শাহারবনু’র গল্প

শাহারবনু’র গল্প

বাবা-মায়ের আদরের মণি শাহরবনু দেখতে দেখতে সাত বছরে পড়লো। বাবা মেয়েকে নারী শিক্ষকের কাছে পাঠিয়ে দিলো পড়ালেখা শেখার জন্য। এই নারী শিক্ষকের তৎকালীন পরিভাষা ছিল মোল্লাবাজি। মোল্লাবাজির ছাত্ররা তাকে যে ধরনেরই উপহার দিতো শাহরবনু’র উপহারটা হতো একবারেই ভিন্নরকমের এবং উন্নত।শিক্ষকের মনে কৌতূহল জাগলো। কৌশলে শাহরবনু’র কাছ থেকে কথা বের করার চেষ্টা করলো তার বাবার অবস্থা কেমন, কী কাজ করে ইত্যাদি। শাহরবনু বুঝে উঠতে পারে নি তার শিক্ষক মোল্লাবাজি মনে মনে কী ছক কেটে রেখেছে সেজন্য সরলভাবে সে তার জীবনের সবকিছুই মোল্লাবাজিকে বলে দিলো।

মোল্লাবাজি তো শাহরবনু’র কথা শুনে বুঝতে পেরেছে যে তার বাবা অঢেল টাকা-পয়সার মালিক। তাদের জীবনে কোনো কিছুর কমতি নেই। মোল্লাবাজি মনে মনে ফন্দি আঁটলো এবং সেদিন থেকে শাহরবনুকে আরো কাছে টানার চেষ্টা করলো। তাকে এতো বেশি আদর যত্ন করতে শুরু করলো যেন ‘মায়ের চেয়ে খালারই দরদ বেশি’। শাহরবনুও আদরযত্নে একেবারে মোল্লাবাজিতে অন্ধ হয়ে গেল। মোল্লাবাজি যদি বলতো ‘দই তো কালো’ সে প্রশ্নহীনভাবে তাই মেনে নিতো। এভাবে কাটতে লাগলো দিনের পর রাত, সপ্তার পর মাস। একদিন মোল্লাবাজি শাহরবনু’কে একটা বাটি দিয়ে বললো: এই বাটিটা তোমার মা কে দেবে এবং আমার সালাম জানাবে। তারপর বলবে বাটিটা যেন সির্কা দিয়ে ভরে স্কুলে পাঠায়।

আবার বলেও দিয়েছে যখন তার মা গুদামঘরে যাবে সিরকা আনতে শাহরবনুও যেন তার পিছনে পিছনে যায় এবং বলে যে মোল্লাবাজি সাত বছরের সিরকা নিতে বলেছে। কোনোভাবেই যেন মাটির সপ্তম জার ছাড়া অন্য কোনো জার থেকে সিরকা না নেয়। ফলে এক এক করে সপ্তম জারের কাছে গিয়ে মুখ খুলে যখন সিরকা নিতে জারের ভেতরে মাথা দিয়ে কুঁজো হবে তার মা, তখন যেন মায়ের দু’পা উপরে তুলে জারের ভেতরে ফেলে দেয় এবং জারের মুখটা বন্ধ করে দেয়। শাহরবনু তো একদম অক্ষরে অক্ষরে মোল্লাবাজি’র কথা অনুসরণ করে মাকে জারের ভেতর ফেলে দিয়ে মুখ আটকে দেয়। এদিকে রাতের বেলা বাবা ঘরে ফিরে যখন দেখলো তার স্ত্রী ঘরে নেই শাহরবনুকে জিজ্ঞেস করলো: তুমি একা কেন, তোমার মামনি কোথায়? শাহরবনু বললো: জানি না। স্কুল থেকে বাসায় ফিরে মাকে দেখি নি।

পরদিন শাহরবনু যথারীতি স্কুলে গিয়ে যা যা সে করেছে মোল্লাবাজিকে সবকিছু খুলে বললো। মোল্লাবাজি সব কথা শুনে খুশি হয়ে গেল এবং শাহরবনুকে জড়িয়ে ধরে তার মাথার ওপর হাত বুলিয়ে দিয়ে কপালে চুমু খেলো। কিছুদিন পর মোল্লাবাজি এক মুঠো খকশির দিলো শাহরবনুর হাতে। খকশির হলো কাউনের মতো ছোটো ছোটো দানা। কাঁঠালি রঙের ওই দানা দিয়ে শরবৎ তৈরি করা হয়। শুকনো ওই দানা শাহরবনুকে দিয়ে মোল্লাবাজি বললো: বাসায় ফিরে এই খকশির তোমার মাথায় ঢালবে। যখন তোমার বাবা বাসায় ফিরবে তখন কাবাব তৈরি করার মানগাল বা কয়লার আগুন ভর্তি চার কোণা পাত্রের ওপর চুল ঝাড়বে যাতে খকশির কয়লার আগুনে পুড়ে টুস টাস শব্দ হয়। বাবা যখন জিজ্ঞেস করবে কীসের শব্দ হচ্ছে? তখন যেন বলে: ‘তার মাথায় প্রচুর উকুন জন্মেছে। তাকে তো দেখার কেউ নেই। কে তার বিছানাপাতি পরিষ্কার করবে, কে তাকে গোসল করাবে। আমার তো মা নেই। যদি মা থাকতো তাহলে কি তার এই দশা হতো’! এই বলে শাহরবনু কেঁদে দেয়। শাহরবনু কেঁদে ফেলায় তার বাবা তার মাথায় হাত বুলাতে গেলে শাহরবনু বলে: ‘তুমি আরেকটা বিয়ে করো। তাহলে নতুন মা আমাকে আদর যত্ন করবে, আমার ঘর পরিচ্ছন্ন রাখবে, আমাকে গোসল করাবে, সাজাবে গুছাবে, আর কোনো সমস্যা থাকবে না’। বাবা জিজ্ঞেস করে: আবার কাকে বিয়ে করতে যাবো!

শাহারবনু মোল্লাবাজির শিখিয়ে দেওয়া কথাগুলো ফরফর করে বলে দিলো: ‘বাবা তুমি কিছু কলিজা কিনে আনো। ওই কলিজা বাড়ির গেইটে ঝুলিয়ে রাখবে। যেই মহিলা প্রথম আসবে এবং যার মাথা ওই কলিজায় লাগবে ঠিক তাকেই তুমি বিয়ে করবে’। বাবা মেয়ের কথা মেনে নিয়ে ঠিক তাই করলো। পরদিন সকালে বাজারে গিয়ে কলিজা কিনে এনে দরোজায় ঝুলিয়ে রাখলো।

এই সুযোগের অপেক্ষাতেই ছিল মোল্লাবাজি। প্রতি মুহূর্তেই সে কান খাড়া করে রাখছিল কী হয় না হয়। হঠাৎ করেই সে আবির্ভূত হলো এবং খোঁজখবর নেওয়ার অজুহাতে বাসায় ঢুকতে চাইলো। কিন্তু বাসায় ঢোকার সময়ই সে বলতে লাগলো: ‘ওহ হো! মাথাটা আমার ব্যথা করছে। কী ঝুলিয়ে রেখেছো দরোজায় মাথায় লেগে আমার জামা-কাপড় সব রক্তে ভরে গেছে’। মোল্লাবাজির সরব কথাবার্তা শুনে শাহরবনুর বাবা ঘর থেকে বেরিয়ে মূল গেইটে গিয়ে মহিলার কাছে ক্ষমা চাইলো এবং কলিজা ঝুলিয়ে রাখার নেপথ্য ঘটনা খুলে বললো। মোল্লাবাজি ঘটনা শুনে বিয়েতে রাজি হয়ে গেল এবং শাহরবনুর বাবা মোল্লাবাজিকে নিয়ে গেল কাজির কাছে। আকদ করে মোল্লাবাজির হাত ধরে ঘরে নিয়ে গেল।

