কঠিন বাস্তবতা

কঠিন বাস্তবতা

আমি তাজ নতুন কলেজে প্রথম ক্লাস করতে চাই।আমার
কলেজটা সিলেট শহরেরই।বাসা থেকে যেতে প্রায় দু’ঘন্টার
পথ।
যাতায়াত টা করতে হয় বাস দিয়ে।পুরান পুলে যাওয়ার আগেই আমি
হুমায়ুন রশীদ চত্বরে নেমে যাই। এই চত্বরে নেমেই
ট্রেক্সি (সিএনজি) নিয়ে ঠিলাঘর পয়েন্টে নেমে যাই।
সেখান থেকে এম সি কলেজ পাড় হয়েই আমাদের কলেজ।
সিলেট সরকারী কলেজ।আমি নতুন কলেজে ভর্তি হয়েছি।
এবার ইন্টার ফাস্ট ইয়ারে মানবিক বিভাগের ছাত্র।
এত ঘটা করে বলার কারণটা হলো আমি কলেজে যাওয়ার পথেই
নির্মম একটা সত্য ঘটনা শুনতে পাই।এতো নির্মম মৃত্যু কোন মা-
বাবা,ভাই বোন কখনও সহ্য করতে পারবে না।
.
ছেলেটার নাম অলি।দেখতে শুনতে খুব ভালো।পরিচয়টা হয়
আমার ছেলেটার বাবার সাথে।ছেলেটার বাবা বাস ড্রাইভার।গোয়ালা
বাজার টু সিলেট হাইওয়ে রোড এ আজ বাইশ বছর যাবৎ বাস চালিয়ে
যাচ্ছেন।
ছোট্ট পরিবার সুখে ভরপুর ছিলো।ওনার দুই ছেলে,আর এক
মেয়ে।সুখের পরিবারটা বেশ ভালোই চলছিলো।চাচা মিয়া
আমাকে দেখে ওনার ছেলের কথা মনে পরে যায়।বাসে সিট
না পেয়ে ড্রাইভারের পাশের সিটে বসতে হয়েছে আমাকে।
হাতে খাতা দেখে বুঝে গেছেন আমি কলেজ থেকে ফিরছি।
আর যে সময়টা ছিলো তা দুপুর দুইটা বাজে।এ সময় পুরান পুলের
কাছে বাস স্ট্যান্ডে এসে গোয়ালাবাজারের বাসে উঠে বাসার
পথে ফিরতে হয়।
আমিও যথারীতি বাসে জায়গা না পেয়ে ক্লান্ত শরীর নিয়ে
একিবারে সামনের সিটে বসে পড়লাম চাচা মিয়ার পাশে।
কেমন যেনো মুখটা মলিন হয়ে কাছে।যে কেউ দেখলে
বুঝতে পারবে কোন বিষাদের ছায়া চেয়ে গেছে
মুখমন্ডলে।
.
এক পর্যায় আমাদের পরিচয় হলো,
–চাচা মিয়া আপনি কত বছর হলো এ রাস্তায় বাস চালাচ্ছেন?(তাজ)
–চাচা মিয়া,বাবা সে অনেক বছর।আজ প্রায়য় বাইশ বছর চললো
আমি সিলেট টু গোয়ালাবাজার হাইওয়েতে গাড়ি চালাই।
তা বাবা তুমি কলেজ থেকে বাসায় যাচ্ছো নাকি?
–জি,চাচা আমি কলেজ থেকে বাসায়
ফিরতেছি।(তাজ)এই কথাটা শুনে চাচা মিয়া একটা দীর্ঘ নিঃশ্বাস
ছাড়লেন।কেমন যেনো আমার কাছে রহস্যময় মনে হলো।
আমি মনের সব দ্বিধা ভেঙে বললাম চাচা আপনার কোন ছেলে
মেয়ে আছে?
–হ্যাঁ,বাবা আমার ছেলে মেয়ে তিন জন।ছেলেটা বড়,তারপব
একটা মেয়ে,আর ছোট আরেকটা ছেলে আমার স্ত্রী। এই
নিয়েই আমার সুখের পরিবার ছিলো।
–তাজ আরো কৌতুহলী হয়ে পরে!চাচা ছিলো বলতে ঠিক কি
বুঝালেন?
–আমার পরিবারে এখন বিষাদের ছায়া বয়ে যাচ্ছে বাবা।আমার বড়
ছেলেটা “মোদনমোহন কলেজের” রাষ্ট্রিবিজ্ঞান নিয়ে
অনার্স করেছে।শেষ বর্ষের ছাত্র ছিলো আমার অলি।যেমন
মেধাবী ছিলো, তেমনি যোগ্যতায় মোদনমোহন
কলেজের ছাত্র লীগের নেতা ছিলো।অলির ভেতরে
কোন দলীয় কোন্দল ছিলো না।সবাই খুব পছন্দ করতো।
ন্যায়ের সাথে সব কিছু সামলিয়ে যেতো।কিন্তু এ পরিণতি যে
এত খারাপ হবে আমার ছেলে মুঠেও অনুধাবন করতে পারেনি।
.
এক দিন তাদের দলের মধ্যে দুই বন্ধুর মাঝে কি একটা বিষয় নিয়ে
কথা কাটা-কাটি হয়।বিচার আসে অলির কাছে।অলি পরের দিন ন্যায়ের
সাথে সমাধান করে দিবে বলে সময় নেয় একদিনের….
