বড়দা ট্যুর অ্যান্ড ট্রাভেল পার্টি

বড়দা ট্যুর অ্যান্ড ট্রাভেল পার্টি

বড়দা আবার আমাদের বেড়াতে নিয়ে যাচ্ছে। বড়দার একটা ট্রাভেল এজেন্সি আছে। প্রথমবার পুরী নিয়ে গেছিল সে গল্প তোমরা অনেকেই জান। এবার ঠিক করেছি বড়োদের আর সঙ্গে নেব না। আগেরবারের ঘটনা এখনও ভুলিনি আমরা। এবার শুধু আমরা ভাই-বোনেরা আর কিট্টু যাব। কিট্টু আমাদের পোষা টিয়া পাখি। তবে ওকে খাঁচায় পোরার কথা আমরা ভাবতে পারি না। ইন্দুদি, আমি আর বিন্দুদি বেড়ালের মুখ থেকে ওকে বাঁচিয়ে ছিলাম। সেই থেকে আমাদের সঙ্গে ওর বন্ধুত্ব। মাঝে মাঝে ও ওর পরিবারের সঙ্গে দেখা করতে যায়, আবার আসে, আমাদের সঙ্গে কাটিয়ে যায়। তবে মেজদাকে দু’চক্ষে দেখতে পারে না। তাই মেজদা বলেছে কিট্টুকে কিছুতেই সঙ্গে নেবে না।

ইন্দুদি বলল, “বেশ তো, তুমি বাড়ি পাহারা দাও। আর মন দিয়ে গবেষণা কর।” আমাদের মেজদা মস্ত বৈজ্ঞানিক। চা একদম জুড়িয়ে জল করে খায়। তাও ল্যাবের জানলা গলিয়ে দিতে হবে। ভাতটাও ওইভাবেই খায়। সারাক্ষণ চিন্তা করছে নতুন কী জিনিস আবিস্কার করা যায়। ইতিমধ্যে অনেক কিছু আবিষ্কার করে ফেলেছে। নোবেল প্রাইজ একেবারে বাঁধা।

বিন্দুদি বলল, “তুমি গিয়েই বা কী করবে? সারাক্ষণ এটা করিস না ওটা করিস না বলে ঝামেলা করবে।”
মেজদা, “বেশ, আমাকে রেখেই তোরা আনন্দ কর। আমি তোদের কে?”

“আরে না না, রাগ কর কেন? আমরা তো মজা করছি। তুমি না গেলে আমাদের কে বকবে? তোমার বকা না খেলে আমাদের ভাত হজম হয় না। সারাক্ষণ দুঃখ দুঃখ মুখ করে ঘুরে বেড়াব। সেটা কি ভাল হবে, বল?”
“আমি কি শুধুই বকি?”

“হ্যাঁ, একদম সেলফিস জায়েন্টের মত।”

“কী!!!!!! আ —মি— সে—–ল—–ফি—স —-জা—-জা—-জা”
এই রে! মেজদা খুব রেগে গেছে। রেগে গেলে মেজদার কথা আটকে যায়।
“য়েন্ট। না না, তুমি মোটেই সেলফিশ জায়েন্ট নও। তুমি তো ভীষণ ভাল দাদা আমাদের। বিন্দুর কথা ছেড়ে দাও। ও কী বলতে কী বলে ফেলেছে। তোমার তুলনা মেলা ভার।”

মেজদা মুখ চোখ কুঁচকে আবার বসে পড়ে। তাতাইদা আর পাপাইদা মোবাইল ফোন নিয়ে কী সব গল্পগুজব করছে। বড়দা ওদের ফোন কেড়ে নিল।

বলল, “এখন প্রশ্ন হল আমরা যাব কোথায়?”
ছোড়দা বলল, “পুরী।”

মেজদা, “না, এত নোংরা শহরে আমি যাব না। তাছাড়া আগেরবার তোমরা পুরী গেছিলে। আমি তখন বিদেশে।”

“তাহলে দার্জিলিং।”

“ওই তোমাদের এক দোষ। পুরী আর দার্জিলিং ছাড়া কিছু বোঝ না। দার্জিলিং এখন ঘিঞ্জি হয়ে গেছে।”

“শিলং। প্রাচ্যের স্কটল্যান্ড।”
“রক্ষে কর বাবা, সারাক্ষণ শুধু বৃষ্টি। প্যাচপেচে কাদা।”
“তাহলে দিঘা-মন্দারমণি?”
“ইস! যত খুনে বদমাশদের আড্ডা।”
“ঘাটশিলা, রাঁচি, মধুপুর, গিরিডি?”

“দূর দূর! এসব জায়গায় আর কী আছে? এক কালে বাঙ্গালিরা খুব যেত। এখন আর কিছুই নেই।”
বড়দা একের পর এক জায়গার নাম করে যেতে লাগল, মেজদা সব বাতিল করে দিতে লাগল।
ইন্দুদি বলল, “সুন্দরবন।”

মেজদা, “এই গরমে সুন্দরবন গেলে কালো কুচ্ছিত বোন হয়ে যাবি।”
প্রায় ঘণ্টাখানেক এই চলল। মেজদার পছন্দমত জায়গা আমাদের দেশে নেই মনে হয়।
ছোড়দা বলল, “আচ্ছা তোমরা এবার থামো। আমি টস করছি। হেড পড়লে পাহাড় আর টেল পড়লে সমুদ্র।”
পকেট থেকে একটা কয়েন বার করে টস করল। আমরা হেড হেড বলে চেঁচিয়ে উঠলাম। হেড-ই পড়েছে। ইয়েয়েয়েয়ে! তার মানে আমরা পাহাড়ে যাচ্ছি।

মেজদা বলল, “এই হেড টেল আমি মানি না। কেন পাহাড় আর সমুদ্র ছাড়া কি আর যাবার জায়গা নেই? ফরেস্ট কী দোষ করল? ঐতিহাসিক জায়গা কী দোষ করল?”
মেজদা থাকতে আর আমাদের বেড়ানো হয়েছে। যা গোলমেলে লোক একখানা। এই জন্য মেজদাকে আমি ভয় পাই। বেশি নয় একটুখানি।
ছোড়দা বলল, “তুমি কোথায় যেতে চাইছ? রিও ডি জেনিরো? ক্রোয়েশিয়া? ম্যাডাগাস্কার? গ্রিনল্যান্ড? হাওয়াই দ্বীপপুঞ্জ? নাকি আন্টাকর্টিকা অভিযান? এই সব চ্যাঁ ভ্যাঁ নিয়ে অত দূরে যাওয়া যায়? তুমি আর আমি চুপি চুপি বিদেশে চলে যাব পরে।”

“চুপ কর সবাই। আমরা ডুয়ার্স বেড়াতে যাব। প্রথমে মাদারিহাট যাব, তিনদিন থাকব, তারপর লাটাগুড়িতে থাকব। সব ব্যবস্থা জলদি জলদি করে ফেলতে হবে। আর কোনও কথা নয়। গরমের ছুটি পড়লেই আমরা রওনা দেব। সবাই বাক্স প্যাঁটরা গুছিয়ে নাও।”

“সবই যখন ঠিক করে ফেলেছ তাহলে এত আলোচনার কী দরকার ছিল?” পাপাইদা জিজ্ঞাসা করল।
“বলিস কী! সবাই মিলে বেড়াতে যাব আর তার আগে একটু শলা পরামর্শ করব না? আর বকাসনি। এখন সবাই বেরো আমার ঘর থেকে,” বড়দা একরকম তাড়িয়েই দিল আমাদের।

সেজজেঠু ভয়ানক আপত্তি করল ডুয়ার্স যাবার কথা শুনে। “যেখানে ঠাকুর দেবতা নেই সে জায়গায় যেয়ে কী হবে? ধর্মকর্ম শুরু করে দাও এখন থেকেই। আমি বলি বরং তোমরা হরিদ্বার চলো।”
“গরমের মধ্যে হরিদ্বার যাব?” বড়দা প্রশ্ন করে।
“তুই দেখছি কোনও খবরই রাখিস না।”

“হরিদ্বার কি দক্ষিণ গোলার্ধে চলে গেল? এখন বুঝি ওখানে শীত কাল?”
“মস্করা করবে না। এখন সর্বত্র এসি বাস হয়ে গেছে, আমাদের বেড়াতে কোনও অসুবিধা হবে না। আমরা দেরাদুনে থাকব কিছুদিন, দেখবে কিছুমাত্র কষ্ট হচ্ছে না। আমি তোমাকে গাইড করব।”
সেজমা বলল, “আমিও যাব। কত মন্দির ওখানে। গঙ্গা মায়ের আরতি দেখব। রোজ ভোলাগিরি আশ্রমে খিচুড়ি খাব,” বলেই হাতজোড় করে কপালে ঠেকাল।

