মিলন বেলা

মিলন বেলা

ঘুম হাল্কা হয়ে এসেছিল ভোরের দিকে। তাৎক্ষণিক ঘুম ভেঙে গেল মসজিদ থেকে আসা ফজরের আজানের মিষ্টি সুরে। উঠে পড়লাম জলদি। মসজিদে যেতে হবে। প্রাকৃতিক কাজ শেষে ওযু করে মসজিদের উদ্দেশ্যে রওনা দিলাম।

নামায শেষে হেটে হেটে ফিরছি। ঠান্ডা পড়েছে। শীতকাল চলে আসছে। ভোরের ঠান্ডা বাতাস, পাখির কলকাকলি মনকে করে তুলছে পরিপূর্ণ। তবুও কিছুর যেন একটা অভাব বোধ করছি। অনুভব করতে পারছি খুব প্রিয় একটা জিনিশ আমার করে নিতে পারিনি। যেটা না পেলে মনটা আর পরিপূর্ণ হবে না। কুয়াশায় ছেয়ে আছে চারপাশ। হঠাৎ শিশির ফোটা পরা ঘাসের উপর হাটতে ইচ্ছা করছে খুব। বাড়ির কাছের মাঠের কাছে পৌঁছে গেলাম। সেন্ডেল জোড়া হাতে নিয়ে খালি পায়ে হাটছি। মনের মাঝে চলছে উত্তাল আনন্দের ঢেউ। কিন্তু বা হাতে কারও ছোঁয়াও বড্ড অনুভব করছি। গত ১ সপ্তাহ মাথায় খুব চাপ গেছে। এখন অনেক হাল্কা লাগছে মাথাটা। আলো উঠে গেছে। কুয়াশাও হাল্কা হয়ে যাচ্ছে। এখনি সূর্যের মুখ দেখা যাবে। পাখিদের ডাক শুনতে শুনতেই বাসায় ফিরে গেলাম।

বাসায় ফিরে বারান্দায় রাখা চেয়ারে গিয়ে বসলাম। রোদ উঠেছে। বারান্দাটা পূর্ব দিকে হবার সুবাদে রোদ সরাসরি গায়ে লাগছে। ঠান্ডা লাগছিল। এখন শরীরে গরমের একটা প্রবাহ বয়ে গেল। মা এসে চা দিল। প্রতিদিনের মতই সকালে হাল্কা আলাপ হয়। আজও তার ব্যাতিক্রম হলো না। মা বলল,

— অনেক তো হলো, খোকা! এবার বিয়ে কর।
— করবো পরে, আম্মু।
— পরে পরে! বলতো এই পরে টা কবে আসবে?
— আসবে যেদিন সেদিন জানতে পারবে।
— হয়েছে হয়েছে! শান্তি তো দিবি না। এখন মরেও শান্তি দিবি না দেখছি! বাজার করা লাগবে। যা বাজার করে নিয়ে আয়।
— কেন, আব্বু কোথায়?
— আজ তুই বাসায় আছিস দেখে অলস আরও জাকিয়ে বসেছে তার। দেখ গে এখনো পড়ে পড়ে ঘুমুচ্ছে।
— হা হা, সমস্যা কী? অনেক তো করেছে জীবনে। অবসর নিক এবার। বাজারের ব্যাগটা রেডি করো আমি আসছি।

আম্মুর হাতে চায়ের কাপ ধরিয়ে দিয়ে আমি আব্বুর ঘরের দিকে গেলাম। দেখি কম্বল গায়ে দিয়ে আরামে ঘুমুচ্ছে। কিন্তু কাছে যেতেই অবাক করে দিয়ে বলল,

— কিরে ঘুম ভাঙলো?
— তা ভেঙেছে বৈকি! কিন্তু তোমার যে পরিপূর্ণ ঘুম হয়নি সে বুঝতে পারছি। ঘুমাও।
— আয় দুজন একসাথেই ঘুমাই।
— না আব্বু! বাজার করতে হবে।
— আচ্ছা যা! ভাল ভাল বাজার করবি কিন্তু।
— তা আর বলতে।

আম্মুর কাছ থেকে বাজারের ব্যাগটা নিয়ে বেড়িয়ে পড়লাম। বাড়ি থেকে কিছু দূরেই বাজার। হেটেই যাবো। তাই হাটতে শুরু করলাম। পরিচয়টা তাহলে দিয়ে দেই কী বলেন?

