ব্যাচেলর্স!

ব্যাচেলর্স!

ঢাকা শহর থেকে সময়ের দিক দিয়ে অনেক বাইরে, সোজা কথায় নবীনগরের একটু দুরে চারতলা ভবনের চারতলায় আমাদের মেস। পুরো বিল্ডিংটাই ব্যাচেলরদের জন্য! ইংরেজি অক্ষর L এর মত কাঠামো! সামনে ছোট একটা ফাকা জায়গা যার চারপাশে আম গাছ দিয়ে ঘেরা! অতিরিক্ত গরম হলে নিচে নেমে মেসমেট আর বড় ভাইয়েরা মিলে গাছগুলোর নিচে বসে আড্ডা দিই আর বেশি বাতাস হলে ছাদে গিয়ে পাটি বিছিয়ে ডন নিয়ে বসে পড়ি! সবাই ব্যাচেলর, অতএব বাধা ধরা নিয়ম নেই! ছোট বড় মিলে মোট ৬০টি ফ্লাট! নিঃসন্দেহে বিশাল বড় মেস! যিনি ব্যাচেলরদের কথা মনে করে এই মনোরম পরিবেশের বিল্ডিং বানিয়েছেন তার জন্য মনে মনে এবং প্রতি ওয়াক্তের নামাজে দোয়া করি! আমরা চারজন থাকতাম একরুমে! প্রত্যেকটা ফ্লাটে তিনটা রুম সাথে রান্নাঘর আর বাথরুম তো আছেই! ব্যাচেলরদের জন্য এই মেসটা কোন পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ে আনন্দ আড্ডার চেয়ে কম না। আমার রুমমেটরা হল সোহেল, আসাদ, রাফি। আমার রুমমেটদের সাথে পরিচয় করিয়ে দিই। প্রথমে সোহেল, গ্রাম রংপুরে। বাবা একজন শিক্ষিত কৃষক। অনেকেই ভাবে কৃষক আবার শিক্ষিত হয় নাকি? অবশ্যই হয়, কৃষি সম্পর্কে উনি কোন কৃষিবিদের চেয়ে কম জানেন না! নিজেদের অঘাত জমি আছে! একই জমিতে তিনি এবং অন্যান্য নিম্নবিত্ত কৃষক একসাথে কাজ করেন! স্যালো মেশিনের কোনো টাকা তিনি নেন না। অমায়িক লোক একজন! মনে কোন অহংকার, হিংসা, ভেদাভেদ নেই! সোহেল সেই রকম। প্রথমে ভালো বাসা ভাড়া নিয়ে থাকতো কিন্তু আমাদের কথা চিন্তা করে এই মেসে থাকা শুরু করেছে! আমাদের মধ্যে সোহেল সবচেয়ে লম্বা! এবার পরিচয় করিয়ে দেই আসাদের সাথে। আসাদ ঢাকার স্থানীয়। বাসা কাচঁপুর ব্রিজের পাশে। মধ্যবিত্ত এবং বাস্তববাদী ছেলে। আবেগের কোন জায়গা তার মনে নেই। মায়াবী চেহারার ছেলেটা একদম সোজা সাপটা কথা বলে। ভাবার সময় নেই তার! রাফি হল মেসের সবচেয়ে স্মার্ট ছেলে! গ্রামের বাড়ি যশোর সদরে! চারিত্রিক গুনাবলির মধ্যে সবচেয়ে বেশি যে কাজ করে সেটা হল রুপচর্চা! মেয়েরাও ওর কাছে হার মানবে! ক্লাসে যাক আর টিউশনিতে যাক অক্সি ফেস ওয়াস আর মেঞ্জ অ্যাক্টিভ ওর ব্যাগে থাকবেই! কিন্তু দুঃখের বিষয় হল এপর্যন্ত কোনো মেয়েকে রাফি পটাতে পারে নি! এবার আমার পরিচয়, আমি তাহসিন। গ্রামের বাড়ি শেরপুর,বগুড়া। মা বাবার বড় ছেলে। মধ্যবিত্ত পরিবার। হাসি কান্না, সুখ-দুঃখের এক জারণ বিজারণ বলয় দ্বারা বেষ্টিত পরিবার। আম্মুর কাছে ছেলে হিসাবে অতি ভদ্র আর শান্ত শিষ্ট আর আব্বুর কাছে প্রথম শ্রেণীর ফাঁকিবাজ! ফ্রেন্ডদের মধ্যে আমি একদমই ইউনিক! এটা আমার কথা না, আমার ফ্রেন্ডরা বলে। কারণ সিগারেট টানা, গাঁজা খাওয়া, টিজ করা ইত্যাদি আমাকে আজও ছুতে পারে নি!

