নেই—আর যদিই বা একটু আধটু কেটে যায়, তাতে আমার চেহারা খারাপ হবে না। আমার ত আর মানুষের মতো ন্যাড়া নাক নয়, কাঁটার দাগ রোঁয়ার ভিতরে দিব্যি ঢাকা থাকবে। তখন শিশুমন কল্পনার সিঁড়ি বেয়ে উধাও হয়ে যায় রূপকথার রহস্যজগতে। তাই নাকুর বদলে নরুণ পেলুম তাকডুমা ডুমডুম তাদের কাছে হয়ে ওঠে আদি কবিতা।

ছোটদের কথা এমন করে খুব কম মায়েরাই ভেবেছেন। জ্ঞানদানন্দিনীর অন্যান্য প্রবন্ধেও দেখা যাবে শিশুচিন্তার প্রাধান্ত। তার লেখা তিনটে প্রবন্ধ ভারতী পত্রিকায় প্রকাশিত হয়। তার মধ্যে একটির নাম কিন্টার গার্ডেন। দ্বিতীয়টির নাম স্ত্রীশিক্ষা। অর্থাৎ প্রথমটি শিশুশিক্ষা ও দ্বিতীয়টিতে নারীশিক্ষার কথা বলা হয়েছে। তবে স্ত্রীশিক্ষারও মূল উদ্দেশ্য জ্ঞানদানন্দিনীর মতে আদর্শ জননী হওয়া। শিশুকেন্দ্রিক রচনা ছাড়াও তার লেখা আরও দুটি রচনা আমরা পাই। একটি মারাঠী রচনার বঙ্গানুবাদ ভাউ সাহেবের খবর—তৃতীয় পানিপথের যুদ্ধের পটভূমিতে লেখা কাহিনী। আর একটি হল ইংরাজনিন্দা ও স্বদেশানুরাগ নামক প্রবন্ধ।

জ্ঞানদানন্দিনী ভারতের প্রথম আই. সি. এস অফিসারের স্ত্রী, উচ্চবিত্ত ইঙ্গবঙ্গ সমাজের সঙ্গে তার হৃদ্যতা, নিজেও বিলেত ঘুরে এসেছেন। সুতরাং বিলিতি হাব-ভাব রুচি-চিন্তার সঙ্গে তার মিল হওয়াই স্বাভাবিক। অথচ জ্ঞানদানন্দিনী নিজে সাহেবিয়ানা বেশি পছন্দ করতেন না। একটি নারীর পূর্ণ আত্মবিকাশের জন্য যতখানি পশ্চিমী রীতি গ্রহণ করা উচিত তিনি ঠিক ততটুকুই নিয়েছিলেন। তাই গড়ের মাঠে হাওয়া খেতে কিংবা জামা-জুতো পরে গাড়ি চড়ে বেড়াতে তার যেমন আপত্তি ছিল না তেমনি বাধা ছিল না স্বদেশের মঙ্গল চিন্তায়। তবে তিনি ভুয়ো ইংরেজনিন্দা করে সারাজীবন ইংরেজের অনুগ্রহ ভিক্ষা করে কাটিয়ে দেওয়াকে তীব্র ভাষায় ভৎসনা করে স্বদেশবাসীকে নিজের পায়ে দাঁড়াতে বলেছেন। তিনি জানতেন, আমাদের জাতীয় যথার্থ স্থায়ী উন্নতি আমরা ভিন্ন কাহারও দ্বারা সাধিত হইতে পারে না।

জ্ঞানদানন্দিনীকে আমরা সব কাজেই এগিয়ে আসতে দেখেছি। এমনকি অভিনয় করার বেলায়ও তার ডাক পড়ত। সব কাজেই তার অনায়াস পটুতা। দেওরদের মাথায় পাগড়ি বেঁধে দেওয়ার জন্যে যেমন তাঁর ডাক পড়ত তেমনি সবাই তাকে খুঁজত নাটকের মহল দেবার সময়। ঠাকুরবাড়িতে নাটক-পাগল লোকের অভাব ছিল না। সেখানে কথায় কথায় থিয়েটার দেবার বা নাটকাভিনয়ের কথা শোনা যায়। মনে হয় বাঈ-নাচের পরিবর্তে এটি গৃহীত হয়েছিল। জোড়াসাঁকো থিয়েটার উঠে গেল, জোড়াসাঁকোর উঠোনের ঘরোয়া অভিনয় বন্ধ হল তবু নাট্যামোদী মানুষের মন চাপা রইল না। তাই নতুন করে যখন রাজা ও রাণী লেখা হল তখন জ্ঞানদানন্দিনীর বাড়িতেই বসল নাটকের মহলা। ভূমিকাও প্রায় ঠিকঠাক :

রাজা বিক্রম–রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর
রাণী সুমিত্রা—জ্ঞানদানন্দিনী দেবী
দেবদত্ত–সত্যেন্দ্রনাথ ঠাকুর
নারায়ণী—মৃণালিনী দেবী
কুমার–প্রমথ চৌধুরী
ইলা—প্রিয়ম্বদা দেবী

অন্যান্য ভূমিকায় ঠাকুরবাড়ির অন্যান্য ছেলেরা। অভিনয় দারুণ জমেছিল। সবাই ভাল অভিনয় করেছিলেন। লোকে কাকে ছেড়ে কাকে দেখে? সেই ভিড়ের মধ্যে মিশে গিয়ে লুকিয়ে লুকিয়ে অভিনয় দেখে গেল পাবলিক স্টেজের কয়েকজন অভিনেতা অভিনেত্রী। তারপর? সে এক দারুণ ব্যাপার। প্রত্যক্ষদর্শী অবনীন্দ্রনাথ। তিনি জানিয়েছেন, পাবলিক স্টেজে রাজা ও রাণী অভিনয় দেখার নিমন্ত্রণ পেয়ে তারা গিয়েছিলেন সেখানে। গিয়ে একেবারে তাজ্জব বনে গেলেন রাণী সুমিত্রা স্টেজে এল, একেবারে মেজ জ্যাঠাইমা। গলার সুর, অভিনয়, সাজসজ্জা, ধরনধারণ হুবহু মেজ জ্যাঠাইমাকে নকল করেছে। এমারেল্ড থিয়েটারের এই অভিনয় খুব জনপ্রিয় হয়েছিল আর রাণী সুমিত্রা সেজে জ্ঞানদানন্দিনীকে নকল করেছিল যে অভিনেত্রী তার নাম গুলফম হরি। রাজার ভূমিকায় মতিলাল সুর, কুমারের ভূমিকায় মহেন্দ্রলাল বস্তু ও ইলার ভূমিকায় কুসুমকুমারীর (হাড়কাটা) অভিনয়ও ভাল হয়েছিল।

এই অভিনয়কে কেন্দ্র করে অবশ্য আরো একটা ঘটনা ঘটেছিল। ঝড় তুলেছিল বঙ্গবাসী পত্রিকা। ঠাকুর বাড়ির নতুন ঠাট নাম দিয়ে একটা প্রবন্ধ ছাপা হল, তাতে ঐ নাটকের পাত্রপাত্রীদের তালিকা এবং ব্যক্তিগত জীবনে তাদের পারস্পরিক সম্পর্কের কথা স্পষ্ট করে লিখে কোন কোন নিষিদ্ধ সম্পর্কে স্বামী-স্ত্রী সাজা হয়েছে সেটা দেখিয়ে দেওয়া হয়। আগেই বলেছি, রাজা ও রাণীর ভূমিকায় অভিনয় করেন রবীন্দ্রনাথ ও জ্ঞানদানন্দিনী অর্থাৎ দেবর-বৌদিদি আর দেবদত্ত ও নারায়ণী সাজেন সত্যেন্দ্রনাথ ও মৃণালিনী অর্থাৎ ভাশুর-ভ্রাতৃবধু। কিন্তু এসব ছোটখাট ব্যাপারের দিকে তাকাতে হলে জ্ঞানদানন্দিনীকে অনেক আগেই থেমে যেতে হত।

নিজে লেখা ছাড়াও অপরকে উৎসাহ দিয়ে লেখানোর দিকে জ্ঞানদানন্দিনীর ঝোঁক ছিল বরাবর। ছোটদের কথা তো আগেই বলেছি। জ্যোতিরিন্দ্রনাথের সংস্কৃত নাট্যানুবাদের মূলেও ছিলেন তার এই মেজ বৌঠান। তার আগে জ্যোতিরিন্দ্রনাথ একটিও সংস্কৃত নাটক পড়েননি। জ্ঞানদানন্দিনীর অনুরোধে তাকে শকুন্তলা পড়ে শোনাতে গিয়ে জ্যোতিরিন্দ্রনাথ মুগ্ধ হয়ে সংস্কৃত নাটক অনুবাদে হাত দিয়েছিলেন। রবীন্দ্রনাথকে ও ছোটদের জন্যে লিখতে উৎসাহ দিয়েছিলেন জ্ঞানদানন্দিনী। তাঁর বালকের জন্যই কবি ছোটদের লেখায় হাত দিতে বাধ্য হন। কথায় কথা বাড়ে : আমরা আর একটি কথা বলে জ্ঞানদানন্দিনীর প্রসঙ্গ থেকে অন্য প্রসঙ্গে যাব। তিনি তো অনেক কাজেই উৎসাহী ছিলেন। একবার বোম্বাই থেকে ফিরে করলেন কি, একরকম জোর করেই একজন ফটোগ্রাফার ডাকিয়ে শাশুড়ী, জা, ননদ, ও বাড়ির অন্যান্য মেয়ে বৌয়েদের ফটো তুলিয়ে ফেললেন। সেদিন তার আগ্রহ আর উৎসাহ না থাকলে অনেকেই হয়ত ক্ষণকালের আভাস থেকে চিরকালের অন্ধকারে হারিয়ে যেতেন। ধারণা গড়ে নেবার মতো একটা সামান্য ছবিও আমাদের চোখের সামনে এসে পৌঁছত না। কে বলতে পারে, হয়ত রবীন্দ্রনাথের ছবি কবিতাটা লেখাই হত না কোনদিন। একাকিনী জ্ঞানদানন্দিনী এভাবেই অনেকটা এগিয়ে দিয়েছিলেন বাঙালী মেয়েদের।
জ্ঞানদানন্দিনীর সঙ্গে সব কাজেই জড়িয়ে মিশিয়ে আছেন স্বর্ণকুমারী, ঠাকুরবাড়ির অন্দরমহলের উজ্জ্বলতম জ্যোতিষ্ক। মেয়েরা কেউ কেউ সবে যখন কিছু করবার কথা ভাবছেন তখন স্বর্ণকুমারী এসেছেন একেবারে ঝোড়ো হাওয়ার মতো। লেখাপড়ার পাঠ ভালভাবে শেষ হতে না হতেই তিনি তরতর করে লিখে ফেললেন একেবারে আস্ত একখান উপন্যাস। সবাই অবাক। তা উনিশ শতকটপ তো অবাক হবারই যুগ। কঁচা ভিতের ওপর পাকা ইমারত গড়তে দেখলে কে না বিস্মিত হয়? এই তো সেদিন, মাঝে দশটা বছর গেছে কি যায়নি, প্রথম সার্থক বাংলা উপন্যাসখানি লিখে বঙ্কিমচন্দ্র তার ঔপন্যাসিক জীবন শুরু করেছেন। এখনও সবার মনে দুর্গেশনন্দিনীর অমলিন স্মৃতি। চারপাশে শুধু নাটক-প্রহসন আর নকশার ভিড়। কখন উপন্যাস লেখায় হাত দিলেন এই অষ্টাদশী তরুণীটি? এ তো শুধু প্রথম লেখা নয়। এ যেন আবির্ভাব!

আবির্ভাবই বটে। ১৮৭৬ সালে ডিসেম্বর মাস, শীতার্ত সন্ধ্যা উজ্জ্বল হয়ে উঠল এক অনামিকার শুভ আবির্ভাবে। বইয়ের নাম দীপনির্বাণ। সকলেই উলটে পালটে দেখে। সকলের মনেই নানারকম প্রশ্ন। লেখকের নামহীন বইটি নিয়ে জল্পনা চলছে। কার লেখা বই? কার লেখা হতে পারে? এরই মধ্যে কানাঘুষো শোনা গেল বইখানি একটি মেয়ের লেখা।

মৌচাকে যেন ঢিল পড়ল এবার।

একজন মেয়ের লেখা? পড়ে বিশ্বাস হয় না। ভাষায় এমন বাঁধুনি, লেখায় এমন মুন্সিয়ানার ছাপ! মেয়েলি জড়তা-সংকোচ কুণ্ঠা কোথাও কিছু নেই। এ কি কোন মেয়ের লেখা হতে পারে? সাধারণী কাগজ সমালোচনা করলে :

…শুনিয়াছি এখনি কোন সম্ভাবংশীয় মহিলার লেখা। আহলাদের কথা। স্ত্রীলোকের এরূপ পড়াশোনা, এরূপ রচনা, সহৃদয়তা, এরূপ লেখার ভঙ্গি বঙ্গদেশ বলিয়া নয় অপর সভ্যতর দেশেও অল্প দেখিতে পাওয়া যায়! প্রশংসা ঠিকই। কিন্তু তারই মধ্যে লুকিয়ে রইল সন্দেহের কাঁটা। খচখচ করে বেঁধে মহিলার লেখা।

সত্যিই কি মহিলার লেখা?

কে সেই মহিলা? কী তাঁর পরিচয়?

মহিলার নামে পুরুষের লেখাও তো হতে পারে।

স্বর্ণকুমারীর মেজদাদা সত্যেন্দ্র তখন বিদেশে; তিনি ভাবলেন এ নিশ্চয় তার ভাই জ্যোতিরিন্দ্রর লেখা। অভিনন্দন জানিয়ে চিঠি পাঠালেন, জ্যোতির জ্যোতি কি প্রচ্ছন্ন থাকিতে পারে? সত্যিই পারে না। স্বর্ণকুমারীর বর্ণালী দীপ্তিও অজানা খনির নতুন মণির আলোর মতো ছড়িয়ে পড়ল দিকে দিকে। সন্দেহের আর অবকাশ রইল না।

স্বর্ণকুমারীকে নিয়ে এত আলোড়ন উঠেছিল কেন? তিনিই কি প্রথম বাঙালী লেখিকা না প্রথম মহিলা ঔপন্যাসিক? ইতিহাস বলবে, এর কোনটাই ঠিক নয়। ঠাকুরবাড়ির মতো শিক্ষিত ও সম্ভ্রান্ত পরিবার থেকেই প্রথম লেখিকার আবির্ভাব হওয়া অসঙ্গত নয়, অসম্ভবও ছিল না। কিন্তু দীপনির্বাণ প্রকাশের আগেই মার্থা সৌদামিনী সিংহের নারীচরিত কিংবা নবীনকালী দেবীর কামিনী কলঙ্ক লেখা হয়েছে, প্রকাশিত হয়েছে হেমাঙ্গিনী দেবীর মনোরমা কিংবা সুরঙ্গিণী দেবীর তারাচরিত। যতদূর জানি, প্রথম বাংলা কাব্য-লেখিকার নাম কৃষ্ণকামিনী দাসী। তার চিত্তবিলাসিনী ১৮৫৬ সালে প্রকাশিত হয়। ফুলমণি ও করুণার বিবরণ-কে বাদ দিলে এটিই বাঙালী মেয়ের লেখা প্রথম গ্রন্থ। এরপর প্রবন্ধ-জাতীয় রচনা প্রথম লেখেন পাবনার বামাসুন্দরী দেবী ১৮৬১ সালে। তার পুস্তিকাখানির নাম ছিল কি কি কুসংস্কার তিরোহিত হইলে এদেশের শ্রীবৃদ্ধি হইতে পারে। প্রথম মহিলা নাট্যকার কামিনীসুন্দরী দেবী উর্বশী নাটক লেখেন ১৮৫৬ সালে। অনেকের মতে প্রথম মহিলা ঔপন্যাসিকের নাম শিবসুন্দরী দেবী। তার তারাবতী প্রকাশিত হয় ১৮৬৩ সালে (মতান্তরে ১৮৭৩ সালে), শিবসুন্দরী ছিলেন পাথুরেঘাটার হরকুমার ঠাকুরের স্ত্রী। তার কনিষ্ঠ পুত্র শৌরীন্দ্রমোহন তারাবতীর ইংরাজী অনুবাদ করে (১৮৮১) নিজের গানের বইয়ের সঙ্গে বিভিন্ন দেশে উপহার পাঠিয়েছিলেন। এই প্রসঙ্গে বলে নেওয়া ভাল, পাথুরেঘাটা-ঠাকুরবাড়ির মহিলারাও কিছু কিছু সাহিত্যচর্চা করতেন। সংখ্যায় কম হলেও আমরা ঐ বাড়ির ছ-সাতজন মেয়ে ও বৌকে কবিতা কিংবা নাটক লিখতে দেখেছি। যতীন্দ্রমোহন ঠাকুরের ছোট মেয়ে মনোরমা লিখেছিলেন কবিতায় পিতৃদেবচরিত। এছাড়া বিরজামোহিনী ও অনিরুদ্ধ মিলন নাটক এবং গৌরগীতিকা ও মানকুঞ্জ কাব্যগ্রন্থ। ঘরে বসেই তিনি কাকার কাছে শিখেছিলেন সুরকানন বাজাতে। শৌরীন্দ্রমোহনের দুই মেয়ে শ্রীজয়ন্তী ও জয়জয়ন্তীও কিছু কিছু লিখেছেন, প্রকাশিতও হয়েছিল। জয়জয়ন্তী লিখেছিলেন জয়ন্তী দেবী নামে। তার দুখানি গ্রন্থের নাম মহামিলন ও জীবনমুক্তি। কালীকৃষ্ণ ঠাকুরের স্ত্রী সৌদামিনী লেখেন ভক্তিরসতরঙ্গিনী। প্রথম মহিলা আত্মজীবনীকার রাসসুন্দরী দেবী (১৮৭৬)। বামা রচনাবলীর প্রথম ভাগেও (১৮৭২) বেশ কয়েকজন লেখিকার সন্ধান পাওয়া যায়। তবে সেগুলির অধিকাংশই প্রবন্ধ। সমাজ সংস্কার, স্ত্রীশিক্ষা, নীতি প্রভৃতি গুরুগম্ভীর বিষয় নিয়ে একসময় প্রবন্ধ লিখেছেন কামিনী দত্ত, স্বর্ণলতা ঘোষ, মধুমতী গঙ্গোপাধ্যায়, বিবি তাহেরণ লেছ, গোলাপমোহিনী দাসী, রমাসুন্দরী ঘোষ, ক্ষীরদা মিত্র, শ্ৰীমতী সৌদামিনী ও আরো অনেকে। এরা কেউই জোড়াসাঁকো ঠাকুরবাড়ির সঙ্গে যুক্ত ছিলেন না। শিবসুন্দরী প্রমুখ কয়েকজন ছাড়া অন্যরা কোন বিখ্যাত সন্ত্রান্ত পরিবার থেকেও আসেননি। তবু তাদের বিদ্যানুরাগ ও সাহিত্যপ্রতি আমাদের মুগ্ধ করে। যাক সে কথা, এই তথ্যের দিকটিকে বাদ দিলে স্বর্ণকুমারীর পূর্ববর্তিনীদের কাউকেই সাহিত্যিক হিসেবে গ্রহণ করা চলে না। পরম গৌরবে নিজেদের দায়িত্ব পালন করলেও মেয়েদের সাহিত্য এতদিন ছিল শুধু হাস্যকর এবং অনুকম্পার বস্তু। অথচ বিশ্বসাহিত্যে প্রথম উপন্যাসের স্রষ্টা কোন পুরুষ নন, একজন মহিলা। তাঁর নাম মোরাকিসিকিবু (১৮৭৮-১৯৩১)। এই জাপানী মহিলাই লিখেছিলেন গেঞ্জি মনোগাতারি নামে প্রথম উপন্যাস। যাই হোক বাংলা সাহিত্যের আসরে স্বর্ণকুমারী এসে আদায় করে নিলেন প্রার্থিত সম্মান। হাসি আর করুণার বদলে দেখা দিল শ্রদ্ধামেশানো বিস্ময়! মেয়েদের চলার পথ, আত্মপ্রকাশের পথ আরো বুঝি একটু সুগম হল।

উপন্যাস ছাড়াও স্বর্ণকুমারী লিখেছিলেন গল্প, নাটক, প্রহসন, কবিতা, গাথা, গান, রম্যরচনা, প্রবন্ধ, ভ্রমণকাহিনী, গীতিনাট্য, স্মৃতিকথা, স্কুলপাঠ্য বই— একজন মহিলার পক্ষে যা প্রায় অসম্ভবের পর্যায়ে পড়ে। আশ্চর্যের কথা এই যে তিনি তার পূর্ববর্তিনীদের দ্বারা বিন্দুমাত্র প্রভাবিত হননি। তার আদর্শ লেখক ছিলেন বঙ্কিমচন্দ্র, যদিও তার ইতিহাসনিষ্ঠা রমেশ দত্তকেই মনে করিয়ে দেয়। বঙ্কিমের মতো লেখক আদর্শ হওয়ায় স্বর্ণকুমারীর রচনায় রমণীয় লাবণ্যের কিছু অভাব ঘটেছে। অবশ্য তাতে খুব বেশি ক্ষতি হয়নি। আর যেখানেই হোক। সাহিত্যে মেয়েলি ভঙ্গির আদর নেই। স্বর্ণকুমারীর অধিকাংশ রচনাই পুরুষালি টংএ লেখা। অথচ তিনি গল্প-উপন্যাস লিখতে শুরু করেন বেশ অল্প বয়সে। এই বয়সে উপন্যাস লেখার নজির অবশ্য আরো আছে। তরু দত্তের কথাই ধরা যাক না। মাত্র একুশ বছর বয়সে দুরোগ্য ব্যাধিতে তরুর মৃত্যু হয় কিন্তু সেই স্বল্প কটি দিনের মধ্যেই তিনি লিখেছিলেন অনেক গুলো মনে রাখবার মতো না।

কবিতা আর দুটি উপন্যাস, লিখেছিলেন ইংরেজী ও ফরাসী ভাষায়। সে যুগে ইংরেজী ভাষায় নাটক, নভেল অনেকেই লিখতেন। বিদেশিনী শিক্ষয়িত্রীদের শিক্ষার ফলে ইংরেজী শেখার পথও হয়েছিল সরল। স্বর্ণকুমারীও তার নিজের গল্প ও উপন্যাসের অনুবাদ করেছেন, তবে সে অনেক পরে।

মাঝে মাঝে স্বর্ণকুমারীকে অসাধারণ সৌভাগ্যবতী বলে মনে হয়। পথের কাঁটাও বুঝি তার পায়ের তলায় ফুল হয়ে ফুটেছে। নতুন কিছু করার জন্যে জ্ঞানদানন্দিনীকে যত ঝড়ঝাপ্টা সইতে হয়েছিল তাকে সে সব দুর্যোগ স্পর্শ করতে পারেনি। তিনি পেলেন শুধুই শ্রদ্ধা, শুধুই সম্মান, শুধুই অভিনন্দন। একেই বলে ভাগ্য! সত্যিই কি কোন বাধা ছিল না? না, স্বর্ণকুমারী কোন বাধাকে বাধা মনে করেননি। আপাতভাবে সংসারে উদাসীন হওয়ার জন্য স্বর্ণকুমারী সবসময় এক নিরাসক্ত দূরত্বের মধ্যে নিজেকে সরিয়ে রাখতে পেরেছিলেন। বাকিটুকু ঘিরে রেখেছিল জানকীনাথ ঘোষালের ভালবাসা। স্ত্রীকে তিনি সমস্ত দুঃখ-বিপদের হাত থেকে সরিয়ে চেষ্টা করেছেন সাহিত্যক্ষেত্রে সার্থক করে তুলতে। স্বর্ণকুমারীর সাহিত্যিক খ্যাতি চিড় ধরায়নি তাদের দাম্পত্য জীবনে।

স্বর্ণকুমারী যখন নিজেকে লেখিকা হিসাবে তৈরী করে নিচ্ছেন তখন অন্যান্য মেয়েরা কি করছিলেন? অন্যান্য বাড়ির অন্দরমহলের খবর সংগ্রহ করা সহজ নয়। আগে ঠাকুরবাড়িটাই দেখা যাক। স্বর্ণকুমারীর দিদি-বৌদিদিরা মগ্ন থাকতেন ঘরের কাজে। সকাল থেকৈ, তাদের বসত তরকারি বানানোর আসর, সেই সঙ্গে মেয়েলি আড্ডা—এই আসরে যোগ দিতেন সৌদামিনী, শরৎকুমারী, বর্ণকুমারী, প্রফুল্লময়ী, সর্বসুন্দরী, কাদম্বরী আরো অনেকে। মহর্ষি বাড়ি ফিরলে তদারক করতে আসতেন সারদাদেবী। এছাড়া বাড়ির অন্যান্য আশ্রিতা মহিলারাও যোগ দিতেন। হাতের কাজের সঙ্গে জমে উঠত গল্প। বাড়ির ছোট ছোট মেয়েরা গল্পের টানে হাজির হত সেখানে। সরলাও প্রায়ই যেতেন কিন্তু নিজের মাকে কোনদিন সে আসরে যেতে দেখেননি।

শরৎকুমারী ভালবাসতেন রূপচর্চা করতে। সবচেয়ে বেশি সময় নিয়ে রূপটান মেখে চৌবাচ্চার জলে সাঁতার কেটে তিনি অনেকটা সময় কাটিয়ে দিতেন। তার স্বামী যদুনাথ (যদুকমল) মুখোপাধ্যায় ছিলেন সুরসিক ব্যক্তি। শোনা যায়, অনেকেরই কৌতূহল ছিল ঠাকুরবাড়ির ছেলেমেয়েদের রূপ রঙ নিয়ে। একজন জিজ্ঞেস করেছিলেন যদুনাথকে। তিনি উত্তর দিয়েছিলেন দুধে আর মদে। কেউ কেউ মনে করতেন ঠাকুরবাড়ির ছেলেমেয়েদের এই দুটি পদার্থ দিয়ে স্নান করানো হত জন্মাবার পরই। যদুনাথের রহস্যপ্রিয়তার এই ছোট্ট ছবিটি উপহার দিয়েছেন সত্যেন্দ্র-দুহিতা ইন্দিরা, তার অপ্রকাশিত গ্রন্থ শ্রুতি ও স্মৃতিতে। ঠাকুরবাড়িতে মেয়েরা রন্ধনচর্চাও করতো, শরৎকুমারী ছিলেন রন্ধন-পটিয়সী। অন্যান্য বাড়ির মেয়েরাও যে অন্যভাবে জীবন কাঁটাতেন তা নয়। বিনয়িনীর অপ্রকাশিত আত্মকথা কাহিনী পড়ে জানা যায় তাদের বাড়িতে অর্থাৎ অবন-গগন ঠাকুর পরিবাবের মেয়েদের অনেক সময় কেটে যেত ঠাকুরঘরে। অন্যান্য বাড়িতেও অধিকাংশ মেয়ে এমনি ভাবেই সময় কাঁটাতেন। এছাড়া কেউ দিতেন পুতুলের বিয়ে, কেউ খেলতেন তাস-পাশা কিংবা দশ-পঁচিশ। স্বর্ণকুমারী এভাবে জীবন কাঁটাননি : নিজেকে অন্য সব দিক থেকে সরিয়ে এনে তিনি অনেক অবাঞ্ছিত পরিস্থিতি থেকে রক্ষা পেয়েছিলেন।

দীপনির্বাণ উপন্যাসের পরে প্রকাশিত হল বসন্ত-উৎসব, প্রায় একই সঙ্গে আত্মপ্রকাশ করল ছিন্নমুকুল! এবার যশের মুকুট তার মাথায় পরিয়ে দিলেন পাঠকসমাজ। ইদানীংকালে হয়ত অনেকেই ভুলে গেছেন যে, বাংলায় অপেরাধর্মী গীতিনাটিকা লেখার ব্যাপারেও স্বর্ণকুমারী পথিকৃতের গৌরব দাবি করতে পারেন। তিনি রবীন্দ্রনাথের বাল্মীকি-প্রতিভ এমনকি জ্যোতিরিন্দ্রনাথের মানময়ীরও আগে রচনা করেন বসন্ত-উৎসব। লেখার সঙ্গে সঙ্গে অভিনয়। ঠাকুরবাড়িতে তখন সুবর্ণ যুগ চলছে। বাড়িতে রয়েছেন স্বর্ণকুমারীর নাট্যরসিক দাদা জ্যোতিরিন্দ্রনাথ ও তাঁর সাহিত্যপ্রেমিকা স্ত্রী কাদম্বরী। সত্যেন্দ্র-জ্ঞানদানন্দিনী মাঝে মাঝে আসতেন ঝোড়ো হাওয়ার মতো; জীর্ণ পুরাতনকে ভাসিয়ে দিয়ে উড়িয়ে দিয়ে। প্রচণ্ড উদ্দীপনার মধ্যে দিয়ে হয়ে গেল হিন্দুমেলা। এরপর ঠাকুরবাড়ির ছেলেমেয়েরা মেতে উঠলেন একটা নতুন পত্রিকা প্রকাশের জন্যে। পাঁচ বছর আগে বেরিয়েছে বঙ্গদর্শন। ঘরে ঘরে বঙ্কিমের বঙ্গদর্শনের আদর। ওই রকম ভাল কাগজ বার করা যায় না কি? মহর্ষির বড় ছেলে দ্বিজেন্দ্র একটু প্রাচীনপন্থী, তার ইচ্ছে তত্ত্ববোধিনীকেই আরো জঁকিয়ে তোলা। নব্যপন্থী জ্যোতিরিন্দ্রের সে ইচ্ছে নয়। পুরনো জিনিষকে নতুন করা যায় না। শেষে তারই জয় হল। ভাই-বোনেরা মিলে খসড়া করেন, পরিকল্পনা হয়, রাত বাড়ে।

কি নাম দেওয়া হবে?

সুপ্রভাত?

না, কেমন যেন শোনাচ্ছে। সবচেয়ে বেশি ভোটে যে নামটি গৃহীত হল সেটি যেমন সুন্দর, তেমনি অর্থবহ।

কী নাম?

ভারতী।

প্রথম দিকে ভারতী ছিল জ্যোতিরিন্দ্র-কাদম্বরীর মানসকন্যা, পরে স্বর্ণকুমারীই ছিলেন ভারতীর প্রকৃত কর্ণধার। অবশ্য সে অনেক পরের কথা, ১৮৮৪ সালের কথা। তার বছর সাতেক আগে ভারতীর প্রথম সম্পাদক হন দ্বিজেন্দ্রনাথ। প্রথম সংখ্যা থেকেই কিশোর রবীন্দ্রনাথ শুরু করেছিলেন মেঘনাদবধের কঠোর সমালোচনা। আবার ফিরে আসা যাক পূর্ব প্রসঙ্গে।

ঠাকুরবাড়িতে নিম্নমানের নাচ-গান হত না বটে তবে রসের ভোজে কেউ কোনদিন বাদ পড়তেন না কারণ রসস্রষ্টা ছিলেন তারা নিজেরাই। বাড়ির যে কোন আনন্দ-উৎসবের সময় নানারকম অনুষ্ঠান হত। এর উদ্যোক্তা ছিলেন স্বয়ং জ্যোতিরিন্দ্রনাথ। বছর দশেক আগেকার জোড়াসাঁকো থিয়েটারের উদ্যোক্তা ছিলেন গণেন্দ্র, গুণেন্দ্র, সারদাপ্রসাদ ও জ্যোতিরিন্দ্র। এখন সে থিয়েটারের পাট চুকে গেছে কিন্তু বদলায়নি নাট্যামোদীর মন। তাই আবার নতুন করে নাটক জমিয়ে তুললেন জ্যোতিরিন্দ্রনাথ। পুরনো থিয়েটারি মজলিশ বাড়িতে ঢুকতে পেলে না বটে তবু নাটক জমে উঠল। জোড়াসাঁকো থিয়েটারের সেই কুশলী অভিনেতা জ্যোতিরিন্দ্র, যিনি নটীর ভূমিকায় অভিনয় করে সবার মন। ভুলিয়ে ছিলেন, তিনিই আসর সাজালেন। পুরনো কুশীলবরা নেই, কেউ বা পরলোকে। এবার নতুন করে যোগ দিলেন বাড়ির মেয়েরা। যদিও ঘরোয়া অনুষ্ঠান, দর্শকরাও আত্মীয় স্বজনেরা। তবু এ ঘটনায় চমকে উঠল সবাই। অভিনয়কে বাড়ির উঠোনে টেনে আনা ও সম্ভ্রান্ত ঘরের মেয়েদের মঞ্চে এসে দাঁড়ানো দুটোই ছিল অসম্ভব ব্যাপার।

স্বর্ণকুমারীর বসন্ত-উৎসবের অভিনয় হয়েছিল ঠাকুরবাড়ির ঘরোয়া আসরে। একদিন বারান্দার জমাটি আড্ডায় বসে কথা উঠল, সেকালে বসন্ত-উৎসব কেমন হত? আসর জমে উঠল তর্কে বিতর্কে। সব কাজের উদ্যোক্তা জ্যোতিরিন্দ্র প্রস্তাব করলেন, এসো না, আমরাও একদিন সেকেলে ধরনের বসন্ত-উৎসব করি। কারুর উৎসাহ তো কম নয়। দেখতে দেখতে পিচকারী আবীর কুঙ্কুম প্রভৃতি প্রয়োজনীয় সব সরঞ্জাম এসে গেল। রঙিন আলোয় ছাদের বাগানে খুব আবীর খেলা হবে। আমোদ-প্রমোেদ বাদ যায় কেন? স্বর্ণকুমারী লিখে ফেললেন বসন্ত-উৎসব। গীতিনাটিকার সূচনা হল স্বর্ণকুমারীর হাতে। এই বিরাট আনন্দযজ্ঞে অবশ্য রবীন্দ্রনাথ উপস্থিত ছিলেন না। তিনি তখন সাত সমুদ্র তেরো নদীর পারে বিলেতে বসে কোন এক মরা সাহেবের বিধবা গিন্নীকে বেহাগ-সুরে শোকগীত শোনাচ্ছেন।

বসন্ত-উৎসবের নায়িকা লীলা সাজলেন কাদম্বরী। আর যে সন্ন্যাসিনীর কৃপায় লীলা তার প্রেমিককে ফিরে পেল সেই সন্ন্যাসিনী সাজলেন স্বর্ণকুমারী নিজে। গেরুয়া সাজের সঙ্গে তার উদাসিনী প্রকৃতিটি সুন্দর খাপ খেয়েছিল। নায়ক হয়েছিলেন জ্যোতিরিন্দ্রনাথ। তবে বসন্ত-উৎসবের পরবর্তী অভিনয়ে রবীন্দ্রনাথও প্রতিনায়ক হয়ে টিনের তলোয়ার ঘুরিয়ে যুদ্ধ করেছিলেন। এরপর কিছুদিন ধরে তিন ভাইবোনে গীতিনাট্য লেখা এবং অভিনয় চালিয়ে গেলেন নিয়মিতভাবে। পরে স্বর্ণকুমারী লেখেন বিবাহ-উৎসব।

অবিরাম ঝর্ণার মতো বয়ে চলল স্বর্ণকুমারীর লেখার স্রোত। রবীন্দ্রনাথকে বাদ দিলে ঠাকুরবাড়ির আর কেউই বোধহয় এত বেশি লেখেননি। তার সাহিত্য-আলোচনার ক্ষেত্র এটি নয়। বাংলা সাহিত্যে স্বর্ণকুমারী তার যোগ্য আসন আজও পাননি। অথচ একদিকে বঙ্কিমচন্দ্র অপরদিকে রবীন্দ্রনাথ এই দুটি ভিন্ন কোটির মধ্যবর্তী সেতু হিসেবে আমরা স্বর্ণকুমারীর নাম করতে পারি। ঐতিহাসিক গল্প ও উপন্যাস রচনায় টড কাহিনী অনুসরণ করেও তিনি যে মুন্সিয়ানা দেখিয়েছেন তার তুলনা হয় না।

স্বর্ণকুমারীর ঐতিহাসিক উপন্যাসের সংখ্যা কম নয়। দীপনির্বাণ, মিবাররাজ, বিদ্রোহ, ফুলের মাল্য, হুগলীর ইমামবাড়া—প্রত্যেকটিই জনপ্রিয় হয়েছিল। ইতিহাসের ফাঁক ভরিয়ে তোলার জন্যে তিনি মাঝে মাঝে যে কৌশল অবলম্বন করতেন তা সত্যিই প্রশংসনীয়। যেমন ধরা যাক, কুমার ভীমসিংহ গল্পের কথা। রাজসিংহের প্রথম পত্নী কমলকুমারী ও দুই রাণীর দুই পুত্র ভীমসিংহ ও জয়সিংহের কথা টড কাহিনীতে আছে। কিন্তু রাজসিংহের দ্বিতীয় স্ত্রীর কোন নাম নেই। কিন্তু স্বর্ণকুমারী যখন গল্প লিখছেন তখন বঙ্কিমের রাজসিংহ উপন্যাস লেখা হয়ে গেছে। কিষাণগড়ের চারুমতীকে বঙ্কিম রূপনগরের বীরাঙ্গনা চঞ্চলকুমারী করে তুললেন। এর পাঁচ বছর পরে গল্প লিখতে বসে স্বর্ণকুমারী অবলীলায় জয়সিংহ-জননীর নাম দিয়ে দিলেন চঞ্চলকুমারী। টডের ইতিহাস একটু ক্ষুন্ন হল বটে কিন্তু হোঁচট খেলে না পাঠকের মন। কল্পনা বাস্তবে মেশা ছায়া-ছায়া নামহারা একটা চরিত্র ব্যক্তিত্ব লাভ করল স্বর্ণকুমারীর হাতে।

ঐতিহাসিক উপন্যাস লিখলেও সামাজিক গল্প-উপন্যাস লিখে স্বর্ণকুমারী নাম করেন বেশি। যদিও ঠাকুরবাড়ির বিশেষতঃ এ বাড়ির মেয়েদের সঙ্গে সাধারণ বাঙালী সমাজের ঘনিষ্ঠ যোগ ছিল না বলে তাদের লেখায় বাস্তব জীবনের ছাপ বিশেষ পাওয়া যায় না, এমন একটা ধারণা বহুদিন থেকেই আমাদের মনে বাসা। বেঁধে আছে। স্বয়ং রবীন্দ্রনাথ মনে করতেন পৃথিবীর সঙ্গে যথার্থ পরিচয়ের অভাব তাদের পঙ্গু করে রেখেছে। তিনি সম্ভবতঃ সেজন্যেই স্বর্ণকুমারীর রচনাগুলির অনুবাদ-প্রকাশে প্রবল আপত্তি জানিয়েছিলেন। পারিবারিক জীবনের ছোটবড় খুঁটিনাটি ব্যাপারের দিকে চোখ তুলে না তাকালেও স্বর্ণকুমারী বাস্তব। জীবন সম্বন্ধে উদাসীন ছিলেন না। সমাজ-সংসার সব কিছুর উর্ধ্বে যে মানুষের মন, তিনি তার নাগাল পেয়েছিলেন। তাই তার সর্বশ্রেষ্ঠ দুটি উপন্যাসই সামাজিক উপন্যাস।

প্রথমে ধরা যাক স্নেহলতার কথা। বিশ শতকের সমালোচকদের ভাষায়, বাঙালী সমাজে আধুনিকতার সমস্যা লইয়া এই প্রথম উপন্যাস লেখা হইল। আগেই বলেছি, স্বর্ণকুমারী সব বিষয়েই অতি ভাগ্যবতী, নয়ত বিধবা-সমস্যা নিয়ে এর অনেক আগে থেকেই তো লেখালেখি চলছে, স্বর্ণকুমারীর ভাগ্যে অভিনন্দন জুটবে কেন? তবে এ বিষয় নিয়ে স্বর্ণকুমারীকে ভাবতে দেখে একটু অবাক লাগে কারণ মহর্ষি স্বয়ং বিধবা বিবাহের বিরোধী ছিলেন। বিধবা স্নেহলতাও অবশ্য বিষবৃক্ষের কুন্দনন্দিনীর পন্থা অনুসরণ করেছে কিন্তু চোখের বালির বিনোদিনীই কি নতুন পথ দেখাতে পেরেছিল? যাক সে কথা, স্বর্ণকুমারী বিধবা-সমস্যাকে দেখেছেন সমাজ-সংস্কারকের দৃষ্টিতে নয়, নারীর নিজস্ব দৃষ্টিভঙ্গি দিয়ে। নারীর প্রেম-ভালোবাসা-সংশয়-লজ্জা সংকোচ-ভয়-সংস্কার সব কিছুর মধ্য দিয়েই তিনি মেয়েদের সমস্যাকে দেখতে চেয়েছেন। বাংলা সাহিত্যে এই দৃষ্টিভঙ্গির স্বাতন্ত্রই বৈশিষ্ট্য এনেছিল।

উনিশ শতকে বিধবা-সমস্যা নিয়ে অনেকেই ভাবনা-চিন্তা শুরু করেছিলেন। শুধু ভাবনা-চিন্তা নয়, সক্রিয় হয়ে কাজে যোগ দিয়েছিলেন আরো অনেকে। ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগর ১৮৫৬ সালের এই ডিসেম্বর প্রথম বিধবা-বিবাহ দেবার পর উৎসাহ-উদ্দীপনা অনেক বেড়ে গেল। বালবিধবা কালীমতীকে বিবাহ করেন। ঈশ্বরচন্দ্রের প্রিয়পাত্র ঐশচন্দ্র বিদ্যারত্ন। এ ব্যাপারে অবশ্য ব্রাহ্ম সমাজ অসাধারণ আগ্রহ দেখিয়েছে। আদি ব্রাহ্ম সমাজে বিধবা-বিবাহের প্রবর্তন হয় অনেক পরে কিন্তু দুর্গামোহন দাস, শিবনাথ শাস্ত্রী প্রমুখ উৎসাহী ব্রাহ্ম যুবকেরা অনেক অসাধারণ দৃষ্টান্ত রেখে গেছেন। আমরা সত্যেন্দ্রনাথের উদার দৃষ্টি ও স্ত্রীস্বাধীনতাপ্রয়াসী মনটির কথা জানি। দুর্গামোহন দাসের দৃষ্টিভঙ্গি ছিল আরো উদাত্ত, আরো বলিষ্ঠ। সমস্ত প্রতিকূলতা জয় করে তিনি নিজের তরুণী বিমাতার সঙ্গে একজন বন্ধুর বিয়ে দিয়েছিলেন। তার স্ত্রী ব্ৰহ্মময়ীও ছিলেন অসাধারণ মহিলা। শিবনাথ শাস্ত্রীও কম যান না। তিনি প্রথম জীবনে পিতার আদেশে প্রথমা স্ত্রী প্রসন্নময়ী থাকা সত্ত্বেও বিবাহ করতে বাধ্য হয়েছিলেন বিরাজ মোহিনীকে। পরে ব্রাহ্মধর্ম গ্রহণ করে স্থির করেন তিনি বিরাজমোহিনীকে স্ত্রীরূপে গ্রহণ না করে আবার তার নতুন করে বিয়ে দেবেন। অবশ্য বিরাজমোহিনীর প্রবল আপত্তিতে ব্যাপারটা বেশি দূর গড়াতে পায়নি। ঠাকুরবাড়ি থেকে এই ধরনের মনোভাব কোন সময়ই সমর্থন পায়নি। ১৮৭২ সালে কেশব সেন অসবর্ণ বিবাহকে যখন বৈধ ঘোষণা করে বিশেষ বিবাহনীতি (তিন আইন) চালু করলেন, তখন ঈশ্বরচন্দ্র রাজনারায়ণ বসুর মেয়ে লীলাবতী মিত্রের কাছে কয়েকজন অসহায় বিধবাকে পাঠান যাতে তিনি তাদের পুনর্বিবাহের ব্যবস্থা করতে পারেন। লীলাবতীও কম সাহসের পরিচয় দেননি। তিনি ১৮৮৩ থেকে ১৮৯০-এর মধ্যে আটটি বিধবা মেয়ের বিয়ে দিয়েছিলেন।

স্বর্ণকুমারীও যে বিধবাদের কথা ভাবেননি তা নয়। তিনি নারীকল্যাণমূলক কাজ আরম্ভ করেছিলেন সখিসমিতির মধ্যে দিয়ে। নামটি দিয়েছিলেন রবীন্দ্রনাথ। স্বর্ণকুমারী তার বান্ধবীদের নিয়ে এই সমিতি পরিচালনা করতেন! এই সমিতির প্রধান উদ্দেশ্য ছিল বিধবা ও কুমারী মেয়েদের লেখাপড়া শিখিয়ে অন্তঃপুরের শিক্ষয়িত্ৰী করে ভোলা। তখনও মেয়েরা বিশেষতঃ বিবাহিতারা স্কুলে পড়তে আসত না অথচ লেখাপড়া শেখার আগ্রহ বেড়ে গেছে। তাই ঘরে ঘরে শিক্ষয়িত্রীর প্রয়োজন-তাদের অভাবে শিক্ষক কিংবা বিদেশিনী মিশনারী মেম সাহেব নিয়োগ করা হত। স্বর্ণকুমারী দেখলেন বাঙালী মেয়েরা লেখাপড়া শিখলে অনায়াসেই এই কাজটি পেতে পারে। অর্থোপার্জনে স্বনির্ভর হলে অনাথ বিধবাদের জীবনযাত্রা যে সহজতর হবে তাতে সন্দেহ ছিল না। সখিসমিতি যে এ ব্যাপারে খুব সফল হয়েছিল তা নয়, তবে স্ত্রীশিক্ষা প্রসারে ও মেয়েদের আত্মনির্ভর হয়ে ওঠার জন্য সখিসমিতির মতো প্রতিষ্ঠানের প্রয়োজন ছিল। সত্যি কথা বলতে কি আজও সে প্রয়োজন ফুরিয়ে যায়নি।

আবার ফেরা যাক স্নেহলতা প্রসঙ্গে। স্বর্ণকুমারী বিধবাদের লেখাপড়া শিখিয়ে তাদের আত্মনির্ভর করে তুলতে চাইলেও তাদের পুনর্বিবাহ দেবার চেষ্টা করেননি। তবে এভাবে বিধবা-সমস্যার সমাধান সত্যিই হয় কিনা সে নিয়েও চিন্তা করেছিলেন। সেই চিন্তার ফসল স্নেহলতা। তাই স্নেহের মৃত্যুর পরে জগৎবাবুর চিন্তার সূত্র ধরে আমরা যখন লেখিকার ভাবনার সঙ্গে পরিচিত হই তখন চমকে উঠি। জগৎবাবু এই উপন্যাসের একটি প্রধান চরিত্র। স্নেহের মৃত্যুর পর তার মনে হয়েছিল, স্নেহকে লেখাপড়া না শিখাইলে সে বেশ সন্তুষ্ট চিত্তে আপনার অদৃষ্ট বহন করিতে পারি, আপনার অধঃপতন। মৃত্যু আপনি ডাকিয়া আনিত না। এ কথা লেখিকারও কথা। যুক্তি যদি ভেতর থেকে মনকে নাড়া দেয় তাহলে উপেক্ষিত জীবনের বঞ্চনা ও ক্ষোভকে অদৃষ্ট বলে মেনে নেবার অপরিসীম শক্তির ভিত আসে দুর্বল হয়ে। নারী হয়ে স্বর্ণকুমারী এই সত্যকে অস্বীকার করতে পারেননি। তাই বিধবাদের আত্মনির্ভরতা এবং অর্থোপার্জনের পথ দেখিয়ে দিলেই যে সব হল না সেটা তিনি জানতেন। হিরন্ময়ী বিধবা শিল্পাশ্রমের জন্যে লেখা নিবেদিতা নাটকেও তিনি এই সমস্যার আরেকটি কুৎসিত রূপ ফুটিয়ে তুলেছেন। তবে কোথাও তিনি সমাধানের পথ দেখাতে পারেননি এমনকি সে চেষ্টাও করেননি। তবু মনে হয় তিনি বিধবা মেয়েদের সমাজের মধ্যে সসম্মানে পুনঃপ্রতিষ্ঠিত করতে চেয়েছেন। সম্মানের পরিবর্তে শুধু অন্নের সংস্থান, অর্থোপার্জন, শিক্ষা এমন কি পুনর্বিবাহও তার মতে, কোন নারীকে পূর্ণ করে তুলতে পারে না। স্বর্ণকুমারীর সমসাময়িক আরো কয়েকজন লেখিকা সামাজিক উপন্যাস লিখে সকলের দৃষ্টি আকর্ষণ করেন। এঁদের একজনের নাম কুসুম কুমারী দেবী ও অপরজন শরৎকুমারী চৌধুরাণী। কুসুমকুমারীর স্নেহলতা, প্রেমলতা ও শান্তিলত ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগর ও বঙ্কিমচন্দ্রের প্রশংসা লাভ করেছে। শরৎকুমারীকে সার্টিফিকেট দিয়েছিলেন স্বয়ং রবীন্দ্রনাথ।

স্বর্ণকুমারীর অপর জনপ্রিয় উপন্যাসটির নাম কাহাকে। এখানে স্বর্ণকুমারী সমস্ত পুরুষালি ঢং বিসর্জন দিয়ে শুধু একটি মেয়ের ভালবাসার কথা শুনিয়েছেন। স্বর্ণকুমারীর লেখায় যারা নারীসুলভ রমণীয়তা পাননি কাহাকে তাদের সন্তুষ্ট করেছে। অন্য কোন সমস্যা এখানে নেই, আছে শুধু একটি আধুনিকার আত্মকথন। শিক্ষিত আধুনিক নায়িকা নিজেকে বিশ্লেষণ করে ভালবাসার স্বরূপ সন্ধান করেছে। নারীসুলভ স্বাভাবিক লজ্জা ও সংস্কারকে বর্জন করে স্বর্ণকুমারী যেভাবে নারীমনকে বিশ্লেষণ করেছেন তার তুলনা এ যুগেও খুব বেশি মেলে না। সাধারণ জীবনের দৈনন্দিন বাস্তবতার সঙ্গে হয়ত তার পরিচয় কিছু কম ছিল কিন্তু মনোবিশ্লেষণ দিয়ে তিনি সেই অভাবকে পূর্ণ করে দিয়েছেন। অনেকেই কাহাকে উপন্যাসে লেখিকার নিজস্ব পরিবেশ অর্থাৎ তৎকালীন শিক্ষিত ও সম্ভান্ত পরিবারের পরিবেশ খুঁজে পেয়েছেন। লেখিকার নিজের পরিবেশ বলেই কাহাকে এত জীবন্ত এ ধারণাও করা হয়। স্বর্ণকুমারীর নিজের জীবনের সঙ্গে নায়িকার সাদৃশ্য না থাকলে এ পরিবেশে তিনি যে খুব স্বচ্ছন্দ সে কথা অস্বীকার করে লাভ নেই। কাহাকে শুধু বাঙালী পাঠকদের ভাল লেগেছিল তা নয়, বিদেশীদেরও মন ছুয়েছিল।

উনিশ শতকে ইংরেজীতে নভেল লেখার একটা রেওয়াজ ছিল। সে সময় অনেকেই ইংরেজী উপন্যাস লিখতেন, কেউ কেউ নিজেদের বাংলা লেখা অনুবাদ করে নিতেন। খুব স্বাভাবিক ভাবেই ধরে নেওয়া যায় ইংরেজী ভাষাটা তখনকার ছেলেমেয়েদের কাছে শক্ত ছিল না। যে কোন ধনী পরিবারে ছোট বেলা থেকেই ছেলেমেয়েদের ইংরেজী পড়ানো হত। পড়ার বইও লেখা হত ইংরেজীতে। গভর্নেস বা শিক্ষয়িত্ৰী হতেন বিদেশিনী। কাজে কাজেই ইংরেজী ছিল শাসক ইংরেজের মতোই বাঙালীর কাছের জিনিস। মহিলারাও ইংরেজী ভাষায় উপন্যাস লিখতেন। এ সময় কতজন বাঙালী লেখিকা ছিলেন প্রশ্ন জাগতে পারে। ১৮৫৪ থেকে ১৯১০ সালের মধ্যে ১৯৪ জন লেখিকার নাম পাওয়া যায়। তাছাড়া বোধহয় আরো জন পঞ্চাশেক লেখিকা ছিলেন যারা নাম প্রকাশ করতে চাননি! সুতরাং স্বর্ণকুমারীকে একাকিনী ভাবলে ভুল করা

যাইহোক, কথা হচ্ছিল উপন্যাসের অনুবাদ নিয়ে। এ ব্যাপারে স্বর্ণকুমারী বেশ উৎসাহী ছিলেন। তাঁর দুটো উপন্যাস, চোদ্দটা গল্প ও একটা নাটক অনূদিত হয়। সবচেয়ে আগে ক্রিস্টিনা আলবার্স অনুবাদ করেন ফুলের মালা। মডার্ণ রিভিউ-এ দি ফ্যাটাল গারল্যাণ্ড নামে ছাপা হয়। ফুলের মালা উপন্যাস হিসাবে খুব সার্থক হয়নি! খুব সম্ভব সেজন্যেই রবীন্দ্রনাথের এই অনুবাদ সম্বন্ধে ভাল ধারণা ছিল না। ১৯১৩ সালে কবি যখন ইংলণ্ডে তথন স্বর্ণকুমারী তাঁর কাছে এই বইটি পাঠান, হয়তো বিদেশের বাজারে একটু পরিচিত হবার জন্যেই। রবীন্দ্রনাথ তাঁর অভিমত জানালেন।

আমি জানি এ বই প্রকাশ করবার চেষ্টা এখানে সফল হবে না। তাছাড়া তর্জমা খুব ভালো হয়েছে তা নয়—অর্থাৎ ইংরেজী রচনার উচ্চ আদর্শে পৌঁছয়নি। [ ২৮. ১. ১৯১৩ ]

তাঁর একই মন্তব্য শোনা গেছে ইন্দিরাকে লেখা চিঠিতেও। কবি তাঁকে। লিখেছেন :

নদিদি আমাকে তার ফুলের মালার তর্জমাটা পাঠিয়েছিলেন। এখানকার সাহিত্যের বাজার যদি দেখতেন তাহলে বুঝতে পারতেন এসব জিনিস এখানে কোন কোনমতেই চলতে পারে না। এরা যাকে reality বলে সে জিনিসট। থাকা চাই। [ ৬.৫, ১৯১৩]

কবির পক্ষে এ নিয়ে কথা বলা মুস্কিল হয়েছিল এইজন্যে যে, তাঁর কবিতা সে সময় বিদেশে যথাযোগ্য সম্মান পেয়েছে। কিন্তু তার সঙ্গে তো আর কারুর তুলনা চলতে পারে না। অথচ এ কথা বলতে গেলে ভুল বোঝার শংকা বেশি। তিনি নোবেল পুরস্কার পাওয়ার পর অনেক বাঙালী লেখকের ধারণা হয়েছিল যে তাদের গ্রন্থের অনুবাদ প্রকাশ হলে তারাও উপযুক্ত সম্মান পেতে পারেন। এই ধরনের লেখকদের কথা বলবার সময় রবীন্দ্রনাথ স্বর্ণকুমারী সম্বন্ধেও শ্রদ্ধাপোষণ করেননি। তিনি রোটেনস্টাইনকে লিখেছিলেন,

She is one of those unfortunate being who has more ambition than abilities. But just enough talent to keep her mediocrity alive for a short period. Her weakness has been taken advantage of by some unscrupulous literary agents in London and she has had stories translated and published. I have given her no encouragement but I have not been successful in making her see things in their proper light.

কবি এ চিঠিটা কবে লিখেছিলেন জানা যায়নি। মনে হয়, এ সময় স্বর্ণকুমারীর আরেকটি উপন্যাসের অনুবাদ এ্যান্ আফিনিস্ট সঙ লণ্ডনে প্রকাশিত হয়েছে। এই উপন্যাসটি কাহাকের অনুবাদ, অনুবাদিকা স্বর্ণকুমারী স্বয়ং। কোন কারণেই দমে না গিয়ে স্বর্ণকুমারী কাহাকে অনুবাদ করেছিলেন। লণ্ডন থেকেই বইটি প্রকাশিত হয় ১৯১৩ সালের ডিসেম্বরে। ১৮৭৬-এর ডিসেম্বর থেকে ১৯১৩-র ডিসেম্বর দীর্ঘ পথ পরিক্রমা করে স্বর্ণকুমারী এসে দাঁড়ালেন শীল রজনীর তুষার-কুয়াশাঢাকা লণ্ডনবাসী পাঠকের কাছে। তাঁরা দেখলেন, একটি বিদেশী বই, শেষ করে মনে হল অসমাপ্ত গানের কলি যেন। ঝরে পড়ল মুগ্ধ পাঠকের প্রশংসাবাণী।

Remarkable for the picture of Hindu life the story is overshadowed by the personality of the authoress, one of foremost Bengali writer to-day. (Clarion) আর একটু সোচ্চার প্রশংসা করলেন ওয়েস্ট মিনিস্টার গেজেটের সম্পাদক :

Mrs. Ghosal, as one of pioneers of the women movement in Bengal, and fortunate in her own upbring, is well qualified to give this picture of a Hindn maiden development.

রবীন্দ্রনাথ যে কেন এত আশংকা করেছিলেন বোঝা যায় না। তাঁর সমস্ত অনুমানকে অমূলক প্রমাণ করে ১৯১৪ সালে এ্যান্ আনফিনিস্ট সঙ-এর দ্বিতীয় সংস্করণ প্রকাশিত হয় ঐ একই কোম্পানী থেকে। সুতরাং সাময়িকভাবে হলেও স্বর্ণকুমারী বিদেশীদের আকৃষ্ট করেছিলেন। কাহাকের আরো একটি অনুবাদ হয়েছিল। সেটি কলকাতা থেকে ১৯১০ সালে টু হুম নামে প্রকাশ করা হয়। টু হুমের অনুবাদিকা স্বর্ণকুমারীর ভাইঝি শোভনা। দুটো অনুবাদের মধ্যে স্বর্ণকুমারীর লেখাটিই বেশি স্বচ্ছন্দ। এছাড়াও দিব্যকমল নাটকটি অনূদিত হয় জার্মান ভাষায় প্রিন্সেস কল্যাণী নামে এবং বেশ কয়েকটি ছোট গল্প শর্ট স্টোরিজ নামে ইংরেজীতে। সুতরাং স্বদেশে-বিদেশে সর্বত্রই স্বর্ণকুমারী লেখিকার সম্মান অর্জন করেছিলেন।

আমাদের দেশে সাধারণত লেখক খ্যাতি তারাই পান যারা উপন্যাস লেখেন। স্বর্ণকুমারী সফল উপন্যাস রচয়িত্রী হলেও তিনি আরো অনেক কিছু লিখতেন। তাঁর লেখা ছোটগল্পও বেশ আকর্ষণীয় হয়ে উঠেছে। যদিও বাংলা সার্থক ছোটগল্প প্রথম লিখেছেন রবীন্দ্রনাথ। তার আগে যারা গল্প লিখেছেন তারা জানতেনও না তাদের নতুন রচনাটিকে কি নামে ডাকা হবে। তাই স্বর্ণকুমারীর লেখা গল্প কুমার ভীমসিংকে কখনও বলা হয়েছে ঐতিহাসিক উপন্যাস আবার কখনও ঐতিহাসিক নাটক। বাংলা ছোটগল্পের যখন এই রকম অবস্থা তখন স্বর্ণকুমারী বাঙালী মেয়েদের নিয়ে বেশ কয়েকটা ছোটগল্প লিখেছিলেন। মালতী, লজ্জাবতী, গহনার ভাবিনী, যমুনা প্রতিদিনের শত তুচ্ছের আড়ালে আড়ালে লুকিয়ে থাকে, হারিয়ে যায়। স্বর্ণকুমারী আঁকলেন তাদেরই লজ্জানত-দ্বিধাজড়িত মুখের ছবি। এসব ছবি তিনি সংগ্রহ করেছিলেন সমাজসেবা করতে করতে।

সখিসমিতির কথা আগেই বলেছি। স্বর্ণকুমারী অন্যান্য লেখিকাদের সব সময়েই উৎসাহ যোগাতেন। সেযুগে লেখিকার প্রায়ই ছিলেন একে অপরের সখি বা সই। পুরুষের ক্ষেত্রে হয়ত প্রতিযোগিতা ছিল কিন্তু মেয়েরা ছিলেন মেয়েলি ঈর্ষার ঊর্ধ্বে। একজন লেখিকাকে কোন সময়েই অপর লেখিকার কঠোর সমালোচনা করতে দেখা যায়নি। স্বর্ণকুমারীর অনেক সখি—শরৎকুমারী তার বিহঙ্গিনী সই, মহিলা কবি গিরীন্দ্রমোহিনী তার মিলন-বিরহ সই—এরকম আরো অনেক সখি ছিল। সখিসমিতির উদ্যোগেই সর্বপ্রথম শিল্পমেলা হয়। স্বর্ণকুমারী চেয়েছিলেন মেয়েদের হাতের কাজকে শিল্পের মূল্য দিয়ে সকলের চোখের সামনে তুলে ধরতে। এতদিন হাতের কাজ শুধু ঘরের শোভা বাড়িয়েছে, সমাজে কৌলিন্য পায়নি। শিল্পীও পায়নি প্রাপ্য সম্মান। শিল্পমেলায় সেই সুযোগ এল। বেথুন কলেজ-প্রাঙ্গণে বসল মেলা। রবীন্দ্রনাথ লিখে দিলেন অভিনয়োপযোগী একটা নাটক মায়ার খেলা। মেয়েরাই অভিনয় করলেন তাতে; দর্শকও শুধুই মেয়েরা। তাঁদের সেই উৎসাহ-আনন্দ-উদ্দীপনার বুঝি তুলনা হয় না। অভিনয় ঠাকুরবাড়ির মেয়েরাই করলেন, বাইরের দু-একজনও হয়ত ছিল। কিন্তু হাতের কাজের পুরস্কার পাবার সময় দেখা গেল ঠাকুরবাড়ির মেয়েদের হারিয়ে দিয়ে প্রথম পাঁচটি পুরস্কারই পেলেন ভিন্ন পরিবারের মেয়েরা। প্রথম বছর (১২৯৫) যারা শ্রেষ্ঠ পুরস্কার পেয়েছিলেন তাঁদের নাম ও শিল্পকর্মের বিবরণ পাওয়া গেছে। যেমন,

প্রথম পুরস্কার—মিস মানুক রঞ্জিতের বেলসেতুর ছবি

দ্বিতীয় পুরস্কার-শ্ৰীমতী ভুবনমোহিনী দাসী ক্ষীরের ফুলশয্যা ও খোদিত প্রস্তরছাপ

তৃতীয় পুরস্কার—শ্ৰীমতী গিরীন্দ্রমোহিনী দাসী মাটির গ্রাম্যছবি ও কার্পেটে দেবী চৌধুরানী

চতুর্থ পুরস্কার—মিস সরকার সুতার সুক্ষ্ম কারুকার্য

পঞ্চম পুরস্কার—শ্ৰীমতী বসন্তকুমারী দাস জরীর কাজ

এঁদের মধ্যে তৃতীয় পুরস্কার পান কবি গিরীন্দ্রমোহিনী। পঞ্চম পুরস্কারপ্রাপ্ত বসন্তকুমারী সখিসমিতির কত্রীসভার একজন। অন্যান্য কত্রীরা হলেন, স্বর্ণলতা ঘোষ, বরদাসুন্দরী ঘোষ, ললিতা রায়, সরলা রায়, মনোমোহিনী দত্ত, থাকমণি। মল্লিক, সৌদামিনী গুপ্তা, প্রসন্নতারা গুপ্তা, হিরন্ময়ী দেবী, সৌদামিনী দেবী, চন্দ্রমুখী বসু, মৃণালিনী দেবী, বিধুমুখী রায়, প্রসন্নময়ী দেবী, সুরবালা দেবী, গিরীন্দ্রমোহিনী দেবী ও স্বয়ং স্বর্ণকুমারী।

সখি গিরীন্দ্রমোহিনীর মতো স্বর্ণকুমারীও কবিতা লিখতেন, গান লিখতেন আর লিখতেন গাথা। আজকাল গাথা লেখার দিন শেষ হয়ে গেছে কিন্তু উনিশ শতকে একটা কাহিনী নিয়ে কবিতা লেখাকে বলা হত গাথা। শরৎকুমারীর স্বামী অক্ষয় চৌধুরী গাথা রচনার সূত্রপাত করলে রবীন্দ্রনাথ, স্বর্ণকুমারী ও আরো অনেকে গাথা লেখায় মন দিয়েছিলেন। স্বর্ণকুমারীর গাথা পড়ে দু-একটা পত্রিকা বেশ উচ্ছ্বসিত হয়ে ওঠে। কিন্তু আজকের দিনে সে সব রচনা মোটেই সাড়া জাগাতে পারে না এমন কি তার সুন্দর গানগুলোও না। তবে এখনও যে স্বর্ণকুমারী কয়েকটা ক্ষেত্রে অপ্রতিদ্বন্দ্বী হয়ে আছেন তার প্রথমটি হল পত্রিকা সম্পাদনা ও দ্বিতীয়টি হচ্ছে বৈজ্ঞানিক প্রবন্ধ রচনা। আজও কোন লেখিকা কোন নীরস তথ্যভারাক্রান্ত বিষয় নিয়ে প্রবন্ধ লিখতে রাজী হবেন কিনা সন্দেহ। এই দুটি ক্ষেত্রে স্বর্ণকুমারী যেন পুরুষোচিত বলিষ্ঠতার পরিচয় দিয়েছেন।

বাংলায় মহিলা পরিচালিত সাময়িকপত্রের সংখ্যা কম নয়! ১৮৭৫ থেকে ১৯১০ সাল পর্যন্ত সময়ের মধ্যে অন্ততঃ ২৬ জন সম্পাদিকার আবির্ভাব হয়েছিল। বলাবাহুল্য সবচেয়ে উল্লেখযোগ্য ছিলেন স্বর্ণকুমারী। ঠাকুরবাড়ির আরো অনেক মেয়ে এবং বৌ পত্র-পত্রিকা সম্পাদনার কাজে এগিয়ে এসেছেন, তবে সে অনেক পরে। জ্ঞানদানন্দিনীর কথা আগেই বলেছি। তিনি ছাড়াও ইন্দিরা, হিরণায়ী, সরল, প্রতিভা, প্রজ্ঞা, হেমলতা ও আরো অনেকে সম্পাদিকা হিসেবে কৃতিত্বের পরিচয় দিয়েছেন।

১৮৭৫ সালের জুলাই মাসে থাকমণি দাসীর সম্পাদনায় প্রথম মহিলা। পরিচালিত পত্রিকা প্রকাশিত হয়। তবে থাকমণি বোধহয় ছিলেন নামে মাত্র সম্পাদিকা। তাঁর বাবা এই পত্রিকা বার করেছিলেন। এর বছর দুই পরে ঠাকুরবাড়ি থেকে প্রকাশিত হয় ভারতী। সাত বছর পরে, কাদম্বরীর আকস্মিক মৃত্যুর পর স্বর্ণকুমারী এই পত্রিকার পরিচালনভার গ্রহণ করেন। তিনি যে একজন ভাল সম্পাদিকা একথা হয়ত জানাই যেত না, যদি না কাদম্বরীর আকস্মিক মৃত্যু ঘটত। শরৎকুমারীর ভাষায় এই দুর্দিনে তিনি নারীর পালন শক্তির পরিচয় দিলেন। শুধু কি তাই? এই ভারতীর জন্যেই স্বর্ণকুমারীকে লিখতে হল নতুন নতুন প্রবন্ধ, নাটক, প্রহসন কত কী!

মহিলা নাট্যকারের কথা বলেছি। কিন্তু তারা যে কোনদিন প্রহসন লিখবেন সেটা অনেকেই আশা করেনি। স্বর্ণকুমারী অনেকগুলো নাটক ছাড়া লিখেছেন দুটি প্রহসন। কারুণিক প্যাটার্নের গল্প-উপন্যাস লিখতে লিখতে তিনি যে হাসাতেও পারেন তারই দুটি সার্থক উদাহরণ হয়ে দাঁড়াল পাকচক্র আর কনেবদল। এছাড়া তিনি লিখেছেন অনেকগুলো শারাড! শারাড কথাটা শুনতে যত অপরিচিত লাগছে আসলে তা নয়। খানিকটা রঙ্গকৌতুক পরিবেশনই এর লক্ষ্য। অভিনয়ের মধ্যে থেকে দর্শককে হেঁয়ালিটি বার করতে হয়। যেমন ধরা যাক পাহাড় কথাটি। একজন সাজলেন বোগী, তার পায়ের হাড় ভেঙেছে। ডাক্তার এসে তার পা টিপে টাপে দেখলে; দর্শক বুঝল এর মধ্যে পাহাড় কথাটি লুকিয়ে আছে। স্বর্ণকুমারীর বৈজ্ঞানিক বর ও লজ্জাশীলা শারাড হিসেবে অতুলনীয়। প্রথম মহিলা শিশু সাহিত্যিক হিসেবেও স্বর্ণকুমারী স্মরণীয়। তার গল্পস্বল্পে (১৮৮৯) ছোটদের মনের কথা সুন্দরভাবে ধরা পড়েছে।

বঙ্কিমচন্দ্রের মতো স্বর্ণকুমারীও একসঙ্গে সৃষ্টি ও সংস্কারের কাজে হাত দিয়ে উপন্যাসের রম্যজগৎ ছেড়ে নেমে এসেছিলেন প্রবন্ধ লেখার দুরূহ কাজে। তাই, পৃথিবীর মতো কষ্টসাধ্য প্রবন্ধ লেখার পেছনেও তার আন্তরিকতাটুকু চোখে পড়ে। এমন বিষয় নিয়ে, এই রকেট নিয়ে গ্রহান্তরে ছুটে যাবার যুগেও, মেয়েরা বড় একটা প্রবন্ধ লেখেন না। হয়ত মহাবিশ্বলোকে ইশারায় কেঁপে ওঠে তাদের অন্তর। অথচ স্বর্ণকুমারী বিজ্ঞান বিষয়ক প্রবন্ধ লেখার কাজে হাত দিয়েছিলেন বঙ্কিমের বিজ্ঞানরহস্য প্রকাশের মাত্র সাত বছর পরে, রামেন্দ্রসুন্দর তখনও সাহিত্যের আসরে নামেননি। এমন সময় স্বর্ণকুমারী বিশ্বের শ্রেষ্ঠ ভূবিজ্ঞানীদের মতামত সংকলন করে সাতটি প্রবন্ধ লিখে বাঙালী মেয়েদের মধ্যে বিজ্ঞানালোচনার সূত্রপাত করেন। এসময় স্কুল বুক সোসাইটির উদ্যোগে স্কুলপাঠ্য ভূগোল ও বিজ্ঞানের নানারকম বই বেরিয়েছে। কিন্তু স্বর্ণকুমারী প্রবন্ধগুলি লেখেন নবজাগ্রত বাঙালী-মানসে পৃথিবী সংক্রান্ত যাবতীয় প্রশ্নের যথাসম্ভব ভাল উত্তর দেবার জন্যে।

বাংলায় বৈজ্ঞানিক প্রবন্ধ লেখবার সময় স্বর্ণকুমারী একটা কঠিন বাধার সম্মুখীন হয়েছিলেন সেটি হল বাংলা পরিভাষার অভাব। পারিভাষিক শব্দের অভাবে বাংলায় লাপলা, হারসেল, টমস, নর্মাণ, লাকিয়ার, গডফ্রে, ব্যালফোর, ফিগুয়ে প্রভৃতি ভূবিজ্ঞানীর মতামত প্রকাশ করতে গিয়ে স্বর্ণকুমারী প্রথম বেশ বিপদে পড়েছিলেন। তাই নিজেই কিছু পরিভাষা সৃষ্টি করেন। তার তৈরি করা পরিভাষার সংখ্যা কম নয়, তবে তার ঝোঁক ছিল সহজ ও সুশ্রাব্য শব্দের দিকে। যেমন :

ফার্ণ=পর্ণীতরু
পেনামব্রা=উপচ্ছায়া
সেন্সিটিভ = মোহিষ্ণু
সোলর স্পট =সূর্যবিম্ব
পিগমি = বালখিল্য
ট্রায়াসিক = ত্রিস্তর
য়ুনিভার্স= বিশ্বাকাশ
হিপনোটিস্‌ম্‌ =স্বাপ্নিকতা
ডিডাসন = অবরোহ

এইজাতীয় পরিভাষা সুনির্বাচিত শব্দচয়নে স্বর্ণকুমারীর কৃতিত্বের পরিচয় দেয়।

সাহিত্যচর্চা ও সমাজসেবার সঙ্গে সঙ্গে স্বর্ণকুমারী যোগ দিয়েছিলেন কংগ্রেস অধিবেশনে। তার স্বামী জানকীনাথ ছিলেন ভারতীয় কংগ্রেসের অন্যতম প্রধান নেতা। তাঁর সবচেয়ে প্রিয় কর্মক্ষেত্র ছিল ইণ্ডিয়ান ন্যাশনাল কংগ্রেস। কংগ্রেসের জন্ম থেকে আরম্ভ করে অনেকগুলো বছর তিনি এর সঙ্গে যুক্ত ছিলেন। তিনিই হয়েছিলেন কংগ্রেসের জেনারেল সেক্রেটারি। স্বামীর সঙ্গে স্বদেশপ্রেমে দীক্ষা নিয়েছিলেন স্বর্ণকুমারী। তিনি কংগ্রেসের পঞ্চম ও ষষ্ঠ অধিবেশনে যোগদান করেন। ঐ অধিবেশনে আরেকজন মহিলাও যোগ দিয়েছিলেন, তিনি প্রথম মহিলা চিকিৎসক কাদম্বিনী গঙ্গোপাধ্যায়। ঠাকুরবাড়ির সঙ্গে তারও কোন যোগ ছিল না তবে তৎকালীন নারী সমাজে তিনি রীতিমতো আলোড়ন জাগিয়েছিলেন। কাদম্বিনী যেখানে যেতেন, সেখানেই ভিড় জমে যেত তাকে দেখবার জন্য। স্বর্ণকুমারীর স্বদেশ চিন্তা তাঁর শেষ জীবনে লেখা উপন্যাসত্রয়ীতে যেমন প্রতিফলিত হয়েছে তেমনি প্রতিফলিত হয়েছে তার ছোট মেয়ে সরলার জীবনে। এমনকি তিনি ভেবেছিলেন সরলার বিয়ে দেবেন না, তাকে স্বদেশসেবায় উৎসর্গ করবেন। বিদেশের বিশেষত ইংলণ্ডে মেয়েদের স্বাধীনতা, আত্মনির্ভরতা এমনকি রাজনৈতিক কার্যকলাপে অংশগ্রহণ সব কিছুই স্বর্ণকুমারীর ভাল লাগত। তিনি জানতেন পুরুষেরা এজন্য বিরক্তি প্রকাশ করে, ঠাট্টা তামাসা করে কিন্তু তাদের সম্মানের চক্ষেই দেখে, তাদের হাতেই কলের পুতুলের মতো নাচে। ভারতের মেয়েরা কি এভাবে এগিয়ে আসবে না। যদিও স্বর্ণকুমারীর সাহিত্যকৃতি কোন পুরস্কারের মুখাপেক্ষী ছিল না তবু কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে তাকে সর্বোচ্চ সম্মান জগত্তারিণী স্বর্ণপদক দেওয়া হয়। এই পদকের প্রথম প্রাপক স্বর্ণকুমারীর ছোট ভাই বিশ্বকবি রবীন্দ্রনাথ। যতদূর জানি তিনিই প্রথম নারী, যিনি এই স্বর্ণপদক লাভ করলেন। ঠাকুরবাড়ির অন্দরমহলে স্বর্ণকুমারীর উজ্জ্বলতাই সবচেয়ে বেশি চোখে পড়ে।
যেখানে স্বর্ণকুমারী ও জ্ঞানদানন্দিনীর শিক্ষার গোড়াপত্তন হয়েছিল সেই ঠাকুরবাড়ির ঘরোয়া স্কুলটিতে আবার ফিরে যাওয়া যাক। এই ঘরোয়া স্কুলে কেউ স্পেশাল ক্লাস যদি করে থাকেন তবে তিনি নীপময়ী। প্রবল বিদ্যানুরাগী হেমেন্দ্রনাথ স্ত্রীকে সর্ববিদ্যায় পারদর্শিনী করে তুলতে চেয়েছিলেন। তার সে সাধ পূর্ণ করেছিলেন তার মেয়েরা। নীপময়ীই কি অপূর্ণ রেখেছিলেন স্বামীর মনোবাসনা? জ্ঞানদানন্দিনীর মতো নীপময়ী কোন হৈচৈ তোলেননি সত্যি, তবু এই বিরাট বাড়িটির অন্দরমহলে নারী জাগরণের কি রকম প্রস্তুতি চলেছিল, কি ভাবে তাদের স্বামীরা তাদের গ্রহণ করতেন জানবার জন্যেই পেছন ফিরে তাকানো যেতে পারে।

নীপময়ী দেবেন্দ্রনাথের প্রিয় বন্ধু হরদেব চট্টোপাধ্যায়ের মেয়ে। তার ছোট বোন প্রফুল্লময়ীও ঠাকুরবাড়ির বৌ হয়েছিলেন। হরদেব বন্ধুর অনুরোধে সৌদামিনীর সঙ্গে তাঁর নিজের দুই মেয়েকেও বেথুনে পাঠিয়েছিলেন। অবশ্য যারা বেগুনে পড়তে গিয়েছিলেন, তারা নীপময়ী-প্রফুল্লময়ী নন, তাদের দিদি অন্নদা ও সৌদামিনী। মহর্ষি এবং হরদেব দুই বন্ধু হলেও তাদের মধ্যে সামাজিক অবস্থার দুস্তর প্রভেদ ছিল। তাই নীপময়ীর বিয়ে নির্বিঘ্নে সম্পন্ন হয়নি। খুব গণ্ডগোল দেখা দিয়েছিল।

গণ্ডগোল হবে নাই বা কেন? হরদেব চট্টোপাধ্যায় কুলীন ব্রাহ্মণ, তিনি ব্রাহ্ম মতে পিরালী ব্রাহ্মণের সঙ্গে মেয়ের বিয়ে দেবার ব্যবস্থা করলে জ্ঞাতি কুটুষেরা দিশাহারা হয়ে ভাবলেন তাদের সবারই জাত যাবে। জাতকুল রক্ষার তোড়জোড় চলল ভালমতো। হরদেবের বড় ছেলে স্ত্রী-পুত্র নিয়ে বাড়ি ছেড়ে চলে গেলেন অন্য জায়গায়। শিশু পৌত্রের জন্যে বুকটা ফেটে গেলেও সংকল্পচ্যুত হলেন না হরদেব। দেবেন্দ্র যে তার প্রাণের বন্ধু, তার ছেলের সঙ্গে মেয়ের বিয়ে দেবেন, সেখানে সমাজ বাধা দেবার কে? এখন সমাজের ক্ষমতা আর তো নেই। এই তো সেদিন এক কুলীনের বউ স্বামীর বিরুদ্ধে মামলা করে খোরপোষ আদায় করলেন, খুব বেশিদিনের কথা নয়, মাত্র ১৮৫৬ সালের ঘটনা। বিদ্যাসাগর বিধবা বিবাহ দিয়েছেন। সমাজ কি আর করতে পারে? হরদেব ভয় পেলেন না।

অপর পক্ষও যে নিশ্চেষ্ট হয়ে বসেছিল তা নয়। একশ জন লাঠিয়াল নিয়ে তারা তৈরি হলেন যাতে বর এলেই লাঠির ঘায়ে তার পঞ্চত্ব প্রাপ্তি ঘটিয়ে কনেকে তুলে নিয়ে চম্পট দেওয়া যায়। তারপর? হয়ত দ্বাদশী নীপময়ীর জন্যে এক অন্তর্জলী যাত্রী কুলীন পাত্রকেও তারা জোগাড় করে রেখেছিলেন; তবে ব্যাপারটা এতদূর গড়াতে পারেনি। খবরটা জানাজানি হয়ে যাওয়ায় পুলিশপাহারা বসল বিয়েবাড়িতে। গোধূলি লগ্নে বরবেশে এলেন হেমেন্দ্রনাথ যেমন রূপ তেমনি সাজের বাহার, দেখে চোখ জুড়িয়ে গেল যেন। বেনারসী জোড়ের ওপর নানারকম গয়না—গলায় মুক্তোর মালা, হীরের হার, হাতে বাল, আঙুলে নানারকম আংটি ঝলমল করছে। বালিকা প্রফুল্লময়ীর দেখে মনে হয়েছিল বরবেশে বুঝি মহাদেব এসেছেন তার দিদিকে বিয়ে করতে।

সালঙ্কারা নীপময়ী হেমেন্দ্রকে সাতবার প্রদক্ষিণ করে পরিয়ে দিলেন বরণমালা। ব্রহ্মোপাসনা শেষ করে তারা বাসরে প্রবেশ করলেন। কৌতূহল হলে সেখানেও একটু উঁকি মেরে আস। চলে; কারণ হেমেন্দ্র আমার বিবাহ পুস্তিকায় সমস্ত খুঁটিনাটি বিবরণ লিখে রেখেছেন। ব্রাহ্ম বিবাহ বলে বাসরে অব্রাহ্ম মহিলারা আসেননি। তাই হেমেন্দ্রকেও অব্রাহ্মিক পরিহাস সহ্য করতে হয়নি। শুধু তাই নয়, পাছে তারা কোন পরিহাস করেন সেই ভয়ে হেমেন্দ্র স্ত্রীশিক্ষার প্রসঙ্গ তুললেন এবং তাদের বাড়ির অনেক মেয়ে সংস্কৃত ও ইংরেজী পড়তে পারেন বলে সমবেত মহিলাদের অবাক করে দিলেন। হেমেন্দ্রর এই উক্তি থেকে বোঝা যাচ্ছে যে, সেকালে সব ব্রাহ্ম মহিলাই উচ্চশিক্ষিতা ছিলেন না। সাধারণত আমরা ব্রাহ্মিকা বলতেই যা বুঝি তার বাইরেও অনেকে ছিলেন। সুকুমারী ও হেমেন্দ্রর এই ধরনের ব্রাহ্ম বিবাহ দেওয়ায় মহর্ষিভবনের সামাজিক গণ্ডিটি আরো ছোট হয়ে এল। কিন্তু সেদিকে তাকাবার সময় কারুর ছিল কি?

