নিচে নামার সিঁড়ি

নিচে নামার সিঁড়ি

আবদুল কাদির কি পাগল হয়ে গেছে?তার এরকম ব্যবহারের অর্থ কী? ভারি অবাক কাণ্ড!

যে আবদুল কাদিরের কথার নড়চড় হয় না, যে তার জানি দোস্ত সেই শৈশবকাল থেকে, সে কী না ‘আমি আগামীকালই আবার আসছি’ বলে আজ ছ’মাস ধরে হাওয়া।

অথচ এমন না যে সে ঢাকা শহরে নেই। তাকে মাঝে মাঝেই এখানে-সেখানে পথ চলতে দেখা যায়। যেমন সেদিন ফার্মগেটের মোড়ে দেখা গেল। তাকে চেনা দায়। তাই বলে আবদুর রহমানকে ফাঁকি দেয়ার মতো তার ক্ষমতা হয় নি। আর একটু হলেই আবদুর রহমান তার হাত চেপে ধরত। কিন্তু ভিড়ের ধাক্কায় সে মওকাটুকু পাওয়ার আগেই আবদুল কাদির জনারণ্যে মিলিয়ে গেল।

আরও একদিন তার সাথে বায়তুল মোকাররমের সামনে দেখা। ঈদের বাজার। শাপলা চত্বর থেকে প্রেস ক্লাব পর্যন্ত একটা জনসমুদ্র যেন স্থির হয়ে আছে। তার ভেতরে দেখা গেল আবদুল কাদির দাঁড়িয়ে আছে। তার পেছনে একটা স্ন্যাকবার। কী যেন একটা খুব চিবিয়ে চিবিয়ে খাচ্ছে সে। ভিড় ঠেলে সেদিকে যাওয়া প্রায় অসম্ভব। তাই রাস্তার এপার থেকেই চেঁচিয়ে উঠে আবদুর রহমান আবদুল কাদিরকে ডাক দিল।

কিন্তু তার গলার স্বর যেন মহাসমুদ্রের গর্জনের ভেতরেই টুক করে মিশে গেল। আর ভিড়ের মধ্যে হারিয়ে গেল আবদুল কাদির।

অথচ এতদিনে আবদুর রহমানের কাছ থেকে আবদুল কাদিরের নেয়া পাঁচ হাজার টাকার ধার প্রায় শোধ হয়ে যাওয়ার কথা। তবে কি সে ধার শোধ দেয়ার ভয়ে পালিয়ে বেড়াচ্ছে?

কিন্তু তা কী করে হয়? আপন মনে ভাবে আবদুর রহমান।

তার ছেলেবেলার বন্ধু আবদুল কাদিরকে সে কি চেনে না?

আবদুর রহমানের কাছ থেকে আবদুল কাদির প্রায় ছ’মাস আগে পাঁচ হাজার টাকা ধার হিসেবে নিয়েছিল। ছেলের অসুখের চিকিৎসা করাবে বলে নিয়েছিল। সেদিন বাক্যালাপটা ছিল এরকম :

দোস্তো।

বলো।

কিছু মনে করবে না তো?

কী?

বড় বিপদে পড়েছি

কী?

ছেলেটার অসুখ জানো

কার ছেলের? অন্যমনস্কের মতো বলে উঠেছিল আবদুর রহমান।

আমার। আমার ছেলে। একটাই তো সন্তান আমাদের।

ওঃ, সুমনের? কী অসুখ? সচকিত হয়ে উঠেছিল আবদুল কাদির।

পেটের। শুকিয়ে একেবারে হাড্ডিসার হয়েছে দোস্ত। শরীরে কিসের যেন অভাব। দুধ সহ্য করতে পারে না। তাছাড়া সব সময় বুক ঘড়ঘড় করে। ও পেটে থাকার সময় ওর মায়েরও স্বাস্থ্য ভালো ছিল না। এখন ছেলেটা ঠিকমতো সুস্থ হয়ে উঠলে হয়।

কাকে দেখাচ্ছো? আবদুর রহমান একটু উদ্বিগ্ন হয়ে জিজ্ঞেস করল।

পিজির প্রফেসর কে। কিন্তু টাকার বড় অভাব। জানো তো যে চাকরি করি তাতে ঘরভাড়া দিয়ে হাতে আর বিশেষ কিছু থাকে না।

বল কি।

হ্যাঁ, ভাই। তাই তোমার কাছে কিছু টাকা ধার চাই।

এবার একটু ইতস্তত করে আবদুর রহমান বলল, কত টাকা, বল-তো?

তারা দু’জনে এতক্ষণ দোকানে বসে কথা বলছিল। এই প্রথম কথার মাঝখানে আবদুর রহমান নড়েচড়ে বসল। তার ভয় হল, ধারের অংকটা না বিদঘুটে কিছু হয়। এমনিতে তার ব্যবসা বর্তমানে তেমন ভালো যাচ্ছে না। হয়তো তখন বাধ্য হয়ে না করে দিতে হবে।

আবদুল কাদির এতক্ষণ চোখের দিকে তাকিয়ে কথা বলছিল। এবার চোখ নামিয়ে বলল, হাজার পাঁচেক টাকা ভাই, দিতে পারবে?

টাকার অংক শুনে আবদুর রহমান মনে মনে হাঁফ ছেড়ে বাঁচল। মনে মনে ভাবল, যাক, তবু রক্ষা। হাজার দশেক চাইলেও পারত। আজকাল দশ হাজার টাকারই বা মূল্য কী?

পরমুহূর্তে নানা খাপছাড়া চিন্তা তার মনে নাড়াচাড়া হতে শুরু করল।

দেশের এখন এমন অবস্থা যে টাকা আজকাল বাতাসে ওড়ে। যে ধরতে পারে, সে পারে। আর যে পারে না, সে পারে না।

আবদুর রহমানের মুখের ভাবে সম্মতির লক্ষণ বুঝতে পেরে বলে উঠল, বাঁচালে ভাই। তোমার দেয়া এ ঋণ আমি মাস তিনেক বাদে প্রতি মাসে হাজার টাকা করে শোধ দিয়ে দেব। মাস পাঁচেক লাগবে শোধ দিতে। তুমি কিন্তু ভাই কিছু মনে করতে পারবে না।

২.

আবদুর রহমান জানত আবদুল কাদিরের কথার নড়চড় হয় না। তবে সে যে এতখানি গরিব হয়েছে তা জানত না। আগে সে খবরের কাগজে একটা চাকরি করত। তারপর কী যেন সেখানে হল, চাকরি ছেড়ে দিল। আবার শুনছে ইদানীং নাকি নতুন এক অফিসে কাজ শুরু করেছে। কাজটা এখনও নাকি পাকা হয়নি। আর পাকা হলেই বা কি, কাদিরের মনের ভেতরে থিতু ভাব না এলে কোনো চাকরিই সে করতে পারবে না।

তবে আবদুল কাদিরকে সে সেই ছাত্রজীবন থেকে দেখে আসছে। স্কুলজীবনে আবদুল কাদির ছিল আবদুর রহমানের সহপাঠী। লেখাপড়ায় বলতে গেলে ছিল সে ফার্স্টক্লাস। কিন্তু ঐ যা হয়। গরিব চাষির ঘরে মেধার মূল্য কতটুকু। বাবা তাকে বারবার চাষের খেতে টেনে নিয়ে গেলেও আবদুল কাদির পালিয়ে চলে আসত স্কুলে। আর মাস্টাররাও যত্ন করে পড়াতেন। কে বলে মাস্টাররা পড়ান না? প্রতিভার সাক্ষাৎ পেলে কোন মাস্টার পড়ান না?

তবে আবদুল কাদিরের ক্লাসের মোটামুটি সব ছেলেই ছিল লেখাপড়ায় ভালো। যে দু-চারজন খারাপ ছিল তাদের ভেতরে আবদুর রহমান ছিল একজন। অংকের বণিক বাবু আবদুর রহমানের মাথায় গাট্টা মারতে মারতে মাথার একপাশ যেন বসিয়ে দিয়েছিলেন। তবে আবদুর রহমান যে বুদ্ধিহীন ছিল তা ঠিক নয়, বরং অন্যান্য বাস্তব সব ঘটনাবলির ভেতর দিয়ে আবদুর রহমানের একটা বিশেষ বুদ্ধির পরিচয় পাওয়া যেত। আর তা ছিল তার ধৈর্য। একভাবে কোনোকিছুর পেছনে লেগে থাকা। এবং ক্ষিপ্রতার সাথে কোনো সিদ্ধান্তে পৌঁছোনো।

এর ফলে যা হওয়ার তাই হল। তার ক্লাসের অন্য বন্ধুরা বড় হয়ে নানা প্রকারের উচ্চশিক্ষায় ব্যস্ত হয়ে পড়ল। স্কুলের বড় ক্লাসে উঠে সে লেখাপড়া ছেড়ে দিয়ে পৈতৃক ব্যবসায় লেগে গেল। তার বাবার ছিল বেশ বড় একটা ওষুধের দোকান। একজন কর্মচারী ছাঁটাই করে আবদুর রহমান তার বাবার কাজে সহায়তা করতে লাগল।

তারপর আরও কিছুদিন বাদে তার বন্ধুবান্ধবরা যখন নানাবিধ কারণে শহর ছাড়ল, তখন আবদুর রহমান বেশ পোক্ত একজন ব্যবসায়ী হয়ে উঠেছে।

সে সময় তার স্কুলের পুরনো টিচার, অংকের শিক্ষক বণিক বাবুর ক্যানসার ধরা পড়ল। তখন বণিক বাবু রিটায়ার্ড। এবং আগের চাইতেও গরিব। তাকে অর্থ সাহায্য করার মতো এমন কেউ নেই। বণিক বাবুর নিজের ছেলেমেয়েরা তখন ছোট। আবদুর রহমান এ সময় অংক স্যার বণিক বাবুর একমাত্র ভরসা। বণিক বাবুকে সে অর্থ সাহায্য করত ঠিকই, কিন্তু এ নিয়ে তার মনে এক জিঘাংসামূলক আনন্দের সঞ্চার হতো মাঝে মাঝেই।

বণিক বাবুর মৃত্যুর আগে শেষ যেবার দেখা করতে গিয়ে সে টাকা দিয়ে এসেছিল, ফিরে আসার আগে উচ্চকণ্ঠে জিজ্ঞেস করেছিল, সবুর কি আপনাকে দেখতে এসেছিল, স্যার?

না, বাবা।

বদরুল হাসান এসেছিল? আপনি তো জানেন, বর্তমানে সে কলেজের অধ্যাপক হয়েছে?

না, বাবা।

হরিপদ এসেছিল?

ওর কথা আর বলো না, ও একটা অমানুষ।

কাদির এসেছিল, স্যার?

মলিন মুখে বণিক বাবু উত্তর দিয়েছিলেন, নাঃ।

কথা বলতে গিয়ে তার গলার স্বর তখন ক্ষীণ হয়ে এসেছে।

নিয়ামত এসেছিল, স্যার?

না, না।

স্যারের কথা শুনে এবার হেসে উঠেছিল আবদুর রহমান। এরপর করুণায় গলার স্বর বিগলিত করে বলেছিল, ওরা আসবে কী স্যার। ওদের নিজের সংসার নিয়েই টানাটানি। যা রোজগার করে তাতে নুন আনতেই পান্তা ফুরোয়। এখানে এলে আপনাকে সাহায্য করতে হবে বলেই হয়তো কেউ আসে না। এরা সব আপনার ভালো ছাত্র ছিল তো স্যার। অংক ভালো বোঝে!

৩.

টাকা ধার করার ঠিক পাঁচ দিন বাদে একদিন ফোন করল অবদুল কাদির। সে সময় দোকানে ভিড় কম ছিল।

আবদুর রহমান দোকানের পেছনে গিয়ে সবেমাত্র ক্যাশ বাকসোটা খুলেছে, ওমনি ফোন এল।

ফোন তুলে আবদুর রহমান বলল, হ্যালো!

কে, রহমান?

হ্যাঁ, তুমি কাদির?

হ্যাঁ।

কী ব্যাপার দোস্তো, ভালো আছো তো?

হ্যাঁ, আছি মোটামুটি। কিন্তু আমার ছেলেটাতো ভালো হচ্ছে না। কী যে করি, ভাই। দিনের ভেতরে কতবার যে বমি করে, তার হিসাব নেই। ওষুধ দিচ্ছি। নিয়মিত ডাক্তারা দেখছে। ইনভেস্টিগেশন যা যা করতে বলছে, সব করাচ্ছি। ঐটুকু ছোট বাচ্চাকে গতকাল স্যালাইন দিতে হয়েছে। এসব চোখে তাকিয়ে দেখা কী যে কষ্ট ভাই।

আবদুল কাদিরের কথা শুনে মন খারাপ হল আবদুর রহমানের। তার আবার কোনো সন্তানাদি নেই। কিন্তু একটি সন্তানের জন্য মনে হাহাকার আছে। বিশেষ করে তার স্ত্রীর ভেতরে এটা বেশি।

একটু চুপ করে আবদুর রহমান বলল, দরকার হলে হাসপাতালে ভর্তি করে দাও না।

না, সেটা সম্ভব নয়। এর আগে দু’বার করে হাসপাতালে নিয়ে গিয়েছিলাম, চার-পাঁচ দিন করে ভর্তিও ছিল। একটু ভালো হতেই ওরা ছেড়ে দিল। বলল, কোনো কোনো বাচ্চার এরকম অসুখ হয়, আবার ঠিক হয়ে যায়।

এদিকে তোমার ভাবী আবার নার্ভাস মানুষ। স্নায়ু দুর্বলতায় ভোগে। বাচ্চার অবস্থা দেখে সে এখন ঝাঁড়-ফুঁক করাচ্ছে। মাদুলি, তাবিজও নেয়া হয়েছে।

আবার এদিকে দেদার পয়সা খরচ হচ্ছে। দোয়া করো ভাই, ছেলেটা যেন বাঁচে।

হাঁফাতে হাঁফাতে কথা বলতে লাগল আবদুল কাদির।

একসময় ফোন অফ হয়ে গেল।

আবদুর রহমান বুঝল কোনো দোকান থেকে ফোন করছিল আবদুল কাদির। পয়সা শেষ, তাই লাইন কাটা গেল।

ফোন রেখে আবদুর রহমান চোখ তুলে দেখল মোটা একটা রেকসিনের ব্যাগ হাতে করে দোকানে এসে ঢুকেছে কেএস সোবহান। লোকটা মেডিকেল রিপ্রেজেনটেটিভ। নামকরা এক কোম্পানিতে চাকরি করে। চেহারাটা নরম এবং লাজুক। তবে অন্যদিকে স্মার্টনেস আছে। যার জন্য বাপের দেয়া নাম সোবহান মোল্লা কেটে কেএস সোবহান করেছে।

তার ভিজিটিং কার্ডে এ নামই ছাপানো।

সোবহান দোকানের কাউন্টারে দাঁড়িয়ে মৃদু স্বরে জিজ্ঞেস করল, ভালো আছেন, রহমান সাহেব?

ভালো, আপনি কেমন?

এই চলে যাচ্ছে, আপনাদের দোয়া। বলল সোবহান।

চলে গেলেই ভালো, আজকাল জীবন ঠিকমতো চালানো যে কী মুশকিল, তা তো আমি জানি।

ঠিক বলেছেন ভাই, এই তো দেখুন না, আমাদের কোম্পানিতে আবার নতুন এরিয়া ম্যানেজারের নিয়োগ হল, অথচ আমার এবার হয়ে যাওয়ার কথা ছিল। কিন্তু এখানেও সেই নেপোটিজম। ভাবছি পরেরবার চাকরিতে উন্নতি না হলে এ কোম্পানি ছেড়ে দেব।

তার কথা শুনে একটু যেন উদ্বিগ্ন হয়ে আবদুর রহমান বলল, ছেড়ে দেবেন মানে? ছেড়ে দিয়ে কোথায় যাবেন?

উত্তরে কে এস সোবহান বলল, কোথায় এখনো ঠিক করিনি। তবে দু-তিনটে অফার আছে।

কথার ফাঁকে ফাঁকে আবদুর রহমান আসল প্রসঙ্গের জন্য অপেক্ষা করতে লাগল। কারণ সে জানত কে. এস. সোহবান খামোখা তার দোকানে বেড়াতে আসেনি।

একটু পরে সে বলল, ভালো চাকরি যেখানে সুবিধে হয়, সেখানে করাই ভালো।

তা ঠিক বলেছেন। তবে আজ কিছু মাল এনেছি আপনার জন্য। বলল এবার সোবহান।

কোন মাল? সেদিন যেগুলোর কথা বলেছিলাম, সেগুলো?

কৌতূহলী হয়ে জিজ্ঞেস করল আবদুর রহমান।

আজ বহুদিন হল কে এস সোবহানের সাথে তার একটা যোগাযোগ আছে।

উত্তরে সোবহান বলল, হ্যাঁ। তবে বেশি এখন দিতে পারব না। খুব কড়াকড়ি। আবার যখন নতুন চালান আসবে দেবো। তাছাড়া ডাক্তাররাও খুব ঘাওরা, যে কোনো ওষুধ লেখার আগে সরাসরি স্যাম্পল চায়।

কথা শুনে আবদুর রহমান বুঝদারের মতো বলে উঠল, তা তো চাইবেই। চিরদিন মুফতে পেয়ে এসেছে। এখন আর কি দেখছেন, আগে তো ডাক্তারদের জন্য বিদেশ থেকে দামি দামি সব উপহার আসত। বিদেশি কোম্পনিরা খুব দামি সব উপহার পাঠাত। বছর শেষে এমন সব সুন্দর ক্যালেন্ডার পাঠাত যেগুলোর ছবি ফ্রেমে বাঁধিয়ে ডাক্তাররা তাদের চেম্বার সাজাত। এখন তো দেশি সব কোম্পানি বিদেশ থেকে কাঁচামাল এনে ওষুধ তৈরি করছে। এখনও প্রিমিটিভ অবস্থায়। তাদের জান এত বড় না যে মন খুলে ডাক্তারদের উপহার দেবে!

আবদুর রহমানের কথা শুনে কে এস সোবহান হাসল, হাসিটা কোষ্ঠকাঠিন্যের মতো দেখাল। কিন্তু সে গলার সুর ধরে রেখে বলল, এগুলো অবশ্য বিদেশি ওষুধ। এর আগে আপনাকে কিছু কোরামিন ইনজেকশন দিয়েছিলাম। সেগুলো কি সব শেষ হয়ে গেছে? এগুলোও সেই কোরামিন। বর্তমানে দেশে এভাইলেবল না। তবে আমাদের স্টকে আছে প্রচুর পরিমাণে। আমি কিন্তু একটারও কভার দেব না। কারণ সব অ্যামপুলে ফিজিসিয়ান স্যাম্পলের ছাপ মারা ছিল। তাই এখন বোতলের গায়ে কিছু লেখা নেই।

তার কথা শুনে আবদুর রহমান তড়িঘড়ি করে বলে উঠল, এ নিয়ে আপনি চিন্তা করবেন না। এসব আমি ম্যানেজ করে নেব। তবে এক্সপায়ারি ডেটের কোনো ইনজেকশন দেবেন না। তাহলে ঘাপলা হতে পারে।

তার কথা শুনে কে এস সোবহান বলে উঠল, আরে না, না। এখনও ছ’মাসের জন্য নিরাপদ। তারপরও যদি স্যাম্পল থেকে যায় তো আরও ছ’মাস পর্যন্ত বাড়াতে পারেন। এগুলো হচ্ছে বিদেশি ওষুধ। এক্সপায়ারি ডেট যা লেখা থাকে তার চেয়েও ছ’মাস বা এক বছর বেশি পর্যন্ত ব্যবহার করা যায়।

উত্তরে আবদুর রহমান চিন্তিত মুখে বলে উঠল, আপনার কথা শুনে গতবার আমি অ্যান্টিবায়োটিকগুলোর মেয়াদ ছ’মাসের মতো তারিখ বাড়িয়ে দিয়েছিলাম, কিন্তু তারপরও তো কিছু স্যাম্পল থেকে গিয়েছে।

একথায় কে এস সোবহান বলে উঠল, কোনো অসুবিধে নেই। আপনি ওগুলো আমাকে ফেরত দিয়ে দিতে পারেন আজ। অথবা নিজেও ডেসট্রয় করে ফেলতে পারেন।

এ কথার উত্তরে মাথা নেড়ে আলতো করে সায় দিল আবদুর রহমান। কিন্তু ওষুধগুলো ফেরত দেওয়ার তাগিদ অনুভব করল না। কারণ সে মনে মনে জানত ওষুধের চালান বাজার থেকে নিঃশ্বেষ না হওয়া পর্যন্ত এক্সপায়ারি ডেট জীবনে আসবে না। তবে চালু ওষুধ শেষ হতেও দেরি হবে না।

এসব কথা হচ্ছিল দোকানের পেছনে একটা আমকাঠের চৌকিতে বসে। সেখানে একটা তিন সিটের সোফাও আছে। অনেক আগে খুব সস্তায় পেয়ে কিনে রেখেছিল আবদুর রহমান। রেক্সিনের কভার দেয়া পুরনো সোফা এখনও বেশ কাজে দেয়।

টাকা হাতে নিয়ে ফিরে যাওয়ার সময় কে এস সোবহান ইতস্তত করে বলল, দেখেন রহমান সাহেব, আজকের দামটা ঠিক হল না। ট্রেড প্রাইসের অনেক নিচে আপনাকে আমি স্যাম্পল বিক্রি করি, আপনি যা দেন তাতে করে আমার রিস্ক কভার হয় না!

তার কথা শুনে আবদুর রহমান হাসল। অমায়িক হাসি। হাসতে হাসতে বলল, মন খারাপ করবেন না সোবহান সাহেব, বিক্রিবাটা কম, পরেরবার পুষিয়ে দেব। কোরামিন ইনজেকশন ক’জন ব্যবহার করে? ক’জন মৃত্যুমুখী মানুষ কোরামিন ব্যবহারের সুযোগ পায়?

৪.

দোকান ছেড়ে কে এস সোবহান চলে গেলে আপন মনে খুব খানিকটা হাসল আবদুর রহমান। মনে মনে বলল, ডাক্তারদের ন্যায্য স্যাম্পল গোপনে হাতিয়ে নিয়ে বিক্রি করে খাচ্ছে আবার রিস্ক কভারের কথা বলে। হা, হা। সত্যি কথা বলতে ও যা হাতে পায়, তার সবটাই তো ওর লাভ। একেকজন মেডিকেল রিপ্রেজেনটেটিভের বাসা আজকাল মেডিসিনের স্যাম্পল দিয়ে সয়লাব। ওগুলো ডাক্তারদের স্যাম্পল। নিজেরা আজকাল পয়সা দিয়ে ওষুধ তো কেনেই না, তাদের আত্মীয়স্বজনেরও কিনতে হয় না!