মোল্লাবাজি শাহরবনুকে এক পোটলা তুলার পরিবর্তে তিন পোটলা তুলা আর গরু নিয়ে চারণভূমিতে পাঠিয়েছে গরুকে ঘাসা খাওয়ানো আর সূতা বানানোর জন্য। কিন্তু ছোট্ট মেয়েটির পক্ষে এতো বেশি কাজ করা কী করে সম্ভব! তাই বিকেলের দিকে সে বসে কাঁদছিল। সে সময় হলুদ গরু এসে তাকে একটা পথ বাতলে দিলো। দৈত্যের কাছে গিয়ে সে দৈত্যের মন জয় করলো। দৈত্য শেষ পর্যন্ত তার সব কাজ করে দিয়ে বললো তৃতীয় উঠোনে গিয়ে ঝরনাধারার পাশে বসে হলুদ রঙের পানি নিয়ে তার চোখে-মুখে-ভ্রু-তে মাখতে আর সাদা পানি দিয়ে চেহারা ধুতে। শাহরবনু মাথা নেড়ে সম্মতি দিয়ে উঠোন পেরুলো।

শাহরবনু তৃতীয় উঠোনে গেল এবং বহমান পানির ধারার পাশে কসলো। দৈত্য যেভাবে যেভাবে বলেছিলো ঠিক সেভাবেই তার চোখ-ভ্রু-মাথা ধুয়ে নিলো কালো পানি দিয়ে আর সাদা পানি দিয়ে ধুইলো তার কচি চেহারাটা। তারপর ফিরে এলো দৈত্যের কাছে। দৈত্যের কাছ থেকে বিদায় নিয়ে বাসায় ফিরতে চাইলো সে। দৈত্য বললো: যখনই তোমার কষ্ট হবে কঠিন কাজের চাপ পড়বে চলে আসবে আমার কাছে। শাহরবনু অনেক অনেক ধন্যবাদ দিয়ে তার সূতাগুলো নিয়ে কূপের ভেতর থেকে বেরিয়ে এলো। এসেই দেখে হলুদ রঙের গরুটা দাঁড়িয়ে আছে। সন্ধ্যা ঘনিয়ে এসেছে তখন। চারদিকে আঁধার নেমে আসছিল। কিন্তু শাহরবনু দেখলো তার পায়ের সামনে আলো। সুন্দরভাবে পথ দেখা যাচ্ছে। কোত্থেকে এ আলো আসছে সে দেখতে চাইলো তার চারপাশে।

অনেকক্ষণ পর সে বুঝলো এ আলো তার নিজের চেহারা থেকে আসছে। যখন সে তার চেহারায় সাদা পানি দিয়েছিল তখন তার কপালের মাঝখানে পূর্ণিমার চাঁদের মতো একটা আলো আর তার কাঁধের মাঝখানে একটা তারকা ফুটে উঠেছিল। শাহরবনু চিন্তায় পড়ে গেল। এই চাঁদ আর তারা নিয়ে সে যদি বাসায় ফিরে যায় মোল্লাবাজি তাকে আরও বেশি কষ্ট দেবে, জ্বালাতন করবে। তাড়াতাড়ি সে তার কপাল এবং কাঁধ ঢেকে নিলো স্কার্ফ দিয়ে। তারপর বাসায় গিয়ে মোল্লাবাজির হাতে সূতা বুঝিয়ে দিলো। তার দুষ্টু মা আশ্চর্য হয়ে গেল। মনে মনে বললো: শাহরবনু কী করে একদিনে তিন বস্তা তুলার সূতা বানালো! সে সূতাগুলো ভালো করে দেখতে শুরু করলো কোথাও কোনো ত্রুটি খুঁজে পাওয়া যায় কিনা; কিন্তু না, কোনো ত্রুটি ধরার সুযোগ পেল না সে। রেগেমেগে সে শাহরবনু বললো: যা! ঘর ঝাড়ু দে। তার টার্গেট ছিল অন্ধকারে ঘর ভালো করে ঝাড়ু না দিতে পারলে তাকে মার দেওয়ার অজুহাত পাবে সে।

মোল্লাবাজি রান্নাঘরের কাছে যেতেই বিস্ময়ে হতবাক হয়ে গেল। কোত্থেকে যেন আলো বিচ্ছুরিত হচ্ছে। পা টিপে টিপে সামনে গিয়ে দেখে শাহরবনুর কপালে ছোট্ট একটা চাঁদ। ওই চাঁদ থেকে আলো বিচ্ছুরিত হচ্ছে। আর তার ঘাড় থেকে বেরুচ্ছে তারকার আলো। শাহরবনু এমনিতেই বেশ সুন্দর ছিল, এখন আরও সুন্দর হয়ে গেছে। মোল্লাবাজি শাহরবনুর হাত ধরে রুমের ভেতর নিয়ে বললো: মার খাবার আগে সত্যি করে বল কীভাবে এসব হয়েছে। এই চাঁদ এই তারা কীভাবে কোত্থেকে পেলি? শাহরবনু এমনিতেই সহজ সরল ছিল। সে সবকিছু খুলে বলে দিলো মোল্লাবাজিকে। মোল্লাবাজি কিচ্ছু না বলে ভাবলো পরদিন তার মেয়েকে শাহরবনুর সাথে পাঠাবে যেন সেও ওই কূপে যায় এবং কপালে চাঁদ আর কাঁধে তারা নিয়ে ফেরে।

মোল্লাবাজি শাহরবনুর সাথে ভালো ব্যবহার করতে শুরু করলো। তাকে আদর করে বললো: শাহরবনুজান! কাল তুমি তোমার সাথে আমার মেয়েকেও নিয়ে যাবে,কেমন! তোমার বোনকেও ওই কূপের ভেতর পাঠাবে। তুমি যা যা করেছো সব তাকে শিখিয়ে দেবে যাতে ওর কপালে আর ঘাড়েও তোমার মতো চাঁদ আর সেতারা ফুটে ওঠে, কেমন! তাহলে সেও তোমার মতো সুন্দরী হয়ে উঠবে। শাহরবনু বললো: ঠিক আছে! আমি তাকে সাহায্য করবো। পরদিন সকালবেলা মোল্লাবাজি তিন পোটলার বদলে আধা পোটলা তুলা দিলো শাহরবনুকে কারণ আজ তার নিজের মেয়েও যাচ্ছে। দুপুরের খাবারের জন্য শুকনো রুটি আর বাসি পনিরের পরিবর্তে মুরগির কাবাব এবং দুধের তৈরি রুটি দিলো। মোল্লাবাজির মেয়ে শাহরবনুর হাত ধরে চললো চারণভূমির দিকে। তাদের সঙ্গে রয়েছে হলুদ গরু মানে শাহরবনুর প্রকৃত মা।

যেতে যেতে একসময় তারা গিয়ে পৌঁছলো চারণভূমিতে। মোল্লাবাজির মেয়ে শাহরবনুকে বললো: তাড়াতাড়ি আমাকে ওই কৗপে নিয়ে যাও! শাহরবনু তা-ই করলো। সে কূপ দেখিয়ে দিলো। মোল্লাবাজির মেয়ে তুলাগুলো ফেললো ওই কূপে এবং সে নিজেও ঢুকে গেল কূপের ভেতর। ভেতরে গিয়ে দেখলো একটা বাগিচায় ঘুমোচ্ছে ওই দৈত্যটা। মোল্লাবাজির মেয়ের পায়ের শব্দের দৈত্যের ঘুম ভেঙে গেল। চোখ মেলে দেখলো বিশ্রী একটা মেয়ে তার সামনা-সামনি দাঁড়িয়ে আছে। মেয়েটা তাকে কোনোরকম সালামও করলো না। দৈত্য তাই গভীর দৃষ্টিতে মেয়েটার দিকে তাকিয়ে থাকলো। মেয়েটাও অপলক চোখে তাকিয়ে থাকলো দৈত্যের দিকে।#

