আবছা আলো

আবছা আলো

“তোমার গালে এই লাল দাগটা কিভাবে আসলো?

আদিরার ডান গালে একটা লাল দাগ দেখে জিজ্ঞেস করলাম। ও আমার থেকে লুকানোর ব্যর্থ চেষ্টা করতে লাগল। আমি প্রথমেই ওর চেহারা দেখার পরই কিছুটা আচ্ করতে পেরেছিলাম কিছু একটা হয়েছে। আদিরা আমাকে বলল
“ও কিছুনা রিফাত
“কি কিছুনা দেখাও আমাকে?

একটু জোর করেই দেখতে চাইলাম গালটা। লাল একটা দাগ রক্ত জমে আছে মনে হচ্ছে। আমার দাগটা দেখেই তো গলা শুকিয়ে গেছে এরকম ভয়ংকর দাগ। আমি বললাম
“কি এটা? আর তুমি বলছো কিছুনা কিভাবে হলো এটা?
“পড়ে গেছিলাম
“মিথ্যা বলছো? তোমার আম্মু আবার মেরেছে?
“হুম
“ঐ মহিলার একদিন কি আমার একদিন। কি মনে করে নিজেকে তোমার গায়ে হাত দিয়েছে কতো বড় সাহস উনার। আমি আর তোমাকে উনার কাছে রাখবো না।
“রিফাত রিফাত থাক এসব চিৎকার করোনা