.
পরের দিন সকাল এগারটা(১১টা)বাজ
ে।সবাই যথারীতি ক্যান্টিনে আসলো।একই দলের উভয়ই বন্ধু
হয়।বন্ধুর বিচার আর কি করবে?ডান হাত টাও তার বাম হাতটাও তার।তার
পরেও সমাধান করলো।এক বন্ধু অলির সমাধনে খুশি হলো।
আরেক বন্ধু তা মেনে নিলো না।উল্টো অলিকে ঘুষ খোর,
বাটপার,ইত্যাদি নোংরা গালিগালাজ করে ক্যান্টিন হতে রাগারাগি করে
বের হয়ে যায়।
.
অলি বরাবরই শান্ত থাকে।সে বলে আমরা সবাই বন্ধু।এখানে
বিচারের কি আছে? আচ্ছা বাদ দে তো সে ঠিক বুঝবে এক
সময়।তখন রাগ কমলে আমাদের সাথে মিলিত হবে।
কে শুনে কার কথা?? অলির উপর যে এই ঝাল মিটাবে অলি সম্পূর্ণ
অজ্ঞ। হিংসার আগুন জ্বলতে থাকে বিবাদ না মানা সেই বন্ধুটার
ভেতরে।
প্রতিশোধ পরায়ণ হয়ে উঠে বিপক্ষ ছেলেটা।বিনিময়ে
নির্দোষ হয়েও নিষ্পাপ জীবনটা দিতে হলো আমার ছেলের।
.
একদিন হঠাৎ অলির উপর ওইছেলেটা সহ আরো কয়েকজন
ঝাপিয়ে পরে।একা সে রাতে মেসে ফিরছে।ঠিক তখনি ওই
ছেলেটা নির্দয় ভাবে আমার ছেলেকে পিটাতে থাকে।এক
পর্যায়ে তাকে চুরির আঘাত করে।পর পর অনেক বার অলির বুকে
চুরি দিয়ে আঘাত করে।যার ফলে সেই মুহুর্তেই অলির নির্মম
মৃত্যু হয়।
.
এ পর্যন্ত বলে চাচা মিয়া থেমে যান।বাবার। কঠিন মনের মানুষ হয়
আমি জানি।কিন্তু ওদেরও যে ভালোবাসা কাতর মন হয় তা আমি এই
চাচা কে না দেখলে বুঝতেই পারতাম না।প্রত্যেকটা কথার সাথে
নীরবে অস্রু বিসর্জন দিয়ে যাচ্ছেন তা স্পষ্টই দেখতে
পাচ্ছি।পুরো বাকহীন হয়ে পড়ি আমি।কি বলবো ভাষা খোঁজে
পাচ্ছি না।আমারও ভেতরটা মুচড়ে যাচ্ছে।চোখটা জলে ভরে
উঠেছে।কখন যে নীরবে চোখের পানিটা গাল বেয়ে
পরছে বুঝতে পারিনি।
.
আচ্ছা চাচা মনে কিছু না নিলে আরেকটা প্রশ্ন করতে পারি?
–হ্যাঁ,বাবা বলো?
আপনার ছেলের খুনিদের বিচারের কি হলো? হত্যাকারীদের
বিচার হয়েছে নাকি হয় নি?
–চাচা, না বাবা, আজ প্রায় দু’বছর হয়ে গেছে না কোন বিচার
পেয়েছি আমার ছেলের হত্যার না কোন অপরাধী শাস্তি
পেলো!
–কেনো চাচা? বাবা আমি পুলিশের কাছে দৌড়াতে দৌড়াতে এখন
হালটা ছেড়ে দিয়েছি! পুলিশের কাছে যাওয়ার পর বলে, এদের
পিছেনে দৌড়ে লাভ নাই! ওদের শাস্তি দিলে তো আর আপনার
ছেলে ফিরে আসবে না?
পুলিশ আজ পর্যন্ত আমাদের ক্যাসটা হাতেও নিলো না! আবার
কোন খুনিও সাজা পায়নি!
ব্যর্থতা মেনে নিয়ে আর বুক ভরা কষ্টের শূণ্যতা নিয়ে সবর
করে বসে আছি। এমন কি ওর ছাত্র লীগের কেউ ও আমার
ছেলের হত্যার ব্যাপারে কোন ব্যবস্থা ও নেয়নি! এখন আছি
আমার সন্তানের স্মৃতিটুকু বুকে ধরে।আল্লাহ একদিন বিচার
করবেন সে আশায় চলছি আমি আর আমার পরিবারের সবাই।জানি
কোন দিনও আমার ছেলের বিচার হবে না এই নিষ্ঠুর দুনিয়াতে….
.
আমি ও তত সময়ে আমার গন্তব্যে পৌঁছে গেলাম। চাচা দোয়া
রইলো আল্লাহ আপনাদের মনোবাসনা পূর্ণ করুণ। আপনারা নিশ্চয়
একদিন ন্যায় বিচার পাবেন। গাড়িটাও থেমে গেলো! হয় তো
চলমান জীবন এভাবেই চলতে থাকবে নতুন করে! কিন্তু জানি না
চাচা মিয়ার ছেলে হত্যার বিচার কখনও হবে কি না??

গল্পের বিষয়:
অন্যান্য

Share This Post

সর্বাধিক পঠিত