আমরা দেখেছি মোল্লাবাজি শাহরবনুর কপালে আলো দেখে তার মেয়েকেও পরদিন পাঠিয়েছে দৈত্যের কাছে যেন সেও কপালে চাঁদ আর কাঁধে তারা নিয়ে ফেরে। কিন্তু ঘটনা উল্টো ঘটেছে। মোল্লাবাজির মেয়ের কপালে একটা আর কাঁধে গজিয়েছে একটা হলুদ বিচ্ছু। বাসায় ফেরার পর মা তাকে দেখে তো অজ্ঞান হয়ে পড়ার উপক্রম। এরইমধ্যে প্রতিবেশি এসে বিয়ের দাওয়াত দিয়ে গেছে এবং মোল্লাবাজিও কথা দিয়েছে মেয়েকে নিয়ে যাবে।

বিয়ের অনুষ্ঠানে যাবার প্রস্তুতি চললো। মোল্লাবাজি মেয়েকে নতুন জামা কাপড় পরালো। জমকালো গয়নাগাটি পরালো তারপর সিল্কের রুমাল দিয়ে তার কপাল এবং ঘাড় ঢেলে দিলো। নিজেও নতুন পোশাক পরলো এবং ব্যাপকভাবে সাজলো। শাহরবনু এ সময় ঘরের এক কোণে দাঁড়িয়ে ছিল। তারও খুব ইচ্ছে করছিলো অনুষ্ঠানে যেতে। মোল্লাবাজির নজর পড়লো তার ওপর। জিজ্ঞেস করলো: কী! বিয়েতে যেতে ইচ্ছে হচ্ছে? শাহরবনু মাথা নেড়ে বললো: হ্যাঁ! মোল্লাবাজি বললো: তোকে বিয়েতে যাওয়া দেখাচ্ছি, দাঁড়া! এই বলে মোল্লাবাজি স্টোর রুম থেকে তিন-চার বাটি ছোলা, সয়া বিচি আর ভাঙা ডাল একসাথে মিলিয়ে দিয়ে বললো: এই ধর ডালের বাটি আর এই নে খালি বাটি। খালি বাটি তোর অশ্রু দিয়ে পূর্ণ করবি আর ডালগুলো সব আলাদা করে রাখবি। এই হলো তোর বিয়েতে যাবার আয়োজন।

মোল্লাবাজি শাহরবনুর হাতে ডালের বাটি ধরিয়ে দিয়ে হাসতে হাসতে মেয়েকে হাত ধরে টেনে নিয়ে গেল বিয়ে বাড়িতে। শাহরবনু ঘরের এক কোণে বসে বসে দুশ্চিন্তা করছিল: কী করে ওই বাটি চোখের পানি দিয়ে পূর্ণ করবে আর এতো ডাল ছোলা আর সয়া আলাদা করবে। হঠাৎ তার মনে পড়ে গেল দৈত্যের কথা। দৈত্য বলেছিল কখনো কোনো বিপদে পড়লে তাকে যেন জানায়। শাহরবনু উঠে তাড়াতাড়ি চলে গেল মরুভূমিতে দৈত্যের কূপে। দৈত্যকে দেখেই সালাম দিয়ে তার দুষ্ট মায়ের দেওয়া শাস্তির কথা বলে সাহায্য চাইলো। দৈত্য বললো: ঘাবড়াবার কিচ্ছু নেই। তাড়াতাড়ি উঠে এক মুষ্টি সামুদ্রিক লবণ নিয়ে এলো এবং শাহরবনুর হাতে দিয়ে বললো: বাটি পানিতে পূর্ণ করে এই লবণ ওই বাটিতে ঢালবে। এরপর দৈত্য মোল্লাবাজির মোরগের মতো হুবহু একটা মোরগ দিলো শাহরবনুকে।

মোরগ দিয়ে বললো: সবার আগে যেন মোল্লাবাজির মোরগটাকে তার অজান্তে জবাই করে। তাহলে এই মোরগটা তার কাজে লাগবে। সেইসাথে শাহরবনুকে বললো তার যদি বিয়েতে যেতে ইচ্ছে করে তাহলে যেতে পারে। শাহরবনু বললো: ভীষণ ইচ্ছে করছে যেতে। দৈত্য ভেতরে গিয়ে ছোট্ট একটা সিন্দুক নিয়ে এল। সিন্দুক খুলে বিয়ের অনুষ্ঠান উপযোগী একটা পোশাক, চমৎকার একটা মুকুট আর এক জোড়া জুতা শাহরবনুকে দিলো। আরও দিলো মুক্তার একটা মালা, এক জাড়া সোনার চুড়ি, হীরার একটি আংটি। এগুলো দিয়ে বললো: বাসায় ফিরে যেন এগুলো পরে বিয়ের অনুষ্ঠানে যায়। তবে বিয়ের আনুষ্ঠানিকতা শেষ হবার আগেভাগেই যেন বাসায় ফিরে এসে আগের পোশাক পরে। এসব বলে দৈত্য তার তোষকের নীচ থেকে একটা তেলের শিশি বের করলো। শাহরবনুর পায়ে কিছুটা মলে দিলো যাতে দ্রুত যেতে পারে।

দৈত্য শাহরবনুর এক হাতে দিলো তাজা ফুলের সুগন্ধিময় পাপড়ি আর অপর হাতে দিলো এক মুষ্টি ছাই। বললো: বিয়ে বাড়িতে গিয়ে ছাইগুলো ছিটাবে মোল্লাবাজি আর তার মেয়ের মাথায়,অপর পাপড়িগুলো ছিটাবে বর-কনে এবং অতিথিদের মাথায়। শাহরবনু মাথা নেড়ে ঠিক আছে বলে ফিরে গেল বাসায়।

দৈত্যের পরামর্শ নিয়ে বাসায় ফিরে শাহরবনু সব কাজ ঠিকঠাক মতোই করল। নিজের পুরনো জীর্ণ পোশাক পাল্টালো। পুরোনো কাপড়-চোপড়গুলো নিয়ে লুকিয়ে রাখলো খোঁয়াড়ে। দৈত্যের দেওয়া রাজকীয় পোশাক পরে সেজেগুজে প্রস্তুত হলো। তাকে দেখলে যে-কেউই হা করে তাকিয়ে থেকে ভাববে: এ কী মানুষ নাকি বেহেশতের কোনো হুর। ওই পোশাকেই শাহরবনু পা বাড়ালো বিয়ে বাড়ির দিকে এবং এক সময় গিয়ে হাজির হলো। বিয়ে বাড়িতে শাহরবনুর পা পড়তেই চারদিকে গুঞ্জন শুরু হয়ে গেল। কেউ আর বরকনের দিকে তাকালো না শাহরবনুর দিকেই এক দৃষ্টিতে তাকিয়ে থাকলো সবাই। একে অপরকে জিজ্ঞেস করতে লাগলো: এ মেয়ে কে? এতো সুন্দর? হতবুদ্ধি হয়ে গেল সবাই। বিশ্বাসই হচ্ছিল না কারও যে কোনো মানুষ এতো সুন্দর হতে পারে।

সবাই যখন এভাবে বলাবলি করছিল মোল্লাবাজির মেয়ে তখন তার মায়ের দিকে তাকিয়ে বললো: মা! আমার মনে হয় যে মেয়েকে নিয়ে এখানে গুঞ্জন চলছে সে আর কেউ নয় শাহরবনু। তুমি তাকে বিচি বাছতে দিয়ে এসেছো, সেগুলো ফেলে রেখে সে এখানে চলে এসেছে। মোল্লাবাজি বললো: তোর কি কোনো আক্কেল-জ্ঞান আছে? শাহরবনু এখন বিছি বাছার কাজে ব্যস্ত। সে জোর করে কান্নাকাটি করার চেষ্টা করছে যাতে পেয়ালাটা চোখের পানিতে পূর্ণ করতে পারে। নৈলে তো সে জানে কী পরিমাণ মার খেতে হবে তাকে। কিন্তু মা! এ মেয়েকে শাহরবনুর মতোই লাগছে। শাহরবনুর চোখ, নাক, ভ্রু, উচ্চতা, চুল সবকিছুই এ মেয়ের সাথে মিলে যায়।