ঠাকুরবাড়িতে তখন নতুন ভাবের স্রোত বইছে। উৎসাহ-উদ্দীপনায় দিন কাটছে খেয়ালখুশির হালকা হাওয়ায় ওড়া পাখির মতো। বাইরের শিক্ষিত সমাজেও চলছে উৎসাহ উদ্দীপনা। সবচেয়ে বেশি পরিবর্তন নিয়ে আসছে ব্রাহ্ম সমাজ। কেশব সেন একদিন একদল ব্রাহ্ম মহিলাকে নিয়ে বরস নামে এক পাত্রীর বাড়িতে চায়ের নিমন্ত্রণ রাখতে গেলেন। চায়ের পেয়ালায় তুফান রোজই ওঠে। হেমেন্দ্রও এই ফাঁকে একটা কাজ করলেন। তিনি স্ত্রীকে লেখাপড়া শেখানোর সঙ্গে সঙ্গে গান শেখাবার ব্যবস্থা করে দিলেন।

এমন দুর্জয় সাহসের কথা তখন কেউ ভাবত না কারণ ভদ্রঘরের বাঙালী মেয়েরা মোটেই গান শিখতেন না। কবে থেকে এ ব্যবস্থা চালু হল বলা মুস্কিল, হয়ত ঔরঙ্গজেবের সময় থেকেই গানের চর্চা বন্ধ হয়েছিল। বাংলাদেশে গান শিখতেন পুরুষেরা, গান শিখত বাঈজীরাও। নটীর নূপুর নিক্কণে আর বাঈজীর কোকিল কণ্ঠের কাছে বাবুরা নিজেদের সর্বস্ব বিকিয়ে দিলেও সমাজের দিক থেকে ভদ্রঘরের মেয়েদের নাচগান শেখানো ছিল বড় নিন্দনীয়, গহিত ব্যাপার। মেয়েরা গান শোনার শখ মেটাত বৈষ্ণবীদের গান শুনে। তবে বাড়ির মধ্যে নিজের মনে তারা গুনগুন করতেন না এ কথা মোটেই বিশ্বাস্য নয় কারণ স্বর্ণকুমারী আর কাদম্বরী দুজনেই গান জানতেন। তবে ওস্তাদী হিন্দুস্থানী গান সঙ্গীতজ্ঞের কাছে শেখেননি।

হেমেন্দ্রনাথ এ বাধা না মেনে স্ত্রীকে গান শেখাবার জন্যে মহর্ষির কাছে অনুমতি চাইলেন। মহর্ষির রক্ষণশীল মন প্রথমটায় বুঝি সায় দিতে চায়নি। কিন্তু যা সত্যিই মন্দ নয় তাকে তিনি বাধা দেবেন কেন? পিতার অনুমতি পেয়ে হেমেন্দ্র বাড়ির গয়ক বিষ্ণু চক্রবর্তীর কাছে নীপময়ীর গান শেখার ব্যবস্থা করে দিলেন।

তারপর?

তারপর কি হল? যিনি একটা বড়সড় সংবাদ হয়ে উঠতে পারতেন, যাকে নিয়ে সমাজপতিরা আর একবার হাঁ হাঁ করে সমাজকে রসাতলে পাঠাতে পারতেন, পড়শিনীরা আর একবার গালে হাত দিয়ে ভাববার সুযোগ পেতেন, তাঁকে নিয়ে একটা গুঞ্জন পর্যন্ত উঠল না। কেন? মেজবৌ জ্ঞানদানন্দিনীর মতো নীপময়ী বাইরে ছড়িয়ে পড়েননি বলে? বিচিত্র মানুষের মন! দুই ভাইয়ের একজন স্ত্রীকে ভারতীয় নারীর আদর্শ করে তুলতে বিলেত পাঠান, আরেকজন স্ত্রীকে সর্ববিদ্যায় পারদর্শিনী করে তোলেন নীরবে নিভৃতে। জ্ঞানদানন্দিনী যদি নারী জাতির আদর্শ হন নীপময়ীও তো তাই। তবু দুজনের মধ্যে কত প্রভেদ।

নীপময়ী সম্বন্ধে আমাদের কৌতূহল শেষ পর্যন্ত থেকেই যায়। এগারোটি সুযোগ্য-সার্থক সন্তানের জননী নীপময়ী গান জানতেন, ছবি আঁকতেন, নানা ভাষার বই পড়তেন, দেশী বিলিতি রান্না করতেন। আমরা জানি, নতুন বৌ এলে তাকে ঠাকুরবাড়ির আদব-কায়দা শেখাবার ভার পড়ত নীপময়ীর ওপরে। মহর্ষির নির্দেশে ফুলতলির ভবতারিণীকেও গড়ে পিটে মৃণালিনী করে তুলেছিলেন আর কেউ নয়, এই নীপময়ী। অথচ কোনদিন তাকে নিজের কথা বলতে শোনা গেল না। বোঝা গেল না, সর্বগুণান্বিতা নীপময়ী জীবনকে কি ভাবে গ্রহণ করেছিলেন। একথা সত্যি, তিনি বহির্জগতে কোন প্রভাব বিস্তার করেননি। অন্যান্য সম্রান্ত পরিবারের শিক্ষিত বন্ধুর মতোই তার জীবন কেটেছে।

নীপময়ীর একটি সংবাদ আমাদের সবচেয়ে বেশি আকৃষ্ট করে সেটি হল তার ছবি আঁকা। সেদিন পুণ্য পত্রিকায় নীপময়ীর একটা ছবি চোখে পড়ল। ১৩০৭ সালের পুণ্যতে প্রকাশিত হরপার্বতী অতি সাধারণ একটি ছবি। চিত্রশিল্পী হিসেবে নীপময়ী হয়ত কিছুই হতে পারেননি তবু জানতে ইচ্ছে করে বৈকি। বাংলাদেশে ছবি আঁকার চর্চা প্রায় ছিলই না। পূর্ব যুগের পটশিল্প অবহেলায় হারিয়ে যাচ্ছিল। ভারতীয় শিল্পের অবস্থাও খুব ভাল নয়। এ সময় নীপময়ী ছবি আঁকা শিখেছিলেন। ডঃ অমৃতময় মুখোপাধ্যায়ের সৌজন্যে তার মাতামহ ক্ষিতীন্দ্রনাথের অপ্রকাশিত একটি খাতা মহর্ষিপরিবার-এর কিছুটা দেখবার সুযোগ হয়েছিল। তাতে ক্ষিতীন্দ্রনাথ তাঁর মায়ের কথা কিছু কিছু লিখেছেন, ছবি আঁকার কথাও আছে :

মায়ের আঁকা ছবি এখনও আমাদের তিন ভাইয়ের ঘরে কয়েকখানা আছে। কালিদাস পালের শিক্ষকতায় মা ইরুদিদির একটা ছবি এঁকেছিলেন। তাছাড়া একটা ক্লিওপেট্রার ছবি এঁকেছিলেন। White সাহেবের শিক্ষকতায় দিদির ছবি একেছিলেন।

দুঃখের বিষয় নীপময়ীর আঁকা ছবিগুলি সবই নষ্ট হয়ে গেছে। বিবরণ পড়ে মনে হয় নীপময়ী এদেশী এবং বিদেশী চিত্রশিল্পীর কাছে ছবি আঁকা। শিখলেও অঙ্কনশৈলীতে তার নিজস্ব কিন্তু ফুটে ওঠেনি। নীপময়ীর ছেলেমেয়েরাও ভাল ছবি আঁকতেন। ক্ষিতীন্দ্রনাথ তাঁর মায়ের শিক্ষকদের কথাও লিখেছেন। কালিদাস পালের মাসিক বেতন ছিল ত্রিশ টাকা আর white পেতেন একশ টাকা।

ছবি আঁকা ছাড়াও নীপময়ী সেকালের সুপ্রসিদ্ধ বেণীমাধববাবুর কাছে শিখেছিলেন বায়া-তবলা ও করতাল বাজাতে। নীপময়ীকে হেমেন্দ্রনাথ শেখাননি এমন বিষয় খুব কম ছিল। ক্ষিতীন্দ্রনাথ তাঁকে মিন্টনের প্যারাডাইস লস্ট ও সংস্কৃত অভিজ্ঞান শকুন্তলম্ পড়তে দেখেছিলেন। তবে নীপময়ীর সঙ্গীতচর্চা, চিত্রচর্চা, সবই নেপথ্যে রয়ে গেছে। শিক্ষার ফল শুধু দেখা গেছে তার মেয়েদের অসাধারণ গুণাবলীর মধ্যে। হয়ত তার ছোট বোন প্রফুল্লময়ীও এমনি আড়ালে থেকে যেতেন যদি-না তাঁর স্মৃতিকথাটি আমাদের কাছে পৌছে দিতেন সুধীন্দ্রনাথের বড় মেয়ে রমা। তিনিও জ্ঞানদানন্দিনী-স্বর্ণকুমারীর মতো কোন গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা নিয়ে বাংলার মেয়েদের চোখের সামনে কোন নজির সৃষ্টি করেননি। কিন্তু ঠাকুরবাড়ির অন্দরমহলে সর্বসুন্দরী, নীপময়ী, প্রফুল্লময়ীরাও তো ছিলেন।

প্রফুল্লময়ীর মতো হতভাগিনী নারীর সংখ্যা বেশি নেই। নাম তার প্রফুল্লময়ী, কিন্তু সারাটা জীবন তিনি চোখের জল ফেলে ঘরের কোণে বসে কাটিয়েছেন। রূপকথার রাজপ্রাসাদের মতো এই বিশাল ঠাকুরবাড়ির একটা ঘরে যে এত অশ্রুবিন্দু জমাট বেঁধে পাথর হয়ে উঠেছে সে কথাই বা কে জানত? জীবনের একেবারে শেষ পর্বে প্রফুল্লময়ী ব্যক্ত করলেন নিজেকে। না কর েঠাকুরবাড়ির সমস্ত আনন্দ উল্লাস ছাপিয়ে অব্যক্ত যন্ত্রণাক্লিষ্ট একটি অশ্রুসিক্ত অপরূপ মুখশ্র কি কোনদিন স্পষ্ট হয়ে উঠত? সুখ-দুঃখ আর হাসি-কান্নার টানাপোড়েনে তবেই না বোনা হয়েছে নারীজীবনের সার্থক ছবি।

প্রফুল্লময়ীর দুঃখ কোন সময়েই খুব স্পষ্ট হয়ে ওঠেনি। কি করে উঠবে? হঠাৎ-হারানোর হাহাকার রূপ পেতে পারে, তিল তিল করে জমে ওঠা বুকভাঙা বেদনার তো কোন রূপ নেই। অথচ প্রফুল্লময়ী পেয়েছিলেন সবই। ছোটবেলায় পুণ্যিপুকুর ব্রত করবার সময় সব মেয়েই যা চায়, সেই সব। দিদির বিয়ে হয়েছে বড় ঘরে। মহাদেবের মতো সুন্দর ভগ্নিপতি। গবে মাঝে মায়ের সঙ্গে দিদিকে দেখতে যেতেন ছোট্ট প্রফুল্লমঙ্গী। অবাক বিস্ময়ে দেখতেন দেউড়িদালানওয়ালা তিন মহলা বাড়িটিকে। কত ঘর, কত থাম, জানলা, রেলিং, দাসদাসী, আসবাবপত্র, আলমারিতে সাজানো কাঁচের-পুতুল–কত কী! তাঁকে দেখেও পছন্দ হয়ে গেল শরৎকুমারী ও স্বর্ণকুমারীর। কেমন স্বর্ণচাপার পাপড়ির ফিকে সোনার মতো চমৎকার গায়ের রঙ, পদ্মের পাপড়ির মতো টানা-টানা ডাগর দুটি ভ্রমরকৃষ্ণ চোখ, নিখুত মুখশ্রী, চমৎকার গড়ন, মিষ্টি গলা—আচ্ছা, বীরেন্দ্রের সঙ্গে বিয়ে দিলে কেমন হয়? যেমন ভাবা তেমন কাজ।

দুই বোনে তাড়াতাড়ি মেয়ে দেখার ব্যবস্থা করলেন। বীরেন্দ্র মহর্ষির চতুর্থ পুত্র, অত্যন্ত মেধাবী, বিশেষ করে অঙ্কে অসাধারণ আসক্তি। সুদর্শন। বেশ মানাবে দুজনকে। তাই মেয়ে দেখার প্রস্তাষ। এর আগে ঠাকুরবাড়িতে মেয়ে দেখা হত সাবেকীমতে। বাড়ির পুরনো ঝি খেলনা নিয়ে মেয়ে দেখতে যেত এবং তারা যাদের পছন্দ করে আসত তাদের সঙ্গেই বিয়ে হত। কিন্তু দিন বদলাচ্ছে সুতরাং আধুনিক মেয়ে দেখার পদ্ধতি যদি চালু করা হয় দোষ কি? একদিন প্রফুল্লময়ী আসতেই দুই বোনে মিলে তাকে সাজিয়ে বীরেন্দ্রকে দেখাবার জন্য টেনেটুনে বাইরের দিকের বারান্দায় নিয়ে যাবার চেষ্টা করলেন। গ্রামবালিকা প্রফুল্লময়ী, তখন তাঁর লজ্জাই বেশি। কাজেই তিনি কিছুতেই বীরেন্দ্রের সামনে বেরোলেন না। কোন রকমে ভেতরের দিকে চলে এলেন। তাতে অবশ্য বিয়ে আটকাল না। অতি বৃদ্ধা বয়সে স্মৃতিকথা বলার সময় প্রফুল্লময়ীর সব কথাই মনে পড়েছিল। সেই সব সুখের দিনের স্মৃতি।

এক ফাল্গুনী অপরাহ্নে দিদির মতোই একহাত ঘোমটা টেনে তাঞ্জামে চেপে প্রফুল্লময়ী এলেন স্বামীর ঘরে। শাশুড়ী-ননদ-জা-দিদির আদরে দিনগুলো শুরু হল স্বপ্নের মতো। ঠাকুরবাড়ি থেকে নতুন বৌ যৌতুক পেলেন গা-ভরা গয়না। গলায়—চিক, ঝিলদানা, হাতে চুড়ি, বালা, বাজুবন্দ; . কানে— মুক্তার গেচ্ছা, বীরবৌলি, কানবালা; মাথায় জড়োয়া সিথি; পায়ে গোড়ে, পায়জোড়, মল, ছানলা, চুটকী; কোমরে—দশ ভরির গেট, আরো কত কী! মনে হল সুখের বুঝি সীমা নেই।

স্মৃতিচারণের সময় প্রফুল্লময়ী ঠাকুরবাড়ির ছোট ছোট ছবি এঁকেছেন। সে ছবিগুলি আশ্চর্যরকমের ঘবোয়া। বাড়ির মধ্যে যে বিরাট পরিবর্তন হচ্ছিল, নারী পুরুষ সকলেই প্রগতির নেশায় মেতে উঠেছিলেন, প্রফুল্লময়ীর লেখা পড়ে তা বোঝাই যায় না। প্রফুল্লময়ী জানাচ্ছেন সাবেকী সব বাড়িতে যেমন হয়, তাদের বাড়িতেও ননদ-জায়েরা সবাই মিলে একসঙ্গে খেতে বসতেন। গায়ের মেয়ে বলে প্রফুল্লময়ী টানতেন দীর্ঘ ঘোমটা। একহাত ঘোমটার মধ্যে তিনি কি করে খান ভেবে না পেয়ে লুকিয়ে-কিয়ে উঁকি মারতেন জ্যোতিরিন্দ্রনাথ এবং খাওয়ার রকম দেখিয়া থাকিতে না পারিয়া নানারকম ঠাট্টা করিতে ছাড়িতেন না।

এরকম করেই দিন কাটছিল। মিষ্টি গলা। বলে তার গান শেখারও ব্যবস্থা হল। মাঝে মাঝে গলা মিলিয়ে গান করতেন কিশোর দেবর রবীন্দ্রনাথের সঙ্গে। কিন্তু চার বছর পরে সমস্ত সুখস্বপ্ন মিলিয়ে গেল ক্ষণিক বুদ্ধদের মতো। স্নান আহার ত্যাগ করে দিনে দিনে অস্বাভাবিক হয়ে উঠলেন বীরেন্দ্র। ক্রমশই অস্থিরতা বাড়তে বাড়তে রূপ নিল পাগলামির। লোকে বলে অঙ্ক কষতে কষতে বীরেন্দ্র পাগল হয়ে গিয়েছিলেন। ঘরের চার দেয়ালে বড় বড় অঙ্ক কষে রাখতেন কাঠকয়লা দিয়ে। শোনা যায়, একজন ইংরেজ অঙ্কবিদ সেই অঙ্কগুলি দেখে বিস্ময়ে হতবাক হয়ে যান। কিন্তু অন্য সময়ে বীরেন্দ্রের মধ্যে এই স্থিরতা ছিল না। প্রকাণ্ড সন্দেহের বিষে সবাইকে জর্জরিত করে তুলতেন। জোর করে তাকে এক চামচ ভাত বা একটি পটল পোড় খাওয়াতে হিমসিম খেতে হত সবাইকে। এমনি করে আরো তিন বছর কাটে কিন্তু প্রফুল্লময়ীর ভাঙা কপাল আর জোড়া লাগেনি। ধীরে ধীরে অতি অকালে ম্লান হয়ে আসে সদাহাস্যময়ী মুখখানি।

বাড়িতে যখন বসন্ত-উৎসব আর পুনর্বসন্তের মহড়া চলছে পুরোদমে, প্রফুল্লময়ীর চোখে তখন ঘন বর্ষার শ্রাবণধারা। মাঝে মাঝে বড় বিস্ময় লাগে। কেন এমন হয়? কি করে হয়? কিন্তু ভরা-ভোগের প্রাচুর্যের মধ্যে বদ্ধদুয়ার ঘরে একটি মেয়ের তিল-তিল করে শুকিয়ে যাওয়া চিরদিন কে মনে রাখে? প্রথমে দুঃখ পায়, সান্ত্বনা দেয়। তারপর ভুলে যায়। এ ঘটনা তো যে কোন বাড়িতে ঘটে। কিন্তু ঠাকুরবাড়ির মতো আলোকপ্রাপ্ত পরিবারেও এর কোন পরিবর্তন হল না? উন্নতমনা মহর্ষিও কি এই বিষাদ প্রতিমাটিকে কোন ভাবে সার্থক হয়ে ওঠার পথ দেখাতে পারতেন না? প্রফুল্লময়ী সমস্ত শোক তাপের উর্ধ্বে উঠতে পেরেছিলেন অধ্যাত্ম চিন্তার মধ্যে দিয়েই। কিন্তু সে তার একান্ত নিজস্ব উপলব্ধি, মহর্ষির উপদেশ বা সান্ত্বনাবাক্য কোনদিন তার পাথেয় বা পথের দিশারী কোনটাই হয়ে উঠেছিল বলে শোনা যায়নি।

এত দুঃখের মধ্যেও প্রফুল্লময়ীর ভাগ্য মাঝে কিছুদিন সুপ্রসন্ন হয়েছিল। না হলে অন্ধের নড়ির মতো রুগ্ন সন্তান বলেন্দ্রনাথের অল্প বয়সেই এত নামডাক হবে কেন? কিছুদিন পরে টুকটুকে বউ হয়ে এলেন সুশী বা সাহানা। এবার বোধহয় দুঃখ ঘুচল। প্রফুল্লময়ী আপনমনে স্বামীর পরিচর্যা করেন। ছেলে ও ছেলের বৌকে নিয়ে স্বপ্ন দেখেন। আবার বাদ সাধলেন বিধাতা। মাত্র কদিনের অরবিকারে শয্যা নিলেন বলে। যমে-মানুষে টানাটানি চলে কদিন। হিতাহিত জ্ঞান হারালেন প্রফুল্লময়ী! তারপর এল সেই দুর্যোগভরা ভয়ানক রাত্রি। ঘরে-বাইরে অশ্রুর তুফান। বলেন্দ্রের অবস্থা ক্রমেই খারাপ হয়ে আসছে। তার যন্ত্রণা চোখে দেখতে না পেরে বারবার বাইরে গিয়ে বসেছেন হতভাগিনী জননী। এক সময়ে রবীন্দ্রনাথ এসে বললেন, তুমি একবার তার কাছে যাও। প্রফুল্লময়ী জানতেন এ ডাক আসবে। তা বলে এত শীঘ্র! পুত্রের মৃত্যুশয্যার পাশে এসে দাঁড়ালেন প্রফুল্লময়ী।

সব শেষ হইয়া গেল। তখন ভোর হইয়াছে। সূর্যদেব ধীরে ধীরে কিরণচ্ছটায় পৃথিবীকে সজীব করিয়া তুলিতেছিলেন, ঠিক সেই সময় তাহার জীবনদীপ নিভিয়া গেল।

প্রফুল্লময়ী সব আঘাত সহ্য করলেন শান্ত মুখে, ঘোড়শী পুত্রবধুর মুখ চেয়ে। এমনই তার কপাল যে পুত্রবিয়োগ ব্যথায় তিনি শোকে তাপে ভেঙে পড়েননি বলে বাড়ির সবাই আশ্চর্য, বুঝি-বা বিরক্তও হলেন। স্বয়ং রবীন্দ্রনাথ স্ত্রীকে লিখলেন, নবোঠানের এক ছেলে, সংসারের একমাত্র বন্ধন নষ্ট হয়েছে তবু তিনি টাকাকড়ি কেনাবেচা নিয়ে দিনরাত যে রকম ব্যাপৃত হয়ে আছেন তাই দেখে সকলেই অশ্চর্য এবং বিরক্ত হয়ে গেছে। কবি চিঠিটা লিখেছিলেন বলেন্দ্রের শ্রাদ্ধের আগের দিন। প্রফুল্লময়ীর স্মৃতিকথা পড়ে মনে হয় কেনাবেচা কাজ-কর্ম নিয়ে তিনি দুঃখ ভোলার চেষ্টা করছিলেন। নয়ত তিনি জল-ঝড় উপেক্ষা করে বলেরে ঘরের সামনে দিনরাত পড়ে থাকতেন কেন?

এরপরেও পুত্রবধূর মৃত্যু, স্বামীর মৃত্যু, ভাইয়ের মৃত্যু, বিষয় থেকে বঞ্চিত হওয়ায় অর্থাভাব প্রভৃতি নানা বিপর্যয় প্রফুল্লময়ীর জীবনে আনাগোনা করেছে। তিনি তার হিসেব রাখেননি। বুকজোড়া শূন্যতার হাহাকার প্রশমিত হবার পর তিনি যখন আমাদের কথা বলতে বসেছেন তখন আর কারুর বিরুদ্ধে তাঁর কোন অভিযোগ নেই, নেই কোন বঞ্চনার গ্লানি। নির্বেদ বিষণ্ণতার মধ্যে নিজেকে নিমজ্জিত করে তিনি যে শান্তি পেয়েছেন, দুঃখশোকহীন সুখের তরঙ্গে ভেসে বেড়ালে তা কোনদিনই পেতেন না। যে স্পর্শমণি পাবার জন্য মানুষ আকুল হয়ে ঘুরে বেড়ায়, বেদনার সিন্ধু মন্থন করে সেই অমৃতের সন্ধান প্রফুল্লময়ী যেদিন পেলেন, সেইদিন তিনি বিশ্বচরাচরের সব কিছুর মধ্যে বলেন্দ্রকে আবার ফিরে পেলেন। এই পাওয়াই তাঁর জীবনের চরম প্রাপ্তি। তিনি লিখেছেন,

মনে হয়, সে আঙিনায় সেই পূর্বের মতো হাসিয়া খেলিয়া বেড়ায়। পূর্বাকাশে ভোরের আলোতে তাহারই মুখখানি জ্বলজ্বল করে। সূর্যাস্তের সঙ্গে সঙ্গে সেও যেন ঘুমের অচেতনে আমার কোলে ঢলিয়া পড়ে। আমার বলুকে আমি হারাইয়াও হারাই নাই বরং তাহাকে আরও নিকটে পাইয়াছি বলিয়া মনে হয়। এক সে আমার বহু হইয়া অহরহ আমার সম্মুখে ঘুরিয়া ঘুরিয়া বেড়াইতেছে, আজ সে অনন্তরূপে অনন্ত বাহু মেলিয়া আমার বুকে ঝাপাইয়া পড়িয়াছে।

ঠাকুরবাড়ির অন্তঃপুরকে সার্থক করে তোলার জন্যে প্রফুল্লমঙ্গীর এই ঐশ্বরিক উপলব্ধিরও প্রয়োজন ছিল। নইলে মনে হতে পারত ঠাকুরবাড়ির অন্তঃপুরিকারা নানা-কেতায় পোষাক পরে, বেড়াতে বেরিয়ে, ঘোড়ায় চেপে, চুল বেঁধে আর রান্না করে বাঙালী মেয়েদের শুধু বহির্মুখী করেই তুলেছেন। কিন্তু তা তো নয়। এ বাড়িতে প্রাচ্য ও প্রতীচ্যের মহাসঙ্গম ঘটেছে। বহিমু খী ধারার সঙ্গে মিশেছে অন্তর্মুখী সাধনার ধারা। প্রফুল্লময়ী সর্বপ্রথম শোকসাগর মন্থন করে সেই অমৃতের সন্ধান এনে দিলেন।

কোন কিছুই কারুর জন্যে থেমে থাকে না। বিশাল ঠাকুরবাড়ির এক কোণে যখন প্রফুল্লময়ীর জীবনে দুর্ভাগ্যের কালোছায়া নেমে আসছে ঠিক তখনই বাড়ির আরেক প্রান্তে বেজে উঠছে খুশির সানাই বারোয়া সুরে। চতুর্দোলায় চড়ে আর একটি ছোট্ট মেয়ে গোধূলি লগ্নের সিঁদুরি রঙে-রাঙ্গা চেলি পরে প্রবেশ করলেন ঠাকুরবাড়িতে। তার কঁচা শামলা হাতে সরু সোনার চুড়ি, গলায় মোতির মালা সোনার চরণচক্র পয়ে। বাড়ির ছোট্ট ছেলেটির হঠাৎ মনে হল এতদিন যে রাজার বাড়ি খুঁজে খুঁজে সে হয়রাণ হয়েছে, খুজে পায়নি, সেই বাড়িটিরই বুঝি খবর নিয়ে এল এই রূপকথার রাজকন্যে, তার নতুন বৌঠান। কল্পনার দৌড় গেল বেড়ে।

কাদম্বরী যশোরের সেই পরিচিত রায়বংশের মেয়ে নন, তিনি কলকাতাবাসিনী। তার বাবা শ্যামলাল গাঙ্গুলির সঙ্গে ঠাকুরবাড়ির যোগাযোগ অনেকদিন ধরেই ছিল। কাদম্বরীর পিতামহ জগন্মোহনের সঙ্গে বিয়ে হয়েছিল দ্বারকানাথের মামাতো বোন শিরোমণির। কাজেই এ বিবাহে মহর্ষির আপত্তি ছিল না। বাধা দিয়েছিলেন তার মেজ ছেলে সত্যেন্দ্র। তিনি তখন বিলেত থেকে ফিরে এসেছেন, চোখে কত রঙ্গিন স্বপ্ন! ছোট ভাই জ্যোতিরিন্দ্রর বধূ রূপে তিনি মনে মনে মনোনীত করে রেখেছেন ডাঃ সূর্যকুমার গুডিব চক্রবর্তীর মেয়েকে। শিক্ষিত মেয়ের সঙ্গে ভাইয়ের বিয়ে হবে, তার বদলে কিনা বাল্যবিবাহ! আট বছরের একটি খুকি? এরপরে কি জ্যোতি বিলেত যাবে? যদি যায় তো ফিরে এসে কি এই ছোট্ট মেয়েটিকে জীবনসঙ্গিনীরূপে গ্রহণ করতে পারবে? শেষে নষ্ট হয়ে যাবে না তো দুটি অমূল্য জীবন! কিছুতেই কিছু হল না। একে পিরালী তায় ব্রাহ্ম ঠাকুরবাড়ির অবস্থা তখন একঘরে হওয়ার মতো, তাই জ্যোতিরিন্দ্রের জন্যে যে মেয়ে পাওয়া গেছে তার সঙ্গেই বিয়ে হল। সত্যেন্ত্রের সমস্ত আশংকা মিথ্যে করে দিয়ে কাদম্বরী ঠাকুরবাড়ির যোগ্যতম বধূ হয়ে উঠলেন।

তিনি এ বাড়িতে এসে তিন তলার ছাদের ওপর গড়ে তুললেন নন্দন কানন। বসানো হল পিল্পের ওপর সারি সারি লম্বা পাম গাছ, আশেপাশে চামেলি, গন্ধরাজ, রজনীগন্ধা, করবী, দোলনচাঁপা। এল নানারকম পাখি। দেখতে দেখতে বাড়িটার চেহারা যেন বদলে গেল। গৃহসজ্জার দিকে নববধূর প্রথম থেকেই সতর্ক দৃষ্টি ছিল। কিশোর রবীন্দ্রনাথের সৌন্দর্যবোধকে সবচেয়ে উঁচু তারে বেঁধে দিয়েছিলেন এই কাদম্বরী, সেই বাধন কোনদিন শিথিল হয়নি।

ঠাকুরবাড়ির অন্দরমহলের যা কিছু দান, তার সব কিছুর সঙ্গে জড়িয়ে আছেন কাদম্বরী। অথচ, খুবই আশ্চর্যের ব্যাপার, নিজে তিনি কোন কিছুতেই অংশ গ্রহণ করতেন না। শুধু অপরের প্রাণে প্রেরণার প্রদীপটিকে উজ্জীবিত করে ভোলাই ছিল তাঁর জীবনের ব্রত। আসলে আমরা যাকে বলি রোম্যান্টিক সৌন্দর্যবোধ, কাদম্বরীর সেটি পুরোমাত্রায় ছিল। ঠাকুরবাড়িতে এসে অনুকূল পরিবেশ হয়ত বৃদ্ধি পেয়েছিল কিন্তু এই চেতনা ছিল তার মানস-গভীরে। তাই বাইরে থেকে এসে এ বাড়ির প্রাণপুরুষকে জাগিয়ে দিতে তিনি যতখানি সফল হয়েছেন আর কেউ তা পারেননি।

কাদম্বরীকে নিয়ে এত বেশি আলোচনা হয়েছে যে তার সম্বন্ধে নতুন করে কিছু বলতে চেষ্টা করা বাহুল্যমাত্র। অবশ্য এই আলোচনা-সমালোচনার কারণ রবীন্দ্রনাথ। কিশোর রবীন্দ্রনাথের মনোগঠনে কাদম্বরীর দান অসামান্য। তার অকালমৃত্যু রবীন্দ্রমানসে গভীর ছাপ রেখে যায়। একথা কবি নিজেই অসংখ্য কবিতা ও গানের মধ্যে প্রকাশ করেছেন। সুতরাং যারা তাদের নিয়ে অনেক কল্পনা এবং কষ্ট-কল্পনা করেন তাদের সুযোগ করে দিয়েছেন স্বয়ং রবীন্দ্রনাথ, একথা বললে খুব ভুল বলা হবে না। কবি নিজেও জানতেন সেকথা। তাই কৌতুক করে শেষ বয়সে বলতেন, ভাগ্যিস নতুন বৌঠান মারা গিয়েছিলেন তাই আজও তাকে নিয়ে কবিতা লিখছি—বেঁচে থাকলে হয়ত বিষয় নিয়ে মামলা হত।

জোতিরিন্দ্রনাথ প্রথম জীবনে কিছুটা গোঁড়ামির পরিচয় দিলেও সত্যেন্দ্রজ্ঞানদানন্দিনীর প্রভাবে নব্যভাবের নেশায় মেতে উঠলেন। সাবেক সংস্কার ত্যাগ করে তিনি কাদম্বরীকেও ঘোড়ায় চড়া শিখিয়েছিলেন এবং গঙ্গার ধারে নির্জনে শিক্ষাপর্ব শেষ হলে কাদম্বরী প্রতিদিন স্বামীর সঙ্গে ঘোড়ায় চড়ে গড়ের মাঠে হাওয়া খেতে যেতেন। তাঁদের দেখে অবাক বিস্ময়ে যারা কানাকানি করত তাদের কথা প্রথমেই বলেছি। কাদম্বরীর অশ্বারোহণ বেশ আলোড়ন জাগিয়েছিল। কাদম্বরী ঠিক কোন সময় ঘোড়ায় চড়তেন সেকথাও জানা যায়নি। কেউই সঠিক সময় নির্দেশ করেননি। তবে এ ব্যাপারে কাদম্বরীকে একমাত্র অশ্বারোহিণী বঙ্গললনা বলা চলে না। কারণ আরো কয়েকজনের কথা আমরা শুনেছি। তারা কাদম্বরীর পূর্ববর্তিনী হয়ত নন কিন্তু সমসাময়িক বা অল্প পরবর্তী যে সে বিষয়ে সন্দেহ নেই। য়ুরোপীয় শিক্ষার অঙ্গ হিসেবে আধুনিকারা ঘোড়ায় চড়া শিখতেন। সাহেবদের অনুকরণ করতেন দেশী সাহেব অর্থাৎ ভারতীয় আই. সি. এস. অফিসারেরা। সত্যেন্দ্রনাথকে অনেকেই জিজ্ঞেস করেছিলেন যে তার স্ত্রী ঘোড়ায় চড়তে পারেন কিনা। সত্যেরে পরেই যে তিনজন বাঙালী সিভিলিয়ান অফিসার হয়েছিলেন তারা—রমেশচন্দ্র দত্ত, বিহারী লাল গুপ্ত ও সুরেন্দ্রনাথ বন্দ্যোপাধ্যায়। এঁরা আচার-বিচার চালচলনে পুরো সাহেব হয়ে গিয়েছিলেন। সুরেন্দ্রনাথের স্ত্রী শ্রীহট্টে ঘোড়ায় চড়ে বিকেলে হাওয়া খেতে বেরোতেন। লর্ড সত্যেন্দ্র প্রসন্ন সিংহের মেয়ে রমলা এবং কুচবিহারের মহারাণী সুনীতিদেবীর মেয়েরাও ঘোড়ায় চড়তে জানতেন। হেমেন্দ্রনাথের মেয়েরাও কেউ কেউ এ ব্যাপারে কৃতিত্ব দেখিয়েছেন তবে এর এসেছেন অনেক পরে। সেকালের আধুনিক মেয়েরা অনেক ব্যাপারেই অভিনবত্ব দেখিয়েছেন। এঁদের সবচেয়ে আধুনিকতা ছিল স্বামী বা সঙ্গীনির্বাচনের অভিনবত্বে। ঠাকুরবাড়ির মেয়ে-বৌরা ঠিক এই ধরনের মানসিকতার পরিচয় দিতে পারেননি। তারা সনাতন ধারাটিতেই এনেছেন নতুন কালের ছন্দ। বগহীন উন্মত্ত মুক্তির স্রোতে হয়ত উন্মাদনা আছে কিন্তু সুস্থ মানসিকতা কোথায়? ঠাকুরবাড়ির কোন মেয়েই এমন হালকা হাওয়ার খেয়ালী নেশায় মেতে ওঠেননি। তাই নারী সমাজের ওপর তাদের মোহরের ছাপটাই সবচেয়ে গভীর!

কাদম্বরী শুধু ঘোড়ায় চড়ে বেড়াতেই বেরিয়েছিলেন তা নয়, সাধারণী নারীদের চোখে এঁকে দিয়েছিলেন এক দুঃসহ স্পধার মায়াঞ্জন, অনেকের বুকে তিনি জাগিয়েছিলেন দুঃসাহস। মেয়েরা দেখল হালকা-হাওয়ায় উড়ে আসা। বুদ্বুদের ফেনার মতো পশ্চিমীধারায় মানুষ হওয়া মেয়ে নয়, পথে ঘোড়ায় চড়ে চলেছেন তাদেরই মতো এক গৃহবধূ। বাস্তবিকই মেয়েলি কাজে কাদম্বরীর সুতীব্র আগ্রহ ছিল। সুপুরি কাটতেন নিয়মিত। প্রতিদিনের তরকারি কাঁটার আসরে তিনি যেমন উপস্থিত থাকতেন তেমনি দেখাশোনা করতেন বাড়ির ছোট ছোট ছেলেমেয়েদের। কারুর জ্বর হলে আর রক্ষে নেই, কাদম্বরী গিয়ে বসতেন তার শিয়রে। সদ্য মাতৃহারা বালক দেবরটিকেও তিনি পরম স্নেহে কাছে টেনে নিয়েছিলেন অথচ কতই বা বয়স তার? রবীন্দ্রনাথের চেয়ে মাত্র এক বছরের বড়।

কাদম্বরীর প্রধান পরিচয় তিনি অসাধারণ সাহিত্যপ্রেমিকা ছিলেন। বাংলা বই তিনি পড়তেন শুধু সময় কাঁটাবার জন্য নয়, সত্যিই উপভোগ করতেন। পড়তেন দ্বিজেন্দ্রনাথের স্বপ্নপ্রয়াণ, বঙ্কিমচন্দ্রের বিষবৃক্ষ। দুপুর বেলায় রবীন্দ্রনাথও পড়ে শোনাতেন তাকে। হাতপাখা নিয়ে হাওয়া করতেন কাদম্বরী, কারণ আপন মনে পড়ার চেয়ে শুনতেই বেশি ভাল লাগত তার। ভারতী পত্রিকা নিয়েও তার ভাবনা ছিল। ভারতীর ছাপার হরফে তাঁর নাম নেই সত্যি কিন্তু তিনিই ছিলেন ঐ পত্রিকার প্রাণ। সে কথা বোঝা গিয়েছিল তার মৃত্যুর পরে। পূর্বোক্ত নন্দন কাননে সন্ধ্যেবেলা বসত গান ও সাহিত-পাঠের আসর। আসরে যোগ দিতেন বাড়ির অনেকে, বাইরে থেকে আসতেন অক্ষয়। চৌধুরী ও তার স্ত্রী শরৎকুমারী লাহোরিণী, জানকীনাথও থাকতেন সেখানে, আর মাঝে মাঝে আসতেন কবি বিহারীলাল! জ্যোতিরিন্দ্রনাথ, রবীন্দ্রনাথ ও স্বর্ণকুমারী ছিলেন এ সভার স্থায়ী সভ্য। কাদম্বরী বিহারীলালের কবিতা পড়তে খুব ভালবাসতেন ও মাঝে মাঝে তাকে নিমন্ত্রণ করে খাওয়াতেন। শুধু তাই নধু, নিজের হাতে একটা আসন বুনে উপহার দিয়েছিলেন। আসনের ওপর, প্রশ্নচ্ছলে কার্পেটের অক্ষরে লেখা ছিল সারদামঙ্গল কাব্যেরই কয়েকটা লাইন। কবি সে উত্তর দেবার জন্যে আর একটা কাব্য যখন রচনা করেন,

তখন কাদম্বরী ইহলোকে নেই। বিহারীলাল তাঁর উপহারকে স্মরণ করে। কাব্যের নাম দিয়েছিলেন সাধের আসন। আসনদাত্রী দেবীর উদ্দেশে লিখেছিলেন?

তোমার সে আসনখানি
আদরে আদরে আনি,
রেখেছি যতন করে চিরদিন রাখিব;
এ জীবনে আমি আর
তোমার সে সদাচার,
সেই স্নেহমাখা মুখ পাশরিতে নারিব।

ছাদের বাগানে সন্ধ্যেবেলা বসত পরিপাটি গানের আসর। মাদুরের ওপর তাকিয়া, রূপোর রেকাবে ভিজে রুমালের ওপর বেলফুলের গোড়ের মালা, এক গ্লাস বরফজল, বাটা ভরতি হুঁচি পান সাজানো থাকত। কাদম্বরী গা ধুয়ে চুল বেঁধে তৈরি হয়ে বসতেন সেখানে, জ্যোতিরিন্দ্র বাজাতেন বেহালা, রবীন্দ্র ধরতেন চড়া সুরের গান, সে গান সূর্য ডোবা আকাশে ছাদে ছাদে ছড়িয়ে যেত। হু হু করে দক্ষিণে বাতাস উঠত দূর সমুদ্র থেকে, তারায় তারায় যেত আকাশ ভরে। কিশোর রবীন্দ্রনাথের রোম্যান্টিক সৌন্দর্যচেতনাকে জাগাবার জন্য এই পরিবেশ এই সৌন্দর্যদৃষ্টি ও কল্পনার একান্ত প্রয়োজন ছিল।

পরবর্তীকালে রবীন্দ্রনাথ এবং তাঁর নতুন বৌঠান কাদম্বরীকে নিয়ে বহু আলোচনা হয়েছে। মাঝে মাঝে অনুচিত সন্দেহ এসে যে কাঁটা বেঁধায়নি তাও নয়। বিশেষতঃ রবীন্দ্রনাথের বিবাহের কয়েকমাসের মধ্যে কাদম্বরীর মৃত্যু সংশয় সৃষ্টি করেছিল। রবীন্দ্রমানস গঠনে এই অসামান্যা নারীর দান চিরস্মরণীয়। তার কবি হয়ে ওঠার কথা পড়ে মনে হয় তাঁর আন্তরিক চেষ্টার মূলে ছিলেন কাদম্বরী। বৌদিদির চোখে নিজেকে যত দামী করে তোলার চেষ্টা চলছিল, কাদম্বরী মুখ টিপে হেসে ততই অগ্রাহ্য করে গেছেন দেবরটিকে :

রবি সবচেয়ে কালো, দেখতে একেবারেই ভালো নয়, গলা যেন কী রকম। ও কোনোদিন গাইতে পারবে না, ওর চেয়ে সত্য ভালো গায়।

বলতেন :

কোনোকালে বিহারী চক্রবর্তীর মতো লিখতে পারবে না। রবীন্দ্রনাথের তখন শুধুই মনে হত কী করে এমন হব যে আর কোন দোষ তিনি খুঁজে পাবেন না। বুঝতেন না, সেই সাধনাই করছেন কাদম্বরী, যাতে কেউ কোনদিন রবির দোষ খুঁজে না পায়। যখন একথাটা বোঝার মতো করে বুঝলেন তখন কাদম্বরী হারিয়ে গেছেন চির অন্ধকারে, প্রতিভার প্রদীপে তেল-সলতে যোগানো সারা, আলো জ্বালার কাজ শেষ। কবির কথায় বারবার এসেছে কাদম্বরীর কথা, খুব ভালবাসতুম,তাকে। তিনিও আমায় খুব ভালবাসতেন। এই ভালবাসায় নতুন বৌঠান বাঙালী মেয়েদের সঙ্গে আমার প্রাণের তার বেঁধে দিয়ে গেছেন। তাই তো সারাজীবন ধরে চলে তার অনুসন্ধান :

নয়ন সম্মুখে তুমি নাই
নয়নের মাঝখানে নিয়েছ যে ঠাঁই।

আমরা রবীন্দ্রকাব্য আলোচনায় যাব না, তবে তার বহু কবিতায় বহু গানে মিশে রয়েছেন কাদম্বরী, ছবিতে ধরা পড়েছে তার চোখের আভাস। সব মিলে কাদম্বরী আজ আমাদের কাছে বাস্তবে-কল্পনায় মেশা একটা অপরূপ চরিত্র হয়ে আছেন। কবি নারীকে বলেছেন, অর্ধেক মানবী তুমি অর্ধেক কল্পনা— কাদম্বরীও তাই। রোম্যান্টিক স্বপ্ন-সঞ্চারিণী নতুন বৌঠানের মধ্যে হারিয়ে গেছেন মানবী কাদম্বরী।

ঠাকুরবাড়ির অন্দরমহলে কাদম্বরীর আরেকটি ভূমিকাও স্মরণীয়। তিনি ছিলেন সুঅভিনেত্রী এবং সুগায়িকা। নাট্যরসিক জ্যোতিরিন্দ্রর মন আরো উজ্জীবিত হয়ে উঠেছিল গুণবতী স্ত্রীকে পেয়ে। বাইরের জোড়াসাঁকো-থিয়েটার বন্ধ হয়ে গেছে। তিনি নিজেই লিখতে শুরু করলেন নাটক-প্রহসন-গীতিনাট্য, অভিনয়ের ব্যবস্থাও হল। একেবারে ঘরোয়া পরিবেশে, বাড়ির উঠোনে। বাড়ির মধ্যে অভিনয়ে মেয়েদের যোগ দিতে বাধা কি? কাদম্বরীকে কেউ বাধা দিলেন না। তিনি এসে দাঁড়ালেন পাদপ্রদীপের আলোয়। প্রথম অভিনয় স্বর্ণকুমারীর বসন্ত উৎসব, না কি জ্যোতিরিন্দ্রর অলীকবাবু? প্রথমে যার নাম ছিল এমন কর্ম আর করব না। রচনার সময় হিসেবে এমন কর্ম আর করব না পূর্ববর্তী। সুতরাং বসন্ত-উৎসবের চেয়ে তার দাবি বেশি। যদি ধরে নেওয়া যায় এ প্রহসন লেখার পরই অভিনয়ের ব্যবস্থা হয় এবং রবীন্দ্রনাথ নায়কের ভূমিকায় অবতীর্ণ হন, তাহলে প্রহসনটি অভিনীত হয়েছে রবীন্দ্রের প্রথম য়ুরোপযাত্রার আগে এবং এটাই ছিল কাদম্ববীর প্রথম অভিনয়।

প্রথম বা দ্বিতীয় যাই হোক না কেন এমন কর্ম আর করব না মঞ্চসফল নাটক। এই নাটকে বাড়ির অনেকেই সানন্দে যোগ দিয়েছিলেন। রবীন্দ্রনাথ অলীক বাবু, দ্বিজেন্দ্রনাথ সত্যসন্ধ, জ্যোতিরিন্দ্রনাথ চীনেম্যান, অলীকের বন্ধু অরুণেন্দ্রনাথ, গদাধর শরৎকুমারীর স্বামী যদুনাথ মুখোপাধ্যায়। পিসনি বা প্রসন্নাসীর ভূমিকায় অভিনয় করেছিলের মহর্ষির ছোট মেয়ে বর্ণকুমারী।

রবীন্দ্রনাথের ছোট দিদি বর্ণকুমারী সম্বন্ধে আমরা খুব কম জানি। অথচ তিনি রবীন্দ্রনাথের পরেও অনেকদিন জীবিত ছিলেন। শিল্প বা সাহিত্যের দিকে নজর দিতে না পারলেও বর্ণকুমারী ভাল অভিনয়ের নজির সৃষ্ট করে গেছেন প্রসন্ন চরিত্রাভিনয়ে। বালিকা ইন্দিরার মনে সে অভিনয় দাগ কাটে, তিনি প্রসন্ন সেজে দাসীদের অতি স্বাভাবিক আচরণ অভিনয় করে দেখালেন একদিন। অন্যান্য বড় নাটকে তাকে অংশগ্রহণ করতে দেখা না গেলেও অভিনয়ের প্রতি তার আকর্ষণ ছিল। বহু বার নাটকে রিহার্সালে তিনি উপদেষ্টার ভূমিকা গ্রহণ করেছেন। কিন্তু তার নিজের অভিনয়ের কথা বড় একটা শোনা যায়নি। বর্ণকুমারীর বিয়ে হয়েছিল কবি-সাহিত্যিক রাজকৃষ্ণ মুখোপাধ্যায়ের ছোটভাই সতীশচন্দ্রের সঙ্গে। চিকিৎসক হিসেবে তিনি দেশ-বিদেশে খ্যাতি লাভ করেন। কারমাইকেল মেডিক্যাল কলেজের (আর. জি. কর) অন্যতম প্রতিষ্ঠাতারূপে তিনি সর্বজন-পরিচিত। জার্মান ভাষাতেও তার অগাধ পাণ্ডিত্য ছিল কিন্তু দুরারোগ্য ক্যানসারে তার অকাল মৃত্যু হয়।

বর্ণকুমারী শরৎকুমারীর মতোই অতিমাত্রায় সাংসারিক ছিলেন। খুব ভাল রাখতে পারতেন, সেলাই করতেন, আবার গানও জানতেন। ভালবাসতেন উপাসনা সেরে দেবেন্দ্রনাথের ব্রহ্মসঙ্গীত গাইতে। কিছু কিছু লিখেছেনও কিন্তু লজ্জায় সংকোচে নিজের নামে প্রকাশ করতে পারেননি। তাই আজ পুরনো ভারতীর পাতা থেকে তার বেনামী লেখাগুলো খুঁজে বার করা খুবই কঠিন। খুব বৃদ্ধ বয়সেও ভাইফোঁটার দিন জোড়াসাঁকোয় এসে কবিকে ফোঁটা দিয়ে যেতেন বর্ণকুমারী। রবীন্দ্রনাথের মৃত্যু পর্যন্ত তাদের যোগাযোগ অটুট ছিল।

আবার ফিরে আসি নাটকের কথায়। এই নাটকের সবচেয়ে দুরূহ ভূমিকাটিই হচ্ছে হেমাঙ্গিনীর। বঙ্কিম-উপন্যাস পড়া উনিশ শতকের রোম্যান্টিক নায়িকা এমন কর্ম আর করব না-র হেমাঙ্গিনী। আবেগগর্ভ আদিরসকে পরিহাসতরল হাস্যরসে পরিণত করে আজও সে অমর হয়ে আছে। অনেকেই মনে করেন এই ভূমিকাভিনেত্রী ছিলেন কাদম্বরী। অথচ ইন্দিরার স্মৃতিতে অলীকবাবুর যে অভিনয়টি স্মরণীয় হয়ে আছে সেটিতে হেমাঙ্গিনী সেজেছিলেন অক্ষয় চৌধুরীর স্ত্রী শরৎকুমারী। রবীন্দ্রজীবনীকার প্রভাতকুমার মুখোপাধ্যায়ও ইন্দিরাকে অনুসরণ করে শরৎকুমারীকেই হেমাঙ্গিনীর ভূমিকাভিনেত্রী বলেছেন। অপরদিকে সজনীকান্ত দাস সরাসরি কবিকে প্রশ্ন করেছিলেন, হে কে? প্রশ্ন করার কারণ, কবি ভগ্নহৃদয় গ্রন্থাকারে প্রকাশিত হবার সময় সেটি উৎসর্গ করেন শ্ৰীমতী হে—কে। কবি সজনীকান্তকে পাল্টা প্রশ্ন করেন, তোমার কি মনে হয়? সজনীকান্ত বলেছিলেন, হেমাঙ্গিনী। অলীকবাবুতে আপনি অলীক ও কাদম্বরীদেবী হেমাঙ্গিনী সাজিয়াছিলেন। সেই নামের আড়ালের সুযোগ। আপনি গ্রহণ করিয়াছিলেন।

কবি স্বীকার করেন, ইহাই সত্য অন্য সব অনুমান মিথ্যা।

এই শ্ৰীমতী হে নিয়েও কম সংশয় নেই। ইন্দিরা মনে করেন হের পুরো নাম হেকে টি, গ্রীক পুরাণের ত্রিমুণ্ড দেবী, সংক্ষেপে কাদম্বরীর ডাকনাম। তবে ইন্দিরা দেখেননি বলেই যে কাদম্বরী হেমাঙ্গিনীর ভূমিকায় কখনো অভিনয় করেননি তা মনে হয় না। ১৮৭৭ সালে যদি প্রথম অভিনয় হয়ে থাকে তখন ইন্দিরা এদেশে ছিলেন না, পরেও তিনি যে সব সময় ঠাকুরবাড়িতে থাকতেন তা নয়। এসব অভিনয়ে আমরা জ্ঞানদানন্দিনীকেও অভিনয় করতে দেখিনি। অলীকবাবুর অভিনয় পরেও অনেকবার হয়েছে। রবীন্দ্রনাথের প্রযোজনায় পরবর্তীকালের অভিনয়ে কবি গল্পটিকে ঈষৎ বদলে হেমাঙ্গিনীকে সারাক্ষণ নেপথ্যে রেখেছিলেন! অবন ঠাকুর কারণ ব্যাখ্যা করে বলেছিলেন, তখন মেয়েই বা কই এ্যাকটিং করবার। অসম্ভব নয়। তবু এক একবার মনে হয় সত্যিই কি শুধু অভিনেত্রীর অভাব? সে অভাব কখনও পূরণ হয়নি? না, কাদম্বরীর সমকক্ষ মনে হয়নি কাউকে? যাক, অলীক কষ্টকল্পনা করে তো লাভ নেই।

হেমাঙ্গিনীর ভূমিকা নিয়ে সন্দেহ থাকলেও বসন্ত-উৎসব ও মানময়ীতে কাদম্বরীর ভূমিকা স্পষ্ট। এ দুটি অভিনয়ে কাদম্বরী শুধু ভাল অভিনয়ই করেননি, ভাল গানও গেয়েছিলেন। অবশ্য সঙ্গীতে কাদম্বরীর অধিকার ছিল। বিখ্যাত সঙ্গীত জগন্মোহন গঙ্গোপাধ্যায়ের পৌত্রী তিনি, গান তার রক্তে। তিনি আসার সঙ্গে সঙ্গে তিন তলার ঘরে শুধু পিয়ানো আসেনি, জ্যোতিরিন্দ্র ও রবীন্দ্রের অনুশীলনও শুরু হয়ে গেছে। তাঁর নন্দনকাননের সান্ধ্য-সভাতেও বসত গানের আসর। এসব দেখে মনে হয় অভিনয়, গান, সাহিত্য নিয়ে কাদম্বরী সবাইকে একেবারে মাতিয়ে রেখেছিলেন। ভারতী পত্রিকার কথাই ধরা যাক না। দ্বিজেন্দ্রনাথ সম্পাদক, জ্যোতিরিন্দ্রনাথ দেখাশোনা করতেন, রবীন্দ্রনাথ লিখতেন। কাদম্বরীর কাজ কি ছিল? শরৎকুমারীর ভাষায়, তিনি ছিলেন ফুলের তোড়ার বাঁধন। সবাইকে একসঙ্গে তিনিই বেঁধে রেখেছিলেন, সবার অলক্ষ্যে। বাঁধন যেদিন ছিড়ল সেদিন শুধু সেদিনই বোঝা গেল কাদম্বরী কি ছিলেন।

নিজের হাতে জীবনদীপটি নিবিয়ে দিয়ে অন্তরালে চলে না গেলে তিনি হয়ত ঠাকুরবাড়ির অন্তঃপুরের রসের উৎসটিকে আরো কিছুদিন বাঁচিয়ে রাখতে পারতেন। তার মৃত্যুর সঙ্গে সঙ্গেই জোড়াসাঁকোর বাড়ি থেকে সোনালি দিনগুলি শীতের পাখির মতো বিদায় নিতে শুরু করল। এরপরে ঠাকুরবাড়ির মেয়েদের সম্মিলিত ভূমিকার চেয়ে একক ভূমিকাই বড় হয়ে উঠেছে। কিন্তু কেন চলে গেলেন কাদম্বরী? কেন? কেন? এ প্রশ্নের স্পষ্ট উত্তর আজও পাওয়া যায়নি।

রবীন্দ্রনাথের বিবাহের মাত্র কয়েক মাস পরেই কাদম্বরীর মৃত্যু হয়। ঘটনাটি আকস্মিক। তবে একেবারে অভাবনীয় নয় হয়ত। পূর্কেও তিনি একবার। আত্মহত্যার চেষ্টা করেছিলেন। এই সুরসিকা, রুচিসম্পন্না, প্রতিভাময়ী নারীর জীবনেও শান্তির অভাব ছিল। রবীন্দ্র জীবনীকারের ভাষায় কাদম্বরী ছিলেন যেমন অভিমানিনী, তেমনি সেন্টিমেন্টাল এবং আরো বলিব ইনট্রোভার্ট, স্কিজোফ্রেনিক। তাঁর মতের সঙ্গে সবাই একমত না হলেও কাদম্বরীকে অভিমানিনী আরো অনেকেই বলেছেন। তাঁর নিঃসন্তান-জীবনের বেদনা অভিমানকে আরো তীব্র করে তুলেছিল। তাই প্রাণের গভীরে লুকিয়ে থাকা দুঃখের ফধারা হঠাৎ এক আঘাতে নিজেকে হারিয়ে বাঁধভাঙা বন্যার মতো নেমে এল দুকূল ছাপিয়ে।

পরবর্তীকালে এ নিয়ে জল্পনার শেষ নেই। অনেকেই অনেক রকম গল্প রচনা করে ফেলেছেন। তার মধ্যে সবচেয়ে প্রচলিত কাহিনীটি রবীন্দ্রনাথকে নিয়ে। বিশেষ করে তার বিবাহ এবং কাদম্বরীর মৃত্যুর মধ্যে একটি যোগসূত্র কল্পনা করে নেওয়া যখন সত্যিই খুব কষ্টকর নয়। কারণ রবীন্দ্রনাথের স্ত্রীকে কাদম্বরী কি ভাবে গ্রহণ করেছিলেন তা কেউ জানে না। কাদম্বরীর সঙ্গে মৃণালিনীর কথাবার্তা বা দেখা-সাক্ষাতের কোন বিবরণ পাওয়া যায়নি। ভবতারিণীকে মৃণালিনী করে তোলার ভার কাদম্বরী না পেয়ে নীপময়ী পেলেন কেন তাও অজানা। রবীন্দ্রনাথের বিবাহের খুঁটিনাটি বিবরণ পাওয়া গেছে। হেমলতার প্রবন্ধে, সেখানেও কাদম্বরী আশ্চর্যভাবে অনুপস্থিত। মেয়ে দেখার সময় যার এত উৎসাহ ছিল, তিনি চুপ করে গেলেন কেন? প্রবীন্দ্রনাথের জন্যে পাত্রী নির্বাচনের সময় কি তার সঙ্গে মতান্তর হয়েছিল অন্য কারুর? প্রভাতকুমার মুখোপাধ্যায় এজন্যই বোধহয় একবার মন্তব্য করেন কাদম্বরীর আকস্মিক মৃত্যুর কারণ হচ্ছে, মহিলাদের মধ্যে দ্বন্দ্বের পরিণাম। তবে এই মহিলা কবিপত্নী নন, তিনি তখন বালিকামাত্র। সম্ভবত জ্ঞানদানন্দিনীর সঙ্গেই তার মতান্তর হয়। মনের গভীরে এর হয়ত অন্য কারণ ছিল। তারই বহিঃপ্রকাশ ঘটল একটা সামান্য ঘটনা উপলক্ষ্য করে। তাই সমসাময়িক কালে কেউ কেউ এ ঘটনার জন্য দায়ী করেছিলেন জ্যোতিরিন্দ্রনাথকে।

কাদম্বরীর মৃত্যু সংক্রান্ত যে সব খবর পাওয়া গেছে তাতে নিশ্চিত উত্তর কিছু পাওয়া যায় না। ইন্দিরা আত্মহত্যার কারণ সম্পর্কে লিখেছেন, জ্যোতিকাকামশাই প্রায়ই বাড়ি ফিরতেন না। তার প্রধান আড্ডা ছিল বির্জিতলাওয়ে আমাদের বাড়ি। আমার মা জ্ঞানদানন্দিনীর সঙ্গে ওঁর খুব ভাব ছিল। এরই মধ্যে একদিন অভিমানিনী কাদম্বরী স্বামীকে বলেছিলেন তাড়াতাড়ি ফিরতে। গানে গানে আডডায় আড়ায় সেদিন এত দেরি হয়ে গেল যে জ্যোতিরিন্দ্রের বাড়ি ফেরাই হল না। প্রচণ্ড অভিমানে কাদম্বরী ধ্বংসের পথই বেছে নিলেন। বাড়িতে কাপড় নিয়ে আসত বিশু বা বিশ্বেশ্বরী তাতিনী। সেই বিশুকে দিয়ে লুকিয়ে আফিম আনিয়ে, সেই আফিম খেয়েই কাদম্বরী মর্ত জীবনের মায়া কাঁটালেন।

আবার বর্ণকুমারীকে প্রশ্ন করে অমল হোম শুনেছিলেন, জ্যোতিরিন্দ্রনাথের জোব্বার পকেট থেকে কাদম্বরী পেয়েছিলেন তখনকার দিনের একজন বিখ্যাত অভিনেত্রীর মতান্তরে নটী বিনোদিনীর কয়েকখানি চিঠি। চিঠিগুলি উভয়ের অন্তরঙ্গতার পরিচায়ক। এই চিঠিগুলি পেয়ে কাদম্বরী কয়েকদিন বিমনা হয়ে কাঁটান তারপর আত্মহত্যা করেন। মৃত্যুর আগে তিনি লিখে গিয়েছিলেন যে ঐ চিঠিগুলিই তাঁর আত্মহত্যার কারণ। মহর্ষির আদেশে সেসব চিঠি ও তাঁর স্বীকারোক্তি নষ্ট করে ফেলা হয়। কাজী আবদুল ওদুদ লিখেছেন যে, তিনি ঠাকুরবাড়ির একজন খ্যাতনামা ব্যক্তির মুখে শুনেছেন, যে মহিলার সঙ্গে জ্যোতিরিন্দ্রনাথের অন্তরঙ্গত জন্মেছিল তিনি অভিনেত্রী নন তবে সেই অন্তরঙ্গতার জন্য কাদম্বরী নাকি আগেও একবার আত্মহত্যার চেষ্টা করেছিলেন।

সমসাময়িক কালের অন্যান্য কবিদের কোন কোন লেখা থেকে মনে হয় তারাও জ্যোতিরিন্দ্রনাথকেই দায়ী করেছেন। নিঃসন্তান স্ত্রীর সঙ্গহীন-শূন্যতা ভরিয়ে তোলার জন্যে স্বামীর যতটা মনোযোগী হওয়া উচিত জ্যোতিরিন্দ্রনাথ তা ছিলেন না। হয়ত এ ব্যাপারে তিনি খানিকটা উদাসীন ছিলেন। নিত্য নতুন সৃষ্টির আনন্দে মেতে ওঠা, হঠাৎ একেকটা খেয়ালের বশবর্তী হয়ে চলা, সত্যেন্দ্র-জ্ঞানদানন্দিনীর সান্নিধ্য, তাদের পুত্র-কন্যার সাহচর্য তাঁকে কাদম্বরীর কাছ থেকে দূরে সরিয়ে এনেছিল। তৎকালীন রুচি ও রীতির পরিপ্রেক্ষিতে জ্যোতিরিন্দ্রর পক্ষে থিয়েটারের অভিনেত্রী বা নটীদের সংস্পর্শে আসার সম্ভাবনাও বিচিত্র নয়। সেকালে একান্নবর্তী সংসারে বন্ধ্যা নারী ছিলেন উপেক্ষার পাত্রী। তাঁর বিশেষ আদর ছিল না। কাদম্বরী ঠাকুরবাড়ির বৃহৎ সংসারেও তার যথার্থ স্থানটি কোনদিন পাননি। যাই হোক, সব মিলে কাদম্বরীর মনে প্রচণ্ড চাপ সৃষ্টি করে। সযত্ন স্বামীসেবা, গৃহ পরিচর্যা, সাহিত্যশিল্প নিয়ে তিনি নিজেকে ভুলিয়ে রাখলেও শেষরক্ষা করতে পারেননি। সত্যেন্দ্রজ্ঞানদানন্দিনীর কলকাতায় প্রত্যাবর্তন ও বির্জিতলাও বাস এবং রবীন্দ্রনাথের বিবাহ দুটি ঘটনায় তার নিঃসঙ্গতা প্রচণ্ড বৃদ্ধি পায়। সেই অবস্থায় স্বামীর অবহেলায় কাদম্বরী মানসিক ভারসাম্য হারিয়ে ফেলেন ও আত্মহননের পথ বেছে নেন। এর পটভূমিতে ইন্দিরা-কথিত বা বর্ণকুমারী-কথিত যে কোন একটি বা দুটি কাহিনীই থাকতে পারে তবে তৃতীয় কোন অনুমানের অবকাশ বোধহয় নেই।

এই ঘটনার কিছু আগে এবং পরে লেখা কয়েকটা কবিতার প্রতি এজন্যেই সমালোচকদের দৃষ্টি পড়েছিল। প্রথম কবিতাটির কবি অক্ষয় চৌধুরী। জগদীশ ভট্টাচার্যের মতে অন্যাসক্ত স্বামীর প্রতি নারীর অভিমানই অভিমানিনী নিঝরিণী এবং এই নিঝরিণী আর কেউ নন, জ্যোতিরিন্দ্র-পত্নী কাদম্বরী।

রাখিতে তাহার মন, প্রতিক্ষণে সযতন
হাসে হাসি কাঁদে কাঁদি—মন রেখে যাই,
মরমে মরমে ঢাকি তাহারি সম্মান রাখি,
নিজের নিজস্ব ভুলে তারেই ধেয়াই,
কিন্তু সে ত আমা পানে ফিরেও না চায়।

প্রভৃতি অংশ পড়ে অবশ্য সেবাপরায়ণ গুণবতী কাদম্বরীর কথাই মনে পড়ে। অপর দিকে রবীন্দ্রজীবনীকার তারকার আত্মহত্যায় দেখেছেন কাদম্বরীর প্রথম আত্মহনন চেষ্টার প্রতিচ্ছবি। কিশোর রবীন্দ্রনাথ জানতেন তার নতুন বৌঠানের মনোবেদনার কথা।

যদি কেহ শুধাইত
আমি জানি কী যে সে কহিত
যতদিন বেঁচে ছিল
আমি জানি কী তারে দহিত।…

তাই জ্যোতির্ময় জগৎ থেকে আঁধার জগতে তারকার স্বেচ্ছা নির্বাসন। কাদম্বরীর মৃত্যুর পরেও পুষ্পাঞ্জলিতে কবি লিখেছেন, যাহারা ভাল, যাহারা ভালবাসিতে পারে, যাহাদের হৃদয় আছে, সংসারে তাহাদের কিসের সুখ! কিছু না। কিছু না। তাহার যন্ত্রের মতো, বীণার মতো—তাহাদের প্রত্যেক শিরা সংসারের প্রতি আঘাতে বাজিয়া উঠিতেছে। সে গান সকলেই শুনে, শুনিয়া সকলেই। মুগ্ধ হয়—তাহাদের বিলাপধ্বনি রাগিনী হইয়া উঠে, শুনিয়া কেহ নিঃশ্বাস ফেলে না। বেশ বোঝা যায় এই বীণাটি আর কেউ নন, কাদম্বরী। কারণ তার পরেই আছে, পাষণ্ড নরাধম পাষাণ হৃদয় যে ইচ্ছা সেই ঝন্‌ঝন্‌ করিয়া চলিয়া যায়, আর মনে রাখে না। এ বীণাটিকে তাহারা দেবতার অনুগ্রহ বলিয়া মনে করে না—তাহারা আপনাকেই প্রভু বলিয়া জানে—এই জন্যে কখনো বা উপহাস করিয়া, কখনো বা অনাবশ্যক জ্ঞান করিয়া, এই সুমধুর সুকোমল পবিত্রতার উপরে তাহাদের কঠিন চরণের আঘাত করে।

আরো একজন কবি জ্যোতিরিন্দ্রকে শালীনতার আড়াল না রেখেই তীব্র ভৎসনা করেছিলেন। বিহারীলাল তার সাধের আসনে পতিব্রতা সতীকে বললেন আর এস না ধরায় কারণ :

পুরুষ কিস্তৃতমতি চেনে না তোমায়।
মন প্রাণ যৌবন
কি দিয়া পাইবে মন।
পশুর মতন এর নিতুই নতুন চায়।

সমসাময়িক ব্যক্তিদের সাক্ষ্য এবং কবিদের রচনা থেকে বোঝা যায়, কাদম্বরীর মৃত্যুর সঙ্গে রবীন্দ্রনাথের বিবাছকে জড়িয়ে যে অনুচিত কল্পনা মাঝে মাঝে প্রকাশিত হয় তার কোন ভিত্তি নেই। দেবর রবীন্দ্রনাথের প্রতি যদি কাদম্বরীর অনুচিত আসক্তি সত্যিই প্রকাশ পেত তাহলে তিনি সবার অন্তরে এই শ্রদ্ধার আসন পেতেন কি?

এই মৃত্যুকে জ্যোতিরিন্দ্রনাথ কি ভাবে গ্রহণ করেছিলেন? এ প্রশ্ন জাগা স্বাভাবিক। কাদম্বরীর মৃত্যুর এক মাস পরেই তিনি জ্ঞানদানন্দিনী, সুরেন্দ্র, ইন্দিরা ও রবীন্দ্রনাথকে নিয়ে সরোজিনী জাহাজে চেপে বেড়াতে গিয়েছিলেন। তাই আপাতদৃষ্টিতে মনে হয় তারকার আত্মহত্যার কিশোর কবির অনুমানই বোধহয় ঠিক, যেমন আছিল আগে তেমনি রয়েছে জ্যোতি। কিন্তু প্রত্যক্ষ এবং পরোক্ষ সমস্ত অভিযোগ অস্বীকার করে আমরা বোধহয় শুধু একটি কথাই বলতে পারি, কাদম্বরীর জীবনাহুতি জ্যোতিরিন্দ্রকে একেবারে নিঃস্ব করে দিয়েছিল। তাই শুধু বাণিজ্যেই তাকে পর্যুদস্ত হতে হল তা নয়, তাকে পরাস্ত হতে হল জীবনের কাছেও। না হলে তার মতো প্রতিভাবান নাট্যকার কাদম্বরীর মৃত্যুর পর সব ছেড়ে দিয়ে শুধু অনুবাদ নিয়ে পড়ে থাকবেন কেন? জমাটি আর মজলিশ ছেড়ে কেন চলে যাবেন দূরে? এ যে নিজেকেই ভুলে থাকা। কাদম্বরীর মৃত্যুকালে তার বয়স মাত্র পঁয়ত্রিশ বছর কিন্তু তিনি দ্বিতীয়বার বিবাহ করেননি। কেন করেননি সে প্রশ্ন করা হলে তিনি শুধু বলেছিলেন, তাকে ভালবাসি।

যুক্তিবাদীরা হয়ত বলবেন অনুশোচনা। হয়ত সত্যিই তাই। নিজেকে সমাজ-সংসার থেকে স্বেচ্ছানির্বাসন দিয়ে তিনি তিল তিল করে শাস্তি দিয়েছেন নিজেকেই। শাস্তি দিয়েছেন কাদম্বরীর প্রতি অমনোেযোগী উদাসীন কর্তব্যচ্যুত স্বামীকে। দুঃখের বিষয় আমরা জ্যোতিরিন্দ্রনাথের মনোভাবের কথা একেবারেই জানতে পারি না। শোনা যায় কিছুদিনের জন্য মানসিক ভারসাম্যও হারিয়েছিলেন তিনি। আমার জীবনস্মৃতি কিংবা শেষ বয়সে লেখা:ডায়রি, কোথাও জ্যোতিরিন্দ্রের মনের কথা ধরা নেই। কোথাও নেই কাদম্বরীর কথা। জীবনস্মৃতিতেও দু-একটি সংবাদ ছাড়া কাদম্বরী সর্বত্রই আশ্চর্যভাবে অনুপস্থিত। অথচ ব্রাচিতে তার নিজের বাড়ি শান্তিধামের যে নিরাভরণ ঘরখানিতে তিনি থাকতেন তার দেয়ালে ছিল একটি মাত্র ছবি, তার নিজের হাতে আঁকা কাদম্বরীর পেন্সিল স্কেচ। সুতরাং এই ভুলে থাকা নয় সে তো ভোলা। জ্যোতিরিন্দ্র সেই নির্জন বিষণ্ণ শান্তিধামের নিরালা অবসরে হয়ত বারবার অনুভব করতে চেয়েছেন সেই অসামান্যাকে, যার প্রেরণায় রবীন্দ্রনাথের কবি-মন উজ্জীবিত হয়েছিল।

এ প্রসঙ্গে একটা কথা বলে রাখি যদিও সেটি ঠিক প্রমীলা সংবাদ নয়। সাম্প্রতিক কালের কোন কোন সমালোচক ভাবতে শুরু করেছেন যে জ্যোতিরিন্দ্রনাথের সঙ্গে রবীন্দ্রনাথের সম্পর্ক কোন এক অজ্ঞাত কারণে ছিন্ন হয়ে যায়। এর কারণ হিসেবেও তারা নিয়েছেন রবীন্দ্রনাথের ক্রমবর্ধমান খ্যাতি এবং নতুন বৌঠানের আত্মহত্যা ঘটনাটিকে। কিন্তু দুটি সম্ভাবনাই অসার মনে হয়, কারণ রবীন্দ্রের প্রতি জ্যোতিরিন্দ্র কোনদিন ঈর্ষান্বিত হবেন ভাবা যায় না। বিশেষ করে পরবর্তীকালে যখন তিনি জীবন থেকে সরে গিয়েছেন। তাছাড়া রবীন্দ্রনাথের সঙ্গে তার যোগ স্ত্রীর মৃত্যুর পরে তো ছিলই, অন্য সময়েও বিচ্ছিন্ন হয়নি। সরোজিনী জাহাজে ভ্রমণ করা ছাড়াও তারা দুই ভাই বহুদিন সত্যেন্দ্রনাথের বাড়িতে পাশাপাশি ঘরে বাস করেছেন। তাঁর শেষ বয়সের ডায়রিতেও দেখা যাবে দু-তিনবার রবীন্দ্র প্রসঙ্গ আছে। রবির বক্তৃতা, দাড়ি রাখা, গান কিছুই তার চোখ এড়ায়নি। এমন কি ছবিও এঁকেছেন। তবে এ সময় জ্যোতিরিন্দ্র সব কিছু থেকেই অনেক দূরে সরে যাচ্ছিলেন।

অপরদিকে রবীন্দ্রনাথের লেখা চিঠিতেও দেখা যাবে অন্তরঙ্গতার সুর। ভাই জ্যোতিদাদার ছবির এ্যালবাম ছাপার ব্যাপারে তিনিই উদ্যোক্তা এবং আগ্রহী। পরবর্তী জীবনে রবীন্দ্রনাথ বিশ্বকবি। তার পারিবারিক জীবনেও নেমে এসেছে। নিয়মিত দুর্বার দণ্ড। স্ত্রী ও পুত্রকন্যাদের মৃত্যু, শান্তিনিকেতনের সমস্যা নিয়ে বিব্রত কবি তখন নিজের কোন আত্মীয়স্বজনের সঙ্গেই যোগাযোগ রাখতে পারছেন না, জীবনবিরাগী জ্যোতিরিন্দ্রনাথ তো সেখানে আরো দূরের মানুষ। সুতরাং কাদম্বরীর মৃত্যু দুই ভাইয়ের মধ্যে বিভেদ সৃষ্টি করেনি। এই মৃত্যুর মধ্যেই জ্যোতিরিন্দ্রনাথ খুজেছেন কাদম্বরীর বিদেহী সত্তাকে আর রবীন্দ্রনাথ নতুন করে চিনেছেন নিজেকে। কাদম্বরীর দেহহীন সভা মিশে রইল তাঁর কবিতায়, গানে, ছবিতে।
জীবন থেমে থাকে না। কাদম্বরী যখন চলে গেলেন ফুলতলির ভবতারিণী তখন নাবালিকা। তাকে স্বর্ণ মৃণালিনী হবার আশীর্বাদ করেছিলেন দ্বিজেন্দ্রনাথ। তারপর ভবতারিণী একদিন হারিয়ে গেলেন মৃণালিনীর মধ্যে। যদিও এই পরিবর্তন কোন আলোড়ন আনল না বহির্জগতে। একটুও তরঙ্গ তুলল না প্রগতিশীলদের মনে। তবু মৃণালিনীকে সামান্যা বলতে পারা যায় না। মাত্র দশ বছর বয়সে একহাত ঘোমটা টেনে যে ভবতারিণী ঠাকুরবাড়িতে ঢুকেছিলেন সেদিন তিনি বুঝতেও পারেননি কোন্ বাড়িতে তাঁর বিয়ে হচ্ছে, কাকে পেলেন তিনি।

রবীন্দ্রনাথ বলতেন, আমার বিয়ের কোন গল্প নেই, বলতেন, আমার বিয়ে যা-তা করে হয়েছিল। কিন্তু প্রথম দিকে তোড়জোড় শুরু হয়েছিল বড় মাপে। দাসী, পাঠিয়ে মেয়ে পছন্দ করা পুরনো ব্যাপার তাই এবার একটা কমিটি তৈরি হল—জ্ঞানদানন্দিনী, কাদম্বরী, জ্যোতিরিন্দ্রনাথ ও রবীন্দ্রনাথকে নিয়ে। তারা সদলবলে মেয়ে খুঁজতে গেলেন যশোরে—সেখান থেকেই ঠাকুরবাড়ির অধিকাংশ বৌ এসেছিলেন। জ্ঞানদানন্দিনীর বাপের বাড়ি নরেন্দ্রপুরে গিয়ে উঠলেও দক্ষিণডিহি, চেঙ্গুটিয়া প্রভৃতি আশেপাশের সব গ্রামের বিবাহযোগ্যা মেয়েই দেখা হয়ে গেল কিন্তু বৌঠাকুরাণীদের মনের মতো সুন্দরী মেয়ে পাওয়া গেল না। তাই শেষকালে ঠাকুর স্টেটের কর্মচারী বেণীমাধব রায়ের বড় মেয়ে ভবতারিণীর সঙ্গেই বিয়ে ঠিক করা হল। অবশ্য দাদাদের মতো রবীন্দ্রনাথ বিয়ে করতে যশোরে যাননি, জোড়াসাঁকোতেই বিয়ে হয়েছিল।

গুরুজনেরা যে সম্বন্ধ স্থির করেছিলেন, রবীন্দ্রনাথ বিনা দ্বিধায় তাকেই বরণ করে নিয়েছিলেন। বন্ধুদের নিজের বিয়ের নিমন্ত্রণ লিপি পাঠিয়ে দিলেও এ বিয়েতে ঘটাপটা বিশেষ হয়নি। পারিবারিক বেনারসী দৌড়দার জমকালো শাল গায়ে দিয়ে তিনি বিয়ে করতে গেলেন নিজেদের বাড়ির পশ্চিম বারান্দা ঘুরে। বিয়ে করে আনলেন অজ্ঞ বালিকা ভবতারিণীকে। কবির বাসর ঘরের সুন্দর বিবরণ পাওয়া যাবে প্রত্যক্ষদর্শী হেমলতার লেখায় :

বাসরে বসেই রবীন্দ্রনাথ দুষ্টমি আরম্ভ করলেন।…ভড় খেলার বদলে ভাঁড়গুলো উপুড় করে দিতে লাগলেন ধরে ধরে। তার ছোট কাকীমা ত্রিপুরাসুন্দরী বলে উঠলেন,

ও কি করিস রবি? এই বুঝি তোর ভাঁড় খেলা? ভাঁড়গুলো সব উল্টেপাল্টে দিচ্ছিস কেন?…

রবীন্দ্রনাথ বললেন, জানো না কাকীমা—সব যে ওলটপালট হয়ে যাচ্ছে। কাজেই আমি ভাঁড়গুলো উলটে দিচ্ছি।…

কাকীমা আবার বললেন, তুই একটা গান কর! তোর বাসরে আর কে গাইবে, তুই এমন গাইয়ে থাকতে? এরপর তার বাসর ঘরে একবার উঁকি দিলে দেখা যাবে সেখানে তিনি ওড়নাটক জড়সড় বধূর দিকে চেয়ে কৌতুক ভরে গান ধরেছেন আ মরি লাবণ্যময়ী…।

শোনা গেছে, কথায় প্রচণ্ড যন্তরে টান থাকায় ভবতারিণী প্রথম দিকে বেশ কিছুদিন কথাই বলতেন না। কবি কি এই অসম বিবাহকে খুশি মনে গ্রহণ করেছিলেন? তাই তো মনে হয়। ছোট ছোট ঘটনায় রয়েছে সুখের আমেজ। এরই মধ্যে শুরু হল ভবতারিণীর মৃণালিনী হয়ে ওঠার শিক্ষা। প্রথমে তিনি মহর্ষির নির্দেশে ঠাকুরবাড়ির আদব-কায়দা-বাচনভঙ্গির ঘরোয়া তালিম নিলেন নীপময়ীর কাছে। তারপর নীপময়ীর মেয়েদের সঙ্গে মৃণালিনীও পড়তে গেলেন লরেটো হাউসে। ফুলতলির ভবতারিণী হয়ত হারিয়ে গেলেন কিন্তু মৃণালিনী অতি আধুনিক হয়েও ওঠেননি কিংবা তার লরেটোর ইংরেজী শিক্ষা, পিয়ানো শিক্ষা, বাড়িতে হেমচন্দ্র বিদ্যারত্নের কাছে সংস্কৃত শিক্ষা কোন সৃষ্টিমূলক কাজেও লাগেনি। কারণ তাঁর জীবন সংসারের সকলের সুখে নিমজ্জিত ছিল। চারপাশে অতি সংব এবং সোচ্চার চরিত্রগুলির পাশে তার নির্বাক ভূমিকাটি আমাদের কাছে তেমন স্পষ্ট নয়। অথচ তিনিও বাড়ির অন্যান্য মেয়ে-বৌয়েদের মতো অভিনয় করেছেন, রামায়ণ অনুবাদ করেছেন, রবীন্দ্রনাথের নির্দেশে রূপকথা সংগ্রহ করেছেন, আমোদ-প্রমোদে-দুঃখে-শোকে সবার সবচেয়ে বেশি কাছে এসে দাঁড়িয়েছেন।

রবীন্দ্রনাথের রাজা ও রাণীর প্রথম অভিনয়ে মৃণালিনী সেজেছিলেন নারায়ণী আর দেবদত্তের ভূমিকায় কে অভিনয় করেছিলেন জানেন? তার মেজ ভাশুর সত্যেন্দ্রনাথ। ঘরোয়া অভিনয় নয়, বেশ বড় মাপের আয়োজন হয়েছিল। যদিও প্রথমবার, তবু তার অনাড়ষ্ট সাবলীল অভিনয় ভালভাবেই উৎরেছিল। অথচ নবনাটকে অভিনয় করার জন্যে, একটি স্ত্রীভূমিকা গ্রহণ করে, অয় চৌধুরী আর কিছুতেই স্টেজে এসে দাঁড়াতে পারেননি। মৃণালিনীরও এরকম অবস্থা হতে পারত। বিশেষ করে ভাশুরের সঙ্গে অভিনয়! কিন্তু কোন বিঘ্ন ঘটেনি। তবু রবীন্দ্রনাথের নাটক কিংবা অভিনয়ে যোগ দেবার আগ্রহও মৃণালিনীর ছিল না, একথা স্বীকার করতেই হবে। সখিসমিতির দু-একটা অভিনয়ে কিংবা মায়ার খেলার ছোটখাট চরিত্রাভিনয়ে যোগ দেওয়া ছাড়া আর কিছুতেই তাকে অংশ গ্রহণ করতে দেখা যায়নি। আসলে গন-অভিনয়সাহিত্যচর্চার মধ্যে মৃণালিনীর প্রকৃত পরিচয় খুঁজে পাওয়া যাবে না। স্বামীর মহৎ আদর্শকে কাজে পরিণত করবার জন্যে তিনি যখন রবীন্দ্রনাথের পাশে এসে দাঁড়ালেন, তখন শুধু তখনই তাঁর প্রকৃত পরিচয় প্রথম বার আমরা পেলুম। সামান্যার মধ্যে দেখা দিলেন অসামান্যা দেখা দিল সনাতন ভারতবর্ষের শাশ্বতী নারী। অবশ্য সে অনেক পরের কথা।

ঠিক সুগৃহিণী বলতে যা বোঝায় ঠাকুরবাড়িতে মৃণালিনী ছিলেন তাই। জোড়াসাঁকোতে সবার ছোট তবু সবাই তার কথা শুনতেন। সবাইকে নিয়ে তিনি আমোদ-আহ্লাদ করতেন, বৌয়েদের সাজাতেন কিন্তু নিজে সাজতেন না। সমবয়সীরা অনুযোগ করলে বলতেন, বড় বড় ভাশুর-পো ভাগ্নেরা চারদিকে ঘুরছে—আমি আবার সাজব কি? একদিন কানে দুটি ফুল ঝোলানো বীরবৌলি পরেছিলেন সবার উপরোধে। সেইসময়ে হঠাৎ কবি উপস্থিত হলে সঙ্গে সঙ্গে তিনি দু হাত চাপা দিয়ে বীরবেইলি লুকিয়ে ফেলেছিলেন। গয়না পরায় এতই ছিল তাঁর লজ্জা। তিনি আরো ভালবাসতেন রান্না করতে, আর পাঁচ জনকে ভালমন্দ বেঁধে খাওয়াতে। ঠাকুরবাড়িতে মেয়েদের গৃহকর্মে নানারকম তালিম দেওয়া হত। মহর্ষিকন্যা সৌদামিনী তার পিতৃস্মৃতিতে লিখেছিলেন যে তাদের প্রতিদিন নিয়ম করে একটা তরকারি রাধতে হত। রোজ একটা করিয়া টাকা পাইতাম, সেই টাকায় মাছ তরকারি কিনিয়া আমাদিগকে রাধিতে হইত।