মেসে প্রথমে আমার দিন কাটতো না। আর ক্লাসেও ভাল বন্ধু ছিল না! একপ্রকার একাকীত্বে আমার দিন কাটতে থাকে! রসকসহীন জীবন। তারপর পরিচয় হল আসাদের সাথে। আসাদ ছিল ক্লাসের সবচেয়ে চুপচাপ ছেলে। স্যাররা তাকে খুব ভাল চোখে দেখতো। আসাদের সবচেয়ে ভাল গুণ হল সাহায্য করার জন্য সবার আগে দারিয়ে যেত। অপকার করে নি আজ পর্যন্ত। আমার সাথে বন্ধুত্ব হয়েছিল এই সাহায্য করা নিয়েই! পরীক্ষার তিনদিন বাকি ছিল! অথচ আমার বইটা পড়ার মত অবস্থায় ছিল না। বৃষ্টির পানিতে ভিজে একাকার হয়ে ভাজ খুলে বিভিন্ন স্থানে ছিড়ে গিয়েছিল! ছোট বেলা থেকেই প্রত্যেক শ্রেণীর ১ম বা ২য় সাময়িক পরীক্ষায় কমপক্ষে একটি সাবজেক্ট হলেও ফেল করেছি! তাই মনে মনে ভাবলাম হয়তো আমার রেকর্ডটা আমি ভাঙতে পারবো না! অনেকের কাছেই বই ধার চাইলাম কিন্তু কেউ দেয় নি। আর দিবেই বা কেন? অনেক লাইব্রেরীতে খোজ করলাম কিন্তু পাই নি। ঠিক তখনই আসাদ আমাকে একটা পুরানো বই ম্যানেজ করে দিল! নতুন বইয়ের চেয়ে পুরোনো বইগুলোই আমার পড়তে সুবিধা হয়। এতে অনেক ইম্পরট্যান্ট প্রশ্ন গুলো দাগানো থাকে! কিন্তু আমি তো বিদ্যাসাগর বা একে ফজলুল হক না যে একবার পড়লেই বই মুখস্থ হবে! এবারের টেনশন ছিল কোনটা ছেড়ে কোনটা পড়ব! আমি প্রায় অধৈর্য হয়ে যাচ্ছি। শেষমেশ পাঁচটা প্রশ্ন ভালভাবে পরে গেলাম পরীক্ষা দিতে!
পরীক্ষার প্রশ্নের দিকে তাকিয়ে আমি হতাশ! মাত্র একটা কমন পরছে! একটা লিখে আমার কলম আর চলে না! স্যাররা পাশ দিয়ে যাওয়ার সময় কলম চালানোর অভিনয় করি বা প্রশ্ন পড়ার অভিনয় করি! সকলের খাতায় কলম জেট বিমানের গতিতে চলছে আমার আমার কলম চালুই হচ্ছে না! “বাসায় পড়া লাগে, কলম চালানোর ভাব ধরলেই নাম্বার আসবে না!!!” বলেই স্যার আবার চলা শুরু করলেন! আসাদ আমার সামনেই ছিল কিন্তু স্যারদের কঠোর গার্ডের ফলে আমি টু শব্দও করতে পারি নি! পরীক্ষা চার ঘন্টার, তিন ঘন্টা অতিবাহিত হয়েছে। এই তিন ঘন্টার মধ্যে পাঁচজন স্যার এক সেকেন্ডের জন্য দরজার বাইরে যান নি! এদিকে আমার জানের পানি শুকিয়ে যাচ্ছে! এরমধ্যে দুইজন স্যার এসে অন্য দুইজনকে রেস্ট নিতে বললেন। এরপর আরও দুইজন এসে দায়িত্ব পরিবর্তন করে নিলেন। এখন এটাই সুযোগ! আমি আসাদের উপর চড়াও হলাম। তিনটা বড় প্রশ্ন আর তেরটা ছোট প্রশ্ন লিখে নিলাম! কঠোর গার্ডের পর সহজ গার্ড হয়, আমি এই সুত্রে বিশ্বাসী। আর পরীক্ষার হলেও সেটাই হল। ব্যস, স্যাররা শেষের দিকে আর কড়া ডিউটি দেন নি! কোনো রকম পাশ করে গেলাম। তারপর থেকে আসাদের সাথে ভাল বন্ধুত্ব। আমি ওকে আমার মেসে আসতে বললাম। মেস দেখে ওর দারুণ পছন্দ হল! পরের মাসে আসাদ আমার সাথে শিফট হয়ে গেল! এখন কোন সমস্যা হয় না। দুই বন্ধু খুব ভালমতো মেসে রাজত্ব করে যাচ্ছি। ক্লাসে নতুন একটা ছেলের সাথে পরিচয় হয়। নাম রাফি। আগেও কথা হয়েছে কিন্তু অতটা আন্তরিকতার সাথে বলা হয় নি। রাফি জানালো ওর থাকা খাওয়া নিয়ে খুব সমস্যা হচ্ছে। মেস মালিক যখন ইচ্ছা তখন ভাড়া বাড়ায়। বুয়া থাকে না আরও নানান ঝামেলা! আমরা ওকে আমাদের মেসে শিফট হওয়ার জন্য বললাম। আমরা তিনজন একসাথেই থাকা শুরু করলাম। হাসি, আড্ডা সবই চলছিল ভালভাবে।
.