আমি ফয়সাল আহমেদ। কোনো একটা মফস্বল শহরে থাকি। এম.এ কম্পলিট করে বর্তমানে শহরের কোনো একটা কোম্পনির অফিসে চাকরী করছি। বাবা মা আর আমি এই আমাদের পরিবার। মোটামুটি হাসি খুশি সচ্ছল পরিবার। হাসিখুশি দিয়েই দিন শুরু হয় আর দিন যায়।

বাজারের প্রায় কাছেই চলে এসেছি। হঠাৎ একটা জটলা জমছে দেখলাম। লোক ঘিরছে একটা জায়গাকে কেন্দ্র করে। কাছে গিয়ে একটা একটা লোককে জিজ্ঞাস করলাম,

— কী হয়েছে ভাই এখানে?
— এখনই একটা অটো একটা মেয়েকে ধাক্কা মেরে বাজারের দিক পালিয়েছে। মেয়েটা ধাক্কা খেয়ে পড়ে গিয়ে রাস্তায় মাথা ঠুকে গিয়েছে। অজ্ঞান হয়েছে। (লোকটি)
— তাহলে আপনারা তাকে হাসপাতালে নিচ্ছেন না কেন?
— পাগল হয়েছেন! হাসপাতাল নিয়ে যাই আর পুলিশ আমাদের ধরুক।
— কেমন মানবতা আপনার ভিতরে?

রাগে লোকটাকে ঠেলে সরিয়ে দিয়ে, জটলার লোক গুলোকে ঠেলে ঢুকতে লাগলাম। দেখলাম একটা মেয়ে রাস্তায় পড়ে আছে। কপালের এক পাশে হাল্কা কেটে গেছে সেখানে থেকে হাল্কা রক্ত বের হয়েছে। বাইরে কম দেখাচ্ছে কিন্তু ভেতরে হয়তো আঘাত গভীরে গেছে। যার ফলে রোগী জ্ঞান হারিয়েছে। তার চেয়েও বড় কথা মেয়েটাকে খুব বড় পরিচিত মনে হচ্ছে। যাই হোক ও সব পরেও ভাবা যাবে। আগে একে হাসপাতালে নিতে হবে। একটা অটো দেখে আশেপাশের লোকের সাহায্যে তাকে তুলে নিয়ে বসলাম। অটোকে শহরের একটা হাসপাতালে নিয়ে যেতে বললাম।

আমি তাকিয়ে আছি মেয়েটার মুখের দিকে। চেনার চেষ্টা করছি। মনে পড়ছে না। আরেকবার সারা মুখ ভাল ভাবে দেখে নিলাম। হঠাৎ বিদ্যুৎ চমকের মত মনে পড়ে গেলো। আরে এ তো তাসনিয়া। তাসনিয়া এতো দিন পর হঠাৎ এখানে। সেই তাসনিয়া যাকে ৮ বছর ধরে ভালোবাসি। মাঝে হঠাৎ নাই হয়ে গিয়েছিল। ভোজবাজির মত অদৃশ্য হয়ে গিয়েছিল যেন। কিন্তু তার মুখের এ কী অবস্থা হয়েছে। চেহারা ধ্বসে গেছে একেবারে। চাপার মাংস বসে গেছে। কপালের একপাশে একটা পুরোনো কাটা দাগ দেখা যাচ্ছে। যেন অনেক দিন যুদ্ধ করেছে মেয়েটা। মোট কথা চেনাই যাচ্ছে না প্রায়। এমন হয়েছে যে ভালো ভাবে খেয়াল না করলে চিনাই যাবে না। যেন কষ্টের মাঝে থেকে থেকে কী হয়ে গেছে। তার উপর মুখের উপর থেকে রক্ত সরে গেছে। ফ্যাকাশে দেখাচ্ছে মুখটা।

হাসপাতালে এসে একটা কেবিন ঠিক করে ভর্তি করিয়ে দিলাম। ডাক্তার ডেকে চিকিৎসা শুরু করতে বললাম। পুলিশি ঝামেলা আমি দেখবো। টাকা এনেছিলাম সাথে বেশি করে, বাজার করতে হবে বলে। কিন্তু করা হলো না। সেই টাকা দিয়ে তাসনিয়ার চিকিৎসার খরচ দিলাম। আম্মুকে ফোন দিয়ে আব্বুকে দিয়ে বাজার করে নিতে বললাম। আম্মু বুঝে গেলেন ঝামেলায় পড়েছি। তাই কোনো প্রশ্ন করলো না। খালি বলল,” আচ্ছা ঠিক আছে।”

ডাক্তার বলেছে রক্ত লাগবে না। কাটা জায়গা সেলাই করতে হবে। চিকিৎসা শেষে ডাক্তার যখন এলো তখন বলল,
— আঘাতটা ভিতরে গেছে। যার ফলে অজ্ঞান হয়ে গেছে। কালকে দুপুরের দিকে জ্ঞান ফিরতে পারে। তবে আরেকটা ব্যাপার। রোগীর শরীরে আঘাতের চিহ্ন পাওয়া গেছে। মানে নির্যাতন করা হতো উনাকে।
— ধন্যবাদ ডাক্তার।