কথাগুলো ভাবতে ভাবতে দোকানের পেছন থেকে বাইরে বেরোবার সময় তার টেলিফোন বেজে উঠল। টেলিফোন তার দোকানের কাউন্টারের পেছনে তালা লাগানো অবস্থায় থাকে। কারণ মানুষের স্বভাব হচ্ছে চোখের সামনে টেলিফোন দেখলে একটু ফোন করতে চাইবে!

তাছাড়া কোনো কাস্টমারও টেলিফোন ব্যবহার করতে চাইলে সে মনে মনে খুব নাখোশ হয়। মাঝে একবার এক টাকা ফি নিয়ে বাইরের মানুষকে টেলিফোন করতে দিত। তাতেও অনেক ঝামেলা। কেউ একবার ফোন করতে শুরু করলে তার আর ছাড়াছাড়ি নেই।

টেলিফোন বজে উঠতে আবদুর রহমান তার বন্ধু আবদুল কাদিরের কথা মনে করলো। এ ফোন নিশ্চয় তার। নাঃ বন্ধুটা তার ছেলেটিকে নিয়ে বড় বিপদে পড়ে গেছে। মনে মনে ভাবতে ভাবতে সে ফোন তুলে হ্যালো বলল।

কিন্তু না, আবদুল কাদির নয়। রেহানা।

রেহানার গলার স্বর তারের ওপ্রান্ত থেকে ভেসে এল। যেমন শান্ত তার গলা, তেমনই গম্ভীর।

এরকম গলা শুনলে আবদুর রহমানের পেটের ভেতরে কেমন যেন গুড়গুড় করে ওঠে। রেহানাকে সে এখনও ভয় করে।

তবে কোনোদিন না কোনোদিন তাকে সাহসী হতে হবে। কীভাবে সেটা হবে সে বিষয়ে যদিও তার মনে কোনো নির্দিষ্ট রূপরেখা নেই।

ভাত খেতে বাসায় ফিরবে না? রেহানা ওপ্রান্ত থেকে গোটা গোটা অক্ষরে বলে উঠল।

সাতক্ষীরার মেয়ে হলেও রেহানা ভালো বাংলায় কথা বলতে চেষ্টা করে।

ওঃ, কটা বাজে? একটু যেন বিহ্বল স্বরে বলে উঠল আবদুর রহমান।

দুটো তো বেজে গেছে। আবার আজ বিকেলে ছোট কাকির বাসায় দাওয়াত। মিনুকে আজ দেখতে আসবে।

স্ত্রীর কথা শুনে মনে মনে একটু বিরক্ত হল অবদুর রহমান। এই একটা ব্যাপার সে ভালোবাসে না। আর তা হল অযথা আত্মীয়তা।

কিন্তু রেহানার ভয়ে মনের কথা সে ঠিকমতো কোনোদিন বলতে পারে না। উল্টো সে বরং বলে উঠল, ওঃ, তাই নাকি?

কথাটা বলে তার মনে একটু ভয় হল। রেহানার বিরাগভাজন হওয়ার ভয়।

আত্মীয়স্বজনের খোঁজখবর রাখা রেহানার একটা বাতিক বলা যেতে পারে। অথবা এসব নিয়ে থাকতেই যেন সে ভালোবাসে। অবশ্য তাছাড়া সে সময় কাটাবেই বা কি করে। দূর সম্পর্কের আÍীয়রাও রেহানার নজর থেকে সরতে পারে না। এ জন্য রেহানার যথেষ্ট সুনাম আছে।

কিন্তু এ জন্য আবদুর রহমানকে যে কতখানি খেসারত দিতে হয় তা কারও জানা নেই।

স্ত্রীর কাছে আবদুর রহমান কেমন যেন অপ্রস্তুত বোধ করে। আবার রেহানা নিজেও যেন একটা দূরত্ব বজায় রেখে সংসার করতে ভালোবাসে। আজ দশ বছর তাদের বিয়ে হয়েছে অথচ এখন পর্যন্ত কোনো সন্তানাদি হয় নি।

কেন যে হয় নি, তাও তারা জানে না। ভবিষ্যতে হবে কি-না তাও জানে না।

অথচ আবদুর রহমান এর মধ্যেই চারতলা ভিতের ওপর দোতলা বাড়ি করে বসে আছে কাঁঠালবাগানে।

আবদুর রহমান এমনিতে কোলাহল পছন্দ করে না। হৈ চৈ, বিয়ে, আকিকা, পানচিনি, গায়ে হলুদ, সভা-সমিতি এসব তার দু-চোখের বিষ।

অথচ তার স্ত্রী রেহানা হৈ চৈ ছাড়া যেন থাকতে পারে না। এটা যে তার বাচ্চা না হওয়ার দুঃখ ভুলে থাকার একটা চেষ্টা, তা অবশ্য আবদুর রহমান জানে। এ ব্যাপারে তার নিজের কিছু অপরাধবোধও কাজ করে। অনেক ডাক্তার এবং ওষুধপত্র করেও এখন পর্যন্ত সুসংবাদ পায় নি। সন্তান না হওয়ার মূল দায়িত্ব কেন জানি সে নিজের ঘাড়েই তুলে নিয়েছে।

একটু ইতস্তত করে এ প্রান্ত থেকে আবদুর রহমান বলল, আজ আর বাড়ি যেতে পারব না রেনু। অনেক কাজ আছে।

তাহলে খাবে কোথায়?

উত্তরে আবদুর রহমান বলল, ভাত পাঠিয়ে দিতে পার বাড়ি থেকে।

রেহানা বেশ সহজেই তার প্রস্তাব মেনে নিয়ে বলল, তাহলে ঠিক আছে। বিকেলে সময় হলে আমি ছোট কাকির বাসায় চলে যাব। তুমি কি দোকান থেকে সোজা ওখানেই চলে যাবে? উত্তরে আবদুর রহমান তড়িঘড়ি করে বলল, সেই ভালো। আমি দোকান থেকে সোজা ওখানেই চলে যাব। রাতে একসাথে বাড়ি ফিরব।

আচ্ছা, বলে টেলিফোন রেখে দিল রেহানা।

৫.

দোকানের কর্মচারীদের আবদুর রহমান একেবারে বিশ্বাস করে না। যদিও দু’জন কর্মচারী সব সময় তার দোকানে থাকে, তবু তারা কেউ পার্মানেন্ট নয়। আজ আছে কাল নেই। মাসের শেষে হিসাব মেলাতে গেলে প্রায় দেখে ওষুধ বিক্রি শেষ কিন্তু টাকার হিসাবে গরমিল। ভাগ্যিস তসির মিয়া ছিল। কিন্তু সে আসে সন্ধ্যার পর। সেই মোটামুটি সবকিছু সামলে রাখে। তাছাড়া কর্মচারীদের পেট-পাতলা স্বভাবও সে পছন্দ করে না। সে যে মেডিকেল রিপ্রেজেনটেটিভদের কাছ থেকে অল্প দামে ওষুধ কেনে ড্রাগ কোম্পানিদের ফাঁকি দিয়ে এ খবর একবার রটে গেলে তার ব্যবসার ক্ষতি হবে। এমনিতে সে একটু উদ্বিগ্ন স্বভাবের মানুষ। শুধু তাই না, মানুষকে সে সহজে বিশ্বাস করতেও পারে না।

তার দোকানে প্রতিদিন বিকালে পর্দাঘেরা একটা রুমে একজন ছোকরা ডাক্তার এসে বসে। সদ্য পাস করা ডাক্তার। এখনও বিয়ে হয়নি। তবে মনে হয় বেশ বুদ্ধিমান। আবদুর রহমানের ভাষায়, বেশ চতুর। তাই আবদুর রহমান মনে মনে তাকে অপছন্দ করে। আরও অপছন্দ এ কারণে যে তার বন্ধু আবদুল কাদিরের সঙ্গে এ ডাক্তারের বেশ ভাব আছে। একদিন দু’জনকে নিজেদের ভেতরে হেসে হেসে ইংরেজিতে কথাবার্তা বলতেও সে শুনেছে। আবদুর রহমানের মনে কোথায় যেন এক দুর্বলতা আছে। স্মার্ট বা দৃঢ় চরিত্রের কোনো মানুষকে দেখলে সে মনে মনে নার্ভাস বোধ করে।

তারওপর এ ডাক্তার রিপ্রেজেনটেটিভদের কাছ থেকে পাওয়া ওষুধের স্যাম্পলগুলো ফার্মেসিতে দান না করে রোগীদের বিলিয়ে দেয়! এতে আবদুর রহমানের ব্যবসায় ক্ষতি। ডাক্তারকে বিনা পয়সায় বসতে দিয়েছে, নাকি?

একবার দোকানে তার ছোট শালাকে বসিয়েছিল, কিন্তু তার ভাবভঙ্গি এবং চালবাজ ব্যবহার দেখে এত ঘাবড়ে গেল যে দোকান থেকে তাকে রাতারাতি সরিয়ে ফেলে তবে মনে শান্তি এল। এ নিয়ে রেহানার সঙ্গে তার খিটিমিটি বাঁধল বটে, তবে সেটা স্থায়ী হতে পারেনি।

নিজেকে মনে মনে মাঝে মাঝে বিচার করতে চেয়েছে আবদুর রহমান। ছেলেবেলায় স্কুলে গিয়ে পড়া না পারার জন্য মাস্টারদের অতিরিক্ত মারধর এবং ব্যঙ্গ-বিদ্রুপের জন্য হয়তো তার ব্যক্তিত্বে কোনো চোট লেগে থাকবে, যে জন্য নিজের মনের ভেতরেই নিজেকে সে খাটো চোখে দেখতে শিখেছে, যদিও বাইরে সে একজন টাফ বিজিনেস ম্যান। ওষুধ কোম্পানিগুলোর সাথে তার জমাট লেনদেন। ওষুধ তো সে কোম্পানির কাছ থেকে কেনেই, তারওপর কিছু ওষুধ অবৈধভাবে তার কাছে বিক্রি করে রিপ্রেজেনটেটিভরা। বিশেষ করে ডাক্তারদের স্যাম্পলগুলো। এ খবর কোম্পানির হেড অফিসও জানে, কিন্তু এসব খবর তারা ওভারলুক করে। এতসব দেখতে গেলে ব্যবসা চালানো যায় না।

কোন ওষুধ কখন বাজারে ছাড়তে হবে, কোন ওষুধ কখন লকারে ভরে ফেলতে হবে, এবং ইমারজেন্সির সময় বেশি দামে বাজারে ছাড়তে হবে, এসব ব্যাপার আবদুর রহমানের নখদর্পণে। তার বাবার কাছ থেকে সব শেখা।

এখনও এদেশে ওষুধের ইন্ডাস্ট্রি বা ওষুধ তৈরির কারখানা সেভাবে গড়ে ওঠেনি। তবে জোর চেষ্টা চলছে। ভালো করে গড়ে উঠতে আরও কিছু দিন লাগবে।

এখন তো বিশেষ বিশেষ ওষুধের জন্য বিদেশের দিকে তাকিয়ে থাকতে হয়। চেষ্টা করা হচ্ছে বিদেশ থেকে কাঁচামাল আমদানির। বাইরের দুনিয়ার নামকরা ওষুধ কোম্পানিগুলোও চায় তাদের কাঁচামাল এদেশে বিক্রি করে তাদের ছায়ায় রেখে নতুন কোম্পানি তৈরি করে নতুন নতুন ওষুধ বিক্রি করতে। ততদিন অবশ্য এদেশের মানুষ গিনিপিগ হিসেবে ব্যবহৃত হবে। যখন এদেশ সব ধরনের ওষুধ নিজেরাই তৈরি করতে পারবে বিদেশের মুখাপেক্ষী না হয়ে ততদিনে আবদুর রহমান বুড়ো হয়ে যাবে। এখন অবশ্য সে দোকান ব্যবসায়ী সমিতির ট্রেজারার পদে নির্বাচিত হয়েছে। সে অবশ্য চায়নি, সকলে জোর করে করেছে। জীবনে খুব বড় হওয়ার তাগিদ অনুভব করে না আবদুর রহমান। সেরকম কোনো উচ্চাশা তার নেই। তবে অবশ্যই অর্থশালী হতে চায়। অর্থ, প্রচুর অর্থ তার প্রয়োজন। যদি সংসারে তার সন্তান না-ই আসে, তখন অর্থই হবে তার সন্তান।

৬.

‘আমি আগামীকালই আবার আসছি’ এ কথা বলে আবদুল কাদির সেই যে চলে গেল, আর এল না।

এ ঘটনার আগে যা ঘটেছিল সেটা হল তার ছেলের মৃত্যু।

ছেলের মৃত্যুর ঠিক সাত দিন পরে আবদুল কাদির শেষবারের মতো তার দোকানে এসেছিল। সময়টা তখন সন্ধ্যে।

সেদিন আবার সকাল থেকে ঝিরিঝিরি বৃষ্টি। বৃষ্টির জন্য কামরাঙ্গীর চর থেকে কোনো কর্মচারী আসেনি। তসির মিয়াও দেশে গিয়েছিল। আবদুর রহমান সেদিনও বাড়ি ফেরেনি দুপুরের খাবার খেতে। দোকানে খেয়ে দোকানেই সে একটা লম্বা ঘুম দিয়ে উঠেছিল।

দুপুরে সাধারণত সে ঘুমোয় না। কিন্তু সেদিন ঘুমিয়েছিল বলে ঘুম থেকে ওঠার পর শরীরে একটা অলসতা জড়িয়ে ছিল।

সেদিন সন্ধ্যেও নেমেছিল যেন ধীর পায়ে।

একসময় সন্ধ্যের ছোপ গাঢ় হয়ে এল।

আর তখুনি আবদুল কাদির দোকানে এসে হাজির।

বন্ধুর চেহারা দেখে সেদিন আঁতকে উঠেছিল আবদুর রহমান।

এ কি চেহারা!

গাল তোবড়ানো। দু’চোখ কোটরে বসা। শার্টের ভেতর দিয়ে কণ্ঠার হাড় উঁচু হয়ে আছে। রুক্ষ চুলে পাকার ছোপ বড় ঘন হয়ে বসেছে। কয়েক সপ্তাহের ব্যবধানে যেন আবদুল কাদিরের বয়স দ্বিগুণ বেড়ে গেছে।

আবদুর রহমানের গলা দিয়ে অস্ফুট স্বর বেরোল, একি, কাদির তুমি?

আবদুল কাদির অদ্ভুত শব্দ করে হেসে উঠে বলল, হ্যাঁ, দোস্ত, ছেলেটি আমার মারা গেছে।

তার কথা শুনে যেন হতবাক হয়ে গেল আবদুর রহমান।

কোনো রকমে আবদুর রহমান বলল, বলো কি। কবে?

উত্তর দেয়ার আগে আবদুল কাদির দোকানের একটি মাত্র চেয়ারে পা ঝুলিয়ে বসল।

তারপর বলল, একটা সিগ্রেট দাও।

আবদুর রহমান তাড়াতাড়ি সিগারেটের প্যাকেট এগিয়ে দিল। তারপর একটা ধরিয়ে আপন মনে অনেকক্ষণ ধরে টানল সে। টানতে টানতে ঝোলানো পা দুটি দোলাতে লাগল এদিক-ওদিক। যেন পা নয় , ঘড়ির পেণ্ডুলাম।

একটু পরে সিগারেটটা দূরে ছুড়ে ফেলে সে পকেট থেকে একটা খালি ইনজেকশনের অ্যামপুল বের করে বলল, শালার ডাক্তারের নামে মামলা করব বলে আমি তোমার সাথে পরামর্শ করতে এসেছি। এই ইনজেকশনটা দেয়ার কিছুক্ষণের ভেতরেই ছেলেটি আমার মারা যায়। এই দেখ।

বন্ধুর হাত থেকে অ্যামপুলটা নিয়ে মনে মনে চমকে উঠল আবদুর রহমান। এই সেই কোরামিন। কিছুদিন আগে এই ইনজেকশন তার দোকান থেকেই সাপ্লাই নিয়েছে ছোট কিছু দোকানদার। ইনজেকশনগুলোর এক্সপায়ারি ডেট ছিল ছ’মাস আগের। তবে সেটা নিয়ে তার মাথাব্যথা ছিল না। কারণ সে ডেট সে পাল্টে নতুন করে ডেট বসিয়ে দিয়েছিল!

অ্যামপুলটার দিকে চোখ পড়তে মনে মনে চমকে উঠল আবদুর রহমান।

এগুলো সবই কে এস সোবহানের সাপ্লাই করা অ্যামপুল। কিছুদিন আগে কোরামিন ইনজেকশন বাজারে ছিল না। আবদুর রহমানই মওকা বুঝে বাজারে ছেড়েছে। তার মানে কি কে এস সোবহান তাকে ঠকিয়েছে? অনেক আগে এক্সপায়ারি ডেট পার হয়ে যাওয়া ইনজেকশন সে নিজেই কারসাজি করে মিথ্যে বলে বিক্রি করেছে আবদুর রহমানের কাছে।

আর আবদুর রহমান না জেনে সেখানে আবার নতুন করে তারিখ বসিয়েছে। হয়তো এক বছর আগেই এই ইনজেকশনগুলো তাদের কার্যক্ষমতা হারিয়েছে।

আরে, কী সর্বনাশ!

অ্যামপুলটার দিকে তাকিয়ে আবদুর রহমান কেমন যেন ভ্যাবাচাকা খেয়ে গেল।

কিন্তু এখন তাল হারালে চলবে না। মাথা রাখতে হবে ঠাণ্ডা।

সে এখন বন্ধুর হাত ধরে বলে উঠল, এ তুমি কী বলছ, দোস্ত?

সত্যিই বলছি। আবদুল কাদির পা নাড়াতে নাড়াতে বলল।

দেখি, এবার অ্যামপুলটা ভালো করে দেখি। আমার হাতে দাও।

এ কথা বলে অ্যামপুলটা আবদুল কাদিরের হাত থেকে নিয়ে একটু নেড়ে চেড়ে সে বলল, এ তো দেখি লাইফ সেভিং কোরামিন। নাঃ, ইনজেকশন তো ভালোই দেখছি। ছোট বাচ্চাদেরও দেয়া হয়। তবে অল্প ডোজে। কেন, আমার ভায়রার বাচ্চাটিকেও তো সেদিন এ ইনজেকশন দেয় হল। না, না, এ তোমার ভুল ধারণা ভাই। ডাক্তার তো ঠিক চিকিৎসাই করেছে।

তুমি বলছ তাহলে?

ঘন ভ্রুরুর জঙ্গল কপালের ওপরে তুলে আবদুল কাদির বন্ধুর মুখের দিকে তাকাল।

দেখে যেন প্রাণ কেঁপে উঠল আবদুর রহমানের।

মনে মনে ভাবল কে এস সোবহান এবার তার ওপরেই বাটপারি করেছে। এবং বোকা আবদুর রহমান না বুঝে তার ফাঁদে পা দিয়েছে। কিংবা কে জানে হয়তো সোবহান কিছুই করেনি, ছ’মাসের বেশি হয়ে যাওয়ায় ইনজেকশনের গুণাগুণ এমনিতেই কমে এসেছিল বা সম্পূর্ণই নষ্ট হয়ে গিয়েছিল।

অথচ এত বছর ধরে সে এরকম কাজ মাঝে মাঝেই করেছে, কিন্তু কোনোদিন তো এমন হয় নি।

পুরো ব্যাপারটা আবদুর রহমানের কাছে যেন রহস্য বলে মনে হতে লাগল।

এখন আবদুল কাদির ডাক্তার নিয়ে, প্রেসক্রিপশন নিয়ে যত টানাটানি করবে, খবরের কাগজওয়ালাদের একবার নজরে পড়ে গেলে কতদূর তা গড়াবে কে জানে। হয়তো তখন অন্য অ্যামপুলগুলোর খোঁজ পড়বে। মহাখালীর ল্যাবরেটরিতে পরীক্ষা নিরীক্ষা হবে। এ ওষুধের সাপ্লাইয়ার বর্তমানে তারই দোকান। শেষে কান টানতে মাথা আসবে। দেখা যাবে ওষুধের গুণাগুণ শেষ অথচ বাজারে স্বাভাবিকভাবে বিক্রি হচ্ছে।

কথাগুলো চিন্তা করে আবদুর রহমানের মাথার ভেতরে কেমন যেন করে উঠল। বিপদ তো এভাবেই আসে। ভাবল সে। সে উঠে দাঁড়িয়ে বন্ধুর হাত ধরে দোকানের পেছনে এনে বলল, আমি অত্যন্ত দুঃখিত, ভাই।

কেন? আবদুল কাদির অন্যমনস্ক হয়ে বলল।

বিপদের দিনে তোমাকে কোনো সাহায্য করতে পারলাম না।

করুণ মুখে বলে উঠল আবদুর রহমান।

না, না, তুমি যথেষ্ট করেছ। ব্যতিব্যস্ত হয়ে বলে উঠল আবদুল কাদির। তুমি টাকা না দিলে ছেলেটার চিকিৎসা করাতাম কীভাবে? তাকে আঙুর কিনে দিতাম কীভাবে? জানো, আঙুর খেতে সে বড় ভালোবাসত, ভাই। যদি বিনা চিকিৎসায় মারা যেত, তাহলে কীভাবে নিজেদের সান্ত্বনা দিতাম বলো-তো? দোস্ত আমি ডাক্তারের নামে থানায় কমপ্লেইন দেব, জেনে রাখ। মামলাও করব।

কথা বলার সময় হঠাৎ করে আবদুল কাদিরের গালের মাংস থির থির করে উঠল।কোনো ব্যাপারে অত্যন্ত দৃঢ়প্রতিজ্ঞ হলে মানুষের যেমন হয়।

অবস্থা দেখে আবদুর রহমানের বুকের ভেতরটা অজানা শঙ্কায় যেন কেমন করে উঠল। তার মনে হল, ব্যাপারটা নিয়ে আবদুল কাদির একটা হেস্ত নেস্ত করবে।

সে হঠাৎ করে আবদুর কাদিরের হাত ধরে বলল, এসো, আগে চা খাই। চা খাওয়ার পরে আমরা এক জায়গায় যাব।

সেখানে গেলে মনে শান্তি আসে। আমি তো প্রায়ই যাই।

আমার মনে যে শান্তি নেই, কে তোমাকে এ কথা বলল?

আবদুর রহমান বিমর্ষ মুখে বলল, কেউ বলেনি। তবে তোমার খোকাটা অকালে চলে গেল তো!