রাতের খাবার খাওয়ার পর আসাদ বললো, “আচ্ছা হাউজফুল মানে আমরা একই ডিপের তিনজন আছি, খুঁজে শুজে আরেকজন জোগার করা যায় না?” আমরা ব্যাপারটা ভেবে প্রস্তাবে রাজি হয়ে যাই! পরেরদিন ক্লাসে গিয়ে আমরা যে বন্ধুর সাথে বেশি ঘনিষ্ঠ তাকে গিয়ে বলি। ছেলেটা সোহেল। ব্যাস, আমরা চারজন হয়ে গেলাম! এরপর থেকে প্রত্যেক শুক্রবারে আমরা একসাথে ঘুরতে বের হতাম। এক শুক্রবারে রাফি আমাদের বললো, “চল নতুন কিছু উপভোগ করে আসি?” আমাদের মনে খুব কৌতুহল জন্মালো কি হতে পারে আজ! আমরা সবাই বাইরে দারিয়ে আছি কিন্তু রাফিকে দেখছি না! বুঝে নিলাম নবাব চেহারার উপর ঘষামাজা করায় ব্যস্ত আছেন! পাঁচ মিনিট, দশ মিনিট তারপর বিষ মিনিট কিন্তু নবাবের আসার খবর নেই! সোহেল গিয়ে উত্তম মাধ্যম দিয়ে নিয়ে আসলো। আমরা রাস্তার পাশে দারিয়ে আছি। রাফির চোখ শুধু পিক-আপ খুঁজছিল। আমাদের বললো, “যেকোনো খালি পিক-আপ দেখলেই সিগনাল দিবি। চারজন একসাথে দিলে অবশ্যই থামবে!” এরপর একের পর এক পিক-আপ যাওয়া শুরু করলো কিন্তু কেউ থামলো না! রাফির অক্লান্ত সাহসী সংকেতে অবশেষে একটা পিক-আপ দারালো! রাফি বললো, “ঘাটে?”
ড্রাইভার বললো, “হুম, ৮০টাকা এক পিস!”
“আরে মামা আমরা সবাই স্টুডেন্ট, আমাদের কাছ থেকে এত নিলে যামু কই? চারজন আছি পঞ্চাশ করে দিবানে! নিয়া যান।”
“উঠেন!”
ব্যাস, আমরা হই হুল্লা করতে করতে পিক-আপে উঠলাম! সে এক অজানা আনন্দের সাগরে সাঁতার কেটে যাচ্ছিলাম আমরা! যে আনন্দের শেষ নেই! আমরা চারজন চার কোণায় দারিয়ে একের পর এক সেল্ফি তুলতে লাগলাম। ছোট্ট পিক-আপ খুব দ্রুত গতিতে ছুটছিল! এরচেয়ে দ্রুত ছুটছিল বাসগুলো! সেদিন আমাদের আনন্দের কোনো সীমানা ছিল না! সোহেল ব্যাগ থেকে ক্যামেরা বের করে প্রকৃতির ছবি তুলছিল। আসাদ চিৎকার দিয়ে বললো, “ওই ক্যামেরাম্যান, আমাগো ছবি তুলছ না ক্যারে? আমরা কি দেখতে খারাপ?” চলন্ত পিক-আপে বিভিন্ন রকম পোস নিয়ে ছবি উঠা শুরু করলাম আমরা!
.