চিন্তা করতে লাগলাম কোথায় ছিল তাসনিয়া। যেখানে ওর উপর নির্যাতন করতো। খানিক বাদেই পুলিশ পৌঁছে গেল। পুলিশি ঝমেলা চুকিয়ে দিলে তারা বিদেয় হলো। আমি কাবিনে ঢুকলাম। মুখের রঙ ফিরেছে। এখন কিছুটা চেনা যাচ্ছে। যদি না সব ঠিক থাকতো। মুখে কোনো আঘাতের চিহ্ন নাই কপালের সেই পুরোনো কাটা দাগ ছাড়া। খানিক দিন পরিচর্চা করলে আবার আগের মত হয়ে যাবে। দরকার খালি একটু সেবা শুশ্রূষা। কিন্তু ২ বছর পর হঠাৎ তাসনিয়া। হঠাৎ নাই হয়ে যাওয়া আবার হঠাৎ উদয় হওয়া কিছুই বুঝছি না। দুপুর হয়েছে। হোটেল থেকে দুপুরের খাওয়া দাওয়া সেরে নিলাম। বাড়িতেও একটা ফোন করে জানিয়ে দিয়েছি যে, ফিরতে নাও পারি। তাসনিয়াকে স্যালাইন দেয়া হয়েছে। কাল দুপুরের আগেই জ্ঞান ফিরতে পারে। মাথায় ব্যান্ডেজ করা শুকনো মুখটা দেখে আমার ভিতরে ভিতরে কেঁপে কেঁপে উঠছে। কি হয়েছে তার সাথে এই দুবছর? জ্ঞান ফিরলে জানিতে হবে, নাকি তাও বলবে না?

রাতে এখানেই থাকবো সিদ্ধান্ত নিলাম। সন্ধ্যার দিকে ডাক্তার এসে একবার পরিক্ষা করে গেল। অবস্থা উন্নতির দিকে। পাশে রাখা চেয়ারে বসে তার মুখের দিকে তাকালাম। তাকিয়ে হারিয়ে গেলাম অতীতে,

” ঠিক তারই সুন্দর মায়াবী মুখ দেখেছিলাম ভার্সিটি প্রথম ক্লাসের দিন। সাথে তার মায়াবী চোখ। দীঘির মত বড় বিশাল শান্ত পানি যেন। একবার চোখে চোখ পড়লে ফিরিয়ে নিতে ইচ্ছা করে না কিন্তু ভদ্রতার তাগিদে আর ভয়েই হোক বেশিক্ষণ তাঁকিয়ে থাকতাম না। তার সঙ্গে কথা বলতাম না তেমন। মেয়েদের থেকে দুরত্ব রেখে চলতাম। হয়তো এজন্যই তার মনে জায়গা করে নিয়েছিলাম।

যথারীতি চলে গেল ১ টা বছর এভাবেই। সারা ক্লাসে তাকে দেখা, আর স্যারের লেকচার শুনা প্রতিদিনকার কাজ। আর রাতে তাকে নিয়ে নিত্য নতুন স্বপ্ন বানানো, দেখা যেন রুটিন হয়ে দাঁড়িয়েছিল। তাসনিয়া যে তাকাতো না তা না। বরং মাঝে মাঝেই তাঁকাতো। ধরতে পারতো, কিন্তু কিছু বলতো না। তাসনিয়ার পিছে প্রতিনিয়ত ছেলের লাইন যেন লেগেই থাকতো। আমার চেয়ে ভাল ভাল অবস্থা সম্পন্ন ছেলে আছে। তাদেরকেই পাত্তা দেয় আমাকে দিবে কেন। মনে মনে দমে গেলেও স্বপ্ন টা যেন প্রতিনিয়ত আরও রঙিন হয়ে উঠলো। হয়তো এরই নাম ভালোবাসা। সিদ্ধান্ত হলো পাত্তা পাবো না তো দেখেই যাবো না হয়। এভাবেই পার হলো একটা বছর।

চলছিলাম আমার মতো কিন্তু ওলট পালট হয়ে গেলো একদিনে। একদিন সকালে ভার্সিটি ক্যাম্পাসে ঢুকতেই তাসনিয়া দৌড়ে এলো আর আমার হাত ধরে ক্যাম্পাসের এক পুকুরের পাশে নিয়ে এলো। কোনো দ্বিধা না করেই সরাসরি বলল,

— তুই কি আমায় ভালোবাসিস? (রাগী কণ্ঠে)

আমি হাঃ হয়ে গেলাম। বলে কি আবার এসে সাথে সাথে তুই করে বলে। তার উপির রাগী কণ্ঠে। আমি তো গেছি। আমি তো ভয়েই কাঁপতে লাগলাম। এভাবে টানা ১ মিনিট তার মুখের দিকে তাকিয়ে ছিলাম হাঃ করে। সে আবার বলল,

— হাঃ করে তাকিয়ে না থেকে বল তাড়াতাড়ি! (আরেকটু ঝাঁঝালো কণ্ঠে)

আমি বাস্তবে ফিরলাম। বললাম,

— ইয়ে মানে… ইয়ে.. হ্যা। আমি….