মনে হচ্ছে এই মুহূর্তে ঐ মহিলাকে এমন এক উচিত্ শিক্ষা দিতে যাতে ও আমার আদিরার উপর আর নির্যাতন না করতে পারে। কিন্তু সেটা সম্ভব না। মহিলাদের উপর হাত তোলা ঠিক না।
.
.
ফ্ল্যাশব্যাক:
আদিরা আর আমি একে অপরকে ভালোবাসি। আমি যে বাসায় ভাড়া থাকি তার ৪র্থ তলায় থাকে ওরা আর আমি ৩য় তলার একটা রুমে থাকি থাকি। আমি ছোট খাটো একটা জব করি। বাবা মা গ্রামে থাকে।
.
আমি যখন সকাল সকাল অফিস বের হতাম, ওদের ফ্ল্যাটের ওদিক থেকে প্রায় প্রতিদিন চিৎকারের আওয়াজ পেতাম। ওই ৪র্থ তলার ভদ্রলোক পুরো বাড়িটার মালিক। ব্যাপারটা কেমন দেখায় বাড়ির মালিকের ফ্ল্যাটে প্রায় ঝগড়া-ঝাটি চিৎকার চেঁচামেচি করে কেউ। কে করে?
.
এক শুক্রবার সকালবেলা ওই ফ্ল্যাটের আঙ্কেল আর আমি বাসার নিচে যে ফাঁকা জায়গা আছে ওখানে বসে পেপার পড়ছিলাম। আঙ্কেলের সাথে মাঝেমাঝেই কথাবার্তা হয়। দেখা হলেই জিজ্ঞেস করে “কি খবর রিফাত সাহেব জব কেমন চলছে? বাসার সবাই কেমন আছে?” তখন টুকটাক কথা হয়। আঙ্কেল খুব ভালো লোক। পেপারের একটি পাতা উল্টাতে উল্টাতে বললাম
.
“আঙ্কেল আপনি কিছু মনে না করলে আপনাকে একটা কথা জিজ্ঞেস করি?
“হ্যা বাবা করো
“প্রায় প্রতিদিন আমি অফিস যাওয়ার সময় কিছু চিৎকার চেচামেচির আওয়াজ শুনতে পাই আপনার ফ্ল্যাটের ওদিক থেকে কে করে?
.
প্রশ্নটি করে আমি আঙ্কেলের দিকে তাকালাম। আঙ্কেল চোখের চশমা খুলে হাতে নিয়ে একটা দ্বীর্ঘশ্বাস ফেললেন। বললেন
.
“যার কন্ঠ তুমি শুনতে পাও। উনি আমার দ্বিতীয় স্ত্রী। আদিরার মা মারা যাওয়ার পর মা বাবার কথা মতো দ্বিতীয় বিয়ে করি কিন্তু আদিরার যত্ন দেখাশোনার জন্য যাকে বিয়ে করি সে আমার মেয়েটাকে দেখতে পারেনা কথায় কথায় গালি দেয়। নানারকম কষ্ট দেয়।
.
এরপর আঙ্কেল চোখের জল মুছতে লাগলেন। আমি বললাম
.
“সরি আঙ্কেল আমি বোধহয় আপনাকে ইমোশনাল করে দিচ্ছি?
“না বাবা ঠিক আছে। আমি যখন দ্বিতীয় বিয়ে করি তখন আদিরার বয়স সাতবছর। আমি অফিসের কাজে বাইরে থাকতাম। আদিরাকে একা পেয়ে যেমন পারত সেরকম কাজ করিয়ে নিত। আদিরার মা মারা যাওয়ার পর সব হাসি খুশি ওর জীবন থেকে নাই হয়ে যায়।
“আঙ্কেল আদিরা কি লেখাপড়া করেনি?
“হ্যা বাবা করেছে এবার অর্নাস দ্বিতীয় বর্ষে। কিন্তু ওকে ঠিকমতো বের হতে দেয়না ওর সৎমা ক্লাসে যেতে দেয়না। পরিক্ষার সময় শুধু পরিক্ষা দেয়।
.
আদিরাকে খুব দেখতে ইচ্ছা করতো লাগল। একটা মেয়ে ছোট থেকে এভাবে নির্যাতিত হয়েছে। কেন যে মুখ বুজে সহ্য করে এত কষ্ট? বুঝিনা।
.
জ্যোৎস্না দেখা আমার ছোটকালের অভ্যাস। জানালা দিয়ে বাইরের আকাশটায় মস্ত বড় চাঁদ উকি দিচ্ছে। কিছু বাতাম হাতে নিয়ে ছাদে উঠতে লাগলাম। কিছুক্ষণ একা একা জ্যোৎস্না দেখা যাবে আজ রাতে।
.
