পরে থাকা সেই কাগজটা

পরে থাকা সেই কাগজটা

বাবা মায়ের ৪র্থ তম সন্তান। যখন জন্মেছি বাবা মায়ের মুখ অন্ধকার ছিলো। কারন তাদের যে আরো একটা মুখের খাবার জোগার করতে হবে। বাবা দিনমজুর কষ্ট করে কোন মতে সংসার চালায়। বাবা মা আমার আরো তিন ভাই বোন ও দাদি সবার ভরন পোষন চালাতে হিমসিম খায়। তবুও মাথার ঘাম পায়ে ফেলে সবার ভরন পোষন চালান। ভাই বোনদের পড়ালেখা করানোর মত সামর্থ বাবার হয়নি। কিন্তু আমি ছিলাম সবার ছোট। ইচ্ছে ছিলো পড়ালেখা করে চাকুরি করব আর বাবা মায়ের জন্য কিছু করব। যাতে বাবাকে আর মানুষের বাড়িতে কাজ করতে নাহয়। তবে বাবার সেই সামর্থ টুকুও নেই যে আমায় পড়ালেখা করাবে।

তাই নিজে প্রায়মারী স্কুলে ভর্তি হলাম আর পঞ্চম শ্রেনীতে পাস করে ষষ্ঠ শ্রেনিতে উঠলাম। এখন যে বড় শ্রেনিতে উঠেছি লেখাপড়া করতে অনেক খরচ তাই কোন মত মানুষের বাড়িতে কাজ করে কিছু টাকা পেতাম সেগুলা দিয়ে পড়াশুনা চালাতাম। কষ্ট করে হলেও দশম শ্রেনিতে উঠলাম আর সামনে পরিক্ষা তাই রাতে দিনে একটু পড়া পরতাম এভাবে পরিক্ষা টা দিয়েই দিলাম। কিছুদিন আগে রেজাল্ট বের হলো। সেরকম ভালো রেজাল্ট করতে পারিনি। কারন, পড়াশুনা করতে হলে অনেক টাকা পয়সার প্রয়োজন হয়। অনেকগুলো প্রাইভেট নিতে হয়, সেগুলো তো আমি নিতে পারি নাই কারন টাকা ছিলো না।

যাই হোক কষ্ট করে হলেও জীবনের একটা ধাপ পার হলাম। তবে যে এখানেই শেষ নয় আমায় যে আরো পড়ালেখা করতে হবে আর চাকরি করতে হবে। তবে কিভাবে পড়লেখা করব তার টাকা যে আমার কাছে নেই। এগুলো চিন্তা করতে করতে মাথা খারাপ হয়ে গেছিলো, রাতে ভালো মত ঘুমাতে পারতাম না। কয়েকদিন পরেই কলেজে ভর্তি হতে হবে আর ভর্তি হতে হলে এক হাজার টাকা লাগবে। তবে আমার কাছে ছিলো না।

বিকালে রাস্তায় হাটতেছিলাম হাটতে হাটতে সামনে একটা কাগজ পড়ে আছে চোখে পরলো। হাতে নিয়ে দেখলাম সেখানে লেখা ছিলো। ” নিজের জীবন নিজেকে গড়তে হবে, যত বাধাই আসুক না কেন লক্ষ্য স্থির রেখে পথ চললেই সাফল্য ধরা দিবে ” লেখাটা পরে মনের মাঝে যেন একটা অন্য রকম ভাবনা এলো। ভাবলাম আমার লক্ষ্যে পৌছাতে হলে আমায় কষ্ট করতে হবে তাহলে অামার জীবনে সাফল্য আনতে হবে। মাথায় একটা বুদ্ধি আসলো আমি তো পড়া লেখা করেছি মানুষকে প্রাইভেট পড়াতে পারব। তাই পরের দিন পাড়ার কয়েকজনকে বলতেই আমার কাছে প্রাইভেট পড়তে আসলো। নিজের সবটুকু দিয়েই তাদের পড়াতে লাগলাম। এক মাস হতেই তারা আমায় টাকা দিলো। যে টাকা দিয়ে কলেজে ভর্তি হয়েও কিছু টাকা হাতে থাকবে। মনে অন্যরকম একটা খুশি আসলো। যে কয়টাকে ভর্তি হয়ে বাঁচবে সেগুলা দিয়ে বাজার থেকে মাছ কিনে এনে মায়ের হাতে দিলাম। মা মাছ হাতে নিয়ে অনেক খুশি হলো। রাতে সবাই মিলে একসাথে মাছ দিয়ে ভাত খেলাম। আমার অনেক ভালো লেগেছিলো সবার জন্য একদিন হলেও কিছু আনতে পেরেছি।