তার রাগী মুখের দিকে তাকিয়ে আপনা আপনিই কথা বন্ধ হয়ে গেল। সে বলল,

— তা এতো দিন বলিস নাই কেন? আমি কী বাঘ নাকি ভাল্লুক যে কাঁপছিস।
— এমনি আপনাকে ভয় লাগে। বলি নাই কারণ আমাকে পাত্তা দিবেন না তাই। আমার চেয়েও অনেক ভাল ভাল ছেলে আপনার পিছে ঘুরে তাই!
— ও এই ব্যাপার। সবাইকে সবাই পাত্তা দেয় না। আবার কাউকে কাউকে পাত্তাও দেয়া। আচ্ছা ঠিকাছে মাফ করলাম। এবার প্রোপজ কর দেখি!

আবারো হাঃ হয়ে গেলাম। বলে কি এই মেয়ে পাগলী নাকি। অবশ্য একটু আধটু পাগলামি করতে দেখেছি দূর থেকে। এখন তো রীতিমত বেশিই করছে। যাক গে তাড়াতাড়ি বলে ফেলাই ভাল নাইলে আবার কী করে বসে কে জানে। আমি বললাম,

— আমি আপনাকে ভালোবাসি।

চোখ বন্ধ করে এক নিঃশ্বাসে বললাম। সিনেমাতে দেখেছি প্রোপজ করার পর একটা থাপ্পড় খেতেই হয়। তাই থাপ্পড় খাবার জন্য তৈরি হয়েছিলাম। কিন্তু খনিকক্ষণ কিছু হলো না দেখে চুখ খুললাম। দেখলাম তার মুখ আরও লাল হয়ে গেছে। আরও ভয় পেয়ে গেলাম। এই পাগলী মেয়ে আজ কী না কী করে বসে। সে বলে উঠলো,

— আপনি টা কেরে, আশেপাশে বৃদ্ধ কাউকে দেখছি না তো। তাহলে কে?

আমি ভয়ে ভয়ে উত্তর দিলাম,

— আপনাকে বলেছি।
— কী তোর এতো বড় সাহস! আমাকে বুড়ি মনে হয় তোর কাছে। (রাগী ও ঝাঁঝালো কণ্ঠে)
— না মানে আপনি সুন্দরী।

রক্ষা পাবার চেষ্টা করলাম। কাজ হয়েছে। সে বলল,

— অই ঠিক আছে তুমি করে বলবি কিন্তু!

হঠাৎ যেন খেয়াল করলো সে তুই করে বলছে। লজ্জা পেয়ে গিয়ে বলল,

— সরি রাগে এতক্ষণ ধরে তুই বলেছি। তুমি খুব সাঙ্ঘাতিক! চোখের চাহনি দিয়ে একটা মেয়ের বুকে নিজের জন্য গর্ত খুঁড়ে ফেলতে পারো। ১ টা বছর ধরে অপেক্ষা করছি তোমার জন্য। আর তুমি সেই ভীতু চোখের চাহনী পর্যন্তই যেন রাস্তা শেষ করে রেখেছো। এজন্যই রাগে আজ সব করেছি। (এতক্ষণে মিষ্টি কণ্ঠে বলল)
— ঠিক আছে। (হাফ ছেড়ে বাঁচলাম)

কল্পনার মাঝেও একটু হেসে উঠলাম।

সেই থেকে শুরু ভালোবাসার পথ চলা। রোজ গল্প করা, ঘুরে বেড়ানো। এভাবেই চলেছে বছরের পর বছর। আমরা অনার্স কম্পলিট করলাম। কিন্তু এর পরেই তাসনিয়া তারা দিলো চাকরীর জন্য। তার বাড়িতে নাকি বিয়ে ঠিক করতে লাগছে। কিন্তু অনার্স পাশ করে চাকরী পাওয়া কী এতো সহজ। তবুও চেষ্টা করতে লাগলাম। যেখানেই যাই মামা চাচা নয়তো টাকা। এদুটোর কোনোটাই আমার নাই। তাসনিয়ার পরিবার মোটামুটি অবস্থা সম্পন্ন। তাই আমার বিয়ের প্রস্তাব সহজে নাকচ করে দিবে। তবুও গিয়েছিলাম একবার। সেখানে কথা হয়েছিল আমাদের মাঝে যা তা হলো,