ছাদের দরজা খোলা! মানে কেউ আছে ছাদে। যাক গল্প করা যাবে একটু। একটা মেয়ে ছাদের রেলিং এ দুহাত সামনে দিয়ে দাড়িয়ে আছে। আমিও গিয়ে উনার পাশে দাঁড়ালাম।
.
একি! মেয়েটা কাঁদছে। আমি কিছু বাদাম হাতে নিয়ে মেয়েটার সামনে ধরলাম
.
“এই নিন বাদাম খান। খুব সুস্বাদু
“নো থ্যাংকস
“আজকের চাঁদটা অনেক সুন্দর তাইনা আদিরা?
.
আদিরা আমার দিকে ভ্রু কুঁচকে তাকালো। বললো
.
“আপনি আমার নাম জানলেন কিভাবে?
“শুধু নাম না অনেক কিছুই জানি
.
আদিরা আর কিছু বললো না চুপ করে চাঁদ দেখতে লাগলো। আমি ঠিক কি বললো বুঝতে পারছিনা। একটু ভেবে বললাম
.
“আপনি সব সময় এমন গম্ভীর থাকেন কেন? একটু হাসি-খুশি থাকার চেষ্টা করবেন।
.
আদিরা একথা শোনার পর কিভাবে যেন আমার দিকে তাকালো। তারপর ছাদ থেকে চলে গেল। আমি একটু অবাক হলাম। হঠাৎ চলে গেল ও। যাইহোক কিছুক্ষণ পর আমিও রুমে এসে ঘুমিয়ে গেলাম।
.
তারপর ব্যস্ততার কারণে প্রায় অনেকদিন ছাদে যাওয়া হলো না। আর আদিরার সঙ্গে দেখা হওয়ার কোন চান্স ও নেই। মাঝে অবশ্য আঙ্কেলের সাথে একবার কথা হয়েছিলো। তারপর একদিন সময় করে ছাদে উঠার জন্য ভাবলাম। যেই ভাবা সেই কাজ
.
বাদাম চিবাচ্ছি আর তাহসানের ‘অভিমানি’ গুনগুন করতে করতে সিড়ি বেয়ে উঠছি।
.
ছাদে কোন এক অপ্সরী কে দেখে থমকে গেলাম। আদিরা এত্ত সুন্দর। অবশ্য সেদিন কথা বলার সময় খেয়াল করিনি। আদিরা আমার দিকে একবার তাকিয়ে অন্যদিকে মুখ করে বলল
.
“এতোদিন কোথায় ছিলেন?
“অফিসের কাজে ব্যস্ত ছিলাম
“হুম। বাদাম খাবো বাদাম দিন
“হাহাহা
“এই ছেলে এরকম ক্ষ্যাত মার্কা হাসি দিচ্ছেন কেন? আমার মতো হাসবেন হিহিহি। দেখেছেন কত্ত কিউট
.
সত্যি তো আদিরার হাসিটা চমৎকার। আমি কিছু না বলে আদিরাকে কিছু বাদাম দিলাম।তারপর চুপচাপ আদিরাকে দেখতে লাগলাম। মেয়েটা কতো মিশুক দ্বিতীয়বার কথাতেই মনে হচ্ছে আমি ওর কত দিনের চেনা। আদিরা কিছু একটা বলে হিহিহি করে হাসতে লাগলো।
.
একি! আঙ্কেল ছাদের দরজার পাশে দাড়িয়ে আছে। আমি উনার মেয়ের সাথে কথা বলছি এতো রাতে উনি কি যে মনে করবে। এখন কি করা উচিত্? ছাদ থেকে কি লাফ দিবো? না থাক।
.
আদিরা কিছু না বলে ছাদ থেকে চলে গেলো। আমি আর আঙ্কেল এখন ছাদে। আমার কেন জানি খুব ভয় করছে। গুলি করে মারবেনা তো আমাকে? এসব ভাবতে ভাবতে আঙ্কেল বলে উঠলো
.
“ভয় পাওয়ার কিছু নেই বাবা। আমি তোমাকে কিছু বলবো না। আদিরার মা মারা যাওয়ার পর অনেকদিন পর আদিরার মুখে হাসি দেখলাম। যার কারণ তুমি। সত্যি আজ আমি অনেক খুশি
.
আঙ্কেলের কথা শুনে ভয়টা কাটলো আর অনেক ভালোও লাগল। যে আদিরা আমার কারণে অনেকদিন পর হেঁসেছে। আঙ্কেল আবার বলল
.
“পানি খাওয়ার জন্য ড্রয়িংরুম দিয়ে যাচ্ছিলাম কিন্তু দেখলাম আদিরার রুমের দরজা কিছুটা খোলা। আমি রুমে না পেয়ে খুজতে এখানে আসি। কারণ ও মাঝেমাঝেই এখানে আসে। অনেক রাত হয়েছে তুমিও গিয়ে ঘুমিয়ে যাও।
.