“আর খঞ্জনি নিয়ে সকাল-সন্ধে কীর্তন গাইব,” কথাটা বলেই বড়দা আর দাঁড়াল না। দাঁড়ালে অশেষ দুঃখ ছিল।
হরিদ্বার যাওয়ার প্রস্তাব আমাদের খারাপ লাগল না। গরমের ছুটি মন্দ কাটবে না। আমার ইন্দুদির বিন্দুদির স্কুল ছুটি। টুকাইদি আর মেজদির কলেজ ছুটি। আর ছোড়দার কাগজের অফিস অবশ্য ছুটি নয়, তবে ফাটাফাটি রকম একটা ভ্রমণ লিখতে চায়। তাই আমাদের সঙ্গে ঝুলে পড়েছে। মেজদা লন্ডন থেকে ফিরেছে ছুটি নিয়ে। সেখানে একটা কলেজে পড়াশোনা করে। বড়দারই একটু খারাপ লেগেছে। সেজজেঠু সব টিকিট কেটে দেবে বলেছে। আমাদের বাবা মায়েরা আমাদের টাকা দিয়ে দিয়েছে, ঘুরে বেড়াতে পয়সা লাগবে। সমস্যা হল কিট্টুকে নিয়ে। ও কে কী করে নেব? খাঁচা সমেত পাখি নিয়ে কেউ বেড়াতে যায়? লোকে তাকিয়ে থাকবে আর হাসবে, ভাববে এরা কোন গ্রহ থেকে এসেছে! সে ভারি অপমানের হবে। খাঁচাটাই বা কে বইবে? আমাদের সবার লাগেজ। মেজদার ভারি আনন্দ হল, কিট্টু যাবে না। কিট্টুকে দিনরাত কলা দেখাচ্ছে। কিট্টুর চোখ ছল ছল করছে। আমরা ভাইবোনেরা এই সমস্যার সমাধান করতে পারলাম না। আমার এক বন্ধু বলল, “কিট্টু-কে কাঁধে করে নিয়ে যাও।”

কথাটা বেশ বলেছে। কাঁধে করেই নেব ওকে। আমি ইন্দুদি, বিন্দুদি, মেজদি সবাই পালা করে ওকে কাঁধে নেব। আমাদের সবার বিশাল মালপত্র হয়েছে। ট্রেনে তুলে দিতে সবাই এসেছে। ইন্দুদির কাঁধে কিট্টুকে অনেকেই ঘুরে ঘুরে দেখছে। আমরা ট্রেনে উঠে বসলাম। গাড়ি ছেড়ে দিল। সেজমার কপালে হাত। ঠাকুর প্রণাম করছে। সেজজেঠুও তাই করছে।

মেজদা টিফিন ক্যারিয়ার খুলে খাওয়া দাওয়া শুরু করে দিয়েছে। বড়দা টিফিন ক্যারিয়ার কেড়ে নিল। দাঁত মুখ খিঁচিয়ে বলল, “আমাদের পুরো দলের খাবার আছে এতে। কাল বিকেল অবধি চালাতে হবে।”
মেজদা তখন হকারদের থেকে কিনতে শুরু করল। যা যা উঠছে সব কিনছে। বাদাম ভাজা দিয়ে স্টার্ট করেছে। যতক্ষণ ট্রেনে থাকব মেজদার মুখ চলতেই থাকবে। আপার বার্থে কিট্টু বসে বসে ঢুলছে। সেজমা জানলা দিয়ে বাইরে দেখছে। বাকিরা এত গল্প করছে যে কামরার কিছু লোক খুব বিরক্ত হয়ে তাকিয়ে দেখছে আমাদের। দেখল তো বয়ে গেল। কলিযুগ হলে ভস্ম হয়ে যেতাম। আমরা এখন গানের লড়াই খেলব। দু’জন ষণ্ডা মার্কা লোক খুব বিরক্ত হয়ে দেখছে মাঝে মাঝে। দু’জনকেই আমার খুব সন্দেহজনক মনে হচ্ছে। দু’জনেরই বয়স চল্লিশ থেকে পঞ্চাশের মধ্যে। দিব্যি সেজেগুজে বয়স কমানোর চেষ্টা করছেন। একজন বেশ ভালোই লম্বা। মাথার চুলে বাদামি রঙ। সরু গোঁফ, থুতনির কাছে অল্প দাড়ি। চোখে দামি ফ্রেমের চশমা। ফর্সা গায়ের রঙ। টিকলো নাক যাদের তাদের নাক উঁচুই হয় (এই মেজদা যেমন)। ইংরাজি খবরের কাগজ পড়ছেন, ভাবখানা এমন যেন কত পণ্ডিত! আমাদের হইচইয়ে পড়ার যেন কতই ব্যাঘাত ঘটছে। জামাকাপড়েও কেতাদুরস্ত। গলার আওয়াজ সরু। পাশের জন গুঁফো মোটা টাকমাথা কালো মাঝারি হাইটের। বেশি ফ্যাশান করে না। মনে হল ফর্সা লোকটি বস আর এ হল শাগরেদ। ব্যাঙ্ক ডাকাত বা বড়ো ধরনের কোনও অপরাধী না হয়ে যায় না। যেভাবে দেখছে আমাদের! মনে হয় মেজদাকেই টার্গেট করেছে। ফিসফিস করে দু’জনে কী সব বলাবলি করছে। সবচেয়ে আশ্চর্যের ব্যাপার, একবার হাঁচতে গিয়ে টাকমাথার মোটা গোঁফ-এর একদিক খুলে গেল। বাদামি চুল তাড়াতাড়ি ঠিক করে দিল। এরা কিডন্যাপিং-এর প্ল্যান ছকছে নির্ঘাত! মেজদাকে ডাকাতদের খুব পছন্দ (ওদের মতই দেখতে কিনা!)। যারা ডাকাতের খপ্পরে মেজদা পড়েছে তারা জানে। রেল ডাকাতও হতে পারে।

চেকার এসে আমাদের টিকিট দেখে গেলেন। কিট্টুকে দেখে বললেন, “এও যাবে?”
“নিশ্চয়, এ আমাদের ছোটো ভাই,” ইন্দুদি বলল। ভদ্রলোক শুধু হাসলেন।
ট্রেন জার্নিটা ভালোই লাগল। আজকাল আর যেতে আসতে দু’দিন লাগে না। দুন এক্সপ্রেসের চেয়েও দ্রুতগামী ট্রেন বেরিয়ে গেছে।

সারাদিন-রাত ট্রেন জার্নি করার পর পরের দিন বিকেলে হরিদ্বার এল। এসি কামরা থেকে বেরুতেই আগুনের হলকা লাগল। “ইস কী গরম” – তাতাইদা বলল।

“কিন্তু আমরা তো মুসৌরি আর দেরাদুনে থাকব। এখানে দু’দিন থাকব,” বড়দা বলল।
স্টেশান থেকে বেরিয়েই সার সার অটো। এখানে অটোগুলো অনেক বড়ো। বেশ অনেকখানি জায়গা থাকে। মেজদাকে ছোড়দা ধরে ধরে নিয়ে আসছে। বলছে, “আমি তখনই বারণ করেছিলাম মেজদা যে অত খেয়ো না। এখন হল তো! পেট ব্যথা কমল একটু নাকি আরেকটু ওষুধ খাবে?”

“কী করব! দাদা যে টিফিন ক্যারিয়ার কেড়ে নিল। বাড়ির খাবার খেলে আমার একটুও পেট ব্যাথা করত না।”
“সত্যি বড়দা তুমি এটা ঠিক করনি। দেখ তো মেজদা কত কষ্ট পাচ্ছে।”

বড়দা মেজদার মাথায় হাত বুলিয়ে দিয়ে বলল, “সরি রে লাল্টু। আমার জন্যই তুই কষ্ট পেলি।”
“না দাদা। এখন আমি ভাল আছি। বুবুন ওষুধ দিয়েছে।”

সেজজেঠু এর মধ্যে দুটো অটো ঠিক করে ফেলেছে। লাগেজ-টাগেজ নিয়ে আমরা উঠলাম। বিন্দুদি চেঁচিয়ে উঠল, “কিট্টু কোথায় গেল? ট্রেন থেকে নেমেছে তো?”

