চাঁপাডাঙার বউ

চাঁপাডাঙার বউ

দেবগ্রামের পথে পাশের বড় গ্রাম হইতে গাজনের সঙ আসিয়া হাজির হইয়াছে। একজন ঢাকী বড় একখানা ঢাক নাচিয়া নাচিয়া বাজাইতেছে। তাহার সঙ্গে কাসি ও শিঙা। দলটাকে অনেক। দূরে দেখা যাইতেছে। দেবগ্রামে গাজন নাই। নবগ্রামের গাজনও এ গ্রামে আসে না। এবার। ব্যাপারটা নতুন।

দক্ষিণ পাড়ার মণ্ডলবাড়ি হইতে বাহির দরজায় বধূ দুটি ছুটিয়া আসিয়া দাঁড়াইল।

গ্রামের সবচেয়ে সমৃদ্ধ মণ্ডলবাড়ি। মাটির ঘর টিনের চাল, পাকা মেঝে। বারান্দায় সুন্দর গড়নের কাঠের খুঁটি। সেতাব ও মহাতাপ মণ্ডলের বাড়ি। বধূ দুইটি দুই ভায়ের স্ত্রী কাদম্বিনী ও মানদা। কাদম্বিনী ঈষৎ দীর্ঘাঙ্গী, তন্বী এবং শ্যামবৰ্ণে চমৎকার লাবণ্যময়ী মেয়ে। মানদা মাথায় খাটো, একটু লাঙ্গী। কাদম্বিনী নিঃসন্তান, বয়স চব্বিশ-পঁচিশ, মানদার বয়স সতেরআঠের—একটি সন্তানের জননী মানদা।

ওদিকে গাজনের সঙের দল অন্য একটা রাস্তায় ভাঙিয়া ঢুকিয়া যাইতে শুরু করিল। ঢাকের বাজনার শব্দ বাঁকের আড়ালে পড়িয়া কম হইয়া আসিল।

মানদা বলিল, মরণ! ওরাস্তায় ঢুকে গেল যে মড়ার দল।

কাদম্বিনী গবেষণা করিয়া বলিল, বোধহয় ও-পাড়ায় মোটা মোড়লের বাড়ি গেল।

—মোটা মোড়লের বাড়ি? কেন? আমাদের বাড়ির চেয়ে মোটা মোড়লের খাতির বেশি। নাকি?

—তা বয়সের খাতির তো আছে। তা ছাড়া দিতে-থুতে মোটা মোড়লর নাম যে খুব।

ঠোঁটে পিচ কাটিয়া মানদা বলিল, নাম! বলে যে সেইভেতরে ছুঁচোর কেন, বাইরে কোচার পত্তন, তাই। এদিকে তো দেয় শুনি একগলা জল। ইরে দেওয়া-থোয়ার নাম।

কাদম্বিনী একটু শাসনের সুরেই বলিল, ছি, এমন করে কথা বলে না। হাজার হলেও মান্যের লোক। এখন চল, হাতের কাজ সেরে নিই। গায়ে যখন এসেছে তখন এদিকেও আসবে।

তাহারা বাড়ির মধ্যে ঢুকিয়া গেল।

প্রথমেই গোশালা। গরুগুলি চালায় বাঁধা। দ্বিপ্রহরের রৌদ্রের মধ্যে শুইয়া আছে, রোমন্থন করিতেছে, একটা রাখাল গরুর গায়ে তাকিয়ার মত হেলান দিয়া ঘুমাইতেছে।

তাহার পর খামার-বাড়ি।

খামার-বাড়িতে ঢুকিতেই এক কলি গান ও দুপদুপ শব্দ শুনিতে পাওয়া গেল। গমের উপর বাঁশ পিটিয়া গম ঝরাইতে ঝরাইতে কৃষাণটা গান করিতেছে–

চাষকে চেয়ে গোরাচাঁদরে মান্দেরী ভাল।

গমের চারিপাশে পায়রা জমিয়া গম খাইতেছে।

কাদম্বিনী ফিক করিয়া হাসিয়া বলিল, কেন রে নোটন, এত আক্ষেপ কেন?

জিভ কাটিয়া নোটন বলিল, আজ্ঞে মুনিব্যান?

–চাষের চেয়ে মান্দেরী ভাল বলছিস?

–আজ্ঞে মুনিব্যান, মান্দেরী হলে কি আজ আর গম ঝরাতাম গো। চলে যেতাম গাজনের ধুম দেখতে।

মানদা বলিল, এবার গাজনের ধুম যে দেখি খুব নোটন। দুখানা গেরাম পার হয়ে আমাদের গাঁয়ে এল।

—সে তো আমাদের ছোট মোড়লের কাও গো। তুমিই তো ভাল জানবে ছোট মুনিব্যান। কাদম্বিনী সবিস্ময়ে প্রশ্ন করি, কার? মহাতাপের?

–হাঁ গো। আজ কদিন সে হোথাকেই রয়েছে।

–সে কি? সে যে গেল শ্বশুরকে দেখতে! মানুর বাপের অসুখ

মানদা তাহার দিকে অগ্নিদৃষ্টি হানিয়া বলিল, শাক দিয়ে মাছ ঢাকা যায় না বড়দি। শুধু শুধু আর মিছে কথাগুলো বোলো না তুমি!

–মানু! কি বলছিস তুই?

–ঠিক বলছি গো, বড় মোল্যান। সে যে যায় নাই, তা তুমি জান।

–আমি জানি।

–জান না? যদি না জান তবে আমার যাওয়া তুমি বন্ধ করলে ক্যানে?

—এই গরমে ছ ক্ৰোশ পথ থোকাকে নিয়ে যাবি, খোকার অসুখবিসুখ করবে, তাই বারণ করলাম। বললাম-ঠাকুরপো দেখে আসুক।

মিছে কথা। আমি জানি, আমি বুঝি। বুঝেছ, আমি সব বুঝি। আমার বাপের বাড়ি যাবে? তার চেয়ে চার দিন গাজনে নেশাভাঙ করুক, ভূতের নাচন নাচুক, সেও ভাল। আমি সব বুঝি।

মানদা হনহন করিয়া চলিয়া গেল খামার-বাড়ি পার হইয়া বাড়ির ভিতর দিকে। খামারবাড়ির ও-দিকে পাচিলের গায়ে একটা দরজা। সেই দরজাটাকে সবলে ঠেলিয়া দিয়া ভিতরে ঢুকিয়া গেল। কাদম্বিনী দাঁড়াইয়া রহিল। খানিকটা ভাবিয়া দেখিয়া বলিল, তুই ঠিক জানিস নোটন, ঘোট মোড়ল আজ কদিন নবগ্যেরামের গাজনে মেতে সেইখানেই রয়েছে?

–এই দেখ! আমি নিজে চোখে দেখে এসেছি গো। রোজ দেখা হচ্ছে।

–বলিস নাই ক্যানে?

—তার আর বলব কি বল? আর কি বলে, ছোট মোড়ল বললে—নোটন, বলিস না বাড়িতে, তা হলে দেব কিল ধমাধম। ছোট মোড়লের কিল বড় কড়া, তেমুনি ভারি, আষিঢ়ে তাল।

–হুঁ। কাদম্বিনী বাড়ির দিকে অগ্রসর হইল।

নোটন পিছন হইতে বলিল, বড় মোল্যান!

–কি?

–ছোট মোড়ল কিন্তু চাঁপাডাঙা গিয়েছিল।

–গিয়েছিল? গিয়েছিল তো নবগ্রামে থাকল কি করে?

–ওই দেখ! ছ কোশ ছ কোশ বার কোশ রাস্তা ছোট মোড়লের কাছে কতক্ষণ! যেদিন সকালে গিয়েছে, তার ফেরা দিন ফিরেছে। এসে নবগ্যেরামেই জমে যেয়েছে। ভাঙ খেয়েছে, বোম্বোম্ করছে; আর পড়ে আছে। শোনলাম, দশ টাকা চাঁদা দিয়েছে।

—দশ টাকা?

–হ্যাঁ।

–দশ টাকা?

–হ্যাঁ গো। ছোট মোল্যান তিরিশ টাকা দিতে দিয়েছিল বাপের বাড়িতে। তা থেকে দশ টাকা ছোট মোড়ল খয়রাত করে দিয়েছে।

—তোকে কে বললে?

—কে আবার! খোদ ছোট মোড়ল নিজে। সে সেই প্রথম দিনের কথা। যে দিনে যায় সেই দিনের। নবগ্যেরামে চাঁদা দিয়েটিয়ে ভাবছে-কি করি! আমার সাথে দেখা। বলে—দশ টাকা তু ধার এনে দে নোটন। বলে দোব, বড় বউ তোকে দেবে। তা কি করব? এনে দেলাম।

বড় বউ কাদম্বিনীর মুখে একটু হাসি ফুটিয়া উঠিল। হাসিয়াই সে বলিল, আর কাউকে এ কথা বলিস না নোটন, তোর টাকা আমি দোব।

বলিয়া সে বাড়ির ভিতর ঢুকিয়া গেল।

বাড়ির উঠানে ছোলা কলাই মেলিয়া দেওয়া রহিয়াছে। পাশে দুইটা ঝুড়িতে কতক তোলা হইয়াছে। বধূ দুইটি ছোলা তুলিতে তুলিতেই উঠিয়া গিয়াছিল, দেখিয়াই বোঝা যায়।

একটা ছাগল সেগুলো নির্বিবাদে খাইতেছে। দুইটি ছানা পিছনে দাঁড়াইয়া আছে, লাফাইতেছে।

ছোট বউ মানদা একটা দাওয়ায় দেওয়ালে ঠেস দিয়া ফুঁপাইয়া কাঁদিতেছে।

বড় বউ ঘরে ঢুকিয়াই ছাগলটাকে তাড়াইল—মর ম সব্বনাশী রাক্ষসী, বেরো, দূর হ।

ছাগলটা পলাইল।

বড় বউ ঝুড়ি টানিয়া লইয়া বলিল, তুই বসে বসে দেখলি মানু? তাড়ালি না?

–আমার ইচ্ছে।

–আমার খুশি।

–তোর খুশি?

–হ্যাঁ। খুশি। বলি, কেন তাড়াব? কি গরজ? এ সংসারে আমার কি আছে? কি হবে?

বড় বউ তুলিতে তুলিতে বলিল, এত রাগ করে না। দিনে-দুপুরে কঁদে না, কাঁদতে নাই। আর তার কারণও নাই। নোটনকে তুই জিজ্ঞাসা করে আয়, ঠাকুরপো চাঁপাডাঙা গিয়েছিল। তবে হ্যাঁ, এক দিনের বেশি থাকে নাই। সেখান থেকে এসে নবগ্যেরামে ডেরা নিয়েছে। আয়, ছোলা কটা তুলে নে।

–পারব না আমি।

–পারতে হবে। আয়।

–তুমি মহারানী হতে পার, আমি তোমার দাসী নই। সংসার চুলোয় যাক, আমার কি?

একটা ঝুড়ি ইতিমধ্যে পূর্ণ হইয়া গিয়াছিল। সেটাকে কাঁধে তুলিয়া ঘরে লইয়া যাইবার পথে মানদার কাছে থমকিয়া দাঁড়াইয়া মৃদু স্বরে বলিল, টাকা তিরিশটা চাঁপাডাঙায় তালুয়ের হাতে পৌচেছে মানু। ঠাকুরপো দিয়ে এসেছে। সংসার চুলোয় গেলে, সে আর কখনও পাঠানো চলবে না। যা কলাইগুলো তুলে নে। কেলেঙ্কারি বাড়াস নেয়।

সে ঘরের মধ্যে ঢুকিয়া গেল।

মানদা চমকিয়া উঠিল। ঘরের দিকে মুখ ফিরাইয়া বলিল, কি বললে? তুমি কি বললে?

ঘরের ভিতর হইতেই কাদু জবাব দিল, কিছু বলি নাই। বলছি, ছোলাগুলো তুলে ফেল্‌।

মানদা ঘরের দিকে আগাইয়া গেল–না, টাকা বলে কি বললে তুমি বল?

কাদম্বিনী বাহির হইয়া আসিয়া হাসিয়া বলিল, বলছি টাকা নয় রে–তারিখ, তারিখ–আজ মাসের ক তারিখ বলতে পারিস? বলিয়াই সে মুখে আঙুল দিয়া চুপ করিবার ইঙ্গিত দিয়া আঙুল দিয়াই দেখাইয়া দিল। নিজে জানালা দিয়া উঁকি দিল।

ঘরের মধ্যে সেতাব খাতাপত্ৰ লইয়া হিসাব করিতেছিল। বয়স বছর বত্রিশেক। শুকনা শরীর, বিরক্তি-ভরা মুখ। এক জোড়া গোঁফ আছে। সে ঘাড় উঁচু করিয়া কান পাতিয়া কথা শুনিতেছে। কথা বন্ধ হওয়ায় সে সন্তৰ্পণে উঠিয়া দাঁড়াইল এবং পা টিপিয়া আসিয়া জানালার পাশে আড়ি পাতিল। ওদিকে পাশের দরজা ঠেলিয়া বড় বউ ঢুকিয়া দাঁড়াইল এবং বলিল, ও কি হচ্ছে কি?

সেতাব চমকিয়া উঠিল এবং উত্তরে প্রশ্ন করিল, কি?

–তাই তো জিজ্ঞাসা করছি। ওখানে অমন করে আড়ি পাতার মত দাঁড়িয়ে কেন?

–আড়ি পাতব কেন?

–তবে করছ কি?

–কিছু না। সে ফিরিয়া আসিয়া তক্তপোশে বসিল। তারপর বলিল, ভত্তি দুপহরে তোমরা দুই জায়ে ঝগড়া লাগিয়েছ কেন বল তো? পয়লা বোশেখ… শুভদিন, বলি তোমরা ভেবেছ কি? বলি ভেবেছ কি?

কথা বলিতে বলিতেই তাহার কথার তাপ বাড়িতে লাগিল।

ও-দিকের ঢাকের বাজনা ক্রমশ স্পষ্ট হইয়া উঠিতে লাগিল।

বড় বউ কাদম্বিনী বলিল, ঝগড়া? কে ঝগড়া করছে? কার সঙ্গে? কোথায় দেখলে তুমি ঝগড়া? আমাদের দুই জায়ে একটু জোরে কথা বলছি। তার নাম ঝগড়া? অমনি তুমি আড়ি পেতে শুনতে গিয়েছ?

—শুনব না? ছোট বউমা বললে না—টাকা বলে কি বললে বল? তুমি ঢাকলেনা, টাকা নয়, তারিখ তারিখ বলে? আমি তোমার স্বামী, বল তো পায়ে হাত দিয়ে?

—হায় হায় হায়! খুট করে কোনো শব্দ উঠলে বেড়াল ভাবে ইদুর। চোর ভাবে পাহারাওয়ালা। আর টাকার কথা শুনলে তোমার টনক নড়ে। ওই শুনেই তুমি আড়ি পাততে গিয়েছ।

—যাব নাঃ টাকা কত কষ্টে হয়, কত দুঃখের ধন, জান? কই, সাত হাত মাটি খুঁড়ে টাকা তো টাকা—একটা পয়সা আন দেখি! আমি বহু কষ্টে গড়েছি সংসার। বাবার দেনা শোধ করেছি, দশ টাকা নাড়াচাড়া করছি। মা-লক্ষ্মীকে পেসন্ন করেছি। সেই টাকা আমার তছনছ করে দেবে। তোমরা? তার চেয়ে তার চেয়ে–

—তার চেয়ে টাকার মাপে তোমার চামড়া কেটে দিতে কম দুঃখ পাও তুমি, তা আমি জানি। কিন্তু নিশ্চিন্ত থাক, তোমার টাকা কেউ অপব্যয় করে নি।

—না, করে নি! আমি জানি না, বুঝি না কিছু? বেশ তো, টাকা টাকা করে কি বলছিলে, বল না শুনি?

–বলছিলাম মানুর বাপের অসুখ, ঠাকুরপো চাঁপাডাঙা দেখতে গেল—সঁচটা টাকাও তো দিতে হত পথ্যির খরচ বলে। তাই মানুকে বললাম, ভাসুর না দেক সোয়ামি না দেক তুই তো নিজে নাকছবি বেচেও দিতে পারতি? তোরই তো বাপ। তাই বেঁজে উঠল মানু।

–উঁহুঁ। গড়ে বললে কথা। মিথ্যে বললে। বল আমার পায়ে হাত দিয়ে।

–তুমি অতি অবিশ্বাসী, অতি কুটিল। ছি-ছি-ছি—

–আমি অবিশ্বাসী কুটিল?

–হ্যাঁ, শুধু তাই না। তুমি কৃপণ, তুমি অভদ্র।

–কাদু।

ছোট বউয়ের বাপের অসুখে দশ টাকা তত্ত্ব বলে দেওয়া উচিত ছিল না তোমার? ভিখিরিকে ভিক্ষে দিতে তোমার মন টনটন করে। ছি তোমার টাকা-পয়সাকে।

ঢাকের আওয়াজ খুব জোর হইয়া উঠিল।

বড় বউ ঘর হইতে বাহির হইয়া গেল।

সেতাব উঠিয়া দাঁড়াইয়া বলিল, এই মরেছে। ঢাক আবার বাড়িতে কেন রে বাবা? এই মরেছে।

সে দরজা খুলিয়া উঁকি মারিল।

দেখিল, দাওয়ায় বড় বউ ও ছোট বউ দাঁড়াইয়া আছে।

ওদিকে দরজা দিয়া উঠানে গাজনের সঙ প্রবেশ করিতেছে।

শিব সাজিয়া মহাতাপ নাচিতেছে। লম্বা-চওড়া বলিষ্ঠ শরীর।

শিব তাহাকে খুব ভাল মানাইয়াছে। দাড়ি-গোঁফ-জটায় তাহাকে চেনা যায় না।

সঙের দল গান গাহিতে গাহিতেই প্রবেশ করিল। তাহারা গাহিতেছে—গাহিতেছে পার্বতীর সখী, জয় বিজয়া।

শিবো হে, শিবো হে, অ শিবো শঙ্কর হে।
হাড়মালা খুলে ফুলোমালা পরো হে,
অ শিব শঙ্কর হে।
হায়—হায়—হায়—হায়—
ফুল যে শুকিয়ে যায়–
গলায় বিষের জ্বালায় শিবো জ্বরত্বর হে!
অ শিবো শঙ্কর হে।
শিব :- তা থৈ থৈ তা থৈ থৈ–বম্ বম্
হর হর—সব হর হে।– (নাচন)
জয় বিজয়া :-
হায় রে হায় রে–
মদন পুড়ে ছাই রে–
লাজে কাদে পার্বতী
ঝর ঝর হে–।
গাজনে নাচন শিবো সম্বর হে।
শিব শঙ্কর হে।

গান শেষ হইবামাত্র শিব-বেশী মহাতাপ ভিক্ষার থালাটা পাতিয়া ধরিল। ঘরের ভিতর হইতে সেতাব বাহির হইয়া আসিয়া বলিল, কি? বলি এসব আবার কি?

বড় বউ বলিল, থাম তুমি। দাঁড়াও, এনে দিই আমি।

–না, যত সব অনাছিষ্টি কাণ্ড! আমাদের গায়ে গাজন নাই, তা ভিন গা থেকে গাজনের সঙ! দিন দিন নতুন ফ্যাচ্যাং।

বড় বউ ফিরিয়া আসিয়া শিবের হাতের থালাটা টানিয়া লইয়া তাহাতে দুইটা টাকা দিয়া অন্যদের দিকে বাড়াইয়া ধরিল।

সেতাব বলিল, ও কি? দু টাকা? দু টাকা কি ছেলেখেলা নাকি?

—থাম বলছি। ও টাকা তোমার নয়। নাও গো, নিয়ে যাও তোমরা। বলিয়া শিব ছাড়া অন্য একজনের হাতে দিল। তারপর সঙ্গে সঙ্গেই শিবের হাতখানা চাপিয়া ধরিয়া বলিল, না। আর তোমার যাওয়া হবে না। ঢের নাচন হয়েছে। অনেক ভাঙ খাওয়া হয়েছে। চাঁপাডাঙা। যাই বলে পাঁচ দিন নিরুদ্দেশ। ছাই মেখে, ভস্ম মেখে, নেচে বেড়াচ্ছ! ছি-ছিছি! যাও, তোমরা যাও বলছি। ঢের সঙ হয়েছে। যাও। এই নাও তোমার জটা-দাড়ি-গোঁফ নাও।

দাড়ি-গোঁফ-জটা টানিয়া খুলিয়া দিল।

মহাতাপ বার-দুই চাপিয়া ধরিয়া অবশেষে কাতরভাবে অনুরোধ করিল, বড় বউ! বউদিদি! পায়ে পড়ি তোমার, পায়ে পড়ছি আমি।

মানদা দাঁড়াইয়া দেখিতেছিল। মহাতাপের স্বরূপ প্ৰকাশ হইতেই ঘোমটা টানিয়া বলিল, মরণ। বলিয়া ঘরে চলিয়া গেল।

—তাতে আমার পাপ হবে না। কিন্তু এমনি করে সঙ সেজে বেড়াতে তোমাকে আমি দেব না।

তারপর দলের লোকদের লক্ষ্য করিয়া বলিল, যাও না তোমরা। কথা বললে শোন না কেন? সঙ দেখাতে এসে সঙ দেখতে লাগলে যে! সংসারে সঙের অভাব? কারও বাড়িতে কি এমন সঙ হয় না? সকলের বাড়িতেই হয়—আমরা যাই দেখতে সে সঙ?

মহাতাপও এবার চেঁচাইয়া উঠিল, যাও যাও, সব বাহার যাও। নেহি যায়েগা; হাম নেহি যায়েগা। ভাগো। ভাগো।

সেতাব ওদিকে বারান্দায় আপন মনেই পায়চারি করিতেছিল এবং বলিতেছিল, হুঁ!! যত সব কেলেঙ্কারি! হু! মানসম্মান আর রইল না। হুঁ!

ধমক খাইয়া সঙের দল বাহিরে চলিয়া গেল।

রাস্তার উপর আসিয়া দলের মধ্যে বসা শুরু হইয়া গেল। নন্দী নিজের জটা খুলিয়া ফেলিয়া ক্ৰোধভরে বলিয়া উঠিল, তখুনি বলেছিলাম—পাগলাকে দলে নিও না! তখন সব বললে—দশ টাকা চাঁদা দেবে। চেহারা ভাল, গানের গলা ভাল। এখন হল তোর।

বিজয়া খিলখিল করিয়া হাসিয়া বলিল, অঃ, বেচার এবার শিব সাজতে না পেয়ে রাগ খুব!

–খবরদার বলছি, চ্যাংড়া ছেড়া। একটি চড়ে তোমার বদনখানি বেঁকিয়ে দেব।

—চুপ চুপ, ঝগড়া কোরো না! চল, বাড়ি চল সব। রাস্তাতে বেচাকে শিব সাজিয়ে নেব চল। উ যে এমন করবে তা কে জানে!কথাটা বলিল—জামাকাপড়ে আধুনিক ম্যাট্রিক-ফেল চাষীর ছেলে ঘোঁতন ঘোষ।

—তা–কে জানে–! কেন, মহাতাপের মাথা খারাপ সেই ছেলেবেলা থেকে, কেউ জান না, নাকি?

বিজয়া সাজিয়াছিল যে ছেলেটা, সেটা দেখিতে কুৎসিত, খুব ঢাঙা, রঙ কালো। সে আবার আসিয়া বলিল, বেচা শিব সাজলে আমি দুগ্‌গা হব। রমনা হবে বিজয়া। মুখে কাপড় দিয়া সে হাসিতে লাগিল।

হঠাৎ উচ্চ কাঁচ শব্দ করিয়া মণ্ডলবাড়ির বাহিরের দরজা খুলিয়া গেল। গলা ঝাড়িয়া সেতাব বাহির হইয়া আসিল।

জনতা স্তব্ধ হইয়া গেল। এ উহার মুখের দিকে চাহিল। দলপতি ঘোঁতনই ভ্রূ কুঁচকাইয়া বলিল, চল চল। বলিয়া সে সর্বাগ্রে হনহন করিয়া চলিতে শুরু করিল।

তাহার পিছনে পিছনে সকলে। সেতাব ডাকিল, এই ঘোঁতন, এই! এই! এই! দলের একজন বলিল, ঘোঁতনদা ডাকছে যে বড় মোড়ল!

—ডাকুক। মরুক চেঁচিয়ে গলা ফাটিয়ে। বেটা আমার কাছে ধান পাবে। চলে আয়। সে। হনহন করিয়া চলিতে লাগিল।

সেতাব রাস্তায় নামিল।

ঘোঁতন তাহার কথা শুনিল না দেখিয়া রাগিয়া গেল এবং চিৎকার করিয়া বলিল, নালিশ করব আমি।

ঘোঁতন এবার ফিরিয়া দাঁড়াইয়া বলিল, কর। মহাতাপ পাওনা ধান ছেড়ে দেবে আমাকে কড়ার করায় তবে ওকে আমি শিবের পাট দিয়েছি। লোকে সাক্ষি দেবে। বোঁচা বল্ না রে!

সেতাব চমকিয়া উঠিল।

ক্রুদ্ধ দৃষ্টিতে কয়েক মুহূর্ত চাহিয়া থাকিয়া হনহন করিয়া ঘরের দিকে চলিয়া গেল।

বাড়ির মধ্যে ঢুকিয়া দেখিল—উঠানে একটা জলচৌকির উপর মহাতাপ বসিয়া আছে এবং কৃষাণ নোটন উঠানের কোণের পাতকুয়া হইতে জল উঠাইতেছে, রাখালটা মাথায় ঢালিতেছে। মহাতাপ খুব আরাম করিয়া স্নান করিতেছে; মধ্যে মধ্যে মুখে জল লইয়া ফু-ফু করিয়া উপরে আশপাশে ঘুড়িতেছে। বড় বউ দাওয়ায় দাঁড়াইয়া আছে। তাহার হাতে গামছা। পাশে দড়ির আলনায় কাপড়। বড় বউয়ের কোলে মহাতাপের পাঁচ বছরের হৃষ্টপুষ্ট ছেলে মানিক।

বাপের জল-কুলকুচার রকম দেখিয়া সে খুব হাসিতেছে।

সে বলিল, বাবা কি করছে? ব-মা?

কাদু বলিল নোটন ও রাখালকেওই হয়েছে, ঢের হয়েছে। আর থাক।

মহাতাপ বলিল, উঁহুঁ। হয় নাই, এখনও হয় নাই। ঢাল্‌, নোট্‌না ঢাল্‌।

বলিয়াই জল ছুঁড়িল—ফু!

মানিক বলিল, বাবা কি করছ?

–গঙ্গা ঝরতা হ্যায় রে বেটা। শিবকে শির পর গঙ্গা ঝরতা হ্যায়। গান ধরিয়া দিল—

ঝর ঝর ঝর ঝর গঙ্গা ঝরে
শিরোপরে গঙ্গাধরের রে!
ঝর ঝর ঝর ঝরফুঃ!

আমি শিব রে বেটা, হম শিব হ্যায়।

–শিব হ্যায়?

–হ্যাঁ, তু বেটা গণেশ। মাথায় হাতির মুণ্ড বসিয়ে দেব।

সেতাব দাঁড়াইয়া খানিকটা দেখিল, তারপর, হুঁ। ছিছিছি! ছিঃ-ছিঃ! বলিয়া উঠান পার হইয়া চলিয়া গেল এবং দাওয়ায় গিয়া উঠিল। ঘরে ঢুকিবার সময় দাঁড়াইয়া বলিল, ঘরের লক্ষ্মীর চুলের মুঠো ধরে বনবাসে দেওয়ার পথ ধরেছিস তুই মহাতাপ। ছিঃ!

এবার মহাতাপ বিদ্যুৎস্পৃষ্টের মত উঠিয়া দাঁড়াইল!—কেয়া?

বড় বউ কাদম্বিনী শঙ্কিত কণ্ঠে ডাকিল, মহাতাপ।

মহাতাপ আগাইয়া আসিয়া বলিল, নেহি নেহি নেহি। চামদড়ি কিপটে কেয়া বোলতা হ্যায়—জানতে চাই আমি। ঝুট বাত হাম নেহি শুনেগা।

বড় বউ এবার মহাতাপের ছেলেকে নামাইয়া দিয়া আগাইয়া আসিয়া তাহার হাত ধরিলছি, বড় ভাই গুরুজন, তাকে এমনি কথা বলে! কতদিন বারণ করেছি না?

মহাতাপ বলিল, ও মিছে কথা কেন বলবে? আমি তোমার চুলের মুঠো ধরে বনবাসে দোব-আমি!

সকলে অবাক হইয়া গেল।

সেতাব বলিল, তোর মাথা খারাপ, বুদ্ধি কম—শেষে তুই কালাও হলি নাকি? বলছি ঘরের লক্ষ্মীর কথা। বড় বউয়ের কথা কখন বললাম?

–কখন বললাম! বড় বউই তো ঘরের লক্ষ্মী।

বড় বউ হাসিয়া ফেলিল—মরণ আমার। নাও, খুব হয়েছে। চল, এখন মাথা মুছে কাপড় ছেড়ে খাবে চল। এস।

—যাবে, তার আগে একটু দাঁড়াও। মহাতাপ টাকা পেলে কোথায়? দশ টাকা চাঁদা দিয়েছে। গাজনের দলে সঙ সাজবার জন্যে তুমি দিয়েছ?

—নেহি। ছোট বউ, ছোট বউ দিয়েছে।

বড় বউ মুখের কথাটা কাড়িয়া লইয়া বলিল, হ্যাঁ হ্যাঁ। আমি ছোট বউকে দিয়েছিলাম তালুইয়ের অসুখে তত্ত্ব করবার জন্যে। মহাপুরুষ তাই দাতব্য করেছেন গাজনের দলে। হ্যাঁ, সে টাকা আমি দিয়েছি। তোমার সংসারে একটা দানা কি এক টুকরো তামা আমার কাছে বিষের মত; তোমার সংসারে দরকার ছাড়া যে আমি কিছুই ছুঁই না, সে তুমি জান। আমার মায়ের গহনা পেয়েছি, সেই বিক্রির টাকা থেকে দিয়েছি আমি। ও নিয়ে তুমি এমন করে ফেঁসর্ফোস কোরো না গোখরো সাপের মত। এস ঠাকুরপো।

মহাতাপের হাত ধরিয়া টানিয়া লইয়া সে ঘরে ঢুকিল। ঢুকিবার সময় শুকনো কাপড়টা তাহার কাঁধে ফেলিয়া দিল।

ঘরের মধ্যে কানা-উঁচু থালায় প্রচুর পরিমাণে ভাত, একটা বড় বাটিতে জলের রঙের আমানি অর্থাৎ পান্তা ভাত-ভিজানো জল, একটা বাটিতে ডাল, পোস্ত-বাটা অনেকটা, গেলাসে জল। মোটা ভারী বেশ বড়সড় একখানা কাঠের পিঁড়ি পাতা। পাশে মানদা শিল-নোড়া লইয়া কুড়তি কলাই বাটিতে বসিয়াছে। ঘস-ঘস শব্দে দুলিয়া দুলিয়া বাটিয়া চলিয়াছে।

মহাতাপকে আনিয়া বড় বউ পিড়ির উপর দাঁড় করাইয়া দিল। নাও, বস। মহাতাপ বসিয়া দেখিতে লাগিল, কি কি আছে?

বড় বউ বলিল, যা ভালবাস তাই আছে। খাও। পান্তা ভাত, আমানি, পোস্ত-বাটা, কলাইয়ের দাল, অম্বল—সব আছে। আর ওই কুড়তি কলাই তোমার সরস্বতী ঠাকরুন বাটছে।

–কি? সরস্বতী ঠাকরুন কুড়ৎ কলাই বাটছে? ওই বাটকুল-সরস্বতী ঠাকরুন?

–আমি লক্ষ্মী হলে, মানু সরস্বতী বৈকি? আমার ছোট বোন তো!

–আচ্ছা! ঘাড় নাড়িতে লাগিল মহাতাপ সমঝদারের মত।

–ঘাড় নাড়তে হবে না। খাও।

খাওয়ার ওপর ঝুঁকিয়া পড়িল মহাতাপ।

ওদিকে সেতাব দাওয়ার উপর এক হাতে হুঁকা ও অন্য হাতে কন্ধে ধরিয়া ফুঁ দিতেছিল। সে উঠানের দিকে পিছন ফিরিয়া ঘরের দেওয়ালের দিকে মুখ ফিরাইয়া বসিয়া ছিল। মধ্যে মধ্যে বিরক্তিভরে বলিতেছিল, হুঁ। লক্ষ্মী! সাক্ষাৎ অলক্ষ্মী। ঘরের লক্ষ্মী তাড়িয়ে দেবে। হঁ। দশ টাকা। দশ টাকা সামান্য কথা!।—বলিয়া কায় কল্কে বসাইয়া টানিতে টানিতে উঠিয়া ঘুরিয়া দাঁড়াইল। এবার সে দেখিতে পাইল, উঠানে বাপের চৌকিতে বসিয়া মানিক গায়ে মুখে কাদা মাখিয়াছে এবং মুখে জল লইয়া ফুঁ ফু করিতেছে।

সেতাব হাঁ-হাঁ করিয়া উঠিল—এই, এই কি বিপদ। ও কি হচ্ছে, জঁ। সে উঠানে নামিয়া মানিকের দিকে অগ্রসর হইল।

মানিক বলিল, ছিব হব, ছিব। ফু। বলিয়া জল ছিটাইয়া দিল।

–ছিছিছি। অ বড় বউ। শুনছ। মাকে কি করছে দেখ।

ছোট বউ বাহির হইয়া আসিল এবং মানিকের অবস্থা দেখিয়া ছুটিয়া গিয়া তাহাকে কোলে তুলিয়া লইয়া আধ-ঘোমটায় চাপা গলায় ক্রোধভরেই বলিল, দুষ্ট ছেলে কোথাকার!

–ছিব, ছিব–আমি ছিব!

—ছিব? তা হবে বৈকি? তা না হলে আমার কপালের চিতের আগুন নিভে যাবে যে! শিব হবি? শিব হবি? ছেলের পিঠে সে চাপড় বসাইয়া দিল। মানিক কাঁদিয়া উঠিল।

সেতাব ক্রুদ্ধ হইয়া বলিল, ছোট বউমা! মেরো না বলছি।

মানদা আরও একটা কিল বসাইয়া দিল।-হারামজাদা বজ্জাত–

সেতাব আবার বলিল, ছোট বউমা! তুমি গৰ্ভে ধরেছ বলে মানিক তোমার একলার নয়। বড় বউ, বলি অ বড় বউ।

বড় বউ বাহির হইয়া আসিল।–মানু!

মানু উষ্মভরেই বলিল, কি?

–ভাসুর বারণ করছে, তবু তুই মারছিল!

–মারব না? দেখ না কি করেছে? আমার কাপড়টা কি হল দেখ!

–কাপড় তো ছাড়লেই হবে! দে, আমায় দে।

–না। আলুনো আদর দিয়ে একজনের মাথা খেয়েছ। আর না।—বলিয়া ছেলেকে কোলে করিয়া লইয়া ঘরে চলিয়া গেল।

—কি? কি বললি ছুটকী?

সেতাব পায়চারি করিতে করিতে হুঁকা টানিতেছিল। উল্টা মুখ হইতে ঘুরিয়া এবার সে বলিল, ছোট বউমা মিছে কথা বলে নাই বড় বউ। মহাতাপের মাথা তুমিই খেয়েছ। ছোট বউমা ঠিক বলেছে।

বড় বউ জবাব দিবার আগেই মহাতাপ ডালভাত-মাখা এঁটো-হাত চাটিতে চাটিতে বাহিরে আসিয়া বলিল, সরস্বতী! ওই বাটকুল, কুঁদুলে সরস্বতী—ও দুষ্টু সরস্বতী হ্যায়!

বড় বউ বলিল, সব খেয়েছ? না, না খেয়ে ঝগড়া করতে উঠে এলে কুঁদুলে ঠাকুর?

–চাট পোট! চাঁট পোট করকে খা লিয়া।

–তা হলে হাত ধোও, ধুয়ে শুয়ে পড় গে। দেখি আমি। মানু-অ মানু! বলিয়া আবার ঘরে ঢুকিল। মহাতাপ জলের ঘটি তুলিয়া লইয়া হাত ধুইতে লাগিল।

সেতাব বলিল, গাজনে দশ টাকা চাঁদাই শুধু দিস নি, ঘোঁতনা ঘোষকে ধান পাওনা ছেড়ে দিয়েছিস?

মহাতাপ তাহার মুখের দিকে চাহিল—হাঁ হাঁ-কাগজে লিখে দিয়েছি। ধান সব ছাড়িয়া দিলাম—শ্ৰীমহাতাপ মণ্ডল। দিয়েছি। ঘোঁতনার বাড়ি গেলাম, ওর মা কাঁদতে লাগল। বললে–বাবা, ঘোঁতনা তো জামা-জুতো পরে ঘুরে বেড়ায়, যাত্রা করে, চাষ করে না। ভাগীদার চাষ করে যা দেয় তাতে খেতে কুলোয় না। দেনা শোধ কি করে দেব? ঘোঁতনার বাচ্চাগুলোর টিকটিকির মত দশা। তাই ছোড় দিয়া। হ্ৰা, ছোড় দিয়া। লিখ দিয়া হ্যায়। একদম কাগজমে ঘস-ঘস করকে লিখ দিয়া হ্যায়।

—লিখে দিয়েছিস?

–হ্যাঁ। একদম লিখ দিয়া হ্যায়।

–তারপর? নিজেদের কি হবে?

মানিককে কোলে মানদা বাহির হইয়া আসিল। সে বলিল, ওই ঘোঁতনার ছেলের মত টিকটিকির দশা হবে। বলিয়া বড় বউ যে ঘরে ঢুকিয়াছিল সেই ঘরে ঢুকিয়া গেল।

মহাতাপ জ্বলিয়া উঠিল।দেব তোর পিঠে কিল ধম্‌ধম লাগিয়ে। আরে! আমার ছেলে টিকটিকির মত হবে? মহাতাপ নিজে হাতে চাষ করে। ভীম হ্যায়। মহাতাপ ভীম হ্যায়। ঘোঁতনাকে যে ধান ছেড়ে দিয়েছি, সে ধান আমি এবার বাড়তি ফিরিয়ে দেব। দম্ভভরে সে নিজের বুকে কয়েকটা চাপড় মারিল।

আবার বড় বউ বাহির হইয়া আসিল। তাই হবে, তাই ফলাবে। যাও, এখন শোও গে। চার রাত্তির বোধহয় ঘুম হয় নাই। যাও। যাও। ঠাকুরপো! যাও বলছি।

—যাচ্ছি। আমি যাচ্ছি।

মহাতাপ ঘরের মধ্যে ঢুকিতে উদ্যত হইল।

সেতাব বলিল, লক্ষ্মী আর এ বাড়িতে থাকবে না। মোড়লবাড়ির লক্ষ্মীকে ঘাড় ধরে বের করলে সবাই মিলে। সেকালের কথা এরই মধ্যে ভুলে গেলি সবাই? হায় রে হায়! হায় রে হায়!

হুঁকা ও কল্কে নামাইয়া রাখিয়া সেতাব চলিয়া গেল। বলিতে বলিতেই গেলহায় রে হায়! হায় রে হায়!

মহাতাপ হুঁকা-কটো তুলিয়া লইয়া দাদাকে ভ্যাঙচাইয়া দিল-হায় রে হায়! হায় রে হায়! ওই এক আচ্ছা বুলি শিখেছে।
দ্বিতীয় পরিচ্ছেদ

মহাতাপ কথাটা মিথ্যা বলে নাই; ওই হায় রে হায় কথাটা সেতাবের মুখে লাগিয়াই আছে। উঠিতে বসিতে সে বলে—সেদিনের কথা এর মধ্যে ভুলে গেলি সব! হায় রে হায়! হায় রে হয়। অর্থাৎ কথাটা সকলেই ভুলিয়াছে কেবল সেতাব ভুলিয়া যায় নাই। কথাটার মধ্যে সেতাবের জীবনের পরম অহঙ্কার নিহিত আছে। বেশি দিনের কথা নয়, সেতাবের বাপ প্রতাপ মণ্ডল হঠাৎ মারা গেল, সেতাবের বয়স তখন বার, মহাতাপের বয়স ছয়। মাঝের একটি ভাই তাহাদের নাই। প্ৰতাপের মৃত্যুর মাস কয়েক না যাইতেই মহাজন পর পর তিনটা নালিশ করিয়া প্রতাপের সম্পত্তি ক্রোক করিয়া বসিল।

প্ৰতাপ মণ্ডল হককের মানুষ ছিল। নামেও প্রতাপ কাজেও প্রতাপ ছিল। গ্রামের মাতব্বর, জমিদারের মণ্ডল, ইউনিয়ন বোর্ডের মেম্বার অনেক কিছু ছিল। গ্রামের কাছেই আধাশহর লক্ষ্মীপুরের ব্যবসায়ী মহাজন বাবুলোকদের কাছেও খাতির ছিল। মনটা ছিল উদার, মানুষটা ছিল দুর্দান্ত। বাড়িতে চাষের ধুম ছিল। লক্ষ্মীপুরের বাবুরাও অনটনের বর্ষায় তার কাছে ধান বাড়ি অর্থাৎ ধার লইত। হঠাৎ প্ৰতাপ মণ্ডল ব্যবসায়ে নামিয়া বসিল। নামিল নামিল এমন ব্যবসায়ে। নামিল যাহার সঙ্গে তাহার কোনো পরিচয় নাই। ইউনিয়ন বোর্ডের সেক্রেটারি জগাই পাঠককে শূন্য বরাদার করিয়া ঠিকাদারির কাজে নামিয়া পড়িল।

সালটা তখন ১৯২৬-২৭ সাল। সবে দেশে ইউনিয়ন বোর্ড হইয়াছে। প্রতাপ মণ্ডলের বোর্ডে হঠাৎ বছরের শেষাশেষি খবর আসিল—সরকার পানীয় জল সরবরাহের জন্য ইন্দারা করিতে টাকা দিবেন; শর্ত ইউনিয়ন বোর্ডকে এক-চতুর্থাংশ টাকা দিতে হইবে। এক-একটা ইন্দারার প্রায় পাঁচশো করিয়া টাকা খরচ, অর্থাৎ ইউনিয়ন বোর্ডকে একশো পঁচিশ আন্দাজ দিতে হইবে। প্রতাপ নিজের গ্রামে ইন্দারার জন্য চাঁদা তুলিতে চেষ্টা করিল কিন্তু পায়ে অনেক ধুলা মাখিয়া হাঁটাহাটি করিয়া পঁচিশ টাকা কয়েক আনার বেশি চাঁদা তুলিতে পারি না। এই সময় জগাই পাঠক তাহাকে পরামর্শ দিল—মোড়ল এক কাজ কর। ইন্দারাটা তুমি ঠিকে নিয়ে নাও। ঠিকাদারির একটা লাভ আছে তো, সেই লাভে ও টাকা উঠে যাবে! আমি দেখেশুনে সব ঠিক করে দেব।

ভয়ে ভয়েই প্রতাপ কাজে নামিল। কিন্তু ইন্দারাটা শেষ হইতেই ভয় কাটিয়া উৎসাহে মাতিয়া উঠিল। ঠিকা অর্থাৎ কনট্রাক্ট হইতে যাহা লাভ হইয়াছে তাহা দেয় সিকি টাকার বেশ কিছু উপরে উঠিয়া গিয়াছে। লোকাল কন্ট্রিবিউশান অর্থাৎ স্থানীয় চাঁদার দাবি ছিল সিকি অর্থাৎ শতকরা পঁচিশ, সেই স্থানে লাভ দাঁড়াইল শতকরা পঁয়ত্রিশ টাকা। বিল আদায় করিয়া নগদ পঞ্চাশ টাকা প্রতাপের হাতে তুলিয়া দিয়া সেক্রেটারি পাঠক বলিল দশ টাকা পুজো দিয়ে মোড়ল, পনের টাকা আমার, পঁচিশ টাকা তোমার।

প্রতাপের চোখ দুটো জ্বলিয়া উঠিল।

পাঠক বলিল, ইন্দারার কাজে তবু লাভ কম। রাস্তার ঠিকে কি সাঁকোর ঠিকে যদি হত না—তবে দেখতে অর্ধেক খরচ আর অর্ধেক লাভ। টাকায় টাকা। করবে ঠিকের কাজ? ইউনিয়ন। বোর্ডের নয়, ডিস্ট্রিক্ট বোর্ডের ঠিকে নেবে?

প্রতাপ কথা বলতে পারিল না, সেক্রেটারি পাঠকের মুখের দিকে চাহিয়া রহিল। পাঠক চতুর লোক, তাহার উপমা দিয়া লোকে বলে—মৃগেল মাছ। পাক কাটিয়া চলে আবার সমানে ভাসিয়া সাঁতারও কাটে। প্রতাপের দৃষ্টির অর্থ তাহার বুঝিতে দেরি হইল না। পুকুরের জলের মধ্যে ভাসমান টোপের সম্মুখে মাছ স্থির হইয়া পাঁড়াইয়াছে। হাসিয়া পাঠক বলিলরাস্তার কাজ পাথর কুড়িয়ে জমা করা আর কাকর কেটে তোলা, তারপর গরুর গাড়িতে বয়ে ফেলা। আলমপুরের বাবুদের জমিদারিটাই রাস্তার কাজের পয়সায়। কাঁচা পয়সা হে! তারপর দশ টাকা ওভারসিয়ারের পকেটে খুঁজে দিলে মাপ বাড়িয়ে বিশ টাকা পাইয়ে দেবে তোমাকে। লেগে যাও। আমি বরং সব দেখেশুনে দেব তোমার। আমাকে দিয়ে কিছু। শূন্য বরাদার করে নিয়ো।

কথাগুলার একটাও মিথ্যা বলে নাই পাঠক। আলমপুরের বিখ্যাত জমিদারবাড়ির অভ্যুদয় এই রাস্তার কাজে কন্ট্রাক্টারি হইতেই। প্রায় একশো বছর আগে দুইটা জেলায় বড় বড় রাস্তাগুলো তৈয়ারি ও মেরামতের কাজ ছিল তাহাদের একচেটিয়া। এই ঠিকাদারির লাভ হইতেই আলমপুরের চৌধুরীরা তিরিশ হাজার টাকা আয়ের জমিদারি কিনিয়া পেশা চাষের পরিবর্তে দলিলদস্তাবেজে পেশা জমিদারি লিখিতে শুরু করিয়াছিলেন। আর ওভারসিয়ারের পকেটে খামে পুরিয়া টাকা দেওয়ার গল্প না জানে কে? বাইসিক্ল চড়িয়া হেটকোট পরিয়া সে-ওভারসিয়ার বাবুদের সে দেখিয়াছে। ইউনিয়ন বোর্ডের মেম্বার হইয়া তাহাদের সঙ্গে আলাপ-পরিচয় হইয়াছে। সুতরাং–

সুতরাং সে নামিয়া পড়িল। এবং নামিয়াই সে ঊর্ধ্বশ্বাসে ছুটিতে শুরু করিল। প্রথম বছরে লাভ হইল এক হাজার টাকার কিছু বেশি। প্রতাপ মূলধন লইয়াছিল তিন হাজারের কিছু কম। তিন হাজারে এক হাজার লাভ। দ্বিতীয় বৎসরে মূলধন বাড়াইয়া সে আট হাজার তুলিল; একটা ঘোড়া কিনিল, খান তিনেক সেকেন্ড হ্যান্ড বাইসিক্ল কিনিল এবং পাঠকের এক শালা ও এক ভাইপোকে কাজ দেখিবার জন্য মাসিক তিরিশ টাকা বেতনে কর্মচারী নিযুক্ত করিল। চার-পাঁচ জন সাঁওতাল সর্দার অর্থাৎ গ্যাঙ সর্দার, তিন জন গরুর গাড়ির সর্দার, এক জন রাজ মজুরদের। সর্দার নিযুক্ত করিয়া শোরগোল করিয়া কাজ জুড়িয়া দিল। নিজে ঘোড়ায় চড়িয়া ঘুরিতে লাগিল। পাঠক ঘুরিত একখানা নতুন বাইসিক্লে। প্রথম বছর তিনেক নিজের বাড়িতে ছিল সকল কাজের কর্মকেন্দ্র, বাইরের চাষের ঘরটাতেই চুন, সিমেন্ট, গাঁইতি, কোদাল, খাপত্র থাকিত; চতুর্থ বৎসরে নবগ্রামে ঘরভাড়া করিয়া আপিস বসাইয়া দিল। খাতায় পত্রে বাহিরের কাজ চলিতে লাগিল। পাঠক সদর শহরে ডিস্ট্রিক্ট বোর্ড আপিসে বিল হিসাব ইত্যাদি লইয়া মাসে পনের দিনের বেশি থাকিতে হয় বলিয়া সেখানে একটা ঘরভাড়া লইল।

প্রতাপ মোড়ল মোড়ল উপাধি ছাড়িয়া ঘোষ উপাধি কায়েম করিল। গ্রামের জ্ঞাতিকুটুম্বদের সঙ্গে ঝগড়া না করিয়াও পর হইয়া পাঁড়াইল। পোশাকে পরিচ্ছদে কথায় বার্তায় সে হইয়া গেল আর এক মানুষ। দলিলদস্তাবেজে সে পেশা চাষের বদলে পেশা ব্যবসায় লিখিতে আরম্ভ করিল। বাড়িতে প্রতাপের স্ত্রী শঙ্কিত হইল। প্রতাপ তাহাকে প্রায়ই বলিত, একটু সভ্য হও। চাষীর পরিবার যখন ছিলে তখন যা করেছ যা পরেছ যা বলেছ সেজেছে। এখন ভদ্রলোকের চালচলন শিখতে হবে। ও গোবর দেওয়া, কাপড় সেদ্ধ করা এসব ছাড়! মধ্যে মধ্যে বলিত, এখানকার ঘরবাড়ি যা আছে থাক, নবগ্রামে গিয়ে নতুন বাড়ি করব। অন্যদিকে ইউনিয়ন বোর্ডের সভ্যপদের উপর বক্রব্যঙ্গদৃষ্টি হানিয়া ডিস্ট্রিক্ট বোর্ডের সভ্য হইবার আয়োজন করিল। এমন সময় হঠাৎ একদা সে কোথা হইতে টাইফয়েড ধরাইয়া আনিয়া বিছানায় শুইল। এবং চব্বিশ দিনের দিন মারা গেল। প্রতাপের স্ত্রী জগাই পাঠককে ডাকিয়া বলিল পাঠক মশাই, কি হবে?

পাঠক বলিল—তাই তো? আমি তো মাথায় হাত দিয়ে বসে গিয়েছি বাপু। হাজার দুয়েক টাকা না হলে তো সব অচল।

প্রতাপের স্ত্রী চমকিয়া উঠিল।

পাঠক যাহা বলিল তাহা এই। একটা বড় সাঁকোর ঠিকা ছিল, সাঁকোও হইয়াছে কিন্তু সেটা ফাটিয়া গিয়াছে। রাস্তার ঠিকায় কাকর পাথর যাহা মজুত করা হইয়াছে নতুন ওভারসিয়ার তাহার মাপ ঠিক দেয় নাই। প্রায় ছয় আনা পরিমাণ কাটিয়া দিয়াছে। বিল সমস্ত আটক পড়িয়াছে। এদিকে গাড়োয়ান, কুলি, রাজমিস্ত্রিদের তিন সপ্তাহের মজুরি বাকি। তহবিল শূন্য।–এখন অন্তত হাজার টাকা চাই। এ সময় বিপদের সময়। টাকার কথা মুখে আসে না। কিন্তু না বললেও নয়। গাড়োয়ান কুলি রাজমিস্ত্রিদের কথা শুনে আমার হাত পা পেটের ভেতর সেঁদিয়ে গিয়েছে। তারা বলাবলি করছে আমাকে ধরে মারবে আর—হুঁ।

বার দুই ঢোক গিলিয়া বলিল—আর বলছে দল বেঁধে এসে বাড়িতে তোমাদের চেপে বসবে। না খেয়ে তো তারা খাটতে পারবে না।

প্রতাপ জ্ঞাতি-কুটুম্ব ছাড়িয়াছিল, গ্রামের লোকও সরিয়া দাঁড়াইয়াছিল, প্রতাপের মৃত্যুর পর তাহারা প্রকাশ্যে শত্রুতা না করিলেও সাহায্য করিতে এক পা আগাইয়া আসিল না। নিজেদের বাড়ির দাওয়ায় বসিয়া অধিকাংশ লোকই বলিল—এ হবে তা তো জানা কথা।

*****

সেসব দিনের কথা সেতাবের মনে আছে। বাপ প্রতাপ মণ্ডলের ঠিকাদারির জমজমাট আমলে সেও বাপের মত নিজেকে এ গ্রামের সকল ছেলে হইতে পৃথক বলিয়া ভাবিতে শুরু করিয়াছিল। আর মহাতাপ একেবারে প্রায় আদুরে গোপাল বনিয়া গিয়াছিল। ছেলেবেলা হইতেই মহাতাপ সরল চঞ্চল। বাপের অবস্থার আকস্মিক উন্নতিতে সে আদর পাইয়া হইয়া উঠিয়াছিল দুর্দান্ত।

সবই মনে আছে সেতাবের।

ইউনিয়ন বোর্ডের সেক্রেটারি পাঠক সেদিন যে বলিয়া গেল গাড়িওয়ালারা ও মজুরেরা দল বাঁধিয়া পাওনার জন্য আসিবে এবং গোলা ভাঙিয়া ধান বিক্রি করিয়া টাকা উসুল করিয়া লইবে সে কথা সে মিথ্যা বলে নাই। একদিন সত্যই তাহারা আসিল। সঙ্গে আসিল প্রতাপের জ্ঞাতিভাই ধানের পাইকার গোপাল ঘোষ; ওই ঘোঁতন ঘোষের বাপ। সেতাব মহাতাপের মা তখন বউ মানুষ, বয়সও অল্প, তিরিশও হয় নাই; সেদিন সে ঘোমটা খুলিয়া গিয়া দাঁড়াইল মোটা মোড়লের বাড়িতে। মোটা মোড়ল ধর্মভীরু মানুষ এবং ভাল মানুষ। প্রতাপের সঙ্গে ইদানীং তাহার কথাবার্তা বড় একটা ছিল না। মোটা মোড়ল গ্রাম সম্পর্কে দাদা বলিয়া কয়েকবার প্রতাপকে সৎপরামর্শ দিতে চাহিয়াছিল, কিন্তু প্রতাপ সে কথার উত্তরে বলিয়াছিল—আমার উন্নতিতে বুক সবার টাটিয়ে গেল তা আমি জানি। পরামর্শ আমি কারুর চাই না। মোটা মোড়ল এ উত্তরে আঘাত পাইয়াছিল। সেদিন হরিকে স্মরণ করিয়া প্রতাপের নিকট হইতে চলিয়া গিয়াছিল এবং সেই হইতে এদিক আর বড় মাড়ায় নাই। পথে প্রতাপের সঙ্গে দেখা হইলে পাশ কাটাইয়া সরিয়া যাইত। কিন্তু প্রতাপের বিধবা বধূ সেদিন গিয়া দাঁড়াইবা মাত্র সে বলিল—সে কি! চল মা চল! দেখি।

সে আসিয়া খাতা দেখিয়া ধান বিক্রি করিয়া সকলের পাওনা শোধ করিয়া দিল। পাঠককে বলিল—হিসাবের খাতাটা যে একবার বার করতে হবে পাঠক মশাই!

