মুখোশ

মুখোশ

– ভাই আমার কাছে টাকা ছিল কিন্তু কেউ হয়তো পকেট মেরে নিয়ে গেছে ভাই।
– ফালতু কথা শোনার সময় নাই আমার কাছে, টাকা ছাড়া আমার গাড়িতে উঠছেন ক্যান?
– ভাই উঠার আগে আমি আমার পকেটে তেমন খেয়াল করিনি তাই আর মানিব্যাগটাও দেখিনি।
– মিয়া ফাজলামো করেন আমার লগে?
.
কি ঝামেলায় পরলাম রে বাবা! কি যে করি এখন কিছুই বুঝতে পারছি না। পকেটে মানিব্যাগ ছিল আর তাতে চকচকে দুইটা

পাঁচশত টাকার নোট ছিলো কিন্তু এখন সিএনজি থেকে নেমে ভাড়া দিতে গিয়ে দেখি টাকা তো দূরের কথা আমার মানিব্যাগটারও

কোনো খোঁজ খবর নেই। কখন যে কে পকেট কেটে নিয়ে গেল কিছুই বুঝতে পারলাম না। আর এখন এই সিএনজির ড্রাইভার

আমাকে ইচ্ছেমত কথা শুনাচ্ছে, আমার কথা বোঝার চেষ্টাই করছেন না ওনি। আগে পকেট টা খেয়াল করলে হেঁটে হেঁটেই এখানে আসতাম,

এই গাড়িতে আর চড়তাম না।
.
– এই কি হয়েছে এখানে?( পুলিশ অফিসার)
– দেখুন স্যার ওনি আমার গাড়িতে উঠার আগে ওনার পকেট খেয়াল করেনি আর এখন বলছে ওনার কাছে কোনো টাকা নেই,

পকেটমার নাকি ওনার টাকা নিয়ে গেছে।( ড্রাইভার)
– স্যার আমি সত্যি বলছি আমার কাছে টাকা ছিল কিন্তু কেউ একজন চুরি করে নিয়ে গেছে।( আমি)
– আচ্ছা এই নাও তোমার ভাড়া এখন ক্যাচাল না করে বিদায় হও তো এই রাস্তার ধার থেকে, যত্তোসব ফালতু।

দুইটা টাকার জন্য রাস্তার পাশে এভাবে ঘেউ ঘেউ করতেছে। ( অফিসার)
.
কোথা থেকে যেন একটা বড়সর দামী পুলিশের গাড়ি নিয়ে এই মহান বড় মনের পুলিশ অফিসারটা এসে ঐ

ড্রাইভারটাকে দেড়শ টাকা দিয়ে বিদায় করে দিলেন। উফফফ বাঁচলাম এতক্ষণে।
– স্যার আপনাকে অনেক ধন্যবাদ।
– নাম কি তোমার?
– মাহিন
– কই যাবা?
– হবিগঞ্জ।
– ওখানে কি?
– আমার বাড়ি।
– হবিগঞ্জ তো এখান থেকে মোটামুটি ভালই দূরে, এইটুকু পথ কিভাবে যাবে?
– পোড়া কপাল আছে সাথে স্যার, এই পোড়া কপালই কোনো ভাবে নিয়ে যাবে।
– আচ্ছা আমি তো এখন উল্টো দিকে যাচ্ছি, ওদিকে গেলে তোমাকে নিয়ে যেতাম। এখন এই পাঁচশো টাকা রাখ

আর গাড়ি করে বাড়ি চলে যাও ( আমার হাতে একটা পাঁচশো টাকার নোট ধরিয়ে দিল)
– এ কি স্যার, অচেনা কারো জন্য আপনি এতো কিছু করছেন কেন?
– কোনো সমস্যা নেই, যাও তুমি।
.
উপরোক্ত এইটুকু কথা বলেই পুলিশ স্যারটা হনহন করে ওনার গাড়িতে উঠলো তারপর বাতাসের বেগে চলে গেল গাড়ি নিয়ে।