ইন্দুদি জিভ কাটল, “সরি কিট্টুর কথা একদম মনে ছিল না।”

আমার চোখে জল এসে গেল। সবার খুব মন খারাপ হয়ে গেল। কিট্টু কিট্টু করে আমরা অনেক ডাকলাম সাড়া নেই কারও।

একটা ঝাঁকড়া আমলকি গাছ থেকে কেউ উড়ে এসে আমার কাঁধে বসল। তাকে দেখেই আমাদের মন ভালো হয়ে গেল। মেজদা বলল, “বদমাইশ পাখি!” ইন্দুদি বলল, “আমার সোনা ভাই। আর এরকম মজা করবে না। কেমন!” কিট্টু নিজেই আমাদের কারোর একটা কাঁধে চেপে নেমে পড়েছিল। দুষ্টুমি করে লুকিয়েছিল।

অটোতে চড়ে সেজোজেঠু সেজমা খুব রেগে গেল। আমরাও হতাশ হলাম। বাইরের দৃশ্য দেখতে দেখতে চলেছি। মা গঙ্গাকে দেখতে পেলাম না। সেই জায়গা একদম শুকনো। হেঁটে পার হওয়া যায়।
সেজমা জিজ্ঞাসা করল, “মা গঙ্গা কোথায় গেল?”

অটো চালক বাংলা কথা বুঝতে পারল। সেও বাংলাতেই বলল, “গঙ্গা নদী এখন দেখা যাবে না।”
“সে কী! মা গঙ্গাও কি বেড়াতে যান নাকি মাঝে সাঝে?”

“আসল ব্যাপার হল গঙ্গাকে মাঝে মাঝে পরিস্কার করা হয়, তার জন্য পুরো জল টেনে নেওয়া হয়। এখন তাই শুকনো দেখছেন। জল পরিষ্কার করার পর আবার ছেড়ে দেওয়া হয়। অনেক রকম প্রসেস আছে এখানে জল পরিষ্কার রাখার। মাঝে মাঝে পরিস্কার না করলে ভাল লাগে বলুন?”
বড়দা বলল, “এমন অদ্ভুত কথা তো শুনিনি।”

সেজজেঠু, “তা শুনবে কেন, তোমরা খবর নিয়ে আসতে পারনি? সব মাটি হয়ে গেল। গঙ্গা চারদিকে ঘেরা থাকলে এই শহর কত সুন্দর লাগে! আজ একদম মরুভূমি মনে হচ্ছে।”
সেজমা বলল, “ওকে বকছ কেন? ও কী করে জানবে?”

“কেন? নেট দেখেই তো জানা যায়! এখনকার ছেলেমেয়েরা নেট চালিয়ে শুধু গল্পই করে। কাজের কাজ কিছুই করে না।”

মেজদা বলল, “ব্যাপারটা আমি জানি। বিদেশে আরও ভালো পদ্ধতি আছে নদীর জল পরিস্কার রাখার।” নদীর জলদূষণ আর পরিস্কার নিয়ে মেজদা একটা বক্তৃতা দেবার জন্য মুখ খুলেছিল, কিন্তু আমাদের কারও আগ্রহ নেই দেখে চুপ করে গেল।

অটো নামল ভোলাগিরি আশ্রমের দরজায়। মেজদা বলল, “এখানে কিছুতেই থাকব না। অসম্ভব।”
“শুধু একটা রাতের জন্য থাক।”
“এক মুহূর্তও নয়। এসি ছাড়া আমি থাকতে পারব না।”
ছোড়দা বলল, “এসি বসানো হোটেল আমি ঠিক করে রেখেছি। নেট থেকে। এই তো হোটেল গঙ্গা লজ। ওখানে নিয়ে চল। দাদার করার কথা এগুলো। আমি করছি।”

বড়দা হাই তুলে বলল, “গঙ্গা লজ না হয়ে গঙ্গাজল হলে ভাল হত। সেক্রেটারির কাজ করেছিস। এত ক্রেডিট নেবার কী আছে? মালপত্র নামাতে আমাকে হেল্প করিস। লাল্টু তো অসুখ বাঁধিয়ে শুয়ে পড়েছে।”
“তুমি তাতাই পাপাইদের বল। ওরা হেল্প করবে তোমায়। আমি মেজদাকে নামাব।”
“কেন, তোর মেজদা কি লাগেজ যে টেনে নামাতে হবে! তাতাইদের দিয়ে কাজ করানো খুব শক্ত। তাও চেষ্টা করব।”

গঙ্গা লজ আমাদের সবার পছন্দ হল। সুন্দর একটা বাগান আছে। সেজমা বলল, “যাক গঙ্গা পাওয়া গেল শেষ পর্যন্ত।” তখন কী আর জানি, চকচক করলেই সব জিনিস সোনা হয় না।

তাতাইদা পাপাইদা ছুটে গেল সেলফি তুলবে বাগানে ফুলের পাশে দাঁড়িয়ে। বড়দা সেদিকে তাকিয়ে বলল, “মালগুলো একা আমাকেই নামাতে হবে দেখছি।”

ঘরে ঢুকে আরেক কাণ্ড। সেজোজেঠু বলল, “আমার ঘর বদলে দে, একদম ভাল হয়নি।”
“কী বলছ সেজোকাকা! তোমার জন্য সব চেয়ে ভালো আর সুন্দর ঘর বুক করেছি। জানলা খুললেই কেমন সুন্দর রাস্তা দেখা যায়, দূরে পাহাড়ের সারি,” ছোড়দা চোখ গোল গোল করে বলল।

“ছাই রাস্তা দেখা যায়। খালি নর্দমা দেখা যায়। নর্দমার গন্ধ। ওয়াক ওয়াক! তা ছাড়া এখানে সকালে সূর্য ওঠা দেখা যায় না।”

“ঘরের মধ্যে সূর্য ওঠা কোথাও দেখা যায় না সেজোকাকা। বিদেশে গেলেও না,” ছোড়দা বলল।
“গবেট আর কাকে বলে! ঘরের মধ্যে সূর্য ওঠার কথা বলেছি আমি?” সেজোজেঠু চিৎকার করে ওঠে।
আমরা এই সূর্য ওঠা দেখার কথা কিছুই বুঝলাম না। এর ওর মুখের দিকে তাকাচ্ছি। মেজদিদি বলল, “আরে বাবা সূর্য প্রণাম করে সকালে। আর এই ঘর থেকে সানরাইজ দেখা যাবে না। তাই বলছে অন্য ঘর দিতে, যেখান থেকে সানরাইজ দেখা যাবে ভাল।”

এতক্ষণে ব্যাপারটা ক্লিয়ার হল। আমার মেজদিদির মাথা বরাবরই খুব সাফ। এই সূর্য ওঠা নিয়ে আমার দাদারা কেমন হিমসিম খেয়ে গেছিল। মেজদিদি বলল, “ভোরবেলা ঘুম থেকে উঠে জবাকুসুম শঙ্কাসম না করে বাবা জল খায় না।”

ছোড়দা মাথা-টাথা চুলকে বলল, “কী করি এখন! সানরাইজ দেখা যায় এমন ঘর তো আর পাব না। আগে থেকে বুক না করলে পাওয়া যায় না এখানে।”

বড়দা হেসে ফেলল। বলল, “আমার একটা নাম অরুণ। অরুণ মানে সূর্য। তুমি বরং আমাকে দেখে জবাকুসুম শঙ্কাসম করবে সকালবেলা।” সেজোজেঠু বড়দার মাথায় জোর একটা গাঁট্টা বসিয়ে দিল।
বড়দা হাউমাউ করে উঠল, “বাবা রে! খুন করে ফেলল।”

মেজদিদি বলল, “ছিঃ নিজেদের মধ্যে মারামারি কেন? আমরা না হয় মনে মনে সূর্য প্রণাম করে নেব।”
এদিকে সেজোমা একগাদা কাপড় কেচে ফেলেছে। সেজোমা সেগুলো বারান্দার রেলিঙে মেলতে গেছিল। লজের এক কর্মীর চোখে পড়ে গেল ব্যাপারটা। তার সঙ্গে বেশ ঝগড়া শুরু হয়ে গেল। সেই ভদ্রলোক বলল, “ম্যাডাম এখানে এত কেচেছেন কেন? এখানে জামাকাপড় কাচার নিয়ম নেই।”

