ঈদের শপিং

ঈদের শপিং

ঈদ নিয়ে অনেকেই হরেক রকমের পোস্ট দিয়েছে ঈদের আগে ও পরে। আমি পোস্ট দেবার মতো তেমন কোনো কিছু খুঁজে পাইনি। বন্ধুরা অনেকেই তার জিএফ কে নিয়ে বিভিন্ন পার্কে ঘুরাফেরা করার প্লান করলেও। আমার প্লান ছিলো সারা দিন ফেসবুক আর ঘুম পারার ।

তেমন ধনীর দুলা না, যে বাবা পনেরো বা বিশ হাজার টাকা হাতে দিয়ে বলবে….! যাও বাবা ঈদের শপিং করে নিয়ে আসো। আমি খুব সাধারন একজন মধ্যবিত্ত পরিবারের সন্তান। তাছারা মা বেঁচে নেই! তাই আমার ঈদের শপিং নিয়েও তেমন তোরজোড় নেই পরিবার থেকে। ঘরে থাকা সৎ মা পাঁচ হাজার টাকার মতো শপিং করেছে। আমার শপিং নিয়ে তেমন মাথা ব্যথা নেই। আমার আগে থেকেই প্লান ঈদের দিন অনেক ঘুমাবো। তাছাড়া বাহিরের কোলাহল আমার খুব একটা ভালো লাগে না।

বন্ধুবান্ধব বলতে তেমন কেউ নেই! ফেসবুকে কয়েকটা ছেলে মেয়ে পরিচিত আর রিয়েল লাইফে কাওছারের সাথে পরিচয়। কাওছার আমার অনেক ক্লোজ একটা বন্ধু। ছেলেটার সাথে আমার বন্ধুত্ত হয় ২০১১ সালের মার্চ মাসে। এর মাঝে বেশ কয়েকবার আমাদের ভুল বুঝাবুঝি হলেও তা ছিলো সাময়িক সময়ের জন্য! পরে নিজেরাই আবার মিটমাট করে নিয়েছি নিজেদের মধ্যে। আমাদের ভুল বুঝাবুঝির কারনটা ছিলো একটা মেয়েকে কেন্দ্র করে। শেষমেশ মেয়েটার বিয়ে হলে পরে বুঝতে পারলাম মেয়ে ক্ষণিকের জন্য আসলেও বন্ধুত্ত থেকে যায় হাজার বছর। সেদিনের পর থেকে আর কোনো মেয়ে দিয়ে ভালো লাগার নজরে তাকাইনি। বন্ধুরা কথা বলতে ছিলাম ঈদ নিয়ে। ঈদের চার দিন আগে বাবা বলতেছে…….

— সানভি তুই ঈদের শপিং করবি না?
— না বাবা, আগের যা আছে সেগুলো দিয়েই চলবে।
— তোর কি কোনো কারনে মন খারাপ?
— না তো বাবা, হঠ্যাৎ তোমার এমন মনে হলো কেনো?
— না, এমনি বললাম! পনেরোশ টাকা রাখ।
— এত টাকা দিয়ে কি করবো বাবা?
— ঈদের কিছু শপিং করিস।

বাবা হনহন করে রুম থেকে বের হয়ে চলে গেলো। বুঝলাম সৎ মা হয়তো বাবাকে আমার শপিং নিয়ে কিছু বলেছে। যাগগে এসব কথা! ম্যানিব্যাগে পনেরোশ টাকা রাখলাম। সুয়ে সুয়ে ফেসবুকে চালাচ্ছি হঠ্যাৎ কাওছারের কল।

— দুলা ভাই কি করেন?
— দোস্তো সুয়ে আছি।
— ডিনার করছিস?
— করছি! তুই করছিস।
— হ্যা! ঈদের শপিং করছিস দোস্তো?
— না, করি নাই! তুই করছিস?
— আমি ও তো করি নাই। কালকে যাবি শপিং করতে?
— হুম, যাওয়া যায়।