আবদুল কাদির এ কথা শোনার পর পা নাচানো থামিয়ে কী যেন ভাবল। তারপর হঠাৎ হাউমাউ করে কেঁদে উঠে বলল, দোস্ত, আমি আত্মহত্যা করব। আমার বউ পুত্রশোকে পাগল হয়ে গেছে। আমি একজন মুক্তিযোদ্ধা। কিন্তু সরকারের কাছ থেকে বা কোনো মুক্তিযোদ্ধা সংসদের কাছ থেকে কোনো সার্টিফিকেট নিইনি। নেবার প্রয়োজনও মনে করিনি। দেশের প্রয়োজনে যুদ্ধ করেছি, এটা তো দেশের প্রতিটি নাগরিকের নৈতিক কর্তব্য। দরকার যদি হয় আবারও যুদ্ধ করব, কিংবা আমার করার সাধ্য না থাকলে আমাদের সন্তানরা করবে। কিন্তু সেই সন্তান যদি এমনভাবে মারা যায় তো নিজেকে ক্ষমা করতে পারিনে, ভাই।

আবদুল কাদিরের সাথে সাথে আবদুর রহমানও চোখ মুছল। বন্ধুর ঘাড়ে হাত রেখে তাকে সান্ত্বনা দিতে চাইল। না, সে নিজে মুক্তিযুদ্ধ করেনি বটে, তবে দেশের ভেতরে থেকে মুক্তিযোদ্ধাদের সাহায্য করেনি এ কথা কেউ বলতে পারবে না। গোপনে ওষুধ দিয়ে সে অনেক মানুষকে সাহায্য করেছে। ওষুধের দোকান তখনও ছিল। তখন ছিল তার বাবার। বাবা মুক্তিযুদ্ধ শেষ হওয়ার পরপরই মারা যান। হয়তো নয় মাসের যুদ্ধের ধাক্কা তার নাজুক হার্ট সহ্য করতে পারেনি। ঢাকায় এখন আবদুর রহমানের নিজের ওষুধের দোকান। বাবার ওষুধের দোকানটা তার ছোট ভাইয়ের হাতে ছেড়ে এসেছে। সেখানকার আয় থেকে গ্রামের বাড়ির খরচ চলে। আর তার মেজ ভাইকে দিয়ে নারায়ণগঞ্জে একটা ট্যানারির ব্যবসা খুলেছে। সে তার পরিবার নিয়ে নারায়ণগঞ্জেই থাকে।

তবে ঢাকায় দোকান খুলেছে সে স্বাধীনতার পরে। দেশ থেকে তার সংসার গুটিয়ে নিয়ে রাজধানীতে চলে এসেছে।

আবদুর রহমান ভাবতে লাগল। এসব ভাবনার ফাঁকে ফাঁকে এটাও ভাবল যে দোকান থেকে ইনজেকশনের অ্যামপুলগুলো সব সরিয়ে ফেলতে হবে। ওষুধ নিয়ে আজকাল প্রায় স্ক্যান্ডাল হচ্ছে। বাচ্চাদের খাওয়ার অ্যাসপিরিনের মধ্যে পাওয়া যাচ্ছে বিষ। অনেক বাচ্চা জ্বরের সময় অ্যাসপিরিন খেয়েই মারা যাচ্ছে। অ্যান্টিবায়োটিকের ভেতরে নকলের ছড়াছড়ি। মানুষজন ঠাট্টা করে, কোষ্ঠকাঠিন্য যদি না সারে ভাই, তাইলে অ্যান্টিবায়োটিক কিইন্যা খাও, ভালো জোলাপের কাজ করে। একদিনেই প্যাট এক্কেরে সাফ! এসব নিয়ে কাগজে কত লেখালেখি।

বন্ধুর সহানুভূতি পেয়ে আবদুল কাদির চোখ মুছে বলল, জীবনটা অর্থহীন হয়ে গেল, দোস্ত।

আবদুর রহমানের কোনো সন্তান সেই, তবু সে মাথা নেড়ে বলল, জানি।

আবদুল কাদির বলল, সন্তান হারানো যে বাবা-মায়ের জন্য কী এক শাস্তি, একমাত্র তারাই বুঝবে যারা হারিয়েছে।

আবদুর রহমান মুখ কালো করে বলল, জানি, দোস্ত।

ছেলেটি আমার খুব ভালো ছিল, জানো দোস্ত, মৃত্যুর আগ পর্যন্তও হাসিখুশি ছিল। শুধু ওর মাকে ভালো রাখার জন্য।

আবদুর রহমান ঢোক গিলে বলল, জানি, দোস্ত।

খুব লক্ষ্মী ছেলে ছিল, বেশি বায়না ধরতো না। সামান্য প্লাস্টিকের খেলনা পেলেই খুশি হয়ে যেত।

তাই, না? আবদুর রহমান এ কথায় একটু অন্যমনস্ক হয়ে বলে উঠল। তার এখন খুব খারাপ লাগছে। আবদুল কাদির বলে চলল, স্কুলে যাওয়ার জন্য বায়না ধরত, অথচ মোটে চার বছর ছিল বয়স। ওর মা ওকে প্লে গ্রুপে ভর্তি করার জন্য চেষ্টা করছিল।

খুব ভালো ছেলে তো! আবদুর রহমান বলল।

হ্যাঁ, দোস্ত, খুব ভালো ছেলে ছিল।

এবার কথা শেষ করে হা হা করে হেসে উঠল আবদুল কাদির। হাসতে হাসতে বলল, সন্তান হারালে বাবা-মায়ের হৃৎপিণ্ডের ভেতরে কী হয়, জানো? না, জানো না। তার ভেতরে আর রক্ত থাকে না। থাকে শুধু পানি। চোখের নোনতা পানি।

কথা শেষ করে আরও খানিকটা সে হাসল। তারপর ঝট করে উঠে দাঁড়িয়ে বলল, আচ্ছা, আগামীকালই আমি আসছি।

তারপর একটা লাফ দিয়ে দোকান থেকে বেরিয়ে গেল।

পড়ে থাকল দোকান থেকে কেনা ধুমায়িত চা।

আবদুর রহমান তাকে বাধা দেয়ার সময়ও পেল না।

৭.

ইদানীং দোকানে বসলেই আবদুর রহমান তার বন্ধুর কথা মনে করে। মনে হয় মানুষটার খোঁজ নেয়া দরকার। সেই যে ছেলের অসুখের সময় সে বেশ ক’দিন খুব দৌড়াদৌড়ি করেছিল, তারপর থেকে হঠাৎ করে যেন সব চুপ। এমনই চুপ যেন মনে হয় এই রাজধানীতে আবদুল কাদির বলে কোনো মানুষ কোনোদিন ছিল না। মুশকিল যে আবদুল কাদিরের বাসায় কোনো টেলিফোন নেই। কোনোদিন ছিল না। আজকাল মানুষের বাড়িতে টেলিফোন লাইন নেয়া বড় ঝামেলার। একগাদা ঘুষ-ঘাস না দিলে কোনো লাইন পাওয়া যায় না। অনেক তদ্বির তাগাদার পর তবে লাইন পাওয়া যায়।

সেদিন তো একটা তাজ্জব খবর ছাপা হল খবরের কাগজে। একজন রিটায়ার্ড মানুষ তার সারা জীবনের শখ বাড়িতে একটা প্রাইভেট টেলিফোন নেয়া। টিএন্ডটির কাছে দরখাস্ত করে মাসের পর মাস ভদ্রলোক অপেক্ষা করতে লাগলেন। কিন্তু টেলিফোন কানেকশন মিলল না। অনেক ধরাধরি করেও কানেকশন পেলেন না। তার এ অপারগতা স্ত্রীর কাছে গ্রহণীয় ছিল না। তিনি স্বামীর ওপর রাগ করে বসে থাকলেন। পরে ভদ্রলোক খবর পেলেন কিছু ঘুষ দিলে কানেকশন পাওয়া যাবে। কিন্তু ভদ্রলোক ছাপোষা মানুষ। তার পক্ষে ঘুষ দিয়ে টেলিফোন বাড়িতে আনা প্রায় অসম্ভব একটা ব্যাপার।

এর পরের কাহিনী সংক্ষিপ্ত। কিছুদিন বাদে ভদ্রলোক অসুখে মারা গেলেন। যেদিন মারা গেলেন সেদিন দুপুরে টিএন্ডটি থেকে লোক গেল বাড়িতে টেলিফোন কানেকশন দিতে। কিন্তু সেদিন বাড়ির লোকজন মুর্দা গোসল করতে ব্যস্ত। তারপর তাকে কবর দিতে দেশের বাড়িতে নিতে হবে।

ভদ্রলোকের ছেলে রাগ করে টিএন্ডটির কর্মচারীদের বাড়ি থেকে তাড়িয়ে দিলেন।

খবরটা একটা দৈনিকে পড়েছিল আবদুর রহমান। সেকথা এখন দোকানে বসে মনে পড়ল তার। মনে পড়ে সে সিদ্ধান্ত নিল নিজেই একদিন আবদুল কাদির যে অফিসে চাকরি করে সেখানে খোঁজ লাগাবে।

অনেক খুঁজে পেতে সে একদিন দোকানে বসে তার নোটবুক খুলে আবদুল কাদিরের অফিসের টেলিফোন নম্বর বের করল। বেশ কিছুক্ষণ চেষ্টার পর একজনকে পাওয়া গেল। প্রথমে সে তো আবদুল কাদিরকে চিনতেই পারে না। পরে ও, হ্যাঁ, হ্যাঁ, বলে খবর দিল বিগত তিন মাস ধরে সে আর এ অফিসে আসে না।

চাকরি ছেড়ে দিয়েছে কি-না, তা ও সে বলতে পারে না। এসব ওপরের তলার ব্যাপার।

খবরটা জানতে পেরে বন্ধুর জন্য উদ্বিগ্ন বোধ করলেও এটুকু বুঝল যে ঘটনাটা বেশি দূর গড়ায় নি। যদি গড়াত তাহলে এতদিন সবকিছু এরকম নীরব থাকত না। আবদুর রহমান এটাও জানত যে মানুষের নিকটজন কেউ হঠাৎ মারা গেলে আত্মীয়স্বজনরা ডাক্তারের ওপরে মারমুখী হয়ে ওঠে। স্বজন হারানোর বেদনা তো সহ্য করা সহজ ব্যাপার নয়। কিন্তু মানুষের হঠাৎ মৃত্যুর পেছনে ডাক্তার বা ওষুধ ছাড়া যে আরও কিছু কারণ থাকতে পারে এটা সে সময় হয়তো ভাবতে পারে না।

আবদুর রহমানের একটু ক্ষোভ হল মেডিসিন রিপ্রেজেনটেটিভ কে এস সোবহানের ওপর। ছেলেটা, ছেলেই তো বটে, এখনো তিরিশ পেরোয় নি, এমনিতে এত ভদ্র, বিনীত, নিচুস্বরে কথা বলে, টিপিটিপি পায়ে হাঁটে, অথচ শয়তানের হাড্ডি। সেদিন থার্ড জেনারেশন অ্যান্টিবায়োটিক যতগুলো সাপ্লাই দিয়েছে, সবগুলোর এক্সপায়ারি ডেট সে নিজেই পাল্টে দিয়েছে তাকে বিক্রি করার আগে।

আবদুর রহমানকে এ খবরটা পর্যন্ত সে জানায় নি। ভাগ্যিস এখন পর্যন্ত এটা নিয়ে কেউ প্রশ্ন করেনি।

প্রশ্ন তুলতে তুলতেই সব ইনজেকশন বাজারে বিক্রি হয়ে রোগীর শরীরে চলে যাবে।

তখন আর কে খোঁজ রাখে।

কে এস সোবহানের কথা যত ভাবতে লাগল, ততই আবদুর রহমানের মনের ভেতরে অশান্তি হতে লাগল। তার মনে হল এ লোকাটা তার বাড়িতেই মনে হয় নকলের কারখানা বসিয়ে ফেলেছে।

কথাটা ভেবে নিজের ভেতরে একটা অস্থিরতা অনুভব করে আবদুর রহমান। একবার তার মনে হয় আবদুল কাদিরের ছেলের মৃত্যুর পেছনে কোরামিনের কোনো অবদান নেই। সেটা এ হিসাবে যে ইনজেকশনের কোনো কার্যকারিতাই ছিল না। পানি ইনজেকশন দেয়া যা , এটাও ছিল ঠিক তাই। আবার ভাবে, মৃত্যুমুহূর্তে কোরামিন কোনো কাজ করতে পারেনি কারণ ওষুধের কার্যকারিতা ছিল না। যদি থাকত তাহলে হয়তো বাচ্চাটাকে সে মুহূর্তে বাঁচিয়ে তোলা সম্ভব হতো।

হ্যাঁ, সম্ভব হতো।

হায়, প্রকারান্তরে ছেলেটিকে তো হত্যাই করা হল!

কথাগুলো ভেবে আবদুর রহমানের বুকের ভেতরে কেমন একটা অস্বস্তির ভাব শুরু হল। তার সাথে কেমন একটা আশঙ্কা। যা সে কাউকে মুখ খুলে বলতে পারছে না এ মুহূর্তে। রেহানাকে তো নয়ই।

আবদুর রহমান ইতোমধ্যে অবশ্য পুরান ঢাকার দোকানগুলো থেকে তার সাপ্লাই করা ইনজেকশনগুলো ফিরিয়ে এনেছে। টাকাও ফেরত দিয়ে এসেছে কর্মচারী পাঠিয়ে। তবু তার মনে কেন যেন শান্তি আসছে না। বন্ধু আবদুর রহমানকে সে চেনে, একটু ইমোশনাল বটে। তবে অবুঝ নয়। মুখে যত যাই বলুক, ডাক্তারের নামে সে মামলা করবে না। মামলা যে করবে তার তহবিল কোথায়? মামলা করা কি মুখের কথা? আর মামলা করলেও সে কিছুতে প্রমাণ করতে পারবে না যে ডাক্তারের গাফিলতির জন্য বা ইনজেকশনে কাজ না হওয়ার জন্য তার ছেলের মৃত্যু হয়েছে।

কথাটা ভাবতে গিয়ে আবদুর রহমানের মনের ভেতরে কেমন যেন একটা আক্রোশমিশ্রিত ক্ষোভের জন্ম হল। মানুষের বিচিত্র মন। নইলে কেন তার মনে এরকম হবে? আক্রোশ বন্ধু আবদুর রহমানের প্রতি। কেন সে মামলা করার স্পর্ধা দেখাবে? আর ক্ষোভ কে এস সোবহানের প্রতি। কেন সে এবার তাকে এভাবে ফাঁকি দিল?

লাইফ সেভিং ইনজেকশন নিয়ে কেন সে ছেলেখেলা করল?

আবার মনে মনে এ যুক্তিও খাড়া করতে লাগল যে আবদুল কাদির কিছুতেই প্রমাণ করতে পারবে না তার সাপ্লাই দেয়া ইনজেকশনের কারণে ছেলেটির মৃত্যু হয়েছে। প্রথম কথা ছেলেটির অবস্থা এমনিতেই খারাপ ছিল। কোনোকিছু পেটে রাখতে পারত না। বমি হয়ে যেত। একজন নয়, দু-তিনজন ডাক্তার ছেলেটিকে দেখেছে। তাদের ভেতরে একজন ডাক্তার ছিল স্পেশালিস্ট। এ কথা ঠিক যে ইনজেকশন দেয়ার পরপরই তার মৃত্যু হয়েছে, তা সে যে কোনো কারণেই হতে পারে। ইনজেকশনের ডোজ বেশি হতে পারে যদি তার পোটেন্সি বজায় থাকে, অর্থাৎ কার্যকারিতা বজায় থাকে। অথবা ছেলেটার শরীর রোগে ভুগে ভুগে এতই কাহিল হয়ে গিয়েছিল যে সামান্য ডোজও তার সহ্য হয় নি। অথবা এ ইনজেকশনই কাজে লাগতে পারত, যদি তার পোটেন্সি না হারাত।

এতসব চিন্তাভাবনা আবদুর রহমানের মাথার ভেতরে যতই ঘুরপাক খেতে লাগল তত তার মনে অশান্তি বাড়তে শুরু করল। সামান্য একটা সরল চিন্তা যেন ক্রমাগত জটিল হয়ে উঠতে লাগল। ইনজেকশনের পোটেন্সির অভাবে হয় ছেলেটির মৃত্যু হয়েছে অথবা এমনিতেই তার শেষ সময় এসে গিয়েছিল, যখন কেউ আর কিছু করতে পারে না, এই সোজা চিন্তাটা যেন আর সরল পথে প্রবাহিত হতে পারছে না, এরকম মনে হতে লাগল তার।

অথচ আবদুল কাদিরের ছেলেটাকে জীবনে সে চোখে দেখেনি। কোনোদিন দেখার সুযোগও হয় নি। সত্য এই যে আবদুর রহমান থাকে কাঁঠালবাগানে। আর আবদুল কাদির সূত্রাপুর বা এরকম কোনো জায়গায়। ঘন ঘন বাড়ি পাল্টানো আবদুল কাদিরের স্বভাব। বাড়িভাড়া যত বাড়ে, তত যেন সে পুরান ঢাকার গভীর থেকে আরও গভীরে প্রবিষ্ট হয়! এসব কিছু কিছু জানত আবদুর রহমান।

তবে সুখবর যে খালি অ্যামপুলটা আবদুল কাদির আর ফেরত চায় নি। হয়তো সেদিন আবেগতাড়িত ছিল বলে ফেরত নিতে মনে ছিল না। আবদুর রহমানের হাতেই সেটা রয়ে গেছে। আবদুল কাদির দোকান ছেড়ে গেলে খালি অ্যামপুলটা চোখের সামনে নিয়ে সে ঘুরিয়ে ফিরিয়ে দেখতে লাগল। অ্যামপুলটার চেহারা সামান্য মলিন মনে হলেও এর গায়ের লেবেল বেশ চকচকে। লেবেলের গায়ে নীল কালি দিয়ে আরও এক বছরের পোটেন্সির ছাপ আছে। আবদুর রহমানের মনে পড়ল এ লেবেল তার নিজের হাতে রাতের বেলা দোকানের পেছনে বসে লাগানো। এসব ব্যাপারে সে কাউকে সাক্ষী রাখে না। এসব কাজে যেমন ঝুঁকি আছে, তেমনি গোপন এক আনন্দও আছে। যে কোনো ঝুঁকির কাজে একটা আনন্দ আছে, শুধু পয়সা উপার্জনই একমাত্র কারণ নয়। এটা আবদুর রহমানের বিশ্বাস।

বড় চা, ভালো আছেন?

ডাক শুনে চমকে উঠল আবদুর রহমান। তার চিন্তায় ছেদ পড়ল হঠাৎ।

তাকিয়ে দেখল জাহাঙ্গীর তার ভেতরের ঘরের সামনে এসে দাঁড়িয়েছে। কখন যে সে তার দোকানে ঢুকেছে আবদুর রহমান টের পায়নি।

জাহাঙ্গীর তার চাচাতো ভাইয়ের ছেলে। এরা সব একে একে রাজশাহী থেকে ঢাকা শহরে পাড়ি দিয়েছে। কেউ চাকরির সুবাদে। কেউ লেখাপড়া। কেউ ব্যবসা-বাণিজ্য।

যেমন আবদুর রহমান তার দেশের ওষুধের দোকানটা তার ছোট ভাইয়ের হেফাজতে রেখে দিয়ে এসেছে। নিজে ঢাকায় এসে তার বাবার নামে আবার দোকান খুলে বসেছে। রহমান ফার্মেসি। শুধু দোকান নয়, ছোটখাটো কারখানা তৈরি করারও চেষ্টা চালাচ্ছে সে। এ স্বাধীন দেশে এখন মানুষ ইচ্ছে করলেই যে কোনো ব্যবসা করতে পারে। প্রাথমিক ঝামেলাটুকু যদি পার হতে পারে, তাহলে আর কোনো অসুবিধে নেই।

আবদুর রহমান ভালো করে জাহাঙ্গীরের দিকে তাকাল। মাথায় ঘাড়অব্দি লম্বা রক্ষ্ম চুল, কানে একটা দুল বেদেনী মেয়েদের মতো। ডান হাতের কনুইয়ের ওপরে একটা মাদুলি ঝোলানো।

পরনে তার জিনস-এর ময়লা ফুলপ্যান্ট ও হাতাকাটা স্যান্ডো গেঞ্জি।

আজকাল বিদেশি সিনেমা দেখে ছেলেরা এসব বেহুদা পোশাক পরা শিখেছে।

জাহাঙ্গীর লেখাপড়া করে না। ইউনিভার্সিটি ছেড়ে দিয়েছে। সে নাকি আবার পার্টিও করে। বাড়ির সাথে সম্পর্ক খারাপ। তাতে অবশ্য বাড়ির লোকের যত অশান্তি, জাহাঙ্গীরের তত না। সে দিব্যি খায়, দায়, ঘুমোয় এবং দিনভর এবং রাতভর পার্টি করে।

এ একটা ব্যাপার দেখা যাচ্ছে। দেশ স্বাধীনের এক যুগও পুরো হয় নি, এর ভেতরেই ছেলেমেয়েরা রাতভর আনন্দ-ফুর্তি করতে শিখেছে। পার্টি করা শিখেছে। এ নিয়ে বাবা-মায়েদের মনে কত যে অশান্তি। বিশেষ করে উঠতি বয়সী মেয়েরা পার্টিতে যোগ দিতে না পারলে আত্মহত্যা পর্যন্ত করে বসছে!

এদিকে জাহাঙ্গীরের কথাবার্তা শুনলে মনে হয় যেন সে বিরাট দায়িত্বশীল একজন মানুষ।

জাহাঙ্গীরকে দেখে মেজাজ খারাপ হয়ে গেল আবদুর রহমানের। ছেলেটা খুব জ্বালাচ্ছে তার বাবা-মাকে। এ খবর সে লোক মারফত পায়। মাদকের নেশায় যে পড়েছে এটা তার চেহারা দেখেই আন্দাজ করা যায়।

সাধারণ লোকে বলাবলি করছে এখন ষোলো বছরে পা দিতে না দিতেই তার ভেতরে চরিত্রদোষও দেখা যাচ্ছে!

এখন কি মতলবে জাহাঙ্গীর তার এখানে এসেছে কে জানে।

আবদুর রহমানকে চুপ করে ভাবতে দেখে জাহাঙ্গীর আবারও জিজ্ঞেস করল, ভালো আছেন, ছোট চাচা?

ভালো আর কি, এ চলছে কোনোরকমে! মনে মনে বিরক্ত হয়ে বলল আবদুর রহমান।

মা, ক’দিন ধরে খুব আপনার কথা বলছিল।

কিছু জিজ্ঞেস করবে না ভাবতে ভাবতেও আবদুর রহমান ফস করে বলে ফেলল, কী বলছিল?

বলছিল, তোর ছোট চাচার জন্য মনটা কেমন করছে ক’দিন ধরে। একটু খোঁজ নে।

কথাটা যে ডাহা মিছে, তা বুঝতে দেরি হল না আবদুর রহমানের। তার ভাবী এমন স্বভাবের কোনোদিন ছিল না যে এ সুরে তার খুড়তুতো দেবরের জন্য আহাজারি করবে।

তবু প্রতিবাদ না করে আবদুর রহমান বলল, হুঁ।

আর মা বলছিল, তোর ছোট চাচা অনেকদিন আমাদের বাসায় আসে না, তাকে আসতে বলিস।

যাব একসময়। কোনোমতে বলল আবদুর রহমান।

এখন চলেন না, যাবেন?

এ কথা শুনে বিস্ময়ে চোখ কপালে তুলে ফেলল আবদুর রহমান। এখন রাত প্রায় ন’টা। বাইরে আবার হঠাৎ করে ঝিরঝির বৃষ্টি পড়ছে। রাস্তা দিয়ে পানি গড়িয়ে আসছে দোকানের ভেতর।

এ ছেলে এখন বলে কি?