নতুন বৌয়েদের শিক্ষা শুরু হত পান সাজা দিয়ে। তারপর তারা শিখতেন বড়ি দিতে, কাসুন্দি-আচার প্রভৃতি তৈরি করতে। ধনী পরিবারের বৌ হলেও এসব শিক্ষায় ত্রুটি ছিল না। বলাবাহুল্য মৃণালিনী এসব কাজে অত্যন্ত দক্ষতার পরিচয় দিয়েছিলেন। তবে একটা কথা মনে রাখতেই হবে, এ সময় দিন বদলাচ্ছে। পালাবদল চলছে বাড়ির বাইরে, বাড়ির ভেতরেও। না বদলালে কি জ্যোতিরিন্দ্র কাদম্বরী তিন তলার ছাদে নন্দন কানন তৈরি করতে পারতেন? সে সভায় অনাত্মীয় পুরুষেরাও অবাধে আসতেন, অথচ সত্যেন্দ্র-বন্ধু মনোমোহনকে অন্তঃপুরে নিয়ে আসতে কম কাঠ খড় পোড়াতে হয়নি। যুগ বদলাচ্ছে। মৃণালিনী যখন লরেটো স্কুলে পড়তে গেলেন তখন আর কেউ ধিক্কার দিতে এল না। কারণ তার আগেই চন্দ্রমুখী ও কাদম্বিনী অসাধ্য সাধন করে ফলেছেন। যাক সে কথা পরে হবে। এখন কথা হচ্ছে ঠাকুরবাড়ির সাবেকী {ণ নিয়ে। অন্দরমহলের ব্যবস্থা বদলাতে বড় দেরি হয়। যাই যাই করেও স্মিকালের শেষ-সূর্যের আলোর মতো মেয়েদের চিরকেলে অভ্যেস যেন যেতে চায় না। তাই বাইরের জগতে কয়েকটি মেয়ে বিরাট পরিবর্তন আনলেও। বৌয়েরা তখনও শিখতেন ঝুনি-রাইয়ের ঝাল কাসুন্দি, আমসত্ত্ব, নারকেল চিড়ে তৈরি করতে। মৃণালিনী নানারকম মিষ্টি তৈরি করতে পারতেন। তার মানকচুর জিলপি, দইয়ের মালপো, পাকা আমের মিঠাই, চিড়ের পুলি যারা একবার খেয়েছেন তারা আর ভোলেননি। স্ত্রীর রন্ধন নৈপুণ্যে কবিও উৎসাহী হয়ে মাঝে মাঝে নানারকম উদ্ভট রান্নার এক্সপেরিমেন্ট করতেন। শেষে। হাল ধরে সামাল দিতে হত মৃণালিনীকেই। শেষে তাকে রাগাবার জন্যে কবি বলতেন, দেখলে তোমাদের কাজ তোমাদেরই কেমন একটা শিখিয়ে দিলুম। মৃণালিনী চটে গিয়ে বলতেন, তোমাদের সঙ্গে পারবে কে? জিতেই আছ সকল বিষয়ে।

লেখাপড়া শেখার পর শিলাইদহে বাস করবার সময় মৃণালিনী কবির নির্দেশে রামায়ণের সহজ ও সংক্ষিপ্ত অনুবাদের কাজে হাত দিয়েছিলেন। শেষ হয়নি। কবি সেই অসমাপ্ত খাতাটি তুলে দিয়েছিলেন মাধুরীলতার হাতে, বাকিটুকু শেষ করার জন্যে। অসমাপ্ত কাজ সমাপ্ত করার আগেই অকালে মাধুরীর জীবনদীপ নিবে যাবার পর আর খাতাটির খোঁজ মেলেনি। রথীন্দ্রের কাছে আর একটি খাতা ছিল—তাতে মৃণালিনী মহাভারতের কিছু শ্লোক, মনুসংহিতা ও উপনিষদের শ্লোকের অনুবাদ করেন। এছাড়া কবির নির্দেশে তিনি বাংলাদেশের রূপকথা সংগ্রহের কাজেও হাত দিয়েছিলেন। অবনীন্দ্রনাথ তার সংগ্রহ থেকেই পেয়েছিলেন ক্ষীরের পুতুল গুল্পটি। মৃণালিনী ঠিক যেমন করে গল্পটি বলেছিলেন ঠিক তেমনি করেই লিখেছিলেন অবনীন্দ্রনাথ। রূপকথার যাদুকরের সেদিন হাতেখড়ি হল মৃণালিনীর কাছেই। সকৃতজ্ঞ অবনীন্দ্রনাথ বলেছেন, এই আমার রূপকথার আদিকথা। কিন্তু মৃণালিনীর লেখা আর কিছু কি ছিল? স্বর্ণকুমারীকে এ নিয়ে একবার প্রশ্ন করা হলে তিনি দৃপ্তভঙ্গিতে বলেছিলেন, তাহার স্বামী বাংলার একজন শ্রেষ্ঠ লেখক, সেইজন্য তিনি স্বয়ং কিছু লেখা প্রয়োজন বোধ করেন নাই।

খুবই সত্যি কথা, তবু মনটা খুঁতখুঁত করে বৈকি। ঠাকুরবাড়ির এই আমুদে বৌটি কি তার মনের মধু সবটাই ঢেলে দিয়েছিলেন নীরব সেবায়! কালের সীমা পেরিয়ে কিছুই কি আমাদের কাছে এসে পৌঁছবে না? দ্বিপেন্দ্রনাথের স্ত্রী হেমলতার লেখা থেকেই শুধু পাওয়া যাবে মৃণালিনীকে? সুরসিকা মৃণালিনীর একটা-দুটো চিঠি অবশ্য রক্ষা পেয়েছে। সেই ছোট্ট সাংসারিক চিঠির মধ্যেও তার পরিহাসপ্রিয় সহজ মনটি ধরা পড়েছিল। সুধীন্দ্রনাথের স্ত্রী চারুবালাকে লেখা একটা চিঠিতে দেখা যাবে মৃণালিনী তাকে অনুযোগ করছেন অনেকদিন চিঠি না লেখার জন্যে। তার মধ্যে যে অনাবিল স্বচ্ছতা আছে তার সৌন্দর্য বুঝি কোন সাহিত্যিক চিঠির চেয়ে কম নয় :

…তোমার সুন্দর মেয়ে হয়েছে বলে বুঝি আমাকে ভয়ে খবর দাওনি পাছে আমি হিংসে করি, তার মাথায় খুব চুল হয়েছে শুনে পর্যন্ত কুন্তলীন মাখতে আরম্ভ করেছি, তোমার মেয়ে মাথা ভরা চুল নিয়ে আমার ন্যাড়া মাথা দেখে হাসবে, সে আমার কিছুতেই সহ্য হবে না। সত্যিই বাপু, আমার বড় অভিমান হয়েছে, না হয় আমাদের একটি সুন্দর নাতনী হয়েছে, তাই বলে কি আর আমাদের একেবারে ভুলে যেতে হয়।

শান্তিনিকেতনে চলে গেলেও জোড়াসাঁকোর একান্নবর্তী পরিবারটির জন্যে মৃণালিনীর আন্তরিকতা কখনো হ্রাস পায়নি। শিলাইদহে তার কাছেই ছুটে যেতেন ভাশুরপো ও ভাশুরঝিরা। বলেন্দ্রনাথ সংস্কৃত, ইংরেজী, বাংলা যখন যে বই পড়তেন কাকীমাকে পড়ে শোনাতেন। শুধু কি আত্মীয় স্বজন? মৃণালিনী সবার সুখেই সুখী আবার সবার দুঃখেই সমদুঃখী। শিলাইদহে একদিন মুলা সিং নামে এক পাঞ্জাবী তার কাছে এসে কঁদতে কাঁদতে নিজের দুরবস্থার কথা জানিয়ে বললে, মাইজী, একটি চাকরি দিয়ে আমাকে রক্ষা করুন, নতুবা আমি সপরিবারে মারা পড়িব। রবীন্দ্রনাথ তখন শিলাইদহে ছিলেন না, মৃণালিনী তাকে কুঠিবাড়ির দারোয়ানের কাজে বহাল করলেন। কদিন পরে দেখলেন মুলা সিং তখনও বিষণ্ণ। মৃণালিনী কারণ জানতে চাইলেন। সে জানাল তার মাইনের সবটাই খরচ হয়ে যায় দুবেলা চার সের আটার রুটি খেতে। করুণাময়ী মৃণালিনী সেইদিন থেকে তার সংসার থেকে মুলা সিংয়ের জন্য চার সের আটা বরাদ্দ করলেন। মাইনে বাড়ল তবু আটার ব্যবস্থা আগের মতোই রয়ে গেল। দিনে দিনে তাঁর যে মূর্তিটি বড় হয়ে উঠেছে সে তার জননী মূর্তি। শান্তিনিকেতন আশ্রম বিদ্যালয় প্রতিষ্ঠার সময় তার পূর্ণ পরিচয় পাওয়া গেল। সীমার্গের ইন্দ্রাণী সেখানে হয়ে উঠলেন অন্নপূর্ণা। মৃণালিনী রূপসী ছিলেন না, কিন্তু অপরূপ মাতৃত্বের আভা তার মুখে লাবণ্যের মতো ঢলঢল করত, একবার দেখলে আবার দেখতে ইচ্ছে হয়, এই ছিল প্রত্যক্ষদর্শীর অভিমত। পাঁচটি সন্তানের জননী মৃণালিনীর এই মাতৃমূর্তি আরো সার্থক হয়ে উঠেছিল শান্তিনিকেতনে ঘর থেকে দূরে আসা শিশুগুলিকে আপন করে নেওয়ার মধ্যে।

সহধর্মিণীর কাছে রবীন্দ্রনাথের প্রত্যাশা কি ছিল জানতে ইচ্ছে করে। নিশ্চয়ই। কি ভাবে তিনি তাদের যৌথ জীবন গড়ে তুলতে চেয়েছিলেন সেকথা জানা যায় মৃণালিনীকে লেখা কবির পত্র পড়ে। একটি পত্রে তিনি লিখেছেন, আমাকে সুখী করবার জন্যে তুমি বেশি কোন চেষ্টা কোরো না—আন্তরিক ভালোবাসাই যথেষ্ট। অবশ্য তোমাতে আমাতে সকল কাজ ও সকল ভাবেই যদি যোগ থাকত খুব ভাল হত-কিন্তু সে কারো ইচ্ছায়ও নয়। যদি তুমি আমার সঙ্গে সকল রকম বিষয়ে সকল রকম শিক্ষায় যোগ দিতে পার ত খুসি হই—আমি যা কিছু জানতে চাই তোমাকেও তা জানাতে পারি—আমি যা শিখতে চাই তুমিও আমার সঙ্গে শিক্ষা কর তাহলে খুব সুখের হয়। জীবনে দুজনে মিলে সকল বিষয়ে অগ্রসর হবার চেষ্টা করলে অগ্রসর হওয়া সহজ হয়—তোমাকে কোন বিষয়ে আমি ছাড়িয়ে যেতে ইচ্ছে করিনে—কিন্তু জোর করে তোমাকে পীড়ন করতে আমার শঙ্কা হয়। সকলেরই স্বতন্ত্র রুচি অনুরাগ এবং অধিকারের বিষয় আছে—আমার ইচ্ছা ও অনুরাগের সঙ্গে তোমার সমস্ত প্রকৃতিকে সম্পূর্ণ মেলাবার ক্ষমতা তোমার নিজের হাতে নেই-সুতরাং সে সম্বন্ধে কিছুমাত্র খুংথুং না করে ভালোবাসার দ্বারা যত্নের দ্বারা আমার জীবনকে মধুর–আমাকে অনাবশ্যক দুঃখকষ্ট থেকে রক্ষা করতে চেষ্টা করলে সে চেষ্টা আমার পক্ষে বহুমূল্য হবে।

কবির প্রত্যাশা পূর্ণ করেছিলেন মৃণালিনী। জীবনের সবক্ষেত্রে এমনকি শান্তিনিকেতনে অদিশ-বিদ্যালয় প্রতিষ্ঠার বাসনা নিয়ে রবীন্দ্রনাথ সেখানে গেলে মৃণালিনী ও তার পাশে এসে দাঁড়িয়েছিলেন। এই ধরনের কাণ্ডজ্ঞানহীনতায় আত্মীয় স্বজনের উপদেশ, উপহাস, বিরুদ্ধতা, বিদ্রুপ সবই সহ্য করতে হয়েছিল। আত্মীয়দের খুব দোষ নেই, সর্বনাশের মুখোমুখি গিয়ে কেউ দাঁড়াতে চাইলে। তাকে তে সাবধান করবেনই। নাবালক পঁাচটি সন্তান, তার মধ্যে তিনটি মেয়ে অথচ কবি অঁরি যথাসর্বস্ব ঢেলে দিচ্ছেন আশ্রম বিদ্যালয়ে। লোকে বলবে না। কেন? মৃণালিনীর মনেও এ নিয়ে ভাবনা ছিল, তবু তিনি স্বামীকে সব কাজে হাসিমুখে সাহায্য করেছেন। যখনি কোন প্রয়োজন হয়েছে, তখনই খুলে দিয়েছেন গায়ের এক একটি গয়না। মৃণালিনী পেয়েছিলেন প্রচুর। বিয়ের যৌতুকের গয়না ছাড়াও শাশুড়ীর আমলের ভারী গয়না ছিল অনেক। সবই তিনি কবির কাজে গা থেকে খুলে দিয়েছিলেন। রথীন্দ্র লিখেছেন, শেষ পর্যন্ত হাতে কয়েক গাছ চুড়ি ও গলায় একটি চেন হার ছাড়া তার কোন গয়না অবশিষ্ট ছিল না।

শুধু গয়না দিয়ে নয়, আশ্রমের কাজেও মৃণালিনী স্বামীকে যথাসাধ্য সাহায্য করেছেন! আধুনিক অর্থে তাকে হয়ত প্রগতিশীল বলা যাবে না কারণ শিক্ষাদীক্ষায় ঠাকুরবাড়ির মেয়েদের ছাড়িয়ে অন্যান্য মেয়েরাও ক্রমশঃ এগিয়ে যাচ্ছিলেন। উগ্র আধুনিকতা এ বাড়ির মেয়েদের রক্তমজ্জায় প্রবেশ করেনি। দীর্ঘকাল ধরে জ্ঞানদানন্দিনীই সেখানে উগ্র আধুনিকতার পরিচয় দিয়ে এসেছেন। কিন্তু মহৎ নারীর পরিচয় মৃণালিনীর মধ্যে আছে। চারিত্রপূজা গ্রন্থ লেখবার সময় রবীন্দ্রনাথ এক জায়গায় লিখেছেন, মহাপুরুষের ইতিহাস বাহিরে নানা কার্যে এবং জীবন বৃত্তান্তে স্থায়ী হয়, আর মহৎ নারীর ইতিহাস তাহার স্বামীর কার্যে রচিত হইয়া থাকে। এবং সে লেখায় তাহার নামোল্লেখ থাকে না। এরই মধ্যে মামরা মৃণালিনীর আসল পরিচয় খুঁজে পাব। আজ আমরা ঠাকুরবাড়ির মেয়েদের কথা খুঁটিয়ে বলতে বসেছি তাই, নয়ত মৃণালিনীকে নিয়ে স্বতন্ত্র প্রসঙ্গের শবতারণা করার সুযোগ বড় কম। তিনি রবীন্দ্রজীবনে, ঠাকুরবাড়িতে, শান্তিনিকেতনের আশ্রম-বিদ্যালয়ে মিশে আছেন ফুলের সুরভির মতো। দেখা যায় না, অনুভবে মন ভরে যায়।

মৃণালিনী আরো কিছুদিন বেঁচে থাকলে রবীন্দ্রনাথের আশ্রম-বিদ্যালয়ের পরিকল্পনা অরো সার্থক হতে পারত। তিনি ব্রহ্মচর্য আশ্রমের দেখাশোনা করতেন এবং অপরের কচিকচি শিশুদের অপরিসীম মাতৃস্নেহে নিজের কাছে টেনে নিয়ে, তাদের হোস্টেলে আসার দুঃখ ভুলিয়ে দিতেন। বাড়ির থেকে দূরে এসেও ছেলেরা, মাতৃস্নেহের আশ্রয় পেত। কিন্তু কঠোর পরিশ্রমের তীব্র অঘািত সহ্য করতে না পেরে, আশ্রম-বিদ্যালয় স্থাপনের মাত্র এগারো মাস পরেই বিদায় নিলেন মৃণালিনী। কবির সমস্ত সেবা যত্ন ব্যর্থ করে দিয়ে শীতের পদ্মটি ম্লান হয়ে এল, হারিয়ে গেল কবির প্রিয় পত্র-সম্বোধনটি ভাই ছুটি। কে জানত এত শীঘ্র জীবন থেকে, সংসার থেকে ছুটি নিয়ে তিনি চলে যাবেন! জীবনের প্রতি পদে লোকান্তরিত মৃণালিনীর অভাব অনুভব করেছেন রবীন্দ্রনাথ এমন কেউ নেই যাকে সব বলা যায়—। স্মরণের কবিতায় ঝরে পড়েছে লোকান্তরিত পত্নীর জন্য বেদনা। সংসারে যখন শুধুই কথার পুঞ্জ জমে উঠছে তখন তিনি বারবার স্মরণ করছেন লোকান্তরিতা স্ত্রীকে। অনুভব করছেন তাঁর আশ্রমবিদ্যালয় অসম্পূর্ণ থেকে গেছে কারণ আমি তাদের সব দিতে পারি, মাতৃস্নেহ তো দিতে পারি না। বাংলাদেশে আরো কয়েকজন আদর্শ জননীর পাশে মৃণালিনীর মাতৃমূর্তিটিও চিরস্থায়ী আসন লাভ করতে পারে।

ঠাকুরবাড়ির বৌয়েদের সঙ্গে আরো একজনের কথা এ প্রসঙ্গে সেরে নেওয়া যাক। যোগমায়াকে নিশ্চয় মনে আছে, গিরীন্দ্রনাথের সাহিত্যপ্রেমিকা ধর্মশীল স্ত্রী, যিনি সাবেকী লক্ষ্মীজনার্দন ঠাকুরকে নিয়ে উঠে এসেছিলেন বৈঠকখানা বাড়িতে। সেদিন থেকে জোড়াসাঁকোর বাড়ি দু ভাগ হয়ে গেল কিন্তু মনের মধ্যে দেয়াল ওঠেনি। বরং ঠাকুরবাড়ির সঙ্গে যোগ ছিল না নগেন্দ্রনাথের সন্দেহপরায়ণা স্ত্রী ত্রিপুরাসুন্দরীর। সম্পত্তি সংক্রান্ত নানারকম সন্দেহের বশবর্তী হয়ে তার ধারণা হয়েছিল, মহর্ষিপরিবার তাকে বিষ খাইয়ে মেরে ফেলতে চান। তাই তিনি সদর টীটের বাড়ি থেকে এ বাড়িতে কদাচিৎ এলেও কিছু খেতেন না। সব সময় তার খাবার অন্য বৌদের চেখে দিতে হত। যাক সে কথা। যোগমায়ার পুত্রদের সঙ্গে মহর্ষির পুত্রদের সৌহার্দ্য ঘোচেনি। মানসিকতার দিক থেকেও গুণেন্দ্ৰপরিবার এঁদের সঙ্গেই ঘনিষ্ঠ হয়ে উঠলেন। তাই এ দুটি বাড়ি প্রকৃতপক্ষে এক বাড়িই রয়ে গেছে। আবার গুণেন্দ্ৰপরিবার ব্রাহ্ম না হওয়ায় পাথুরেঘাটা বা কয়লাহাটা ঠাকুরবাড়ির সঙ্গেও তাদের যোগ ছিন্ন হল না। এক কথায় এঁরা রইলেন দুই ঠাকুর পরিবারের ঠিক মাঝখানে। অন্যান্য ঠাকুরদের সঙ্গে রইল সামাজিক যোগ, মহর্ষিভবনের সঙ্গে হল মানসিক যোগ। তাই দ্বারকানাথ লেনের পাঁচ নম্বর আর ছ নম্বরকে এক বাড়ি বলাই ভাল। আর সত্যিই তো এক সীমানার মধ্যে ছিল দুটি বাড়ি, এখন অবশ্য নেই। পাঁচ নম্বর বা দ্বারকানাথের সাজানো গোছানো অমন সুন্দর বৈঠকখানা বাড়িটিকে ভেঙ্গে নিশ্চিহ্ন করে দেওয়া হয়েছে, রক্ষা পেয়েছে শুধু অন্দরমহল সংলগ্ন বেনেবাড়িটি। এই বৈঠকখানা বাড়ির প্রকৃত গৃহিণী ছিলেন গুণেন্দ্রনাথের স্ত্রী সৌদামিনী।

বৃহৎ পরিবারে পাঁচটি সন্তানের জননী সৌদামিনীর কর্তৃত্বশক্তির পরিচয় প্রথমটায় পাওয়া যায়নি। বোঝা গেল, যেদিন তিনি ছোট ছোট ছেলেমেয়েদের নিয়ে নানা সমস্যার সম্মুখীন হলেন।

যে বিচক্ষণতার সঙ্গে সৌদামিনী ভাঙা সংসারের হাল ধরেছিলেন, তার তুলনা হয় না। গুণেন্দ্রনাথের উদ্দাম-জীবন উৎসবের উন্মত্ততায় এমন আকস্মিকভাবে নিঃশেষ হয়ে গেল দেখে তিনি মনঃস্থির করেছিলেন, তার ছেলেদের তিনি বিলাসের ফাঁস থেকে, যেমন করে তোক রক্ষা করবেন। বঙ্গহীন প্রমোদের স্রোতে ভেসে যেতে দেবেন না। এই প্রতিজ্ঞা রক্ষা করা যে কত কঠিন, সেকথা আজ আমরা বুঝতে পারব না। উনিশ শতকের শিক্ষা-সংস্কৃতি-নবজাগরণের ফাঁক দিয়ে তখন বয়ে চলেছে বাবুয়ানির তীব্র পঙ্কিল স্রোত। একদিকে যেমন স্কুল খোলা, পত্রিকা প্রকাশ, সমাজসেবার ধূম অপরদিকে তেমনি নগরনটীদের নৃপুর নিক্কণ আর পেয়ালাভরা সুরার রক্তিম আহ্বান। ধনী সন্তানের দেশী বিলিতি উভয় ধরনের বিলাসিতাতেই অভ্যস্ত হয়ে উঠছেন।

বড়লোকের ছেলে বিলাসী হবে না? সে কি কথা? গোঁফ ওঠার সঙ্গে সঙ্গেই তো তাদের তালিম দিয়ে আলালের ঘরের দুলালে পরিণত করা হত। যখনকার যা দস্তুর! ঠাকুরবাড়িতে ধনের অভাব ছিল না, অভাব ছিল না বনেদিয়ানার। তবে? বাবুয়ানি না দেখালে আভিজাত্য থাকবে কি করে? কলকাতার আর পাঁচটা ধনী পরিবার কি করছে? সৌদামিনী শক্ত হলেন। যেখানে যা হয় হোক। পাশেই তো রয়েছে মহর্ষিভবন। সেখানে তে আনন্দের উপাদানের নীচে বয়ে যাচ্ছে না পঙ্কিল বিলাসের স্রোত। তাই হল শেষ পর্যন্ত। সেকেলে বাবুয়ানির ক্রমাগত হাতছানি অনায়াসে উপেক্ষা করে গগনেন্দ্র-সমরেন্দ্র-অবনীন্দ্র মহর্ষিপুত্রদের মতোই নানা গুণের অধিকারী হয়ে উঠলেন। সব দিকে থাকত সৌদামিনীর প্রখর দৃষ্টি। তিনি কখনো নিজের ইচ্ছের কথা জোর করে জানাতেন না, কোথাও ছিল না জেদ বা জবরদস্তির কোন চিহ্ন। তবু তাঁরই ইচ্ছায়, তারই প্রাণের প্রভাবে ছেলেরা চলেছে। কেউ এতটুকু প্রতিবাদ করতে পারেনি। বাইরে কঠিন ভেতরে কোমল এই অসামান্য নারী রবীন্দ্রনাথেরও অকুণ্ঠ শ্রদ্ধা আকর্ষণ করেছিলেন। বহুদিন পরে কথা প্রসঙ্গে কবি রাণী চন্দকে বলেন, আমাদের গগনদের মা ছিলেন, যাকে ভুলেও শিক্ষিত বলা যায় না কিন্তু, কী সাহস আর কী বুদ্ধিতে তিনি চালিয়েছিলেন সবাইকে। তিন তিনটি ছেলেকে কী ভাবে মানুষ করে তুললেন। ছেলেরা তাদের মাকে যা ভক্তি করে অমন সচরাচর দেখা যায় না।

সৌদামিনী শুধু ছেলেদের মানুষ করেছিলেন তা নয়, ঋণের বোঝায় সংকটাপন্ন জমিদারীকেও একেবারে নতুন করে দিয়েছিলেন। তার কথা মনে হলেই যেন যোগাযোগ উপন্যাসের বড়বৌ অর্থাৎ কুমুর মাকে মনে পড়ে যায়।

সবদিকে নজর রাখতে গিয়ে সৌদামিনী অবশ্য নিজের দিকে একেবারেই তাকাতে পারেননি। সাহিত্য বা শিল্পচর্চার নজির না থাকলেও নানারকম মেয়েলি গুণের অধিকারী ছিলেন সৌদামিনী। মনে হয় তার নাতনীদের মধ্যে পরে যেসব গুণের প্রকাশ হয়েছিল সবই তার মধ্যে অল্পবিস্তর ছিল, নাহলে কারুর মধ্যে কোন গুণের সামান্য স্ফুলিঙ্গ দেখলেই তিনি তাকে চিনতেন কি করে। তাছাড়া তিনি বেশ ভাল চরকা কাটতে পারতেন। তার নিজের হাতে কাঁটা-সুতোয় বোনা কাপড় শান্তিপুরী কাপড়ের মতো মিহি দেখাত। নাতনীদেরও সবাইকে তিনি একটা করে চরকা কিনে দিয়েছিলেন। রোজ সুতো কেটে তাদের দেখাতে হত। হাতে তৈরি জিনিষ বা স্বদেশী কুটির শিল্পের প্রতিও তাঁর আগ্রহ ছিল। গ্রামাঞ্চল থেকে মেয়েরা তাদের হাতের তৈরি খেলনা বা পুতুল বিক্রী করতে এলে তিনি তাদের উৎসাহ দেবার জন্যে সব কিনে নিতেন। এমনকি স্বদেশী আন্দোলনের প্রতিও তার সহানুভূতি ছিল। অর্থ-সাহায্য ছাড়াও তার বাড়িতে গোপনে অনুশীলন সমিতির কাজ হত! এরকম ছোটখাট অনেক ঘটনা দেখে বোঝা যায়, সৌদামিনী প্রগতিশীল ছিলেন না ঠিকই কিন্তু অসাধারণ এবং দুর্লভ গুণের অধিকারী ছিলেন। তাঁকে এবং তাঁর মতে আরো কয়েকজন বন্ধুকে দেখে জানা যায়, ব্রাহ্ম সমাজ বা নারী প্রগতি-স্ত্রীশিক্ষা প্রভৃতি নবজাগ্রত-ধ্যান-ধারণার সঙ্গে যেসব মেয়ের যোগ ছিল না তারাও কম কৃতিত্বের পরিচয় দিয়ে যাননি। এঁদের কথা আলোচনা না করে শুধু প্রগতিশীল জ্ঞানদানন্দিনী-কাদম্বরী-স্বর্ণকুমারীর কথা মনে রাখলে ঠাকুরবাড়ির অন্দরমহলের পরিচয় যেমন সম্পূর্ণ পাওয়া যাবে না, তেমনি জানা যাবে না এই মহীয়সীদের প্রভাবে এ পরিবারের পুরুষদের শিল্পীস্বভাব কি করে গড়ে উঠেছিল। যাক সে কথা।

মহর্ষি দেবেন্দ্রনাথের প্রতিভাময়ী নাতনীদের সংখ্যাও কম নয়। উপযুক্ত পরিবেশে, প্রতিভাবান পিতামাতার প্রভাবে, তারাও অনেকেই নানান গুণের অধিকারিণী হয়ে উঠেছিলেন। ভিন্ন পরিবার থেকে আসা কয়েকজন নাতবৌও যে কৃতিত্বের পরিচয় দেননি, তা নয়। আসলে এ সময় বাংলাদেশে অভাবনীয় নারী জাগরণের উদ্দীপনা দেখা দিয়েছিল। মেয়েরা নিজেরাই ঠেলেঠুলে বেরিয়ে এসেছিলেন বাইরে। প্রথম পর্যায়ে ঠাকুরবাড়ির মেয়েদের কাজকর্ম দেখে যেমন মেয়েরা সবাই হতবা হয়ে গিয়েছিলেন এন ঠিক সে অবস্থা রইল না। মহর্ষির নাতনীদের সমবয়সী অনেকগুলি গুণবতী মেয়ের সন্ধান পাওয়া গেল। অবশ্য ঠাকুরবাড়ির মেয়েরাও যে দূরে সরে গেলেন, তা নয়। তারা এখন অস্পৃশ্য। মানবী নন বরং উঁচু মহলের আভিজাত্যের প্রতীক এবং অনুকরণযোগ্য। সমাজ ধিক্কারের বদলে তাদের রুচিবোধের প্রশংসা করল। শিল্পে-সাহিত্যে ঠাকুরবাড়ির সংস্কৃতির একটা নিজস্ব ছাপ পড়তেও শুরু হল। বস্তুতঃ ১৮৭৫ থেকে ১৯২৫ এই পঞ্চাশ বছরটাকে যদি এক ঝলকে, এক পলকে দেখে নেওয়া যেত তাহলে ঠাকুরবাড়ির সোনালি-সফল দিনগুলোকেও একসঙ্গে দেখা যেত। বাংলার নারী সমাজেও এই সময় এসেছে যুগান্তর। ঠাকুরবাড়ির অন্তঃপুরেও জ্ঞানদানন্দিনীস্বর্ণকুমারী-মৃণালিনী-সৌদামিনীর পাশে এসে দাঁড়িয়েছেন প্রতিভা-ইন্দিরা-সরলাশোভনারা। সবাইকে আমরা পেয়ে যাচ্ছি একসঙ্গে। কিন্তু আলোচনার সুবিধের জন্যে একের পর এক নীতি মেনে নিতে হল ঠাকুরবাড়ির মেয়েদের সঙ্গে এবার পাল্লা দিলেন অন্যান্য মেয়েরাও। সবার দানেই নারীপ্রগতি আজকের দিনে এত বেশি সার্থক হয়ে উঠেছে।

মহর্ষির নাতনীদের মধ্যে সবার চেয়ে বয়সে বড় সৌদামিনীর মেয়ে ইরাবতী আর হেমেন্দ্রনাথের মেয়ে প্রতিভা। দৌহিত্রীদের সবাই না হলেও ঠাকুরবাড়িতে যারা মানুষ হয়েছেন। তাঁদের আমরা ঠাকুরবাড়ির মেয়েই মনে করব। যদিও ইরাবতীর সঙ্গে ঠাকুরবাড়ির যোগ খুব বেশিদিনের নয়। তিনি রবীন্দ্রনাথের সমবয়সী ছিলেন। বিয়ে হয়েছিল পাথুরেঘাটার সূর্যকুমারের দৌহিত্রের পুত্র নিত্যঞ্জনের সঙ্গে। দক্ষিণারঞ্জন মুখোপাধ্যায়ের ভাইপো নিত্যরঞ্জন থাকতেন কাশতে। গোঁড়া হিন্দু-পরিবার হওয়ায় তাঁর। অনেকদিন ঠাকুকবাড়ির সঙ্গে যোগ রাখেননি। ইরাবতী বাপের বাড়ি এসেছিলেন বিয়ের দীর্ঘ আঠারো বছর পরে। তবে তার যে একটি কল্পনাপ্রবণ মন ছিল সেটি ধরা পড়ে সেই ছোটবেলাতেই, যখন তিনি রাজার বাড়ির কথা বলে, সমবয়সী মামাটিকে বোকা বানিয়ে দিতেন। তিনি হঠাৎ এসে তাকে বলতেন, আজ রাজার বাড়ি গিয়েছিলাম। বালকের কল্পনা সমুদ্রের ঢেউয়ের মতো ফুলে ফেঁপে উঠত। তাঁর মনে হত, রাজার বাড়ি খুব কাছে, এই বড় বাড়িটারই কোন একটা জায়গায়, কিন্তু কোথায় সেটা। বালকের ব্যাকুল প্রশ্ন বুক চিরে উঠে আসত, রাজার বাড়ি কি আমাদের বাড়ির বাহিরে?

ইরাবতী মজা পেয়ে বলতেন, না, এই বাড়ির মধ্যেই। তিনি জানতেও পারেননি এই ছোট্ট কথাটি তার মামার মনে কী আলোড়ন জাগায়। কল্পনার সোপানে সেই প্রথম পদার্পণ! বালক শুধু ভাবতেন, বাড়ির সকল ঘরই তো আমি দেখিয়াছি কিন্তু সে ঘর তবে কোথায়? রাজা কে কিংবা রাজত্ব কোথায় সে কথা তিনি জানতে পারেননি; শুধু মনে হয়েছে, তাঁদের বাড়িটাই রাজার বাড়ি। রবীন্দ্রনাথের শৈশব-কল্পনা উজ্জীবনে ইরাবতীর ভূমিকাটিকে তাই আমরা উপেক্ষা করতে পারি না।

ইরাবতীর ছোট বোন ইন্দুমতীর সঙ্গে ঠাকুরবাড়ির যোগ আরও কম। তার স্বামীর নাম নিত্যানন্দ (নিত্যরঞ্জন চট্টোপাধ্যায়। ঠাকুরবাড়িতে দুই জামাই বড় নিত্য ও ছোট নিত্য নামেই পরিচিত ছিলেন। ইন্দুমতী থাকতেন সুদূর মাদ্রাজে। নিত্যানন্দ সেখানকার ডাক্তার ছিলেন। খুব স্বাভাবিক কারণেই সেখানে তাঁরা এ্যাঙ্গলো ইণ্ডিয়ান সমাজের সঙ্গে বেশি মেলামেশা করতেন বলে ইন্দুমতী বিদেশী চালচলনে অভ্যস্ত হয়ে ওঠেন। তার যতগুলি ফটো আমরা দেখেছি সেগুলো সবই গাউন পরা, বিদেশিনীর সাজে। ইন্দুমতীর এক মেয়ে লীলার বিয়ে হয়েছিল প্রমথ চৌধুরীর ভাই মন্মথর সঙ্গে। চিত্রাভিনেত্রী দেবিকারাণী এই লীলারই মেয়ে।

প্রতিভা বা প্রতিভাসুন্দরী রবীন্দ্রনাথের চেয়ে মাত্র পাঁচ বছরের ছোট। মহর্ষির তৃতীয় পুত্র হেমেন্দ্রনাথের প্রথম সন্তান প্রতিভা। সত্যিই প্রতিভাময়ী তিনি। হেমেন্দ্র তাঁকে সর্বগুণে গুণান্বিত করে তোলার জন্যে একেবারে উঠেপড়ে লেগেছিলেন। তাই প্রতিভা প্রথম জীবনে অবকাশ পেয়েছেন খুব কম। সাদাসিধে বেথুন স্কুলের বদলে তিনি ভর্তি হয়েছিলেন লরেটো হাউসে। লরেটোতে প্রতিভাই প্রথম হিন্দু (ব্রাহ্ম) ছাত্রী। তখনও মেয়েদের পরীক্ষা দেবার ব্যবস্থা চালু না হওয়ায় প্রতিভা কোন পরীক্ষা দিতে পারেননি তবে ওপরের ক্লাস পর্যন্ত উঠেছিলেন।

আশ্চর্যের বিষয় এই যে, প্রতিভা বা তার বাবা হেমেন্দ্রনাথ কেউই এ সময় পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হবার কথা ভাবেননি অথচ তখনই বিশ্ববিদ্যালয়ের বন্ধ দরজা খোলার চেষ্টা করছিলেন চন্দ্রমুখী বসু। তিনি সময়ের দিক থেকে প্রতিভার সমসাময়িক। মেয়েদের শিক্ষা প্রসারে চন্দ্রমুখীর দান অসামান্য। তিনি এনট্রান্স পরীক্ষা দেবার জন্যে প্রথমে দেরাদুনের নেটিভ ক্রিশ্চান গার্লস মিশনারী স্কুলের অধ্যক্ষ রেভারেণ্ড হেরনের কাছে প্রার্থনা জানালেন। হেরন প্রথমে তাকে অনেক বুঝিয়ে-সুঝিয়ে পরীক্ষা দেবার সংকল্প ত্যাগ করতে বলেন। কিন্তু চন্দ্রমুখীর কাতর অনুরোধে বিশ্ববিদ্যালয় থেকে অনুমতিও প্রার্থনা করলেন। সত্যিই তো, ছেলেরা যদি পরীক্ষা দিতে পারে তবে এই মেয়েটি পারবে না কেন? কি তার অপরাধ?

অপরাধ না থাকুক, সহজে চন্দ্রমুখীকে অনুমতি দেয়নি কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়। অনেক তর্কাতর্কির পর ১৮৭৬ সালের ২৬শে নভেম্বরের সিণ্ডিকেট সভা চন্দ্রমুখীকে এই শর্তে পরীক্ষায় বসতে দিতে রাজী হলেন যে তাকে নিয়মিত পরীক্ষার্থী হিসেবে গণ্য করা হবে না এবং পরীক্ষকরা তার খাতা দেখে যদি বা পাশের নম্বর দেন, তবু পাশকরা ছাত্রদের তালিকায় তার নাম থাকবে না। চমৎকার সিদ্ধান্ত। ধন্য কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়! চন্দ্রমুখী তাতেই রাজী হলেন এবং পাশও করলেন। এ সময়ও ঠাকুরবাড়ির কোন মেয়ে এগিয়ে এলেন না পরীক্ষা দিতে, অথচ ঘরে বসে তখন প্রতিভা চন্দ্রমুখীর মতোই শিক্ষিত হয়ে উঠেছেন। তাই ঠাকুরবাড়ির মেয়েরা প্রথম স্কুলযাত্ৰিনীদের একজন হয়েও, প্রথম কলেজে পড়া ছাত্রীর গৌরব থেকে বঞ্চিত হলেন।

প্রথম মহিলা গ্র্যাজুয়েট হিসেবেও চন্দ্রমুখীর নাম করা যায়। সে সময় তার সঙ্গিনী ছিলেন মাত্র আর একজন, কাদম্বিনী বসু। পরে যিনি প্রথম মহিলা চিকিৎসক হয়েছিলেন। আর সবটাই যে শুধু এই দুটি মেয়ের চেষ্টায় সম্ভব হয়েছিল তা নয়। এদিকে অনেকেরই দৃষ্টি পড়েছিল। ঢাকার অবলাবান্ধব দ্বারকানাথ গঙ্গোপাধ্যায়ের আপ্রাণ চেষ্টায় মেয়েরা কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ের একটা অতিরিক্ত টেস্ট পরীক্ষায় বসার অনুমতি পেলেন। সাহায্য করলেন নারী হিতৈষী ভাইস চ্যান্সেলার স্যার আর্থার হবহাউস। এবারে পাশ করলেন কাদম্বিনী। তিনি কলেজে পড়ার জন্য অনুমতি চাইলে শেষে বিশ্ববিদ্যালয়ের সম্মতি পাওয়া গেল। ১৮৮০ সালে এনট্রান্স পাশ করলেন চণ্ডীচরণ সেনের মেয়ে কামিনী সেন (রায়) ও সুবর্ণপ্রভা বসু। ১৮৮১-তে পাশ করলেন আরো ছজন মেয়ে। অবলা দাস (বসু), কুমুদিনী খাস্তগির (দাস), ভার্জিনিয়া মিত্র (নন্দী), নির্মল মুখোপাধ্যায় (সোম), প্রিয়তমা দত্ত (চট্টোপাধ্যায়) ও বিধুমুখী বসু। বাংলার নারী প্রগতি আন্দোলনে পরে এরা প্রত্যেকেই উল্লেখ যোগ্য ভূমিকা গ্রহণ করেছিলেন এবং অসাধারণ কৃতিত্বের পরিচয় দিয়েছিলেন। পরের ইতিহাস তো সংক্ষিপ্ত। বেথুন কলেজের একমাত্র ছাত্রী হিসেবে কাদম্বিনী এবং ফিচার্চ অব স্কটল্যাণ্ড থেকে বি. এ. পড়লেন চন্দ্রমুখী। ১৮৮২ সালের ডিসেম্বর মাসে পরীক্ষার ফল প্রকাশ হলে দেখা গেল, সমস্ত ব্রিটিশ সাম্রাজ্যের মধ্যে প্রথম দুটি মহিলা গ্র্যাজুয়েটের নাম চন্দ্রমুখী ও কাদম্বিনী। চন্দ্রমুখী পরে এম. এ. পাশ করেন আর কাদম্বিনী হন চিকিৎসক। কাদম্বিনীকে অনেক কাঠখড় পুড়িয়েই। ডাক্তার হতে হয়েছিল, সহজে হয়নি। ভারতে তিনি পরীক্ষকদের বিচারে ফেল করেছিলেন তবে তাকে চিকিৎসা করবার অনুমতি দেওয়া হয়। তাতে সন্তুষ্ট না হয়ে তিনি গ্লাসগো ও এডিনবরা থেকে চিকিৎসকের ডিগ্রী নিয়ে আসেন। মাদ্রাজে ডাক্তারী পড়েছিলেন অবল দাস। কলকাতায় ভার্জিনিয়া মিত্র ও বিধুমুখী বসু। এভাবেই উচ্চশিক্ষার ক্ষেত্রে মেয়েদের দরজা খুলে দিলেন চন্দ্রমুখী ও কাদম্বিনী। সে যুগে এই দুজনকে দেখবার জন্য রাস্তায় লোকের ভিড় জমে যেত। বিশেষ করে মেয়েরা তাদের দেখত শ্রদ্ধা মেশানো বিস্ময় নিয়ে। এদের সঙ্গে প্রতিভার নামটি যুক্ত হলেই হয়ত সব দিক দিয়ে সুন্দর দেখাত কিন্তু পরীক্ষার ব্যাপারে ঠাকুরবাড়ির মেয়েরা বেশ খানিকটা পিছিয়েই রইলেন। এগিয়ে গেলেন শিল্প-সংস্কৃতির জগতে।

সঙ্গীতের জগতে বাঙালী মেয়েদের জন্যে আরেকটি মুক্তির পথ খুলে দিয়েছিলেন প্রতিভা। প্রাচীন প্রথা না মেনে হেমেন্দ্র তার স্ত্রীকে গান শিখিয়েছিলেন। প্রতিভা চর্চা করেছিলেন দেশি-বিলিতি উভয় সঙ্গীতেরই। শুধু তাই নয়, চিরকালের ট্র্যাডিশন ভেঙ্গে প্রতিভা তার ভাইয়েদের সঙ্গে ব্রহ্মসঙ্গীত গাইলেন মাঘোৎসবের প্রকাশ্য জনসভায়। আর একটি নতুন নক্ষত্রের আত্মপ্রকাশে খুশি হলেন সুধীসমাজ। মেয়েকে গান শেখানোর ব্যাপারে কার্পণ্য করেননি হেমেন্দ্র। বাড়ির ওস্তাদ বিষ্ণু চক্রবর্তীর কাছে তালিম নেওয়া ছাড়াও বিদেশী গান ও পিয়ানো শিখতেন প্রতিভা। আরো নানারকম বাদ্যযন্ত্র ও শিখেছিলেন। ১৮৮২ সালে লেখা হেমেন্দ্রর একটি চিঠিতে দেখা যাচ্ছে তিনি প্রতিভাকে বিলিতি গান সম্বন্ধে উপদেশ দিচ্ছেন :

…কেবল নাচের বাজনা ও সামান্য গান না শিখিয়া যদি Beethoven প্রভৃতি বড় বড় German পণ্ডিতদের রচিত গান বাজনা শিক্ষা করিতে পার, এবং সেই সঙ্গে music theory শেখ তবেই আসল কম হয়।

প্রত্বিভা তাঁর বাবার ইচ্ছা সর্বাংশে পূরণ করে মেয়েদের মধ্যে গানের ব্যাপারে অভিজ্ঞ হয়ে উঠলেন। বিদ্যোৎসাহিনী সভায় তার গান আর সেতার শুনে খুশি হয়ে রাজা শৌরীন্দ্রমোহন তাঁকে দিলেন স্বরলিপির বই, রঘুনন্দন ঠাকুর দিলেন বিশাল তানপুরা। গান ছাড়াও আর একটা ব্যাপারে ট্র্যাডিশন ভাঙলেন প্রতিভা। চন্দ্রমুখী-কাদম্বিনী যেমন বাঙালী মেয়েদের লেখাপড়ার সুযোগ করে দিয়েছিলেন, প্রতিভা তেমনি সুযোগ করে দিলেন গান করার ও অভিনয় করার। এই দুঃসাহসিক নজির তার কাকীমাদের ঘোড়ায় চড়া বা বিলেত যাওয়ার চেয়ে খুব কম সাহসের কথা নয়। তার কাকীমা, পিসীমার অভিনয় করেছিল ঘরোয়া আসরে। দর্শক হিসেবে যারা ছিলেন তারা সবাই আপনজন, চেনাশোেনা মানুষ সুতরাং লজ্জা ছিল না, সমালোচনার আশংকাও না। সাধারণ মানুষ, যাদের আমরা বলি পাবলিক, সর্বপ্রথম তাদের সামনে এসে দাঁড়িয়েছিলেন প্রতিভা। ঠাকুরবাড়ির যে কোন উৎসবে তাই মানুষ ভেঙে পড়ত। তারা শুনত বাঙালী মেয়েদের গান, অবাক হয়ে দেখত ভদ্রঘরের মেয়েরা আসরে বসে গান গাইছে। বিস্ময়ে হতবাক হয়ে যেত। তারপর বিদ্বজ্জন-সমাগমের সভায় মেয়েরা অভিনয় করতেও এগিয়ে এলেন। সবার আগে প্রতিভা, বাল্মীকিপ্রতিভার সরস্বতী হয়ে।

রবীন্দ্রনাথ যখন বিলেত থেকে ফিরে এলেন তখন ঠাকুরবাড়িতে শুরু হয়েছে। গীতিনাট্যের যুগ। স্বর্ণকুমারী ও জ্যোতিরিন্দ্রর লেখা বসন্ত-উৎসব, মানময়ীর ঘরোয়া অভিনয় হয়ে গেছে কয়েকবার। এমন সময় রবীন্দ্রনাথ দেশী বিলিতি সুর ভেঙে লিখলেন একটি নতুন অপেরাধর্মী গীতিনাট্য। রামায়ণের সুপরিচিত রত্নাকর দস্তুর বাল্মীকিতে রূপান্তরের কাহিনীটিকে তিনি বেছে নিলেন। এই নাটকে তিনটি নারী চরিত্র রয়েছে। বালিকা, লক্ষ্মী ও সরস্বতী। নাটক লেখার পরেই যখন রিহার্সাল শুরু হল তখন রবীন্দ্রনাথ সরস্বতীর ভূমিকায় প্রতিভার অপূর্ব অভিনয় দেখে নাটকের সঙ্গে প্রতিভার নামটি জুড়ে নতুন নাম দিলেন বাল্মীকিপ্রতিভা।

এরপর স্থির হল, বিদ্বজ্জন-সমাগম সভায় বাল্মীকি প্রতিভার অভিনয় হবে। সেদিনটা ছিল শনিবার। ১৬ই ফান্তুন বাংলা ১২৮৭ সাল। সন্ধ্যেবেলা। বসন্তের মৃদুমন্দ দখিনা বাতাস বইছে। দর্শকরা উপস্থিত। এমন সময়ে শুরু হল বাল্মীকিপ্রতিভা। ডাকাতের আনাগোনা। গুরুগম্ভীর পরিবেশ। দর্শকেরা মুগ্ধ! স্তব্ধ। বিস্ময়ের ওপর বিস্ময়। ক্রৌঞ্চমিথুনের জায়গায় সত্যিকারের দুটো মরা বক। বুক দুটো অবশ্য জোগাড় করে এনেছিলেন জ্যোতিরিন্দ্রনাথ। ছোট ভাইয়ের নাটক মঞ্চস্থ হবে, জ্যোতিরিন্দ্র মহা উৎসাহে পাখি শিকারে বেরোলেন। কিন্তু কোথায় পাখি? সারাদিন ঘুরে ঘুরে ক্লান্ত হয়ে খালি হাতে ফিরে আসছেন, তখন দেখলেন, একজন অনেকগুলো বক বিক্রী করতে যাচ্ছে। তার কাছ থেকে দুটো বক কিনে, মেরে বাড়ি নিয়ে আসেন। সেকালে অনেকেই স্টেজের মধ্যে বাস্তব জগৎকে টেনে আনতে চেষ্টা করতেন। শুধু সেকালে কেন? একালেও রিয়্যালিস্টিক স্টেজ করার চেষ্টা কম হয় না। স্টেজের মধ্যে ট্রেন-সেতু। বন্যা-গাড়ি এসব আনার মধ্যেও সেই একই মানসিকতা কাজ করছে। কালমৃগয়ার অভিনয়ে জ্যোতিরিন্দ্রনাথের একটা পোষা হরিণকে স্টেজে ছেড়ে দেওয়া হয়েছিল। এই জাতীয় জিনিষের সূচনা হয় বেঙ্গল থিয়েটারের পুরুবিক্রম নাটকে। ছাতুবাবুদের বাড়ির শরচ্চন্দ্র ঘোষাল পুরু সেজেছিলেন। তিনি একটা সত্যিকারের সাদা তেজিয়ান ঘোড়ার পিঠে চেপে স্টেজে আসতেন।

বাল্মীকিপ্রতিভার অভিনবত্ব ছিল অভিনেত্রীর আবির্ভাবে। হাত বাঁধা বালিকার ভূমিকায় সত্যিই একটি অনিন্দ্যসুন্দরী বালিকা এসে বসল। প্রতিভাকে চিনতে পারলেন অনেকে। এই মেয়েটিই তো সেবার মুগ্ধ করেছিল গান শুনিয়ে, এবারও মুগ্ধ করল সরস্বতী রূপে। নাটকের শেষে এক অনির্বচনীয় তৃপ্তির রেশ নিয়ে ফিরে গেল সবাই। আর্যদর্শন কাগজে যখন এই অভিনয়র সংবাদ ছাপা হল, তখন দেখা গেল সমালোচক প্রতিভার অভিনয়ের প্রশংসা করে লিখেছেন, শ্ৰীযুক্ত বাবু হেমেন্দ্রনাথ ঠাকুরের প্রতিভা নাম্নী কন্যা প্রথমে বালিকা পরে সরস্বতীমূর্তিতে অপূর্ব অভিনয় করিয়াছিলেন। প্রতিভা সৌভাগ্যবতী, তাই প্রথম মঞ্চাবতরণের পর তাকে সহ্য করতে হয়নি অপমানের গ্লানি। বরং কলারসিকেরা তাকে সশ্রদ্ধ স্বীকৃতিই জানিয়েছেন।

বাল্মীকি প্রতিভায় কিন্তু আরও একটি নারীচরিত্র ছিল—লক্ষ্মী। এই প্রথমবারে অভিনয়ে লক্ষ্মী হয়েছিলেন শরৎকুমারীর বড় মেয়ে সুশীলা। ইন্দিরা সেরকম ইঙ্গিতই করেছেন। অথচ আদর্শনের সমালোচক লক্ষ্মীর কথা উল্লেখ করেননি দেখে অবাক হতে হয়। তখনকার দিনের পক্ষে লক্ষ্মীর ভূমিকা দেখেও তো মুগ্ধ হবার কথা। বাইরের রঙ্গমঞ্চে অবশ্য তখন বড় বড় অভিনেত্রীর আবির্ভাব হয়েছে, নটী বিনোদিনীর অভিনয়ে কলকাতা সরগরম। তবু কোন সম্রান্ত পরিবারের মেয়ে তখনও অভিনয়ের কথা ভাবতেই পারতেন না। মনে হয়, সুশীলার অভিনয় খুব ভাল হয়নি। তবু তাঁর প্রথম প্রয়াস অবশ্যই অভিনন্দনযোগ্য। সুশীলার কথা এর পরেও আর শোনা যায়নি। তারা ছিলেন চার বোন। অপর তিনজন সুপ্রভা, স্বয়ংপ্রভা ও চির প্রভা। শেষোক্ত দুজনের কথা বিশেষ কিছু জানা যায়নি তবে সুপ্রভা সম্বন্ধে একথা চলে না। ঠাকুরবাড়িতে বাস করেও এঁরা কেউ চারুপাঠের বেশি লেখাপড়া যেমন শেখেননি, তেমনি শিল্পকলার চর্চা করেছেন বলেও শোনা যায়নি, প্রত্যেকেই ছিলেন গৃহকর্মনিপুণ এবং সাংসারিক কাজ নিয়েই থাকতে ভালবাসতেন। সুপ্রভা তারই মধ্যে অসাধারণ প্রাণপ্রাচুর্যে পূর্ণা এবং সুরসিক ছিলেন। বিখ্যাত শিল্পী অসিত হালদার তাঁর সন্তান।

ঠাকুরবাড়িতে সুশীলার মতো সুপ্রভাও দু-একবার অভিনয় করেছিলেন। বোধহয় হিরন্ময়ীর বিয়ের সময়। স্বর্ণকুমারীর লেখা বিবাহ-উৎসবের অভিনয়ে সুপ্রভা সাজলেন নায়কের বন্ধু। ঠাকুরবাড়িতে প্রত্যেক বিয়েতে একটা করে থিয়েটার হত। অন্যান্য বড় লোকের বাড়িতে হত বাঈ-নাচ বা পেশাদার যাত্রা ও থিয়েটার। মহর্ষিভবনে বাঈ-নাচ কোনদিনই হত না। তার বদলে ছেলেরা ও মেয়েরা একটা করে নাটক অভিনয় করতেন। এই অভিনয়ের প্রয়োজন হয়েছিল আরেকটা কারণে। সে সময় ঠাকুরবাড়িতে সব অত্মীয়স্বজন অবাধে আসতে পারতেন না। এমনকি পাঁচ বা ছয় নম্বরের অধিবাসীরাও নয়। ইচ্ছে থাকলেও সামাজিক বাধা ছিল; মহর্ষিপরিবার ব্রাহ্ম, তারা হিন্দু বিয়েতে যেখানে শালগ্রাম শিলা আছে সেখানে যাবেন না। অপরদিকে গুণেন্দ্ৰপরিবারও ওবাড়ির কাউকে নিমন্ত্রণ করতেন না পাছে অন্য আত্মীয়ের ব্রাহ্মদের সঙ্গে পংক্তিভোজনে না বসেন। অথচ কে না চায় আনন্দ অনুষ্ঠানে সবাই আসুক। তাই বিয়ের পরদিন কিংবা আট দিনের দিন একটা নাটক অভিনয় হত এবং তাতে সবাই নিমন্ত্রিত হতেন। এ সময় মিষ্টান্ন বিতরণ হত হাতে-হাতে, পংক্তিভোজন না হওয়ায় জাত-পাতের বালাই নিয়ে কেউ মাথা ঘামাতেন না। এই রকমই একটা ঘরোয়া অনুষ্ঠানে সুপ্রভা সাজলেন নায়কের সখ। বিবাহ-উৎসব আরো একবার অভিনীত হয় সুপ্রভার বিয়ের সময়। বিয়ের কনে হয়ে যাওয়ায় সুপ্রভার ভূমিকাটি পান স্বর্ণকুমারীর ছোট মেয়ে সরলা।

বিবাহ-উৎসবের কথায় আরো কয়েকজনের কথা মনে পড়ে। একজন এ। নাটকের নায়ক, তাঁর নামও সুশীলা তবে তিনি ঠাকুরবাড়ির মেয়ে নন, বৌ। দ্বিজেন্দ্রনাথের জ্যেষ্ঠপুত্র দ্বিপেন্দ্রের প্রথম স্ত্রী। অপরজন এ নাটকের নায়িকা সোজাসুন্দরী। সরোজাসুন্দরী এবং উষাবতী দ্বিজেন্দ্রনাথের দুই মেয়ে। বিয়ে হয়েছিল রাজা রামমোহন রায়ের পুত্রের দৌহিত্র বংশে—মোহিনীমোহন চট্টোপাধ্যায় এবং রমণীমোহন চট্টোপাধ্যায়ের সঙ্গে। মোহিনীমোহন ভারতীয় থিয়সফিস্ট আন্দোলনের উদ্যোক্তা, পরে তিনি দীর্ঘ সাত বছর আমেরিকায় বাস করেন। তাঁর দার্শনিক চিন্তা, কবিত্ব শক্তি আর ইংরেজী ভাষার ওপর চমৎকার দখল সেকালে সবার দৃষ্টি আকর্ষণ করেছিল। অন্যান্য গ্রন্থ রচনা ছাড়াও তিনি ইংরেজীতে অনুবাদ করেন শ্ৰীমদ্ভগবদ্গীতা। এঁর আরেক ভাই রজনীমোহনের সঙ্গে বিয়ে হয়েছিল অবন-গগনের ছোট বোন সুনয়নীর এবং বোন হেমলতার সঙ্গে দ্বিপেন্দ্রনাথের বিয়ে হয় তার প্রথম স্ত্রী সুশীলার মৃত্যুর পরে।

সরোজা ছিলেন অসামান্যা রূপসী এবং সুগায়িকা। তাই বিবাহ-উৎসবে তিনি নিয়েছিলেন নায়িকার ভূমিকা। পরে অবশ্য সুগৃহিণী হিসাবে তিনি যতটা কৃতিত্বের পরিচয় দিয়েছেন বহির্জগতে ততটা ছড়িয়ে পড়তে পারেননি। দ্বিজেন্দ্রপরিবারের মেয়েদের ক্ষমতা ছিল ঠিকই কিন্তু সেভাবে স্ফুরণ হয়নি। উদাসীন দার্শনিক দ্বিজেন্দ্রনাথও এ সব বিষয়ে মনোযোগী ছিলেন না। তবে সমাজসেবিকারূপে সরোজার দুই মেয়ে গীতা চট্টোপাধ্যায় ও দীপ্তি চট্টোপাধ্যায় সারাজীবন নিরলসভাবে বহু কাজ করে গিয়েছেন। উদাবতী গান গাইতেন কোরাসে। একবার কালমৃগয়ায় তিনি ও ইন্দিরা সেজেছিলেন বনদেবী। ঠাকুরবাড়িতে এদের অভিনয় বা অন্যান্য ভূমিকা হয়ত খুব স্মরণীয় নয়। কিন্তু সম্মিলিতভাবে এঁরা ঠাকুরবাড়ির অন্দরমহলকে যেভাবে আলোকিত করে তুলে। ছিলেন সে কথা ভোলা যায় না। তাছাড়া কোনদিন যদি রবীন্দ্র-নাটকের প্রতিটি অভিনয়ের পাত্র-পাত্রীদের খোঁজ করা হয় তাহলেও দেখা যাবে তার প্রথম দিকের নাটক এবং গানকে বাড়ির ছেলেমেয়েরাই সবার সামনে তুলে ধরেছিলেন।
আবার বাল্মীকি প্রতিভার কথাতেই ফিরে আসা যাক। একবার বেশ বড় মাপের বাল্মীকি প্রতিভা অভিনয়ের আয়োজন করা হল। ১৮৯৩ সালে লেডি ল্যান্সডাউনের সম্বধনা উপলক্ষে। এর আগে এক যুগ ধরে (১৮৮১-১৮৯২) বাল্মীকি প্রতিভার বহু মঞ্চাভিনয় হয়ে গেছে। প্রতিবারই সরস্বতী সেজেছেন প্রতিভা এবং বাল্মীকি রবীন্দ্রনাথ। এবার আমন্ত্রণ জানানো হল বহু গণ্যমান্য ইংরেজ দর্শকদের। স্টেজ সাজাবার ভার দেওয়া হল দ্বিজেন্দ্রনাথের অন্যতম পুত্র নীতীন্দ্রনাথকে। তিনি প্রাণপণে স্টেজে ন্যাচারাল এফেক্ট আনবার চেষ্টা করলেন। বারান্দা থেকে টিনের নল লাগিয়ে বৃষ্টির জল পড়ার ব্যবস্থাও হল। সাহেবরা খুব খুশি। এবার হাত-বাঁধা বালিকা সাজলেন প্রতিভার সেজ বোন অভিজ্ঞা আর লক্ষ্মী সাজলেন সত্যেন্দ্র-দুহিতা ইন্দিরা। সরস্বতীর ভূমিকা তো প্রতিভার বাঁধা। সাদা সোলার পদ্ম ফুলে শুভ্র সাজে প্রতিভা যখন অস্টিচ পাখির ডিমের খোলা দিয়ে তৈরি বীণাটি হাতে নিয়ে বসেছিলেন তখন প্রথমে সবাই ভাবলে বুঝি মাটির প্রতিমা। তাই শেষে প্রতিভা যখন উঠে এসে বীণাটি কবির হাতে তুলে দিলেন তখন অডিয়েন্স মন্ত্রমুগ্ধ হয়ে গেল। এই অভিনয়টির সাফল্য প্রমাণ করল ঠাকুরবাড়ির শিল্পরুচির শুচিতা এবং মাধুর্য। নাটক এবং অভিনয় বললেই যে আদিরসাত্মক একটি প্রণয় কাহিনী বা ভক্তিরসাশ্রিত পৌরাণিক কাহিনী বেছে নেবার দরকার নেই সেকথাও সকলেই বুঝল।

প্রতিভা পরবর্তী জীবনেও গানের জন্যে অনেক সাধনা করেছেন। সৌভাগ্যক্রমে এঁকে কোন বাধা পেতে হয়নি। সরোজার স্বামীর মতো প্রতিভার স্বামীও ছিলেন বিখ্যাত ব্যক্তি, রবীন্দ্র-সুহৃদ আশুতোষ চৌধুরী। দ্বিতীয়বার বিলেত যাবার সময় রবীন্দ্রনাথ আশুতোষের সঙ্গে পরিচিত হন। পাবনার বিখ্যাত চৌধুরী পরিবারের সন্তান আশুতোষ এসেছিলেন ভিন্ন পরিবেশ থেকে। বন্ধনমুক্ত উদার সমাজ-পরিবেশ বা সংস্কৃতির আলো কোনটাই তিনি প্রথম থেকে পাননি কিন্তু যা করেছিলেন তারও নজির মেলে না। তারা সাত ভাই-ই বিবিধ গুণের অধিকারী ছিলেন। বিশেষ করে আশুতোষ ও প্রমথ-র তো কথাই নেই। বাংলা সাহিত্যের আসরে আশুতোষকে পাওয়া যায় সমালোচকরূপে। রবীন্দ্রনাথের কড়ি ও কোমলকে যথোচিত পর্যায়ে সাজিয়ে তিনিই প্রকাশ করেন। শিক্ষাক্ষেত্রে তার সবচেয়ে বড় কৃতিত্ব কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে একই বছরে বি. এ. ও এম. এ পাশ করা (১৮৮০)। আশুতোষ বিলেত যাচ্ছিলেন বেশ কাঠখড় পুড়িয়ে। তাঁর দিদি প্রসন্নময়ীর লেখা পূর্বকথা পড়ে জানা যায় আশুতোষের পথ মোটেই সুগম ছিল না। চৌধুরীবংশের মধ্যে আশুতোষই প্রথম বিলেত গেলেন। তার আগে তাদের জেলার আর কেউ বিলেত যাননি। ফলে জাত গেল, জাত গেল রব উঠল চারদিকে। চৌধুরীরা কেউ প্রায়শ্চিত্ত করে সমাজে ওঠবার চেষ্টা না করাতে সমাজপতিরা আক্রমণ করলেন আশুতোষের বাবা পিসীদের। তাদের প্রায়শ্চিত্তের ব্যবস্থা হল। প্রত্যেকে পাঁচ কাহন কড়ি দিয়ে মাথা মুড়িয়ে তবে অব্যাহতি পেলেন। প্রসন্নময়ী লিখেছেন, তাঁহারা তো বালবিধবা, আশৈশব ব্রহ্মচর্য প্রতিপালন করিয়া চলিতেন, অকারণ কেন তাহাদিগের জাতি লইয়া টানাটানি পড়িয়া গেল, সেটা বুঝিবার ক্ষমতা কাহারও ছিল না ও নাই। আসলে এই ছিল বাংলা দেশের খাঁটি ছবি। সে সময় হিন্দুর ছেলে বিলেত গেলেই বাড়িশুদ্ধ সকলকে এমনি সামাজিক অত্যাচার সহ্য করতে হত। অথচ সময়ের দিক থেকে ১৮৮১ সাল খুব পুরনো নয়। এর আগে জ্ঞানদানন্দিনী দুটি অবোধ শিশু নিয়ে বিলেত ঘুরে এসেছেন। চন্দ্রমুখী পাশ করে গেছেন এনট্রান্স। কাদম্বিনীর সঙ্গে গ্র্যাজুয়েট হবার তোড়জোড় করছেন। প্রসন্নময়ীর পিসীরাও অক্ষর পরিচয়হীনা নন। প্রতিভা নেমেছেন অভিনয় করতে।

রবীন্দ্রনাথের সেবার বিলেত যাওয়া হল না। কিন্তু আশুতোষের সঙ্গে বন্ধুত্ব ক্ষুন্ন হয়নি। পরে বিলেত থেকে ফিরে আশুতোষ ঠাকুরবাড়ির অন্যান্যদের সান্নিধ্যে আসেন। তাঁর সরল স্বভাব ও সাহিত্যানুরাগ ঠাকুরবাড়ির সকলেরই খুব ভাল লাগল। আলাপ হল প্রতিভার সঙ্গে! রূপে লক্ষ্মী গুণে সরস্বতী প্রতিভার সঙ্গে এমন সোনার টুকরো ছেলেকে সুন্দর মানাবে, সুতরাং বিয়ের সানাই বাজতেও দেরি হল না। এই বিয়েতে অত্যন্ত সুখী হয়েছিলেন মহর্ষি দেবেন্দ্রনাথ। বলেছিলেন, আশু আমার একটা অর্জন। অনেক সাধনায় প্রতিভা এমন পাত্রে পরিণীতা হয়েছে। এ সময় একটা ঘটনা ঘটেছিল। আমরা জেনেছি ইন্দিরার লেখা শ্রুতি ও স্মৃতির পাণ্ডুলিপি পড়ে। রবীন্দ্রনাথের সঙ্গে কোন সভায় বুঝি যাচ্ছিলেন ইন্দিরা, একই গাড়িতে উঠেছিলেন আশুতোষ। এ ঘটনায় কারুর কোন হাত ছিল না। কিন্তু ভয়ে কাঠ হয়ে নীপময়ী ভাবলেন, জ্ঞানদানন্দিনী বুঝি তার মেয়ের সঙ্গেই আশুতোষের বিয়ে দিতে চান। প্রগতিসম্পন্ন জ্ঞানদানন্দিনীর সঙ্গে মনের মিল অনেকেরই হয়নি। তাই সন্দেহ। জ্ঞানদানন্দিনী তো হেসে আকুল। তার মেয়ের বয়স কম, এর মধ্যে বিয়ে দেবেন কি? তবু সন্দেহ ঘোচে না। এরই মধ্যে মৃত্যু হয় হেমেন্দ্রনাথের। কিছুদিন পরে প্রতিভার সঙ্গে আশুতোষের বিয়ে হয়ে গেল। অনেকের মনেই প্রশ্ন। জেগেছিল আশুতোষের বাকি ছয় ভাইয়ের সঙ্গে প্রতিভার ছয় বোনের বিয়ে। হবে কিনা? এঁদের মধ্যে তিন ভাইয়ের সঙ্গে ঠাকুরবাড়ির আরো তিনজন মেয়ের বিয়ে হয়েছিল কিন্তু তারা কেউই প্রতিভার নিজের বোন ছিলেন না। এই বিয়ে উপলক্ষে দুটি পরিবারের যুবক-যুবতীদের অনেকেই গভীর মেলামেশা করেছিলেন। অনেকে মনে করেন এর কারণ ঠাকুরবাড়ির শিল্প-সংস্কৃতির আহ্বান, আবার কেউ কেউ বলেন এর পেছনে ছিল ঠাকুরবাড়ির রূপবতী-গুণবতী শিক্ষিতা মেয়েদের সঙ্গে পরিচিত হবার বাসনা। কারণ যাই হোক না কেন, বাংলা দেশের সমস্ত শিক্ষিত সমাজই ঠাকুরবাড়ি সম্বন্ধে, বিশেষত এ বাড়ির বিদুষী সঙ্গীতজ্ঞ মেয়েদের সম্বন্ধে, সচেতন হয়ে উঠছিলেন তাতে সন্দেহ নেই। ইন্দিরা জানিয়েছেন, ঠাকুর এবং চৌধুরী-পরিবারে ঘনিষ্ঠ মেলামেশা সব সময়েই যে সুখ পরিণতি লাভ করেছিল তা নয়। এই সব ছোটখাট ঘটনার ফাঁক দিয়ে আমরা মাঝে মাঝে সমাজেরও ছবিটা যেন দেখতে পাই।

সঙ্গীতের ক্ষেত্রে প্রতিভার সত্যিকারের অবান হল স্বরলিপি রচনার সহজতম পন্থাবিষ্কার। তিনি দ্বিজেন্দ্রনাথ এবং জ্যোতিরিন্দ্রনাথের স্বরলিপি পদ্ধতি এবং স্বরসন্ধি প্রয়োগ পদ্ধতিতে যেমন নতুনত্ব এনেছিলেন তেমনি তাকে করে তুলেছিলেন সকলের ব্যবহারের উপযোগী। প্রতিভার আগে কোন মহিলা স্বরলিপি নির্মাণের ব্যাপারে এগিয়ে আসেননি।

জ্ঞানদানন্দিনীর বালক পত্রিকায় প্রতিভার স্বরলিপি পদ্ধতি প্রকাশ হতে থাকে। বাল্মীকি প্রতিভা ও কালমৃগয়ার গানগুলিরও প্রথম স্বরলিপিকার হচ্ছেন প্রতি। শোনা যায়, এ সময় হেমেন্দ্রনাথের নির্দেশে তিনি বহু ব্ৰহ্মসঙ্গীত ও হিন্দুস্থানী সঙ্গীতের স্বরলিপি তৈরি করেন। সংখ্যা আমরা গুণে দেখিনি তবে প্রতিভার এক ভাই হিতেন্দ্রনাথ ১৩১১-র আষাঢ় সংখ্যা পুণ্যে জানাচ্ছেন যে এই সংখ্যা প্রায় তিনশ-চারশ। কিন্তু শুধু স্বরলিপি নির্মাণ করলেই তো হবে না, গাইবে কে?