“কাহে কা নিয়ম নেহি! তুমি হামাকে নিয়ম শিখানে কে লিয়ে আয়ে হো! ট্রেনের ময়লা কাপড় জামা না কেচে পহেঙ্গে ক্যায়সে! নিজে তো একটা কালো কুস্টি জামা পরে আছ! মাগো! দেখলে ঘেন্না আসে।”

ভদ্রলোক তো রেগে টং। গাড়ওয়ালি লোক হলেও বাংলা ভালোই বোঝে। আর বুঝবে না কেন, এখানে বেশির ভাগ ট্যুরিস্ট তো বাঙালিই। আর যথেষ্ট পরিস্কার জামা পরে আছে ভদ্রলোক।

ছোড়দা বড়দা অনেক কষ্টে ব্যাপারটা মেটাল। ভদ্রলোক গজগজ করতে করতে চলে গেল নিজের কাজে।
বড়দা বলল, “তুমি এখানে কাপড় কাচতে বসলে কেন সেজোকাকিমা। দেখলে তো কেমন ঝামেলা হল।”
“তোমাদের মতো নোংরাকুটে তো নেই। তোরা না থামালে খোট্টা লোকটাকে আজ আচ্ছা করে দিতুম।”
সেজোমা সেজোজেঠুকে সামলাতে অনেক ধকল গেল। আমাদের ঘরগুলো বেশ ভালোই হয়েছে। আমি, মেজদিদি, ইন্দুদি, বিন্দুদি, টুকাইদি আর কিট্টু এক ঘরে আছি।

মেজদা বড়দা একটা ঘরে। তাতাইদা পাপাইদার আলাদা একটা ঘর। ছোড়দা নিজের জন্য আলাদা একটা ঘর নিয়েছে। রাত জেগে কাগজের অফিসের জন্য হরিদ্বার ভ্রমণ লিখবে তাই।

পরের দিন সকালে আমরা বেড়াতে যাব। প্রথমে যাব কনখলে। এখানে সতীর বাপের বাড়ি ছিল অর্থাৎ দক্ষ প্রজাপতির বাড়ি। দক্ষ প্রজাপতির মুণ্ডু কেটে দিয়েছিল শিব আর জুড়ে দিয়েছিল একটা ছাগলের মুণ্ডু। খালি শিব ঠাকুরকে গালমন্দ করত দক্ষ, তাই এই সাজা। ছাগলের মুখ নিয়েই শিবের স্তুতি করে উদ্ধার পায় দক্ষরাজ। পরনিন্দা পরচর্চার উপযুক্ত শিক্ষা পেয়েছিল দক্ষ। এটা একটা বিখ্যাত দর্শনীয় স্থান। আর কাছাকাছি আছে আনন্দময়ী মা’র আশ্রম। সকাল সাতটায় আমাদের বেরুবার কথা। তাড়াতাড়ি ঘুমাতে হবে।
মাঝরাত্তিরে দরজায় ঠক ঠক। শুধু ঠক ঠক বললে ভুল হবে। অতিকায় কোনও প্রাগৈতিহাসিক প্রাণী দমাদম দরজা পিটছে মনে হল। আমার গলা শুকিয়ে কাঠ। মেজদিদি ধড়ফড় করে উঠে বলল। “কে কে!” “আরে আমি, তোদের মেজদা। একটু খোল না।” দমাদম দরজা পেটা একটুও বন্ধ হয় না। বিখ্যাত ওর দরজাপেটা। যে শুনেছে সে জীবনেও ভুলবে না।

“কী ব্যাপার মেজদা? এত রাতে?”
মেজদা তড়াক করে ভেতরে চলে এল। বলল, “আমি এখানে থাকব। ওই ঘরে আমি আর যাচ্ছি না।”
“কেন কেন? ব্যাপারটা খুলে বল। আমাদের এখানে তোমার জায়গা হবে না। দেখছ তো আমরা কীভাবে ঠেসাঠেসি করে আছি।”

“ভূত আছে ঘরে। বাথরুমের কল খুলে যাচ্ছে আপনা-আপনি। কে যেন গান গাইছে মনে হল। আর ধন্য তোদের বড়দার নাক ডাকা! বাঘের পাশে শুয়েছি মনে হচ্ছে।”
“কী আমি নাক ডাকি! তুই নিজের নাসিকা গর্জন কখনও শুনেছিস?” বড়দা চলে এসেছে ঘরে। আর এসেই গর্জন শুরু করে দিয়েছে।

“ভাগ্যিস আমার ঘুম ভেঙে গেল তাই পিছু পিছু আমি এলাম। আর তাতেই জানতে পারলাম আমার সম্বন্ধে তুমি যা তা বলছ বোনেদের কাছে।”

“হ্যাঁ ঠিক বলেছি, তোর পাশে শোওয়া যায় না।”
“বেশ, তুমি একা থাকো ও ঘরে। আমি বুবুনের কাছে শুচ্ছি।”

মেজদা বড়দার হাত ধরে বলল, “ওই ঘরে ভূত আছে। বাথরুম থেকে জল পড়ছে। কারা যেন গান গাইছে। ওরে বাবা ভাবলেই গায়ে কাঁটা দেয়।”

প্রবল প্রতাপান্বিত বৈজ্ঞানিক মেজদা তাহলে ভূতে ভয় পায়! বড়দা বলল, “আমার মোবাইলে লো ভলুমে গান চলছিল, ভূতের এত দায় পড়েনি তোকে গান শোনাবার।”

তাতাইদা পাপাইদা চলে এল আমাদের ঘরে। তাতাইদা বলল, “আমাদের ঘরের এসিটা একদম ঠাণ্ডা হচ্ছে না। রুম সার্ভিসে ফোন করলাম কেউ ধরছে না।”
ইন্দুদি বলল, “মেজদার ঘরে নাকি ভূত আছে।”

“ছ্যাঃ ছ্যাঃ! বৈজ্ঞানিক আবার ভূতের ভয় পায়,” মেজদি বলল।

মেজদা বলল, “বিজ্ঞানীরাও মানুষ এবং ভূত ভগবান সবই মানে। এখানে একটা ঘরেরও এসি ঠিক নেই। মশা কামড়ে কামড়ে শেষ করে দিল। এই যদি জার্মানি বা ইংল্যান্ড হত…”
“সামনের বার আমরা জার্মানি বা ইংল্যাণ্ড যাব।”
“কে তোদের নিয়ে যাবে র‍্যা! গেলেই তো উৎপাত করবি।”
পাপাইদা বলল, “আহ তুমি চুপ কর। বিছানা ভর্তি লাল পিঁপড়ে। বাথরুমটাও জঘন্য। জল বেরোয় না।”
“ঘরগুলোয় কেমন ড্যাম্পের গন্ধ।”
“অ্যাকোয়া গার্ডটাও ভালো নয়। জলে কেমন গন্ধ।”

“ওই জন্যই ইন্টারনেট দেখে ঘর বুক করতে নেই। স্বচক্ষে দেখে তবে ঘর বুক করতে হয়,” বড়দা বলল। কিন্তু মাঝ রাতের আড্ডা আর জমল না। আমাদের মুখোমুখি ঘরের দরজা খুলে গেল। ও বাবা এ যে সেই ট্রেনের কামরার দুই সাশপিসাস। বাদামি চুল আর টাকমাথা। টাকমাথা চেঁচিয়ে উঠল, “ও দাদারা দিদিরা, গল্প করতে হয় ঘরে ঢুকে দরজা বন্ধ করে করুন। আপনাদের চিৎকারে আমরা ঘুমাতে পারছি না।” “এই ছেলেমেয়েগুলোই ছিল কাল ট্রেনে, ওখানেও জ্বালিয়েছে আবার এখানেও এসে জুটেছে। কোনও ম্যানার্স জানে না। ডিস্টার্ব এলিমেন্টস। এদের জন্য আমাদের হোটেল বদলাতে হবে দেখছি,” বাদামি চুল রাগে গজগজ করতে থাকে।

“দেখবে ওইখানে গিয়েও উঠেছে গুণ্ডাগুলো,” টাকমাথার ঝঙ্কার।
পাপাইদা বলল, “চল সবাই ঘরে ফিরে যাই। লোকে বিরক্ত হচ্ছে।”
বড়দা বলল, “তোদের নিয়ে আর কখনও কোথাও যাব না, খুব শিক্ষা হল।”

রাতে অত গোলমালের কারণে কারোর ভাল করে ঘুম হল না, সকালে কেউ উঠতে পারলাম না। আমাদের আর বেড়াতে যাওয়া হল না।