আমি আমাদের সম্পর্কের কথা জানাই তাসনিয়ার বাবাকে। উল্লেখ্য যে তাসনিয়ার বাবা প্রেম বিরোধী ছিলেন। তাসনিয়াই বলেছিলো। তাসনিয়ার বাবা বলল,

— তোমার তো চাকরী নাই। তাছাড়া কেবল অনার্স পাশ। সহজে চাকরীও পাবে না। টাকা লাগবে কিন্তু সে টাকা টমার পক্ষে দেয়া সম্ভব না। তোমার সম্পর্কের কথা আমরা জেনেছি আগেই। আর সেজন্য আমি তাসনিয়ার বিয়ে ঠিক করছি। আর আমি প্রেম বিরোধী সেটা জানো নিশ্চয়। সুতরাং আর কোনো কথা না বলে ঘরের ছেলে ঘরে ফিরে যাও। তাসনিয়াকে ভুলে যাও এটাই ভালো হবে।

আমার আর কিছু বলার থাকে নি। ইতো মধ্যে এম.এ পড়া ১ বছর পার হয়েছে। আরও কয়েক বছর লাগবে। তাসনিয়াকে বললে সে বলে তাহলে আমাদের পালাতে হবে। যদিও জানি ও খুব একরেখা জেদি তবুও আমি বললাম,

— ওরা তোমার বাবা মা। ছোট থেকে বড় করেছে। তাদের ভালোবাসা টা বেশি আমার থেকে। এমন সিদ্ধান্ত নেয়া ঠিক না।
— তুমি পালাবা না তাইতো। আমাকে ভালোবাসো না
সোজা কথায় শেষ করে দাও।
— আরে বাবা রাগ করে কেন? আমি কি ভালোবাসি না বলেছি।
— বুঝি বুঝি।

জানি বলে লাভ নাই। রাজি হয়ে গেলাম। কালকে পালাবো ঠিক করলাম। জায়গা ঠিক হলো আমার বাড়ির পাশের মাঠে সন্ধ্যার আগে একসঙ্গে পালাবো। তাই ঠিক করে যার যার বাড়ি ফিরে গেলাম। পরের দিন বিকাল হতে মাঠে বসে রইলাম। সন্ধ্যা গিয়ে রাত নেমে গেল তবুও তার দেখা নাই। এমনিতেই টেনশন হচ্ছে সারাদিন যোগাযোগ হয় নি। ভাবেছিলাম হয়তো ব্যাস্ত আছে। নাহ দেখেই আসি ওদের বাড়ি গিয়ে। কিন্তু ও যদি আবার আসে। না আজ এখানেই থাকি। কালকে না হয় ওর বাড়িতে যাবো। কিন্তু রাতেই আসে নি। ১১ টার পর বাড়ি ফিরে যাই।

পরের দিন ওদের বাড়ি গিয়ে দেখি ফাঁকা তালা দেয়া। বাড়ির কেয়ার টেকার কে জিজ্ঞাসা করলাম বলল কালকে নাকি সন্ধ্যাতেই ওরা বাড়ি ছেড়ে গেছে। কিছু নিয়ে যায় নি। নতুন কোথায় উঠবে। কিন্তু কোথায় সেটা বলে নি তাকে।

আমি চলে আসলাম। অনেক খুঁজলাম। পেলাম না। আমাকে ফেলে চলে গেল কী তবে তাসনিয়া। কিন্তু ও তো এমন করবে না। ওর মনে আমার প্রতি ভালোবাসা। আমার অনুভূতিও তাই বলে। যদি আমার অনুভূতি মিথ্যা হিয় তাহলে তো আমার ভালোবাসাটাও মিথ্যা। না নিশ্চয় কোনো গোলমাল হয়েছে। আবার ফিরবে সে কোনো বেলায় সে আবার ফিরবে আমার কাছে। যদি আমার অনুভূতি সত্যি হয় তাহলে সে ফিরবে আবার আমার কাছে।

সেই থেকে একা আছি। চাকরী খুঁজি নি আর। পড়াশোনায় মন দিলাম ভালো করে। এম এ কম্পলিট করে কোম্পানি অফিসে চাকরী নিলাম। সেই চলছে তাসনিয়া যাওয়ার ২ বছর হয়ে গেছে। আজও প্রায় সে মাঠে সন্ধ্যায় বসে থাকি মাঝে মাঝে সে ফিরে আসে। আশা ছিলো একটাই তাসনিয়া ফিরে আসবে। অবশেষে সেটা সত্যি হয়েছে। ফিরেছে আমার তাসনিয়া।”