গম্ভীর মুখে আবদুর রহমান বলে উঠল, না, এখন যাব না, এটা কি কারও বাসায় যাওয়ার সময়? তাছাড়া তুই বা এত রাতে রাস্তায় ঘুরঘুর করছিস কেন? বাড়ি যা।

ঠিক এ সময় তসির মিয়া দোকানে ঢুকল। তসির রাত আটটা থেকে রাত বারোটা পর্যন্ত দোকানে বসে। ঘুমোয় দোকানের ভেতর। আবার সকালে ওঠে চামড়ার কারখানায় চলে যায়। এই এক লোক তসির, যাকে আবদুর রহমান এখন পর্যন্ত বিশ্বাস করে। তার বাবার আমলের লোক। আগে সাতক্ষীরায় ছিল। এখন আবদুর রহমানের সঙ্গে ঢাকায় এসেছে। দেশে বউ-বাচ্চা রেখে এসেছে। প্রতি দু’মাস অন্তর সে তাদের দেখতে যায়। টাকা-পয়সা যা লাগে দিয়ে আসে।

নারায়ণগঞ্জের দিকে একটা ট্যানারি হাউস চালু করেছে আবদুর রহমান। প্রাথমিক পর্যায়ে আছে ব্যবসাটা। ব্যবসাটা তার মেজ ভাইেয়ের হাতে ছেড়ে দিয়েছে। তবে সে খবরদারির ভেতরে ব্যবসাটা রাখে। কারণ ইনভেস্টমেন্ট সবই তার। তসির মিয়া রোজ সকালে ওঠে নারায়ণগঞ্জে যায়। সন্ধ্যে বেলা আবার ঢাকায় ফিরে আসে।

এক পুরুষেই আবদুর রহমান তার ফ্যামিলিকে যতদূর সম্ভব টেনে ওপরে নিতে চায়।

তসির রাতের বেলা দোকানে থাকলেও রাতে ভিড় কম হয়। সুতরাং অত কষ্ট হয় না। দোকানের আর দু’জন কর্মচারী রহিম ও বেলায়েত, তারা সকাল ন’টা থেকে রাত ন’টা পর্যন্ত দোকানের কাউন্টারে থাকে। দুপুরবেলা দোকানের পেছনে বসে ভাত খেয়ে নেয়।

আগে তার দোকানে চারজন কর্মচারী রেখেছিল আবদুর রহমান। কিন্তু তাতে কাজ বেশি এগোয় না। শুধু ঠেলাঠেলি হয়। দু’জন কর্মচারী রেগুলার থাকলেই চলে।

রেহানা মাঝে মাঝে বলে বটে এভাবে রাতদিন খাটলে শরীরে চাপ পড়ে যাবে আবদুর রহমানের, কিন্তু তার কথা আবদুর রহমান শোনে না। বরং সে খুশিই হয় দোকানে থাকতে পেরে। তবে মাঝে মাঝে রেহানার জন্য দুপুরবেলা অন্তত ঘণ্টা দুই সময় তাকে দিতে হয়। বাসাটা তার বেশি দূরে নয়। কাঁঠালবাগান রাস্তার নালাটা ডিঙি মেরে পার হলেই আবদুর রহমানের বাড়ি। দোতলা। আড়াই কাঠার ওপর দোতলা। অবশ্য চার তলার ফাউন্ডেশন আছে।

আবদুর রহমানের ইদানীং গোপন এক শখ হচ্ছে একটা প্রাইভেট গাড়ি কেনার। আজকাল অনেকেই নিজেদের ব্যবহারের জন্য প্রাইভেট কার কিনছে। ট্যানারিটা ঠিকমতো দাঁড়িয়ে গেলে আবদুর রহমানও গাড়ি কিনবে। কিন্তু গাড়ি কেনার কথা চিন্তা করলে তার কেমন যেন লজ্জা লাগে। মনে হয়, গাড়ি একবার কিনে ফেললে তখন আর সে দোকানে বসতে পারবে না! মানাবেও না। তখন তাকে কর্মচারীর ওপর নির্ভর করতে হবে।

কিন্তু এদিকে ‘বাড়ি যা’ বলার পরেও জাহাঙ্গীর দোকান ছেড়ে নড়বার লক্ষণ দেখাল না। কাউন্টারের ওপর দু’হাত ছড়িয়ে রেখে মুখে একটা স্মিত হাসি ধরে রাখল।

তার ভাব দেখে মনে মনে খুব রাগ হল আবদুর রহমানের। ছেলেটা একেবারে বখে গেছে। মনে মনে ভাবল সে। আজ বেলায়েত কাজে আসেনি। সে বিয়ে করতে দেশে গেছে।

তসির মিয়া অত্যন্ত ধীরস্থির মানুষ। বুদ্ধি ভালো।

সে জাহাঙ্গীরের দিকে তাকিয়ে বলে উঠল, সেলাম, মামা।

সেলাম, ভালো আছেন, মামা? উল্টে জাহাঙ্গীর তাকে জিজ্ঞেস করল।

হ্যাঁ, আপনি ভালো আছেন?

এ আছি এক রকম। বলল জাহাঙ্গীর।

তারপর আবার চুপচাপ দাঁড়িয়ে থাকল। আবদুর রহমান এবার অস্বস্তি বোধ করতে লাগল। এবার গলা চড়িয়ে তাকে দোকান ছেড়ে যেতে বলার আগেই জাহাঙ্গীর মুখ তুলে আবদুর রহমানের দিকে তাকিয়ে বলল, আপনার কাছে একশোটা টাকা হবে, ছোট্চা?

তার কথা শুনে একটু যেন হতভম্ব হয়ে গেল আবদুর রহমান। এর আগে জাহাঙ্গীর কোনোদিন তার কাছে টাকা চায় নি। সে সামান্য ক্ষুব্ধ হয়ে বলল, টাকা?

হ্যাঁ, চাচা।

একশো?

হ্যাঁ।

কি করবি?

একটু দরকার ছিল।

এতক্ষণে জাহাঙ্গীরের মতলব বুঝতে পারল আবদুর রহমান।

একট যেন ভাবনায় পড়ে গেল। টাকা দেবে কি দেবে না ভাবতে লাগল। একবার মনে হল বলে, যা, বাড়ি যা, টাকা এখন নেই।

কিন্তু কি ভেবে তসিরকে ইশারা করল সে। তসির ক্যাশ কাউন্টারে ঢুকে চাবি দিয়ে ড্রয়ার খুলে একশো টাকার নোট বের করে দিল একটা।

হেলতে দুলতে আবার সালাম জানিয়ে দোকান ছেড়ে বেরিয়ে গেল জাহাঙ্গীর।

মাস্তান, বানু ভাবীর ছেলে একটা মাস্তান হয়েছে; তার দিকে তাকিয়ে মনে মনে ভাবল আবদুর রহমান। কে জানে, হয়তো এর মধ্যেই চাঁদার ভাগিদার হয়ে গেছে সে। কেমন লোভীর মতো চকচকে চোখে চারদিকে তাকিয়ে দেখছিল!

অবস্থা দেখে মনটা খারাপ হয়ে গেল তার।

৮.

রাত হয়ে এসেছে। দোকানপাট বন্ধ হতে শুরু করেছে। বৃষ্টির জন্য অনেকেই আজ আগেভাগে দোকান বন্ধ করে বাড়ি ফিরে যাচ্ছে। পথে আলোর অপ্রতুলতার জন্য বাইরে ভালো করে চোখে কিছু দেখা যাচ্ছে না। রাস্তার লাইটগুলো পর্যন্ত মানুষ আজকাল চুরি করতে শিখেছে। রাস্তার ম্যানহোল ঢাকনা কখন যে কে তুলে বাড়ি নিয়ে চলে যাবে সেটা বলা মুশকিল। ম্যানহোলে পা হড়কে পড়ে অনেক মানুষের মৃত্যু পর্যন্ত হয়েছে। অনেকের হাত-পা ভেঙে গেছে।

আবদুর রহমান মনে মনে নানা কথা ভাবতে লাগল। এমনভাবে যেন এসবে তার কোনো অংশ নেই। তাছাড়া সত্যি বলতে তার চুরি আর কতটুক? এদেশে যে বড় বড় রাঘব বোয়ালের জন্ম হয়েছে তাদের তুলনায় আবদুর রহমান আর কতটুকু চুরি করার সাহস পায়?

একটু পরে আবদুর রহমান বলল, তসির, আমি বাড়ি যাই, তুই থাক। ওদিকের খবর কি?

এক লট মাল এসেছে বড় ভাই। তবে বিশেষ ভালো জাতের চামড়া মনে হয় না। আপনি একবার দেখে আসবেন।

যাব। তবে মালে কোনো দাগ নেই তো?

না। বড় ভাই। আমি নিজের চোখে দেখছি। মাইজা ভাইও দেখছেন।

আচ্ছা, তাইলে ঠিক আছে।

কথা শেষ করে বাইরে বেরোতে যাবে, তখন ফোন এল। কাউন্টারের নিচ থেকে রিসিভার তুলে সে বলল, হ্যালো!

উত্তরে রেহানা বলল, আমি বলছি।

বলো

বাড়ি আসছ কখন?

এই-তো রওনা হচ্ছি।

এদিকে বৃষ্টিতে বাড়ির উঠোনে অনেক পানি জমেছে। ইট পেতে দিয়েছে। দেখো অন্ধকারে যেন হুমড়ি খেয়ে পড়ো না।

এটুকু বৃষ্টিতে এত পানি জমে গেল? বিস্ময় প্রকাশ করল আবদুর রহমান।

হ্যাঁ, গেল তো। আরও একটা খবর আছে।

রেহানার গলার স্বর শুনে একটু খটকায় পড়ল আবদুর রহমান। গম্ভীর গলায় জিজ্ঞেস করল, কী খবর?

তুমি বাড়ি আস, বলছি।

এ বলে টেলিফোন রেখে দিল রেহানা।

একটু পরে হাতে ছাতা নিয়ে বাইরে বেরোল আবদুর রহমান।

রাস্তার অবস্থা দেখে তার মেজাজ খারাপ হয়ে গেল। গ্রিন রোডে পানি জমে সহজে। তার ধাক্কা এসে লাগে রাজাবাজার আর কাঁঠালবাগানেও। জায়গাটা একটু নিচু। আর চারপাশের পানি বেরোনো নালাগুলো একেবারে বন্ধ।

বাড়ির কাছাকছি এসে আবদুর রহমান অবাক। এমন কিছু আহামরি বৃষ্টি হয় নি। তবু রিকশার চাকা পানির প্রায় মাঝামঝি ডুবে যাচ্ছে। বাড়ির কাছ পর্যন্ত পৌঁছতে বেশ দেরি হয়ে গেল। তাকিয়ে দেখল বাড়ির গেট থেকে ইট পাতা হয়েছে। স্বাধীনতার কয়েক বছরের ভেতরেই সে সাতক্ষীরা থেকে পাট তুলে নিয়ে এসে ঢাকায় বসবাস শুরু করেছিল। জমিও কিনেছিল আড়াই কাঠা। তার ধারণা হয়েছিল জীবনে উন্নতি করতে গেলে তাকে মফস্বল ছাড়তে হবে। তবে বাবার ওষুধের দোকান সে শহর থেকে তোলে নি। তার ছোট ভাইটাকে সেখানে বসিয়ে রেখে এসেছে। দোকান সেখানে ভালো চলে। এখান থেকে সে ওষুধপত্র পাঠায়। অনেক ওষুধ সেই দোকানে পাওয়া যায় যা অন্য কোনো দোকানে পাওয়া যায় না। তাছাড়া সেখানেও কোম্পানির লোকজন আছে।

এ বাড়ির নিচতলায় আবদুর রহমান থাকে। দোতলাটা ভাড়া দেয়া। নিচে দুটো ছোট ছোট গুদাম ঘর করেছে বাড়ির পশ্চিম দিকে। সেখানে ওষুধ জমা করে রাখে। বাসার বিশ্বস্ত চাকর মোমিনুল রাতেরবেলা গুদামের সামনে পাটি পেতে শুয়ে থাকে।

দোতলায় থাকে মতিউর রহমান বলে একজন ব্যবসায়ী। তার একমাত্র মেয়ে পারুল প্রায় নিচের তলায় এসে রেহানার সাথে গল্পগুজব করে। মেয়েটির বয়স সতেরো-আঠারো হবে, কিন্তু চেহারার ভেতরে পুরুষ ভোলানোর যাবতীয় র’ মেটেরিয়াল আছে! বিয়ে এখনো হয়নি। স্থানীয় একটা কলেজে পড়ে। আবদুর রহমানকে সে দুলাভাই বলে সম্বোধন করে। চোখে টুসকি তুলে কথা বলে। তাকে চোখে দেখলে আবদুর রহমানের মনের ভেতরে কেমন যেন অস্বস্তি হয়। মনে হয় কোনোদিন সুযোগ পেলে…। তারপর দেখা যাক কি হয়!

তার এসব গোপন ভাবনার খবর অবশ্য রেহানা জানে না।

আরও অনেক গোপন খবর আবদুর রহমানের মনের ভেতরে আজকাল ঘুরঘুর করে। কিন্তু চোখ রাঙিয়ে সে তাদের চুপ করিয়ে রাখে। কিন্তু সে আর কতদিন?

তবু আবদুর রহমান নিজে খুব খারাপ চরিত্রের মানুষ নয়।

বাড়ির উঠোনে পা রেখে আবদুর রহমানের হঠাৎ মনে পড়ল এই বাড়ি যেদিন শেষ হল, আবদুল কাদির সেদিন বন্ধুর বাড়ি দেখে আনন্দিত হয়ে ঘুরে ঘুরে চারপাশ দেখেছিল। আর মুখে বারবার প্রশংসা করছিল। তুমি দেখালে দোস্ত, রাজধানীতে নিজের বাড়ি তৈরি করা, একি চট্টিখানি কথা? বারবার করে বলেছিল সে।

আবদুর রহমান জানত, আবদুল কাদির গরিব হোক বা যা হোক, তার চেয়ে অনেক বড় লেখাপড়া করা, অনেক জ্ঞানগম্যির মালিক এবং সবচেয়ে বড় কথা তার মনে আবদুর রহমানের প্রতি কোনো ঈর্ষা নেই। বন্ধুকে সে সত্যি মন দিয়ে ভালোবাসে।

তবে আবদুর রহমানও কি তাকে ভালোবাসে না? হতে পারে তার বন্ধু বেশি উপার্জনশীল নয়, স্বভাবের এক ধরনের অস্থিরতা তাকে যেন তাড়িয়ে নিয়ে বেড়ায়, হয়তো মুক্তিযুদ্ধে সরাসরি অংশ নেয়ার জন্যে এবং নিজের হাতে শত্রু নিপাত করার জন্যে তার ভেতরে এক ধরনের অপরাধবোধ কাজ করে থাকবে, কারণ শত্র“ও মানুষ, যদিও খুব খারাপ মানুষ, তবু মানুষ এবং সেই শত্র“রও আছে মা-বাপ, ভাই-বোন, ছেলে-মেয়ে। অপরাধীরও থাকে মন খারাপ এবং হাহাকার, থাকে মানবতাবোধ।

খবরের কাগজের অফিসে যতদিন ছিল, আবদুর রহমান একথা জানত যে, তার বন্ধু আবদুল কাদির কাজের অবসরে বসে বসে পুরনো খবরের কাগজগুলো ছিঁড়ত। পাতা ছিঁড়ে কুটি কুটি করত। অফিসের বেয়ারা রোজ দিনের কাজ শেষে বেতের ঝুড়ি ভর্তি করে কাগজ টেনে নিয়ে ফেলত রাস্তার ডাস্টবিনে। কেন সে এরকম কাজ করত কেউ সাহস করে কোনোদিন জিজ্ঞেস করেনি। কিন্তু আবদুর রহমান জানত তার বন্ধুর মনে শান্তি নেই। কিন্তু কিসের যে অশান্তি সে জানত না। জানার অবশ্য মওকাও হয়নি।

এত গভীরভাবে মানুষ নিয়ে চিন্তা করা আবদুর রহমানের চারিত্রিক বৈশিষ্ট্য নয়, তবু সে চিন্তাভাবনা করে। প্রায় সব বন্ধুদের নিয়েই আবদুর রহমান চিন্তা করে। তবে সকলে ঢাকায় থাকে না। কেউ কেউ বিদেশ পাড়ি দিয়েছে। আজকাল বিদেশ পাড়ি দেয়া তো এমন কিছু কঠিন ব্যাপার নয়।

হ্যাঁ, আবদুর রহমান তার স্কুলের বন্ধুদের ভালোবাসে। আর বাসে বলেই সে সেদিন বন্ধুর বাচ্চার অসুখের কথা শুনে ঝট করে পাঁচ হাজার টাকা বের করে দিয়েছিল। মনে মনে একথা জেনেও যে হয়তো জীবনেও এ টাকা সে ফেরত পাবে না। আর না পেলেও তার কিছু এসে যাবে না। সে তার এলাকার দোকান ব্যবসায়ী সমিতির ট্রেজারার। এলাকায় তার একটা মান-সম্মান আছে। টাকা-পয়সা আছে বলেই না মান-সম্মান আছে। টাকাই তো আজকাল মানুষের হয়ে কথা বলে!

সেই হিসেবে আবদুল কাদিরের কী আছে? এত ভালো লেখাপড়া শিখেও কোনো ভালো সরকারি চাকরি জোগাড় করতে পারেনি।

অনেক কিছু ভাবতে ভাবতে আবদুর রহমান দরজার কাছে পৌঁছে গেল।

দরজার গোড়ায় বেল আছে। বেল টিপতে দরজা খুলে গেল। তার সামনে এখন দাঁড়িয়ে আছে রেহানা। কাজের মেয়েই সাধারণত দরজা খোলে। আর দরজা খুললেই কাজের মেয়ের শরীর থেকে কাঁচা রসুনের গন্ধ বেরোয়। তখন জোর করে নিঃশ্বাস বন্ধ রাখতে হয় আবদুর রহমানকে অন্তত কিছুক্ষণের জন্য। রেহানার পরনে নীল রঙের ছাপা শাড়ি। চুল সুন্দর করে আঁচড়ানো। মুখে প্রসাধন। এত রাতেও মুখে প্রসাধন? ব্যাপার কি, ভাবল আবদুর রহমান। আরও কনফিউজিং রেহানার ঠোঁটে মিষ্টি একটা হাসি। ঐ হাসিটুকুই যা স্বস্তি দিল আবদুর রহমানকে। আর যাই হোক খবর নিশ্চয় ভালো। নইলে স্ত্রীকে নিয়ে তার মনের ভেতরে সর্বদাই কেমন যেন এক দুশ্চিন্তা।

ব্যাপার কি? আবদুর রহমানও একটু হেসে জিজ্ঞেস করল।

ঘরে চলো, বলছি। কথা বলে রেহানা শোবার ঘরে চলে গেল।

স্ত্রীর ব্যবহারে মনে মনে একটু বিরক্ত হল আবদুর রহমান। আরে, এত ভনিতার দরকার কি? সোজাসুজি বলে দিলেই তো হয়।

ঘরে গিয়ে জামাকাপড় পাল্টে খাটের ওপর পা ঝুলিয়ে বসতেই রেহানা হাসি হাসি মুখে বলল, জানো, আজ দু’মাস ধরে আমার মাসিক বন্ধ?

আবদুর রহমান শুনে খুশি হবে কি হবে না ভাবতে ভাবতে অবাক হওয়ার ভান করে বলল, বল কি?

খবর শুনে চুপ করে থাকল আবদুর রহমান।

এর আগেও দু’বার করে রেহানা এভাবে ঘোষণা দিয়েছে যে তার বাচ্চা হবে, কিন্তু পরে দেখা গেছে তার মাসিকের গণ্ডগোল। তখন সাংঘাতিক এক কাণ্ড হয়ে যায়। তখন সে বমি করে। খাবারে নানা প্রকারের গন্ধ পায়। অরুচি শুরু হয়ে যায়। অর্থাৎ পাকে প্রকারে রেহানা প্রমাণ করার চেষ্টা করে সে গর্ভবতী। তারপর দিন যেতে যেতে তাকেও বাস্তবতার সম্মুখীন হতে হয়। কিন্তু রেহানা সেটাকে তার গর্ভপাত বলে শনাক্ত করে। মানুষকে তখন বলে, আমার কী যে হয়েছে, গর্ভধারণ করি, কিন্তু অল্প কিছুদিন বাদেই গর্ভপাত হয়ে যায়। আরও বলে, আজ আমার প্রথম সন্তানটি বেঁচে থাকলে সাত বছরের হতো!

আবদুর রহমান স্ত্রীর এ মানসিক বিপর্যয়ে খুব একটা সাহায্য করতে পারে না। কারণ সে মেয়েদের এসব জটিল মনোভাবের মাথামুণ্ডু কিছু বুঝতে পারে না। বরং সে কিছুদিন ধরে আরেকটি বিয়ে করবে কি-না গোপনে এটাও ভাবছে। নইলে এতসব সয়সম্পত্তির ভবিষ্যৎ কী?

তবে তার এ ভাবনাটা এখন পর্যন্ত মনের ভেতরেই শুধু ঘোরাফেরা করে। বাইরে বেরোতে সাহস পায় না। এখন হঠাৎ মনে হল এবারও যদি বাচ্চা না হয়, তাহলে প্রস্তাবটা পাড়বে কি-না এবং সেই প্রস্তাব পাস করিয়ে নেবে কি-না।

মুখে সে বলল, আল্লাহর রহমত রেনু, এবার যদি সত্যি সত্যি বাচ্চা হয়, তাহলে আজমির শরিফে গিয়ে খাজা বাবার দরগায় সিন্নি দিয়ে আসব।

স্বামীর কথা শুনে রেহানার চোখে-মুখে একটা খুশির ঝিলিক উঠল। বলল, সত্যি বলছো তো?

সত্যি গো সত্যি, আবদুর রহমান বলল।

রেহানা বলল, দেখ, গতবারেও আমার পেটে বাচ্চা এসেছিল, কিন্তু বদ জিনের আছরে বাচ্চাটা নষ্ট হয়ে গেল। তারও আগেরবারে সেই একই অবস্থা। হুজুর তাই আমার জন্য এবার বিশেষ এক দোয়া দিয়ে আরেকটা তাবিজ তৈরি করে দেবেন বলেছেন। সেটা পরতে হবে কোমরে। একটু বড় সাইজের হবে তাবিজটা। পরশু গিয়ে নিয়ে আসব।

খবর শুনে আবদুর রহমান বলল, খুব ভালো।

কিন্তু মনে মনে একটু উদ্বিগ্ন হল। এসব তাবিজে কোনো কাজ হয় বলে তার বিশ্বাস নেই। খামোখা টাকা-পয়সার শ্রাদ্ধ। আগেও এ সম্পর্কে তার তিক্ত অভিজ্ঞতা আছে।

একটু পরে কি মনে হতে রেহানা স্বামীর মুখের দিকে তাকিয়ে নিচু স্বরে বলে উঠল, তুমি খুশি তো?