ঘাটে পৌঁছে বাস ট্রাকের বিশাল লম্বা জ্যাম! রাফিকে কারণ জিজ্ঞেস করলে বললো, “দোস্ত সেতু না থাকায় এখানে সকল যানবাহনকে ফেরিতে করে নদী পার হয়ে খুলনা বিভাগে যেতে হয়। বাস ট্রাক ফেরির সিরিয়ালে দারিয়ে আছে!” বাস্তবে আমি কখনও ফেরি দেখি নি! ইচ্ছা হল ফেরি দেখার আর ফেরিতে উঠার! রাফিকে ফেরিতে উঠার কথা বললাম। রাফি বললো, “বাসের সাথে সাথে যাবি, কেউ কিছু জিজ্ঞেস করলে বলবি এই বাসের যাত্রী, আর টিকেট ভিতরে আছে। অযথা টাকার বলিদান করার দরকার নাই!” রাফি আমাদের তিনজনকে প্রথম তিনটা বাসের সাথে সাথে যেতে বললো।
ফেরিতে উঠে রাফি আমাদের ছাদে যেতে বললো। ছাদে উঠে আমি অবাক! পদ্মা নদীর অপরূপ সৌন্দর্য আর তার বুকে সূর্যের ঝলমলে কিরণ নদীর পানিকে আরও সৌন্দর্যময় করে তুলছে! রেলিং ধরে দারিয়ে দমকা বাতাস অনুভব করছি! আঁকা বাঁকা রাস্তার বাকের মত করে নদীর কিণার ঘেষে ফেরিগুলো পরপর চলতে শুরু করল! রাফি বললো, “শোন, ওপারে নেমে ইলিশ ভাজা খাবো। একদম ফর্মালিন ছাড়া। আমার পরিচিত হোটেলে!” ঘাটে নোঙর ফেলার কিছুক্ষণপর আমরা নেমে গেলাম। দুপুরের খাওয়া শেষে আবার মেসের উদ্দেশ্যে রওনা হলাম। আজকের দিনটা আমার সারাজীবন মনে থাকবে।
ক্লান্ত শরীরে বাসের সিটে বসে চোখ বন্ধ করলাম। তারপর চোখ খুলে দেখি আসাদ ডাকছে, নামার সময় হয়ে গেছে!
মেসে ফিরে ফ্রেশ হয়ে চার বন্ধু ডন নিয়ে বসে পরলাম! রাত ২টা পর্যন্ত খেললাম। খেলায় এতটাই মগ্ন ছিলাম যে কখন রাত গভীর হয়েছে বুঝতে পারি নি। চোখে ঘুম দৌড়াদৌড়ি করছিল তাই বিছানা পর্যন্ত যাওয়ার শক্তি খরচ না করেই ঘুমিয়ে পরলাম।
.
দিনগুলি এভাবেই যাচ্ছিল। সবসময় আড্ডাবাজি, কার্ড খেলা, ঘুরতে যাওয়া এরমধ্যে জানতে পারলাম রাফি একটা মেয়েকে পটিয়েছে! দেখতে নাকি হেব্বি সুন্দরী! সারাদিন ফোনের উপর অত্যাচার চালায়! আমরা তিনজন যখন গ্রুপ স্টাডি করি রাফি তখন ফোন জান, বাবু, বেবি ইত্যাদি লুতুপুতু নিয়ে ব্যস্ত থাকে! সোহেল বললো, “চল প্রেমের তরকারিতে একটু গরম মসলা দিয়ে আসি!” আমরা সবাই রাফিকে ঘিরে বসলাম। রাফি কথা থামিয়ে, “কেউ কিছু বলবি?” আমরা সবাই নাবোধক উত্তর জানালাম। রাফি আবার কথা বলায় ব্যস্ত হয়ে পরলো। এমন সময় আসাদ চিৎকার করে রাফির ফোনের সামনে এসে বললো, “কিরে রাফি এইডা তোর কয় নম্বর মাল?” রাফি আসাদের দিকে অগ্নি চক্ষু নিয়ে তাকালো! তারপর সোহেল বললো, “বন্ধু তোর আগের গার্লফ্রেন্ড নাকি?” রাফি মোবাইল উপরে উঠয়ে নিচু স্বরে বললো, “হারামজাদারা, আজ তোরা এত ফাউ কথা বলছিস কেন? ব্রেক-আপ হয়ে যাবে তো! একটু শান্তিতে কথা বলতে দে বাপ!” আমরা কিছুক্ষণের জন্য চুপ করে থাকলাম। একটুপরে আমি আমার ফোনের রিংটোন বাজিয়ে রাফির কাছে নিয়ে জোরে জোরে বললাম, “দোস্ত তোর দুই নাম্বার গার্লফ্রেন্ড নিশি কল করছে, তাড়াতাড়ি রিসিভ কর নাইলে কাইটা যাইবো!” এরপর বাকিটা ইতিহাস! যতটুকু শোনা গেল তাতে মেয়েটা বললো, “তুই আমাকে আর কল করবি না। তুই থাক তোর দুই নম্বর তিন নম্বর গার্লফ্রেন্ড নিয়ে, শয়তান, ইতর, বদমাইশ কুত্তা… টুট টুট টুট!!!” আমরা তিনজন হেসে গড়াগড়ি দিচ্ছি আর এদিকে রাফি কোনভাবেই মেয়েটিকে বুঝাতে পারছে না যে সে নির্দোষ! আজ আর বাবু, বেবি, জান, আত্মা, পাখি কোন শব্দতেই আর মেয়েটির মন ভাঙাতে পারছে না! রাফির দিকে আমরা তাকাতে পারছি না। খুব কষ্ট পেয়েছে আমাদের এমন কর্মকাণ্ডে। আসাদ বললো, “যতই গালাগালি করস না কেন ওই মাইয়া তর সাথে একদম মানায় না। কত পোলাপানের লগে প্রেম করল ডেট করল ও। কাল যাইয়া দেখবি ওই মাইয়া অন্য পোলার লগে ঘুরঘুর করতেছে! বেট!” সেরাতে রাফি আমাদের সাথে আর কথা বলে নি! ছেলেটা রাতে না খেয়েই ঘুমিয়ে পরল!