বেরুতে বেরুতে তাই অনেকখানি বেলা হয়ে গেল। প্রচণ্ড গরম বেলা বাড়ার সঙ্গে সঙ্গেই। মন্দিরের পাথর একদম তেতে উঠেছে। পা রাখা যাচ্ছে না। বড়দা দুটো অটো ভাড়া করেছিল। কিট্টু আমাদের কারোর একটা কাঁধে বসে পড়ছে। মাঝে মাঝে মেজদারও কাঁধে বসে পড়ছে। মনের ভুলে মেজদা কিট্টুকে তাড়াতে ভুলে যাচ্ছে। ফটো তোলায় এত ব্যস্ত যে খেয়ালই করছে না কিট্টুকে। আবার খেয়াল পড়লেই কিট্টুকে হাত দিয়ে ঠেলে সরিয়ে দিচ্ছে, আর গান গাইছে, ‘যা যা বেহায়া পাখি যা না! ইন্দুর কাছে যা না, বিন্দুর কাছে যা না। কেউ করেনি মানা।’ কিট্টু মুখে মুখে উত্তর করছে না। প্রকৃতি দেখতে ব্যস্ত। দুটো ছেলে দাঁত বার করে হাসতে হাসতে চলে গেল, বলে গেল, “ইস আদমিকা দিমাক খারাপ হ্যায়। পুরা খানদানই পাগল হ্যায় স্যায়দ।” মেজদা তখন উপুড় হয়ে একটা বাঁদরের ছবি তুলছিল। রাস্তার লোকের কথা শুনে কখনও ঝগড়া বিবাদ করা উচিত নয়। তাই আমরা কিছু বললাম না। এই গরমেও মেজদা বিশাল একটা কোট গায়ে দিয়েছে। ফ্রাঙ্কফুর্ট থেকে দরদাম করে কেনা বলে এই গরমেও পড়তে হবে? তোমরা কিছুই জান না দেখছি, বৈজ্ঞানিক মেজদার পকেটে এয়ারকণ্ডিশনিং পিল আছে, শীতে গরম লাগবে, গরমে শীত লাগবে। এত গরমে আর মন্দির দেখা নিরাপদ নয় মনে করে বড়দা সবাইকে হোটেলে ফিরিয়ে নিয়ে গেল। কালকে আমরা হৃষীকেশ যাব। মুসৌরী আগে দেখে নিলে হৃষীকেশ দেখতে কষ্ট বেশি হবে কারণ ওখানে বেশ গরম। দুপুরে ভাত আর ঘি দেখে মেজদা নাক কুঁচকে বলল, “এ বাবা! শেষ বেশ এই খেতে হবে! ঘি থেকে কেমন একটা বাজে গন্ধ বেরুচ্ছে।”
“তোর কী হবে রে লাল্টু। সবেতেই সমস্যা,” বড়দা নিরাশ হয়ে বলল।

ঘি থেকে সত্যি কেমন একটা গন্ধ বেরুচ্ছে বটে। তবে খেতে খুব খারাপ নয়। মোষের দুধ থেকে এই ঘি তৈরি হয়, একটু গন্ধ থাকে। অনেকে খেতে পারে না। আলুসেদ্ধ, কাঁচা লঙ্কা আর ডাল, আলুভাজা, পাঁপড়, আলু-পটলের দম, ধোঁকার ডালনা আর পাকা তেঁতুলের চাটনি – এই হল মেনু। মাছ, মাংস, ডিম ছাড়া যারা একদম থাকতে পারে না তাদের জন্য এই শহর নয়। তবে নিরামিষাশীদের স্বর্গরাজ্য। পাপাইদা বলল, “আগে জানলে বাবা হরিদ্বার আসতুম না।”

বড়দা বলল, “সত্যি তো, বড়ো ভুল হয়ে গেছে।”

সেজোমা বলল, “হরির দরজায় এসে তোমরা আজে বাজে খাবার কথা ভাবছ। হে ঠাকুর, তুমি এদের অপরাধ নিও না।” সেজোমা কপালে হাত ঠেকাল।

সেজোজেঠু বলল, “এর চেয়ে ভোলাগিরি আশ্রমে খেলে ভাল হত।”
মোদ্দা কথাটা হল, মানুষ কোনও অবস্থাতেই হ্যাপি নয়। আরও বেশি হ্যাপি থাকতে চায়।

সন্ধেবেলা হর কি প্যারীর ঘাটে গঙ্গা আরতি শুরু হল। এখানে একটা বিখ্যাত ঘড়ি আছে। তোমরা ছবি দেখে থাকবে। জল কমে গেছে যদিও, তবু গঙ্গা মায়ের আরতি হয় নিয়ম করে। কিছু লোক স্নান করছে। কিছু লোক প্রদীপ ভাসানোর তোড়জোড় করছে। আমাদের দিকে সবাই ঘুরে ঘুরে দেখছে, কারণ হল কিট্টু। আজব লোক আমরা, চিড়িয়া নিয়ে ঘুরে বেড়াচ্ছি। দুজন সন্ন্যাসী বসে বসে গাঁজা খাচ্ছে। কেউ কেউ আবার মোটর বাইক চালাচ্ছে। সন্ন্যাসীদের মোটর বাইক চালাতে দেখে অনেকেই দাঁড়িয়ে পড়েছে। চারদিকে নানা রকম আওয়াজ। মেজদা ছবি তুলছে ফটাফট। ছবি তুলতে তুলতে একটা কুকুরের পা মাড়িয়ে দিল মেজদা। বসে ছিল বেচারি, ঘ্যাঁক করে উঠল। মেজদাকে কামড়াল না। বড়দা কুকুরটাকে বিস্কুট খাওয়াল। পা মাড়ানোর ক্ষতিপূরণ। ছোড়দা বলল, “মেজদা রাস্তাঘাট দেখে চল। এক্ষুনি কুকুরটা তোমাকে কামড়ে দিত।”
“যত সব রাস্তার কুকুর। বাড়ি গিয়ে গরম জলে পা ডুবিয়ে বসে থাকব। না জানি কীসের জার্ম ঢুকে গেল শরীরে। এই যদি জার্মানি বা ব্রিটেন হত একটাও নেড়ি থাকত না। আমাদের দেশ ভর্তি শুধু কুকুর আর বিড়াল।”

তাতাইদা বলল, “তোমার কিন্তু কুকুরটির ওপর কৃতজ্ঞতা থাকা উচিত। নেড়ি বলে অপমান কোরো না। তোমাকে কামড়াতে পারত কিন্তু কামড়ায়নি।”

“কিন্তু যদি কামড়াত?”
“তাহলেই ভাল হত!”
“এত বড়ো কথা বলতে পারলি? তোদের বেড়ানোটা মাটি হত যে।”

“চুপ কর না রে, গঙ্গা মায়ের আরতি শুরু হচ্ছে যে,” সেজোজেঠু বলল, “এরা মোটেই ভদ্রতা-সভ্যতার ধার ধারে না।” ইন্দুদি আমাকে দেখাল, “দ্যাখ দ্যাখ হোটেলের সেই পাজি লোকদুটো এখানেও এসেছে।” ওমা, ওই তো বাদামি চুল আর টাকমাথা জলে ভাসাবে বলে প্রদীপ কিনছে। ওরা প্রে করছে যাতে ওদের দুষ্টু পরিকল্পনা সব মা গঙ্গা সফল করেন। গঙ্গা মায়ের আরতি শুরু হয়ে গেল ঢঙ ঢঙ করে। হর হর গঙ্গে! দেখার মতো জিনিস বটে। তবে জল কম আছে আগেই বলেছি। আমরা কিছুক্ষণ ঘুরে টুরে হোটেলে ফিরে এলাম। এখানে অনেক ফুচকা চাট বসেছে। সেজোজেঠু কিছুই খেতে দিল না। “পরের দিন ভোর বেলা বেরুতে হবে। এই সব খেয়ে অসুখ বাধিয়ো না।”

সেজজেঠুকে না আনলেই ভাল হত। এখানে সবাই দেখছি শুধু ঠাকুরের গান শোনে।
পরের দিন ভোরবেলা বেরুতে হবে ঋষিকেশ-লছমনঝুলা। হরিদ্বার থেকে এসি বাস ছাড়লেও বড়দা আমাদের জন্য ছোটো একটা বাসের ব্যবস্থা করেছে। সকাল ছ’টায় বেরুবার কথা ছিল, কিন্তু মেজদার জন্য দেরি হয়ে গেল। আমরা সবাই রেডি হয়ে বসে আছি, মেজদার আর হয় না। ব্যাপারটা কী হল দেখতে হচ্ছে। “কী আর হবে! নির্ঘাত বাথরুমে ঢুকে বসে আছে। কতবার বলেছি লাল্টু একটু বুঝে শুনে খা। কে শোনে কার কথা!” বড়দা বলল উদাস মুখ করে। পাপাইদা ছুটতে ছুটতে এসে বলল, “ব্যাপার বড় সাংঘাতিক। মেজদা কী করছে দেখ।”