তার কথা শুনে মনে মনে ইতস্তত করে আবদুর রহমান বলল, বাঃ, খুশি হবো না? তুমি বল কি?

রেহানা এবার স্বামীর পাশে বসে তার গা ঘেঁষে আদুরে গলায় বলল, কি নাম রাখবে বাচ্চার?

নাম? একটু ঢোক গিলে বলে উঠল আবদুর রহমান।

হ্যাঁ, হ্যাঁ, কি নাম রাখবে?

আবদুর রহমান এবার ভেবে বলল, আগে পয়দা হোক। তারপর তো নাম। ছেলে হবে না মেয়ে হবে, তারই তো ঠিক নেই।

কথাটা মুখে বললেও আবদুর রহমান যে ক্রমাগত তার স্ত্রীর স্বপ্নের জালে ধরা দিচ্ছে বুঝতে পারল। কিন্তু বুঝেও সরে আসতে পারল না।

তাহলে আমি বলি, যদি মেয়ে হয়, তাহলে তার নাম রাখব আমি, মাদুলি। বলল রেহানা।

মাদুলি? নাম শুনে হো হো করে হেসে উঠল আবদুর রহমান।

বাঃ, মাদুলি খারাপ নাম? অভিমান করে বলল রেহানা।

না তো? এখন এসব কথা ছাড়ো, আমাকে খেতে দাও। আবদুর রহমান বলে উঠল।

দিচ্ছি, দিচ্ছি। বলল রেহানা। তারপর বলল, কেউ রাখে না তাই। নইলে নামটার ভেতরে কত মিষ্টি একটা ভাব আছে, জানো? তাছাড়া হুজুরের মাদুলির জোরেই তো ও টিকবে।

আবদুর রহমান এবার গম্ভীর হয়ে বলে উঠল, আমার মনে হয় রেনু, ডাক্তারের কথা ভুলে যেও না। কাল-পরশুর ভেতরেই ডাক্তার দেখাও।

একথায় একটা ছায়া পড়ল রেহানার মুখে। সে বলল, যাবো ডাক্তারের কাছে। কিন্তু ডাক্তাররা কেউ তো এতদিনেও কিছু করতে পারল না। কত ওষুধ, কত পথ্যি। সব বিফলে গেল!

আবদুর রহমান এবার জোর গলায় বলল, না পারলেও যেতে হবে। কারণ বয়স একটু বেশি হলে শুনেছি বাচ্চা হতে মেয়েদের বড় ঝকমারি হয়।

কিন্তু রেহানা যেন আবদুর রহমানের কথা কানে শুনতে পেল না, এমনি মুখ করে বলে উঠল, আচ্ছা, তুমি বললে না তো ছেলে হলে কি নাম রাখবে?

স্ত্রীর মুখের দিকে তাকিয়ে আবদুর রহমানের বুকের ভেতরে হঠাৎ কেমন করে উঠল। দশ বছর বিয়ে হয়েছে তাদের, অথচ এতদিনেও কোনো সন্তান হল না। সে জানে না, এবারও রেহানা গর্ভবতী কিনা। হয়তো মা হওয়ার কত তীব্র বাসনা। এবারও যদি রেহানা মা না হয়, এবারও যদি ডাক্তার পরীক্ষা করে বিরস মুখে বলে, এটা ফলস প্রেগন্যান্সি, তাহলে কী উপায় হবে? সত্যি কথাটা ডাক্তারের মুখে শোনার ভয়েই না রেহানা ডাক্তারের সংসর্গ পরিহার করতে চাচ্ছে।

আবদুর রহমান এই প্রথম রেহানার কাঁধে হাত রাখল। তার অতৃপ্ত পিতৃহৃদয় রেহানার দুঃখকে যেন নতুন চোখে দেখার চেষ্টা করল।

রেহানা ঝুল ধরে বলল, বলো না গো, কী নাম রাখবে?

আবদুর রহমান মৃদু স্বরে বলে উঠল, এখনও কিছু ভাবিনি, রেনু।

তাহলে ভাবো এখন। রেহানা তার মুখের দিকে চোখ ফেলে রেখে বলল।

তাইতো। যেন নিরুপায় হয়ে বলে উঠল আবদুর রহমান।

তাইতো, মানে? বলল রেহানা।

মানে, কি নাম রাখব, তাই ভাবছি। আচ্ছা, সুমন রাখলে কেমন হয়?

নামটা মুখ ফসকে বেরিয়ে যেতেই আবদুর রহমানের হৃৎপিণ্ডের ভেতরে কী একটা যেন শিরশির করে উঠল।

তার ছেলেবেলার বন্ধু আবদুল কাদিরের মৃত ছেলেটিকে সে কি আবার নামের ভেতর দিয়ে ফিরিয়ে আনতে চাচ্ছে?

৯.

সন্ধ্যে হয় হয়। দোকানে দোকানে বাতি জ্বলে উঠেছে। এমন সময় একদল ছোকরা এসে হামলে পড়ল দোকানে।

চা খাওয়া বন্ধ হয়ে গেল আবদুর রহমানের। সে চিন্তা করতে লাগল দ্রুত। কিন্তু ঠিকমতো কিছু চিন্তা করতে পারল না। সবচেয়ে লম্বা ছেলেটা সোজা তসির মিয়ার সামনে দাঁড়িয়ে বলল, আমরা ম্যাচে ফুটবল খেলার চান্স পাইছি। কিছু চান্দা লাগব।

ঠিক সেদিনই ছোকরা ডাক্তারটা চেম্বারে বসেনি। নাকি ব্যক্তিগত কোনো কাজে সে ময়মনসিংহ গেছে। ফিরবে কাল বিকেলে।

তসির মিয়া আজ ক’দিন ধরে নারায়ণগঞ্জের ট্যানারিতে যায় না। সেখানে আবদুর রহমানের মেজ ভাই খলিলুর রহমান অন্য একজন লোক নিয়োগ দিয়েছে। তার ভাইয়ের ভাষ্যে ট্যানারি বিজিনেস হয়তো বন্ধ করে দিতে হবে। এখন এসব ব্যবসা চালানো দিন দিন কঠিন হয়ে উঠছে। প্রথম কথা ভালো চামড়া পাওয়া যায় না, তার ওপর গ্রামগঞ্জ ঘুরে ঘুরে চামড়া সংগ্রহ করা মুশকিল। চামড়া সংগ্রহ হলেও তার রক্ষণাবেক্ষণে দিন দিন ঝামেলা হয়ে যাচ্ছে। চামড়া চালান দিতে গেলেও নানা রকমের ফন্দিফিকির করতে হয়।

আবদুর রহমানের এতসব বিক্ষিপ্ত ভাবনার মাঝখানেই ভর সন্ধ্যেয় এতগুলো ছেলে এসে দোকানে হাজির।

তসির মিয়ার মাথা খুব ঠাণ্ডা। হৈ হট্টগোলে সে সহজে বিচলিত হয় না।

লম্বা ছেলেটার পেছনে আরও সাত-আটজন ছেলেকে দাঁড়িয়ে থাকতে দেখে তসির মিয়া ধীরে ধীরে উচ্চারণ করল, চান্দা?

লম্বা ছেলেটি ধমকে উঠে বলল, হ, হ, চান্দা। চান্দা কারে বলে জানেন না?

তসির মিয়া উত্তরে বলল, তা অবশ্য জানি, কিন্তু আমরা তো এভাবে কাউরে চান্দা দেই নাই আগে।

তসির মিয়ার কথায় ছোকরাদের ভেতরে একটা হাসির হুল্লোড় পড়ে গেল। একজন বলে উঠল, সগীর ভাই, লোকটা বোতলে কইরা দুদু খায়, এভাবে কাউরে নাকি সে চান্দা দেয় নাই আগে, আজ চান্দা দেয়া শেখান।

লম্বা ছেলেটা যার নাম সগির, যার এক কানে মেয়েদের মতো মাকড়ি ঝুলছে, সে কাউন্টারে কনুই ভাঁজ করে রেখে দু’হাতের পাতায় তার সরু চিবুকটা ধরে রেখে ধীরে ধীরে বলল, আমরা জিতলে আপনাদের এলাকার নাম হবে। আমরা চোর না। আমরা আমাগো এরিয়ার সুনাম কিনতে চাই। তার জন্য সাহায্য লাগব।

তোমরা কে? তছির মিয়া শান্ত গলায় জিজ্ঞেস করল।

আমরা এ পাড়ার বয়েজ ভেঞ্চার গ্রুপ। বলল ছেলেটি।

তোমাদের তো কখনো আগে এ পাড়ায় দেখিনি?

এ কথার উত্তরে একটি কিশোর চেঁচিয়ে উঠে বলল, এবার থেকে আমাদের দেখবেন। আমরা রেগুলার আসব।

দোকানের পেছনে বসে আবদুর রহমান সব শুনছিল। বুকে হাঁপর পড়ছিল তার। ছোকরাগুলো খুব সম্ভব জানে না যে সে এই দোকানের ভেতরে বসে আছে। অথবা জানে কিন্তু ইচ্ছে করেই উপেক্ষা করছে তাকে। হোক না সে এই এলাকার দোকানদার সমিতির ট্রেজারার, তাতে তাদের কিছু যায় আসে না। এমন দিন হয়তো আসবে যেদিন তারাই পাড়ার নেতা হিসেবে দোকানদারদের ভেতর থেকে ট্রেজারার নিয়োগ করবে। ততদিনে আবদুর রহমানের আশা সে রিটায়ার করবে।

এখন তারা টাকা চাইতে এসেছে, টাকা পেলেই চলে যাবে। আর যদি না পায়, তাহলে কি ঝামেলা করবে, কে জানে। আজকাল তো এদের কাছে থাকে না এমন মারণাস্ত্র নেই।

এত বছর এখানে ওষুধের দোকান করছে আবদুর রহমান, কোনোদিন এরকম দল বেঁধে কেউ চাঁদা চাইতে আসেনি। এখন জোরে একটা ঘুষি মারলেই তো দোকানের শোকেস ভেঙে চুরমার হবে। এখন সন্ধ্যেবেলা একি মুসিবত। কিছুক্ষণ আগেই ভাবছিল রাস্তার উল্টোদিকে আরেকটা দোকান ভাড়া নেবে, সেখানে তসির মিয়াকে বসাবে, এ মুহূর্তে ভাবনাটাকে দু’পায়ে মাড়িয়ে ফেলল।

আবদুর রহমান দোকানের ফাঁক দিয়ে দেখল তসির মিয়া ক্যাশ বাকসো না খুলে নিজের পকেট থেকে পঞ্চাশ টাকার নোট বের করে সগির নামে ছেলেটির হাতে দিতে গেল।

সগির লাল নোটটার দিকে এক পলক তাকিয়ে দেখে গম্ভীর স্বরে বলল, ইয়ার্কি করেন, না? আমাগো ভিখারি পাইছেন? দু’হাজারের নিচে আমরা চান্দা নেই না।

আর খুব জলদি কইরেন মিয়া, আমরা বেশি সবুর করুম না। আমাগো অন্য প্রোগ্রাম আছে।

গোঁফের সরু রেখা ওঠা ছেলেটি ভাঙাচোরা গলায় পাশ থেকে বলে উঠল।

তসির মিয়া একটু ভেবে নিয়ে বলল, এত টাকা তো দিতে পারুম না।

তার মানে? চোখ গরম করল সগির।

এত ট্যাকাতো আমার কাছেই নাই। তসির মিয়াও গম্ভীর হয়ে বলল।

আপনার ক্যাশ বাকসো খোলেন, আমরা দেখতে চাই। বলল সগির।

ক্যাশ বাকসোর চাবি আমার কাছে নাইকা। সগির সাতক্ষীরার মানুষ হলেও দিব্যি ঢাকাইয়া চালিয়ে যেতে লাগল। এত বড় সংকটের ভেতরেও আবদুর রহমান মনে মনে প্রশংসা না করে পারল না।

এইবার মোটাসোটা একটি ছেলে যে এতক্ষণ চুপ করে দাঁড়িয়ে ছিল বলে উঠল, কার কাছে চাবি আছে? বুজছো সগির, এই লোক আমাগো সাথে ধান্ধা করে।

সগির ছেলেটার দিকে এবার ভালো করে তসির মিয়া তাকালো। নিজের অজান্তেই গা শিরশির করে উঠল তার। ছেলেটি লম্বা এবং রোগা। গলার পুঁটলি তেকোণা হয়ে চামড়া ফুটে বেরোচ্ছে। চোখ দুটো কোটরে। সেখানে মণি দুটো ঠাণ্ডা এবং স্থির। ঠিক যেন এক গোক্ষুর।

এ ছেলে মাদকাসক্ত। তসির মিয়া মনে মনে বলল। হেরোইন, হেরোইন খায়। না, না, ফেনসিডিল সিরাপ। আজকার ফেনসির খুব কদর এসব এলাকায়। মনে মনে বলল তসির মিয়া।

সগির খুব ধীর স্বরে পরিষ্কার বাংলায় বলল, মাত্র দু’হাজার টাকা আপনাদের মতো দোকানগুলোর হাতের ময়লা। চিন্তা করে দেখেন কত লাখ লাখ টাকার ওষুধ সরকারকে কর ফাঁকি দিয়ে আপনারা বিক্রি করেন। সামান্য অজুহাতে কত ওষুধের দাম রাতারাতি বাড়িয়ে দেন। কত ওষুধ মওকা বুঝে গুদামে লুকিয়ে রাখেন দাম বাড়াবার জন্যে। কত এক্সপায়ার ডেটের ওষুধ আপনারা লেবেল পাল্টে বাজারে ছাড়েন এবং এভাবে জনগণের জানমালের-

আমরা এইসব কাম করি না।

তসির মিয়ার উত্তর শুনে যেন হাসির হুল্লোড় পড়ে গেল ছেলেদের ভেতরে। দলের ভেতর থেকে একজন গলা লম্বা করে বলে উঠল, জেরুজালেম থেকে কবে এসেছেন, ভাইজান?

কথা শুনে মুখ লাল হয়ে উঠল তসির মিয়ার। সে চুপ করে থাকল। ছোকরাগুলো ভাগ্যিস আবদুর রহমানের উপস্থিতি টের পায়নি। যদি পেত তাহলে হয়তো তাকে টানাটানি শুরু করে দিত। আর ক্যাশ বাকসোর চাবি আবদুর রহমানের ফুলপ্যান্টের পকেটের ভেতরেই থাকে।

আবদুর রহমান ভেতর থেকে উঁকি মেরে দেখল ছোকরাগুলোর চুল ঘাড় পর্যন্ত ছাঁটা, চাঁদির দুপাশ কামানো। পরনে ছেঁড়া জিনস। হাতে লোহার বালা। কারও কারও হাতে রুপোর চেইন। এই এক স্টাইল শুরু হয়েছে, হাতে রুপোর চেইন। আর পাশ কামানো মাথা। তবে লম্বা চুলের আধিক্যই এখন পর্যন্ত বেশি।

তসির মিয়া এইসময় হঠাৎ এক কাণ্ড করে বসল। সে পঞ্চাশ টাকার নোটখানা পকেটে ভরে শান্ত গলায় বলল, অত টাকা চাঁদা আমি দিতে পারব না। আমি মালিকের চাকরি করি। আমি মালিক না।

কি বললেন?

তসির মিয়া গোঁ ধরে বলে উঠল, যা বললাম, তা তোমরা শুনেছ। এখন এই দুশো টাকা রাখলাম। ইচ্ছে হলে নিয়ে যেতে পার।

কথা বলে তসির মিয়া দুশো টাকা কাউন্টারে রাখল।

দলের মোটা ছেলেটা দ্রুতবেগে এগিয়ে এসে কাচের শোকেসের ওপর বসাল এক ঘুষি। সঙ্গে সঙ্গে কাচ ফেটে গিয়ে বড় বড় তেকোণা কিছু টুকরো চারদিকে ছড়িয়ে পড়ল। ছেলেটা এত চালাক যে ঘুষি মারার আগে নিজের হাতটাকে রুমাল দিয়ে জড়িয়ে নিয়েছে।

যেন তার নিজের কোনো ক্ষতি না হয়। কাচ ভেঙে যাবার শব্দে অন্য ছেলেগুলো লাফ মেরে সরে দাঁড়াল দোকানের বাইরে।

এমন সময় ক্রিং ক্রিং করে বেজে উঠল টেলিফোন। পাশের দোকান থেকে লাফ মেরে বেরিয়ে এল সব লোকজন। আশেপাশের দোকানের ঝাঁপ পড়তে লাগল ঝপঝপ করে।

সগির ছেলেটি অবস্থা মুহূর্তে যাচাই করে দুশো টাকা পকেটে পুরে নিয়ে বলল, তাহলে পাওনা থাকল বাকি টাকাটা। সুদে আসলে পরের বার শোধ হবে।

ছেলেগুলো দোকান ছাড়লে পাশের খোপ থেকে পায়ে পায়ে বেরিয়ে এলো আবদুর রহমান।

তসির মিয়া একবার মাত্র মুখ তুলে তার দিকে তাকিয়ে নীরবে মেঝে থেকে কাচ তুলতে লাগল।

নিজেকে কেমন বোকার মতো মনে হতে লাগল আবদুর রহমানের।

যদিও সে বুদ্ধিমানের মতো ছোকরাগুলোর সামনে এসে দাঁড়ায়নি, তবুও কোথায় যেন একটা কাপুরুষতার ভাব আছে। সেটা কাটিয়ে উঠতে তাড়াহুড়ো করে বলল, না, না, তসির কাচ তুইলো না। এখুনি থানায় গিয়া রিপোর্ট দিতে হবে। সব আলামত রেখে দাও। পুলিশ এসে নিজের চোখে দেখবে।

তসির মিয়া মনে মনে ভয় পেয়েছিল খুব, আর কিছু না হোক সগির ছেলেটা তাকে ঘুষি বসিয়ে দিতে পারত। তখন কি হতো? দেশে তো তার বউ-বাচ্চা আছে?

আবদুর রহমানের নীরব ভূমিকাও তার ভালো লাগেনি।

সে মুখ গোঁজ করে ঝাড়ু দিতে দিতে কী যেন চিন্তা করতে লাগল।

আবদুর রহমান হাসার চেষ্টা করে বলল, কও কি তসির মিয়া। কাচ তো কালই লাগায়া নিতে পারব, কিন্তু ক্যাশ বাকসে হাত পড়লে তো সর্বস্বান্ত হইয়া যাইতাম। তুমি খুব বুদ্ধিমানের মতো কাম করছো, তসির।

তসির মিয়া এ কথায় একটু হাসলো। কিন্তু ঘর ঝাড়–ও দিতে লাগল আপন মনে।

পাশের দোকানে মালিক এবার ঘরে ঢুকে বলল, হালার পোরা কত ট্যাকা চান্দা হাতাইছে, তসির ভাই?

উত্তরে তসির চুপ থাকল। বেশি কথা বলা তার স্বভাবে নেই।

আরও কিছু মানুষ জড়ো হল এতক্ষণে। কেউ পাশের দোকানের। কেউ বা রাস্তার ওপারের জেনারেল স্টোরের মালিক।

আবদুর রহমান তাদের পাশ কাটিয়ে তসিরের দিকে তাকিয়ে বলল, আমি এবার থানায় যাই, জিডি কইরা আসি। অথবা এফআইআর। এইভাবে চান্দা দিলে তো দোকান লাটে উঠবে। মাঝে মাঝে আমার কি মনে হয় জানো, তসির।

হঠাৎ করে আবদুল কাদিরের কথা মনে ওঠাতে মনে মনে ভীষণ বিরক্ত হল আবদুর রহমান।

বিরক্তিতে ভুরু কুঁচকে গেল তার।

১০.

আবদুর রহমান একজন ঘাঘু বিজনেসম্যান। ছেলেবেলা থেকে বাবার ওষুধের দোকানে দাঁড়িয়ে থেকে তার হাতেখড়ি। একেকটা ওষুধের নাম মনে মনে জানতে হতো তখন তাকে। ওষুধের মোড়ক দেখে বাইরে থেকে ওষুধ চিনতে হতো। আলমারির কোন তাকে কোন ওষুধ, কোথায় অ্যান্টিবায়োটিক, কোথায় অ্যান্টি হিস্টামিন, কোথায় অ্যান্টি রিউমাটিক, কোথায় ভ্যাকসিন বা ভিটামিনের তাক, সবকিছু মুখস্থ রাখতে হতো। তার বাবা বলত, ডাক্তারের প্রেসক্রিপশন যে যত দ্রুত পড়তে পারবে, সে তত মুন্সীয়ানা দেখাবে তার ব্যবসায়ে। একেকটা ডাক্তারের প্রেসক্রিপশন তার বাবা আবদুর রহমানের নাকের ডগায় মেলে ধরে বলত, দ্যাখ, বাপজান, এই হলো গিয়ে ডাক্তারের সঙ্গে আমাগের লুকোচুরি খেলা। তার হাতের লেখা যদি আমি সহজে বুঝে যাই তো সে কোনো ডাক্তারই না! আগে আগে তো ডাক্তার আর কম্পাউন্ডারের ভেতরে চলত একটা মজার খেলা। যতবড় ডাক্তার, তত তার কম্পাউন্ডারের সাথে এক ধান্ধাবাজ খেলা। আগে আমারে কত ওষুধ তৈরি করে দিতে হতো, তখন তো আরও কঠিন ব্যাপার ছিল। এখন প্রায় সব ওষুধ পেটেন্ট, তবু তাদের নাম যখন প্রেসক্রিপশন প্যাডে লিখবে, এমন ভাবে লিখবে যেন আমরা দোকানিরা বুঝতে না পারি। যেন আমরা ঘোল খেয়ে যাই।

বাবার সঙ্গে সারাদিন তখন সে দোকানে দাঁড়িয়ে থাকত। হয়তো আবদুল কাদিরের মতো অত গরিব ছিল না তার বাবা, তবু অনেকদিন তাকে খালি পায়ে স্কুলে যেতে হয়েছে। তারওপর বাড়িতে সৎ মা ছিল। সৎ মা তাকে ভালোবাসত না। পারতপক্ষে তার ক্ষতি করারই চেষ্টা করত মহিলাটি, তবু তার স্নেহ পাওয়ার জন্যে মনের ভেতরে একটা আকুলি থেকেই যেত আবদুর রহমানের। লেখাপড়ায় সে ভালো ছিল না, কিন্তু তাকে ভালো করার জন্যে কেউ চেষ্টাও করেনি। হয়তো তার বাবা জানত আবদুর রহমানের বেশি লেখাপড়া জানার দরকার নেই। দোকানে বসে বা দাঁড়িয়ে কাস্টমারের হাতে ওষুধ তুলে দিতে কতখানিই বা বুদ্ধি খরচ করতে হয়!