যাইহোক হাতে এখন পাঁচশো টাকা আছে, ভালভাবে বাড়ি যেতে পারবো। ভাগ্যিস স্যারটা এসে আজ আমাকে বাঁচিয়ে দিল

নয়তো আজ আমার তো বার টা বেজে যেতই তার সাথে আমার সম্মানটাও ফেলুদা হয়ে যেতো। নাহ, এইসব আর চিন্তা করা যাবে না,

এখন শান্ত মনে বাড়ি ফিরতে হবে। অতঃপর একটা বাসে চেপে বসে পরলাম আর হনহন করে বাড়িতে এসে পৌঁছালাম।
.
রাতে ভাত খেতে বসছি, খাটের নিচে এক পাশে ছোট্ট একটা পাটি বিছিয়ে আর গাঁয়ে একটা চাদর দিয়ে।

মা সামনে বসে আছে আর আমি ভাত খাচ্ছি। বাবা নেই, অনেক আগেই আমাকে আর মা কে একা রেখে এ পৃথিবী ছেড়ে বিদায় নিয়েছে।

দুই বছর আগেও মা আমার জন্য অন্য কোনো লোকের বাড়িতে কাজ করত, শুধু আমার খাওয়া আর পড়াশোনার যোগান

দেওয়ার জন্য কিন্তু এখন আর আমি মাকে ওসব করতে দেই না। কারণ আমি নিজেই এখন উপার্জন করতে পারি,

যদিও তা খুব অল্প তবুও সেটা দিয়েই আমাদের মা ছেলের বিন্দাস চলে যায় কোনো রকমে।
– জানো মা আজ বিকেলে ফেরার সময় রাস্তায় কি হয়েছিল?
– আমি কেমনে জানুম? আমি কি তর লগে গেছিলাম নাকি?
অতঃপর মাকে আজকে ঐ পকেটমার, ড্রাইভার আর পুলিশ অফিসের কথা বললাম। সবকিছু শোনার পর মা শুধু একটা কথাই বললো,
– এ যুগে এমন পুলিশ খুব কমই পাওয়া যায় রে বাবা।
.
আমিও আর কিছু না বলে খাওয়া শেষ করে হাত ধুয়ে উঠে পরলাম। তারপর কিছুক্ষণ বাইরে দাঁড়িয়ে রইলাম।

বাহ্, আজ তো খুব সুন্দর চাঁদ উঠেছে, শুধু ওই চাদেঁর দিকে তাকিয়ে থেকেই আজকের রাতটা পার করতে ইচ্ছে করছে,

কিন্তু বেশীক্ষণ থাকতে পারলাম না, একটু পরই মা ঘুমাতে যেতে বললো তাই আর ওখানে না দাঁড়িয়ে থেকে নিজের ঘরে চলে গেলাম।
এভাবে খেয়ে পড়ে চলে যাচ্ছে আমাদের মা ছেলের ছোট্ট জীবন। অঢেল টাকা পয়সা না থাকুক আমার কাছে

আমার মায়ের ভালবাসা আছে আর এটা নিয়েই আমি অনেক খুশি। যা উপার্জন করতে পারি তাতে মায়ের মুখে হাসি ফুটেছে এতেই আমি সন্তুষ্ট।
.
কয়েক সপ্তাহ পরের কথা,
রাত সাড়ে বারটা বাজে, আজ শুক্রবার তাই মোবাইলে হেডফোন লাগিয়ে ভূত এফএম শুনতেছি আর তখনই হঠাৎ

করে ফোনে কলের রিংটোন বেজে উঠলো, দেখি সমীর ফোন করেছে। সমীর হলো আমার বন্ধু, আমার বাড়ি থেকে এই