পরেরদিন আমরা ব্যবহারিক ক্লাসের জন্য বের হলাম কিন্তু রাফি গেল না! অনেক জোরাজুরি করলাম কিন্তু কাজ হল না! বাধ্য হয়ে ও ছেড়েই ক্লাসে গেলাম আমরা। বিকাল বেলা আড্ডা দিয়ে মেসে ফিরে আমরা অবাক হয়ে গেলাম! চানাচুর, বিস্কুট, তন্দুল রুটি, গ্রিল, সেভেন আপ নিয়ে রাফি বসে আছে! আমরা একে অপরের দিকে তাকিয়ে ব্যাপারটা বুঝার চেষ্টা করলাম। “সরি দোস্ত, মাফ করে দে, ওইরকম কথা বলা আমার উচিৎ হয় নি!” রাফির এমন কথার উত্তরে আসাদ বললো, “আরে ব্যাটা হইছে কি হেইডা ক…”
“কিছুক্ষণ আগে বাইরে গেছিলাম, তারপর দেখি লিজা অন্য আরেকটা ছেলের হাত ধরে ঘুরতেছে! আমাকে দেখে এমন চেহারা বানালো যেন আমি ওর শত বছরের শত্রু! সরি দোস্ত। তাই তোদের জন্য নিয়া আসলাম!”
রাফির কথা শুনে আমরা আবার হাসতে হাসতে গড়াগড়ি খাচ্ছি! মজা করে চার বন্ধু খাওয়া দাওয়া শুরু করলাম! সেল্ফিও তোলা হচ্ছে চরমভাবে!

মাঝে মাঝে তিন চারদিন সময় নিয়ে আমরা যে যার মত নিজেদের বাড়ি চলে যেতাম। বাড়ি গেলেও মনটা ওই মেসের মধ্যেই থাকতো! আমি দুইদিনের জন্য একটা কাজে গ্রামে চলে যাই।বাসায় পৌঁছে দেখি আম্মু আব্বু আমার পছন্দের সকল খাবার রান্না করে টেবিলে রেখে দিয়েছে! আমাকে দেখে সেই ভালবাসা মাখানো কথাটা বললো আম্মু, “কিরে ওখানে ঠিকমত খাওয়া দাওয়া হয় না নাকি? মুখ, গাল, চাপা এমন শুকনো আর ভাঙা ভাঙা লাগছে কেন?” “তোমার হাতের রান্না পাই না দেখেই তো চাপার এমন হাল!” আব্বু বললো! যাওয়ার সময় হলে আম্মু অনেক কিছু রান্না করে দিতে চাইতো কিন্তু সব নেয়া সম্ভব হত না। তাই আম্মুকে শুধু মাছ ভাজি আর মুরগি বা গরুর মাংস ভুনা করে দিতে বলতাম। আম্মু খুব সুন্দর করে রান্না করে হটপটে দিয়ে দিত! মেসে ফিরে যখন আম্মুর রান্না করা মাছ মাংস আসাদ, সোহেল, রাফির সামনে রাখতাম তখন কাড়াকাড়ি লেগে যেত! আমরা আঙুল চেটে খেয়ে নিতাম। কিছুই বাকি রাখতাম না। ঠিক এভাবেই যে যখন বাড়ি থেকে আসতো তখন বাড়ির রান্না করা কিছু না কিছু নিয়ে আসতো! আর অপেক্ষা করতে থাকতাম কবে আবার বাড়ির রান্না খাবো!