এদিকে স্কুলের মাস্টাররাও ব্যস্ত ছিল তার মাথায় গাট্টা মারতে। আসলে তো বুদ্ধি কম ছিল না আবদুর রহমানের। কিন্তু সে বুদ্ধি ব্যবহার করার কায়দা কেউ তাকে শিখিয়ে দেয়নি। তার মনের ভেতরে সর্বক্ষণ যেন এক অস্থিরতা বিরাজ করত তখন। সে নিরাপত্তাহীনতায় ভুগত। বিয়ের পরও এর সুরাহা হয়নি। বিবাহিত জীবনে সে রেহানাকে কখনো আন্তরিকভাবে কাছে পায়নি। রেহানা সর্বক্ষণ যেন নিজেকে নিয়েই ব্যস্ত থাকতে ভালোবাসে।গভীরভাবে সে কোনোদিন আবদুর রহমানকে অনুভব করতে পেরেছে কি-না, আবদুর রহমান জানে না। এই যে তার সন্তানের জন্যে মাথা কোটা এতে তার নিজের মনের না পাওয়ার অনুভূতিটুকুই প্রখর, আবদুর রহমানের মনের ভেতরে যে একটা হাহাকার থাকতে পারে, এ ব্যাপারে যেন তার কোনো সচেতনতাই নেই!

এবং সেদিন যা ভেবেছিল আবদুর রহমান, হলও তাই। ডাক্তার রেহানার পেটে হাত দিয়েই সাফ বলে দিয়েছে, রেহানা গর্ভবতী নয়।

তবে এর পরপর আশ্বাসও দিয়েছে। বলেছে বাচ্চা গর্ভে ধারণ না করার পেছনে কোনো যৌক্তিকতা নেই। কারণ স্বামী-স্ত্রী দু’জনের ভেতরে কোনো প্রকারের শারীরিক ঝামেলা নেই। যে কোনোদিন, যে কোনো মুহূর্তে বাচ্চা গর্ভে ধারণ করতে পারে রেহানা।

রেহানা এবারও ডাক্তারের কথা বিশ্বাস করেনি। বাড়ি ফিরেই সে কয়েকবার ওয়াক, ওয়াক করে বমি করার চেষ্টা করেছে। তার মনে এখনও বদ্ধ ধারণা সে গর্ভবতী।

বউ আমার বাচ্চার অভাবে পাগল হয়ে যাবে, নাকি?

কথাটা ভেবে রেহানার মুখের দিকে আজকাল যেন তাকাতে পারে না সে।

আপনমনে গর্ভধারণের অভিনয় করে যাচ্ছে রেহানা, নিজেকে কল্পনার জগতে ঠেলে ফেলে।

নিজেকে কেমন জানি আপরাধী মনে হয়।

মনে হয় বাচ্চা না হওয়াটা যেন তারই অপারগতা।

দোকানে বসে নিজের চিন্তায় যেন বুঁদ হয়ে বসেছিল আবদুর রহমান। দোকানটা একেবারে মেইন রোডের ধারে। দোকানের সামনে চওড়া ফুটপাথ। কত লোক তার দোকানের দিকে তাকাতে তাকাতে হেঁটে চলে যাচ্ছে। এই এলাকায় ওষুধের দোকান হিসাবে তারটা বেশ বড়। বিক্রিও হয় সবচেয়ে বেশি। রহিম ও বেলায়েত সকাল-সন্ধ্যে খাটতে খাটতে হয়রান। সন্ধ্যের পর আসে তসির মিয়া। তখন ভিড় হয় আরও বেশি। কারণ সে সময় এলাকার ডাক্তাররা প্র্যাকটিস করতে বসে যায়। তারা যে প্রেসক্রিপশন লেখে সেই প্রেসক্রিপশন নিয়ে লোকজন ভিড় করে। রাত নটার পর থেকে ভিড় কমে যায়। দশটার সময় আরও কম। রাত বারোটায় দোকানের ঝাঁপ পড়ে। তখন তসির মিয়া দোকানে ঘুমায়। তসির মিয়ার হাতে দোকানের ভার দিয়ে আবদুর রহমান রাত আটটার ভেতরেই বাড়ির দিকে রওনা দেয়।

আজ দুপুরে বাড়ি ফিরে যায়নি আবদুর রহমান। দোকানে ভাত আনিয়ে খেয়েছে। তার খেয়ে যা বাঁচে তাতে রহিমের খাওয়া হয়ে যায়। বেলায়েত সাধারণত বাইরে গিয়ে খায়। তখন সে এক ঘণ্টা ছুটি পায়। আবার কাস্টমার না থাকলে দুপুরের দিকে একটু ঝিমিয়ে নেয় বেলায়েত।

রহিম বিচ্ছুর বাচ্চা। তার চোখে ঘুম নেই। শুধু ছটফট, ছটফট। তবে এমনিতে চুরি-চামারি করে না। কাজেও বেশ চটপটে।

তবে চুরি করা শিখতে আর কতক্ষণ?

রাস্তার দিকে অলস চোখে তাকিয়ে কাউন্টারের ভেতরে দাঁড়িয়ে ছিল আবদুর রহমান। হঠাৎ চিৎকার করে উঠল সে, হেই বেলায়েত, ধর, ধর।

হাঁক শুনে তন্দ্রা ছুটে গেল বেলায়েতের। সে লাফিয়ে উঠে বলল, কি কইত্যাছেন, স্যার?

ঐ, ঐ যে আমার বন্ধু যায়। আবদুল কাদির। ঐ যে, ঐ দ্যাখ, লম্বা চুল, গায়ে পাঞ্জাবি, পায়ে স্যান্ডেল, সামনে ঝুঁকে হাঁটছে। দৌড় দে, ডেকে আন, বল যে আমি ডাকছি।

বেলায়েত ব্যাপারটা ভালো করে বোঝার আগেই রাস্তার ফুটপাথ পার হয়ে ওপারে দৌড় দিল। কিন্তু রাস্তার মাঝখানে দাঁড়িয়ে থমকে গেল সে। তার ডানদিক দিয়ে সাঁৎ করে গাড়ি যায়, বাঁ দিক দিয়ে সাঁৎ করে গাড়ি যায়, ড্রাইভাররা অসহিষ্ণু হয়ে হর্ন বাজাতে লাগল।

উরে বাপরে বাপ, বলে রাস্তার ওপারে দৌড়ে উঠল সে। কিন্তু কোথায় কি। পাঞ্জাবি পরনে কোনো মানুষই তখন রাস্তায় নেই। সব লুঙি, অথবা ফুল প্যান্ট। কিছু সালোয়ার-কামিজ আছে। কিন্তু তারা সব মেয়ে।

আবার রাস্তার এপারে ফিরে এলো সে। তার দিকে তাকিয়ে হঠাৎ রাগ হয়ে গেল আবদুর রহমানের। সে চেঁচিয়ে উঠে বলল, আরে, হাবলা, ঐভাবে কেউ রাস্তা পার হয়? আর একটু হলে আমাকে থানা, পুলিশ, হাসপাতাল করায়ে ছাড়তিস। বেহুদা কাঁহিকা।

খুঁইজা পাইলাম না, সার।

হ, সেইটা তো দেখতেই পাইত্যাছি। যাও এখন কাম করোগে।

মুখে একথা বললেও মনে মনে খুব রাগ হল আবদুর রহমানের। বেশ লোক তো আবদুল কাদির। তার এরকম ব্যবহারের কারণ কি, হ্যাঁ? আর কিছু না হোক সে তো টাকা ধার করেছে বন্ধুর কাছ থেকে একথা তো সত্যি? এবং খুব একটা কম টাকাও নয়। ছেলেটি মারা যাওয়ার এতদিন পর অন্তত টাকাটা শোধ করার কথা চিন্তা করতে পারত আবদুল কাদির। ছেলেতো আর ফিরে আসবে না। কিন্তু ভবিষ্যতে আরও টাকা ধার নেয়ার তো প্রয়োজন হতে পারে।

আবদুর রহমান অবশ্য সব টাকা ফেরত নিত না, এমনকি হয়তো কোনো টাকাই ফেরত নিত না, কারণ আবদুল কাদিরের ছেলে তো তারও ছেলে। হয়তো শেষ মুহূর্তের চিকিৎসাটা কোনো কাজ করেনি। হয়তো ইনজেকশনের বিরূপ প্রতিক্রিয়াও হতে পারে। হয়তো কেএস সোবহান ইনজেকশনের তারিখ পাল্টে তার কাছে বিক্রি করেছে। আবদুর রহমান তা না বুঝে, আরও এক দফা তারিখ পাল্টেছে। ফলে ছেলেটা হয়তো মৃত্যু যন্ত্রণায় ছটফট করতে করতে মরেছে। সাড়ে তিন বছরের ছেলে যখন মুখে সে তার সব কষ্টের কথা বলতে পারে। মুখে বলতে পারে, ব্যথা। মুখে বলতে পারে, কষ্ট। মা-বাবাকে আদর-সোহাগ দেখাতে পারে। হাঁটতে পারে, খেলতে পারে, বায়না ধরতে পারে, ছড়া বলতে পারে। বাপ-মায়ের গলা জড়িয়ে ধরতে পারে।

না, আবদুর রহমান যেন আর ভাবতে পারল না।

১১.

আর সেই যে ডাক্তারের নামে মামলা করবে বলে পরামর্শ নিতে এসেছিল আবদুল কাদির, তারপর থেকে সে আর এলো না। অথচ সে যে এই রাজধানীতে নেই, সেটাও না। এই তো সে একটু আগেই আবদুর রহমানের দোকানের সামনের ফুটপাথ ধরে হেঁটে চলে গেল, একবার তাকাল না পর্যন্ত তার দোকানের দিকে। আবদুল কাদির কি তাহলে বুঝতে পেরেছে যে সেই ইনজেকশনটা তার দোকান থেকেই মূলত সাপ্লাই করা হয়েছিল? কী সর্বনাশ! আর তাই কি তার ওপরে ক্রুদ্ধ হয়েছে সে? তাই কি তার মুখ আর জীবনে দেখবে না বলে সে মনে মনে প্রতিজ্ঞা করেছে? তাই কি সে তাকে মনে মনে গালি দিয়ে বলেছে, শালা, আমার সাধ্য থাকলে, তোর ভিটেয় ঘুঘু চড়িয়ে ছাড়তাম। বাতিল ওষুধের ব্যবসা করিস, হারামখোর, তোর দোকানে আমি আর যাবো না।

কিছু ভাবতে না চাইলেও আবদুর রহমানের মাথার ভেতর কিছু অবাঞ্ছিত ভাবনা জট পাকাতে লাগল।

থাকতে না পেরে একদিন আবদুল কাদিরের অফিসে গিয়ে হাজির হল আবদুর রহমান। যদিও কিছুদিন আগে অফিস থেকে তাকে সে ফ বলে দেয়া হয়েছে যে আবদুর রহমান আর সেখানে কাজ করতে যায় না। তবু সে সেখানেই গেল। কারণ এই একটা মাত্র যোগাযোগের অছিলা তার হাতে বর্তমানে আছে। অফিসটা মতিঝিলে। এ ক’দিন অনেক ভেবেচিন্তে দেখেছে সে। আবদুল কাদিরকে খুঁজে পাওয়ার এই একমাত্র পথ। নতুবা সে নিজে সহজে দোকান ছেড়ে কোথাও যায় না। দোকানে তসির না থাকলে সে সহজে দোকান ছেড়ে বেশিক্ষণ বাইরে থাকে না।

আজ সে পুরো বেলার জন্যেই বাইরে বেরিয়েছে।

দুপুরে আজ ভাত খায়নি। বাইরে কোথাও রুটি খেয়ে নেবে খিদে পেলে।

একটা বেবিট্যাক্সি ভাড়া করে সে মতিঝিল পৌঁছাল। ভাড়া নিল পনেরো টাকা। দিন দিন যাতায়াত খরচ বেড়ে যাচ্ছে এই দেশে। কোথায় গিয়ে ঠেকবে কে জানে। সেদিন তো বাস ভাড়া আট আনার বদলে এক টাকা করায় বিশাল মিছিল বেরিয়ে গেল। লাফ মেরে এত বেশি ভাড়া জনগণ কোত্থেকে দেবে।

আবদুল কাদিরের অফিসটা ইমপোর্ট-এক্সপোর্টের অফিস। বেশ বড় মনে হল। মতিঝিলের একটা পুরনো রঙচটা বাড়ির ওপরের দুটো ফ্লোর জুড়ে অফিস। লিফট নেই। থাকার কথাও নয়। হেঁটে হেঁটে ওপরে উঠতে হয়। দোকানে রাত-দিন বসে থেকে থেকে আবদুর রহমানের শরীর ইদানীং ভারি হয়ে এসেছে। চারতলায় উঠতে তার কষ্ট হল খুব। হাঁফানি থামিয়ে একজনকে জিজ্ঞেস করে জানলো আবদুল কাদিরের বিভাগটা পাঁচতলায়। বাপস। মনে মনে বলল সে।

তবু বিশ্রাম নিয়ে আর একতলা উঠল সে।

সিঁড়ির মুখেই দেখল একজন টাইপিস্ট বসে বসে কি যেন টাইপ করছে। আবদুর রহমানের দিকে এক পলক তাকিয়ে দেখেই সে চোখ নামিয়ে কাজে মন দিল।

আবদুর রহমান জোর গলায় বলে উঠল, আবদুল কাদির সাহেব কি এখানে আছেন?

কে? টাইপিস্ট টাইপ না থামিয়ে এবং মুখ না তুলে জিজ্ঞেস করল।

আবদুল কাদির সাহেব। এখানে পারচেস ডিপার্টমেন্ট কাজ করেন।

ও, কাদির স্যার। প্রশ্ন করে টাইপিস্ট এবার তার মুখের দিকে তাকাল। এবং তাকিয়েই থাকল। একটু পরে কি ভেবে বলল, আসলে আমরাই তো স্যারকে খুঁজে বেড়াচ্ছি।

বলেন কি? অবাক হয়ে বলল আবদুর রহমান।

জি, হ্যাঁ, আজ কতদিন স্যার তো অফিসেই আসেন না।

খবরটা যদিও জানত, তবু না জানার ভান করে আবদুর রহমান বলে উঠল, বলেন কি। কোথাও কি চলে গেছে?

তা তো আমি বলতে পারবো না। তবে মনে হয় তিনি এই চাকরিতেই আছেন। আমাদের এখানে তো স্যার অনেকদিন ধরে আছেন। হয়তো স্যারের কোনো অসুখ হয়েছে।

বলেন কি, অসুখ? আবদুর রহমান যেন একটু ঘাবড়ে গিয়ে তাকিয়ে থাকল।

লোকটি এবার নিজেকে সামলে নিয়ে বলল, আসলে আমি ঠিক জানিনে।

কেন, আপনারা কেউ তার খোঁজ করেননি? এবার যেন একটু রাগ হয়ে বলে উঠল আবদুর রহমান।

আমি তো স্যার সেটা সঠিক বলতে পারব না। টাইপিস্ট এবার মাথা চুলকে বলে উঠল। ভাবল আবদুর রহমান নিশ্চয় কোনো আত্মীয়-টাত্মীয় হবে।

এই সময় করিডোর দিয়ে একজন কর্মচারী হেঁটে যাচ্ছিল। আবদুর রহমানের দিকে তাকিয়ে সে বলল, কার খোঁজ করছেন, জনাব?

লোকটাকে দেখে মনে ভরসা পেল আবদুর রহমান। বলে উঠল, আপনাদের অফিসের আবদুল কাদির সাহেবের। আমার খুব ঘনিষ্ঠ বন্ধু। কিন্তু অনেকদিন যোগাযোগ নেই। খবর পেলাম তিনি আপনাদের এখানে চাকরি করেন। তাই খবর নিতে এসেছি।

আপনার বন্ধু? লোকটা একটু অবাক হয়ে জিজ্ঞেস করল।

জি, বন্ধু। কিন্তু অনেকদিন হল কোনো খবর পাচ্ছিনে। কথাটা বলতে গিয়ে এবার যেন আবদুর রহমানের গলার স্বর কেমন অসহায় শোনালো।

লোকটি এবার ভালো করে যেন আবদুর রহমানকে দেখল। এই একটা জিনিস ইদানীং লক্ষ্য করছে আবদুর রহমান। কথায় কথায় মানুষকে মানুষের সন্দেহ করা।

লোকটি বলল, তাহলে স্যার আপনি তার বাড়িতে খোঁজ নেন। তিনি তো বহুদিন হল আর অফিসে আসেন না। আগে তো আমাদের সাথে স্যার খুব আনন্দস্ফূর্তি করতেন। তারপর কি যে হল।

কথাটা বলে লোকটি আবার চলে যাওয়ার উদ্যোগ করতে আবদুর রহমান ইতস্তত করে বলে উঠল, আপনি কি তার বাসার ঠিকানাটা আমাকে দিতে পারবেন?

বন্ধুর বাসার ঠিকানা অফিসের লোকের কাছে জানতে চেয়ে আবদুর রহমানের কেমন যেন দ্বিধা হল মনে। লোকটা কি ভেবে তার মুখের দিকে তাকিয়ে বলে উঠল, আমি তো স্যারের বাসার ঠিকানা জানিনে। ছেলেটা মারা যাওয়ার পর কেমন যেন উদাসীন হয়ে গিয়েছিলেন। সান্ত্বনা দিতে গেলে বলতেন, আমি তো ভালো আছি ভাই, আমার স্ত্রীকে নিয়ে হয়েছে জ্বালা। সে একেবারে খাওয়া-দাওয়া ছেড়ে দিয়েছে। কিন্তু, আমার যেন সন্দেহ হতো ঠিক উল্টো। মনে হতো তিনিই যেন খাওয়া-দাওয়া ছেড়ে দিয়েছিলেন। আগে খেলাধুলোর দিকে কত ঝোঁক ছিল। বাচ্চাটা মারা যাওয়ার পর তা আর ছিল না। এই যে এতবড় বিশ্বকাপ হয়ে গেল, ম্যারডোনা বলতে সকলে অজ্ঞান, অথচ কাদির সাহেবের মুখে খেলার কোনো কথাই নেই। ইদানীং নিজের চেহারা বা পোশাকের কোনো খেয়ালই ছিল না। আজ তিন মাস ধরে তো কোনো দেখাই নেই। তিনবার চিঠি ছাড়া হয়েছে। শেষবার ওয়ার্নিং লেটার। কিন্তু না, কোনো খবর নেই।

কর্মচারীদের মুখে এইসব কথা শুনতে আবদুর রহমানের খারাপ লাগছিল।

সে এবার কথা ঘোরাবার জন্যে বলল, তার বাসার ঠিকানাটা আপনারা কেউ জানেন?

এ প্রশ্নে সেই লোকটি টাইপিস্টের দিকে তাকিয়ে বলে উঠল, লিটন, তোমার কি ঠিকানাটা জানা আছে?

না, স্যার। হিরু জানে।

হিরু, সে কোথায়? তার কাছ থেকে একটু জেনে দাও।

সে তো স্যার গতকাল থেকে ছুটি নিয়েছে। সাত দিনের ছুটি। লিটন বলল।

আবদুর রহমান বুদ্ধি করে বলল, ঠিকানা নিশ্চয় পাওয়া যাবে। চিঠি যখন একটা কোনো ঠিকানায় গিয়েছে।

ফাইল সব হিরুর লকারে। ওর কাছেই চাবি থাকে।

কথা শুনে মন খারাপ হয়ে গেল আবদুর রহমানের। এটা কি কখনো হতে পারে যে একজন কর্মীর ঠিকানা তার অফিস থেকে পাওয়া যাবে না?

টাইপিস্ট এবার তার স্মরণশক্তি ব্যবহার করে বলল (কারণ চিঠিগুলো তার হাতেই টাইপ হয়) কলুটোলায় কাদির স্যার থাকেন।

আবদুর রহমান তার চোখের দিকে স্থির চোখে তাকিয়ে বলল, তুমি ঠিক বলছ?

আমি শিওর।

তুমি শিওর?

আবদুর রহমানের গুরু গম্ভীর প্রশ্নে এবং তার ছাঁটা দাড়ির দিকে একপলক তাকিয়ে দেখে টাইপিস্ট লিটন তার গাল চুলকে নিয়ে বলল, আমি শিওর মনে হয়।

কারণ আবদুর রহমানের মনে পড়ল একদিন কথায় কথায় কলুটোলার বাসার কথাই যেন বলেছিল আবদুল কাদির।

ঠিকানাটা লিখে নিয়ে আবদুর রহমান আবার রওনা হল তার দোকানের দিকে।

১২.

সেদিন বাড়ি ফিরে গিয়ে আবদুর রহমানের সারারাত ঘুম হল না। রেহানাকে নিয়েও অশান্তি। আজ কত বছর বিয়ে হয়েছে। কিন্তু এভাবে বিমর্ষ হয়ে তাকে বিছানায় পড়ে থাকতে দেখেনি। বরং সব ব্যাপারে তার উৎসাহ বিরক্তির কারণ হয়েছে মাঝে মাঝে। আজ ক’দিন হল সে একেবারে খাওয়া-দাওয়া ছেড়ে দিয়েছে। সর্বক্ষণ বিছানায় পড়ে থাকে। আগের মতো সেই হাসিখুশি, বেড়ানো, আত্মীয়-স্বজনের সাথে মেলামেশা আর নেই। ক’দিন ধরে গর্ভবতী মায়ের অভিনয় করাও ছেড়ে দিয়েছে সে। কথা বলে না কারও সাথে। এমন কি আবদুর রহমানের সাথেও।

পারুল দোতলা থেকে নেমে এসে মাঝে মাঝে রেহানার পাশে বসে। মাঝে মাঝে পারুলের মাও আসে। রেহানার সাথে ভাড়াটেদের খাতির বেশ।

সেদিন পারুলকে রেহানার পাশে বসে থাকতে দেখে আবদুর রহমানের সাথে একবার চোখাচোখি হয়েছিল। আবদুর রহমানের দৃষ্টিতে এমন কিছু ছিল যে পারুলের ঠোঁটে কেমন যেন আবছা একটা হাসি ফুটে উঠেছিল।

আবদুর রহমানের চেহারা সত্যি বলতে খারাপ কিছু তো নয়!