মোল্লাবাজি বলল: বাদ দে এসব ফালতু কথা। সবজি বাগানে গেলে এক রকম বেগুন হাজারটা পাওয়া পাবে। তাহলে একটা শহরে একরকম দেখতে দুইটা মেয়ে পাওয়া যেতে পারে না? তো শেষ পর্যন্ত শাহরবনু ফুলের পাপড়ি ছিটালো বরকনে আর মেহমানদের মাথায়। ওই ফুলের পাপড়ির ঘ্রাণ উপস্থিত সবাইকে ভীষণভাবে আকৃষ্ট করলো। আর অন্য হাতে থাকা ছাই ছিটিয়ে দিলো মোল্লাবাজি আর তার মেয়ের ওপর। বিয়ের অনুষ্ঠানে যারা ছিল সবাই অবাক হয়ে গেল এর মাঝে কী রহস্য আছে: সবার উপরে ছিটালো ফুলের পাপড়ি আর ওই মা মেয়ের মাথায় কেন ছাই! এর রহস্য কেউই উন্মোচন করতে পারল না। কিন্তু যে প্রশ্নটি দেখা দিল তাহলো এই মেয়ে এত ফুল আর এই ছাই পেলো কোথায়! শাহরবনু যখন দেখলো সবাই ফুল আর ছাইয়ের রহস্য নিয়ে মেতে আছে, সেই সুযোগে সে আস্তে করে বেরিয়ে গেল বিয়ের মজলিশ থেকে এবং সোজা চলে গেল বাসায়।

ঘটনাক্রমে বাদশার ছেলে শিকার করে ফিরছিল বাসায়। পথেই শাহরবনুকে দেখে তার পিছু নিল। শাহরবনু ভয় পেয়ে আরও জোরে দৌড়াতে লাগলো। দৌড়াতে দৌড়াতে সামনে পড়লো একটা খাল। খাল পার হতে গিয়ে তার এক পায়ের জুতো রয়ে গেল ওপারে। শাহরবনু দেখলো ওই জুতার জন্য পেছনে গেলে শাহজাদা তাকে ধরে ফেলতে পারবে। তাই জুতা রেখেই দৌড়ে পালালো। শাহজাদা শাহরবনুর নাগাল আর পেল না। তবে শাহরবনুর এক পায়ের জুতো নিয়েই সে ফিরলো প্রাসাদে।

এদিকে মোল্লাবাজি আর তার মেয়ে বিরক্ত হয়ে বিয়ে বাড়ি থেকে তাড়াতাড়ি ফিরে গেল বাসায়। মাথাভর্তি ছাই নিয়েই তারা ফিরলো। ওই ছাইয়ের জের শাহরবনুকে পিটিয়ে শোধ নিতে হবে! কিন্তু কী হলো আসলে তারপর! সে কাহিনী শুনবো পরবর্তী আসরে।

 

মোল্লাবাজির মেয়ের পায়ের শব্দে দৈত্যের ঘুম ভেঙে গেল। চোখ মেলে সে দেখলো বিশ্রি একটা মেয়ে তার সামনা-সামনি দাঁড়িয়ে আছে। মেয়েটা তাকে কোনোরকম সালামও করলো না। দৈত্য তাই গভীর দৃষ্টিতে মেয়েটার দিকে তাকিয়ে থাকলো। মেয়েটাও অপলক চোখে তাকিয়ে থাকলো দৈত্যের দিকে। তারপর কী ঘটলো, সে কাহিনী আমরা শুনবো আজকের আসরে। আপনারা যারা দীর্ঘ সময় ধরে ভেবেছেন কী ঘটতে পারে তাঁরা মিলিয়ে নিন নিজ নিজ ভাবনাগুলো।

সেই অপলক চোখে মেয়েটির দিকে তাকিয়ে থেকেই দৈত্য বললো: ওই! তুই এখানে কী করছিস! মেয়েটি বললো: আমার তুলাগুলো বাতাসে এখানে উড়িয়ে নিয়ে এসেছে। তাই এসেছি তুলাগুলো নিতে। দৈত্য বললো: এতো তাড়া কীসের! এদিকে আয়! আমার মাথাটা ভালো করে পরিষ্কার করে দে! তারপর তোর তুলা নিয়ে চলে যা। মেয়েটা রাগে বিড়বিড় করছিল। কিন্তু কিচ্ছু করার নেই। সামনে এগিয়ে গেল এবং দৈত্যের চুলে বিলি কাটতে শুরু করে দিল। দৈত্য বললো: আচ্ছা! বল তো! আমার চুল সুন্দর পরিষ্কার নাকি তোর মায়ের চুল। মেয়েটা বললো: অবশ্যই আমার মায়ের চুল। মায়ের মাথায় উকুন আর তোমার মাথাভর্তি সাপ আর বিচ্ছু। দৈত্য বললো: ঠিক আছে! এবার উঠে গিয়ে উঠানটায় ঝাড়ু দে!

মেয়েটা বিরক্তির সাথে উঠলো এবং উঠোনে ঝাড়ু দিয়ে দৈত্যের কাছে এলো। দৈত্য বললো: বল তো! তোদের উঠোন সুন্দর নাকি আমারটা? মেয়ে ঝটফট বললো: অবশ্যই আমাদের উঠোন। আমাদের উঠোনে কেউ গেলে তার মন প্রশান্তিতে ভরে ওঠে। আর তোমার উঠোনে কেউ এলে তো তার মনটাই বিষিয়ে উঠবে। দৈত্য বললো: তাই। ঠিক আছে। যা,এবার আমার থালাবাটিগুলো ধো! মোল্লাবাজির মেয়ে এবার বললো: হায় খোদা! কী ঝামেলার মধ্যে পড়লাম’। কিন্তু কিচ্ছু করার নেই। ইচ্ছার বাইরেও তাকে ধুতেই হলো থালাবাসন। কোনোরকমে ধুয়ে সেগুলো নিয়ে রাখলো রান্নাঘরের এক কোণে। দৈত্য এবার জানতে চাইলো: কার থালাবাসন সুন্দর, তারগুলো নাকি মেয়েরগুলো! মেয়ে নির্দ্বিধায় বললো: নি:সন্দেহে আমাদেরগুলো সুন্দর। তোমার থালাবাসন যে দেখবে তার তো মাথাখারাপ হয়ে যাবে। এবার দৈত্য বললো: অনেক হয়েছে। এবার তোর মুখ বন্ধ কর। উঠোন থেকে তোর তুলাগুলো নিয়ে ভাগ।

মোল্লাবাজির মেয়ে তুলা নিতে গিয়ে দেখে তুলার পাশে পড়ে আছে ঝকমকে সোনার বার। অনেক অনেক। সে হাতে নিয়ে দেখলো বেশ ওজন ওগুলোর। লোভ সামলাতে না পেরে কয়েকটা নিয়ে জামার ভেতর লুকালো। মাথা নীচু করে এবার বিদায় না নিয়েই কূপ থেকে বেরিয়ে যেতে চাইলো। কিন্তু তখনই তাকে ডাক দিলো দৈত্য।

দৈত্য বললো: কোথায় যাস। এতো তাড়া কেন। এদিকে আয়। কাজ আছে। মেয়েটি ফিরে এসে দৈত্যের সামনে দাঁড়ালো। দৈত্য বললো: বাইরে যাবার আগে এই উঠান থেকে দ্বিতীয় উঠানে যাবে। দ্বিতীয় উঠান থেকে তৃতীয় উঠানে। সেখানে দেখবি উঠানের মাঝখান দিয়ে পানির ধারা বয়ে যাচ্ছে। ওর পাশে বসবি। যখন দেখবি সাদা এবং কালো পানি আসছে, হাত লাগাবি না। যখনই দেখবি হলুদ রঙের পানি আসছে সেই পানি দিয়ে তোর হাত মুখ ধুয়ে নিবি,তারপর তুই তোর কাজে যাবি।

মেয়েটা দৈত্যের কথামতো পানির ধারার পাশে গিয়ে বসলো এবং যখনই হলুদ রঙের পানি এলো ওই পানি দিয়ে সে তার হাত মুখ ভালো করে ধুয়ে নিলো। তারপর তার তুলা নিয়ে কূপ থেকে বেরিয়ে গেল। শাহরবনু এতোক্ষণ মোল্লাবাজির মেয়ের অপেক্ষায় ছিল। তাকে দেখেই শাহরবনু খুশি হবার পরিবর্তে তার অজ্ঞান হয়ে পড়ার অবস্থা হলো। কারণ সে দেখলো মোল্লাবাজির মেয়ের কপালের মাঝখানে কালো একটা সাপ আর একটা হলুদ বিচ্ছু তার ঘাড়ে বসা। কিন্তু ভয়ে সে টু শব্দটি করলো না। একসাথে রওনা হলো বাড়ির দিকে। বাসায় ফেরার পর মোল্লাবাজি তার মেয়েকে দেখেই ভয়ে চীৎকার করে উঠলো। নিজের মাথায় নিজে হাত দিয়ে চাপড়াতে চাপড়াতে ভাবলো প্রতিবেশিরা আবার না দেখে ফেলে। সেজন্য তাড়াতাড়ি মেয়েকে ঘরের ভেতর নিয়ে বললো: এটা তুই কী করলি! কেমনে এইরকম ভয়ংকর চেহারা বানালি তুই!