তিনদিন হল পানির খুব সংকটে আছি আমরা! মটর পুরে গিয়েছে সাথে আদিম কালের এক তালা লাগানো ছিল যাতে চাবি ঢুকাতে গিয়ে চাবি আটকে গেছে! মেসের অনেকেই যে যার মত বাড়ি চলে গিয়েছে শুধু আমরাই আছি! আর অন্যান্য সাত আটজন আছে। এখন বুয়ার অনেক দাপট হয়ে গেছে! উনি সাত আটজনের জন্য রাধবেন না! আরও পানির অভাব, তাই তার বেশি কষ্ট হয়ে যাচ্ছে! অথচ সত্তরের অধিক ব্যাচেলরদের জন্য তার রাঁধতে কষ্ট হয় না! কতদিন এভাবে চলবে কে জানে। এদিকে কাপড় চোপড় ধোয়াও হচ্ছে না। পরার জন্য তেমন কোন শার্ট প্যান্ট অবশিষ্ট নেই! কি করবো ভাবতে ভাবতে ঘুমিয়ে গেলাম! ঘুম ভাঙলো বিদ্যুৎ চমকানোর আওয়াজ শুনে! জানলা খুলে তাকিয়ে দেখি আকাশ জুড়ে কালো মেঘ জমা হয়েছে! আসাদ, সোহেল আর রাফিকে ধরফর করে ডেকে উঠালাম। “বাকি বালতি গুলা নিয়া জলদি ছাদে আয়! বৃষ্টি হচ্ছে!” এই বলে দুইটা বালতি নিয়ে ছাদে চলে গেলাম! কিছুক্ষণপর বৃষ্টি শুরু হল। মেসের বাকি ব্যাচেলররা কেউ ছাদে বা কেউ নিচে গিয়ে পানি ধরতে লাগলো। মুষলধারায় বৃষ্টি শুরু হল সাথে দমকা হাওয়া! আসাদ নিচে গিয়ে কয়েকটা আম কুড়িয়ে নিয়ে আসলো। সোহেল কয়েকটা শার্ট প্যান্ট আর টেবিলের রেক্সিন নিয়ে আমার পাশে দারিয়ে গেল!
“কি রে তুই কাপড় চোপড় নিয়ে আসলি যে? আর এই বল সাবান দিয়ে কি করবি?”
” ছাদে ক্রিকেট খেলবো তাই আনছি…” “মানে?”
সোহেল বললো, “আল্লাহ এত সুন্দর একটা চান্স দিল জামা কাপড়গুলা ধোয়ার জন্য, আর এই চান্স তো পাগলেও মিস দিবে না! আর তোরা ড্রাম ভর্তি কর। তারপর যদি প্যান্ট শার্ট ধোয়া লাগে তাহলে ছাদে আসিস!” আসলেই সোহেলের মাথায় প্রচুর বুদ্ধি আছে। আমরা ড্রাম ভর্তি করে বৃষ্টির পানিতেই কাপড় ধোয়া শুরু করলাম। কিন্তু সাবান দিয়ে খুব বেশি পরিমাণে কাচতে হচ্ছে! আল্লাহর রহমতে কাপড় ধোয়াও হল আর আমরাও পবিত্র বৃষ্টিতে ভিজে গোসল করে নিলাম! চার বন্ধু লাফালাফি করে ভিজলাম। মনে হচ্ছে সেই শৈশবকালে ফিরে গেলাম আমরা। আমাদের দেখাদেখি অন্যান্যরাও তাই করলো। এমন আনন্দ শুধু ব্যাচেলরদের দ্বারাই সম্ভব!

শুক্রবার
জুম্মার দিন, নামাজ পড়ে এসে শুয়ে আছি। এদিকে ক্ষুধায় আমাদের পেট ছোট হয়ে আসছে! রাফি বললো, “দোস্ত, সামনের কমিউনিটি সেন্টারে এক বড়লোকের দুলালীর বিয়ে চলছে, চল পেটের কাজটাও মিটিয়ে আসি! ফাইভ স্টার খাওয়া দিয়ে আসি!” ব্যাস, সাথে সাথে আমরা আমাদের নতুন শার্ট প্যান্ট পরে ভদ্রলোক সেজে বেরিয়ে পরলাম। কমিউনিটি সেন্টারের সামনে গিয়ে আহাম্মক হয়ে গেলাম! বিয়ের কার্ড দেখে সবাইকে ভিতরে ঢুকতে দিচ্ছে! আসাদ বললো, “বড়লোকগুলা এমন কিপ্টামি করতে পারে জানা ছিল না!” রাফি বললো, “তাহসিন স্যার কিছু ভাবুন!” আমি ওদের অপেক্ষা করতে বলে গাড়ি পার্কিং এর প্লেসটা দেখতে গেলাম। ফিরে এসে বললাম, “শোন, আমাদের যাওয়ার একমাত্র উপায় হচ্ছে বরযাত্রীদের সাথে আনন্দ করে ঢুকতে হবে!” “তুই কেমনে জানলি বর পক্ষ আসে নি?” আসাদকে বললাম, “ফয়িন্নি পার্কিং প্লেসটা দেখে আয় সেখানে কোন ফুলে সাজানো গাড়ি নাই!”