বাস্তবে ফিরলাম যেন হঠাৎ করে। ফজরের আজান দিচ্ছে। সারারাত তাহলে অতীতের স্মৃতির মাঝে ডুবে ছিলাম। হাস্যকর লাগলো না মোটেই। মাঝে মাঝে এমন করে ভাবতে ভাবতে রাত কেটে যায়। ঘুমের চিহ্ন থাকে না তখন।

উঠে অজু করে নামায পড়ে নিলাম। হাসপাতালের করিডরে গিয়ে হেটে নিলাম একটু। আবার কেবিনে ঢুকে চেয়ার নিয়ে জানালার পাশে বসলাম জানালা খুলে দিয়ে। ঠান্ডা বাতাস আসছে। ঠান্ডা লাগছিলো। তবে ভালোই লাগছে তবুও। এখানে থেকে তাসনিয়া মুখ স্পষ্ট দেখা যাচ্ছে। দেখতে দেখতে কখন যে ঘুমিয়ে পড়েছি মনে নেই।

ঘুম ভাঙল দুপুরের দিকে। গরমে হয়তো। তাসনিয়ার দিকে চোখ পড়তেই দেখলাম এখনো জ্ঞান ফিরে নি। আবাক হয়ে গেলাম। এতোক্ষণ ঘুমিয়েছি। ডাক্তারকে তো ডাকার কথা আমাকে। কারণ সকালে রোগীর চেকাপ করতে হয়। পরমুহুর্তে ডাক্তার এর কাছে গেলাম। ডাক্তার বলল,

— আমি চেকাপ করতে সকালে গিয়েছিলাম। দেখি রোগী আপনার মুখের দিকে তাকিয়ে রয়েছে। জ্ঞান ফিরেছে। এই খবর আপনাকে দিতে চাইলে সে মানা করে। উনি কেমন করে যেন জেনে গেছিলেন সারারাত জেগে ছিলেন আপনি। আমি আর জাগাই নি। তার চেকাপ করেছি। সপ্তাহ খানিক লাগবে ভালো হতে। কাল সকালে ছাড়া পাবে। এখন ঘুমিয়ে রয়েছেন।

তার মানে তখন ঘুমাচ্ছিল আর আমি ভেবেছি জ্ঞান ফিরে নি। আমি ডাক্তার কে ধন্যবাদ দিয়ে কেবিনে ফিরে এসে তাসনিয়ার পায়ের সোজা দাঁড়িয়ে রইলাম।

তাসনিয়া চোখ খুলল। কথা বলার চেষ্টা করে বলল,

— কেমন আছো? অনেক দিন পর দেখা হলো তাই না?
— হুম তা বটে! দু’বছর পর। ভালো আছি। তুমি কেমন বোধ করছো এখন? আর জানলে কীভাবে আমি রাত জেগেছিলাম?
— ভালো। জানি রাগ করে আছো আমার উপর ২ বছর ধরে। কিন্তু কোন উপায় পাই নি তোমার কাছে আসার। আর হ্যা, আমি কিন্তু তোমার মুখ দেখে সব বুঝতে পারতাম ভুলে গেছ।
— না ভুলি নি। কী হয়েছিল খুলে বলো তো।
— সত্যি শুনবে! তাহলে শুনো,

“সেদিন তোমার সাথে কথা বলে বাড়ি ফেরার পর বাবা জিজ্ঞাসা করেছিল কোথায় গিয়েছিলাম। আমি বানিয়ে কিছু ঘটনা বলেছিলাম। পরে বাবা আমাকে ঘরে যেতে বলেন। আমি গেলে তারা বাহির থেকে দরজা এটে দেয়। অনেক চেষ্টা করেও খুলতে পারি নি। ডেকে ডেকে কাউকে খুলাতে পারি নি। এদিকে জানালায় গ্রিল লাগানো যা খোলা যন্ত্র ছাড়া অসম্ভব। তবুও চেষ্টা করেও বিফল হয়েছিলাম। শেষ পর্যন্ত হাল ছেড়ে দেই। পুরো জেলখানায় আটকে পড়েছে যেন এক অপরাধিনী। পর দিন সন্ধ্যায় বাবা মা আমাকে নিয়ে এক মাইক্রোতে নিয়ে বসায়। কোথায় যাচ্ছি জানতে চাইলে জানায় নি। পরে যখন পৌঁছাই বুঝতে পারি এটা দাদাবাড়ি। সেখান থেকেও অনেক চেষ্টা করেছি পালানোর কিন্তু কোনো উপায় পাই নি।