মেয়ে মাকে সবকিছু খুলে বললো দৈত্যের সাথে যা যা ঘটেছিল। মোল্লাবাজি ভীষণ বিরক্ত হলো। বললো: তো স্বর্ণের বার আর সূতাগুলো কই? মেয়ে তার পোটলাটা মাটিতে রাখলো। মোল্লাবাজি দেখলো সূতা কোথায়! যে তুলা সে তুলাই নিয়ে এসেছে। এরপর স্বর্ণের বার দেখতে গিয়ে দেখে সেগুলো সব পাথরের টুকরো। মোল্লাবাজি আর রাগ সামলাতে না পেরে বকাবকি শুরু করে দিলো মেয়েকে। কী জন্য তোকে লালনপালন করে এতো বড়ো করলাম। মেয়ে বললো: আমি কি দৈত্যের কাছে যেতে চেয়েছি? তুমিই তো পাঠিয়েছো! সে কারণেই তো আমার এখন এ অবস্থা। বলতে বলতে কাঁদতে শুরু করলো সে। মোল্লাবাজি এবার বললো: সব দোষ শাহরবনুর। এই বলেই শাহরবনুকে কষে এক চড় মেরে বসলো। তারপর মেয়েকে নিয়ে গেল হেকিমের কাছে।

হেকিম বললো: এগুলোর শেকড় মনের ভেতরে। ওই শেকড় কাটা সম্ভব নয়। একটাই আছে করণীয়, সেটা হলো একদিন পরপর ধারালো ছুরি দিয়ে সাপ আর বিচ্ছুর লেজ কেটে দিতে হবে। আর কাটা জায়গায় লবণ লাগিয়ে দিতে হবে। এরপর থেকে মেয়ের ওই একটাই কাজ থাকলো: বিচ্ছু আর সাপের লেজ কাটা। ইতোমধ্যে এক প্রতিবেশি মোল্লাবাজি আর তার মেয়েকে বিয়ের দাওয়াত দিলো। মোল্লাবাজি তার পীড়াপীড়িতে বিয়েতে যাবার ব্যাপারে কথা দিতে বাধ্য হলো।

 

মোল্লাবাজি মাথায় ছাই নিয়ে বিরক্ত হয়ে বিয়ের মজলিশ ছেড়ে বাসায় ফিরে এলো শাহরবনুর উপরে ঝাল ঝাড়তে। ঘরের দরজায় না পৌঁছতেই চীৎকার করে বললো: শাহরবনু! তাড়াতাড়ি আয়। দেখি চোখের পানিতে বাটি ভর্তি করেছিস কিনা। শাহরবনু তাড়াতাড়ি লবণাক্ত পানি ভর্তি বাটি নিয়ে এলো। মোল্লাবাজির হাতে দিল। মোল্লাবাজি বাটির পানি মুখ দিয়ে চেখে দেখলো লবণাক্ত। বাটির দিকে তাকিয়ে দেখলো একেবারে স্বচ্ছ। বললো: বিচিগুলো কী করেছিস? শাহরবনু বললো: সব আলাদা করেছি। এই বলে মোল্লাবাজির হাত ধরে টেনে নিয়ে গেল ভেতরে। দেখালো আলাদা আলাদা করে রাখা বিচিগুলো। মোল্লাবাজি আশ্চর্য হয়ে গেল।

মনে মনে বললো: কেউ যদি প্রশান্ত মনে ধৈর্যের সাথেও এই কাজ করে তাহলেও তার অন্তত এক মাস সময় লাগার কথা। কিন্তু শাহরবনু কান্নাকাটি করতে করতে কী করে এতো তাড়াতাড়ি সব কাজ করে ফেলল? উপায় না দেখে মোল্লাবাজি শাহরবনুকে বলল দ্রুত ঘর ঝাড়ু দিতে। মনে মনে বলল: এই মেয়ের কাণ্ড কারখানা তো কিছুই বুঝে আসছে না। মোল্লাবাজির মেয়ে তাকে বলল: নিশ্চয়ই কেউ শাহরবনুকে সাহায্য করেছে। মোল্লাবাজি বলল: মনে হয় ওই হলুদ গরুটা মানে শাহরবনুর মা। সে-ই শাহরবনুকে কূপ আর রাস্তা বাতলে দেয়। এই গরু যতদিন জীবিত থাকবে শাহরবনু ততদিন আমাকে ধোঁকা দিয়েই যাবে। সুতরাং গরুটাকে মেরে ফেলতে হবে।

এই বলে মোল্লাবাজি জামা কাপড় পাল্টে উঠে পড়লো এবং সোজা গিয়ে হাজির হয়ে গেল হেকিমের কাছে। হেকিমের কাছে গিয়ে বলল: রাতে যেন বাসায় আসে। তাকে দেখে যেন বলে মারাত্মক অসুখ হয়েছে। এই অসুখের চিকিৎসা হলো হলুদ গরুর গোশত। এই বলেই মোল্লাবাজি ফিরে গেল বাসায়। রাতে তার স্বামী বাসায় ফেরার আগেই অসুখের ভান করে শুয়ে পড়ল। শুয়ে শুয়ে উহ…আহ… আল্লাহ মরে গেলাম… ওহ.. আমার কোমর… আ..হা! হা… হা… বুকের ব্যথায় মরে গেলাম… কেউ কি নেই এখানে… আমার চীৎকার কি কারো কানে যায় না… ইত্যাদি ভান করতে শুরু করলো।

মোল্লাবাজির স্বামী বাসায় ফিরে বৌয়ের এই অবস্থা দেখে কী করবে না করবে বুঝে উঠতে পারছিল না। তাড়াতাড়ি গভযাবন ফুল আর এনাব জ্বাল দিয়ে চা তৈরি করে দিল। কিন্তু কিছুতেই কিছু হলো না। ব্যথা একটুও কমলো না। পরদিন মোল্লাবাজি তার চেহারায় একটু হলুদ মাখলো আর তোষকের নীচে শুকনো মচমচে রুটি রাখলো। রাতে স্বামী ঘরে ফিরতেই খাটে উঠে এপাশ ওপাশ গড়াতে লাগলো আর শুকনো রুটি ভাঙার শব্দ হচ্ছিল পিঠের নীচ থেকে। মহিলা চীৎকার করে কান্নাকাটি করে বলতে লাগলো: আল্লাহ আমার শরীরের হাড্ডিগুলোও ভেঙে যাচ্ছে। স্বামী এই অবস্থা দেখে তো হতবাক হয়ে গেল। তাড়াতাড়ি দৌড়ে গেল হেকিমের কাছে।