কিন্তু এসব ভাবনা তার মনের ভেতরে স্থায়ী হয় না। কারণ আবদুর রহমান জানে তার জীবন রেহানার সাথেই গভীরভাবে জড়িয়ে গেছে। এ জীবনে আর কারও সাথে সে সংসার করতে পারবে না। মনের ভেতরে যতই অন্য কোনো নারীর উপস্থিতি সে অনুভব করুক না কেন, এসবই তার কল্পনার ভেতরেই থেকে যাবে।

এজন্যে আবদুর রহমানের মনে কোনো ক্ষোভ বা আপরাধবোধ নেই। সে একজন পুরুষ। সে নিজেই জানে জীবনের ঘাটে ঘাটে পুরুষের মনের ভেতরে অন্য নারী নড়াচড়া করে, কিন্তু ব্যস ওই পর্যন্তই। মরার সময় সব পুরুষই নিজের স্ত্রীকেই কাছে পেতে চায়। স্ত্রীর বাঁধন বড় শক্ত বাঁধন। এটা সব পুরুষই জানে।

বাজার ঘুরলে আবদুর রহমানের মন ভালো থাকে। তার বাড়ির কাছেই বাজার। আর এই বাজারে অনেক ধরনের পণ্য। বড় বাজার। কত ধরনের মাছ আর শাক-সবজি ওঠে তার হিসাব নেই। দোকানের তরি-তরকারি চেয়ে চেয়ে দেখতে আবদুর রহমানের এত ভালো লাগে। সেই কবে গ্রাম ছেড়ে এসেছে আবদুর রহমান, তবু কচি লাউয়ের ডগা, তরতাজা চাল কুমড়ো, সবুজ কাঁচকলার কাঁদি, লম্বা সরু বরবটির আঁটি, হালকা সবুজ বেগুন, সবুজ পুঁইশাক তাকে তার নিজের গ্রামের কথা, বাঁশ বাগানের কথা, সবুজ ধানক্ষেতের কথা মনে পড়িয়ে দেয়। মনটা তার ছেলেবেলার মতো যেন সুগন্ধে ভরে যায়। এই শহুরে জীবন, এই বেঁচে থাকার প্রতিযোগিতা, চারপাশের এই টেনশন, আজকাল আবদুর রহমানকে ভারি বিব্রত করে।

মাঝে মাঝে তার মনে হয় কি হবে এভাবে বেঁচে থেকে। এত টাকা-পয়সাই বা কি হবে। কে খাবে তার উপার্জন?

তবে ঐ পর্যন্তই। দোকানে একবার এসে বসলে অবদুর রহমান অন্য মানুষ। ওষুধে এক পয়সারও লাভ ছাড়ে না সে। পারলে দু’পয়সা বেশি লাভ করার চেষ্টা করে। ব্যবসা করার সময় মানুষের সাথে খাতির কিসের?

দোকানে পা দিয়ে মেজাজ খিঁচড়ে গেল তার। বেলায়েতে আসেনি। সদ্য বিয়ে করার পর থেকে ছেলেটার ভেতরে কেমন যেন অস্থিরতা। বউ দেশে রেখে এসেছে। ঢাকা শহরে বাস করা খুব কঠিন কাজ আজকাল। এদিকে শুধু রহিমকে দিয়ে দোকান চালানো তসির মিয়ার পক্ষেও মুশকিল হয় মাঝে মাঝে। ছেলেটা বুদ্ধিমান হলেও ছটফটে। এক ওষুধ দিতে আরেক ওষুধ দেয়। প্রেসক্রিপশন দেখেই ঝটপট বলে দেয় ওষুধ নাইক্যা। অথচ ওষুধ তার নাকের সামনে।

দোকানের ভেতরেই আজ চেয়ার টেনে বসল আবদুর রহমান। সাধারণত সে পেছনের ঘুপচি ঘরটার ভেতরে বসে। ওখানেই বসে সে টেলিফোনের লম্বা তার টেনে নিয়ে যায়। মাঝে মাঝে মানুষজনদের ফোন করে। সবই ব্যবসার জন্যে। ব্যক্তিগত ফোন সে নিজে থেকে কমই করে। তার কাছেই বেশিরভাগ ফোন আসে আত্মীয়-স্বজনের। অবশ্য রেহানাকে তার ফোন করতে হয়। না করলে রেহানা মনে মনে ক্ষুব্ধ হয়।

আজ সে দোকানের ভেতরে বসেই হাঁক পাড়ল, অ্যাই রহিম্যা?

সেই কবে ঢাকায় ব্যবসা করতে এসে প্রথম যে কাজটি করেছে আবদুর রহমান সেটা হল ঢাকাইয়া ভাষা রপ্ত করা। যে দেশে বসবাস সে দেশের ভাষা না শিখলে তার ব্যবসায়ে লস এটা আবদুর রহমান বেশ ভালোই জানে।

এখন তো তার কথা শুনে কেউ মনে করবে না সে মিষ্টি একটা দেশের মিষ্টি একটা ভাষায় কোনোদিন কথা বলত। নাটোরের মুখের বুলির মতো মিষ্টি ভাষা এ দেশে আর কোথায় আছে?

রহিম সাহেবের মনের ভাব বুঝতে না পেরে তড়িঘড়ি করে বলে উঠল, জে স্যার।

এক কাপ চা লয়্যা আয়।

আদেশ শুনে রহিম ছুটে দোকান থেকে বেরিয়ে গেল।

আবদুর রহমান এরপর চোখ তুলে দেখল তার চোখের সামনে হাসি হাসি মুখ করে দাঁড়িয়ে আছে কেএস সোবহান।

আরে মুশকিল, এর ভেতরে সে কোত্থেকে এলো?

আবদুর রহমান বিরস মুখে তাকিয়ে থাকল তার মুখের দিকে।

যে কোনো সময় এখন পুলিশ চলে আসতে পারে। কিছু না, দোকানে বসে হয়তো একটু খোঁজ-খবর নেবে। চা খাবে। কারণ তারা এলেই তাদের চা খাওয়াতে হয়। এটা অলিখিত নিয়ম। এ নিয়মের ব্যত্যয় নেই।

কেএস সোবহান হাসিমুখে তার দিকে তাকিয়ে বলল, ভালো আছেন, রহমান সাহেব?

এই চলছে আরকি। নিরুত্তাপ গলায় উত্তর দিল আবদুর রহমান। এমন কি তাকে বসতেও বলল না। বসতে বলবেই বা কোথায়। টুলগুলো সব দোকানের ভেতরে রাখা আছে।

কেএস সোবহান দাঁড়িয়ে থেকেই বলল, আজ কিছু স্যাম্পল নিয়ে এসেছি।

আজ আর কিছু নেবো না, সোবহান সাহেব। কথাটা বলে যেন চমকে গেল আবদুর রহমান। এরকম কথা কোনোদিন তার মুখ থেকে বেরোয়নি।

মানে? অবাক হয়ে বলে উঠল কেএস সোবহান।

মানে আগেরগুলোই সব স্টক থেকে সরিয়ে ফেলতে হয়েছে। সবগুলোর মেয়াদ পূর্ণ হয়েছে অনেকদিন আগে। শীতের দেশে তাও কিছু কার্যকারিতা থাকে, গরমের দেশে তো সেটা থাকে না, সোবহান সাহেব।

সোবহান কি আর সে কথা জানে না? তবু সে বলে উঠল, আরে না, না, কি যে বলেন।

তা জানিনে, ঘাড় গোঁজ করে বলে উঠল আবদুর রহমান। তারপর ঘাড় উঁচু করে বলল, তা জানিনে, তবে এ নিয়ে আর কথা বলতেও চাইনে। আপনার সেলসে আমি ফোন করেছিলাম। ওরা এসে ট্রেড প্রাইসেই সব মাল সাপ্লাই দিয়ে যাবে এরপর থেকে। সে তো খুব ভালো কথা। আমি আমার কোম্পানির কাছ থেকে আগেই জেনেছি। তাছাড়া এতদিন আমিই তো এসব কাজ করে এসেছি।

তা ঠিক। তবে আপনাকে বলি, ডাক্তারদের স্যাম্পল ডাক্তারদের কাছেই দেবেন। নিজের বাড়িতে ধরে রাখবেন না। আমি জানি আপনারা আজকাল কোম্পানির অলক্ষ্যে নিজের বাড়িতে বহু ওষুধ গোডাউন করে রাখেন। ওসব ওষুধ ডাক্তারদেরই প্রাপ্য। প্রত্যেক কোম্পানি তাদের নিজেদের স্যাম্পল ডাক্তারদের সাপ্লাই করে। দুনিয়ার সব দেশে একই নিয়ম।

তার কথা শুনে একটু যেন স্তব্ধ হয়ে গেল আবদুস সোবহান। কিন্তু সে মুহূর্ত মাত্র। তারপর হাসিতে মুখ ভরে বলল, আপনি তাহলে হয়তো এটা জানেন না, আজকাল ডাক্তাররাও স্যাম্পল বিক্রি করে। তাদের নিকটস্থ ওষুধের দোকানে মাসের শেষে বড় বড় বান্ডিল হয়ে সব ওষুধ চলে যায় বিক্রি হওয়ার জন্যে। ক্যাশ টাকা ডাক্তাররা মাসের শেষে পকেটে ভরে। তাদের কিসের অভাব বলেন তো? ক’জন গরিব রোগী তাদের কাছ থেকে সাহায্য পায়? বরং হক কথা বলতে আমরাই তো অভাবী। এই যে আমার চকচকে পোশাক বাইরে দেখেন এটা তো কোম্পনির দান। এটা খুলে ফেললে আমার শরীরে লুঙি আর ছেঁড়া গেঞ্জি ছাড়া আর কিছু নেই!

কথা বলতে বলতে আবদুস সোবহান যেন একটু উত্তেজিত হয়ে উঠল। অথচ এটা তার স্বভাববিরুদ্ধ আবদুর রহমান জানে।

আবদুর রহমান উত্তেজনা চায় না। সে মাথা ঠাণ্ডা রেখে বলল, তা ঠিক, তবে আমার এখানে আজকাল পুলিশ ঘোরাঘুরি করতে শুরু করেছে।

তার কথা শুনে মুহূর্তে মিইয়ে গিয়ে কেএস সোবহান বলল, সে কি? কেন?

মাস্তান দোকানে হানা দিয়েছিল ক’দিন আগে। তারপর থেকে।…। তবে আপনাকে বলি, আপনার সাপ্লাই দেয়া ইনজেকশনে একটি বাচ্চা মারা গেছে ক’মাস আগে। তার বাবা মামলা করবে ডাক্তারের বিরুদ্ধে বলে গেছে। তখন কিন্তু আপনার সাপ্লাই দেয়া ইনজেকশন নিয়ে টানাহেঁচড়া হবে।

হোক, তাতে আমার কি। আমি তো কিছু করিনি। আমার সাপ্লাই দেয়া ওষুধ তো নকল ছিল না। তাছাড়া তার মেয়াদও শেষ হয়নি। সে তো অনেক আগের কথা। কিছু ঘাপলা হলে আপনিও আমার সাথে মরবেন। আমি না হয় চুরি করে কোম্পানির স্যাম্পল আপনার কাছে বিক্রি করেছি। আজকাল কোন রিপ্রেজেনটেটিভ এসব কাজ না করে? আমিও করেছি। কিন্তু আমি তো কোনোদিন এক্সপায়ার ডেট পাল্টাইনি। আমি তো ওষুধ বাজারের চাহিদা বুঝে ইচ্ছে করে লুকিয়ে রাখিনি!

তার কথা শুনে একেবারে যেন তাজ্জব হয়ে গেল আবদুর রহমান। আরে, এ লোক বলে কি? সব দোষ এসে এখন তার ঘাড়ে চাপছে!

একটু পরে কেএস সোবহান বেশ গম্ভীর হয়ে বলে উঠল, আপনি আমার স্যাম্পল আর নেবেন না? তাহলে অন্য দোকানে যাই। তারা কেনার জন্যে হামলে পড়বে।

কেএস সোবহান বেরিয়ে যেতে আবদুর রহমান মনে মনে বিস্মিত হল। আজকাল চোরের গলার আওয়াজও কত বেড়ে গেছে! মনে কোনো ভয়ডর নেই। এক কোম্পানি ছেড়ে দিলে আরেক কোম্পানিতে হাসতে হাসতে চলে যাবে। ওদের কি! যে কোম্পানি তাকে ট্রেনিং দিয়ে এনেছে, তার মুখেই করবে পদাঘাত।

১৩.

কেএস সোবহান দোকান ছেড়ে বেরিয়ে গেলে যেন হাঁফ ছেড়ে বাঁচল আবদুর রহমান। এই এক জ্বালাতন। আজকাল ওষুধের রিপ্রেজেনটেটিভ আর ইন্সিওরেন্সের দালাল, দুই গ্র“প এক হয়েছে। দেশ স্বাধীন হতে পারেনি, ইন্সিওরেন্সের দালাল পিছু পিছু ঘুরছে। মেয়াদি ইন্সিওরেন্স, জীবন বীমা ইন্সিওরেন্স, খণ্ডকালীন ইন্সিওরেন্স, কতকিছু। টাকা হাতে আসতে পারেনি মানুষের, এর ভেতরেই ডজনকে ডজন ইন্সিওরেন্স। কিন্তু আবদুর রহমানও ঠ্যাটা। আজ পর্যন্ত কোনো দালাল তাকে কুপোকাৎ করতে পারেনি। কার জন্যে ইন্সিওরেন্স? যত সব ঝামেলা।

একটু পরে বেলায়েত এলো। তসির মিয়ার এ বেলা ছুটি। বেলায়েতকে কিছুক্ষণ বকাঝকা করার পর সে ঘুপচি ঘরে গিয়ে ভাঙা সোফাটার ওপর টান টান হয়ে শুয়ে পড়ল।

দুপুর গড়িয়ে বিকেলে সে ঘুম থেকে উঠল। বাড়ির থেকে খাবার এসে পড়ে আছে। রেহানাও কেন জানি আজ এখন পর্যন্ত ফোন-টোন করেনি। পেটে প্রচণ্ড খিদে অনুভব করল। হাতমুখ ধুয়ে ভাত খেল সে। খেয়ে আবার ঘুমোতে গেল।

ঘুম ভেঙে দেখল তসির মিয়া দোকানে দাঁড়িয়ে আছে। তার যদিও আজ ছুটি, কিন্তু হয়তো কোথাও আর যাওয়ার কথা নেই। তসিরকে দেখে মন তার প্রফুল্ল হয়ে উঠল। এই একটি মানুষ যার ওপর সে ভরসা করতে পারে।

ঘড়ির দিকে তাকিয়ে দেখল সন্ধ্যে আসন্ন। এরপর নিজের জামাকাপড়ের দিকে তাকাল। পরনের ট্রাউজারটা ঢোলা। তবে ঘুমোবার জন্যে ততো ভাঁজ পড়েনি। পরনের পাঞ্জাবিও পরিষ্কার। যখনই সে দোকানে ঘুমোয়, দেয়ালের হুকে পাঞ্জাবি ঝুলিয়ে রাখে। তসির মিয়া রাতে যেখানে ঘুমোয় সেখানে একটা চৌকি পাতা আছে। একটা জানালাও আছে সেদিকে। জানালা দিয়ে আলো আসে। রাস্তা দেখা যায়। তবে তসিরের বিছানায় আবদুর রহমান ঘুমোয় না। তার জন্যে আলাদা একটা সোফা পাতা আছে। অনেক পুরনো এই দোকানটা সে লিজ নিয়েছে আবার নতুন করে দশ বছরের। পারলে কিনে নেয়। তবে সে সুযোগ এখনও আসেনি।

আমি যাচ্ছি। বলল আবদুর রহমান।

তারপর রাস্তায় বেরিয়ে এলো। একটু হেঁটেই সে পেয়ে গেল একটা বেবিট্যাক্সি। ট্যাক্সিতে উঠে সে বলল, কলুটোলা চলো।

নতুন ঢাকা থেকে পুরনো ঢাকায় যাওয়ার ইচ্ছে বোধহয় ট্যাক্সিঅলার ছিল না। সে গাঁইগুই করতে লাগল। ধমকে উঠল আবদুর রহমান। পেছন থেকে বলল, ট্যাকা বেশি পাইবা। কলুটোলা চলো।

কথাটা বলেই তার খেয়াল হল তার পকেটে টাকা আছে।

বেরিয়ে আসার সময় এগুলো তসির মিয়ার কাছে রেখে আসা উচিত ছিল। তবু একবার যখন বেরিয়ে পড়েছে, তখন আর ফেরার প্রয়োজন বোধ করল না। এমনিতেও বাসে বা রিকশায় আবদুর রহমান আজকাল ঘোরাফেরা করে না। চুরি, ছিনতাই এখন মানুষের নিত্যনৈমিত্তিক জীবন ধারার সাথে জড়িত হয়ে গেছে।

স্কুলে থাকতে আবদুর রহমান তার পাঠ্যবইয়ে পড়েছিল, অনেক বছর আগে, বাংলাদেশে চোর-ডাকাতদের উৎপাত এত বেশি ছিল যে মানুষ সন্ধ্যে হলেই ঘরে ঢুকে পড়ত। দরজা-জানালা এঁটে লুকিয়ে পড়ে থাকত নিজেরই বাড়িতে। আবদুর রহমান যে কোনো দূরের যাত্রায় আজকাল বেবিট্যাক্সি ব্যবহার করে। তাতে কিছুটা অন্তত নিরাপত্তা আছে। তবে ট্যাক্সিঅলা যদি ডাকাত হয়, এরকমও এখন হচ্ছে, তাহলে ভাগ্যের ওপর ছাড়া মানুষ আর কোথাও ভরসা পাবে না। তাদের নারায়ণগঞ্জের ট্যানারিটা এই যাতায়াতের ঝামেলাতেই ভালোমতো চলছে না। কতদিন হল সেখানে আবদুর রহমান যায়নি। অথচ ঐ ট্যানারির বেশিরভাগ মালিকানা এখন পর্যন্ত তারই।

আবদুর রহমান যখন কলুটোলায় পৌঁছল, তখন সন্ধ্যে পার হয়ে রাত নেমেছে। এর ভেতরেই নানা বিচিত্র ধরনের গলির ভেতর দিয়ে তাকে আসতে হল।

পুরনো ঢাকা কোনোদিন আবদুর রহমানকে আনন্দ দেয় না। এখানকার রাস্তাঘাট সে চেনে না। এইসব এলাকার মানুষের সঙ্গে তার ততটা আলাপ-পরিচয় নেই, তবে ওষুধ বেচাকেনার মাধ্যমে যতটুকু চেনা-জানা। গলি ঘুঁজি, পথ চলতে মাঝে মাঝেই রাস্তার হঠাৎ হঠাৎ বাঁক, এক বাড়ির ভেতর দিয়ে অন্য বাড়ির যাতায়াত, এদের নিজেদের ভেতরে পাকানো পাকানো ভাষা, সবকিছু সে দেখে একটু দূর থেকে। দূর মফস্বলের মানুষ সে। ব্যবসাসূত্রে ঢাকায় বাস, পুরনো ঢাকা তার কাছে এখনও রহস্যময়।

ট্যাক্সিঅলা যখন জানান দিল সে কলুটোলায় পৌঁছে গেছে, তখন আবদুর রহমান কি করবে হঠাৎ বুঝতে পারল না। সারাদিন দোকানের সোফায় লম্বা হয়ে ঘুমোবার জন্যে তার মাথাটাও কেমন ভার ভার ঠেকছিল।

আবদুর রহমান ট্যাক্সি থেকে নেমে কিছুক্ষণ এদিক-ওদিক তাকিয়ে দেখল। সে একে-ওকে আবদুল কাদিরের কথা জিজ্ঞেস করতে লাগল। কিন্তু কেউ তাকে চেনে বলে মনে হল না।

বেবিট্যাক্সিকে সে তখনো ছাড়েনি। বরং হাত তুলে তাকে অনুসরণ করতে বলে সে হন হন করে হাঁটতে লাগল সেদিকে। রাত নেমে এসেছে বলেই হোক বা শীত পড়েছে বলেই হোক, গলিটা এখন নির্জন। দু’চারজন মানুষ শুধু হঠাৎ হঠাৎ চলাচল করছে। তারা যেন কোনো কোটর থেকে বেরিয়ে আসছে আবার চোখের পলকে উধাও হয়ে যাচ্ছে। ফলে গলিটা আবার সেই আগের মতোই নির্জন হয়ে আসছে দ্রুত।

আবদুর রহমান বেশ দ্রুতগতিতে হাঁটতে লাগল।

একটু পরে পৌঁছল খোলামতো একটা জায়গায়। আশপাশে দোকানপাটও বিশেষ নেই। এর ভেতরেই বেবিট্যাক্সি তাকে অনুসরণ করে চলতে চলতে গেল খারাপ হয়ে। বেবিঅলা অন্ধকারে রাস্তায় নেমে টানাটানি কারার পরও ট্যাক্সি আর চলল না। তখন সে বুদ্ধিমানের মতো একটা ছোট টর্চ জ্বালিয়ে রাস্তার ধারে বসে গেল মেরামত করতে।

হাত নেড়ে তাকে সেখানে অপেক্ষা করতে বলে আবদুর রহমান বাড়ি খুঁজতে লাগল। এখানে গায়ে গায়ে লেগে থাকা সব বাড়ি। ছোট ছোট কিছু গলি বাড়িগুলো যেন পেঁচিয়ে ধরে এঁকেবেঁকে বিভিন্ন দিকে সব চলে গেছে। যেন রাস্তাগুলো দেশান্তরীই হয়ে গেছে। এর ভেতরেই কেউ কেউ পুরনো বাড়ি ভেঙে ফেলে নতুন বাড়ি তৈরি করছে। রাস্তার দু’ধারে ঢিবি হয়ে আছে ইট, বালু, খোয়া। তার ভেতরেই বাড়িঘরের আবর্জনার স্তূপ। বাতাসে তীব্র তীক্ষè গন্ধ।

এর ভেতরেই কড়া মশলায় কষানো গোশতের ঘ্রাণ।

এতক্ষণে একটা বেকারির সামনে এসে দাঁড়ালো আবদুর রহমান। দোকানি ভীষণ বুড়ো, তোবড়ানো গাল, অনেক পোড় খাওয়া চেহারা।

আবদুর রহমান তার দোকানের সামনে দাঁড়িয়ে ডাকল, ভাইসাহেব।

কেন তাকে ভাইসাহেব বলে ডাকল আবদুর রহমান জানে না। ডাকার পরেও জানল না।

বৃদ্ধ মুখ তুলে তাকে দেখল। আবদুর রহমান যতদূর সম্ভব আন্তরিক গলায় বলল, একটা মানুষের খোঁজ দিতে পারেন, সে এ পাড়াতেই থাকে।

আবদুর রহমানের দিকে নির্লিপ্ত দৃষ্টিতে তাকিয়ে বৃদ্ধ বলল, নাম কি?

আমার নাম আবদুর রহমান।

না, আপনার নাম না, যাকে খুঁজছেন, তার নাম কি?

আবদুর রহমান একটু অপ্রতিভ হয়ে বলল, আবদুল কাদির।

বয়স কত?

এই আমার বয়সী হবে।

দেখতে কেমন?

লম্বা। একটু রোগা। চোখে চশমা আছে।

শ্যামলা রঙের?

হ্যাঁ।

অফিস করে?