দোস্তো তাহলে ওই কথাই থাকলো! কালকে সকালে দুই বন্ধু মিলে শপিং করতে যাচ্ছি। সকাল হয়েছে অনেক সময় হলো। বাবা আর সৎ মা নাস্তা করছে। সৎ মা বাবাকে আমার নামে কানপড়া দিচ্ছেন। মানে হলো আমার নামের যত খারাপ কথা বলা যায় আর কি? তোমার ছেলে কোনো কাজ করে না, সারা দিন রুমের মধ্যে ঝিমায় আর মোবাইল টিপাটিপি করে…… এই সেই নানান কথা। মনটা একটু খারাপ হয়ে গেলো। যাই হোক কোনো প্রতিউত্তর না দিয়ে ফ্রেশ হয়ে হালকা নাস্তা করে বাসা থেকে বের হলাম। মোবাইল হাতে নিতেই দেখি কাওছারের নাম্বার থেকে দশ বার মিসকল উঠে আছে । কল ব্যাক করতেই…!

কিরে হালায় তুই কোথায় এখন! আমরা রিফাত মোরে সেই কখন থেকে দাড়িয়ে আছি। তোরা মানে কি? তোর সাথে আর কে আছে। দোস্তো তন্বী আছে আমার সাথে! প্লিজ তারাতারি আয় না ভাই তোর দুটো পায়ে পরি। বুঝলাম বন্ধু আমার অনেক প্যারায় আছে মেয়েটাকে সাথে নিয়ে। আমি না গেলে হয়তো মারাই যাবে। বাসা থেকে একটা রিক্সা নিয়ে দশ মিনিট পরে রিফাত মোরে গেলাম। রিফাত মোর থেকে একটা সিএনজি করে নিউ মার্কেটে আসলাম তিনজন। মেয়েটা আগের থেকে দেখতে সুন্দরি হয়েছে। তাছারা আটা ময়দা হয়তো একটু বেশি করে মেখেছে তাই হয়তো একটা বিলাতি মেয়েদের মতো লাগছে। কাওছার বাবা মায়ের এক মাত্র সন্তান। তাছারা ওদের পরিবারটাও একটু উচ্চ বংশের টাকা পয়সার তেমন অভাব নেই। জিএফ জন্য শপিং করতে তাই একটু মোটা অংকের টাকা নিয়ে আসছে।

সানভি তোর শপিং একটু পরে করি! আগে তন্বীর শপিং করে নেই। কানের কাছে এসে ফিসফিস করে কথা গুলো বললো। আরে ব্যাপার না, তন্বীর কি কি লাগবে দেখ? জান এটা লাগবে, ওটা লাগবে, এটা পছন্দ না, এ দোকানের জিনিসপত্র পছন্দ না, ওই দোকানে চলো। অবশেষে পাঁচ ঘন্টা দৌড়াদৌড়ি করার পর মেয়েটার শপিং কম্পিলিট হলো। জান আমাকে এত কিছু কিনে দিলে আর তোমাকে কিছু কিনে দিবো না সেটা কি হয়। চলো ওই দিকে এই বলে ‘সিটি মার্কেটের’ দিকে আসলাম। সিটি মার্কেটের সামনে বেশ কয়েকটা ফুটপাতের দোকান বসেছে। আমি আগে থেকেই আন্দাজ করতে ছিলাম পৃথিবীর অষ্টম আশ্চর্য মনে হয় দেখতে যাচ্ছি। যা ভাবছিলাম তাই হলো….! ফুটপাতের দোকান থেকে আশি টাকা দিয়ে একটা ছোট প্যান্ট কিনে বন্ধুর হাতে ধরিয়ে দিলো। যারা ছেলেদের ছোট প্যান্ট বুঝেন না। তারা এখনো মায়ের গর্ভে ঘুমিয়ে আছেন মনে হয়। গার্লফ্রেন্ডের এত বড় উপহার পেয়ে বন্ধু আমার প্যাঁচার মতো একটা সুইট হাসি দিয়ে বললো “লাবু জান”। আমার তো অজ্ঞান হবার মতো অবস্থা। মেয়েটাকে ঠাডিয়ে একটা চর মারতে মন চাচ্ছিলো।কিন্তু বন্ধুর জানের জান বলে কথা। একটা পাঁচ তারা রেস্টুরেন্টে দুপুরের লাঞ্চ করে তন্বীকে একটা সিএনজিতে উঠিয়ে দিয়ে বিদায় জানালাম । কাওছারের ফ্রেশ দেখে স্পষ্ট বুঝা যাচ্ছে বন্ধু আমার মারাক্তক রকমের শর্ক্ট খাইছে।