পাঠক আকাশ হইতে পড়িলখাতা তো মোড়লের বাড়িতে। খাতাপত্র তো আমি জানি না। মোটা মোড়ল অনেক চেষ্টা করিয়াও পাঠককে কায়দা করিতে পারিল না। গোটা গ্রামের লোক প্রতাপের ছেলেদের বিরুদ্ধেই একরকম দাঁড়াইয়াছিল। মোটা মোড়ল একা কোনো রকমেই তাহাদের বুঝাইতে পারিল না। দোষী প্রতাপ মরিয়া গিয়াছে, তাহার ছেলেরা নির্দোষ নিরপরাধ একথা তাহারা কোনো রকমেই বুঝিল না। ওদিকে হঠাৎ মহাজন নালিশ করিয়া বসিল–সে টাকা পাইবে। তিন হাজার টাকা।

তিন হাজার টাকা? প্রতাপ মোড়ল টাকা ধার করিয়াছে?

পাঠক বলিল–করিয়াছে। হ্যান্ডনেটের বয়ান সে লিখিয়াছে এবং প্রতাপ সই করিয়াছে। ব্যবসায়ের জন্য টাকার প্রয়োজন হইয়াছিল। সকল ব্যবসায়ীকেই ধার করিতে হয়। ব্রাহ্মণ সন্তান হইয়া মিথ্যা বলতে পাঠক পারিবে না। আসল কথা কিন্তু অন্য। দরখাস্ত ইত্যাদির জন্য প্রতাপ কিছু সাদা কাগজে সই করিয়া পাঠককে দিয়াছিল। পাঠক মহাজনের সঙ্গে ষড়যন্ত্ৰ করিয়া সেই কাগজে হ্যান্ডনেট বানাইয়াছে।

এদিকে ছোট ছেলে মহাতাপ পড়িল জ্বরে। জ্বর দাঁড়াইল টাইফয়েডে। প্রতাপের টাইফয়েডের বিষ তাহাকে পাড়িয়া ফেলিল। যমে মানুষে টানাটানি করিয়া মহাতাপ বাঁচিল কিন্তু কেমন বোকা বুদ্ধিহীন হইয়া গেল। প্রথম প্রথম কথার জড়তা হইয়াছিল। কথা বলিলে বুঝিতে পারি না, ফ্যালফাল করিয়া মানুষের মুখের দিকে তাকাইয়া থাকিত।

সেতাবের মনে পড়ে সেতাবও সারা পৃথিবীর দিকে ফ্যালফ্যাল করিয়া তাকাইয়া থাকিত। সে নেহাত ছোট ছিল না। বুঝিবার বয়স তাহার হইয়াছিল। বাপ বাঁচিয়া থাকিতে শুনিত পাঠক বলিত, আরও দু-চার জন বলিত, মোড়ল, ছেলেকে তুমি ভাল করে পড়াও। ওকে ওভারসিয়ারি পড়াবে। ওভারসিয়ার হলে এ ব্যবসা একেবারে হইহই করে চলবে।

কথাটা কি করিয়া ছড়াইয়া পড়িয়া নবগ্রামের ইস্কুল পর্যন্ত পৌঁছিয়াছিল। সেখানে ঘোঁতন ছিল তাহার সহপাঠী। ঘোঁতন পড়াশুনাতে ভাল ছিল এবং নবগ্রামের আধাশহুরে ফ্যাশন ও কথাবার্তাতেও পাকা ছিল। সে তাহাকে ঠাট্টা করিয়া ওপোর স্যার বলিয়া ডাকিতে শুরু করিয়াছিল। তাহাতে সেতাব লজ্জা অনুভব করিত বটে কিন্তু তাহার মধ্যেও গোপন অহঙ্কার অনুভব করিত। হঠাৎ বাপ মরিতেই ঘোঁতনের ওই ঠাট্টাটা মারাত্মক রূপে অসহনীয় হইয়া উঠিল। অন্যদিকে গ্রামে পথে ঘাটে লোকজন তাহাকে দেখিয়া বলিতে শুরু করিল—ছেলেটা তো বড় হয়েছে, আবার পড়া কেন রে বাপু? এই অবস্থায়! যা হোক কুলকর্মে লাগলে দুমুঠো খেতে পাবে তো। পড়েই বা করবে কি? হুঁ।

ওদিকে ম গাজন নালিশ করিয়া ডিক্রি করিল। প্রায় বিঘা দশেক জমি বিক্রি হইয়া গেল। বৎসরের শেষে কৃষাণ মজুরেরা অবশিষ্ট জমির ধান তুলিয়া ভাগ করিয়া যে ধান লইয়া মণ্ডলবাড়ির উঠানে মরাই বাঁধিল তাহাতে বাড়ির উঠানের একটা কোণও ভাল করিয়া ভরিল না। অথচ আগে উঠানটার অর্ধেকটা মরাইয়ে মরাইয়ে ভরিয়া থাকিত। সেতাব মহাতাপের লুকোচুরি খেলার আদর্শ ক্ষেত্র হইয়া উঠিত।

সেতাবের মা মরাইয়ের দিকে তাকাইয়া দীৰ্ঘনিশ্বাস ফেলিল, সঙ্গে সঙ্গে চোখে জল গড়াইয়া আসিল। আর বছর দুয়ের মধ্যে আরও দুঃসময় আসিল। সেদিনও সেতাবের মা কাঁদতেছিল। সেতাব সেদিন ইস্কুল হইতে ফিরিয়া নির্বাক হইয়া বসিয়া ছিল। পরীক্ষায় সে একটা বিষয়ে ফেল করিয়াছে। প্রথম ডাকে প্রমোশন পায় নাই; দ্বিতীয় ডাকে পাইবে কি না তাহারও কোনো স্থিরতা নাই। তাই চুপচাপ বসিয়া ছিল, কথাটা মাকেও বলে নাই। হঠাৎ মায়ের চোখে জল দেখিয়া সে উঠিয়া দাঁড়াইল। বার দুই পাক মারিয়া বলিল-আমি আর পড়ব না।

—পড়বি না? মা অবাক হইয়া ছেলের মুখের দিকে তাকাইল।

–না। এবার প্রমোশন পাই নাই।

বাধা দিয়া মা বলিল না পেয়েছিস এবার ভাল করে পড়। আসছে বার ভাল করে উঠবি?

–না। আর পড়ব না।

–করবি কি? আমার মুণ্ডু?

–না। চাষবাস করব। নইলে যা আছে তাও থাকবে না। ধার করে ধান খেতে হবে। তার দায়ে জমি বিকিয়ে যাবে।

সেতাব পড়া ছাড়িয়া সেই সংসারের হাল ধরিল। দেহ তাহার দুর্বল ছিল, নিজে হালের মুঠা ধরিয়া বিশেষ কিছু করিতে পারিল না কিন্তু দিনরাত্রি তদারকের ফলে চাষের উন্নতি হইল। অনাবৃষ্টির সময় গভীর রাত্রে সে মাঠে বাহির হইয়া লোকের জমির আল কাটিয়া নিজের জমি ভিজাইয়া লইত। চাষের আগে রাত্রে মাঠে গিয়া দশখানা জমি হইতে দশ ঝুড়ি আর উঠাইয়া নিজের জমিতে ছড়াইয়া দিয়া আসিত। পথ চলিতে চলিতে গোবর পাইলে গোবরটুকু উঠাইয়া লইয়া হয় জমিতে নয় নিজের সারগাড়িতে আনিয়া জমা করিত। বৎসর দুয়েক পর সে মাথা খাটাইয়া এক ব্যবসা বাহির করিল। তরির ব্যবসা ও তাহার সঙ্গে বীজের ব্যবসা। নদীর ধারে তাহাদের খানিকটা গোচর-অর্থাৎ গোচারণভূমি ছিল। সারা বর্ষাটা নদীর বানের জলে ড়ুবিয়া থাকিত। বান কমিয়া গেলে প্রচুর ঘাস হইত, বর্ষার তিন মাস ছাড়া বাকি নয় মাস গরুগুলি। সেখানে ঘাস খাইত। সেইখানে সে তরির চাষ শুরু করিল। এবং বাজারে প্রথম মরসুমে তরি তুলিয়া বিক্রয় করিত। তাহার আলু উঠিত কার্তিক মাসে। তখনকার দিনে আট আনা হয় আনা সের বেচিত টমাটো, বেগুন, মুলা তাহার প্রথম কেঁকে উঠিত। সে ফসল লইয়া সে নিজে গিয়া হাঁটে বেচিয়া আসিত। আবার, একদফা এইসব ফসল লগাইত একেবারে শেষ ঋতুতে। অর্থাৎ আলু তুলিত চৈত্র মাসে। সেই আলু পাকাইয়া বালির উপর বিছাইয়া রাখিত, বিক্রি করিত বর্ষার সময়, কতক বিক্রি করিত বর্ষার সময়, কতক বিক্রি করিত বীজ হিসাবে। মূলা-বেগুনও তাই। শেষ মরসুমে পাকাইয়া বীজ করিয়া ঘরে তুলিত এবং পরবর্তী ফসলের মরসুমে গায়ে গায়ে ফিরিয়া সেই বীজ চাষীদের সরবরাহ করিয়া আসিত। টাকা আদায় করিত ফসল উঠিবার পর। বীজে ফসল না জন্মিলে তাহার দাম লইত না। ইহাতেই তাহার দশাটা সে কিছু ফিরাইয়া ফেলিল। শুধু ইহাতেই নয়, বাড়ির হালচালও সে বদলাইয়া ফেলিয়াছিল। প্রতাপ মণ্ডল ব্যবসা ফাদিয়া ঘরে চুনকাম করাইয়াছিল, সে সেই চুনকাম-করা দেওয়ালের চুন ঢাকিয়া মাটি দিয়া নিকাইয়া দিল। খানকয়েক চেয়ার কিনিয়াছিল প্ৰতাপ মণ্ডল। সেগুলা বিক্রি করিয়া দিল। খান দুই বেঞ্চ ছিল, সেগুলার উপরে বীজের হাঁড়ি বসাইল। বাড়ির খাওয়াদাওয়া পোশাকআশাক সব বদলাইয়া দিল। তাহার মা তাহাতে আপত্তি করিল না। আপত্তি করিল মহাতাপ। খাওয়াদাওয়া ভাল না হইলে তাহার চলে না। সে অ্যাঁ-অ্যাঁ করিয়া চিৎকার করিত। দুই-তিন বৎসরে তাহার কথার জড়তা কাটিয়াছে, শরীরও সারিয়াছে, সেই পূর্বের মত সবল দেহ হইয়াছে কিন্তু মাথার গোলমালটা যায় নাই। মধ্যে মধ্যে সে সেতাবকে লাঠি লইয়া তাড়াও করিত।

সেতাব হাসিত। ভাগ্য তাহার ফিরিয়াছে, ভাইয়ের আবদারে রাগ করিতে মন উঠিত না।

ঠিক এই সময়েই একদিন এগার বছরের চাঁপাডাঙার বউ চেলির কাপড় পরিয়া, হাতে রুপার গাড়ু, গলায় মুড়কিমালা দোলাইয়া, দুই পায়ে চারগাছা রুপার মল বাজাইয়া মণ্ডলবাড়িতে

আসিয়া ঢুকিল।

সেও এক বিচিত্ৰ ঘটনা। লোকে বলিল, একেই বলে বিধির বিধান। যে যার হাড়িতে চাল দিয়াছে। নইলে ও মেয়ের বিয়ে হবার কথা কার সঙ্গে—হল কার সঙ্গে।

কথাটা মিথ্যা নয়। মেয়েটির বিবাহের সম্বন্ধ ছেলেবেলা হইতেই ঠিক ছিল গোপাল ঘোষের ছেলে ঘোঁতনের সঙ্গে। কিন্তু হঠাৎ সব ওলটপালট হইয়া গেল।

চাঁপাডাঙার বউ কাদম্বিনীর বাপ উমেশ পাল চাঁপাডাঙার সম্ভ্ৰান্ত চাষী। সম্ভ্ৰান্ত মানে আধুনিক কালের শিক্ষায় শিক্ষিত সম্ভ্ৰান্ত নয়, খটি এদেশের চাষী; গলায় তুলসীর মালা, কপালে তিলক, কাঁধে চাদর, পায়ে চটি তার পোশাক, বিনীত মিষ্ট কথা, অখল অকপট মানুষ, দিনে চাষ করে, নিজে হাতে লাঙল বয়, গো-সেবা করে, সন্ধ্যায় মোটা গলায় হরিনাম করে; ইংরেজি-জানা বাবুদের খাতির করে, ভয় করে, কিন্তু বিশ্বাস করে না, ঘৃণাও করে না। তবে তাহারা যখন তাহার বাড়িতে বর্ষার সময় ধানের অভাব পড়িলে ধার করিতে আসে তাহাদের মনে মনে অনুকম্পা করে। মুখে প্রকাশ করে না। ধান সে দেয়। এমনকি ক্ষেত্রবিশেষে ধান পাইবে না জানিয়াও দেয়। মুখে তখন সে বার বার বলে, হরিবোল হরিবোল!

এই উমেশ পালের স্ত্রী এবং গোপাল ঘোষের স্ত্রী অর্থাৎ ঘোতনের মা, এক গ্রামের মেয়ে, বাল্যসখী সই। গোপালের ছেলে ঘোঁতন ভূমিষ্ঠ হওয়ার ফলে উমেশের স্ত্রী বলিয়াছিল—আমার মেয়ে হলে তোমার ছেলেকে আমি জামাই করব। উমেশের প্রথম দুই সন্তান পুত্র, তৃতীয় সন্তান কন্যা কাদম্বিনী। কাদম্বিনী ভূমিষ্ঠ হইলে উমেশের স্ত্রী সইকে খবর পাঠাইয়াছিল যে…মেয়ে হইয়াছে। কথা যেন পাকা থাকে।

উমেশ পাল খুঁতখুঁত করিয়াছিল। কারণ গোপাল ঘোষ পাইকার অর্থাৎ দালাল মানুষ। ধানের দালালি করে। চাষবাস আছে কিন্তু ধানের দালালিতে ঝোঁক বেশি। সেই সূত্রে আধাশহুরে মানুষ। সদগোপ হইয়াও চাষ করে না, করে ধানের পাইকারিঅর্থাৎ ধান-চালের দালালি। দালালিতে কাজের চেয়ে কথা বেশি। কাজের চেয়ে যেখানে কথা বেশি সেখানে কথার সবই ভুয়া অর্থাৎ মিথ্যা। তবুও স্ত্রীর কথার প্রতিবাদ করে নাই। বাই যখন দিয়াছে মেয়ের মা, তখন না মানিলে উপায় কি? মেয়ের জন্মের পর কিছুদিন বেশ উৎসাহের সঙ্গে মধ্যে মধ্যে দুই বাড়িতে খবরাখবরের আদানপ্রদান চলিল। তত্ত্বতল্লাশও চলিল। তারপর ধীরে ধীরে সব কমিয়া আসিল। তারপর কাদুর বয়স হইল এগার। ওদিকে বাজারে গুজব টিল—নতুন আইন হইতেছে যে, মেয়ে যুবতী হওয়ার আগে বিবাহ দিলে জেল হইবে। বিবাহ নাকচ হইবে। কেহ বলিল চোদ্দ বছর, কেহ বলিল ষোল, কেহ বলিল আঠার বছর বয়স না হইলে মেয়েদের বিবাহ চলিবে না। ভীষণ আইন, সারদা আইন না কি আইন!

ওদিকে গোপাল ঘোষের ছেলে ঘোঁতন নাকি ম্যাট্রিক দিয়াছে। বিবাহের বাজারে ছেলের দর। খুব। গোপাল ঘোষ নাই, মরিয়াছে; উমেশ লোক পাঠাইল ঘোঁতনের মায়ের কাছে, অর্থাৎ স্ত্রীর সইয়ের কাছে। বিবাহ এক মাসের মধ্যেই শেষ করিতে অনুরোধ জানাইল। উত্তর দিল ঘোঁতন। সে বলিয়া পাঠাইল—বিবাহ করিতে সে এখন আদৌ ইচ্ছুক নয় এবং পরবর্তীকালেও সে যখন বিবাহ করিবে তখন লেখাপড়া-জানা মেয়ে বিবাহ করিবে। এগার বৎসর বয়সের মেয়েকেও সে বিবাহ করিবে না। ঘোতনের মা লোকের সামনে ঝরঝর করিয়া কাঁদিয়া ফেলিয়া বলিল,—আমার দশা দেখে যাও বাবা। সইকে বোলো, সয়াকে বোলো, আমি নিরুপায়। দিনরাত চোখের জল সার হয়েছে আমার। আমার কোনো হাত নাই।

জবাব পাইয়া উমেশ পাল খানিকক্ষণ গুম হইয়া মাটির দিকে চাহিয়া রহিল, তারপর মুখ তুলিয়া উঠিয়া দাঁড়াইল। ঠিক সেই মুহূর্তটিতেই পালের বাড়িতে প্রবেশ করিল সেতাব। তাহার সঙ্গে একজন ভারী। তাহার কাঁধের ভারে দুই দিকে বীজের বস্তা। উমেশ পালের মুখটা প্রসন্ন। হইয়া উঠিল। হ্যাঁ, পাত্র সে পাইয়াছে। ঠিক হইয়াছে। সেদিন গণকার কাদুর হাত দেখিয়া বলিয়াছিল—এ মেয়ের পাত্র পায়ে হেঁটে তোমার বাড়ি এসে উঠবে পাল। তুমি দেখে নিয়ো।

কথাটা শুনিয়া উমেশ পালও হাসিয়াছিল। ভাবিছিল,ভারি চতুর এই গণকার মশাই। ঘোঁতনের সঙ্গে কাদুর বিবাহের সম্বন্ধের কথা এখানে মোটামুটি সবাই জানে। সেই কথাটি সে তাকমাফিক চমৎকার ঝাড়িয়া দিয়াছে। আজ কিন্তু সে সেই কালো বামুনকে মনে মনে প্ৰণাম করিল। প্রতাপ মণ্ডল এ অঞ্চলের নামি মানুষ ছিল। তাহার ছেলে সেতাব। বংশ উচ্চ। ছেলের যোগ্যতা ছেলে নিজে প্ৰমাণ করিয়াছে। যে ছেলে ড়ুবন্ত নৌকাকে ভাসাইয়া তুলিতে পারে, সে নাই বা হইল ম্যাট্রিক পাস। উমেশ পাল পরের দিনই সেতাবের বাড়ি আসিয়া তাহার মায়ের কাছে কথা পাড়িল। এবং এক মাসের মধ্যেই বিবাহ শেষ করিয়া নিশ্চিন্ত হইল। সেতাবের মা বউ দেখিয়া খুশি হইল। মহাতাপ বউয়ের ঘোমটা খুলিয়া দিয়া বলিল-এঃ-এই আবার বউ হয়? এইটুকুন মেয়ে।

মা বলিয়াছিলেন—হয়। ওই বউ বড় হবে। তোমার বড় ভাজতোমার মায়ের তুল্য হবে। আমার ঘরের লক্ষ্মী।

সেতাব তাহার পর ধুলার মুঠা ধরিয়াছে, সোনার মুঠায় পরিণত হইয়াছে সে ধুলা। আবার সোনার মুঠা চোখের উপর ধুলায় পরিণত হইতে বসিয়াছে। সাধে সে হায় হায় করে।
তৃতীয় পরিচ্ছেদ

দিন কয়েক পরের কথা।

ভোরবেলা। সূর্য উঠি-উঠি করিতেছে। গোয়াল-বাড়িতে বলদ জোড়াটার কাঁধে হাল চাপাইয়া বাঁধিতে বাঁধিতে মহাতাপ গান ধরিয়া দিয়াছিল।

মালসা মারিয়া কাপড় পরিয়াছে। মাথায় রঙিন গামছা বধিয়াছে। পাশে ওধারে লাঙল নামানো। একটা ধানের বীজের ঝুড়ি। দুইখানা কোদাল। কো-কক্কে। একটা ছোট চটের থলে।

কৃষাণ নোটন সাহায্য করিতেছে।

হাল জোতা হইলে মহাতাপ বার দুই সস্নেহে গরু দুইটার গায়ে হাত বুলাইয়া দিল। তারপর একটা ছোট টুকরিতে কিছু খইল লইয়া একটার মুখের কাছে ধরিল। গান চলিয়াছে। একটার মুখের কাছে খইল ধরিতেই অপরটা গন্ধে চঞ্চল হইয়া উঠিল স্বাভাবিকভাবে। মহাতাপ সমের মাথায় ধমক দিল তাহাকে ধ্যাৎ তেরি!

ইতিমধ্যে বাড়ির ভিতর হইতে বধূ দুইটি, দুইটি ঘড়া কাখে লইয়া কাঁধে গামছা ফেলিয়া স্নানে বাহির হইল।

বড়চাঁপাডাঙার বউ যাইতে যাইতে দাঁড়াইল। হাসিয়া বলিল, ঘরদোর চাষবাস বলে তা হলে মনে পড়ল ছোট মোড়লের এত দিনে? চার দিন গাজননাচন নেচে–পাঁচ দিন ঘুম।

মানদা বলিল, ক ঘটি ভাঙ খেয়েছিল শুধাও।

মহাতাপ বলিল, ফের ব্যাড়ব্যাড় করে। একদিন কেবল ওই কথা, ব্যাড় ব্যাড়—ব্যাড়র ব্যাড়রক ঘটি ভাঙ খেয়েছ? ভাঙ কেউ হিসেব করে খায় নাকি?

চাঁপাডাঙার বউ বলিল, তা খায় না, কিন্তু ছেলেবেলায় অসুখ করে যার মাথা দুর্বল, সে ভাঙ খায় কেন? কথাটা মনে থাকে না কেন?

মহাতাপ বলিল, এই কান মলছি। বুয়েচ কিনা। সত্যই সে কান মলিয়া বসিল—ওই ঘোঁতনা শুয়ার, আর ওই বেচা শেয়াল, ওই ওরাই—ওরাই যত অনিষ্টের মূল।

কথার উপরে কথা কহিয়া মানদা বলিল, ওরাই যত অনিষ্টের মূল। কচি খোকা। ওরা ঝিনুকে করে খাইয়ে দিয়েছিল।

—দেখ বউদিদি, দেখ। তুমি দেখ। তুমি বল ওকে—এমন করে কেন? কেমন করে দেখ। দেব আষিঢ়ে কিল পিটে বসিয়ে, হাঁক লেগে যাবে।

বলিয়া আগাইয়া গিয়া লাঙলটা কাঁধে তুলিয়া লইল।–চল্ রে চল, নোটন?

নোটন ইতিমধ্যে তামাক সাজিতে গোয়ালের ভিতর ঢুকিয়াছিল। তাহাকে না পাইয়া সে চিৎকার করিয়া ডাকিল, নোটনা। বলি অ—বুড়ো হনু।

বড় বউ বলিল, দাঁড়াও, দাঁড়াও, মানুর ওপর রাগ করে পালিয়ে গেলে হবে না। আমার একটা কথার জবাব দাও তো। ঘোঁতনাকে ধানটা ছেড়ে দিয়ে এলে, ঘোঁতনার মায়ের কথায় দয়া হল, তা বুঝলাম। কিন্তু একবার জিজ্ঞাসাও তো করে। দাদা রয়েছে। কি কথা বল না যে?

—কি বলব কি? বলতে গেলে, তোমার স্বামীর নিন্দে করতে হবে।

–কার?

–তোমার ইয়ের, বরের। আবার কার!

খিলখিল করিয়া হাসিয়া উঠিল চাঁপাডাঙার বউ।

মহাতাপ ওদিকে নাকে ঘড়াত শব্দ করিয়া গরু দুটার পিঠে হাত দিয়া তাহাদের চালাইয়া দিল।

বাড়ির বাহিরের দাওয়ায় রাস্তার সামনে সেতাব বসিয়া চেঁড়া ঘুরাইয়া শণের দড়ি পাকাইতেছিল। তাহার সামনে রাস্তার উপর দিয়া মহাতাপ হালগ লইয়া চলিয়া যাইতেছিল। দাওয়ার উপর মানিক একটা মাটির পুতুল লইয়া খেলা করিতেছে। রাখালটা কল্কেতে তামাক সাজিয়া ফুঁ দিতেছে। একটা খুঁটিতে একটা ছাগল বাধা, পাতা খাইতেছে। বাচ্চা দুইটা পাশে ঘুরিতেছে। সেতাব বলিল, কতটা বীজ ফেলবি আজ?

—জোলের দু আড়াতে ফেলাব।

–দু আড়া?

–হাঁ তো কি! তোমার মত মরা খেটে নাকি আমি?

–তা না হয় তু ভীম ভৈরবই হলি! কিন্তু এক দিনে এত ক্যানে?

–বাত চলে যাবে।

–বাত চলে যাবে সে জ্ঞানটা ভাঙ খাবার সময় থাকলে ভাল হত।

–ফ্যাঁচফ্যাঁচ কোরো না বেশি। এই বেটা গরু, চল না ক্যানে। আবার নাকে ঘড়াত শব্দ করিয়া গরু দুইটার পিঠে পাঁচনের টিপ দিল এবং চলিয়া গেল।

সেতাব ডাকিল, মানকে!

–উঁ!

–বাবার মত খবরদার হবারাম হবি নে বেটা। লোককে পাওনা ছেড়ে দিয়ে আসবি না।

–আমি ছিব হব।

–না। হবি না। খবরদার!

–কি হব?

–আমার মত হবি।

–না, তুমি ছাই। রোগা—

–ওরে বেটা, বুদ্ধিতে আমার মত হবি। অঙ্ক শিখবি। কাউকে এক পয়সা ছাড়বি না।

–পয়সা দাও।

–ওরে বেটা, অনেক পয়সা জমিয়েছি তোর জন্যে। সব তোর জন্যে, বুঝলি?

–কাউকে দেব না।

–হ্যাঁ। কেউ আমাকে দেয় নি, কেউ ছাড়ে নি মানকে। বাবা দেনা করেছিল, কেউ ছাড়ে নি। বুঝলি? আর পরিবারের কাছে টাকা নিবি না। তোর বড়মা দেনার সময় গয়না দিয়েছিল দেনা শোধ করতে। তার পাপ আমাকে আজ ভুগতে হচ্ছে। খবরদার মানকে। হাঁ।

রাখালটা হুঁকা-কল্কে সেতাবের হাতে দিল।

সেতাব বলিল, শোন, তু একবার ঘোঁতন ঘোষের বাড়ি যাবি, বুঝলি? বলবি পঞ্চায়েত মোড়লেরা একবার ডেকেছে। বুঝলি?

রাখালটা বলিল—সে আসবে না গো। বড় ত্যাঁদড় নোক ঘোঁতন।

—তা হোক, তু যাবি। আমি বলছি—তু যাবি। আসে না-আসে আমি বুঝব। এই কাগজখানা দিবি।

রাখালটা বলিল, তা হলে এখুনি যাই। নইলে ঘোঁতন মুড়ি খেয়ে বিড়ি টানতে টানতে বেরিয়ে যাবে, আর সেই ভাত খাবার বেলা পর্যন্ত পাব না।

ঘোঁতনের বাড়ি গোপডাঙায়। ঠিক পাশের গ্রামে।

এই গ্রাম ও আধাশহর লক্ষ্মীপুরের মাঝখানে গোপডাঙা–ছোট একখানি গ্রাম। লক্ষ্মীপুরেরই কাছাকাছি বেশি। লক্ষ্মীপুর অনেকদিনের সমৃদ্ধ গ্রাম। ব্রাহ্মণ-কায়স্থ-প্রধান সমাজ। গোপডাঙার টানটা চিরকাল ঐ দিকেই বেশি। ব্রাহ্মণ এবং কায়স্থ বুদ্ধিজীবী ভদ্রলোকেরা গোপডাঙার চাষীদের এবং গোপদের উৎপনের পুরনো খরিদ্দার। গোপডাঙার তরিতরকারি এবং দুধ, দুই লক্ষ্মীপুরের অন্নকে পঞ্চাশ না-হোক বেশ কয়েক প্রকার ব্যঞ্জনে সমৃদ্ধ করিয়াছে। এবং গুড় ও দুধ সহযোগে পরমানু না হোক পায়সানে পরিণত করিয়াছে। শুধু তাই নয় এই গ্রামের চাষীরাই। বরাবর ব্রাহ্মণ কায়স্থদের জমিজেরাত ভাগে ঠিকায় করিয়া আসিয়াছে। এবং সেকালে ইহা হইতেই তাহাদের দু-চার জন বছরে নিজের খামারে একটা মরাই-ও বাঁধিয়াছে আবার অজন্মার বছরে ঠিকার ধান শোধ না করিতে পারিয়া খতও লিখিয়াছে। খতের আসল, সুদে বাড়িয়া। তাহাদের পৈতৃক জমি বিক্রয় করিতে বাধ্য করিয়াছে। এ সব পুরনো কথা। তাহার পর মাঝে একটা সময় আসিয়াছিল যখন লক্ষ্মীপুরের ব্রাহ্মণ-কায়স্থ-বাঁড়ুজ্জে মশায়, মুখুজ্জে মশায়, বোস মশায়, ঘোষ মহাশয়ের সকলেই ও-সব উপাধি ছাড়িয়া বাবু মশাই ইলেন; ঘরে ঘরে তক্তপোশ-ফরাসের বদলে চেয়ার-টেবিল হইল, টোল পাঠশালা উঠিয়া গল, ইংরিজি ইস্কুল হইল, বাবুরা শহরে চাকরি ধরিল। উকিল হইল, মোক্তার হইল, ডাক্তার হইল। শরবত ছাড়িয়া চা ধরিল, হুঁকার সঙ্গে সিগারেট ঢুকিল, তখন লক্ষ্মীপুরে খানসাম র চাহিদাটা বাড়িয়া গেল। এই সময় গোপডাঙার অনেকে চাষের মত অভদ্র কাজ ছাড়িয়া এই শৌখিন কাজে ঢাকিল। ছোট বড় করিয়া চুল ইহারাই প্রথম ঘটিল, চাদরের বদলে কামিজ আমদানি করিল। কাছেই বক্রেশ্বর নদী ইহার পর বক্রেশ্বর নদী দিয়া অনেক জল বহিয়া গেল। শুধু বহিয়াই গেল না, বন্যায় চারিপাশ ড়ুবাইয়া দিয়াও গেল। চাষের জমিতে পলিও পড়িল, বালিও চাপিল। সেতাবদের গ্রাম নয়নপুরের চাষীরা বালি-পড়া জমির বালি তুলিল, পলি-পড়া জমিতে সোনা ফলাইল। কিন্তু গোপডাঙার চাষীরা চাষ একেবারে তুলিয়া না দিলেও ওই জীবিকার উপর আস্থা হারাইল। তাহারা চাষের সঙ্গে এটা ওটা ব্যবসায়ে হাত দিল। কেহ নবগ্রামে দোকান করিল। মুদির দোকান, বিড়ির দোকান ইত্যাদি এবং ছেলেদের ইস্কুলে ভর্তি করিয়া দিল। দুই চারটি ছেলে ম্যাট্রিক পাস করিল, একজন এম এ পাস করিল, একজন বি-এল হইল এবং গোপডাঙার বাস উঠাইয়া কর্মস্থল শহরে চলিয়া গেল। ঘোঁতনের বাবা গোপাল ঘোষ নিজে চাষবাসের সঙ্গে পাইকারি অর্থাৎ ধানের দালালির কাজ ধরিয়াছিল। লক্ষ্মীপুরের বণিকদের কাছে টাকা লইয়া গ্রামে গ্রামে ধান কিনিত এবং সেই ধান গাড়ি বোঝাই করিয়া বণিকদের গদিতে পৌঁছাইয়া দিত। কিছু লাভ থাকিত দরের মাথায়, আর কিছু থাকিত ওজনের মাথায়। খরিদ্দারের ঘরে হাতের টিপে যে ওজনটা সে লাভ করিত—সেইটার দাম মিলিত। ইহার উপর আছে কিছু ঢলতা—কিছু আছে। ঈশ্বরের নামে বৃত্তির ভাগ। ঘোঁতনকে ইস্কুলে দিয়াছিল। ঘোঁতন ও সেতাব কয়েক ক্লাস একসঙ্গে পড়িয়াছিল। ঘোঁতন ছেলে মন্দ ছিল না, সেতাবের মত সে এম্‌কে অ্যাম, একে অ্যান, একে অ্যাল বলিত না। চোস্ত উচ্চারণ ছিল তার। লক্ষ্মীপুরের বাবুদের ছেলেদের সঙ্গে ফুটবল খেলিত, স্কুলে ডিবেটিং ক্লাবে ডিবেট করিত। ভাল আবৃত্তি করিতে পারি। লক্ষ্মীপুরের থিয়েটার ক্লাবের রিহারস্যালের দিন হইতে অভিনয়ের দিন পর্যন্ত নিয়মিত আড়ালে-আবডালে থাকিয়া শুনিত, শিখিত। ক্লাবের লাইব্রেরি হইতে নাটক নভেল পড়িত। লোকে বলিত ছেলেটির ভবিষ্যৎ আছে। মাস্টাররাও আশা করিতেন, ঘোঁতন অন্তত সেকেন্ড ডিভিশনে পাস করিবে। মন দিয়া পড়িলে ফার্স্ট ডিভিশনেও যাইতে পারবে।

হয়ত পারিত। কিন্তু গোপাল ঘোষ মরিয়া সব গোলমাল হইয়া গেল। ঘোঁতন বন্ধাশূন্য অশ্বের মত ধাবমান রইল। ফার্স্ট ক্লাসে উঠিয়া সে প্রেমে পড়িয়া গেল। মনে মনে সে বেশ কিছুদিন হইতেই প্রেমে পড়িয়াছিল। স্থানীয় মাইনর গার্লস স্কুলের মাইনর ক্লাসের ছাত্রীদের প্রত্যেকটিকেই কিছুদিনের জন্য প্ৰিয়তমা ভাবিতেছিল। কিন্তু জাতের বাধা বা অন্য বাধা স্মরণ করিয়া সে কথা প্রকাশ করিতে পারি না। নিজের খাতায় তাহাদের নাম লিখিত এবং খুব যত্নের সঙ্গে কাটিত। হঠাৎ প্রকাশ্যে প্রেমে পড়িবার সুযোগ জুটিয়া গেল। স্থানীয় সবরেজেষ্ট্রি আপিসেই তাহাদের স্বজাতি এক কেরানী আসিল—এবং তাহার বড় মেয়েটি মাইনর ক্লাসে ভর্তি হইল। লম্বা ধরনের শ্যামবৰ্ণ মেয়ে, বয়স বোধহয় তের-চৌদ্দ; কিন্তু ঘোতনের প্রেমে পড়িবার পক্ষে তাই যথেষ্ট। মাইনর ক্লাসে পড়ে; বেণি ঝুলাইয়া ফেরত দিয়া কাপড় পরিয়া স্কুলে যায়—সুতরাং ইহার চেয়ে অধিক আয়োজন আর কী হইতে পারে লক্ষ্মীপুরে। ঘোঁতন প্রেমে পড়িল, মেয়েটির বাপের সহিত আলাপ করিল। তাহাদের বাড়িসুদ্ধ নিমন্ত্ৰণ করিয়া বাড়ি আনিয়া খাওয়াইল। এই সময়েই উমেশ মণ্ডল কাদম্বিনীর বিবাহের জন্য তোক পাঠাইল। ঘোঁতন তাহাকে সোজা না বলিয়া দিয়া বিবাহ ভাঙিয়া দিল। সবরেজেস্ট্রি অফিসের কেরানীবাবুটি ভীরু। কন্যাদায়গ্রস্ত লোক, সেও ঘোঁতনকে পছন্দ করিল। মাস্টাররা বলেন—ছেলে মন্দ নয়। বাহিরে তো খুব চটপটেস্মার্ট। বাড়ি-ঘরদেরও খারাপ নয়। সুতরাং আকারে ইঙ্গিতে সেই ইচ্ছাই প্রকাশ করিল।

ঘোঁতন খুব উৎসাহিত হইয়া পরীক্ষা দিয়া আসিল। শহরে পরীক্ষা দিয়া ফিরিবার সময় সেলুনে চুল ছটিয়া এক টিন গোল্ডেন বার্ডসাই নামক সিগারেট মিকশ্চার কিনিয়া বাড়ি ফিরিল এবং একদা শুভলগ্নে কেরানীবাবুর মাইনর-পড়া চতুর্দশ কন্যা নীহারিকাকে বিবাহ করিয়া ফেলিল। কিন্তু পরীক্ষার ফল বাহির হইলে দেখা গেল যে গেজেটে থার্ড ডিভিশন অবধি কোথাও ঘোঁতনচন্দ্রের নাম নাই।

ঘোঁতন বলিল—শালারা সব!

শ্বশুর বলিল–আবার ভাল করে পড়।

ঘোঁতন বলিল–না, ও গোলামি লেখাপড়া আমি আর করব না।

ঘোঁতন তখন লক্ষ্মীপুরের থিয়েটারে পার্ট পাইয়াছে। সামনে মাসখানেক পরেই অভিনয়। লক্ষ্মীপুরের ক্লাবের নিয়মানুসারে কোনো স্কুলের ছাত্র পার্ট করিতে পায় না। স্কুলে আবার ভর্তি হইতে হইলে পার্ট ছাড়িতে হইবে। সুতরাং ঘোন কিছুতেই রাজি হইল না, উপরন্তু শ্বশুরের সঙ্গে ঝগড়া করিয়া শ্বশুরের বাসার পথে হাঁটা বন্ধ করিল এবং কিছু জমি বিক্রয় করিয়া লক্ষ্মীপুরের গোলাম দর্জির সঙ্গে বখরায় একটা কাটা কাপড়ের দোকান করিল, এবং ইউনিয়ন কোর্টে পেটি মামলার তদ্বির আরম্ভ করিল। কিছুদিনের মধ্যে কাটা কাপড়ের দোকানের ভাল কাপড়গুলার জামা পরিয়া দোকানটা গোলামকে বেচিয়া দিল বটে কিন্তু মামলার তদ্বিরে তাহার কৃতিত্ব প্রতিষ্ঠিত হইল। থিয়েটারেও সে সুনাম অর্জন করিল।

শ্বশুর মেয়ের বাপ, তাহার ইচ্ছা যাই থাক, মনের ইচ্ছা মনে চাপিয়া জামাইয়ের কাছে নতি তাহাকে স্বীকার করিতে হইল, সে জামাইকে বলিল—তুমি তা হলে আর একটা কাজ কর। মামলার তদ্বিরের সঙ্গেই চলবে। সবরেজেষ্ট্রি আপিসে আমি রয়েছি, তুমি সবরেজেষ্ট্রি আপিসে টাউটের কাজ কর। শনাক্ত দেওয়া, দলিল লেখার কাজ কর। তা হলে মধ্যে মধ্যে যখন নকলের জন্যে একস্ট্রা হ্যান্ড দরকার হবে সে কাজও বলে-কয়ে করে দিতে পারব।

এ প্রস্তাবে ঘোঁতন রাজি হইল। এবং এ ব্যাপারেও সে কৃতিত্ব প্রদর্শন করিল। কানে কলম গুঁজিয়া বড়তলায় ঘুরিতে লাগিল। কিছুদিন পর লক্ষ্মীপুরের সাহাদের পঞ্চানন সাহার সঙ্গে জুটিয়া একটা যাত্রার দলও খুলিয়া বসিল। পঞ্চানন সাহা লক্ষ্মীপুরের থিয়েটারে দূত-প্রহরী ছাড়া পার্ট পায় না, অথচ তাহার ধারণা ভাল পার্ট পাইলে নিশ্চয়ই নাম করিতে পারে। মধ্যে মধ্যে এ লইয়া ক্লাবে ঝগড়াঝাটিও করিত পঞ্চানন। হঠাৎ এই ঝগড়া একদিন চরমে উঠিয়া গেল এবং পঞ্চানন ক্লাব ছাড়িয়া দিল। কয়েকদিন পর শোনা গেল, পঞ্চানন সাহা যাত্রার দল খুলিতেছে। পঞ্চাননের পয়সা আছে, যথেষ্ট পয়সা, সে হাজার দুয়েক খরচ করিয়া পোশাক, চুল, বাদ্যযন্ত্রপাতি কিনিয়া ঘোঁতনকে ডাকিয়া বলিলবামুন-কায়েতদের সঙ্গ ছাড়া ও বেটারা আমাদিগকে দূত-প্রহরী সাজিয়ে নিজেরা রাজা-উজির সাজে। আমার দলে আয়, রাজা-উজির সব আমরাই সাজব এখানে। ঘোঁতন আনন্দে জুটিয়া গেল।

পঞ্চাননের দল প্রথমেই পালা ধরিল নাগযজ্ঞ এবং নায়ক তক্ষক নাগের পার্ট দিল ঘোঁতনকে। ঘোঁতন তক্ষক নাগের পার্টে এমন ফেঁসফোঁস করিয়া ফেঁসাইল যে লোকে বাহবা দিল খুব। ঘোঁতন নিজেও খুশি হইল, সত্য বলিতে পালাও জমিল।

বছর খানেক পর পঞ্চাননের শখ মিটিল, হাজার খানেক টাকা লোকসান দিয়া দল তুলিয়া দিল। তুলিয়া দিবার সময় ঘোঁতন বলিলপঞ্চানন-দাদা, দল তুলে দেবে? কিন্তু

–কিন্তু কি? আমার শখ মিটেছে।

–তা হলে আমাকে দিয়ে দাও ওগুলো। আমাদের শখ এখনও আছে।

–কিন্তু টাকা যে অনেক লেগেছে ঘোঁতন।

—তা লেগেছে। কিন্তু পঞ্চানন অপেরায় তোমার নামটা তো থাকবে। আমি টাকা কিছু দোব। আড়াইশো।

শেষ পর্যন্ত চারশো টাকায় রফা করিয়া পঞ্চানন সাহাকেই বিঘা দুয়েক জমি সাতশো টাকায় বেচিয়া ঘোঁতন দলের সরঞ্জাম কিনিল এবং বাড়িতে সামনের চাষের সরঞ্জামের ঘরখানার মেঝে বাঁধাইয়া—দেওয়ালে কলি ফিরাইয়া—বাহিরে পঞ্চানন অপেরার সাইনবোর্ড খাটাইয়া দেখিয়া শুনিয়া বলিল–O. K. ঠিক হয়েছে।

প্রথম বছর দুই-তিন জমজমাট আসর চলিয়াছিল ঘোঁতনের। তখন যুদ্ধ মিটিয়াছে কিন্তু বাজারে তখন অঢেল কাগুজে টাকা। তাহার পর মন্দা পড়িয়াছে। ঘোতনের যাত্রার দলে লোকসান। যাইতে শুরু করিল। ওদিকে রেজেষ্ট্রি অফিসে মন্দা পড়িল। ঘোঁতনের স্ত্রী চার-পাঁচ বছরে তিনটি সন্তান প্রসব করিয়া সংসার বৃদ্ধি করিল, নিজে রোগে পড়িল। বোন পুঁটি বড় হইয়া পনের পার হইয়া পড়িল ষোল বছরে। মা মেয়ের বিবাহের জন্য তাগিদ দিলেও ঘোঁতন চঞ্চল হইল না। স্পষ্ট বলিয়া দিল—আমার টাকা নাই। ইহার মধ্যে আরও বিঘা তিনেক জমি নিলাম হইয়া গেছে। ঘোঁতন আপিল করিয়াছে। তাহার উপর পর পর দুবছর অনাবৃষ্টিতে ফসল নাই। ঘোঁতন করিবেই বা কি? গত বছর সেতাবের কাছে ধান লইয়াছিল। ভরসা করিয়াছিল ওই পাগল মহাতাপের। পাগলটাকে যাত্রার দলে। ঢুকাইতে পারিলে পার্টের লোভ দেখাইয়া অন্তত বছরের খোরাকির ধানটার সংস্থান হয়। কিন্তু যাত্রাটাত্রা মহাতাপ বোঝে না। তার চেয়ে সে সঙ ভালবাসে, সংকীর্তন ভালবাসে। বায়া তবলার চেয়ে খোল বাজাইতে তাহার উৎসাহ বেশি। এবার সেইজন্য মহাতাপকে গাজনের সঙে শিব সাজাইয়াছিল। দশ টাকা দাও লইয়াছে। আবার ধান ছাড়িয়া দিলাম বলিয়া লিখিয়াও লইয়াছে।

***

রাখালটা যখন সেখানে গিয়া পৌঁছিল, তখন ঘোঁতনের মা ঘরের দাওয়াটা মাটি দিয়া নিকাইতেছে। ঘোঁতন চায়ের একটা বাটি লইয়া তক্তপোশের উপর বসিয়া আছে। এক হাতে একটা জ্বলন্ত বিড়ি। রুখু চুলগুলা উড়িতেছে। চোখে উদাস দৃষ্টি। সে ভাবিতেছিল পার্টের কথা।

রাখালটা আসিয়া বলিল, ঘোষবাবু মশায়!

—কে? তাহার দিকে ঘোঁতন তাকাইল।সেতাব মোড়লের রাখাল না তুই?

–হ্যাঁ গো। এই কাগজটা দিলে মুনিব। তোমাকে যেতে বলেছে একবার।

কাগজটা দেখিয়া ঘোঁতন দতে দত টিপিয়া ক্রুদ্ধ মুখভঙ্গিসহকারে বলিল, এক কিলে বেটার দাঁত কটা ভেঙে দোব। নোটিশ এনেছে, পঞ্চায়েতের নোটিশ! ভাগ, ভাগ বলছি! ভাগ!

রাখাল বলিল, তা আমি কি করব? ওই! আমাকে পাঠালে–। ওই–

বলিতে বলিতে সে পিছাইতে শুরু করিল।

ঘোঁতন চায়ের বাটি হাতে উঠিয়া দাঁড়াইল। বলিল, বেটা ছুঁচোর গোলাম চামচিকে ঘোঁতনের মা ত্রস্ত হইয়া বলিল, ও ঘোঁতন, ওরে! কি হল রে?

—কিপটে কঞ্জুস পেকো সেতাবের রাখাল বেটা নোটিশ নিয়ে এসেছে। পঞ্চায়েতের নোটিশ। I don’t care-ওরে বেটা বলে দিবি, ঘোঁতন ঘোষ dont care I mean does not care.

মা আবার বলিল, ঘোঁতন!

ঘোঁতন বলিল, আমি মাছে পোকা পড়িয়ে দেব। হুঁ, হুঁ,–আমি ঘোঁতন ঘোষ। আমি হোৎ-তা-তা লাঙল ঠেলি না। আকাট মুখ্যু নই আমি। সেতাব মোড়লের বাড়ির কীর্তি ফাঁস করে দোব, গুপ্ত বিন্দাবনের পালা লিখে ছড়িয়ে দেব।

মা এবার কঠিন স্বরে বলিল, ঘোঁতন, তোর মুখ খসে যাবে, ও কথা বলিস নে। ঘোঁতন কি বলিতে চাহিতেছে মুখ খুলিবামাত্র সে তাহা বুঝিয়াছে।

ঘোঁতন ভেঙাইয়া বলিল, আ মলো যা। তোর দরদ উথলে উঠল যে?

তুই যা বলছি, তা আমি বুঝেছি। চাঁপাডাঙার বউ সতীলক্ষ্মী। মহাতাপ বোকা হোক, মুখ হোক, তোর মত ফেশানদুরস্ত ভদ্দনোক না সাজুক, বড় ভাল ছেলে। আমি চোখের জল ফেলে। নিজের দুঃখের কথা বললাম তো এক কথায় পাওনা ধান ছেড়ে দিলে—

–দিলে? এই তো সেতাব মোড়ল পঞ্চায়েতের নোটিশ দিয়েছে।

—দিক। সে যখন বলেছে তখন সেতাব কখনও কথা ফেরাবে না। তার উপর কাদু আছে। সে আমার সইয়ের মেয়ে।

–না। ফেরাবে না। একটা আধপাগলা মুখ, একটা উল্লুক, একটা পাঠাতে আর মহাতাপে কোনো তফাত নাই। ঘরে খাবার আছে, সম্পত্তি আছে, তারই জোরে আমাদের চেয়ে তার খাতির। সব কলঙ্ক ঢাকা পড়ছে।

মা এবার মাটি-গোলার হাড়িটা হাতে লইয়া উঠিয়া দাঁড়াইল। মৃদু অথচ দৃঢ়স্বরে বলিল, দেখ ঘোঁতন, অন্যায় কথা বলিস না! তোর যেমন পাপ মন তেমনি কূটবুদ্ধি। তত তোর মনে হিংসে। অমৃতিকে তুই বিষ বলছিস। ছি। ছি।

—যাও, যাও, মেলা ফ্যাঁচফ্যাঁচ কোরো না বলছি। বিড়ি টানিয়া ঘোঁতন খানিকটা ধোঁয়া উড়াইয়া দিল—আমি হাঁড়ি ব্রেক করে দোব বাবা। হুঁ হুঁ।

বলিয়া সে হাঁটু দোলাইতে লাগিল।

মায়ের দাওয়া নিকানো শেষ হইয়াছিল। মাটি-গোলা হাঁড়িটা হাতে লইয়া সে দাওয়া হইতে নামিয়া পাচিলের গায়ে সদর দরজা দিয়া বাড়ির ভিতরে ঢুকিতেছিল, ঘোঁতনের কথা শেষ হইতেই সে ঘুরিয়া দাঁড়াইল। বলিল, তোমার হাঁড়ি যে ভেঙে আটকুচি হয়ে আছে বাবা। চাঁপাডাঙার মেয়ে কাদুর সঙ্গে তোমার বিয়ের সম্বন্ধ ছেলে বয়েস থেকে; তুমি বাবা যাচা লক্ষ্মীকে ফিরিয়ে দিয়ে বিয়ে করলে নিজে পছন্দ করে। বউমা ভাল, নিন্দে করব না বাবা, কিন্তু সবেরই তো পয় আছে ভাগ্যি আছে; তোমার বউয়ের ভাগ্যি বলতে কিছু নাই। তা ছাড়া ধন্যি বাপের মেয়ে, বাপ সেই যে–আলতানুটি শাকেরকুটি দিয়ে বিয়ে দিয়ে চলে গেল এখান থেকে আর খোঁজ করলে না। আর কাদুর বাপ মরবার সময় মেয়েকে দিয়ে গেল এতগুলি গহনা। আজ কাদুকে দেখে দশখানা গাঁয়ের লোকের চোখ জুড়োয়। বলে মরি মরিকি লালিত্যি! এ রাগের কথা—লোকে না জানুক, আমি জানি। এতে তোমার অকল্যাণ হবে বাবা। আমার সইয়ের মেয়ে সে আমার মেয়ের তুল্য। বিয়ে যখন হয় নাই-তখন তাকে বোন ভাবা উচিত তোমার। কিন্তু তুমি–প্রৌঢ়া আক্ষেপের সঙ্গে ঘাড় নাড়িয়া একটা দীর্ঘনিশ্বাস ফেলিল।

ঘোঁতন এবার হঠাৎ ক্রুদ্ধ হইয়া হাতের চায়ের বাটিটা ছুঁড়িয়া ফেলিয়া দিল এবং দাওয়া হইতে রাস্তায় নামিয়া হনহন করিয়া চলিয়া গেল। হঠাৎ দাঁড়াইয়া ঘুরিয়া বলিল, চিরকালের ঘরজ্বালানী পরলোনী যে তুমি। কাদু তোমার সইয়ের মেয়ে—সে তোমার পেটের ছেলের চেয়ে। আপন! তার জন্যে আমার উপর রাগ। ফু-ফু! ফু!