প্রতিভা না হয় প্রকাশ্যে গান গেয়ে একটা বৈপ্লবিক পরিবর্তনের সূচনা করলেন, তাকে নিত্য নতুন রস সিঞ্চন করে বাঁচিয়ে রাখতে হবে তো। সে। ওর ও নিলেন প্রতিভাই। স্বরলিপি নির্মাণের সঙ্গে সঙ্গে চলল গান শেখাবার চেষ্টা। তারও হাতে খড়ি বালকে। সেখানে তিনি কাগজে কলমে খুললেন একটি গানের ক্লাস সহজ-গানশিক্ষা। বালক ছোটদের কাগজ, ছোটদের দিয়ে শুরু করা ভাল তাই তিনি প্রথমে তাদের বলে নিলেন গান কাকে বলে। সেই বয়সেই প্রতিভা গানের সংজ্ঞা নির্দেশ করতে গিয়ে বলেছেন, গান মানুষের স্বাভাবিক। হাসি-কান্নার সময় মানুষের কণ্ঠস্বরের পরিবর্তন হয়। তাই বোঝা যায় নানা ভাবের নানা সুর আছে, সেই সুরের চর্চা করেই গানের উৎপত্তি হয়েছে। সঙ্গীতের সম্বন্ধে প্রতিভার এই সংজ্ঞা নির্ণয় তার একান্ত নিজস্ব। পরিণত বয়সে তিনি আরও মৌলিক সঙ্গীত চিন্তার পরিচয় দিয়েছিলেন।

গান এমন একটা জিনিষ যার জন্য শুধু জ্ঞান নয় রীতিমত চর্চার প্রয়োজন আছে। প্রতিভা সেই চেষ্টায় নিজের বাড়িতে প্রথমে আনন্দসভা পরে সঙ্গীতসংঘ স্থাপন করেন। গান শেখার স্কুল হিসাবে সঙ্গীত-সংঘ খ্যাতিলাভ করে। এখানে প্রতিভা শেখাতেন খাটি ওস্তাদী হিন্দুস্থানী গান। যদিও বিদেশী সঙ্গীতেও তার ছিল অবাধ অধিকার। শিখেছিলেন Nicolini-এর কাছে। বাঙালী মেয়েরা এখানে ভাল করে গান শেখার সুযোগ পেল। অবশ্য সঙ্গীত-সংঘের সঙ্গে সঙ্গীত-সম্মিলনী নামটাও অনেকেরই চেনা মনে হবে। সেটিও গানের স্কুল স্থাপন করেছিলেন মিসেস বি. এল. চৌধুরী, অর্থাৎ বনোয়ারীলাল চৌধুরীর স্ত্রী প্রমদা চৌধুরী। এই দুটি স্কুলের সুযোগ হওয়ায় বাঙালী মেয়েরা অনেকেই গান শিখতে শুরু করেন। প্রতিভার স্কুলটির দেখাশোনার কাজে ইন্দিরাও এসে যোগ দিয়েছিলেন, ঘটনাস্থত্রে তখন তিনিও এসেছেন চৌধুরীবাড়ির বৌ হয়ে।

গান শেখানোর সঙ্গে সঙ্গে প্রতিভা একটা সঙ্গীত বিষয়ক পত্রিকার কথাও ভাবছিলেন। জ্যোতিরিন্দ্রনাথের সঙ্গীত প্রকাশিকা অনেকদিন আগেই বন্ধ হয়ে গেছে। কিন্তু গানের চর্চার জন্য ঐরকম একটা পত্রিকা থাকা খুবই প্রয়োজন। তাই আনসভার নামে প্রতিভা নতুন পত্রিকার নাম দেন আনন্দ সঙ্গীত পত্রিকা। তবে কোন কিছু একা করায় প্রতিভার বড় সংকোচ তাই এবারও দলে টানলেন ইন্দিরাকে। যুগ্ম সম্পাদনায় আনন্দ সঙ্গীত আট বছর সগৌরবে প্রকাশিত হয়। এই পত্রিকায় প্রতিভা শুধু নিয়মিত ভাবে স্বরলিপি প্রকাশ করতেন তা নয়, সেইসঙ্গে চলত লুপ্ত সঙ্গীত পুনরুদ্ধারের চেষ্টা। শুধু কি সঙ্গীত ও যন্ত্রসঙ্গীতের পুনরুদ্ধারের চেষ্টা? প্রতিভা প্রাচীন সঙ্গীত শিল্পীদেরও বিস্মৃতির অন্তরাল থেকে উদ্ধার করতে লাগলেন—তানসেন, স সদারঙ্গ, বৈজু বাওয়া নায়ক, মহারাজা শৌরীন্দ্রমোহন ঠাকুর ও আরো অনেক সঙ্গীতস্রষ্টার জীবনী রচনা তার সঙ্গীত সম্পর্কিত চিন্তার বৈশিষ্ট্যকে তুলে ধরেছে। আজ যখন কোন প্রাণহীন যান্ত্রিক কণ্ঠে রবীন্দ্রসঙ্গীত শুনি তখন বুঝতে পারি প্রতিভা কেন সঙ্গীতচর্চার সঙ্গে সঙ্গে সঙ্গীতজ্ঞদের কথা ভাবতেন, তাদের সঙ্গীত সাধনাকে আদর্শের মতো তুলে ধরতে চাইতেন। শিল্প ও শিল্পী উভয়কে না জানলে যে সাধনা অপূর্ণ থেকে যায়। তাঁর চেষ্টায় বহু সঙ্গীতজ্ঞের জীবন ও সাধনার লুপ্ত ইতিহাস সংগৃহীত হয়েছে। গানের ক্ষেত্রে প্রতিভা তার কাকা-জ্যাঠাদের মতো খ্যাতি পাননি বটে কিন্তু সঙ্গীত জগতে তিনি তার গুরুজনদের মতোই সমান কৃতিত্বের অধিকারিণী। প্রতিভার মৃত্যুর পরে সঙ্গীত-সংঘের পুরস্কার বিতরণ সভায় তার কাকা রবীন্দ্রনাথ যে কথা বলেছিলেন তার মধ্যেই প্রতিভার প্রকৃত পরিচয় লুকিয়ে রয়েছে। রবীন্দ্রনাথ বলেন, সঙ্গীত শুধু যে তার কণ্ঠে আশ্রয় নিয়েছিল তা নয়, এ তার প্রাণকে পরিপূর্ণ করেছিল। এরই মাধুর্য প্রবাহ তার জীবনের সমস্ত কর্মকে প্লাবিত করেছে।

রবীন্দ্রসঙ্গীতের ক্ষেত্রে প্রতিভার প্রধান কৃতিত্ব স্বরসন্ধিসহ কয়েকটি রবীন্দ্রসঙ্গীতের স্বরলিপি রচনা করা। এর সার্থক উদাহরণ কোন আলোকে প্রাণের প্রদীপ গানের স্বরলিপি। সংস্কৃত স্তোত্রে সুর দিয়ে গাওয়ার পরিকল্পনা রবীন্দ্রনাথের একান্ত নিজস্ব। তার দেওয়া সুরে বেদগানের স্বরলিপিও তৈরি করেন প্রতিভা। মাঘোৎসবের সূচনা হত একটি বেদগানের ভাবগম্ভীর পরিবেশ দিয়ে। কখনও যদেমি প্রস্ফুন্নিব কখনও তমীশ্বরাণাং আবার কখনও গীতা স্তোত্র দিয়ে। প্রতিবাই প্রতিভা স্বরলিপি তৈরি করে অন্যদের গান শেখাতেন। তিনি নিজেও যে দু-একটা গানে সুর দেননি তা নয়, ত্বমাদিদেব পুরুষপুরাণ স্ত্রোত্রে তিনি কেদারা রাগিণীর সুর বসান। সংখ্যায় কম হলেও প্রতিভার নিজের লেখা গানও দুর্লভ নয়, বিশেষ করে সাঁঝের প্রদীপ দিনু জ্বালায়ে এবং দীনদয়াল প্রভু ভুলো না অনাথে জনপ্রিয়তা অর্জন করে।

প্রতিভার জীবনে গানের সঙ্গে মিশে ছিল আরো দুটি জিনিস—ধর্ম ও জ্ঞানস্পৃহা। মহর্ষির অধ্যাত্মসাধনা এবং হেমেন্দ্রর উগ্র ধর্মানুরাগ সঞ্চারিত হয়েছিল প্রতিভার জীবনে। তাঁর ভক্তিগীতি বা নববর্ষের বক্তৃতাগুলোর ওপর নজর বোলালেই বোঝা যাবে ব্রাহ্মধর্ম প্রতিভার মনে কী গভীর ভাবে প্রভাব বিস্তার করেছিল। ঠিক সাহিত্যচর্চা না করলেও বাংলা ভাষা ও সাহিত্যের ওপর প্রতিভার বেশ দখল ছিল। তিনি ইংরেজী, ফরাসী, ল্যাটিন, সংস্কৃত প্রভৃতি নানা ভাষা যেমন শিখেছিলেন, তেমনি ইতিহাস-ভূগোল ও অন্যান্য বিদ্যাচর্চাতেও আগ্রহী ছিলেন। ঠাকুরবাড়ির অন্যান্য মেয়েদের দু-চারটে লেখা যেমন ইতস্তত চোখে পড়ে প্রতিভার লেখা সেরকম দেখা যায় না। তার একটি বক্তৃতা সংগ্রহ আলোক ছাপা হয়েছিল অনেকদিন আগে। সেখান থেকে তার একটি প্রবন্ধের কিছু অংশ আমরা উদ্ধৃত করছি। সে অংশটির মধ্যেই প্রতিভার রচনারীতির বৈশিষ্ট্য ফুটে উঠেছে। প্রতিভা লিখছেন :

ভাল চিন্তা হৃদয়কে অধিকার না করিলে ভাল হইবার দিকে অগ্রসর হওয়া যায় না। চিন্তার ভালমন্দ গতি আমাদের আচার ব্যবহারের গতি নিয়মিত করে। চিন্তা সংযত না হইলে আমাদের স্বভাব যথেচ্ছাচারী ও শিথিল হইয়া পড়ে। কিন্তু কাহার চালনায় এই চিন্তাকে আমরা সংযত করিতে পারি? কুপথ হইতে ফিরাইয়া লইতে পারি? সে সারথি কে? সে আর কেহ নয়-জ্ঞান।

এই সংক্ষিপ্ত উক্তিই বিদুষী প্রতিভার জ্ঞানতৃষ্ণা ও সংযত চিন্তার প্রতি আগ্রহ প্রমাণ করে। নববর্ষের প্রীতি উপহার হিসেবে তিনি মাঝেসাঝে ছোট ছোট কবিতাও লিখতেন। একবার লিখেছিলেন বর্ষপ্রবেশ :

বর্ষ এল বর্ষ গেল নিয়তি তোমার,
সুমঙ্গল পাঞ্চজন্য বাজিল আবার
প্রকৃতির ঘরে ঘরে নব অনুরাগে
ভরিয়া উঠিল বিশ্ব নবীন সোহাগে।

কবিতা প্রসঙ্গে প্রতিভার পুত্রবধূ লীলার কথাও সেরে নেওয়া যাক। লীলা পাথুরেঘাটার রণেন্দ্রমোহন ঠাকুরের মেয়ে। বিদুষী কবি। বিয়ে হয়েছিল প্রতিভার বড় ছেলে আর্যকুমারের সঙ্গে। তার কাব্যগ্রন্থ কিশলয়, ঝরার ঝর্ণা, রূপহীনা ও সিঞ্চন বেশ জনপ্রিয় হয়েছিল। তাঁর মৃত্যুর পরে রণেন্দ্রমোহন তার নামে কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে প্রতিবছর একটি পুরস্কার দেবার ও একটি বক্তৃতামালার ব্যবস্থা করেন। প্রথম লীলা পুরস্কার পান হেমলতা দেবী (১৯৪৪)। আর এই বক্তৃতামালার প্রথম বক্ত-অনুরূপা দেবী। তার বিষয় ছিল সাহিত্যে নারী-স্রষ্টী ও সৃষ্টি (১৯৪৫)। আপাতত আমরা প্রতিভার অন্যান্য বোনেদের কথায় আসি।

প্রতিভা যখন সংগীত চিন্তায় বিভোর, লুপ্ত সঙ্গীত শিল্পীদের পরিচয় উদ্ধারে তৎপর, ঠিক সেই সময় তার মেজ বোন প্রজ্ঞসুন্দরী ব্যস্ত ছিলেন আর একটা চিরপুরনো অথচ চিরনতুন জিনিষ নিয়ে। দিদির মতো তিনিও লেখাপড়া শেখা, গান শেখ, স্কুল যাওয়া, ছবি আঁকা দিয়ে জীবন শুরু করেছিলেন কিন্তু নদী যেমন এক উৎস থেকে বেরিয়েও ভিন্নমুখী হতে পারে তেমনি প্রজ্ঞাও ধরলেন একটি নতুন পথ ঠাকুরবাড়িতে সব রকম শিল্পচর্চার সুযোগ ছিল। মেয়েরাও শিখতেন নানারকম কাজ। কিন্তু প্রজ্ঞার মন টেনেছিল রান্নাঘর। এমন আর নতুন কি? ঠাকুরবাড়িতে সব মেয়ে-বৌই অল্পবিস্তর রাধতে শিখতেন; তার মধ্যে সবচেয়ে বেশি নম্বর পেয়ে গেছেন কাদম্বরী ও মৃণালিনী। শরৎকুমারী ও সরোজাসুন্দরীরও এ ব্যাপারে সুনাম ছিল। সৌদামিনীদের প্রতিদিন একটা করে তরকারি রাধা শিখতে হত। তবে আর প্রজ্ঞার নতুনত্ব কোথায়? বলতে গেলে উত্তরাধিকারসুত্রেই তিনি রান্না শিখেছিলেন। তা শিখেছিলেন ঠিকই। প্রজ্ঞার মা নীপময়ীও ভাল রাঁধতেন। মহর্ষিরও এ ব্যাপারে কম উৎসাহ ছিল না। অথচ তাদের বাড়িতে রোজকার ব্যঞ্জন ছিল ডাল—মাছের ঝোল—অম্বল, অম্বল—মাছের ঝোল-ডাল। বড়ি ভাজা, পোর ভাজা, আলু ভাতে ছিল ভোজের অঙ্গ। আসলে এ ব্যবস্থা ছিল বারোয়ারি। তবে ব্যঞ্জনে মিষ্টি দেবার প্রচলন শুরু হয় ঠাকুরবাড়ি থেকেই। মহর্ষি নিজে মিষ্টি তরকারি খুব ভালবাসতেন। বৌয়েরা ঘরে নানারকম তরকারি ও মিষ্টি তৈরি করতেন। প্রজ্ঞার বৈশিষ্ট্য এই যে তিনি শুধু নিজের হাতে রাধা খাবার প্রিয়জনদের মুখে তুলে দিয়ে নিরস্ত হননি। ঠাকুরবাড়ির চিরকেলে রেওয়াজ ছেড়ে নিজেদের আবিষ্কার করা পিঠে-পুলিপোলাও-ব্যঞ্জন তুলে দিতে চেয়েছেন সকলের মুখে। এখানেই তার অনন্যতা।

বাস্তবিকই রান্না এবং রান্নাঘর নিয়ে, কেতাবী ভাষায় রন্ধনতত্ত্ব ও রন্ধনবিদ্যা নিয়ে তিনি যত মাথা ঘামিয়েছেন তত চিন্তা আর কোন মহিলা করেছেন বলে মনে হয় না। ঘরের কোণে বসে রান্নার পরীক্ষা চালাবার সময় তিনি সেগুলো লিখে রেখেছিলেন ভাবীকালের আগন্তুকদের জন্যে। তাই তাঁর আমিষ ও নিরামিষ আহার-এর বইগুলি এত নতুন হয়ে দেখা দিয়েছিল। আধুনিক যুগে গার্হস্থ্য বিজ্ঞানের বহু বই লেখা হয়েছে ও হচ্ছে, কিন্তু পঁচাত্তর বছর আগে প্রজ্ঞার বইগুলি হাতে নিয়ে অবাক হয়ে যেতে হয়। অবশ্য এ ব্যাপারে আরো দু একজনের নাম করা যায়। কিরণলেখা রায়ের বরেন্দ্র বন্ধন ও জলখাবার, নীহারমালা দেবীর আদর্শ রন্ধন শিক্ষা ও বনলতা দেবীর লক্ষ্মীও রান্নার বই হিসেবে জনপ্রিয় হয়েছিল, তবে সে পরের কথা! পুরুষেরাও এ ব্যাপারে দক্ষতা দেখিয়েছিলেন, সংস্কৃত পাকরাজেশ্বর অনুবাদ করিয়েছিলেন বর্ধমানরাজ। বিপ্রদাস মুখোপাধ্যায়ের রান্নার বইও অনেক আগেই প্রকাশিত হয়েছিল কিন্তু প্রজ্ঞা ভেবেছিলেন বেশি। তার রান্নার বই দুটির ভূমিকাদুটিকে আমরা একাধারে রন্ধনতত্ত্ব ও গার্হস্থ্য বিদ্যার আকর বলে ধরে নিতে পারি। বিয়ের পরে বেশ গিন্নীবান্নি হয়েই প্রজ্ঞা এ কাজে হাত দিয়েছিলেন।

প্রতিভার মতো প্রজ্ঞারও বিয়ে হয়েছিল এক বিখ্যাত ব্যক্তির সঙ্গে। অসমিয়া সাহিত্যের জনক লক্ষ্মীনাথ বেজবড়ুয়া তার স্বামী। বিয়ের আগে লক্ষ্মীনাথের সঙ্গে তার কোন রকম সাক্ষাৎ হয়নি। লক্ষ্মীনাথ তার আত্মজীবনীতে জানিয়েছেন যে ঠাকুরবাড়ির এই গুণবতী, শিক্ষিত, সুশীলা ও ধর্মপ্রবণা মেয়েটির ছবি দেখেই তিনি তাঁর প্রতি আকৃষ্ট হন এবং বিবাহে সম্মত হন। যদিও তার নিজের বাড়ি থেকে এসেছিল প্রচণ্ড বাধা। কারণ তখনকার দিনে ঠাকুরবাড়িতে বিয়ে হওয়া মানেই ছেলেকে হারানো। তাই একমাসের মধ্যে বহু টেলিগ্রাম কলকাতা ও গৌহাটিতে আসা যাওয়া করলেও বিধির লিখন বদলাল না। ১৮৯১ সালের ১১ মার্চ, স্বপ্নরঙিন বাসন্তী-সন্ধ্যায় সপ্তপদী গমনের পর শুভদৃষ্টি। বেজবড়ুয়া। দেখলেন প্রজ্ঞা তার দিকে তাকিয়েই ফিক করে হেসে ফেললেন। হাসি ফুটল লক্ষ্মীনাথেরও ঠোটের কোণে। পরে অবশ্য তিনি জিজ্ঞেস করেছিলেন প্রজ্ঞাকে, শুভদৃষ্টির সময় ঐরকমভাবে হেসেছিলে কেন? প্রজ্ঞার উত্তর, বিয়ের অনেকদিন আগেই তোমাকে আমি স্বপ্নে দেখেছিলাম। স্বপ্নে দেখা মুখটার সঙ্গে লক্ষ্মীনাথের মুখের হুবহু মিল দেখে হেসেছিলেন প্রজ্ঞা। লক্ষ্মীনাথের আঁকা এই সব ছোট কথার-ছবি দেখে, ধরে নিতে অসুবিধে হয় না দাম্পত্যজীবনে প্রজ্ঞা কতখানি সুখী ছিলেন। নিজের জীবনে পর্যাপ্ত সুখের সন্ধান পেয়ে তিনি বুঝেছিলেন গৃহকে সুখের আগার করে তুলতে হলে গৃহিণীকে কোন দিকে নজর দিতে হবে। তাকে মায়ার খেলাতে অভিনয় করতে দেখা গেছে, ছবি আঁকতে দেখা গেছে কিন্তু সব ছেড়ে তিনি আঁকড়ে ধরেছিলেন আপাত অবহেলিত রান্নাঘরখানিকে।

রান্নাঘর নিয়ে প্রজ্ঞা ভাবতে শুরু করেন পুণ্য পত্রিকা সম্পাদনার সঙ্গে সঙ্গে। হেমেন্দ্রনাথের পুত্রকন্যাদের পৃষ্ঠপোষকতাতেই প্রকাশিত হত পুণ্য পত্রিকা। লিখতেন প্রজ্ঞার ভাইবোনেরা, প্রথম সম্পাদিকা ছিলেন প্রজ্ঞা নিজে। প্রথম থেকেই এর পাতায়-পাতায় হরেক রকম আমিষ ও নিরামিষ ব্যঞ্জনের পাকপ্রণালী ছাপা হতে থাকে। সুগৃহিণীর মতো তিনি আবার তৎকালীন বাজারদরটিও পাঠিকাদের জানিয়ে দিতেন যাতে কেউ অসুবিধেয় না পড়েন। কালের সীমানা পার হয়ে আজ সে বাজারদর আমাদের মনে শুধু সুখস্মৃতি জাগায়। মাছের দাম ছিল অবিশ্বাস্য রকমের সন্তা—আধসের পাকা রুই তিন বা চার আনা, চিতল মাছ তিন পোয়া ছয় আনা, বড় বড় ডিমওয়ালা কৈ আট নটার দাম নয় দশ আনা, একটি ডিম এক পয়সা, ঘি এক সের এক টাকা, দুধ এক সে চার আনা, টমেটো কুড়িটি দুই আনা—না, অকারণে মন খারাপ করে লাভ কি? শুধু এটুকু মনে রাখলেই হবে, এই দামগুলো সঠিক বাজারদর কিনা ধনী গৃহিণী প্রজ্ঞা যাচিয়ে নেননি। দরদাম করলে জিনিষপত্রের দাম হয়ত আরো একটু কমত।

আমিষ ও নিরামিষ আহার-এর তিনটি খণ্ড বেরিয়েছিল। প্রজ্ঞা ভেবেছিলেন পাকপ্রণালীর পরে লিখবেন গৃহবিজ্ঞানের বই। কিন্তু সে আর হয়ে ওঠেনি। এর ফলে অপূরণীয় ক্ষতি রয়ে গেল গৃহবিজ্ঞানের। প্রজ্ঞার মত এত যত্নে রান্নার বই লেখার কথা হোমসায়েন্সের শিক্ষিকারাও ভাবেন বলে মনে হয় না। তিনি বইয়ের প্রথম দিকে খাদ্য, পথ্য, ওজন, মাপ, দাসদাসীর ব্যবহার, পরিচ্ছন্নতা সব ব্যাপারেই প্রয়োজনীয় নির্দেশ দিয়েছেন। সেই সঙ্গে তৈরি করেছেন রান্নাঘরে ব্যবহৃত শব্দের পরিভাষা। হয়ত শব্দগুলো আমাদের অজানা নয় তবু এ ধরনের শব্দের সংকলন এবং পরিভাষা থাকা যে সত্যিই খুব প্রয়োজনীয় তাতে সন্দেহ নেই। কতখানি উৎসাহ এবং নিষ্ঠা থাকলে একাজ করা সম্ভব পরিভাষার দীর্ঘ তালিকা দেখলেই বোঝা যাবে। প্রজ্ঞা চলিত এবং অপ্রচলিত কোন শব্দকেই অবহেলা করেননি। অধিকাংশই আমাদের পরিচিত শব্দ। যেমন :

বাখর=পাপড়ি
চুটপুট = ফোড়ন ফাটার শব্দ
হালসে=কাঁচাটে বিস্বাদ গন্ধ
রুটিতোষ= সেঁকা পাউরুটি
পিট্‌নী= যাহার দ্বারা মাংসাদি পেটানো হয়
বালিখোলা=কাঠ খোলায় বালি দিয়া জিনিষ ভাজা
সিনা=বুক
চমকান= শুকনা খোলায় অল্প ভাজা
তৈ= মালপোয়া ভাজিবার মাটির মাত্র
তিজেল হাঁড়ি= ডাল বঁধিবার চওড়া মুখ হাঁড়ি
তোলো হাঁড়ি=ভাত রাঁধিবার বড় হাঁড়ি
খণ্ড কাঁটা = ডুমা ডুমা টুকরো কাঁটা
চিরকাটা=লম্বাভাবে ঠিক অর্ধেক করিয়া কাঁটা
ছুঁকা=ফোড়ন দেওয়া

রান্না ঘরে যে এত রকম শব্দ প্রচলিত আছে প্রজ্ঞার আগে তা কে জানত? এখনও এসব শব্দ নিত্যব্যবহার্য, তবু গার্হস্থ্যবিজ্ঞান লেখার সময় এ জাতীয় পরিভাষার প্রয়োজন অস্বীকার করা চলে না।

এছাড়াও আছে নানারকম প্রয়োজনীয় কথা—গৃহিণীদের জ্ঞাতব্য নানারকম তথ্য—বিনা পেঁয়াজে পেয়াজের গন্ধ করা কিংবা ধরা গন্ধ যাওয়ার মতো আরো অনেক কথা আছে। কজন আর জানে, আদার রসে হিং ভিজিয়ে রেখে সেই হিংগোলা নিরামিষ তরকারিতে দিলে পিয়াজের গন্ধ হয় কিংবা ডাল-তরকারি হাড়িতে লেগে গেলে তাতে কয়েকটা আস্ত পান ফেলে দিলে পোড়া গন্ধ কমে যায়? তরিতরকারি রোদে শুকিয়ে কি ভাবে অনেকদিন রেখে দেওয়া যায় সেকথা জানাতেও প্রজ্ঞা ভোলেননি। তবে এসব ছোটখাট জিনিষ ছাড়া প্রজ্ঞা আরও একটা নতুন জিনিষ বাংলার ভোজসভায় এনেছিলেন। সেটি হল বাংলা মেনু কার্ড বা তার নিজের ভাষায় ক্রমণী। বিলিতি ধরনের রাজকীয় ভোজে মেনু কার্ডের ব্যবস্থা আছে। প্রজ্ঞা স্থির করলেন তিনিও নিমন্ত্রিত ব্যক্তিদের জন্যে ক্ৰমণীর ব্যবস্থা করবেন। ছাপা ক্রমণী যদি হাতে হাতে বিলি করা না যায় তাহলে সুন্দর করে লিখে খাওয়ার ঘরের দেওয়ালে ঝুলিয়ে দিলেও চলবে। শুধু নামকরণ করেই প্রজ্ঞা কর্তব্য শেষ করেননি। বাংলা ক্ৰমণী কেমন হবে, এক একবারের ভোজে কি কি পদ থাকবে, কোন্ পদের পরে কোষ্টা আসবে, কিংবা কেমন করে লিখলে শিল্পসম্মত হয়ে উঠবে সে কথাও ভেবেছেন। কয়েকটা ক্রমণী দেখলেই বোঝা যাবে ব্যাপারটা। প্রথমে একটা নিরামিষ ক্ৰমণী :

জাফরণী ভুনি খিচুড়ি
ধুঁধুল পোড়া শিম বরবটি ভাতে
পাকা আম ভাতে
পটলের নোনা মালপোয়া
পাকা কাঁঠালের ভূতি ভাজা
কাঁকরোল ভাজা
ভাত
অরহর ডালের খাজা
লাউয়ের ডালনা
বেগুন ও বড়ির সুরুয়া
ছোলার ডালের ধোঁকা
বেগুনের দোল্মা
আলুবখরা বা আমচুর দিয়ে মুগের ডাল
পাকা পটলের ঝুরঝুরে অম্বল
ঘোলের কাঁঢ়ি
রামমোহন দোল্মা পোলাও
নীচুর পায়স
নারিকেলের বরফি।

যেন একটা আস্ত কবিতা। হঠাৎ চোখে পড়লে সেরকম ভুল হবারই সম্ভাবনা। যদিও নিরামিষ তবু সরস হয়ে ওঠে রসনা। সেকালের ভোজসভা সম্বন্ধেও একটা ধারণা গড়ে ওঠে। প্রজ্ঞা প্রতিটি রান্না নিজে হাতে বেঁধে তবে সেগুলি খাদ্যতালিকাভুক্ত করতেন। অনেক রান্নার আবিষ্কী তিনি নিজেই। মাঝে মাঝে সেগুলোর সঙ্গে যোগ করে দিতেন প্রিয়জনের নাম। যেমন, রামমোহন দোলা পোলাও, দ্বারকানাথ ফির্নিপোলাও, সুরভি—তার অকালমৃত মেয়ের নাম।

আবার অনেক রকম উদ্ভট এবং নতুন ব্যঞ্জনও আছে। খেজুরের পোলাও, লঙ্কা পাতার চড়চড়ি, রসগোল্লার অম্বল, বিটের হিঙ্গি, পানিফলের ডালনা, ঝিঙাপাত গোড়া, মিছা-দই মাছ, ঘণ্ট-ভোগ, কচি পুই পাতা ভাজা, কঁচা তেঁতুলের সরস্বতীঅম্বল, আমলকী তে, পেঁয়াজের পরমানু, কই মাছের পাততোলা, কাকড়ার খোলা পিঠে, মাংসের বোম্বাইকারী—আরো কত কী। ক্লাসে ওঠার মতো রান্না শেখারও ক্লাস আছে, হিঙ্গি করতে শিখিলেই বুঝিতে পারিবে ইহা ঠিক যেন ডালনার এক ধাপ উপরে উঠিয়াছে অথচ কালিয়াতে উঠিতে পারে নাই। আরো দু-একটা ক্ৰমণী দেখা যাক। আমিষ ক্ৰমণীর আকার খুব বড় নয়। যেমন :

এস্পারোগাস স্যাণ্ডুইচ
শসার স্যাণ্ডুইচ
মাংসের স্যাণ্ডুইচ
মাছের স্যাণ্ডুইচ
পাউণ্ড কেক
স্পঞ্জ কেক
বিস্কুট
সিংয়াড়া
ডালমোট
ঝুরি ভাজা
আইসক্রীম।

আরেকটা :

পাতলা পাউরুটির ক্রূটোঁ।
জারক নেবু
বাদামের সুপ
ভেটকী মাছের মেওনিজ
মুরগীর হাঁড়ি কাবাব
মটনের গ্রেভি কাটলেট
শবজী ও বিলেতী বেগুনের স্যালাড
স্নাইপ রোস্ট
আলুর সিপেট
উফস আলানিজ
ডেজার্ট
কফি।

সে তুলনায় নিরামিষ ক্ৰমণীর আকার বেশ বড়। আর গৃহিণীর কৃতিত্বও যেন বেশি :

ভাত
আলু পোড়া, দুধ দিয়ে বেগুন ভর্তা, মূলা সিদ্ধ, আনারস ভাজা
মোচা দিয়া আলুর চপ
মুগের ফাঁপড়া
ডুমুরের হেঁচকি মোচা হেঁচকি
কুমড়া দিয়া মুগের ডালের ঘণ্ট
পালম শাকের ঘণ্ট
উচ্ছা দিয়া মসুর ডাল
ওলার ডালনা
ঢ়্যাঁড়সের ঝোল
ছানার ফুপু পোলাও
নিরামিষ ডিমের বড়ার কারী
করলার দোল্ম আচার
আলুর দমপক্ত
কচি কাঁচা তেঁতুলের ফটকিরি ঝোল
নারিকেলের অম্বল
পাকৌড়ী
খইয়ের পরমান্ন
কমলী।

আজকাল খুব বড় ভোজসভাতেও পদের সংখ্যা এত বেশি হয় না। নিরামিষ ভোজসভাও আজকের দিনে অচল। যত রকম তরকারি, পিঠে, পায়েস খালার পাশে সাজিয়ে দেওয়া যেত ততই সুগৃহিণীত্ব প্রমাণিত হত। বাঙালী জীবনের শান্ত নিরুদ্বেগ স্বচ্ছলতার প্রতীক এই সব ভোজসভা। বাঙালী কোনদিনই ভোজনবীর ছিল না, ছিল ভোজনরসিক। তাদের শিল্পবোধ স্থায়ী জিনিষগুলোকে ছাড়িয়ে অস্থায়ী তাৎক্ষণিকতার মধ্যেও রসের সন্ধান করেছে। আর বাঙালী মেয়েরা রান্নাঘরকে করে তুলেছে শিল্পমন্দির। প্রজ্ঞা যে সব রান্নার কথা বলছেন এত না হলেও অধিকাংশের সঙ্গেই তখনকার গৃহিণীরা পরিচিত ছিলেন এবং নিজেরাও রাঁধতেন। তবে তারা কেউ সেসব পাকপ্রণালী প্রজ্ঞার মতো লিখে অন্যের রান্না শেখার পথ সুগম করে যাননি। এক একটি বড় ক্ৰমণীতে ফুটে, উঠেছে প্রজ্ঞার শিল্পবোধ ও সৌন্দর্যরুচি :

কলাইশুটি দিয়া ফেনসা খিচুড়ি
পলতার ফুলুড়ি
বেশন দিয়া ফুলকপি ভাজা
কাঁচা কলাইশুটির ফুলুড়ি
পেঁয়াজ কলি ভাজা
ভাত
ছোলার ডালের দুধে মালাইকারী
বাঁধাকপির ছেঁচকি
তেওড়া শাকের চড়চড়ি
কচি মূলার ঘণ্ট
লাল শাকের ঘণ্ট
বাঁধাকপির ঘণ্ট
গাছ ছোলার ডালনা
মটর ডালের ধোঁকা
কমলানেবুর কালিয়া
ওলকফির কারী
পেঁয়াজের দোলা আচার
ফুলকপির দমপোক্ত
বেগুন দিয়া কাঁচা কুলের অম্বল
আনারসী মালাই পোলাও
ফুলিয়া।

কিন্তু সব সময়েই কি এত বড় বড় মাপের আয়োজন হত? ছোটখাট ক্ৰমণীও আছে। এখনকার তুলনায় সেও খুব ছোট নয় :

ডিম দিয়া মুলুকস্তানী সূপ
ভাত
আলু ফ্রেঞ্চ স্টু
চঁওচঁও, বড় রুই মাছের ফ্রাই
মাংসের হুশনী কারী
পোলাও
ফ্রুট স্যালাড
ফল।

কিংবা

অলিভ রুটি
নারিকেলের সূপ
ধুম পক্ক ইলিশ
মুরগী বয়েল, হ্যাম।
মটনের কলার
ঠাণ্ডা জেলী ও ব্লাঁমজ
নারিকেল টফি, আদার মোরব্বা
কফি।

আর নিরামিষ :

ভাত
মাখন মারা ঘি, নেবু, নুন
নিমে শিমে ছেঁচকি ছোলার ডাল ভাতে
বেগুন দিয়া শুল্‌ফা শাক ভাজি
ছোলার ডালের কারী কুমড়ো এঁতোর ফুলুরি
পুন্‌কো শাকের শশ্‌শরি।
ভর্তাপুরী
পালম্‌ শাকের চড়চড়ি
থোড়ের ঘণ্ট
তিলে খিচুড়ি
ছানার ডালনা পাকা শসার কারী
পটলের দোল্মা
তিল বাঁটা দিয়ে কচি আমড়ার অম্বল
পাকা পেঁপের অম্বল
লক্ষ্ণৌ কড়ই কাঁচা আমের পায়স।

এখনকার দিনে প্রজ্ঞার বইটি দুষ্প্রাপ্য। সেজন্যই গর কয়েকটি ক্রমণীর উদাহরণ তুলে দেওয়া হল। এই ক্ৰমণী দেখে মনে হয় তখনও ভোজসভায় ফরাসী কায়দায় ইচ্ছা নির্বাচনের সুযোগ ছিল, না হলে এত ব্যঞ্জন এবং একই সঙ্গে ভাত, খিচুড়ি এবং পোলাওয়ের ব্যবস্থা থাকত না।

প্রজ্ঞার রান্নার বই দুটি আমাদের মনে যে কৌতূহল জাগায়, সেটি হল ভাইঝির এই রন্ধন নৈপুণ্যে রবীন্দ্রনাথ কতখানি খুশি হয়েছিলেন! রান্না এবং নতুন খাদ্যদ্রব্য সম্বন্ধে তার উৎসাহ তো কম ছিল না। বহু মহিলাই তাঁদের স্মৃতিকথায় এ কথা বলেছেন। কবি কি তাদের কাছে কখনো প্রজ্ঞার রান্নার গল্প করেননি? না, প্রজ্ঞা তাঁর কাকাকে কিছু বেঁধে খাওয়াননি? ভাইঝির ক্রমণী আবিষ্কারে কাকার উৎসাহ ছিল কিনা কিছুই জানা গেল না। প্রজ্ঞা বিবাহসূত্রে অসমিয়া, স্বামীগৃহে যাওয়ায় তাঁর সঙ্গে কি কবির যোগ একেবারে ছিন্ন হয়েছিল? নয়ত উভয়ে উভয়ের সম্বন্ধে আশ্চর্যভাবে নীরব থেকে গেলেন কেন কে জানে! এবার অন্য প্রসঙ্গে যাওয়া যাক।

হেমেন্দ্রনাথের মেয়েদের মাঝখানে আমরা আরেকজনকে পেয়েছি। তিনি শার কেউ নন সর্বজন-পরিচিত সত্যেন্দ্র-জ্ঞানদানন্দিনীর একমাত্র মেয়ে ইন্দিরা। সময়ের দিক থেকে তিনি হেমেরে সেজ মেয়ে অভিজ্ঞার বোন দিদি অর্থাৎ পনেরো দিন আগে জন্মেছেন। সৌভাগ্যবশতঃ তিনিও দীর্ঘ জীবনের অধিকারিণী হওয়ায় ঠাকুরবাড়ির অন্দরমহলের আর একটি উজ্জ্বলতম রত্নকে আমরা পেয়েছি। ছোটবেলা থেকেই তিনি রবীন্দ্রনাথের বিখ্যাত ছিন্নপত্রাবলীর প্রাপক। অন্য কোন ক্ষেত্রে যদি তার কিছুমাত্র দান নাও থাকত তাহলেও ক্ষতি ছিল না। কেননা, রবীন্দ্রনাথকে দিয়ে যিনি এই অসাধারণ চিঠিগুলি লিখিয়ে নিতে পেরেছিলেন তার অসামান্যতা সম্পর্কে সন্দেহ জাগতেই পারে না। আর কেউই কবির সমস্ত লেখাটা আকর্ষণ করে নিতে পারেন। কিন্তু ইন্দিরার পরিচয় এখানেই শেষ নয় বরং শুরু।

ইন্দিরার সমস্ত কাজকর্মের মধ্যেও বড় হয়ে উঠেছিল তার অসাধারণ ব্যক্তিত্ব। অপরূপ লাবণ্যময়ী ইন্দিরা তাই অনন্যা হয়েও সবার অতি আপন বিবিদিতে পরিণত হয়েছিলেন। মনে হয় তিনি সেই জাতের মানুষ যারা শুধুমাত্র তাদের জীবনযাপনের মধ্যেই সংসারকে মধুময় করে তোলেন। প্রতিদিনের জীবনযাত্রা পথে তাদের হৃদয়ের মর্য আর পবিত্রতাই অপরের পথের দিশারী হয়ে ওঠে। মাথা তখন আপনিই নত হয়ে আসে সেই পরমতমার। উদ্দেশ্যে। কিন্তু শুরুতেই এ কথা কেন? ইন্দিরার সমগ্র জীবন যে ভরা। অশেষের ধনে সুতরাং আবার পেছন ফিরে তাকানো যাক।

১৮৭৩ সাল। সন্তানসম্ভবা জ্ঞানদানন্দিীর ইচ্ছে এবার মেয়ে হোক। ঘর আলো করা, কোলজোড়া। খুব সুন্দর দেখতে হবে। প্রাণভরে তাকে সাজাবেন। মায়ের ইচ্ছে অপূর্ণ রইল না। মহারাষ্ট্রের কালাগি শহরে ভূমিষ্ঠ হল ঠাকুরবাড়ির একটি মেয়ে, আকাশ থেকে যেন নেমে এল একটি তারা। কাঁটা কাঁটা ধারাল মুখশ্রী, সুন্দর গায়ের রঙ, বড় বড় দুটি উজ্জ্বল চোখ, রজনীগন্ধার মতো সতেজ সুন্দর দেহলতার অধিকারিণীর নাম রাখা হল ইন্দিরা। কলকাতায় ইন্দিরার রূপের খ্যাতি কেমন ছড়িয়ে পড়েছিল তার একটি সমসাময়িক সাক্ষী উপস্থিত করি। বোধহয় ১৮৮৪ সাল হবে। সরস্বতী পুজোর দিন রবীন্দ্রনাথ এসেছেন এ্যালবার্ট হলে বক্তৃতা দিতে, সঙ্গে ইন্দিরা।

প্রমথ চৌধুরী তখন ছাত্র। অনেকখানি হেঁটে প্রেসিডেন্সী কলেজের মাঠে বন্ধু নারায়ণ চন্দ্র শীলের সঙ্গে দেখা। বন্ধুকে নারায়ণ সোৎসাহে জানালেন রবীন্দ্রনাথ এ্যালবার্ট হলে বক্তৃতা দিচ্ছেন, সঙ্গে নিয়ে এসেছেন তার ভ্রাতুস্পুত্রীকে। চল না, রাস্তাটা পেরিয়ে আমরা এ্যালবার্ট হলে যাই। প্রমথ রাজী হলেন না বক্তৃতা শুনতে যেতে। বন্ধু বললেন, রবীন্দ্রনাথের বক্তৃতা না। শুনতে চাও, অন্তত তার ভ্রাতুস্পুত্রীটিকে দেখে আসি চল। শুনেছি মেয়েটি নাকি অতি সুন্দরী। রেগে উঠে গাছতলায় শুয়ে পড়ে প্রমথ বলেছিলেন, পরের বাড়ির খুকি দেখবার লোভ আমার নেই। কিন্তু অনেকেরই সেদিন সে আগ্রহ এবং কৌতূহল ছিল। পরে এই প্রমথর সঙ্গেই বিয়ে হয়েছিল ইন্দিরার। প্রমথ চৌধুরী তাঁর আত্মকথায় এই ঘটনাটির উল্লেখ করায় ঠাকুরবাড়ির মেয়েদের সম্পর্কে সমসাময়িক কালের আগ্রহ এবং কৌতূহলের একটা ছোট্ট ছবি আমরা দেখতে পেয়ে যাচ্ছি।

শুধু কি রূপ? ইন্দিরার গুণের সংখ্যাও কম ছিল না। আরো একটা কাজ করেছিলেন তিনি। ঠাকুরবাড়ির মেয়েদের মধ্যে ইন্দিরাই সর্বপ্রথম বি. এ. পাশ করেন। এই পরিবার বাঁধাধরা শিক্ষাকে কোনদিন মূল্য দেননি। কিন্তু ডিগ্ৰীলাভ? তারও একটি মূলা আছে বৈকি। বিশেষ করে সেযুগে। যখন গ্র্যাজুটে মেয়েদের দেখবার জন্যে রাস্তায় ভিড় জমে যেত। চন্দ্র মুখী ও কাদম্বিনী কিছুদিন আগেই ঠেলাঠেলি করে বিশ্ববিদ্যালয়ের বন্ধ দরজা খুলে ফেলেছেন। এবার সেই পথে অগণিত মেয়ের ভিড়। অবশ্য ইন্দিরারও আগে গ্র্যাজুয়েট হয়েছেন স্বর্ণকুমারীর মেয়ে সরলা ঘোষাল। এবার খোদ ঠাকুরবংশের মেয়ে ইন্দিরা। তিনি লরেটো থেকে এনট্রান্স পাশ করে বাড়িতেই বি. এ. পড়েছিলেন ইংরেজীতে অনার্স ও ফরাসী ভাষা নিয়ে। ১৮৯২ সালে বি. এ. পরীক্ষায় সর্বোচ্চ স্থান লাভ করে ইন্দিরা পান পদ্মাবতী স্বর্ণপদক। তার আগে আরো এক ডজন মহিলা গ্র্যাজুয়েট কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে বেরিয়েছেন তবে তারা কই ফরাসী ভাষা নিয়ে পড়াশোনা করেননি। ইন্দিরার আট বছর পরে যাবার ফ্রেঞ্চ পড়েছিলেন তারকনাথ পালিতের মেয়ে লিলিয়ান পালিত, ভাররতবর্ষে প্রথম বিবাহ-বিচ্ছেদের মামলা এনে যিনি খুব চাঞ্চল্য সৃষ্টি করেন। বিশ্ববিদ্যালয়ের পুরনো কাগজপত্র দেখে জানা গেছে ১৮৮২ থেকে ১৮৯১ সাল পর্যন্ত মাত্র বারোজন মহিলা গ্র্যাজুয়েট হয়েছিলেন। ইন্দিরা তেরো নম্বর। তিনজনের মধ্যে একজন মাত্র ডবল এম. এ. পাশ করেন তার নাম নির্মলবালা সোম। তিনি ১৮৯১-এ ইংরেজী ও ১৮৯৪-এ মর‍্যাল ফিলসফিতে এম, এ. পাশ করেন। তবে এই সংখ্যা যে হু হু করে বাড়ছিল তাতে সন্দেহ নেই। নাহলে ১৮৯২-এর এই সংখ্যা ১৯১০-এ সাতান্ন জন মহিলা গ্র্যাজুয়েটে পৌঁছবে কি করে? ১৮১৮ থেকে ১৯১০-এর মধ্যে এম. এ. পাশ করেছিলেন আটজন মহিলা, এঁদের কেউই ঠাকুরবাড়ির সঙ্গে যুক্ত ছিলেন না।

ইন্দিরা খুব ভাল ফরাসী জানতেন। ভাগ্যক্রমে তার স্বামী প্রমথ চৌধুরীও ছিলেন ফরাসী ভাষায় সুপণ্ডিত। তাঁর লেখায় ফরাসী রুচির ছাপ আছে। তাঁদের প্রাকবিবাহ পর্বের চিঠিপত্রের প্রিয় সম্ভাষণটিও ছিল ফরাসী Mon ami. ভাল করে লক্ষ্য করলে ইন্দিরার লেখাতেও প্রাথমিক গদ্যরীতির কারুকর্ম চোখে পড়বে। গল্প-উপন্যাস না হলেও তার যে কোন লেখা সরস-সহাস্য ও সুমিত লাবণ্যে সমুজ্জ্বল। প্রমথ চৌধুরীর অসামান্য ব্যক্তিত্বের প্রভাব ইন্দিরার ওপর পড়াও অসম্ভব নয় তবে যাকে বলে প্রসাদ গুণ, ইন্দিরার নিজস্বতায় সেটি প্রচুর মাত্রায় ছিল। প্রবন্ধ-গান-সমালোচনা-স্মৃতিকথা—বিষয় যাই হোক না কেন, সর্বত্র মিশে আছে তার রম্য ব্যক্তির স্বাদ।

নিরপেক্ষভাবে ইন্দিরার কাজের বিচার করতে বসলে মনে হয় যেন থৈ পাওয়া যাচ্ছে না। অথচ স্মৃতি-বিস্মৃতির মায়াজাল ছাড়িয়ে যেখানে তিনি নিজেকে প্রতিষ্ঠিত করেছেন আমাদের নিজের স্বার্থেই সেই বিষয়গুলিকে পুনরুদ্ধার করতে হবে। তিনি যে শুধু কযেকটা বই লিখেছিলেন কিংবা গানের স্বরলিপি তৈরি করেছিলেন তা তো নয়, বাংলা সাহিত্য ও সঙ্গীতকে তিনি যেভাবে সমৃদ্ধ করে গিয়েছেন তাতে তার তুলনা মেলা ভার। বাংলায় যে কয়েকটি হাতে গোনা স্বল্পসংখ্যক মহিলা সত্যিকারের ভাল মননশীল প্রবন্ধ লিখতে পেরেছেন ইন্দিরা তাদের অন্যতম। ভাবতে অবাক লাগে, লেখার আশ্চর্য ক্ষমতা, কলমে অভাবনীয় জাদু থাকা সত্ত্বেও তিনি তাঁর পিসীমা স্বর্ণকুমারীর মতো গল্প-উপন্যাস রচনায় হাত দেননি। কেন? কেন লেখেননি। গল্প-উপন্যাস? প্রবন্ধ, সঙ্গীতচিন্তা, স্মৃতিকথা ও অনুবাদ এই চারটি শাখাতেই ইন্দিরার সাহিত্যকীতি চিরস্মরণীয় হয়ে রয়েছে।

অনুবাদের কাজটা বেশ কঠিন। অচেনা ভাষাকে রক্তে চেনা ভাষায় রূপান্তরিত করলেও তাতে প্রাণের রস আনা যায় না। কবির ভাষায় তর্জম মরা বাছুরের মূর্তি, তা সেই মরা বাছুরকেই প্রাণ দিতেন ইন্দিরা। রবীন্দ্রনাথের বহু কবিতা তিনি অনুবাদ করেছেন। কবি নিজেও স্বীকার করেছেন সে কথা। ইন্দিরা অনুবাদের ভার নিলে তিনি যতটা নিশ্চিন্ত হতেন ততখানি ভরসা আর কারুর ওপর ছিল না। চিঠিতে লিখেছেন, তোর সব তর্জমাগুলিই খুব ভাল হয়েছে। এইমাত্র তের তর্জমালি অপূর্বকে দেখালুমসে বললে আমার কবিতার এত ভাল তর্জমা সে আগে আর দেখেনি। [৬. ১. ১৯২৯ ] আবার। দেখা যাবে জাপান যাত্রী অনুবাদের ভার কবি ইন্দিরাকে দিয়েই নিশ্চিন্ত হতে চান।

কবে থেকে অনুবাদ করা শুরু করেছিলেন ইন্দিরা? ১২৯২ সালের বালকে রাস্কিনের ইংরেজী বুচনা তুলে দিয়ে এক প্রতিযোগিতা আহ্বান করেছিলেন জ্ঞানদানন্দিনী। পৌষ সংখ্যায় পুরস্কার পেলেন যোগেন্দ্রনাথ লাহা। তার অনুবাদের সঙ্গে আর একটা অনুবাদও ছাপা হল। অনুবাদিকার নাম দেখা গেল শ্ৰীমতী ইঃ–। সম্পাদিকা জানালেন একটি অল্পবয়স্কা বালিকার রচনা? অনেকের মতে এই শ্ৰীমতী ইঃ যে ইন্দিরা তাতে সন্দেহ নেই। তখন থেকেই ইন্দিরার আত্মগোপনের চেষ্টা শুরু হয়েছে। ফলে আজকের এই নিজের ঢাক পেটানোর কোলাহলে ইন্দিরা ঠিক কি করেছিলেন তা জানা যাচ্ছে না। এমনকি তার সমস্ত রচনার একটি তালিকাও বোধহয় এখনো তৈরী হয়নি। সাময়িক পত্রের পাতা থেকে সেসব সংগ্রহ করে একটা অখণ্ড গ্রন্থাবলী প্রকাশের চেষ্টা তো অনেক দূরের কথা।

রবীন্দ্র-রচনার অনুবাদ ছাড়াও ইন্দিরা অনুবাদ করেন প্রমথ চৌধুরীর চার ইয়ারী কথার। টেল অব ফোর ফ্রেণ্ডস্ বেশ উল্লেখযোগ্য অনুবাদ। এছাড়া তিনি সত্যেন্দ্রনাথের সঙ্গে যুগ্মভাবে অনুবাদ করেন মহর্ষির আত্মজীবনী দি অটোবায়োগ্রাফী অব মহর্ষি দেবেন্দ্রনাথ টেগোর। এ তো গেল বাংলা থেকে ইংরেজী অনুবাদের কথা। ইন্দিরা ফরাসী থেকে বাংলায় অনুবাদের ক্ষেত্রেও অসাধারণ কৃতিত্ব দেখিয়েছেন। ফরাসী ভাষা সকলে জানেন না। ইন্দিরা ফরাসী ভালই জানতেন। প্রমথ চৌধুরীর সান্নিধ্য তাকে আরও শাণিত করে তুলেছিল। তার যে চারটি অনুবাদের কথা শ্রদ্ধার সঙ্গে স্মরণ করা উচিত সেগুলি হল রেনে গ্রুসের ভারতবর্ষ, পিয়ের লোতির কমল কুমারিকাম, মাদাম লেভির ভারত ভ্রমণ কাহিনী (কলম্বো থেকে শান্তিনিকেতন) এবং আঁদ্রে জীদের লেখা ফরাসী গীতাঞ্জলির ভূমিকা।

ইন্দিরা প্রথম প্রেমে পড়লেন কবে? সে এক মজার ব্যাপার। সেকথা তিনি জানিয়েছেন একেবারে জীবনের শেষপর্বে নিজের আত্মকাহিনী শ্রুতি ও স্মৃতিতে। বিশেষ করে তার আবদারেই রবীন্দ্রনাথ তাঁহার দুই ভাইবোনকে নিয়ে গিয়েছিলেন হাজারিবাগে। কারণ, তখনকার দিনে কনভেন্টের এক একজন মেয়ের এক একজন সিস্টারের প্রেমে পড়ার রেওয়াজ ছিল। বোধহয়। ভবিষ্যৎ জীবনের মকস স্বরূপ তা যাই হোক, ইন্দিরা লিখেছেন তাঁর প্রেয়সী ছিলেন সিস্টার এ্যালাইসি। তাঁকে হাজারিবাগের কনভেন্টে বদলি করা হয়েছিল বলেই ইন্দিরার এ অভিযান।

প্রেমের কথা যখন উঠলই তখন ইন্দিরার জীবনের কথাও এক ফাঁকে সেরে নেওয়া যাক। পূর্ণিমা ঠাকুরের লেখা ইন্দিরার জীবনকথা থেকে জানা যায়, তিনি যখন স্কুলে যেতেন তখন ফটকের বিপরীত দিকের মাঠে এক দর্শনপ্রার্থী যুবক দাঁড়িয়ে থাকত। কোন রকম আলাপ পরিচয় হয়নি। বাড়িতে হাসির ধুম পড়ে যায়। রবীন্দ্রনাথ এই ঘটনাটিকে নিয়েই লিখেছিলেন একটা গান–সখি প্রতিদিন হায় এসে ফিরে যায় কে। ঠাকুরবাড়ির মেয়েরা বাইরে বেরোতেন বা অভিনয় করতেন ঠিকই কিন্তু তারা কোন অনাত্মীয় পুরুষের সঙ্গে কথা বলতেন না। বেশ পরবর্তীকালে জসীমউদ্দীন যখন ঠাকুরবাড়ির ছেলেদের ঘনিষ্ঠ বন্ধু হয়ে ওঠেন তখনও এই বৈশিষ্ট্য লক্ষ্য করেছিলেন। যাইহোক, ইন্দিরার এই নীরব দর্শনপ্রার্থীর সঙ্গে আকস্মিকভাবে দেখা হয়েছিল বহুকাল পরে। দুজনেরই বয়স তখন আশি পেরিয়ে গেছে। শান্তিনিকেতনের রবীন্দ্র সদনে সেই ভদ্রলোক এসেছিলেন তার ছেলের কাজের আবেদন নিয়ে। গল্পের মতো ঘটনা! তবু! কতদিন কেটে গেছে। দুজনেই অস্বস্তি বোধ করেছিলেন। হয়ত কেঁপে উঠেছিল চোখের পাতা কিংবা গলার স্বর। দুজনেরই। হায়! সেদিন কি আর ফেরে? কোনরকমে দরকারি কথা তাড়াতাড়ি সেরে উঠে পড়েছিলেন ইন্দিরা। গল্পটা তার আত্মকাহিনীতেও আছে।

ইন্দিরার পাণিপ্রার্থীর অভাব ছিল না। তার মধ্যে ছিলেন প্রমথ চৌধুরী এবং তাঁর দাদা যোগেশ চৌধুরীও। কয়েক বছর আগে আশুতোষের সঙ্গে প্রতিভার বিয়ে হয়েছে। দুই পরিবারের মধ্যে সৌহার্দ্য গড়ে উঠলেও এই মেলামেশার ফল সব সময় ভাল হয়নি। কোন অজ্ঞাত কারণে উভয় পরিবারের সম্পর্কে চিড় ধরে। চৌধুরীদের কোন কোন ছেলে ব্রাহ্ম হয়ে যাওয়ায় এই তিক্ততা স্বাভাবিকভাবেই বেড়ে ওঠে। ইন্দিরা ও প্রমথর বিয়েতেও নানা রকম বাধা আসে। কিন্তু কোন বাধাই টেকেনি। বিয়ের প্রস্তাব প্রথমে জানান প্রমথ তাতে সমর্থন ছিল ইন্দিরার, ঠাকুরবাড়ির আপত্তি তো ছিল না। তাদের সকলেই খুশি হলেন। কিন্তু বাধা এসেছিল চৌধুরীবাড়ি থেকে সম্ভবত যোগেশ চৌধুরীর জন্যেই। নাহলে প্রতিভার বিয়েতে আপত্তি হয়নি, এখন হবে কেন? প্রসন্নময়ী তার পূর্বকথায় জানিয়েছেন, ঠাকুর পরিবারে ভাতার বিবাহকালে দেশে আর নৃতন কোন আন্দোলন উপস্থিত হয় নাই, বরং বুদ্ধিমতী পিসিমাতারা এ কার্য অনুমোদনই করিয়াছিলেন ও সুশীল সুলক্ষণা ভ্রাতুস্পুত্রবধূ দেখিয়া পরম পরিতুষ্ট হইয়াছিলেন। পয়মন্ত ধুর আগমনে আমাদিগের গৃহের সর্বাংশে মঙ্গল হইয়াছে।

এ ঘটনা আশুতোষ ও প্রতিভার বিয়ের সময়কার। তখন বিয়েতে কোন বাধা আসেনি। ইন্দিরাকে নিয়ে পারিবারিক মনান্তরের সূচনা হয়েছিল বলে বিয়ের পর নববধু শ্বরবাড়ির পরিবর্তে গিয়ে উঠলেন ছোট ননদ মৃণালিনীর বাড়িতে। তারপর তার নিজের বাড়ি কমলালয়ে। এরপরে তো একটানা কাজের ইতিহাস!

বাংলার নারী জাগরণের অন্যতম নেত্রী ইন্দিরাকে তার মায়ের মতো পদে পদে বাধা পেতে হয়নি। তাই খ্রীশিক্ষা, নারীজাগরণ, স্বাধীনতা, স্বেচ্ছাচার, মেয়েদের অধিকার ও কর্তব্য, আত্মরক্ষাসমিতি, সুবিধে-অসুবিধে, কাজকর্ম, এককথায় বলতে গেলে মেয়েদের সামগ্রিক ভূমিকার কথা নিরপেক্ষভাবে ভাববার অবকাশ ইন্দিরা পেয়েছিলেন। সেটা জ্ঞানদানন্দিনী, কাদম্বরী কিংবা অন্য কেউ পাননি। কোনটা সত্যি ভাল আর কোনটার সত্যি প্রয়োজন আছে আকস্মিক উত্তেজনাটা থিতিয়ে না গেলে সেটা ভাল বোঝা যায় না। ইয়ংবেঙ্গল গ্রুপকে যেমন নিছক সংস্কার ভাঙ্গার জন্যে কতকগুলো অর্থহীন কাজ করতে হয়েছিল তেমনি প্রথম যুগের মেয়েদেরও কিছু সাহস দেখাবার প্রয়োজন ছিল। দরকার। ছিল কয়েকটি অমূল্য আত্মাহুতির। মেয়েদের চোখের সামনে নতুন নজির সৃষ্টি করবার জন্যে কাদম্বরীর অশ্বারোহণ, জ্ঞানদানন্দিনীর একলা বিলেত যাওয়া, কাদম্বিনীর ডাক্তারি পড়া, সরলা রায় ও অবলা বসুর শিক্ষা, চন্দ্রমুখীর এম. এ. পড়া, ব্রাহ্ম সমাজে চিকের বাইরে এসে উপাসনা করা, জামা জুতো পরে খোলা গাড়ি চড়ে বেড়ানোর দরকার ছিল বৈকি। খুবই দরকার ছিল। নইলে অন্য মেয়েদের মন থেকে অবরোধের, পাহাড় নামবে কেমন করে? কিন্তু ইন্দিরা এঁদের পরের যুগের মানুষ। তিনি সেকেলে রক্ষণশীলতা আর একেলে উগ্র আধুনিকতা দুই-ই বর্জনের পক্ষপাতী ছিলেন। সব জায়গাতেই তিনি উগ্রতাবিরোধী এবং মধ্যপন্থাবলম্বী। তাঁর নিজস্ব মত :

সেকালের ধীর-স্থিরাদের সঙ্গে একালের বীৰা হতে হবে; অথবা সেকালের শ্রী ও হ্রীর সঙ্গে একালের ধী মেলাতে হবে-বঙ্কিমবাবু হলে যাকে বলতেন প্রখরে-মধুরে মেশা! এই সামঞ্জস্যই নারীজীবনের মূলমন্ত্র।

ইন্দিরার প্রতিটি লেখার স্টাইল ঋজু ও স্বচ্ছ। তাঁর কাকার ভাষায় সমুজ্জ্বল। তিনি ইন্দিরার লেখা প্রবন্ধ পড়েও বুঝতে পারেননি এই স্টাইল ইন্দিরার। কারণ খুব স্বাভাবিক। প্রবন্ধ লেখার ক্ষেত্রে এখনও পুরুষের অগ্রাধিকার সর্বজনস্বীকৃত। মেয়েরা যতই এগিয়ে যাক না কেন, গভীর মনন ও চিন্তার ফসল ফলেছে পুরুষের কলমেই একথা অস্বীকার করে লাভ নেই। বিশ্ব সাহিত্য সম্পর্কেই একথা প্রযোজ্য। বাংলা দেশে তো হবেই। তবে এদেশ বড় আশ্চর্য দেশ। এখানে অসম্ভব বলে কিছু নেই। তাই পর্দার আড়ালে, নিতান্ত অন্দরমহল থেকেও মাঝে মাঝে এমন একটি কূট বিচক্ষণতার পরিচয় পাওয়া গেছে যাতে তাবৎ পুরুষ সমাজের ও তাক লেগে গেছে। মননের ক্ষেত্রেও কোন কোন মেয়ে এমন পাণ্ডিত্যের পরিচয় দিতে পেরেছেন যে তাকে শ্রেষ্ঠ আসনে বসাতে কেউ দ্বিধা করেননি। ইন্দিরা সেই বিরলতমাদের একজন। তার লেখা নারীর উক্তির ছটি নারী সংক্রান্ত প্রবন্ধ, রাংলা প্রবন্ধ সাহিত্যের শ্রেষ্ঠ উদাহরণ।

আবার ইন্দিরা যখন স্মৃতিকথা লিখতে বসতেন তখন তাতে মিশত গল্পের রস। প্রখর স্মৃতিশক্তির সাহায্যে তিনি রবীন্দ্রনাথের প্রথম জীবনের বহু গান উদ্ধার করেছেন। না হলে অনেক গানেরই সুর যেত হারিয়ে। স্মৃতিকথা হিসেবে ইন্দিরার সবচেয়ে উল্লেখযোগ্য রচনা রবীন্দ্রস্মৃতি। পাঁচ ভাগে ভাগ করে তিনি রবীন্দ্রনাথের সঙ্গে জড়িত সঙ্গীত, সাহিত্য, নাট্য, ভ্রমণ ও পারিবারিক স্মৃতির কথা বলেছেন। এতে রবীন্দ্রনাথের প্রথম জীবনের অনেক কথাই জানা। যায়। স্মৃতিকথা লেখবার সময় ইন্দিরা সবসময় একটি বিশেষ রীতি মেনে চলতেন, যাতে যার কথা বলতেন, তাঁর ঘরোয়া ব্যক্তিত্বের ছবি ফুটে উঠত। এই ছোট ছোট ব্যক্তিত্বের সমষ্টিকে তিনি বলতেনছোট ফুলের শ্রদ্ধাঞ্জলি। তাঁর শেষ রচনা শ্রুতি ও স্মৃতি যেন রূপকথার ঝাপি। এটি ইনিরার নিজের কথা—শুরু হয়েছে তার জন্ম থেকে আর শেষ হয়েছে দাদা সুরেন্দ্রনাথের পৌত্র সুপ্রিয়ের জন্মবৃত্তান্তের সঙ্গে সঙ্গে। ঠাকুরবাড়ির এবং চৌধুরীবাড়ির বহু খবর এতে পাওয়া যাবে। গ্রন্থটি এখনও প্রকাশিত হয়নি, ফাইলবন্দী হয়ে বিশ্বভারতীর রবীন্দ্রভবনে পড়ে আছে।

রবীন্দ্রসঙ্গীতের ক্ষেত্রে ইন্দিরার ভূমিকা যে কী এক কথায় তা বলা যাবে না। তাঁর দিদি প্রতি গানের জগতে মেয়েদের মুক্তি দিয়েছিলেন। আর ইন্দিরা উদ্ধার করেছিলেন প্রায় লুপ্ত প্রথম দিকের রবীন্দ্রসঙ্গীতকে। তার চেয়ে পনের দিনের ছোট অভিজ্ঞার কণ্ঠেও রবীন্দ্রসঙ্গীত নতুন রূপ পেতে শুরু করেছিল কিন্তু অকালে মৃত্যু হওয়ায় অভিজ্ঞা স্থায়ীভাবে কিছু রেখে যেতে পারেননি। সে অভাব পূরণ করেছিলেন তার বোনদিদি ইন্দিরা! দেশী ও বিলিতি উভয় সঙ্গীতে তিনিও তালিম নিয়েছিলেন শৈশবেই। এমন কি যন্ত্রসঙ্গীতেও তার হাত ছিল পাকা। সেন্ট পলস্-এর অর্গানিস্ট স্লেটার সাহেবের কাছে পিয়ানো ও সিনর ম্যাটোর (Signor Manzato) কাছে তিনি শিখেছিলেন বেহাল। ওস্তাদি হিন্দুস্থানী গান শেখেন বদ্রীদাস মুকুলের তত্ত্বাবধানে। হেমেন্দ্রর মেয়েরা গান নিয়ে মেতে থাকলেও অভিজ্ঞ ছাড়া আর কেউ রবীন্দ্রসঙ্গীত চর্চা বেশি করেননি। তাই ইন্দিরাকে একাই সব ভার নিতে হয়েছিল। তিনি নিজেও পরিহাসতরল কণ্ঠে বলতেন, আমার জীবনের যতদূর পর্যন্ত দেখতে পাই যেন সামনে এক বিস্তীর্ণ স্বরলিপির মরুভূমি পড়ে রয়েছে, তার মাঝে ম ঝ রেফ ও হসন্তের কাঁটাগাছ।

বাস্তবিকই ইন্দিরা যে কত গানের স্বরলিপি করেছেন, তার ইয়ত্তা নেই। শুধু সুর এবং স্বরলিপি রক্ষা করা নয়, তিনি রবীন্দ্রসঙ্গীতের তথ্য ও তত্ত্ব দুটোকেই সমৃদ্ধ করেছেন। একদিক থেকে স্বরলিপি উদ্ধার করে ও গান শিখিয়ে অপর দিকে সঙ্গীত সংক্রান্ত প্রবন্ধ লিখে। রবীন্দ্রসঙ্গীতে ত্রিবেণী সঙ্গম এমনই একটি ছোট্ট বই। এতে ইন্দিরা দেখিয়েছেন রবীন্দ্রনাথ অপরের সুরে নিজের কথা গেঁথে গেঁথে কত নতুন গান সৃষ্টি করেছেন, আবার পরের কথায় তার সুর দেওয়ার সংখ্যাও যে একেবারে নেই তা নয়। কবির যাবতীয় ভাঙা গানের একটি লিস্ট তৈরি করে তিনি দেখিয়ে দিয়েছেন, সামান্য অদলবদলের মধ্যে কবি কি অসাধ্য সাধন করেছিলেন। সঙ্গীত জগতে এই পুস্তিকাটি অমূল্য সংযোজন। রবীন্দ্রসঙ্গীত নিয়ে এ যুগের অনেকেই নানারকম আলোচনা করেছেন। এ ব্যাপারে মহিলাদের সংখ্যা কম হলেও পুরুষদের সংখ্যা নগণ্য নয়। কিন্তু কেউই ইন্দিরার মতো রবীন্দ্রসঙ্গীত নিয়ে এত ব্যাপক আলোচনা বোধহয় কেরেননি। যারা করেছেন তাদের আলোচনারও আকর হিসেবে গৃহীত হয়েছে ইন্দিরার সঙ্গীত চিন্তা! যাইহোক, ইন্দিরার দেওয়া হিসেব থেকে জানা যায়, রবীন্দ্রনাথের দুশ সাতাশটা ভাঙা গানের বারোটির সুর নেওয়া হয়েছে স্কচ ও আইরিশ গান থেকে। রবীন্দ্রসঙ্গীতে হিন্দুস্থানী গানের দানও কম নয়। ভাবতে অবাক লাগে, আমাদের চির পরিচিত বিদায় করেছ যারে নয়ন জলের উৎস বাজে ঝননন। মোরে পায়েলিয়, তুমি কিছু দিয়ে যাও-এর উৎস কৈ কছু কহরে কিংবা শূন্য হাতে ফিরি হে নাথ-এর উৎস রুমঝুম বরষে হতে পারে। অপরের কথায় কবির সুর দেবার কথাও আছে। বিদ্যাপতির পদ কিংবা বঙ্কিমচন্দ্রের বন্দেমাতরম্‌-এর প্রথম স্তবক ছাড়াও কবি অক্ষয় বড়াল, সুকুমার রায়, হেমলতা ঠাকুরের গানে সুর দিয়েছিলেন।

ইন্দিরার লেখা রবীন্দ্রসঙ্গীত বিষয়ক প্রবন্ধের সংখ্যা অনেক। বহু পত্রিকায় তিনি এ নিয়ে আলোচনা করেছেন। এদের মধ্যে সঙ্গীতে রবীন্দ্রনাথ, রবীন্দ্রসঙ্গীতের শিক্ষা, রবীন্দ্রসঙ্গীতের বৈশিষ্ট্য, রবীন্দ্রনাথের সঙ্গীতপ্রভাত, স্বরলিপি পদ্ধতি, শান্তিনিকেতনে শিশুদের সঙ্গীতশিক্ষা, হারমনি বা স্বরসংযোগ, রবীন্দ্রসঙ্গীতে তানের স্থান, রবীন্দ্রনাথের গান, বিশুদ্ধ রবীন্দ্রসঙ্গীত, হিন্দুসঙ্গীত, আমাদের গান, স্বরলিপি, দি মিউজিক অব রবীন্দ্রনাথ টেগোর, ইন্দিরার সঙ্গীত চিন্তার পরিচয় বহন করে।

শুধু কাজ দিয়ে বোধহয় ইন্দিরার বিচার করা যায় না। তিনি সারাজীবন নানারকম কাজ, মহিলা সমিতি, প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে জড়িয়ে ছিলেন। কিছুদিনের জন্যে বিশ্বভারতীর উপাচার্যের পদও তাকে গ্রহণ করতে হয়েছিল। পেয়েছিলেন দুটি বিশ্ববিদ্যালয়ের দেওয়া সর্বোচ্চ সম্মান কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ের ভুবনমোহিনী স্বর্ণপদক এবং বিশ্বভারতীর দেশিকোত্তমা। কিন্তু যারা তার সঙ্গে ব্যক্তিগতভাবে পরিচিত ছিলেন তারা জানতেন ইন্দিরার তুলনায় এসব সম্মানউপাধি-স্বর্ণপদক কত সামান্য। মর্ত্যের কুসুম দিয়ে কি স্বর্গের লক্ষ্মীকে সাজানো যায়?

এইখানেই ইন্দিরা প্রকৃত বৈশিষ্ট্য। কোন কাজ করে নয়, কোন কাজের মধ্যে নয়, শুধু উপস্থিতি দিয়েই তিনি ভরে দিতে পারতেন সব শূন্যতাকে। শান্তিনিকেতনে রবীন্দ্র-প্রয়াণের পর রবীন্দ্র ভাবধারাকে একটানা কুড়ি বছর ধরে ধচিয়ে রেখেছিলেন তিনি। সঙ্গে নিশ্চয় আরো অনেকে ছিলেন কিন্তু তাঁরা সঙ্গীমাত্র, তার বেশি কিছু নয়। ইন্দিরা একাই সব।

ইন্দিরার কমনীয় ব্যক্তিত্বে যে কমল হীরের দীপ্তি ফুটে উঠেছে তাকেই বলা যায় কালচার। এই কালচারের ছাপ ইন্দিরার সাজসজ্জায়-বাক্যবিন্যাসেঘরসজানোয়-আচার-ব্যবহারে-প্রেমপত্রে-সাহিত্যচর্চায় স্বামীসেবায়-গৃহিণীপনায় -সবুজপত্রে-কমলালয়ে-শান্তিনিকেতনের আশ্রম-কুটিরে সর্বত্র পড়েছিল। এই বিশিষ্টতাই তার সবচেয়ে বড় দান। বাংলার নারীদের সামনে তিনি তার প্রাচ্য ও পাশ্চাত্য শিক্ষায় শিক্ষিত আদর্শ জীবনটিকে তুলে ধরেছিলেন। তারই মধ্যে ফুটে উঠেছিল জোড়াসাঁকোর ঠাকুরবাড়ির মেয়েদের নিজস্ব সংস্কৃতির শ্রেষ্ঠ পরিচয়।
আবার হেমেন্দ্রনাথের মেয়েদের কথায় ফিরে আসা যাক। প্রতিভা ও প্রজ্ঞার আরো ছটি গুণবতী বোন ছিলেন। তাঁদের সেজ বোন অভিজ্ঞাসুন্দরী বেঁচে আছেন সকলের স্মৃতিকথায়। তাকে অনেকেই দেখেননি কিন্তু যারা দেখেছিলেন তারা আর ভোলেননি। সবাইকে অবাক করা এই মেয়েটিই রবীন্দ্রনাথের সবচেয়ে প্রিয় ভাইঝি অভি। তার গলায় নিজের গান শুনে মুগ্ধ হয়ে যেতেন স্বয়ং রবীন্দ্রনাথ। শিলাইদহে থাকতে থাকতে অভিজ্ঞার গান শোনবার জন্যে তার মন উঠত হু হু করে। ইন্দিরাকে লেখা চিঠিতেও সেই ব্যাকুলতার আভাস, অভির মিষ্টি গান শোনবার জন্যে আমার এমনি ইচ্ছে করে উঠল যে তখন বুঝতে পারলুম, আমার প্রকৃতির অনেকগুলি ক্রন্দনের মধ্যে এও একটা ক্রন্দন ভিতরে ভিতরে চাপ ছিল।

কি ছিল অভিজ্ঞার কণ্ঠে?

অকালে, নিতান্ত অসময়ে হারিয়ে যাওয়া এই কিশোরীর কণ্ঠে কোন অনির্বচনীয় মাধুরী ধরা পড়ত, কে দেবে উত্তর? যারা দিতে পারতেন তারা সবাই তো পরলোকে। শোনা গেছে, রবীন্দ্রনাথের প্রথম জীবনের গানগুলি : অভিজ্ঞার কণ্ঠে মূতি লাভ করত। হিন্দী গানও অভিজ্ঞ মর্মস্পর্শী করে গাইতে পারতেন। ছায়ানটের ঠারি রহো মের আঁখন আগে গানটি কিশোরী অভির। কণ্ঠে শুনে মুগ্ধ হয়েছিলেন প্রমথ চৌধুরী। ঠাকুরবাড়িতে তখন সুবর্ণযুগ চলছে। রবীন্দ্রনাথ সৃষ্টির আপন খেয়ালে তন্ময়। একের পর এক লিখে চলেছেন বাল্মীকিপ্রতিভা, কালমৃগয়া, মায়ার খেলা। আর ক্লান্তিহীন কণ্ঠে তাকে রূপ দিয়ে চলেছেন অভিজ্ঞ।

করুণ গানে অভিজ্ঞার জুড়ি ছিল না। বাল্মীকি প্রতিভার পর কবি লিখলেন কালমৃগয়া! বিদ্বজ্জনসভায় আবার এলেন অতিথিরা। ১৮৮২ সালের ২৩শে ডিসেম্বর, জমাট কুয়াশাভরা শীতার্ত সন্ধ্যা। তাদের সামনে শুরু হল কালমৃগয়া। বাল্মীকিপ্রতিভায় আত্মপ্রকাশ করেছিলেন প্রতিভা, এবার মঞ্চে অবতরণ করলেন অভিজ্ঞ। লীলার ভূমিকায় অভিজ্ঞর অভিনয় দেখে অনেকেই সেদিন চোখের জল রাখতে পারেননি। এই অভিনয়ে রবীন্দ্রনাথ সেজেছিলেন অন্ধমুনি আর জ্যোতিরিন্দ্রনাথ দশরথ। কিন্তু অভিজ্ঞার অভিনয় সবার মনে যতটা দাগ কেটেছিল তার কাকারাও ততটা পারেননি। ভারতবন্ধু কাগজের সমালোচক লিখেছেন, লীলার গান শুনলে পাষাণ হৃদয়ও বিগলিত হয়।

অভিজ্ঞার পাষাণ-গলানো গনি আর শোনা গেছে বাল্মীকি প্রতিভা অভিনয়ের সময়ে। হাত বাঁধা বালিকা সেজে তিনি যখন গাইলেন, হা কী দশা হল আমার তখন বাঙালী দর্শকরা কেঁদে ভাসিয়ে দিলেন–এ একেবারে অবনীন্দ্রনাথের নিজের চোখে দেখা। আরো কিছু দিন পরে অভিজ্ঞ একটু বড় হয়েছেন। কণ্ঠে মাধুরীর সঙ্গে মিশেছে দরদ। ভালবাসার কুঁড়ি ধরল তাতে রবীন্দ্রনাথ এবার লিখলেন মায়ার খেলা। কথা ও সুরের সত্যিকারের মিলন হল যেন। তাকে আরো সুন্দর করে তুলল অভিজ্ঞার কণ্ঠ। ইন্দিরা ও তার স্বামী প্রমথনাথের সাক্ষ্যে জানা যায়, অভিজ্ঞ এ,সনে বসে বাল্মীকিপ্রতিভা বা মায়ার খেলার সমস্ত গান গাইতে পারতেন। বাল্মীকি প্রতিভার সমস্ত গান অভিজ্ঞার মতো মর্মস্পর্শী করে গাইতে প্রমথনাথ আর কাউকে শোনেননি। অপর দিকে মায়ার খেলার গান শুনে বহু দিন পরে প্রায়-বৃদ্ধ অবন ঠাকুরের স্মৃতি উদ্বেল হয়ে ওঠে, হায়, যে ওসব গান গাইবে সে মরে গেছে। সেই পাখির মতো আমাদের ছোট বোনটি চলে গেছে।…সে সুরে যে গাইত সে পাখি মরে গেছে। অভিজ্ঞা তাই স্মৃতি হয়েও যেন স্মৃতি নন। যে একবার তার গান শুনেছে সে-ই তাকে মনে রেখেছে।

মায়ার খেলায় অভিজ্ঞ নিতেন শান্তার ভূমিকা। শান্তার করুণ-মধুর বিষণ্ণতা অভিজ্ঞার কণ্ঠে জীবন পেত। পরে বির্জিতলায় আরেকবারের অভিনয়ে ইন্দিরা নিয়েছিলেন শান্তার ভূমিকা, কারণ শান্তার ভূমিকাভিনেত্রী তখন আর ইহলোকে নেই। অভিজ্ঞ ছিলেন শান্ত, গম্ভীর, রোদনভরা বিষণ্ণ। দেহ বলে তার কোন জিনিষ ছিল না, মুখের মধ্যে দুটি বড় বড় জীবন্ত চোখ ছিল। আর সে চোখ দুটি মাধুর্যপূর্ণ। নিষ্ঠুর শিকারীর অব্যর্থ লক্ষ্যভে েরিত হয়েছিল। বুঝি পাখির মতো কোমল হৃদয়। কালব্যাধি যে তলে তলে বাসা বেঁধেছে সে কথা কেউ বুঝতেই পারেনি। বিয়ের রাতে ঘটল অঘটন। অনুষ্ঠানের শেষেই তিনি অসুস্থ হয়ে পড়েন। হঠাৎ জ্বর, প্রবল জ্বর। দিনে দিনে অসুখ বেড়ে চলে এবং জানা যায় দুরারোগ্য ক্ষয় রোগ তাকে গ্রাস করে ফেলেছে। চিকিৎসার অসাধ্য। কৃশপাণ্ডুর চাঁদের মতোই একমাসের মধ্যে হারিয়ে গেলেন অভিজ্ঞ। মৃত্যু হল জোড়াসাঁকোর বাড়িতেই। চিকিৎসক স্বামী বধূকে আরোগ্য করবার সুযোগই পেলেন না।

অভিজ্ঞার মৃত্যুতে সবচেয়ে ক্ষতি হয়েছে রবীন্দ্রসঙ্গীতের। সেই প্রথম পরীক্ষা-নিরীক্ষার যুগে অভিজ্ঞার মতো প্রতিভাময়ী গায়িকা বেঁচে থাকলে কবি প্রয়োগের দিক থেকেও রবীন্দ্রসঙ্গীতকে প্রতিষ্ঠা দিতে পারতেন। কিন্তু সে বুঝি হবার নয় তাই অকালে ঝরে পড়ল অস্ফুট কোরটি, অকালে নিভে গেল বাংলা দেশের একটি রত্নপ্রদীপ। অভিজ্ঞার মৃত্যুর পরে কবি চারটি সনেট লিখেছিলেন— নদীযাত্রা, মৃত্যুমধুরী, স্মৃতি ও বিলয়। নতুন করে কবির যেন মনে পড়েছিল মৃত্যুমাধুরীমাখা দুটি আশ্চর্য সুন্দর চোখ আর প্রভাত-পাখির মতো সুমধুর কণ্ঠের অধিকারিণী অভিজ্ঞাকে। এখানে একটা কথা বলে নিই। কবিমানসী গ্রন্থের লেখক জগদীশ ভট্টাচার্যের মতে এই সনেট চারটি কবির নতুন বৌঠানের স্মৃতিসুধায় ভরপুর। কিন্তু একথা মেনে নিতে পারিনি। ক্ষিতিমোহন সেনের ডায়রিতে যে চৈতালি কাব্য আলোচনার অনুলেখন রাখা আছে তাতেও দেখা যাবে কবি এই সনেটগুলো সম্পর্কে মন্তব্য করেছেন, আমার ভাইঝি অভির মৃত্যুর পরে লেখা। অভিজ্ঞার মৃত্যুর পরে আর একজনও তার কথায় উচ্ছ্বসিত হয়ে উঠেছিলেন। তিনি আর কেউ নন, প্রমথ চৌধুরী, যিনি কোন রকম ভাবালুতাকে প্রশ্রয় দেওয়া অনাবশ্যক মনে করতেন। তার কাছেও অভিজ্ঞ একটি বিস্ময়! তার মনে হয়েছিল অভিজ্ঞ সেক্সপীয়রের কল্পিত আরিয়েলের সগোত্র। অর্থাৎ অশরীরী সঙ্গীত। বারো তেরো বছর বয়সের এই কিশোরী তার মনে স্থায়ী ছাপ রেখে গিয়েছিলেন, জীবনে কোন কোন লোক প্রথম থেকেই আমাদের মনে বিশেষ ছাপ রেখে যায়, যা কখনো বিলুপ্ত হয় না। অভি ছিল সেই দু-চারটি লোকের ভিতর একজন। প্রমথনাথের মনে হয়েছিল, ইংরেজরা বলে whoin the gods love die young। অভি ছিল সেই দেবানাং প্রিয় একটি বালিকা। কেননা সে কখনো কিশোরী হয়নি।

সময় কারুর জন্যে বসে থাকে না; অভিজ্ঞার ঠিক পরের বোন মনীষাও বড় হয়ে উঠেছেন। তাঁর দিদির রবীন্দ্রসঙ্গীতে এত নাম কিন্তু তিনি বেছে নিলেন বিদেশী যন্ত্রসঙ্গীতকে। বড়দিদি প্রতিভার মতো তিনিও খুব ভাল য়ুরোপীয় গান এবং পিয়ানো বাজাতে পারতেন। পরে পিয়ানোর দিকেই ঝোঁক থাকায় এদেশের শ্রেষ্ঠ পিয়ানিস্টদের একজন হয়ে ওঠেন। তবে ভারতে মনীষা খুব পরিচিত ছিলেন না। কারণ আর কিছুই নয়, বিদেশী সঙ্গীতের চর্চা। অন্যান্য বোনেদের মত তিনিও লরেটোয় পড়তেন, বাড়িতে চলত ক্লান্তিবিহীন সঙ্গীতসাধনা। তবু দেশী গানের সঙ্গে তার অন্তরের যোগ ছিল না বললেই হয়। প্রতিভা গাইতেন বিলিতি গান, পিয়ানোয় বাজাতেন ওস্তাদি বাজনা, পরে তার ঝোঁক পড়ে হিন্দুস্থানী গানের ওপর। কিন্তু মনীষ প্রথম থেকে শেষ পর্যন্ত পিয়ানো চর্চা করেই কাটিয়েছেন। তিনি রবীন্দ্রনাথের পদপ্রান্তে রাখে সেবকে ও দু-তিনটি গানে গিয়ানোর সঙ্গত বসিয়েছিলেন কিন্তু সেগুলো তেমন জনপ্রিয় হয়নি। যেমন জনপ্রিয় হয়নি তমীশ্বরাণাং বেদমন্ত্রের পিয়ানো সংগত। এর ফলে মনীষা বাঙালীদের গানের জলসায় প্রায় অপরিচিতাই রয়ে গেছেন। আরো একটা কারণও আছে। এক সময় সাহেবিয়ানার অনুকরণে বাঙালীর ঘরে ঘরে পিয়ানোচর্চা শুরু হয়েছিল ঠিকই কিন্তু পিয়ানো কোনদিনই বাঙালীর ঘরের জিনিষ হয়ে ওঠেনি। এখন বিলিতি বাজনা সর্বস্বতার যুগ, তবু পিয়ানো, তার বিশাল আকার আর বিশাল দাম দিয়ে অভিজাত ড্রইংরুমের বাইরে বড় একটা এসে পৌঁছয়নি—তার স্থান নিয়েছে পিয়ানো-একর্ডিয়ান, গীটার প্রভৃতি ছোট ছোট বাদ্যযন্ত্র। তাই পিয়ানিস্টরাও সাধারণ সমাজে পরিচিত নন। মনীষা তার মোগ্য সম্মান পেয়েছিলেন বিদেশে।

অভিজ্ঞার মৃত্যুর পরে তার স্বামী দেবেন্দ্র চট্টোপাধ্যায়ের সঙ্গে মনীষার বিয়ে হয়েছিল। বিয়ের মাত্র একমাস পরেই বিদায় নিলেন অভিজ্ঞা তাঁর বাসরশয্যাই মৃত্যুশয্যায় পরিণত হল। দেবেন্দ্রের সেবা তাকে ফিরিয়ে আনতে পারল না। কিন্তু বোনের মৃত্যুর পর এই উদার উন্নতমনা যুবকটিকে ভালবেসে ফেলেছিলেন অভিজ্ঞার দাদারা। তারা প্রস্তাব করলেন তাঁদের বোন স্নেহবন্ধন ছিঁড়ে চলে গেছেন, কিন্তু দেবেন্দ্র যেন না যান। মনীষার সঙ্গে দেবেন্দ্রর আবার বিয়ে দেওয়া হোক। আপত্তির কারণ ছিল না। শুধু একটু বাধা। মহর্ষি নাতনীদের বিয়েতে তিন হাজার টাকা যৌতুক দিতেন। এবার দেবেন্দ্রকে নতুন করে যৌতুক দিতে তিনি রাজী হলেন না। মনে হয়, নাতজামাইকে পরীক্ষা করবার জন্যেই। বিব্রত হলেন হিতে-ক্ষিতীন্দ্র-ঋতেন্দ্র। তাঁরা দেবেন্দ্রকে অনুরোধ জানালেন এ বিয়েতে রাজী হতে, পরে যেমন করে হোক, তাঁরা এ টাকা জোগাড় করে দেবেন। দেবেন্দ্র এসব দাবি করেনইনি, তাই বিয়ে বন্ধ হল না। সব দেখে সন্তুষ্ট হয়ে, মহর্ষিও সমস্ত টাকা দিয়ে দিলেন। ক্ষিতীন্দ্রনাথের অপ্রকাশিত ডায়রি মহর্ষি পরিবারে এ তথ্য পাওয়া গেছে।

মনীষা স্বামীর সঙ্গেই বিদেশে গিয়েছিলেন। সেখানে তাঁর পিয়ানোয় নিখুঁত ইংলিশ কোটেশন শুনে য়ুরোপীয়রা যেমন মুগ্ধ হয়েছিলেন তেমনি বিস্মিত ইসছিলেন, পিয়ানোয় হিন্দু মার্গসঙ্গীতের ভাব প্রকাশের স্বাচ্ছন্দ্যে। বিদেশে যারা মনীষার পিয়ানো শুনেছিলেন তাদের মধ্যে ছিলেন মনীষী ম্যাক্সমুলার। শীষাকে লেখা তার একটি উচ্ছ্বসিত প্রশংসাপূর্ণ চিঠি আজও রবীন্দ্রভারতী মিউজিয়ামে মনীষার নিখুঁত সুরসৃষ্টির নীরব সাক্ষী হয়ে আছে। তাতে জানা যায় শুধু য়ুরোপীয় সঙ্গীত নয়, ভারতীয় সঙ্গীত বিশেষত হিন্দু মার্গসঙ্গীতের বিশুদ্ধ সুরসৃষ্টি দিয়ে মনীষা সমস্ত পশ্চিমী জগৎকে মুগ্ধ করেছিলেন।

অবশ্য এদেশের সঙ্গীত-সমাজের সঙ্গেও যে মনীষার যোগ ছিল না তা নয়। প্রতিভা ও ইন্দিরা যেমন সঙ্গীত-সংঘের প্রাণকেন্দ্র ছিলেন তেমনি সঙ্গীত সম্মিলনীর প্রাণ ছিলেন প্রমদা চৌধুরী। মনীষা এই সঙ্গীত সম্মিলনীর সঙ্গে ঘনিষ্ঠভাবে যুক্ত ছিলেন। তাঁর স্বামীর ঘনিষ্ঠ বন্ধু হিসেবেও প্রমদার স্বামী বনোয়ারীলাল চৌধুরী পরিচিত। প্রমদার সঙ্গে ছিল মনীষার গভীর সখ্য। তাঁর স্মৃতিকথা থেকেই জানা যায়, প্রথমদিকে সঙ্গীত সম্মিলনী আনন্দ সভার মতোই একটা ক্লাব ছিল। সেই ক্লাবের সদস্যদের আগ্রহ আর ইচ্ছেতেই গড়ে ওঠে সঙ্গীত সম্মিলনী গানের স্কুল। স্কুলের পরিচালন-ভার গ্রহণ করে প্রমদা। মনীষ ছিলেন উৎসাহী সভ্য। মাঝে মাঝে যোগ দিতেন বিভিন্ন সঙ্গীত ও নৃত্যের অনুষ্ঠানে, বাজাতেন পিয়ানো কিংবা বেহালা। মনীষার লেখার হাতও বেশ ভাল ছিল যদিও তিনি খুব বেশি লেখেননি। তাঁর সাহিত্যচর্চার বিবরণ পাওয়া যাবে তত্ত্ববোধিনী পত্রিকার পুরনো ফাইলে। কয়েকটা প্রবন্ধ ছাড়াও তিনি লিখেছিলেন একটা নাটক। ছোটদের অভিনয় করার জন্যে। কিন্তু লেখার পরে সেটিও আর যত্ন করে তুলে রাখেননি। প্রমদার মৃত্যুর পরে লেখা স্মৃতিকথাটির ভাষাও ঝরঝরে। তিনি লিখেছেন :

তারপর আমি শিলং বাস করাতে ক্ষণিক সম্বন্ধ ত্যাগ করতে হল। মাঝে মাঝে চিঠিতেও পরামর্শ দিতুম। সময় সময় প্রমদা সম্মিলনী ছাড়ি ছাড়ি করতেন। কিন্তু আমরা ছাড়তে দিইনি। সম্মিলনী যেন তার অঙ্গ ছিল।… তিনি নিঃসন্তান ছিলেন। কিন্তু এই সম্মিলনীর ছেলেমেয়েরা তার সন্তান স্বরূপ ছিল। কেউ বা মিঠাপিসী, কেউ বা জেঠিমা, কেউ বা মিঠাদিদি বলে ডাকত। সকলেই তার আদরের ছিল! বিবাহ সম্বন্ধ পাকাতে তাঁর দ্বিতীয় আর কেউ ছিল না।

মনীষা সাহিত্যচর্চার সঙ্গে সঙ্গে পুণ্য পত্রিকার মাধ্যমে মাঝে মাঝে সেলাইফোড়াইয়ের কাজও শেখাতেন। বিশেষ করে সেকালে বসবার ঘরে পুতির পর্দা ঝোলানো ছিল আভিজাত্যের লক্ষণ। ঠাকুরবাড়িতেও এ প্রথা ছিল। মনীষা সেই পর্দা সেলাইয়ের বা বোনার পদ্ধতি, নকশা প্রভৃতি ছবি এঁকে, ঘর গুণে সেলাই দিয়ে বোঝাবার চেষ্টা করেছেন। হেমেন্দ্রনাথের অন্যান্য মেয়েদের মধ্যেও নানা গুণের সমাবেশ দেখা গেছে। ঠাকুরবাড়ির মেয়েরা দেখিয়েছেন প্রগতির সঙ্গে শাশ্বতীকে বেঁধে রেখে কি করে সমাজকে গড়ে তোলা যায়। শুধু এই কারণেই বাঙালী মেয়েদের ওপর তারা যে প্রভাব বিস্তার করতে পেরেছিলেন আর কেউ তা পারেননি। লিলিয়ান পালিত, রমল সিংহ, রাণী নিরুপমা, সুনীতি দেবী, সুচারু দেবী, মৃণালিনী সেন ও আরো অনেকেই সেদিনকার ধনী সমাজে আলোড়ন জাগিয়েছিলেন, এনেছিলেন নতুন উদ্দীপনার জোয়ার কিন্তু তাদের প্রভাব কি পড়েছিল আমাদের সমাজে? না পড়ার কারণ, তারা ছিলেন আরো অনেক দূরবর্তিনী। বরং প্রভাব ফেলেছিলেন সরল৷ রায়, অবলা বসু, কুমুদিনী খাস্তগির, কাদম্বিনী গাঙ্গুলী, চন্দ্রমুখী বস্তু—দলে দলে মেয়েরা এগিয়ে এসেছিলেন তাঁদের মতো লেখাপড়া শিখতে।