হেকিম মোল্লাবাজির শিয়রে আসতেই মোল্লাবাজির কান্নাকাটি বেড়ে গেল। হেকিম ভালো করে পরীক্ষা করে স্বামীকে বললো: এই রোগের একমাত্র ওষুধ হচ্ছে হলুদ গরুর গোশত। আজ রাতের মধ্যে কিংবা কাল যদি জোগাড় করতে পারো তো ভালো না পারলে তোমার স্ত্রীর দাফন কাফনের ব্যবস্থা করতে হবে। মোল্লাবাজির স্বামী খুশি হয়ে গেল,বললো: “আল্লাহর দরবারে শুকরিয়া আদায় করছি এজন্য যে আমাদের নিজেদেরই হলুদ গরু আছে। কাল সকালেই ওই গরুটা জবাই করবো এবং গোশতগুলো আমার স্ত্রীকে দেব রান্না করে খাবার জন্য”। শাহরবনু এসব কথা শুনে ভীষণ উদ্বিগ্ন হয়ে পড়লো। কারণ এই হলুদ গরু ছিল তার মা। কিছুতেই বুঝে উঠতে পারছিল না কীভাবে মাকে এই বিপদ থেকে রক্ষা করবে। অবশেষে বললো: দৈত্যের কাছে যাওয়াটাই ভালো। দৈত্য সুন্দর একটা উপায় বাতলে দেবে।

শাহরবনু ওই রাতেই সবাই ঘুমিয়ে পড়লে পা টিপে টিপে ঘর থেকে বেরিয়ে গিয়ে সোজা চলে গেল দৈত্যের কূপে। দৈত্যকে সালাম করে সব ঘটনা তাকে খুলে বললো। দৈত্য বললো: দুশ্চিন্তার কোনো কারণ নেই। দ্রুত ঘরে ফিরে যাও। হলুদ গরুটাকে নিয়ে এসে মরুভূমিতে ছেড়ে দাও। আমি তোমাকে হুবহু ওই গরুর মতো আরেকটি গরু দিয়ে দিচ্ছি। এই গরুটাকে খোঁয়াড়ে নিয়ে বেঁধে রেখো! সকালে যখন কসাই এসে এই গরু জবাই করবে তুমি তার গোশত খাবে না। আর হাড্ডিগুলো নিয়ে গিয়ে খোঁয়াড়ে দাফন করে রাখবে।

শাহরবনু দ্রুত ঘরে ফিরে গিয়ে তার মাকে নিয়ে এল মরুভূমিতে। তাকে ছেড়ে দিয়ে দৈত্যের কাছে যেতেই দৈত্য আরেকটা গরু দিলো হুবহু তার মায়ের মতো। ওই গরু নিয়ে তার মায়ের জায়গায় বেঁধে রাখলো। তখনো সকাল হয় নি। ফজরের আজান হতে আরও ঘণ্টা তিনেক বাকি আছে। শাহরবনু তাই ঘুমিয়ে পড়লো নিশ্চিন্তে।

ভোরে শাহরবনুর বাবা তাড়াতাড়ি করে কসাই নিয়ে এল। কসাই খোঁয়াড় থেকে হলুদ গরুটাকে বের করে এনে জবাই করলো। গরুর গোশতের কাবাব বানিয়ে খেলো সবাই। শুধু শাহরবনুই খেল না। যতই তাকে খাওয়ার জন্য পীড়াপীড়ি করা হলো কিছুতেই সে খেল না। সে বরং উঠে গিয়ে গরুর হাড্ডিগুলোকে মাটিতে পুঁতে রাখলো খোঁয়াড়ের ভেতর। মোল্লাবাজি গরুর কাবাব খেয়ে সুস্থ হয়ে ওঠার ভান করলো। মনে মনে খুশি এই ভেবে যে এখন আর শাহরবনুকে সাহায্য করার কেউ নেই।

কিন্তু সে তো জানে না শাহজাদার চোখে আটকে পড়ে গেছে শাহরবনু। এত বেশি ভালোবেসে ফেলেছে তাকে যে শাহজাদা শাহরবনুর দেখা না পেয়ে তার জুতোটা বালিশের নীচে রেখে ঘুমায় আর ওই জুতার ময়লা সুরমার মতো চোখে লাগায়।

 

শাহরবনুর প্রেমে শাহজাদার অবস্থা পাগলের মতো হয়ে গেল। বাদশার স্ত্রী ছেলের চিকিৎসার জন্য শহরের যত ডাক্তার ছিল সবাইকে হাজির করলো। ডাক্তারদের বললো যে করেই হোক আমার ছেলেকে সুস্থ করে তুলতে হবে। আমার ছেলের কষ্ট যে করেই হোক দূর করতে হবে। চিকিৎসকেরা শাহজাদাকে পরীক্ষা করে বুঝলেন বাদশার ছেলের আসলে কোনো রোগব্যাধি হয় নি সে কোনো এক মেয়ের প্রেমে পড়েছে। ওই মেয়ের এক পায়ের জুতাও তার কাছে আছে। বাদশার স্ত্রী একথা জানতে পেরে ছেলেকে সান্ত্বনা দিয়ে বললো: চিন্তা করো না বাবা! যে মেয়েকে তুমি চাও সেই মেয়ে যদি রূপকথার পাহাড়ের পেছনেও থাকে বের করে আনা হবে এবং তোমার হাতে তার হাত সঁপে দেওয়া হবে।

এরপর বাদশার স্ত্রীর আদেশে জুতা বিশেষজ্ঞ কয়েকজন বৃদ্ধাকে ওই জুতোটা দিয়ে পাঠানো হলো শহরের প্রতিটি ঘরে গিয়ে খোঁজ নিতে। কিন্তু খোঁজ নিয়ে কোনো কাজ হলো না। জুতোর জোড়া মিললো না মানে জুতার মালিককে পাওয়া গেল না। ওই জুতা যে মেয়ের পায়েই পরানো হয়েছে হয় ছোট না হয় বড় হয়েছে। ঠিকমতো কারো পায়েই হয় নি। অবশেষে শাহরবনুর বাবার ঘরে যখন গেল বুড়িরা মোল্লাবাজি তখন শাহরবনুকে নিয়ে লুকিয়ে রাখলো তন্দুরি বানাবার চুল্লির ভেতর। ফার্সিতে এই চুল্লিকে বলা হয় তানুর। তানুরের মুখটাকে একটা বড়ো ডালা দিয়ে ঢেকে দিলো যাতে বুঝতে পারা না যায় যে ভেতরে কেউ আছে।

ওই ডালায় শস্যদানাও রাখল। এরপর মোল্লাবাজি তানুরের কাছে মোরগকেও ছেড়ে দিলো যাতে মোরগ সেখানে ঘুরে বেড়ায় এবং টুক টুক করে ডালায় রাখা শস্যদানা খায়। এর ফলে শাহরবনু যদি শব্দ করার চেষ্টাও করে মোরগের শব্দের কারণে কেউ তা বুঝে উঠতে পারবে না।

রাজদরবারের মহিলারা মোল্লাবাজির ঘরে ঢুকে জিজ্ঞেস করলো: ঘরে কোনো মেয়ে নেই?