রাস্তায় নামিয়া খানিকটা আসিয়াই সে দেখিল, সেতাবের রাখাল ছোঁড়াটা একটা আমগাছের তলায় দাঁড়াইয়া গাছে ঢেলা মারিয়া আম পাড়িতেছিল। ঘোঁতন তাহাকে দেখিয়া ডাকিল, এই ছোঁড়া, শোন্ তো। এই! তাহার মাথার মধ্যে একটা মতলব খেলিয়া গেল।

ছোঁড়াটা ছুটিতে উদ্যত হইতেই ঘোঁতন একটা ঢেলা তুলিয়া বলিল, পালাবি তো ঢেলা মেরে ঠ্যাঙ খোঁড়া করব তোর। শোন্।

ছোঁড়াটা থমকিয়া দাঁড়াইল। ঘোঁতন আগাইয়া আসিয়া বলিল, তার ছোট মনিব কোথা? একবার ডেকে দিতে পারি?

–ছোট মুনিব মাঠে।

–মাঠে?

–হুঁ। বীজ বুনতে গিয়েছে।

ঘোঁতন চলিয়া যাইতে উদ্যত হইল। কয়েক পা অগ্রসর হইয়া ঘুরিয়া দাঁড়াইয়া বলিল, বিড়ি খাবি?

–বিড়ি? দেবেন আপুনি? সত্যি?

–এই নে না।

একটা বিড়ি তাহাকে দিয়া নিজে একটা বিড়ি মুখে পুরিয়া দেশলাই জ্বালিয়া ধরাইয়া, নিজের ধরানো বিড়িটা রাখালটার বিড়িতে ঠেকাইয়া দিয়া বলিল, টান।

রাখালটা হুস করিয়া ধোঁয়া ছাড়িয়া দিল।

ঘোঁতন বলিল, হাঁ রে, তোদর ছোট মুনিব আর বড় মুনিবে নাকি ঝগড়া হয়?

–দিন রাত। সেই যে বলে, সাপে নেউলে।

–কেন বল্ তো?

—ছোট মুনিব মানুষটা যে কেমন গো। লোকের কাছে ঠকে আসে। লোককে পাওনা-গোণ্ডা ছেড়ে দেয়। টাকা হাতে পেলেই খরচ করে দেয়। এই বড় মুনিবের রাগ। আর ছোট মুনিবের রাগ, বড় মুনিব কেপন। বড় মুনিব বকে। সবচেয়ে বেশি রাগে, মোল্যানকে বকে বলে।

–হুঁ। বড় মোল্যানের সঙ্গে মহাতাপের খুব মাখামাখি–না রে?

—ওরে বানাস। বড় মোল্যান ছাড়া কথা নাই ছোট মুনিবের। সে যা বলবে তাই বেদবাক্যি।

—তোদের ছোট মোল্যান রাগ করে না?

–করে না আবার? করে, মাঝে মাঝে ফোঁসফোঁস করে। তা ছোট মুনিব বলে—নেহি মাংতা হ্যায়, চলে যা বাপের বাড়ি। বড় মোল্যান আবার বকে ছোট মুনিবকে। ছোট মোল্যানকেও বকে খুব।

–হুঁ। একটু ভাবিয়া লইয়া ঘোঁতন বলিল, ভাল ছেলে তুই—তোকে আমার যাত্রার দলে একটা পার্ট দোব। বুঝলি? করবি?

বার বার সে ঘাড় নাড়িল। মনে মনে মাকে ব্যঙ্গ করিল। চাঁপাডাঙার বউয়ের উপর মায়ের বড় দরদ। অথচ রাখাল ছোঁড়া কি বলিয়া গেল? তাহার মানে কি? নয়ানপুরের যত সব ভেড়ার দল—সেতাব-মহাতাপের অবস্থাকে ভয় করিয়া মুখ খুলিতে সাহস করে না। দেওর-ভাজের মাখামাখিরও একটা সীমা আছে। রাখালটাকে হাত করিয়া ঠিক খবরটা বাহির করিবে সে।

আজকালকার ভাল ভাল উপন্যাসে নরনারী-তত্ত্বের জীবন-রহস্য সে জলের মত বুঝিতে। পারিয়াছে।

ছেলেটা খুশি হইয়া ঘাড় নাড়িল।

ঘোঁতন আবার প্রশ্ন করিল, এখন বল্ তো কোন্ মাঠে বীজ পাড়ছে তোর ঘোট মুনিব?

–ওই তো গো আপনার কাছে কেনাকাড়াজোলের সেই বেঁকী বাকুড়ির মাথায়।

কাঁড়াজোলের মাঠ। এখানে ওখানে লোক হাল বহিতেছে। বৈশাখ মাস বীজ বুনিবার সময়। মহাতাপ লাঙল চালাইতেছিল। তাহার বলিষ্ঠ দেহের সকল শক্তিতে লাঙলের মুঠা চাপিয়া ধরিয়াছে। গরু দুইটা চলিয়াছে মন্থর গমনে।

কৃষাণটা কোদাল কোপাইয়া আলের মুখ কাটিয়া জল-নির্গমের পথ করিয়া দিতেছিল।

এমন সময় আসিয়া দাঁড়াইল ঘোঁতন। ডাকিল, মহাতাপ।

মহাতাপ মুখ তুলিয়া চাহিল, বলিল, ভাঙ খাবার দলে আমি নাই, যা!

–একটা বিড়ি খা।

–বকিস না, আমার সময় নাই। দু আড়া বীজ ফেলতে হবে আমাকে।

সঙ্গে সঙ্গে নাকে তালুতে ঘড়াত শব্দ করিয়া গরু দুইটাকে তাড়া দিয়া বলিল, অই-অই, বেকুব বেহুদা গরু কোথাকার। অই-অই, আবার শব্দ। কহিল—ক্যা-কা-ক্যা-ক্যা।

ঘোঁতন বলিল, ওড়ে দাঁড়া, শোন্। কথাটা বেশ ধমকের সুরেই বলিল।

—কি?

–বলি মানুষের কথা কটা রে?

–ক্যানে? কথা একটা। দু কথার মানুষ মহাতাপ নয়।

–তবে?

–কি তবে! মহাতাপ লাঙল ছাড়িয়া দিল এবার।

–তুই যে দাতাকৰ্ণ সেজে মাকে পাওনা ধান ছেড়ে দিয়ে এলি—

–হ্যাঁ হ্যাঁ। তোর মায়ের জন্যে দিয়েছি। তোর জন্যে নয়।

–বুঝলাম। তো তোর দাদা আবার ধান চায় কেন?

–কি?–তোর দাদা, কিপটে সেতাব–

—এক চড়ে তোর উঁত ভেঙে দেব ঘোঁতনা। কিপটে আছে আপন ঘরে আছে, তুই কিপটে বলবি ক্যানে?

—সে ধান চায় ক্যানে? পঞ্চায়েত ডাকে ক্যানে?

–যা যা, ঘর যা। সে আমি বড় বউকে বলে দোব। সে সব ঠিক করে দেবে।

–বড় বউকে বলে ঠিক করে দিবি? ফিক করিয়া হাসিয়া ফেলিল ঘোঁতন। ঘাড় নাড়িয়া খুব রসিকের মত হাসিয়াই বলিল, হা হ্যাঁ, তাই দিস। কথার শেষে সে আরও খানিকটা হাসিল।

মহাতাপ তাহার হাসি দেখিয়া ক্ষেপিয়া গেল, বলিল, হাসছিস যে? এই, তুই হাসছিস যে?

ঘোঁতনা বিজ্ঞের মত বলিল, হাসলাম। তা তুই রাগছিস ক্যানে?

—তু হাসবি ক্যানে? মহাতাপ আরও দুই পা আগাইল।

–ওই! ওই! সে পিছাইতে লাগিল।

মহাতাপ খপ করিয়া তাহার হাত চাপিয়া ধরিল—ব ব্যাটা ফড়িং, হাসিস ক্যানে? এমন করে হাসলি ক্যানে বল্–

–ছাড়্‌, ছাড়্‌ ছাড়্‌—ওরে বাপ রে।

নোটন ছুটিয়া আসিয়া বলিল, ছোট মোড়ল, ছাড়, ছাড়, ছোট মোড়ল—

দূর হইতে কণ্ঠস্বর ভাসিয়া আসিল-ঠাকুরপো!

দূরে একটি গাছতলায় বড় বউ কাদম্বিনী হাতে গামছায় বাঁধা জলখাবার লইয়া দাঁড়াইয়া ছিল; মাথায় বিড়ার উপর জলের ঘটি। মাঠে চাষের কাজের সময় চাষীদের বধূরাও মাঠে স্বামী। পুত্রের জন্য জলখাবার লইয়া যায়। সেতাব ভরা চাষের সময় ছাড়া চাষে খাটে না। হিসাবনিকাশ দেনাপাওনা বীজের ব্যবসা লইয়া তাহার অনেক কাজ। মহাতাপের চাষ লইয়া মাতন।

ছোট বউকে সমাদর করিয়া কাদু মাঠে বাহির হইতে দেয় না। তাহার উপর পাগলকে তো বিশ্বাস নাই; কোথায় মাঠেই ঝগড়া করিয়া বসিবে মানুর সঙ্গে। তাহার যদি মনে হয় গুড় কম কি মুড়ি নরম তাহা হইলে এক কাদু ছাড়া আর কাহারও সাধ্য নাই যে তাহাকে ঠাণ্ডা করিয়া বুঝাইয়া খাওয়াইতে পারে। মহাতাপের জন্য জলখাবার লইয়া আসিয়া গাছতলায় দাঁড়াইয়াই তাহার চোখে পড়িল ঘোঁতন দাঁড়াইয়া আছে, কি কথা বলিতেছে। কথা যে ধানের কথা তাহা বুঝিতে তাহার কষ্ট হইল না। মুহূর্ত পরেই মহাতাপের উচ্চকণ্ঠস্বরে সে চমকিয়া উঠিল। তাহারও মুহূর্ত পরে মহাতাপকে যুদ্ধোদ্যত দেখিয়া তাহাকে চিৎকার করিয়া না ডাকিয়া পারিল না।

মহাতাপ চমকিয়া তাহার দিকে চাহিল।

নোটন বলিল, বড় মুনিব্যান।

দূর হইতে কাদু বলিল, ছেড়ে দাও ঠাকুরপো। ছেড়ে দাও।

মহাতাপ ঘোঁতনকে ছাড়িয়া দিল, যা বেটা আলকাটার কাপ, আজ তোকে ছেড়ে দিলাম। ফের দিন তোকে কিলিয়ে কাঁঠাল পাকা পাকিয়ে দোব।

ঘোঁতন হাতে হাত বুলাইতে বুলাইতে চলিয়া গেল।

মহাতাপ গাছের তলায় গিয়া বসিল, ব্যাটা হাসে। দেখ তো কাণ্ড।

কাদম্বিনী বলিল, কি হল তাতে? হাসি তো ভাল জিনিস।

–ভাল জিনিস? ওই হাসি ভাল জিনিস? ভাল জিনিস তো গা জ্বলে যায় ক্যানে?

–নাও, ভিজে গামছায় গা মুছে ফেল। জ্বালা জুড়িয়ে যাবে। একটু বুদ্ধি কোরো। বুঝলে, সবতাতেই মারমূর্তি ভাল নয়।

—তুমি এই কথা বলছ? তোমার কথায় কখনও রাগি আমি?

বড় বউ জলের ঘটি আগাইয়া দিল–মুখ ধোও। হাত ধোও।

মহাতাপ হাতমুখ ধুইতে লাগিল।

বড় বউ বলিল, আমার কথায় রাগো না সে তো কথা নয়। পরের কথাতেই বা রাগবে কেন? ছিঃ! কি হল কি? ঘোঁতন হাসলেই বা ক্যানে?

–ক্যান! এবার মহাতাপ চেঁচাইয়া উঠিল—ক্যানে! তোমার নাম করে হাসল ক্যানে?

বড় বউ তাহার মুখের দিকে তাকাইল, ভ্রূ কুঞ্চিত করিয়া বলিল, আমার নাম করে?

–হ্যাঁ। আবার হাসছে যেন মদ খেয়ে আসছে। দাও মুড়ি দাও।

বলিয়া মুড়ির খোরাটা টানিয়া লইল। হস করিয়া জল ঢালিয়া দিল। গুড়ের বাটি হইতে চামচখানেক গুড় লইয়া মিশাইয়া দিল। তারপর বলিল, ব্যাটার হাত ভেঙে দিতাম।

বড় বউ কাদম্বিনী বিচিত্ৰ হাসি হাসিল।তার চেয়ে ওরা হাসুক। হাসতে দাও ওদের। পরের হাত ভেঙে তোমাকে ফ্যাসাদ বাধাতে হবে না।

প্রকাণ্ড হাতে মুড়ির গ্রাস তুলিতে গিয়া মহাতাপ বলিল, এমনি করে হাসবে ঘোঁতনা?

—যাঁর বিচারের ভার তিনিই বিচার করবেন। এতে আমার গায়ে ফোস্কা পড়বে না। কিন্তু ও আবার তোমার কাছে এসেছিল কেন?

ওই দেখ। ভুলে যেতাম এখুনি। তুমি সেই কেপনকে বোলে তো, আমি ঘোঁতনকে যে ধান ছেড়েছি সেটা এবার চাষে ফলিয়ে দোব–দোব–দোব!

বলিয়াই সে বড় বড় গ্রাসে খাইতে লাগিয়া গেল।

চাঁপাডাঙার বউ হাসিয়া ফেলিয়া বলিল, বড় মোড়ল বুঝি ছাড়বে না বলেছে?

খাইতে খাইতেই মহাতাপ বলিল, পঞ্চায়েত ডেকেছে। আজই সন্ধেবেলা।

চাঁপাডাঙার বউ ঘাড় নাড়িয়া বলিল, না-না-না। সে ঘোঁতনের জন্যে নয়। আজ পঞ্চায়েত বসবে–শিবকেষ্ট রামকেষ্টদের হাঁড়ি আলাদা হবে, বিষয় ভাগ হবে।

–উঁহুঁ, ঘোঁতন বলে গেল। কেপনের সর্দার লোক পাঠিয়েছিল।

চাঁপাডাঙার বউ ভ্রূ কুঞ্চিত করিয়া ভাবিয়া লইল।

মহাতাপ উত্তরের প্রতীক্ষা করিয়া বলিল, তুমি বোলো যেন!

–বলব। বলব। তুমি খাও।

–বাস। নিশ্চিন্দি তো?

–হ্যাঁ গো, হ্যাঁ।

–এবার এমন চাষ করব–দেখবে।

–কোরো। এখন খেয়ে নাও।

মহাতাপ বড় বড় গ্রাসে মুড়ি খাইতে লাগিল।

চাঁপাডাঙার বউয়ের বুঝিতে বাকি রহিল না ব্যাপারটা। সে মণ্ডলবাড়ির গৃহিণী, সেতাবও বর্ধিষ্ণু ব্যক্তি হিসাবে এখানকার পঞ্চায়েতের একজন মণ্ডল, গ্রামের সকল খবরই তাহাদের পক্ষে জানা স্বাভাবিক। রামকেষ্ট এবং শিবকে দুই ভায়ের মধ্যে বনিবনাও অনেক দিন হইতেই হইতেছে না। কাজেই তাহারা ভিন্ন হইতে চলিয়াছে। সেইজন্য—আজই সন্ধ্যায় পঞ্চায়েত বসিবার কথা। এই সুযোগ লইয়া সেতাব ঘোঁতনের ব্যাপারটাও পঞ্চায়েতের সম্মুখে উপস্থিত করিবার ব্যবস্থা করিয়াছে—কথাটা মুহূর্তে কাদম্বিনী বুঝিয়া লইল। ব্যাপারটা কাদম্বিনীর ভাল লাগিল না। সেতাবের উপর সে বিরক্ত হইল। এ কি? এই স্বভাবটা কি তাহার কোনোদিন যাইবে না? একদিন যখন অবস্থা খারাপ ছিল তখনকার কার্পণ্যের কথা সে বুঝিতে পারে। আজ এত কার্পণ্য কেন? তা ছাড়া মহাতাপ বুদ্ধিহীন হোক, সেও তো বাড়ির অর্ধেকের মালিক। তাহার অপমান হইবে যে! মহাতাপকে সে স্নেহ করে। মহাতাপ সরল, নিৰ্বোধ, মাথাতেও একটু ছিট আছে—তাহার উপর ভাঙ খায়, লোকের সঙ্গে মারামারি করিয়া আসে, জানোয়ারদের সঙ্গে লড়াই করিয়া আসে, সবই সত্যি। কিন্তু মৃত্যুশয্যায় মায়ের কথাটাও কি মনে পড়ে না। সেতাবের? চাঁপাডাঙার বউয়ের তখন পনের-ষোল বৎসর—মহাতাপের চোদ্দ–পনের, মৃত্যুশয্যায় শাশুড়ি বউকে ডাকিয়া বলিয়াছিল—বউমা, ওই পাগলকে তোমার হাতে দিয়ে গেলাম, তুমি ওকে দেখো।

মহাতাপকে ডাকিয়া মা বলিয়াছিল–বড় ভাজ আর মায়ে সমান। চাঁপাডাঙার বউয়ের কথা কখনও অমান্য করবি নে। ও আমার সাক্ষাৎ লক্ষ্মী।

সেতাবকে ডাকিয়া বলিয়াছিল—সবই তোমার ওপর ভার বাবা। বউমার অযত্ন কোরো না, ও-ই হল এ বাড়ির ঘরের লক্ষ্মী। তুমি বউমাকে দেখো; মহাতাপকে দেখো।

চাঁপাডাঙার বউ তাহার প্রতিশ্রুতি রক্ষা করিয়াছে। সে প্রতিশ্রুতি রক্ষা শুধু কর্তব্যপালন নয়, তাহার সঙ্গে তাহার অন্তরের অকৃত্রিম স্নেহের যোগ আছে। বুদ্ধিহীন মহাতাপ আজও সেই ছেলেবেলার মত চাঁপাডাঙার বউকে অ্যাঁকড়াইয়া ধরিয়া থাকিতে চায়। তাহার ক্রোধ হইলে সে ভয়ঙ্কর হইয়া ওঠে। প্রতিশোধ না লইতে পারিলে সে মেঝের উপর মাথা কোটে। সেসময় তাহার সম্মুখে কেহ দাঁড়ায় না। দাঁড়ায় ওই চাঁপাডাঙার বউ। চাঁপাডাঙার বউ দাঁড়াইলেই মহাতাপের ক্রোধের মাত্রা কমিয়া আসে। সে-ই মুখ তুলিয়া তাহার দিকে তাকায়। চাঁপাডাঙার বউ বলে, ছি! ছি!

মহাতাপ প্রথমটায় প্রতিবাদ করে।

বড় বউ আবার বলে, ছি! ছি! তোমার জন্যে ছি-ছি করে সারা হলাম। চিরকালই কি তুমি ছেলেমানুষ থাকবে?

মহাতাপ এবার নিজের দিকের ন্যায়কে প্রবল করিয়া তুলিতে চেষ্টা করে। বড় বউ বলে, সব বুঝেছি। অন্যায় ওদেরই। কিন্তু সংসারে যে সয়—সেই মহাশয়।

মহাতাপ শান্ত হয়।

মহাতাপের বিবাহও সে-ই দিয়াছে। মানদা তাহারই জ্ঞাতিকন্যা।

মানদা মেয়েটি দেখিতে বড় ভাল। তাহার উপর কাজ কর্মে এমন পারঙ্গম মেয়ে চাষীর বাড়িতেও বিরল। শুধু সেতাবই কি সব ভুলিয়া গেল? দিন দিন পয়সা পয়সা করিয়া সে কি হইতে চলিল।

চাঁপাডাঙার বউয়ের সদাহাস্যময়ী মুখখানি বিষ হইয়া গেল। স্বামীর এই আচরণের সংবাদে মর্মাহত হইল। মহাতাপ এ বাড়ির অর্ধেকের মালিক, তাহার বুদ্ধি নাই কিন্তু তাহার সবল শরীরের পরিশ্রমেই জমির ধানে এ বাড়ির খামার উথলিয়া ওঠে। শুধু তাই নয়—তাহাদের সন্তান নাই, ওই মহাতাপের ছেলে মানিকই এ বংশের উত্তরাধিকারী।

বিষণ্ণ মন লইয়াই সে বাড়ি ফিরিল।

খামার-বাড়িতে কতগুলা কুমড়ার লতা মাচায় উঠি-উঠি করিতেছে, সেতাব একখানা কোদাল লইয়া সেগুলোর গোড়ায় চারা করিয়া দিতেছে। পঁচিলের গোড়ায় হুঁকা-কল্কে ঠেকানো রহিয়াছে।

তাহার অনতিদূরে বসিয়া আছে রামকেষ্ট ও শিবকেষ্টর দুই বিধবা খুড়ী। বয়স চল্লিশবিয়াল্লিশের কাছাকাছি ইন্দাশের বউ ও টিকুরীর বউ। দুই জনেই উবু হইয়া বসিয়া আধঘোমটা দিয়া কথা বলিতেছে, এক জন একটা লাঠি দিয়া মাটিতে দাগ কাটিতেছে।

এক জন বলিতেছে, শিবকেষ্ট রামকেষ্ট ভেন্ন হবে বাবা, তোমরা পঞ্চায়েত মিলে ভাগ করে দিচ্ছ; কিন্তু আমাদের কি হবে, বল?

সেতাব একটু রূঢ়স্বরেই বলিল, সে একা আমাকে বললে কি হবে?

—মোটা মোড়ল তোমাকেই বলতে বললে বাবা। বললে, তোমরা বাপু সেতাবের কাছে। যাও। বয়স ছোট হলেও তার কথাই বিকুবে। তার অবস্থা ভাল। বলতে হেন লোক নাই যে সেতাবের কাছে ধান হোক টাকা হোক ধারে না। শিবকেষ্টদেরও দেনা রয়েছে।

সেতাব কোদালটা রাখিল, বলিল, মিছে কথা বুড়ি, মিছে কথা। দুনিয়া হয়েছে নেমখারামের দুনিয়া। বুঝলে বুড়ি, নেমখারামের দুনিয়া। এই দেখ, ওই ঘোঁতন—সে-ই যাত্রার দলের আলকাটার কাপ, তাকে পঞ্চায়েতে আসতে বলেছিলাম, তা সে বলেছে—নেহি যাঙ্গা।

বউ দুটির এক জন বলিল, শিবকেই রামকে তা বলতে পারবে না বাবা। তোমার ঘরে তমুসুদে বাঁধা। তুমি বললে—তোমার কথা অমান্যি করতে পারবে না।

সেতাব গিয়া হুঁকা-কল্কেটা তুলিয়া লইল, টানিতে টানিতে আসিয়া বলিল, তা তোমরা বলছ কি? কথাটা কি?

চাঁপাডাঙার বউ ইহার মধ্যে কখন আসিয়া ঢুকিয়াছিল। সে আগাইয়া আসিয়া বলিল, কথা আর কি? বিধবা বউ, তাদের খাবার ব্যবস্থা করে দিতে হবে। তা না করে দিলে হবে ক্যানে? তাহলে তোমরা কিসের পঞ্চায়েত?

এক জন বিধবা বলিল, এই হয়েছে। বউমা এসেছে। বল মা, তুমি বল তো। তুমি বলে দাও সেতাবকে।

সেতাব তাড়াতাড়ি বলিল, আহা, তাই তো বলছি গো! তোমরা কি চাইছ তা বল? বলি আলাদা করে থাকতে চাও, না, ওদের সংসারে থাকতে চাও, তা বলতে হবে তো।

এক জন বিধবা বলিল, আলাদা হলেই তো ভাল বাবা। স্বাধীন মতে থাকতে পাই।

সেতাব উৎসাহের সঙ্গেই বলিল, তাই হবে। আলাদাই থাকবে। দুজনকে খানিকটা করে জমি দিতে হবে দুই ভাইকে।

অন্য বিধবা বলিল, তাতে মোটা মোড়লের মত নাই। বলেছে, সে বলতে পারব না বাপু। তোমরা দুদিন পর কাউকে জমি বিক্রয় কর–

সেতাব বলিয়া উঠিল, করে তো করবে।

চাঁপাডাঙার বউ বলিল, না। মোটা শ্বশুর ঠিক বলেছে। তাতে সংসার নষ্ট হবে। খুড়ীদিগেও তো ভাবতে হবে-সংসার শ্বশুরের সংসার, স্বামীর সংসার। রামকেষ্ট শিবকেষ্টই তো খুড়ীদের জল দেবে! তোমরা তা কোরো না খুড়ী, তোমাদের অধর্ম হবে।

–কিন্তু হতচ্ছেদ্দা করবে যে বউমা!

—ছেদ্দা কেউ কাউকে আপনা থেকে করে না খুড়ী, ছেদ্দা করাতে হয়। তুমি যার বাড়িতে থাকবে তাকে যদি পেটের ছেলের মত ভালবাস, তার সংসারে নিজের সংসার বলে খাটো তবে ছেদ্দা না করে সে যাবে কোথায়?

সেতাব ইতিমধ্যে কয়েকবার হুঁকায় ব্যর্থ টান দিয়া ধোঁয়া বাহির করিতে না পারিয়া বসিয়া কল্কেটা ঝাড়িয়া ফেলিয়া তামাক সাজিতে বসিয়াছিল। এবং মধ্যে মধ্যে বিরক্তভাবে আপন মনেই হুঁঃ-হুঁঃ করিতেছিল। চাঁপাডাঙার বউয়ের কথাটা শেষ হইতেই সে বলিল, তাই যা হয় হবে খুড়ী, যা হয় পঞ্চজনে করা যাবে। সন্ধেবেলায় এসো বুঝলে? উ তোমরা বললেও হবে না, চাঁপাডাঙার বউ বললেও হবে না। আমরা পঞ্চজনে বুঝেসুঝে যা হয় করব। হ্যাঁ, সে যা হয়। হবে। সন্ধেবেলাতে এসো চণ্ডীমণ্ডপে।

—তাই আসব বাবা।

বিধবা দুই জন চলিয়া গেল। তাহারা চলিয়া যাইতেই সেতাব সেইদিকে তাকাইয়া দেখিয়া আপন মনেই বলিল, এই মেয়েলোকের মুড়লি আমি দুচক্ষে দেখতে পারি না।

বড় বউ বিধবা দুইটির পিছন পিছন দরজা বন্ধ করিতে গিয়াছিল। দরজা বন্ধ করিয়া ঘুরিয়া দাঁড়াইয়া বলিল, তা পারবে কেন? খুড়ীদিগে জমির ভাগ বার করে দিয়ে জমিটা কিনে নেবার মতলবে ঘা পড়ছে বুঝি? সেই মতলব মনে এসেছে? ডি ছি ছি!

সেতাব ধরা পড়িয়া গেল। হঠাৎ সেই মতলবই তাহার মাথায় গজাইয়া উঠিয়াছিল, বোধ করি মতলবের কথাটা নিজের কাছেও ভাল করিয়া পরিষ্কার হয় নাই। ঠিক যেন রোগসংক্রামিত দেহের প্রথম অবস্থার মত! কেহ বলিয়া দিলে বুঝিতে পারে—তাই তো, শরীরটা অসুস্থই তো হইয়াছে। চাঁপাডাঙার বউ তীক্ষ্ণ দৃষ্টিতে ঠিক ধরিয়াছে তাহাকে। সে চমকিয়া উঠিল। সেই চমকানির ধাক্কায় হাতের কঙ্কেটা উল্টাইয়া গেল, কোটা পড়িয়া গেল। সে চাঁপাডাঙার বউয়ের দিকে তাকাইয়া বলিল, তোমার দিব্যি, এই হুঁকো ছুঁয়ে বলছি।

চাঁপাডাঙার বউ বলিল, আমি মরে গেলেই বা তোমার কি? আর হুঁকো ছুঁয়ে মিথ্যে বললেই বা সংসারে কি হয় শুনি?

সেতাব অপ্রতিভ হইয়া বলিল, হুঁকো ছুঁয়ে বললেই বা কি হয়? তুমি মরে গেলেই বা আমার কি?

–হ্যাঁ গো! বল না কি হয়?

সেতাব আছাড় মারিয়া হ্ৰকাটা ভাঙিয়া ফেলিল, বলিল, হুঁকোর কিছু না বলেছে! এই নে।

—এইবার কোদাল নিয়ে আমার মাথাটা কাটো!

সেতাব চিৎকার করিয়া উঠিল, চাঁপাডাঙার বউ! যা-তা বোলো না বলছি।

চাঁপাডাঙার বউ খুব গম্ভীরভাবে বলিল, পরের ঘর ভাঙতে যেয়ো না। তোমার নিজের ঘর ভেঙে যাবে।

সেতাব এবার হাত জোড় করিয়া বলিল, জোড়হাত করছি চাঁপাডাঙার বউ, তুমি থাম তুমি থাম।

চাঁপাডাঙার বউ সঙ্গে সঙ্গে গড় হইয়া প্ৰণাম করিল, বলিল, তুমি হাতজোড় করলে, আমি। তোমাকে পেনাম করছি। প্রণাম সারিয়া উঠিয়া বলিল, আরও একটা কথা তোমাকে বলি। ঘোঁতন ঘোষের ধান মহাতাপ ছেড়ে দিয়েছে, তুমি তবু লোক পাঠিয়ে পঞ্চায়েতে ঘোঁতনকে ডেকে পাঠিয়েছ। ভাল কর নি। ও-কথা আর তুলো না।

সেতাব চঞ্চল হইয়া উঠিল, বলিল, ইয়েকে বলে, ই তো ভারি ফেসাদ জুড়ে দিলে! পাওনা ধান ছেড়ে দেব?

চাঁপাডাঙার বউ বলিল, মহাতাপের মানের চেয়ে ধান বড় হল? তার অপমান হবে।

–বোকা পেয়ে তাকে ঠকিয়ে নিলে, তাতে অপমান হয় না আর–

—না, হয় না। যে দান করে সে দাতা। দাতার বোকা বুদ্ধিমান নাই। মহাতাপ দান করেছে। তাকে যদি খাটো করতে চাও, তবে আমি উপোস দেব বলে দিলাম।

বলিয়া সে হনহন করিয়া বাড়ির ভিতর ঢুকিয়া গেল।

সেতাব নিজের মাথার চুল খামচাইয়া ধরিয়া বসিয়া রহিল। হঠাৎ সে চিৎকার করিয়া বলিয়া উঠিল, আমি মানি না, মানি না। কারুর কথা আমি মানি না। আমি সেতাব মোড়ল। বলিয়া সেও বাহির হইয়া চলিয়া গেল।

চাঁপাডাঙার বউকে সে ভয় করে। আবার তাহাকে নহিলে তাহার একদণ্ড চলে না।

চাঁপাডাঙার বউ যেন তাহার বুকের ভিতরটা দেখতে পায়। কোনো কথা তাহার কাছে গোপন থাকে না। তার উপর তার কাটাকাটা কথা। সেতাব থই পায় না। আবার বিচিত্র চাঁপাডাঙার বউ, সে তার বাপের মৃত্যুকালে দেওয়া হাজার টাকা দামের গহনা সেতাবের হাতে দিয়া হাসিয়া বলে টাকার অভাবে তুমি নিলেমে লক্ষ্মীপুরের বাবুদের চরের জমিটা কিনতে পারছ না, জমিটা হাতছাড়া হলে তোমার দুঃখ হবে। কিনে ফেল জমিটা। পরে আমাকে টাকা দিয়ো।

লক্ষ্মীপুরের বাবুদের চরের জমি—সোনা-ফলানোচর। সেখানে এক-একটা তরমুজ হয়। পাঁচ সের ওজনের। সেই জমি কেনার পর মণ্ডলবাড়ি আবার পূর্বের শ্ৰী ফিরিয়া পাইয়াছে। আগের অবস্থাকেও ছাড়াইয়া গিয়াছে। কিন্তু–কিন্তু তাই বলিয়া কি তাহার হুকুমে ওই ঘোঁতনের মত পাষণ্ড উদ্ধত শয়তানকে পাওনা ছাড়িয়া দিতে হইবে। ঘোঁতনকে সে দু-চক্ষে দেখিতে পারে না। সেই স্কুলজীবন হইতে। মহাতাপের অপমান হইবে? মহাতাপ তাহার মায়ের পেটের ভাই। বিষয়-সম্পত্তি, এই ভূতের বেগার খাটা কাহার জন্য? তাহার নিজের জন্য? সে খায় কমুঠা? পরে কি? তাহার নিজের সন্তান আছে? সে খাটে মণ্ডলবাড়ির জন্য। সবই পাইবে মহাতাপের ছেলে মানিক। মানিকের যে ভাইয়েরা ইহার পর আসিবে তাহারা। চাঁপাডাঙার বউ ছাড়া অন্য কেহ হইলে সে এতদিন বংশরক্ষার জন্য আবার বিবাহ করিত। কিন্তু সেতাব তা করে নাই। তুমি সেটা মান না! ঘোঁতনকে পাওনা ছাড়িতে হইবে। রামকেষ্ট শিবকেষ্টদের জমি কিনিতে সে পাইবে না। তোমার কথায়? প্রতাপ মোড়ল মারা গেলে সম্পত্তি নিলামে উঠিয়াছিলরামকেষ্ট শিবকের বাপ হরেক মণ্ডল চাদর গায়ে দিয়া চটি পায়ে দিয়া সদরে গিয়া প্ৰতাপ মোড়লের খিড়কি পুকুরের অংশ কিনিয়াছিল। এখনও তাহারা সে পুকুরের অংশীদার। তোমার কথায় তাহাকে চুপ করিয়া থাকিতে হইবে! তুমি সেতাবকে ধর্ম-অধৰ্ম শিখাইতে আসিয়াছ! রাগে তাহার চুলগুলা ছিঁড়িয়া ফেলিতে ইচ্ছা হইতেছে।

বাহিরে আসিয়া গোয়াল-বাড়িতে দাঁড়াইল। ডাকিল, গোবিন্দে, গোবিন্দে! ওরে অ-গোবিন্দে! গোবিন্দে।

গোয়ালঘর হইতে গোবিন্দ বাহির হইয়া আসিল—কি বলছেন গো?

সে চোখ কচলাইতে লাগিল।

–ঘুমুচ্ছিলি?

–ঘুমুই নাই। বসে বসে ঢুলছিলাম।

–ঢুলছিলি?

–কি করব? বড় মনিব্যান না এলে তো দুধ দোয়ানো হবে না।

–তু এক কাজ কর। ছুটে যাবি রামকেষ্টদের বাড়ি, বুঝলি?

ঘাড় নাড়িয়া গোবিন্দ বলিল, হ্যাঁ।

–রামকেষ্টদের দুই কাকীকে জানিস তো?

–এই তো খানিক আগে এয়েছিল, তারাই?

–হ্যাঁ। তাদের যাকে পাবি ডাকবি, আড়ালে ডাকবি, বলবি—কেউ যেন না শোনে, বুঝলি?

–হ্যাঁ, চুপিচুপি বলব।

–হ্যাঁ। বলবি–বড় মুনিব বলে দিলে, তোমরা জমি চাইবে। বাস, বলে চলে আসবি।

বলিয়াই আপন মনে বলিল, তারপর আমি দেখছি। আমি কারুর কথা শুনি না। কাউকে গেরাহ্য করি না। বড় সব বড় বেড়ে গিয়েছে।

বলিতে বলিতে গোয়ালবাড়ি হইতেও বাহির হইয়া গেল।

চণ্ডীমণ্ডপের পঞ্চায়েত মজলিসে সেতাব আসিল সকলের শেষে। মজলিসের সকলে তাহারই প্রতীক্ষা করিতেছিল। প্রায় দশ-বার জন লোক বসিয়া আছে। পঞ্চায়েতের প্রধান মোটা মোড়ল বিপিন মণ্ডল স্থূলকায় মানুষ, গলায় তুলসীর মালা, কপালে তিলক। শান্তদর্শন লোকটি। তাহার আশপাশে বাকি লোক বসিয়া আছে। রামকেষ্ট ও শিবকেষ্ট দুই ভাই দুই বিপরীত দিকে বসিয়াছে। একটু দূরে বসিয়া আছে তাহাদের দুই বিধবা খুড়ী। মাঝখানে একটা হারিকেন জ্বলিতেছে।

চণ্ডীমণ্ডপের সামনে পথের উপরে জন চার-পাঁচ ছোকরা অন্ধকারের মধ্যে বিড়ি টানিতেছে। একজন বলিতেছিল, জমি তো মোট তিরিশ বিঘে। তাতে খুড়ীদিকে জমি দিতে গেলে ওদের থাকবে কি? অন্য একজন বলিল, ওরা ধরেছে, জমিই ওরা নেবে। সংসারে থাকা মানে অধীন হয়ে থাকা। সে ওরা থাকবে না।

–তা বললে চলবে কেন? ওদের দু ভায়ের কথা ভাবতে হবে তো?

–পঞ্চায়েত কি বলছে?

—মোটা মোড়ল না বলেছে। আর সবাই চুপ করেই আছে। সেতাব পাকু না এলে মুখ খুলবে না।

ঠিক এই সময়েই পিছনে শোনা গেল গলাঝাড়ার শব্দ। একজন বলিল, কে?

পথের বাঁক হইতে লণ্ঠন হাতে বাহির হইয়া আসিল সেতাব।

সকলে পরস্পরের মুখের দিকে চাহিল। একজন বলিল, সেতাবাদা!

সেতাব বলিল, আর সেতাবাদাঁতে কাজ নাই। পথ ছাড়।

একজন হাসিয়া বলিল, কি হল, মেজাজ এত খারাপ কেন?

সেতাব তাহাদিগকে অতিক্ৰম করিয়া চণ্ডীমণ্ডপের তালগাছের টুকরা দিয়া গড়া সিঁড়িতে পা দিয়া বলিল, সেতাব কারু কথা গেরাহ্য করে না, বুঝেছ? সে পেকো চামদড়ি কৃপণ—যা বল। ন্যায্য কথা সেতাব বলবেই, আর ন্যায্য দাবি পাওনা সে কড়াক্রান্তি কাউকে ছাড়বে না।

সে গটগট করিয়া উপরে উঠিয়া গেল। মেজাজটা সত্যই তাহার খারাপ হইয়া আছে।

মহাতাপ সন্ধ্যার সময় কাঁধে খোল লইয়া সংকীর্তনের দলে যোগ দিতে যাইবার পথে বাড়ির দুয়ারে প্রকাণ্ড একটা গোখুরা সাপ মারিয়াছে। বৈশাখ মাস, গোখুরা সাপকে পিতিপুরুষে ব্রাহ্মণ বলিত, তাহার উপর অনেক সাপ বাড়ির লক্ষ্মীর প্রহরী। সাপটা বাহির দরজার পাশ দিয়া যাইতেছিল। মহাতাপ একে মহাতাপ, তাহার উপর বৈকালে ভাঙ খাইয়াছে। সাপটাকে দেখিবামাত্র খোল নামাইয়া খামারের একটা বাঁশ লইয়া দুমদাম শব্দে দুই-তিনটা আঘাতেই শেষ। করিয়াছে। তিরস্কার করিলে বলিয়াছে, সাপ যদি লক্ষ্মীর পাহারা হয় তো মহাতাপও দিগ্গজ পণ্ডিত!

তারপর দুই হাতের বুড়া আঙুল নাড়িয়া বলিয়াছেকচু জান তুমি! এ বাড়ির লক্ষ্মীর পাহারা সাপ নেহি হ্যায়, মহাতাপ হ্যায়। এ বাড়ির লক্ষ্মী হল বড়াবউ, আর মহাতাপ মণ্ডল পাহারাদার!

সাপটাকে দেখাইয়া বলিয়াছে, ও বেটা লক্ষ্মীকে ডংশাতে এসেছিল। এখুনি বড় বউ আসত সন্ধ্যেতে বারদোরে জল দিতে। বাস্! ফেঁসা না-না করে লাগাত ছোবল!

বলিয়াই খোল লইয়া বাহির হইয়া গিয়াছে।

তাহার উপর পঞ্চায়েত আসরে আসিবার জন্য লণ্ঠনটি হাতে লইয়া পা-টি সবে বাড়াইয়াছে। অমনি আদরিণী বড় বউ টুক করিয়া পিছু ডাক দিয়াছে। সে ডাকার কত ঢং!

পিছু ডাকছি না। কিন্তু মনে করিয়ে দিচ্ছি আমার মাথার দিব্যি রইল!

সেতাব চমকিয়া উঠিয়াছিল। ভুরু কুঁচকাইয়া বলিয়াছিল–মানে?

হাসিয়া কাদু বলিয়াছিল—ওর আবার মানে থাকে নাকি? মাথার দিব্যি মানে মাথার দিব্যি।

–তা তো বুঝলাম। কিন্তু কিসের জন্যে?

কাদু উত্তর দিয়াছে—সত্যি যদি আমাকে ভালবাসতো কিসের জন্যে তা পঞ্চায়েতের আসরে যেতে যেতে ঠিক মনে পড়বে।

সেতাব চটিয়া উঠিয়াছিল—হেঁয়ালি সে ভালও বাসে না, বুঝিতেও পারে না। অথচ এই কাদুর অভ্যাস। কাদুর স্পৰ্ধা একেবারে আকাশে ঠেকিয়াছে। গায়ের অনেক মেয়ে আড়ালে আড়ালে বলে—মোড়লবাড়ির চাঁপাডাঙার বউ অহঙ্কারে যেন মটমট করছে। হেসে ঠেকার দিয়ে কথা কয় যেন বিন্দাবনের রাধা। সেতাবের মনে হইয়াছিল তাহারা মিথ্যা বলে না। সে উত্তরে বলিয়াছে—ভাল আমি কাউকে বাসি না; হ্যাঁ।

শুনিয়া কাদুর সে কি হাসি।—বেশ আর একবার বল—তিন সত্যি হোক।

–ক্যানে, মিছেমিছি তিন সত্যি করব ক্যানে? কি দায় পড়েছে!

সারাটা পথ সেতাব আপন মনে গজগজ করিতে করিতে আসিতেছে।

মজলিসের প্রান্তে গিয়া লণ্ঠন রাখিয়া প্ৰণাম করিল। তারপর মজলিসে গিয়া বসিল। বিপিন। তাহাকে দেখিয়াই বলিল, এস বাবা। তোমার অপেক্ষাতেই বসে আছি। নাও, তামাক খাও। কোটা সে আর একজনকে দিল। সে অপেক্ষাকৃত বয়স্ক ব্যক্তি। সে সেতাবের দিকে আগাইয়া দিল। সেতাব হুঁকোটা লইয়া মজলিস হইতে সরিয়া গিয়া পিছন ফিরিয়া টানিতে বসিল। টানিতে টানিতে বলিল, তারপর? কি ঠিক হল সব?

বিপিন বলিল, এ দিকে তো গোল কিছু নাই! জমি মাপজোক, হিসেবকিতেব সে সব তো হয়েই আছে একরকম। রামকেষ্ট শিবকেষ্ট, আপন আপন পছন্দ করেও নিয়েছে। বাসনকোসন ভাগ কাল সকালে হবে। এখন দুই খুড়ী বলছে—আমাদের খাবার মত জমি বার করে দাও।

শিবকেষ্ট বলিল, খেতে দিতে আমরা নারাজ নই। কিন্তু জমি দিতে গেলে আমাদের থাকবে কি?

এক খুড়ী বলিল, তা বাবা, তোমাদের সঙ্গে কি বউদের সঙ্গে আমাদের যদি না বনে?

বিপিন বলিল, ও কথা অনেক হল বউমা। আর থা। আমার বাপু জমি দেবার মত নাই।

যে মাতব্বর কাটা লইয়া সেতাবকে দিয়াছিল সে বলিল, আমি বলি কি, একটা ধান বরাদ্দ করে দেওয়া হোক, দুজনে দুই খুড়ীকে দেবে। আর দুই খুড়ীর থাকবার মত দুখানা ঘর, রান্নাঘর।

বিপিন বলিল, তা মন্দ কথা নয়। সেতাব, বল বাবা, কি বলছ?

সেতাব হুঁকাটা লইয়া মজলিসের মধ্যে ফিরিয়া বলিল, লেন, খান। বিপিন হুঁকাটা লইল। সেতাব বলিল, আপনাদের উপর আমার কথা বলা ঠিক নয় জেঠা। তবু না বললেও নয়।

একজন বিধবা বলিল, বল বাবা, তুমি হক কথা বল।

–হক কথাই বলব, যেন রাগ-টাগ কেউ করবেন না। ধান ঘর এসব আমার মত নাই। দেখুন, দু বছর পর যদি ধান বন্ধ করে, কি কোনো বছর যদি ভাল ফসল না হয়? দিতে না পারে?

বিধবা টিকুরীর খুড়ী বলিল, এই। বুদ্ধিগুণেই হা-ভাত, বুদ্ধিগুণেই খা-ভাত। পঞ্চায়েত বুঝে দেখুক।

ইন্দাশের খুড়ী সঙ্গে সঙ্গে সুর ধরিল, তার চেয়ে আমাদের দু জাকে পাঁচ বিঘে করে দশ বিঘে জমি আলাদা করে দাও বাবা, আমরাও নিশ্চিন্দি তোমরাও নিশ্চিন্দি। সাতখানা খাটের দড়িতে থাকব না।

—উঁহুঁ-উঁহুঁ। সেতাব ঘাড় নাড়িল। সাতখানা খাটের দুড়িতে থাকব না বললে কি হয়। খুড়ী? তোমাদের মুখে আগুন দেবে ওরা, তোমাদের মুখে জল দেবে, শ্রাদ্ধ করবে ওরা। বুড়ো বয়সে অসুখ করলে ওদেরই তোমাদের সেবা করতে হবে। তোমাদের শ্বশুর-স্বামীর বংশ। ভাসুরের ছেলে, স্বামীর ভাইপো। তোমাদের গর্ভের সন্তান নাই; ওরাই তোমাদের সন্তান। আমি বলি, জমি দেওয়াও নয়, ধান দেওয়াও নয়, দুই খুড়ী দুই ভাসুরপোর ঘরে মায়ের মতন থাকবে, তেমনি যত্ন-আত্যি করবে, নাতিনাতনী নিয়ে ঘর করবে, এরা সেবা করবে, ছেদ্ধা-ভক্তি করবে, বাস।

বিপিন বলিয়া উঠিল, ভাল ভাল ভাল। এর চেয়ে আর ভাল কথা হতে পারে না। গোবিন্দ। গোবিন্দ! হরিবোল হরিবোল।

সেতাব বলিল, পৃথক হলেই পৃথক। মা বেটায় পৃথক হলে মা বেটা পর হয়। আবার পুরকে আপন করলে পরই আপন হয়। শিবকেষ্ট রামকেষ্ট পৃথক হচ্ছে, কেন হচ্ছে জানি না। তা হচ্ছে। হোক। কিন্তু তোমরা খুড়ীরা দু ভাগকে চার ভাগ করে সংসারটার সর্বনাশ করে দিয়ো না।

অন্য একজন বলিল, বা বাস্। এর ওপর আর কথা নাই। হরিবোল হরিবোল।

আর একজন বলিয়া উঠিল, তাই বটে। হরিবোল হরিবোল!

মজলিসের মধ্যে গুঞ্জন উঠিল।

ওদিকে ঠিক এই সময়ে বাহিরের রাস্তা হইতে কোন একজনের চিৎকার শোনা গেল–বিচার করুক পঞ্চায়েত, এর বিচার করুক। গরিব বলে আমার মান-ইজ্জত নাই? পঞ্চায়েত–

বলিতে বলিতেই গায়ের চাদরখানা কোমরে জড়াইতে জড়াইতে আসিয়া উপস্থিত হইল রাখাল পাল। বিশ্বামিত্রের মত ক্রোধী শীর্ণকায় রাখাল আসিয়া বসিয়াই মাটিতে একটা চাপড় মারিয়া বলিল, পঞ্চায়েত এর বিচার করুক। মজলিসটা স্তব্ধ হইয়া গেল।

সেতাব বলিল, কিসের বিচার রে বাপু? হঠাৎ যে একেবারে গগন ফাটিয়ে চেঁচাতে লাগলি!

রাখাল বলিল, চেঁচাবে না? আলবৎ চেঁচাবে। পঞ্চায়েত বিচার করবে কি না বলুক!

বিপিন মোড়ল এবার বলিল, কি হল তাই বল?

—আমাকে মারলে। ঠাস করে এক চড়! এই গালটা দেখ, পাঁচটা আঙ্গুলের দাগ বসেছে। সে লণ্ঠনটা তুলিয়া লইয়া নিজের গালের পাশে ধরিল।

—আঃ, তাই তো রে; কে মারলে—

—ওই ওরই ভাই। সে আঙুল দিয়া সেতাবকে দেখাইয়া দিল।

–মহাতাপ? সেতাব প্রশ্ন করিল।

–হ্যাঁ—হ্যাঁ—হ্যাঁ।

সেতাব মাথা হেঁট করিয়া বলিল, কি বিপদ হয়েছে যে আমার!

বিপিন প্রশ্ন করিল, এমনি মারলে তোকে মহাতাপ? মহাতাপ রাগী বটে, খানিকটা অবোধও বটে, কিন্তু এমনি কেন তোকে মারবে রাখাল?

–নাম সংকেত্তনের দলে আমি বাজাচ্ছিলাম। রাখাল পালের সঙ্গে খেলে কে হাত দিতে পারে বলুক পঞ্চায়েত। আমি হক মেরে বলছি, পাঁচখানা গায়ে কে আছে তা বলুক।

–নাই। তাই হল। সে কথা থাক। কি হল তাই বল।

রাখাল বলিল, তাই হল লয়। ডাক কে আছে? ডাক। একটু চুপ করিয়া রহিল। বোধ করি, কেহ তাহার এই আত্মশ্লাঘার উত্তরে সাড়া দেয় কি না দেখিবার জন্যই চুপ করিয়া রহিল। তাহার পর বলিল, আমাকে বলে, তাল কাটছে। নিজে ভাঙ খেয়ে তাল কাটছে। তার ঠিক নাই। আমি বললাম, তোর কাটছে। তা গায়ের জোরে বলে, না, তোর। আমি বললাম, মহাতাপ, ক্ষ্যাপামি করিস তোর বউয়ের কাছে বউদির কাছে, এখানে করি না। এই আমার গালে বসিয়ে দিলে এক চড়।

বিপিন বলিল, তুই বউ বউদির কথা তুললি কেন?

—কি, হয়েছে কি? বলি তাতে কি হয়েছে কি? তোমরা বিচার করবে কি না বল?

সেতাব বলিল, হবে, বিচার হবে। নিশ্চয় হবে। বস্ তুই। আগে এই কাজ শেষ হোক। তারপর হবে।

—তারপর হবে?

–হ্যাঁ। বস্ তুই।

–বসব? বসতে হবে?

–হ্যাঁ রে, তামাক খা।

–নেহি মাংতা হ্যায়। চাই না বিচার আমি চাই না।

বলিয়া রাখাল হনহন করিয়া চলিয়া গেল। বাহির হইতে বলিল, বড়লোক কিনা? নিজের ভাই কিনা? বেমক্কা চড় খেয়ে যদি মরে যেতাম আমি?

বিপিন বলিল, গাঁজা খেয়ে খেয়ে রাখালের মেজাজে আগুন ধরেই আছে। মহাতাপকে সাবধান কোরো সেতাব। ভাঙ খেতে ওকে দিয়ো না।

সেতাব দীর্ঘনিশ্বাস ফেলিয়া বলিল, আমার হয়েছে মরণ। বুঝলেন? আমার কথা কি শোনে?

–চাঁপাডাঙার বউমাকে বোলো, তাকে খুব মানে শুনেছি।

হঠাৎ সেতাব বলিয়া উঠিল, আমি যাই, হতভাগাকে একবার দেখি–

—বোসো, বোসো। মাথা খারাপ কোরো না। এদের কাজটা সেরে দাও বাবা।

সেতাব আবার বসিল। বলিল, এর আর সারাসারি কি বলুন? দুই খুড়ী দুই ভায়ের ভাগ। কে কাকে নেবে বলুক। খুড়ীরাও বলুক।

যে ব্যক্তি সেতাবকে কা দিয়াছিল সে বলিল, ছোট খুড়ী ইন্দেশের বউ তো ছোট ভাই রামকেষ্টর সম্পর্কে শাশুড়ি হয়। রামকেষ্টর বউ তো ভাইঝি হয়!