হেমেন্দ্রনাথের পঞ্চম কন্যা শোভনাসুন্দরী। তিনি আবার গান-বাজনার চেয়ে লেখাপড়াতেই বেশি উৎসাহী। ঠাকুরবাড়িতে তখন রসের উংসে ভাটা পড়তে শুরু করেছে, একেবারে শুকিয়ে যায়নি, এমনি সময়ে শোভনা বড় হয়ে উঠলেন আপন মনে। দিদিরা ব্যস্ত গান-বাজনা ছবি আঁকা নতুন রকমের খাবারদাবার তৈরি করতে, ছোট বোনেদেরও হয়ত ওদিকেই বেকি কিন্তু শোভনা স্বপ্ন দেখেন পিসীমার মতো বই লেখার। কি সুন্দর গল্প! কেমন অবলীলায় লেখা! কি করে লেখিকা হওয়া যায়? পড়তে পড়তে শোভনা ভাবেন আর তারই ফাঁকে ইংরেজী শেখার ভিত গাঁথা হয়। হঠাৎ বিয়ে হয়ে গেল নগেন্দ্রনাথ মুখোপাধ্যায়ের সঙ্গে, সুদূর জয়পুরের ইংরেজীর অধ্যাপক। বাড়ি হাওড়ায়। চার ভাইয়ের বড় ভাই রায়বাহাদুর। নগেন্দ্রনাথ মেজ। সেজ ভাই যোগেন্দ্রনাথের সঙ্গে বিয়ে হয়েছিল শোভনার সপ্তম বোন সুষমার। বিয়ের পর শোভনা গেলেন স্বামীর কর্মক্ষেত্রে। এক হিসেবে হয়ত ভালই হল। কলকাতার মেয়েরা তখন। এগিয়ে চলেছেন জোর কদমে। দুর্গামোহন দাসের মেয়েরা উঠে পড়ে লেগেছেন লোককল্যাণের কাজে। সরলা স্থাপন করেছেন গোখেল মেমোরিয়াল, অবলা খুলেছেন ব্রাহ্ম-বালিকা বিদ্যালয়। ঠাকুরবাড়ির মেয়েরা সমাজের মধ্যমণি। প্রতিভা, প্রজ্ঞা, ইন্দিরা তো আছেনই আরো আছেন হিরন্ময়ী ও সরলা। আছেন মহারাণী সুনীতি, মণিকা, সুচারু, এসেছেন হেমলতা, প্রিয়ংবদা আরো কতজন। এঁদের মধ্যে নতুন কিছু করার কথা ভাবতেই পারতেন না শোভনা। তাই অনেক দূরে, নিভৃতে সম্পূর্ণ স্বতন্ত্র পরিবেশে গিয়ে শোভনা সংগ্রহ করে আনলেন ডালি ভর্তি মরুকুসুম, সেই সঙ্গে তার লেখার হাতটি গেল খুলে। চোখ পড়ল এমন সব জিনিষের ওপর যাদের সবাই দেখেছে অথচ কেউ লেখেনি তাদের ওপর।

পত্নীপ্রেমিক নগেন্দ্রনাথ উৎসাহ দিলেন। তার মধ্যেও একটি কবিমন লুকিয়ে ছিল। মাইকেলের অনুসরণে তিনি লিখেছিলেন যক্ষাঙ্গনা কাব্য। তার আরো অনেক লেখা পাণ্ডুলিপি আকারে রয়েছে—কৃষ্ণা, মেনকানন্দিনী কাব্য, স্বর্গোদ্ধার কাব্য এবং সোনার ঢেউ নামে গল্পগুচ্ছ। কিন্তু সেসব এমন কিছু উল্লেখযোগ্য হয়ে ওঠেনি, তার চেয়ে শোভনার কৃতিত্ব অনেক বেশি। কি লিখবেন তিনি? স্বর্ণকুমারীর মতো গল্প? না না, সে যেন অসম্ভব। তার চেয়ে—তার চেয়ে হারিয়ে যাওয়া-লুকিয়ে থাকা উপকথা-রূপকথাগুলোকে সংগ্রহ করলে কেমন হয়? ঠাকুরবাড়ির মেয়ে, গ্রাম বাংলার সঙ্গে-লোকগাথার সঙ্গে পরিচয় কম। তার চেয়ে বরং জয়পুরের গল্প সংগ্রহ করা যাক। আর এমনি করেই শোভন সত্যিকারের পথ খুঁজে পেলেন। পুণ্য পত্রিকায় ছাপা হল ভিন্ন স্বাদের, ভিন্ন পরিবেশের কয়েকটা গল্প—ফুলাদ ডালিমকুমারী, গঙ্গাদেব, লুব্ধবণিক তেজারাম, দিলীপ ও ভীমরাজ, লক্ষটাকার এক কথা। সবই জয়পুরী গল্পের ছায়ায় লেখা। প্রথমটা মনে হল, স্বর্ণকুমারীর মতোই শোভন টডের রাজস্থান থেকে গল্প সংগ্রহ করেছেন। আসলে কিন্তু তা নয়। শোভনা মন দিয়েছিলেন উপকথা সংগ্রহে। পরে তিনি জয়পুরী প্রবাদ বা কছাবৎও সংগ্রহ করেন। সেই সঙ্গে মন দিলেন শিল্প ও সাহিত্য সম্পর্কেও। লেখার জন্যে লোকসাহিত্য থেকে উপকরণ নির্বাচন যে অত্যন্ত সুষ্ঠু ও মনোজ্ঞ হয়েছে তাতে সন্দেহ নেই। তখনকার তুলনায় তার আগ্রহ বেশ নতুন ধরনের বলা বাহুল্য। কোন মহিলা তখনও লোককথা সংগ্রহ করবার জন্যে বেরিয়ে পড়েননি তবে রূপকথা সংগ্রহের কাজে হাত দিয়েছিলেন মৃণালিনী। সব কাজে অগ্রণী ঠাকুরবাড়ির মেয়ে শোভনাই বা পিছিয়ে থাকবেন কেন? লোককথার সরণি বেয়েই তিনি পৌঁছলেন প্রাচীন ভারতের পৌরাণিক সাহিত্যের জগতে।

জয়পুরী উপকথা সংগ্রহের সঙ্গে সঙ্গে শোভনা সংগ্রহ করেছিলেন কহাবৎ বা জয়পুরী প্রবাদ। ১৯০০/১৯০১ সালে প্রবাদ সংগ্রহের দিকে অনেকেই নজর দিয়েছেন। রেভারেণ্ড লঙ এবং আরো কয়েকজন তখন বাংলা প্রবাদ সংগ্রহ করেছিলেন। তবে ভিন্ন প্রদেশের প্রবাদ সংগ্রহ করে তার অর্থ উদ্ধার, অনুবাদ এবং বাংলায় সমার্থক প্রবাদ অনুসন্ধান করে শেভিনা সত্যিই একটা নতুনত্ব আনার চেষ্টা করেন। এইসব কহাবং-এ জয়পুর বা রাজস্থানবাসীর বিশ্বাস, শ্রদ্ধা, ব্যঙ্গপ্রবণতা ও এ অঞ্চলের কিছু কিছু স্থানীয় বৈশিষ্ট্য ধরা পড়েছে। আজকের দিনে অর্থাৎ শোভনার কহাবৎ সংগ্রহের প্রায় আশি বছর পরেও এই ধরনের প্রবাদ সংগ্রাহকের সংখ্যা খুবই কম। এবার কয়েকটা কহাবং শোনা যাক :

মূল : কাল কী জয়োড়ী গধেড়ী, পরসো কী গীত গাবে

অনুবাদ : কাল জন্মেছে গাধা, পরশুর গীত গাচ্ছে।

অর্থ : গর্দভ জন্মগ্রহণ করিয়াই পূর্বজন্মের অভ্যাসবশতঃ অমঙ্গল ডাক ডাকিতে থাকে।

বঙ্গীয় প্রবচন : রাসভবিনিন্দিত স্বর

***

মূল : জয়পুর কী কমাই ভাড়া বলিতা খাই

অনুবাদ : জয়পুরের উপার্জন ভাড়া ও ঘুটেতে ব্যয় হয়

অর্থ : জয়পুরে ঘর ভাড়া ও রন্ধনকাষ্ঠের মূল্য বেশি

***

মূল : সীতলা কুনসা ঘোড়া দে, আপ হী গধা চড়ে

অনুবাদ : শীতলা ঘোড়া কোথা থেকে দেবে, আপনিই গাধ চড়ে

অর্থ : নিজেই পায় না পরকে দেবে।

***

জয়পুরের উপকথা-রূপকথা-প্রবাদ-প্রবচন ছাড়াও শোভনাকে আকৃষ্ট করেছিল জয়পুরী শিল্প-একেবারে ঘরোয়া শিল্প। ছেড়া কাগজ দিয়ে তৈরি ধামা, চুপড়ী, থালা, বাটি, খেলনা, পুতুলকে ওখানে বলা হয় ডোমলা শিল্প। পুণ্যর পাঠিকাদের তিনি ডোমলার কাজও শিখিয়েছিলেন। কিন্তু এগুলি সবই উপক্রমণিকা, এরপর শোভনা নামলেন তার আসল কাজে।

বাংলা ভাষা ছেড়ে তিনি ইংরেজীতে লিখতে শুরু করলেন ভারতের বেদপুরাণ-ইতিহাস-লোককথার গল্প। ব্যাপারটা খুলেই বলা যাক। শোভনা মনে করতেন গল্প লেখার ইচ্ছে থাকলেও তার কল্পনার দৌড় খুব নয়, কাজেই সৃজনশীল রচনার চেয়ে অনুবাদেই তার হাত খুলবে বেশি। তাই প্রথমে তিনি সাহস করে অনুবাদ করে ফেললেন স্বর্ণকুমারীর জনপ্রিয় উপন্যাস কাহাকে। ইংরেজী অনুবাদের নাম টু হুম। খুব যে ভাল হল তা নয়। অনুবাদকের তো কোন স্বাধীনতা নেই। স্বর্ণকুমারী নিজে যখন কাহাকের অনুবাদ করলেন এ্যান অ্যাফিনিস্ট সঙ নামে তখন সে অনুবাদ হয়ে উঠল নতুন বই। যাইহোক, একই সঙ্গে শোভনা অনুবাদ শুরু করেছিলেন পুরনো দিনের গল্পের। এই ধরনের চারটি বই ছাপা হয়েছিল লণ্ডনের ম্যাকমিলান কোম্পানী থেকে।

প্রথম বই ইনডিয়ান্ নেচার মীথস। শোভনা লিখলেন ছোটদের মনের মতো ইংরেজীতে! ছোটদের মানে এই নয় যে রসরর্জিত নীতিসারসংগ্রহ আসলে ইংরেজী ভাষাটা লিখলেন সহজবোধ্য ও সবার উপভোগ্য করে। রামায়ণ, মহাভারত, পুরাণ, বেদ, উপনিষদ এবং লোককথা থেকে পঞ্চাশটি গল্প সংগ্রহ করে শোভনা লিখেছেন নেচার মীথ্‌স্—অধিকাংশই সৃষ্টিতত্ত্বের দিকে তাকিয়ে লেখা। যেমন, দি অরিজিন অব তুলসী প্ল্যান্ট, দি অরিজিন অব ডেথ, দি অরিজিন অব ভলকানে, দি অরিজিন অব টোবাকো প্ল্যান্ট ইত্যাদি।

ইনডিয়ান ফেবস্ এ্যাও ফোকলোর একই জাতের গ্রন্থ। শোভনা এ বইয়ের গল্প সংগ্রহ করেছেন মহাকাব্য, পুরাণ, কথাসরিৎসাগর, পঞ্চতন্ত্র ও ভক্তমাল থেকে। সবশুদ্ধ গল্প আছে উনত্রিশটা। তার মধ্যে মীরাজ, ব্রাইডগ্রম (ভক্তমাল), এ র‍্যাট স্বয়ম্বর (পঞ্চতন্ত্র, একলব্য এণ্ড দ্রোণ (মহাভারত), কাউ অব প্লেন্টি (রামায়ণ) নিশ্চয় বিদেশী পাঠকদের বিস্মিত করেছিল। প্রায় প্রতিটা গল্পেই শোভনা বিস্ময়ের সঙ্গে আনন্দের খোরাক জুগিয়ে গিয়েছেন।

আর দি ওরিয়েন্ট পার্লস রূপকথা সংকলন। শোভনা জয়পুরী উপকথা সংগ্রহ দিয়ে যে সাহিত্য-জীবন শুরু করেছিলেন এখানেও তারই জের চলেছে। এবং এই চারটি বইয়েই ইতিহাস পুরাণ লোককথা সংগ্রহে অসামান্য প্রতিভার পরিচয় দিয়েছেন। তবু সংস্কৃত সাহিত্য থেকে পৌরাণিক গল্প সংগ্রহ আর বাংলাদেশের লোকের মুখে মুখে ছড়ানো রূপকথা সংগ্রহ অন্য জিনিষ। শোভন। এ সব গল্প সংগ্রহ করেন এক অন্ধ ভৃত্যের কাছ থেকে। তিনি এই রূপকথাসংগ্রহ যদি বাংলাতেও লিখতেন তাও অমূল্য সম্পদ হয়ে থাকত। সেকালে ইংরেজীতে বই লেখার চল্ মেয়েদের মধ্যে ছিল। কনভেন্টে পড়া, বিদেশিনী গভর্নেসের কাছে মানুষ হওয়া মেয়েরা য়ুরোপীয় ভাবাপন্ন হবেন এ আর বেশি কথা কি? তারকনাথ পালিতের মেয়ে লিলিয়ান, লর্ড সিনহার মেয়ে রমলা কিংবা কুচবিহারের তিন রাজকুমারী সুকৃতি, প্রতিভা ও সুধীরার কথাই ধরা যাক না কেন, তাদের চালচলনে সেদিন বিদেশিয়ানাই স্পষ্ট হয়ে উঠেছিল। এঁরা লেখিকা হলে মনের কথা ইংরেজীতেই প্রকাশ করতেন তাতে সন্দেহ নেই। হেমেন্দ্রনাথের আট মেয়ে এবং ইন্দিরাও অভ্যস্ত ছিলেন বিদেশী চালচলনে। সুতরাং শোভনার পক্ষে ইংরেজীতে বই লেখা খুবই স্বাভাবিক। যেমন ইংরেজীতে কবিতা লিখেছিলেন তরু দত্ত কিংবা সরোজিনী নাইডু। সরোজিনী শোভনার সমবয়সী কিন্তু শোভনার চেয়ে অনেক বেশি পরিচিত, বিশেষ করে রাজনীতিক্ষেত্রে সরোজিনীর ভূমিকা অবিস্মরণীয়। তার কবিতার বই তিনটি— দি গোল্ডেন থেসোল্ড, দি বার্ড অব টাইম, ও দি ব্রোকেন উইঙ খুব জনপ্রিয়। হয়েছিল। ১৯০৫ থেকে ১৯২০ এই পনেরো বছরে গোল্ডেন থেসোরে পুনর্মুদ্রণ হয়েছিল সাত-আট বার। শোভনা এভাবে খ্যাতির চূড়া স্পর্শ করেননি, হয়ত সে ক্ষমতা তার ছিল না। কিন্তু যেটুকু তিনি দিয়েছেন তারই বা মূল্য কম কী? একেবারে প্রথম থেকে ১৯২৫ সাল পর্যন্ত যে সব ভারতীয় রূপকথা সংগ্রহ প্রকাশিত হয়েছে তার মধ্যে দি ওরিয়েন্ট পার্ল-এর স্থান বেশ ওপরে। বাঙালী মেয়েদের মধ্যে শোভনাই সবার পূর্ববর্তিনী। আরো আট বছর পরে ১৯২৩ সালে মহারাণী সুনীতি দেবীর ইনডিয়ান্ ফেয়ারি টে লণ্ডন থেকে প্রকাশিত হয়।

শোভনার পূর্ববর্তী রূপকথা সংগ্রাহকের সংখ্যা যে খুব বেশি তা নয়। তাদের নাম—লালবিহারী দে ফোক টেল অব বেঙ্গল (১৮৮৩), রামসত্য মুখোপাধ্যায় ইনডিয়ান ফোকলোর (১৯০৪), কাশীনাথ বন্দ্যোপাধ্যায় পপুলার টেস্ অব বেঙ্গল (১৯০৫), দক্ষিণারঞ্জন মিত্র মজুমদার ঠাকুরমার ঝুলি (১৯০৭), উপেন্দ্রকিশোর রায়চৌধুরী টুনটুনির বই (১৯১০), ম্যাক কুলক বেঙ্গলি হাউসহোল্ড টেস্ (১৯১২), ডি. এন. নিয়োগী টেস্ সেক্রেড এ্যাণ্ড সেকুলার (১৯১২ }। এর পরেই প্রকাশিত হয় শোভনার দি ওরিয়েন্ট পার্লস্ (১৯১৫)।

শোভনার বইয়ে রূপকথা আছে আঠাশটি। সব গল্পই শুরু হয়েছে (Once upon a time বলে রূপকথার আমেজে। যে সব গল্প আছে তার মধ্যে আমাদের পরিচিত ও অপরিচিত উভয় ধরনের রূপকথাই পাওয়া যাবে। দি ওয়াক্স প্রিন্স, দি গোল্ডেন প্যারট, দি হারমিট ক্যাট, এ নোজ ফর নোজ, আঙ্কল টাইগার, দি ব্রাইড অব দি সোর্ড সকলের খুব ভাল লাগবে। তবে এসব রূপকথা যে বিদেশীদের একেবারে অপরিচিত তা হয়ত নয়, কারণ বিভিন্ন দেশের রূপকথার মধ্যে গল্পের অদৃশ্য যোগ চিরকালই ছিল।

আপাতভাবে স্বল্প পরিচিত টেলস্ অব দি গডস্ অব ইনডিয়াতেও নতুনত্ব আছে। এখানে দেবতাদের গল্প নির্বাচন করা হয়েছে ভিন্ন ধরনের দৃষ্টিভঙ্গি নিয়ে। ইদানীংকালে বাংলায় প্রেমকথা নাম দিয়ে কয়েকটি পৌরাণিক প্রেমকাহিনী সিরিজ প্রকাশ করা হয়েছে, যেমন-ভারত প্রেম কথা, রামায়ণী প্রেমকথা, গ্রীক প্রেমকথা, অরণ্য প্রেমকথা, বাইবেল প্রেমকথা ইত্যাদি। এই লেখকদের অনেকেই হয়ত জানেন না তাদের অনেক আগে রামায়ণমহাভারত-বেদ-পুরাণ থেকে যুগল প্রেমের উৎস সন্ধান করেছিলেন শোভন। ভারতের দেবদেবী সংক্রান্ত বইটির জন্যে শোভনা সংগ্রহ করেছেন তিরিশটি গল্প। তিনি কোথা থেকে কোন গল্প নিয়েছেন তার উংস নির্দেশ করতেও ভোলেননি। নাম নির্বাচনও সুন্দর। ঋগ্বেদ থেকে তিনি নিয়েছেন পাচটি গল্প–দ্য ও পৃথিবী, যম ও যমী, ঋভুভ্রাতৃদ্বয় ও উষা, অশ্বিনীকুমারদ্বয় ও সূর্যা এবং বিবস্বান ও সরণু। মহাভারত থেকে সংগ্রহ করেছেন আরো চোদ্দটি গল্প। সে গুলি আমাদের খুবই পরিচিত, যেমন, পুরুরবা ও উর্বশী, সংবরণ ও তপতী, রুরু ও প্রমঘরা, সোম ও তারা, বশিষ্ঠ ও অরুন্ধতী, ইন্দ্র ও শচী, সাবিত্রী ও সত্যবান, বিষ্ণু ও লক্ষ্মী, শিব ও সতী, মদন ও রতি, অর্জুন ও উলু সী, ভীম ও তার রাক্ষসী বধূ, বলরাম ও রেবতী, দময়ন্তী ও তার দেব পাণিপ্রার্থী। রামায়ণ থেকে নেওয়া হয়েছে রাম ও সীতার গল্প, এবং অগ্নি ও স্বাহার গল্প। শতপথ ব্রাহ্মণ থেকে নেওয়া হয়েছে চ্যবন ও সুকন্যা এবং মিত্র, বরুণ ও অসির আখ্যান! কালিদাসের কাব্য থেকে শোভনা নিয়েছেন কুমারসম্ভব, অভিজ্ঞান শকুন্তলম্ এবং মেঘদূতের গল্প। যম ও বিজয়ার কথা নেওয়া হয়েছে ভবিষ্যপুরাণ থেকে এবং বেহুলা ও লখীন্দরের কাহিনী মনসামঙ্গল থেকে তিনি সংগ্রহ করেন। কোন কোন গল্প দু-তিনটে বইয়ে আছে বলে তিনি তাদেরও উল্লেখ করেছেন, যেমন বিষ্ণু ও লক্ষ্মী আছে মহাভারত ও বিষ্ণুপুরাণে, আবার শিব ও সতী আছে মহাভারত ও ভাগবতপুরাণে। গল্প নির্বাচনে এবং তার উৎস নির্দেশে শোভনার এই সাবধানতা বিস্ময়কর। পরবর্তীকালে এই বইটি যতই দুষ্প্রাপ্য হয়ে উঠেছে এই জাতীয় গল্পের চাহিদাও ততই বেড়েছে।

শুধু ইংরেজী বই লেখা নিয়েই ভুলে থাকেননি শোভন। শেষজীবনে আবার বাংলা রচনায় হাত দিয়েছিলেন য়ুরোপ ভ্রমণ সেরে ফিরে আসার পরে। তাঁর কয়েকটি ভ্রমণবৃত্তান্ত য়ুরোপে মহাসমরের পরে, লগুনে, রণক্ষেত্রে বঙ্গমছিলা ও মহাযুদ্ধের পর প্যারী নগরীতে নামে বিভিন্ন পত্রিকার প্রকাশিত হয়। তাছাড়া তিনি মেতে উঠেছিলেন স্কুল নিয়ে। ঠাকুরবাড়ির ছেলেমেয়েদের স্কুল খোলার নেশা এক আশ্চর্য নেশা। সেই নেশা ছিল শোভনারও। তার নিঃসন্তান জীবনের অনেকখানি কেটে যেত হাওড়া গার্লস স্কুলের তত্ত্বাবধানে। স্কুলে তিনি পড়াতেন ইংরেজী। এখনও ঐ স্কুলে তার নামাঙ্কিত একটি রৌপ্যপদক স্কুলের সেরা ছাত্রীকে প্রতিবছর দেওয়া হয়। এ ছাড়াও তিনি খুলেছিলেন একটা ছোট্ট গানের স্কুল। বেশ চলছিল। আকস্মিকভাবে সব শেষ হয়ে গেল। সন্ন্যাস বোগে মৃত্যু হল শোভনার। শোকার্ত পত্নীপ্রেমিক নগেন্দ্রনাথের লেখা একটি শোকগাথা প্রেমাঞ্জলি নামে ছাপা হল, রবীন্দ্রনাথ তার ভূমিকায় লিখেছিলেন একটি ছোট্ট কবিতা শোভনা।

শোভনাসুন্দরী ও সুষমাসুন্দরী—দুটি কর্মব্যস্ত বোনের মাঝখানে একটু ক্ষীণ। যতির মতো ছিলেন সুনৃতা। হেমেন্দ্রনাথের মেয়েদের মধ্যে সবচেয়ে অপরিচিত। তাঁর জীবনদীপও নিভেছিল অভিজ্ঞার মতো নিতান্ত অসময়ে। তবে অভিজ্ঞার মতো ভাগ্যবতী নন তিনি! মৃত্যুর পরেও অভিজ্ঞ বেঁচে ছিলেন সবার স্মৃতিতে, সুনৃতাকে তার নিকট আত্মীয়রাও মনে রাখেনি। হয়ত দীর্ঘদিন বেঁচে থাকলে তিনিও কোন কোন ক্ষেত্রে প্রতিভার পরিচয় দিতে পারতেন। এখন তার সম্বন্ধে প্রায় কিছুই জানা যায় না। তার স্বামী নন্দলাল ঘোষাল ছিলেন বারুইপুরের প্রসিদ্ধ ঘোষাল পরিবারের সন্তান। পরে অবস্থা বিপর্যয়ে তাদের চলে যেতে হয় শ্যামনগরে। সুনৃতার সঙ্গে বাপের বাড়ির যোগ ছিন্ন হয় দারিদ্র্য ও দূরত্বে। তবে সুন্বত এখনও বেঁচে আছেন পুণ্য পত্রিকার পুরনো ফাইলে। আছেন নন্দলালও। তারা দুজনেই সাহিত্যানুরাগী এবং পুণ্যর লেখক-লেখিকা ছিলেন। তাঁদের প্রাকৃবিবাহপর্বে পূর্বরাগ-অনুরাগ ছিল কিনা জানা যায়নি। অবশ্য সুনৃতার মন ছিল প্রজ্ঞার মতো গৃহিনীপণার। তার ইচ্ছে ছিল পুণ্যর মাধ্যমে পাঠিকাদের ঘরে ঘরে পৌঁছে দেবেন নানারকম মুখরোচক আচার। আমের আচার, কুলের আচার, তেঁতুলের আচার প্রভৃতির প্রস্তুত প্রণালী প্রকাশ করতেন সুনৃতা। সাহিত্য জগতে তার ভীরুকুষ্ঠিত প্রবেশ একটিমাত্র রচনা নিয়ে ব্রহ্মে শূলীনাথ। বর্ষায় শূলীনাথ শিব খুব বেশি পরিচিত নন। তথাগত মন্দিরের প্রাধান্যের মধ্যে শূলীনাথ কোন রকমে নিজের অস্তিত্বটুকু বাঁচিয়ে রেখেছেন। সুন্বত তার খবর পেলেন কি করে? বৌদ্ধ-প্যাগোডার বদলে পুরনো মন্দিরের প্রতি আগ্রহ দেখে মনে হয় তিনি ঝুকেছিলেন মন্দির-শিল্প ও তার বৈশিষ্ট্যের দিকে। কিন্তু একটির বেশি প্রবন্ধ লেখা হয়ে ওঠেনি।
সুনৃতার ছোট বোন সুষমার মন প্রথম থেকেই বিদ্রোহী। তাঁর দিদিরা সবাই লরেটোতে পড়লেও সুষমা বাড়িতেই লেখাপড়া শিখতেন, সেই সঙ্গে স্বপ্ন দেখতেন সব বন্ধন ছিঁড়ে এগিয়ে যাবার। অগ্রগতির পথে প্রথম বাধা বিবাহ। সুতরাং সুষমা ঠিক করলেন বিয়ের বিরুদ্ধে বিদ্রোহ করবেন। কিন্তু ঠাকুরবাড়ির ট্র্যাডিশন আর মায়ের দৃঢ়তা ষোড়শী সুষমাকে নতুন পথে এগিয়ে যেতে বাধা দিল। নতুন ভাবে পথ দেখালেও ঠাকুরবাড়ির মেয়েরা কেউই পরিণয়ে প্রগতি দেখাতে পারেননি। প্রেম ভালবাসার ক্ষেত্রেও নতুন দৃষ্টিভঙ্গির পরিচয় দিয়েছেন কি? মনে পড়ে না। সুষমার বান্ধবী প্রথম মহিলা ঈশান স্কলার লিলিয়ান পালিত প্রথম বিবাহ বিচ্ছেদের মামলা এনে চাঞ্চল্য সৃষ্টি করেন। তাঁর স্বামী। ছিলেন ব্যারিস্টার শিশির মল্লিক। বিবাহ বিচ্ছেদের পরে তিনি দ্বিতীয়বার বিবাহ করেন ভাগলপুরের জমিদার দীপনারায়ণ সিংকে। কেশব সেনের নাতনীরাও কম যান না। কুচবিহারের রাজকন্যা প্রতিভা ও সুধীর বিয়ে করেছিলেন জন ম্যাণ্ডার ও হেনরি ম্যাণ্ডারকে। সে নিয়েও কি কম হৈচৈ হয়েছে? কিংবা হরিপ্রভা তাকেদা? বুলবুল সোপ ফ্যাক্টরীর ওয়েমন তাকেদার সঙ্গে তার বিয়ে হয় ১৯০৭ সালে। ১৯১২ সালে জাপানী স্বামীর সঙ্গে চলে গেলেন জাপানে। আত্মীয়দের আপত্তি ও অনিচ্ছা অগ্রাহ্য করে। সেদিন সবাই চমকে উঠেছিল। কত আগ্রহ নিয়ে যে বাঙালীরা হরিপ্রভার লেখা বঙ্গ মহিলার জাপান যাত্রা পড়েছে তার তুলনা হয় না। তুলনায় ঠাকুরবাড়ির অনেক মেয়েই বেশ প্রাচীনপন্থী এমনকি ভিন্ন প্রদেশের বরের সঙ্গে বিয়ে হলেও বেশির ভাগ ক্ষেত্রেই তাতে পূর্বরাগের ছিটে-ফোঁটা থাকত না।

সুষমার বিয়ে হয়েছিল গতানুগতিকভাবে যোগেন্দ্রনাথের সঙ্গে। বুধবার ১৯০৫ সালের ৭ই মার্চ। সুষমা তখন সবে টি-নিটি কলেজ থেকে পিয়ানোর পরীক্ষায় ফাস্ট হয়েছেন। য়ুরোপীয় ছাত্রীরাও পিয়ানোয় সুষমার কাছে হার মেনেছিলেন। কিন্তু গান-বাজনা বা সাহিত্য বা রান্নাঘর দিদিদের বাঁধাধর গতের কোনটার মধ্যেই সুষমা নিজেকে বেঁধে রাখেননি। তিনি সব কিছু শিখে তারপর এগিয়ে যেতে চেয়েছেন নারী প্রগতির বন্ধুর পথে। পায়ে বেড়ি পড়ত। যোগেন্দ্রনাথ ব্যারিস্টার কিন্তু তার মন ছিল অন্য দিকে। তিনি ভালবাসতেন অঙ্ক কষতে। তার মডার্ণ এরিথমেটিক খুব জনপ্রিয় স্কুলপাঠ্য অঙ্কের বই। স্ত্রীর প্রগতির পথে কোন বাধা দেবার প্রশ্নই ওঠে না। তবু সুষমা যেন শান্তি পান না। এগিয়ে যাবার মতো একটা পথ! একটা পথের খবর কি কেউ দিতে পারবে না? চিন্তায় ঘুম আসে না। মনের মধ্যে গুমরে ওঠে বোবা কান্না!

অবশেষে পথের সন্ধান পেলেন সুষমা। কোথা থেকে হাতের কাছে এসে পড়ল অঙ্কল টমস কেবিন বইটা। পাতার পর পাতা এগিয়ে যেতে চোখের পাতা ভিজে ওঠে। এই বইয়ের লেখক কে? হারিয়েট বিচার স্টো? তিনি একজন মহিলা। আচ্ছা তার কি ঘর-সংসার নেই। তবু কি করে তিনি এমন বই লেখেন? সুষমা মাদাম স্টোর জীবনচরিত পড়তে বসেন আগ্রহ নিয়ে। অসীম আগ্রহ! অবশেষে একটা তৃপ্তির আমেজ নেমে আসে। হ্যাঁ, এই তো। এই তো পথের সন্ধান পাওয়া গেছে। হারিয়েট যদি পেরে থাকেন সুষমাই বা পারবেন না কেন?

সুষমা মন দিলেন নারী জাগরণের দিকে। প্রথমেই তিনি স্থির করলেন মেয়েরা জাগো বা মেয়েদের জাগাতে হবে এসব ধুয়ে না ধরে তাদের সামনে কতকগুলো উদাহরণ তুলে ধরবেন। যারা নিজের পায়ে দাঁড়িয়েছেন তাদের যদি চোখের সামনে রাখা যায় তবে সবার পক্ষেই দাঁড়ানো সম্ভব। তার মনের দ্বিধা দ্বন্দ্ব যিনি ঘুচিয়েছিলেন সেই মাদাম স্টোর কথাই সবার আগে লিখলেন সুষমা। সমসাময়িক বিচারে সেটা বেশ নতুনও বটে। এর আগে বাঙালীরা কেউ খ্যাতনাম্নী মহিলাদের জীবনী লেখায় তেমন আগ্রহ দেখাননি। আর সেরকম মেয়েই বা তখন কোথায়? আজ আমরা যাদের মহিয়সী বা প্রগতিশীল বলে থাকি সমসাময়িককালে তো সেভাবে বিচার করা সম্ভব ছিল না। তবে ভক্তিমতী মহিলাদের নিয়ে কিছু লেখা হয়েছিল। তাই সুষমা শুরু করলেন বিদেশিনীদের নিয়ে। ইচ্ছে ছিল বাংলায় বিদেশিনীদের কথা বলে ভারতীয়দের নিয়ে লিখবেন ইংরেজীতে। একে একে পুণ্যে ছাপা হল হারিয়েট বিচার স্টো, হারিয়েট মার্টিনো, মাদাম দ্য স্টেল, সুইডিস গায়িকা লিণ্ডের জীবনী। এসব জীবনী সংগ্রহ করে সুষমা দেখাতে চেয়েছিলেন সাহিত্যিক, সামাজিক, রাজনৈতিক এবং সাঙ্গীতিক ক্ষেত্রে নারীর চরম সাফল্য। নিজের দেশের ললনাদের চোখ ফোঁটানোর জন্যে তো বটেই, সেইসঙ্গে সুষমা কলম ধরেছিলেন তাদের জন্যেও যাহারা বলেন যে স্ত্রীলোকদিগের বুদ্ধি পরিচালনা দ্বারা কোন কর্ম করিবার শক্তি নাই, মহিলাগণ কেবল সন্তান পালন করিতেই জানেন। স্বীয় বুদ্ধি বিবেচনা দ্বারা কিছুই করিতে পারেন না। চোখ থাকতেও যারা দেখতে পায় না তাদের চোখে আঙ্গুল দিয়ে দেখিয়ে দেওয়া ছাড়া উপায়ই বা কি?

সুষমার লেখা এসব বাংলা প্রবন্ধ ছাপা হয়েছিল পুণ্য পত্রিকায়। বাংলা ভ্রমণকাহিনী ছাপা হয় তত্ত্ববোধিনী পত্রিকায়। তাঁর কাশ্মীর ভ্রমণকাহিনীতে পথের বর্ণনা ও সৌন্দর্যের চেয়ে বড় হয়ে উঠেছে কাশ্মীরবাসীর জীবনযাত্রা দুঃখদুর্দশার কথা! প্রায় একই সময়ে তিনি ইংরেজীতে লেখা শুরু করেন আইডিয়ান্স অব হিন্দু উওম্যানহুড। ভারতীয় নারীর আদর্শরূপে তিনি বেছে নিয়েছিলেন সতী, সীতা, শৈব্যা, সাবিত্রী, দময়ন্তী ও শকুন্তলাকে। লেখা হয়েছিল তবে ছাপা হয়নি। আজও পাণ্ডুলিপি আকারেই জীর্ণ খাতাটি পড়ে আছে, তাঁর নাতিদের কাছে। নারী নির্বাচনেও তিনি সনাতন দৃষ্টিভঙ্গিরই পরিচয় দিয়েছেন। ত্যাগ-তিতিক্ষা ও দাম্পত্য প্রেমে যারা উজ্জ্বল সেইসব নারীদের আত্মমর্যাদা ও সমবোধ তাকে আকৃষ্ট করেছিল।

সুষমার প্রকৃত পরিচয় পাওয়া গেল আরো কিছুদিন পরে। ১৯২৭ সালে সাতটি সন্তানের জননী ও গৃহবধূ হয়েও যখন তিনি নারীপ্রগতি ও শিক্ষাধারার সঙ্গে পরিচিত হবার জন্যে যাত্রা করলেন আমেরিকা যুক্তরাষ্ট্রে। এর প্রায় পঞ্চাশ বছর আগে জ্ঞানদানন্দিনীও একা গিয়েছিলেন ইংলণ্ডে। সে যাত্রাও ছিল দুঃসাহসিক তবে তার সঙ্গে সুষমার যাত্রার তুলনা হয় না। সুষমা গিয়েছেন বিজয়িনী বেশে এবং গিয়েছেন বক্তৃতা দিতে। না, না, সর্বপ্রথম ভারতীয় বক্তা নন সুষমা। তার আগে মোহিনীমোহন চট্টোপাধ্যায়, প্রতাপ মজুমদার, স্বামী বিবেকানন্দ ও রবীন্দ্রনাথ আমেরিকায় অসামান্য কৃতিত্বের পরিচয় রেখে এসেছেন। শুধু পুরুষেরা নয়, ভারতীয় নারী রমাবাঈও গিয়েছেন আমেরিকায়। এঁদের পরে সুষমা। তবু Hindi Poet and Philosopher রবীন্দ্রনাথের ভাইঝিকে নিয়ে সাড়া পড়ে গেল যুক্তরাষ্ট্রে। হা, রবীন্দ্রনাথকে যুক্তরাষ্ট্রের খবরের কাগজ কবি ও দার্শনিক রূপেই ব্যাখ্যা করেছে এবং সেই সঙ্গে সব সময় যোগ করা হত হিন্দু শব্দটি। সুতরাং Niece of Tagore সবার মনেই প্রচণ্ড আগ্রহ ও উৎসাহ জাগালেন।

কেন সুষমা বিদেশ সফরে গিয়েছিলেন? বেড়াতে? উহুঁ, বেড়াতে নয়। সুষমার দিদি মনীষা ও শোভনা হয়ত বেড়াতেই গিয়েছিলেন, বেড়িয়ে-টেড়িয়ে ফিরে এসেছেন সেযুগের অনেক শিক্ষিত এবং প্রগতিশীল। মেয়ের মতো। কিন্তু সুষমার কথা স্বতন্ত্র। ছোটবেলার সেই না-মেটা সাধ সার্থক করতে হবে না? ঘরে-বাইরে সমানভাবে কাজ করবার জন্যে তৈরি হলেন সুষমা। ছেলেমেয়েরা সবাই বড় হতে, বাইরের জগতের দিকে একটু তাকাবার সুযোগ পেলেন এতদিনে। প্রথমে একটা ছোটখাট স্কুল খুলে ফেললেন ১৯২২ সালে। একেবারেই মেয়েদের জন্যে। নাম বালিকা শিক্ষা সংঘ। স্কুল খোলার পর সুষমা বুঝতে পারলেন ভারতে অশিক্ষিতার সংখ্যা কত বেশি। এতদিন তিনি চিনতেন শিক্ষিত সমাজকে। এবার দেখলেন দেশের শতকরা নিরানব্বই জন মেয়েই নিরক্ষর। তাই তো প্রথম এম-এ পাশ চন্দ্রমুখী বসু এবং প্রথম ডাক্তার কাদম্বিনী গঙ্গোপাধ্যায়কে দেখবার জন্যে ভিড় জমে যেত। জমবে না কেন? শিক্ষিতা মেয়ে কই, সে তো গোনাগুন্‌তি কয়েকটা পরিবারে। অথচ তখন বিদুষীর সংখ্যা বাংলা দেশে মোটেই কম নয়। চন্দ্রমুখী-কাদম্বিনীর যুগ অনেকদিন কেটে গেছে। অধলা দাসের মাদ্রাজে মেডিকেল পড়তে যাওয়ও পুরনো খবর। বিধুমুখী বসু ও ভার্জিনিয়া মিত্রও কলকাতায় মেডিকেল কলেজে পড়েছেন। ভার্জিনিয়া সমস্ত ছাত্রছাত্রীর। মধ্যে প্রথম স্থান পেলেন (১৮৮৮)। তথন তটিনী গুপ্তও (দাস) সম্মিলিত বাংলা-বিহার-উড়িষ্যার ম্যাট্রিক পরীক্ষায় প্রথম হয়েছেন, লিলিয়ান হয়েছেন ঈশান স্কলার, হিন্দু ঘরের বিধবা সরলাল মিত্র শিক্ষণশিক্ষার জন্যে বৃত্তি নিয়ে গেছেন ইংলণ্ডে। হরিপ্রভা গেছেন জাপানে। রাজনীতি ক্ষেত্রে আগ্নেয়াস্ত্র হাতে নিয়ে এগিয়ে আসছেন প্রীতিলতা ওহদেদার, কল্পনা দত্ত কিংবা বীণা দাসের মতো সাহসী মেয়েরা। পুলিশের অমানুষিক অত্যাচার সহ্য করেও দেশের জন্যে হাসিমুখে কারাবরণ করেছেন ননীবালা ও দুকড়িবালা। সুতরাং আপাতদৃষ্টিতে তো চোখ ধাঁধিয়ে যাওয়ারই কথা। সুষমার দিদিরাও শিক্ষিতা। ইন্দিরা আর সরলা। রীতিমতো অনার্স গ্র্যাজুয়েট। সুতরাং স্কুল খোলার আগে সুষমা বুঝতেই পারেননি নিরক্ষর মেয়েদের সংখ্যা কত বেশি। শুধু স্কুল নয়, এসময় সুষমা জড়িয়ে পড়েন উইমেন এডুকেশনাল সোসাইটি অব ইনডিয়ার সঙ্গে। এই সোসাইটির প্রেসিডেন্ট হয়ে তিনি অশিক্ষিত মেয়েদের জন্য আরো বেশি ভাবনা-চিন্তা করার সুযোগ পেলেন।

প্রথমেই সুষমার চোখ পড়ল যুক্তরাষ্ট্রের দিকে। প্রথম বিশ্বযুদ্ধের পর স্বাভাবিকভাবেই নিঃস্ব ক্ষতবিক্ষত য়ুরোপের চেয়ে আমেরিকা যুক্তরাষ্ট্রের গুরুত্ব অনেক বেশি। তার ওপর সেখানে গিয়ে স্বামীজী যে উন্নতমনা ও উদারহৃদয় মানুষের সাক্ষাৎ পেয়েছিলেন সেকথাও সবার জানা, বিশেষ করে সুষমার কাকা রবীন্দ্রনাথ সেখানে বক্তৃতা দিয়ে এসেছেন ১৯১৬ সালে। সুতরাং একবার সে দেশের উন্নতি ও নারীপ্রগতির সঙ্গে পরিচিত হয়ে আসার জন্যে সুষমা প্রস্তুত হলেন। সেখানকার মেয়েদের বহুমুখী জীবন-প্রবাহ এদেশের মেয়েদের যদি বিভিন্ন দিক থেকে প্রভাবিত করতে পারে তাহলে তো ভালই হয়। আমেরিকায় সুষমা তার পৈতৃক উপাধিটি ব্যবহার করেছিলেন শুধু সহজে পরিচিত হবার জন্যে।

সুষমার বিদেশ সফর সাড়া জাগিয়েছিল। আমেরিকানদের মনে হয়েছিল এ আবার কি? তাঁরা যখন ভারতীয় মেয়েদের সম্বন্ধে একটা ভাসা ভাসা ধারণা গড়ে নিয়েছেন তখন কোথা থেকে এল এই গ্রহান্তরের মানবী? হিন্দু কবি ও দার্শনিক রবীন্দ্রনাথ একবার তাঁদের মনকে নাড়া দিয়ে গিয়েছেন। এবার এসেছেন তারই ভাইঝি; ভাইপো হলেও এতে চমকাতেন না আমেরিকার মানুষ। যত না বক্তৃতা শোনার জন্যে হোক ভারতীয়াকে একবার চোখে দেখবার জন্যে সবাই মনে মনে উৎসুক হয়ে উঠলেন।

সুষমা যুক্তরাষ্ট্রে পৌঁছলেন ১৯২৭ সালের ফেব্রুয়ারী মাসে। আমেরিকার নরনারী অবাক হয়ে দেখলে লুচিস্মিত-লাবণ্যে পূর্ণতঃ এক গরিয়সী তেজস্বিনীকে। যেন দীপ্ত অগ্নিশিখা। বক্তার দিকে শ্রোতারা চেয়ে থাকতেন মুগ্ধ হয়ে। ঘনপক্ষ্ম কৃষ্ণভ্রমর বিশাল দুটি চোখ তুলে তিনি সহজ স্বচ্ছন ভঙ্গিতে উঠে দাঁড়াতেন মঞ্চের ওপর। বিদেশীদের চোখে পড়ত a sari of purple silk with sleeves of green embroidered in gold, আপনিই বুঝি উত্তেজনায় ঝিমঝিম করে উঠত নীল রক্ত। বিস্ময় ঝরে পড়ত কলমের মুখে:

Miss Tagore is a charming bit of the Orient in an occidental settiug. Short of stature, quiet and demure, with lazy dark eyes that can flash fire when the occasion arises, it takes the native garb of India to really do justice to her Hindu beauty.

এরপর যখন নিখুঁত উচ্চারণে মিষ্টি অথচ তীক্ষ্ণ কণ্ঠে সুষমা বক্তৃতা শুরু করলেন তখন উল্লাসের হিল্লোল বয়ে গেল শ্রোতাদের মধ্যে। এত সুন্দর, স্পষ্ট উচ্চারণ, এত নিপুণ, নিখুঁত? উচ্চারণ বিভ্রাটের জন্যে অধিকাংশ ভারতীয়ই বিদেশীদের মনে ছাপ ফেলতে পারে না। সুষমা ভঁর আকর্ষণীয় ব্যক্তিত্বের ছোঁয়া মেশালেন কঠে। বিদেশী সাংবাদিকরা লিখলেন :

She speaks softly, with never a trace of bitterness of the lot of her people, and her expression never changes, except when her deep dark eyes seem to sinile. আসলে সুষমার চোখ দুটি আকর্ষণ করেছিল বিদেশীদের। অনেকেই লিখেছেন :

Her eyes are very large, and very black. ডেলি টেক্সাসের সাংবাদিক সুষমার বক্তৃতার প্রশংসা করে শেষে তো বলেই। ফেললেন :

Not only is Miss Tagore ably qualified to discuss this subject (The Ideals of India) through extensive study and experience, but she is also capable of preseuting it iu clear and forceful English, which none of the people of India can do.

আমেরিকাবাসিনীদেরও নতুন লেগেছিল সুষমাকে। তাঁরা যখন শুনলেন সুষমা লম্বা চুল কাটতে রাজী নন বরং দীর্ঘ কেশকেই নারীর সৌন্দর্য মনে করেন তখন যেন চমকে উঠলেন। বিস্ময় চরমে উঠল সুষমা রুজ লিপস্টিক ব্যবহার করেন না শুনে; এমন কি তিনি ধূমপান করতেও রাজী নন। কেননা, এ সবই সুষমার কাছে most unladylike। প্রশ্নের পর প্রশ্ন ছুটে এল। সব উত্তরই তিনি দিলেন হাসিমুখে। হ্যাঁ, তিনি মনে করেন বৈকি, শিক্ষার প্রয়োজন আছে। এখানকার শিক্ষাপদ্ধতি দেখতেই তো এসেছেন। তবে তার মতে ভারতীয় মেয়েদের বিবাহিত জীবনের জন্যেই শিক্ষা দেওয়া উচিত : কারণ ভাল স্ত্রী ও ভাল মা হবার শিক্ষাই তাদের জীবনের শ্রেষ্ঠ শিক্ষা। অর্থাৎ প্রথম জীবনে বিবাহ সম্বন্ধে তাঁর মনে যত বীতরাগই জমে থাকুক না কেন, পরবর্তী জীবনে তিনি সনাতন ভারতীয় রীতিকেই সত্য বলে গ্রহণ করেছিলেন। বিশ্বের নানাবিধ সমস্যার সমাধান সম্পর্কে তিনি তার নিজস্ব অভিমত জানিয়েছিলেন আমেরিকার মেয়েদের :

When women are united as wives, mothers and daughters they have more influence on man than has man on woman. If we would only remember that we are all children of one God, our women united would establish world peace.

তিনি আরো বলেন :

The supreme, traditional virtutes of the Hindu woman are fidelity, sincerity and self sacrificing love. A wife subordinates her wishes to those of her husband.

সুষমার মতে :

Real satisfaction lies in control and self restraint. Let us enjoy the inaterial side of life, but not lose ourselves in its glamour.

এসব বক্তৃতার কথা প্রকাশিত হয়েছিল আমেরিকার বিখ্যাত কাগজের পাতায় পাতায়। কিন্তু তার এসব বক্তৃতার প্রতিলিপি ভারতের কোথাও পাওয়া যায় না। আর একটু শোনা যাক সুষমার কথা। পশ্চিমের বিবাহ প্রথার প্রতি তার কোন শ্রদ্ধা ছিল না। নিউইয়র্কের একটা হলে, তিনি রক্তলাল শাড়ি পরে দৃপ্ত ভঙ্গিতে উঠে দাঁড়িয়ে সন্ধ্যাতারার মতো দুটি উজ্জ্বল চোখ তুলে যখন বললেন :

Your idea of marriage, companionate marriage and love seems very strange to us. Your divorces startle us. We believe in the holiness of marriage, considering it a sacred and divine union of two souls. Our marriages are regarded as permanent; separation or divorce unspeakable, we stay married.

গুঞ্জন উঠল, সে কী! এতদিন যে আমরা শুনেছি ভারতে মেয়েরা পুরুষের হাতের খেলার পুতুল! আর তাদের সম্মান? সে তো নেই বললেই চলে। এ কথাই তো আমরা জেনেছি। বিদেশিনীদের কথায় হাসি পায় সুষমার। বলেন, আমাদের দেশের মেয়েরা অনেক বেশি প্রভাবশালিনী। তারা সৃষ্টির কাজে ঈশ্বরকে সাহায্য করে। তোমাদের কাছে ভগবান পিতা কিন্তু ভারতে আমরা তাকে বলি মা। আর অত দূরে যাবার দরকার কি, সুষমা প্রশ্ন করেন তাদের, এই যে আমি এত দূরে এসেছি, বাড়ি থেকে চোদ্দ হাজার মাইল দূরে, স্বামীর ওপর প্রভাব বিস্তার করবার ক্ষমতা না থাকলে পারতুম কি?

আমেরিকায় সুষমা যে সব বক্তৃতা দিয়েছিলেন তার মধ্যে ভারতের নারী, নারী শিক্ষা, ভারতের আদর্শ, ভারতের দর্শন, বিশ্বভগ্নীত্ববোব (Universal Sisterhood), রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর, মহাত্মা গান্ধীর দর্শন ও বৈদিক সঙ্গীত খুন জনপ্রিয় হয়। বার বার নানান জায়গা থেকে তার ডাক আসে। শেষদিকে আরো দুটো বক্তৃতা দিয়েছিলেন মাই পিল গ্রীমেজ টু আমেরিকা ও এ্যাডভানটেজ এ্যাণ্ড ডিজএ্যাডভানটেজ অব ইণ্টার ম্যারেজ বিটুইন ইন্দো-এরিয়ানস এ্যাণ্ড ইউরো-এরিয়া। প্রায় দু বছর ধরে বিদেশ সফর করে ঘরে ফিরে আসেন। সুষমা ১৯২৯ সালের জুলাই মাসে। সঙ্গে নিয়ে আসেন শিক্ষণ ব্যবস্থার রীতিপদ্ধতি, মূল্যবান অভিজ্ঞতা ও দুর্লভ সম্মান। যুক্তরাষ্ট্রের আটত্রিশটি জায়গায় সুষমা বক্তৃতা দিয়েছিলেন। তার মূল উদ্দেশ্য ছিল অবশ্য শিক্ষা তাই তাকে ওয়াল্ড ফেডারেশন অব ন্যাশনাল এডুকেশনের কনফারেন্সেও ভারতের প্রতিনিধিত্ব করতে দেখা গেছে। তিনি সব সময় বলেছেন শিক্ষার মতো প্রয়োজনী আর কিছুই নয়, The general education for the masses is more important than any kind of agitation for political clauge. তাই কাকা রবীন্দ্রনাথের মতোই তিনিও গান্ধীজীর অসহযোগ আন্দোলনকে সমর্থন করতে পারেননি। বলেছেন, A word such as non-co-operation is meaningless to the great majority in India, education being permanet and political condition transitory.

ভারতবর্ষে ফিরে এসে সুষমা তাঁর বিপুল অভিজ্ঞতাকে খুব বেশি কাজে লাগাতে পারলেন না কারণ তার স্বামী ও এক কন্যার আকস্মিক মৃত্যু এবং দুই পুত্রের সন্ন্যাস গ্রহণ তাকে জটিল সমস্যার মুখোমুখি করে দিল। অবশ্য ভেঙে পড়েননি সুষমা। শিক্ষা এবং স্কুল সম্বন্ধে তাঁর দৃষ্টিভঙ্গির কথা ছাপা হল সংবাদপত্রে। জনশিক্ষা বিস্তারের জন্যে তার চিন্তা এবং পরিকল্পনা সত্যিই অভিনন্দনযোগ্য। তার পরিকল্পনার প্রধান তিনটি পদক্ষেপ হল :

১. ভারতের বিভিন্ন প্রদেশ থেকে অন্তত ২০ জন সদস্য নিয়ে ভারতের গ্রাম নিরক্ষরতা দূরীকরণ সমিতি নামে একটা সংঘ প্রতিষ্ঠা করা হবে।

২. প্রত্যেক প্রদেশে একটা করে প্রাদেশিক কমিটি প্রতিষ্ঠা করা হবে।

৩. যেখানে যেখানে ইউনিশ্লন বোর্ড আছে এবং সেই বোর্ডের অধীনে যত গ্রাম আছে, তাদের প্রত্যেক গ্রামের এক একজন প্রতিনিধি নিয়ে প্রাদেশিক কমিটি খুলবে গ্রাম্য শিক্ষা কমিটি। এছাড়া গ্রামের ছেলেমেয়েরা স্কুলে পড়তে আসছে কিনা সেটা দেখার ভার থাকবে গ্রাম্য শিক্ষা কমিটির ওপর। স্থানীয় চাঁদায় পাঠশালার জিনিষপত্র কেনা হবে, ক্লাস হবে খোলা হাওয়ায়, গাছের নীচে। আর যদি স্বতঃপ্রবৃত্ত শিক্ষক না পাওয়া যায় তাহলে তাকে সামান্য পারিশ্রমিক অর্থাৎ নগদে না হোক চাল ডাল জিনিষপত্র দিতে হবে। প্রত্যেক জমিদারকে দিতে হবে পাঁচ বিঘা জমি আর প্রত্যেক প্রদেশের জন্যে দরকার হবে পাঁচ থেকে দশ হাজার টাকা।

মনে রাখতে হবে, সুষমা যখনকার কথা ভেবেছেন তখন ভারতের শাসক বিদেশী। সুতরাং সরকারী সাহায্যের কথা তিনি ভাবেননি। তার এই পরিকল্পনার মধ্যে পল্লীচিন্তা এবং শিক্ষাবিস্তারের বাস্তবানুগ ধারণার ছাপ স্পষ্ট। এখনকার দিনে বয়স্ক শিক্ষার প্রসারের কথাও ভাবা হচ্ছে। গ্রামের মধ্যে থেকেই এ ধরনের কমিটি গড়ে উঠলে শিক্ষার প্রসার আরও সহজ হবে বলেই মনে হয়। এর পরেও সুষমা দীর্ঘদিন ছিলেন। ইদানীংকালে আমেরিকায় নারীমুক্তি আন্দোলনের ঝড় তুলেছিলেন বেটি ফ্রিডান, গ্লোরিয়া স্টেনেম ও কেটি মিলেট— কিন্তু বৃদ্ধ বয়সে সুষমা আর নারীমুক্তি নিয়ে চিন্তা করেননি। কেউ তার মতামতও জানতে চাননি। অথচ এ সময় তিনি প্রবন্ধ লিখেছেন, বক্তৃতা দিয়েছেন, স্কুলে পড়িয়েছেন কিন্তু সবই নীরবে প্রায় নিভৃতে। দুঃখের বিষয় এই যে, আন্তর্জাতিক নারীবর্ষেও সুষমা রয়ে গেলেন সবার অলক্ষ্যে।

সুষমা সম্বন্ধে আর একটি কথা বলে আমরা প্রসঙ্গান্তরে যাব। তাঁর লেখা একটি প্রবন্ধ আমেরিকায় বেদান্ত ধর্মের প্রভাব ও সমাদর। প্রবন্ধটি তৎকালীন কোন কাগজে ছাপা হয়নি বলে পাণ্ডুলিপি আকারেই পড়ে আছে। খানিকটা বাদ দিয়ে ১৩৩৬ সালের জ্যৈষ্ঠ সংখ্যা চতুরঙ্গে ছাপা হলেও আমাদেয় কৌতূহল উদ্রেক করে সুষমার মূল রচনাটি। কারণ এতে সুষমা স্বামী বিবেকানন্দ সম্পর্কিত কিছু খবর দিয়েছেন। যদিও এ খবর আমাদের অজানা নয়, তবু ঠাকুরবাড়ির একটি মেয়ে আমেরিকায় গিয়ে স্বামীজীর সংবাদ সংগ্রহ করতে আগ্রহী হয়েছিলেন জেনে ভাল লাগে বৈকি। রামকৃষ্ণ মিশন এবং সন্ন্যাসীদের প্রতি সুষমার শ্রদ্ধা ছিল। তার জ্যেষ্ঠ পুত্রও রামকৃষ্ণ মিশন থেকে সন্ন্যাস গ্রহণ করেন। সুষমার সঙ্গে আমেরিকায় স্বামী অভেদানন্দ, স্বামী পরমানন্দ, ভগিনী দেবমাতা ও ভগিনী দয়ার সঙ্গে সাক্ষাৎ পরিচয় হয়। যাইহোক, ভারতবর্ষে কিছু স্বার্থান্বেষী মানুষ স্বামীজীর আমেরিকাবাস ও ভ্রমণ সম্পর্কে নানারকম কুৎসা রটাচ্ছিলেন। দু একটি সংবাদপত্রও এ ব্যাপারে উৎসাহী হয়ে ওঠে। ব্রিটিশ সাম্রাজ্যবাদীরা ইন্সে করেই এ সব কুৎসাকে প্রশ্রয় দিতে থাকলেও খবরের কাগজের এসব সংবাদ অধিকাংশ ভারতবাসীকে সেদিন মর্মাহত করেছিল। দুঃখ পেয়েছিলেন সুষমা। তাই আমেরিকায় গিয়ে তিনি এই পৃতচরিত্র সন্ন্যাসীর মিথ্যা দুর্নাম সম্বন্ধে বহু খোঁজ করেন। সুষমার অনুসন্ধান ব্যর্থ হয়নি। আমেরিকার বিভিন্ন মানুষ বিশেষ করে মহিলারা জানান স্বামীজীর নামে যা কিছু রটানো হয়েছে সবই মিথ্যা, এমনকি তার পেছনে তদানীন্তন সরকারেরও চক্রান্ত রয়েছে। স্বামীজীর প্রতি সুষমার শ্রদ্ধা এবং তার এই অনুসন্ধান স্পৃহা আমাদের মুগ্ধ করে।

আট বোনের মধ্যে সবার ছোট বোন সুদক্ষিণা। পোষাকী নাম পূর্ণিমা। জন্মের পরই বাবাকে হারিয়ে সুদক্ষিণা বড় হয়েছিলেন দাদা-দিদিদের আদর যত্নে। বাপের বাড়িতে যতদিন ছিলেন ততদিন তাকে চেনাই যায়নি। চাঁদের ষোলকলার মতো যখন তার রূপ আর অভিমান দুকূল ছাপিয়ে বন্যার মতো ছড়িয়ে পড়ল তখন যেন সবার চোখ খুলল। তাই তো! এ যে রাজরাজড়ার ঘরে যাবার উপযুক্ত। সুদক্ষিণা কি শুধু সাধারণ ঘরের শিক্ষিত ছেলের জীবনসঙ্গিনী হবেন, না হতে পারেন? তার জন্যে খুঁজতে হবে মনের মতো বর। অচিরেই পাওয়া গেল। বুধাওনের অধিবাসী হরদৈ জেলার জমিদার পণ্ডিত আলাপ্রসাদ পাণ্ডে। শোনা যায়, জমিদার হওয়া সত্ত্বেও তিনি নাকি ছিলেন। আই-সি-এস অফিসার। হিন্দুস্থানী কেতায় পালকি চেপে উত্তরপ্রদেশে স্বামীর ঘর করতে চলে গেলেন সুদক্ষিণা। ঠাকুরবাড়ির একটি স্ফুলিঙ্গ গিয়ে পড়ল অনেক দূরে। তারপর দাবানলে যখন পরিণত হলেন তখন জলপ্রসাদ পরলোকে।

সুদক্ষিণার কার্যক্ষেত্র উত্তরপ্রদেশের হরদৈ-বুধওন-শাজাহানপুরে, তাই বাংলা দেশে তিনি একরকম অপরিচিত। আমরা সুনৃতার মতো তাকেও পাই পুণ্য পত্রিকার পাতায়। রান্নার লক্ষ্মৌ প্রণালী লিখতেন তিনি। প্রজ্ঞার মতো হয়ত তাঁরও রান্নার হাতটি ভাল ছিল কিংবা বাপের বাড়ির দেশের লোকের মুখে শ্বশুরবাড়ির দেশের সুখাদ্য তুলে দেবার স্বাভাবিক ইচ্ছেয় তিনি কলম ধরেছিলেন। নয়ত রান্নাঘরের ঘোমটা-ঢাকা বৌটির ভূমিকায় তাকে মানায় না।

জ্বালা প্রসাদ সস্নেহে স্ত্রীকে জমিদারী পরিচালনা শিখিয়েছিলেন। তার কাছে সুদক্ষিণা শিখেছিলেন ঘোড়ায় চড়া ও বন্দুক ছোঁড়া। অর্থাৎ উগ্র আধুনিকারা সেকালে যা যা শিখতেন সে সবই শিখেছিলেন তিনি। ইংরেজী বলতেন মেম সাহেবের মতো। স্বামীর মৃত্যুর পরে ঘোড়া ছুটিয়ে তিনি গ্রামেগ্রামান্তরে গিয়ে নিজের জমিদারী দেখে আসতেন। বিধবা হয়েছিলেন মাত্র সাতাশ বছর বয়সে। কার্বাঞ্চল হয়ে হঠাৎ জলাপ্রসাদের মৃত্যু হয়। সবাই ভেবেছিল স্বদেশ থেকে এতদূরে অল্পবয়স্ক। নিঃসন্তান বিধবা-বিরাট জমিদারীটা এবার লাটে উঠতে দেরি হবে না। সাহেব-মহলেও আলোড়ন জাগেনি তা নয়। বিপুল সম্পত্তির অধিকারিণী, রূপসী বিধবা, ভরা যৌবন—কিন্তু হতাশ হতে হল সবাইকে। শোনা যায়, একজন ইংরেজ উচ্চপদস্থ কর্মচারী নাকি পাণিপ্রার্থনা করেছিলেন সুদক্ষিণার। দোষ ছিল না তাতে। কিন্তু সুদক্ষিণা কর্ণপাত করেননি। তবে এ সবই শোনা কথা। নিশ্চিত কি ঘটেছিল তা জানাবার মতো কেউ আর ইহজগতে নেই। অবশ্য এসব কথাকে অবিশ্বাস করারও কোন কারণ নেই। সুদক্ষিণা ছিলেন সত্যিকারের দোর্দণ্ডপ্রতাপান্বিত জমিদারের দোর্দণ্ডপ্রতাপান্বিতা পত্নী। তার প্রতাপে ইংরেজ অফিসাররাও তটস্থ হয়ে থাকতেন।

সুদক্ষিণা ইংরেজ কর্মচারীদের ওপর এত প্রতাপ দেখাতেন কি করে? কেন ভয় পেতেন না কাউকে? শোনা গেছে, জলপ্রসাদের পিতা সিপাহীবিদ্রোহের সময় কয়েকজন ইংরেজকে আশ্রয় দিয়ে সাহায্য করেন, তাই এর পুরস্কাররূপে তিনি লাভ করেন একটা বিশেষ অধিকার। তাঁর জমিদারীকে কোন কারণে নীলামে চড়ান চলবে না। ব্রিটিশ-আইন তাদের প্রতিজ্ঞা রেখেছিল। ফলে সুদক্ষিণা এবং জলাপ্রসাদের শক্তি অনেক বেড়ে যায়। স্বামীর মৃত্যুর পর জমিদারীর ভার হাতে এলেও, সুদক্ষিণা ইংরেজ কর্মচারীদের মনে মনে বেশ অপছন্দ করতেন, যদিও প্রয়োজনে তাদের সঙ্গে যোগ রাখতেন ঠিকই কিন্তু একটু বাড়াবাড়ি বা বেটাল দেখলে, তৎক্ষণাৎ ওপরে নালিশ জানাতেন। তাই ইংরেজ রাজকর্মচারীরা পারতপক্ষে তাকে চটাতেন না।

শোনা গেছে, সুদক্ষিণা তার জমিদারীতে ছিলেন মুকুটহীন রাণী। ব্রিটিশ শাসকেরা তাকে দিয়েছিলেন C. I. E. খেতাব। দিতে চেয়েছেন মহারাণী খেতাব। একবার নয় তিন তিনবার। প্রতিবারই প্রত্যাখ্যান করেন সুদক্ষিণা! কি হবে ওদের দেওয়া খেতাব নিয়ে? কি সম্মান বাড়বে? মাঝ থেকে আমার জমিদারীতে ওদের উৎপাত বাড়বে। তার চেয়ে এসব দরকার নেই। তিনি থাকতেন তার নিজের সন্তানতুল্য প্রজাদের নিয়ে। অন্য গ্রামে বা অন্য জমিদারীতে ডাকাতি হয়, অনাচার হয়। সুদক্ষিণার জমিদারী এসবের ঊর্ধে। প্রজারা কপালে হাত ঠেকিয়ে বলত, রামরাজত্বে বাস করি। তিনি বেছে বেছে কয়েকটা ডাকাতকে নিয়ে তৈরি করেছিলেন ভয়ানক রক্ষীবাহিনী। নিজে ঘোড়ায় চেপে বন্দুক হাতে যেতেন গ্রাম দেখতে। লোকে বলত অভ্রান্ত নিশানা। রাইফেল সুটিংয়ের প্রতিযোগিতায় তিনি ইংরেজ পুরুষ প্রতিযোগীদেরও হারিয়ে দিতেন। এমন রণচণ্ডীর মতো তেজস্বিনী মেয়ে যেন বাংলাদেশেও খুব বেশি নেই। অবশ্য বাঙালী মেয়ের জমিদারী চালনায় চিরকালই দক্ষ। রাণী ভবানী বা রাণী রাসমণির কথা আমরা জানি। তারাও বিচক্ষণতার সঙ্গে জমিদারী চালাতেন। সত্যিকারের রাণী না হলেও প্রজাদের চোখে, শ্রদ্ধায় সম্মানে তিনি রাণীর আসনই পেয়েছিলেন। সুদক্ষিণা জমিদারী পেয়েছিলেন খুব অল্পবয়সে তায় বিদেশে, তবু কোন অসুবিধে হয়নি।

জমিদারী দেখা ছাড়াও সুদক্ষিণা মন দিয়েছিলেন জনকল্যাণে ও লোকসেবায়। তার জন্যে বলাবাহুল্য, পারিবারিক ট্র্যাডিশন অনুযায়ী তিনি একটা স্কুল প্রতিষ্ঠা করলেন উত্তর প্রদেশের অশিক্ষিত ও অনুন্নত মানুষের জন্যে। ঐ সব অঞ্চলে তখন মেয়েরা একেবারে অন্ধকারে বাস করত। সুদক্ষিণা তাদের মধ্যেও শিক্ষাপ্রসারের চেষ্টা শুরু করলেন। তবে অসহযোগ আন্দোলনের সময় যখন আংরেজী হঠাও আন্দোলন শুরু হল তখন সুদক্ষিণা আপত্তি জানালেন। ইংরেজ হঠাও তাতে ক্ষতি নেই কিন্তু ইংরেজী হঠাও কেমন কথা! সে তো একটা দরকারি ভাষা। বিশ্বের শ্রেষ্ঠ সাহিত্যের সঙ্গে পরিচিত হবার সুযোগ করে দিয়েছে সে। প্রচণ্ড প্রতিবাদ জানিয়ে তিনি বললেন যে, ইংরেজী না পড়ানো হলে তার স্কুল তিনি তুলে দেবেন। সাহেবী চালচলনে অভ্যস্ত সুদক্ষিণাকে তাই ভুল বোঝা সম্ভব ছিল। অথচ সমসাময়িক সমস্ত ইংরেজ রাজকর্মচারী জানতেন, সুদক্ষিণার মতো ইংরেজবিদ্বেষী আর দুটি নেই।

আগে বলেছি, সুদক্ষিণার পোষাকী নাম ছিল পূর্ণিমা। এই নামে তিনি একটি গানে সুর দিয়েছিলেন। সেই সুরের নাম দি ইনডিয়ান ভিলেজগার্ল। রেকর্ডে এই অর্কেস্ট্রা বেশ জনপ্রিয় হয়েছিল কিন্তু সুদক্ষিণা এর কৃতিত্ব সবটাই দিতে চাইতেন তার দাদা হিতেন্দ্রনাথকে। সম্ভবত হিতেন্দ্রের নির্দেশেই তিনি এই রেকর্ডটির সুর সৃষ্টি করেন।

মহর্ষির পৌত্রীদের মধ্যে বাকি রইলেন আর তিনজন, রবীন্দ্রনাথের তিন কন্যা। কিন্তু কবির মেয়েদের আগে আরও দুজনের কথা বলে নেওয়া যেতে পারে। এঁরা দুজন আর কেউ নয়, স্বর্ণকুমারীর দুই গুণবতী মেয়ে হিরন্ময়ী ও সরলা। সময়ের দিক থেকে তারা প্রতিভা, ইন্দিরা, সরোজা, প্রজ্ঞাদের সমসাময়িক। আসলে হিরন্ময়ী ও সরলা ঘোষাল বংশের মেয়ে কিন্তু তাদের ঠাকুরবাড়ির মেয়ে হতে তেমন বাধা ছিল না। বরং তাঁরা ঠাকুরবাড়ির মেয়ে হিসেবেই সর্বজনপরিচিত। সেটাই স্বাভাবিক। হিরন্ময়ী ও সরলার শৈশব কেটেছে এই বিশাল মায়াপুরীর সোনালি দিনগুলোতে। স্বর্ণকুমারী থাকতেন তিন তলার এক অংশে। মেয়েরা থাকতেন বাড়ির অন্যান্য মেয়েদের সঙ্গে। পরে স্বর্ণকুমারী ও জানকীনাথ যখন অন্য বাড়িতে গিয়েছেন তখনও তার প্রতিদিন আসতেন ঠাকুরবাড়িতে কিংবা ঠাকুরবাড়ি থেকে কেউ না কেউ যেতেন তাদের বাড়ি। সুতরাং হিরন্ময়ী ও সরলা ঠাকুরবাড়ির অন্দরমহলের সদস্য। রূপেই পরিচিত।

হিরন্ময়ী ছিলেন সব কাজেই মায়ের যথার্থ সঙ্গিনী। ভারতী পত্রিকা সম্পাদনায়, সখিসমিতি পরিচালনায় স্বর্ণকুমারী হিরন্ময়ীর সাহায্য পেয়েছেন সবচেয়ে বেশি। কিন্তু হিরন্ময়ীর হাতে যখন ভারতী সম্পাদনার ভার এল তখন তিনি প্রবাসিনী সরলাকেও সম্পাদনার কাজে টেনে নিলেন। তাই দেখা যাবে হিরন্ময়ীর সব কাজেই জড়িয়ে আছেন সরলা। এমনকি কর্মজীবনের শুরুতেও তারা দুই বোনে মিলে মেয়েদের জন্যে একটা পাঠশালা খুলেছিলেন কাশিয়াবাগানে, তাদের নিজের বাড়িতে। এখনকার বয়স্ক শিক্ষার আদিরূপ বলা যায় সেটাকে। তাদের বাড়ির পুকুরে জল নিতে আসত পাড়ার বৌঝিরা। তাদের মধ্যে থেকে গোটা কুড়ি কুমারী ও বালবিধবা নিয়ে এই স্কুল শুরু হয়েছিল। প্রধান শিক্ষিকা হিরন্ময়ীর তখন বয়স চোদ্দ-পনেরো বছর। সহশিক্ষিকা সরলা। দশে পড়েছেন। দুজনে মিলে ছাত্রীদের শেখাতেন বাংলা, ইংরেজী, গান আর সেলাই। প্রতিদিন বিকেল সাড়ে চারটে থেকে সাড়ে ছটা পর্যন্ত এই স্কুল বস্ত। জোড়াসাঁকো থেকে যারা আসতেন তারা ছাত্রীদের পরীক্ষা নিতেন। পুরস্কার দেওয়া হত। একবার রবীন্দ্রনাথকে দিয়ে প্রাইজ বিতরণ করান হয়।

বিয়ের পরে হিরন্ময়ী তার মায়ের সখিসমিতিকে একটু অদলবদল করে বিধবা শিল্পাশ্রমে পরিণত করেন। সখিসমিতির তখন জীর্ণাবস্থা। ইতিপূর্বে হিরন্ময়ী শশিপদ বন্দ্যোপাধ্যায় প্রতিষ্ঠিত বরানগরের একটি বিধবা শিল্পাশ্রমের সঙ্গে পরিচিত হন। তারপর তিনি সখিসমিতিকেও নতুন আদলে গড়ে তৈরি করলেন বিধবা শিল্পাশ্রম। তাঁর মৃত্যুর পরে এই আশ্রমের নাম হয় হিরন্ময়ী বিধবা শিল্পাশ্রম। মেয়েদের হাতের কাজ, সেলাই প্রভৃতির জন্যে এখান থেকে মেডেল দেওয়া হত। গগনেন্দ্রনাথের ছোট মেয়ে সুজাতাও এখান থেকে মেডেল পেয়েছেন হাতের কাজের জন্যে।

হিরন্ময়ীর সামাজিক কাজকর্মের আড়ালে লুকিয়েছিল একটি শিল্পীসত্তা। বেথুন স্কুল থেকে মাইনর পরীক্ষা পাশের পর হিরন্ময়ী আর স্কুলে পড়েননি তবে সাহিত্যের সঙ্গে তার যোগ ছিল। সখা, বালক ও ভারতীতে তার অনেক লেখা ছাপা হয়। সে সব লেখা আজও পুরনো পত্রিকার পাতাতেই ছড়িয়েছিটিয়ে পড়ে আছে। কেউ সযত্নে সংগ্রহ করে প্রকাশ করার চেষ্টা করেননি। ভারতী সম্পাদনা করবার সময় তিনি একাই সব কিছু দেখাশোনা করতেন। প্রবাসিনী সরল। ছিলেন নামে মাত্র যুগ্ম-সম্পাদিকা। কাজ হিরন্ময়ীকে ই করতে হত। তাঁর নিজের লেখা ভারতীতে আছে বোধহয় চব্বিশটি। তার মধ্যে বেশ কয়েকটি রাশিয়া নিয়ে লেখা। প্রবন্ধগুলি মৌলিক নয়, অনুবাদ-তাহলেও ভাষার ওপর তাঁর দক্ষতা ও বিষয় নির্বাচনের ক্ষমতা প্রশংসার যোগ্য। রুশিয়া, রুশিয়ার কারাগার, রুশিয়ার বাণিজ্য, রুশিয়ার ভাষা ও বাণিজ্য, রুশিয়ার শাসনপ্রণালী বেশ মননধর্মী রচনা।

হিরন্ময়ীর মৌলিক রচনা কয়েকটি সনেট। সরলার ভাষায় বলা যায়, যেমন কারুর কারুর গানের গলা মিষ্ট ও করুণ অথচ সে বড় গাইরে নয় তেমনি হিরন্ময়ীর কবিতাগুলোও করুণ-মধুর। ভারতীর প্রতি ছিল তার আন্তরিক অনুরাগ। তাই তার ভার নিয়েও মনে জমেছিল শংকা। কি জানি কি হয়? তিনি অনেক চেষ্টা করে ভারতীর ভার তুলে দিলেন তার মামা রবীন্দ্রনাথের হাতে। কবি ভার নিয়েছিলেন মাত্র এক বছরের জন্যে। তারপর কি হবে? সে কথাই হিরন্ময়ী প্রকাশ করেছেন একটি সনেটে। তাতে তিনি বলেছেন রবি যদি অস্ত যায় আসে অন্ধকার, তবু রব কাছে, বাস্তবিকই পরম আদরে তিনি রবিহারা ভারতীকে তুলে নিয়েছিলেন বুকে। তাঁর জীবৎকালে ভারতীর সঙ্গে তার বিচ্ছেদ হয়নি। ভারতী যখন বন্ধু হয়ে যায় হিরন্ময়ী তখন পরলোকে। হিরন্ময়ীর সাহিত্যানুরাগ সঞ্চারিত হয়েছে তার বিদুষী কন্যা কল্যাণীর মধ্যেও। নাথকাল্টের ওপর অত্যন্ত মূল্যবান ও পরিশ্রমসাধ্য গবেষণা করে তিনি পি-এইচ. ডি. উপাধি লাভ করেন বেশ কয়েক বছর আগে। তার গবেষণ! গ্রন্থটির নাম নাথসম্প্রদায়ের ইতিহাস দর্শন ও সাধনপ্রণালী।

স্বর্ণকুমারীর মধ্যে যে রাজনৈতিক চেতনা ও দেশভক্তির উন্মেষ দেখা দিয়েছিল। তার পূর্ণ বিকাশ ঘটল তাঁর মেয়ে সরলার মধ্যে। সরলার মতো তেজস্বিনী নারী বিরল-যেন কোষমুক্ত-কৃপাণলতা, বাংলার জোয়ান অব আর্ক, ভারতের প্রথম চারণী। সাহিত্য-সঙ্গীত-স্বাদেশিকতার ত্রিধারাকে তিনি বইয়েছিলেন এক খাতে, তবে আমাদের মনে হয় সঙ্গীত ও সাহিত্য দুই-ই তাঁর স্বদেশচেতনার অনুগামী। সরলার প্রথম জীবন কেটেছিল জোড়াসাঁকোতে আর সব বোনেদের মতোই—শুধু মনে ছিল একটা চাপ বেদনা। লেখাপড়ায় মগ্ন মা তাঁকে ভালবাসেন না। বাসেন না কি আর? তবে বহিঃপ্রকাশটা বড় কম। সেকেলে অভিজাত পরিবারের এই তো দস্তুর! একান্নবর্তী বিশাল পরিবার। সেখানে মা কেন মেতে থাকবেন নিজের ছেলেমেয়েদের নিয়ে? তাদের জন্যে তে দেখাশোনা করবার জন্যে ঝি আছে। ঠাকুরবাড়ির ছোট ছেলেমেয়েদের জন্যে এক বা একাধিক খাস চাকর বা খাস ঝি থাকত। ছেলেদের জন্যে চাকর, মেয়েদের ঝি আর দুগ্ধপোষ্যদের জন্যে দুধ মা-এর নড়চড় হত না। সব দেখে মনে হয় সেকালের বড়লোকদের বাড়িতে শিশুরাই ছিল সবচেয়ে অসহায়। অবশ্য সরলা দেখতেন তার মা-মাসীরা নিজেদের সন্তানদের সম্বন্ধে যতটা উদাসীন ছিলেন মামীরা অর্থাৎ ঠাকুরবাড়ির বৌয়েরা তা ছিলেন না। তারা বাইরে থেকে আসতেন ভিন্ন পারিবারিক ধারা নিয়ে, সন্তানদের টেনে নিতেন বুকে। বিশেষ করে জ্ঞানদানন্দিনী, তিনি তার ছেলেমেয়েদের খুব ভালবাসতেন, তাদের ঘটা করে জন্মদিন হত। তাদের জন্যে দুধ মা বা খাস ঝি-চাকর থাকলেও মাতৃস্নেহে ভঁটা পড়ত না। দুঃখ শুধু সরলার। ক্ষুব্ধ অভিমানে ছোট্ট বুকটা ভরে উঠত।

হয়ত মায়ের উদাসীনতা অভিমানী মেয়ের বুকে একটা চাপা দীর্ঘশ্বাস সৃষ্টি করেছিল, তাই সরলা মন দিয়েছিলেন লেখাপড়ার দিকে। মাত্র তেরো বছর বয়সে বেথুন থেকে এনট্রান্স পাশ করে সরলা বোধহয় প্রথম সবার চোখে পড়লেন, এমনকি মায়েরও। চোখে পড়ার কারণও ছিল। এনট্রান্স পরীক্ষার সময়, ইতিহাসের প্রশ্নের মধ্যে মেকলের লেখা লর্ড ক্লাইভ গ্রন্থের ওপর ভিত্তি করে ক্লাইভের বঙ্গবিজয় সম্বন্ধে একটা প্রশ্ন করা হয়েছিল। সরল মেকলের আঁকা বাঙালী চরিত্রের হেয় তার প্রতিবাদ করে নিজেই বিপরীত মন্তব্যপূর্ণ উত্তর এমন যুক্তি তেজ ও আন্তরিকতার সঙ্গে তুলে ধরেছিলেন যে, পরীক্ষক এন. ঘোষ এই ছাত্রীকে সর্বাধিক নম্বর দিয়ে, খোঁজ করেছিলেন মেয়েটি কে? ইতিহাসের পরীক্ষায় সরলাই সেবার প্রথম হয়েছিলেন। সবাই দেখলেন সরলা রাতারাতি বড় হয়ে উঠেছেন। তাই তো! কখন বড় হয়ে উঠল সরলা? রূপের প্রতিযোগিতায় পিছিয়ে থাকা সরলা এগিয়ে গেলেন সবার আগে। ঠাকুরবাড়িতে এর আগে কোনো মেয়ে পরীক্ষায় বসেনি। শুধু এনট্রান্স নয়, সরলা এরপর পাশ করলেন বি. এ. (১৮৯০)। সতেরো বছর বয়সে। বেথুন কলেজ থেকে ইংরেজীতে অনার্স নিয়ে। ইন্দিরা তখনও পরীক্ষা দেননি। সরলা সবচেয়ে বেশি নম্বর পেয়ে কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে পান পদ্মাবতী স্বর্ণপদক। তিনিই এ মেডেল প্রথম পান। সংখ্যার দিক থেকে তিনি ছিলেন সপ্তম মহিলা গ্র্যাজুয়েট। এরপর তিনি ভেবেছিলেন সংস্কৃতে এম. এ. পড়বেন, নানা কারণে পরীক্ষা দেওয়া হয়নি। বিষয় নির্বাচনের বৈশিষ্ট্য থেকেই সরলার খেয়ালখুশি ও জেদের পরিচয় পাওয়া যায়। বি. এ. পড়বার আগে তিনি স্কুলে পড়েছিলেন সায়েন্স। সে সময় মেয়েদের সায়েন্স পড়ার সুযোগ ছিল না তাই সরলা জেদ করে দাদাদের সঙ্গে ডাক্তার মহেন্দ্রনাথ সরকারের সায়েন্স এ্যাসোসিয়েশনের সান্ধ্য-লেকচারে যাবার অনুমতি নিলেন। সেখানে সরলা একমাত্র ছাত্রী, তাই তিনি বসে থাকতেন অধ্যাপকদের ঘরে! তাঁরা ক্লাসে এলে সরলাও আসতেন। দুপাশে দুই দাদা—জ্যোৎস্নানাথ ও সুধীন্দ্রনাথ। তিনটে স্বতন্ত্র চেয়ার থাকত সামনের লাইনে, সেখানে বসতেন দুপাশে দুই দাদাকে নিয়ে সরলা আর বাকী ছাত্ররা বসত বেঞ্চে। আড়ালে ফিসফিস করে দুই দাদাকে দেখিয়ে ছেলেরা বলত বডি গার্ডস। কিন্তু এত কাঠ-খড় পুড়িয়ে যে সায়েন্স পড়া, সেই সায়েন্সের ওপর কোনো আকর্ষণই ছিল সরলার। থাকলে তিনি কাদম্বিনী গাঙ্গুলী বা অবলা বসুর মত চিকিৎসক হতে চাইতেন। কিংবা বিধুমুখী বসু ও ভার্জিনিয়া মিত্রের মতো। মনে রাখতেন ঐ মহিলাদের অবিস্মরণীয় ডাক্তারী পড়ার কাহিনীকে। কাদম্বিনীকে দেখে মনে হয় কোন বাধাই বুঝি বাধা নয়। অবলাও কম যান না, তিনি মাদ্রাজে গিয়েও ডাক্তারী পড়তে রাজী হয়েছিলেন। এমনকি স্বর্ণকুমারীর মতো বিজ্ঞানমনস্কতা থাকলেও সরলা বিজ্ঞানচর্চায় অনেক উন্নতি করতে পারতেন। কিন্তু ঠাকুরবাড়ির কোনো মেয়েই বিজ্ঞান-সচেতনতার পরিচয় দিতে পারেননি। পরবর্তী যুগেও তারা শুধু চর্চা করেছেন সাহিত্য ও শিল্পকলার। আর সরলার আগ্রহ ছিল অন্য দিকে তাই তিনি বিচিত্র বিষয় নিয়ে অধ্যয়ন করেছেন, হয়ত খুজেছেন ঈপ্সিত পথ।

শুধু লেখাপড়া নয়, গানেও সরলার আগ্রহ কম ছিল না। ছোটবেলা থেকেই তিনি বাংলা গানে ইংরেজী কর্ড ব্যবহার করে ইংরেজী piece রচনা করতে পারতেন। রবীন্দ্রনাথের কয়েকটা গানের স্বরলিপি তৈরি করা ছাড়াও তিনি কয়েকটা গানকে য়ুরোপান্বিত করলে কবি খুব খুশি হয়ে ওঠেন। সকাতরে ঐ কঁদিছে গানটিকে সরলা যখন রীতিমতো একটা ইংরেজী বাজনার piece-এ পরিণত করলেন তখন সেটা পুরোদস্তুর ব্যাণ্ডে পিয়ানোতে বাজাবার যোগ্য হল। উৎসাহিত হয়ে রবীন্দ্রনাথ তাকে বললেন নিঝরের স্বপ্নভঙ্গের পিয়ানো সংগত তৈরি করতে। সেও হল। সরলার তখন বয়স মাত্র বারো। কবি তাকে জন্মদিনে উপহার দিলেন একটা য়ুরোপীয় গান লেখার খাতা। দিয়ে বললেন, এইতে লিখে রাখ, ভুলে যাবি।

সরলার সঙ্গীতচর্চা মহর্ষিরও দৃষ্টি আকর্ষণ করেছিল। তিনি তাকে হাফিজের একটি কবিতায় সুর বসাতে দিলেন। এক সপ্তাহ পরে সরলা বেহালা বাজিয়ে গেয়ে শোনালেন হাফিজ। দেবেন্দ্রনাথ মজে মজে শুনলেন। খুব ভাল গান না হলে তিনি শুনতে চাইতেন না। বাড়ির লোকদের মধ্যে তিনি ভালবাসতেন রবীন্দ্রনাথের গান আর প্রতিভার পিয়ানো বাজানো শুনতে। যাইহোক, সরলার গান শুনে শুধু খুশিই হলেন না, গায়িকাকে উপহার দেবার ব্যবস্থাও করলেন। এল হাজার টাকা দামের হীরে-চুনি সেট করা জড়োয় নেকলেস। ঘরোয়া সভায় নেকলেসটি সরলার হাতে তুলে দিয়ে মহর্ষি বললেন, তুমি সরস্বতী! তোনার উপযুক্ত না হলেও এই সামান্য ভূষণটি এনেছি তোমার জন্যে।

গান সংগ্রহ ও সুর সংগ্রহ ছিল সরলার নেশার মতো। বাউল গান, আর দক্ষিণ ভারতীয় সঙ্গীতে ভরা একটি গানের ডালি তিনি উপহার দিয়েছিলেন রবীন্দ্রনাথকে। কবি সেই গানকে ভেঙে-ভেঙে অনেক নতুন গান সৃষ্টি করেছেন। ইন্দিরাও এ ঘটনার উল্লেখ করেছেন রবীন্দ্রসঙ্গীতের ত্রিবেণীসঙ্গমে। সরলার আনা সুরে রবীন্দ্রনাথ নিজের কথা বসিয়ে যে গান রচনা করেন সেগুলো হচ্ছে, আনন্দলোকে মঙ্গলালোকে, এসো হে গৃহদেবতা, এ কি লাবণ্যে, চিরবন্ধু চিরনির্ভর ইত্যাদি।

এ তো গেল গানের কথা। অনেকেই জানেন না বন্দেমাতরম্ গানের প্রথম সুর রবীন্দ্রনাথের অনুরোধে সরলাই দিয়েছিলেন। কবি প্রথম দু লাইনের সুর বসান। সরলা নিজেও গান লিখতেন এবং সেইসব দেশাত্মবোধক গান প্রচুর উন্মাদনা সৃষ্টি করত। কিন্তু সে প্রসঙ্গে আমরা পরে যাব। আপাতত সরলার সাহিত্যচর্চার কথা সেরে নিই। এত কাজের ফাঁকে সরলা লিখেছেনও প্রচুর। বারো বছর বয়সেই একটা কবিতা লিখে পুরস্কার পেয়েছিলেন সখা পত্রিকা থেকে। প্রথম প্রবন্ধ পিতামাতার প্রতি কি ব্যবহার করা কর্তব্য। সেই শুরু, তারপর থেকে তো নিয়মিত লিখছেন ভারতীতে। প্রথমবারে যুগ্ম সম্পাদিকা থাকার সময় না হলেও পরে এককভাবে ভারতী সম্পাদনার সময় তিনি লিখতেন। প্রচুর। এ সময় তিনি মহীশূর থেকে ফিরে এসেছেন। বছর কয়েক আগে তিনি এম. এ. পড়া ছেড়ে মহীশূরের মহারাণী পাল স্ স্কুলে চাকরি নিয়ে চলে যান দক্ষিণ। ভারতে। ঠাকুরবাড়িতে এও নতুন ঘটনা। বাইরের অনেকেও সরলার চাকরি করতে যাওয়াটা ভাল চোখে নেয়নি। বঙ্গবাসী কাগজ ফোঁস করে মন্তব্য করল, এ ঘরের মেয়ের একলা একল। বিদেশে চাকরি করতে যাওয়ার দরকারটা কি? খাওয়া-পরার তো অভাব নেই? কেন খামোকা নিজেকে বিপদগ্রস্ত করা? এই ছিল সেকেলে দৃষ্টিভঙ্গির বৈশিষ্ট্য। যেন খাওয়া-পরার প্রয়োজনই সব। এর মেয়েদের এগিয়ে যাওয়াকে চিরকাল সন্দেহের চোখে দেখে এসেছেন। আর ঠাকুরবাড়ির মেয়েদের তো কথাই নেই। তাদের কার্যকলাপ এদের একেবারে ভাল লাগেনি। মনে হয়েছে সব তাতেই বাহাদুরি দেখানোর চেষ্টা! কিন্তু ঠাকুরবাড়ির মেয়েরা এগিয়েছেন প্রাণের দুর্বার আবেগে। বিপদকে তুচ্ছ করেছেন সরলা, তিনি কি ঘরে বসে থাকতে পারেন? আর তিনি তো একলা নন, আরো কত মেয়েই এগিয়ে গেছেন। তিনি যখন মহীশূরে গেলেন। তার আগেই সেখানে গিয়েছেন কুমুদিনী খাস্তগির।

যাইহোক, দেশে ফিরে আবার ভারতী নিয়ে বসলেন সরলা। কাগজে একেবারে বিজ্ঞাপন দিয়ে দিলেন আগামী মাসে শ্ৰীযুক্ত রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর একটি সামাজিক প্রহসন লিখবেন। কাগজ পড়ে তো রবীন্দ্রনাথের চক্ষুস্থির। সে কী! তিনি কিছুই জানেন না আর বিজ্ঞাপন দেওয়া হয়ে গেল! বকতে আরম্ভ করলেন, কেন তুই আমাকে না জানিয়ে বিজ্ঞাপন দিলি? আমি লিখব না। কিন্তু শেষ পর্যন্ত লিখতেই হল। সরলা নতুন সম্পাদিকা, তাকে বিপদে ফেলতে মন চাইল না। লেখা হয়ে গেল চিরকুমারসভা। তবে সরলার এই রকম কাজের জন্যে কিংবা লেখার তাগিদে কবি পরবর্তীকালে বেশ বিরক্ত হয়ে ওঠেন। কিন্তু নিরপেক্ষ বিচারে দেখা যাবে সরলার খুব একটা দোষ ছিল না। সম্পাদিকা হিসেবে সরলা খুবই বিচক্ষণতার পরিচয় দিতেন। লেখকদের পারিশ্রমিক দেবার প্রবর্তন করেন তিনিই। ভারতীকে নানাভাবে তিনি সার্থক করে তুলেছিলেন। বালক, সাধনা, পুণ্যর মতো ভারতী শুধু ঠাকুরবাড়ির কাগজ হয়ে যে। থাকেনি সে কেবল সরলার গুণে। তিনি গুণী লেখকদের খুঁজে বার করতেন এবং সুযোগ দিতেন। একটা উদাহরণ দেওয়া যাক। শরৎচন্দ্র বোধহয় সবে তখন গল্প লেখা শুরু করেছেন। কুণ্ঠা যায়নি। রয়েছেন বর্মায়। সেই সময় তার মামা বড়দিদি গল্পটির পাণ্ডুলিপি দিয়ে এলেন প্রবাসীতে। কিছুদিন পড়ে থাকার পর রামানন্দ চট্টোপাধ্যায় সেটি ফেরৎ দিলেন অমনোনীত রচনা বলে। সুরেন গঙ্গোপাধ্যায় আর কি করেন? তিনি সেটি নিয়ে এলেন ভারতীর অফিসে। সে সময় সরলা পাঞ্জাব থেকে এসেছেন কিছুদিনের জন্যে। ভারতীর সুব্যবস্থা করতে। তাঁকে গল্পটি দেখানো হল। তিনি পড়ে উচ্ছ্বসিত প্রশংসা করে বললেন, চমৎকার! এক কাজ কর, বৈশাখ, জ্যৈষ্ঠ, আষাঢ় তিন মাসে ছাপাও বৈশাখ ও জ্যৈষ্ঠ সংখ্যায় নাম দিও না, সকলে মনে করবে রবীন্দ্রনাথের লেখা। আমাদের দেরির ক্রটি ঘুচবে এবং গ্রাহক-গ্ৰাহিকা বাড়বে। আষাঢ় সংখ্যায় বড়দিদি শেষ হবে, আর সেই সংখ্যায় শরৎচন্দ্র চট্টোপাধ্যায় লেখকের নাম ছাপবে। তাই হল এবং দেখা গেল সরলার সব অনুমানই সত্যি। অনেকে রবীন্দ্রনাথকে গিয়ে প্রশ্ন করলেন বড়দিদির কথা। বিস্মিত রবীন্দ্রনাথ জানালেন লেখক তিনি নন, তবে গল্পটি নিঃসন্দেহে কোন শক্তিশালী লেখকের লেখা। তিনিও কৌতূহলী হয়ে উঠলেন। ঔৎসুক্য প্রকাশ করলেন গগনেন্দ্র অবনীন্দ্র ও আরো অনেকে। নাম না থাকায় বড়দিদি ক্রমশই কৌতূহল বৃদ্ধি করে এবং এরপর শরৎচন্দ্রের প্রতিষ্ঠাও সহজ হয়ে গেল।

শুধু নতুন লেখক আবিষ্কার নয়, সরলা ভারতীকে সমৃদ্ধ করেছিলেন কয়েকজন মনীষীর দুল ভ ইংরেজী রচনার অনুবাদ করিয়ে। এই রচনাগুলি হল?