মোল্লাবাজি বললো: থাকবে না কেন। অবশ্যই আছে এবং ভালো মেয়ে আছে।” এই বলে মোল্লাবাজি নিজের মেয়েকে এনে হাজির করলো। মহিলারা শাহজাদার দেওয়া জুতাটা পরতে বললো মেয়েকে। কিন্তু যতই চেষ্টা করলো মেয়ের পায়ে কিছুতেই ওই জুতা লাগলো না।

সব ঘরই দেখা শেষ হয়ে গেছে। তাই দরবারের মহিলারা মোল্লাবাজিকে জিজ্ঞেস করলো ঘরে আর কোনো মেয়ে নেই? মোল্লাবাজি বললো: না, আমার একটাই মেয়ে,এ-ই সে। হঠাৎ করে মোরগ ডেকে উঠলো:

কুক্ কুরু কুক.. কুক্ কুরু কুক/
শস্যের ডালা তানুরের মুখ,
শস্যের ডালা তানুরের মুখ।
কুক্ কুরু কুক, কুক্ কুরু কুক
চাঁদকপালি তানুরের বুক
চাঁদকপালি তানুরের বুক ।
কুক্ কুরু কুক, কুক্ কুরু কুক
তানুরের মুখের ডালা সরাও
চাঁদকপালি বের করে নাও।

দরবারের মহিলারা মোরগের এই গান শুনে হতবাক হয়ে গেল। তারা বললো: এই মোরগ খী বলছে এগুলো? মোল্লাবাজি একটা পাথর ছুঁড়ে মারলো মোরগের দিকে। তারপর বললো: এই মোরগটা একদম পাজি। কালই তাকে জবাই করবো। নৈলে তার অত্যাচার থেকে বাঁচার কোনো উপায় নেই।

পাথর ছুঁড়ে মারার ফলে মোরগ ভয়ে দেয়ালের উপরে উড়ে গিয়ে বসলো এবং আবারও ওই গানটা গাইতে শুরু করলো। দরবারের বৃদ্ধারা একে অপরের দিকে তাকালো এবং বললো: চলো তানুরের কাছে যাই, দেখি ব্যাপারটা আসলে কী? বুড়িরা সেখানে গিয়ে তানুরের মুখের ডালা সরাতেই দেখতে পেল চতুর্দশী চাঁদের মতো সুন্দরী এক বালিকা তানুরের ভেতর বসে আছে। এক বৃদ্ধা তার হাত বাড়িয়ে দিলো শাহরবনুর দিকে। শাহরবনু বুড়ির হাত ধরে বেরিয়ে এলো তানুর থেকে। বৃদ্ধারা আনন্দে চীৎকার দিয়ে উঠলো। বেশি আনন্দ এজন্য যে এত সুন্দরী মেয়ে তারা জীবনে আর দেখে নি। এমন চাঁদকপালি মেয়ে তারা কখনোই দেখেনি,যার কাঁধে ফুটে আছে তারা।

কেউ আবার জুতা নিয়ে এসে পরানোর চেষ্টা করলো এবং সহজেই শাহরবনুর পায়ে জুতোটা ঠিকঠাকমতো লেগে গেল। মহিলারা এবার মোল্লাবাজির দিকে তাকিয়ে বললো: রাজপুত্র এই কন্যার প্রেমে পড়েছে। ওকে না দেখতে পেয়ে রাজপুত্রের নাওয়া-খাওয়া-ঘুম সব হারাম হয়ে গেছে। এখন বলো তোমার কন্যার জন্য কী চাও রাজপুত্রের কাছ থেকে! মোল্লাবাজি বললো: বেশি কিছু না। নীল রঙের দুই মিটার ক্যানভাসের কাপড় আনলেই চলবে। তবে একটা আছে। শর্তটা হলো এই মেয়েকেও নিয়ে যেতে হবে কোনো মন্ত্রীর ছেলের জন্য। বৃদ্ধারা বললো যে তারা বাদশাকে শর্তের কথাটা জানাবে এবং বাদশা আদেশ দিলে অবশ্যই কোনো না কোনো মন্ত্রী তার ছেলের জন্য তোমার মেয়েকে নিতে রাজি হবে। কিন্তু মহিলাদের মাথায় ঢুকছিলো না যে এত অপরূপ সুন্দরী একটা মেয়েকে কেন এভাবে কোনো চাহিদা ছাড়াই দিয়ে দিচ্ছে।

মোল্লাবাজি এবার শাহরবনুর বদনামি শুরু করে দিলো। মহিলারা বললো তাদের সঙ্গে এসবের কোনো সম্পর্ক নেই। এই বলে তারা চলে গেল এবং পরদিন দুই মিটার নীল ক্যানভাসের কাপড়, আধা মণ রসুন আর আধা মণ পেঁয়াজ নিয়ে মোল্লাবাজির বাসায় এলো শাহরবনুকে নিয়ে যেতে। কিন্তু মোল্লাবাজি জিজ্ঞেস করলো: তার মেয়েকে কখোন নেবে? মহিলারা বললো রাজপুত্রের বিয়ের পরের রাতে। এভাবে কথাবার্তা শেষ হবার পর মোল্লাবাজি বললো: ঠিকাছে! তোমরা বিকেলে এসে শাহরবনুকে নিয়ে যেও। মহিলারা জানতে চাইলো: কেন বিকেলে?#

আমরা দেখেছি দরবারের বৃদ্ধা মহিলারা দুই মিটার নীল ক্যানভাসের কাপড়, আধা মণ রসুন আর আধা মণ পেঁয়াজ নিয়ে মোল্লাবাজির বাসায় এলো শাহরবনুকে নিয়ে যেতে। কিন্তু মোল্লাবাজি জিজ্ঞেস করলো: তার মেয়েকে কখোন নেবে? মহিলারা বললো রাজপুত্রের বিয়ের পরের রাতে। এভাবে কথাবার্তা শেষ হবার পর মোল্লাবাজি বললো: ঠিকাছে! তোমরা বিকেলে এসে শাহরবনুকে নিয়ে যেও। মহিলারা জানতে চাইলো: বিকেলে কেন?

কেন বিকেলে আসতে হবে তার কারণ হিসেবে মোল্লাবাজি বলেছিল: তোমরা যে কাপড় নিয়ে এসেছো ওই কাপড় দিয়ে শাহরবনুর জন্য বিয়ের পোশাক বানাবো। একটু সময় তো লাগবে।

মহিলারা মেনে নিলো এবং মোল্লাবাজির ঘর থেকে চলে গেল দরবারের দিকে। এইফাঁকে মোল্লাবাজি শাহরবনুর জন্য ওই মোটা ক্যানভাসের কাপড় দিয়ে বিয়ের পোশাক বানিয়ে তাকে পরিয়ে দিলো। তখন সন্ধ্যা ছুঁই ছুঁই। দরবারের মহিলারা আবারও এসে হাজির হলো এবং শাহরবনুকে সঙ্গে নিয়ে রওনা হলো বাদশার প্রাসাদের দিকে। বাড়ি থেকে বের হয়েই শাহরবনু বৃদ্ধাদের বললো: আমার মায়ের কাছ থেকে বিদায় নিতে যাবো।

মহিলারা জিজ্ঞেস করলো: এ তোমার মা নয়?

শাহরবনু বললো: না, এই মহিলা আমার বাবার স্ত্রী।

মহিলারা এবার গুঞ্জন তুলে বললো: ও… তাই তো বলি, কেন তোমাকে তানুরের ভেতর লুকিয়ে রেখেছে, কেন এতো বাজে কথা বললো আর কোনো দাবি দাওয়া ছাড়াই তোমাকে দিয়ে দিলো।

শাহরবনু মহিলাদেরকে মরুভূমির দিকে নিয়ে গেল। কূপের কাছে পৌঁছে তাদেরকে বললো: তোমরা এখানে অপেক্ষা করো। আমি আমার মায়ের কাছ থেকে বিদায় নিয়ে এক্ষুণি ফিরছি।

শাহরবনু দ্রুত কূপের ভেতর গেল। দৈত্য জিজ্ঞেস করলো: এই ক্যঅনভাসের পোশাক পরে কোথায় যাচ্ছো?