— বন্ধু জিএফ এর জন্য তো অনেক হলো! তুই জন্য কিছু কিনবি না।
— আমার তেমন কিছু কেনার শখ নাই। চল তোর জন্য কিছু শপিং করি।
— কাওছার আমার যথেষ্ট আছে! আগে তোর জন্য একটা কিছু কিনবো। চল!

সিটি মার্কেটের বেশ কয়েকটা দোকান ঘুরেফিরে দেখলাম। কিন্তু আমার কোনো টিশার্ট পছন্দই হচ্ছে না। অনেক দেখাদেখির পর একটা টিশার্ট আমার পছন্দ হলো। সিটি মার্কেটের সকল পণ্য একরেটে বিক্রি করা হয়। ভাইয়া প্রাইজ কত এই টিশার্টের! ৯০০ শত ৯০ টাকা। টাকা প্রেইড করে কাওছারের হাতে ব্যাগটা ধরিয়ে দিলাম। এবার যেনো কাওছার পৃথিবীর নবম আশ্চর্য দেখলো।

— সানভি এই টিশার্ট কার জন্য ?
— আমার সালা বাবুর জন্য!
— দোস্ত আমার টিশার্ট লাগবে না।
— লাগবে লাগবে আমি জানি।
— সত্যি তুই টিশার্টটা নিবি না?
— আমার অনেক আছে তো!

কাওছার দেখ তুই আমার বন্ধু হলেও আছিস ভাই হলেও আছিস। আমার উপহার যদি ফিরিয়ে দিস তবে তোর সাথে এখানেই আমার সব সম্পর্ক শেষ। পকেটে পাঁচশ দশ টাকা আছে। সানভি তোর নিজের জন্য কিছুই নিবি না। তোকে তো আগেই বললাম। আমার যথেষ্ট আছে দোস্ত। তাছারা আমার রুচি সম্পর্কে তুই তো ভালো করেই জানিস। চাহিদার বেশি অতিরিক্ত কোনো কিছুই আমার পছন্দ না। সালা তুই এ জনমেও চেন্জ হবি না। অনেক তো হলো এবার বাসায় যাই চল। রাতের ডিনার করার সময় বাবার হাতে পাঁচশ টাকা তুলে দিলাম। বাবা পাঁচশ টাকার নোট টা পকেটে রেখে দিয়ে আবার খাওয়া শুরু করলেন। দেখতে দেখতে ঈদের দিন চলে আসলো। ঈদের দিন সকালে সালা বাবুর ফোনে ঘুম ভাংলো।

— দুলা ভাই ঈদ মোবারক। কেমন আছেন।
— ভালো আছি! সালা বাবু বাসায় আসেন।
— নারে দোস্তো! আজ পার্কে বেড়াতে যাবো।
— আচ্ছা আপনার জন্য শুভ কামনা।
— আপনিও ভালো থাকেন দুলা ভাই।

কাওছারের সাথে কথা শেষ করে ফেসবুকে লগিন দিলাম। অনেকেই ঈদের শুভেচ্ছা জানিয়েছে। সব গুলো মেসেজ সিন করলেও কারো মেসেজর রিপ্লাই দিলাম না। এদিক থেকে আপনারা আমাকে সেলফিস ভাবতে পারেন। কিন্তু আমার তাতে কিছুই যাবে বা আসবে না। আগেই বলেছি কোলাহল আমার ভালো লাগে না। ঈদের নামায শেষ করে রুমে আসলাম। ফোনটা সাইলেন্ড করে বিছানায় সুয়ে পড়লাম। ঘুমাচ্ছি তো ঘুমাচ্ছি। ঘুম ভাংগার কোনো নাম গন্ধই নেই। দুপুর গড়িয়ে বিকাল হয়ে গেছে। বিকাল চারটার দিকে সালা বাবুর ফোনে ঘুম ভাংলো।