রামকেষ্ট বলিল, তা হোক। ছোট খুড়ীর টান দাদার ছেলেদের ওপর। ভাইঝিকে দশটা কড়া কথা না বলে জল খায় না।

ইন্দেশের বউ বলিয়া উঠিল, আর তোমার বউ মুখে ময়দা লেপে চুপ করে শোনে, না? একেবারে ভাল মানুষের পিতিমে। আমাকে বলে না? বলে কি বাবা সকল—তবে ভাইঝির কথা বলি শোন। লুকিয়ে চাল ধান বেচে পয়সা করে। আমি বলি, সাজার সংসারে চুরি করিস না। ভাগী ভঁড়িয়ে খেতে নাই। তাই রাগ বাবা। সেদিন নিজের ছেলেকে একটা বশি কিনে দিলে। তা শিবকেষ্টর ছোট ছেলেটা কাঁদতে লাগল। আমি বললাম, একেও একটা কিনে দে। পয়সা তো সাজার সংসারের পয়সা, মুখ বেঁকিয়ে চলে গেল। আমি বাবা তাকে একটা বাঁশি কিনে দিয়েছি।

হ্যাঁ, তা দিয়েছি। ছেলেটি আমার কাছে থাকতে ভালবাসে। এই রাগ।

সেতাব বলিল, বেশ বেশ। তা হলে খুড়ী শিবকেষ্টর সংসারেই থাকবে।

—তাই থাকব। সেই ভাল।

–আর মেজ খুড়ী টিকুরীর বউ রামকেষ্টর সংসারে থাকবে। বুঝলে গা খুড়ীরা?

টিকুরীর খুড়ী বলিল, বুঝলাম বাবা, খুব বুঝলাম। এমন বোঝা আর বুঝি নাই কখনও। আঃ, মরি মরি মরি।

—তার মানে?

–মানে? তুমি বাবা দুমুখো সাপ। এক মুখে কামড়াও এক মুখে ঝাড়। তাই হল। তোমরা পঞ্চায়েত, যা বলবে তাই হল।

বলিয়া সে উঠিয়া চলিয়া গেল।

সেতাব ডাকিল, খুড়ী! অ খুড়ী।

বিপিন বলিল, উই উঁহুঁ! ডেকো না। যাক। ভাগ করতে গিয়ে সবাইকে সন্তুষ্ট করা যায় না। বাবা। থাক। এখন শিবকেষ্ট, রামকেষ্ট, ইন্দেশের বউমা, এই যা হল—তাতে তোমরা মোটামুটি খুশি তো?

শিবকে বলিল, আমার আপত্তি নাই।

–রামকেষ্ট?

–আমি মশায় যা করে দেবেন তাতেই রাজি।

ইন্দেশের বউ বলিল, আমি মেনে নিয়েছি বাবা, আমি মেনে নিয়েছি।

সেতাব উঠিল। আমি তা হলে উঠলাম জেঠা।

বিপিন বলিল, তা তোমার সেটা কি করে হবে? ঘোঁতনের সেইটা। ঘোঁতন তো আসে নাই।

সেতাব বলিল, সেসে আমি ছেড়ে দিলাম। বুঝেছেন? সে ছেড়ে দিয়েছি। মহাতাপ যখন ছেড়ে দিয়েছে, তখন ও-কথা থাক। তবে বলতে চেয়েছিলাম, ঘোঁতন আমাকে আঙ্গুল দেখাবে ক্যানে? বুঝেছেন? আর পাগলকে শিব সাজাবার লোভ দেখিয়ে দশ টাকা চাঁদাই বা নিয়েছে। ক্যানে? তারই জন্যে। বলুন না দশজনে এ জোচ্চুরি কি না! আচ্ছা, আমি চললাম জেঠা।

সে বাহিরে আসিয়া আবার একটি প্রণাম করিয়া লণ্ঠনটি হাতে করিয়া বাহির হইয়া গেল।

সেতাব বাড়ির দরজায় আসিয়াই চাঁপাডাঙার বউয়ের উচ্চ কণ্ঠস্বর শুনিতে পাইল। বাড়ির ভিতরে চাঁপাডাঙার বউ কাহাকে তিরস্কার করিতেছে।

তোমাদের দু ভায়ের জ্বালায় হাড়ে কালি পড়ে গেল। নিন্দে শুনে কান পচে গেল।

সেতাব দরজা খুলিয়া গোয়াল-বাড়িতে প্রবেশ করিল, তাহার পর খামার-বাড়িতে ঢুকিল। এবার মহাতাপের কণ্ঠস্বর শোনা গেল। সে বলিল, আমি তোমাকে জ্বালাব? আমি তোমার হাড়ে কালি পড়ালাম?

–পড়াও না?

–কক্ষনও না। সে পড়ায় তোমার স্বামী কুচুটে পাকাটি চামদড়ি কেপন—

–ছি ছি মহাতাপ।

–আর ওই ছোট বউ। ওই কুঁদুলী, ওই ঘ্যানঘেনানী, ওই দুটু সরস্বতী।

মানদার কণ্ঠস্বর শোনা গেল, ও মা গ—অ! বলে সেই দরবারে হেরে বউকে মারে ধরে। আমাকে নিয়ে পড়লে কেন?

সেতাব বাড়ি ঢুকিয়াই আলোটি কমাইয়া দিয়া খামার-বাড়িতে চুপ করিয়া বসিল।

বাড়ির ভিতরে তখন মানদা ঘর হইতে বাহির হইয়া আসিয়া বলিল, খবরদার বলছি, আমাকে নিয়ে কথা বলবে না বলছি।

চাঁপাডাঙার বউ বলিল, মানু, তুই চুপ কর।

—কেন? চুপ করব কেন? আমাকে নিয়ে পড়ল কেন?

মহাতাপ বলিল, পড়বে না? তুই তো আজ আমাকে ভাঙ খাওয়ালি। তুই কিনে আনিয়ে বেটে শরবত করে রাখিস নি, বললি নি? বলুক বড়গিনি; সারাদিন ভূতের মত খাটো, বরাবরের অভ্যেস না খেলে বাঁচবে কেন? ভাঙ খেলে আমার চড়াত করে রাগ হয়ে যায়। দিলাম চড়িয়ে রাখালের গালে।

—এখন রাখালের বউ গাল পাড়ছে শোন গিয়ে। যত শাপশাপান্ত একরত্তি মানিকের ওপর। কেন তুমি এমন করে মেরে আসবে?

–নিজে তাল কেটে আমাকে তালকানা বলবে কেন? আমি তালকানা? ও আমাকে বললে। আমি ছাড়ি না কাটি?

–হ্যাঁ, তুমিই তালকানা, তোমার তাল কেটেছিল, আমি বলছি। নাও, মার আমাকে দেখি।

–বড় বউ! ভাল হবে না বলছি!

–নাও, মার না।

—তুমি ছোট বউ হলে সে দিতাম এতক্ষণ।

মানদা ফোঁস করিয়া উঠিল, কই, মার না দেখি।

—দেখবি?

বড় বউ দাওয়া হইতে উঠানে নামিল,—কাল সকালে আমি চলে যাব তোমাদের বাড়ি থেকে। তোমাদের দুই ভায়ের মনোবাঞ্ছা পূর্ণ হবে। তারও হবে। মহাতাপের দিকে চাহিয়া বলিল—তোমারও হবে। দুই ভাইয়ে যা খুশি করবে। এই রাতদুপুরে দুদিক থেকে দুই ভায়ের ওপর গাল পড়ছে। ওদিকে রামকেষ্টদের বাড়ি থেকে, এদিকে রাখালের বউ। আমি আর পারব। না, আমি আর পারব না।

বলিয়া চাঁপাডাঙার বউ ঘরে ঢুকিয়া গেল।

মানদা বলিল, নাও, হল তো। গোসাঘরে খিল পড়ল তো। আর খাবেও না, সাড়াও দেবে না, কাঠ হয়ে পড়ে থাকবে।

সেতাব এবার আসিয়া ঘরে ঢুকিল; সে আর থাকিতে পারে নাই। সে বলিতে বলিতেই ঢুকিল, একে বলে, এতো বড় ফেসাদ। একে বলে, ঘোরালে লাঠি, ফেরালে কোতকা সেই বিত্তান্ত! আরে বাপু, আমার অন্যায়টা কি হল? তুমি যা বললে, তাই করে এলাম। জমি ধান সব দেওয়া বাতিল করে দুই বউকে দুই ভায়ের ভাগে ভাগ করে দিলাম। তাতেই গাল দিচ্ছে টিকুরীর খুড়ী। রামকেষ্ট নয়। তা আমি কি করব? ঘোঁতনার ওপর নালিশ তুলে নিলাম

মহাতাপ উঠানে ভাম হইয়া দাঁড়াইয়া ছিল, সে হঠাৎ বলিয়া উঠিল, তোমার মনোবাঞ্ছাই পূৰ্ণ হোক–চললাম আমি।

সেতাব ব্যস্ত হইয়া বলিল, অই—অই–ওরে, চললি কোথা? ওরে। অঃ, এ গোয়ারগোবিন্দকে নিয়ে কি করি বল তো? ওরে। সেতাবও বাহির হইয়া গেল।

বাহির হইতে মহাতাপ বলিল, সেই রাখলার কাছে চললাম। তার পায়ে ধরে নাকে খত দিয়ে নাকের চামড়া তুলে দিয়ে আসছি।

মানদা ব্যস্ত হইয়া ডাকিল, দিদি! দিদি! শুনছ?

বড় বউ আবার বাহির হইয়া আসিল।

মানু বলিল, ওই আবার গেল, বারণ কর।

–না। যাক। রাখাল প্রবীণ মানুষ, গাঁজা খায়, কিন্তু কখনও কারুর মত করে না। ধার্মিক লোক। তার কাছে মাপ চেয়ে আসুক। রাখালের বউয়ের শাপশাপান্ত আর শুনতে পারছি না।

মানদা ফোঁস করিয়া উঠিল—আর টিকুরীর খুড়ীর শাপশাপান্ত? বড় মোড়লকে পাঠাও পায়ে ধরতে।

চাঁপাডাঙার বউ বলিল, বড় মোড়ল ন্যায়বিচার করে এসেংহ মানু। অন্যায় তো করে নি। টিকুরীর খুড়ীই অন্যায় করে শান্ত করছে। সে শাপান্ত আমাদিগকে লাগবে না। আর সে গাল তো দিচ্ছে বড় মোড়লকে আমাকে। তা দিক, মানিকের অকল্যাণ না হলেই হল।

শিবকেষ্ট রামকেষ্ট পালদের বাড়ির একাংশে পথের ধারে দাওয়ার উপর বসিয়া টিকুরীর বউ উচ্চকণ্ঠে গাল দিতেছিল। কিছুদূরে শিবকেষ্ট রামকে দাঁড়াইয়া আছে। আর কয়েকজন জুটিয়াছে। তাহাদের মধ্যে ঘোঁতন রহিয়াছে। দাঁড়াইয়া জটলা করিয়া বিড়ি টানিতেছে।

পল্লীগ্রামে সেই ছড়ার মত বাঁধা গালিগালাজ-অভিসম্পাত। তাহার বাধুনি বিচিত্র, সুর বিচিত্র।

টিকুরীর বউ বলিতেছিল, সব্বস্বান্ত হবে, পথে দাঁড়াবে, ফকির হবে, জমিদার মহাজনে ড়ুগড়ুগি বাজিয়ে যথাসৰ্বস্ব নিলেম করে নেবে। টিনের চাল ঝড়ে উড়ে যাবে, পাকা মেঝে ফেটে চৌচির হবে। সাপখোপের আড়ত হবে। অকালে মরবেন, বিনা রোগে ধড়ফড়িয়ে যাবেন-ওই আদুরী গিদেরী পরিবার চাঁপাডাঙার বউয়ের দশা আমার মত হবেন।

ওপাশ থেকে ঘোঁতন বলিয়া উঠিল, তা হবে না খুড়ী, তা হবে না। ও শাপ দিও না। ফলবে না, ফলবে না।

টিকুরীর বউ ফোঁস করিয়া উঠিল—কে রে, বলি তুই কে রে মুখপোড়া ভঁ্যাদড়? তুই কে?

ঘোঁতন হাসিতে হাসিতে আসিয়া দাঁড়াইল।—মুখখানা আমার কালো বটে খুড়ী, কিন্তু পোড়ে নাই; মেচেতা পড়েছে। আমি ঘোঁতন।

—ও। ইংরেজি-পড়া বাবু, যাত্রার দলের কাপ। তা তুই তো বলবিই রে? তোকে ধান। ছেড়ে দিয়েছে, নালিশ তুলে নিলে।

–নিলে সাধে! আমি ঘোঁতন ঘোষ। হোৎ-তা-তা লাঙল-ঠেঙানো বুদ্ধি নয় আমার। আমি কলকাঠি টিপতে জানি। পাকাল মাছের পেটে কেঁচোর বাসার খবর জানি আমি। বুঝেছ! আমার নামে নালিশ করবে?

—তুই আমার হয়ে একটা নালিশ ঠুকে দিতে পারিস? পাপরের দরখাস্ত না কি বলে। টাকাকড়ি লাগে না, অনাথ গরিব বলে।

–বললেই পারি। ঘোঁতন কাউকে ডরায় না।

–তা হলে বোস্। আমি গালটা দিয়ে নিই। মনের ঝালটা মিটিয়ে নিই।

—তা লাও। ওদিকে রাখালের বউও খুব জুড়েছে-ওলাউঠো হবে, না হয়ত রাজকাশ হবে। লোহার গতর ভেঙে যাবে। ছেলে মরবে। বউ ভিক্ষে করবে

সুর ধরিয়া সঙ্গে সঙ্গে টিকুরীর বউ শুরু করিল, করবে, ভিক্ষে করবে, দোরে দোরে হরিবোল বলে ওই চাঁপাডাঙার বউ

হঠাৎ চমকিয়া টিকুরীর বউ বলিল, কে র‍্যা?

অন্ধকার পথে একটা দুনী মাথায় করিয়া যাইতেছিল নোটন।

–আমি গো, নোটন।

–নোটনা। তা মাথায় কি? দুনী নাকি? এত রেতে দুনী নিয়ে কি করবি?

–হ্যাঁ গো। আকের জমিতে হেঁচন দিতে হবে।

শিবকেষ্ট বলিল—চুপ কর খুড়ী। সেতাবদের কৃষেণ নোটন-ও সব শুনে গেল। বলবে তে গিয়ে সব মুনিব-বাড়িতে।

দুই হাতের বুড়া আঙুল নাড়িয়া বুড়ি বলিল-বয়েই গেল—বয়েই গেল। আমার বেগুন বাড়ি ভেসে গেল! শুনবে! শোনবার জন্যেই তো বলছি! আমি কি ভয় করি নাকি কাউকে?

তখন সেতাবের বাড়িতে দাওয়ার উপর পিঁড়িতে বসিয়া রাখাল ভাত খাইতেছে। সঙ্গে বসিয়াছে—মহাতা ও সেতাব। পরিবেশন করিতেছে চাঁপাডাঙার বউ। সে অম্বল পরিবেশন করিতেছিল। সকলেই তালুতে টোকা মারিয়া খাইতেছিল এবং সঙ্গে সঙ্গে বলিতেছিল, আঃ!

রাখাল বলিল, আর একটু দাও, বউমা, আর একটু! বেড়ে বেঁধেছ! খাসা হয়েছে!

সেতাব বলিল, তা হলে কি হবে! কাঁচা তেলের গন্ধ উঠেছে। এত করে নাকি তেল দেয়! হুঃ?

মহাতাপ বলিল, তেল বেশি হয়েছে, তেল বেশি হয়েছে! তেল নইলে রান্না হয় নাকি?

রাখাল বলিল, আরে, ওই তেলেই তো অম্বলের সৈরভ…সুবাস! নেশার মুখে যা লাগছে, সে কি বলব, অম্রেত যেন। আর তেমনি কি রান্নার তাক। বেঁচে থাক মা সুখে থাক, সংসারের কল্যাণ হোক। খেয়ে মুখটা জুড়ল। পোড়া আর ধরা আসেদ্ধ আর নুনচড়া খেয়ে জিভে যেন চটা ধরেছিল!

চাঁপাডাঙার বউ বলিল, সব আমাদের ছোট বউয়ের রান্না।

–বা-বা-বা! বলিহারি বলিহারি! তা হবে না কেনে? মহাতাপ যে ছোকরা বড় ভাল, বড় ভাল ছোকরা! আমাকে বড় মেরেছে ভাঙের নেশার মুখে। তা মারুক! ভুল করেছে। আবার গিয়ে তো বললে রাখালদাদা, দোষ হয়েছে। তা আমিও বললাম, বাস্ বাস্; ঠিক আছে। ভাগ্যে পঞ্চায়েতে নালিশ করি নাই! বুয়েচ, হাতের তীর ছাড়তে নাই। ছাড়লেই বাস, ভ্যাক করে বিঁধে যাবে। তাই তো আমার পরিবারকে তখন থেকে বলছি—এমন করে গাল দিস না, দিস না। তা বুয়েচ, আমাকে মানুষ বলেই গণ্যি নাই। তোমরা কিছু মনে কোরো না-ওর কথায় কিছু হয় না। বুয়েচ? তা সেও ঠাণ্ডা হয়ে গিয়েছে। মহাতাপ বললে, খেতে হবে, আজই রেতে। তা আমি দোনোমনো করছিলাম, কিন্তু সে-ই বললে—সে কি, ডাকছে হাত ধরে, যাবে না কি? বুয়েচ। তা পেট খুব ভরল। খুব।

মানদা আসিয়া দুধের বাটি নামাইয়া দিল।

—আবার কি?

–দুধ।

এমন সময় বাহিরে ধম করিয়া একটা শব্দ উঠিল। সকলেই চকিত হইয়া উঠিল। মহাতাপ খাবার ছাড়িয়া উঠিয়া লাফাইয়া নামিল।

—কে?

ওপাশ হইতে সাড়া আসিল, আমি গো ছোট মুনিব।

মহাতাপ বাহির হইয়া গেল।

খামার-বাড়িতে নোটন দুনীটা সশব্দে ফেলিয়াছে, শব্দটা তাহারই।

মহাতাপ বলিল–দুনী আনলি?

–না আনলে? তোমার মন তো বিন্দাবন, যদি বাঁশি বাজে তো রেতেই বলবেচ যাব, লাগাব দুনী! তোমার কিলকে বড় ভয়!

—দাঁড়া রে বাবা, খোল কুটে রেখেছে কি না দেখি!

–সে বড় মোল্যান ঠিক রেখেছে। কাজে তার ভুল হবে না।

আর খোল তো এসেছে কাল বিকেলে। আজ কুটলে কখন? বড় বউ–অ বড় বউ?

ফিরিয়া আসিয়া বাড়িতে ঢুকিল। তখন সেতাব-রাখালের খাওয়া হইয়া গিয়াছে। তাহারা হাত মুছিতেছে।

রাখাল বলিতেছে, তা তুমি পালদের বাড়িটা ভাগ করে ভাল করেছ সেতাব। ঠিক করেছ। বউ দুজনকে ভাগ করে দুজনার ঘরে দিয়েছ, ন্যায্য করেছ। হু! তা নইলে জমি দিলে বেচেঘুচে পালাত। বেশ করেছ। তা হলে আমি যাই। বুয়েচ? আর ওই আমার পরিবারের গালের জন্যে কিছু মনে কোরো না। আমি ঠাণ্ডা, সেও ঠাণ্ডা। বুয়েচ? আমি চললাম। সে আসবে, কাল মহাতাপের বউ-ছেলেকে আশীর্বাদ করতে আসবে। বুয়েচ! বলিয়া পুলকিত হাস্যে স্মিতানন হইয়া উঠিল।

সে চলিয়া গেল। ওদিক হইতে আসিয়া মহাতাপ ঘরে ঢুকিল।

মহাতাপ হাঁকিয়া বলিল, বলি কানমে কেতনা ভরি সোনা পিধা হ্যায় বড় মোল্যান? বলি, আকের গোড়ায় দেবার খোল কোটা হয়েছে?

মানদা বলিয়া উঠিল, বিত্যেব দেখ! ষাড়ের মত চেঁচানি দেখ?

কথাটা অবশ্য সে চাপা গলাতেই বলিল, কারণ ভাসুর রহিয়াছে। কিন্তু কথাগুলা কাহারও কান এড়াইল না। এড়াইবার জন্য বলেও নাই সে।

মহাতাপ ফাটিয়া পড়িল, অ্যাও! কিল মেরে দাঁত ভেঙে দোব। সে আগাইয়াও গেল।

বড় বউ বাহিরে ছিল না। সে ঘর হইতে বাহির হইয়া আসিয়া মহাতাপের সামনে দাঁড়াইয়া বলিল, কি হচ্ছে, হচ্ছে কি?

মহাতাপ থমকিয়া দাঁড়াইয়া গেল। বড় বউ বলিল—মারবে। কেন মারবে শুনি?

মহাতাপ বলিল, তোমাকে নয়। ওই দুটু সরস্বতীকে।

মানদা বলিয়া উঠিল, বটে! আমি বুঝি বানে ভেসে এসেছি?

আরে তুই আমাকে ষাড় বলি কেনে?

বড় বউ বলিল, তুমি ওকে দুষ্টু সরস্বতী বলবে কেন? আর বাঁড় তো ভাল কথা। বাবা শিবের বাহন। মা দুৰ্গার সিংহ তার কাছে পারে না।

—আমাকে বোকা বোঝাচ্ছ তুমি!

–না। তাই পারি? বোসো, ঠাণ্ডা হয়ে বোসো। এখন কি বলছিলে বল? কানে কত ভরি সোনা পরেছি, নাকি?

মানদা বলিয়া উঠিল, শুধাও না, কত ভরি দিয়েছে?

মহাতাপ বলিল, সে ওই কেপনকে বলবে। কেবল ধান বেচেছে, গুড় বেচেছে আর টাকা করেছে।

সেতাব আর পারিল না। বলিল, তুমি দাতাকৰ্ণ হয়ে লোককে পাওনাগণ্ডা ছেড়ে দিয়ে আসছ! এমনি করলে, খাবে—দু হাতের বদলে চার হাতে খাবে।

মহাতাপ উত্তর না পাইয়া হঠাৎ মাটিতে চাপড় মারিয়া চেঁচাইয়া উঠিল, আমার খোল কোটা হয় নাই কেনে? আমার আকের জমিতে হেঁচন দিতে হবে। তার আগে খোল না দিলে, আবার সেই এক মাস পর ভিন্ন হবে না। কেনে খোল কোটা হয় নাই?

সেতাব বলিল, হবে রে হবে। ব্যস্ত হোস না! দু-তিন দিন দেরি হলে মহাভারত অশুদ্ধ হবে না।

কাদম্বিনী বলিল, কাল পরশু দুদিনে আমি কুটিয়ে দোব। তুমি ক্ষেপো না। আর ঘেঁচন দেবার জন্যে তাড়াতাড়ি কোরো না। জল নামবে। দু-তিন দিনের মধ্যেই নামবে।

–নামবে। তোমার হুকুমে নামবে। আকাশ খাঁখাঁ করছে। জ্বলে গেল সব।

–নামবে। গরম দেখছ না? তারপর ওই দেখ। লণ্ঠনটা হাতে লইয়া সে দেওয়ালের গায়ে আলো ফেলিয়া অন্য হাতের আঙুল দিয়া দেখাইল—মেঝে থেকে পিঁপড়েরা ডিম মুখে করে ওপরে উঠে যাচ্ছে।

দেখা গেল, সারি বাঁধিয়া লক্ষ পিঁপড়া উপরে উঠিয়া চলিয়াছে।

বড় বউ বলিল, শুধু এক জায়গায় না, আজ আমি পাঁচ-সাত জায়গায় দেখেছি।

–আ—ত তেরি তোম তেরে না। বলিয়া মহাতাপ একটা লাফ দিয়া উঠিল; তারপর বলিল, দাদা, বোসস বোসো। তামুক সাজি।

বলে কলকে লইয়া তামাক সাজিতে বসিল।

বড় বউ ডাকিল, মানু আয় খেয়ে নিবি।

বড় বউয়ের দেখায় ভুল হয় নাই। রাত্রে সত্য সত্যই জল নামিল। গুরু গুরু শব্দে মেঘগৰ্জনে মহাতাপের ঘুম ভাঙিয়া গেল। সে ধড়মড় করিয়া উঠিয়া বসিল।

মানু তখন উঠিয়া পড়িয়াছে। সে ঘরের জানালা বন্ধ করিতে ব্যস্ত।

মহাতাপ সদ্য-ঘুম-ভাঙা চোখে বিহ্বলের মত চাহিয়া বলিল, জল? মেঘ ডাকছে?

মানু বলিল, ছাটে সব ভিজে গেল।

মহাতাপ বলিল, যাক যাক। বন্ধ করিস না মানু, বন্ধ করি না।

–বন্ধ করব না?

–না। আহা-হ্যাঁ, কেমন জল নেমেছে দেখ দেখি!

উঠিয়া গিয়া মানুর হাত ধরিল। বলিল, বোস এইখানে। বসে বসে জল দেখি।

মানু ঠোঁট বাঁকাইয়া বলিল, জল দেখব?

–হ্যাঁ। আমার কোলে মাথা রেখে শো। আমি জল দেখি আর তোকে দেখি। হঠাৎ এই বর্ষার আমেজে তাহার আবেগ উথলিয়া উঠিল। সে দুই হাতে মানুর মুখখানি ধরিয়া বলিল, পাগলি পাগলি পাগলি! তোকে আমি খুব ভালবাসি।

–ছাই বাস। দিনরাত মারব, মারব আর অকথা কুকথা!

–আরে! সে কথা তোকে না মানু, তোকে না। তোর ক্যাঁটকেঁটে কথাকে–

–হুঁ। বড় মোল্যানের কথাগুলা তো মিষ্টি লাগে! তার বেলা?

আরে বাপ রে! দুই হাত জোড় করিয়া কপালে ঠেকাইয়া মহাতাপ বলিল, আরে বাপ রে, বড়কী বহু, উ তো ঘরকে লছমী হ্যায়।

মহাতাপ মানদাকে সজোরে বুকে চাপিয়া যেন পিষিয়া ফেলিল।

ওদিকে চাঁপাডাঙার বউয়ের ঘরে চাঁপাডাঙার বউ আপন ঘরের জানালায় একা বসিয়া বাহিরের বর্ষণের দিকে চাহিয়া রহিয়াছে।

সেতাব মুড়িসুড়ি দিয়া ঘুমাইতেছে। দুর্বলদেহ সেতাবের অল্পেই শীত লাগে। গ্রীষ্মকালেও সে একখানা চাদর পায়ের তলায় রাখিয়া তবে ঘুমায়। চাঁপাডাঙার বউ স্বামীর জড়োসড়ো ভাব দেখিয়া একটু হাসিয়া চাদরখানা তাহার গায়ে চাপাইয়া দিল। ও ঘরে মানিক কাঁদিয়া উঠিল। চাঁপাডাঙার বউ একটা দীর্ঘনিশ্বাস ফেলিল।
চতুর্থ পরিচ্ছেদ

দেখিতে দেখিতে বৰ্ষা নামিয়া পড়িল। জ্যৈষ্ঠ মাসের শেষেই। কি যে হইয়াছে দিন-কালের সে কথা কৃষিজীবী সাধারণ মানুষগুলি বুঝিতে পারিতেছে না। চিরকালের প্রবাদখনার বচন চৈতে মথর মথর, বৈশাখে ঝড়পাথর, জ্যৈষ্ঠ মাটি ফাটে—তবে জেনো বর্ষা বটে। অর্থাৎ চৈত্রে আধা শীত আধা গরম, বৈশাখে কালবৈশাখী, জ্যৈষ্ঠে প্রখর গ্রীষ্ম—এই হইলে জানিবে সুবর্ষা অবশ্যম্ভাবী। আর এ ফাল্গুনের শেষ হইতেই গরম উঠিতেছে; চৈত্রে বৈশাখে মারাত্মক রৌদ্র, কালবৈশাখী নাই! কদাচিৎ এক-আধ পসলা বর্ষা ঝড়; শিলাবৃষ্টি তো নাই। তারপর জ্যৈষ্ঠ মাসের শেষে হঠাৎ বর্ষার মেঘ গুরু গুরু ডাকিয়া চলিয়া আসিতেছে। চাষীদের বীজ পাড়া হইতেছে না। বর্ষা তাহাদিগকে বেকুব করিয়া দিয়া বিদ্যুতের মৃদু মৃদু চমকে যেন সকৌতুকে হাসিয়া তামাশা করিতেছে। মহাতাপ বর্ষার মেঘকে নিত্য গালি পাড়ে। সে বিপুল বিক্ৰমে মাঠে ঝাঁপাইয়া পড়িয়াছে। শুকনা ধুলার বাতে বীজ পাড়া হইয়াছে সামান্য। বাকি বীজ আছাড়া করিয়া ফেলিতে হইবে। দশ দিনের মধ্যে সে কাজ শেষ করিয়া মহাতাপ জমিতে জল বাঁধিয়া লাঙল চালাইতে লাগিয়াছে। সেতাবও এখন মাঠে। সে কখনও খানিকটা কোদাল চালায়। কখনও এক-আধবার লাঙলের মুঠা ধরে। আলের উপর বসিয়া তামাক সাজে, নিজে খায়। মহাতাপকে ডাকিয়া হাতে হুঁকা দিয়া তাহার লাঙলটা গিয়া ধরে।

মহাতাপ বলে—ক্ষ্যাপামি কোরো না। মোষের লেজের বাড়িতে তুমি পড়ে যাবে। মহাতাপ দুইটি বিপুলকায় মহিষ লইয়া লাঙল চালায়।

নোটন কৃষাণ মুখ টিপিয়া হাসে। মিথ্যা বলে নাই ছোট মনিব। বড় মনিব তাহার তালপাতার সেপাই।

সেদিন আষাঢ়ের পনেরোই। গত দুই-তিন দিন মুষলধারে বৃষ্টি নামিয়াছিল। মাঠ-ঘাট প্রায় ভাসিয়া গিয়াছে। সকালবেলাটাও ঘনঘটা হইয়া রহিয়াছে। টিপিটিপি বৃষ্টি পড়িতেছে। চাঁপাডাঙার বউ দাওয়ার উপর আঁচল বিছাইয়া শুইয়া অলস দৃষ্টিতে মেঘাচ্ছন্ন আকাশের দিকে চাহিয়া রহিয়াছে। মানিক একটা বাটিতে মুড়ি খাইতেছে।

মানদা ভিজিতে ভিজিতে এক পাজা বাসন লইয়া বাড়িতে ঢুকিল। দুম করিয়া দাওয়ার উপরে রাখিয়া দিয়া আবার প্রায় ছুটিয়া বাহির হইয়া যাইবার উদ্যোগ করিল।

চাঁপাডাঙার বউ বলিল, মানু–

—আসছি।

–যাচ্ছিস কোথা নাচতে নাচতে?

–মাছ।

—মাছ!

–মাছ উঠেছে পুকুর থেকে! ঘোট ঘোট পোনা।

–পোনা বেরিয়ে যাচ্ছে? গোবিন্দকে পুকুরের মুখে বার দিতে বল্‌।

–তুমি বল। আমি মাছ ধরে নিয়ে আসি। শো-শো করে নালার জলে ছুটছে সারবন্দি। সে বাহির হইয়া গেল।

মানিক দাঁড়াইয়া উঠিল—আমি যাব। সে তাহার সাধের বাঁশিটা লইয়া একবার বাজাইয়া দিল–পু!

বড় বউ তাহাকে কোলে লইয়া মাথায় মাথাল দিয়া উঠানে নামিল। নহিলে যে দুরন্ত ছেলে জলে ভিজিয়া নাচিয়া-কুঁদিয়া একাকার করিবে। মহাতাপের ছেলে তো! খামারবাড়িতে আসিয়া ডাকিল, গোবিন্দ! গোবিন্দ।

মানিক বাঁশি বাজাইল—পু-পু। খামারে গোবিন্দ নাই। নিশ্চয় বর্ষার আরামে গোয়ালের দাওয়ায় খড়ের গাদা বিছাইয়া শুইয়া ঘুম দিতেছে। ঘোড়াটা ইদানীং বড় কাজে ফাঁকি দিতেছে। কোনোদিন সন্ধ্যার সময় থাকে না। সন্ধ্যার আগেই গরু গোয়ালে ঢুকাইয়া পালায়। তাও দুটাএকটা বাছুর বাহিরে ফেলিয়া যায়।

সে গোয়াল-বাড়িতে আসিয়া ঢুকিল।

গোবিন্দ ঘুমায় নাই। সে গরুর চালায় দাঁড়াইয়া কোমরে হাত দিয়া নাচ প্র্যাকটিস করিতেছিল। সে ইহারই মধ্যে ঘোতনের যাত্রার দলে ভর্তি হইয়াছে। আপন মনেই সে–এক দুই তিন, এক দুই তিন চার গনিয়া গনিয়া নাচিতেছিল।

চাঁপাডাঙার বউ ডাকিল, গোবিন্দ!

তালভঙ্গের অপরাধে অপরাধীর মত গোবিন্দ দাঁড়াইয়া গেল।

চাঁপাডাঙার বউ বলিল, ও কি হচ্ছে? অ্যাঁ?

গোবিন্দ জিভ কাটিয়া মাথা হেঁট করিল। মানিক বাঁশিটা বাজাইয়া দিল–পু।

—বলি ক্ষেপলি নাকি? নাচছিস আপন মনে?

–উ কিছু লয়। কি বলছ? মাথা চুলকাইতে লাগিল।

–কিছু নয়! এক দুই তিন, এক দুই তিন-বলে নাচছিলি আর বলছিস–কিছু নয়?

এবার গোবিন্দ বলিল, লাচ শিখছিলাম গো! যাত্তার দলে সখী সাজব কিনা? লাও এখন কি বলছ বল!

—যাত্তার দলে সখী সাজবি? তা হলে সে খুব যাত্তার দল।

–উঁহুঁ! ঘোঁতন ঘোষ মশায়ের দল। দেখবে এবার কেমন গায়েন করে।

–ঘোঁতন ঘোষের দলে ঢুকেছিস?

বড় বউ স্থির দৃষ্টিতে ছেলেটার মুখের দিকে চাহিয়া রহিল। ধারণা করিতে চেষ্টা করিল, ব্যাপারটা কি? তাহার যেন একটা সন্দেহ হইল।

রাখালটা অস্বস্তিতে পড়িয়াছিল। সে বলিল, বল, ক্যানে গো!

চাঁপাডাঙার বউ বলিল, শাওন মাস থেকে তোর জবাব হল গোবিন্দে। তাকে আর কাজ। করতে হবে না। মাসের শেষে মাইনে–বলিয়াই মনে হইল—গোবিন্দ মাইনে পাইবে না। পূজা পর্যন্ত তাহার মাহিনা সে অগ্রিম লইয়া রাখিয়াছে। আবার একবার তাহার দিকে স্থির দৃষ্টিতে চাহিয়া বলিল,এইজন্যেই তুই সন্ধ্যার আগে পালাস? আবার একটু চুপ করিয়া থাকিয়া বলিল—ঘোঁতন। তোকে আমাদের বাড়ির কথা জিজ্ঞাসা করে, না গোবিন্দে? কি জিজ্ঞাসা করে?

গোবিন্দ কিছু বলিবার পূর্বেই ছোট বউ এক আঁচল মাছ লইয়া প্রবেশ করিল।অ দিদি। পাড়ার ছেলে জুটে সব ধরে নিলে মাছগুলা। খলবল করে বেড়াচ্ছে—এক শো, দু শো

–করুক। তুই তো নেচেকুঁদে এলি জলে কাদায়।

–এই দেখ কত মাছ ধরেছি!

আঁচল খুলিয়া সে ঝরঝর করিয়া মাছগুলো ফেলিয়া দিল। মানিক বাঁশিটা বাজাইয়াছিল। নেহাত ছোট মাছ নয়, গত বছরের পোনা কোনোেটা এক পোয়া কোনোেটা তিন ছটাক! কাতলাগুলো পাঁচ পোয়া হইয়াছে।

চাঁপাডাঙার বউ ঘোতনের কথা বাদ দিয়া গোবিন্দকে বলিল, গোবিন্দ, শিগগির যা। যতক্ষণ আছিস কাজ করতে হবে তো। যা!

পুকুরটা ভাগের পুকুর। তবে সেতাবদের অংশই বেশি। সেতাব কিনিয়া কিনিয়া অংশটাকে প্রায় দশ আনার কাছাকাছি করিয়া ফেলিয়াছে। পুকুরটা তাহার বাড়ির কাছে, হেফাজত করিতে সে-ই করে। সেতাবের পর মোটা অংশ বিপিন মোড়লের; প্রায় সোয়া তিন আনা অর্থাৎ পাঁচ ভাগের এক ভাগ। অবশিষ্ট এগার পয়সার মধ্যে ভাগী আছে অনেক কয়জন। রামকেষ্ট এবং শিবকেষ্টর তিন পয়সা রকমের ভাগ আছে। সেটা অবশ্য সেতাবের কাছে ঋণদায়ে আবদ্ধ। শিবকেষ্টর ভাগের খুড়ী টিকুরীর বউ মাছ বাহির হইতেছে এবং ছেলের পাল মাছ ধরিতেছে সংবাদ পাইয়া গাছকোমর বাঁধিয়া ছুটিয়া আসিয়া পথের উপর দাঁড়াইয়া ছেলের দলের উপর গালিগালাজ বর্ষণ করিতে শুরু করিল।

—বলি অ ড্যাকরার, অ আল্পেয়েরা, অরে অ আবাগেরা, আবাগীর পুতেরা, বলি পরের লুটেপুটে খেয়ে কদিন বাঁচবি রে। ওলাওঠো হয়ে মরবি রে, ধড়ফড়িয়ে মরবি। পুকুরে শিবকেষ্টর দেড় পয়সা অংশ, আমার দেড় পয়সা ভাগ দিয়ে যা বলছি। বলি পালাচ্ছিস যে! আমি বুঝি দেখতে পাচ্ছি না? আমার চোখ নাই? ঢেলা ছুঁড়ে মারব, ঢেলা ছুঁড়ে মারব বলছি। পরের পুকুরের মাছ বেরিয়েছে—বড় মজা, ভাজা খাবি, ঝোল খাবি, অম্বল খাবি, খাবি খেয়ে মরবি, ওলাউঠা হয়ে মরবি, অম্বলশূল হবে–

কয়েকটা ছেলে পথের ধারের গাছের আড়াল হইতে উঁকি মারিতেছিল। তাহাদের দেখিয়া টিকুরীর বউ বলিল, যাবি কোথা? পথ আগলে দাঁড়িয়েছি আমি। দে বলছি আমার ভাগের মাছ, দে।

একটা ছেলে তাহাকে জিভ কাটিয়া ভ্যাঙচাইয়া বলিল, দে! দে বললেই দেব? মাঠে মাছ। ধরেছি; তোমাদের পুকুরের মাছ তা কে বললে? গায়ে নেকা আছে?

–ওরে খালভরা! নেকা নাই, কিন্তু মাছগুলো কি আকাশ থেকে পড়ল?

–তা কি জানি? ওই তো বড় মোড়লের মোটা ভাগ, তাদের ছোট বউ তো কিচ্ছু বললে না?

আর একটা ছেলে বলিল, সি এক আঁচল ধরে নিয়ে গেল—সের দরুনে।

টিকুরীর বউ এবার জ্বলিয়া উঠিল। অ্যাঁ? ওরা নিয়ে গেল? যাই, আমি যাই একবার। আগে তোরা মাছ দিয়ে যা! দে—দে—মাছ দে। দে।

হঠাৎ একটা বড় গাছের আড়াল হইতে রাখাল পাল বাহির হইয়া আসিয়া আঁচল হইতে মাছ কয়েকটা বাহির করিয়া ফেলিয়া দিয়া বলিল, ওই লে। লে তোর মাছ।

টিকুরীর বউ তাড়াতাড়ি মাথায় কাপড় দিতে চেষ্টা করিল কিন্তু গাছকোমর বাঁধা কাপড় খুলিল না। সে পিছন ফিরিয়া দাঁড়াইল। অ মাগো! এ কে গো? পালেদের ফাঁকলা?

—ফাকলা। আমার নাম ফাঁকলা? ক্রুদ্ধ হইয়া উঠিল রাখাল।

—তা ভাসুরের নাম করব নাকি?…তুই যে সম্পর্কে ভাসুর হস মিন্সে। বুড়ো মিন্সে ছেলের পালের সঙ্গে মাছ ধরতে এয়েছে। নোলাতে ছেঁকা দাও গিয়ে!

রাখাল মুহূর্তে ধ্বনির প্রতিধ্বনির মত জবাব দিল গরম গরম মাছভাজা খেয়ে তুমি নোলাতে ছেকা নিয়ে মা, তুমি হেঁকা নিয়ে। নোলাতে আরও গাল ফুটবে, তপ্ত খোলায় খইয়ের মত ফুটবে।

হনহন করিয়া চলিয়া যাইতে যাইতে রাখাল আবার ফিরিয়া দাঁড়াইল। বলিল, মরে তুমি মেছো পেত্নী হবে, মাছ মাছ করে বিলে বিলে চবাং চবাং করে ঘুরে বেড়াবে, সারা অঙ্গে সেঁক ধরবে। তা আমি বলে দিলাম। বলিয়া সে চলিয়া গেল।

ছেলেগুলা এই অবসরে সুটসুট করিয়া পালাইতেছে। টিকুরীর বউ এবার ঘুরিয়া দাঁড়াইল, মাথায় সে এতক্ষণে ঘোমটা দিতে পারিয়াছিল এবং রাখাল পালের গমনপথের দিকে চাহিয়া বলিল, মরে যাও, তুমি মরে যাও, অপঘাতে যাও, মাছ বলে সাপ ধর, সাপের কামড়ে জ্বলে পুড়ে মর। পেরেত হও। আপন জ্বালাতে তুমি দাপাদাপি করে বেড়াও।

মাছ কয়টা কুড়াইতে সে কিন্তু ভুলিল না। মাছ কয়টা কুড়াইতেছিল। এমন সময় মাঠের খাবার লইয়া বড় বউ বাড়ি হইতে বাহিরে আসিয়া থমকিয়া দাঁড়াইল। সে বলিল, কি হল গা টিকুরীর খুড়ী?

মাছ কুড়াইতে কুড়াইতেই মুখ তুলিয়া চাঁপাডাঙার বউকে দেখিয়া টিকুরীর খুড়ী বলিল, এই যে! মোড়ল-গিন্নি! ভামিনী আমার!

মাছ কুড়াইয়া সোজা হইয়া দাঁড়াইল। বলিল, তোমাদের ছোট বউ নাকি সাজার পুকুরের পাঁচ সের মাছ ধরে ঘরে ঢুকিয়েছে?

চাঁপাডাঙার বউ অবাক হইয়াও হাসিয়া কৌতুকরে বলিল, পাঁচ সের? দাঁড়িপাল্লা দিয়ে। ওজন করলে কে খুড়ী?

—দাঁড়িপাল্লা দিয়ে ওজন করলে কে খুড়ী! ওজন করবে কে? বলি ওজন করবে কে? আমি কি মেছুনী নাকি?

চাঁপাডাঙার বউ এবার বিব্রত হইল, সে জানে ইহার জের অনেক দূর যাইবে। সে তাই বলিল, সে আবার কখন বললাম তোমাকে?

–বললে না? তো কি বললে? ও-কথার মানে কি হয়?

—তা জানি না। ছোট বউ কতকগুলো মাছ ধরে এনেছে। মাঠে ছড়িয়ে পড়েছিল। সে মাছ। ঘরে আছে, তোমার ভাগ তুমি নিয়ে যাও।

–যাবই তো। ভাগের ভাগ হকের ধন। এ আমার ভাইকে ফাঁকি দিয়ে পুঁটলি-বাধা ধন নয়। নেবই তো ভাগ।

—কি বলছ খুড়ী যা-তা?

–ঠিক বলছি। দেওর-সোহাগী, দেওরকে সোহাগের মানে আমরা বুঝি না, না? কিন্তু ওতে নিজেই ফাঁকি পড়ে, বলি, ঠকিয়ে জমানো ধন ভোগ করবে কে? বলি হল একটা কোলে? ওই জন্যেই ছেলে নেনা, যেমন সেতাব—তেমনি তুমি।

এবার চাঁপাডাঙার বউ গম্ভীরভাবে বলিল, থাম টিকুরীর খুড়ী।

টিকুরীর খুড়ী থামিয়া গেল। চমকাইয়া উঠিয়াই থামিল। চাঁপাডাঙার বউয়ের কণ্ঠস্বরে যেন কি ছিল; সে যেমন অলঙ্ঘনীয়—তেমনি ভর্ৎসনাপূর্ণ।

সেই কণ্ঠস্বরেই চাঁপাডাঙার বউ বলিয়া গেল, তুমি যা বললে তা যদি সত্যি হয়, তবে ভগবান আমার মাথায় যেন বজ্ৰাঘাত করেন। আর যদি মিথ্যা হয় তারও বিচার তিনি করবেন। কোনো শাপান্ত আমি করব না।

ফিরিল সে, ফিরিয়া উচ্চকণ্ঠে ডাকিল, মানু! মানু!

মানু বাড়ির ভিতর হইতেই সাড়া দিল, কি বলছ?

—এই টিকুরীর খুড়ীকে ওদের মাছের ভাগ দিয়ে দে। যাও খুড়ী, তোমার ভাগ তুমি নাও গে। মানুও সে মূর্তি সেথায় দেখিয়া অবাক হইয়া গেল। কোনো একটা কথাও মুখে ফুটিল না। মাছ সে। বড় ভালবাসে। সেই মাছ ফেরত দিবার আদেশের বিরুদ্ধেও কোনো কথা তাহার ফুটিল না।

কথা কটা বলিয়া চাঁপাডাঙার বউ আবার ফিরিল এবং আপন পথে গরবিনীর মতই চলিয়া গেল।

গ্রাম্যপথে তখন চাষীর ঘরের মেয়েরা স্বামী-পুত্রের বাপ-ভাইদের খাবার লইয়া মাঠে চলিয়াছে। কাকালে ঝুড়ির মধ্যে কাসার খোরায় মুড়ি গুড় ইত্যাদি। বৃষ্টিতে যাহাতে সেগুলি ভিজিয়া না যায়, তাহার জন্য তাহার উপর আর একটি ঝুড়ির আবরণ। এক হাতে জলের ঘটি। তাহারা আগে চলিতেছে। চাঁপাডাঙার বউয়ের আজ দেরি হইয়া গিয়াছে। কিন্তু তবুও সে চলিবার। গতি ত্বরিত করিতে পারিতেছে না। তাহার বুকের ভিতরটা যেন কেমন করিতেছে, গা যেন ভারি। হইয়া উঠিয়াছে। টিকুরীর খুড়ী তাহার বুকে যেন শেল ঘঁড়িয়া মারিয়াছে। সে আঘাতে তাহার সর্বাঙ্গ কাঁপিতেছে। সব বল যেন ফুরাইয়া গিয়াছে। সে গ্রামপ্রান্তরের একটা গাছতলায় আসিয়া দাঁড়াইল। আর চলিতে পারিবে না।

পিছন হইতে একটি মেয়ে আসিয়া তাহাকে দেখিয়া থমকিয়া দাঁড়াইল। চাঁপাডাঙার বউ মাঠের দিকে মুখ ফিরাইয়া দাঁড়াইয়া ছিল। বেদনার্ত অন্তরের সঙ্গে বিস্তীর্ণ প্রান্তরের বোধ করি একটা নিবিড় যোগাযোগ আছে। মন এমন ক্ষেত্রে শূন্য বিস্তৃতির দিকে চাহিয়া সান্ত্বনা পায়। একটা দীর্ঘনিশ্বাস ফেলিল কাদম্বিনী। এই বিস্তীর্ণ জলভরা মাঠও মাসখানেকের মধ্যে সবুজ ফসলে ভরিয়া উঠিবে না!

মেয়েটি তাহাকে দেখিয়া বলিল—বড় মোল্যান।

চাঁপাডাঙার বউ মুখ ফিরাইল-ইহার মধ্যে কখন তাহার চোখ হইতে জলের ধারা গড়াইয়া আসিয়াছে।

মেয়েটি সবিস্ময়ে বলিল, কাঁদছ তুমি বড় মোল্যান?

চাঁপাডাঙার বউয়ের খেয়াল হয় নাই যে, তাহার চোখ হইতে জল গড়াইতেছে। কথাটা শুনিয়া সে দীর্ঘশ্বাস ফেলিয়া চোখ মুছিতে চেষ্টা করিল। দুই হাত আবদ্ধ, কাজেই মুখখানি নিজের কাঁধের কাপড়ে খুঁজিয়া চোখের জল মুছিয়া চাহিল।

মেয়েটি জিজ্ঞাসা করিল, কি হল গো মোল্যান?

বিষণ্ণ হাসিয়া চাঁপাডাঙার বউ বলিল, বড় মাথা ধরেছে মা। শরীরটা কেমন করছে আমার।

সে আবার মুখ ফিরাইল।

সামনেই বিস্তীর্ণ কৃষিক্ষেত্র। বর্ষণের মধ্যে কর্ষণ চলিয়াছে। মাঠে মাঠে হালগুরু আর মানুষ। চাষীর পেশিবহুল দেহ সামনে ঝুঁকিয়া পড়িয়াছে, গরুগুলি কাধ টান করিয়া লাঙল টানিয়া চলিতেছে। কতক লোক আলের উপর কোদাল কোপাইয়া চলিয়াছে। বীজক্ষেতের মধ্যে হাঁটু গাড়িয়া বসিয়া বীজচারা তুলিতেছে।

মধ্যে মধ্যে বীজের বোঝা মাথায় করিয়া চাষী চলিয়াছে রোয়ার ক্ষেত্রের দিকে। পরিপাটি। কাদা-চাষ-করা-জমিতে মেয়ে-পুরুষ মিলিয়া ধানচারা রোপণ করিতেছে। চারিদিক ব্যাঙের কোলাহলে মুখর। কাদা-চাষকরা জমির চারপাশে কাক নামিয়াছে—পোকামাকড়ের আশায়। দুই। একটা কাদাখোঁচা এখানে ওখানে ঘুরিতেছে। কালো মেঘের গায়ে সাদা বকের সারি উড়িয়া চলিয়াছে মাঝে মাঝে। মেঘমেদুর দিনটির সঙ্গে ক্লান্ত বিষণ্ণ চাঁপাডাঙার বউ যেন একাত্মতা অনুভব করিতেছিল।

যে মেয়েটি চাঁপাডাঙার বউয়ের সঙ্গে কথা বলিতেছিল সে তাহার মুখের দিকে চাহিয়া সহানুভূতির সঙ্গে বলিল, দেহ ভাল নেই তো এই জলে ভিজে এলে ক্যানে মা? ছুটকীকে পাঠালেই হত।

চাঁপাডাঙার বউ বলিল, অমরকুড়ির পানে যাস যদি নয়ানের মা, তবে আমাদের ওদিকে ডেকে দিস বলিস এখানে দাঁড়িয়ে আছি আমি। আর যেতে পারছি না।

–দোব—দোব। ছেবার তো নয় মা, নইলে আমি নিয়ে যেতাম।

—তার চেয়ে বড় মোড়লকে বলিস। মহাতাপ চাষ ছেড়ে আসতে রাগ করবে। বড়কে বলিস, সে এসে নিয়ে যাবে।

অমরকুড়ি অর্থাৎ অমরকুণ্ডু। ধান সেখানে মরে না। সেখানেই তখন সেতাবদের চাষ চলিতেছিল।

চাষের সময় সেতাবও চাষে খাটে। কঠিন কাজগুলো তেমন সে পারে না, তবে অন্য সকল। কাজই করে। কোদাল কোপায়, বীজচারা পোঁতে, কাদা-চাষ-করা জমিতে কোনো ঠাঁই উঁচু হইয়া থাকিলে, সেও পায় করিয়া ঠেলিয়া সমান করিয়া দেয়।

সেতাবের চাষ বড়। দুইখানা হাল। হাল দুইখানার কাজ শেষ হইয়াছে; লাঙল খোলা অবস্থায় হাল কাঁধে লইয়া গরু চারিটা ঘুরিয়া ঘাস খাইতেছে। কয়েক জন সাঁওতাল মেয়ে ধান। পুঁতিতেছে। মহাতাপ কোদাল কোপাইতেছে। সেতাব হুঁকা হাতে জমির এধার হইতে ওধার পর্যন্ত ঘুরিয়া উঁচু জায়গাগুলি পায়ে বসাইয়া দিতেছে।

নয়ানের মা জমির কাছে আসিয়া দাঁড়াইল।

চাঁপাডাঙার বউয়ের দেহ খারাপ, আসিতে পারিবে না শুনিয়া সেতাব উদ্বিগ্ন চিত্তেই আলপথে হাঁটিতেছিল। গাছতলায় উপস্থিত হইয়া সে দেখিল, চাঁপাডাঙার বউ চুপ করিয়া যেন মাটির পুতুলের মত বসিয়া আছে।

সেতাব বলিল, নয়ানের মা বললে—দেহ খারাপ তোমার?