ক) ভগিনী নিবেদিতার প্রত্যেক মা ছেলের জন্য কি করতে পারে (জ্যৈষ্ঠ ১৩০৬), বঙ্গমাতার কর্তব্য। শ্রাবণ ১৩০৬)

খ) মহাদেব গোবিন্দ রানাডের-পূর্বকালের সমাজ শাসন (শ্রাবণ ১৩০৭)

গ) মোহনদাস করমচঁদ গান্ধীর-দক্ষিণ আফ্রিকার ভারতোপনিবেশ (বৈশাখ ১৩০৯)।

শোনা যায় এই ভারতী সম্পাদনাসূত্রেই সরলার সঙ্গে পরিচয় হয়েছিল সাহিত্যিক প্রভাতকুমার মুখোপাধ্যায়ের। বিপত্নীক, উন্নতরুচি, সাহিত্যপ্রেমিক প্রভাতকুমারের সঙ্গে বোধহয় সরলার বিবাহের কথাবার্তাও হয়েছিল এবং নিজেকে আরো যোগ্য করে তোলার জন্যে প্রভাতকুমার ব্যারিস্টার হবার জন্যে বিলেত যাত্রা করেন। শেষ পর্যন্ত অবশ্য বিয়ে হয়নি। প্রভাতকুমারের গোড়া হিন্দু জননীর প্রবল বিরোধিতায় বিয়ের প্রস্তাব নাকচ হয়ে যার। আরো কয়েকজনের নামও শোনা গেছে সরলার ভাবী বর হিসেবে। তবে মনে হয়, এ সবই অলীক কল্পনা। আমাদের দেশে বয়স্থা অনুঢ়া মেয়েকে নিয়ে জল্পনা করা চিরকেলে স্বভাব। সরলা বহুদিন অবিবাহিত ছিলেন, প্রায় তেত্রিশ বছর। বিয়ের বয়স হিসেবে বয়সটা আজকের যুগেও বেশি। তাই কথা তো উঠবেই। আসলে এ ব্যাপারে প্রথম দিকে সরলার আগ্রহ ছিল না। স্বদেশপ্রেমিকা তেজস্বিনী মেয়েকে দেশের কাজে কুমারী রাখার আগ্রহ ছিল স্বর্ণকুমারীরও। এমনকি মহষি ও প্রস্তাব করেছিলেন সরলার বিয়ে হবে খাপখোলা তলোয়ারের সঙ্গে। ফলে বয়স বাড়ে। শেষে যার সঙ্গে সরলার বিয়ে হল তিনি সত্যিই সরলার যোগ্য স্বামী, পাঞ্জাবের বিপ্লবী নেতা খাপখোলা তলোয়ারের মতো তেজস্বী রামভজ দত্ত চৌধুরী।

ভারতীতে সরলা নিজেও নানারকম রচনা লিখতেন। গান-কবিতা-গল্পউপন্যাস-রম্যরচনা সমালোচনা-অনুবাদ-আর বাকী রইল কী! স্মৃতিকথা? তাঁর শেষ জীবনে লেখা জীবনের ঝরাপাতা একটি অসাধারণ রচনা। সমসাময়িক যুগের দর্পণ বললেও অত্যুক্তি হবে না। এছাড়া তার সংস্কৃত কাব্য আলোচনা করে লেখা কয়েকটা প্রবন্ধ রতিবিলাপ, মালতীমাধব, মালবিকাগ্নিমিত্র, মৃচ্ছকটিক অনেকেরই দৃষ্টি আকর্ষণ করে। সাহিত্যসম্রাট বঙ্কিমচন্দ্ৰ শ্ৰশ মজুমদারকে এই প্রবন্ধগুলো দেখিয়ে বলেছিলেন, লেখিকার বয়স বিবেচনা করিলে বলিতে হয় ও বয়সে আমাদেরও অমন লেখা সহজ হইত না। তাহার সমালোচনা পড়িয়া নাটকগুলি আবার নতুন করিয়া পড়িতেছি। সরলার সব রচনার কোন সংকন আজও প্রকাশিত হয়নি।

মৌলিক রচনার হিসেবে সরলার প্রথম উল্লেখযোগ্য রচনা প্রেমিক সভ লেখকের নামহীন লেখাটি বেশ প্রশংসা পায়। রবীন্দ্রনাথ স্বয়ং অভিনন্দন জানিয়ে ভগ্নীকে লিখলেন, নাম দিসনি বলে তোর এ লেখার ঠিক যাচাই হল। নতুন হাতের লেখার মতো নয়, এ যেন পাকা প্রতিষ্ঠ লোকের লেখা। এ যদি আমারই লেখা লোকে ভাবত, আমি লজ্জিত হতুম না। এর চেয়ে বড় কমপ্লিমেন্ট আর কি হতে পারে? এরপর সরলা বেশ কয়েকটা সুখপাঠ্য গল্প লেখেন।

কিন্তু আগেই বলেছি, সরলার জীবনে সাহিত্য বা সঙ্গীত প্রধান নয়। তার জীবনে সবচেয়ে বড় ছিল তার স্বদেশপ্রেম। সাহিত্য বা সঙ্গীত তাঁকে স্বদেশহিতৈষণার পথে সাহায্য করেছিল কিংবা বলা যায় সরলা তার রাজনৈতিক কাজে এ দুটিকে ঠিকমতো ব্যবহার করতে পেরেছিলেন। ঠাকুরবাড়ির কোন ছেলেও তখন সরলার মতো চরমপন্থী রাজনীতি নিয়ে মেতে ওঠেননি। সৌম্যেন্দ্রনাথ এসেছেন অনেক পরে। সরলার মধ্যে স্বদেশচেতনার আগ্রহ জাগিয়ে দিয়েছিলেন তার বাবা-মা। জানকীনাথ ছিলেন ভারতীয় কংগ্রেসের মেরুদণ্ড। স্বর্ণকুমারী প্রথমে হিন্দুমেলায় যোগ দিয়ে মেয়েদের মধ্যে সর্বপ্রথম স্বদেশিয়ানার সুচনা করেন। তার সখিসমিতি, শিল্পমেলার মধ্যেও স্বদেশপ্রেমের বীজ লুকিয়েছিল। রল। স সেরি এলেন রাজনীতিতে। ১৮৯৫ সাল থেকেই তিনি ভারতীর মারফত বাঙালী যুবমানসকে বীমন্ত্রে দীক্ষা দেবার চেষ্টা করেন। মৃত্যুচর্চা, ব্যায়াম চর্চা, বিলাতি ঘুষি বনাম দেশী কিল বাঙালীর মুমূযু আত্মসম্মানকে জাগিয়ে দিল। সুস্থ সবল জীবন যাপন ও অপমানের প্রতিরোধে মৃত্যুও ভাল এই বোধে সবাই উদ্বুদ্ধ হতে শুরু করল। সারা দেশে বইল উদ্দীপনার জোয়ার। দলে দলে স্কুল কলেজের ছেলেরা এল সরলার কাছে। সরলা তাদের মধ্যে থেকে কয়েকজনকে বেছে বেছে একটা দল করলেন। ভারতবর্ষের কখানি। [চত্র তাদের সামনে রেখে প্রতিজ্ঞা করাতেন তনু মন দিয়ে ভারতের সেবা করার। শেষে হাতে একটি রাখি বেঁধে দিতেন তাদের আত্মনিবেদনের সাক্ষী হিসেবে। অবশ্য সরলার এই সমিতি ঠিক গুপ্ত সমিতি ছিল না তবে মুখে মুখে রটানো বারণ ছিল।

বছর কয়েক পরে এই লাল সুতোর রাখিবন্ধন দেশময় ছড়াল রবীন্দ্রনাথের জন্যে। ১৯০৫ সালে বঙ্গভঙ্গের দিনে তিনি হিন্দু মুসলমান নির্বিশেষে সবার হাতে পরিয়ে দিলেন মিলনরাখি। সরলার রাখিবন্ধনের কথা মনে হলেই মনে পড়ে যায় চার অধ্যায়ের এলাকে। তার হাতের রক্ততিলক ছেলেদের মনে দারুণ উদ্দীপনা সৃষ্টি করত। এই জাতীয় দলনেতৃত্ব ঠাকুরবাড়িতেই প্রথম নয়, বাংলাদেশেও প্রথম। বিদেশেও কি সুলভ ছিল? ইংলণ্ডে তখন মেয়েরা ভোটাধিকারের জন্যে লড়াই করছেন। কল্পনা করা যায় কি ঠিক সেই সময়ে ছেলেদের বীর্যমন্ত্রে দীক্ষিত করছেন একটি বাঙালী মেয়ে!

ভারতী সম্পাদনাসূত্রে সরল। এ সময় পরিচিত হয়েছিলেন আরো দুটি অলোক সামান্য প্রতিভার সঙ্গে স্বামী বিবেকানন্দ ও ভগিনী নিবেদিতা। স্বামীজী চেয়েছিলেন সরলা বিদেশে যাবেন ভারতীয় নারীর প্রতিনিধি হয়ে। প্রতীচ্যের মেয়েদের শোনাবেন প্রাচ্যের আধ্যাত্মিক বাণী। চিঠিতে লিখেছিলেন?

যদি আপনার ন্যায় কেউ যান তো ইংলণ্ড তোলপাড় হইয়া যাইতে পারে, আমেরিকার কা কথা!

স্বামীজী নিবেদিতাকেও বারবার বলেছিলেন সরলার কথা। নিবেদিতা লিখেছেন, তিনি (স্বামীজী) বলেন—সরলা নারীকুলের রত্ন; অনেক বড় জিনিয করবে। নিবেদিতা গল্প করেছিলেন সরলাকেও, স্বামীজী তাকে বলেছেন—সরলার education perfect; এইরকম education ভারতের সব মেয়েদের হওয়া দরকার। এরপরই নিবেদিত প্রস্তাব নিয়ে এলেন— স্বামীজীর সঙ্গে inext trip-এ সরলারও বিলেত যাওয়ার, সেখানে ভারতের মেয়েদের প্রতিনিধি হয়ে প্রাচ্যের আধ্যাত্মিক বার্তা প্রতীচ্যের মেয়েদের শোনাবার জন্যে।

স্বামীজীর আশা অবশ্য সফল করতে পারেননি সরলা, কারণ তিনি তার সঙ্গে বিদেশ যেতে পারেননি। স্বামীজী ও নিবেদিতার সঙ্গে খুব বেশি যোগাযোগ রাখাও সম্ভব হয়নি সরলার পক্ষে, তার পেছুটান ছিল ঠাকুরবাড়ি ও ব্রাহ্ম সমাজের। বরং স্বামীজীর স্বপ্ন আংশিকভাবে সফল করেছিলেন সুষমা। তাঁর আমেরিকাযাত্রার কথা আগেই বলেছি। সরলা ঝড় তুলেছিলেন বাংলায়, পাঞ্জাবে, সারা ভারতবর্ষে।

এর মধ্যে হঠাৎ একটা সভানেতৃত্বের আহ্বান এল। সরলা ইতস্তত করতে লাগলেন। মহীশূর ঘুরে এসেছেন বটে, তা বলে কলকাতা শহরে প্রকাশ্যে ছেলেদের সভায় যোগ দেওয়া! এ যে কল্পনার অতীত! মাঝে মাঝে স্বামীজীর আশ্রমেও গিয়েছেন কিন্তু তখন সঙ্গে থাকতেন মামাতো দাদা সুরেন কিংবা অগ্নিশিখার মতো অলোকসামান্য নিবেদিত। তবু রাজী হতে হল। তার নির্দেশে সভা হল পয়লা বৈশাখ। ঐ দিন যশোরেশ্বর প্রতাপাদিত্যের রাজ্যাভিষেক হয়েছিল। উৎসবের নাম হল প্রতাপাদিত্য উৎসব। তার জীবনী আলোচনা করে ছেলেরা দেখাল লাঠি খেলা, কুস্তি, বকসিং!

দিন বদলেছে বলে সরলাকে বিরূপ সমালোচনা শুনতে তো হলই না, উন্টে কাগজে কাগজে সমালোচনার বদলে উচ্ছ্বসিত প্রশংসা শোনা গেল। মরি মরি কি দেখিলাম! এ কি সভা! বক্তিমে নয়, টেবিলে চাপড়াচাপড়ি নয়—শুধু বঙ্গবীরের স্মৃতি আবাহন, বঙ্গযুবকদের কঠিন হস্তে অস্ত্রধারণ ও তাদের নেত্রী এক বঙ্গললনা…দেবী দশভুজা কি আজ সশরীরে অবতীর্ণ হইলেন?

কিংবা, কলিকাতার বুকের উপর যুবক সভায় একটি মহিলা সভানেত্রীত্ব করিতেছেন দেখিয়া ধন্য হইলাম।

কাগজে লিখল, সরলাদেবীর সঙ্গে দৌড়ে দৌড়ে হাঁপিয়ে পড়ছি। রোজ ভোরে উঠে মনে হয়-অতঃ কিম?

আসলে সরলা বাঙালী মানসিকতার গতিপ্রকৃতিকে ঠিকমতো ধরতে পেরেছিলেন। যুক্তির চেয়ে আবেগ উত্তেজনায় তারা মেতে ওঠে বৈশি। তাদের জাগাতে হলে তাদের প্রবণতার পথ ধরেই এগোতে হবে। তাই তিনি বীরাষ্টমী, রাখিবন্ধন, প্রতাপাদিত্য উৎসব, উদয়াদিত্য উৎসবের সূচনা করে নিজের বাড়িতে শরীর চর্চার আখড়া খোলেন। তবে এই প্রতাপাদিত্য উৎসব নিয়ে রবীন্দ্রনাথের সঙ্গে সরলার মতবিরোধ শুরু হয়। রবীন্দ্রনাথ প্রতাপাদিত্যকে জাতীয় বীর বলে গ্রহণ করতে রাজী ছিলেন না কারণ তার চারিত্রিক আদর্শ মহান নয়। বৌঠাকুরাণীর হাটে তিনি প্রতাপাদিত্যকে সেভাবেই এঁকেছেন। অথচ সরলা সেই ব্যক্তিকে নিয়ে, যার ঐতিহাসিক গুরুত্ব সত্যিই আছে কিনা বিচার না করে, মেতে ওঠায় তিনি বিরক্ত হন। সরলার উত্তর, তিনি প্রতাপাদিত্যকে নীতির নিক্তিতে বিচার করেননি, করেছেন রাজনৈতিক মতাদর্শের দিক দিয়ে। একলা এক জমিদার হয়ে তিনি যে মোগল বাদশার বিরুদ্ধে বিদ্রোহ করে বাংলার স্বাধীনতা ঘোষণা করেছিলেন, নিজের নামে সিক্কা চালিয়েছিলেন সে কথা তো সত্যি।

সব মিলে সরলা এক বিশাল কর্মযজ্ঞ বাঁধিয়ে দিলেন। এর ওপর ছিল তার গান! সে যেন রুদ্রবীণার ঝঙ্কার! ১৯০১ সালের কংগ্রেস অধিবেশনে গাওয়া হয় তার নিজের গান নমে হিন্দুস্থান। প্রবল উদ্দীপনা ছড়িয়ে পড়ল। বিবেকানন্দের। আলমোড় আশ্রমের অধিনেত্রী মিসেস সেভিয়ার গান শুনে সরলাকে বলেছিলেন, আর কিছু না, শুধু যদি জাতীয় গান গেয়ে ফেরো তুমি ভারতের নগরে নগরে গ্রামে গ্রামে, সমস্ত দেশকে জাগাতে পারবে। কিন্তু সরল নিজে সন্ত্রাসবাদীদের সঙ্গে মিশে যেতে পারেননি। পেরেছিলেন নিবেদিতা। সরলা চেয়েছিলেন যুবমানস গড়ে তুলতে, তাদের ধমনীতে শক্তি সঞ্চার করতে। থুন বা স্বদেশী ডাকাতিতে তার সমর্থন ছিল না। শরীর শিক্ষা, আখড়া স্থাপন, লাঠি খেলা, কুস্তি, তলোয়ার শিক্ষা, লক্ষ্মীর ভাণ্ডার স্থাপন প্রভৃতি কাজেই তার উৎসাহ। পাঞ্জাবেও তাঁর সংগঠন শক্তির পরিচয় পাওয়া গেছে।

বাংলাদেশের মেয়েরা এ সময় অভূতপূর্ব স্বাদেশিকতার পরিচয় দিয়েছিলেন। অন্যান্য ক্ষেত্রে যে তারা খুব এগিয়ে ছিলেন তা নয়, কিন্তু দেশের কাজে সাড়া দিয়েছিলেন সবাই। বেশির ভাগ এসেছিলেন সাধারণ সমাজ থেকে। তুলনায় উচ্চবিত্ত সম্ভ্রান্ত মহিলাদের সংখ্যা কম। সরলা অবশ্য ব্যতিক্রম। তার লক্ষ্মীর ভাণ্ডার ভরে উঠল স্বদেশী জিনিষে। সরলা লক্ষ্মীর ভাণ্ডার খুলেছিলেন স্বদেশী জিনিষ ব্যবহার ও প্রচার করবার জন্যে। তিনি অবাক হয়ে দেখেছিলেন, সেসময় যে-সমস্ত জাপানীরা সুরেন্দ্রনাথ ঠাকুরের কাছে আসতেন তারা নিজেদের দেশ থেকে বয়ে সব কিছু জিনিষ আনতেন, এমনকি চিঠি লেখার কাগজ পর্যন্ত। একদিন সরলা বিস্মিত হয়ে জিজ্ঞেস করলেন, এত কাগজ এনেছেন কেন? তারা জানালেন, ভারতবর্ষে কিছুই পাওয়া যায় না ভেবে তাদের বাড়ির মেয়েরা চিঠি লেখার কাগজ দিয়েছেন যাতে তাদের চিঠি লেখা বন্ধ না হয়ে যায়। আশ্চর্য! সরলা ভাবেন, জাপান জানে পরাধীন অসভ্য ভারতবর্ষ ভারতবর্যের লোক কিছুই করতে পারে না, করতে জানে না। তিনি স্বদেশী জিনিষ ব্যবহার শুরু করলেন। ভারতীর মলাট দিলেন দেশী হলুদ রঙের তুলট কাগজে। খুললেন লক্ষ্মীর ভাণ্ডার। যোগেশ চৌধুরী প্রমুখ কয়েকজনের সাহায্যে বৌবাজারেও খুললেন স্বদেশী স্টোস। বঙ্গভঙ্গ আন্দোলনের আগেই তারা স্বদেশী দোকান খুলেছিলেন। লক্ষ্মীর ভাণ্ডার-এ বিক্রী হত বাংলাদেশের বিভিন্ন জেলা থেকে সংগ্রহ করা, শুধু মেয়েদের জন্যে, স্বদেশী কাপড় ও জিনিষপত্র। কোন উৎসবে যেতে হলে সরলা আপাদমস্তক স্বদেশী বেশভূষায় সেজে, লক্ষ্মীর ভাণ্ডার পরিচালনা উপলক্ষে পাওয়া স্বদেশী মেডেলটি দিয়ে তৈরি করা ব্রোচটি কাঁধের কাছে লাগিয়ে যেতেন। অপরূপ বেশে তার অনুপম লাবণ্য সকলকেই মুগ্ধ করত। এ সময় তাঁর ভারতী আর সরযূবাল দত্তের ভারত-মহিলা পত্রিকা ভার নিয়েছিল জাতীয়তাবোধে মেয়েদের উদ্বুদ্ধ করবার। তারা সফল হয়েছিলেন নিশ্চয়, না হলে স্বদেশী আন্দোলনে মেয়েরা এমন গৌরবময় ভূমিকা নেবেন কেন? নাটোরের মহারাণী গিরিবালা দেবী, অবলা বসু, সরোজিনী বস্তু বা বঙ্গলক্ষ্মী, ননীবালা দেবী, দেশবন্ধুর বোন উর্মিলা দেবী, শ্রী অরবিন্দের ভাইঝি লতিকা ঘোয—সকলেই এগিয়ে এসেছিলেন রক্তাক্ত শপথ নিতে। মেয়েদের দিক থেকে শ্রমিক আন্দোলন পরিচালনা করেন সন্তোষ কুমারী গুপ্তা। বিখ্যাত মেথর ধর্মঘট পরিচালনা করে তাদের সজাগ করে তুললেন প্রভাবতী দাসগুপ্তা, সরোজিনী বসু প্রতিজ্ঞা করেছিলেন, যতদিন বন্দেমাতরুম্ ধ্বনির বিরুদ্ধে নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহার না হয় ততদিন তিনি সোনার বালা পরবেন না। আসলে এই স্বদেশী আন্দোলনের যুগে বাংলাদেশের ঘরে ঘরে বহু নারী নীরবে সকলের অলক্ষ্যে আন্দোলনকে সাহায্য করে গেছেন। একেবারে সামনে এসে প্রত্যক্ষ কাজ না করলেও তাদের এই নীরব দানের মূল্য কম ছিল না। তবে এসব ঘটনা পরের কথা। সরলা তখন আর বাংলার প্রত্যক্ষ রাজনীতিতে নেই। চলে গেছেন পাঞ্জাবে। সে সময় সর্বভারতীয় রাজনীতিক্ষেত্রে বাঙালী-মেয়েরা বিশেষ প্রভাব ফেলতে পারেননি। হায়দ্রাবাদের সরোজিনী নাইডু, মাদ্রাজের ম্যাজিস্টেট যতীন্দ্রনাথ রায়ের স্ত্রী বিভাবতী কিংবা এলাহাবাদে রামানন্দ চট্টোপাধ্যায়ের দুই মেয়ে সীতা ও শান্ত স্বদেশী আন্দোলনে প্রবাসে কিছু কিছু আলোড়ন জাগিয়েছিলেন। সরলা ঝড় তুলেছিলেন পাঞ্জাবে। লাহোরে প্রায় পাঁচশ জন বাঙালী যুবক সংগ্রহ করে তিনি প্রতিবাদ সভার আয়োজন করেন।

রামভজের সঙ্গে বিয়ের পরে সরলার কর্মজীবন শুরু হয় পাঞ্জাবে। রাজনৈতিক জীবনে রামভজ ছিলেন সরলার মতোই তেজস্বী ও চরমপন্থী। বাংলার বাঘিনী যেন খুঁজে পেল যথার্থ দোসর। তবে পাঞ্জাবে সরলা শুরু করলেন সমাজ সেবা। সখিসমিতি আর বিধবা-শিল্পাশ্রমের মধ্যে যে অভাব ছিল সেটা পূরণ করবার জন্যে তিনি স্থাপন করলেন ভারত স্ত্রী মহামণ্ডল। নারীর স্বাধিকার প্রতিষ্ঠার ইতিহাসে এই প্রতিষ্ঠানটি বিশেষ ভূমিকা গ্রহণ করেছিল। পর্দানশীন মেয়েদের শিক্ষা দেওয়াই ছিল এর মুখ্য উদ্দেশ্য। তাই, প্রথমে এলাহাবাদে, পরে লাহোর, অমৃতসর, দিল্লী, করাচী, হায়দ্রাবাদ, কানপুর, বাকীপুর, হাজারীবাগ, মেদিনীপুর, কলকাতা ও আরো কয়েক জায়গায় এর শাখা খোলা হয়। কলকাতা শাখার ভার ছিল কৃষ্ণভামিনী দাসের ওপর। কয়েক বছরের মধ্যে তিনি ও তার সহকারিণীরা কলকাতার প্রায় তিন হাজার অন্তঃপুরবাসিনীকে লেখাপড়া শিখিয়েছিলেন। বিধবা হবার পর সরল আবার ফিরে এসে মহামণ্ডলেরই আরেকটা শাখা স্থাপন করেন ভারত স্ত্রীশিক্ষা সদন। এঁদের চেষ্টায় কলকাতায় পর্দাপ্রথা খুব দ্রুত উঠে যায়। মেয়েদের স্কুলের সংখ্যা বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে ছাত্রীরাও দলে দলে আসে স্কুলে ভর্তি হতে। শিক্ষার সুবিধের জন্যে মহামণ্ডল থেকে এ সময় বেবিক্রেস আর মেয়েদের হস্টেল খোলার ব্যবস্থাও হয়েছিল।

পাঞ্জাবে সরকার কার্যকলাপ খুব স্পষ্ট নয়। সেখানে রামভজের উপযুক্ত সহধর্মিণী হয়ে তিনি হিন্দুস্থান পত্রিকাটির ভার নেন। শোনা যায়, লাহোরের চিফ কোর্ট আদেশ দিয়েছিল যে পত্রিকার সম্পাদক ও স্বত্বাধিকারী হিসেবে রামভজের নাম থাকলে তার ওকালতির লাইসেন্স বাতিল করে দেওয়া হবে। সরলা প্রস্তাব করলেন পত্রিকায় তাঁর নাম দেওয়া হোক। তাই হল। হিন্দুস্থানের একটা ইংরেজী সংস্করণ বার করে সরলা তাতে জ্বালাময়ী বক্তৃতা প্রকাশ করতে থাকেন। রোলট এ্যাক্ট চালু হলে হিন্দুস্থান বন্ধ করে প্রেস বাজেয়াপ্ত করা হল, রামভজ নির্বাসিত হলেন। একাকিনী সরলা শক্ত হাতে হাল ধরে পাঞ্জাবের বিদ্রোহকে নিয়ে গেলেন পরিণতির পথে। পাঞ্জাবের ব্রিটিশ অত্যাচার চরমে উঠল জালিয়ানওয়ালাবাগের হত্যাকাণ্ডে। এসময় সরলাকেও গ্রেপ্তারের কথা হয়েছিল, কিন্তু তখনও পর্যন্ত ব্রিটিশ আইনে রাজনৈতিক কারণে মেয়েদের আটক করার নিয়ম চালু হয়নি।

এরপর থেকে সরল মহাত্মা গান্ধীর অসহযোগ আন্দোলনের অতিমাত্রায় সমর্থক হয়ে পড়লেন। তাই চরকা-খদ্দর প্রবর্তনেও সরল গান্ধীজীর ডান হাত। সবে তার একমাত্র পুত্র দীপকের সঙ্গে মহাত্মা গান্ধীর নাতনী রাধার বিয়ে হয়েছিল। এই বিবাহ দুটি ভিন্ন পারিবারিক ধারার যোগ ঘটাল। স্বামীর মৃত্যুর পরেও সরলাকে দেখা যায় সমাজসেবিকারূপে। ১৯২৫ সালে তিনি নিখিল ভারত সামাজিক মহাসমিতির সভানেত্রী হয়েছিলেন। কিন্তু বাঙালীর কাছে তার প্রথম জীবনের তেজস্বিনী মূর্তিটিই বেশি আদর পেয়েছে।

মহর্ষি ভবনে যখন গুণবতী মেয়েদের ভিড় তখন পাশের বৈঠকখানাবাড়িতেও দুটি পিঠোপিঠি বোন বড় হয়ে উঠেছেন। তারা গুণেন্দ্রনাথের মেয়ে বিনয়িনী ও সুনয়নী। এখন আর সৌদামিনীর দুঃখ নেই। তার তিন ছেলে বড় হয়েছেন! অবন-গগনের ছবি ফিরিয়ে এনেছে দেশের সম্মান। অবশ্য সে পরের কথা। তার অনেক আগেই বেজেছিল বিনয়িনীর বিয়ের সানাই, বড় করুণ সুরে। প্রথমে ঠিক হয়েছিল খুব ধুমধাম করে বিয়ে হবে। কিন্তু মানুষ ভাবে এক, হয় আর। গুণেন্দ্রনাথের ছত্রিশ বছরের জীবন হঠাৎ স্তব্ধ হয়ে গেল। কেউ জানলে না কিসের দুর্দমনীয় বেগ তাঁকে এমন নির্মমভাবে আত্মহত্যার পথে এগিয়ে নিয়ে গিয়েছিল। এ উক্তি গুণেন্দ্র-দৌহিত্রী প্রতিমার। মায়ের অভিমান ও বেদনার স্পর্শ পেয়েছিলেন তিনি, নয়ত মাতামহকে দেখবার কোন সুযোগই তাঁর হয়নি। গুণেন্দ্রের আকস্মিক মৃত্যুর পর খুব সাধারণ ভাবে বিয়ে হল বিনয়িনীর। হ্যাঁ, পূর্বনির্ধারিত পাত্র শেষেন্দুভূষণের সঙ্গেই। তারপর?

তারপর আবার কি? মসৃণভাবে দিন কেটে গেছে ঘর-সংসার জপ-তপ আর রান্না-বান্না নিয়ে। ঠাকুরবাড়ির মেয়েরা সবাই বিকেলে গা ধুয়ে পছন্দমতো খোঁপা বাঁধতেন। তারপর শিউলি বা নটকনিয়াঙ্গা শাড়ি পরতেন সুন্দর করে। রূপটান করে মোমরাট, কাজল প্রভৃতি দিয়ে প্রসাধন সেরে আসতেন কর্তৃঠাকরুণকে সাজ দেখতে। তিনি প্রত্যেকের খোঁপায় জড়িয়ে দিতেন ফুলের মালা। হয়ত এ নিয়ম অন্যান্য সাবেকী বাড়িতেও ছিল। বিনয়িনী খোপা বাঁধতে পারতেন সুন্দর করে। বেনিঝি-ভাইঝিদের চুলে ফুটে উঠত নানা রকম ছাদবেনেবাগান, মনভোলানো, ফঁশজাল, কলকা, বিবিয়ানা আরো কত কী! হয়ত বিনয়িনী চিরকাল এভাবে সবার চোখের আড়ালে থেকে যেতেন যদি না তার নিজের লেখা আত্মজীবনীর পাণ্ডুলিপিটি অকস্মাৎ পাওয়া যেত। এটি এখনো অপ্রকাশিত আকারে তাঁর পৌত্র শ্রী সুদীপ্ত চট্টোপাধ্যায়ের কাছে রয়েছে। তিনি তাঁর ঠাকুরমার হাতে লেখা জীর্ণ খাতাটি পান পিসীম। প্রতিমা ঠাকুরের কাছ থেকে। প্রচলিত রীতি অনুযাধী ঠাকুরমা বললুম বটে তবে ঠাকুরবাড়িতে পিতামহীকে বলা হত দাদু আর পিতামহ হতেন দাদামশায় বা কর্তাবাবা। দাদুর বদলে সম্ভ্রমে ঠাকুরমাকে অনেক সময় বলা হত কাম।

বিনয়িনী তাঁর জীবনী, যার নাম তিনি দিয়েছেন কাহিনী, লেখা শুরু করেন পঁয়তাল্লিশ বছর বয়সে। খাতার ওপরে ১৯১৬-১৭ লেখা থাকলেও তিনি নিজের কাহিনী শুরু করেন আরো পরে। ১২৮০ থেকে ১৩৩০-এর জীবনবৃত্তে তিনি কাহিনী লেখেন ১৩২৫ সালে, মৃত্যুর পাঁচ বছর আগে। এ বয়সে তার নিজের কথা বলতে ইচ্ছে করল কেন তা তিনি নিজেই জানেন না। ঠাকুরবাড়িতে আত্মকাহিনী লেখার রেওয়াজ বহুদিনকার। মহাভবনে পুরুষরা তো বটেই মেয়েরাও আত্মকথা লিখতে এগিয়ে এসেছিলেন। অবশ্য আত্মজীবনী রচনায় মেয়েদের পথ দেখিয়েছিলেন রাসসুন্দরী দেবী, তিনি ঠাকুরবাড়ির কেউ নন। প্রমথ চৌধুরীর মনে হয়েছিল, বাংলা ভাষায় মাত্মজীবনী লেখেন শুধু মেয়েরা। বলাবাহুল্য এই মন্তব্যের কারণও রসি সুন্দরী। কেশবচন্দ্র দেনের মা সারদাসুন্দরী দেবীর আত্মরিত আর এক থানি উল্লেখযোগ্য বই। বিনয়িনী কাহিনী লেখার আগে সৌদামিনীর পিতৃ স্মৃতি, স্বাকুমারীর সেকেলে কথা ও আরো অনেক আত্মজীবনী বেরিয়ে গেছে। এদের যে কোন একটা বিনয়িনীর মনে আগ্রহ জাগতে পারে। তবে লেখবার সময়, তিনি কাউকে অনুকরণ না করে, নিজের মনে নিজের কথা বলে গিয়েছেন।

নিয়মিত লেখাপড়ার চর্চা না থাকলেও বিনয়িনীর সাদামাটা আটপৌরে ধরনের লেখার হাতটি ভাল—কৃত্রিমতার স্পর্শ নেই। যেন আপন মনে আয়নায় নিজের মুখ দেখা! সহুজ, স্বচ্ছ, স্বচ্ছন্দ। প্রথমদিকে খানিক বাপের বাড়ির কথা লিখে বিনয়িনী লিখেছেন শ্বশুরবাড়ির কথা। অনেক তথ্য আছে, তবে সব। ছাপিয়ে বড় হয়ে উঠেছে তার ধর্মপরায়ণ ভক্তিনত রূপটি। ধর্মচেতনার উন্মেষ হয়েছিল শৈশবেই। মায়ের কথামতো ভোরবেলায় উঠে বাগান থেকে ফুল কুড়িয়ে আনতে হত তাদের দুবোনকে। কার্তিক মাসে হত শ্ৰীধর ঠাকুরের। পূজো। ভোর ছটার মধ্যে ফুল নিয়ে তারা হাজির হতেন ঠাকুরঘরে। বড় পিসী কাদম্বিনী নানা ভাবে ঠাকুরকে সাজাতেন। কোনদিন হলদে কলকে, কোনদিন রক্তকরবী, কোনদিন সাদা রজনীগন্ধা দিয়ে সাজিয়ে ভাইঝিদের ডেকে দেখাতেন। পাঁচ নম্বর বাড়ির এই ছবিটি আমরা পেয়েছি বিনয়িনীর ডায়রি কাহিনী থেকেই। দুটো বাড়ির মেয়েদের জীবনে এই যে আকাশপাতাল বিভেদ সেটা বেশি করে ধরা পড়ে ইন্দিরা-প্রতিভা-প্রজ্ঞা-সুষমার জীবনযাত্রার সঙ্গে বিনয়িণী-সুনয়নীর জীবনযাত্রার তুলনা করলে। তার শ্বশুরবাড়ি অর্থাৎ প্রসন্নকুমার ঠাকুরের বাড়ির কথাও কাহিনীতে আছে। সেখানে দুর্গোৎসব হত ঘটা করে। সন্ধ্যারতির মনোজ্ঞ ও মূল্যবান বিবরণ পাওয়া যায় বিনয়িনীর রচনায়! ..তখন সন্ধ্যায় আরতি আরম্ভ হল, চারজন ব্রাহ্মণব্রতী এসে বসলেন। দুইজন চণ্ডীপাঠ করতে আরম্ভ করলেন অর একজন পুরোহিত ঠাকুরকে পুথি দেখে মন্ত্র বলে দিতে লাগলেন। সেই আশী বংসরের পুরোহিত ভক্তিপূর্ণ হয়ে মাকে প্রণাম করে উঠে দাঁড়ালেন। রূপোর প্রদীপদানীতে ১০০৮ ঘৃত-প্রদীপ দিয়ে রূপোর ঘণ্টা বাজিয়ে আরতি আরম্ভ হল। প্রতিমার দু পাশে মস্ত দুইটা পিতলের প্রদীপ, যার বুক পর্যন্ত উজ্জ্বল। প্রদীপে একসের ঘৃত ধরে। এইরূপ প্রদীপ তিন দিন তিন রাত জ্বলতে থাকল। নতুন উদ্যমের পাশে পুরনো। নিস্তরঙ্গ জীবনের অমন সহাবস্থান আর দেখা যাবে না।

বিনয়িনীর লেখা সর্বত্রই আশ্চর্য রকমের সাবলীল। স্বামীর মৃত্যুর কথাও তিনি ব্যক্ত করেছেন শান্তভাবে। পড়তে পড়তেই বোঝা যায় বিনয়িনী লিখেছেন একেবারে নিজের জন্যে। আর কারুর জন্যে নয়। একটু তাকে অনুসরণ করা যাক :

আগের দিন থেকে তার অসুখ বেড়েছে। আমাকে কোথাও উঠে যেতে। বারণ করলেন। পরদিন বিকেল ছটার সময় অকস্মাৎ তিনি চলে গেলেন। হাতে আমার হাত রেখে কি যেন বলে গেলেন সেটি আমি অনেক করেও বুঝতে পারলাম না। জীবনের সমস্ত সুখ এই সঙ্গে শেষ হল। তখন আমার যে ধৈর্যগুণ এল, এখন মনে হলে আশ্চর্য হয়ে থাকি। মনে হল এই যে যাওয়া আসা। এ তে কতকগুলো তৃণগুচ্ছ নদীর ঢেউয়ে কখনও একত্র হচ্ছে আবার সরে যাচ্ছে। এর জন্যে এত কাতরতা হচ্ছে কেন?

একজন সাধারণ নারীও যে শোকের সময় মাঝে মাঝে নির্বেদ বৈরাগ্যের সন্ধান পান তার দ্বিতীয় প্রমাণ বিনয়িনী। এর আগে পুত্রশোকে আচ্ছন্ন প্রফুল্লময়ীও দুঃখের মধ্যে হারানিধি সন্তানের বিচ্ছেদ ভুলতে পেরেছিলেন। যাইহোক, বিনয়িনীর কাহিনীর আরো একটি গুরুত্ব আছে। যতদূর মনে হয়, অবনীন্দ্রনাথের ঘোয়, জোড়াসাঁকোর ধারে এবং আপনকথা ও প্রতিমা ঠাকুরের স্মৃতিচিত্র লেখার প্রেরণা যুগিয়েছিল ৰিনঘিনীর আত্মকাহিনী। কেউ একজন পুরনো কথা বলতে বসলে সকলেরই স্মৃতি মাথা চাড়া দিয়ে ওঠে। এখানে সেই পুরনো কথা বলবার দায়িত্ব প্রথমে নিয়েছিলেন বিনয়িনী।
দিদির মতো সুনয়নীও ঘর–সংসার, ঠাকুর–দেবতা নিয়ে থাকতে ভালবাসতেন। তারই ফাঁকে ফাঁকে তিনি আঁকতেন রাধাকৃষ্ণ, হরপার্বতী, বালগোপাল, ননীচোরা, কৃষ্ণশোদার ছবি। কি করে ছবি আঁকতে হয় সুনয়নী শেখেননি। দুই দাদাকে নিবিষ্ট মনে দক্ষিণের বারান্দায় বসে ছবি আঁকতে দেখে-দেখে একটু বেশি বয়সে আপন মনেই ছবি আঁকা শুরু করেছিলেন। ছবি আঁকা তো নয়, আঁকা-আঁকা খেলা। আগে থেকে কিছু না ভেবে, তুলি বুলিয়ে জলে ডুবিয়ে ডুবিয়ে ধোয়া—তারই মধ্যে কখনো আভাস এল নাদুসনুদুস বালগোপাল কেষ্টঠাকুরের, কখনো লাজুকলতা কনে বৌয়ের হেসে ওঠা চোখ দুটির—আগে থেকে কিছু বোঝা যায় না। কিন্তু শিল্পী দাদাদের কোন প্রভাব সুনয়নীর ছবিতে নেই। আধুনিক ভারতীয় চিত্রকলার নব উদ্বোধনের যুগে তিন ভাইবোন বেছে নিলেন তিনটি পথ। অবনীন্দ্র গ্রহণ করলেন পারশিয়ান ও মোগল টেকনিক! গগনেন্দ্র নিলেন জাপানী ও কিউবিষ্টিক ধারা আর সুনয়নী একেবারে জনসাধারণের আট অর্থাৎ পটশিল্পের ভিত্তির ওপর আঁকলেন তার একান্ত নিজস্ব ছবি। পটের ছবির সবচেয়ে বড় আকর্ষণ টানা-টানা দীঘল দুটি কালো চোখের গহিন ছায়ায়। সুনয়নীর ছবিতেও স্বভাবশিল্পী পটুয়াদের আঁকা চোখদুটি চোখে পড়ে। এ ধরনের চোখ আঁকার ব্যাপারে সুনয়নী যামিনী রায়েরও পূর্ববর্তিনী।

সুনয়নী ছবি আঁকতেন আপন খেয়ালে। তিনিই বাঙালী মহিলা চিত্রশিল্পীদের পথিকৃৎ। তখনকার দিনে যে মেয়ের ছবি আঁকত না তা নয়। বিশেষ করে যারা পশ্চিমের ফ্যাশান দুরস্ত ছিলেন তাদের তো কথাই নেই। ঘোড়ায় চড়া, ইংরেজীতে কথা বলা, পিয়ানো বাজানোর মতোই ছবি আঁকাঁটাও ছিল তাদের গুণের নিদর্শন। ঠাকুরবাড়ির ট্রাডিশন ভেঙে হেমেন্দ্রনাথও তার স্ত্রী ও মেয়েদের ছবি আঁকা শিখিয়েছিলেন। প্রতিভার আঁকা দু-একটা ছবি ছাপা হয়েছিল পুণ্যে। প্রজ্ঞার আঁকা দু-তিনটে পোট্রেট বেশ ভাল হয়েছিল। সুতরাং ছবি আঁকার চেষ্টা যে সুনয়নীর পক্ষে খুব নতুন তা নয়। নতুন তার দৃষ্টিভঙ্গির নতুনত্বে। এতদিন যারা ছবি এঁকেছেন তাঁর আঁকার চেয়ে বেশি ওপরে ওঠেননি। মানুষ বা প্রতিকৃতি যাই হোক না কেন তারই অনুকরণ করেছেন তারা। নীপময়ী, প্রতিভা, প্রজ্ঞা সম্বন্ধেও একথাই খাটে। কিন্তু সুনয়নী যা দেখলেন তাই আঁকলেন না। ছবির সঙ্গে মিশে রইল এক অধরা সৌন্দর্য। তাই তার ছবিতেই প্রথম দেখা দিল স্বকীয়তা। প্রথম প্রথম তিনি ছবি নিয়ে দেখাতে যেতেন দাদাদের।

দেখ তো দাদা কেমন হয়েছে।

দাদার উৎসাহ দেন। কখনো বলেন ভাল। কখনো বলেন বা। কখনো বলেন এঁকে যা, তোর হবে। সুনয়নী এঁকে চলেন। ঘর ভরে ওঠে ছবিতে। এর মধ্যে একটা ছবি অর্ধনারীশ্বর। দেখে খুশি হয়ে উঠলেন গগনেন্দ্র। অবনীন্দ্র তখন সরকারী আট কলেজের সঙ্গে যুক্ত। তাকে বললেন, ওকে একটা সাটিফিকেট লিখে দাও।

অবনীন্দ্র অনেকদিন থেকেই লক্ষ্য করছিলেন সুনয়নীর ছবি। এবার বললেন, ও যে ধারায় ছবি আঁকছে তার জন্যে আমায় আর সাটিফিকেট লিখে দিতে হবে না। পরে দেশের লোকের কাছ থেকে ও নিজেই সাটিফিকেট আদায় করে নেবে।

সত্যিই তাই নিয়েছিলেন সুনয়নী। দেশের সম্মান, বিদেশের সম্মান সবই পেয়েছিলেন। তবু তার জীবন ছিল সহজ ও অনাড়ম্বর।

সুনয়নী কি কোন বাধা পেয়েছিলেন? মনে তো হয় না। একলা ঘরে গিন্নী ছিলেন তিনি। বিয়ে হয়েছিল সেই বিখ্যাত চাটুজ্যে পরিবারে, যেখানে দুই বৌ হয়ে গিয়েছিলেন সরোজা ও ঊষা। সুনয়নীর স্বামী রজনীমোহন অবশ্য পাঁচ নম্বর বাড়িতেই থাকতেন। বাপের বাড়িতেই শ্বশুরবাড়ি হওয়ায় সুনয়নী অন্যান্য কাজের ফাঁকে ফাঁকে পিয়ানোয় সুর তুলতেন, ডিক্সনারী দেখে ইংরেজী শিখতেন আর ছবি আঁকতেন। আরেকটা কাজেও সুনয়নীর উৎসাহ ছিল। তিনি মেয়েদের দিয়ে নাটকাভিনয় করাতেন। মহর্ষি ভবনের মতো এ বাড়িতে স্ত্রীপুরুষ সবাই মিলে নাটক করতেন না। বরং মেয়েদের নাটকে মেয়েরাই সাজতেন পুরুষ। একবার জ্ঞানদানন্দিনীর উৎসাহে রত্নাবলী নাটকের অভিনয় হল। রাজা সাজলেন বিনয়িনী। রাণী গগনেন্দ্রের স্ত্রী প্রমোদকুমারী, মন্ত্রী সমরেন্দ্রের স্ত্রী নিশিবালা, বাসবদত্তা সুনয়নী ও চুতলতিকা অবনীন্দ্রের স্ত্রী সুহাসিনী। ছোট মেয়েদের নিয়েও সুনয়নী করাতেন আলিবাবা, মৃণালিনী বা অন্য কিছু। রবীন্দ্রনাথ বা জ্যেতিরিন্দ্রনাথের নাটক নিয়ে এঁরা এক্সপেরিমেন্ট করেননি, এমনকি অবনীন্দ্রনাথের লেখাও না। তাই বোঝা যায় এবাড়ির অন্দরমহলের সুরটি বাঁধা ছিল সাবেক কালের সঙ্গে।

সুনয়নীকে ছবি আঁকায় কেউ বাধা দেয়নি। সমাজ এখন উদার হয়েছে। আর সুনয়নীর বি ও তো ঠাকুর দেবতার ছবি। তারই মধ্যে দেখা দিল তার নিজস্ব ধারা। সুনয়নীর ছবি বিদেশীদের চোখে পড়েছিল। সর্বপ্রথম এ ব্যাপারে উৎসাহী হয়ে ওঠেন স্টেলা ক্ৰামরিশ। তিনি ছবির আলোচনা করলে সেই লেখা পড়ে উৎসাহিত হয়ে ওঠেন শ্ৰীমতী ককশীটার। লণ্ডনের উইমেন আর্ট ক্লাব থেকে তিনি সুনয়নীর ছবির প্রদর্শনীর ব্যবস্থা করলেন ১৯২৭ সালে। বিদেশীরাও মুগ্ধ হল। তুলির টানে কোন দুর্বলতা নেই, নেই সংশয়ের অবকাশ। সবচেয়ে সুন্দর দুটি চোখ। দীঘল, মায়াময়, স্বপ্ন ঙিন। এ চোখ বুঝি পাশ্চাত্ত্য প্রথাসিদ্ধ নয়, তবুও ভীষণ রকম বাস্তব। সম্পূর্ণ বিদেশী প্রভাবমুক্ত সুনয়নী যেন নতুন শিল্পরীতির প্রবর্তন করলেন। ফ্রান্স এবং জার্মানী থেকেও আহ্বান এসেছিল। তবে সুনয়নী এত প্রদর্শনীর কথা ভাবছেন না। ভাল লাগত, মনের খেয়ালে আঁকতেন, বিলিয়ে দিতেন প্রিয়জনদের। এত খ্যাতি, এত সম্মান কিন্তু তাতে সুনয়নীর চিত্রভাষা বদলাল না। সেই রূপকথা, কথকতা, পাঁচালী, পুরাণ, মহাকাব্য, আলপনা, নকশী কাথা, বাউল, বোস্টম, আরব্য-রজনীর গল্পই জুড়ে রইল তাঁর ছবির জগৎ। শিব, কৃষ্ণ, লক্ষ্মীর ছবির সংখ্যাই বেশি। হরপার্বতী, অনারীশ্বর এবং রাধাকৃষ্ণেরও একাধিক ছবি আছে। অসংখ্য ছবি, কিন্তু সবার মধ্যেই যেন লৌকিক সারল্যের স্পর্শ মাখানো রয়েছে। ভাস্কর মীর মুখোপাধ্যায়ের মতে, সুনয়নীর ছবিতে কোন উচ্চাকাঙ্ক্ষা নেই; দক্ষ হাতের খেলা নেই, কোন রঙের আড়ম্বর নেই—আছে একটি সহজ সোজা মন ও চোখের দৃষ্টি। একথা আরো মনে হয় সুনয়নীর কবিতা পড়লে। ঠাকুরবাড়ির অধিকাংশ মেয়েদের মতো তিনিও গান জানতেন, কবিতা লিখতেন। প্রকাশ্যে নয়। গোপনে। তাই বিনয়িনীর আত্মকাহিনীর মতোই সেগুলো আত্মগোপন করে আছে খাতার পাতায়। আমরা তার পুত্রবধূ মণিমালা দেবীর সৌজন্যে দুটো কবিতা দেখেছি। একটা তুলে দিচ্ছি। দুটিতেই রয়েছে এক অনাবিল সারল্য। সেকেলে শিশুপাঠ্য কবিতার সঙ্গে সুনয়নীর কবিতার মিল আছে। অথচ তিনি রবীন্দ্র-কাবের সঙ্গে ভালমতোই পরিচিত ছিলেন। অন্যদের কবিতাও পড়েছেন। কিন্তু তার নিজের কবিতা আশ্চর্যভাবে সরলীকৃত। মাটি ঘেঁষা। প্রাণবন্ত। শৈশবচেতনায় মগ্ন। এবার কবিতা :

সারাদিন বসি গগনের মাঝে
আলোকের খেলা করিয়া শেষ
সাঁঝের বেলায় চলে দিনমণি
ক্লান্ত শরীরে আপন দেশ।
গ্রামের পথটি আঁধারে ঢাকিল
ছেলেরা চলিল আপন ঘর প্র
দীপ জ্বলিয়া কে রেখে দিয়েছে
আলপনা দিয়ে দুয়ার পর
বধুটি চলেছে ঘোমটায় ঢাকি
কলসী ভরিয়া লইয়া জল
সোপান বাহিয়া চলে ধীরে ধীরে
চরণে তাহার বাজিছে মল।
গগন সাজিল নতুন শোভায়
পরণে নীল শাড়ি হীরার ফুল।
জ্বলিল গগনে হীরক প্রদীপ
আর নাহি হবে পথের ভুল।
খেয়া তরীখানি বাহিয়া এখনি
আসিবে যে নেয়ে করিতে পার
বলিবে কে যাবি আয় ত্বরা করি
নাহি কোন ভয় ভাবনা আর।

সুনয়নীর কবিতাও যেন ছবিতে ভরা। এই প্রকৃতি, এই ছেলের দল, আলপনা আঁকা-প্রদীপ জ্বালা ঘর, ঘোমটা-টানা বন্ধুর মল বাজিয়ে জল আনা, খেয়া তরীর মাঝির আহ্বান—এ সবই তো ছবির উপাদান। বাংলার নিজস্ব। এই সুর, এই ভঙ্গি, এই কল্পনা, কালিঘাটের পোটোর মতো এই তুলির টানও সুনয়নীর একান্ত নিজস্ব।
এবার রবীন্দ্রনাথের মেয়েদের কথায় আসা যাক। ঠাকুরবাড়ির অন্য মেয়েরা যথেষ্ট বড় হয়েছেন এমন সময় একে একে এলেন তিন কন্যা—মাধুরী, রেণুকা, অতসী। যেন তিনটি পদ্ম ফুলের কুঁড়ি। বড় মেয়ের নাম মাধুরীলতা, কবির বড় আদরের বেলা, বেলি বা বেলুবুড়ি। ফরসা রঙ, অপরূপ সুন্দর মুখ। ছাব্বিশ বহরের পিতা রবীন্দ্রনাথের মনের আয়নায় ধরা পড়েছে তার বিচিত্র অভিব্যক্তি। কিছু চিঠিপত্র ও স্মৃতিকথা ছাড়াও বেলার এই বয়সটা চিরকালের মতো ধরা আছে কাবুলিওয়ালা গল্পের মিনির মধ্যে।

ঠাকুরবাড়ির মেয়ে হয়েও মাধুরীলতা মানুষ হয়েছেন স্বতন্ত্র ধরনে। তা স্বতন্ত্র বৈকি। সত্যেন্দ্র বা হেমেন্দ্রর মেয়েদের মতো ধরাবাঁধা বিলিতি স্কুল লরেটোতে পড়েননি তিনি। এমনকি দেশী স্কুল বেথুনেও না। পড়েছেন বাড়িতে। তিনজন ইংরেজ শিক্ষয়িত্রী, লরেন্স সাহেব ও হেমচন্দ্র ভট্টাচার্যের কাছে শিখতেন লেখাপড়া। এছাড়া পড়তেন বাবার কাছে। স্কুলে পাঠাননি বলে কবি যে মাধুরীকে কিছু শেখাতে বাকি রেখেছিলেন তা নয়। দেশী-বিলিতি গান, সাহিত্য, এমন কি নার্সিং পর্যন্ত শিখিয়েছিলেন।

মাত্র একত্রিশ বছর বেঁচেছিলেন মাধুরীলতা। তাঁর সংক্ষিপ্ত জীবনের ইতিবৃত্ত সকলেরি জানা কারণ তিনি রবীন্দ্র-দুহিত। পিতা রবীন্দ্রনাথের প্রথম উপলব্ধি বেলাকে কোলে নিয়েই। তাই তাকে নিয়ে তার কত আশা কত আশঙ্কা! কত স্বপ্ন কত সাধ! পাঁচ ভাই-বোনের মধ্যে বেলা কবির সবচেয়ে প্রিয়। বাবার মন বলে বড় হয়ে বেলি খুব লক্ষ্মী মেয়ে হবে। হয়েছিলেনও তাই। একটু বড় হতেই মাধুরী বুঝেছিলেন, আমি যা করব আমার ভাইবোনেরা তাই দেখে আমার দৃষ্টান্ত অবলম্বন করবে। আমি যদি ভাল না হই, তবে ওদের পক্ষে, আমার পক্ষেও মন্দ! মাধুরী জানতেন তিনি দিদিদের মতো বিশেষ করে ইন্দিরার মতো গুণবতী নন। কিন্তু তার চেষ্টা যদ্দুর পারি ভাল হব।

শিলাইদহের একঘেয়েমিতে মৃণালিনীর মতোই হাঁপিয়ে উঠতেন মাধুরী। দিন যেন কাটে না। অভিযোগ ঝরে পড়ে বাবার বিরুদ্ধে। রবীন্দ্রনাথকে সরাসরিভাবে তাক্রমণ করার সাহস কারুর নেই। কিন্তু মাধুরীলতা তারই মেয়ে। তাই বাবাকে চিঠি লেখেন :

তোমার একলা মনে হয় না, কেননা তুমি ঢের বড় বড় জিনিষ ভাবতে, আলোচনা করতে, সেগুলোকে নিয়ে একরকম বেশ কাঁটাও। আমরা সামান্য মানুষ, আমাদের একটু গল্পগুজব মানুষজন নিয়ে থাকতে এক একসময় একটু আধটু ইচ্ছে করে। আর যদি তুমি এখানে এসে আর নড়তে না চাও তবে তুমি যে যে মহৎ বিষয় নিয়ে থাকে। তাই সব আমাদের একটু একটু দাও।

ভাবতে অবাক লাগে, মাধুরী যখন এ চিঠি লিখছেন তখন তার বয়স চোদ্দও পুরো হয়নি। তখন থেকেই তিনি পিতার দার্শনিক চিন্তার শরিক হতে চেয়েছেন।

মাধুরীর চোদ্দ বছর বয়স হতেই তার বিয়ের জন্যে ব্যস্ত হয়ে উঠলেন রবীন্দ্রনাথ। মনের মতো ছেলে পাওয়া কি এতই সোজা? তার ওপর মোটা বরপণ আছে। বন্ধু প্রিয়নাথ সেনের ওপর পড়ল পাত্র খোঁজার ভার। যখন কথাবার্তা। ফলপ্রসূ হয় না তখন বন্ধুকে সান্ত্বনা দিয়ে লেখেন, বৃথা চেষ্টায় নিজেকে ক্ষুব্ধ কোরো না। আবার লেখেন, নদী যেমন চলতে চলতে একসময়ে সাগরে গিয়ে পড়েই, সেইরকম বেলা যথাসময়ে তার স্বামীকুলে গিয়ে উপনীত হবে। কিন্তু এ তো সান্ত্বনা। এভাবে বসে থাকলে তো মেয়ের বিয়ে হয় না। অবশেষে সুপাত্রের সন্ধান মিলল। কবি বিহারীলাল চক্রবর্তীর পুত্র শরৎ-কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ের কৃতী ছাত্র। দর্শনে অনার্স নিয়ে প্রথম শ্রেণীতে প্রথম হয়ে। পেয়েছেন কেশব সেন স্বর্ণপদক। তারপর মেন্টাল এ্যাণ্ড মর্যাল সায়েন্সে এম. এ., তাতেও প্রথম। এখন ওকালতী পাশ করে মজঃফরপুরে প্র্যাকটিস করছেন। সব দিক থেকেই মনোমত পাত্র। কবি বিহারীলালের প্রতি রবীন্দ্রনাথের আকর্ষণ প্রথম জীবন থেকে সেই তিন তলার ছাদ, ফুলের বাগান, জ্যোতিদাদার সাহিত্য মজলিশ, বৌঠানের প্রিয় কবি বিহারীলালের উদাত্ত, হাসি, সাধের আসন—সব যেন মনে পড়ে। এখন বিহারীলাল নেই, তার ছেলে। কি তার মতোই স্বভাব পাবে না?

শরতের মা মোটা বরপণ দাবি করলেন। বিয়ে হবে ব্রাহ্ম মতে। কবি তখনও সংস্কারক হননি। মেয়ের সুখের জন্য ক্ষুব্ধ অভিমানে বরপণের দাবিও মেনে নিলেন। সম্মত হলেন দশ হাজার টাকা দিতে। গুরুজনদের প্রতি কোনরকম বিরুদ্ধাচরণ করে শরৎ এ বিয়েতে মত দিতে চাননি, কবিও না, তাই পণের টাকা নিয়ে কোন পক্ষই কিছু ভাবেননি। এর আগে বলেছি, মহর্ষি মেয়েদের বিয়েতে যৌতুক দিতেন তিন হাজার টাকা, এবারে দিলেন পাঁচ হাজার। বাকিটা দিলেন কবি। পণের টাকা দেওয়া নিয়েও বিস্তর লেখালেখি হল। বিয়ের কথা পাকা হবার পরেও বাধা এসেছিল, কারণ শরৎত্রা যে শ্রেণীর ব্রাহ্মণ, তার সঙ্গে মাধুরীর বিয়ে কুটুম্বদের মনঃপূত হয়নি। অবশ্য এসব আপত্তি কবি গায়ে মাখলেন না।

বিয়ের পর মাধুরী স্বামীর প্র করতে গেলেন মজঃফরপুরে। সেখানে ওরকম যৌতুক নিয়ে ঘরবসত করতে কেউ আসেনি। অপর্যাপ্ত শাড়ি, গয়না, অসামান্য রূপ। তার ওপর মাধুরীর মধুর ব্যবহারে সমস্ত মজঃফরপুরবাসী বাঙালী বিস্ময়ে মুগ্ধ হয়ে গেলেন। এর ওপর অতিথিরূপে এসেছেন মাধুরীর কবিপিতা। লোক সমাগমের যেন শেষ নেই। এত ঝঞ্চাটের মধ্যেও কবি খুশি হয়েছিলেন জামাই হিসেবে শরৎকে পেয়ে স্ত্রীকে লিখলেন, এমন সম্পূর্ণ নির্ভরযোগ্য জামাই তুমি হাজার খুঁজলেও পেতে না। অনেক উপদেশ দিয়েছিলেন মেয়েকে; মাধুরী উত্তরে লিখেছেন, এ বাড়ির মেয়ে বলে উনি আমাতে অনেক সদগুণ আশা করেন, তাতে যাতে না নিরাশ হন আমি সেই চেষ্টা করব।

মাধুরীর চেষ্টা সফল হয়েছিল। সতেরো বছরের দাম্পত্য জীবনে সুখী হয়েছিলেন শরৎ ও মাধুরী। মজঃফরপুরের জীবনের সঙ্গে নিজেকে মানিয়ে নিতে নিশ্চয় কষ্ট হয়েছিল মাধুরীর। লেখিকা অনুরূপা দেবীর সঙ্গে এ সময় মাধুরীর আলাপ হয়। দুজনের স্বামীরা ছিলেন দুই বন্ধু। সেই সূত্রে বন্ধুত্ব। বিয়ের সময় অনুরূপা মজঃফরপুরে ছিলেন না। ফিরে এসে মাধুরীকে দেখলেন এক স্নিগ্ধোজ্জল চৈত্র অপরাহ্নে। দেবকন্যার মতোই অপরূপা। সকলেই তার গুণে মুগ্ধ। মাধুরীর গৃহিণীপণার গল্প আর করব না। কবির চিঠিতে তার উল্লেখ আছে। ঠাকুরবাড়ির মেয়েরা, শুধু ঠাকুরবাড়ির মেয়েরা কেন, বাঙালী মেয়েরা গৃহিণীপণায় খুব পটু। সুতরাং অন্য প্রসঙ্গে আসি।

বিহারে তখন প্রচণ্ড পর্দার যুগ চলছে। সেই পর্দা ভেদ করে মেয়েদের কাছে শিক্ষার আলো পৌঁছয় না। এইরকম জায়গায় এসে মাধুরী কি শুধু আপন সংসারটিকে নিয়ে সাজিয়ে গুছিয়ে নিশ্চেষ্ট হয়ে থাকতে পারেন? না পারা সম্ভব? বিশেষ করে মাধুরী সেই ঠাকুরবাড়ির মেয়ে, যে মেয়ের জ্ঞানের আলো জ্বালাতে বারবার এসে দাঁড়িয়েছেন পুরুষের পাশে। মজঃফরপুরে যদিও শরৎকে কোন সমাজ-সংস্কারের কাজে মগ্ন হতে দেখা যায়নি তবে স্ত্রীর ইচ্ছেয় তিনি বাধাও দেননি। তাই মাধুরী কাজ শুরু করে দিলেন অনুরূপাকে সঙ্গে নিয়ে। কলকাতায় তিনি দেখে এসেছেন নারী শিক্ষা প্রসারের চেষ্টা, দেখেছেন তার দিদিরা কেমন মেতে উঠেছেন জনসেবার কাজে। এখানেও রয়েছে অনেক কাজ। মেয়েরা একেবারে অশিক্ষিত, ঘোর পর্দার আড়ালে তাদের জীবনের সবটাই প্রায় ঢাকা। এমন উপযুক্ত পরিবেশে শিক্ষার বীজ বপন করতেই হবে। সখী অনুরূপাকে নিয়ে মাধুরী সেখানে গড়ে তুললেন লেডিজ কমিটি, যুগ্ম সম্পাদিকা হলেন দুজনেই। তারপর প্রতিষ্ঠা করলেন একটা গালস স্কুল, চ্যাপম্যান বালিকা বিদ্যালয়। স্কুল তো হল, ছাত্রী কই?

মজঃফরপুরে ছাত্রী জোগাড় করা সহজ নয়। বাংলার তুলনায় বিহারের মেয়েরা তখনও পেছনে পড়ে আছেন। মাধুরীর সমসাময়িককালেই বিহারের মেয়েদের কথা আরো অনেক বেশি ভেবেছিলেন অঘোরকামিনী রায়। তার অক্লান্ত চেষ্টায় বাঁকিপুরের মেয়েদের অবস্থা কিছু বদলেছে। তিনি নিজের কাছে মেয়েদের রেখে তাদের একটু একটু করে শিখিয়েছেন। এভাবেই প্রথম পনেরোজন শিক্ষিত হয়ে ওঠে। অঘোরকামিনীর সঙ্গে সঙ্গে কাজ করতেন। তার মেয়েরাও। বিহারের মেয়েরা থাকত পর্দার আড়ালে। পর্দা প্রথা দূর করবার জন্যে অঘোরকামিনী ব্ৰহ্মসঙ্গীত গাইতে গাইতে মেয়েদেব নিয়ে পথে বেরোতেন। সে এক দৃশ্য! তাদের সমবেত সঙ্গীত সাহস জোগাত অন্যদের, একটু একটু করে খুলে যেত বন্ধ দুয়ার। অবশ্য অঘোরকামিনীর মতো সমাজ সেবিকার সঙ্গে মাধুরীর কোন তুলনা হয় না। কতই বা বয়স তার? কদিনই বা ছিলেন মজঃফরপুরে? এসময় আরো একজন মহিলা ভাগলপুরের মেয়েদের দুরবস্থা দূর করতে এগিয়ে এসেছিলেন, কিন্তু পারেননি। তাঁর নাম বেগম রোকেয়া সাখাওয়াত হোসেন। তিনিও বাংলারই মেয়ে। বিয়ে হয়েছিল ভাগলপুরের ডেপুটি ম্যাজিষ্ট্রেট খান বাহাদুর সৈয়দ সাখাওয়াত হোসেনের সঙ্গে। বিদুষী স্ত্রীকে তিনি লেখাপড়া ও বইলেখার কাজে উৎসাহ দিতেন। মৃত্যুকালে একটা মেয়েদের স্কুল স্থাপন করে স্ত্রীকে তার ভার দিয়ে যান। মাত্র পাঁচটি মেয়ে ও একজন শিক্ষিকা নিয়ে স্কুলের কাজ শুরু করেন রোকেয়া। কিন্তু সেখানে বিশেষ করে মুসলমান সমাজের অবস্থা তখন অবর্ণনীয়। বোরখার অন্ধকারে হাঁফিয়ে উঠে কত মেয়ে যে ছটফট করত কে তার হিসেব রাখে! বিয়ে-সাদী স্থির হলে মেয়েকে ছয় কি সাত মাস রাখা হত অন্ধকার ঘরে। দিন-রাত আটক থাকতে থাকতে কেউ হারাত স্বাস্থ্য, কেউ হারাত জীবন, কেউ হারাত দৃষ্টিশক্তি, তবু পর্দা এতটুকু ফাঁক হত না। এদের ভাল করার সাধ্য একা রোকেয়ার ছিল না। স্বামীর স্মৃতি রক্ষার জন্যে তাকে স্কুলটি তুলে নিয়ে চলে আসতে হয় কলকাতায়। তবে ভাগলপুরে মেয়েদের জন্যে কিছু কাজ করতে পেরেছিলেন। দীপনারায়ণ সিং-এর স্ত্রী লিলিয়ান বা লীল। ভাগলপুরের পাশেই তো মজঃফরপুর। সেখানে দুটি সংসার-অনভিজ্ঞা কিশোরী বধূ কি করে স্কুল চালাবেন!

অনুরূপা হতাশ হয়ে হাল ছেড়ে দিতে চান কিন্তু মাধুরীর ধৈর্য অসাধারণ। সখীকে টেনে নিয়ে ঢাকা ঘোড়ার গাড়ি চড়ে মাধুরী বাড়ি বাড়ি ঘুরতে শুরু করলেন। মেয়েরা তখনও অসূর্যম্পশ্যা। তাদের মনে বিশ্বাস উৎপাদন করবার জন্যে মাধুরীদের লুকোতে হত আড়ালে। গাড়ি থেকে নামার সময় দুদিকে চাদর ধরে আড়াল করা পথ দিয়ে তাঁরা গৃহস্থবাড়ীতে ঢুকতেন। কেন এই প্রয়াস? তারা তোত অসূর্যম্পশ্যা নন। তবু বিশ্বাস আনতে হবে তো। খণ্ডন করতে হবে বিবিয়ানার অপবাদ। আপনজনের সামনেই তো খুলবে মনের বদ্ধ দুয়ার, তাই ছোট শহরের সামাজিক রীতিকে উপেক্ষা করলেন না মাধুরী। একটু একটু করে সত্যিই দরজা খুলতে লাগল। মজঃফরপুরে বেশিদিন থাকলে মাধুরীও নিশ্চয় সমাজসেবিকা হিসেবে নাম করতেন! কিন্তু স্ফুলিঙ্গ দাবানলে পরিণত হবার আগেই পট পরিবর্তন হল! মাধুরী ফিরে এলেন কলকাতায়।

মাধুরীর লেখাপড়ার দিকে নজর ছিল রবীন্দ্রনাথের। তাই বোধহয় লেখার হাত খুলেছিল প্রথম থেকেই। চিঠিগুলোই তার প্রমাণ। এছাড়াও তার আটটা রচনার খোঁজ পাওয়া গেছে। মনে হয় এ সময়েই কবি মৃণালিনীর অসমাপ্ত রামায়ণটা মেয়ের হাতে তুলে দেন। শরৎ ব্যারিস্টারি পড়তে বিলেতে গেছেন। অবসর সময়ে মাধুরী শান্তিনিকেতনে বাচ্চাদের পড়াতেন। গল্প লেখার শুরুও এখানে অনুবাদ ছাড়া তিনটে গল্পে নতুনত্ব এবং শক্তির পরিচয়। পাওয়া যায়। আত্মপ্রকাশে কুণ্ঠিত মাধুরীকে লিখতে বলতেন অনুরূপাও। তারপর বাবার উৎসাহে লিখে ফেললেন সুয়ো, মাতশত্রু, সৎপাত্র, অনাদৃতা, চোর প্রভৃতি গল্প। ছাপা হয়েছিল ভারতী, প্রবাসী ও সবুজপত্রে। অবশ্য সে আরো পরের কথা। তখন মাধুরী আছেন জোড়াসাকোতে, শরৎ বিলেতে। স্ত্রী, রেণুকা আর শমীন্দ্রকে হারিয়ে কবি অবশিষ্ট সন্তানদের আরো আপন করে নিতে চাইলেন। এই সময়ই মকসো চলত গল্পের। খসড়া দেখে দিতেন মাধুরীর বাবা। কবি প্রশান্ত মহলানবিশকে বলেছিলেন, ওর ক্ষমতা ছিল, কিন্তু লিখত না। মাতশত্রু বা সৎপাত্র পড়লেই এ কথা বোঝা যাবে। তবে এসব গল্পে রবীন্দ্রনাথ কতখানি কলম চালিয়েছিলেন বলা শক্ত। হয়ত শুধু কাঠামোটাই ছিল মাধুরীর। গল্প গুচ্ছের প্রথম মুদ্রণে সংপাত্র তো রবীন্দ্রনাথের রচনা হিসেবেই ছাপা হয়। পরে কবি জানান সেটি তার কন্যার লেখা। এ গল্পে নারীমাংসলোলুপ সাধুচরণের শ্বাপদবৃত্তির যে ছবি আঁকা হয়েছে তা যেমন তীব্র তেমনি ভয়াবহ। গল্পের শেষে একটি মাত্র মন্তব্য স্ত্রীর হিসাবে সাধুচরণের যত্র আর তত্র ব্যয়। এই গল্প এবং শেষের মন্তব্যটির অনির্বাচ্য ব্যঞ্জনায় মাধুরীর চেয়ে বিশ্ববিখ্যাত বাবার হাতই যে বেশি ছিল তাতে কোন সন্দেহ নেই। মাতশত্রুও বেশ নতুন ধরনের গল্প। এক হতভাগিনী মায়ের দুর্জয় লোভ ও তার পরিণতি নিয়ে লেখা। শরৎকুমারীর সোনার ঝিনুকের সঙ্গে এর আশ্চর্য মিল রয়েছে। হয়তো মূল গল্পটি কবিই দুজনকে বলেছিলেন, দুটো গল্পই অবিশ্বাস্য অথচ বিশ্বাসযোগ্য করে তোল হয়েছে। মাধুরীর বন্ধু অনুরূপার সঙ্গে কবির দেখা হয়েছিল একবার। কবি অনুরূপাকে বলেছিলেন, তোমার দেখাদেখি ইদানীং গল্প লিখতে আরম্ভ করেছিল। বেঁচে থাকলে হয়ত তোমার মতো লিখতে পারত।

নিতান্ত অকালে-হারানো মাধুরীলতার জীবন যেভাবে শুরু হয়েছিল সেভাবে শেষ হল না। ১৯০৯ থেকে ১৯১৩ সাল পর্যন্ত জোড়াসাঁকোতে কাটলেও তারপর শুরু হয়েছিল ঘোর অশান্তি। কারণটা ঠিক জানা যায়নি। কবি ছিলেন বিদেশে। জোড়াসাঁকোর বাড়ি তদারকির ভার ছিল ছোট জামাই নগেন্দ্রনাথের হাতে। শোনা যায়, ঐ সময়ে শরতের ওপর নানারকম অবিচার করা হয়। দোষ ছিল না তার। তবু ফিরে আসার পর মাধুরীর মুখে সব কথা শুনেও কবি যখন কোন ব্যবস্থা না করেই শান্তিনিকেতনে ফিরে গেলেন তখন ক্ষুব্ধ অভিমানে শরৎ ও মাধুরী চলে গেলেন ডিহি শ্রীরামপুরের বাড়িতে। এরপর আর কোনদিন শরতের সঙ্গে রবীন্দ্রনাথের দেখাসাক্ষাৎ হয়নি। আর মাধুরীলতা?