শাহরবনু বললো: আমাকে আমার স্বামির ঘরে নিয়ে যাওয়া হচ্ছে। এরপর যা যা ঘটেছিল সব ঘটনা দৈত্যকে খুলে বললো।

দৈত্য তাড়াতাড়ি করে চমৎকার এক সেট রেশমি কাপড়, একটা ইয়াকুত মানে পদ্মরাগ মণিমুক্তার মুকুট, একটা হিরার আংটি, জমরুদ বা পান্নার একটা হার এবং এক জোড়া স্বর্ণের জুতো শাহরবনুকে দিয়ে বললো: এগুলো শিগগির পরে নাও! তারপর বললো: বাদশার ছেলে যা যা পানীয় দেবে তোমাকে সব নেবে মানে গ্রহণ করবে কিন্তু শাহজাদা দেখতে না পায় এমনভাবে সেগুলো ফেলে দেবে,খাবে না। শাহরবনু দৈত্যের কাছ থেকে বিদায় নিয়ে কূপের ভেতর থেকে বেরিয়ে দরবারের মহিলাদের সামনে এলো। মহিলারা শাহরবনু দেখতেই নির্বাক হয়ে গেল। সবার মুখ হা হয়ে গেল। কিছুক্ষণ পর শাহরবনু’র রূপের প্রশংসায় পঞ্চমুখ হয়ে উঠলো সবাই। তারপর রওনা হলো প্রাসাদের দিকে।

প্রাসাদে পৌঁছার পর রাজপ্রাসাদের সবাই অবাক হয়ে গেল। শাহজাদা শাহরবনুকে নিয়ে গেল তার মায়ের কক্ষে। মা শাহরবনু মানে ছেলের বৌকে দেখেই বিস্মিত হয়ে গেল। এত সুন্দর মেয়ে! আবার কপালে চাঁদের জ্যোছনা এবং তারা ঝলমল করে-কী আশ্চর্য! এতো সুন্দরী মেয়ে রাজরাণী জীবনে আর কখনো দেখে নি। তাড়াতাড়ি করে বিয়ের আয়োজন করতে বললো এবং তাই করা হলো। রাতের মধ্যেই সকল আয়োজন। আনন্দের বাদ্য বাজনা বাজলো। রাতের শেষ প্রহরে রাজা, মন্ত্রীরা, সভাসদরা, দরবারের মুরব্বিরা, উকিলেরা সবাই এলো এবং বিয়ের অনুষ্ঠানে অংশগ্রহণ করলো। অনুষ্ঠান শেষে শাহজাদা এবং শাহরবনু ঘুমাতে গেল। কিন্তু মোল্লাবাজি আর তার মেয়ের কী হলো?

মোল্লাবাজি মানে শাহরবনুর দুষ্ট মা ভেবেছিল ওই রাতেই শাহরবনুকে গলাধাক্কা দিয়ে অপমান করে প্রাসাদ থেকে বের করে দেবে। কিন্তু রাত কেটে সকাল গেল,দুপুর হলো শাহরবনু ফিরলো না। তাই সে নিজেই গেল প্রাসাদের দিকে খোজ খবর নেওয়ার জন্য। মোল্লাবাজি একে ওকে জিজ্ঞাসা করে করে গেল প্রাসাদের দিকে, গিয়ে দেখতে পেল শাহরবনুকে। না, সে যেরকম ভেবেছিল সেরকম কিছু নয়, বরং উল্টো। শাহরবনুর মাথায় মুণমুক্তা খচিত মুকুট, পরণে সিল্কি পাশাক, গলায় পান্নার মালা, হাতে সোনার বালা আর আঙুলে হীরের আংটি। রাণীর মতো আরামে বসে আছে শাহরবনু আর তাকে ঘিরে রেখেছে চাকর বাকরেরা। শাহরবনুর চেহারায় জ্যোছনার মতো আলো আর তার ঘাড়ে চমকাচ্ছে তারা।

মোল্লাবাজি মনে মনে বললো: আ..হা! আমার কপালটা কীরকম খারাপ। যতই চেষ্টা করলাম এই শাহরবনুকে অপদস্থ করতে ততই তার আরও উন্নতি হচ্ছে। এইসব চিন্তা করে তাড়াতাড়ি ফিরে গেল বাড়িতে। বাড়িতে গিয়েই দেখে উজিরের বাসা থেকে লোকজন এসেছে বিয়ের প্রস্তাব নিয়ে। তারা মোল্লাবাজিকে জিজ্ঞেস করলো: তোমার এই মেয়েকে নিতে কী কী আনতে হবে? মোল্লাবাজি বললো: মায়ের উপহার স্বরূপ ৫০টি রূপার কয়েন, মোহরানা বাবদ এক শ স্বর্ণমুদ্রা, বিয়ের দিনের জন্য সাত রঙের সাতটি পোশাক, চুড়ি বালা ইত্যাদি।

বুড়িরা বললো: ঘটনা কী? শাহরবনুর জণ্য সামান্য একটু ক্যানভাসের কাপড় এবং রসুন পেঁয়াজ আর এই মেয়ের জন্য তোমার চাহিদারই শেষ নেই,ব্যাপারটা কী?

মোল্লাবাজি বললো: এই মেয়ের সাথে ওই মেয়ের কথা আসছে কেন? আজ পর্যন্ত এই মেয়ের কণ্ঠস্বর কোনো পুরুষ শোনে নি। এই মেয়ে খুবই অভিজাত এবং সম্ভ্রান্ত।

মহিলারা কিছু বলল না। তারা চলে গেল এবং বিকেলে সবকিছু নিয়ে আবার এলো। মোল্লাবাজি সাপ আর বিচ্ছুকে একেবারে গোড়া থেকে কেটে ফেললো। কপাল আর ঘাড় ঢেকে দিলো রঙীন সিল্কের রুমাল দিয়ে। এরপর তাকে সাজালো বিয়ের সাজে। সাজগোজ শেষে মেয়েকে নিয়ে গেল উজিরের ঘরে। উজিরের ছেলে একটু সামনে পা বাড়িয়ে দেখতে চাইলো নিজের স্ত্রীকে। কিন্তু ওই মেয়েকে দেখে উজিরের ছেলে চোখ ফিরিয়ে নিলো। এত কুশ্রী মেয়ে জীবনে সে আর দেখে নি। কিন্তু বাদশার ভয়ে মুখ ফুটে কিছু বলার সাহস পেল না। দ্রুত বিয়ের কাজ সেরে ফেললো। মোল্লাবাজির মেয়ে আসার সময় রসুন খেয়েছিল এখন তার মুখের গন্ধে কেউ তার কাছে ভিড়তে পারছেনা। উজিরের ছেলে নতুন বৌয়ের কাছে গিয়েই কান্নাকাটি শুরু করে দিলো।

যাই হোক, বিয়ে তো হয়ে গেল। রাতের বেলা সবাই যখন ঘুমিয়ে গেল উজিরের ছেলে তখন উঠে মোমবাতি জ্বালালো। হালকা আলোয় তার চোখ পড়লো বৌয়ের কপাল আর ঘাড়ের দিকে। জোরে চীৎকার দিয়ে উঠলো সে। দৌড়ে সোজা চলে গেল মায়ের রুমে। মাকে সব খুলে বললো। মা সব শুনে উজিরকে বললো। উজির বাদশাকে জানালো। বাদশা তার স্ত্রীকে বললো। সে বললো নিজের ছেলেকে। ছেলে জিজ্ঞেস করলো শাহরবনুকে। শাহরবনু সাপ আর বিচ্ছুর ঘটনা সব খুলে বললো তার স্বামীকে। বাদশা সব জানতে পেরে উজিরকে ডেকে বললো: যেহেতু আমার কারণেই তোমার ছেলের কপালে এসব জুটেছে সেহেতু আমি আমার মেয়েকে তোমার ছেলের সাথে বিয়ে দেবো।

ঘটা করে বিয়ে হলো আর মোল্লাবাজি এবং তার মেয়েকে অনেক দূরে একটা গর্তে ফেলে দেওয়া হলো। এদিকে শাহরবনু একদিন দৈথ্যের কাছে গিয়ে বললো: তোমাকে সবসময় আমি বিরক্ত করেছি। এবার মাকে নিয়ে যেতে চাই আমার কাছে। দৈত্য হলুদ গরুটাকে নিয়ে এলো এবং হীরার ব্লেড দিয়ে তার চামড়া তুলে নিতেই ভেতর থেকে বেরিয়ে এলো তার মা। মেয়ের কাঁধে হাত দিয়ে বললো: মাকে সিরকার ড্রামে ফেলা কি ঠিক?

শাহরবনু মাথানীচু করে কাঁদতে শুরু করলো। তারপর দুজনে চলে গেল প্রাসাদে। রাজপ্রাসাদে মেয়ে আর জামাইকে নিয়ে সুখে শান্তিতে দিন কাটতে লাগলো মায়ের।

গল্পের বিষয়:
শিক্ষনীয় গল্প

Share This Post

আরও গল্প

সর্বাধিক পঠিত