তারপর থেকে প্রতি রাতেই আদিরার সাথে কথা হতে লাগলো। ছাদে জমিয়ে বাদামের সাথে আড্ডা জমতো। আস্তে আস্তে ওর প্রতি আমার ভালোবাসা আরো বাড়তে লাগলো।
.
কি ইনোসেন্ট একটা চেহারা মেয়েটার যত দেখি ততই মুগ্ধ হই। আমি অনেকবার ওকে প্রোপোজ করতে গিয়ে পারিনি। ওর সামনে গেলেই সব কিছু গুলিয়ে ফেলি।
.
সেদিন রাতে ছাদে গিয়ে আদিরাকে পেলাম না। একটু অবাকই হলাম। ও সবসময় আমার আগেই ছাদে আসে। আজকে হঠাৎ কি হলো। অনেকক্ষণ অপেক্ষা করার পর আদিরা আসলো। দেখে মনে হলো মন খারাপ। আমি জিজ্ঞেস করলাম
.
“মন খারাপ তোমার?
“হুমম!
“কেন কি হয়েছে? কোন সমস্যা?
“না আসলে আব্বু আমার জন্য ছেলে দেখছে। তাই।
“ওয়াও দ্যাটস গ্রেইট খুব ভালো খবর।
“আমার জন্য না!
“কেন কেন??
“আমি এক হাদারাম কে যে ভালোবেসে ফেলেছি। কিন্তু সমস্যা হাদারাম টা বুঝে না কিচ্ছু। ওর জন্য আমি হাসতে শিখেছি। আগে সৎ মায়ের অত্যাচার এ বাঁচতে ইচ্ছা করতো না কিন্তু এখন ওই হাদারাম কে নিয়ে অনেক স্বপ্ন দেখি। অনেক বছর বাঁচতে ইচ্ছে করে এক সাথে।
“কে সে?
.
এ কথা বলতেই আদিরা আমার দিকে রাগি লুক নিয়ে এক দৃষ্টিতে তাকালো। আমি খানিকটা ভয় পেলাম। ও কি করবে বুঝতে পারছিনা আমি। আমি ভয়ে বললাম
.
“এভাবে তুমি আমার দিকে তাকাচ্ছো কেন?
“কিছুনা। আমার ঘুম পাচ্ছে আমি নিচে গেলাম।
.
একথা বলার পর ও হাটতে লাগলো নিচে যাবার জন্য। আমার এখন কি করা উচিৎ বুঝতে পারছি না। আমি আর ভাবতে পারছি না আদিরাকে আমি হারাতে পারবো না। পিছন ফিরে একটু জোরে হেটে আদিরার হাত ধরলাম। ও এবার আমার দিকে আবার সেই অগ্নি দৃষ্টিতে তাকালো। ওর রাগ দেখে আমি ফিক করে হেসে দিলাম। ও আমার হাসি দেখে বললো
.
“কি ব্যাপার হাসছো কেন?
“আমাকে ছেড়ে অন্য কাউকে ভালোবাসতে পারবা? বিয়ে করতে পারবে?
.
ও কিছু না বলে আমার বুকে মুখ লুকালো। আর বললো “ভালোবাসি অনেক” আমি তোমাকে ছাড়া কোন কিছু ভাবতে পারিনা। আমি তোমাকে ছাড়া আর কাউকে বিয়ে করবোনা। আমি তোমাকে ছাড়া বাঁচবো না।
.
তারপর থেকেই আদিরা আমার জীবনের সাথে জড়িয়ে যায়। ওর দুঃখ কষ্ট ভাগ করার সুযোগ আমাকে দেয়।
.
আজ ছাদে ওর জন্য অপেক্ষা করছিলাম। ও যখন দেরি করে আসলো তখন ওর গালে লাল দাগটা দেখে ওসব বললাম। কিন্তু আর না অনেক কষ্ট সহ্য করেছে ও আর না।
.
“আদিরা?
“হুম
“কালকে আমরা বিয়ে করছি। আমি তোমাকে আর এখানে রাখবো না। আমরা এ শহর থেকে দূরে কোথাও চলে যাবো।
“কিন্তু
“তুমি রেডি থেকো সকাল ৯ টার সময়! আঙ্কেল কে আমি বলেছি আগেই। ওনার কোন আপত্তি নেই।
.
ওর মলিন মুখে হাসি ফুটে উঠলো। হয়তো এটা ভেবে আজকের পর থেকে সৎ মায়ের অত্যাচার সহ্য করতে হবে না। আজকের পর থেকে মুক্ত পাখির মতো হয়ে যাবে আর বন্দী ঘরে আবদ্ধ হয়ে থাকতে হবে না। হয়তো আমাকে আপন করে পাওয়ার কথা ভেবে।

গল্পের বিষয়:
অন্যান্য

Share This Post

সর্বাধিক পঠিত