মৃত্যুসংবাদ ছাড়া তার সম্বন্ধে আর কি কিছুই জানা যাবে না? দেবতুল্য বিশ্ববন্দিত পিতার সঙ্গে তার বিচ্ছেদ ঘটল, সে সময় কে রইল পাশে? কে দিল সান্ত্বনা? এ সময় থেকেই তিনি ধীরে ধীরে রোগশয্যা নিলেন। বছরখানেক পরে একটু সুস্থ হয়ে অনুরূপাকে লিখেছিলেন, বন্ধুহার মম অগ্ধ ঘরে, থাকি বসে অবসন্ন মনে। রোগশয্যায় শুয়ে মাধুরী অনুভব করেছেন :

একটা আবরণ সরে গেছে, মানুষকে যেন নতুন করে দেখতে শিখেছি। এরকম কঠিন ভাবে মনটা নাড়া না পেলে হয়ত কখনো ক্ষাগত না।

মাধুরী উপলব্ধি করেছেন, তার জীবনে এতদিন আত্মার সঙ্গে মনের পরিচয় হবার সুযোগ হয়নি, হয়েছে সুদীর্ঘ বোগশয্যায়, জীবনমৃত্যুর মাঝখানে। এই নতুন উপলব্ধি নিয়ে মাধুরী আর সংসারে ফিরে আসতে পারেননি। সম্প্রতি জানা গেছে, অনুরূপা ছাড়াও আর এক বান্ধবীর সঙ্গে এসময় পত্রালাপ করেছিলেন মাধুরী, তার নাম ইন্দুপ্রভা। ইন্দুপ্রভাকে লেখা চিঠিতে অবশ্য নেই তার নতুন উপলব্ধির কথা কি কোন বিষণ্ণতার আভাস। তবে কি মাধুরী তখন সবই ভুলে যেতে চাইছিলেন? তাই চিঠিতে লিখেছেন, মেয়েমানুষকে যখন বি, এ ছাড়া অন্য পাশ দিতে হয় না তখন অত লম্বা স্মরণশক্তি রেখে কি ফল? এসময় একবার হাজারিবাগে ইন্দুপ্রভার বাড়িতে যাওয়ার ইচ্ছে ছিল। মাধুরীর, মনে হয় যাওয়া হয়নি। কবিকেও বারবার যেতে হয়েছে বিদেশে। এণ্ডজের মুখে বাবার বিজয়বার্তা শোনেন মাধুরী। প্রদীপ্ত হয়ে ওঠে মেয়ের পাণ্ডুর মুখ। তারপর শোনা গেল ডাক এসেছে মাধুরীর। যে রোগে মারা গেছেন ছোট বোন রেণুকা, সেই রাজাই বাসা বেঁধেছে স্বর্গীয় মাধুরীমাখা বেলার শরীরে। এ তো বেলার অসুখ নয়। এ যে মহাকালের পরীক্ষা! কবি রথীন্দ্রকে লিখলেন, জানি বেলার যাবার সময় হয়েছে। আমি গিয়ে তার মুখের দিকে তাকাতে পারি এমন শক্তি আমার নেই।

সময় যখন সত্যিই ঘনিয়ে এল, তখন কবিকে এসে বসতেই হল মেয়ের পাশে। বিছানায় মিশে থাকা, তিল তিল করে ক্ষয়ে যাওয়া রুগণ শরীর, দুখানি শীর্ণ সাদা হাত বাড়িয়ে মাধুরী ছেলেবেলার মতো আবদার করেন, বাবা গল্প বলো।

বাবার বুকে শেলাঘাত হয়। এই তো সেদিন, কদিন আর হবে, তার অবুঝ চঞ্চল মেজ মেয়ে রাণীও বেলার মতোই শীর্ণ হাত দিয়ে আঁকড়ে ধরেছিল তাকে, বলেছিল বাবা গল্প বলো। আবার? এত শীঘ্র গল্প শোনাতে হবে আরেক জনকে, কথাকোবিদ পিতার গল্পের ঝুলিও বুঝি শেষ হয়ে যেতে চায়। রুদ্ধ হয়ে আসে কণ্ঠ। তবু বলেন। রেণুকা শুনেছিল ছোট ছেলের গল্প—শিশুর কবিতা —সে নিজেও যে শৈশবের সীমানা পার হয়নি। বেলা বুঝি শোনেন পলাতকার বিনুর গল্প, মুক্তি, হারিয়ে যাওয়া বামির কথা! এই গল্প শোনাও একদিন ফুরল।

মাধুরীলতার মৃত্যুসংক্রান্ত কিছু তথ্যঘটিত ভ্রান্তি রয়েছে। বেশির ভাগটাই শরৎকে নিয়ে। আমরা ঠিক না জানলেও একথা সত্য যে জোড়াসাঁকোর বাড়িতে যে অপ্রীতিকর অবস্থার উদ্ভব হয়েছিল মাধুরীর মৃত্যুর মতো বিশাল ঘটনাতেও তার জের মেটেনি। রবীন্দ্রজীবনীকার প্রভাতকুমার মুখোপাধ্যায় লিখেছেন, কবির সঙ্গে আর শরতের সাক্ষাৎ হয়নি। বেলা যখন মৃত্যুশয্যায় তখন কবি কন্যাকে দেখতে যেতেন দুপুরে—যখন জামাতা আদালতে। অপর দিকে হেমলতার উক্তি তুলে ধরেছেন মৈত্রেয়ী দেবী। তাতে দেখা যাবে হেমলতা বলেছেন, অত আদরের মেয়ে বেলা তার মৃত্যুশয্যায়, সব অপমান চেপে তিনি দেখা করতে যেতেন। শরৎ তখন টেবিলের উপর পা তুলে দিয়ে সিগারেট খেত। পা নামাত না পর্যন্ত—এমনি করে অপমান করত। উনি সব বুকের মধ্যে চেপে মেয়ের পাশে বসতেন, মেয়ে মুখ ফিরিয়ে থাকত।

দুটি উক্তিই আমাদের মনে সংশয় জাগিয়েছে। কারণ রবীন্দ্রনাথ এবং প্রশান্ত মহলানবিশ দুজনেই বলেছেন তারা মাধুরীকে দেখতে যেতেন সকাল বেলা। প্রশান্ত তাকে নিয়ে যেতেন গাড়ি করে, তাই তার ভুল হবার সম্ভাবনা কম। অপর দিকে রবীন্দ্রজীবনীকার বলেছেন দুপুরবেলা। অবশ্য এই সময়টা বেলা দশটার পর হলে, বোধহয় কোনো সংশয় থাকে না। অপর দিকে হেমলতার কথাকেও বিনা দ্বিধায় মেনে নেওয়া গেল না, কারণ কবি নিজে বলেছেন মেয়ে তাকে বলতেন বাবা গল্প বলে। বেলার মৃত্যুর পরে রামেন্দ্রসুন্দর ত্রিবেদীকে লেখা চিঠিতেও দেখা যাচ্ছে, কবি লিখেছেন তিনি তার মেয়ের রোগযন্ত্রণা কিছুই লাঘব করতে পারেননি, পারা সম্ভবও ছিল না অথচ পিতার উপর শেষ পর্যন্ত তাহার নির্ভর ছিল। তাই মেয়ের মুখ ফিরিয়ে থাকার মধ্যে সন্দেহ থেকে যাচ্ছে। শরতের চাপা অভিমানী স্বভাবের সঙ্গেও যেন এই ব্যবহার খাপ খায় না। বরং তার সঙ্গে কবির দেখা না হবার সম্ভাবনাই বেশি। যেদিন দেখা হতে পারত অর্থাৎ বেলার মৃত্যুর সময়, সেদিন কবি ফিরে গিয়েছিলেন সিঁড়ি থেকেই। স্ত্রীর মৃত্যুর পরে শরৎ চলে গিয়েছিলেন মজঃফরপুরে, একটা পুরনো নীলকুঠি কিনে সেখানে গাছপালা ফুলের বাগান করে নিরালায় বাস করতেন। অনেকের মতে মাধুরীলতার বিবাহিত জীবন সুখের হয়নি। রবীন্দ্রনাথ তার ব্যর্থ-বিড়ম্বিত জীবন থেকেই সংগ্রহ করেছিলেন হৈমন্তী গল্পের বীজ। হৈমন্তীর সঙ্গে মাধুরীর সাদৃশ্য আছে ঠিকই তবে শরৎ ও মাধুরীর বিবাহিত জীবন ব্যর্থ হয়েছিল মনে হয় না। ইন্দিরা লিখেছেন, শরং তাদের স্বল্পকালস্থায়ী বিবাহিত জীবনে বেলার প্রতি বিশেষ অনুরক্ত ছিলেন। তবে ক্ষুব্ধ অভিমানের দুস্তর সেতু কবি বা শরৎ কেউই কোনদিন পার হতে পারেননি।
এবার রেণুকার কথায় আসা যাক। রবীন্দ্রনাথের মেয়েদের মধ্যে দীর্ঘ জীবনের অধিকারিণী শুধু মীরা বা অতসীলতা। মীরার আগে ছিলেন রেণুকা। কবির মেজো মেয়ে রাণী বা রেণুকার মৃত্যু হয়েছিল কৈশোরে, ফুল হয়ে ফুটে ওঠার আগেই। অত্যন্ত জেদী একরোখা ধরনের মেয়ে রেণুকার কথা সবচেয়ে বেশি জানা যায় মীরার স্মৃতিকথা থেকে। সব ব্যাপারেই তাঁর ছিল সুগভীর ঔদাসীন্য। সাজতে ভাল লাগত না, চুল বাঁধা তো বিরক্তিকর ব্যাপার। খানিকটা নিস্পৃহ অথচ খেয়ালী মেয়ে রেণুকার বিয়ে হয়েছিল মাত্র এগারো বছর বয়সে। বেলার বিয়ের একমাস পরেই। কবি এসে স্ত্রীকে বললেন, রাণীর বিয়ে ঠিক করে এলুম ছেলেটিকে আমার বড় ভাল লেগেছে ছোট বউ, যেমন সুন্দর দেখতে তেমনি মিষ্টি অমায়িক স্বভাব। রাণীটা যা জেদী মেয়ে, ওর বর একটু ভাল মানুষ গোছের না হলে চলবে কেন? তাই বিয়ে হয়ে গেল। রেণুকা কিন্তু এ বন্ধনটা খুব খুশি মনে মেনে নিতে পারলেন না, তার ভুরু একটু কুঁচকেই রইল। বিয়ের পরই বর বিদায় হবে শুনে একটু নিশ্চিন্ত হলেন। বিয়ের সব অনুষ্ঠানই লক্ষ্মী মেঘের মতো মেনে নিলেন। মায়ের মৃত্যু এবং স্বামী অকৃতকার্য হয়ে আমেরিকা থেকে ফিরে আসার রেণুকা খুব দুঃখিত হন। মনের। ব্যথা পরিণত হয় বুকের ব্যাধিতে। কবি তাঁকে শোনাতেন শিশুর কবিতা। মেয়ের শৈশবের কথা বলতে গিয়ে নিজের শৈশব উঁকি মেরে যেত বারবার। হাওয়া বদলের জন্যে নিয়ে গেছিলেন হিমালয়ে। কিন্তু কিছুতে কিছু যখন হল না তখন কবি কে প্রতিদিন উপনিষদের মন্ত্রের অর্থ বুঝিয়ে দিয়েছেন, যাতে ছেড়ে যেতে কষ্ট না হয়! তাই হয়ত যাবার সময় রেণুকা বাবার হাত চেপে ধরে বলেছিলেন, বাবা, ওঁ পিতা নোহসি বল। রেণুকার জীবনে তার বাবাই ছিলেন তার সব, তাই মৃত্যুর হাতে যখন আত্মসমর্পণ করতে হল তখন তিনি বাবার হাত ধরেই দরজাটুকু পার হতে চেয়েছিলেন।

নিজের দিদির কথা নিপুণভাবে বললেও মীর স্মৃতিকথায় ব্যক্তিগত ক্ষয়ক্ষতির। কোন আভাস দেননি। তাতে আছে শুধু নিজের ছেলেবেলার কথা। দুঃখের দারুণ আঘাত বারবার হানা দিয়েছিল মীরার জীবনে তবু সব শোকতাপ থেকে নিজেকে গুটিয়ে নিয়েছিলেন তিনি। তা বলে যে অন্যের দুঃখের বেদনা বুঝতে পারতেন না তা নয়, তাই তো রেণুকার কথাটুকু বললুম, কিশোরী রেণুকার কথা এত ভাল করে আর কেউ লেখেননি। এখন রেণুকার কথা থাক। মীরার কথাই বলি।

রবীন্দ্রনাথের সবচেয়ে কাছে থাকা সবচেয়ে নির্বাক মেয়েটি। হায়! বেলার ভাগ্যে জুটেছিল কত আদর! আর মীরা শৈশবেই হারিয়েছে মাকে, ভাইকে, দিদিকে। পিতার সান্নিধ্যই বা তেমন পেয়েছেন কোথায়? মানুষ হয়েছেন জ্ঞানদানন্দিনীর কাছে। বিবাহিত জীবনেও মীর সুখী হননি। সাধারণ ব্রাহ্মসমাজের নগেন্দ্রনাথ গঙ্গোপাধ্যায়কে ভাবী জামাতা রূপে নির্বাচন করেই কবি চরম ভুল করেছিলেন। প্রিয়দর্শন তেজস্বী নগেন্দ্ৰ আদি সমাজের নিয়ম অনুযায়ী মীরাকে বিয়ে করতে রাজী হয়েছিলেন আমেরিকা যাবার শর্তে। বিয়ের সময়েই উপবীত নিয়ে বিরোধ বাধে। আদি ব্রাহ্মসমাজের মতে উপবীত ধারণ অবশ্যকর্তব্য। সাধারণ সমাজের নিয়মানুযায়ী নগেন্দ্র উপবীত ত্যাগ করেছিলেন। এরপর তার বিরোধ শুরু হয় শং-মাধুরীর সঙ্গে, কবি নীরব থেকে অবিচার করলেন শরতের ওপর। কিন্তু অদৃষ্ট! সুখ ছিল না মীরার জীবনে। নগেন্দ্র তাকে ত্যাগ করে খ্রীস্টান হয়ে চলে যান ভিন্ন পথে। মীরাও তাকে ফিরিয়ে আনার কথা ভাবেননি; শুধু ছোট ছোট ছেলে-মেয়ে দুটিকে নিয়ে থেকেছেন স্বতন্ত্রভাবে। স্বামীর সঙ্গে আর একবার দেখা হয়েছিল মীরার, একমাত্র ছেলে নীতীন্দ্রের মৃত্যুশয্যার পাশে জার্মানীতে। কবি ভেবেছিলেন বিরাট দুঃখ দুটি অভিমানী হৃদয়কে কাছে এনে দেবে। দেয়নি। এমনকি মীরার স্মৃতিকথাতে একবারও আসেননি নগেন্দ্র, মীরার জীবন থেকে তিনি একেবারেই মুছে গিয়েছিলেন।

আত্মপ্রকাশে বিমুখ মীরার দিন কাটত নির্জনে। নিজের হাতে গড়া। মালঞ্চে বসে। একমাত্র সান্ত্বনা ছিল দুটি সন্তান। তারাও চলে গেল। নীতীন্দ্র অত্যন্ত অকালে, সেই পুরনো কালব্যাধি যক্ষ্মায়। নন্দিতা অনেক পরে। কিন্তু কোন রকম দুঃখশোকের বহিঃপ্রকাশ দেখা যেত না। কবি বলতেন, সব লোকের সামনে নিজের গভীরতম দুঃখকে ক্ষুদ্র করতে লজ্জা করে। মীরাও লুকিয়ে রেখেছিলেন দুঃখের উপচে-ওঠা ডালি। একেবারে শেষ জীবনে স্মৃতিকথা না লিখলে তাকে নিয়ে স্বতন্ত্র করে লেখার কিছু থাকত না।

জীবনের শেষ দিকে নিজেকে ব্যক্ত করতেই বা বসলেন কেন তিনি। তার কি মনে হয়েছিল যা হারিয়ে যায় তা আগলে বসে রইব কত আর তাই কি লিখে রাখতে চেয়েছিলেন? কখনই না। যার নিজের জীবনেরই সব কিছু হারানোর তহবিলে চলে গেছে সে আর কি চাইবে? তিনি স্মৃতিকথা লিখেছেন। রোগশয্যার দীর্ঘ অবসর কাঁটাবার জন্যে। তাই এর মধ্যে নেই কোন ধারাবাহিকতা, নেই নিজের জীবনের কোন ছবি। যাদের সান্নিধ্য তার অন্ধকার-মনের বুক চিরে আলোর আভাস এনে দিয়েছিল শুধু তাদের কথাই আছে। যার মনের আয়নায় তারা ধরা পড়লেন তিনিই শুধু রইলেন অধরা।

তবু মানুষ কি একেবারে নিজের কথা লুকিয়ে রাখতে পারে? তাই স্মৃতিকথার পাতাও আপনি হয়ে উঠেছে ভারি। যখন তার মনের মতো বাগানে ফুল ফুটত তখন আর কোন দুঃখ থাকত না। মন আর স্থির হয়ে আসত। মীরার ভাষা বা লেখার ভঙ্গিটিও ভারি সরল। একটু দেখলে মন্দ হয় না :

গাছ ভরে বেল জুই ফুটতে লাগল, সকালে উঠে লাল রাস্তার উপর শিশির ভেজা শিউলি ফুল বিছিয়ে আছে দেখতে পেতুম, বাতাসে দূর থেকে চামেলির গন্ধ ভেসে আসত, তখন আর আমার কোন দুঃখ রইল না। মনে হত এরা। আমাকে যথেষ্ট প্রতিদান দিয়েছে। কেননা কোন কাজে যখন আমি মন বসাতে পারছিলুম না, তখন এই বাগানের নেশা আমাকে বাঁচিয়ে রেখেছিল।

লেখার অনেক আগে মীরা রবীন্দ্র নির্দেশে কয়েকটি দেশী-বিদেশী। ইংরেজী প্রবন্ধের সর সংকলন করেন। আটটি ছাপা হয় প্রবাসীতে এবং তিনটি তত্ত্ববোধিনীতে। এছাড়া দীর্ঘ জীবনে মীর। শান্তিনিকেতনে বাস করলেও, বলতে গেলে কিছুই করেননি। মীরার সঙ্গে সঙ্গেই মহর্ষির নাতনীদের কথা বলার পালাও ফুল। এবার আসা যাক, এ বাড়ির নতুন-আসা বৌয়েদের কথায়। মেয়েরা যেমন ঠাকুরবাড়ির নিজস্ব সংস্কৃতিকে নিয়ে গিয়েছিলেন ভিন্ন পরিবারে তেমনি ভিন্ন পারিবারিক ঐশ্বর্যের গরিমা নিয়ে এসেছিলেন আরও কয়েকটি মেয়ে। তবে সকলে তো আর সমান প্রতিভার অধিকারী হতে পারেন

তাই যারা বিশেষ গুণ বতীরূপে খ্যাতি অর্জন করেছিলেন তাদের কথাই বলব। এ সময়ে ঠাকুরবাড়িতে যারা বৌ ছয়ে এসেছিলেন এঁদের মধ্যে তিনজনের নাম সবচেয়ে বেশি শোনা যায়। এই তিনজন হচ্ছেন হেমলতা, প্রতিমা ও সংজ্ঞা।
হেমলতা দ্বিজেন্দ্রনাথের জ্যেষ্ঠ পুত্রবধূ। দ্বিপেন্দ্রনাথের দ্বিতীয় স্ত্রী। দ্বিপেন্দ্রর প্রথমা স্ত্রী সুশীলা তার জীবনের স্বল্প অবকাশে অন্দরমহলকে হাসিয়ে-কাঁদিয়ে চলে গেছেন। বাংলা দেশের এক গ্রাম থেকেই বোঁ হয়ে এসেছিলেন সুশীল ও তাঁর বোন চারুশীলা, দু বোনের কেউই বেশিদিন বাঁচেননি। সুশীলা ভাল গান ও অভিনয় করতে পারতেন। প্রফুল্ল মন্ত্রী তার স্মৃতিচারণের সময় জানিয়েছেন যে, যে কোন গানই তিনি এমন ভাব নিয়ে গাইতেন যে লোকে মুগ্ধ হত। সুশীলার ছেলে দিনেন্দ্রর গানেও এই বৈশিষ্ট ছিল। সুশীলা অভিনয় করেছেন ঠাকুরবাড়ির সেই সোনালি পর্বে। বিবাহ-উৎসব নাটিকায় তিনিই সাজতেন নায়ক। তার একটা গান ও কেন চুরি করে চায় তখন খুব জনপ্রিয় হয়েছিল। অবশ্য এই জনপ্রিয়তা ঠাকুরবাড়ির বাইরে নয়। বাইরে সুশীলার গান অভিনয় কিছুই পোঁছয়নি। তার স্বভাবটি ছিল ভারি মিষ্টি। সবার সঙ্গে মিলে-মিশে হৈচৈ করতে ভালবাসতেন, তারই মধ্যে দেখা গেল মেমেরাইজ করার দুর্লভ ক্ষমতাও সুশীলায় যথেষ্ট রয়েছে। তিনি দীর্ঘজীবী হলে আর একটি প্রতিভাময়ী নারীকে আমরা দেখতে পেতুম।

সুশীলার মৃত্যুর পরে ঠাকুরবাড়ির বৌ হয়ে আসেন হেমলতা। রাজা রামযোহন রায়ের পুত্র রাধাপ্রসাদ রায়ের দৌহিত্র বংশে তার জন্ম। ইতিপূর্বে তার তিন দাদার সঙ্গে ঠাকুরবাড়ির তিনটি মেয়ের বিয়ে হয়েছে। এবার সে বাড়ির বৌ হয়ে এলেন হেমলতা, বিয়ের আগে থেকেই ঠাকুরবাড়ির অন্তঃপুরের সঙ্গে হেমলতার পরিচয় ছিল। ষোলো বছর বয়সে বৌ হয়ে এসেই দ্বিপেন্দ্রর দুটি ছেলেমেয়ের একেবারে আসল মা হয়ে উঠলেন। তারপর থেকে হেমলতার বড় মা হয়ে ওঠার কাহিনী এগিয়েছে মসৃণভাবে। তার নিজের সন্তান ছিল না, কিন্তু তিনি ছিলেন সবারই বড় মা। জীবনের শেষদিন পর্যন্ত এই শ্রদ্ধা ও সম্মান পেয়েছেন তিনি। সেবা, শুশ্রুষা, আদর-যত্ন, দেখাশোনা, কর্তৃত্ব ক্ষমতার সঙ্গে সঙ্গে ছিল লেখবার দুর্লভ ক্ষমতা। আদি ব্রাহ্মসমাজে তিনি প্রথম আচার্য। পারিবারিক কাজ, সমাজ সেবা, ধর্মোপদেশ দানের ফাঁকে ফাঁকে চলত তার সাহিত্য-সাধনা।

ছোটবেলা থেকেই হেমলতা বিদ্যোৎসাহিনী। তাই তার বাবা লতিমোহন যত্ন করে মেয়েকে বাংলা, ইংরেজী ভাষার সঙ্গে শিখিয়েছিলেন জ্যোতিষশাস্ত্র। মেয়েদের জ্যোতিষ পাঠ নিষিদ্ধ। যাদের বাঁচা-মরা খাওয়া-পরা নির্ভর করে পরের হাতে সে নিজের ভাগ্য গণনা করে করবেই বা কি? তাই মেয়ের মা বিরোধিতা। করতেন। এখন দিন বদলেছে। তাই ললিতমোহন হেসে বলতেন, এই মেয়ে আমার ব্রাহ্মণ। ব্রাহ্মণের মতোই হেমলতার ধারণাশক্তি ছিল তাই জ্যোতিষচর্চা। করা মোটেই অসম্ভব নয়। হেমলতার জ্যোতিষচর্চা অবশ্য কতটা এগিয়েছিল জানা। যায়নি তবে কয়েকটা গল্পে তার ছাপ পড়েছে। এছাড়া দাদা মোহিনীমোহনের কাছে তিনি পড়েছিলেন কালীসিংহির মহাভারত। বিয়ের পরও তার আগ্রহ দেখে দ্বিপেন্দ্র মিস ম্যাকস্কলকে নিয়োগ করেন হেমলতাকে ইংরেজী পড়াবার। জন্যে। শান্তিনিকেতনে বাস করার সময় হেমলতাকে দুবছর নিয়মিতভাবে ইংরেজী পড়ান পিয়ার্সন সাহেব। এণ্ডজের কাছে হেমলতা পড়তেন ইংরেজী কবিতা। হেমলতা পড়তেন রবীন্দ্রনাথের কাছেও। কবি দেশবিদেশের ইংরেজী পত্রিকা থেকে ভাল ভাল প্রবন্ধ বেছে নিয়ে হেমলতাকে অনুবাদ করতে দিতেন। শুধু সাহিত্য বা ভাষা নয়, হেমলতার আগ্রহ ছিল ধর্ম ও আধ্যাত্মবাদের ওপর। তার বাবা ছিলেন তৈলঙ্গস্বামীর সাক্ষাৎ শিষ্য। দাদা মোহিনীমোহনও প্রথমে থিয়সফিস্ট আন্দোলনের এবং পরে শিবনারায়ণ স্বামীর সংস্পর্শে আসেন। হেমলতাও পরমহংস শিবনারায়ণ স্বামীকেই গুরু হিসেবে গ্রহণ করেছিলেন। সুতরাং বিভিন্ন আধ্যাত্মিক চিন্তা ও ধর্মসাধনার প্রতি তার আগ্রহ ছিল। রাজা রামমোহনের ঐতিহ্য তো ছিলই, বিয়ের পরে এর সঙ্গে যুক্ত হল মহর্ষির জীবনসাধনা। রবীন্দ্রনাথের কাছে তিনি কিছু সুফীবাদের বইও পড়েন। অনুবাদ করেন আফ্রিকায় ইসলাম প্রবন্ধটি। সেটি পড়ে একদিন কবি পড়াতে পড়াতে বলেন, তুমি মুসলমান হবে নাকি? তোমার মন যে রকম উজ্জ্বল হয়ে ওঠে দেখি, সুফীদের কথায়।

হেমলতা তখন নতুন বৌ নন। তাই বললেন, সুফীরা মহাতাপস, তবে কোন কিছু হাওয়াইওয়ি চবে না রাজা রামমোহনের যুগে। কোন একটা কোঠায় ঢোকা যায় কি করে?

কবি শুনে খুশি হয়েছিলেন, কথা ঠিক। তোমার ওপর রাজা রামমোহনের আশীর্বাদ আছে দেখছি।

মহর্ষির আশীর্বাদও পেয়েছিলেন হেমলতা। বলেরে মৃত্যুর পর পারিবারিক ধর্মালোচনার সময় তার আগ্রহ, উৎসাহ এবং পৃথক ধর্মসাধনার কথা মহর্ষি শুনতে পান ও হেমলতার সঙ্গে প্রতিদিন দুপুরে একঘণ্টা ধর্মালোচনা করতে আরম্ভ করেন। এভাবেই কাটে দীর্ঘ সাত বছর।

মৃত্যুর আগে নাতবৌয়ের ধর্মবিশ্বাস ও ভগবৎ ভক্তির প্রতি আস্থার নিদর্শন রূপে মহর্ষি তাকে দিয়ে যান নিজের দীক্ষার আংটিটি। হেমলতা একথা জানতেন না। মহর্ষির মৃত্যুর পরে তাঁর খাজাঞ্চী যদুনাথ চট্টোপাধ্যায় আংটিটি হেমলতাকে দিয়ে বলেন, কর্তামহাশয় ইহা আপনাকে দিবার জন্য আমাকে বলিয়া গিয়াছেন এবং বলিয়াছেন আপনিই ইহার প্রকৃত অধিকারী। হেমলতা অনেকদিন এই আংটি পরেছিলেন, পরে আংটিটি শান্তিনিকেতনের রবীন্দ্রভবনে রাখা হয়। এই ঘটনা থেকেই প্রমাণ পাওয়া যায় হেমলতা ছিলেন সবার থেকে স্বতন্ত্র এবং মহর্ষির জীবন-সাধনার যোগ্যতম উত্তরাধিকারিণী। এ সময় ঠাকুরবাড়ির মেয়েরা বিভিন্ন দিকে এঁকে দিচ্ছেন নিজেদের সাফল্যের পরিচয় আর হেমলতা নীরবে নিভৃতে দিচ্ছেন ধর্ম উপদেশ। এই উপদেশগুলি পুস্তিকার আকারে ছাপা হয়েছিল। পরমাত্মায় কি প্রয়োজন, সৃষ্টি ও স্রষ্টা কাহার নাম, চৈতন্যময় পূর্ণ ও সর্বশক্তিমান ঈশ্বর কাহার নাম, সত্য লাভের উপায় কি প্রভৃতি উপদেশে ব্রাহ্মধর্মের সারসত্য নিহিত আছে। ধর্ম সম্বন্ধে হেমলতার যেমন গোঁড়ামি ছিল না তেমনি সর্বধর্মের প্রতি ছিল তার আন্তরিক শ্রদ্ধা। রামকৃষ্ণ মিশনের সন্ন্যাসীরা হেমলতার বক্তৃতা শুনে আনন্দিত হতেন। শ্রীরামকৃষ্ণ পরমহংসদেবের জন্মশতবর্ষপূর্তি উৎসবে যোগ দিয়ে তিনি ঠাকুরকে ব্যাখ্যা করেছিলেন, সহজ আনন্দের উৎস শিশু ভোলানাথ রূপে।

ধর্মচর্চার সঙ্গে সঙ্গে হেমলত করেছেন সাহিত্যচর্চা এবং সমাজসেবা। এ কাজেও তিনি কোন বাধা পাননি। মেয়েদের বাধা ক্রমশই অপসারিত হচ্ছিল। তার ওপরে তিনি ধর্মপ্রাণ, সুশিক্ষিত এবং ধনী-ঘরনী। সব কাজের মধ্যেও বাড়ির সবার জন্যে সর্বদা ব্যস্ত থাকত তার দুit সেবানিপুণ হাতের প্রাণঢালা শুশ্রুষা। কি করে যে এত কাজ তিনি করতেন কে জানে? গল্প-কবিতা-প্রবন্ধনাটিকা-শিশুপাঠ্য বই-স্মৃতিকথা-গান বলতে গেলে সবই লিখেছেন হেমলতা। এর ওপর ছিল বঙ্গ লক্ষ্মী পত্রিকা সম্পাদনা, সরোজনলিনী ও বসন্তকুমারী বিধবা আশ্রমের ভার। ছিল শান্তিনিকেতনের ছেলেদের দেখাশোনার ভার। প্রথমে তার সাহিত্যচর্চার কথাটাই সেরে নেওয়া যেতে পারে। ঠাকুরবাড়িতে এসে অনেকেই লেখিকা হয়েছেন কিন্তু হেমলতার সাহিত্যবোধ ছিল সহজাত। এ বাড়ির বৌ হয়েও তার নিজস্বতা তিনি হারাননি। তাই তাঁর গল্পে পাওয়া যাবে ভিন্ন সুরের সন্ধান, তবে প্রবন্ধ-স্মৃতিকথায় তিনি ঠাকুরবাড়ির বিশেষ ভঙ্গিটিকেই গ্রহণ করেছেন।

হেমলতার কবিতার বই প্রকাশিত হয়েছে মাত্র তিনটি—জ্যোতিঃ, অকল্পিতা ও আলোর পাখি। এছাড়াও অনেক কবিতা এখনও পত্র-পত্রিকায়। ছড়িয়ে আছে। রবীন্দ্রনাথ এবং জ্যোতিরিন্দ্রনাথ হেমলতার কয়েকটা কবিতায় সুর দিয়েছিলেন। রবীন্দ্রনাথের সুর দেওয়া গান হল ওহে সুনির্মল সুন্দর উজ্জ্বল শুভ্র আলোকে ও বালক প্রাণে আলোক জালি। জ্যোতিরিন্দ্র সুর দিয়েছিলেন। আমি আর কিছু না জানি কবিতায়। এঁরা ছাড়াও হেমলতার গানের সুর ও স্বরলিপি করেছেন ইনিরা, ও বিখ্যাত গায়ক সুরেন্দ্রনাথ বন্দ্যোপাধ্যায়।

হেমলতার সব কবিতাই ভগবৎ-প্রেমে সিক্ত। ছোট ছোট কবিতায় গভীরতার ছাপ স্পষ্ট কিন্তু কোথাও দুর্বোধ্য বা জটিল নয়। কোথাও নেই রূপ ও রূপকের ঠোকাঠুকি, প্রতীক ও ইঙ্গিতের ব্যঞ্জনা কিংবা চিত্রকল্পের সুমিত আভাস। তবু কি যেন আছে। অন্তর ও বাইরের চেতনাকে তিনি এক করে দেখতে চেয়েছেন। এই দেখার মধ্যে আছে তার নিজস্ব অনুভব :

অন্তরে চেতনা অনুভবে
বাহিরে সে ধরে
নানামত রূপ,
অন্তরে বাহিরে নেহারে যে তারে
ঘুচে তার ভব–
বন্ধনের দুখ।

হেমলতার সব কবিতাই আজকের তুলনায় বড় বেশি সরলীকৃত তবে ১৯১০১২ সালে এ জাতীয় কবিতার আদর ছিল। রবীন্দ্রানুসারী কবিগোষ্ঠী ছাড়াও এরকম কবিতা লিখতেন প্রিয়ম্বদা দেবী, কামিনী রায়, অনুদাসুন্দরী দেবী, মানকুমারী বস্তু আরো অনেকে। আসলে পারিবারিক সুখদুঃখ, প্রকৃতি এবং ঈশ্বর এই ছিল মেয়েদের কবিতার জগৎ এবং ছিল অনেকদিন। তখনও গদ্য কবিতা নিয়ে পরীক্ষা-নিরীক্ষা শুরু হয়নি। ভাব এবং কাব্যভাষাতে রাবীন্দ্রিক ছাপই বেশি ছিল। কবি হেমলতার কবিতা পড়তে ভালবাসতেন। স্কুলপাঠ্য কাব্য পরিচয়ে তিনি হেমলতার একটা কবিতাও যোগ করেন।

দুনিয়ার দেনা আর দেহলি হেমলতার লেখা গল্পের বই। প্রথমটির গল্পগুলো অনেকটা লিপিকাধর্মী তবে দার্শনিক চিন্তায় ভরা। কামিনী রায় গল্প পড়ে অবাক হয়ে গিয়েছিলেন। এবং সেই সঙ্গে অনুভব করেছিলেন হেমলতার সাহিত্য সাধনায় অনুমান আর কল্পনার চেয়ে জীবনের অভিজ্ঞতা অনেক বেশি কার্যকর হয়েছে। কথাটা সত্যি, মেয়েদের লেখায় অভিজ্ঞতার অভাব একটা মস্ত বড় জিনিষ। তাই অনেক জিনিষই সত্য হয়েও বাস্তব হয়ে ওঠে না। হেমলতার সেই অসুবিধে ছিল না। তিনি সমাজসেবার জন্যে বিভিন্ন মানুষকে দেখেছিলেন, পর্যবেক্ষণ করেছিলেন আপন অসামান্য অন্তদৃষ্টি দিয়ে, তাই মুগ্ধ করতে পেরেছিলেন কথাকোবিদ রবীন্দ্রনাথকে। যিনি মেয়েদের লেখা পছন্দ করতেন না। তিনিও দেহলি পড়ে উচ্ছ্বসিত হয়ে লিখেছিলেন একখানি অনবদ্য চিঠি। লিখেছিলেন :

বাংলা দেশের ছোট বড় নানা গ্রামে পল্লীতে তুমি ভ্রমণ করেছ, সেই উপলক্ষ্যে তোমার দৃষ্টিশক্তি তোমার অভিজ্ঞতাকে বিচিত্র করে তুলেছে, তোমার গল্পগুলি সেই অভিজ্ঞতার চিত্র প্রদর্শনী।

ঠাকুরবাড়ির মেয়ে-বৌদের মধ্যে স্বর্ণকুমারীর পর মৌলিক গল্প লিখে এতখানি সম্মান বোধহয় হেমলতাই পেলেন। কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ও তাকে সম্মান জানিয়েছিল সর্বপ্রথম লীলা পুরস্কার দিয়ে। হেমলতার গল্পের সঙ্গে স্বর্ণকুমারীর লেখার সাদৃশ্য নেই, বরং যোগ আছে লাহোরিনী শরৎকুমারীর গল্পের। দুজনেরি স্বচ্ছ সরস জীবনদৃষ্টি তাঁদের গল্পে উদ্ভাসিত। তবে হেমলতার কবিতার মতোই গল্পগুলোও জটিলতাবর্জিত। তার গল্পের চরিত্র, ঘটনা, সংলাপ সবই অতি সহজ, স্বাভাবিক, অনাড়ম্বর। অধিকাংশ গল্পেই আছে হেমলতার বাস্তব অভিজ্ঞতা। বিধবা আশ্রম দেখা শোনার সময় তিনি অনেকের সুখ-দুঃখের সঙ্গে পরিচিত হন।

হলে চন্দ্রমণি গল্পের নায়িকাকে আঁকতে পারতেন না। দারিদ্র্যের জ্বালা সহ্য করতে না পেরে কুমারী মেয়েকে বিধবা সাজিয়ে আশ্রমে পাঠানো তৎকালীন লেখিকাদের কলমে আঁকা সম্ভব ছিল না। অভিজ্ঞতাই তাকে বহু বিচিত্র পরিস্থিতির সামনে এনে দাঁড় করিয়েছে।

হেমলতাকে প্রকৃত সমাজ সেবিক। বললেই বোধহয় তার যথার্থ পরিচয় দেওয়া হয়। ঠাকুরবাড়ির অন্যান্য মেয়েরাও সাহিত্য, সঙ্গীত চর্চার সঙ্গে সঙ্গে সমাজসেবা করেছেন। কিন্তু হেমলতার প্রধান লক্ষ্য ছিল নারী কল্যাণ। সখিসমিতি, বিধবা শিল্পাম কিংবা ভারত স্ত্রীমহামণ্ডলের সঙ্গেই তার যোগ বেশি। তিনি নিয়েছিলেন সরোজনলিনী নারীমঙ্গলসমিতি ও পুরীর বসন্তকুমারী বিধবা-আশ্রমের ভার। আশ্রম পরিচালনার সময় হেমলতা যে সংগঠনী শক্তির পরিচয় দিয়েছিলেন তার তুলনা বোধহয় চলে শুধু ভারত স্ত্রীমহামণ্ডলের কৃষ্ণভামিনী দাসের সঙ্গে।

সরোজনলিনী আশ্রম প্রতিষ্ঠা হয় ১৯২৫ সালে। তার কিছুদিন পরে গুরুসদয় দত্তের অনুরোধে হেমলতা এর ভার নেন। পরে তিনি দেখলেন নারীশিক্ষাসমিতির জন্যে অবলা বসু, হিরন্ময়ী শিল্পাশ্রমের জন্যে স্বর্ণকুমারী ও ভারত স্ত্রীমহামণ্ডলের দেখাশোনার জন্যে সরলা আছেন কিন্তু সরোজনলিনীর জন্যে কেউ নেই। তাই সে ভার তাকেই নিতে হল। নারীশিক্ষা ও কল্যাণের আদর্শে নিজেকে একেবারে সঁপে দিয়ে তিনি খুঁজেছিলেন, মেয়েদের সত্যিকারের অধিকার কোথায় খর্ব হয়েছে। নিজে কঠোর বৈধব্য জীবন যাপন করলেও মেয়েদের মৌল সমস্যা অনুসন্ধানের সময় সংস্কারমুক্ত দৃষ্টিভঙ্গিরই পরিচয় দিয়েছেন। মেয়েদের স্বাধীনতা কি এবং কাকে বলে সেকথাও তিনি খুব সংক্ষেপে জানাতে পেরেছেন। পুরুষের সঙ্গে অবাধে মিলতে মিশতে পারাকেই তিনি স্ত্রী-স্বাধীনতা নাম দিতে নারাজ। পুরুষকে শুধু পুরুষ বলেই জেনে যে মেয়ে পুরুষের সঙ্গে মেলামেশার জন্যে লালায়িত, সে মেয়ে অশিক্ষিত। পুরুষকে যিনি পুরুষের অতিরিক্ত মানুষ বলে দেখতে ও চিনতে শিখেছেন তিনিই প্রকৃত শিক্ষিত। তবে বাঙালী মেয়েদের স্বাধীনতা স্পৃহাকে যারা বাঁকা চোখে দেখেছেন তাদের ভুলও ভেঙে দিতে চেয়েছেন হেমত। বাঙালী মেয়েরা পুরুষের সঙ্গে মেশবার লালসায় স্বাধীনতা চাননি। তাদের সত্যিকারের অধীনতা হচ্ছে দায়ভাগে অনধিকার।

য়ুরোপে নারীমুক্তি আন্দোলনের কথা শুনে উৎসাহিত হয়ে হেমলতা দেখতে গিয়েছিলেন সেখানে নারীমুক্তি আন্দোলন কি ভাবে সফল হয়েছে এবং স্বাধীনতার প্রকৃত স্বরূপ কি? অনেক দেশ ঘুরে তিনি যখন ভারতে ফিরে এলেন তখনও তার এ সম্বন্ধে কোনো ধারণার পরিবর্তন দেখা যায়নি। নারীর আদর্শ তার কাছে ত্যাগ-তিতিক্ষা-সংযম ও পরহিত। সেই আদর্শেই তিনি মেয়েদের অনুপ্রাণিত করেছেন। তার একাধিক প্রবন্ধে এই কথাই বলা হয়েছে। সমাজসেবিকা হিসেবে স্বর্ণকুমারী, হিরন্ময়ী, সরলা, কৃষ্ণভামিনী দাস, অবলা বসু, চারুশীলা দেবী, মোহিনী সেন ও আরো অনেকেই ছিলেন, এঁদের মধ্যে হেমলতা ছিলেন মধ্যমণি হয়ে। সব আশ্রমেই তার ডাক পড়ত। হাসি মুখে এগিয়ে যেতেন সবার কাছে। মিশে যেতেন সবার সঙ্গে। অন্তরের অভিজাত শুদ্ধতাবোধের সঙ্গে মিশত প্রাণের আবেগ।

এখনও যে মাঝে মাঝে আমরা হেমলতার কথা মনে করি তার কারণ কিন্তু সমাজসেবা নয়, তার লেখা স্মৃতিকথা। না, ঠাকুরবাড়ির ট্র্যাডিশন অনুযায়ী তিনি নিজের আত্মকাহিনী লেখেননি। কিন্তু ঘরোয়া আটপৌরে ভঙ্গিতে এমন কয়েকটা প্রবন্ধ লিখেছেন যার মধ্যে মিশে আছে রম্য ব্যক্তির স্বাদ। নিজের জীবনের বিচিত্র অভিজ্ঞতার কথা লিখে রাখার ইচ্ছে তার ছিল না। কিন্তু যাদের সংস্পর্শে এসে তার জীবন ধন্য হয়ে উঠেছিল, সেই স্পর্শমণির মতো কয়েকজন ব্যক্তিকে প্রবন্ধের মধ্যে ধরে রেখেছেন হেমলতা। না রেখে পারেননি। স্মৃতিকথা, ছোঁয়া থাকলেও এই প্রবন্ধগুলো লেখবার সময় নিজেকে সম্পূর্ণ। অপরিচয়ের দূরত্বে সরিনে রাখার কৃতিত্ব অস্বীকার করা যায় না। রবীন্দ্রনাথের বিবাহবাসর, বৈশাখের রবীন্দ্রনাথ, সংসারী রবীন্দ্রনাথ, আশ্চর্য মানুষ রবীন্দ্রনাথ, রবীন্দ্রনাথের অন্তমুখীন সাধনার বারা—কবিকে বুঝতে খুব বেশি সাহায্য করে। কবি নিজেও স্বীকার করেছেন রচনাগুলি অতি সুপাঠ্য। রবীন্দ্রজীবনসন্ধানীর কাছে হেমলতার প্রবন্ধগুলি অমূল্য সম্পদ হয়ে আছে। দু একটা ছবি দেখা যাক। হেমলতা লিখেছেন :

কবিপত্নী একবার সাধ করে সোনার বোতাম গড়িয়েছিলেন কবির জন্মদিনে কবিকে পরাবেন বলে। কবি দেখে বললেন, ছি ছি ছি, পুরুষে কখনো সোনা পরে—লজ্জার কথা, তোমাদের চমৎকার রুচি। কবিপত্নী সে-বোতাম ভেঙে ওপাল-বসানে বোতাম গড়িয়ে দিলেন। দু-চার বার কবি সেটি ব্যবহার করেছিলেন যেন দায়ে পড়ে।

জ্ঞানবৃদ্ধ আপনভোলা চিরশিশু দ্বিজেন্দ্রনাথের কথাও কম নেই। দুবেলা তার খাবার সময়ে একটা না একটা গোলযোগ লেগেই থাকত। মোচার ঘন্টে গরম মশলার গন্ধ পেয়েই তিনি হুলস্থুল কাণ্ড বাঁধিয়ে দিতেন, কোথা থেকে কতকগুলো মাথাঘসা বেটে মোচার ঘন্টে ঢুকিয়েছ। কিছু জান না কি করে রাঁধতে হয়। কিংবা

বৈকালে গরম লুচি ভেজে সামনে এনে দিয়েছে। লুচিতে হাত ঠেকিয়েই বললেন, এ কি লুচি? ঘি চপচপ করছে লুচির সারা গায়ে, আমার হাতশুদ্ধ নষ্ট হল ঘি লেগে। লুচির প্লেট আমার হাতে তুলে দিয়ে বললেন, যাও, জল দিয়ে লুচি ভেজে আন। ঘি দিয়ে বুঝি লুচি ভাজে?

হেমলতা একটু পরে ঘিয়ের বদলে শুকনো ময়দা দিয়ে বেলে লুচি ভেজে আনলেন। এবার ঠিক হয়েছে দেখা গেল। লুচির গায়ে ঘি লেগে নেই একটুও। খুশি হয়ে দ্বিজেন্দ্র বললেন, এই তো ঠিক হয়েছে, দেখলে জল দিয়ে ভেজে কেমন হল। খাওয়ার পরে হেমলতা গল্পচ্ছলে শোনালেন লুচি ভাজার ইতিহাস। তখন সে কি হাসি, তাই তো, গরমজলে ময়দা দিলে গুলে কাই হয়ে যাবে তো বটেই। আচ্ছা কাণ্ড আমার, কি বলতে কি বলি, তোমাদের জ্বালিয়ে মারি। তোমরা যা ভাল বোঝ তাই কর–

হেমলতা না থাকলে এ রকম অনেক ছবিই হারিয়ে যেত। হয়ত খুব বড় গোছের ক্ষতি হত না কিন্তু সেই বিশাল মহাপ্রাণ ব্যক্তিদের অনেকখানি ব্যক্তিত্ব রইত ঢাকা। কোন পুরুষ কি আমাদের কাছে পৌঁছে দিতে পারতেন ঠাকুরবাড়ির এই আটপৌরে অনাবৃত রূপ?

দ্বিজেন্দ্ৰপরিবারে সুশীলা, হেমলতা ছাড়াও বধূরূপে এসেছিলেন অরুণেরে দুই স্ত্রী চারুশীল ও সুশোভিনী, নীতীন্দ্রনাথের স্ত্রী সুহাসিনী, সুধীন্দ্রনাথের স্ত্রী চারুবালা এবং কৃতীন্দ্রনাথের দুই স্ত্রী সুকেশী ও সবিতা। সুশীলার মতো চারুশীলা ও সুকেশীর অকালমৃত্যু হয়। চারুশীলা ছিলেন সুশীলারই বোন। অন্যান্যরাও তাদের পারিবারিক গণ্ডির সীমা ছাড়িয়ে এমন কিছুই করেননি যে স্বতন্ত্রভাবে উল্লেখ করা চলে। বরং সুধীন্দ্রের স্ত্রী চারুবালা ওই পারিবারিক পরিবেশেই ছেলেমেয়েদের মনে স্বাদেশিকতা সঞ্চারের চেষ্টা করেন। তখন বাংলাদেশের আকাশে বাতাসে দেশপ্রেমের সুর ভেসে বেড়াচ্ছে। চারুবালা প্রত্যক্ষভাবে কোন আন্দোলনে জড়িয়ে না পড়ে ছেলেমেয়েদের স্বদেশী জিনিষ ব্যবহার, দেশপ্রেমের গান শেখাতেন। তাঁর শিক্ষা যে ব্যর্থ হয়নি তার পুত্র সৌম্যেন্দ্রনাথের বিদ্রোহী মনোভাবই তার প্রমাণ। তবে একটা কথা বলা ভাল। এ সময় ঠাকুরবাড়ির মেয়েরা আর বাংলায় নারী সমাজের নেত্রী হয়ে নেই। কয়েকজন প্রতিভাময়ী নিশ্চয় আছেন কিন্তু তাদের পরিধিও সংকীর্ণ। ঠাকুরবাড়ির সম্বন্ধে এমন একটা ধারা বা ধারণা গড়ে উঠেছে লোকের মনে। সে ধারণা শ্রদ্ধা ও বিস্ময় মেশা। কিন্তু এখন আর বাংলায় গুণবতী মেয়ের সংখ্যা কম নয়। শিক্ষা, শিল্প, বিজ্ঞান সব দিকেই তাদের ভূমিকা স্পষ্ট। বরং ঠাকুরবাড়ির মেয়েরা সে পথ থেকে কিছুটা দূরে সরে এসে নিরালায় শিল্পসাধনা নিয়ে মেতে উঠেছেন, কারণ বাংলার শিল্পজগৎ তখন সম্পূর্ণভাবে সমৃদ্ধ হয়নি।

সুকেশী থাকতেন শান্তিনিকেতনেএই হাসিখুশি মিশুকে বৌটি তার মধুর ব্যবহার দিয়ে সকলকে আপন করে নিয়েছিলেন। এ সময় রবীন্দ্রনাথ শান্তিনিকেতন—বিশ্বভারতী প্রতিষ্ঠা করায় ঠাকুরবাড়ির অনেকেই চলে এলেন শান্তিনিকেতনে। জোড়াসাঁকোর বাড়ি ক্রমশই যেন তার মহিমা হারাচ্ছিল। সেটাই স্বাভাবিক। কারণ, উনিশ শতকে প্রাধান্য বিস্তার করেছিল এই বিশাল বাড়িটি, বিশ শতকে বিশ্ববিখ্যাত হয়ে উঠলেন এই বাড়িরই একটি মানুষ—একক ব্যক্তিত্ব প্রাধান্য লাভ করল। তাই শান্তিনিকেতনে গড়ে উঠতে লাগল ঘরোয়া পরিবেশ। মেয়ের গড়লেন অলাপিনী সভা—আনন্দমেলা। বেরোতে শুরু করল হাতেলেখা মেয়েলি পত্রিকা শ্রেয়সী, ঘরোয়া আরো কত কী! ইন্দিরা, হেমলতা সবাই জমিয়ে বসলেন সেখানে। সুকেশীও মিশে গিয়েছিলেন সবার সাথে। যখনি দরকার পড়ত এগিয়ে আসতেন হাসিমুখে। কখনো বাড়ির মেয়েদের মিলে থিয়েটার করতেন, কখনো নানারকম বরঠকানো রান্না করে লোকেদের ঠকাতেন। একবার ক্ষিতিমোহন সেনকে ঠকিয়েছিলেন কুমড়ো কেটে তৈরি করা চাপা ফুল দিয়ে। অল্প কয়েকদিনের ইনফ্লুয়েঞ্জা জ্বরে সুকেশী। চিরবিদায় নিলেন। কৃতীন্দ্রের পুনর্বিবাহ হয় সবিতার সঙ্গে। সবিতা ভাল ছবি আঁকতে পারতেন। ১৩২৯ সালের শ্রেয়সীর পাতায় তাঁর আঁকা কিছু ছবি ছাপা হয়েছিল। এ প্রসঙ্গে হেমেন্দ্রনাথের পুত্রবধূদের কথাও সেরে নেওয়া যেতে পারে। হিতেন্ত্রের স্ত্রী সরোজিনী, ক্ষিতীন্দ্রের স্ত্রী ধৃতিমতী ও সুহাসিনী এবং ঋতেন্ত্রের স্ত্রী অলকা এসেছেন ঠাকুরবাড়িতে। তবে তিন ভাইয়ের কেউই তাদের বাবার মতো নারী প্রগতি বা স্ত্রীশিক্ষায় উৎসাহী ছিলেন বলে মনে হয় না। বরং এ সময় যেন ঠাকুরবাড়ি একটু বেশি মাত্রায় রক্ষণশীল এবং পর্দানশীন হয়ে পড়েছিল। অবশ্য এরই মধ্যে নানারকম শিক্ষার সুযোগ পেয়েছিলেন সুরেন্দ্রের স্ত্রী সংজ্ঞা, বলেন্দ্রের স্ত্রী সুশী বা সাহানা এবং রথীন্দ্রের স্ত্রী প্রতিমা।

জ্ঞানদানন্দিনীর একমাত্র ছেলে সুরেন্দ্রনাথ! চোখের মণি, আদরের দুলাল। তার বিয়ে দেবেন ডাকসাইটে সুন্দরীর সঙ্গে। যেখানে সুন্দর মেয়ে দেখতে পান তার সঙ্গেই সম্বন্ধ করেন। মাঝে মাঝে তাদের বাড়িতে এনে রেখে দিয়েছেন। ছেলের ঘোর আপত্তি বিয়েতে। কি আর হবে? কঁদতে কাঁদতে অনেক খেলনা দিয়ে সে মেয়েকে বিদায় দিতে হয়েছে। সুরেন্দ্রের বিয়ের কথা হয়েছিল কুচবিহারের রাজবাড়িতে। কেশব সেনের নাতিনী সুকৃতির সঙ্গে। তার মা সুনীতি দেবী। ঠাকুরবাড়ির সঙ্গে এদের সম্বন্ধ-বন্ধুত্ব-হৃদ্যতা অনেক পুরনো। সুতরাং এ তো সুখের কথা! কিন্তু আপত্তি করেছিলেন মহর্ষি। তিনি ব্রাহ্মণ-অব্রাহ্মণের বিবাহের ঘোর বিরোধী। কাজেই হল না। সুকৃতির বিয়ে হল স্বর্ণকুমারীর ছেলে জ্যোৎস্নানাথের সঙ্গে। তিনি বিয়ে করেছিলেন সকলের অমতে! সুরেন্দ্র ও জ্যোৎস্না ছিলেন অভিন্নহৃদয় বন্ধু। যাক সে কথা! সুরেন্দ্রের বিয়ে ঠিক হল একেবারে হঠাৎ।

মহর্ষির প্রিয় শিষ্য প্রিয়নাথ শাস্ত্রীর মেয়ে সংজ্ঞা একদিন এসেছিলেন ভাইয়ের পৈতেয় নিমন্ত্রণ করতে। নাক মুখ টিকলো, কেবল চোখ একটু বসা, তাকে সকলেরি খুব পছন্দ হয়ে গেল। নলিনীর স্বামী সুহৃং চৌধুরী জ্ঞানদানন্দিনীকে বললেন, এই ত বেশ মেয়ে হাতের কাছে রয়েছে। একেই বউ করুন-না। জ্ঞানদানন্দিনী তো এককথায় রাজী। তাই হল। সবচেয়ে খুশি হলেন মহর্ষি। তিনি আনন্দের চোটে এক চামচ ভাত বেশি খেয়ে ফেললেন। বললেন, ঢালাও হুকুম রইল, এ বিয়েতে দেবী যা চায় তাই যেন হয়। দেবী হচ্ছেন সংজ্ঞার মা। আসলে সংজ্ঞার মা ইন্দিরাও ঠাকুরবাড়ির মেয়ে, দ্বারকানাথ। ঠাকুরের সহোদর রাধানাথ ঠাকুরের বংশে শ্রীনাথ ঠাকুরের মেয়ে। তাঁর নিজের লেখা আমার খাতাও একটি সুখপাঠ্য বই।

বেশ ধূমধামের সঙ্গে বিয়ে হল। মায়ের জেদাজেদিতে বিয়ে করতে হল। বলে সুরেন্দ্র মেয়ে দেখেননি। সংজ্ঞার বয়সও তার তুলনায় খুব কম ৷ সুরেন্দ্রের একত্রিশ, সংজ্ঞার সবে বারো বিয়ে করতে যাবার আগে সুরেন্দ্র একবার। শুধু জিজ্ঞেস করেছিলেন ইন্দিরাকে, নেহাৎ বাচ্চা কি? বয়সের খুব পার্থক্য থাকলেও স্ত্রীকে পরম স্নেহে গ্রহণ করলেন সুরেন্দ্র। শুরু করলেন লেখাপড়া শেখাতে! তিনি নিজে খুব ভাল অনুবাদ করতে পারতেন। ইংরেজী বই খুলে একবারও না থেমে এমন সহজ বাংলায় বলে যেতেন যে বোঝাই যেত না মুখে মুখে অনুবাদ করছেন। ক্রমে সংজ্ঞাও শিখলেন অনুবাদ করতে। না, ইংরেজী গল্প নয়, তিনি গোটাকতক জাপানী গল্প অনুবাদ করেন। তার মধ্যে দুটো গল্প। মৎসুয়ামার আয়না ও ইউরিশিমা ছাপা হয় পুণ্য পত্রিকায়। হয়ত এ অনুবাদে সুরেন্দ্রেরও হাত ছিল নয়ত প্রথমেই অমন সহজ স্বচ্ছ সাবলীল ভঙ্গিটি আয়ত্ত করা কঠিন। সংজ্ঞার অনুবাদকে তর্জমা বলে মনেই হয় না। জাপানী গল্প অনুবাদের এই দক্ষতা ছিল সুরেন্দ্রেরও। তিনি জাপানী ঐতিহাসিক গল্প একটি বসন্ত-প্রাতের প্রস্ফুটিত সকুরা-পুষ্প অনুবাদ করে উৎসর্গ করেন সংজ্ঞাকে। এ ব্যাপারে সংজ্ঞা একটু উৎসাহী হলে আরো কিছু জাপানী গল্পের অনুবাদ সেযুগেই আমাদের হাতে এসে পৌঁছত।

ঠাকুরবাড়ির অন্যান্য বৌয়েদের মতো সংজ্ঞাও ভাল অভিনয় করতে পারতেন। রবীন্দ্রনাথ শান্তিনিকেতনে চলে গেলেও অভিনয়ের জন্যে প্রায়ই ডাক পড়ত ঠাকুরবাড়ির মেয়ে-বৌয়েদের। অভিনয়ে তাদের দক্ষতা তপন কিংবদন্তী। শান্তিনিকেতনের শিল্পীগোষ্ঠী ভাল করে তৈরি হয়নি। কলকাতায় বিসর্জনের অভিনয় হবে। তোড়জোড় চলছে। কবির বয়স হার মানল তার উৎসাহের কাছে। তিনি নিজে সাজলেন জম্নসিংহ। অপর্ণার ভূমিকায় চমৎকার অভিনয় করলেন সংজ্ঞার এক মেয়ে মঞ্জু শ্রী! আর সংজ্ঞা নিজে সাজলেন গুণবতী। এ অভিনয় ঘরোয়া মঞ্চে বা জোড়াসাঁকোর উঠোনে সখের অভিনয় নয়। রীতিমতো টিকিট বিক্রী করে এম্পায়ার থিয়েটারে তিন দিন অভিনয় হয়। প্রত্যক্ষদর্শী সৌম্যেন্দ্রনাথের ভাষায় গুণবতীর ভূমিকায় আমার কাকী সংজ্ঞাদেবীর অভিনয় হয়েছিল অনবদ্য। কিন্তু যেমন সাহিত্যচর্চা, তেমনি অভিনয় দক্ষতা থাকলেও কোন কিছুতে মন ছিল না সংজ্ঞার। কোথায় যেন ছিল আশ্চর্য নিরাসক্তি। জ্ঞানদানন্দিনী অনুযোগ করতেন, সংজ্ঞা সাজে না। সুরেনের খাওয়া দেখে না। কিন্তু প্রশ্রয় ছিল সুরেন্দ্রের। তিনি সংজ্ঞাকে সঙ্গে করে নিয়ে গিয়েছেন নানান জায়গায় নিয়ে গেছেন ভগিনী নিবেদিতার কাছে।

প্রিয়নাথ শাস্ত্রীর আধ্যাত্মিক অধিকারী হয়েছিলেন সংজ্ঞা। সংসারের প্রতি আসক্তি কম। বড় ঘর বিপুল সংসার-শ্বশুর-শাশুড়ী স্বামী ছটি সন্তান নিয়ে ভরাভর্তি সুখ তবু আসক্তির বন্ধনটা যেন সংজ্ঞার জীবনে শিথিল হ৪ে আসে। মা ছাড়াও তার ছেলেমেয়েদের অন্য সঙ্গী ছিল, ছিলেন স্নেহময়ী জ্ঞানদানন্দিনী, এবং স্নেহময় জ্যোতিরিন্দ্রনাথ। তারপর আসে একটি পরমলগ্ন। ডায়মণ্ডহারবারে নদীর ঢেউ দেখতে দেখতে তিনি এক দিব্য অনুভূতি লাভ করলেন। এক উজ্জ্বল জ্যোতির্মণ্ডল যেন তাকে দিল এক পরম আনন্দময় চিন্ময় সত্তার সন্ধান। চির বৈরাগ্যের সুর এসে বাজল সংজ্ঞার মনে।

পরের ইতিহাস সংক্ষিপ্ত। স্বামীর মৃত্যুর পর সংজ্ঞা সংসার ত্যাগ করে চলে গেলেন চির বৈরাগী সাধুদের চরণচিহ্ন অনুসরণ করে। বাধা পাননি বিশেষ। বাঞ্ছিতের সন্ধানে যার যাত্রা শুরু, তাকে বাধা দেবে কে? এলাহাবাদে ঈপ্সিত গুরু সচ্চিদানন্দ সরস্বতীর কাছে দীক্ষা নিয়ে সন্ন্যাস গ্রহণ করলেন সংজ্ঞা। গৃহজীবনের শেষ বন্ধন নামটুকু জীর্ণ পাতার মতো খসে পড়ল তার জীবন থেকে। মুছে গেল ঠাকুরবাড়ির বৌটির পরিচয়। নতুন নাম হল স্বরূপানন্দ সরস্বতী। মুণ্ডিতমস্তক গৈরিকধারিণী সংজ্ঞা হরিদ্বারে পেলেন নতুন জীবন। কাশীতে দেখেছিলেন অসীমানন্দ সরস্বতীকে—তার প্রতিষ্ঠিত রামচন্দ্রপুরের আশ্রমেও থেকেছেন অনেকদিন। মাঝে মাঝে যেতেন তীর্থে। তার আধ্যাত্মিক জীবনের তীব্র ব্যাকুলতা প্রকাশ পেয়েছে এসময়ে লেখা কয়েকটি কবিতায়। কবিতাগুলি সংকলিত হয়েছে কৃপাকণা বইতে। সংজ্ঞার কবিতা পড়লে বোঝা যায় প্রাণের তীব্র ব্যাকুলতা তাঁকে কোথায় উপনীত করেছে। ছটি সন্তানের জননী হয়েও মাতৃত্বের আকাঙ্ক্ষা তার মেটেনি কারণ তিনি চেয়েছিলেন সকলের মা হয়ে উঠতে। অনুভূতি, পরপারের সুর, হৃদয়নাথ, আঁধারে, প্রেমবৃষ্টি, মা, আনন্দমিশন, বন্দনা সব কবিতাই আধ্যাত্মিক সুরে বাঁধা। সহজ-সরল প্রাণের আকূতি বলেই পূর্ণমা বোধহয় সবচেয়ে বেশি ভাল লাগে। কৃপাকণাএখন দুষ্প্রাপ্য তাই কবিতাটি সম্পূর্ণ আকারেই এখানে উদ্ধৃত করা হল। ছোট্ট কবিতা :

নারীর দেহে এ ভবেতে হে
লভিয়া জনম আজিকে আমি।
মাতৃত্ব যে কি তাহা তো জেনেছি,
এ দেহ স্বার্থক হয়েছে স্বামী।
রেখ না মোরে ক্ষুদ্র মা করে
ধরণীতে কর গো পরিচিত,
সবারি যে মা হব গো হেথা
সে রূপে হয়ে পূর্ণ বিকশিত।
কল্যাণকামী মঙ্গলকামী
মাতৃরূপিনী আমায় হেরি
ধরার অন্যা পুত্র ও কন্যা
চারিপাশে মোর দাঁড়াক ঘেরি।

সংজ্ঞার অবিরাম তীর্থভ্রমণ, সাধুসঙ্গ, আশ্রমবাস ও বাঞ্ছিতের সন্ধানে অন্বেষণ শেষ হয়েছে এই সেদিন, পার্থিব জীবনের পরিসমাপ্তিতে।

এবার বলেন্দ্রের স্ত্রী সাহানার কথায় আসি। মাত্র তেরো বছরে বিয়ে হয়েছিল তার এবং যোলো বছরেই সব সাধ আহ্লাদ ঘুচিয়ে বিধবার শুভ্র সাজে সাজতে হল তাকে। দিন বদলেছে। তাই সাহানার বাবা ভেবেছিলেন মেয়ের আবার বিয়ে দেবেন। কিন্তু বিধবা বিবাহে মহর্ষির ঘোর আপত্তি। সম্মতি ছিল না উদারচেতা ঠাকুরবাড়ির একজনেরও। স্বয়ং রবীন্দ্রনাথ লক্ষ্ণৌ গেলেন সাহানাকে বুঝিয়ে-সুঝিয়ে ফিরিয়ে আনতে। অথচ এর কয়েক বছর পরেই তিনি বিধবা বিবাহ সম্বন্ধে নিজের মত বদলান। সাহানার দুঃখ কোনদিনই ঘোচেনি। কবির সঙ্গেই শ্বশুরবাড়িতে ফিরে এলেন তিনি, মন দিলেন লেখাপড়ায়। স্কুলের পড়া শেষ করে পাড়ি দিলেন বিলেতে। ইচ্ছে ছিল হাতেকলমে কিছু ট্রেনিং নিয়ে আসা। এ সময় বাঙালী মেয়েদের অনেকেই বিলেত যাচ্ছেন। সরলাবালা-মিত্র সরকারী বৃত্তি নিয়ে কিংবা কুচবিহারের রাজকন্যা প্রতিভা ও সুধীর এবং লর্ড সিন্হার মেয়ে রমলা নিছক বেড়াবার উদ্দেশ্যে বিলেত পাড়ি দিচ্ছেন। সাহানাও গিয়েছিলেন। কোথাও কোন আলোড়ন না তুলে তিনি। আবার কিছুদিন পরেই দুর্বল স্বাস্থ্য নিয়ে ফিরে আসেন। অল্প কিছুদিন পরে মারা যান। সাহানার কথা ঠাকুরবাড়ির কেউ কোনদিন ভাবেননি, এমনকি রবীন্দ্রনাথও নয়। একথা ভাবলে সত্যি কষ্ট হয়। মনে হয় সকলের নিষ্ঠুর ঔদাস্যে সায়াহ্নের সকরুণ সাহানা হারিয়ে গেলেন অকালে।

প্রতিমা ঠাকুরবাড়িরই মেয়ে আবার ঠাকুরবাড়িরই বৌ। পাঁচ নম্বর আর ছ নম্বর, যারা কাছেই ছিল তাদের আরো কাছে এনে দিলেন তিনি। আসলে প্রতিমা বিনয়িনীর মেয়ে। সুন্দর ফুটফুটে মেয়েটিকে দেখে কবিপত্নী মৃণালিনীর খুব ভাল লেগেছিল। অন্তরঙ্গদের বলেছিলেন, এই সুন্দর মেয়েটিকে আমি পুত্রবধু করব। আশা করি ছোটদিদি তার নাতনীটিকে আমায় দেবেন।

অতি অকালে চলে যাওয়ায় মৃণালিনী তার ইচ্ছেকে কাজে পরিণত করতে পারেননি। তাই মুখ ফুটে কিছু বলার আগেই প্রতিমার বিয়ে হয়ে যায় গুণেন্দ্রের ছোটবোন কুমুদিনীর ছোট নাতি নীলানাথের সঙ্গে। তখন প্রতিমার বয়স সবে এগারো। এবাড়ির মেয়েদের একটু ছোট বয়সেই বিয়ে হত, প্রতিমারও হয়েছিল।

ফাল্গুন মাসে বিয়ে হল। বৈশাখ মাসে শুভদিন দেখে প্রতিমাকে শ্বশুরবাড়ির লোকেরা নিয়ে গেলেন। তার কয়েকদিন যেতে না যেতেই গঙ্গায় সাঁতার কাটতে গিয়ে জলে ডুবে মৃত্যু হল নীলানাথের। শ্বশুরবাড়ি থেকে অপয়া অপবাদ নিয়ে ফিরে এলেন প্রতিমা। এ ঘটনার পাঁচ বছর পরে, রথীন্দ্র বিলেত থেকে ফিরলে রবীন্দ্রনাথ প্রতিমার পুনর্বিবাহ দেবার প্রস্তাব করেন। স্ত্রীর মনোবাসনা তার অজ্ঞাত ছিল না, তাছাড়া বিধবা বিবাহের প্রতিবন্ধক মহর্ষি তখন পরলোকে। কবিও বাল্যবিধবাদের অবহেলিত জীবন ও দুভাগ্যের কথা চিন্তা করছিলেন। ঠিক সেই সময় ঢাকার গুহঠাকুরতা পরিবারের মেয়ে লাবণ্যলেখাও বিধবা হয়ে ফিরে এলেন। কন্যাসমা এই মেয়েটিকে বিয়ে দিয়ে আবার সংসারে ফিরিয়ে আনা যাবে না-কি? কবি পূর্বসংস্কার ভাঙবার জন্যে প্রস্তুত হলেন এবং তখনই স্থির করলেন নিজের ছেলের বিয়ে দেবেন বিধবার সঙ্গে। এছাড়া সমাধানের কোন পথ নেই। তিনি নিজে যদি নিজের ছেলের বিয়ে কোন বিধবার সঙ্গে না দেন তাহলে অন্য লোকে দেবে কেন? তিনি গগনেন্দ্রকে মনের কথা জানালেন।

তোমাদের উচিত প্রতিমার আবার বিয়ে দেওয়া। বিনয়িনীকে বলো যেন অমত না করে। ওর জীবনে কিছুই হল না। এ বয়সে চারিদিকের প্রলোভন কাটিয়ে ওঠা মুস্কিল। এখন না হয় মা বাপের কাছে আছে। এর পরে ভাইদের সংসারে কৃপাপ্রার্থী হয়ে থাকবে সেইটাই কি তোমাদের কাম্য? না, বিয়ে দেওয়া ভাল, সেটা বুঝে দেখ।

উদারহৃদয় গগনেন্দ্র তখনই রাজী হলেন। কিন্তু সমাজ রয়েছে। সমাজের কি সম্মতি পাওয়া যাবে? এ তো ব্রাহ্মসমাজ নয়। বিদ্যাসাগর ১৮৫৬-তে বিধবা বিবাহকে কাগজে-কলমে বৈধ করে গিয়েছেন। সমাজ সংস্কারের হিড়িকে কিছু বিধবার বিবাহ হয়েছে কিন্তু সাধারণ ভাবে এখনো সমাজে কেউ মেনে নিয়েছে কি? বিনয়িনী ভয় পেলেন :

আমাকে যে সমাজে একঘরে ঠেলবে। আমার আরও ছেলেমেয়ে আছে তাদের বিয়ে দিতে হবে।

ভয় পেলেন না গগনেন্দ্র। বললেন, তোমাদের ভয় নেই। তোমাদের পেছনে আমি আছি। তোমায় সমাজ ত্যাগ করলে আমিও সমাজ ত্যাগ করব। সমাজকে অগ্রাহ্য করে নিজে দাঁড়িয়ে থেকে প্রতিমার বিয়ে দিলেন গগনেন্দ্র। ঠাকুরবাড়িতে প্রথম বিধবা বিবাহ। অবশ্য ঠিক ঠাকুরবাড়ি বলা চলে না। মাত্র কয়েকমাস আগে পাথুরেঘাটা-ঠাকুরবাড়ির মেয়ে ছায়ার বিধবা বিবাহ হয়েছে। জোড়াসাঁকোতে প্রথম বিয়ে হল রথীন্দ্র ও প্রতিমার। কবি এর পরে লাবণ্যলেখার বিয়ে দিয়েছিলেন প্রিয় শিষ্য অজিত চক্রবর্তীর সঙ্গে। গগনেরে ইচ্ছে ছিল তার নিজের বিধবা পুত্রবধূ গেহেন্দ্রের স্ত্রী মৃণালিনীরও আবার বিয়ে দেবেন। মৃণালিনীর প্রবল আপত্তিতে তা সম্ভব হয়নি।

প্রতিমার বিয়েতে সামাজিক বাবা কিছু এসেছিল। ঠাকুর পরিবারের কোন শরিক নিজের বাড়ির উৎসবে রবীন্দ্ৰপরিবারকে নিমন্ত্রণ করেননি এই সব। এদিকে বেশি মনোযোগ না দেওয়ায় সব ঝড় কেটে গেল। রবীন্দ্রপরিবারে গৃহলক্ষ্মী হয়ে প্রবেশ করলেন প্রতিমা; সত্যিই তিনি ছিলেন মূর্তিমতী লক্ষ্মীশ্রী, রবীন্দ্রনাথের শেষ বয়সের মা-মণি, তার আদরের ব্রাইড মাদার (বৌমা)। দীর্ঘ বত্রিশ বছর ধরে রবীন্দ্র সান্নিধ্যে থেকে তার সেবা করে গিয়েছেন প্রতিমা। সেই সঙ্গে চলেছে আশ্রমের দেখাশোনা আর অতিথি সেবার কাজ। কবির সেবা করা খুব সহজ কাজ ছিল না। প্রতিমা করেছেন অসীম ধৈর্য নিয়ে।

শুধু সেবা নয়, প্রতিমা শিল্পক্ষেত্রে রেখে গেছেন অনেক। তার যা কিছু শিক্ষা রবীন্দ্রনাথের কাছেই। সেই শিক্ষা তার প্রতিভার স্পর্শে নতুন রূপ নিল। চলে যেতে যেতে রেখে গেল ঠাকুরবাড়ির মেয়ের আরো কিছু অসামান্য দান। প্রতিমা দুই পরিবারের শিক্ষা সংস্কৃতি নিয় এসেছিলেন। নিয়ে এসেছিলেন কল্যাণশ্রীর সঙ্গে আশ্চর্য নিরাসক্তি। তিনি ভাল লিখতে পারতেন, পারতেন ভাল ছবি আঁকতে। তাঁর লেখা গুরুদেবের ছবি রবীন্দ্রনাথের চিত্র বিচারের মাপকাঠি। বাস্তবিক চিত্র বিচারে প্রতিমা ছিলেন সিদ্ধহস্ত। রবীন্দ্রনাথের চিত্রকলাকে তিনভাগ করে প্রতিমা দেখিয়েছেন কবির আঁকা প্রাকৃতিক দৃশ্য ও জীবজন্তু যেমন ফরাসী জাতির দৃষ্টি আকর্ষণ করেছিল তেমনি মানুষের মুখের প্রতিকৃতি মনোহরণ করেছিল জার্মানদের। কিন্তু আসলে এসব ছবিকে বিশ্লেষণ করা যায় না। সৃষ্টির এমন এক সত্যকে এরা অনুভূতি দিয়ে প্রকাশ করছে যার ব্যাখ্যা চলে না। দিব্যদৃষ্টি দিয়ে কেউ যদি সে জিনিষ ধরতে পারল তো বুঝল, নইলে খনির ভিতর মণির মতো তার দীপ্তি রইল ঢাকা। রবীন্দ্রনাথ শেষ বয়সে ছবি আঁকলেন দু হাজারেরও বেশি। ছবি তার শেষ বয়সের প্রিয়া—জীবন-সায়াহ্নে যে নায়িকা আসে সে যেন সবচেয়ে বেশি অভিনিবেশ দাবি করে। চোখের সামনে বুঝি ফুটে উঠল আর একটা জগৎ, রঙে-রেখায় কবি তাকে স্পষ্ট করে তুললেন। রবীন্দ্রনাথের এই ছবি আঁকার কথা লিখেছেন প্রতিমা। তাঁর মতে, রবীন্দ্রনাথ কবিতায় যেমন একটা সৃষ্টির সম্পূর্ণ চেহারা দিয়েছেন চিত্রেও তেমনি বস্তু প্রবাহের আবর্তনের ইতিহাস একেছেন। গ্রহ নক্ষত্রের মধ্যে যে ঘূর্ণমান গতি তেজের চাপে রচনার কাজে নিরন্তর নিযুক্ত, তারি জোয়ার ভাটার টানে রেখা হতে রেখান্তরে প্রাণী ও জড়জগতের চেহারা ছাঁচে ঢালাই হয়ে বেরিয়ে আসছে। শিল্পীর মনে লেগেছিল সেই স্রোতের ঢেউ। ব্যক্তিত্বের রসে মজে তাই তুলির টানে বেরিয়ে এল রূপ হতে রূপান্তরে সৃজিত অপরূপ মানুষ পশুপক্ষী ও দৃশ্য।

এ তো গেল প্রতিমার চিত্র সমালোচনার কথা। প্রতিমা নিজেও ভাল ছবি আঁকতেন। কিছু শিখেছিলেন ইতালিয়ান শিক্ষক গিলহার্ডির কাছে। কয়েকটি ছবিতে তার দক্ষতার পরিচয় পাওয়া যাবে। ছবির সঙ্গে সঙ্গে শুরু হল কথার ছবি আঁকা। রবীন্দ্রনাথ তাঁর ছদ্মনাম দিলেন কল্পিতাদেবী। এই নামে প্রতিমা অনেক কবিতা লেখেন প্রবাসীতে। প্রতিটি কবিতা লিখেই তিনি দেখাতে যেতেন কবিকে। বুক ঢিপঢিপ করত ভয়ে। কি জানি হয়ত হয়নি। অথচ না দেখিয়েও তৃপ্তি নেই। কবি বেশ মন দিয়েই দেখতেন। মাঝে মাঝে কলম চালিয়ে তাতে এনে দিতেন ঔজ্জ্বল্যের দীপ্তি। আবার কখনও কখনও প্রতিমার লেখা কবিতাটাকেই ভেঙেচুরে নতুন করে লিখে দেখাতেন কাব্যভাষা বদলাবার সঙ্গে সঙ্গে কবিতাটাই কেমন নতুন হয়ে ওঠে। যেমন ধরা যাক স্মৃতি কবিতাটা প্রতিমা লিখলেন :

এই গৃহ এই পুষ্পবীথি
যারে ঘেরি একদিন তোমার কল্পনা
গড়েছিল ইমারত দীপ্তি গরিমার,
উত্তপ্ত কামনা তব যার প্রতি ধূলির কণায়
জীবন্ত করিয়াছিল তব মুহূর্তেরে।
যে বাসনা মনে ছিল পুরিল না।
অবসন্ন প্রাণ
গেল চলে ছায়া ফেলে অঙ্গনে প্রাঙ্গণে।

রবীন্দ্রনাথ ভাষা বদলে লিখলেন :

এই ঘর এই ফুলের কেয়ারি
একে ঘের দিয়ে তোমার খেয়াল
বানিয়েছিল পরীস্থানের ইমারৎ।
তোমার তপ্ত কামনা।
রাঙিয়েছিল তার প্রত্যেক ধূলিকণাকে
তার প্রত্যেক মুহূর্তকে করেছিল তোমার আবেগ দিয়ে অস্থির।
তুমি চলে গেলে,
অকৃতার্থ আকাঙ্ক্ষার ছায়া ভেসে বেড়াচ্ছে
অঙ্গনে প্রাঙ্গণে।

কবির সঙ্গে কল্পিতার এই ধরনের কবির লড়াই প্রায়ই হত। তার গদ্য রচনাতে চোখে পড়বে লিপিকার বিশিষ্ট ভঙ্গি। সে যেন গদ্য নয়, গদ্য কবিতা। নটী, মেজবৌ ১৭ই ফান, সিনতলা দুর্গ সবই এক সুরে বাঁধা। প্রতিমার লেখা স্বপ্নবিলাসী পড়ে কবি মুগ্ধ হয়ে লেখেন মন্দিরার উক্তি। পুত্রবধূকে অনুরোধ করেন তার পরের অধ্যায় নরেশের উক্তি লিখতে। অর্থাৎ কবি লিখবেন নারীর উক্তি আর প্রতিমা লিখবেন পুরুষের উক্তি। কিন্তু কবির সঙ্গে হাত মিলিয়ে গল্প লেখা? কল্পিতা রণে ভঙ্গ দিলেন।

এছাড়া প্রতিমা লিখেছেন কিছু স্মৃতিকথা। মায়ের ডায়রি কাহিনী অবলম্বনে লেখা হয় স্মৃতিচিত্র। এতে বেশ পাঁচ নম্বর বাড়ির মেয়েদের কথা আছে। যেমন উৎসবের সাজের কথা। দেবেন্দ্ৰপরিবারে মূর্তি পূজো বন্ধ হয়ে গেলেও গায়ে লাগানো পাশের বাড়িতে বেশ ঘটা-পটা করেই দোলদুর্গোৎসব হত। হবে নাই বা কেন? তখনকার কলকাতায় এই তো ছিল দস্তুর। প্রতিমা লিখেছেন :

প্ৰতি, উৎসবেই মেয়েদের তখন বিশেষ সাজ ছিল। বাসন্তী রঙে ছোপানো কালো পেড়ে শাড়ি, মাথায় ফুলের মালা, কপালে খয়েরের টিপ—এই ছিল বসন্ত পঞ্চমীর সাজ। দুর্গোৎসবে ছিল রঙবেরঙের উজ্জ্বল শাড়ি, ফুলের গয়না, চন্দন ও ফুলের প্রসাধন।

দোল পূর্ণিমারও একটি বিশেষ সাজ ছিল, সে হল হালকা মসলিনের শাড়ি, ফুলের গয়না আর অতির গোলাপের গন্ধমাখা মালা। দোলের দিন শাদা মসলিন পরার উদ্দেশ্য ছিল যে আবিরের লাল রঙ শাদা ফুরফুরে শাড়িতে রঙিন বুটি ছড়িয়ে দেবে।

প্রতিমার বিবরণে গয়নার কথা নেই। গগনেন্দ্রর ছোট মেয়ে সুজাতা আমাদের জানিয়েছেন, সে সময় দিনে সোনার গয়না, বিকেলে মুক্তোর গয়না এবং রাতে হীরে জহরতের জড়োয়া গয়না পরার রেওয়াজ ছিল। বিয়েবাড়িতে কিংবা উৎসবের দিনে তারা এভাবেই সাজতেন। দিনের সোনালি আলোয় সোনার জৌলুষ বাড়ে, রাতের আলো হীরে জহরতে ঠিকরে পড়ে, শুধু মুক্তোর ভূমিকাঁটাই তেমন স্পষ্ট হল না। বিকেলের আলো-আঁধারি আর মন-কেমনকরা গোধূলি আলোয় মুক্তোই বোধহয় সবচেয়ে ভাল দেখায়।

প্রতিমার আসল দান কিন্তু ছবি আঁকা বা লেখা নয়, শান্তিনিকেতনে মেয়েদের জন্যে নাচ শেখাবার ব্যবস্থা। যদিও বাঙালীদের মধ্যে নাচ শেখার একেবারেই কোন ব্যবস্থা ছিল না। সেকালে স্টেজের ওপর তাল রেখে দু পা চলাও ছিল রীতিমতো লজ্জার কথা। বাল্মীকি প্রতিভা বা মায়ার খেলার সবটাই ছিল অভিনয়, সামান্য হাত নেড়ে একটু আধটু নাচের ভাব আনার চেষ্টা করা হত। তবে দিন বদলাচ্ছে। মেয়েরা এগিয়ে এসেছেন সব কাজে উৎসাহ নিয়ে। নাচেই বা পিছিয়ে থাকলে চলবে কেন? শান্তিনিকেতনে এই পরীক্ষা চালানোও অপেক্ষাকৃতভাবে সহজ। তাই আগ্রহী হয়ে উঠলেন প্রতিমা। নিজে তিনি মঞ্চে উপস্থিত হয়েছেন খুব কম। তার বিয়ের অল্প পরেই শান্তিনিকেতনে মেয়েদের প্রথম অভিনয় লক্ষ্মীর পরীক্ষা, প্রতিমা তাতে সেজেছিলেন ক্ষীরি। এরপর নিজে অভিনয় না করলেও যে কোন রবীন্দ্র নৃত্যনাট্যের তিনিই ছিলেন প্রাণ। রবীন্দ্রনাথের নিজের মনেও চিত্রাঙ্গদা, পরিশোধ নিয়ে নৃত্যনাট্য রচনার কোন পরিকল্পনা ছিল না। প্রতিমাই একটা খসড়া খাড়া করে কবির কাছে নিয়ে গেলে কবি এই নতুন শিল্পরূপ সম্বন্ধে সচেতন হয়ে ওঠেন।

কিন্তু নাচ কে শেখাবে? শান্তিনিকেতনে কিভাবে শেখান হবে? এ দেশের চোখ নাচ দেখতে অভ্যস্ত নয়। তাতে কি? প্রতিমা শুরু করলেন দুরূহ সাধনা। তিনি নিজে নৃত্যশিল্পী নন, কোনদিন নাচ শেখেননি। অসাধারণ শিল্পবোধের সাহায্যে কে এগোতে হয়েছে। তবে বাঙালীরা যে এ সময় নৃত্য-সচেতন হয়ে উঠেছে তার ইতস্ততঃ প্রমাণ দেখা যেতে লাগল উদয় শংকরের আবির্ভাবে। অবশ্য তখনও তার নৃত্যসঙ্গিনী কোনো ভারতীয় নন, বিদেশিনী সিমকি। ভদ্রবরের বাঙালী মেয়েদের নাচের পথ দেখিয়েছেন রে রায়। য়ুনিভারসিটি ইন্সটিটিউটে ঋতুচক্রের আয়োজন করেছিলেন সৌম্যেন্দ্রনাথ ও আরো অনেকে। উৎসবের শেষ গান যে কেবল পালিয়ে বেড়ায় দৃষ্টি এড়ায় ডাক দিয়ে যায় ইঙ্গিতে শুরু হতেই রেবা হঠাৎ গানের দল থেকে বের হয়ে এলেন উল্কার মতো স্টেজের মাঝখানে, গানের হালকা ছন্দের সঙ্গে শুরু করে দিলেন চপল নৃত্য! কাণ্ড দেখে সবাই তাজ্জব! চোখ কপালে উঠে গেল। ছি ছি ছি, ভদ্রঘরের মেয়েরা আবার নাচে নাকি? বিষোগারে কান পাতা দায়। এর উত্তর দিলেন সৌম্যেন্দ্র আরো কয়েকদিন পরে। জোড়াসাঁকোর বাড়ির উঠোনে নূপুর বেজে যায় রিণি রিণির সঙ্গে নাচলেন তিনটি মেয়ে চিত্রা, নন্দিত ও সুমিতা। এর বছরখানেক পরে রবীন্দ্রনাথ মঞ্চস্থ করলেন নটীর পূজা। এই সময় ভদ্রঘরের মেয়েদের নাচার পথ আরো সুগম করে দিলেন কেশবচন্দ্র সেনের নাতনীরা। ১৯২৮ সালে ভিক্টোরিয়া ইটিটিউশনের সাহায্যের জন্যে মঞ্চস্থ করা হল শ্রী কৃষ্ণ! কৃষ্ণের বাল্যরূপ দিলেন নীলিনা আর তার পরবর্তী জীবন রূপায়ণের ভার পড়ল সাধনার ওপর। সাধনা পরবর্তী জীবনে মধু বসুকে বিয়ে করেন ও মঞ্চে-পর্দায় অনেকবার নর্তকীরূপে উপস্থিত হন। সাধনা শিখেছিলেন ভালো কথক নাচ। আলিবাবা, রাজনৰ্তকী, দালিয়া তার অভিনয়ের সাক্ষ্য হয়ে। আছে। রেবা রায়ও নিয়মিত ভাবে নাচ শেখাতে লাগলেন সঙ্গীত সম্মিলনীতে। বড় বড় নৃত্যনাট্যের অনুষ্ঠান শুরু করলেন কিছুদিন পরে। যাক সে কথা।

প্রতিমা শান্তিনিকেতনে যা শেখাচ্ছিলেন তাকে ভাবনৃত্য বলাই উচিত। বর্ষামঙ্গলের দু-একটা নাচে কিছু রূপ দেবার পর প্রতিমা কবিকে পূজারিণী কবিতার নৃত্যনাট্যরূপ লিখে দিতে অনুরোধ করেন। শুধু মেয়েদের দিয়ে সেটি অভিনয় করবেন কবির জন্মদিনে। লেখা হল নটীর পূজা। দিনরাত খেটে প্রতিমা মেয়েদের দিয়ে অভিনয় করালেন। শ্ৰীমতীর ভূমিকায় অপূর্ব নৃত্যাভিনয় করে চিরস্মরণীয় হয়ে রইলেন নন্দলাল বসুর মেয়ে গৌরী। অবশ্য এ অভিনয় আরো পরের ব্যাপার!