“কী করছে কী করছে!” আমরা হইহই করে উঠি।
“গিয়ে দেখে এস না।”

সবাই ছুটল মেজদার ঘরে। এ বাবা ঘরের কী অবস্থা। বিছানার ওপর বেশ কিছু জামা ছত্রাকার হয়ে পড়ে আছে। চাদরটা মাটিতে ঝুলছে কিছুটা, বিছানার ওপর মোবাইলের চার্জার, ল্যাপটপ সব ঝুলছে। এরকম বিছানা এই প্রথম দেখছি। একজন খাঁটি বৈজ্ঞানিকের বিছানা এরকমই হয় নিশ্চয়। মেজদা আয়নার সামনে দাঁড়িয়ে আছে গম্ভীর মুখ করে, কিছু একটা মন দিয়ে লক্ষ করছে। হঠাৎ গায়ের শার্টটা খুলে ছুঁড়ে ফেলে দিয়ে বলল, “আমাকে এই শার্টে ঠিক মানাচ্ছে না।” শার্টটা উড়ে এসে বড়দার নাকে পড়ল। বড়দা খুব রেগে গিয়ে বলল, “হ্যাঁ রে লাল্টু, এসব কী হচ্ছে? বাস আর কতক্ষণ দাঁড়িয়ে থাকবে?”

মেজদা আর একটা শার্ট পরতে পরতে বলল, “আমার জন্য গোটা পৃথিবী ওয়েট করতে পারে আর এ তো সামান্য একটা বাস।”

মেজদা দু-তিনখানা শার্ট গায়ে দিয়ে দেখল। সব খুলে ছুঁড়ে ফেলে দিল। তারপর একটা ট্রায়াল দেওয়া শার্ট আবার মেঝে থেকে কুড়িয়ে নিয়ে পরল। দাড়ি কামাল। পারফিউম লাগাল (এটাও অনেক বেছে বেছে লাগাল)। বডি স্প্রে লাগাল ফুরফুর করে। মুখে অনেক কিছু মাখল। চুলে আধঘণ্টা ধরে চিরুনি চালাল (যদিও চুল তেমন নেই)। তারপর একটা বাক্স খুলে একগাদা ঘড়ি বার করে ইন্দুদিকে বলল, “কোনটা পরি বল তো!”
আমরা দমবন্ধ করে মেজদার কীর্তি দেখে যাচ্ছিলাম। বড়দা বলল, “যা হোক একটা পর ভাই, তোকে সবেতেই ভাল লাগে।” সাজগোজ শেষ করে মেজদা ঘরে তালা লাগাল। তারপর তালাটা আরেকবার টেনে দেখে নিল।
এই সবের পর আমরা বেরুলাম। আমরাও বাইরে এলাম আর বাসটাও হুশ করে বেরিয়ে গেল। বড়দা আর ছোড়দা বাসের পেছন পেছন ছুটেও দাঁড় করাতে পারল না। ছোড়দা বলল, “দাদা বাসের ড্রাইভারকে একটা ফোন করে দাও।”

বড়দা পকেট থেকে মোবাইল বার করে কিছুক্ষণ টেপাটেপি করে বলল, “যাহ! ড্রাইভারের নম্বর নিতেই ভুলে গেছি।”

ছোড়দা চোখ বড়ো বড়ো করে তাকাল। বলল, “দাদা তোমাকে কিছু বলা বৃথা, আর মেজদা তুমি বিদেশে এত বার গেছ আর পাংচুয়ালিটি বোঝো না?”

“বা রে! বিদেশে যা করি নিজের দেশেও তাই করতে হবে নাকি! এখানে আমি আরাম করে তৈরি হব।”
“নাও এখন আরাম করে তৈরি হবার ঠ্যালা সামলাও।”

সেজজেঠু সময়ানুবর্তীতা নিয়ে ছোটোখাটো একটা লেকচার দিয়ে দিল। বড়দা হোটেলে চলে গেল। ফিরে এল একগাল হাসি নিয়ে, “ঠিক করে ফেলেছি আরেকটা বাস। এক্ষুনি চলে আসবে।” “এই তো বড়দা থাকতে কোনও চিন্তা নেই,” টুকাইদিদি বলল।

মেজদি বলল, “হ্যাঁ, করিতকর্মা বড়দা।”

করিতকর্মাই বটে। যে বাসটা এল তাতে এসি থাকা তো দূরের কথা জানলাগুলো পর্যন্ত খোলা যায় না। জানলা খুলতে রীতিমত যুদ্ধ করতে হয়। কিন্তু তাতে কী? বেড়ানো তো হচ্ছে! হৃষিকেশ আমাদের ডাকছে।
সারাটা রাস্তা আমাদের প্রচণ্ড গরম লাগল। একে তো জানলার কাচ খোলে না। সেজোজেঠু গায়ের শার্ট খুলে ফেলেছে। সেটা দিয়েই হাওয়া খাচ্ছে। সেজোমা বারবার মুখে জলের ছিটে দিচ্ছে। মেজদি আর টুকাইদিদি হাতপাখা নিয়ে হাওয়া খাচ্ছে। মেজদা বলল, “এই রে! আমার এয়ারকন্ডিশনিং পিল নিতে ভুলে গেছি। কী গরম রে এখানে!” মেজদির হাতপাখা কেড়ে নিয়ে হাওয়া খেতে শুরু করল।

“আমাদের সমস্ত ভোগান্তি তোমার জন্য মেজদা,” মেজদিদি বলল।
টুকাইদিদি বলল, “আর তোমাকে নিয়ে বেরুব না।”
বিন্দুদি, “এই একটা লোকের জন্য পুরো ট্যুরটা নষ্ট হল।”
সেজোমাও যোগ দিল, “হাড়বজ্জাত ছেলে!”

সবাই মেজদাকে দোষারোপ করতে লাগল। আমাদের এত কথায় কোনও কাজ হল না। মেজদা পকেট থেকে ক্রিম বিস্কুট বের করে খেতে শুরু করল। তারপর আলুর চিপস বার করল। তারপর চকলেট বার করল। বলল, “তোদের জ্বালায় ব্রেকফাস্ট ভালো করে করতে পারিনি।”

তা বৈকি! চারটে পরোটা আর আলুমটর এমন কী!
হৃষীকেশ শহর দেখে আমার আগেকার দিনের তপোবনের কথা মনে পড়ে গেল। মন্দির আর আশ্রম দিয়ে সাজানো গোটা শহর। প্রতিটা আশ্রমের সঙ্গেই ফুলের বাগান। গনগনে রোদ উঠেছে। খালি পায়ে চলা যাচ্ছে না। মন্দির বা আশ্রমে জুতো পরে চলা যায় না। লছমনঝুলার সেই বিখ্যাত ব্রিজের ছবি এতদিন ঘরের ক্যালেন্ডারে ঝুলতে দেখেছি। মনে মনে ভেবেছি এ তো পুরো স্বর্গ। সামনে থেকে দেখে কিন্তু স্বর্গ বলে মনে হচ্ছে না। কারণ একটাই, প্রচণ্ড রোদ। আর ভীষণ বাঁদরের উৎপাত। কিট্টুকে নিয়ে ভয় হচ্ছে। বাঁদরগুলো দাঁত মুখ খিঁচোচ্ছে ওকে দেখে। পথচলতি লোকজনকে এরা খুব বিরক্ত করে। আমাদের সঙ্গে ছাতা আছে। তেড়ে আসলেই ছাতার বাড়ি দেব পিঠে। গঙ্গার রঙ এখানে সবুজ। নৌকা চড়ছে অনেকে। অনেকটা শিকারার মতো দেখতে নৌকাগুলো। এখানে প্রচুর মাছ জলে। মাছের খাবার কিনতে পাওয়া যায়। তুমি ইচ্ছা করলে ওদের খাওয়াতে পার। লছমনঝুলার কাছেই আছে রামঝুলা। বাঁদরগুলো এমনভাবে তাক করে বসে থাকে যে ব্রিজে হাঁটার আনন্দ অনেকটাই ফিকে হয়ে যায়। না হলে এমন নড়বড়ে ব্রিজে হাঁটার বা দৌড়নোর আনন্দই আলাদা। সারাদিন মন্দির দেখ আর প্রণামী বাক্সে ফেল। কত সব সাহেব মেম এখানে ঘুরছে। ছবি তুলছে। কেনাকাটি করছে। ওদের মনে হয় গরম কম লাগে। আবার বাসে করে হোটেলে ফেরা। কাল আমরা দেরাদুন যাব। সবচেয়ে ভয়ের কথা হল বাদামি চুল আর টাকমাথা আমাদের পিছু নিয়েছে। আমরা যেখানে যেখানে যাচ্ছি ওরাও সেখানে সেখানে চলেছে। আড়চোখে আমাদের দেখছে। আর কী সব বলাবলি করছে। মোবাইল ক্যামেরায় আমাদের ফটো তুলল বলে মনে হল। আমরা বোধ হয় একটা ভয়ঙ্কর রহস্যের জালে জড়িয়ে পড়ছি।