পাঁচ মিনিটের হাঁটা রাস্তা হবে ওর বাড়ি। দুজনে ছোট বেলার বন্ধু, একসাথেই দুজন বড় হয়েছি। সমীর ও আর বসে নেই, ও তো

এখন অনেক ভালো জব করে। কিন্তু হঠাৎ আজ এতো রাতে ওর ফোন পেয়ে কেমন যেন একটা খটকা লাগলো।

আর কিছু মাথায় না ভেবে কলটা রিসিভ করলাম।
.
– কি রে জমিদারের ব্যাটা হঠাৎ এতো রাতে কল দিলি ক্যান?
– দোস্ত অনেক বড় প্রবলেম পরছি, তাড়াতাড়ি একটু আমার বাড়িতে আয়। থানায় যাওয়া লাগবো।
– থানায় ক্যান?
– ছোট ভাইরে ওর বাইক শুদ্ধ একটু আগে ধরে নিছে, লাইসেন্স আছিল না তাই।
– একটু আগে মানে!
– বারটার সময়।
– এতো রাতে বাইরে কি?
– ওর বন্ধুর ছোট বোনের জন্মদিনে গেছিল, তুই আয় তো তাড়াতাড়ি।
.
আর কিছু না বলে টুট করে কলটা কেটে দিল সমীর। আমি আর বসে না থেকে মা কে বলে চলে গেলাম সমীরের বাড়িতে।

গিয়ে দেখি সমীরের মা কান্নাকাটি করতেছে আর তখনই সমীর বাইকের লাইসেন্স নিয়ে আমার কাছে চলে আসলো।

তারপর দুই বন্ধু এই রাতের আঁধারে চললাম আমাদের এলাকার থানায়। এতো রাতে পুরো রাস্তায় একটা গাড়িও পেলাম না,

যা দুই একটা দেখলাম তাও চলতি গাড়ি, রিজার্ভে। তাই আমরা দুজন পুরো রাস্তা হেঁটেই চলে আসলাম।
.
থানার ভেতর যেতেই দেখি ওর ছোট ভাই হ্যাবলার মতো ভেতরে বসে আছে। আমি ওকে দেখে বেশ ভালই মজা

পেলাম কিন্তু তা আর হেসে বাইরে প্রকাশ করলাম না, তাহলে আবার সমীর রাগ করতে পারে। বড় স্যার মনে হয় বাথরুমে গেছিল,

তো তিনি এসে চেয়ারে বসে পরলো। আমার ওনাকে চিনতে একটুও ভুল হলো না, ইনি সেই পুলিশ অফিসার যিনি কয়েক সপ্তাহ

আগে আমাকে ভাড়ার টাকা দিয়ে হেল্প করেছিল। ওনাকে আমি ঠিকই চিনতে পারলাম, স্যারকে চিনতে আমার একটুও ভুল

হয়নি কিন্তু আমি যখন ওনার সামনে গেলাম ওনি আমাকে চিনতে পারলেন না।
.
ওনার তো প্রতিদিনই শতশত মানুষের সাথে দেখা হয় তাই আর কতজনের চেহারা মনে রাখবে। আমার চেহারাটাও হয়তো

মনে রাখতে পারেনি। আমি স্যারের টেবিলের সামনে গিয়ে চুপ করে দাঁড়িয়ে রইলাম আর সমীর স্যারের সাথে কথা বলতে লাগলো।
– এই ছেলেটা কি হয় আপনার?
– জ্বী স্যার আমার ছোট ভাই।
– ওর বাইকের লাইসেন্স নেই কেন?
– জ্বী স্যার আছে তো, এই দেখুন।
হাতের লাইসেন্সটা স্যারের দিকে এগিয়ে দিল সমীর।
– হুম, গুড। এতো রাতে দামী বাইক নিয়ে লাইসেন্স ছাড়া বের হলে যেকোনো পুলিশই আটক করবে।
– আগে তো কখনো এমন হয়নি স্যার।
.
সমীরের এ কথা শুনে পুলিশ স্যারটা চোখ বড় বড় করে ওর দিকে তাকালো। আমিও হাসি না থামিয়ে আর পারলাম না।