“এখন বরযাত্রী যখন আসবে তখনই আমাদের ভিড়ের মধ্যে হইচই করে ঢুকতে হবে। পারবি না সবাই?” সোহেল বললো সে একাজে খুব এক্সপার্ট! আমি আবারও বললাম, “দেখিস বেশি জোসে এসে যাস না! তাহলে কিন্তু সমস্যা!” আমরা অপেক্ষা করতে থাকলাম বরের গাড়ির জন্য। প্যা প্যা আর টি টিট করতে করতে সাত আটট্টা কার আর পাঁচটা এসি বাস আমাদের সামনে থামলো! যাক আর কোনো টেনশন নাই! এত লোকের ভিড়ে কোন ঝামেলা হবে না। এরপর আমরা চারজন সানগ্লাস লাগিয়ে শিনা টান করে ঢুকে পরলাম! একই টেবিলে বসলাম চারজন। পোলাও, খাসি, মুরগীর রোস্ট, গরু মাংস ভুনাসহ আরও তিন চারটা আইটেম নিয়ে আসলো ওয়েটাররা! আমরা চারজন হাত চুবিয়ে খাওয়া শুরু করলাম! কি দারুণ স্বাদ! বুয়ার হাতের ছাই খেয়ে খেয়ে এসবের টেস্ট ভুলেই গিয়েছিলাম! লাগামহীনভাবে খেতে থাকলাম আমরা! ওয়েটার ২৫০মিলির ক্লেমন দিয়ে গেল। আমাদের খাওয়া দেখে পাশের এক লোক জিজ্ঞেস করলো, “ভাইয়ারা, আপনারা কি বরপক্ষের লোক?” আমাদের খাওয়া তখন প্রায় শেষ, এমন সময় এরকম প্রশ্নের কি উত্তর দিব ভেবে না পেয়ে বললাম, “না ভাইয়া, আমরা এলাকার পক্ষ থেকে এসছি!!” এই বলে আর দেরি করি নি। খাওয়া ছেড়ে চারজন চারদিকে ছুটলাম! কোনরকম হাতটা ধুয়ে বের হলাম সেখান থেকে!
রাস্তা দিয়ে হাটছি, আর তারসাথে আজকের অভিজ্ঞতা নিয়ে একটু পরপর হাসছি! একসময় সবাই একসাথে অট্টহাসি দিয়ে উঠলাম! রাস্তার অন্যান্য লোকজন ভাবছে আমরা পাগল হয়েছি! কিন্তু এই অভিজ্ঞতা আমাদের আসলেই বারবার পাগলের মত হাসাচ্ছে! রাফি আমাকে বললো, “কিরে? অমন খুঁড়িয়ে খুঁড়িয়ে হাটছিস কেন?” আমি বললাম পরে বুঝবি… আসাদ বললো, “ওই শালার জন্য ক্লেমনটাও টেস্ট করতে পারলাম না!” “না বন্ধু, ক্লাইমেটস এখনও শেষ হয় নি!” বলে প্যান্টের সামনের আর পিছনের পকেট থেকে ক্লেমনগুলো টেনে বের করলাম! এই দেখে আবারও অট্টহাসিতে ফেটে পরলাম সবাই! রাফি হাসতে হাসতে বললো, “কেমন পসিবল রে?” আসাদ বললো, “তোর প্যান্টে আর কি কি ঢুকানো যায়?” “তোরা তো আরামেই আছিস কিন্তু আমার সামনে পিছে যে ঠাণ্ডা হইয়া গেছে তার কি করুম?” সেদিনের অ্যাডভেঞ্চার ওখানেই শেষ। মেসে ফিরে কুড়ানো আমগুলো কেটে সরিষা, শুকনা মরিচের মসলা দিয়ে মাখিয়ে তৃপ্তি সহকারে খেয়ে নিলাম।

কথায় আছে সব কিছুরই শুরু আছে আবার শেষও আছে। আমাদের ব্যাচেলর লাইফের শুরু হয়েছিল ভার্সিটি থেকে। ব্যাচেলর লাইফের প্রকৃত আনন্দটা শেষ হয়ে গিয়েছে! আজও ব্যাচেলর আছি। এখনও বিয়ে করি নি। আসাদ, সোহেল, রাফি এরা বিয়ে করেছে। সোহেলের সাথে আমার সবসময় যোগাযোগ থাকে। রংপুর বাড়ি ওর, ইচ্ছা করলেই শেরপুর থেকে যেতে পারি বা ওকেই আসার জন্য বলি। কিন্তু আগে যেমন ফ্রি ছিলাম বা যে স্বাধীনতা ছিল সেটা এখন আর নেই। সেই ছোট্ট ছেলেরা সেদিন বাবার সাথে স্কুলে গিয়ে মার সাথে ফিরে আসতো আজ তারা অনেক