রাতে শোবার সময় মেজদি সন্দেহজনক লোকগুলোর কথা তুলল। আমাদের আরও সাবধান থাকতে হবে।
পরেরদিন দেরাদুন আর মুসৌরি। আমাদের ইন্দুদি আর বিন্দুদির মতো যেন দুটো যমজ শহর। একদম ক্যালেন্ডারের ছবির মত সাজানো শহর। দেরাদুন যেতে অনেক সময় লাগল। পথের মাঝে দাঁড়িয়ে ব্রেকফাস্ট করলাম। সহস্রধারা ফলস, টপকেশ্বর শিবের মন্দির প্রথমেই দেখে নেওয়া গেল। টপকেশ্বর শিব মন্দির ভারি মজার। টপ টপ করে শিবের মাথায় জল এসে পড়ছে আপনা আপনিই। একটা পাহাড়ের ওপর মন্দির। আমরা সবাই জল ঢাললাম শিবের মাথায়। “তোমরা কি এখানে একটু ফলের রস খেয়ে নেবে?” বড়দা জিজ্ঞাসা করল।

মেজদা হাত তুলে বলল, “আমি খাব।”
“যার যার খেতে ইচ্ছে করছে খেয়ে নাও।”

বাদামি চুল আর টাকমাথাও এসেছে। দুজনের পরনে চকরাবকরা শার্ট। মনে হয় হরিদ্বারের মার্কেট থেকে কেনা।

দেরাদুন থেকে মুসৌরি দারুণ সুন্দর রাস্তা। দূর থেকে শিবালিক পর্বতমালা দেখা যাচ্ছে। একদম ঘন নীল রঙের পাহাড়ের শ্রেণী। একপাল সাদা মেঘ নীল আকাশে বেড়াতে বেরিয়েছে। নানানরকম গাছপালা, বিশেষ করে ফুলে ভর্তি। একধরণের ফুল ফুটে আছে একদম মুক্তোর মতো দেখতে। এগুলো একরকম ঘাসফুল। দেখে মনে হবে সার সার মুক্তো বসে আছে। এখানকার বাচ্চারা খুব সুন্দর দেখতে। আমাদের বাস দেখে একদল বাচ্চা হাত নাড়ছে হাসিমুখে।

মুসৌরি এসে আমরা হাঁ হয়ে গেলাম আর মেজদার ভারি মন খারাপ হয়ে গেল।
জিজ্ঞাসা করতে বলল, “এই শহরের কোনও খুঁত আমি বার করতে পারছি না। উফ কী কষ্ট যে হচ্ছে!”
“ভাবো ভাবো, ভাল করে ভাবো ঠিক পেয়ে যাবে। এই শহরেই লেখক রাস্কিন বন্ডের বাড়ি,” বিন্দুদি বলল।
“সে আবার কে? জেমস বন্ডের ভাই নাকি?” পাপাইদা জিজ্ঞাসা করে।
“তুই রাস্কিন বন্ডের নাম জানিস না! বিখ্যাত লেখক,” মেজদা বলল।

“আমি একজন বিখ্যাত লেখককেই চিনি যে আমাদের সব কথা লিখে রাখে,” এই রে আমার কথা বলছে পাপাইদা।

বড়দা তাড়া দিল লাঞ্চ করার জন্য।

দারুণ একটা খাবার দোকান। সেজোমা দেখেই নাক কুঁচকে ফেলল। বলল, “‘আমি বাবা মুড়ি চিঁড়ে খাব।”
“এখানে আমিষ নিরামিষ সব পাবে,” বড়দা বলল।

নন-ভেজ খেতে পারবে শুনে আমার দাদারা আনন্দে আত্মহারা হয়ে উঠল। দিদিরা একটু কম হল। সেজজেঠু আর সেজোমাকে একটা ভেজ রেস্টুরেন্টে ঢুকিয়ে দিল বড়দা।

মেজদির কাঁধে বসে থাকা কিট্টুকে সবাই দেখছে। সাহেব মেমগুলোও দেখছে বারবার। মেজদি ব্যাগ থেকে ছোলা আর কাঁচালঙ্কা বার করে খাওয়াতে শুরু করল। কেউ কেউ ফটো তুলছে আমাদের। স্পেশাল লোক অবশ্যই কিট্টু। মেজদা বলল, “আদিখ্যেতা দেখলে গা জ্বলে যায়।” মুসৌরিতে বেশ কিছু শিখ মানুষ ঘোরাফেরা করছে। আমরা এখানে দু’দিন থাকব। আবার হরিদ্বারে একদিন থেকে ফেরার ট্রেন ধরব। তাই সব ব্যাগ-পত্র আনিনি। কিছু ওখানের ওই গঙ্গা লজে রেখে এসেছি। এবার আমরা যে হোটেলে উঠলাম, জানলা দিয়ে পাহাড় দেখা যায়। খুব সুন্দর জায়গা। হোটেলের বাগান ভর্তি মরশুমি ফুল। আমার দাদাদের আরও যে কারণে হোটেলটা পছন্দ হল সেটা হল একজন দেহাতি লোক হোটেলের সামনে ঠেলা গাড়িতে করে মোমো বিক্রি করছে। মেজদা আর ছোড়দার সঙ্গে খুব ভাব হয়ে গেল অল্প সময়ের মধ্যে। মোমোটা সে ভালোই করে। যে ভালো রান্না করতে পারে সে নাকি খুব ভালো মনের মানুষ হয়। ছোড়দা বলে।

এদিকে মেজদার সঙ্গে রুম শেয়ার করতে কেউ রাজি হল না। বড়দা ভাইয়ের মনে কষ্ট দিতে পারল না, বলল, “আমি লাল্টুর সঙ্গে থাকব।”