— হ্যালো! দোস্তো বল?
— দুলা ভাই এখনো আপনার ঘুম ভাংগে নাই।
— নারে দোস্তো! অনেক ক্ষুধা লাগছেরে।
— আমার বাসায় চলে আয়! একটা ম্যাজিক দেখাবো।
— তুই দেখাবি ম্যাজিক? পাগল হবো আবার!
— আয় না ভাই! তোর দুটা পায় ধরি!
— আচ্ছা তুই বাসাতেই থাক আসেছি।

অনিচ্ছা সর্তেও বন্ধুর বাসায় আসলাম। আন্টি কাওছার কোথায়? আরে সানভি যে! কেমন আছো বাবা। কত দিন পরে তোমায় দেখলাম। কাওছার ওর রুমে আছে। সালা বাবু রুম বন্ধ করে ডিজে গান শুনছে।

— কিরে সালা অনেক খুশি মনে হচ্ছে?
— হ্যা আজ অনেক হ্যাপি আমি।
— তা এত খুশির কারনটা জানতে পারি।

সব বলবো আগে চল কিছু নাস্তা করে নেই। দুই বন্ধু মিলে কিছু নাস্তা করলাম। সানভি চল বাইক নিয়ে বের হই। সালা বাবুর বাপের টাকার কেনা সদ্য চকচকে অ্যাপাসি বাইকে চরে দুই বন্ধু মিলে অনেক দূরে ঘুরতে আসলাম। চারিদকে শুনশান জায়গা একবারে জনশূন্য। একটা সবুজ ঘাসের জমিতে বাইক পার্ক করলো। দুই বন্ধু সবুজ ঘাসের উপর সুয়ে আছি। কাওছার এক প্যাকেট ব্লাক সিগারেট বের করলো। কাওছার সিগারেট খাচ্ছে আমি দূরের নীলচে আকাশ দেখছি। সূর্য ডুবি ডুকি করে নীলচে নীলভ রঙে নিজেরে বাঙ্গাচ্ছে।

সানভি এই ফোনটার দাম কত হতে পারে। এই ফোন তুই কোথায় পাইলি। এই ফোনের মার্কেট প্রাইজ তো ১৯ হাজার ৯শ ৯৯ টাকা। এটা তন্বীর ফোন। তন্বীর নিউ বিএফ গিফট করছে। আমি একদিন ইউজ করার কথা বলে নিয়ে আসছি। কিন্তু ফোনটা আর রিটার্ন দিবো না। তন্বী আমাকে লাভ করে না, ভালোবাসে আমাকে বাপের টাকাকে। সো আজ থেকে তন্বীকে গুড বাই।

বন্ধুরা তন্বীর মতো হাজারো মেয়ে আমাদের চারপাশে আছে। তারা আপনাকে নয় ভালোবাসে আপনার বাপের টাকাকে। সত্যি কারের ভালোবাসায় টাকা, শরীর, সম্পদের কোনো চাহিদা থাকে না। কোনো সম্পর্কে যখন টাকা ও শরীরের চাহিদা চলে আসে। সে সম্পর্কে তখন প্রতারণার ভাইরাস ধরে যায়। যা চাইলেও দূর করা যায় না। এখানে আমি পুরো মেয়ে জাতকে ছোট করে দেখায়নি। গল্পের মাধ্যমে সভ্য সমাজের কিছু অসভ্য মেয়ে মুখকে ফুটিয়ে তুলতে চেয়েছি। এই গল্পের তন্বী চরিত্র নিয়ে যদি কারো গা জ্বল। তবে বুঝে নিবো তার মনের মধ্যে ঘাপলা আছে। গল্পটা ভালো লাগলে শেয়ার করতে ভুলবেন না। তবে গল্পের ৭০% কাহিনী লেখকের বাস্তব জীবনের সাথে মিল রয়েছে।

গল্পের বিষয়:
শিক্ষনীয় গল্প

Share This Post

আরও গল্প

সর্বাধিক পঠিত