পরদিন বাবা একজন ছেলেকে তার পারিবার কে নিয়ে আসেন। ছেলেটা বিদেশে থাকে। নাম সৌরভ। জানতে চাইলাম মায়ের কাছে ওরা এসেছে কেন। মা যা উত্তর দিলো প্রস্তুত ছিলাম না। আমাকে নাকি সেদিনই বিয়ে দিয়ে দিবে। ভাবিতে পারছিলাম না। পালানোর চিন্তা করার আগেই বাবা এসে গেল। বলল, “পালানোর চিন্তা করিস না। যদি পালাস আর বিয়েতে রাজি না হোস তাহলে আমাদের মড়া মুখ দেখবি কথা দিলাম।”

আমার আর কিছু করার থাকলো না। বাবার মুখের দিকে চেয়ে রাজি হয়েছিলাম। মনে মনে তোমার কাছ থেকে ক্ষমা চেয়ে নিলাম। সেদিনই বিয়ে করে তারা আমাকে তাদের বাড়ি নিয়ে যায়। সত্যি কথা বাবা মা বিদায়ের সময় কাঁদলেও আমার চোখে তাদের জন্য পানি ছিল না। ছিল শুধু তোমার জন্য। বেঈমানি করেছি জানি। কিন্তু কিছু করার ছিল না।”

আমি বলে উঠলা মাঝ খানে,

— ওয়েট, ওয়েট! তার মানে তুমি বিবাহিত এবং তোমার স্বামীও আছে।

আমার কণ্ঠ ম্লান হয়ে গেল। আশা যেন নিমিষে মিলিয়ে গেল। তাসনিয়া বলে উঠলো,

— আগে সম্পূর্ণটা শুনো।

আবার আগের কথার খেই ধরে বলতে শুরু করলো,

“তার পর বিয়ের কিছু দিন পরেই আমাকে নিয়ে সে বিদেশ চলে এলো। এখানে এসেই টের পেলাম সৌরবের আসল চেহারা। রীতিমতো অত্যাচার করতো আমার উপর। থাপ্পড়, গালাগালি মারামারি করতো। কারণ সে ছিল নেশা খোড়। প্রায় রাতে বার থেকে নেশা করে বাড়ি ফিরত। আর এসেই আগে মারধর করতো। সহ্য করে গেলাম কয়েকটা মাস। আর পারছিলাম না যেন। তারপর একদিন মাথা ঘরে পড়লে সৌরভ ডাক্তার নিয়ে আসে। ডাক্তার তাকে কংগ্রাচুলেশন জানায়। বলে সে নাকি বাবা হবে। সে আমার দিকে তাকিয়ে ছিল। সে চোখে আমি খুব একটা মায়া দেখিনি। যা দেখেছিলাম সব তোমার চোখে। তোমার চোখের মায়ার মত এক ফোটা অংশ ওর চোখে ছিল না। ছিল শুধু হিংস্রতা।

আরও কিছু মাস পর, ততদিনে ওর সাথে আমার বিয়ের বছর পেরিয়ে গেছে। সেদিন হঠাৎ কথা কাটাকাটি হয়। এতে সে রেগে গিয়ে আমাকে ধাক্কা মারে। পড়ে মাথায় আঘাত লেগে রক্ত পড়তে থাকে। সে রাগের মাথায় লাথি চালায় আমি নিজেকে বাঁচাতে সরে যেতেই লাথিটা সোজা পেটে গিয়ে লাগে। আত্মা যেন বাহির হয়ে যাচ্ছিল। জ্ঞান হারিয়েছিলাম একটা চিৎকার দিয়ে।

জ্ঞান ফিরল পরের দিন হাসপাতালে। দুঃস্বপ্ন টা যেন তৈরিই ছিলো আমার জ্ঞান ফিরার জন্য। জ্ঞান ফিরার পর ডাক্তার জানায় বাচ্চা নাকি পেটেই মারা গেছে। আর কিছু করার নাই। আমাকে জিজ্ঞাসা করেছিলো।কিভাবে পড়েছি সিড়ি থেকে। বুঝলাম সৌরভ মিথ্যা বলেছে। মাথায় পট্টি লাগানো লক্ষ করলাম। ডাক্তার কে কিছু বললাম না। কয়েকদিন পর বাড়ি ফিরি। যাই হোক এই পাষাণ লোকের সাথে থাকা আমার পক্ষে আর সম্ভব নয়। আমি তার বাড়ি হতে চলে আসলাম। আসার আগে অনেক অনুরোধ করেছিল। কানে নেই নি। এই মানুষকে বিশ্বাস করা যায় না।