হ্যাঁ, একটা অফিসে চাকরি করে। মতিঝিলে অফিস। সে একজন মুক্তিযোদ্ধা।

বৃদ্ধ এবার আফসোসের স্বরে বলে উঠল, বাচ্চাটা তো তার মারাই গ্যাছে গা, তাও তো বহুৎ দিন হইল। বউটা রাতদিন মাতম করতে করতে তব্ধ হইয়া গ্যাছে। আমার কি, আমার কিছু না, শুধু তাকাইয়া দেহি। কিন্তুক-

কথা অসমাপ্ত রেখে থেমে গেল লোকটা। তারপর যেন আবদুর রহমানের সঙ্গ ত্যাগ করার জন্যে আঙুল তুলে বলে উঠল, এই গলি দিয়া হাঁটতে থাকেন। শেষ মাথায় ডান হাতি বাড়ির আগের বাড়িটায় থাকে। বহুৎ পুরান বাড়ি।

তার কথা শুনে মুহূর্ত দেরি না করে আবদুর রহমান দ্রুত পায়ে গলির ভেতরে ঢুকে গেল। তার কোনো ভয়ডর লাগলো না। বরং তার বন্ধু যদি এরকম এক জায়গায় মাসের পর মাস থাকে তাহলে তার এত ইতস্তত কিসের, একথা ভাবতে ভাবতেই গলির শেষ মাথায় পৌঁছে ডান দিকের শেষ বাড়িটার আগের বাড়ির দরজার সামনে গিয়ে দাঁড়াল আবদুর রহমান। গলির শুরু থেকে শেষ পর্যন্ত পুরো প্রক্রিয়াটা সারতে লাগল মাত্র দেড় মিনিট। তারপর ভাঙাচোরা শ্যাওলা ধরা বাড়িটার সামনে এসে সে স্বস্তির নিঃশ্বাস ফেলল একটা। ভালো করে তাকিয়ে দেখে বুকটা যেন দমে গেল তার। তার চোখের সামনে যেন মূর্তিমান একটা শোকের মতো বাড়িটা দাঁড়িয়ে আছে এমনি মনে হল। পলেস্তারা খসে পড়া, ইট বের করা চেহারা এই বাড়ির।

আশপাশে কোথাও আলোর কোনো নিশানা নেই। দূরের দু’একটা বাড়ির ভেতর থেকে ক্ষীণ আলোর কিছু নিশানা চোখে পড়ছে, কিন্তু চোখ ঘোরালেই আবার সেই অন্ধকারের রাজত্ব।

বাড়ির সামনে দাঁড়িয়ে ইতস্তত করতে লাগল আবদুর রহমান। এতক্ষণ যা মনে হয়নি, এখন সেটা মনে হল। আবদুল কাদির তাকে এই অসময়ে বাসায় ঢুকতে দেখলে অপ্রতিভ হবে নাতো?

কিন্তু এতদূর এক বন্ধুর খোঁজে এসে তার বাসার সামনে থেকে চলে যাওয়াটাই বা কেমন দেখাবে, ভাবতে ভাবতে আবদুর রহমান দরজার কাছে গিয়ে বেল খুঁজতে লাগল।

দরজায় কোনো বেল নেই, কিন্তু একটা লোহার আংটা ঝোলানো আছে। আংটা দিয়ে জোরে একটা নাড়া দিতেই আবদুর রহমানের চোখের সামনে যেন দরজাটা খুলে গেল।

আবাক হয়ে আবদুর রহমান দেখল ঘরের এক কোণে খুব টিম টিম করে একটা হারিকেন জ্বলছে। একটু যেন হতবাক হয়ে মৃদু স্বরে একটু কেশে সে ডেকে উঠল, কাদির, বাসায় আছো?

এ ডাকের কোনো সাড়া এলো না।

ইতস্তত করে আবার ডাক দিল সে। এবারও সাড়া দিল না কেউ। ঘরের ওপাশের দরজার সামনে এক চিলতে একটা বারান্দা। বারান্দার ওদিকে অন্য বাড়ির দেয়াল। ডাকতে ডাকতে বারান্দায় এসে দেখল দেয়ালের ধার ঘেঁষে ওপরে ওঠার সিঁড়ি। একজন মানুষ হেঁটে উঠতে পারে সিঁড়ি দিয়ে। সিঁড়ির মুখে দাঁড়িয়েও দু’বার বন্ধুর নাম ধরে ডাক দিল সে।

সাড়া না পেয়ে আবার ঘরের ভেতর এসে দাঁড়াল।

তার সন্দেহ হতে লাগল এটা সত্যি সত্যি আবদুল কাদিরের বাসা কি-না।

তাকিয়ে দেখল ঘরের চারপাশে। একদিকে শিল কড়–ইয়ের একটা খাট। খাটের ওপরে মলিন একটা বিছানা ভাঁজ করা। মলিন তিনটে বালিশ পড়ে আছে বিছানার ওপরে। খাটের তোশকটা একপাশে বেশি ঝুলে আছে। নীল রঙের ময়লা একটা মশারি অর্ধেক টাঙানো অবস্থায় একপাশে গোটানো।

আবদুর রহমানের দৃষ্টিশক্তি যেন ক্রমশ প্রখর হয়ে এলো। সন্দেহের কিরিকিরি রেখা ফুটে উঠল কপালে। তাকিয়ে দেখল খাটের বাজুতে সাদা সাদা অসংখ্য চুনের দাগ। আবদুর রহমানকে সে কোনোদিন পান খেতে দেখেনি। এ নিশ্চয় তার স্ত্রীর অভ্যাস হবে।

সেখান থেকে চোখ সরিয়ে সে দেখতে পেল একটা কাঁঠাল কাঠের টেবিল। টেবিলের ওপরে নীল প্লাস্টিকের ঢাকনি। তার ওপরে পানি খাবার সবুজ কাচের জগ। কাচের জগের সঙ্গে ম্যাচ করা সবুজ বোতলের তলা কেটে তৈরি করা সবুজ গেলাস।

জগের পাশে বড় একটা হাত আয়না। সেখানে একটা বড় চিরুনি ও চুল বাঁধার রাবার ব্যান্ড।

আবদুর রহমান এবার যেন হন্যে হয়ে চারদিকে তাকাতে লাগল। সে বেশ বুঝতে পারল এই বাসা লোকশূন্য নয়। কিন্তু কেন যেন সে কাউকে দেখতে পাচ্ছে না।

টেবিল থেকে চোখ সরিয়ে সে দেয়ালে ফেলল। ইতোমধ্যে ঘরের কোণে জ্বলতে থাকে হারিকেনের বাতিটা বড় করে নিয়েছে এবং সেটা টেবিলে এনে রেখেছে। উজ্জ্বল আলোয় ঘর এখন সয়লাব। দেখল দেয়ালে ঝোলানো ফটোর ফ্রেমের মধ্যে তার বন্ধু আবদুল কাদির আর তার বউ বসে আছে। বউ এর পরনে বেনারসি শাড়ি, চোখে কাজল, কপালে টিকলি। আবদুল কাদিরের পরনে সাদা পায়জামা-পাঞ্জাবি। গলায় চাদর। আবদুল কাদির তার স্ত্রীর কাঁধে হাত দিয়ে আছে বন্ধুর মতো। বয়স অন্তত দশ বছর কম। বেশ স্মার্ট দেখাচ্ছে তাকে। মুখ তার অবশ্য গম্ভীর কিন্তু দয়ালু।

আবদুর রহমান যেন চুম্বকের মতো আকৃষ্ট হয়ে ফটোর কাছে গিয়ে দাঁড়াল।

বিয়ের কয়েকদিন পরে যে ফটোটা তোলা হয়েছে তাতে কোনো সন্দেহ নেই। আবদুর রহমানের এখন মনে পড়ল ছেলেটা মারা যাওয়ার পরপর শেষবার যখন আবদুল কাদির তার দোকানে এসেছিল, বলেছিল, দোস্ত, আমি আত্মহত্যা করব, আমার বউ পুত্র শোকে পাগল হয়ে গেছে।

কথাটা এই মুহূর্তে মনে পড়ায় আবদুর রহমানের বুকের ভেতরে কেমন যেন শির শির করে উঠল। এইসব অবাঞ্ছিত অনুভূতি আবদুর রহমানের পরিচিত নয়। এরকম অনুভূতি সে ভালোবাসে না। ছেলেবেলায় নিজের মা হারানো আবদুর রহমান এইসব অবাঞ্ছিত অনুভূতির শিকার কোনোদিন হতে চায় না। এই বয়সেও নয়। সে ঝট করে দৃষ্টি ফেরাল। তার দৃষ্টি এখন দেয়ালের অন্য পাশে স্থির। সেখানে আরেকটা ফটো ফ্রেমে দাঁড়িয়ে আছে আবদুল কাদিরের ছেলে। মা-বাবার ফটো থেকে একটু দূরে সে। একা। ফটোর গায়ে দু’তিনটে গাঁদা ফুলের মালা। ফটোতে সে নাদুস-নুদুস চেহারার একটি বাচ্চা, ঠিক যেন কোনো গ্ল্যাক্সো বেবি, নিশ্চয় অসুখ হওয়ার আগে আগে তোলা। তার চেহারা ন্যাংটো। পেট সামান্য ফোলা যেমন তার বয়সী শিশুদের থাকে। অজস্র কোঁকড়া চুলে ঢাকা তার কচি মুখ। সে ছোট ছোট কয়েকটি দাঁত বের করে খুব হাসছে। তার কপালের একপাশে থ্যাবড়া ও গোল একটি টিপ, তার দৃষ্টি বড় ঝকঝকে আর উজ্জ্বল।

১৪.

ছবির দিকে তাকিয়ে দেখে আবদুর রহমান যেন স্তব্ধ হয়ে গেল। সে চোখ ফেরাতে পারল না। মাত্র সাড়ে তিন বা চার বছর বয়স হলেও শিশুটি বেশ বড়সড়। তার বুকের ভেতরে যেন হাপর পড়তে লাগল। এমন কী করে হল? হাসি আর আদরের ভেতর দিয়ে এই শিশুটির কি বড় হয়ে ওঠার কথা ছিল না? বাবা-মায়ের বুকজুড়ে ধীরে ধীরে বড় হয়ে ওঠার কথা কি ছিল না তার? জীবনের পথে হাঁটি হাঁটি পা পা করে এগিয়ে চলার কথা কি ছিল না?

কিন্তু কই কিছুই তো হল না। অসুস্থ এ শিশুর সংকটের মুহূর্তে কোরামিনের ক্রিয়ায় বেঁচে যাওয়ার কথা ছিল। এরকম কত শিশু মৃত্যুর মুখ থেকে এর আগে ফিরে এসেছে। কত হাজার হাজার শিশু ফিরে এসেছে। কিন্তু এ শিশুটি ফিরতে পারেনি। কেন ফিরতে পারেনি?

কথাটা ভাবতে গিয়ে আবদুর রহমানের মনের ভেতরে ভীষণ এক অপরাধবোধ কাজ করতে থাকে। আগে হলে সে ভাবত, ডাক্তারদের ফ্রি স্যাম্পল এ দেশে কোন দোকানদার না রিপ্রেজেনটেটিভের কাছ থেকে সস্তায় কেনে? দ্বিগুণ দামে কাস্টমারের কাছে বিক্রি করার লোভ কোন দোকানদার …? ব্যবসা হচ্ছে ব্যবসা। তাছাড়াও মেয়াদ উত্তীর্ণ হয়ে যাওয়া কোনো দামি ওষুধের গায়ের লেবেল পাল্টে আরও ছ’মাস মেয়াদ বাড়িয়ে নেয়া এসব তো হরহামেশাই ঘটছে। বিদেশে তৈরি যে কোনো ওষুধের পোটেন্সি এক্সপায়ার ডেট ওভার হওয়ার পরেও আরও ছ’মাস বা এক বছর সক্রিয় থাকে। এটা যারা ওষুধের ব্যবসা করে সকলে জানে।

কিন্তু মেয়াদ উত্তীর্ণ ওষুধের মেয়াদ আরও বাড়ানো?

না, এটা একটা গর্হিত কাজ। কেএস সোবহান অস্বীকার করলেও সে মূলতই দোষী, সেটা তার চোখ দেখেই আবদুর রহমান বুঝতে পেরেছে।

সে লেবেল ছাড়া কোরামিন তাকে বিক্রি করেছে, যা মূলতই ছিল মেয়াদ উত্তীর্ণ একটি ইনজেকশন।

আর, আর আবদুর রহমানও দোষী। সে নতুন লেবেল করেছে ওষুধের আরও বেশি করে মেয়াদ বাড়িয়ে।

কেউ তাকে মাফ করবে না।

কেউ না।

কেউ কোনোদিন না জানুক, কিন্তু আবদুর রহমান জানে সে দোষী।

বারান্দায় কোনো বাতি নেই। ঘরের আলো ছিটকে কিছুটা বারান্দায় এসে পড়েছে।

আবদুর রহমান তবু বন্ধুর নাম ধরে ডাকতে ডাকতে বারান্দায় এসে দাঁড়াল। এটা আশ্চর্য যে আবদুল কাদিরের এই বাসায় বর্তমানে কেউ নেই, এমনকি কাজের লোকও নয়। এই শহরে কেউ যে বাসা এভাবে অরক্ষিত রেখে চলে যেতে পারে, এটা কোনো বিশ্বাসযোগ্য ব্যাপার নয়।

সুতরাং আবদুর রহমান মনে মনে জানে এই বাসায় লোক আছে। কোথাও না কোথাও আছে।

সে এবার একটু অনুযোগ করেই বলে ওঠে, ওহে কাদির, কোথায় তোমরা। আমি আবদুর রহমান এসেছি, দোস্ত। অনেকদিন তোমার কোনো খবর না পেয়ে আজ তোমার খোঁজে চলে এসেছি।

কথার উত্তর পেতে কান খাড়া করে রাখল সে। কানে কোত্থেকে যেন ভেসে আসলো একটা হাসি। দূরাগত কোনো অস্পষ্ট একটা ধ্বনির মতো সে হাসি যেন মুহূর্তে মিলিয়ে গেল দেয়ালের ওপাশে।

বিমূঢ় আবদুর রহমান একবার ডাইনে তাকাল একবার বাঁয়ে। এবার দেয়ালে তার ছায়া পড়েছে বেশ বড় হয়ে। সে ছায়া একবার বাঁয়ে দুলছে একবার ডাইনে। যেন মাথা নেড়ে মনে মনে কিছু হিসাব মেলাতে চাইছে আবদুর রহমান। শুধু চোখের সামনে সে এবার দোতলায় ওঠার সিঁড়ি চোখে দেখতে পেল। বুঝলো আবদুল কাদির আর তার বউ বা নিদেনপক্ষে দু’জনের কোনো একজন ওপরের ঘরে রয়েছে। হঠাৎ মনে পড়ল ওপরেই ওদের রান্নাঘর। মনে পড়ল আবদুল কাদিরই একদিন বলেছিল, দোস্ত, বেশ সস্তায় একটা বাড়ি ভাড়া পেয়েছি। শুধু একটাই অসুবিধে, সেটা হল নিচে শোবার ঘর আর ওপরে রান্নাঘর।

সিঁড়ির ওপর দাঁড়িয়ে ঊর্ধ্বমুখে এবার হাঁক দিয়ে উঠল আবদুর রহমান। এবার তার কণ্ঠ থেকে বেরিয়ে এল সাতক্ষীরার ভাষা। বলল, ওহে কাদির, ভায়া, তুমরা কি কি সব কানে তালা লাগায়ে বইসেছো? এদিগে তুমাগের নিচতলা যে লুট হতি চলেছে!

কথা বলতে বলতে একটা একটা করে সিঁড়ি ভাঙতে লাগল সে। এই অবস্থাতেও যে সে তামাশা করে কথা বলতে পারছে, এতে করে নিজেই নিজেকে বাহবা দিল মনে মনে।

এইসময় রাস্তা দিয়ে কেউ একজন ট্রানজিসটর বাজাতে বাজাতে চলে গেল। সে রাত ন’টার খবর শুনতে শুনতে হেঁটে যাচ্ছে। এই একটা ফ্যাশন হয়েছে আজকাল। হাতে ট্রানজিসটর নিয়ে রাস্তা দিয়ে বাজাতে বাজাতে চলা। যে ট্রানজিসটর মুক্তিযুদ্ধ চলাকালীন মানুষকে সাংঘাতিক উদ্দীপনা জুগিয়েছে, সেই ট্রানজিসটরের অবদান মানুষ এখনও যেন ভোলেনি।

উঁচু উচুঁ পনেরো-বিশটা সিঁড়ি। আবদুর রহমানের শরীর ভারি। তার হাঁফ ধরে গেল।

সিঁড়িটা ওপরে উঠে একদিকে বাঁক নিয়েছে। সিঁড়ির শেষ মাথায় দাঁড়িয়ে আর একবার হাঁক দিতে গিয়ে সে যেন থমকে গেল। দেখল ওপরে এক চিলতে রান্নাঘর ও গোসলখানা। রান্নাঘরের কোনো দরজা নেই। সেখানে খোচের ভেতরে একটা কেরোসিনের চুলো। অ্যালুমিনিয়ামের কিছু হাঁড়িকুড়ি, কাঁসা ও কাচের থালবাসন, অ্যালুমিনিয়ামের একটা জগ, একটা মুখখোলা থার্মোফ্ল্যাস্ক, তিনটে কাঠের পিড়ি, কতকগুলো খালি বড় সাইজের গুঁড়ো দুধের টিনের কৌটো এবং রান্না করার অনেক রকমের সাজ-সরঞ্জাম যা আবদুর রহমান কোনোদিন মন দিয়ে তাকিয়ে দেখেনি। নিজের বাড়িতে রান্নাঘরে যায় না আবদুর রহমান। তার যাওয়ার দরকারও পড়ে না কোনোদিন।

তাকিয়ে দেখল রান্নাঘরের জানালা হা করে খোলা এবং তার ওপারেই পাশের বাড়ির দেয়াল। আবদুর রহমানের মনে পড়ল না এর চেয়ে বিষণ্ণ চেহারার কোনো রান্নাঘর সে কোনোদিন চোখে দেখেছে। রান্নাঘরের তাকের ওপরে আপন মনে একটা বাতি জ্বলে যাচ্ছে, যদিও তার পাশেই দেয়ালে আছে ইলেকট্রিকের সুইচ।

নিচে হারিকেন জ্বলা দেখেই আবদুর রহমান বুঝেছিল বাসার ইলেকট্রিক বিল নিয়মিত শোধ না দেয়ার জন্যেই লাইন কাটা গেছে। এই এক ব্যাপারে বিদ্যুৎ বোর্ড খুব তৎপর। হাজার হাজার অবৈধ বৈদ্যুতিক লাইনে শহর ছেয়ে গেছে, কিন্তু সাধারণ জনসাধারণ বিদ্যুতের বিল পরিশোধ করতে এক মাসের বেশি দেরি করলেই লাইন কাটা যাচ্ছে। তারপর সে লাইন আবার জোড়া দিতে হিমশিম খেয়ে যাচ্ছে মানুষ।

কথাটা ভাবতে গিয়ে থমকে গেল আবদুর রহমান। এদিক-ওদিক তাকিয়ে দেখল যেন কেউ তার মনের কথা বুঝে গেল কি-না জানতে।

কিন্তু এখানে জানাজানির কিছু নেই। এই বাসা বর্তমানে বিরান ও পরিত্যক্ত। হয়তো বেশিক্ষণ হয়নি পরিত্যক্ত হয়েছে। এ যেন এক লক্ষ্মীছাড়া গৃহস্থালির ছবি। এ ছবি শুধু যেন ধ্বংসের আগে মানুষ চোখে দেখতে পায়। এক অশুভ আশংকা জড়িয়ে ধরল এখন আবদুর রহমানের মন। নিজের অজান্তেই তার নিঃশ্বাস ভারি হয়ে এলো।

এবার তার গলা দিয়ে যে স্বর বেরোলো তা গুরুতর কোনো আশংকায় খিন্ন এবং বিকৃত।

সে আবার বলে উঠল, দোস্তো-

১৫.

এবার তার ডাক শুনে কে যেন বেশ জোরেই খিলখিল করে হেসে ওঠে। এই খিলখিল হাসি এক শিশুর। সেই হাসি শুনে আবদুর রহমানের শরীর শিহরিত হয়ে ওঠে। তার মনে হয় যেন পৃথিবীর ওপার থেকে ভেসে আসা কোনো হাসি সে এখন কানে শুনতে পাচ্ছে।

ভয়ে আশংকায় দম বন্ধ হয়ে আসে তার। পালাও। এখান থেকে পালাও। কে যেন তার মনের ভেতরে জোরেশোরে বলে ওঠে।

হ্যাঁ, আমি পালাচ্ছি। এক্ষুণি বেরিয়ে যাচ্ছি এই বাসা থেকে।

কথাটা এবার বিড়বিড় করে বলে ওঠে আবদুর রহমান। তারপর বিদ্যুদ্বেগে তার ভারি শরীর নিয়ে ঘুরে দাঁড়ায়। নিচের দরজা খোলা আছে। ভেজানো আছে। বাইরে অপেক্ষা করছে তার বেবিট্যাক্সি। নিচে নেমেই হাত দিয়ে টান মেরে-

ভারি শরীরটাকে অদ্ভুত এক মোচড়ে ঘুরিয়ে ফ্যালে আবদুর রহমান। থপ থপ করে নিচে নামতে থাকে। তার প্রতি পদক্ষেপে শব্দ ওঠে আক্ষেপের। এ কিসের আক্ষেপ আবদুর রহমান জানে না। এ কি তার জীবন।

থপ থপ করে আবদুর রহমান একটা একটা ধাপ করে নিচে নামে। পা দুটো তার সিসার মতো ভারি হয়ে ওঠার জন্যে মূলত এ ধরনের শব্দ হয়।

চারটে সিঁড়ি ভেঙে মোড় নেয়ার পথে সে থমকে দাঁড়ায়। ঘরের হারিকেনের উজ্জ্বল আলো এসে সিঁড়ির নিচের ধাপে পড়েছে। সেই আলোয় সে তাকিয়ে দেখে তার পথ আটকে দাঁড়িয়ে আছে ছোট্ট একটি ছেলে। সিঁড়ির প্রথম ধাপে দাঁড়িয়ে সে তাকিয়ে আছে তার দিকে মুখ উঁচু করে।

ছেলেটির কোমরে ঝোলানো তামার মাদুলি। গলায় চৌকো একটি তাবিজ। তার চোখে কাজল। কপালের একপাশে মায়ের হাতে থ্যাবড়া করে বসানো কাজলের টিপ, পাছে কেউ সাত রাজার ধন এই মানিকটিকে বিষদৃষ্টি নিক্ষেপ করে! গাঁদা ফুলের পুরনো ঝুরঝুরে কিছু মালা তার গলায় এলোমেলোভাবে জড়ানো। হাসতে হাসতে ছেলেটি তাকিয়ে দেখছে আবদুর রহমানকে। তার মুখের দুধসাদা দাঁতগুলো হারিকেনের আলোয় চিকচিক করছে। এখন তার গলার স্বর স্তব্ধ। কিন্তু হাসি হাসি মুখখানা সে তুলে ধরে আছে। ভাবটা যেন এতক্ষণ অনেক লুকোচুরি খেলা হয়েছে। এবার তরে ক্ষ্যান্ত দেয়া যাক।

তাকে দেখে একেবারে স্তম্ভিত হয়ে যায় আবদুর রহমান।

আর নিচে নামতে পারে না।

গল্পের বিষয়:
উপন্যাস
DMCA.com Protection Status
loading...

Share This Post

সর্বাধিক পঠিত