ছোড়দা নিজের লেখালেখির জন্য একটা আলাদা ঘর নিল। সেজোজেঠুর ঘর থেকে সানরাইজ দেখা যাচ্ছে। ভোরবেলা উঠে জবাকুসুম শঙ্কাসম করতে আর অসুবিধা হবে না, তাই সেজোজেঠু খুব খুশি। একটা ব্যাপার লক্ষ্য করেছি। গঙ্গা লজের সেই বাদামি চুল আর টেকো এসেছে। ওরাও দেখেছে যে আমরা এসেছি। রাতের বেলায় সবাই ঘুমিয়ে পড়েছে। এখানে ঠাণ্ডা আছে, তাই সবাই খুব ঘুমোচ্ছে। পরিশ্রমও হয়েছে অনেক। আমার ঘুমটা কেন জানি না ভেঙে গেল। বারান্দায় গিয়ে দাঁড়াতে ইচ্ছে হল। খুট করে দরজা খুললাম। বারান্দাটা তিনটে রুমের বাসিন্দারা শেয়ার করতে পারবে। প্রত্যেক রুমে একই রকম ব্যবস্থা। পাশেরটায় ছোড়দা একা। তার পাশে সেই বাদামি চুল আর টেকো উঠেছে। টেকোদের ঘরের দরজা খুলে গেল। টেকো বেরুল। কানে মোবাইল। আমি আস্তে করে একটা থামের আড়ালে লুকিয়ে পড়লাম। টেকো কাকে যেন বলছে, “পাখি এখানেই আছে। আমি আর বস নজর রাখছি।” ইস! পাখি মানে কিট্টু! তার মানে মেজদা নয়, ওদের টার্গেট কিট্টু। টেকো কান থেকে ফোন নামিয়ে ভেতরে চলে গেল। কিন্তু টেকোর দাড়ি কই? পরিস্কার কামানো দেখছি। ভেতর থেকে আরেকজন লোক বেরুল বারান্দায়। হাতে সিগারেট। অল্প আলোয় দেখলাম এর দাড়ি গোঁপ নেই। মুখখানা চেনা মনে হচ্ছে। এ সেই বাদামি চুলই হবে। দাড়ি গোঁপ কামিয়ে ফেলেছে। লোকটা আবার ভেতরে চলে গেল। দরজা বন্ধর আওয়াজ। আমিও আর বাইরে থাকলাম না।
পরের দিন সকালটা আমরা শহরেই পায়ে হেঁটে ঘুরলাম। দুপুরে লাঞ্চ সেরে সবাই মিলে কেম্পটি ফলস দেখতে গেলাম। মেজদা ভেবেছিল নাক ডাকিয়ে ঘুমাবে, কিন্তু বড়দা সেটা হতে দিল না। ভারি সুন্দর ছায়াঘেরা পরিবেশ আর তার মধ্যে ঝরনা। মনে হচ্ছে কেউ যেন এসি চালিয়ে রেখেছে। আমরা হালকা একটা চাদর জড়িয়ে এসেছি। এখানেই বসে অনেকক্ষণ কাটিয়ে দেওয়া যায়। শুধু জলের আওয়াজ। মেঘলা আবহাওয়া। ঝির ঝির করে ঠাণ্ডা হাওয়া দিচ্ছে। নাম না জানা পাখিরা ডাকছে। ট্যুরিস্টের দল আসছে আর যাচ্ছে। অনেকে জলে নেমেছে। প্রচুর ফটো তুলছে সবাই। বাদামি চুল এসেছে। জলে নেমে খুব হল্লা করছে। টেকোকে দেখতে পাচ্ছি না ধারে কাছে। এত আনন্দের মধ্যেও ভয় লাগছে। না জানি বদমাশ লোক দুটো কী কাণ্ড বাঁধায়।

ছোড়দা বসে ঝিমুচ্ছিল একটা বেঞ্চিতে, হঠাৎ ওরে বাবা করে লাফিয়ে উঠল। ব্যাপারটা আর কিছুই নয়। একজন গেরুয়া পরা সাধুবাবা গলায় বিশাল একটা ময়াল সাপ জড়িয়ে ঘুরে বেড়াচ্ছে, ছোড়দার কাছে এসে পয়সা চেয়েছে আর তাতেই ছোড়দা লাফিয়ে উঠেছে।

আমরা ময়াল সাপ দেখলাম এই প্রথম। ডিসকভারি চ্যানেলে অনেক দেখেছি। কিন্তু কিট্টু কোথায় গেল? আমাদের কারোর কাঁধেই ও বসে নেই। কিট্টু কিট্টু করে অনেক ডাকলাম সবাই, কিন্তু কেউ এল না ডানা ঝাপটাতে ঝাপটাতে।

আমাদের সবার চোখে জল, এক মেজদা ছাড়া। তাকে আর দেখাই যাচ্ছে না। “সেই বাদামি চুল আর তার বন্ধুটাকে দেখা যাচ্ছে না,” ইন্দুদি বলল।

“আমাদের কিট্টু সোনাকে ওরা চুরি করে নিয়ে গেছে,” আমি বললাম। কাল রাতের ঘটনা সব বললাম।
“যারা এ কাজ করেছে তারা শাস্তি পাবে,” সেজোমা বলল।

“চল আমরা ফিরে যাই সবাই। সন্ধে হয়ে এল, আর বেশিক্ষণ এখানে থাকা যাবে না,” তাতাইদা বলল।
আমাদের চিৎকার চেঁচামেচি শুনে কয়েকজন ছুটে এসেছে, ভেবেছে কোনও বাচ্চা হারিয়ে গেছে। কিন্তু বাচ্চার বদলে পাখি শুনে সবাই নিরাশ হয়ে চলে গেল।

মেজদাকে দেখা যাচ্ছে না। কোথাও বসে বসে নিশ্চয়ই ঢুলছে। এদিকে আমরা উদ্বিগ্ন মুখে ছুটোছুটি করছি। পাপাইদাকেও দেখা যাচ্ছে না। কিট্টুকে খুঁজতে খুঁজতে নিশ্চয়ই অনেক দূর চলে গেছে। ইন্দুদি বলল, “ওই যে পাপাইদাদা আসছে।” পাপাইদাকে ধরে ধরে নিয়ে আসছে সেই বাদামি চুল লোকটা আর তার টেকো বন্ধুও সঙ্গে আছে। তবে রে! এত সাহস আমাদের দাদাকে ধরে নিয়ে যাওয়া হচ্ছে!

বড়দা একটা গাছের ভাঙ্গা ডাল কুড়িয়ে নিয়ে ছুটল। তাতাইদাও বড়দার পথ অনুসরণ করল। বাদামি চুল বলল, “আরে আমাকে তাড়া করছ কেন? আমি কী করেছি?”

“আপনি আমার ভাইকে ধরে রেখেছেন।”
“আমাদের কিট্টুকে ধরে রেখেছেন,” ইন্দুদি বলল।
পাপাইদা বলল, “আমাকে এরা ধরে রাখেনি। এরা না থাকলে বিচ্ছিরি একটা অ্যাকসিডেন্ট হয়ে যেত। কিট্টুকে খুঁজতে খুঁজতে অনেক দূর চলে গেছিলাম। খাদের ধারে এসে পড়েছিলাম। আমার নজর ছিল গাছের দিকে। তাই সামনে খাদ খেয়াল করিনি। ভাগ্যিস এই ভদ্রলোক ছিলেন। আমার হাত ধরে টেনে আনেন।”

ইস! মানুষকে চেহেরা দিয়ে বিচার করে আমরা কত ভুল করি! বড়দা গাছের ডাল ফেলে দিয়ে বলল, “কিছু মনে করবেন না, আমাদের ভুল হয়ে গেছে।”

বাদামি চুলের ভদ্রলোকের নাম শিশির কুমার পাল। কলকাতা পুলিশের উচ্চপদে আছেন। টাকমাথার নাম অনুপ পাত্র। সহকারী। শিশিরবাবু নিজের কার্ড দেখালেন। বললেন, “এখানে এসেছেন জেল পালানো এক মারাত্মক অপরাধীর খোঁজে।”

“তা সেই অপরাধীকে পেয়েছেন?” বড়দা জিজ্ঞাসা করে।
“হ্যাঁ পেয়েছি তো। এতক্ষণে এখানকার পুলিশ তাকে অ্যারেস্ট করে ফেলেছে।”
“কে সে?”
“হোটেলের সামনে যে ঠেলাওয়ালা মোমো বিক্রি করে।”
আমার দাদাদের মন খুব খারাপ হয়ে গেল মোমোওয়ালা অপরাধী শুনে।
কিন্তু কিট্টু কোথায় গেল? মেজদা আসছে পাইন গাছের বন থেকে। কাঁধে কিট্টু বসে। আমাদের তাকিয়ে থাকতে দেখে বলল, “কী ব্যাপার?”
“তোর কাঁধে কিট্টু বসে!” বড়দা বলল।
“আমি খেয়ালই করিনি। বজ্জাত পাখিটা আমারই কাঁধে। অ্যাই নাম বলছি।”
“আহা থাক, ওকে বকিস না।”

“দারুণ ঘুমটা হল ঝরনার ধারে বসে। এখন একটু কফি চাই,” মেজদা হাই তুলতে তুলতে বলল। আমরা সবাই মিলে ফেরার পথ ধরেছি। সেজোজেঠু শ্যামাসঙ্গীত ধরেছে একটা। কিট্টু এখনও মেজদারই কাঁধে বসে আছে। আমরা ওকে কোলে নিতে চেয়েছি কিন্তু ও মেজদার কাঁধ ছাড়ছে না। মুসৌরি ট্যুর খুব জমে গিয়েছিল। হরিদ্বারে ফিরে গঙ্গা লজে একদিন ছিলাম। শিশিরকাকু আর অনুপকাকুর সঙ্গে খুব বন্ধুত্ব হয়ে গেছিল।
বাড়ি ফিরেই বড়দা বলল, “ট্রাভেল এজেন্সি আমি বন্ধ করে দিলাম।” শুধু বললই না, একটা বড়ো তালা নিয়ে এসে অফিসে ঝুলিয়ে দিল।

গল্পের বিষয়:
উপন্যাস

Share This Post

আরও গল্প

সর্বাধিক পঠিত