দেশে ফিরে আসি। এসেই আগে একটা ডিভোর্স পেপার রেডি করে সাইন করে এয়ার মেইলে সৌরভের ঠিকানায় পাঠিয়ে দিলাম। দাদা বাড়ি ওখানেই উঠেছি। মা বাবা ওখানেই থাকতো। তারা সব জানতো। আমার দিকে যেন তাকাতে পারছিল না তারা। কিছু বলি নি তাদের। থেকে গেলাম ওই বাড়িতে। কয়েক মাস ছিলাম। তোমার কথা মনে হতো খুব। কেউ একজন খুব কেয়ার করতো আর কেউ একজন মারধর করতো। এটা প্রায় ভাবতাম। কি থেকে কী হয়ে গেল। কিছুই বুঝলাম না।

একদিন তোমাকে দেখতে ইচ্ছা করছিলো খুব। ভাবতাম হয়তো বিয়ে করে ফেলেছ। এতো দিনে তোমার কাছে আসি নি এজন্যই। তবুই দু চোখে একবার দেখার জন্য ছুটে এসেছিলাম এখানে। আমাদের ও বাড়ির কেয়ার টেকারের থেকে জানতে পারি তোমারা এখনো এখানে থাকো। আসার পথে বাজারে নেমেছিলাম আঙুরফল কিনতে। তুমি আবার আঙুরফল খেতে পছন্দ করো কি না। কিন্তু আসার পথ সামনে থেকে অটো হুট করে এসে ধাক্কা মারে। পড়ে গিয়ে মাথায় আঘাত পেয়ে সাথে সাথে জ্ঞান হারাই। তারপর এখানে। ডাক্তার বলেছিলো কোনো একজন লোক এখানে এনেছে। আর রাতে নাকি এখানেই ছিলো। তুমি যে সে ব্যাক্তি বুঝতে পারছি। আসলে উপরওয়ালা দেখা করিয়ে দিলো একে ওপরের।”

তাসনিয়ার চোখ দিয়ে পানি পড়ছে। আমি তাকে পানি দিলাম। সে খেয়ে চোখ মুছে আবার বলল,

— বিয়ে করে ফেলেছো। তবুও দেখতে এলাম রাগ করো না। ভাবলাম তোমাকে দেখে আবার বিদেশ যাবো। এখানে থাকলে বারবার তোমাকে দেখতে মন চাবে। তোমাকে বিরক্ত করবো না আর। বিশ্বাস না হলে এই দেখ টিকিট।

বলেই একটা টিকিট বাড়িয়ে দিলো পাশে রাখা ব্যাগ থেকে। দেখলাম সত্যিই। এতো কিছু ঘটে গেছে ওর জীবনে। এতো আঘাত সহ্য করেছে। আর নয়। আমি টিকিট টা ছিঁড়ে ফেললাম। সে বলে উঠলো,

— কী হলো টিকিট ছিঁড়লে কেন?

আমি তাকে বললাম,

— বিয়ে করবে আমায়?

হে হতবাক হয়ে তাকিয়ে রইলো আমার দিকে। বলল,

— তুমি না বিবাহিত।
— আরে ধুরর, কারো জন্য জন্য রোজ মাঠে দাঁড়িয়ে থাকি সন্ধ্যায়। কেউ আসে না। তাই বিয়ে করা হয় নি।

দেখলাম সে কেঁদে ফেলেছে। বলল,

— তার পরেও ভেবে বলো। আমার বিয়ে হয়ে গিয়েছিল।
— যা হবার হোক। তোমায় একবার হারিয়েছিলাম। দ্বিতীয় বার হারানোর ইচ্ছা বা শখ কোনোটাই নাই।
— এখনো এতো ভালোবাসো আমায়।
— যাকে মনে একবার নেয়া হয়ে যায়, তাকেই যদি না ভালোবাসি তাহলে বাসবো কাকে।
— কিন্তু তোমার বাবা মা।
— ওদের চিন্তা করো না। তুমি বলো বিয়ে করবে আমায়? হবে আমার বাকি জীবনের চলার সঙ্গী?

তাসনিয়া কিছু না বলে হেসে মাথা নাড়ালো। সম্মতির ইঙ্গিত। বেলা শেষ হয়ে আসছে। পাখিরা ডাকাডাকি করে ঘরে ফিরছে। সন্ধ্যা হবার পূর্বাভাস। কথা বলতে বলতে কখন যে সন্ধ্যা হয়েছে খেয়াল করি নি। আরেকটু পরে ডাক্তার আসবে রেগুলার চেকাপ এর জন্যে। শেষ বেলা যেন আমাদের মিলনের অপেক্ষাই করছিলো। আমাদের মিলন না দেখে যাবে না। মিলন হলো অবশেষে বেলাও ফিরে চলতে শুরু করেছে। সব মিলিয়ে এ যেন এক “মিলন বেলা”

গল্পের বিষয়:
অন্যান্য

Share This Post

সর্বাধিক পঠিত