চাঁপাডাঙার বউ বলিল, হ্যাঁ। সঙ্গে সঙ্গে চোখের জলের বাঁধ ভাঙিয়া গেল।

–ওই–ওই, একে বলে, তা হলে জলে ভিজে এলে ক্যানে? ম্যালেরিয়ার সময়—দেখি, কপাল দেখি! সে কপালে হাত দিতে গেল।

চাঁপাডাঙার বউ কপাল সরাইয়া লইয়া বলিল, না।

—এই দেখ, না ক্যানে? দেখি।

–না, কিছু হয় নি আমার।

–একে বলে, এ তো ভ্যালী বিপদ রে বাবা।

–লোকের কথা আমি আর সইতে পারছি না।

—এই দেখ। কে আবার কি কথা বললে তোমাকে? কে? কার ঘাড়ে তিনটে মাথা? বল, আমি দেখছি তাকে। মহাতাপকে বললে—

–না, সে শুনবে বলে তোমাকে ডেকে পাঠিয়ে এখানে এনেছি আমি। লোকে বলছে। মহাতাপকে ঠকিয়ে তুমি পুঁজি করছ। কেন তুমি মহাতাপকে সব কথা বল না?

—তোমাকেই বলি নাকি আমি?

–তাতে ক্ষেতি হয় না। কিন্তু–

—সে আমি বুঝব; সে আমার মায়ের পেটের ভাই। তাকে বলি—আর সে পাড়াসুদ্ধ গেরামসুদ্ধ বলে বেড়াক। কিন্তু কে কি বললে—আমার দিব্যি দিয়ে বলছি বলতে হবে তোমাকে।

–দিব্যি দিলে?

–দিলাম।

–বললে টিকুরীর খুড়ী।

টিকুরীর খুড়ী তখন সেতাবদের বাড়ির দাওয়াতে বসিয়া মানদার সঙ্গে মাছ ভাগ লইয়া বেশ একটা ঝগড়া পাকাইয়া তুলিয়াছিল। উঠানে মাছ ভাগ করা পড়িয়া আছে। এদিকে অনেকগুলি—সেটা সেতাবদের ভাগ, আর এক জায়গায় বিপিনের অর্থাৎ মোটা মোড়লের ভাগ, সেটা সেতাবের ভাগ হইতে কিছু কম হইলেও নেহাত কম নয়, আর কয়েকটি ভাগে কোনোটিতে দুইটি কোনোটিতে তিনটি এমনি। গোবিন্দ মাছ ভাগ করিতেছে।

মানিকের হাতে একটি মাছ। সে মাছটি লইয়া টিপিতেছে।

টিকুরীর খুড়ীর ভাগ ওই তিনটি মাছওয়ালা ভাগের একটা ভাগ। মাছ তিনটি তুলিতে তুলিতে বলিল, ভাগী ভঁড়িয়ে খেতে নাই বাছা, তাতে মঙ্গল হয় না। বুঝেছ? খেয়ো না তা। তোমার একটা ছেলে। ভাসুরের কাছে জায়ের কাছে ও বিদ্যা শিখোনা। ফল দেখেছ তো? তোমাদের স্বামীস্ত্রীকে ঠকিয়ে গোপনে পুঁজি অনেক করেছে ওরা। কিন্তু হয়েছে? বলি একটা সন্তান হয়েছে চাঁপাডাঙার বউয়ের? মাছসুদ্ধ হাত দুটা সে মানদার মুখের কাছে নাড়িয়া দিল।

মানদা কি বুলিবে খুঁজিয়া না পাইয়া বলিল, মিছে কথা বলছ কেনে?

–মিছে কথা! মিছে কথা! গায়ের লোককে শুধাও গা। দেওর-সোহাগী আমার। মরণ তোর দেবীপুরের বউ! কিছু বুঝিস নে তুই। শোনগে, ঘোঁতন ন্যাকাপড়া-জানা ছেলেভদ্দর নোক—সে কি বলে শোনগে। বলে, দেওর-ভাজ আমরা আর দেখি নাই কখনও। নতুন দেখছি। মর তুই মর ছুঁড়ী! তুই মর্।

সে চলিয়া যাইতেছিল।

গোবিন্দ এবার বলিল, অই, অই, তুমি রাখাল পালের কাছে যে মাছ কটা নিলে, সে কটা ভাগ কর এইবার। ওগো ও মোল্যান–অই! মানিকের মা, বল না গো। অ ছোট মোল্যান! এই ওর কোঁচড়ে ভরা রয়েছে গো।

মানদা থরথর করিয়া কাঁপিতেছিল—কণ্ঠস্বর তাহার রুদ্ধ হইয়া গিয়াছে। তবু সে বিচিত্র স্থির দৃষ্টিতে টিকুরীর খুড়ীর গমনপথের দিকে চাহিয়া রহিল।

টিকুরীর খুড়ী কিন্তু মাছগুলি লইয়া শিবকেষ্টর বাড়ি গেল না। এই জলের মধ্যেই সে গিয়া উঠিল ঘোঁতনের বাড়িতে। ঘোঁতন তাহার মামলা করিয়া দিবে বলিয়াছে। সেই জমি ভাগের মামলা।

সেদিন সাবরেজেষ্ট্রি আপিস বন্ধ। তাহার উপর বর্ষার দিন। ঘোঁতন দাওয়ার উপর বসিয়া বাঁয়া-তবলা লইয়া পিটিতেছিল। গান তাহার বড় আসে না। তবলাতেই তাহার সঙ্গীতপ্রিয়তার আবেগ নিঃশেষিত হয়। ধা তিন-ধা-ধতিন ধা। তে রে কেটে-মুখে বোল বলে আর তবলা বাজায়। তবে বক্তৃতায় সে মজবুত! শকুনি, কলি, তক্ষক প্রভৃতি কয়টা পার্টে তাহার খুব নাম।

খুড়ী ঘোতনের দাওয়ায় মাছগুলি ঢালিয়া দিয়া বলিল, লে বাবা ঘোঁতন, ভেজে খাস। খুড়ী চাপিয়া বসিল।

ঘোঁতন খুশি হইয়া বাজনা বন্ধ করিয়া বলিল, এ যে লহনা পোনা খুড়ী।

—হেঁ বাবা। পেলাম, তা বলি ঘোঁতনকে দিয়ে আসি। তা আমার মামলার কি করলি বাবা?

–করেছি খুড়ী। ঠুকে দিয়েছি দরখাস্ত লিখে দিয়েছি সেতাব মোড়ল বিপিন মোড়ল গং প্রভৃতি পঞ্চায়েতবর্গ ঘুষ খাইয়া বিধবাদের সম্পত্তি ঠকাইয়া শিবকেরামকেষ্ট গংকে দিয়াছে। একেবারে ম্যাজিস্ট্রেটের কাছে। ইংরিজিতে দরখাস্ত লিখে দিয়েছি।

বলিতে বলিতেই হেঁট হইয়া একটা মাছ তুলিয়া লইয়াই বলিল, মাছ উঠেছে বুঝি পুকুর থেকে বেড়ে টাটকা মাছ। ভাজি যা হবে! পুঁটি, পুঁটি, অ পুঁটি!

খুড়ী বলিল, সাজার পুকুরের মাছ, বুয়েচ বাবা, মাঠে একেবারে ময়লাপ। মহাতাপের বউ সের দরুনে ধরে ঘরে ঢুকিয়েছে। তা যদি বলতে গেলাম বাবা তো চাঁপাডাঙার বউয়ের ঠেকার কি? আমিও টিকুরীর বেটী, আমি খুব শুনিয়ে দিয়েছি। মুখে মুখে বলে দিয়েছি—বলি দেওরসোহাগী আমার, ঘরের ভাগী ভঁড়িয়ে খেয়ে তোমার তো একটা হল না। আবার শেষে পাড়ার শরিকদের ফাঁকি? ওদের ছোট বউকে বলে এসেছি। গলায় দড়ি তোর। দেওর-ভাজ আর পৃথিবীতে নাই? তা কাকে বলছ? ছুঁড়ী ভাবলী।

ঘোঁতন বলিল, তুমিও ভাবলী খুড়ী, তুমিও ভাবলী।

–আমি ভাবলী?

ঠিক এই সময়েই পুঁটি–ঘোঁতনের অবিবাহিত যুবতী বোন—ঘরের দরজা খুলিয়া বাহির হইয়া আসিল।কি, বলছ কি?

–এই মাছ কটা নিয়ে যা। বেশ করে ভাজি করবি। কিংবা ঝাল।

টিকুরীর খুড়ী বলিল, অ মা গো! পুঁটি? তোমার বুন। এ যে হাতি হয়ে উঠেছে?

খুড়ীর কথা গ্ৰাহ্য না করিয়া পুঁটি বলিল, আমি পারব না। হাঁড়ি চড়ে না, তার মাছভাজা? এ ঘরে তোমার মা ধুকছে জ্বরে, ওঘরে বউ খুঁকছে। তুমি বসে বসে তবলা পিটছ। আমি এত পারব না। তোমরা সবাই আমার হাতির গতরই দেখেছ।

–পুঁটি!–কড়াসুরে ঘোঁতন শাসন করিয়া উঠিল।

পুঁটি যাইতে যাইতে ফিরিয়া মাছ কয়টা কুড়াইয়া লইয়া বলিল, ভাজতে পারব না, পুড়িয়ে দিচ্ছি, খেয়য়া। ঘরে তেল নাই। আর ডাক্তার-কবরেজ যা হয় ডাক-মায়ের জ্বর খুব।

—ম্যালেরিয়া জ্বর, ওর আবার ডাক্তার-কবরেজ কি হবে? হু-হু করে উঠেছে, আবার খানিক পরে ছেড়ে যাবে। ইউনিয়ন বোর্ড থেকে মেপাক্রিন এনে দোব, খেলেই সেরে যাবে।

—ভাল, উদিকে ভাগীদার নেপাল কাহারের বউ এসে বসে আছে।

–ধান-টান দিতে আমি পারব না। সে বলে দেগা। ধান নাই তো দেব কোথা থেকে?

–ধান পরের কথা, এখন বেচন নাই। জমি চাষ হবে না। বেচন দেখে দাও গো।

–বেচন? বেচনই বা পাব কোথা আমি?

–তবে থাকবে তোমার জমি পড়ে।—বলিয়া পুঁটি ঘরে চলিয়া গেল।

—থাকুক গে! আমার কচুটা।—বলিয়া ঘোঁতন বুড়ো আঙুল দেখাইয়া দিল। তারপর খুড়ীকে বললে, খাই যেন একা আমি, বুঝলে খুড়ী? হুঁ। বলিয়া তবলায় অকারণে চাটি মারিয়া দিল।

–আমি চললাম বাবা। একটা তাগিদ দিস, বুঝলি?

বলিয়া খুড়ী উঠিয়া পড়িল।

আরও দিন পনের পর সেদিন বিকেলবেলা বেচারি পুঁটি আসিয়া উপস্থিত হইল বিপিন মোড়লের বাড়ি।

মোটা মোড়ল পায়ে সরিষার তেল মাখিতেছিল। তামাক সাজিতেছিল একজন কৃষাণ। পুঁটি আসিয়া দাঁড়াইল এক পাশে। বলিল, আমি একবার আপনার কাছে এলাম জ্যাঠা।

–কে? কে বল দেখি তুমি বাছা? চেনা-চেনা করছি, চিনতে ঠিক লারছি–

–আমি নবগেরেমের গোপাল ঘোষের কন্যে—

–গোপালের কন্যে? তুমি ঘোঁতনের ভগ্নী?

–হ্যাঁ।

–দেখ দেখি কাণ্ড। বড় হয়ে গিয়েছ। চিনতে পারছি।

–মা পাঠালে আপনার কাছে।

–বল, কি জন্যে পাঠালে?

–বললে পাঁচজন থাকতে বীচনের অভাবে আমাদের জমি চাষ হবে না?

–তোমাদের বীচন নাই? কি হল? তা তুমি এলে কেন? ঘোঁতন কই? ছি-ছি-ছি!

—তাকে তো জানেন। সে উ সব দেখবে না। আর তার সময়ও নাই। রেজেস্টারি আপিস ইউনিয়ন বোর্ড আপিসে সারাদিন কাজ তো। পুঁটি ক্ষীণ যুক্তিতে ভাইকে রক্ষা করিবার চেষ্টা করি।

–হুঁ, তা কতটা জমির বীচন চাই?

–দশ বিঘে জমি; তার বিঘে ছয়েক পুঁতেছে, চার বিঘে পড়ে আছে—বীচন নাই।

—তাই তো বাছা। আমার খানিক বীচন আছে, বাঁচবে, কিন্তু বেনো জমির জন্যে রাখতে হবে। তা—

—আমাদের কি হবে?

–ঘোঁতন হলে বলতাম, উপোস করে মরবে। তা সে কথা তো তোমাকে বলতে পারছি না। দেখি সেতাবের বীচন বাঁচবে, সেতাবের হিসেব মহাতাপের গতর–। তা সেতাব আবার ঘাড় পাতলে হয়? তুমি বাছা ওদের বড় বউকে গিয়ে ধর গা। নাঃ চল, আমিই যাই।

মোটা মোড়ল পথে নামিল। আপন মনেই বলিতে লাগিল, বুয়েছ মা, এই সেতাবের কত্তা বাবার নাম ছিল দয়াল মোড়ল, লোকে বলত দলু মোড়ল; আমার বাবার নাম ছিল পরেশ। দুজনা ছিল চাকলার মাথা। নবগ্যেরামে তখন লতুন ফেশান ঢুকেছে। দেখেশুনে দুজনে পরামর্শ করত আর বলত—দলো মলেই হল, আর পরশা মলেই ফরসা। তাও আমরা কিছু কিছু বজায় রাখলাম, এরপর সব খখা। উচ্ছন্ন দিলে। ইংরেজি ইস্কুলে ঢুকেবাবু হয়ে ফেল মেরে ঘর ঢুকছে; জমি বেচে-বেচে খাচ্ছে বসে।

সারা পথটাই বকিতে বকিতে সেতাবদের দরজায় হাজির হইল। দরজা হইতে ডাকিল–সেতাব? সেতাব রয়েছ? অ সেতাব?

বাড়ির বাহির-দরজায় বাহির হইয়া আসিল মহাতাপ, তাহার হাতে কা। ফরাত ফরাত শব্দে কাটা টানিতে টানিতে বাহির হইয়া আসিয়া মাতব্বর খুড়ো মোটা মোড়লকে দেখিয়াই অপ্ৰস্তুত হইয়া গেল। চট করিয়া কাসুদ্ধ হাতটা পিছনের দিকে করিল।

বিপিন বলিল, সেতাব কই?

মহাতাপের পেট-ভর্তি তামাকের ধোঁয়া, সে দম বন্ধ করিয়া বলিল, তামাক খান। বলিয়া কাটা বিপিনের হাতে দিয়া পিছন ফিরিয়া হুস করিয়া ধোঁয়া ছাড়িয়া দিল। এবং এতক্ষণে স্বচ্ছন্দ হইয়া বলিল, বসুন, উঠে বসুন।

দাওয়ার উপর উঠিয়া মোড়াটা আগাইয়া দিল। পুঁটি অদূরে পথের ধারে দাঁড়াইয়া ছিল।

বিপিন মোড়ল দাওয়ায় উঠিয়া মোড়ায় বসিয়া ডাকিল, এইখানে এস বাছা। অ পুঁটি!

মহাতাপ সবিস্ময়ে বলিল-পুঁটি! এই লাও, ঘোঁতনা তাড়িয়ে দিয়েছে নাকি?

পুঁটি ধীরে ধীরে আগাইয়া আসিল।

মহাতাপ বিপিনকে বলিল, তোমরা হুকুম দাও জেঠা, ঘোঁতনকে আমি কিলিয়ে সোজা করে দিই। বড়া বজ্জাত। নচ্চারটা বড় বজ্জাত। এ মেয়েটা ভাল। যা গালাগাল দেয় আর মারে ওকে–। আমি চোতপরবের সঙের সময় দেখে এসেছি।

বিপিন বলিল, তুই থাম্ মহাতাপ! ও তার জন্যে আসে নি।

মহাতাপ আগাইয়া গিয়া বলিল, তার জন্যে আসে নি! কই বলুক পুঁটি, বলুক কালীমায়ের। দিব্যি করে ঠাস ঠাস করে চড়িয়ে দেয় কি না? বলুক।

পুঁটি দায়ে পড়িয়াছে। সে না পারে স্বীকার করিতে না পারে প্রতিবাদ করিতে। স্বীকার করায় লজ্জা আছে, প্রতিবাদে কুণ্ঠা আছে, আশঙ্কা আছে; মহাতাপ তো নিজেই কালীর দিব্যি গালিয়া। চাক্ষুষ দেখার কথা চিৎকার করিয়া বলিবে এবং হয়ত শেষ পর্যন্ত বীচন দিব না বলিয়া বসিবে।

বিপিন মোড়ল প্রবীণ লোক। সে পুঁটিকে নতমুখ দেখিয়া বলিল, না রে বাপু, না। আজ ও অন্য কাজে এসেছে। ওদের জমির বীচন নাই। বীচন খোঁজ করতে এসেছে।

–হরিবোল! হরিবোল! মহাতাপ হাসিতে লাগিল।

–হাসছিস ক্যানে?

—বীচন হয় নাই তো! সে আমি জানতাম–প্রচুর কৌতুকে সে হাসিতে লাগিল।–তুষ ফেললে বীজ হয় খুড়ো? আমি জানতাম। ঘোঁতনের ভাগীদার নেপাল যেদিন বীচন ফেলে, সেইদিনই আমি বলেছিলাম। আমি বললাম, ই কি রে? এ যে সব তুষ! এতে বীজ হবে ক্যানে? নেপাল বললে আমি কি করব? ঘোঁতন ঘোষ বললে—যা হয় ওতেই হবে। আমি বললাম–দে তবে গোঁজ গোঁজায় নমো করে। মহাতাপ খুব হাসিতে লাগিল।

বিপিন বলিল, কিছু বীচন দিতে হবে। তোর তো নিশ্চয় আছে।

—হ্যাঁ। অহঙ্কার করিয়া মহাতাপ বলিল, জরুর আছে, আলবৎ আছে। কিন্তু ঘোঁতনকে নেহি দেঙ্গা

–দোব না বললে কি হয়? দিতে হবে। ডাক্, সেতাবকে ডাক্।

—সেতাব!-রাগিয়া উঠিল মহাতাপসেতাব কি করবে? সেতাব? মাঠে যতদিন বীচন। থাকবে ততদিন সেতাবের এক গাছ নেহি হ্যায় বাবা। সব মহাতাপের। বিলকুল। হা ধান কাটেগা, ঘরে আনেগা, ঝাড়াই করেগা, গোলায় তুলেগা, তারপর উ যা করেগা তা করেগা। মাঠকে মালিক হ্যাম হ্যায়—হাম। একবার ঘোঁতনার মায়ের কথায় ধান ছেড়ে দিয়েছি, সবাই বকেছে আমাকে। মহাদেবের পাট নিয়ে দশ টাকা চাঁদা দিয়েছি। উঁহুঁ, আর নেহি দেগা।

এবার পুঁটি বলিল, আমার মা-ই আমাকে পাঠিয়েছে মহাতাপদাদা। জমি পোঁতা না হলে আমরা খাব কি বল?

—খাব কি? শুধু তোরা খাবি? ঘোঁতন খাবে না? আগে ভাত বেড়ে তোত কে দিবি।

হঠাৎ বিপিন মোড়ল পুঁটিকে বলিল, চল, বাড়ির ভিতর চল। ডাক, চাঁপাডাঙার বউমাকে ডাক। বউমা তো তোমাদের আপনার গো। বউমার মা তোমার মা তো সই!

মহাতাপ ঘাড় নাড়িয়া বলিল, উঁহু, বড় বউয়ের শরীর খারাপ। সে শুয়ে আছে। উঁহুঁ।

সত্যই বড় বউ ঘরের মধ্যে শুইয়া ছিল। শরীর খারাপ বলিয়া শুইয়া আছে। আসলে টিকুরীর খুড়ীর সেই মর্মান্তিক কথা কয়টা বিষাক্ত তীরের মত তার মর্মস্থল বিধিয়া অবধি তাহাকে বিষণ্ণ ক্লান্ত করিয়া ফেলিয়াছে। কথা কয়টার বিষে তাহার অন্তর এমনই জর্জর হইয়া গিয়াছে। যে, সংসারের জীবনে যেন রুচি পর্যন্ত বিস্বাদ ঠেকিতেছে। অপর সকলের কাছে কথাটা গোপন করিবার অভিপ্ৰায়েই সে শরীর খারাপের অজুহাতে আপন ঘরে শুইয়া আছে। সে চুপ করিয়া। শুইয়া ছিল। মাথার দিকে জানালার ধারে বসিয়া সেতাব তামাক খাইতেছিল আর মৃদুস্বরে বকিতেছিল।

—একে বলে, এ তো ভারি বিপদ করলে তুমি! এ তো বড় ফ্যাসাদ! টিকুরীর খুড়ী কি বললে, আর তুমি গিয়ে শয্যা পাতলে! ওঠ–ওঠ।

–না। আমাকে জ্বালিয়ো না। আপনার কাজ দেখগে যাও।

–ওই! তুমি না খেয়ে পড়ে থাকবে, আর আমি কাজ দেখব? ওঠ ওঠ। কুকুরের কামড় হাঁটুর নিচে। টিকুরীর খুড়ী বললে, ভাগী ভাঁড়িয়ে পুঁজি করি বলে তোমার ছেলে হয় নাই। টিকুরীর খুড়ী একেবারে সাক্ষাৎ বেদব্যাস। তা হয় নাই তো হয় নাই। ছেলে নাই তো নাই–

—কি বললে? বড় বউ উঠিয়া বসিল। সেতাব ভয় পাইয়া থামিয়া গেল। চাঁপাডাঙার বউয়ের মুখের দিকে চাহিয়া বলিল, কি বললাম?

–ছেলে নাই তো নাই! তোমরা পুরুষমানুষ, তোমাদের কথা আলাদা! কিন্তু—

বড় বউ বিচিত্ৰ হাসি হাসিল।

সেতাব সে হাসি দেখিয়া জ্বলিয়া গেল। বড় বউয়ের হাসিতে যে আগুন ছিল, সেই আগুন তাহার অন্তরের সঞ্চিত সন্তানকামনার গোপন ক্ষোভের শুষ্ক দাহ্য বস্তুতে ধরিয়া গেল। কথাটা দুই জনেই পরস্পরের কাছে গোপন করিয়া রাখিয়াছিল। সেতাব চাঁপাডাঙার বউয়ের মুখের দিকে। কয়েক মুহূর্ত স্থির দৃষ্টিতে চাহিল-বড় বউয়ের মত বিচিত্র দৃষ্টিতে। তারপর কাটা রাখিয়া দিয়া বলিল, আলাদা? পুরুষের কথা আলাদা? না? হঠাৎ উঠিয়া দাঁড়াইয়া সে বলিল, একসময় মনে হয়–। সে থামিয়া গেল এবং চলিয়া যাইতে উদ্যত হইল।

বড় বউ উঠিয়া দাঁড়াইল। সেতাবের গায়ের কাপড়ের খুঁট চাপিয়া ধরিয়া বলিল, কি মনে হয়? বলে যাও।

সেতাব বলিল, মনে হয় ঘর-দোর ধান-ধনে আগুন দিয়ে চলে যাই।

বড় বউয়ের হাতখানা খসিয়া পড়িল।

–আমার মনে হয় না ছেলের কথা? আমার সাধ নাই? মনে হয় না এসব আমি ক্যানে করছি? কার জন্যে করছি? কে ভোগ করবে? আমার জলগণ্ডুষের সাধ নাই? পেরেত হয়ে জলের জন্য হা-হা করে বেড়াতে হবে না আমাকে? তবু কি করব?

সেতাব চলিয়া গেল।

চাঁপাডাঙার বউ একটা অস্ফুট কাতর শব্দ করিয়া স্তব্ধ হইয়া গেল। মনে হইল আকাশ ভাঙিয়া পড়িতেছে, মাটি ফাটিতেছে। ফাটুক। তাই ফাটুক। সে তাহারই মধ্যে ঢুকিয়া যাক।

ঠিক এই মুহূর্তে নিচে হইতে বিপিনের ডাক শোনা গেল—বড় বউমা! চমকিয়া উঠিল চাঁপাডাঙার বউ। সে ঠিক বুঝিতে পারিল না। তবু মাথার ঘোমটা তুলিয়া দিল।–কে?

পাশের ঘরের জানালাটা খুলিয়া মানদা মুখ বাড়াইয়া বলিল, পঞ্চায়েতের শিব মোড়ল–মোটা মোড়ল এসেছে দিদি!

চাঁপাডাঙার বউ কোনো রকমে উঠিয়া সিঁড়ির দিকে পা বাড়াইল।

বিপিন নিচেই দাওয়ার উপর চাপিয়া বসিয়া ছিল। তামাক খাইতেছিল। পুঁটি একটি খুঁটি ধরিয়া দাঁড়াইয়া ছিল একপাশে। সেতাব হনহন করিয়া নামিয়া আসিল এবং পুঁটিকে দেখিয়া খানিকটা অবাক হইয়া গেল। সে পুঁটিকে ঠিক চেনে নাই। এমন কালো অথচ শ্রীমতী এত বড় একটি মেয়ে সিঁথিতে সিঁদুর নাই, বিধবা বা কুমারী ঠিক ঠাওর করা যায় না; এ কে? কিন্তু চমৎকার মেয়ে। তাহাকে দেখিয়া বিস্ময় স্বাভাবিকভাবেই জাগিয়া উঠিবার কথা। মহাতাপ উঠানে। বসিয়া একটি কাঠ দিয়া দাগ কাটিতেছিল এবং বলিতেছিল, সে হোগা নেহি, কভি নেহি।

সেতাব বলিল, কি গো খুড়ো?

বিপিন বলিল, এই যে তুমি বাড়িতে আছ; তুমি নাই ভেবে অগত্যে বড় বউমাকে ডাকছিলাম।

সেতাব হুঁকোটা লইয়া টানিল না। সে পুঁটিকেই দেখিতেছিল। হাতের কাচের চুড়ি, লোহা দেখিয়া এতক্ষণে বুঝিল মেয়েটি কুমারী। কিন্তু এত বড় কুমারী মেয়ে? কার বাড়ির? বলিল, এ মেয়েটি?

মহাতাপ উত্তর দিল—ঘোঁতনার বোন।

–ঘোতনের ভগ্নী? বিপিন বলিল, হ্যাঁ, গোপালের কন্যে। বেচারি এসেছে, ওদের বীচন নাই। জমি পড়ে আছে। চার-পাঁচ বিঘের মতন বীচন নাই। ঘোঁতন বলে দিয়েছে, সে কিছু জানে না। কি করে বল? ওকেই আসতে হয়েছে। এত বড় কুমারী মেয়ে, এক গা থেকে আর এক গাঁ—হুঁ। তা পাগল বলছে—নেহি দেগা। তোমরা সব ওকে বকেছ ঘোঁতনকে ধান ছেড়ে দেওয়ার জন্য, তাই ও আর বীচন দেবে না। তাই।

সেতাব বলিল, গোপাল ঘোষ আমাদের অনেক ক্ষতি করেছে খুড়ো, সে তুমি জান। কিন্তু আমি মনে রাখি নি। ঘোঁতনকে গতবার ধান দিয়েছিলাম। সে বৃত্তান্তও সব জান। আবার বীচনও দোব। পাবে বীচন। পুঁটি এসেছে যখন বুঝছি—ওর মা পাঠিয়েছে। গোপাল ঘোষ যা করুক ঘোঁতন যা করুক—ঘোঁতনের মা—বড় বউয়ের সমা! আমার পূজ্য লোক। দিতে হবে বৈকি, দোব বীচন। বড় বউ বলবে কি? বীচন দোব। পাবে, বীচন পাবে।

মহাতাপ অবাক হইয়া গেল। সেতাবের মুখের দিকে চাহিয়া থাকিয়া বলিল, বীচন দেবে?

–হ্যাঁ, জমি তো পুঁততে হবে?

মহাতাপ তাহাকে বলিল, তুমি আর নেহি বাঁচেগা। মর যায়েগা জরুর মর যায়েগা।

সেতাব বলিল, কি বকছে দেখ! সিদ্ধি খেয়েছি?

—কি কছি? আ-হা-হা? তুম এক বাতমে বীজ খয়রাত কর দিয়া? তুম চামদড়ি, তুম কিপটে; তুম দাতাকৰ্ণ বন গিয়া, তুম নেহি বাঁচেগা। কিন্তু আমি বীচন দেব না। কভি না। শুয়ার ঘোঁতনা যদি পিঠে একটা কিল খায় আমার তবে দোব। নেহি তো কভি না।

সে বাহির হইয়া চলিয়া গেল।

পুঁটি হাসিয়া ফেলিল।

বড় বউ এবার বাহির হইয়া আসিয়া বলিল, বীচন পাবে কাকা। আমি ওকে বুঝিয়ে বলব।

তারপর পুঁটিকে বলিল, ওরে, তুই কত বড় হয়েছিস পুঁটি? এত দিনে বীচনের জন্যে দিদি বলে মনে পড়ল? ইমা কেমন আছে?

তাহাকে লইয়া সে বাড়ির ভিতর ঢুকিল।

–মায়ের খুব জ্বর দিদি। মা তোমার কথা প্রায়ই বলে।

–কি বলে রে?

–কত কথা বলে। বেশি বলে—কাদু আমার ভাগ্যবতী, গুণবতী, রূপবতী–মায়ের কাছে সবই ভাই তুমি।

কাদম্বিনী একটা দীর্ঘনিশ্বাস ফেলিল, বলিল, সহমা আমাকে বড় ভালবাসে।

—সেদিন রূপের কথায় বলছিল—সে দেখতে হয় কাদুকে। যেমন মুখচোখ, তেমনি গড়নপেটন—আহা-হ্যাঁ, এখনও যেন কনে বউটি!

—মরণ আমার রূপের! মরণ আমার কনে বউয়ের ছিরিরকে যেন কাদুর অন্তরে আর্তনাদ। করিয়া উঠিল।

পুঁটি তাহা বুঝিল না, সে উৎসাহভরে বলিল, শোন—এই শেষ নাকি? আমার এক পিসি বললেতা বাঁজা মেয়ের দেহের বাঁধন ভাল থাকে। মা বললে—কি হল দিদি? দিদি?

কাদম্বিনী পাশের দেওয়ালটা ধরিয়া দাঁড়াইয়া গিয়াছিল। মুখখানা তাহার কেমন হইয়া গিয়াছে। সে বলিল, মাথাটা কেমন ঘুরে গেল।

সে এক হাতে গলার কবচটা চাপিয়া ধরিয়াছিল, আপনার অজ্ঞাতসারেই।
পঞ্চম পরিচ্ছেদ

ভাদ্র মাস পড়িয়া গিয়াছে।

সেদিন ষষ্ঠীর দিন। চাষী গ্রামটির পাড়ায় পাড়ায় এক এক ঘরে হুলুধ্বনি পড়িয়াছে। মেয়েরা ষষ্ঠীর ব্ৰত-কথা শুনিয়া উলু দিতেছে। রোদে শরতের আমেজ ধরিয়াছে। ভাল চাষীদের চাষ প্রায় শেষ। মহাতাপ তো রোয়ার কাজ শেষ করিয়া নিড়ানের কাজ আরম্ভ করিয়াছে।

সেতাবের বাড়ির ভিতরেও মেয়েরা বসিয়া ষষ্ঠীর ব্ৰত-কথা শুনিতেছে।

সেতাব গোয়াল-বাড়িতে দাঁড়াইয়া ছিল। রাখালটা দুধ দুহিতেছে। গোয়াল-বাড়ির উঠানে ধানের বীচনের একটি বোঝা পড়িয়া আছে। বীচনের বোঝাটি ঘোতনের জমির জন্য তুলিয়া আনা হইয়াছে।

বাড়ি আসিয়া ঢুকিল পুঁটি।

সেতাব তাহাকে দেখিয়া বেশ প্ৰসন্ন হইয়াই বলিল, এই দেখ বীচন তোলা আজ তিন দিন। পড়ে আছে।

পুঁটি লজ্জিত হইয়া বলিল, কি করব। জমির পাট হয় নাই। লোকজন নাই। নেপালের এক হাতের কাজ। তার ওপরে ভাগীদের কাজ।

সেতাব অগ্রসর হইয়া আসিল। বলিল, আজ আবার ষষ্ঠী। আজও ভাবলাম–। সে হাসিল।

পুঁটি বীচনের বোঝাটা নাড়িতে চেষ্টা করিল।

সেতাব বলিল, ওইওই! একে বলে, ওই বোঝা তুমি তুলতে পার? বীচন নেবে কে? নেপাল কই?

–নেপাল জমিতে মই দিচ্ছে। ষষ্ঠীর দিন নেপালের বউ আসে নাই।

–তবে?

–আমিই নিয়ে যাব।

—এই দেখ বলি তাই হয় নাকি?

পুঁটি এবার ডাকিল, দাদা, অ দাদা!

বাহির হইতে ঘোঁতন সাড়া দিল, কি? আয় না বোঝাটা মাথায় তুলে নিয়ে?

সেতাব বলিল ঘোঁতন এয়েছে! কই? অ ঘোঁতন! ঘোঁতন!

ঘোঁতন এবার ঘরে ঢুকিল। তাহার পরনে লুঙ্গি, গায়ে একটা হাফশার্ট—অবশ্য দুইটাই পুরনো। সে ঘরে ঢুকিতেই সেতাব বলিল, বাইরে দাঁড়িয়ে ক্যানে রে? দেখ দেখি। তা তোর লোক কই–এ বোঝা নেবে কে?

ঘোঁতন একটা বিড়ি ধরাইয়া বলিল—শুধাও তাই পুঁটিকে। বললাম, আজ ষষ্ঠী, কাল নেপালের বউ আসবে, কাল সে-ই নিয়ে যাবে। তা বলে—তুমি তুলে দিয়া আমি নিয়ে যাব। আমি বললাম—তাই যাবি তো চ! আমার কি!

পুঁটি বলিল, তাই দাও না তুলে। ধর।

সেতাব ব্যস্ত হইয়া বলিল,—এই! ওরে নোটন! নোটন! যা তো, যা তো, বীচনের বোঝাটা মাঠে দিয়ে আয় তো! যা তো!

ঠিক এই সময়েই বাড়ির ভিতরে উলু পড়িল।

বাড়ির ভিতরে উঠানে ৫/৬টি মেয়ে সুপারি হাতে ব্ৰত-কথা শুনিতে বসিয়াছে। সকলেই স্নান সারিয়া এলোচুলে গোল করিয়া বসিয়াছে।

উলু দিয়া প্ৰণাম করিয়া সকলে উঠিল।

যে প্রবীণা ব্ৰত-কথা বলিতেছিল, সে বলিল, এ ব্রত করলে কি হয়?

নিজেই উত্তর দিল—নিঃসন্তানের সন্তান হয়। সন্তান মরলে, সেই সন্তান জিউ পায়। রণে গোনে অরুণ্যে মা ষষ্ঠী বুক দিয়ে রক্ষা করেন।

চাঁপাডাঙার বউ একটা দীর্ঘনিশ্বাস ফেলিয়া উঠিয়া দাঁড়াইল এবং দরজার চৌকাঠে একটি ফোঁটা দিল। ষষ্ঠীর প্রসাদী হলুদতেলের ফোঁটা।

একটি মেয়ে বলিল, দরজার মাথায় কাকে ফোঁটা দিচ্ছ চাঁপাডাঙার বউ?

বিষণ্ণ হাসিয়া বড় বউ বলিল, দেওরকে ভাই! সে তো মাঠে। শাউড়ি বলে গিয়েছে। বউমা, ওকে ফোঁটা তুমি চিরকাল দিয়ো।

মেয়েরা বাহির হইয়া চলিয়া গেল।

এবার চাঁপাডাঙার বউ ডাকিল, মানিক? মানু, মানিক কই?

মানু কাছে আসিয়া বলিল, তাকে পুরে রেখেছি ঘরে। কোথায় বেরিয়ে পালাবে। বলিয়াই সে চাঁপাডাঙার বউয়ের হাতের হলুদতেলের বাটি হইতে খানিকটা হাতের তেলোয় তুলিয়া লইয়া বন্ধ ঘরের দরজা খুলিয়া ঘরে ঢুকিল।

বড় বউ চকিত বিস্ফারিত দৃষ্টিতে তাহার দিকে চাহিল। এটা সন্দেহ তাহার মনে সাড়া দিয়াছে। পাছে সে আগে মানিককে ফোটা দেয়, এই ভয়েই কি মানু এই কৌশল অবলম্বন করিয়াছে?

মানু মানিককে কোলে লইয়া বাহির হইয়া আসিল এবং বড় বউয়ের সামনে দাঁড়াইল।

বড় বউ মানিকের মুখের দিকে চাহিয়া বিচিত্ৰ হাসি হাসিয়া বলিল, এই যে ফোঁটা দিয়েছিস তুই? বলিয়া সেও ফোঁটা দিল মানিকের কপালে।

মানু ভ্রূ কুঞ্চিত করিয়া প্রশ্ন করিল, কিন্তু তুমি হাসলে ক্যানে বড়দি?

–আমি পাছে আগে ফোঁটা দিই, তাই তুই আগে ফোঁটা দেবার জন্যেই ওকে ঘরে বন্ধ করে রেখেছিলি। তাই হাসলাম। তা আমাকে আগে বললেই পারসি!

মানু তাহার মুখের দিকে চাহিয়া একটু চুপ করিয়া রহিল, তারপর বলিল, তোমাতে আর ভাসুরে সেদিন ঘরে কথা বলছিলে, সেসব কথা আমি শুনেছি বড়দি। মানিক নিয়েও তো তোমাদের বুক ভরে না।

মানু মানিককে লইয়া ঘরে ঢুকিয়া গেল। চাঁপাডাঙার বউ দেওয়ালে ঠেস দিয়া দাঁড়াইল। দেহখানা তার অবশ হইয়া গিয়াছে। সে তাহার গলায় সুতার ড়ুরিতে বাধা কয়েকটা মাদুলি টানিয়া বাহির করিয়া নাড়িতে-চাড়িতে লাগিল।

দিন কয়েক পর সেতাব বাড়িতে আসিয়া ঢুকিল। হনহন করিয়া ঘরের ভিতরে ঢুকিয়া গেল। মিনিটখানেক পরেই ডাকিল, শোন তো একবার! বলি শুনছ?

বড় বউ আসিয়া ঘরে ঢুকিল।

সেতাব তাহার কোঁচড়ে কিছু গুঁজিতেছিল। দেখিয়া বুঝিতে কষ্ট হয় না যে বস্তুটা টাকা। বড় বউ আসিয়া দাঁড়াইতেই সেতাব বলিল, দেখ ঘোঁতন ঘোষ এয়েছে। বুয়েচ? একে বলে বলছে, নবগ্রামের রাখহরি দত্তর ছেলে চার-পাঁচ ভরির সোনার হার বাধা রেখে টাকা নেবে। বলেছে তিনশো, তা আমি বলছি, দুশো! মেরে কেটে আড়াইশো। সুদ টাকায় মাসে ছ পয়সা। দোব? বলব তাকে আসতে?

বড় বউ বলিল, মহাতাপকে শুধাও।

—তুমি ক্ষেপেছ নাকি?

–না। তাকে না শুনিয়ে কোনো কাজ তুমি করতে পাবে না।

স্ত্রীর মুখের দিকে কিছুক্ষণ তাকাইয়া থাকিয়া সেতাব বলিল, এ তো ভ্যাল আবদার রে বাবা। মহাতাপ, মহাতাপ, মহাতাপ করে আমাকে জ্বালিয়ে খেলে তুমি। বলি মহাতাপ তো আমার মায়ের পেটের ভাই। নাকি? তুমি এত হাঁপাও ক্যানে?

বলিয়াই সে বাহিরে চলিয়া গেল।

সে যখন দাওয়ায় বাহির হইল, তখন মানদা এদিক হইতে ওদিকে চলিয়া যাইতেছিল।

বাহিরে ঘোঁতন দাওয়ার উপর মোড়ায় বসিয়া পা নাচাইতেছিল এবং ছোট একটা আয়নাচিরুনি লইয়া চুল অ্যাঁচড়াইতেছিল। সঙ্গে সঙ্গে শিস দিতেছিল।

কাছে দাঁড়াইয়া ছিল গোবিন্দ—সেই রাখাল ছেলেটি।

সেতাব আসিতেই গোবিন্দ পলাইল।

সেতাব বলিল, এই লাও। বলিয়া পাঁচটি টাকা ঘোঁতনকে দিল এবং বলিল, দোব, তাই দোব। বুঝলে, বলে দিয়ে।

ঘোঁতন আয়না-চিরুনি পকেটে রাখিয়া টাকা পাঁচটা রুমাল বাহির করিয়া খুঁটে বাঁধিল। বলিল, তোমাকে লোকে খারাপ লোক বলত বুয়েচ, আমিও বলতাম। কিন্তু তুমি তা লও। বুয়েচ, এ আমি বুঝেচি। বুয়েচ! মুখখুতে বলবে, কিন্তু আমি মুখখু লই। তুমি গুড ম্যান, তবে হ্যাঁ, স্ট্রিকট্‌ ম্যান–

সেতাব বুদ্ধি ধরে বিচক্ষণ, সে চ্যাংড়াও নয়। তাহার উপর সে পঞ্চায়েতের মণ্ডল। সে বলিল, তুই বড় ফাজিল ঘোঁতন। বড় বেশি বকিস। যা, বাড়ি যা। রাখহরির ছেলেকে পাঠিয়ে দিস। আর শো, আর একটা কথা বলি। নিজে একটু খাঁটিস। এত বড় আইবুড়ো বোনটাকে অমন করে খাটাস না। বুঝলি?

ঘোঁতন বিচিত্র মুখভঙ্গি করিয়া বলিল, ওরে বানাস্ রে! তা এক কাজ কর না। সঙ্গে সঙ্গে কণ্ঠস্বর নিম্ন করিয়া বলিল, তুমি পুঁটিকে বিয়ে কর না। তোমার তো ছেলেপুলে হল না।

সেতাব প্রথমটা অত্যন্ত চঞ্চল হইয়া উঠিল ইয়েকে বলে, ইয়েকে বলে। তারপর অকস্মাৎ চিৎকার করিয়া উঠিল, ঘোঁ-ত্‌-না-

—এই দেখ, রাগ করছ ক্যানে? ঘোঁতনা হাসিল।–ও-বউয়ের ছেলেপুলে হবে না তোমার। আর তোমার উপর টানও নাই তার। সে যা কিছু–

সেতাব আবার আরও জোরে চিৎকার করিয়া উঠিল, ঘোঁ-ত্‌-না–

ঘোঁতন আরও কি বলিতে যাইতেছিল, কিন্তু সেই মুহূর্তেই মহাতাপের গলা শোনা গেল রাস্তার বাঁকে। সে গান গাহিতে গাহিতে আসিতেছিল—

কাজুলী কাজুলী ও আমার আখের
বনের আদুরী, কালো বরণ কাজুলী–
তোর পয়ে হরে আমার বউয়ের
আমার হবে মাদুলী।

ঘোঁতন চমকিয়া উঠিয়া প্রায় লাফ দিয়া নামিল রাস্তায়। বলিল, চলো। পাঠিয়ে দোব রাখহরির ছেলেকে।

সে দ্রুতপদে পলাইয়া গেল।

সেতাবের উঁকা ধরা হাতখানি থরথর করিয়া কাঁপিতেছিল। চোখে তাহার বিচিত্র দৃষ্টি ফুটিয়াছে। মুখ কেমন হইয়া গিয়াছে।

মহাতাপ ওদিক হইতে দুই জন ব্যবসায়ীকে সঙ্গে লইয়া প্রবেশ করিল, বলিল; এই লাও। গুড় কিনতে এসেছে। আলুর বীচন কিনবে। সাহজী, এই হামারা দাদা। ওই দামদর করো।

চমকিয়া উঠিল সেতাব। একটা দীর্ঘনিশ্বাস ফেলিয়া হ্রকায় টান দিতে লাগিল।

মহাতাপের সর্বাঙ্গে কাদা। সে জমি নিড়াইতেছিল। বাড়ি ফিরিবার পথে গুড়ের পাইকারদের সঙ্গে দেখা হইয়াছে। তাহাদের সঙ্গে লইয়া আসিয়াছে।

তাহাদের বসাইয়া সে হাঁকিতে হাঁকিতে বাড়ি ঢুকিল, বড় বউ! ও বড় বউ! সুর করিয়া। আবদারের ডাক।

ছোট বউ দাওয়ায় বসিয়া ময়দা মাখিতেছিল। সে বলিল, অ মাগো। ডাকের ঢঙ দেখ একবার।

মহাতাপ গ্রাহ্য করিল না। বলিল, কোথা গেল বড় বউ?

ছোট বউ বলিল—উত্তাপের সহিতই বলিল, তার শরীর খারাপ! ঘরে শুয়ে আছে।

মহাতাপ বলিল, শরীরের কিছু না বলেছে! রোজ শরীর খারাপ! রোজ শরীর খারাপ! অ বড় বউ! বড় বউ!

বড় বউ বাহির হইয়া আসিল। বলিল, কি বলছ?

–বলি ফোঁটা দেবে না আমাকে? ষষ্ঠীর ফোঁটা?

বড় বউ হাসিয়া বলিল, দেব বৈকি। চৌকাঠে দিয়েও মন তো মানে নি। জল না খেয়েই বসে আছি।

—আর একটি কথা শোন।

–বল।

–গুড়-আলুর খরিদ্দার নিয়ে এসেছি। হিন্দুস্থানি পাইকার।

–তা বেশ তো। বেচ দুই ভাইয়ে যুক্তি করে।

—সে যুক্তি তুমি তার সঙ্গে কর গিয়ে। ওসব আমি জানি না। আমার কৃষাণের ভাগের দশ। মণ গুড় চাই। আমি বিক্রি করেগা। সে কথা হয়ে আছে। তুমি সাক্ষী। সে টাকা হাম লেঙ্গে। ১৮ করে মণ। ১৮০ রুপেয়া।

–আচ্ছা পাগল তুমি। সবেরই তো অর্ধেক ভাগ তোমার। নাও না দাদার কাছে।

–উঁহুঁ। উ সব নেহি মাংতা। এই আমার কৃষাণের ভাগটা চাই।

–মানু বলিয়া উঠিল, পাগল লোক সাধে বলে না! মরণ!

—চুপ রহো, চুপ রহো, আরে দুষ্ট সরস্বতী, চুপ রহে। ওহি টাকাসে হম হার গড়ায়েগা। বড়া বহুকে লিয়ে আর তুমহারা লিয়ে। কেয়া দুটু সরস্বতী, এরে ময়না—বোলো রাধা কিষণ, বোলো মিঠি বাত। সেনেকা হার। সেনেকা হার।

মানু বলিয়া উঠিল, একশো আশি টাকায় দুজনের সোনার হার! এ যে সেই দু পয়সার মণ্ডা কিনলাম, আমি খেলাম, আমার দাদা খেলে, তারপর ফেলে দিলাম, কুকুরে খেলে, তাও শেষ করতে পারলে না, পড়ে থাকল। নব্বই টাকা সোনার ভরি।

মহাতাপ এবার হুঙ্কার দিয়া উঠিল—এ, তু মু সামালকে বাত কহো—আশি রুপেয়াকে হারসে মন উঠতা নেহি; অঃ, তেরা লিয়ে পাঁচশো আশি রুপেয়াকে আর চুরি করকে আনেগা হম। দেখো বড়া বহু–

চাঁপাডাঙার বউ বলিল, চুপ কর মহাতাপ। ছি, কতবার বলেছি তোমাকে, এমন কথা বোলো না মানুকে। আর মানু, মানুষটা বড় মুখ করে কথা বললে, তাকে কি ওই ভাবে কথা বলে?

–না, বলে না! আশি টাকার হার—তাও রুপোর না সোনার! সেই পাঁচ সিকের জমিদারি!

–বেশ তো, হার শুধু তোর জন্যেই হবে।

–নেহি। কভি নেহি। কখনও না।

–আমি হার পরব না। আমার চাই না ভাই।

মানু এবার হঠাৎ খুব ভাল মানুষ হইয়া গেল; একেবারে একমুখ হাসিয়া অত্যন্ত মিষ্টি ভাষায়। অতি মোলায়েম করিয়া ঘাড় নাড়িয়া বলিল, আশি টাকার হার পরে, না, মানায় দিদিকে। পাঁচশো আশি টাকার হার পুরবে দিদি, হারের বায়না হয়ে গেল। বুঝেছ?

বলিয়াই সে ময়দার থালাটা হাতে লইয়া অত্যন্ত দ্রুত উঠিয়া চলিয়া গেল।

বড় বউ আৰ্তকণ্ঠে ডাকিল–মানু—হুঁ। তাহার মুখ বিবর্ণ হইয়া গিয়াছে এক মুহূর্তে কে যেন তাহাকে অতর্কিতে নিষ্ঠুর আঘাতে চাবুক হানিয়াছে মুখের উপর।

ছোট বউ ঘরে ঢুকিবার মুখে ঘুরিয়া দাঁড়াইয়া বলিল, চার পাঁচ ভরির হার দুশো আড়াইশো টাকায় খুব সস্তা বড়দিজলের দর। ওতে তুমি এতটুকু খুঁতখুঁত কোরো না, বড় ভাল মানাবে তোমাকে।

বলিয়াই ঘরে ঢুকিয়া গেল।

মহাতাপ কিন্তু উল্লসিত হইয়া উঠিল; সে পরমোল্লাসে বলিয়া উঠিল, সত্যি কথা? বড় বউ আমার দিব্যি, বল? আরে বাপ রে বাপ রে। চামদড়ি কিপটের এ কি সুমতি! সেদিন পুঁটি আসবামাত্র বীচন দিয়ে দিলে। আজ তোমাকে সোনার হার! বলিহারি বলিহারি! আজ দাদাকে পেনাম করেগা, পায়ের ধুলো লেখা।

সে পরমানন্দেই বাহির হইয়া চলিয়া গেল।

বাহির-বাড়ির রাস্তার ধারের দাওয়ার উপর হিন্দুস্থানি দুই জন বসিয়া পিতলের থালায় ছাতু ভিজাইছে, লঙ্কা-নুন রাখিয়াছে। লোটার জলে হাতমুখ ধুইতেছে। সেতাব বসিয়া কা টানিতেছে। তখনও সে যেন কেমন হইয়া আছে। মাথাটা তাহার কেমন করিতেছে।

মহাতাপ আসিয়া হঠাৎ গড় হইয়া প্ৰণাম করিয়া বসিল।

সেতাব চমকিয়া উঠিল—ওই! ওই! এ কি রে বাপুঃ ও কি!

—পরনাম। তোমাকে পেনাম করলাম।

–ওই। হঠাৎ পেনাম ক্যানে রে বাপু?

—তুমি—। তারপর ওই হিন্দুস্থানি দুই জনের কথা মনে করিয়া চুপ করিয়া গেল। বলিল, শুনেছি, আমি শুনেছি। হাসিতে লাগিল।

কি?

–বলব, বলব। দাও, হুঁকোটা দাও।

সে কোটা প্ৰায় টানিয়াই লইল সেতাবের হাত হইতে এবং পিছন ফিরিয়া হুঁকা টানিতে গিয়া থমকিয়া দাঁড়াইল ওই গুড়ের পাইকারদের কাছে। ভিজানো ছাতুর দিকে তাহার দৃষ্টি

পড়িল। ভিজানো ছাতু বেশ ফুলিয়া উঠিয়াছে। সে বলিল, ই কেয়া হ্যায়? ছাতু? সাহজী?

সাহুজী উত্তর দিল, হুঁ, সন্তু!

মহাতাপ বলিল, হুঁ হুঁ! বহুত আচ্ছা চিজ! নুন-লঙ্কা দিয়ে আচ্ছা লাগতা হ্যায়, না!