দায়িত্ববান হয়েছে! চাইলেই তারা এখন স্বাধীনমত কিছু করতে পারে না। অনেক কিছুই ভাবতে হয় তাদের। মা বাবা ভাবে সেদিন ছেলেটাকে কোলে নিয়ে ঘরে প্রবেশ করলাম আর আজ ছেলেটা চাকরি করে! কোনদিক দিয়ে সময়গুলো ফুঁড়িয়ে গেল কেউ ধরতে পারলো না! ব্যাচেলর লাইফের প্রত্যেকটা দিন আমাদের স্মৃতিতে গাথা থাকবে। জানা নেই কবে এই দিন আবার আসবে বা আদৌও আসবে কিনা! ওসব দিনগুলো স্কুল লাইফের স্কুল ফাঁকি দিয়ে বিভিন্ন জায়গায় মুক্ত পাখির মত ঘুরে বেড়ানোর মত। এখন যে যার ক্যারিয়ার নিয়ে ব্যস্ত হয় পরেছি! আসাদ এখন চট্টগ্রাম থাকে। পোর্টের আমদানি রপ্তানির হিসাব নিকাশে ব্যস্ত সে। বিয়ে করেছে কয়েকমাস আগে! কিন্তু আমি ওর বিয়েতে যেতে পারি নি! অফিসিয়াল কাজে সিলেট যেতে হয়েছিল। রাফি এখন লোক প্রশাসনে নিয়োজিত আছে। সোহেল আজ অনেক নামকরা প্রোগ্রামার! ওরা সবাই নিজের সংসার নিয়ে ব্যস্ত! আগের মত সময় হয় কারই যে চুটিয়ে আড্ডা দেব!

আজ আমার বিয়ে। ও আমি কি করি সেটা এখনও জানানো হল না। বর্তমানে আমি একজন সফটওয়্যার ইঞ্জিনিয়ার। আর যাই হোক আজ আমার টাকার অভাব নেই! আমার দুইটা ইচ্ছা ছিল। প্রথম, নিজেকে প্রতিষ্ঠিত করা আর দ্বিতীয়, আম্মু আব্বুকে হজ্বে বা ওমরাহ তে পাঠানো যা গত মাসে পূর্ণ হয়েছে। ক্লাস টেনে আমার ইংরেজি শিক্ষক আমাকে বলছিলেন, “আজ তোমাদের মধ্যে অনেকেই দেখবে খুব ভাল রেজাল্ট করে আবার খারাপ করে। রেজাল্টের কারণে অনেকের সাথে দ্বন্দ্ব হবে। তবে একটা সময় দেখবে যারা এখন খারাপ আছে, ভবিষ্যতে তারা কোন না কোনো ভাবে নিজেদের পথ নিজেরা খুজে বের করে সফল হবে, আবার দেখবে ব্যুয়েট থেকে ডিগ্রি নিয়েও তোমাকে স্যার স্যার বলে ডাকছে! জ্ঞানটাই আসল, প্রতিষ্ঠান নয়!” হুম স্যারের সে কথাটা আমার আজও মনে আছে। ঠিক বলছিলেন স্যার। স্যারদের সকল কথাই অক্ষরে অক্ষরে সত্য এবং প্রমাণ হয়। আমার বিয়েতে সকল প্রকারের লোকজনকে দাওয়াত করেছি এবং বিয়ের অনুষ্ঠানটা হচ্ছে সেই কমিউনিটি সেন্টারে যেখানে আমরা চারজন এলাকার পক্ষ থেকে খেয়ে গিয়েছিলাম। আসাদ, রাফি, সোহেলকে সপরিবারে দাওয়াত দিয়েছি এখন ওরা আমার পাশেই আছে। ওদের স্ত্রীরা আছে আমার হবু স্ত্রীর সাথে! একে একে সবাই খেয়ে বিদায় নিয়েছে। বর এবং কনে একসাথে এবং তাদের অভিভাবক ও কাছের মানুষরা সব এক টেবিলে বসে আছে! আসাদ, রাফি, সোহেল আমার মুখোমুখি বসে আছে। রাফি আর আসাদ বললো, “ভাইয়া, আপনি কোন পক্ষের লোক?” সোহেল বললো, “এই টেবিলের কথা মনে আছে?” আমি আর কি উত্তর দেব? আমার তো মনে আছে, আপনাদের মনে আছে তো?
.
[কিছু কথা: পরতে পরতে হয়তো বিরক্তিকর লাগছে তবুও গল্পটা ব্যাচেলরদের জন্য উৎসর্গ করলাম। ভুল ত্রুটি ক্ষমার দৃষ্টিতে দেখবেন এবং ইস্ট অর ওয়েস্ট, ব্যাচেলর্স আর দা বেস্ট!]

গল্পের বিষয়:
অন্যান্য

Share This Post

সর্বাধিক পঠিত