ফাজিল কোথাকার সব জায়গায়ই ফাজলামো করে। আমার অল্প আওয়াজের হাসির শব্দ শুনে আমার হাতে হালকা করে একটা চিমটি কাটলো ও।
– এখন আট হাজার টাকা দিয়ে আপনার ভাইকে আর এই জড় বস্তুুটাকে নিয়ে যান।
– স্যার আমার তো সবকিছু ঠিকই আছে তাহলে টাকা দিব কেন?
– চুপপপ, দিলে দেন নয়তো খালি এই ছেমড়ারে নিয়ে যান, বাইক পাবেন না।
– স্যার ঘুষ নিচ্ছেন?
– সেটা আপনি যা ভাবার ভাবুন।
– দিয়ে দিন না স্যার প্লিজ!
– এই মিয়া দুই এক টাকা না দিয়ে বাইকের কথা চিন্তা করেন কেমনে? এখনো কি সেই পুলিশের যুগ আছে নাকি যে এমনি এমনি ছেড়ে দিবে?
– আচ্ছা স্যার এখন তো এতগুলো টাকা নিয়ে আসিনি এখন বরং ওকে নিয়ে যাই সকালে এসে বাইক নিয়ে যাব?

( আর কোনো কথা বাড়ালো না সমীর)
– আচ্ছা।
.
তারপর স্যারের সাথে আর একটু কথাবার্তা বলে বিদায় হলাম থানা থেকে। রাস্তা দিয়ে হাঁটছি আমি সমীর আর ওর ভাই।

আমি দু হাত পকেটে ঢুকিয়ে আনমনে সামনের দিকে হেঁকে যাচ্ছি আর সমীর ওর আদরের ভাইটুকে আচ্ছা করে ঝাড়তেছে।

গালিগালাজ তো করতেই আছে সাথে একটু পরপর মাথায় চাপড় মারতেছে, এই দুইটার কান্ড দেখে আমি এখন কি করবো কিছুই বুঝতেছি না।

তিনজনে হাঁটতে হাঁটতেই বাড়ি চলে আসলাম।
.
সকালে হয়তো আমি আমার কাজে চলে যাব আর সমীর যাবে আট হাজার টাকা নিয়ে থানায় ওর বাইকটা আনতে।

আমরা তো কোনো এদিক সেদিক করিনি তবুও এই বাইকটার জন্য আট হাজার টাকা লাগতেছে, এই টাকাটা হয়তো স্যারের পকেটেই যাবে।
বাট একটা কথা ভেবে খারাপ লাগলো, স্যার সেদিন আমাকে যে টাকা দিয়ে হেল্প করেছিল সেটাও হয়তো এমনই কোনো না

কোনো এক গরীবের টাকা ছিল, যেটা ওনি নিয়েছে।
.
সেদিন ওনি আমার কাছে এক সৎ পুলিশের রুপ দেখালেও থানার ভেতরে গিয়ে ওনি ওনার মুখোশের আড়ালের মানুষটাকে

দেখিয়েছে যেটা আমি সেদিন বাইরে খোলামেলা পরিবেশে দেখতে পাইনি। সেদিন আমি স্যারকে নিয়ে

আমার মায়ের কাছে গর্ব করেছিলাম কিন্তু আজ স্যারের সেই বড় মনের ভেতরের মনটাকে দেখিয়ে দিল। ওনারা আর যা পারুক আর নাই পারুক,

পাব্লিকের পকেট খুব সহজে খালি করে দিতে পারে।
আমরা এই ছোটলোকেরাই কি একমাত্র মানুষ, যে মুখোশ পড়তে পারিনা?

গল্পের বিষয়:
শিক্ষনীয় গল্প

Share This Post

সর্বাধিক পঠিত