সাহু হাসিল। বলিল, বাঙালিকে হজম নেহি হোতা।

বিকালের দিকে ওজন করিয়া গুড় বিক্রয় হইতেছিল। খামারে একটা কাঁটা-ওজন খাটাইয়া টিনবন্দি করিয়া গুড় ওজন করিতেছিল রাখাল পাল। সেতাব দাওয়ায় বসিয়া খোলার কুচিতে করিয়া মাটির উপর একটার পর একটা দাগ দিয়া হিসাব রাখিতেছিল। পাশেই একটা গামলা। গামলায় আধ-গামলা গুড় রহিয়াছে। টিনে গুড় বেশি হইলে তাহার ভিতর হইতে হাতায় করিয়া গুড় তুলিয়া গামলায় রাখিতেছিল, আবার কম হইলে পূরণ করিয়া দিতেছিল। কাটার ওজন করিতে রাখালের দক্ষতার খ্যাতি আছে। সে খ্যাতি—খোল বাজানোর খ্যাতির সমান। রাখালের ওজন-করা জিনিস কখনও কম-বেশি হয় না। আর তেমনি দ্রুত ওজন করে।

একদিকে একটা আধ মণ, অন্যদিকে টিন।

কাঁটাটা দুলিতেছিল। রাখাল কাটার উপরে একটা হাত রাখিয়া কাঁটার দিকে তাকাইয়াছিল, আর সুর করিয়া বলিতেছিল, তের রাম তেরতের রাম, তের রামতের রাম–

খানিকটা গুড় তুলিয়া লইয়া বলিল, তের রামে চৌদ্দ। চৌদ্দ। ওঠাও।

নোটন টিনটা নামাইয়া রাখিল। তেরটা টিন আগে হইতেই সাজানো ছিল। এটা রাখিতেই চৌদ্দ হইল। রাখাল বলিল, চৌদ্দ, চৌদ্দ, চাপাও।

নোটন আর একটা টিন চাপাইল।

চৌদ্দ রাম। চৌদ্দ রাম। চৌদ্দ রাম।

ওদিকে ককালে একটা, মাথায় একটা, দুইটা টিন লইয়া বাড়ির ভিতর হইতে আসিয়া হাজির হইল মহাতাপ।

—ধর্‌ নোটনা ধরা। আগে কাঁকালেরটা।

নোটন ককালেরটা ধরিতেই সে নিজেই মাথারটা নামাইল। তাহার গায়ে হাতে গুড় লাগিয়াছে। রাখাল হাকিল, চৌদ্দ রাম, চৌদ্দ রামপনের। পনের। পনের।

মহাতাপ নিজের হাতটা লইয়া গিয়া গরুটার মুখের কাছে ধরিলালে, চেটে লে। গরুটাকে চাটাইয়া লইয়া বাড়ির ভিতর চলিয়া গেল।

রাখাল হাকিতেছিল—পনের পনের পনের।

ওদিকে বাড়ির ভিতরে জালার ভিতর হইতে বাটিতে করিয়া গুড় বাহির করিয়া টিনে ঢালিতেছিল বড় বউ। গাছকোমর বাঁধিয়া সে কাজ করিতেছে।

দাওয়ায় বসিয়া মানিক মুড়ি ও গুড় খাইতেছে। পাশেই তাহার বাঁশিটি পড়িয়া আছে। মধ্যে মধ্যে পু করিয়া দিতেছে।

মানদা টিনের পাশে বসিয়া টিনের গায়ে যে গুড় পড়িতেছে সেই গুড় চাচিয়া লইয়া একটা পাত্রে জমা করিতেছে।

মহাতাপ ঘরে আসিয়া ঢুকিল। টিনে ভরা হয় নাই দেখিয়া অপেক্ষা করিয়া রহিল, বলিল, আরে রাম রাম, এখনও টিন ভরে নাই?

চাঁপাডাঙার বউ বলিল, দিচ্ছি, দিচ্ছি, হাত তো আমাদের দুটো, চারটে তো নয়। চতুর্ভুজো দেখে বউ আনলেই তো পারতে তোমরা! সবুর কর, ঘোড়াটা বাঁধ।

এখন কাজের মধ্যে চাঁপাডাঙার বউয়ের সে বিষণ্ণতাটুকু আর নাই। এই সময়ই বাহির হইতে রাখাল ডাকিল, এক ঘটি জল দেবে বউমা? বড় তেষ্টা পেয়েছে।

মানদা বলিল, গুড়ের লোভে আবার জল খেতে এসেছে গেঁজাল। ওজন করবার আর লোক পেল না।

বাহির হইতে রাখাল বলিল, শুনছ, অ বড় বউমা!

চাঁপাডাঙার বউ একটা বাটিতে গুড় লইয়া বাহির হইয়া গেল। মহাতাপকে বলিল, তুমি বার কর হে ততক্ষণ।

রাখাল বলিল, গুড় কিন্তু ফাস্টো কেলাস মা। কি সুবাস! আর কি তার! সুন্দর! সে বলিয়া। হাত চাটিতেছিল। চাঁপাডাঙার বউকে দেখিয়া হাতখানা পাতিয়া বলিল, তা দেব নাকি একটুকুন? তা দাও।

চাঁপাডাঙার বউ বাটিটা নামাইয়া দিয়া অন্য ঘরে জল আনিবার জন্য চলিয়া গেল। রাখাল লম্বা জিভ বাহির করিয়া বাটি হইতে চাটিয়া চাটিয়া গুড় খাইতে লাগিল। হঠাৎ মহাতাপ ঘর হইতে বাহির হইয়া আসিল—যেন পলাইয়া আসিল এবং খিলখিল করিয়া হাসিতে লাগিল।

ঘরের ভিতর হইতে প্রায় কাঁদিতে কাঁদিতে মানদাও পিছন পিছন বাহির হইয়া আসিয়া বলিল, দেখ দেখ, কি করল দেখ! কাণ্ড দেখ! কথাগুলির মধ্যে আদরের সুর। ছলনা করিয়া মিছামিছি কান্নার ভান। মহাতাপ তাহার দুই গালে গুড় মাখাইয়া দিয়াছে। পুলকিত হইয়াই মানু কাঁদিতেছে।

সেই কৌতুকে মহাতাপ খিলখিল করিয়া হাসিতেছে।

রাখালও কৌতুকে খুখুক করিয়া হাসিতে লাগিল। বড় বউ আসিয়া জলের ঘটিটা নামাইয়া দিয়া বলিল, মানিককে বল চেটে খেয়ে নেবে, পরিষ্কার হয়ে যাবে। যাও তো বাবা মানিক, মায়ের গালের গুড় চেটে—

এই রঙ্গ দেখিয়া মানিকও উৎসাহিত হইয়া উঠিল। সে খুব জোরে জোরে বাঁশি বাজাইতে লাগিল, পু—পু—পু–পু—

পাগল মহাতাপ এই কথা শুনিয়া যাহা করিল তাহাকে অসম্ভব কাণ্ড ছাড়া আর কিছু বলা চলে না। সে অতর্কিতে তাহার দুই হাতের গুড় বড় বউয়ের গালে মাখাইয়া দিয়া বলিল, তা হলে তোমার গালের আমি চেটে খেয়ে লোব।

রাখাল অট্টহাস্যে ফাটিয়া পড়িল।—বলিহারি—বলিহারি—বলিহারি।

ঠিক এই মুহূর্তেই গলা পরিষ্কারের শব্দ তুলিয়া সেতাব বলিল, বলি সব হচ্ছে কি? অ্যাঁ! প্রথমেই সে চটিয়া উঠিল রাখালের উপর। বলিল, বলি গুড় খাওয়া হল কবার? রাখাল! বলি হাহা-হা-হা হাসিই বা কিসের?

রাখাল অপ্রতিভ হইয়া বলিল, মহাতাপ, বুঝলে কিনা সেতাব, ও আমাদের কি বলেও ভারি আমুদে। ওঃ–

সেতাব রুদ্ধ রোষে ভাঙাইয়া বলিল, ওঃ! ও! ভারি আমুদে। দায়ে করে নিজের গলায় কুপিয়ে আমারও আমোদ করতে ইচ্ছে হচ্ছে। আমোদ, আমোদ–

মানদা মহাতাপকে বলিল, তুমি মুর তুমি মর।

মহাতাপ দুই হাত নাড়িয়া বলিল, কেয়া, হুয়া কেয়া? আরে, হল কি?

বড় বউ স্বামীর দিকে একটা তীব্র দৃষ্টি হানিয়া বলিল, কিছু হয় নি, এস, গুড় বের করে বিক্রির কাজটা শেষ কর। বাইরে লোকেরা বসে আছে। সে ঘরে ঢুকিয়া গেল।
ষষ্ঠ পরিচ্ছেদ

ভাদ্র শেষ হইয়া গিয়াছে। আশ্বিনের প্রথম সপ্তাহ। পূজার ঢাক বাজিতেছে। পূজার ঢাক বাঁজা কথাটার মানে পূজার কাজ পড়িয়াছে। পূজার ঢাক সত্য সত্য বাজে বোধনের দিন হইতে। অবশ্য বোধন কোথাও এক মাস আগে হয়, কোথাও বা পনের দিন, কোথাও বা শুক্লপক্ষের পূর্ববর্তী অমাবস্যায় অর্থাৎ মহালয়ার দিন হইতে। যেখানে যেমন নিয়ম। এখানে বোধনের ঘট আসে মহালয়ার দিন। গ্রামের মধ্যে একখানি পূজাওই চণ্ডীমণ্ডপে হইয়া থাকে। কয়েক শরিকের পূজা। বোধনের দেরি আছে। তবুও আশ্বিন পড়িতেই পূজার কাজের ধুম পড়িয়া গিয়াছে। পল্লীতে পল্লীতে। কিন্তু আজ ঢাক সত্যই বাজিতেছে। আজ ইদপূজা বা ইন্দ্ৰপূজা। সকালবেলাতেই ইদপূজার স্থানটায় ঢাকী ধুমুল দিতেছে। ইদপূজা সরকারি পূজা অর্থাৎ আইনমতে জমিদার মালিক। আইনমতে জমিদার মালিক হইলেও আসল মালিক গ্রামের মণ্ডলেরা। পঞ্চমণ্ডলে পূজার কাজ চালাইয়া থাকে। তাহারাই তত্ত্বাবধান করে, তাহারাই খরচ যোগায়, পরে খরচ জমিদারের খাজনা হইতে হিসাব করিয়া বাদ লইয়া থাকে।

সেতাব ইঁদপূজার বেদির স্থানটার পাশে দাঁড়াইয়া ছিল। মোটা মোড়ল চণ্ডীমণ্ডপের কিনারায় বসিয়া মোটা একটা কায় তামাক খাইতেছিল। চণ্ডীমণ্ডপে একখানি একমাটি-করা দশভুজা প্রতিমা শুকাইতেছে। এখনও মুণ্ড বসানো হয় নাই। কতকগুলা উলঙ্গ অর্ধউলঙ্গ ছেলে ঘুরিতেছে এদিক ওদিক। তাহার সঙ্গে মানিকও রহিয়াছে। গোবিন্দ রাখালটা তাহাকে লইয়া আসিয়াছে। মানিককে নামাইয়া দিয়া সে ইন্দ্র-দেবতার বেদিটা গড়িতেছে। দশ-হাত-লম্বা দারুময়-দেহ দেবতাটি একটা বিরাটকায় ফড়িংয়ের মত ঠ্যাং উল্টাইয়া পড়িয়া আছে। মূর্তিটার মধ্যে মূৰ্তিত্ব নাই, নাক কান চোখের বালাই নাই। দশ-হাত-লম্বা একটা বৃক্ষশাখা, ছালটা তুলিয়া দেওয়া হইয়াছে, একদিকে মাথায় ঢেঁকির মত ছোট দুইটা কাঠের সঙ্গে খিল পরাইয়া গাঁথা; ওই ছোট কাঠ দুইটাকে বেদিতে পুঁতিয়া দেবতাকে টোকো দিয়া উন্নত এবং ঊর্ধ্বশির করিয়া পূজার সময় খাড়া করা হইবে।

চণ্ডীমণ্ডপের সামনে গ্রাম্য রাস্তা। রাস্তার উপর দিয়া চাষীরা চলিয়াছে। কয়েকটি মেয়ে ঝুড়ি করিয়া লাল মাটি লইয়া চলিয়াছে। কয়েক জনের মাথায় খড়িমাটি। তাহারা হাকিতেছিল লাল মাটি লেবে গো, লাল মাটি।

খড়িমাটিওয়ালা হাকিল—খড়িমাটি চাই, ঘর নিকুবার খড়িমাটি! দুধের মত অং লবেন। খড়িমাটি!

চণ্ডীমণ্ডপ হইতে খানকয়েক বাড়ির পরে শিবকেরামকেষ্টর বাড়ি। শিবকেষ্টর বাড়ির দাওয়া হইতে টিকুরীর খুড়ী উঁকি মারিয়া মুখ বাড়াইয়া সমান জোরে হাকিয়া প্রশ্ন করিল, কি লা? কি?

—মাটি গো, মাটি।

–লাল মাটি, খড়িমাটি।

খুড়ী মুখ ভ্যাঙাইয়া বলিল, মাটি গো মাটি! লাল মাটি। খড়িমাটি! মাটি নিয়ে কি বুকে চাপাবে নোকে? মাটি গো মাটি! ঘরে চাল সেজে না (অর্থাৎ সিদ্ধ হয় না), লোকে তা বোঝে না। ঘরে ধান নাই, চাল নাই, খাবার নাই; যার ঘরে ধান ছিল লেবি না মেরি করে নিয়ে গেল (লেভিপ্রথা)। যার আছে সে লুকিয়ে রেখেছে। ঘর নিকুবে! লোকে রঙ করবে! মরণ!

—তা মাটি না লিলে মোরা খাব কি?

—কি খাবি তা আমি কি জানি? আমি কি খাব, পঞ্চায়েত ভেবেছে? জমি দিয়েছে আমাকে? সেই পাপেই হচ্ছে এসব। গতবারে পোকা লেগেছিল ধানে। এবারে শুকোতে যাবে। শুকিয়ে যাবে, ধান ফুলোবে না। ফুললে শুকিয়ে তুষ হবে। আর জল হবে না। আর জল হবে না। ঠায় দাঁড়িয়ে ধান মরবে। দেখবি! টিকুরীর বউ যেন নাচিতেছিল। সর্বাঙ্গ দোলাইয়া সুর টানিয়া টানিয়া কথা বলিতেছিল। আনন্দ যেন তাহার ধরিতেছে না।

মাটিওয়ালী মেয়েগুলা তাহার ভঙ্গি দেখিয়া হাসিয়া ফেলিল। একজন ঠিক তাহারই মত সুর করিয়া বলিলতা হবে না মোল্যান, আর সিটির জো নাই। ক্যানেল এয়েছে। মৌরক্ষী বেঁধেছে। পাকা দেওয়াল দিয়ে গো, লোহার ফটক বেঁধে। ফটক বন্ধ করলেই জল চলে আসবে।

—আসবে না, আসবে না, আসবে না; ঘোঁতন বলেছে আসবে না। খালের ভেতর গোঙাল পড়ে জল চলে যাবে পাতালে। লয় তো বাঁধ ভেঙে যাবে। লয় তো সি জলে ধান বাঁচবে না। বাঁচলে পচে যাবে, লয় তো পোকা লাগবে। ধান হবে না, তুষ হবে। ঘোঁতন বলেছে।

একটি মেয়ে বলিল, ঘোঁতন ঘোষের অমনি কথাই বটে! বলে, হরিনামের নিকুচি করি আমি।

খুড়ী খাক করিয়া উঠিল—ঘোঁতন ঘোষের অমনি কথাই বটে! ঘোঁতন নেকাপড়া জানে। বিদ্যে আছে পেটে। হোত-ত্যা-ত্যা করে না। এক লজরে ধরতে পারে। আমাকে সেদিন বলেছিল, ভাবলী। রেগেছিলাম আমি। হুঁ বাবা। তা ভাবলীই হলাম আমি। ভাজের গায়ে গুড় মাখিয়ে চেটে খায়! মা গো! কোথায় যাব! বলিতে বলিতে হঠাৎ সে থামিয়া গেল। কণ্ঠস্বর খাটো করিয়া বলিল, অ-মা! মহাতাপ আসছে যে। গোঁত গোঁত করে আসছে দেখ, বুনো শুয়োর আসছে। অমা, হারামজাদী রাঙীকে ধরে আনছে ক্যানে। এই মরেছে। সঙ্গে আবার মোটা মোড়ল।

সে ঘরে ঢুকিয়া গেল। মেয়ে কয়টা এ উহার মুখের দিকে চাহিয়া চলিতে শুরু করিল। একজন হাকিয়া উঠিল—মাটি চাই মাটি, রাঙা মাটি, খড়িমাটি।

মহাতাপ একটা গরুর গলায় দড়ি বাঁধিয়া লইয়া আসিতেছিল; সোজা টিকুরীর খুড়ীর বাড়ির সামনে আসিয়া দাঁড়াইয়া হাকিয়া বলিল, তোমার গরু আমি খোঁয়াড়ে দিতে চললাম। গরু ভগবতী না হলে, এ যদি ছাগল-ভেড়া হত তো ওকে মেরে ফেলতাম আমি।

পিছনে পিছনে মোটা মোড়ল বিপিনও আসিয়াছিল। সে গরুর দড়িটা হাতে লইয়া বলিল, চেঁচাস নে। যা বলবার আমি বলছি।

—তুমি কি বলবে? আমার এক ভিলি আকের নেতা মেরে দিয়েছে। কিছু রাখে নাই। ওটা গরু, আর মালিক হল বিধবা মেয়েছেলে, আমি কি করব বল দিকিনি?

নিজের চুলগুলা টানিয়া কঠিন আক্ৰোশে ক্ষোভে বলিয়া উঠিল, আমার চুল ছিঁড়ে মাথা ঠুকতে ইচ্ছে হচ্ছে। আমার অমল ভাল আক, লকলকে কষকষে হয়ে উঠেছিল—

বিপিন ডাকিল, টিকুরীর বউ! বেরিয়ে এস বাছা। শোন!

টিকুরীর বউ বাহির হইয়া আসিয়া বলিল, কি শুনব? আমি কারু কথা শুনি না। সব মিছে। কথা। আমার রাঙীকে আমি কখনও বাঁধি না। দিব্যি মাঠে ঘুরে চরে এসে ঘরে ঢোকে। আমি বিধবা মানুষ, আমি বেঁধে খেতে দিতে পাব কোথা? যারা ফসল আজ্জায়, তারা বেড়া দেয় না ক্যানে? ক্ষেতে যখন যায় তখন হেটহেট করে তাড়িয়ে দেয় না ক্যানে?

বিপিন বলিল, তুমি ক্ষেপেছ নাকি? কি সব বলছ—

–ঠিক বলছি। দাও, আমার গরু দাও। আমি ভাসুর বলে খাতির করব না। আমি মোড়ল বলে মানব না। খোঁয়াড়ে দেবে। অঃ!

সে আগাইয়া গেল গরুটা বিপিনের হাত হইতে ছাড়াইয়া লইবে বলিয়া। মহাতাপ অবাক হইয়া এতক্ষণ খুড়ীর দাপট দেখিতেছিল। সে এবার হাঁক দিয়া উঠিল, কভি নেহি! দাও, গরু দাও। বলিয়া ঝটকা মারিয়া দড়িটা বিপিনের হাত হইতে কাড়িয়া লইল।-খোঁয়াড়ে দেব আমি।

গরুটাকে সে টানিতে লাগিল।

টিকুরীর খুড়ী গাছকোমর বাঁধিয়া বলিল, ওরে, আমি তোর পরিবারের মত ম্যানমেনে নই। তোর হাঁকারিকে আমি ভয় করি না–

সে আগাইয়া গিয়া মহাতাপের হাত হইতে গরুটা ছিনাইয়া লইবার জন্য প্রস্তুত হইল। মহাতাপ গ্রাহ্য করিল না। সে টানিতে লাগিল গরুটাকে।

–আয়, আয়।

টিকুরীর খুড়ী বলিয়াই চলিয়াছিল—আমি ঘরের কোণে চোখের জল ফেলব না। লাজের চড় গাল পেতে খেয়ে মনের দুঙ্গু মনেই রাখব না। আমি দরখাস্ত করব। হ্যাঁ, দরখাস্ত করব। এখুনি ঘোঁতনের কাছে যাব।

তাহার কথা শেষ হইতে না হইতে শিবকেষ্ট টলিতে টলিতে বাহিরে আসিয়া দাঁড়াইয়া হাতজোড় করিয়া বলিল, মহাতাপ! ভাই! আমি হাতজোড় করছি, মিনতি করছি। আমার জ্বর, ঘরে পয়সা নাই, ধানচালও নাই। খোঁয়াড়ে দিলে, ছাড়াতে হবে আমাকে। নবগ্রাম হাঁটতে হবে। পয়সা লাগবে। আমার দশা দেখ। গরুটা ছেড়ে দে ভাই।

মহাতাপ থমকিয়া দাঁড়াইয়া গেল।

বিপিন বলিল, দে, গরুটা ছেড়ে দে বাবা।

মহাতাপ বলিল, আহা-হা শিবে, তু যে মরে যাবি রে! অ্যাঁ! আহা-হা-হা রে, কি দশা হয়েছে তোর?

শিবকেষ্টর দাঁড়াইয়া থাকিবার ক্ষমতা ছিল না, সে উপুড় হইয়া বসিয়া হাঁটুর উপর কনুই। রাখিয়া দুই হাতে মাথা ধরিয়া বলিল, জ্বরে একেবারে হাড় ভেঙে দিলে রে! তিনখানা কথাতে কাঁপন থামে না। গরুটা ছেড়ে দে ভাই।

খুড়ী আগাইয়া আসিয়া মহাতাপের শিথিল হাত হইতে গরুর দড়িটা টানিয়া লইয়া বলিল, দেবে আর ভাল বলবে। দেবে না?

মহাতাপ গরুটা ছাড়িয়াই দিল, বলিল, আজ ছেড়ে দিলাম শিবের মুখ চেয়ে। ফের দিনে কিন্তু ছাড়ব না।

খুড়ী বলিল, শিবের মুখ চাইতে হবে না। যার মুখ চাইলে ধর্ম হবে, তার মুখ চেয়ে দেখ গে! ভাজের মুখ থেকে চোখ সরিয়ে নিজের পরিবারের মুখের পানে তাকাগে যা। শিবের মুখ। মরণ!

খুড়ী গরুটা লইয়া চলিয়া গেল।

বিপিন মোড়ল শিবকেষ্টকে বলিল, টিকুরীর বউকে নিয়ে বিপদ হল শিবু! ওকে সাবধান করিস-কথাগুলি ভাল কথা নয়। বলিয়া চলিয়া গেল।

শিবকেষ্ট মাথার উপর হাতটা উল্টাইয়া দিল। সে কি করিবে?

মহাতাপ হাত বাড়াইয়া শিবকেষ্টকে বলিল, ওঠ, আমাকে ধরে ওঠ।

শিবকেষ্ট ধীরে ধীরে উঠিল।

মহাতাপ তাহাকে ঘরে পৌঁছাইয়া দিয়া বাহির হইয়া আসিয়া হঠাৎ থমকিয়া দাঁড়াইল। খুড়ী যেন কী কথাটা বলিয়া গেল! কি ভাজের মুখ! পরিবারের মুখ! কি সব বলিল। শিবকেষ্টর অবস্থা দেখিয়া সে তখন এমনই অভিভূত হইয়াছিল যে, কথাটা ঠিক শুনিয়াও বুঝিবার চেষ্টা করে নাই। এতক্ষণে কথাটা মনে হইল। কি বলিল? সে হাকিয়া ডাকিল—এই, এই খুড়ী, এই বিষমুখী টিকুরীর খুড়ী! বলি শুনছ?

খুড়ী ঘরের ভিতর হইতে উত্তর দিল—কেন রেড্যাকরা? বলি বলছিস কি?

—কি বললে কি তখন? আর একবার বল দিকিন? কি ভাজের–মুখ বউয়ের মুখ–কি বলছিলে?

টিকুরীর খুড়ী হাসিয়া বলিল—তোমাদের বড় বউয়ের মুখখানি বড় সুন্দর রে, চাঁদের পারা। তাই বলছিলাম। তোর বউয়ের মুখ কিন্তু এত সুন্দর নয়, তাই বলছিলাম আমি।

মহাতাপ খুশি হইয়া গেল। সে উচ্চকণ্ঠে সমর্থন করিয়া বলিল, হাজার বার লক্ষ বার। এ তুমি ঠিক বলেছ। আমি বলি কি বলছ! না, এ তুমি ঠিক বলেছ। কিন্তু এবার গরু সামলে রেখো। তা বলে গেলাম। সে হনহন করিয়া মাঠে চলিয়া গেল। স্তব্ধ দ্বিপ্রহর তখন। মাঠে ধান। ভরিয়া উঠিয়াছে। নিড়ান চলিয়াছে। নিদারুণ রৌদ্রের মধ্যে ধানের ক্ষেতে হামাগুড়ি দিয়া আগাছা তুলিয়া চলিয়াছে চাষীরা। দূরে তখনও মাটিওয়ালীদের হক শোনা যাইতেছে। মাটি, মাটি চাই গো! মাটি, লাল মাটি–খড়িমাটি!

সেতাবের বাড়িতে সেদিন দুপুরে ঢেঁকিতে ভোলা কলাই কুটিয়া বেশম তৈয়ারি হইতেছিল। বেশম হইতে সেউই ভাজিয়া গুড়ে পাক করিয়া পূজার নাড় হইবে। দুই জন ভানাড়ী মেয়ে টেকিতে পাড় দিতেছিল, ঢেঁকির মুখে নাড়িয়া-চাড়িয়া দিতেছিল।

স্তব্ধ দ্বিপ্রহর বেলা, বাড়িটা নির্জন। বড় বউকে দেখা যাইতেছে না। এই নির্জনতার মধ্যে তাহারা গান গাহিতেছে। মানদা গাহিতেছে মূল গান, মেয়েগুলি গাহিতেছে ধুয়া।

মেয়েগুলি ধুয়া গাহিতেছিল–

আমার বাজুবন্ধের ঝুমকো দোলায়
বঁধুর মন তো দুলল না,
ও-তার সিথিপাটির লালমানিকের
ছটাতে চোখ খুলল না
হায় সখি, লাজে মরি লাজে মরি গো।

মানদা গাহিল—

আমার মন যে দোলন খেলে
ওতার বনমালার দোলাতে।
আমার মন সেই গেল ভুলে,
তারে এসে ভুলাতে।

ভানাড়ী মেয়েগুলি আবার ধুয়া ধরিল—

আমার বাজুবন্ধের ঝুমকো দোলায়
বঁধুর মন তো দুলল না!
হায় লাজে মরি লাজে মরি লাজে মরি সখি গো!

মানদা আবার গাহিল—

মন কাড়িতে এসেছিলাম
মন হারায়ে ঘর ফিরিলাম–
লাজে গলার চিক মাদুলি পড়ল ছিঁড়ে ধুলাতে।

সঙ্গে সঙ্গে ভানাড়ীরা ধরিল—

হায় লাজে মরি লাজে মরি লাজে মরি সখি গো।

মানদা আবার গাহিল—

খুলতে গেলাম বাজুবন্ধ বধন যে সেই খুলল না।
ভুলতে গেলাম তারে সখি ভুল যে মোকে ভুলল না।
কালনাগে ধরতে গেলাম–
কালীয়ারে জড়াইলাম–
মারতে গিয়ে অমর হলাম জ্বলতে জ্বলন জ্বালাতে!
–লাজে মরি লাজে মরি লাজে মরি সখি গো!

রাধাকৃষ্ণের লীলার স্পর্শ জড়াইয়া এমন ধরনের প্রেমের গান বাংলার পল্লী অঞ্চলে কালে কালে কালোপযোগী ভাষায় ছন্দে উপমায় রচিত হইয়া আসিতেছে। এ ভাব পুরনো হয় না। নূতন ভাষায় নবীন হইয়া দেখা দেয়। সকল কালেই পুরবধূরা এ গান–বাউল বৈরাগী পঁচালি দল, যাত্রার দলের গায়কদের কাছে শুনিয়া শিখিয়া লয়। কালে কালে এইভাবে নির্জন দ্বিপ্রহরে গাহিতে থাকে। ঘরে গায়—ঢেঁকিশালে, ঘাটে গায়—জলে গলা ড়ুবাইয়া, সখিরা মিলিয়া জল আনিবার পথে গায়।

গানের মধ্যেই দরজায় ধাক্কা পড়িল। কেহ শিকল বাজাইয়া দরজার ওপাশে সাড়া দিতেছে। মানদা সেদিকে তাকাইয়া বলিল, কে?

মেয়েলি গলায় সাড়া আসিল, একবার দরজাটা খোল।

মানদা ভানাড়ীদের একজনকে বলিল, দে তো লা খুলে।

মেয়েটি দরজা খুলিয়াই বলিল, অ। পুঁটি মোল্যান! মানদার দিকে তাকাইয়া বলিল, ঘোঁতন ঘোষের বুন গো! বলিয়া সরিয়া দাঁড়াইল।

পুঁটি বাড়ির ভিতর ঢুকিয়া বলিল, ওরে বাপরে। এ যে পুজোর ধুম পড়ে গিয়েছে যে! খুব কলাই কুটছ! খুব গান জুড়েছ!

মানদা মুখ চমকাইয়া বলিল, তা কুটছি। কিন্তু তুমি কি মনে করে হে? এই ভত্তি দুপুরে?

–বড় বউ কই? চাঁপাডাঙার দিদি? একটা কথা বলতে এসেছি।

মানদা তাহার মুখের দিকে চাহিয়া বলিল, কি কথা হে?

–না ভাই, সে আমি তাকেই বলব। আমার মা বলে পাঠিয়েছে, অন্য কাউকে বলতে বারণ করেছে।

–আমি জানি হে, আমি জানি। গয়না তো? টাকা?

—তা জানবে বৈকি ভাই। তুমি অর্ধেকের মালিক। জানবে বৈকি। তবে আমি চাঁপাডাঙার দিদিকে বলে যাই; তুমি তার কাছে শুনো। কই, দিদি কোথায়?

মানদা আঙুল দিয়া দেখাইয়া বলিল, ধান সেদ্ধ করছে, ওদিকের চালায়।

পুঁটি আগাইয়া গেল।

মানদা হাতের কুঁচিগাছটা লইয়া বলিল, ললাটে তিন ঝাঁটা মারতে মন হয়—তিন ঝাঁটা।

বাড়ির আর একদিকে খোভড়া চালায় উনান হাঁড়িতে ধান সিদ্ধ হইতেছিল। ছোট এক টুকরা উনান, সেখানে সিদ্ধ-করা ধান মেলা রহিয়াছে। একটি মজুর মেয়ে পায়ে পায়ে ধানগুলি টানিয়া ওলটপালট করিয়া ঘুরিয়া বেড়াইতেছিল। চাঁপাডাঙার বউয়ের কাপড়খানা ময়লা, ধোঁয়ায় কালো। গাছকোমর বাঁধিয়া কাপড় পরা। মাথায় ঘোমটা নাই। চুলগুলি রুখু দেখাইতেছে। এখনও স্নান হয় নাই। মুখচোখ আগুনের অ্যাঁচে এবং এখনও অস্নাত অভুক্ত বলিয়া শুকাইয়া গিয়াছে। একটু বেশি কালো দেখাইতেছে।

পুঁটি গিয়া একটু অবাক হইয়াই বলিল, তোমার কি অসুখ করেছে নাকি দিদি? এ কি মুখ হয়েছে তোমার? যেন বড় অসুখ থেকে উঠেছ? সে সকরুণ বিস্মিত দৃষ্টিতে কাদুর দিকে চাহিয়া দাঁড়াইয়া রহিল।

–পুঁটি? পুঁটিকে দেখিয়া বড় বউ একটু বিস্মিত হইয়া গেল।—এমন অসময়ে?

–মা পাঠালে তোমার কাছে। কিন্তু–

—সইমা? কেন রে? অসুখ শুনেছিলাম সইমায়ের—; শঙ্কিত হইয়া উঠিল সে। পুঁটি কি তবে টাকা-পয়সার জন্য আসিয়াছে।

—উঠেছে অনেক ভুগে। কিন্তু তোমার এমন চেহারা কেন?

এবার সলজ্জ হাসিয়া বড় বউ বলিল, উপোস কিনা আজ। তার উপর–

–উপোস। ইঁদপুজোর?

–না, আজ সংক্রান্তি। সংক্রান্তিতে কালীর উপোস করি।

–কালীর কবচ নিয়েছ বুঝি দিদি? ছেলের জন্যে?

–হবে না জানি, তবুও নিয়েছি। চাঁপাডাঙার বউ হাসিল–বড় বিষণ্ণ সে হাসিটুকু। উপবাসশুষ্ক মুখে ঠোঁটের সে হাসিটুকু অনাবৃষ্টি আকাশের বর্ষণহীন বন্ধ্যা মেঘের ক্ষীণ বিদ্যুৎ রেখার মতই বিশীর্ণ।

পুঁটি বলিল, তুমি কলকাতায় গিয়ে ডাক্তার দেখাও না কেন দিদি? ওই তো বাবুদের গায়ের রবীনবাবুর বউ কলকাতায় গিয়ে কি সব চিকিৎসা করালে—দিব্যি বছর না ঘুরতে ছেলে হয়েছে।

বড় বউ বলিল, ওসব বাবুদের যা হয় তাই কি আমাদের হয়, না সাজে? এখন কি বলেছে। সইমা ব?

পুঁটি বলিল—কেন কাদু দিদি, জামাই মোড়লের পয়সা তো অনেক। বাবুদের চেয়ে কম নয়। তবে কেন হবে না? না-না, তুমি ধর। তুমি কলকাতায় যাও।

কাদু বলিলটাকা খরচ করবে তোর জামাই মোড়ল? তার থেকে সে নতুন বিয়ে করবে!

পুঁটি সভয়ে যেন চাপা গলায় চিৎকার করিয়া উঠিল—না—কাদুদি না।

কাদু হাসিয়া ফেলিল পুঁটির এমন ভয় দেখিয়া। হাসিয়া বলিল—মরণ। ভয় দেখ ছুঁড়ীর। ভয় নেই, তাও পারবে না তোর জামাই মোড়ল। দুটো বউকে ভাত দিতে হবে না? তাতে খরচ কত জানিস?

পুঁটি স্তব্ধ হইয়া কাদুর মুখের দিকে চাহিয়া রহিল।

কাদু হাসিয়াই প্ৰশ্ন করিল–কি—এমন করে চেয়ে রয়েছিস কেনে?

পুঁটি বলিল–ব্যাটাছেলেদের জান না দিদি, ওদের ঝোঁক চাপলে–ওরা সব পারে।

–ব্যাটাছেলেদের খবর তুই এত জানলি কি করে লা?

যেন অপ্রতিভ হইয়া গেল পুঁটি। পায়ের নখ দিয়া মাটি খুঁটিতে খুঁটিতে বলিল চোখের উপর দেখছি দিদি।

—তোর দাদাকে?

–হ্যাঁ। আরও কতজন দেখছি।

—মরুক গে। যে যা করছে করুক। তোর কেপন জামাই মোড়ল আর যা করবে করুক এ কাজ করবে না। এখন সইমা কি বলেছে বল।

পুঁটি তাহার মুখের দিকে চাহিয়া ছিল, কাদুর শেষ কথায় চমকিয়া উঠিল—একটু আড়ালে চল দিদি।

—আড়ালে? আয়।

পুঁটিকে লইয়া সে একটা ঘরে ঢুকিল। জিজ্ঞাসা করিল, কি রে?

—জান কি না জানি না, তোমার স্বামীর সঙ্গে আমার দাদার আজকাল খুব মাখামাখি। হঠাৎ অঘটন ঘটেছে যেন। মোড়ল প্রায় যায় দাদার কাছে।

চমকিয়া উঠিল চাঁপাডাঙার বউ। কিন্তু সে বড় শক্ত মেয়ে। মুহূর্তে আত্মসংবরণ করিয়া হাসিয়া বলিল—তোর দাদার কাছে যায়? তাতে কি হল? তোর দাদার সঙ্গে এককালে আমার বিয়ের সম্বন্ধ হয়েছিল বলে, চিরকালই কি আক্রোশ থাকবে নাকি?

—তুমি আমার দাদাকে জান না চাঁপাডাঙার দিদি।

–দাদার ওপরে এত রাগ ক্যানে রে? বিয়ে দেয় না?

—মরণ আর কি, বিয়ের জন্যে ভাবি নে। কথাটা কিন্তু আমার নয়, মায়ের। মা বলে দিলে। দাদা বড় মোড়লকে ঠকাচ্ছে। রাখহরি দত্তের ছেলের সঙ্গে জোট করে ফাঁদ পেতেছে। দু ভরির গয়নার ভেতর লোহার তার ভরে, সীসের টোপা ফেলে, চার ভরি ওজন দেখিয়ে বাধা দিচ্ছে। মা বললে—আমার সইয়ের মেয়ে, তারপরে মহাতাপ এবার ধান ছেড়ে দিয়ে উপকার করেছে, তাতে এসব জেনেশুনে চুপ করে থাকলে আমার ধর্মে সইবে না। তোমার স্বামী সেই লোভে মজেছে দাদার সঙ্গে।

—সে তো ভাই স্যাকরাকে দেখিয়ে শুনিয়ে নেয় নিশ্চয়।

–না। নেয় না। সেই তো! মা বললে কিসে যে সেতাবকে ও বশ করলে ভগবান জানেন। কাল দুশো টাকা দিয়ে এক জোড়া ফারফোরের অনন্ত বাধা রেখেছে। তার ভেতরে নাকি দুটো লোহার সরু সিক ভরা আছে। মা নিজের কানে শুনেছে। সে গয়না না ভাঙলে ধরা যাবে না।

চাঁপাডাঙার বউ বলিলবলব আমি তাকে। সে আসুক।

পুঁটি বলিল, আমার নাম কোরো না দিদি। দোহাই তোমার! তা হলে দাদা আমাকে–

–তোকে মারে নাকি পুঁটি?

পুঁটি হাসিল, বলিল, ও কথা ছেড়ে দাও। আর একটা কথা বলি–

চাঁপাডাঙার বউ সপ্রশ্ন দৃষ্টিতে পুঁটির মুখের দিকে চাহিয়া রহিল। পুঁটি বলিল—যা করে হোক তোমার স্বামীকে ওর সঙ্গ ছাড়াও। নইলে তোমাদের ঘর থাকবে না। ভেঙে দেবে। নিশ্চয়ই ভেঙে দেবে। বড় মোড়ল আমাদের বাড়ি যায়, গুজগুজ করে দাদার সঙ্গে। আমার ভাল লাগে না। হয় তোমার নিন্দে, নয় ছোট মোড়লের নিন্দে! বড় মোড়ল মধ্যে মধ্যে বলে, ইচ্ছে। হয় কি জান ঘেঁ,তন—ঘর ছেড়ে বিবাগী হয়ে যাই, নয়ত আগুন লাগিয়ে দিই ঘরে। তোমার স্বামী আর সে মানুষ নাই দিদি। তুমি সাবধান হও।

বড় বউ বিস্ফারিত নেত্ৰে সম্মুখের শরৎকালের গাঢ় নীল মধ্যাহ্ন আকাশের দিকে চাহিয়া রহিল। সেখানে ছোটবড় হালকা মেঘের পুঞ্জগুলি ভাসিয়া মন্থরগতিতে যাইতেছিল। পুঞ্জ পুঞ্জ হালকা দুধের মত রঙের নব লক্ষ গাভীর পাল। আকাশগঙ্গার অসীম-বিস্তার কোমল নীল তটভূমিতে স্বচ্ছন্দ চারণে মন্থরগতিতে ঘুরিয়া বেড়াইতেছে। রৌদ্রে উজ্জ্বলতর হইয়া উঠিয়াছে। হঠাৎ দুই-একটার গায়ে একেবারে মাঝখানে হয়ত ঈষৎ কালো রঙের আমেজ। যেন দধিমুখী ধবলী গাইটার পিঠে টুকরাখানেক কালো রঙের বিচিত্র সমাবেশের মত। ছোট ছোট টুকরাগুলা যেন লাকী বাছুর, বড় মেঘের টুকরার চেয়ে ওইগুলা ছুটিতেছে দ্রুততর বেগে। প্রাণের আবেগে পিঠে লেজ তুলিয়া আকাশের অঙ্গনময় দাপাদাপি করিয়া ফিরিতেছে।

বাইরে একটা গাই ডাকিয়া উঠিল।

সেই ডাকে বউয়ের চমক ভাঙিল। পুঁটি তাহার মুখের দিকে তাকাইয়া ছিল। গরবিনী চাঁপাডাঙার বউয়ের নিজের মনে হইল—সে এক মুহূর্তে যেন কত গরিব হইয়া গিয়াছে। পুঁটি তাহার সে মুখের দিকে চাহিয়া থাকিতে পারি না, তাড়াতাড়ি বলিল—আমি যাই, দিদি।

সে ঘর হইতে বাহির হইয়া যাইতেছিল। চাঁপাডাঙার বউ তাড়াতাড়ি আসিয়া তাহার হাত চাপিয়া ধরিয়া বলিল, পুঁটি!

পুঁটি তাহার দিকে সবিস্ময়ে তাকাইয়া বলিল—কি? চাঁপাডাঙার বউয়ের দৃষ্টি যেন কেমন! ভদ্রের ভরা দিঘির মত তাহার চেহারা। কূলে কূলে ভরা অথৈ জলতল হইতে যেন কোন একটা জলচারী নড়িয়া উঠিতেছে। সে নড়ার উপরটায় কাপন জাগিয়াছে।

চাঁপাডাঙার বউ বলিল—অত্যন্ত চাপা স্বরে, আমার স্বামী আর সে মানুষ নাই? আমার নিন্দে করে? কি নিন্দে করে পুঁটি? আমি কি করেছি? কি বলে?

পুঁটি তাহার মুখের দিকে তাকাইয়া ছিল, সে ভয় পাইয়া গিয়াছিল; সভয়ে হাত টানিয়া লইয়া সে ঘাড় নাড়িয়া বলিল, জানি না চাঁপাডাঙার দিদি, আমি জানি না।

সে একরকম ছুটিয়াই পলাইল। যাইতে যাইতে থমকিয়া দাঁড়াইয়া কাতর কণ্ঠে বলিল, গুজগুজ করে কথা বলে দিদি। শুনতে পাই না। শুনতে পাই না। কিন্তু অনেক কথা অনেক কথা।
সপ্তম পরিচ্ছেদ

ইহার পর প্রায় এক মাসের উপর চলিয়া গিয়াছে। পূজা আসিয়া পড়িয়াছে। ষষ্ঠীর দিন। চণ্ডীমণ্ডপে যথানিয়মে ঢাকের সঙ্গে ঢোল সানাই কঁসি আসিয়া পূজার সুর জমাইয়া তুলিয়াছে। দেশে অন্নের অভাব, কাপড়চোপড় দুমূল্য, এসব সত্ত্বেও পূজার সুর একেবারে কাটিয়া যায় নাই। আগেকার কালে এর সুর একটা দেশব্যাপী ঐকতানের ঝঙ্কার তুলিত, গ্রাম হইতে গ্রামান্তরে পৌঁছিয়া সে গ্রামের বাজনার সঙ্গে সুর মিলাইত। আজ সুর ওঠে, কিন্তু সে সুর ঐকতান তুলিতে পারে না; গ্রামের প্রান্তদেশ পর্যন্ত গিয়া গ্রামান্তরের মধ্যবর্তী মাঠের সীমানার মুখেই এলাইয়া পড়ে। সেদিন বেলা তখন প্রহরখানেক, নবগ্রামের বাজারে কাপড় কিনিতে গিয়াছিল সেতাব। কেনাকাটা শেষ করিয়া ফিরিবার পথে ঘোঁতনের দলিজায় উঠিল। পুঁটি সত্য সংবাদই দিয়াছিল; ঘোঁতনের সঙ্গে সেতাবের এখন খুব মাখামাখি। নবগ্রামের মধ্যবিত্ত ভদ্রলোক শ্রেণীর অর্থাভাব ক্রমশই দারুণ হইতে নিদারুণ হইয়া উঠিয়াছে। সকলের আগে এ অবস্থায় তাহারা গহনা বন্ধক দিয়া অর্থ সংগ্রহ করে। প্রাণ ধরিয়া বিক্রয় করতে পারে না। ঘোত। এই কারবারটায় সেতাবকে ঢুকাইয়া দিতে সাহায্য করিতেছে।

ঘোঁতন বসিয়া বিড়ি টানিতেছিল। কোথায় পূজামণ্ডপে সানাই বাজিতেছে। দাওয়ার পাশেই একটা শিউলিগাছের তলায় শিউলি ঝরিয়া পড়িতেছে।

সেতাব আসিয়া দাওয়ায় উঠিতেই সে সমাদরের সহিত অভ্যর্থনা করিয়া তাহাকে বসাইল। বিড়ি দিল। সেতাবের বগলে একটি বান্ডিল, হাতে একটি পোটলা। বিনা ভূমিকাতেই সে ঘোঁতনের হাতে দিয়া বলিল, দেখ দিকি, ছেলেগুলার গায়ে হয় কি না।

পোটলা খুলিয়া ঘোঁতন দেখিল, কয়েকটা ফ্ৰক জামা, দুইখানা শাড়ি, একখানা ধুতি, একখানা থান কাপড়, দুইটা ব্লাউজ ও একটা শার্ট। ঘোঁতন বুঝিল, এগুলি তাহার জন্যই লইয়া আসিয়াছে। সে দন্ত বিস্তার করিয়া বলিল, দাঁড়াও, দিয়ে আসি বাড়িতে, বুঝলে।

পোঁটলাটা লইয়া সে ভিতরে চলিয়া গেল।

সেতাবের উবু হইয়া বসা অভ্যাস। সে হাঁটুর উপর কনুই রাখিয়া মাথায় এক হাত দিয়া অন্য হাতে বিড়ি টানিতে লাগিল।

পথের উপর দিয়া কয়েকটা গরু লইয়া একটা রাখাল চলিয়া গেল। তাহার পিছনে বহুবল্লভ বাউল একতারা এবং কোমরে গামছা বাঁধিয়া টুটুং শব্দ তুলিতে তুলিতে যাইতেছিল। বহুবল্লভ সেতাবকে দেখিয়া বলিল, বড় মোড়ল এখানে বসে?

সেতাব বলিল, বলি তার কৈফিয়ত তোকে দিতে হবে নাকি?

বহু বলিল, কাপড় কিনতে এসেছিলে?

সেতাব বিড়িতে টান দিয়া ধোঁয়া ছাড়িতে ছাড়িতে বলিল, উঁহুঁ, আকাশের তারা গুনতে এসেছিলাম।

বহু বৈষ্ণব মানুষ, রাগ তাহার নাই; সে হা-হা করিয়া হাসিয়া বলিল, দিনের বেলায়?

সেতাব বলিল, রেতের বেলা পথে সাপ-খোপ শেয়াল কুকুর; রেতের বেলা নিজের বাড়িতে তারা গুনি। নবগেরামের আকাশের তারা দিনে গুনতে আসাই ভাল!

—তা দিনে তারা দেখবার সময় তোমাদের বটে! যা ধান জমেছে তোমাদের! আঃ, যেমন কালো কষকষে রঙ, তেমনি গোছ! তা মহাতাপ একটা মরদ বটে! ক্ষ্যামতা ধরে বটে।

সেতাব তাহার মুখের দিকে চাহিয়া রহিল। তাহার পর ফতুয়ার পকেট হইতে একটা পয়সা বাহির করিয়া ফেলিয়া দিয়া বলিল, যা যেখানে যাবি চলে যা। বকর বকর করে কানের পোকা মারিস না আমার। মেজাজ খারাপ করে দিস না।

–হরিব-ল–হরিব-ল!—বলিয়া পয়সাটি কুড়াইয়া কপালে ঠেকাইয়া আকাশের দিকে চাহিয়া বলিল, তা মেজাজ খারাপ হবার কথা বটে! আঃ, আকাশ খখা করছে। মেঘের চিহ্ন নাই। তোমার উ মাঠে এখনও ক্যানেল আসে নাই। জল না হলে এমন বাহারের ধান সব মরে যাবে। আঃ! একটু চুপ করিয়া থাকিয়া আবার বলিল, তা ভেবো না, জল হবে। এই পুজোতেই হবে জল।

–না, হবে না।

বহু চমকাইয়া উঠিল কথার সুর শুনিয়া।

সেতাব আবার বলিল, একেবারে শুকিয়ে খড় হয়ে যাবে। জ্বলে যাবে।

বহু বলিল, না না না। হবে। ভগবান তা করবেন না। না না। দেবেন দেবেন। মা ভগবতী আসছে–ভোগ খাবেন, মুখ ধোবেন না, এই হয়? হে মা, জল দাও। জল দিয়ে সৃষ্টি রাখ মা।

সেতাব বিরক্ত হইয়া উঠিয়া দাওয়ার উপর ঘরের দরজার মুখে গিয়া ডাকিল, ঘোঁতন! ও ঘোঁতন!

বহু আর দাঁড়াইল না, সে চলিয়া গেল।

ঘোঁতন তাড়াতাড়ি বাহির হইয়া আসিল। সে ইহার মধ্যে নতুন জামাটা পরিয়া ফেলিয়াছে। হাসিয়া বলিল, দেরি হয়ে গেল। চা করতে বললাম। দুধ নাই ঘরে, পুঁটি গেল দুধ আনতে।

—জামাগুলো গায়ে হল ছেলেগুলার?

–হয়েছে। তোমার চোখ আছে হে!

–তা বউয়ের, পুঁটির কাপড় পছন্দ হয়েছে?

—বউয়ের হয়েছে, পুঁটির কথা জানি না। ঝাঁটাখাগী আবার কথা বলে না। ওই এক রকম। বড় বজ্জাত হে।

—না না। বড় কাজের মেয়ে। ভাল মেয়ে।

–বউ কিন্তু হাসছিল।

–ক্যানে, হাসির কথাটা কি এর মধ্যে?

—সেই চাঁপাডাঙার বউয়ের সঙ্গে আমার ছেলেবেলায় বিয়ের সম্বন্ধ হয়েছিল, সেই নিয়ে ঠাট্টা করছিল। সতীনের আড়ি প্রেম হল শেষে!

সেতাব একটু হাসিল, তারপর সহসা গম্ভীর হইয়া বলিল, তুই ভাগ্যিবান ঘোঁতন। তোর ভাগ্যি ভাল। অনেক ভাগ্যি তোর।

তারপর একটু চুপ করিয়া থাকিয়া বলিল, ওই ওর সঙ্গে তার বিয়ে হয় নি ঘোঁতন, তুই বেঁচে গিয়েছিস।

ঠিক এই সময় ঘোঁতনের মা বাহির হইয়া আসিয়া বলিল, ধনে পুত্ৰে তোমার লক্ষ্মীলাভ হোক বাবা, কিন্তু এত টাকার জিনিস তুমি না দিলেই পারতে। এমন মিষ্টি কথাগুলি বলিলেও তাহার কণ্ঠস্বর কেমন বিরস। কেমন যেন বেসুর বাজিতেছে।

সেতাব চঞ্চল হইয়া উঠিল, বলিল, সইমা।

–বাবা।

–ঘোঁতনের ছেলে কাঁদছিল দেখে গেলাম, তা বলি–

—তা ছেলেদের দিলেই হত। এই বাজার। তার ওপর, কিছু মনে কোরো না, তোমার ভাই-ভাজ নিয়ে সংসার

–ভাই-ভাজ! সেতাব রাগিয়া উঠিল।–ভাই-ভাজের কি আছে এতে? আমি দেব আমার অংশ থেকে। তার ছেলে আছে। আমার ছেলে নাই, পুলে নাই। আমার খাবে কে? কি করব আমি? কি দরকার আমার যুগিয়ে?

—কাদুকে বলেছ বাবা?

—কাদুকে? চমকাইয়া উঠিল সেতাব। মাথা হেঁট করিয়া ঘাড় নাড়িয়া জানাইলনা, তাহাকেও বলে নাই।

—তুমি বাবা, আমার আর পুঁটির কাপড় দু জোড়া নিয়ে যাও।

–নিয়ে যাব?