তবে আমার ইচ্ছে জীবনে সাফল্য এনে এরকমি সবার মুখে ভালো খাবার তুলে দেওয়া। এই ভেবে ঘুমিয়ে পড়লাম। সকালে উঠেই কলেজে ভর্তি হতে গেলাম। ভর্তি হলাম, নিয়মিত কলেজ যেতাম আর বিকালে করে প্রাইভেট পড়াতাম। সেখান থেকে যে টাকা পেতাম সেগুলো দিয়ে কলেজের বেতন, আর বই, খাতা কিনতাম। আর বাবার হাতেও কিছু টাকা তুলে দিতাম। নিজের মন প্রান দিয়ে পড়াশুনা করতাম। কলেজে পরিক্ষা শুরু হলো সেখানে ভালো নম্বর পেয়ে একাদশ শ্রেনি থেকে দ্বাদশ শ্রেনিতে উঠলাম। পড়ালেখার পাশাপাশি প্রাইভেট পরাতাম। আর নিজেও প্রাইভেট পরতাম। কারন এবার যে আমায় ভালো ফলাফল করতে হবে।

এভাবে চলতে চলতে সামনে ফাইনাল পরিক্ষা চলে আসলো। কিন্তু ফরম ফিলাম আর বেতনের মিলে তিন হাজার টাকা লাগবে প্রাইভেট পরিয়ে দের হাজারের মত জোগার হয়েছিলো বাট বাকি দের হাজার টাকা ছিলো না।তখন কি করব ভেবে পাইতেছি না। টাকার জন্য মরিয়া হয়ে ঘুরতে লাগলাম, কিন্তু কোথাও টাকার মুখ দেখতে পেলাম না। এভাবে দিনটা কেটে গেলো। পরের দিন সকালে উঠেই বাড়ির পাশের একটা চাচার কাছে গেলাম তাকে বললাম চাচা আমায় কাজ করাবেন সব কাজ করে দিবো তিনি আমায় কাজে নিলেন। এভাবে তার বাড়িতে ৭ দিন কাজ করলাম। তিনি আমাকে দের হাজার টাকা দিলেন। ওই টাকা নিয়ে কলেজের ফরম ফিলাপ করলাম। তখন মাথা থেকে একটু চিন্তা দুর হয়েছিলো।

ভাবলাম এখন পড়া পরতে হবে ১মাসপর পরিক্ষা। প্রতিদিন পড়া পরতাম। এভাবে চলতে চলতে পরিক্ষা শুরু হয়ে গেলো। পরিক্ষা দিয়েই দিলাম। বিশ্বাস ছিলো ভালো কিছু করব। এবং কৃতিত্বের সাথে পাশ করলাম। বাবামা অনেক খুশি হয়েছিলেন। আমিও অনেক খুশি হয়েছিলাম। এর পর অনার্সে ভর্তি হলাম। তারপর ভাবলাম পড়াশুনার পাশাপাশি কোন চাকরি করব তাহলে সংসারের অভাব দুর হবে। অনেক খোজাখুজি করার পর একটা চাকরি পেলাম যা দিয়ে কিছুটা হলেও সংসারের অভাব দুর হবে। চাকরিটা ছিলো রাতের বেলা।

চাকরির পাশাপাশি পড়াশুনা চালিয়ে যেতে লাগলাম। দিনে করে পড়া পরতাম আর মনে একটা বিশ্বাস রাখতাম আমাকে আরো ভালো কিছু করতে হবে।একদিন রাতে এটা ভেবে মনে হলো সেই রাস্তায় পরে থাকা কাগজটার লেখা পরেই যেন জীবন টা বদলে গেলো। আজ বাবা মায়ের মুখে হাসি ফোটাতে পেরেছি। বাবার কষ্টো টা দুর করতে পেরেছি।

নিজেকে যেন গর্বিত মনে হয়েছিলো। জীবনে কিছু পেতে হলে কষ্ট করতে হবে এবং লক্ষ স্থির রেখে পথ চললে সাফল্য ধরা দিবে। যদি সাফল্য পেতে চাও তাহলে লক্ষ স্থির রাখো এখন এটাই যেন আমার জীবনের এক মাত্র চাবিকাঠি।

গল্পের বিষয়:
শিক্ষনীয় গল্প

Share This Post

আরও গল্প

সর্বাধিক পঠিত