দীর্ঘ চোদ্দ বছর অক্লান্ত পরিশ্রম করে প্রতিমা রাবীন্দ্রিক নৃত্যনাট্যের পাকা রূপ ফুটিয়ে তুললেন চিত্রাঙ্গদায়। এর আগে এসেছে শাপমোচন। নৃত্য নিয়ে প্রতিমা যে কত ভেবেছেন তার পরিচয় আছে তাঁর লেখা নৃত্য বইখানিতে। চিত্রাঙ্গদাতে যে বৈশিষ্ট্য ফুটে উঠল তা আরো স্পষ্ট হয়ে উঠল চণ্ডালিকাতে। এই বৈশিষ্ট্য কি? যা অন্য থেকে রবীন্দ্র নৃত্যনাট্যকে পৃথক করে রেখেছে। উদয়শংকরের নাচ তখন অনেকে দেখেছেন, দেখেছেন রেবা রায় ও সাধনা বসুর নাচের ধারা। এমন কি শ্ৰীমতীও মডার্ণ ডাসের আঙ্গিকে পরীক্ষামূলকভাবে রবীন্দ্র কবিতার সঙ্গে পরিবেশন করেছেন তার ভাবনৃত্য। চিত্রাঙ্গদা প্রথম মঞ্চায়িত হল ১৯৩৬ সালে নিউ এম্পায়ারে। এর পর ১৯৪০ সাল পর্যন্ত চিত্রাঙ্গদার অভিনয় হয় চল্লিশবার। এ হিসেব শান্তিদেব ঘোষের রচনা থেকে পাওয়া, তিনি থাকতেন নাচ ও গান উভয় দলেই। অর্জুন, কুরূপা ও সুরূপা চিত্রাঙ্গদা সাজতেন নিবেদিতা, যমুনা ও কবির দৌহিত্রী নন্দিতা। অন্তরালে থাকতেন প্রতিমা। সমস্ত পোশাক-পরিচ্ছদ-সাজ তাঁর নির্দেশেই পাননা হত। মঞ্চ-সজ্জাতেও তিনি শান্তিনিকেতনের ঐতিহ্য গ্রহণ করেছিলেন। রবীন্দ্রনাটক ও নৃত্যনাট্যে দৃশ্যসজ্জা ও রূপসজ্জায় যে একটি শালীন সৌন্দর্য আছে প্রতিমা সেটি। কঠোর ভাবে মেনে চলতেন। তাই নারী চরিত্রগুলির সুরুচিসম্মত রূপসজ্জা রচনায় তার নাম স্মরণীয় হয়ে আছে। শেষ দিকে কবির নির্দেশে তিনি নাটকের মঞ্চসজ্জা কেমন হবে তার স্কেচ করে রাখতেন। কবি তার অনুরোধে আর উৎসাহেই নৃত্যনাট্যগুলির খসড়া করেন আগেই বলেছি। মায়ার খেলারও নতুন রূপ দিয়েছিলেন তিনি। প্রতিমা আবার কথা ও কাহিনীর সামান্য ক্ষতি, গল্পগুচ্ছের ক্ষুধিত পাষাণ ও দালিয়া গল্পকে ট্যাবলো ধরনের মূকাভিনয় আকারে রূপায়িত করে কবিকে দেখিয়েছিলেন। তাতেও অবশ্য অভিনয়ের চেয়ে ভাবনৃত্যের প্রাধান্য ছিল। প্রতিমার নিজের মতে রাবীন্দ্রিক নৃত্যনাট্যের প্রধান বৈশিষ্ট্য সংমিশ্রণ। শান্তিনিকেতনের নৃত্য কোন বিশিষ্ট নৃত্যকলার আঙ্গিককে গ্রহণ করেনি। মিশ্র তল ও ভঙ্গির সহযোগে বৈচিত্র্য আনা সম্ভব হয়েছে। তাই মণিপুরী আঙ্গিকে গড়ে ওঠা চিত্রাঙ্গদার নাচ সমস্ত মণিপুরে খুঁজে পাওয়া যাবে না। দক্ষিণী আঙ্গিকে তৈরি চণ্ডালিকাকে চেনা যাবে না দক্ষিণী নাচের মধ্যে। মিশ্রণের এমনি গুণ। এর পর এই মিশ্র নৃত্যকে দাড় করান হল সঙ্গীতের ভিত্তির ওপর। সেইটেই হল শান্তিনিকেতনের নতুন দান।

এই সঙ্গীতযোগে নৃত্যের পূর্ণবিকাশ আমাদের প্রাচীন নৃত্যে দেখা যায় না।

রবীন্দ্র-নৃত্যের স্বাতন্ত্র্য ও বৈশিষ্ট্য এবং সৌন্দর্য রক্ষার কথাও ভেবেছিলেন প্রতিমা। তাই গানের স্বরলিপির মতো নৃত্যলিপির কথাও তার মনে আসে। শিল্পী হারিয়ে যাবে। শিল্প হারাবে না। শিল্প যে অবিনশ্বর! রবীন্দ্রনাথের চোখের সামনে যে শিল্প নৃত্যরূপ লাভ করল, তার মধ্যে আছে আপন স্বকীয়তা। একে যদি ধরে না রাখা হয় তাহলে যে হারিয়ে যাবে সেই নয়ননন্দন ভঙ্গিমা। তাই প্রতিমা আশ্রমের নতুন মেয়েদের নিয়ে নাচের ক্লাস করতেন। মেয়েদের দিয়ে নাচ তৈরি করিয়ে কবিকে দেখাতেন। কবির অনুমোদন না পেলে সন্তুষ্ট হতেন না। চলত অনুশীলনের পর অনুশীলন। তখন অবশ্য সব নৃত্যই ছিল ভাবনৃত্য। গানের ভাবই প্রকাশ পেত নৃত্যভঙ্গিমায়। প্রতিমা নিজেই নাচের মূদ্রা দেখিয়ে দিতেন; পুরোপুরি নাচ তৈরি করে দিতেন সুন্দরভাবে গানের সঙ্গে গলা মিলিয়ে। নাচের বোল ছাত্রীদের লিখে রাখতে বলতেন এবং কলা ভবনের শিল্পীদের দিয়ে নৃত্যের ভঙ্গি আঁকিয়ে রাখার চেষ্টা করতেন।

রবীন্দ্রনাথকে প্রতিমা যত গভীরভাবে বুঝতেন ততখানি বোধহয় কেউ বোঝেননি! বৃথীন্দ্রের সঙ্গে কবির আদর্শগত মতবিরোধ হত। কিন্তু প্রতিমার সঙ্গে নয়। তাই কবির শেষজীবনের অনুপুঙ্খ ঘটনায় পূর্ণ নির্বাণ প্রতিমার হাতে জীবন্ত হয়ে উঠেছিল। এমন নির্লিপ্ত মৌখিক ভঙ্গিতে তিনি কবির সর্বশেষ পর্যায়টি বর্ণবিরল পরিচ্ছন্ন কয়েকটি হালকা রেখার টানের মতো ফুটিয়ে তুলেছেন যা নিজে না পড়লে বোঝা যায় না। শান্তিনিকেতনে তিনি নারীশিক্ষা ও নারীকল্যাণের দিকটাও দেখতেন। মেয়েদের নিয়ে গড়েছিলেন আলপিনী সমিতি। ইন্দিরা ও হেমলতা ছাড়াও সেখানে ছিলেন সুকেশী, কমলা, মীর ও আরো অনেকেই। মাঝে মাঝে ঘরোয়া এবং পুরোপুরি মেয়েলি অনুষ্ঠানে তারা লুকিয়ে লুকিয়ে নিজেরাই নানারকম নাচের মুদ্রা অভিনয় করছেন, গান গাইতেন। আবার কখনো কখনো তেঁতুলতলায় ছোট চৌকি পেতে বসে তাঁরা বোলপুরের মেয়েদের শেখাতেন গান, বলতেন গল্প। চারপাশের গ্রামে কাজ করা পছন্দ করতেন রবীন্দ্রনাথ। তাই প্রতিমার ব্যবস্থায় আশ্রম থেকে মেয়ের পালা করে যেতেন গ্রামে—কখনো হেঁটে কখনো গরুর গাড়ি চড়ে। গ্রামের অশিক্ষিত মেয়েদের তারা শেখাতেন, কি করে স্বাস্থ্যকর খাবার তৈরি করা যায়, শরীর ভাল করা যায় কিংবা টুকিটাকি হাতের কাজ করে তা থেকে দু পয়সা উপার্জন করে সংসারের সাশ্রয় হয়—এইসব! কবির সমস্ত ইচ্ছেকেই সাগ্রহে রূপ দেবার চেষ্টা করেছিলেন প্রতিমা।

আলাপিনী সমিতির আরেকজন সভ্য ছিলেন দিনেন্দ্রনাথের স্ত্রী কমলা। এরকম আমুদে, সবার মুখে সুখী মেয়ে খুব কমই ছিল। এখনো শান্তিনিকেতনের প্রথম যুগের মানুষেরা কমলা বৌঠানের কথায় খুশি হন। বলেন, তার মতো মানুষ হয় না। খুব আদর যত্ন করতেন। আসলে এক এক জন মানুষ থাকেন যারা অনেক কিছু না করেও জুড়ে থাকেন মনের অনেকখানি, কমলা ছিলেন তাই। কবির সঙ্গেও তার মধুর সম্পর্ক। পরিবারের সবচেয়ে বড় নাতবৌ। সেই সুবাদে কবি প্রায়ই ঠাট্টা-তামাশা করে লজ্জা দিতেন কমলাকে। সবার মাঝে হঠাৎ কমলাকে ডেকে পাশে বসিয়ে বলতে শুরু করে দিতেন,

কমল তুমি এইখানটিতে বোসস! তোমার সঙ্গে আমার যে খুব ভাব, তা না-হয় ওরা দেখতেই পাবে, না-হয় কলকাতায় গিয়েই বলে দেবে।

ওরা হচ্ছেন রামানন্দ চট্টোপাধ্যায়ের মেয়ে সীতা ও শান্তা। আরেক দিনের কথা। তারও সাক্ষী সীত। রবির সঙ্গে কমলের সম্বন্ধটি নিয়ে কবি প্রায়ই ঠাট্টা করেন। তাঁর গানে ঘুরে ফিরে যে কমল কথাটা আসে কেন কে জানে? একজন জানালেন, দিনেন্দ্রনাথ নাকি এতে আপত্তি করছেন কারণ গান শেখাতে গেলে গানে কমল কথাটা থাকলে ছেলেরা হাসে। কবি জানেন সবই। ছেলেদের হাসির কারণ যে কবি নন, স্বয়ং দিনেন্দ্র, তাও জানেন। তাই কবি গম্ভীর হবার ভান করে বলেন, দোষটা মেয়েদেরই। তারাই এ কথাটা ছড়িয়েছে।

আলাপিনী সমিতির নিজস্ব কাগজ ছিল শ্রেয়সী। একদিন শোনা গেল কমলা তার জন্যে একটা গল্প লিখেছেন। কবির মহা উৎসাহ। কেমন গল্প? গল্পের মধ্যে কটা বিয়ে আছে? নেই? বিয়ে ভাঙাও নেই? কমলাকে বললেন, তুমি কোনো কর্মের নয়, একটা বিয়ে দিতে পারলে না?

এরপর প্রতিমা বলে দিলেন, গল্পের নায়ক একজন কবি। আর যায় কোথায়! কবি অত্যন্ত চটে ওঠার ভান করে বললেন, এ নিশ্চয় আমাকে লক্ষ্য করে লেখা, যাও, তোমার সঙ্গে আর কোনো কথা নয়—

শ্রেয়সী পত্রিকার সব কটা সংখ্যা আর পাওয়া যায় না। যে কটি আছে তাতে কমলার গল্পটি পাওয়া যায়নি, শুধু একটিমাত্র লেখা পাওয়া গেছে। গল্প নয়, ছোট্ট একটি রচনা গান। মনে হয় এতে তার স্বামীর হাতই বেশি। দিনেন্দ্রনাথ শুধু রবীন্দ্রসঙ্গীতের ভাণ্ডারী ছিলেন না, নিজেও কবিতা লিখতেন। তার প্রথম কবিতার বইটা প্রকাশিত হল নীরব বীণ নামে। বাকা মন্তব্য করলেন সুরেশ সমাজপতি, দাদামশাই আর নাতি এত জোর নীরব বীণা বাজাচ্ছেন যে দুদিন পরে গড়ের মাঠে আর ব্যান্ড পার্টির দরকার হবে না! লজ্জায় দুঃখে সব বই লুকিয়ে ফেললেন দিনেন্দ্রনাথ। তাঁর মৃত্যুর পরে সমস্ত অপ্রকাশিত রচনা একত্র করে সেগুলি প্রকাশ করে কমলা তার কর্তব্য পালন করেন। গান-এর ভাষা সহজ, সরল, প্রাণের ভেতরে প্রবেশ করে।

গানের ভিতর দিয়ে আমরা আপনাকেই উপলব্ধি করতে পারি। আমাদের ব্যথা আনন্দ-বিরহ মিলন এই সকলের সঙ্গেই গানের সুরের অনির্বচনীয়তা মিশ্রিত হয়ে তাদের অসীম সৌন্দর্য দান করে। অন্তরের বাহিরের এই সুরের দেওয়া নেওয়ার ভিতর দিয়েই আমরা বিরোধের মধ্যে ঐক্যকে আর বিচ্ছেদের মধ্যে মিলনকে লাভ করি।

কবির আরো কয়েকজন নাতবৌ ছিলেন। তাঁদের মধ্যে সবচেয়ে ঘনিষ্ঠ হয়েছিলেন অমিতা ও অমিয়া ঠাকুর। শ্ৰীমতী কাছে এসেছিলেন বিয়ের অনেক আগে। তবে এরা সবাই এসেছেন বেশ পরে। বরং তার আগে একবার গুণেন্দ্র পরিবারের খোঁজ নিয়ে আসা যাক।

সৌদামিনীর তিন ছেলের বিয়ে হয়েছে। ঘরে এসেছেন প্রমোদকুমারী, নিশিবালা ও সুহাসিনী। নাতি-নাতনীদের নিয়ে ভরা সংসার। ছেলের বৌয়ের সাংসারিক কাজে সুনিপুণ। প্রমোদকুমারী, নিশিবালা এবং সুহাসিনীর কথা আমরা খুব বেশি জানতে পারিনি। তারা বাড়ির সনাতন নিয়ম মেনে ঘরকন্নার কাজ নিয়ে থাকতেই ভালবাসতেন। এদের মধ্যে প্রমোদকুমারীর ছিল দুরন্ত সাহস। সবাই তার ওপর নির্ভর করতে পারতেন। পারিবারিক নাট্যানুষ্ঠানে তাদের যোগ দিতে দেখে মনে হয় এদিকে একটু উৎসাহ পেলে তারাও নিজেদের দক্ষতা দেখাতে পারতেন। একবার রত্নাবলী নাটকের অভিনয়ে তারা তিন বোই অংশগ্রহণ করেছিলেন। সঙ্গে ছিলেন তাঁদের দুই ননদ! তবে গান বা নাটক-অভিনয় নিয়ে মেতে না উঠলেও পাঁচ নং বাড়ির পরিবেশটি সব দিক থেকেই মনোরম ও অন্তরঙ্গ করে রেখেছিলেন তিনজনে। অতিথিসেবা, দেবপূজা, ছেলেমেয়েদের মানুষ করা, সংসারের কাজ দেখা সবই করেন তারা। সৌদামিনী বালিশে আধশোয়া হয়ে সব দেখতেন আর স্বস্তির নিঃশ্বাস ছাড়তেন। তার নাতনীরা ঘর-সংসারের চার দেওয়ালের গণ্ডির মধ্যে থেকেও জীবনকে সুন্দর করে তুলতে শিখেছিলেন। তাই বড় কিছু না করলেও এই পরিবারের মেয়েদের বুকে ছিল তৃপ্তির নিঃশ্বাস, শান্তির স্বাদ। অনেক পৌত্রী সৌদামিনীর। গগনেন্দ্রর তিন মেয়ে সুনন্দিনী, পূণিমা ও সুজাতা; সমরেন্দ্রের পাঁচ মেয়ে মাধবিকা, মালবিকা, কমলা, সুপ্রিয়া ও অণিমা; আর অবনীন্দ্রের তিন মেয়ে উমা, করুণা ও সুরূপা। সবাই সমান গুণের নয় তবে ঘর-সংসারের কাজে সবাই বেশ দক্ষ। তাদের সেলাই শেখাবার জন্যে এলেন এক ব্রাহ্ম মহিলা ইন্দুবালা দেবী। সবার চেয়ে বড় হচ্ছেন উমা। তার চেয়ে কয়েক মাসের ছোট সুনন্দিনী একেবারে পিঠোপিঠি বোন আর কি। এখন আর দুজনের কেউ নেই। অথচ কয়েক মাস আগেও ছিলেন উমা। ছিয়াশী বছর বয়সে অপটু দেহের মধ্যে লুকিয়ে রেখেছিলেন এক প্রাণচঞ্চল দশ বছরের কিশোরীকে। কিশোরীটির মনে দুঃখ ছিল বেথুন স্কুলে ভাল রেজাল্ট করেও প্রাইজটা আনতে যাওয়া হয়নি বলে। যাওয়া হয়নি বিয়ে ঠিক হয়েছিল তাই।

ঠাকুরবাড়ির মেয়েদের মতো উমারও নানা ধরনের গুণ ছিল। একবার নাটকের রূপ দিয়েছিলেন বাবার লেখা ক্ষীরের পুতুলকে। ঘরোয়া নাটকে মাঝে মাঝে অভিনয় করা ছাড়াও দুবার তিনি বেশ বড় মাপের অভিনয় করেছিলেন। একবার আলিবাবা নাটকের মর্জিনা আর একবার বিরহের গোলাপী। রবীন্দ্রনাথ দেখেছিলেন সে নাটক। মুগ্ধ হয়ে বলেছিলেন তার সঙ্গে জাভায় যেতে, যাওয়া হয়নি। বাধা দিয়েছিলেন অবনীন্দ্রনাথ। বলেছিলেন, উমা! ও কি পারবে অত ধকল সহ্য করতে? কাজেই যাওয়া হল না।

কলকাতায় বসে বসেই তিনি এই সেদিন পর্যন্ত কাঁপা কাঁপা হাতে বুনে গেছেন সুতোর নকশা, মাকড়সা জালের মতো সূক্ষ্ম আঁকিবুকিতে ফুটে উঠেছে লতা-পাতা-কলকা—সে যুগটাও যেন বাঁধা পড়ে আছে উমারাণীর সুতোর ফাসের বঁধনে। সেলাই ফোঁড়াইয়ে উমার হাত বড় ভাল, তার বোনেরাও কেউ কম যান না। ইন্দুবালা সকলকেই যত্ন করে শেখাতেন। সেকালের মেয়েরা সেলাই-টেলই ভালই শিখতেন, এখনও শেখেন কিন্তু তার সঙ্গে উমার সেলাইয়ের পার্থক্য ছিল। তিনি ছিলেন শিল্পী-পিতার শিল্পী মেয়ে। মেয়ের সীবন-দক্ষতা বাবার মনে উৎসাহ জাগাত। তিনি এঁকে দিতেন নানারকম নকশা, সুতোর রঙের সাথে রঙ মিলিয়ে!

পশ্চিমবঙ্গে কাঁথার চল্ ছিল না, ছিল লেপ, বালাপোষ। পূর্ববঙ্গে ছিল কাঁথর বাহার। ঠাকুরবাড়ির বৌয়েরা আসতেন যশোর থেকে। তাই তারাও জানতেন নকশী কাঁথা সেলাই করতে। অবন ঠাকুর ছিলেন নকশী কাথার সমঝদার। তিনি নানারকম কঁথার নকশা ও ফোড়নের নমুনা সংগ্রহ করে রাখতেন; উমা কাঁথায় তুলতেন সেইসব বয়কা-বাঁশপাতা-তেরসী সেলাই। এখনও সেসব কথা আছে তার ছেলেমেয়েদের কাছে। অনেক রকম নতুন টীচেরও উদ্ভাবক তিনি। তবে এসব তো লিখে রাখেননি তাই ছড়িয়ে পড়েনি দশ জনের মধ্যে। এসময় অনেকেই সেলাইয়ের বই লিখেছেন। তার মধ্যে তুষারমালা দেবীর কাট ছাট বুনন সূচের কাজ, সুশীলা দেবীর আদর্শ সূচী শিল্প, কাননবালা ঘোষের আদর্শ সূচীচিত্র, অপরাজিতা দেবীর সূচীচিত্র শিক্ষা, গায়ত্রী দেবীর সূচীলিখন, যমুনা সেনের সেলাইয়ের নক্শা, সুলেখা দেবীর সূচীরেখা, প্রকৃতি দেবীর চিত্রন, উমা দেবীর কাঠিয়াবাড়ী সেলাই ও কাচের কাজ, মীরা দেবীর সচিত্র উল শিল্প সেলাইয়ের বই হিসেবে স্বতন্ত্র দাবি করে।

বৃদ্ধ বয়সে, হাতে যখন অনেক সময়, ক্ষীণদৃষ্টিতে সেলাই করা যায় না তখন উমারাণী শুরু করলেন স্মৃতিকথা লিখতে। কার কথা লিখবেন? কেন, বাবার কথা! উমার বইয়ের নামও বাবার কথা। অবনীন্দ্রনাথকে এত কাছে থেকে জানবার সুযোগ আর মিলবে না। শেষ বয়সে স্মৃতির আকার দিয়ে আঁকা ছবিগুলো তিনি কারুর কথা ভেবে আঁকেননি। পুরনো কথা ভাবতে ভাবতে হঠাৎ মনে হয়েছিল লিখে রাখার কথা। তাহলে লেখার রেললাইন বেয়ে হয়ত পোঁছনো যাবে ছবির ইস্টিশনে। আমার বাবা ছবি আঁকতেন, আমি লিখব পুরনো দেখা ছবির কথা। এর মধ্যে কোন ধারাবাহিকতা নেই, ইতিহাস নেই, এ শুধু এক নিতান্ত ঘরোয়া মেয়ের পিছন ফিরে চাওয়া। তার মধ্যে সবার কথাই আছে, বাবার কথাই বেশি। কোন বিখ্যাত মানুষকে আমরা তার আপনজনের দৃষ্টি দিয়ে যখন দেখি, নতুন করে আবিষ্কার করি। রবীন্দ্রনাথের সংসার, সোনার বোম পরা নিয়ে মৃণালিনীর সঙ্গে মতান্তর, রান্নার এক্সপেরিমেন্ট, বাসর ঘরে গান কিংবা রোগশয্যায় স্ত্রীকে হাওয়া করার মতো ঘটনাগুলো কি কোনো পুরুষের চোখে ধরা পড়ত? ধরা পড়েছিল হেমলতার চোখে। সেই কাকারই ভাইপো অবন। কাকা সোনার বোম পরতে চান না, ওপাল পাথর পরেন দায়ে পড়ে। ভাইপোই বা কম কী? খুঁটিনাটি নিয়ে তারও আপত্তি। ছোট ছোট ছবি এঁকেছেন উমারাণী। একটা কঁসার ঘটিতে জল খেতেন অবনীন্দ্রনাথ। সাবিত্রী ব্রত উদ্যাপন উপলক্ষ্যে তার স্ত্রী তাকে একটি রূপোর ঘটি করিয়ে দিলেন। কিন্তু বাবা কিছুতেই সে ঘটিতে জল খাবেন না। আমি তাই শুনে তাঁকে বল্লম, মা দুঃখ পাবেন। তুমি কিছুদিন জল খাও, তারপর আবার তুলে রেখে দিও। তখন থেকে সেই ঘটিতে জল খেতে লাগলেন।

মা মারা যাবার পর বাবা বললেন, ও ঘটি তোলো। চোর ডাকাতে লুটে নেবে। আমি সব সময় ও ঘটি সামলাতে পারবো না। তারপর আর কখনো সে ঘটিতে জল খাননি।

এখানেই মেয়েদের লেখা স্মৃতিকথার সার্থকতা। এমন ঘরোয়া ছবি, খুঁটিনাটি দেখবার চোখ মেয়েদেরই আছে। পুরুষ বড় প্রাণ, বড় মান, বড় কথার বেসাতি করে; মেয়েরা পায় বিন্দুর মধ্যে সিন্ধুর স্বাদ! ধনীর দুলালের সাদাসিধে জীবন কাঁটানোর সহজ-অভ্যেস আর স্ত্রীর প্রতি সুগভীর শ্রদ্ধা উমার আঁকা অবন ঠাকুরের এই ছোট্ট ছবিতে যতটা ফুটেছে একটা বিরাট প্রবন্ধে তত ভাল ফুটত না। এরপর উমা বসেছিলেন নিজের আত্মকথা লিখতে। শেষ হবার আগেই শেষ নিঃশ্বাস ফেললেন তিনি। বেথুন স্কুলের শতবার্ষিকীতে সেই প্রাইজ পেয়েও পাওয়া মেয়েটিকে প্রাইজ দেবার তোড়জোড় চলছিল বোধহয়। কিন্তু উমারাণীর আর প্রাইজ নেওয়া হল না এবারও।

উমার সঙ্গে তার ছোট বোনেদের কথাও সেরে নেওয়া যাক। করুণার মৃত্যু হয়েছিল অল্প বয়সেই। তার সঙ্গে বিয়ে হয়েছিল লেখক মণিলাল গঙ্গোপাধ্যায়ের। দুটি ছোট ছোট ছেলেকে রেখে ওপারে পাড়ি দিলেন করুণা। তাঁর ছোট বোনের নাম সুরূপা। খুব ছোটবেলাতেই ডাকঘরের সুধা মালিনী সেজে তিনি সবার মন কেড়ে নিয়েছিলেন। ডাকঘরের সেই প্রথম অভিনয়ে অমল সেজেছিলেন আশামুকুল। অভিনয় হয়েছিল চমৎকার। সুরূপার মনে আছে অভিনয় হয়েছিল পাঁচ দিন। অভিনয়ের শেষে সবাই দুই শিশু অভিনেতাকে জড়িয়ে ধরে আদর করতেন। সুরূপ লিখেছেন, আমাদের কেউ মেডেল দেয়নি কিন্তু সবাই এত আদর করেছিলেন, সে কি বলব। রবিদা তো। খুশি হয়ে আমার বেনে পুতুলের জন্যে একটা চমৎকার সবুজরঙের জরি-পড় দেওয়া সিল্কের রুমালই আমাকে বকশিশ দিলেন। পরে ডাকঘরের কথা উঠলেই কবি দুঃখ করে বলতেন, আমার অমল সুধা বড় হয়ে গেল, আর কে অভিনয় করবে। সুরূপাকে বড় ভালবাসতেন কবি, আদর করে তাকে ডাকতেন মালিনী বলে। দ্বারে কেন নাড়া দিলে ওগো মালিনী বুঝি এই মালিনীর উদ্দেশ্যেই লেখা। বড় হয়ে তিনি একবার হয়েছিলেন নটীর পূজার মালতী। সেও বেশ মজার ঘটনা। আগে থেকে কোন ঠিক ছিল না। রূপা লিখছেন, ও-বাড়ির দালানে নটীর পূজা হবে। শান্তিনিকেতন থেকে মেয়েরা এসেছে, তারা অভিনয় করবে। অভিনয়ের একদিন আগে হঠাৎ মালতী সাজবে যেমেয়েটি তার খুব জ্বর এসে গেল। মহা বিপদ! রবিদাদা তৎক্ষণাৎ দিনুদাদাকে ডেকে হুকুম দিলেন, আমার মালিনীকে নিয়ে এস। ব্যস, দিনুদা বিপুল বপু টেনে ঝড়ের গতিতে পালতোলা নৌকোর মত এ-বাড়িতে এসে আমাকে নিয়ে হাজির করল রবিদাদার সামনে। যত বলি, পারব না এত তাড়াতাড়ি, ছেড়ে দিন আমাকে, অন্য কেউ করুক। কে কার কথা শোনে! করতেই হবে তোকে, নিজে শেখাব। শিখিয়েও ছিলেন কবি যত্ন করে। অভিনয় ভালভাবেই উতরে গেল। অভিনয়ের পর কবি ওপরের বারান্দায় সুরূপাকে ডেকে আদর করে গলায় পরিয়ে দিলেন একটি ফুলের মালা। বললেন, এই তোর প্রাইজ। কিন্তু খুব বেশি অভিনয় করেননি সুরূপা তবে লিখেছেন, মৃত্যুর আগেও লিখতেন মাঝে-সাঝে, কবিতা কিংবা প্রবন্ধ। ছোট ছোট প্রবন্ধ অবনীন্দ্রনাথ, সোমেন্দ্রনাথ ডাকঘর, সুধার স্মৃতি সাময়িক পত্র-পত্রিকার পাতা খুঁজলে হয়ত চোখে পড়বে। ডাকঘর নাটক সম্বন্ধেও অনেক কথা জানা যায়। একদিন রবীন্দ্রনাথ অবনঠাকুরকে হুকুম করলেন, তোমাদের বাড়ির একটি ছোট মেয়ে জোগাড় করো। তখন ছোটদের দিয়ে অভিনয় করাতে কেউই সাহস করত না। ঠাকুরবাড়ির ছেলেমেয়েরাই একটু-আধটু গান করত। রবীন্দ্রনাথ ডাকঘরে দেখালেন ছোটরাও ভাল অভিনয় করতে পারে। বাবার সঙ্গে ভয়ে ভয়ে এলেন সুরূপা, কবির আদেশে পড়লেন ডাকঘর। রবীন্দ্রনাথ খুশি হয়ে বললেন, অবন একে সুধার ভূমিকায় তৈরি করে, তবে তুমি আবার বেশি শিখিও না। ওকে নিজের মতো করতে দিও। সুরূপা লিখেছেন, বাবা আমাকে সাজাতেন মাথায় উবু ঝুটি, গলায় পুতির মালা, পায়ে মল, পরণে। লাল শাড়ি আঁট করে পর, এক হাতে ফুলের সাজি এক বগলে বেনে পুতুল। সুধার স্মৃতি থেকে জানা যায়, ডাকঘরের অভিনয়ের সময় আরো একটা ঘটনা ঘটেছিল। ঠিক অভিনয়ের আগে সুরূপা দেখলেন মঞ্চের সামনে চেয়ার-টেবিল পেতে লাট কারমাইকেল ও অন্যান্যদের বসবার জায়গা হয়েছে। টেবিলে ফুলদানীতে বড় বড় লাল গোলাপ সাজিয়ে দিচ্ছেন সমরেন্দ্রনাথ। সঙ্গে সঙ্গে সুরূপা বায়না ধরলেন, একটা লাল গোলাপ দাও, সাজিতে দেব। সমরেন্দ্রনাথও দেবেন না। বলেন, তোর সাজি তো খালি থাকবে, তুই ফুল তুলতে যাচ্ছিস। সুরূপাও নাছোড়বান্দা। রবীন্দ্রনাথ দেখে বললেন, আহা দাও দাও। মালিনীর বাড়িতেও তো বাগান আছে, সেখানকার ফুল ও তুলেছে। ছোটখাট কাজে বাবার মতো সুরূপারও উৎসাহ ছিল। দিদির মত সেলাই-বোনা নিয়ে না থাকলেও তিনি অবন ঠাকুরের দেখাদেখি তৈরি করতেন ঝিনুকের কুটুমকাঁটাম পুতুল কিংবা আরো টুকিটাকি দু-একটা জিনিষ এই আর কি!

হাতে তৈরি খেলনা কিংবা পুতুলের ওপর ঝোঁক ছিল সুনলিনী, পূর্ণিমা ও সুজাতা তিন বোনেরই। সুনন্দিনী গগনেন্দ্রর বড় মেয়ে। প্রভাতনাথের সঙ্গে তাঁর বিয়ে ঠিক হয়েছিল বলতে গেলে জন্মাবার সঙ্গে সঙ্গেই। বেশ চঞ্চল আর হাসিখুশি মেয়ে। দুষ্ট মি বুদ্ধিতেও সেরা। দাদাদের পরামর্শে ঘুমন্ত পণ্ডিতমশাইয়ের টিকি কেটে দিলে ঠাকুরমা সৌদামিনী বললেন, অনেক পড়াশুনো হয়েছে, এবার বিয়ে দিয়ে দাও।

খুব ধুম করে বিয়ে হল। গৌরীদান করলেন গগনেন্দ্রনাথ। বিবাহবাসরে সেলাই করা কাপড় নিয়ে আপত্তি উঠেছিল সেকথা আগেই বলেছি। গগন দেখালেন তিনি মেয়েকে যে ধাঁচে শাড়ি পরিয়েছেন সেটি যেমন আর্টিস্টিক তেমনি সুন্দর। সবারই ধরনটি বেশ পছন্দ হল। মেয়ে প্রথম শ্বশুরবাড়ি যাবে। গগনেন্দ্র আর্টিস্টকে দিয়ে মেয়ের প্রমাণ সাইজের একটা ছবি আঁকালেন—সেই কেতায় শাড়ি পরা, হাতে কাজললতা, অপূর্ব ছবিটি—এখনো আছে সুনন্দিনীর ছেলে দ্বারকানাথ চট্টোপাধ্যায়ের কাছে।

এই বিয়ের পরে বেশ একটা মজার ঘটনা ঘটেছিল। গগনেন্দ্র বড় মেয়েকে দিয়েছেন একসেট হীরের গয়না। তাই নিয়ে মেয়েমহলে এক তর্ক ওঠে। চিরকেলে মেয়েলি তর্ক যেমন হয় আর কি? একদল বললেন, ও হীরে নয়, পোখরাজ। আরেকদল বললেন, না, ও হীরেই। তর্কের মীমাংসার জন্যে ব্যাপারটা অনেকদূর গড়ায় এবং শেষ পর্যন্ত মেয়েদের থামতে হয় বাড়ির কাদের কাছে ধমক খেয়ে। যারা বলেছিলেন পোখরাজ তারা বাজি হেরে একশ টাকার মিষ্টি তত্ত্ব পাঠালেন।

এতটা হবে মেয়েরাও বুঝতে পারেননি। এই সুন্দর গল্পটি উপহার দিয়েছেন সুনন্দিনীর সেজো বোন পূর্ণিমা। কিন্তু তাঁর গ্রন্থে প্রদত্ত বিবরণটি সত্য নয়। এই তর্কের মধ্যে মহর্ষি পরিবারের মেয়েরা ছিলেন না, ছিলেন পাথুরেঘাটার ঠাকুরবাড়ির মেয়েরা। ব্রাহ্ম বলে মহর্ষি পরিবারের মেয়েরা সেখানে সেদিন নিমন্ত্রিত হননি। কিছু কিছু ভুলভ্রান্তি এবং তথ্যগত প্রমাদ থাকলেও পূর্ণিমার লেখা ঠাকুরবাড়ির গগন ঠাকুর পাঁচ নম্বর বাড়ির অন্দরমহলের সবচেয়ে বিশ্বাসযোগ্য বিবরণ। তিনি সবার কথাবার্তা ভাবভঙ্গি এমন কি কণ্ঠস্বরটি পর্যন্ত যেন পৌছে দিয়েছেন ভাবীকালের পাঠকদের কাছে। তার বই পড়ে বোঝা যায় এ সময় বাইরের ঘটনার বর্ণবিচ্ছুরণে অন্তঃপুরের কোণগুলো আর আলোকিত হয়ে উঠছে না। সেখানে তখনো সেই পুরনো চাল, সাবেকী ঢং বজায় আছে। হয়ত মেয়েরা শাড়ির বদলে ফ্রক পরছেন, স্কুলে যাচ্ছেন এইমাত্র। তার বেশি নয়। স্বাধীনতা আন্দোলনে যোগ দিয়ে কত মেয়ে জেলে গেল, হারিয়ে গেল, কে তার খোঁজ রাখে? কল্পনা দত্ত, বীণা দাস, প্রীতিলতা ওহদেদারের কথাও শোনা যাচ্ছে। কিন্তু ঠাকুরবাড়ি—সেই অন্ধকারের বুক চিরে উষার অস্ফুট আভাস ফোঁটানো বাড়ির মেয়েরা এখন যেন অনেকটা পিছিয়ে পড়েছেন। কিংবা বলা যায় তারা এখনো ধরে আছেন উনিশ শতকের সোনালি সময়টাকে।

যাক সে কথা, পাঁচ নম্বর বাড়ির মেয়েরা শিখেছিলেন কি করে গাৰ্হস্থ্য জীবনকে সুন্দর করে তুলতে হয়, সরল করে রাখতে হয়। সাধারণ জীবনে এর দামও তো কম নয়। শিল্পীকন্যারা শিখেছিলেন নানারকম হাতের কাজ। বিদেশী পুতুল বর্জন করে দেশী পুতুলকে আদর করতে শেখালেন তারা। সুনন্দিনী কাপড় দিয়ে সুন্দর সুন্দর পুতুল তৈরি করতে পারতেন। একে বলা হত গুড়িয়া পুতুল। তাঁর পানওয়ালী ও সাপুড়ে পুতুল যে দেখেছে সে-ই মুগ্ধ হয়েছে। হিতকারী সভা থেকে সাপুড়ে পুতুলটি পুরস্কৃত হয়, প্রাইজ পেয়েছিলেন ক্যালকাঁটা একজিবিশন থেকেও। ইদানিং হাতের কাজ বিশেষ করে পুতুলটুতুলের খুব আদর, মেয়েদের হাতে তৈরি খেলনা-পুতুল চড়া দরে বিকোয়। অনেক মহিলা কিংবা মহিলা-প্রতিষ্ঠান মাঝে মাঝে প্রদর্শনীর আয়োজনও করেন। ঠাকুরবাড়ি থেকেই এসব জিনিষের আদর শুরু। সুনন্দিনী অবশ্য শুধু পুতুলই করতেন না, ভাল অভিনয়ও করতে পারতেন। গানের গলাটিও ছিল চমৎকার। একবার মৃণালিনী নাটকে সেজেছিলেন গিরিজায়া, সবার ভাল লেগেছিল সে অভিনয়। লোককে বোকা বানাতেও তার জুড়ি ছিল না। তার দুব্বোঘাসের চচ্চড়ি খেয়ে যে কত লোক বোকা বনেছেন তার ঠিক নেই। কারুর বাড়িতে জামাই ঠকানোর দরকার হলেই ডাক পড়ত নন্দিনীর। তিনিও কোমর বেঁধে বসে পড়তেন রাধতে। সেও যেন শিল্প-ব্লটিংয়ের রাবড়ি, তুলোর বেগুনি, খড়কুটোর হেঁচকি খেতে গিয়ে ঠাকুরবাড়ির জামাইরা যে কত ঠকেছেন তার ইয়ত্তা নেই।

পূর্ণিমা অনেকটা উমারাণীর মতোই শিল্পী। তার হাতের কাজ বিশেষ করে নকশী কাথাগুলো চোখে না দেখলে ধারণা করা শক্ত। এ ছাড়াও তিনি তৈরি করতেন কাগজের বাড়ি, মেওয়ার পুতুল, ডালের ছবি। সেগুলো কি কাজে লাগত? মেয়ের বিয়েতে তত্ত্ব পাঠানো হত। ঠাকুরবাড়ির তত্ত্ব দেখবার মতো জিনিষ ছিল। একশো-দেড়শেজন লোক যেত। পুরনো ঝিচাকরেরা নিয়ে যেত কলকাতার সব বিখ্যাত খাবার। যশোর থেকে আসত স্পেশাল অর্ডার দেওয়া নারকেল চিড়ে, জিরে-নারকেলের ফুল-মেয়েরা হাতে তৈরি করে চিনিতে পাক করে পাঠাত। এক এক থালা ভরা এক একটা বাতাসা, বড় ঝুড়িতে একটা কদমা। কত রকম ঠাট্টার জিনিষ। এদের সঙ্গেই পাঠানো হত ট্রে ভর্তি মেওয়ার পুতুল, নানারকম ডাল দিয়ে ট্রের ওপরে সাজানো নানারকম ছবি। কাগজের বাড়িগুলোও ছিল খুব সুন্দর। কিন্তু কালের কবল থেকে তারা কেউ রক্ষা পায়নি। আজ পূর্ণিমাও নেই, শুধু আছে তার লেখা ঠাকুর বাড়ির গগন ঠাকুর। আছে তার অধসমাপ্ত আত্মাহিনীর পাণ্ডুলিপি চাঁদের বুড়ি। নাতিদের ভোলাবার জন্যে লেখা—গগনের মেয়ে পূর্ণিমা, জামাই নিশানাথ, সবাই যেন চন্দ্রলোকের বাসিন্দা। ঘর আলো করা মেয়েটি এসেছিল চন্দ্রলোক থেকে।

অতি বৃদ্ধ বয়সে লেখা ঠাকুরবাড়ির গগন ঠাকুর-এর মধ্যে দু-চারটে ঘটনা হয়ত ঠিকমতো সাজান হয়নি। তবু তথ্যপূর্ণ এবং রসগ্রাহী। পড়তে পড়তে মনে হয় যেন লেখা জিনিষ নয়। মুখের সামনে বসে কেউ গল্প বলে যাচ্ছে, কানের ভিতর দিয়ে গল্প প্রবেশ করছে মরমে। খবরও আছে অনেকরকম। যেমন ধরা যাক হিতকারী সভার কথা। আত্মীয় পোষণ ছিল সে যুগের ধনীদের দস্তুর। তাই রবীন্দ্রনাথ গগনেন্দ্র ও অন্যান্যদের সঙ্গে পরামর্শ করে স্থির করেন যে, সব বাড়ি থেকে কিছু কিছু উঁদা তুলে একটা সাহায্য ফাণ্ড খোলা হবে। হলও তাই। দুঃস্থ ঠাকুররা সাহায্য পেতেন। তহবিলে টাকা তোলার জন্যে বছরে একবার করে হত দানমেলা। বাড়ির মেয়েরা হাতে তৈরি জিনিষ দিত এবং তা বিক্রী করে টাকা জমানো হত। পরে অবশ্য হিতকারী সভা থেকে গগনেন্দ্র সরে দাঁড়ালেন। এই খবরটা আমাদের জানিয়েছেন পূর্ণিমা। গগন ঠাকুরকে এই বইয়ে বড় আপন করে পাওয়া যায়।

সুজাতার হাতের কাজও বড় সুন্দর। দিদিদের মতো তিনিও শিল্পী। নানারকম জিনিষ তৈরি করতে পারেন তবে তার পানমশলার বাড়ি বোধহয় অনেকেই দেখেছেন। এই মশলার বাড়িও পাঠানো হত বিয়ের তত্ত্বে। সুজাতা মশলার বাড়ি করতেন শিল্পী মনের স্বপ্ন মিশিয়ে! যেমন তার নিজের বাড়ি ছিল পার্ক সার্কাসের কাছে। গগনেন্দ্রনাথ নিজের কয়েকখানি সুন্দর ছবি দিয়ে সে বাড়ি সাজিয়ে দিয়েছিলেন-রায়টের সময় সে বাড়ি লুঠ হয়ে যায়। সুজাতার বিয়ে হয়েছিল বিদ্যাসাগরের পুত্রের দৌহিত্র সরোজ মুখোপাধ্যায়ের সঙ্গে। নতুন বাড়ি আবার সাজিয়ে গুছিয়ে নিতে হয়েছিল সুজাতাকে। পানমশলা। দিয়ে বাড়ি করা ছাড়াও তিনি তৈরি করেছেন সেতার-তবলা-হারমোনিয়াম। শর্মিলার বিয়েতে তো তৈরি করে দিয়েছিলেন একটা আস্ত ক্রিকেট টীম! এ ছাড়া সুজাতার ঝোঁক ফেলে দেওয়া, কুড়িয়ে-পাওয়া জিনিষ দিয়ে সুদৃশ্য পুতুল বা টুকিটাকি জিনিষ তৈরি করা। নতুন জিনিষ দিয়ে তো সবাই পারে। কিন্তু ফেলনা জিনিষ দিয়ে? সুজাতা দেখেছিলেন তার ছোটকাকা অবনঠাকুর নানারকম ফেলে দেওয়া জিনিষকেই কাজে লাগাচ্ছেন। তুচ্ছ কাঠের টুকরাকে কুটুমকাঁটামে রূপান্তরিত করাই শুধু নয়, তিনি লেখার পাণ্ডুলিপিতেও খবরের কাগজ, পাজী, শাড়ির লেবেল, বোতলের লেবেল, অভিনেতা-অভিনেত্রীদের ছবি, বিজ্ঞাপন, কাটুন কেটেকুটে লাগসই করে জুড়ে জুড়ে ছবি বানাতেন। খুদুর রামায়ণের পাণ্ডুলিপিটি এভাবেই তৈরি হয়েছিল। তিনি জানতেন তুচ্ছ কভু তুচ্ছ নয় শিল্পীর কাছে। সুজাতাও তৈরি করেছেন আইসক্রীম কাঠির বাড়ি, শিশিবোতলের পিনকুশান-মুনদান-পুতুল! আজকাল অব্যবহার্য জিনিষে তৈরি ঘর সাজাবার পুতুল সাজিয়ে অনেকেই বাহবা পাচ্ছেন। ফেনা জিনিষ তুলে এনে অসুন্দরকে সুন্দর করার জাদু জানতেন ঠাকুরবাড়ির মেয়েরা। খুব সম্ভব জাপানী শিল্পীদের আনাগোনার ফলে তারা চিনতে শিখেছিলেন প্রতিদিনের শত তুচ্ছের আড়ালে আড়ালে হারিয়ে যাওয়া সুন্দরকে।

দিদির মতো সুজাতা লেখেন না বড় একটা কিন্তু বাবার কথা যে অফুরান। তাই পূর্ণিমার পরে গগনেন্দ্র শতবার্ষিকী কমিটির উদ্যোক্তারা সুজাতাকে দিয়েও লিখিয়েছেন। সেই ছোট্ট লেখাটিতে আছে আপন করা ঘরোয়া কথা ও সুর। একটুখানি দেখা যাক :

দার্জিলিং-এ দেখেছি বাবা কাঞ্চনজঙ্ঘার দিকে মুগ্ধ দৃষ্টিতে তাকিয়ে থাকতেন। শিল্পীর চোখে তিনি যা দেখেছিলেন আমাদেরও তাই দেখতে শেখালেন। মহাদেব শুয়ে আছেন—নাক মুখ চোখের রেখা তখন স্পষ্ট দেখতে পেলাম। তিনি আমাদের চোখ ফুটিয়ে দিলেন, তাই, নাহলে আগে শুধু বরফের পাহাড় বলেই দেখেছিলাম।

এভাবে দেখতে শেখানই ছিল অবন-গগনের নিজস্ব আর্ট। সুজাতার শিল্পীজীবনে এসেছে পরিতৃপ্তির আনন্দ। ছোটখাট অনেক কিছু করেছেন। তিনি। কয়েকবার পুরস্কার পেয়েছেন হাতের কাজ—সেলাই আর আলপনার জন্যে। শুধু দুঃখ এসব কিছুই থাকে না। শুধু পঞ্চাশ বছরের পুরনো, নিজের হাতে করা বনসাই বটগাছটাই যা চারপাশে ঝুরি নামিয়ে বেঁচে আছে। আর কিই বা আছে? যে সব মেয়েদের কনে সাজালেন তারাও তো আজ গিন্নী। এখন আর পারেন না, হাত কেঁপে যায়। তবু এখনও অনেকে ধরে সাজিয়ে দেবার জন্যে। ঐ যে আদরের নাতনী শিঞ্জিতা, ঐ কি ছাড়ল? যতই মডার্ণ আর আলট্রা মডার্ণ হোক না কেন, বিয়ের দিন সেও চেয়েছিল শিল্পীকন্যার শিল্পমণ্ডিত হাত দুখানির চির নবীন স্পর্শ!

কনে সাজানোর কথায় মনে পড়ছে আরেকজনের কথা। তিনিও খুব ভাল কনে সাজাতেন, তার নাম মাধবিকা। সমরেন্দ্রনাথের মেয়ে। মাধবিকার পাঁচ বোন। যমজ বোন মালবিকা ছাড়াও ছিলেন সুপ্রিয়া, কমলা ও অণিমা। মাধবিকার বিয়ে হয়েছিল কবিকন্যা রেনুকার ছোট দেবর শচীন্দ্রনাথ ভট্টাচার্যের সঙ্গে। ঠাকুরবাড়িতে মেয়ে সাজানোর ব্যাপারে নাম ছিল মাধবিকার। সেখানে মেয়ে সাজানোর একটি বিশেষ ধরন ছিল। নিশ্চিত করে বলতে না পারলেও মনে হয় তখনকার সন্ত্রস্ত পরিবারগুলির মধ্যে এক এক ধরনের মেয়ে সাজানোর বৈশিষ্ট্য ছিল। যাইহোক, ঠাকুরবাড়িতে এখনকার মতো লবঙ্গের টিপ দিয়ে চন্দনের নকশা কেটে মেয়ে সাজানো হত না। তার বদলে অনেকখানি চন্দন লেপে দেওয়া হত পুরো কপালে। ভুরু থেকে সিথি পর্যন্ত চন্দন লেপা হলে খুব সরু যশুরে চিরুনি দিয়ে চন্দনটা আঁচিড়ে দেওয়া হত। ভুরু থেকে চুল পর্যন্ত সারা কপালে চন্দনের খড়কে ডুয়ে কাঁটার পর চন্দন শুকোলে তার ওপর সিঁদুর-কুমকুমের টিপ ও নকশা কাঁটা হত।

ইন্দিরা যখন স্ত্রী-আচারের একখানি সংকলন প্রকাশের কথা ভাবছিলেন, তখন তার এ ব্যাপারে মাধবিকাকেই যোগ্যতমা বলে মনে হয়েছিল। একান্নবর্তী পরিবারে বহু বিয়ে তিনি দেখেছেন এবং এ বিষয়ে স্বাভাবিক ঔৎসুক্য থাকায় সবই মাধবিকার মনে ছিল। তার দেওয়া বিবরণ থেকেই আমরা ঠাকুরবাড়ির বিয়ের স্ত্রী-আচার সম্বন্ধে সব কিছু জানতে পারি। মহর্ষি পরিবার ব্রাহ্ম হয়ে যাবার পরেও মহর্ষি বিয়ের অনুষ্ঠান থেকে স্ত্রী-আচার বাদ দেননি। পাঁচ নম্বরে তো সাবেকী নিয়মই ছিল। মাধবিক। সব জানতেন। সবই মনে রেখেছিলেন। কত নিয়ম! নিয়ম তো নয় সে হল রীতি বা রীত। গায়ে হলুদ থেকে শুরু, বিয়ের পর নদিনে শেষ। মাধবিকা লিখেছেন ঠাকুরবাড়ির কথা, তার সঙ্গে পশ্চিমবঙ্গের স্ত্রী-আচারের তফাৎ নেই বললেই চলে। দু-একটার একটু নতুনত্ব আছে। যেমন :

বরণের পরে মা ছেলের কাছ থেকে কনকাঞ্জলি নেবে। ছোট একটি থালাতে অল্প একটু আতপ চাল, একটি টাকা দিয়ে ছেলের হাতে দিতে হয়, দিয়ে মা সামনে আঁচল পেতে দাঁড়ায় ও ছেলেকে তিনবার জিজ্ঞাসা করে, বাবা কোথায় যাচ্ছে? ছেলে বলে, মা তোমার বৌ আনতে যাচ্ছি।…তিনবার সেই কথাটি বলে মায়ের আঁচলে ঐ চাল ঢেলে দিয়ে নারায়ণ প্রণাম ও মাকে প্রণাম করে যাত্রা করে। সম্প্ৰদান হয়ে গেছে এই খবর মায়ের কানে দিতে হয়; দিলে সারাদিনের উপোসের পর ঐ কনকাঞ্জলির চাল মা একটু ফুটিয়ে মুখে দেন ও দুধ মিষ্টি খান।

মাধবিকা এভাবে খুঁটিনাটির দিকে নজর দিয়ে যত্ন করে লিখেছেন। তবে বইয়ে তার নাম লেখা হয়েছে শুধু মাধবী।

মাধবিকার ছোট বোনেরা কোথাও কোন উল্লেখযোগ্য ভূমিকা গ্রহণ করেননি বা করতে চাননি। তাঁর যমজ বোন মালবিকা ছোটবেলায় মুখে মুখে ছড়া বানিয়ে সবাইকে হাসাতে পারতেন। একবার এক আত্মীয়াকে নিয়ে ছড়া বানাতে গিয়ে খুব ধমক খেয়েছিলেন। দিদিমা সৌদামিনী ধমক দিলেও ছড়া শুনে না হেসে পারেননি। পরবর্তীকালে কিন্তু এই আমুদে মহিলাটির ছড়া লেখায় উৎসাহ ছিল কিনা জানা যায়নি। তবে কমলা কিছু কিছু কবিতা লিখতেন। তিনি দু-একটি নারী সমিতির সঙ্গেও যুক্ত ছিলেন। তাঁর লেখা কয়েকটা অপ্রকাশিত কবিতা এখনো আছে। মেয়ের মৃত্যুর পরে লেখা একটা কবিতায় দেখা যাচ্ছে তিনি বেছে নিয়েছেন গদ্য ছন্দের আঙ্গিক :

আমার হৃৎপিণ্ড ছিঁড়ে কেড়ে
নিয়েছে কে তাকে, সব শূন্য করে দিয়ে
তারপরে তার বন্ধু দুটি এসে
বসলো আমার কাছে, একবার
আমার দিকে চেয়ে মাথা বইল
নীচু করে, চোখের জল নিলে
সাম্‌লে আমার কাছে, মাসীমা
বলে ডাকলে আমায় তারা;
এ জন্মের মতো সে গেল চলে, রেখে
গেল বুঝি, এদের আমার কাছে
ভোলাতে আমায়।

বৈঠকখানা বাড়ির বৌয়েদের কথাও এই ফাঁকে সেরে নেওয়া যাক। আমাদের কালসীমার মধ্যে ঐ বাড়িতে বৌ হয়ে এসেছেন কনকেন্দ্রের স্ত্রী সুরমা, নবেন্দ্রের স্ত্রী অপর্ণা ও অলোকেন্দ্রের স্ত্রী পারুল। গগনঠাকুরের বড় ছেলে গেহেন্দ্র ও তার স্ত্রী মৃণালিনীর মৃত্যু হয়েছিল অল্প বয়সে। মেজো ছেলে কনকেন্দ্র। সুরমা ছিলেন ভাল অভিনেত্রী। ঘরোয়া আমোদ আদে মেতে উঠতেন। তাঁর গায়ের রঙ ছিল খুব ফরসা আর গাল দুটি পাকা। ডালিমফলের মতো লাল। হাসলে আরো টুকটুকে হয়ে উঠত। বিচিত্রায় হত নানারকম অনুষ্ঠান। একবার হল শকুন্তলা ট্যাবলো। সুরমা সেজেছিলেন দুষ্যন্ত আর সুধীন্দ্রনাথের মেয়ে এণা শকুন্তলা। সুন্দর হয়েছিল সে অভিনয়! আরেকবার হয়েছিল মৃণালিনী নাটক। সুরমা সেজেছিলেন পশুপতি আর মনোরমার ভূমিকায় পূর্ণিমা। মেয়ে মহলের ব্যাপার বলে অভিনয়ের শেষটা বদলে দেওয়া হয়। পশুপতির মৃত্যুর পর মনোরমা বিধবা হবে—সে দৃশ্যের বদলে দেখান হল পশুপতি মনোরমার হাত ধরে কাশী চলে যাচ্ছে।

সুরসিক গগনেন্দ্রনাথ মাঝে মাঝে মজার কাজ করতেন। একবার একজন প্রৌঢ়া মহিলাকে ঠকাবার জন্যে তিনি সুরমাকে রাজা যতীন্দ্রমোহনের বাড়ির দারোয়ান সাজিয়ে দিলেন। সুরমা এসে লাঠি ঠুকে দাঁড়ালেন। মাথায় পাগড়ি, মস্ত গোঁফ-কে বলবে ভোজপুরী দারোয়ান নয়। সেই ভদ্রমহিলাও চলো যাই বলে যতীন্দ্রমোহনের বাড়িতে ফিরে যাবার জন্যে উঠে দাঁড়াতেই সবাই হেসে উঠলেন। এ ভাবেই রসের হাট জমে উঠত।

সুরমার ছয় মেয়ে—অনুভা, গৌরী, বকুল, করবী, শুক্লা ও সীমা। তারা প্রত্যেকেই গুণী শিল্পী। গান-বাজনা-সেলাই-বাটিকের কাজ প্রভৃতি নিয়ে বেশ নাম করেছেন। এঁদের মধ্যে অনুভা ঠাকুরের নাম আর একটি কারণেও উল্লেখযোগ্য। তিনি গ্রামোফোন রেকর্ডের প্রথম যুগে দুখানি রবীন্দ্রসঙ্গীত রেকর্ড করেছিলেন। গান দুটি হল দেখো দেখো শুকতারা আঁখি মেলি চায় ও নাই বা এলে যদি সময় নাই। আজ রেকর্ডটি দুষ্প্রাপ্য। কবির সত্তর বৎসর পূর্তি উপলক্ষে যে অনুষ্ঠান হয় তাতেও তিনি গান গেয়েছিলেন। ছোটবেলায় একবার সেজেছিলেন বিসর্জনের হাসি, একটু বড় হয়ে ভৈরবের বলি নাটকে ইলার সখী। কিন্তু বিয়ের পর রুড়কিতে চলে যাওয়ায় অনুভ। আর

অভিনয় ও সঙ্গীতচর্চার সুযোগ বেশি পাননি। এ সময় তিনি সমাজ সেবার। কাজে যোগ দিয়ে একটা চাইল্ড সেন্টার গড়ে তোলেন। বম্বেতেও তিনি বাটিক শেখর স্কুল, নিউ ওয়ার্ক সেন্টার প্রভৃতি নিয়ে কাজের মধ্যে ডুবে থাকতেই ভালবাসতেন। সীমাও গানের ক্ষেত্রে তার যোগ্যতার পরিচয় দিয়েছেন। গৌরী ভাল সেলাই জানেন। শান্তিনিকেতনে যোগ দিয়েছেন সমবেত গানে। কখনো ভৈরবের বলি কখনো বা শাপমোচনে। এই সুরমারই এক পৌত্রী চিত্রাভিনেত্রী শর্মিলা। সত্যজিৎ রায়ের অপুর সংসার-এ তাঁর প্রথম চিত্রাবতরণ থেকে ক্রিকেট খেলোয়াড় পতৌদির নবাব মনসুর আলি খানের বেগম আয়েস। সুলতানা হয়ে ওঠার গল্প আজ সকলেই জানে। সুরমার অপর পৌত্রী ঐন্দ্রিলাও শৈশবে কাবুলীওয়ালা চিত্রের মিনির ভূমিকায় অসাধারণ অভিনয় করেছিলেন।

অপর্ণা দ্বিপেন্দ্রনাথের দৌহিত্রী। তারা তিন বোন সুরমা, অপর্ণা আর পুর্ণিমা। তাদের মা নলিনীর বিয়ে হয়েছিল সেই বিখ্যাত চৌধুরী পরিবারে, যেখানে বধূ হয়ে প্রবেশ করেছিলেন প্রতিভা ও ইন্দিরা। কাজেই ঠাকুরবাড়ির মেয়েদের যা যা গুণ থাকে তার সবই ছিল বোনেদের মধ্যে। অপর্ণা ও পুর্ণিমার বিয়ে হয়েছিল ঠাকুরবাড়িরই দুই ছেলের সঙ্গে। অপর্ণার স্বামী গগনেন্দ্রর ছেলে নবেন্দ্র আর পূর্ণিমার বিয়ে হয়েছিল সত্যেন্দ্রনাথের পৌত্র সুধীরেন্দ্রর সঙ্গে। অপর্ণার গান ও বেহালা বাজানোর কথা ইন্দিরা বারবার বলেছেন। শোনা গেছে দুটি রবীন্দ্র সঙ্গীত দাঁড়িয়ে আছ তুমি আমার ও যদি প্রেম দিলে না প্রাণে তার কণ্ঠে যত ভাল শোনাত অমনটি আর কেউ গাইতে পারতেন না। এক একটা গান বা অভিনয় সম্বন্ধে শোনা যায় এক একজনের কৃতিত্বের কথা। এভাবে যদি কেউ রবীন্দ্রসঙ্গীত বা রবীন্দ্ৰনাটকের একটা ধারাবাহিক ইতিহাস লেখেন তাহলে দেখা যাবে সঙ্গীত ও নাটকের প্রয়োগরীতির দিক থেকে কবি তাঁদের বাড়ির ছেলেদের চেয়েও মেয়েদের সাহায্য পেয়েছেন অনেক বেশি। ভৈরবের বলি ও আরো দু-একটা নাটকে অভিনয়ও করেছেন অপর্ণা। ভৈরবের বলিতে তিনি সেজেছিলেন ইলা।

পারুল ঠাকুরও এ বাড়ির দৌহিত্রী। সৌদামিনীর বড় মেয়ে ইরাবতী, তার মেয়ে পারুল। দুই বাড়ির দুই সৌদামিনীর মধ্যে ভারি ভাব ছিল। দুজনেরই এক নাম, তাই সই পাতিয়েছিলেন দুজনে। ইরাবতীর তিন দিনের মেয়েকে দেখে তার সঙ্গে নাতি অলোকেন্দ্রের বিয়ে ঠিক করেছিলেন সৌদামিনী। তাঁর কথার নড়চড় হয়নি। অবনীন্দ্রনাথের জ্যেষ্ঠ পুত্রবধু হয়েই এলেন পারুল। তখন অবশ্য সৌদামিনী পরলোকে। পাঁচ নম্বরে তখনও সাবেকী রীতি বজায় আছে। বৌদের সকালে যেতে হয় তরকারি বানানোর আসরে। তিন শাশুড়ীর একজন এসে বসতেন চৌকীতে। সামনে দু পাশে সার দিয়ে আসন পেতে বসে পড়তেন বৌ-ঝিরা। দাসীরা তরকারির খোসাটোসা ছাড়িয়ে এনে দিলে তারা গিন্নীর নির্দেশে কুটতেন ঝালের তরকারি, ঝোলের ব্যঞ্জন, কালিয়ার আলু, ঘণ্টর আলু কিংবা ডালনার তরকারি। পারুলের কাজ শেখার শুরুও এমনিভাবে। নাচগান-অভিনয়ে তার বড় সংকোচ। তবু রবীন্দ্রনাথ জোর করে তাকে একবার নামিয়েছিলেন বর্ষামঙ্গলে। হে ক্ষণিকের অতিথি গানের সঙ্গে তার নীরব আবির্ভাব হবে শরৎলক্ষ্মী রূপে। কথা বলতে হবে না, গান গাইতে হবে না শুনে রাজী হলেন পারুল। তা বলে যে গান শেখেননি তা নয়। বিয়ের আগে সুরেন্দ্রনাথ বন্দ্যোপাধ্যায়ের কাছে গান ও সেতার শিখতেন, বিয়ের পরে শ্যাম সুন্দর মিশ্রের কাছে। ছবি আঁকা শেখাতেন নন্দলাল বসু, তবু এসবে বড় সংকোচ। শেষ পর্যন্ত অবশ্য মেঘের মতো একটাল চুল এলিয়ে সাজলেন শরৎলক্ষ্মী। গানের সঙ্গে তাঁর নীরব আবির্ভাব আবার পিছনে হেঁটে প্রস্থান এই ছিল তার ভূমিকা। এখনকার মতো সেকালে তোল অডিয়েন্সের দিকে পিছন ফিরে প্রস্থানের রেওয়াজ ছিল না। তাই পিছনে পায়ে পায়ে সরে গিয়ে প্রস্থান করা হত! মাঝে মাঝে পারুল গিয়ে বসতেন রবীন্দ্রনাথের বিচিত্রার আসরে। শুনেছিলেন প্রথম শেষের কবিতা পাঠ। সেখানে তিনি দেখেছিলেন কবি যখন হাসির গল্প পড়তেন তখন তিনি নিজে হাসতেন না, অন্যের প্রতিক্রিয়া ক্ষ্য করতেন। পারুল তার নাতনী তাই ভয়টা কম; হেসে গড়িয়ে পড়তেন। কবি জিজ্ঞেস করতেন, তোরা হাসছিস কেন? অন্যরা চুপ করে যেতেন। পারুল হেসে বলতেন, তুমি হাসির কথা বলছে, হাসবো না? গল্পটা আমরা তার মুখেই শুনেছি।

পুরনো দিনগুলো কেটে গেছে স্বপ্নের মতো। সুখের স্মৃতির মতো ঠাকুরবাড়ির মেয়েরা এই পর্বে যেন নিজেদের অনেকখানি গুটিয়ে নিয়েছেন। শুক্তি যেমন সযত্নে মুক্তোটিকে লুকিয়ে রাখে এঁরাও তেমনি সযত্নে নিজেদের মনের মধ্যে লুকিয়ে রেখেছেন সে যুগের সেই দুর্লভ স্মৃতি আমাদের কাছে এসব গল্প, কিন্তু সুরূপা, সুজাতা, সুরমা, পারুলের কাছে তো গল্প নয়। বৈঠকখানা বাড়ি আর নেই, মিশে গেছে মাটির সঙ্গে ধূলো হয়ে তবু মনে তার নিত্য যাওয়াআসা। স্মৃতির সরণি বেয়ে চলে যেতে ইচ্ছে করে সেই রূপকথার ঘুমন্ত রাজবাড়িটিতে। এখনো তাদের বুকে মৌন বেদনা গুমরে গুমরে ওঠে কেন ভাঙা হল বাড়িটা? মহর্ষিভবনের মত নব কলেবর নিয়ে দাঁড়িয়ে থাকলেও যে মাঝে মাঝে দেখে আসা যেত নিজেদের হারানো শৈশবকে।

আবার ফিরে আসি মহর্ষিভবনে। এখন অবশ্য ঠাকুরবাড়ির মেয়েরা অনেক জায়গায় ছড়িয়ে পড়েছেন। বাড়িতে রয়েছেন অনেকগুলি নাতনী আর নাতবৌ। কবির নতুন নাটকে তারা পার্ট নেবেন, ভরে দেবেন নতুনগানের ডালি। এখন আর কোন একক ভূমিকা যেন স্পষ্ট নয়। এখন সারা বাংলার মেয়েরা এগিয়ে এসেছেন নব জাগৃতির পথ বেয়ে। সেই প্রথম পায়ে চলা একহারা সরু পথটা কোথায়? সেই বুঝি পথ হারিয়েছে। রবীন্দ্রনাথও ধরলেন বেলা শেষের গান। এই শেষ বেলাকার রাগিনীর ধুয়ো ধরতে এগিয়ে এলেন আরো কয়েকজন।

সুধীন্দ্রনাথের তিনটি মেয়ে—রমা, এণা, চিত্রা। তিনজনেরই নানারকম সুকুমার কলায় দক্ষতা ছিল। যদিও কেউই সাময়িকতার ঊর্ধ্বে উঠতে পারেননি। রমার গানের গলা ছিল অসাধারণ। তার কণ্ঠে রবীন্দ্রসঙ্গীত শুনতে ভালবাসতেন কবি স্বয়ং। সৌম্যেন্দ্রনাথ ঠাকুরের নিজের কথায় তার দিদির গলায় এই যে কালো মাটির বাসা, না গো এই যে ধূলা আমার না এ, সাঁঝের রঙে রাঙিয়ে গেল হৃদয় গগন, সন্ধ্যা হল মা বুকে ধবো এই গানগুলো যারা কখনো শোনবার সৌভাগ্য লাভ করেছে তারা কখনো ভুলবে না। কবি বলতেন, তাঁর গান রমার গলায় যেমন রূপ নেয় এমনটি খুব কম লোকের গলাতেই নেয়। আমাদের দুর্ভাগ্য তাঁর গানের কোন রেকর্ড হয়নি। যারা শুনেছেন তারা বলেন সে গানে মিশে থাকত মাধুর্য আর গভীরতা।

লেখা এবং লেখানো, গান গাওয়া এবং শেখানো সবেতেই রমার উৎসাহ ছিল। অভিনয়ও করেছেন বারকতক। মায়ার খেলায় একবার কুমার আরেকবার শান্তা সেজেছিলেন রমা। দুবারই সুন্দর হয়েছিল তার অভিনয়। প্রফুল্লময়ীর আমাদের কথা হয়ত কোনদিনই শোনা যেত না, যদি না রমা থাকতেন। আগ্রহ আর উৎসাহ নিয়ে তিনি বসতেন দিনের পর দিন বলো নদিদি বলো তোমার কথা বলে। ধীরে ধীরে খুলত স্মৃতির দুয়ার—অনেক চোখের জল মাড়িয়ে প্রফুল্লময়ী এই নাতনীর আবদারেই ফিরে যেতেন নিজের কৈশোরে। এ কি কম কৃতিত্ব! নিজেও লিখতেন রমা। শান্তিনিকেতনে বেরোত মেয়েদের কাগজ শ্রেয়সী। তাতে তিনি দু-একটা ইংরেজী গল্প স্বচ্ছন্দ অথচ সাধু ভাষায় অনুবাদ করেছেন। স্নেহলতা দেবীর একটা গল্প সাপুড়ের গল্প নামে অনুবাদ করেন রমা। ইন্দিরার ভারি ইচ্ছে ছিল রবীন্দ্রনাথের নারী সংক্রান্ত রচনাগুলি একত্র করবার। বলেছেন একে তাকে, কেউ যদি সমগ্র রবীন্দ্র সাহিত্য অনুসন্ধান করে মেয়েদের সম্বন্ধে কোথায় কি তিনি লিখেছেন তা একত্র করে প্রকাশ করতে পারেন তবে মস্ত একটা কাজ হয়। সেই ভার নিয়েছিলেন রমা। রবীন্দ্র সাহিত্যে নারীর স্থাকোথায় তাই দেখার জন্যে। শ্রেয়সীর কয়েকটা সংখ্যায় রবীন্দ্র সাহিত্যে নারী নাম দিয়ে অনেক রচনা সংকলনও করেন। তবে সময়ের অভাবে ধারাবাহিকতা রক্ষা করতে পারেননি।

শেষ জীবনে তার মন ঝুকেছিল তথাগতের আদর্শের প্রতি। কিছু মানসিক অশান্তি তাকে আরো ঠেলে দিয়েছিল মহাবোধি সোসাইটির দিকে। পারিবারিক ট্র্যাডিশন অনুযায়ী তিনি একটি স্কুলও প্রতিষ্ঠা করেছিলেন বাগবাজারে। নাম সাবিত্রী শিক্ষালয়। ঘুরে ঘুরে চাঁদা তুলে অনেক পরিশ্রম করে তিনি এই স্কুলটি প্রতিষ্ঠা করেন। এ সময় তাঁর সঙ্গে সহযোগিতা করেন লেখিকা প্রভাবতী দেবী সরস্বতী, পরে সেখান থেকেও নীরবে সরে এসেছিলেন রমা। নিজেকে সঁপে দিয়েছিলেন মহাবোধি সোসাইটির সৌম্য-শান্ত বুদ্ধদেবের চরণতলে। সেখানে তিনি একটি রচনা সংকলন প্রকাশ করেন লর্ড বুদ্ধ এ্যাণ্ড হিজ মেসেজ নামে। তাতে তার নিজের লেখা না থাকলেও তিনি সংগ্রহ করেছেন রবীন্দ্রনাথ, ইন্দিরা, অসিত হালদার, সুরেন্দ্রনাথ ঠাকুর ও রামানন্দ চট্টোপাধ্যায়ের রচনা। রমার শেষ জীবনের কথা বলেছিলেন তার মেজো বোন এণা। দিদির লেখা-আঁকা সযত্নে তিনি রেখে দিয়েছিলেন। জিনিষ হারায় না, মানুষ হারায়। তাই ভাইবোনদের মধ্যে এখন তাদের এক বোন ছাড়া কেউ নেই। দিদির মতো গাইতে না পারলেও এণা শিখেছিলেন বাঁশী আর সেতার বাজাতে। বিচিত্রায় যে ট্যাবলো অভিনীত হত তাতে এণাও যোগ দিতেন। একবার সেজেছিলেন শকুন্তলা। এণা বিয়ে করেছিলেন রাজেচন্দ্র রায়কে। বিয়ের ব্যাপারে ঠাকুরবাড়ির ট্র্যাডিশন ভেঙেছিলেন তিনিই। তাই পরিণয়ে প্রগতির লেখিকা শৈলসুতা দেবী তার গ্রন্থে এই বিয়ের কথা বর্ণনা করেছেন। আধুনিক সমাজকে ব্যঙ্গ করে প্রগতিশীলদের নিয়ে লেখা অনেকের কথাই পরিণয়ে প্রগতিতে আছে! লেখিকা এণা ও রাজেন্দ্রের প্রসঙ্গে বইয়ের ২১৩ পৃষ্ঠায় লিখেছেন :

এণা দেবী জোড়াসাঁকো ঠাকুর-বংশের কন্যা। মিঃ আর. সি. রায়ের পূর্বপুরুষরা হিন্দু ছিলেন, জাতিতে তারা বৈদ্য। মিঃ রায়ের পিতা গোপাল রায় খ্রস্টধর্মে আস্থাবান …এ বিদুষী ও গুণবতী। তাহার সহিত পরিচয় লাভে আর. সি. রায় মুগ্ধ হইলেন; এণও তাঁহার প্রতি অনুরাগিনী হইয়া পড়িলেন। দুজনে বিবাহ সম্বন্ধে পরামর্শ হইল—এই স্থির হইল যে ধর্মগত বিভেদের জন্য তাহারা পরস্পরকে বিচ্ছিন্ন করিয়া রাখিবেন না। বিবাহে আবদ্ধ হইয়াও নিজ নিজ ধর্ম বিশ্বাস বজায় রাখিবেন।

বিয়ের পর এ চলে গিয়েছিলেন ঢাকায়, একেবারে ভিন্ন পরিবেশে। সেখানেও যে অনুকূল পরিবেশ ছিল না তা নয়, তবু এণ ইচ্ছে করেই হাই সোসাইটির কেন্দ্রমণি হয়ে ওঠার চেষ্টা করেননি। ঘরের মধ্যে ছোট্ট একটা সুখের সংসার গড়তেই তার ভাল লেগেছিল। তার মেয়ে কৃষ্ণা বর্তমানে ফ্রান্সে নানারকম সাংস্কৃতিক কাজে-কর্মে জড়িয়ে আছেন।

সুধীন্দ্রনাথের ছোট মেয়ে চিত্রা কিছুদিন ছিলেন শান্তিনিকেতনে। নাচ-গান অভিনয়ের ধারা মিশেছিল তার রক্তে তাই খুব সহজেই তিনি এ তিনটি জিনিষ আয়ত্ত করে ফেললেন। বিশেষ করে নাচে তাঁর প্রতিভার পরিচয় পাওয়া গেল। শান্তিনিকেতনে প্রতিমার পরিকল্পনা মতো নাচ শেখানো তখন সবে শুরু হয়েছে। নৃত্যশিক্ষক হিসেবে এসেছেন মণিপুরী শিক্ষক নবকুমার। অন্যান্য মেয়েদের সঙ্গে ঠাকুরবাড়ির যে তিনটি মেয়ে এ সময় নাচ শেখেন তারা হলেন চিত্রা, নন্দিতা ও নন্দিনী। অন্য মেয়েদের মধ্যে ছিলেন শ্রীমতী হাতিসিং, গৌরী ব, নিবেদিতা দেবী, অমিত চক্রবর্তী, মালতী সেন, উমা দেবী, অমল রায় চৌধুরী, যমুনা দেবী এবং আরো অনেকে। এঁদের মধ্যে শ্ৰীমতী ও অমিতা পরে ঠাকুরবাড়ির বৌ হয়েছিলেন। চিত্রা নাচের দলে ছিলেন ট্র্যাডিশন ভাঙার সময়। ঠাকুরবাড়ির উঠোনে প্রথম যে নৃত্যানুষ্ঠান হয় তাতে নেচেছিলেন চিত্রা ও নন্দিতা। তারপর নেচেছিলেন ঋতুরঙ্গে সবার রঙে রঙ মেশাতে হবে গানটির সঙ্গে। নিউ এম্পায়ারে সরলাদেবীর পরিচালনায় যে মায়ার খেলার অভিনয় হয় চিত্রা তাতে সেজেছিলেন মায়াকুমারী। আলোড়ন জাগিয়েছিলেন। ১৯২৭ সালের ১৮ অগাস্টের The Englishman জানিয়েছে,…an entirely novel Indian dance by Miss Chitra Tagore and another by Miss Reba Roy…were greatly appreciated by the larger audience.

Forward কাগজের প্রতিনিধিও অনুরূপ কথাই লিখেছেন, The Dances forined a salient feature of the play. It was a sheer delight to watch Sm. Reba Ray and Sm, Chitra in their movements. In the magic of Chitras feet was revealed the enchantment of first love.

সরলাদেবীর মায়ার খেলা হয়ে যাবার কয়েকদিন পরে ঠাকুরবাড়ির ছেলেমেয়েদের উদ্যোগে আরেকবার মায়ার খেলা হয়। এই অনুষ্ঠানে চিত্রা পরিবেশন করেছিলেন একটি স্বতন্ত্র জাপানী নৃত্য। Forward কাগজের প্রতিনিধি ১৯২৭-এর ১৩ সেপ্টেম্বর পুনরায় লিখেছেন :

Srimati Chitra, who excelled in her Japanese dayce, came in for the largest share of the claps. Her quick and jumpy steps, though an adaptation from the west, seemed to have a fascination all their own.

শুধু নৃত্য নয়, অভিনয়েও চিত্রা দক্ষতার পরিচয় দিয়েছিলেন। নটির পূজায় তিনি সেজেছিলেন বাসবী। তপতী নাটকে নিয়েছিলেন মঞ্জরীর ভূমিকা। এই নাটকের গানের দলেও গান গাইতেন