–হ্যাঁ।

–মা! চিৎকার করিয়া উঠিল ঘোঁতন।

মা তাহাতে দমিল না। বলিল—কথা হবে বাবা। হবে নয়—হয়েছে। টিকুরীর বউসে থামিয়া গেল। একটু পর যেন শক্তি সঞ্চয় করিয়া বলিলটিকুরীর বউ আমাকে কাল বলছিল, সেতাব খুব আসছে যাচ্ছে। কনেও খুঁজছে। তা-পুঁটিকে। আবারও সে থামিয়া গেল।

সেতাব বিস্ফারিত দৃষ্টিতে ঘোতনের মায়ের দিকে চাহিয়া রহিল। এই কথাটাই যেন তাহার একান্তভাবে মনের কথা অথচ এই মুহূর্তের পূর্বেও তাহার মন কথাটি হাতড়াইয়া পায় নাই। হ্যাঁ, সে সন্তান চায়। কাদু বন্ধ্যা; সে তাহার প্রতি একান্তভাবে অনুরক্ত আসক্ত তাহার প্রতি প্রেমপ্রীতিতে অভিষিক্ত স্ত্রী নয়। কাদু মহাতাপ মহাতাপ করিয়া সারা। তাহার প্রথম যৌবন অর্থোপার্জনের নীরস কৃচ্ছ্বসাধনের মধ্যে উপবাসী রহিয়া গিয়াছে। বহুজনের বঞ্চনায় কৈশোরে সে নিষ্ঠুর আঘাত পাইয়া সংসারকে কুটিল অবিশ্বাসী হিসাবেই দেখিয়াছে। ঘোঁতন তাহার মনে সন্দেহ জাগাইয়া দিয়াছে। টিকুরীর খুড়ী তাহাতে বাতাস দিয়াছে। অবিশ্বাস তাহার জাগিয়াছে। এই লগ্নে পুঁটি আসিয়া তাহার সামনে দাঁড়াইয়াছে। যুবতী মেয়ে। বিবাহ হয় না। বড় দুঃখী। এই তো ইহাকে বিবাহ করিলে এ তাহাকে পরম কৃতজ্ঞতায় অ্যাঁকড়াইয়া ধরিবে। আজ সব কথাগুলি এক কথায় পরিষ্কার হইয়া গেল। সে বলিতে গেল—চোখ তাহার জ্বলজ্বল করিয়া উঠিল—বলিতে চাহিল–হা। আমি পুঁটিকে চাই। আমি আমার সবসব তাহাকে দিব।

কিন্তু বলা হইল না।

ঠিক এই সময়েই সেতাবের রাখাল গোবিন্দ ছুটিয়া আসিয়া বলিল, মোড়ল মশায়, শিগগির আসেন। বাড়ি চলেন।

–ক্যানে রে, কি হল? প্রশ্ন করিল ঘোঁতন।

সেতাব বলিল, কি হবে? নিশ্চয় সেই আমার জন্ম-শত্ৰু কিছু করেছে। ভাই তো নয়–জন্ম-শত্ৰু আমার। চিরদিন জ্বালিয়ে খেলে। সে-ই কিছু করেছে।

—হ্যাঁগো। মাঠে একেবারে ফাটাফাটি লাগিয়ে দিয়েছে। নিজের মাথা ফেটেছে। এই রক্ত পড়েছে। আর মীরবন্ধের শেখেদের দুজনার মাথা ফাটিয়েছে। সেও রক্ত-গঙ্গা। জল নিয়ে। মারামারি।

সেতাব চিৎকার করিয়া উঠিল, মরুক মরুক, নয়ত ধরে নিয়ে নিয়ে যাক। আমি জানি না, কিছু জানি না।

বলিয়া হনহন করিয়া অগ্রসর হইল।

এত বড় কাটার কারণ যেটি, সেটি শুনিতে সামান্য মনে হয়, কিন্তু চাষার জীবনে তাহা অসামান্য, তাহার গুরুত্ব অনেক বেশি।

কারণ, জল চুরি।

মহাতাপ নিজের মুখেই বলিল, কাল রাত এক প্রহর পর্যন্ত ধরে অমরকুঁড়ির বেঁকে বাকুড়িতে আল-ছাপুছাপু জল করেছি আমি। আঙুল দিয়ে মেপে দেখেছি, আল ছাপতে দু আঙুল বাকি ছিল। সেই জল চুরি করে নেবে শেকের পো? বললাম, তো বলে ক্ষ্যাপামি করিস না, বাড়ি যা। চাঁপাডাঙার বউ ভাত বেড়ে রেখেছে, খা গা। ধরলাম টুঁটি চেপে তো হায়দার মাথায় বসিয়ে দিলে পাঁচনের বাড়ি। আমি মহাতাপ! সেই পাঁচন কেড়ে নিয়ে দিলাম দু ভাইয়ের। মাথা পিটিয়ে ফাটিয়ে।

মহাতাপ তখন বাড়িতে বসিয়া বড় বউয়ের পরিচর‍্যা লইতেছিল। ভাল করিয়া রক্ত ধুইয়া গদাফুলের পাতা বাটিয়া চাপান দিয়া ন্যাড়া দিয়া বাঁধিয়া দিতেছিল। মানদা জল দিয়া রক্তাক্ত দাওয়াটা ধুইয়া ফেলিতেছিল।

সেতাব গম্ভীর মুখে দাঁড়াইয়া শুনিতেছিল। মহাতাপের কথা শেষ হইতেই বলিল—বেশ করেছ, খুব করেছ। এইবার ফৌজদারি মামলা হোক। যাও জেলে। একটা পয়সা আমি খরচ করব না। সে আমি বলে দিলাম।

–তা বলে আমার জল চুরি করে নেবে?

–জল চুরির প্রমাণ হয় নাকি? জলের গায়ে নাম লেখা থাকে নাকি?

–ও জল পেল কোথা থেকে?

–যেখান থেকে পাক। তুই কোথা পেলি? গাড়োল, মুখ্যু পাগল কোথাকার!

বড় বউ এবার বলিল, দেখ, এমন করে ওকে তুমি যা মুখে আসে তাই বোলো না। তোমাকে বারণ করছি আমি। সহোদর বড় ভাই তুমি, তোমার মুখে এ সব বলতে বাঁধছে না? ছি-ছি!

মহাতাপ বড় বউয়ের হাত দুখানি পরম আবেগের সহিত জড়াইয়া ধরিয়া বলিল, যার বড় বউ নাই তার কেউ নাই।

মুহূর্তে সেতাব যেন জোর পাইল; সে জ্বলিয়া উঠিল। চাঁপাডাঙার বউকে বলিল–তোমাকেও ছি, তোমাকেও ছি, তোমাকেও ছি! বুঝলে! বলিয়া কাপড়ের বান্ডিলটা ছুঁড়িয়া ফেলিয়া দিয়া চলিয়া গেল।

কণ্ঠস্বরে চমকিয়া উঠিল কাদু। তীক্ষ্ণ দৃষ্টিতে ভ্রূ কুঞ্চিত করিয়া স্বামীর গমনপথের দিকে কিছুক্ষণ চাহিয়া রহিল, তারপর মহাতাপকে বলিল, ছাড়, তোমার জন্য দুধ গরম করে আনি। যাও, ঘরে গিয়ে শোও একটু। মানু, নিয়ে যা ওকে।

বড় বউ রান্নাশালে আসিয়া উনানে দুধের বাটি বসাইয়া দিয়া চুপ করিয়া বসিয়া রহিল।

মহাতাপ ঘরে আসিয়া বিছানায় শুইয়া আপন মনেই বলিল, চামারের নেতার আমি একদিন নিকেশ করে দেব।

পাশের বিছানায় মানিক শুইয়া ছিল। মানু তাহার চাপাপড়া হাতখানা সরাইয়া দিতেছিল। চামার কথাটা সে শুনিতে পায় নাই। নেতার মারিয়া দিবে শুনিয়াই সে ভাবিল—তাহাকে বলিতেছে মহাতাপ। এ সংসারে পোড়াকপালী মানদা ছাড়া এত সহজে নেতার আর কাহার মারিবে সেই চকিতে ঘাড় ফিরাইয়া তীক্ষকণ্ঠে প্রশ্ন করি, কার?

-কার আবার ওই চামারের কেপনের, ওই বড় বউয়ের স্বামীর। ওই আমার, দাদার, তোর ভাসুরের।

—তোমাকেও ছি! বুঝলে?

–তোমার নেতারভি এক রোজ মার দেগা। হ্যাঁ!

বড় বউ কথাগুলি সিঁড়ি হইতেই শুনিতেছিল, বলিল, কি যা তা বলছ? তোমার জন্যে কি আমি শান্তি-স্বস্তি এক দণ্ড পাব না মহাতাপ? নাও, দুধটা খেয়ে ফেল।

–না। দুধ খাব না আমি। ভাত দাও। মছলি আওর ভাত। কাল পলুইয়ে ধরা মাছ আছে। মনে পড় গিয়া। মাছের মাথা আর ভাত। লে আও।

চাঁপাডাঙার বউ বলিল, মানু, ভাত এনে দে।

বলিয়া সে ফিরিল। মহাতাপ তাহার আঁচলটা ধরিয়া বলিল, নেহি, উ হামকো ছি করতা। উসকে হাতমে নেহি খায়েগা। তুমি এনে দাও ভাত।

চাঁপাডাঙার বউ বলিল, ছাড়, আঁচল ছাড়।

তাহার গম্ভীর কণ্ঠস্বরে মহাতাপ আঁচল ছাড়িয়া দিয়া বলিল, কি, হল কি তোমার, বলতে পার?

—কিছু হয় নি, মাছ আজ ছোব না আমি। মানু এনে দিক্‌।

বলিয়া নামিয়া গেল।

মহাতাপ চিৎকার করিয়া উঠিল, ছোঁবে না ক্যানে? তুমি বিধবা হয়ছ, না, খড়দার মাঠাকরুন হয়েছ? মাছ ছোঁবে না?

সিঁড়ির মধ্যধাপ হইতেই উত্তর আসিল—আজ ষষ্ঠী।

—ষষ্ঠী?

মানদা মুখ বাঁকাইয়া এবার বড় বউ চলিয়া যাওয়ার সুযোগ পাইয়া স্বামীর কাছে আসিয়া বলিল, হা হ্যাঁ, ষষ্ঠী। ছেলে, বংশধর। চাই না? ছেলের জন্যে কি করছে দেখ না। গলায় এই এক ঝোলা মাদুলি। নিত্য উপোস, কানা নাকি?

মহাতাপ আজ রাগ করিল না। সে এক মুহূর্তে বিষণ্ণ বেদনায় অভিভূত হইয়া স্থির দৃষ্টিতে চাহিয়া রহিল। কিছুক্ষণ অস্কুটস্বরে সে বলিল ছেলে! সন্তান! সীয়ারাম, সীয়ারাম! একটা দীর্ঘনিশ্বাস ফেলিল সে।

মানদা বলিল, বড় দরদ বড় বউয়ের জন্যে? এইবার বোঝ।

আবার একটু দীর্ঘনিশ্বাস ফেলিয়া মহাতাপ বলিল, তুই ঠিক বলেছিস মানু, আমি বুঝতে পারতাম না। একটু পর বলিল, আমি তো একটু ক্ষ্যাপাটে বটে! মাথা তো একটু খারাপ।

–একটু? কিন্তু এইবার আক্কেল হল তো?

–হ্যাঁ, হল। আর একটা দীর্ঘনিশ্বাস ফেলিয়া বলিল, নেহি। ই হাম নেহি বুঝা!

–এখন যদি বুঝে থাক, তবে সময়ে বিধান কর। বুঝলে?

—কি করি বল্ তো মানু?

—কি করবে? তাও বলে দিতে হবে আমাকে? দাদাকে গিয়ে সোজা জিজ্ঞাসা কর, ঘোঁতনের সঙ্গে শলা করে কত টাকার গয়না বাধা রেখেছে বল? এ পর্যন্ত কত টাকার ধান বেচেছে, হিসেব দাও।

–বিষয়? মহাতাপ ঘৃণাভরা তিক্ত দৃষ্টিতে মানদার মুখের দিকে চাহিয়া বলিল, শিব-শিবশিব! এতক্ষণ ব্যাড়র ব্যাড়র করে হল বিষয়!

মানদা বিস্ময়ে হতবাক হইয়া স্বামীর দিকে চাহিয়া রহিল। মহাতাপ তাহাকে সিঁড়ি দেখাইয়া দিয়া বলিল, বেরিয়ে যা, আমার সামনে থেকে তুই বেরিয়ে যা। আমার সারা অঙ্গ জ্বলে যাচ্ছে। বেরিয়ে যা। বিষয়।

—বেরিয়ে? মানদা ফোঁস করিয়া উঠিল—বেরিয়ে যাব ক্যানে? আমি ছেলের মা, এ। আমার ছেলের ঘর।

–হাম ছেলের বাবা। আর বেরিয়ে যাবি আর ভাল বলবি। বলিয়া ঘাড়টি ধরিয়া তাহাকে সিঁড়িতে বসাইয়া দিয়া আসিল। আসিয়া মানিকের মাথার শিয়রের কাছে জানালার ধারে বসিয়া বাহিরের দিকে চাহিয়া রহিল।

নিচে বড় বউ ক্লান্ত দেহে বিষণ্ণ অন্তরে দাওয়ার উপর আঁচল বিছাইয়া শুইয়া ছিল। শুইয়া ছিল ঠিক নয়, অন্তরের দুর্বিষহ আবেগের আলোড়ন সংবরণ করিবার জন্য উপুড় হইয়া পড়িয়া ছিল। সে আর পারে না, পারিতেছে না। এমন সময় মানদা দ্রুতপদে সিঁড়ি বাহিয়া নামিয়া। আসিয়া বড় জাকে এইভাবে পড়িয়া থাকিতে দেখিয়া থমকিয়া দাঁড়াইল। নিরুপায় দুরন্ত ক্ৰোধ যেমন মানুষ সর্বংসহ পৃথিবীর বুকে পা ঠুকিয়া জাহির করে, কখনও বা মাথা ঠুকিয়া নিজের কপাল ফাটাইয়া শান্ত হয় আঘাত করে মাটিকেই, রক্তাক্ত করে মাটিকেই তেমনি ভাবেই মানদা বড় জায়ের উপর সব ক্রোধ সব ক্ষোভ দিয়া আঘাত করিল। বলিল, তুমিই—তুমিই আমার কপালে আগুন ধরিয়ে দিলে। তুমি।

বড় বউ তেমনিভাবে পড়িয়া থাকিয়াই উত্তর দিল, দিনরাত চোখের জল ঢেলেও যে নেবাতে পারছি না, কি করব ব?

বলিতে বলিতে সে উঠিয়া বসিল। চোখের জল তখনও গড়াইয়া পড়িতেছিল।

মানু আজ প্রায় ক্রোধে জ্ঞান হারাইয়াছে। সে চিৎকার করিয়া বলিয়া উঠিল, এখন হয়েছে। কি? অনেক কাঁদতে হবে। অনেক কাঁদতে হবে তোমাকে।

মানদার চিারেই বোধ করি একসঙ্গে দুই দিক হইতে সেতাব ও মহাতাপ দুই ভাই আসিয়া হাজির হইল। সেতাব আসিয়াছে বাড়ির বাহির হইতে; মহাতাপ উপর হইতে নামিয়া আসিয়াছে। মহাতাপের কোলে মানিক।

সেতাব তীক্ষকণ্ঠে বলিল, এক দণ্ড শান্তি দেবে না তোমরা? এত অশান্তি কিসের? কাঁদছ? তুমি কাঁদছ? কেন কাঁদছ শুনি?

মহাতাপ স্থির দৃষ্টিতে চাহিয়া দাঁড়াইয়া ছিল। সে হঠাৎ গতি সঞ্চয় করিয়া বড় বউয়ের কাছে আসিয়া কোলের মানিককে প্রায় বড় বউয়ের কোলে ফেলিয়া দিয়া বলিল, এই নাও, ছেলের জন্যই যদি এত দুঃখু তোমার, তবে এই নাও। আমার ছেলে তোমাকে দিলাম। নাও।

মানদা চিৎকার করিয়া উঠিল, নানা-না। আমার ছেলে—

মহাতাপ পথরোধ করিয়া দাঁড়াইল–না।

সেতাব অধীর পদক্ষেপে আসিয়া বড় বউয়ের কোলের মানিককে তুলিয়া লইয়া মানদা ও মহাতাপের কাছে নামাইয়া দিয়া বলিল, না। পরের ছেলে আমি চাই না। ভগবান যদি আমাকে দিয়ে থাকে, তবে সে আমি পাব। আমার হবে।

বলিয়া সে বাহির হইয়া গেল।

বড় বউ তাহাকে ডাকিল, শান, শান, যেয়ো না।

–কি? সেতাব ফিরিয়া দাঁড়াইল।

বড় বউ বলিল, আমাকে তুমি খালাস দাও।

সেতাব বলিল, বাঁচি বাঁচি, তা হলে বাঁচি আমি।–বলিয়া সে চলিয়া গেল।

বড় বউ উঠিল এবং খিড়কির পথের দিকে পা বাড়াইল।

মহাতাপ বলিল, কোথা যাবে তুমি?

বড় বউ বলিল, সর। পুকুরে ড়ুব দিয়ে আসি।

বলিয়া পাশ কাটাইয়া সে বাহির হইয়া গেল। মহাতাপ তাহাকে অনুসরণ করিতে উদ্যত হইয়া ডাকিল, বড় বউ!

মানদা বলিল, আদিখ্যেতা কোরো না। ড়ুবে মরবে না।

মহাতাপ মানদার দিকে ফিরিয়া বলিল, তোরা সাপের জাত। তোরা সাপের জাত। বিষ ছাড়া তোদের কিছুই নাই। জীবনটা জ্বালিয়ে দিলি। বলিস বড় বউকে, তোর কামড় সয়েও ছিলাম। ওর কামড় সইল না। আমি চললাম। এ বাড়িতেই আর আসব না আমি। দু চোখ যেদিকে যায় চলে যাব আমি। হে শিবো! হে ভগবান

বলিতে বলিতে সে চলিয়া গেল।

গেল সে খিড়কির পথেই। পুকুরঘাটে তখন বড় বউ স্তব্ধ হইয়া দাঁড়াইয়া ছিল। ভরা পুকুরের দিকে তাকাইয়া ছিল সে। ডান হাতের মুঠায় চাপিয়া ধরিয়াছিল গলার কবচ মাদুলিগুলি।

দূর হইতে মহাতাপ তাহাকে দেখিয়া বলিল, আমি চললাম? আর আমি ফিরব না।

বড় বউ তাহার দিকে ফিরিয়া চাহিল, কথা বলিতে পারিল না।

মহাতাপ যাইতে যাইতেই বলিল, না। ছেলে—ছেলে তোমার হোক। তাই নিয়ে তুমি সুখে থাক। আমি চললাম। কি দরকার তোমার আমাকে?

সে চলিয়া গেল। বড় বউ দাঁড়াইয়া রহিল। মুখে তাহার বিচিত্ৰ হাসি ফুটিয়া উঠিল; তারপর সে সজোরে টান দিল হাতে ধরা কবরে মুঠায়; কবচ-বাধা সুতার ডোরটা পট করিয়া ছিঁড়িয়া গেল। কবচগুলা সে জলে ছুঁড়িয়া ফেলিয়া দিল। সেখানে একটা টুপ করিয়া শব্দ তুলিয়া কবচগুলি জলে ড়ুবিয়া গেল। তারপর সে ধীরে ধীরে জলে নামিল। হাঁটু-জলে নামিয়া একবার থমকিয়া দাঁড়াইল। চোখ দিয়া তাহার জল গড়াইতেছিল।

মহাতাপ দুই চোখ যেদিকে যায় সেই দিকেই চলিবার সংকল্প লইয়াই বাহির হইয়াছিল। আধপাগল মানুষ। সে আজ গভীর আঘাত পাইয়াছে। বড় বউ তাহার ছেলেবেলার খেলার সঙ্গী। দশ-এগার বছরের কাদম্বিনী শ্বশুরঘরে আসিয়া দেওরের সঙ্গে খেলাঘরে খেলা করিত—সে সাজিত মা, মহাতাপ সাজিত ছেলে। কাদাধুলার ভাত ব্ৰাধিয়া দেবরকে খাইতে দিত। উঠানের একটা খাল অংশকে পুকুর কল্পনা করিয়া সেখানে মহাতাপকে স্নান করাইয়া দিত। ছোট অ্যাঁজলায় শূন্যকে জল কল্পনা করিয়া তাই মহাতাপের মাথায় ঢালিয়া দিয়া মুখে বলিত পুস হুলুস।

ছেঁড়া ন্যাকড়ায় গা মুছাইয়া দিত।

এক একদিন মারিত। মহাতাপ কাঁদত এবং কান্না থামাইয়া হঠাৎ চাঁপাডাঙার বউয়ের ঘাড়ে ঝাঁপাইয়া পড়িয়া উল্টা মার মারিত।

মহাতাপের মা আসিয়া বলিত, কি হল?

কাদু লজ্জায় চুপ করিয়া থাকিত।

মহাতাপ বলিত, আমাকে মারলে।

—তুমি কি করেছিলে?

–বলেছিলাম ভাত খাব না। ও মা সেজেছে কিনা!

–ও! তুমি ছেলে, ও মা!

–মা না কচু! ছাই! ছাই! ছাই!

–না-না-না। ও বলতে নাই, ও বলতে নাই। বড় ভাজ মায়ের মত। মত নয়–মা।

–ওইটুকু মেয়ে আবার মা হয়?

–হয়। লক্ষ্মণের চেয়ে সীতা বয়সে ছোট ছিলেন, তবু সীতা লক্ষ্মণের মায়ের চেয়ে বেশি। জান?

শুধু কি এই খেলা! কত খেলা তাহারা খেলিয়াছে—তাহার কথা একটা পালাগানের চেয়েও বেশি। সে ফুরায় না। লিখিতে গেলে রামায়ণ মহাভারত হইবে বোধহয়, বলিতে গেলে রাত ফুরাইয়া যায়। এইভাবে একসঙ্গে কতদিন কাটিয়াছে। তাহার উপর এতদিন নিঃসন্তান অবস্থায় মহাতাপকে নিবিড় ভালবাসায় জড়াইয়া থাকিয়া, আজ হঠাৎ সে ভালবাসাকে খাটো করিয়া তুচ্ছ করিয়া সন্তানকামনাকে বড় করিয়া তোলার সংবাদে মহাতাপ মর্মান্তিক দুঃখ পাইয়াছে।

সে নিজেদের স্বজাতি জ্ঞাতিগোষ্ঠীর পাড়া বাদ দিয়া আসিয়া উঠিল গ্রামপ্রান্তে বাউরিদের পাড়ায়। বাউরিপাড়া পার হইয়া আসিয়া উঠিল মাঠের প্রান্তে।

আশ্বিন মাসে ধানের জমিতে কানায় কানায় জল প্রয়োজন। কিন্তু সারা আশ্বিন জল নাই, মাঠ শুকাইয়া গিয়াছে। মাঠের মধ্যে উৎকণ্ঠিত চাষীরা কোদাল কাঁধে ফিরিতেছে। মহাতাপের ওই মাঠের মধ্যেই ঘুরিবার কথা। এই সকালবেলাতেও সে ঘুরিয়াছে; মারপিট করিয়া মাথা ফাটাইয়াছে। কিন্তু আর তাহার সে ইচ্ছা নাই। পাগল, মাঠের সীমানার প্রান্তে একটা গাছে চড়িয়া ডালে বসিয়া পা ঝুলাইয়া গান ধরিল–

এ সংসারে কেবা কার মন,
কেবা তোমার তুমি বা কার?
আমার আপন জনা যে জন
কে জানে হায় ঠিকানা তার?

দুই কলি গাহিয়াই তাহার কি মনে হইল। সে লাফ দিয়া নামিয়া পড়িল এবং হনহন করিয়া আলপথ ধরিয়া হটিয়া আসিয়া নিজের জমিগুলি যেগুলিতে সে দিনরাত্রি পরিশ্রম করিয়া দুনীতে তুলিয়া জল ভরিতেছিল, সেই জমিগুলির বাঁধ পায়ে লাথি দিয়া ভাঙিয়া দিল। জল বাহির হইতে লাগিল। সে সোল্লাসে চিৎকার করিয়া উঠিল—বিষয়! বিষ—বিষ! যা! বিষ বেরিয়ে যা! ধান মরে যাক! মরে যাক!

চারিপাশের মাঠেও চাষীরা অবাক হইয়া গেল। ছোট মোড়লের এ কি মতি! ইহাদের অধিকাংশই মজুর-শ্ৰেণী লোক, ধান বচাইবার জন্য মাঠে আসিয়া বুক দিয়া পড়িয়াছে। পুকুরে পুকুরে দুনী বসাইতেছে। নালা কাটিতেছে। খাওয়াদাওয়া মাঠেই, মাঠেই রাত্রি কাটিবে। কড়া পচাই মদের ঊড়ে চুমুক দিতেছে, কড়া তামাক টানিতেছে আর খাঁটিয়া চলিয়াছে। মহাতাপদের কৃষাণ নোটনও মাঠে ছিল। সে ছুটিয়া আসিল। সে মদের হাঁড়িতে চুমুক দিতেছিল, সেটা হাতে করিয়াই সে ছুটিয়া আসিয়া বলিল, ছোট মোড়ল। ছোট মোড়ল!

মহাতাপ বলিল, যাক যাক, বিষ বেরিয়ে যাক।

নোটন হাঁড়িটা আলের উপর রাখিয়া ভাঙা আল বাঁধিতে লাগিল। মহাতাপের নজর পড়িল হাঁড়িটার দিকে। সে হাঁড়িটা তুলিয়া নাক সিঁটকাইয়া মুখ ঘুরাইতে বাধ্য হইল। আবার জোর করিয়া মুখ ফিরাইল। সে খাইবেই।

নোটন সবিস্ময়ে বলিল, কি, হচ্ছে কি? মদ খাবা নাকি?

—খাব। খাব।

–এই দেখ, বাড়িতে বকবে।

–বাড়ি? আমি আর বাড়ি যাব না।

বলিয়া চুমুক দিল ভাঁড়ে।

ওদিকে চণ্ডীমণ্ডপে প্রতিমা তুলিয়া মোড়লেরা একদিকে পূজার আয়োজন করিতেছিল, অন্যদিকে জমিতে জলের কথা হইতেছিল।

বিপিন, সেতাব, রামকেষ্ট এবং আরও মোড়লেরা বসিয়া আছে। ঘোঁতনও আসিয়া জুটিয়াছে। চণ্ডীমণ্ডপে টিকুরীর খুড়ী এবং আরও দুই-তিন জন প্রবীণা মিলিয়া কেহ ঝাঁটা বুলাইতেছে, কেহ পূজার বাসনগুলিতে জল বুলাইতেছে অর্থাৎ ধুইতেছে। একজন খড়ের দড়িতে আমের শাখা পরাইতেছে। গোটা কয়েক ছেলে রঙিন কাগজ কাটিয়া শিকল তৈয়ারি করিতেছিল। একজন একখানা কাগজে মোটা হরফে লিখিতেছিল—যাত্রাভিনয়। একপাশে বসিয়া ছিল ঘোঁতন।

বিপিন বলিতেছিল, তা পূজার কটা দিন যাক। তারপরেতে ক্যানেল আপিসে চল। জল। যখন আসছে ক্যানেলে, তখন মাঠে এখনও খাল আসে নাই বলে জল দেবে না, ই তো হয় না। জল দেক। আমরা কোনো রকমে নিয়ে আসব।

ঘোঁতন বলিয়া উঠিল, সে দেবে না। পরম বিজ্ঞভরে সে ঘাড় নাড়িতে লাগিল।

বিপিন ঘাড় ঘুরাইয়া ঘোঁতনকে দেখিয়া বলিল, কে বটে? ঘোঁতন! ই, তাই বলি এমন বিজ্ঞ মানুষটা কে? ইউনিয়ন কোর্টের উকিল কিনা? আইন একেবারে ঠোঁটস্থ। দেবে না। ক্যানে দেবে না? তুই এখানে কোথা? অ্যাঁ?

সেতাব বলিল, ও আমার কাছে এয়েছে।

—তোমার কাছে তা বেশ। এসেছে বেশ করেছে। তাই সব কথার মধ্যে ও ক্যানে? আমাদের কথা আমরা বুঝব। সবতাতেই ওর পাক মারা চাই। দেবে না! চল সব জোট বেঁধে যাই। বলি, ক্যানেল যখন ধান বাঁচাবার জন্যে, তখন ক্যানে দেবেন না মশায়? না কি হে?

রামকেষ্ট-শিবকেষ্ট এবং অন্যান্য মোড়লেরা সায় দিয়া বলিল, সেই কথাই ভাল। গেরামসুদ্ধ লোক যাবে–

সেতাব উঠিয়া পড়িল। তার এসব ভাল লাগিতেছে না। তাহারও সংসার বিষ হইয়া গেছে।

সে ডাকিল, ঘোঁতন!

ঘোঁতন উত্তর দেবার পূর্বেই বিপিন বলিল, উঠলে যে সেতাব?

—কি করব? আমার জলে দরকার নাই। মরে যাক ধান, জ্বলে যাক মাঠ। যা হবে হোক। বুয়েছেন?

শিবকেষ্ট বলিল, সেতাবের জমিতে জল আছে। সে মহাতাপ করে রেখেছে আগে থেকে। ওর ভাবনা নাই।

—ওহে! বলিয়া সেতাব চিৎকার করিয়া উঠিল। তারপরই কিন্তু হঠাৎ থামিয়া গেল। বলিল, থাক সেসব কথা! আমার কথা আমার মনেই থাক্। বলিয়া সে খানিকটা চলিয়া গেল। কিন্তু একটা কথা মনে হতেই সে ফিরিয়া আসিয়া বলিল, হ্যাঁ, আর একটা কথা জ্যাঠা। আমার পরিবার তো পূজার বরণের ডালা ধরে; তা এবার অন্য লোক দেখুন। সে ধরবে না।

ওদিক হইতে টিকুরীর খুড়ী সর্বাগ্রে বলিয়া উঠিল, তা ভাল, তা ভাল বাবা। আমরা বলতে পারছিলাম না। এ সুমতিটি ভাল হয়েছে তোমার।

বিপিন দৃঢ়স্বরে বলিল, কি, বলছ কি গো টিকুরীর বউমা?

–ন্যায্য কথা বলছি। মোড়ল কি কালা নাকি? কানে কথা যায় না?

–না। যায় না। অন্যায় কথাগুলান বোলো না।

সেতাব বলিল, ন্যায়-অন্যায় বিচারে কি কাজ জ্যাঠা? তার দেহ ভাল নয়, মন ভাল নয়—

–ক্যান রে? মন ভাল লয় ক্যানে? মহাতাপ নিজের ছেলে বড় বউকে দিয়েছে শুনলাম, তবু মন ভাল লয়? বাবা রে, দেওরের কি ভালবাসা।

—খুড়ী! সেতাব কঠিন স্বরে বাধা দিয়া বলিল, মহাতাপের ছেলে আমি নেব ক্যানে? আমার কপালে থাকে।

–হবে না রে বাজার ছেলে কার্তিক ঠাকুরের বাবা এলে। চাঁপাডাঙার বউয়ের কেক ফলবে না।

বাধা দিয়া সেতাব বলিল, চাঁপাডাঙার বউয়ের কপালের নেনই তো একটি নেকন নয় খুড়ী। আমার কপালের একটা নেকনও তো আছে!

সেতাব হনহন করিয়া পথে নামিয়া গেল। ঘোঁতন বলিল-দাঁড়াও, দাঁড়াও!

সে সেতাবের সঙ্গ লইয়া বলিল-আচ্ছা কথাটা তুমি বলেছ! ঠিক বলেছ! পরের ছেলে নিয়ে নিজের সাধ মেটে? মেটে না। মেয়ের অদেষ্ট আর পুরুষের অদেষ্ট এক নয়। বিয়ে করবে তুমি পুঁটিকে? দেব। আমি দেব। বল তুমি।

সেতাব কথা বলিতে গেল কিন্তু পারিল না। অন্তর তাহার লালায়িত। কিন্তু চাঁপাডাঙার বউ! চাঁপাডাঙার বউ! সে? ওঃ সে যেন পাগল হইয়া যাইবে!

ঘোঁতন পকেট হইতে সিগারেট বাহির করিয়া নিজে একটা মুখে গুঁজিয়া একটা সেতাবকে দিল, বলিলখাও।

—সিগারেট?

–হ্যাঁ। লাও ধরাও।

সে দেশলাই জ্বালিল।

ঘোঁতন আবার বলিল—ওই যে বললে, ন্যায়-অন্যায় বিচারে কাজ কি জ্যাঠা? খুব বুদ্ধিমানের মত কথা বলেছ। কথাটা যখন পাঁচজনে বলছে, সন্দেহ যখন–

সেতাব বলিল চুপ কর ঘোঁতন! চুপ কর। ওরে তুই চুপ কর।

সে রাস্তায় নামিয়া পড়িল।

পথে নামিতেই দেখা হইল নোটনের সঙ্গে। নোটন বলিল—বড় মুনিব! ছোট মুনিব–

ছোট মুনিবের কথা আমি কিছু জানি না। সে চলিতেই লাগিল।

–সে চলে গেল

নোটনও সঙ্গ ধরিয়া পিছন হইতে কথা বলিতেছিল। মহাতাপ মদ খাইয়া মাঠ হইতে চলিয়া গিয়াছে। বলিয়া গিয়াছে, সে বিবাগী হইবে। নোটন কোনোমতেই তাহাকে ফিরাইতে পারে। নাই।

–যাক—যাক—যাক।

–ওগো, নেশা করে—

–করুক, মরুক; উচ্ছনে যাক, চুলোয় যাক। যা বলবার বল্‌গা বড় বউকে।

–তিনি কথা বললে না।

–তবে ছোট বউকে বলগা্‌।

–সেও বললে, জানি না।

–আমিও জানি না। বুঝলি! আমিও জানি না।

সেতাব আর কথা না শুনিয়া হনহন করিয়া চলিতে লাগিল।

ঘোঁতন ডাকিল, দাঁড়াও হে। দাঁড়াও।

সেতাব যেন ছুটিয়া পলাইতে চাহিতেছে। কোথায় সে তাহা জানে না।

মহাতাপ তখন প্রান্তরের মধ্যে একটা গাছতলায় শুইয়া ঘুমাইয়া পড়িয়াছিল। নেশায় সে আচ্ছন্ন হইয়া পড়িয়াছে। তাহাদের বাড়িতেও সেই অবস্থা। বড় বউ তেমনিভাবে উপুড় হইয়া শুইয়া আছে। ছোট বউ আপনার ঘরে মানিককে লইয়া বসিয়া নীরবে কাঁদিতেছে। শরতের আকাশ নীল, মেঘের দু-একটা টুকরা মধ্যে মধ্যে ভাসিয়া যাইতেছে। বৃষ্টির কোনো লক্ষণ নাই।

অপরাত্ন গড়াইয়া আসিল। তবু বড় বউ উঠিল না, মানু বাহির হইল না, মহাতাপ ফিরিল না, সেতাবও সেই গিয়াছে—এখনও ফেরে নাই। ক্রমে সন্ধ্যা হইল। নির্মল নীল শরৎ আকাশ ষষ্ঠীর চাঁদের জ্যোৎস্না উঠানে, ঘরের চালে, গাছের শাখায় পল্লবে স্বপ্নলোকের শোভা জাগাইয়া ফুটিয়া উঠিল। সে আলো যেন স্বপ্নে দেখা রহস্যপুরীর আলোর মত স্পষ্ট অথচ আবছা আবছা অথচ স্পষ্ট। আকাশে ষষ্ঠীর চাঁদ, সন্ধ্যাতেই একেবারে সিকি আকাশ পার হইয়া ফুটিয়া ওঠে। যেন আকাশের নীল সায়েরের তলা হইতে মাথা তুলিয়া হাসিতে থাকে। চাঁদের আশপাশে তারা। ফুটিয়াছে। অসংখ্য সংখ্যা নাই, সীমা নাই, এক তারা উকিঝুঁকি, দুই তারা ঝিকিমিকি, তিন তারা ঘোর নামে, চার তারা পাখি থামে, পাঁচ তারা পঞ্চদীপ, ছয় তারা শাঁখ বাজে, সাত তারা সাতভেয়ে, আট তারা অরুন্ধতী, ন তারা অন্ধকার, দশ তারাতে একাকারগুনিতে গুনিতে দশ তারা ফুটিতেই অগুতি তারা ফুটিয়া ওঠে, আর গণনা করা যায় না। তাই উঠিল। তবু মণ্ডলবাড়িতে কেহ উঠিল না, আলো জ্বালিল না, রান্না চড়াইল না, বাহির দুয়ার খোলা হাঁ-হাঁ, করিতে লাগিল। ওদিকে চণ্ডীমণ্ডপে ষষ্ঠীর সন্ধ্যার দেবীর আবাহন অভিষেক হইয়া গেল, ঢাক ঢোল সানাই কঁসি বাজিয়া থামিয়া গেল। সেতাব সেখানকার কাজ সারিয়া এতক্ষণে বাড়ি ঢুকিল। ষষ্ঠীর আবছা জ্যোৎস্নায় স্তব্ধ বাড়িখানা যেন শোকাতুরা সদ্য বিধবার মত বিষগ্ন নিৰ্বাক। হইয়া অবগুণ্ঠন টানিয়া বসিয়া আছে। সেতাব ঘরে ঢুকিয়া থমকিয়া দাঁড়াইল। তাহার সর্বাঙ্গ জ্বলিয়া গেল। সে তীক্ষকণ্ঠে বলিয়া উঠিল।–এ কি!

কেহ উত্তর দিল না।

সেতাব আরও চটিয়া বলিল, বলি কাণ্ড-কারখানাটা কি? ঘরে আলো নাই। উনোন জ্বলে নাই, ষষ্ঠীকৃত্যের দিন। শুভদিন! সব মরেছে নাকি?

বড় বউ দাওয়ার উপর শুইয়া ছিল; সেতাব তাহাকে এতক্ষণে ঠাওর করিয়া তাহার কাছে আসিয়া দাঁড়াইল। বলিল—শুনতে পাও না?

কাদু ক্লান্তকণ্ঠে বলিয়া উঠিল, ওগো আর আমি পারছি না। আমাকে তুমি মায়ের কাছে পাঠিয়ে দাও।

–ভাল। দেব। তাই দেব। ভাল করেই দেব। তাই হবে।

বলিয়া সে উপরের সিঁড়ির দিকে পা বাড়াইল।

–একটা কথা বলি। যতক্ষণ আছি ততক্ষণ বলতে হবে।

–কি?

–মহাতাপ সেই দুপুরে না খেয়ে চলে গিয়েছে। সেই ফাটা মাথা নিয়ে। এখনও ফেরে নি।

–তার কথা আমি জানি না।

—তোমার মায়ের পেটের ছোট ভাই।

–আমার শত্রু; তা ছাড়া সে কচি খোকা নয়।

–জেনেশুনেও একথা বলছ তুমি?

—বলছি! বলছি! বলছি! সে আমার শত্ৰু, তুমি আমার শত্ৰু, ঘর দোর সব আমার বিষ। আগুন। শ্মশান।

বলিয়া সে চলিয়া গেল।

যাইতে যাইতে আবার ফিরিয়া আসিয়া বাহিরের দরজাটা বন্ধ করিল এবং হনহন করিয়া চলিয়া গেল।

মানদা আপনার ঘরে বন্ধ দরজার গায়ে স্থির হইয়া দাঁড়াইয়া সব শুনিতেছিল। বাঘিনীর মত চোখ দুইটা তাহার ক্রোধে জ্বলিতেছিল এবং সে ক্রোধের সবটাই গিয়া পড়িতে চাহিতেছে ওই বড় জায়ের উপর। ওই তাহার অদৃষ্টকে ওই মহাতাপের মত পাগলের অদৃষ্টের সহিত জড়াইয়া দিয়াছে। গরিবের মেয়ে সে। সেই দারিদ্রের সুযোগ লইয়া তাহার পিতৃকুলের জ্ঞাতিকন্যা হিসাবে হিতৈষিণী সাজিয়া সচ্ছল অবস্থার লোভ দেখাইয়া মহাতাপের সঙ্গে বিয়ের সম্বন্ধে তাহার পকে রাজি করাইয়াছিল। প্রথম প্রথম বড় বউয়ের স্নেহ যত্ন, মহাতাপের সঙ্গে তাহার অন্তরঙ্গতা মানদার ভালই লাগিত। ক্রমে ক্রমে চোখ খুলিয়া সে আজ দিব্য দৃষ্টি পাইয়াছে। বুকের ভিতর তাহার আগুন জ্বলিয়াছে। সেই আগুন চোখের দৃষ্টির মধ্য দিয়া বাহির হইয়া সব কিছুকে জ্বালাইয়া পুড়াইয়া খাক করিয়া দিতে চাহিতেছে! আজ এই দুর্গাষষ্ঠীর দিন তাহার নাড়-ছেঁড়া ধন, একটি সন্তান তাহার, তাহাকে মহাতাপ দান করিয়া দিল ওই বন্ধ্যা নারীকে! বন্ধ্যা নারীর দৃষ্টি-আকাঙ্ক্ষা বড় প্রবল, আকর্ষণ দুর্নিবার। ইহার জন্য যদি–

সে আর ভাবিতে পারিল না। ছুটিয়া গিয়া মানিককে জড়াইয়া ধরিয়া কাঁদিতে কাঁদতে অস্ফুটস্বরে বলিল, হে মা ষষ্ঠী! পাগল মানুষ মায়াবিনীর মায়ায় ভুলে বলেছে—দান করলাম ছেলে। আমি বলি নাই মা, আমি বলি নাই! হে মা! রক্ষা করো তুমি।

সে ছেলেকে বুকে জড়াইয়া ধরিয়া বালিশে মুখ গুঁজিল।

আপন ঘরে সেতাব উত্তেজিত মনে অন্ধকারের মধ্যে চালের কাঠের দিকে চাহিয়া জাগিয়া ঘুমন্তের মত পড়িয়া ছিল। মনে মনে তাহার অনেক আলোড়ন, অনেক চিন্তা, অনেক কল্পনা।

বাহিরের পথে চৌকিদারের হক উঠিল। ও–ওই–

কয়েক মিনিট পর চৌকিদারটা বাড়ির দরজায় আসিয়া ডাকিল-বড় মোড়ল! বড় মোড়ল!

সেতাব হাঁকিল–হ্যাঁ, জেগেছি।

চৌকিদারটা বলিল, তোমাদের ছোট মোড়ল, ওই খিড়কির পুকুরের গাছের তলায় বসে কাঁদছে।

-কাঁদুক। তুই যা।

তবু সেতাব উঠিয়া বসিল।

কথাগুলা মানদাও শুনিয়াছিল। সেও উঠিয়া বসিল।

সিঁড়ি বাহিয়া নামিবার মুখেই শুনিল, একটা দরজা খুলিয়া গেল।

দরজা খুলিয়া সেতাব দাওয়ায় আসিয়া দেখিল, বাহিরের দরজাটা খোলা।

দরজা খুলিয়া বড় বউই বাহির হইয়াছে। কি করিবে সে? দুর্নিবার প্রাণের আকর্ষণ লঙ্ন করিতে সে পারিয়া ওঠে নাই। সেই গভীর রাত্রে একাকিনী নারী অন্ধকার পথ অতিক্রম করিয়া পুকুরের ধারের গাছতলাটিতে আসিয়া মহাতাপের হাত ধরিয়া টানিয়া বলিল, ওঠ।

মহাতাপ বলিল, না—না। আমাকে তোমার দরকার নাই! তোমার সব মিছে কথা।

–না–না। কোনো মিছে কথা নয়। মিছে নয়—নয়-নয়। হল তো? ওঠ এখন।

–আমাকে ধর। আমি নেশা করেছি। মদ খেয়েছি।

–শুনেছি। নোটন বলেছে আমাকে।

–আমাকে বকবে না?

-–তোমার দোষ কি? সবই আমার অদৃষ্ট। ওঠ, আমার কাঁধ ধরে ওঠ।

মহাতাপকে সে ধরিয়া তুলিল। মহাতাপ তাহার কাঁধে ভর দিয়া উঠিয়া দাঁড়াইয়া বলিল, জান, আমি বিবাগী হয়ে চলে যেতাম। কিন্তু ফিরে এলাম

বড় বউ অন্ধকারের মধ্যে একটু হাসিল।

পাগল বলিল, তোমার জন্যে ফিরে এলাম–

আর একপাশের অন্ধকার হইতে সেতাব বলিয়া উঠিল, তুমি আর আমার বাড়ি ঢুকো না, আমি বারণ করছি। ঠাঁই না থাকে তো গাছের ডালে গলায় দড়ি দিয়ে ঝুলে মর।

বড় বউ থরথর করিয়া কাঁপিয়া উঠিল এবং পরমুহূর্তেই সংজ্ঞা হারাইয়া পড়িয়া গেল।
অষ্টম পরিচ্ছেদ

পরদিন সপ্তমীর সকাল।

সুখের রাত্রি সোনার নূপুর বাজাইয়া চঞ্চলা বিলাসিনীর মত অকস্মাৎ পোহাইয়া যায়। কেমন করিয়া কোন দিক দিয়া চলিয়া গেল বোঝা যায় না, ফুরাইয়া গেলে চমক ভাঙে। দুঃখের রাত্রিও। দাঁড়াইয়া থাকে না; বিষণ্ণ ক্লান্তি অসহনীয় হইয়া ওঠে, মনে হয় রাত্রির পার নাই, শেষ নাই; কিন্তু সেও এক সময় ফুরাইয়া যায়। রাত্রি শেষ হয়। সকাল হয়। মণ্ডলবাড়ির সেই দুঃখের ষষ্ঠীর রাত্রিও শেষ হইল। বড় বউ অচেতন হইয়া পড়িয়া গিয়াছিল। জ্ঞান হইয়াছে এই সকালবেলা। বাড়ি ঢুকো না এ কথা বলিয়াও সেতাব এই অবস্থায় তুলিয়া না আনিয়া পারে নাই। পথে পড়িয়া মরিতে দিবার মত অমানুষ সে নয়। অবশ্য পথে পড়িয়া মরিবার কথা নয়। মহাতাপ থাকিতে বড় বউ পথে পড়িয়া কখনও মরিবে না। মহাতাপকে সে কাদুকে তুলিয়া আনিতে দিবে না। কখনও না। একদিন সে বড় সাধ করিয়া ঘরে আনিয়া ছল। নিজেকে ভাগ্যবান ভাবিয়াছিল।

সকালবেলা চাঁপাডাঙার বউ চোখ মেলিয়া চাহিল।

মাথার শিয়রে সেতাব দাঁড়াইয়া ছিল, বসিয়া ছিল রাখাল ও বিপিন মণ্ডল। জ্ঞান হইতেছে না দেখিয়া রাখাল এবং বিপিনকে সেবই ডাকিয়া আনিয়াছে। রাখাল ভাল হাত দেখিতে পারে, বাজনায় যেমন তাহার দক্ষতা, নাড়িজ্ঞানও তাহার তেমনি সূক্ষ্ম। রাখাল তাহার হাতখানি দেখিতেছিল, চাঁপাডাঙার বউয়ের জ্ঞান হইতে দেখিয়া সে হাতখানি নামাইয়া দিল। বলিল–জ্ঞান হয়েছে, ভয় নাই। কি মা, চিনতে পারছ সব? মনে পড়ছে?

বড় বউ একটা দীর্ঘনিশ্বাস ফেলিয়া মাথায় ঘোমটা টানিয়া দিল।

রাখাল বলিল—এই দেখ। তবে নাড়ি বড় দুর্বল। যেন কদিন খায়টায় নাই। বুয়েচ না? ভাল করে খেতে দাও। এক বাটি গরম দুধ করে দাও দেখি।

অবগুণ্ঠনের অন্তরাল হইতে বড় বউ মৃদুস্বরে বলিল—মোড়ল জ্যাঠার কাছে আমার একটা নিবেদন আছে।

—আমার কাছে? বিপিন মোড়ল এ কথা শুনিবার জন্য প্রস্তুত ছিল না।

–আপনার কাছেই। হ্যাঁ।

–বল মা বল! কি বলছ বল!

–আমাকে একখানি গাড়ি ডেকে আমার মায়ের কাছে পাঠিয়ে দেন।

–ক্যানে মা? এই পূজার দিন।

সেতাব আর আত্মসংবরণ করিতে পারিল না। সে বলিয়া উঠিল—যাবে যাবে, তার জন্যে মোড়ল জ্যাঠাকে ক্যানে? আমিই পাঠিয়ে দোব। হ্যাঁ, দোব। হবে। হবে।

বড় বউ সে কথা গ্ৰাহ্য করিল না। বলিল—আর আপনারা পাঁচজনে থেকে, ওই মহাতাপকে তার ভাগ বুঝিয়ে দেন। সে পাগল। বিষয়-আশয় হাতে পেলে হয়ত বুঝবে, ঘরে থাকবে, নইলে ও ঘরে থাকবে না। বিবাগী হয়ে যাবে।

সেতাব বলিল, হবে, তাও হবে। এই পুজোর ভেতরেই চুলচেরা করে ভাগ করে দেব। পঞ্চায়েত ডেকেছি।

বিপিন বলিল, আঃ সেতাব! ছিঃ, তুমিও কি পাগল হলে?

–হয়েছি। হয়েছি। আপনারা সব ভাগ করে দেন। নইলে গলায় দড়ি দিতে হবে আমাকে। বলিতে বলিতে ঘর হইতে বাহির হইয়া গেল।

রাখাল ও বিপিন তাহার পিছনে পিছনে চলিয়া গেল।

দাওয়ার উপর তখন মহাতাপ টলিতে টলিতে উঠিয়া দাঁড়াইয়াছে। গত দিনের মাথার। আঘাতের ফলে এবং সারাদিন অনাচারের ফলে তাহার জ্বর হইয়াছে। এই দেহ লইয়াই কখন। বড় বউয়ের চেতনা হইবে—এই প্রত্যাশায় সে দাওয়ায় বসিয়া ছিল। সেখানে বসিয়াই ঘরের কথাগুলি সব শুনিয়াছে। ক্রুদ্ধ উৎসাহে উঠিয়া দাঁড়াইয়াছে।

সেতাব এবং বিপিন বাহির হইয়া আসিতেই সে বলিল হ্যাঁ, আমার বিষয় আমাকে বুঝিয়ে দাও! ভাগ করে দাও। ভাগ করে দাও।

সেতাব তাহার দিকে কঠোর দৃষ্টিতে চাহিয়া রহিল। বিপিন সে দৃষ্টি দেখিয়া শঙ্কিত হইয়া সেতাবকে ডাকিল-সেতাব! বাবা!

সেতাব মহাতাপকে বলিল, দোব। সেতাব না থাকলে পেতাপ মোড়লের জমিজেরাত সব দেনার দায়ে নিলেম হয়ে যেত। ভিক্ষা করে খেতে হত। তা হোক। আমার কর্তব্য আমি করেছি। তোর ন্যায্য ভাগ তুই পাবি।

–ঘোঁতন ঘোষের সঙ্গে শলা করে কত টাকার গয়না বাধা নিয়েছ—সেসব হিসেব আমাকে দিতে হবে।

—সে টাকার একটা পয়সা পেতাপ মোড়লের বিষয়ের টাকা নয়। সে আমার পরিবারের গয়না বিক্রি করা টাকা। গায়ের পঞ্চায়েত জানে বিয়ের সময় পাঁচশো টাকার অলঙ্কার দিয়েছিল শ্বশুর। সে গয়না বেচে দেনা শোধ করেছি। তাকেই আমি বাড়িয়েছি। সে আমার বিয়ের যৌতুক। আমার নিজস্ব।

মহাতাপ বলিল, বড় বউ সে টাকা তোমাকে দেবে না।

—মহাতাপ!–চিৎকার করিয়া উঠিল সেতাব।—বড় বউয়ের নাম তুই মুখে আনিস না। তোকে আমি বারণ করছি। তোকে আমি বারণ করছি।

সে হনহন করিয়া বাড়ি হইতে বাহির হইয়া গেল। তাহার সঙ্গে বিপিন চলিয়া গেল। শুধু রাখাল হতভম্ব হইয়া দাঁড়াইয়া সব দেখিতেছিল।

মহাতাপ সেতাবের শেষ কথাটায় খানিকটা দমিয়া গিয়াছিল; কেন সে বড় বউয়ের নাম মুখে আনিবে না? কেন? হঠাৎ সেই প্রশ্নটা তুলিয়া সে উঠানে নামিল-ক্যানে? ক্যানে শুনি? ক্যানে আমি বড় বউয়ের নাম মুখে আনতে পাব না, শুনি?

ঘর হইতে বাহিরে আসিয়া মানদা তাহার হাত ধরিল না, যেতে পাবে না।

উপর হইতে বড় বউয়ের কণ্ঠস্বর ভাসিয়া আসিল—মহাতাপ, যেয়ো না, ঘরে গিয়ে শোও। আমার দিব্যি, আমার মরা মুখ দেখবে।

মহাতাপ দাঁড়াইয়া গেল।

এতক্ষণে রাখাল বলিল–ঘোট বউমা, চাঁপাডাঙার বউকে একটু দুধ গরম করে দাও বাপু।

ছোট বউ সে কথায় কর্ণপাত করিল না। সে মহাতাপের পায়ের কাছে প্রায় পাগলের মত হাঁটু গাড়িয়া বসিয়া বলিল, মাথা খুঁড়ে মরব আমি।

রাখাল ধীরে ধীরে বাহির হইয়া গেল।

বাহিরে আসিয়া সে দেখিল, সেতাব বসিয়া পত্ৰ লিখিতেছে। দাঁড়াইয়া আছে নোটন। চিঠিখানা শেষ করিয়া সে পড়িয়া লইল—

শ্ৰীমণিলাল পাল কল্যাণবরেষু,

অত্র পত্রের ব্যাপার জরুরি জানিবে। তুমি পত্রপাঠ লোক মারফত চলিয়া আসিবে। এখানে তোমার ভগ্নী কিছুতেই থাকিতে পারিতেছে না। আমরা ভায়ে ভায়ে পৃথকা হইতেছি। এ সময় চাঁপাডাঙার বউকে ওখানে লইয়া না গেলে কোনো মতেই চলিবে না। তুমি পত্রপাঠ আসিবে। অন্যথায় চাঁপাডাঙার বউকে হয়ত একাই পাঠাইয়া দিতে হইবে। সে ক্ষেত্রে আমাকে দোষ দিলে চলিবে না। ইতি–

শ্ৰীসেতাবচন্দ্র মণ্ডল

পড়িয়া দেখিয়া চিঠিখানি মুড়িয়া নোটনের হাতে দিয়া বলিল, চলে যা। কাল মণিকে সঙ্গে করে নিয়ে আসবি। খবরদার, কোনো কথা ভাবি না।

নোটন চিঠিখানা লইতে হাত বাড়াইল।

রাখাল বলিল, সেতাব!

—ফ্যাচফাচ করিস না রাখাল। পিছু ডাকিস না। বাড়ি যা।

–ওহে, চাঁপাডাঙার বউমাকে–

–রাখাল, তু বাড়ি যা।

রাখাল থামিয়া গেল। ভয় পাইল।

সেতাব চিঠিখানা নোটনের হাতে দিয়া বলিল—তু সব বলবি। যা ঘটেছে মুখে বলবি। বুঝলি?

রাখাল চলিয়া গেল এবার।

সেতাব আবার বলিল—যাবার পথে ঘোঁতনকে ঘোঁতনকে বলবি, আমি ডেকেছি। আমি ডেকেছি।

নোটন তবু চুপ করিয়া দাঁড়াইয়া রহিল।

সেতাব বলিল—কি? দাঁড়িয়ে রইলি যে?

ওদিকে চণ্ডীমণ্ডপে সানাই ঢোল ঢাক বাজিয়া উঠিল। সপ্তমী পূজার ঘট আনিবার সময় হইয়াছে।

সেতাব আবার বলিল, নোটন!

এবারে নোটন বলিল, ওই শোন, পূজার ঢাক বাজছে। ঘট আসছে মোড়ল। সে সব বুঝিয়াছে।

সেতাব রূঢ়কণ্ঠে বলিল, নোটন।

নোটন পুরনো লোক, এই ঘরের সুখদুঃখের সঙ্গে তাহার জীবনটা জড়াইয়া গিয়াছে শত পাকে সহস্ৰ বয়নে। সে বলিল, যা করবে পূজার পরে কোরো। মোড়ল, আজ সপ্তমী পুজোর দিন; ঠাকুরুনের ঘট আসবে, সঙ্গে সঙ্গে লক্ষ্মী পাতবে, আজ ঘর ভাঙার ধুয়ে তুলো না। বেসজ্জনের বাজনা বাজিও না।

সেতাব তাহার হাতের চিঠিটা লইতে উদ্যত হইল। বলিল, তুই যাবি কি না বল?

নোটন তাহার হাতখানা সরাইয়া লইয়া বলিল, যাব। তুমি মনিব। কথা শুনতে হবে আমাকে। চললাম আমি। কিন্তু মাঠে ধান মরছে, শো-শে ডাক ধরেছে মাটিতে। জল নাই। জল হবে না। আকাশের জল হবে না। এ আমি বললাম তোমাকে। যা হয় কোরো।

সে চলিয়া গেল।

পথে একটি বাড়ির দরজায় দাঁড়াইয়া তখন বহুবল্লভ বাউল একতারা এবং বায়া বাজাইয়া গান ধরিয়াছিল–

কমল-মুখ শুকায়ে গেছে, আয় মা আয় মুছায়ে দি,
মায়ের কোলে শয়ন কর মা, শীতলপাটি বিছায়ে দি।।
বল বল মা কানে কানে
কি দুঃখ পেলি কোমল প্ৰাণে
শ্মশান-তাপে জ্বলছে দেহ,
আঁচল-বায়ে ঘুচায়ে দি।
আয় মা মুখ মুছায়ে দি।

আগমনী গানের বাৎসল্য রস অনাবৃষ্টি—শুষ্ক শরতের আকাশের উত্তপ্ত নীলিমাকে সকরুণ করিয়া তুলিয়াছিল।

বড় বউয়ের কানে ওই গানের সুর ভাসিয়া আসিতেছিল। এ গান যেন দূর চাঁপাডাঙায় বসিয়া তাহারই মা গাহিতেছে। সে তো যাইবে। এ বাড়ির মেয়াদ তাহার ফুরাইয়াছে। সে কথা সে জানিয়াছে। তাহার নিজের চিত্তের সকল মায়া সব মমতাই কাটিয়াছে। তাহার স্বামীরও কাটিয়াছে। সব ভালবাসা মায়ানদীর মত শুকাইয়া গিয়া মরুভূমিতে পরিণত হইয়াছে। সেই মরুভূমির বুকের মধ্যে সেতাবের অন্তরের রূপটা ফুটিয়া উঠিয়াছে। সে চায় নূতন ঘর, নূতন সংসার, নূতন–

হাসি ফুটিয়া উঠিল তাহার মুখে। তাহার প্রতি এই কদর্য সন্দেহ একান্তভাবেই মিথ্যা। এতকাল এইভাবেই তো ঘর করিয়া আসিল সে। এমনিভাবেই তো সে মহাতাপকে স্নেহ করিয়াছে, এমনিভাবেই তো মহাতাপ আবদার করিয়াছে। কই, এতকালের মধ্যে এমন সন্দেহ তো হয় নাই? হঠাৎ আজ, আজ কেন হইল? ওই তাহার নূতন গোপন সাধটা তাহার চোখে ফুলি পরাইয়া দিয়া সংসারটাকে কালো করিয়া দেখাইয়া তাহাকে জোর দিতেছে।

ঠিক এই সময়েই কে ডাকিল, বউমা!

চমকিয়া উঠিল চাঁপাডাঙার বউ। সে সবিস্ময়ে প্রশ্নভরা দৃষ্টিতে সিঁড়ির দিকে চাহিয়া রহিল।

সিঁড়ির নিচে হইতে আগন্তুক কথা বলিল, আমি মা, রাখাল।

চাঁপাডাঙার বউ ধীরে ধীরে উঠিয়া বসিল।

রাখাল উঠিয়া আসিল; সে একা নয়, তাহার সঙ্গে একটি আট-নয় বছরের মেয়ে। তাহার হাতে এক বাটি দুধ। রাখাল বলিল, তোমার জন্যে দুটুকু নিয়ে এলাম মা। খাও তুমি। দে মা দেী, খুড়ীমাকে দুধের বাটিটা দে।

চাঁপাডাঙার বউ মাথার ঘোমটাটা বাড়াইয়া দিয়া বলিল, পূজার ঘট আসছে। আমাকে লক্ষ্মী পাততে হবে। তার আগে তো খাব না!

–মা, এই দেহে তুমি মাথা ঘুরে আবার পড়ে যাবে।

–না! পারব আমি। খুব পারব।

সে ধীরে ধীরে দেওয়াল ধরিয়া উঠিয়া দাঁড়াইল। বলিল, তুই রাষ্য দেী, আমি লক্ষ্মী পেতে এসে খাব।

রাখাল বলিল, খেঁদী, তুই সঙ্গে যা। বুঝলি, সঙ্গে যা।

ওদিকে ঢাক ঢোল সানাই কঁসির শব্দ উচ্চ হইয়া উঠিল। চণ্ডীমণ্ডপে ঘট আসিল। শাঁখ বাজিল, উলু পড়িল।

চণ্ডীমণ্ডপে এবার পূজার আয়োজন সবই হইয়াছে; কিন্তু তাহাতে প্ৰাণ নাই, সমারোহ জমিয়া উঠিতেছে না। সব যেন বিষণ্ণ চিন্তাভারক্লিষ্ট। আকাশে জল নাই, চাষীর দৃষ্টি আকাশের দূর-দিগন্তে, চিত্ত উদ্বেগকাতর। তাহার উপর সেতাবদের এই কলহটাও একটা বেদনাতুর প্রভাব বিস্তার করিয়াছে। ছেলেরা শুধু ছুটাছুটি করিতেছে। তাহার মধ্যে মানিকও রহিয়াছে। তাহাকে আনিয়াছে গোবিন্দ। খালি গা, জামাও কেহ একটা পরাইয়া দেয় নাই। সে একটা রঙিন বাঁশি লইয়াই খুশি আছে। সেইটাই সে বাজাইতেছে–পু-পু! পু-পু! বাজাইতেছে আর ঘুরিয়া বেড়াইতেছে।

মণ্ডলেরা বসিয়া আছে, তামাক টানিতেছে, কিন্তু আসর ঝিমাইয়া গিয়াছে। কেহ বড় একটা কথা বলে না। চেঁচাইতেছে শুধু টিকুরীর খুড়ী।

—অবিশ্বেস, অনাচার, অবিচার-বলি এর চেয়ে পাপ আর কি হবে? বলি ইয়েতে কি ধৰ্ম থাকে, না দেবতা তুষ্ট হয়। মোড়লেরা কি সব ধর্মজ্ঞান চিবিয়ে খেয়েছে নাকি? বলি পূজা করা কেনে?

বিপিন মণ্ডল সোজা হইয়া বসিল। বলিল—টিকুরীর বউ, তুমি এমন করে ফেঁচাও ক্যানে গো? বলি এমন করে চেঁচাও ক্যানে গো?

—চেঁচাবে না? বলি মোড়লেরা যে চোখ-কানের মাথা খেয়েছে। বলি সেতাবের থেকে এখনও পুজো এল না, সেদিকে নজর আছে?

পাঁচ আনার অংশীদার সেতাব চণ্ডীমণ্ডপের সম্মুখে রাস্তার উপর ঘোঁতনের সঙ্গে কথা বলিতেছিল।

বিপিন মণ্ডল বিস্মিত এবং ব্যস্ত হইয়া উঠিল। প্রতি বৎসর পূজায় চাঁপাডাঙার বউ ষষ্ঠীর সন্ধ্যা হইতে দশমী পর্যন্ত চণ্ডীমণ্ডপে সারাক্ষণ হাজির থাকিয়া সকল অনুষ্ঠান নিখুঁত করিয়া দেয়। সেতাবের দৃষ্টিও এদিকে খুব প্রখর। ভাগের ব্যাপারে সে সকল ভাগীর পূজা বুঝিয়া লয়, নিক্তির ওজনে মাপিয়া বুঝিয়া লইয়া ছাড়ে। একুশ সের আতপের নৈবেদ্য বরাদ্দ আছে। সেতাব চণ্ডীমণ্ডপে মাপের সের হাতে করিয়া বসিয়া থাকে। সর্বাগ্রে চাঁপাডাঙার বউ তাহাদের একের তিন অংশের সাত সের আতপ, সোয়া-পাঁচ গণ্ডা রম্ভার ভাগ সাতটা রম্ভা, সোয়া-পাঁচ পো চিনির সাত ছটাক চিনি, তাহার সঙ্গে আনুষঙ্গিক পূজার জিনিসগুলি একটি ডালায় গুছাইয়া সাজাইয়া লইয়া আসিয়া নামাইয়া দেয়। সেতাব সব বুঝিয়া লইয়া হাঁকাহকি করে—কই সব, কই গো! ভাগীদাররা সব ঘুমুচ্ছে নাকি?

এবার তাদের বাড়িতে একটা আকস্মিক কলহ বাঁধিয়া উঠিয়াছে, তবু পূজা আসিবে না–এ কথা কল্পনা করিতে পারে নাই। চাঁপাডাঙার বউয়ের অবস্থাও বিপিন নিজে দেখিয়া আসিয়াছে; সেতাবও কথার মধ্যে অনেক কিছু বলিয়াছে, তাহার অবশ্য আজ বাহির হইবার কথা নয়, সামর্থও নাই। কিন্তু সেতাব আছে, ছোট বউ আছে।

বিপিন উঠিয়া দাঁড়াইল। ডাকিল—সেতাব!

রাস্তার উপর হইতে সেতাব উত্তর দিল—যাই।

—যাই নয়। বাড়ি যাও। পূজার সামিগ্যিরি আসে নাই। পাঠিয়ে দাও।

টিকুরীর খুড়ী হাকিয়া বলিল—তোমাদের ছোট বউকে পাঠিয়ে দিও, বুঝলে বাবা! বড়। বউকে পাঠিও না।

ঠিক সেই মুহূর্তেই চণ্ডীমণ্ডপের পিছন দিক দিয়া প্রবেশ করিল পুঁটি ও বড় বউ। পুঁটি স্নান করিয়াছে, বড় বউও স্নান করিয়াছে। পুঁটির হাতে পূজার সামগ্রীর ডালা। সে আসিয়া ডালা নামাইয়া দিল।

পুঁটিকে তাহার মা পাঠাইয়া দিয়াছে। পাঠাইয়াছে গুজবের কথাটা বলিতে। বলিয়াছে, লজ্জা করলে চলবে না। বলবি। কাদু আমার পেটের মেয়ের অধিক! কিন্তু কাদুর অবস্থা দেখিয়া পুঁটি। সেকথা বলতে পারে নাই। বলিয়াছে, পুজো দেখতে এলাম দিদি তোমার বাড়ি। কাদু পূজার সামগ্রীর ডালাটা তাহার হাতেই দিয়া সঙ্গে লইয়া আসিয়াছে।

বড় বউকে দেখিয়া সকলে অবাক হইয়া গেল। এত বড় ঘটনা গ্রামে চাপা থাকিবার কথা নয়, সেতাব নিজেই চেঁচামেচি করিয়াছে। ইহার পরও বড় বউ আসিয়া চণ্ডীমণ্ডপে সকলের সমুখে দাঁড়াইবে, এ কথা কেহ কল্পনা করতে পারে নাই।

পুঁটি পূজার ডালাটা নামাইয়া দিল। বড় বউ গলায় আঁচল দিয়া প্ৰণাম করিল।

সমস্ত চণ্ডীমণ্ডপটা কয়েক মুহূর্তের জন্য এমন হইয়া রহিল যে সুচ পড়িলেও শোনা যায়।

প্ৰণাম সারিয়া উঠিয়া বড় বউই নিস্তব্ধতা ভঙ্গ করিল। বলিল-আমাদের পুজোর সামগ্রী। দেখে নাও, কে দেখছ?

এবার টিকুরীর খুড়ী মুখ খুলিল। সে বলিল, আমি দেখে নিচ্ছি, তা–ডালাটার দিকে একবার তাকাইয়া আবার পুঁটির দিকে চাহিয়া জিজ্ঞাসা করিলাপাডাঙার বউকে খুঁয়েছিস নাকি পুঁটি?

বড় বউ দাঁড়াইয়া বলিল—মোড়লবাড়ির ভাড়ার এখনও আমার হাতে টিকুরী খুড়ী। সেখানে লক্ষ্মী পেতে নিজে হাতে সামগ্রী বার করে সাজিয়ে নিজেই নিয়ে আসছিলাম। পুঁটি হঠাৎ এসে পড়ল। তুলে নাও! তোমাদের না বলায় হবে না। না বলতে হয় বলবেন ওই দেবতা। বসিয়া নিজেই সমস্ত সামগ্রী প্রতিমার সামনে নামাইয়া দিয়া বলিল—না বলতে হয় তুমি বল মা। আর কারুর কথা আমি শুনব না। আমার হাতের পুজো অশুদ্ধ যদি হয় তবে বজ্ৰাঘাত কর। আমার মাথায়; না হয় সর্পাঘাত হোক আমার। না হয় নিজের হাতের খাড়াটা দিয়ে আমার বুকে মার!

সকলে স্তব্ধ হইয়া গেল। শুধু বিপিন চিৎকার করিয়া উঠিল—বউমা! বউমা! বউমা!

বড় বউ কোনো দিকে দৃকপাত না করিয়া পুঁটিকে বলিলচ পুঁটি। তাহারা দুই জনে চলিয়া গেল।

টিকুরীর খুড়ী বলিল গঙ্গাজলের ঘটিটা কই? অ ইন্দেশের বউ।

সেতাব রাস্তার উপর হইতে উঠিয়া আসিয়া বিপিনকে বলিল-আজ সন্ধেবেলা তা হলে আমার ভাগের কাজটা সেরে দেন।

—আজ? সেতাব—

–না জ্যাঠা, আজই! আই! আই! এ কেলেঙ্কারি আমি আর সইতে পারছি না।

তাহাই হইল।

পঞ্চায়েত বসিয়া সেতাবের বিষয় ভাগ করিয়া দিল। সেতাবের হিসাবের কাজ বড় পরিষ্কার, কাগজপত্রে খুঁত ছিল না; এবং জমিগুলির মধ্যে কোন্ জমি কেমন ইহাও মোড়লদের কাহারও অজ্ঞাত ছিল না। জমি পুকুর ভাগ কাগজ লইয়া বসিয়া অল্প সময়ের মধ্যেই হইয়া গেল।

শেষের দিন বাসন-কোসন ভাগ হইল এবং বাড়ির উঠানে দড়ি ধরিয়া মাপিয়া ঘর ভাগ করিয়া দিল পঞ্চায়েত মণ্ডল। পঞ্চায়েতরা বাড়ির উঠানে দাঁড়াইয়া ছিল। সেতাব মহাতাপ দুই জনে দুই দিকে দাঁড়াইল। মানিক বাঁশিটা বাজাইয়া ফিরিতেছে—পু-পু-পু! বউয়েরা দুই জনেই ঘরের ভিতর।

ভাগের ব্যাপারে সেতাব কথা বলিল না। গোড়াতেই সে বলিয়াছে—আগে ও-ই বেছে নিক। শেষে আমি ঠকিয়েছি—এ কথা শুনব না।

উঠানে দড়ি ধরিয়াছিল একদিকে রামকেষ্ট, অন্যদিকে আর একজন। বিপিন বলিলবল। এখন কে কোন্ দিকে নেবে? এ দিকের ঘরখানা ভাল, তেমনি ওদিকে, রান্নাঘর করে নিতে হবে। সেতাব–?

মহাতাপ উঠিয়া আসিয়া বলিল—ভাল ঘর আমি নোব।

সেতাব হাসিয়া বলিল—তাই নেক। আমি পুরনো ঘরই নিলাম।

মহাতাপ নূতন ঘরের দাওয়ায় সঙ্গে সঙ্গে উঠিয়া আসিয়া বলিল–বাস।

সেতাব বলিল, আপনারা একটু দাঁড়ান। আমি কাঁচা ইট, রাজ-মজুর ঠিক করে রেখেছি। মাটির দেওয়াল দিতে দেরি হবে। ইটের গাঁথনি আজই দেবে।–আয় রে! ওরে! শুনছিল।

কয়েক জন মজুর আসিয়া ঢুকিল। সেতাব বলিল–ওর মুখ আর আমি দেখব না।

মহাতাপ হঠাৎ উঠিয়া আসিয়া বলিল–গয়না যা বাধা নিয়েছে তার হিসেব কই? বিপিন জ্যাঠা!

সেতাব বলিল—সে তো আমার যৌতুক।

—সে তো বড় বউয়ের গয়না। বড় বউকে তো ও নেবে না।

–সে আমি বুঝব। তা নিয়ে তোর ওকালতি করতে হবে না।

–আলবৎ হবে।

বিপিন বলিল মহাতাপ, তুমি মিছে চেঁচামেচি কোরো না।

ঠিক এই সময়েই বড় বউয়ের ভাই মণিলাল আসিয়া বাড়ি ঢুকিল। মহাতাপ চিৎকার করিয়া বলিল—ওই, ওই বড় বউয়ের ভাই এসেছে। নোটন আনতে গিয়েছিল।

মণিলাল আসিয়া সেতাবকে প্রণাম করিল। বয়সে বড় বউ অপেক্ষা বছর তিনেকের ছোট। বেশ স্বাস্থ্যবান। চাষীর ছেলে। প্ৰণাম করিয়া বলিল—এ সব কি বললে নোটন, জামাই-দাদা?

—তোমার ভগ্নীকে নিয়ে আমার ঘর করা অসম্ভব মণিলাল। বিপিন আসিয়া হাত ধরিয়া বলিল—সেতাব, এ কাজ তুমি হঠাৎ কোরো না। সেতাব!

–না। সে আর হয় না জ্যাঠা। মণিলাল, তুমি তোমার ভগ্নীকে নিয়ে যাও। গাড়ি আমি ঠিক করে রেখেছি।

মহাতাপ ঘাড় নাড়িয়া বিজ্ঞের মত বেশ উল্লাসের সঙ্গেই বলিল—আমিও রেখেছি, গাড়ি ঠিক করে আমিও রেখেছি। হাঁ, আমিও মহাতাপ! হাঁ!

সে বেশ অহঙ্কারের সঙ্গেই, যাহাকে বলে দর্পভরে পদক্ষেপ, তেমনি পদক্ষেপে, কর্মরত মজুরওয়ালার কাটা দেওয়ালের ভিতরটার চারিদিকে বেড়াইয়া আসিল। যেন লাঠি খেলোয়াড় পায়তারা জিতেছে। সেই ভজিবার মুখে তাহার চোখে পড়িল মানদা কখন ঘর হইতে বাহির হইয়া আসিয়া এক ভাগ লইয়া গুছাইতেছে। মহাতাপ থমকিয়া দাঁড়াইল। তারপর বলিল—নেহি নেহি নেহি।

মানদা থমকিয়া গেল। তারপর ঘোমটা টানিয়া চাপা গলায় বলিল—কোটা আমাদের?

–এইটাই। ওটাই মহাতাপ নিয়েছে।—বলিল বিপিন।

–তবে?

মহাতাপ কাছে আসিয়া বলিল—তোকে ছুঁতে হবে না আমার ভাগ। তুই তোর, কাপড়চোপড় গুছিয়ে নে। হাঁ! গাড়ি ঠিক করে রেখেছি আমি। তোর সঙ্গে আমার ঘর করা নেহি। চলেগা। হাঁ!

মানদার হাত হইতে বাসন কয়েকখানা পড়িয়া গেল।

সকলেই চমকিয়া উঠিল। বিপিন বলিল, ওরে মুখ্য, আধপাগল, বলছিস কি! ক্ষেপলি নাকি?

–অন্যায় কি বললাম? ক্ষেপব কেন?

–তবে এসব কি বলছিস? নিজের পরিবারকে নিবি না ক্যানে?

–ও নেবে না ক্যানে? ও পাঠিয়ে দেবে ক্যানে?

সকলে অবাক হইয়া গেল।

মহাতাপ বলিল, ওকে পাঠিয়ে দোব আমি দিয়ে সেই গাড়িতে বড় বউকে নিয়ে আসব আমি। আর নইলে শিবকেষ্ট-রামকেষ্টদের টিকুরীর খুড়ী ইন্দেশের খুড়ীর মত বড় বউকে ছোট বউকে ভাগ করে দাও তোমরা। বড় বউয়ের সঙ্গে ওর বনে না, আমার ছোট বউয়ের সঙ্গে বনে না। ছোট বউ ওর ভাগে যাক, বড় বউ আমার ঘরে থাকবে।

বিপিন বলিল, ছিছিছি! মহাতাপ তুই চুপ কর্। কেলেঙ্কারি বাড়াস নে। বাড়াস নে।

মহাতাপ চিৎকার করিয়া উঠিল—না-না-না, বড় বউকে আমি যেতে দেব না। বড় বউ ছাড়া আমার চলবে না।

সেতাব এক টুকরা ভাঙা ইট লইয়া সজোরে ছুঁড়িল।

মহাতাপকে লক্ষ্য করিয়া নয়। ছুঁড়িল বড় বউকে লক্ষ্য করিয়া। বড় বউ কখন আসিয়া সিঁড়ির দরজার মুখে দাঁড়াইয়া ছিল, কেহ লক্ষ্য করে নাই। সেতাব দেখিয়াছিল। কাঁচা ইটের টুকরাটা বড় বউয়ের পাশে দেওয়ালে লাগিয়া চুরমার হইয়া গেল। বিপিন সেতাবের হাত ধরিয়া টানিয়া বলিল, এস বাইরে এস। তাহাকে টানিয়া সে লইয়া গেল। খামার-বাড়িতে আসিয়া সেতাব বলিল, আমি নতুন করে সংসার করব। আবার বিয়ে করব আমি।

–করবে। আর আপত্তি আমি করব না।

–ঘোঁতনের বোন পুঁটির কথা আমি ঘোঁতনকে বলেছি।
নবম পরিচ্ছেদ

নবমীর রাত্রিকাল। মণ্ডলবাড়ির সম্পত্তি ঘর-দুয়ার আজ দিনের বেলা ভাগ হইয়া গিয়াছে।

বাড়ির বাহিরে টাপর দেওয়া গরুর গাড়ি সাজানো রহিয়াছে। সকালেই বড় বউ চাঁপাডাঙা যাইবে চিরকালের মত হয়ত যাইবে।

বাড়ির উঠানে এক কোমর উঁচু কাঁচা ইটের দেওয়াল গাঁথা হইয়া গিয়াছে। ভারা বাধা রহিয়াছে। কাল বাকিটা শেষ হইবে।

সেতাব সর্বসমক্ষে ঘোষণা করিয়াছে তাহার সন্তান চাই। সে আবার বিবাহ করিবে। তবু তাহার বুকে যেন আগুন জ্বলিতেছে। কাদম্বিনীর উপর একটা কঠিন আক্রোশ বুকের মধ্যে আগুনের মত জ্বলিতেছে।

রাত্রি প্রথম প্রহর পার হইয়াছে, জ্যোত্সা ঝলমল করিতেছে। আকাশে আজ মেঘ দেখা দিয়াছে।

শুইবার ঘরে বড় বউ শুইয়া ছিল। সেতাবও শুইয়া ছিল, কিন্তু ঘুম তাহার আসে নাই। বড় বউকে বিদায় দিব, বিদায় দিব বলিয়া কয়দিন মাতিয়া উঠিয়াছিল; কাল বড় বউ চলিয়া যাইবে, আজ রাত্রে তাহার অন্তর কেমন অধীর হইয়া উঠিয়াছে। ক্রোধ, ক্ষোভ, জ্বালা, বেদনা, দুঃখ-—সে যেন সবকিছুর একটা সংমিশ্রণ। যেন আগ্নেয়গিরির গর্ভে ফুটন্ত বহু ধাতুর আলোড়ন। সে হঠাৎ উঠিয়া বসিল, কত দিন থেকে তুমি আমার চোখে এইভাবে ধুলো দিয়ে আসছ, বলতে পার? কত দিন?

বড় বউ উত্তর দিল না। সেতাব ঘরের মধ্যে একবার পায়চারি করিয়া আসিয়া কাছে। দাঁড়াইল। বলিল, আমার মুখে ক্যানে এমন করে চুনকালি মাখালে, ক্যানে? বলিয়াই দ্রুতপদে জানালার ধারে গিয়া দঁাড়াইল। সঙ্গে সঙ্গে ফিরিয়া আসিয়া বলিল, তুমি তো বিষ খাইয়ে আমাকে মেরে যা খুশি তাই করতে পারতে। তারপরই বলিল, গয়না, ওই গয়না কটা দিয়ে বিষয় বাঁচিয়ে তুমি আমায় ঠকিয়েছ। আমি কানা, আমি অন্ধ। তোমাকে তার একটি পয়সা আমি দোব না।

সে আসিয়া বিছানায় শুইয়া পড়িল। সঙ্গে সঙ্গে উঠিয়া কাছে গিয়া বসিল, বলিল, তোমাকে যেতে আমি দোব না! তোমার গলা টিপে মেরে ফেলব আমি।

বলিতে বলিতেই সে অস্থির হইয়া উঠিয়া দাঁড়াইল। এক পাক ঘুরিয়া আসিয়া বলিল, জবাবও তুমি দেবে না! চাঁপাডাঙার বউ!

এতক্ষণে চাঁপাডাঙার বউ বলিলবল।

–আমার পা ছুঁয়ে বল তুমি।

–কি!

—যা দেখেছি তা ভুল। যা বুঝেছি তা ভুল। বল, আমার পা ছুঁয়ে বল? ওঠ।

সে বড় বউয়ের হাত ধরিয়া রূঢ় আকর্ষণে টানিয়া তুলিল এবং নিজের পাখানা বাড়াইয়া। দিয়া বলিল, আমার পা ছুঁয়ে বল?

বড় বউ তাহার মুখের দিকে স্থির দৃষ্টিতে চাহিয়া থামিয়া বলিল, না! তারপর উঠিয়া ধীরে ধীরে বাহিরে চলিয়া গেল। বাহিরে আসিয়া বারান্দায় শুইয়া পড়িল।

সামনে জ্যোৎস্না-ঝলমল পৃথিবী। আকাশে জ্যোৎস্না, গাছের পল্লবে জ্যোৎস্না। কিন্তু তাহার উপর একটা যেন ছায়া পড়িয়াছে। পূর্ব দিকে দিগন্তে মেঘ উঠিয়াছে, এক কোণে তাহারই ছায়া পড়িয়াছে—জ্যোৎস্না-আলোকিত পৃথিবীর উপর। মধ্যে মধ্যে বিদ্যুৎ চমকাইতেছে। সে চমক চকিত স্বল্প অস্পষ্ট। ইঙ্গিতস্পষ্ট প্রকাশ নয়।

শুইয়া শুইয়া কত কথাই তাহার মনে উঠিল। একবার মনে হইল সেতাবের পায়ে আছাড় খাইয়া পড়িয়া পা দুইটাকে জড়াইয়া ধরিয়া বলিবে—তুমি সত্যিই অন্ধ, তুমি সত্যিই অন্ধ। এই কথাটাই তোমার পা ছুঁয়ে আমি তোমাকে বলছি। আর শেষ মিনতি করছি, মেরেই ফেল আমাকে। মেরেই ফেল। কি করে এই মুখ নিয়ে চাঁপাডাঙায় গিয়ে দাঁড়াব আমি?

সেতাব ঘরের মধ্যে পায়চারি করিতেছিল। চিন্তায় সে অধীর অস্থির।

চাঁপাডাঙার বউয়ের উপর নিষ্ঠুর আক্রোশ যেন মুক্ত প্রবাহে বাহির হইবার পথ পাইতেছে। না। কোথায় যেন বাধা পাইয়া নিজের বুকে ফিরিয়া আসিয়া ধাক্কা মারিতেছে। কোনো মতেই সে অপরাধের পাহাড়টা উহার মাথায় চাপাইয়া দিয়া ছাড়িয়া দিতে পারিতেছে না। বড় বউ উপুড় হইয়া মুখ থুবড়াইয়া পড়িয়া গিয়া পিষিয়া যাইতেছে না। সে জলের ঘটি হইতে জল দিয়া মাথা ধুইয়া ফেলিল। তারপর শুইয়া পড়িল।

সব স্তব্ধ। রাত্রি শনশন করিয়া বহিয়া চলিয়াছে। অসংখ্য-কোটি কীটপতঙ্গ অবিরাম এক বিচিত্র ঐকতান বাজাইয়া চলিয়াছে। বাহিরে এক সময় একটা পাঁচা ডাকিয়া উঠিল। সেতাব। চমকিয়া উঠিল। কান পাতিয়া কিছু শুনিবার চেষ্টা করিল। কই, বড় বউয়ের নিশ্বাসের শব্দ শোনা যায় কই? সে সন্তৰ্পণে বিছানা ছাড়িয়া বারান্দার দিকের দরজার পাশে দাঁড়াইয়া উঁকি মারিয়া দেখিল।

আকাশের জ্যোৎস্না আভাস আসিয়া পড়িয়াছে। বারান্দার ভিতরে বারান্দার রেলিঙের খানিকটা পাশ পর্যন্ত জ্যোৎস্নই রহিয়াছে। সেখানে রেলিঙের ছায়া পড়িয়াছে। ভিতরটায় আবছা আলোঅ্যাঁধারি, তাহারই মধ্যে সাদা-কাপড়-ঢাকা বড় বউ নিথর হইয়া পড়িয়া আছে।

সে আবার আসিয়া বিছানায় শুইল। আবার উঠিল, একটা বালিশ তুলিয়া লইয়া জানালার ধারে রাখিয়া শুইয়া পড়িল। বাহিরে দিগন্তে মেঘ ঘন হইতেছে। বাতাস উঠিতেছে মৃদুমন্দ। সেই বাতাসে তাহার তন্দ্ৰা আসিল।

হঠাৎ তন্দ্ৰা ভাঙিয়া গেল। পায়ে যেন কিছুর স্পর্শ অনুভব করিতেছে সে। দেখিল, পায়ের তলার দিক হইতে চাঁপাডাঙার বউ সিঁড়ির দিকে মুখ ফিরাইয়া পা বাড়াইয়াছে। বারান্দার দরজাটা ঠিক পায়ের কাছেই। বারান্দা হইতে উঠিয়া আসিয়াছে বড় বউ। সিঁড়ি দিয়া নামিয়া চলিয়াছে। সেতাব চঞ্চল হইল না। সে স্থির হইয়া ঘুমন্তের মত পড়িয়া রহিল। বড় বউ নামিয়া গেল। সে উঠিয়া কান পাতিয়া রহিল। সিঁড়ির দরজাটা খুলিয়া গেল। এবার সে উঠিল, ঘরের এক কোণে কয়েকটা জিনিসের সঙ্গে ছিল একখানা দা। সে দাখানা লইয়া নামিয়া গেল।

মহাতাপ বাহিরের বারান্দায় পড়িয়া আছে। শুইবার আগে মানদাকে বলিয়াছে, শাসাইয়াছেনা, না। আমার ঘরে কাজ নাই। নে, তুই ঘর নে, দোর নে, বিষয় নে, আমি চাই না। এই বাইরে থাকছি রাতটার মত। কাল চলে যাব। নিশ্চয় চলে যাব।

বড় বউ সত্যই মহাতাপের বাড়ির দিকেই গেল। মাঝখানে উঠানে পঁচিল পড়িয়াছে। প্রায় হাত দুয়েক উঁচু পর্যন্ত গাথা হইয়া গিয়াছে। বড় বউ সন্তৰ্পণে পচিল পার হইয়া ওপারে দাওয়ার ধারে দাঁড়াইল। মহাতাপ বারান্দাতেই শুইয়া আছে। বারান্দার গায়ে খোলা দরজার ভিতর মিটমিটে লণ্ঠনের স্বল্পালোকিত ঘরে মানদা মানিককে লইয়া শুইয়া আছে, দেখা যাইতেছে। বড় বউ দাওয়ায় উঠিল। মহাতাপের মাথার কাছে একটি ছোট পুঁটুলি নামাইয়া দিয়া দ্রুতপদে। বারান্দার ওই প্রান্তে খিড়কির দরজা দিয়া বাহির হইয়া গেল।

মহাতাপও ভাল করিয়া ঘুমায় নাই। বড় বউয়ের দরজা খোলার শব্দে সে জাগিয়া উঠিল, তাকাইয়া দেখিল—একটি মূর্তি বাহির হইয়া গেল; অঙ্কুটস্বরে সে সবিস্ময়ে বলল, বড় বউ? সে হাতে ভর দিয়া উঠিয়া গেল। দেহে তাহার জ্বর রহিয়াছে। হাতে একটা কি ঠেকিল। সে সেটা লইয়া টিপিয়া দেখিল। এ কি? টাকা? গয়না? বড় বউয়ের দ্রুত অনুসরণ করিল। সে বুঝিয়াছে, সে বুঝিয়াছে। বড় বউয়ের মতলব সে বুঝিয়াছে।

সে বাহির হইয়া গেল।

সঙ্গে সঙ্গে মানদাও বাহির হইয়া আসিল বারান্দায়। খোলা খিড়কির দরজার দিকে চাহিয়া দেখিল সে। একটু হাসিল, তারপর সে অনুসরণ করিল।

এবার উঠানে নামিয়া আসিল সেতাব। তাহার হাতের দাখানা জ্যোৎস্নায় ঝলকিয়া উঠিল।

মহাতাপ খিড়কির দরজার বাহির হইয়া চারিদিকে চাহিয়া দেখিল। কয়টা গাছের তলায় অন্ধকার, তাহার ওপারে জ্যোৎস্নালোকিত পৃথিবী। ভরা পুকুরটা জ্যোৎস্নায় ঝকমক করিতেছে। চাঁদ পুকুরের জলে চাদমালা হইয়া কাঁপিতেছে।

পুকুরের ঘাটে দাঁড়াইয়া বড় বউ।

বড় বউ বসিল। কাপড়ের অ্যাঁচলের ফালি ছিঁড়িয়া ফেলিল। সে মরিবার জন্য আসিয়াছে। সে জলে ড়ুবিয়া মরিবে। কাপড়ের ফালি দিয়া পা দুইটিকে বাঁধিবো বুকের কাপড়ে একখানা ইট। শুইয়া শুইয়া সে অনেক ভাবিয়াছে। ছিঃ! ছিঃ! কোন্ মুখে সে চাঁপাডাঙায় ফিরিয়া যাইবে? লোকে শুধাইলে কি বলিবে?

সে সঙ্কল্প করিয়াই বাড়ি হইতে বাহির হইবার সময় তার গায়ের গহনা কয়খানা এবং গোপন সঞ্চয় শ দুয়েক টাকা পুঁটুলি বাঁধিয়া মহাতাপের মাথার শিয়রে নামাইয়া দিয়া আসিয়াছে। তাহার ছিল অনেক। সবই স্বামিত্বের দাবিতে সেতাব লইয়াছে। সে একটি কথাও বলে নাই। এই সামান্যটুকু সে মহাতাপকেই দিয়া যাইবে। মহাতাপকে বঞ্চিত করিয়াছে সেতাব।

বড় বউ পায়ে বাঁধন দিতেছিল।

গাছের তলার ছায়া হইতে মহাতাপ আসিয়া দাঁড়াইল। ডাকিল-বড় বউ!

চাঁপাডাঙার বউ চমকিয়া উঠিল। তাহার দিকে তাকাইয়া অস্ফুটস্বরে বলিল, মহাতাপ!

মহাতাপ বলিল, তুমি জলে ড়ুবতে এসেছ বড় বউ?

বড় বউ অবোধকে ছলনা করিতে চাহিল-কে বললে? আমি ঘাটে এসেছি ভাই। শরীরটা বড় জ্বলছে। চান করব।

—না।—ঘাড় নাড়িয়া মহাতাপ বলিল, আজ তুমি আমাকে ঠকাতে পারবে না। পায়ে তুমি দড়ি বাঁধছ! আমার মাথার শিয়রে তুমি গয়না-টাকা ফেলে দিয়ে এলে। আমি তখুনি বুঝেছি।

বড় বউ বলিল, আমি এই কলঙ্ক মাথায় নিয়ে চাঁপাডাঙায় কোন্ মুখে ফিরে যাব ভাই? তুমি কেন এসে এই সময়ে সামনে দাঁড়ালে মহাতাপ?

—আমি চলে যাচ্ছি। আমি কিছু বলব না। তুমি তাই মর। ওরা যে এমন ভাবে, তা আমি বুঝতে পারতাম না। তোমার গয়না-টাকা তুমি নাও। অ্যাঁচলে হাত না বেঁধেই ড়ুবে মর তুমি। যার পাওনা সে নেবে।

সে ফিরিতে উদ্যত হইল।

—মহাতাপ! দেও!

মহাতাপ ফিরিল। বড় বউ বলিল, ও তোমার পাওনা। তোমার দাদা তোমাকে ফাঁকি দিয়েছে।

আমি নিয়ে কি করব? তুমি ড়ুবে মর। আমিও চলে যাব ঘর থেকে। তুমি চলে যাবার সঙ্গে সঙ্গে আমিও পথ ধরতাম।

–না, না। ও কথা বলতে নেই। মানুর কি হবে? মানিকের কি হবে!

—সে ওই জানে।-হাতখানা উপরের দিকে তুলিয়া দিল।তুমি যে ঘরে থাকবে না, সে ঘরে আমি থাকব না।

বড় বউ নিজেও আজ সচকিত হইয়া উঠিল। বিরক্ত হইল। ছিছি, ছিছি! কঠিন কণ্ঠেই বলিল, কিন্তু ক্যানে? ক্যানে তুমি আমার জন্যে ঘর ছাড়বে মহাতাপ? তোমার বউ, তোমার ছেলে, তোমার ঘর, তোমার বিষয়–

—আঃ! তুমিও তাই বলছ? হা-হা-হারে। সে যেন হাহাকার করিয়া উঠিল। তারপর আবার বলিল—শুধু বউ বেটা বিষয় নিয়ে ঘর হয়? মা না থাকলে হয়, মা থাকতে তাকে ছেড়ে বউবেটা নিয়ে ঘর? আমার মা বলে গিয়েছে, বড় ভাজ তোর মা। ছেলেবেলায় খেলাঘরে তুমি মা হতে আমি ছেলে হতাম—মনে নাই? বলে নাই লক্ষ্মণের কথা, সীতার কথা?

সে ছবি মুহূর্তে মনের মধ্যে ভাসিয়া উঠিল; সে কি ভুলিবার?

মনে হইল, সেই সেকালের যুগেই যেন ফিরিয়া গিয়াছে।

মহাতাপ আবার বলিল, মরণকালে মা তোমাকে বলে নাই–বউমা, মহাতাপ আমার পাগল, ও মা ছাড়া থাকতে পারে না তুমি ওর মা হয়ো? তোমার ছেলে-পুলে থোক, কিন্তু ঐ তোমার বড় ছেলে। বলে নাই? মনে নাই?

–আছে ভাই।

মনে আছে কেন, এই মুহূর্তে চোখের সম্মুখে ভাসিতেছে।

শুধু তাহারই নয়, শুধু মহাতাপেরই নয়, সেতাবের চোখের সম্মুখেও ভাসিতেছে। সে যে তাহার সাক্ষী। মায়ের মৃত্যুকালে মা যখন কথাগুলি বলে তখন সেও যে দাঁড়াইয়া ছিল সেখানে।

একটা গাছের তলায় দা হাতে সেতার দাঁড়াইয়া কথাগুলি শুনিতেছিল; থরথর করিয়া সে কাঁপিয়া উঠিল। মনে পড়িল সবশেষে মা তাহাকে ডাকিয়া বলিয়াছিল—তুমি আমার বটবৃক্ষ। ঝড় বাজ অনেক সহ্য করে পোড়ড়া মণ্ডলবাড়িকে খাড়া করেছ। তোমার হায়ার তলায় এই দুটিকে দিয়ে গেলাম। মহাতাপ পাগলাটে, তাকে বউমা দেখবে। তুমি বড় বউমাকে দেখো। সাক্ষাৎ লক্ষ্মী আমার। ওর পয়েই সব। ওর অপমান কোরো না কখনও। ও আমার বড় অভিমানী।

এই নিশীথে গাছের ছায়ার মধ্যে সেই ছবি যেন স্পষ্ট ভাসিয়া উঠিল।

ওদিকে আকাশে শনশন করিয়া মেঘ উঠিতেছিল, কখন মেঘ জমিয়াছে—পাক খাইয়াছে; গুমট ধরিয়াছে তাহার পর মৃদু বাতাস উঠিয়াছে, মৃদু বাতাস প্রবল হইয়া উঠিয়াছে। মেঘ ধাবমান হইয়াছে—আকাশ ঢাকিয়া অসীম বিস্তারে প্রসারিত হইতেছে। মেঘে মেঘে সংঘর্ষ বাঁধিয়াছে। বিদ্যুৎ চমকাইয়া একটা মেঘগর্জন ধ্বনিত হইয়া উঠিল। গম্ভীর গুরু গুরু দীর্ঘায়িত মনোহর মেঘধ্বনি।

মহাতাপ বড় বউকে বলিল, তুমি তাই মর মা; মা-ই বলছি আজ। তুমি মর আমিও চলে যাচ্ছি—এই পথেই যাব। একেবারে গঙ্গাসাগর।

বড় বউ বলিল, মহাতাপ! না। সে কোরো না ভাই!

—না নয়! আমি ঠিক করে রেখেছি। তুমিই কি কম দুঃখ দিলে আমাকে? আমাকে নিয়ে তো ছেলের সাধ মেটে নাই তোমার! কত কবচ পরলে, কত উপোস করলে! গঙ্গাসাগরে ড়ুবে মরব আমি। যেন আসছে জন্মে তোমার কোলেই জন্যই আমি।

বড় বউ চিৎকার করিয়া উঠিল, আমার মাদুলি আমি ছিঁড়ে জলে ফেলে দিয়েছি।

একবারে বাধাবন্ধনহীন চিৎকারওই মেঘের ডাকের মত।

সঙ্গে সঙ্গে কোথা হইতে শিশুকণ্ঠের স্বর ধ্বনিত হইল–ব-মা! ব-মা!

বড় বউ চকিত হইয়া বলিয়া উঠিল—মানিক!

ওদিকে একটা গাছের ছায়ার তলা হইতে মানদা চিৎকার করিয়া উঠিল, মানিক!

মানিককে যে সে ঘরে একলা রাখিয়া আসিয়াছে! বাড়ির দরজাগুলা যে খোলা হাট হইয়াছে! মানিক!—বড় বউ উঠিতে লাগিল। কিন্তু পায়ের বাঁধনের জন্য পারিল না, পড়িয়া গেল। সে বলিল, মহাতাপ, মানিককে দেখ। মহাতাপ! আঃ, আমার পায়ের বাঁধনটা, আঃ!

দা হাতে গাছতলা হইতে ছুটিয়া বাহির হইয়া আসিল সেতাব।

মহাতাপ চিৎকার করিয়া উঠিল, না—না—

সেতাব বলিল, তোর পায়ে পড়ি। মহাতাপ। তোর পায়ে পড়ি। কেলেঙ্কারি বাড়াস নে। যা মানিককে দেখ! ওরে ছোট বউমা আমারই মত বাগানে এসে দাঁড়িয়ে ছিল। মানিক একলা ছিল। দেখ। আমি ওর পায়ের বাঁধন কেটে নিয়ে যাচ্ছি। যা।

সে বড় বউয়ের পায়ের বাঁধন কাটিয়া দিতে বসিল। বলিল, ছি-ছি-ছি!

ওদিকে বাড়ির ভিতর হইতে মানদার কণ্ঠস্বর ভাসিয়া আসিল–মানিক! মানিক!

একা মানিক ঘরে শুইয়া ছিল। বিদ্যুতের আলোয় মেঘের ডাকে তাহার ঘুম ভাঙিয়া গিয়াছিল। সে মাকে ঘরে পায় নাই। বাহিরে আসিয়াও কাহাকেও পায় নাই। দরজা খোলা হাট। অল্প ছিলকে মেঘ অবশ্য আকাশময়ই কুয়াশার মত দাগিয়া উঠিয়াছে। তাহাতে জ্যোত্সা ঢাকা পড়ে নাই, ম্লানও ঠিক হয় নাই, একটু রহস্যালোকের চেহারা পাইয়াছে। সে সেই আশোয় খোলা দরজার বাহির হইয়া পড়িয়াছে। হঠাৎ বড় বউয়ের উচ্চকণ্ঠের মহাতাপ ডাকের মধ্যে বড়মায়ের সাড়া পাইয়া বড়মা বলিয়া ডাক দিয়া পথে বাহির হইয়া পড়িয়াছে। কোথায় বড়মা! সকলেই তাহাকে ফেলিয়া গিয়াছে।

মানদা ঘরে ছুটিয়া আসিয়া ডাকিল, মানিক!

কিন্তু কই মানিক?

সে দিশাহারা হইয়া ওই বাগানের খিড়কির পথেই বাহির হইয়া ডাকিল, মানিক!

মহাতাপ ছুটিয়া আসিল—কই—মান্‌কে?

—জানি না-মানদা কাতরভাবে স্বামীর দিকে চাহিল।

মহাতাপ দাঁতে দাঁতে ঘষিয়া বলিল, কথা শুনতে গিয়েছিলে, ছেলেকে একা রেখে?

মানদা একবার ডাকিল, দিদি!

বাগানের ভিতর হইতে বড় বউ সাড়া দিল—মানু! মানিক!

–বাড়িতে নাই।–সে কাঁদিয়া উঠিল।

বড় বউ আসিয়া দাঁড়াইল। সে পাইতেছিল। তাহার পিছনে সেতাব। বড় বউ চিৎকার করিয়া ডাকিল-মানিক!

সেই মুহূর্তের ঘন কালো ঈশান কোণের মেঘে চাঁদ ঢাকিয়া দিল। সঙ্গে সঙ্গে আসিল বাতাস–একটা দমকা বাতাস। বাতাসের প্রথম ঝটকাটা চলিয়া গেল। তাহার পর সমান বেগ লইয়া ঠাণ্ডা বাতাস বহিতে লাগিল। সেই বাতাসের মধ্যে শোনা গেল একটা রঙিন বাঁশির ক্ষীণ আওয়াজ–পু পু!

বড় বউ বলিল, সদর রাস্তায়। ওই মানিকের বাঁশি।

সদর রাস্তাতেই বাহির হইয়াছিল মানিক। তাহার শিশুমনে চণ্ডীমণ্ডপে পূজাসমারোহের স্মৃতি। ধারণা জন্মিয়াছিল, তাহাকে ঘুম পাড়াইয়া রাখিয়া সকলে পূজা দেখিতে গিয়াছে। সেই পথেই তাহার বাঁশিটি বাজাইতে বাজাইতে চলিয়াছিল—পু-পু-পু-পু!

অকস্মাৎ জ্যোৎস্না মেঘে ঢাকিয়া অন্ধকার হইয় গেল।

মানিক ছুটিতে শুরু করিল।

সেও শুনিতে পাইতেছে বড়মা ডাকিতেছে, বাবা ডাকিতেছে, জ্যাঠা ডাকিতেছে, মা। ডাকিতেছে মানিক! মানিক! মানিক! মানিক!

চণ্ডীমণ্ডপ হইতেই তাহারা ডাকিতেছে তাহাতে তাহার সন্দেহ নাই। সে ছুটিতে ছুটিতে পথের বাঁকে দাঁড়ায়, রাস্তাটা চিনিয়া লয়, আবার চলিতে শুরু করে, একবার দুইবার হাতের বাঁশিটা বাজাইয়া লয়।

চণ্ডীমণ্ডপের প্রান্তে সে আসিয়া উপস্থিত হইল।

চণ্ডীমণ্ডপে তখন বড় বউ মাথা ঠুকিতেছে।–আমার মানিককে ফিরে দাও। আমার মানিককে ফিরে দাও।

মানিক উল্লাসের সঙ্গে বাঁশিতে ফুঁ দিয়া চণ্ডীমণ্ডপে বড় মায়ের কাছে দাঁড়াইল।

ওদিকে ঝুমঝম করিয়া বৃষ্টি নামিয়া আসিল।

পরদিন সূর্য উঠিলেন মনোহররূপে।

বর্ষণসিক্ত রাত্রির শেষে কাটাকাটা মেঘের ফাঁকে উঁকিঝুঁকি মারিয়া পূর্বাকাশ লালে লাল করিয়া পশ্চিম আকাশে রামধনু ঝাঁকিয়া পৃথিবীকে বরবর্ণিনীর মত সাজাইয়া দিয়া দিনের ঠাকুর হাসিতে হাসিতে আবির্ভূত হইলেন।

মণ্ডলবাড়ির সামনে তখন মণিলাল বিদায় লইতেছে।

যে টোপর-দেওয়া গাড়িখানায় বড় বউয়ের যাইবার কথা, সেই গাড়িখানাতেই মণিলাল একা বাড়ি ফিরিতেছিল।

সেতাব তামাক খাইতেছিল। মণিলাল হাসিয়া বলিল, মাকে কি বলব? শুধাবে তো কি হল? কাদু এল না ক্যানে?

সেতাব বলিল, বলবে! একটু ভাবিয়া লইয়া বলিল, তেনার জামাইকে ভূতে পেয়েছিল। আর কি বলবে? ভূত ছেড়ে গেল। পাঠালে না।

বড় বউ বাড়ির ভিতর হইতে মানিককে কোলে করিয়া আসিয়া বলিল, যাব রে যাব। বলবি মাকে, এই কোজাগরী লক্ষ্মীপুজোর পরই যাব; আমি, তোর জামাইদাদা দুজনাতেই যাব। লসম্বন্ধ করতে যাব। তোর বিয়ের সম্বন্ধ নিয়ে যাব। বলবি, কনে খুব ভাল। বেশ ডাগর। মায়ের সইয়ের মেয়ে। পুঁটি! তোর জামাইদাদা তো পাগল—

সেতাব বলিল, এই দেখ! এই দেখ! রাধে-রাধে-রাধে! কি যে বল!

বড় বউ হাসিতে লাগিল।

ঠিক এই সময়ে মহাতাপ আসিয়া হাজির হইল। তাহার সর্বাঙ্গে কাদা। মাথায় ব্যান্ডেজ ভিজা, চুল ভিজা, কাঁধে কোদাল। সে ইহার মধ্যে কখন মাঠে গিয়াছিল। সে নিজে মাঠের আল ভাঙিয়া দিয়াছিল; সেই কথা মনে পড়িয়া সে স্থির থাকিতে পারে নাই।

কৰ্কটে ছরকট, সিংহে শুকা, কন্যা কানে কান,
বিনা বায়ে তুলায় বর্ষে কোথা রাখিবি ধান।

কৰ্কট অর্থাৎ শ্রাবণে জলে জল ছরকট করিয়া দিলে, সিংহ অর্থাৎ ভাদে শুকা–রৌদ্র হইলে, কন্যা অর্থাৎ আশ্বিনে আল ভরিয়া কানায় কানায় জল থাকিলে ও তুলা অর্থাৎ কার্তিকে বিনা বাতাসে বর্ষণ হইলে ধান রাখিবার জায়গা কুলায় না খামারে। আশ্বিনে জমির আল কাটা থাকিলে চলে?

ওই খনার বচনটাই চাষীরা এমন দিনে গানের সুরে গাহিয়া বলে—

কৰ্কট ছরকট, সিংহে শুকা, কন্যা কানে কান,
বিনা বায়ে তুলা বর্ষে কোথায় রাখবি ধান,
বউ কনে যতন করে নিকাও অঙনখান।

গল্পের বিষয়:
উপন্যাস

Share This Post

সর্বাধিক পঠিত