সংশয়

সংশয়

বারান্দায় বসে ইজিচেয়ারটা দুলাচ্ছেন প্রকাশ রায় চৌধুরী৷ দৃষ্টি তার ব্যাস্ত রাস্তার ওপারের ভবনটার পরেও অনেকদূর ছাড়িয়ে গেছে৷

সূর্যটা যেখানে দেখা যায় না৷ সেখানে কেবলই রক্তিম দিগন্ত জানান দেয় যে সূর্যটা ডুবতে বসেছে৷ অনেকটা তার ক্ষয়ে যাওয়া জীবনের মতোই৷
.
বাষট্টি বছর বয়স্ক একজন যুবক আমাদের প্রকাশ রায় চৌধুরী৷ যুবক বলছি কারন এ বয়সে এসেও আজো বিয়ে করেননি তিনি৷

বড় ভাই বিজয় রায় চৌধুরী আর তার স্ত্রীর মৃত্যুর পর একমাত্র ভাইপোর দায়িত্ব এসে পড়ে প্রকাশ বাবুর উপর৷
.
তখন তিনি আটাশ বছরের যুবক৷ সবে ওকালতি শুরু করেছেন৷ তবুও উকিল পাড়ায় তার বেশ নামডাক৷
.
জীবনের সে সব সোনালী অতীত হাতড়ে বেড়ালে যে কেউ বলবে, কোন ব্যর্থাতাই তার নেই৷

তবু প্রকাশ বাবু জানেন একটা শূন্য জায়গা আজো রয়ে গেছে৷

যা আর কখনো পূর্ন হবার নয়৷
.
রাত নটার পর একবার রমা প্রকাশ বাবুর ঘরে আসে৷ এটা তার নিত্য দিনের রুটিন৷ এসে রাতের খাবার খাইয়ে ওষুধ খাইয়ে তবেই সে যাবে৷

এতে তার কখনো ভুল হয় না৷ রমা প্রকাশ বাবুর ভাইপো শেখরের স্ত্রী৷ একদিন হঠাৎ করেই শেখর এসে বললো, কাকু আমি বিয়ে করেছি৷

প্রকাশ বাবু তাকে বড় ভালোবাসতেন৷ তাছাড়া কাকার চাইতে ভালো বন্ধু ছিলেন তার৷ তাই সবটাই মেনে নিলেন৷

আর তাছাড়া মেয়েটার চেহারায় কেমন যেন একটা মায়া ছিলো৷ প্রকাশ বাবু আর না করতেন কিভাবে !

মেয়েটার অল্প বয়সে বাবা মারা গিয়েছিল৷ তাই বোধ করি প্রকাশ বাবুকে নিজের বাবার মতোই যত্নাত্মি করতো৷
.
.
কিন্তু আজ রমা ঘরে ঢুকে কোন কথা বলল না৷ খাবার দিয়ে এক হাতে ওষুধ অন্য হাতে পানি নিয়ে দাঁড়িয়ে রইল৷ প্রকাশ বাবু বললেন,
: কিছু বলবে বৌমা ? রমা মেঝের দিকে তাকিয়ে কি যেন একটা ভাবলো৷ তারপর বললো,
: বাবা, আপনি কি আমাদের কোন আচরনে কষ্ট পেয়েছেন ?
: কি যে বলো বৌমা৷ এমন কিছুই নয়৷
: তবে আজ এতো মন মরা হয়ে বসে রইলেন৷ ফুল গাছটাতেও পানি দিলেন না৷
: ও… সে কিছু নয় বৌমা৷ তুমি একবার শেখরকে পাঠাও তো৷
: ও তো অফিস থেকে ফেরেনি৷ আসলেই পাঠাচ্ছি৷
: আচ্ছা আচ্ছা৷ তুমি যাও বৌমা৷ গিয়ে খেয়ে নাও৷
রমা নিঃশব্দে ঘর থেকে বেরিয়ে গেল৷ প্রকাশ বাবু বিছানায় বসেই একটা সিগারেট ধরালেন৷

লাইট জ্বালিয়ে বিছানার নিচ থেকে অ্যাশ ট্রে টা বের করে আনলেন৷ রমা জানলে খুব রাগ করবে৷ তাই এসব জিনিস লুকিয়ে রাখতে হয়৷
.
.
দশটার কিছুপরে শেখর ঘরে এসে ঢুকলো৷ প্রকাশ বাবু একবার সেদিকে তাকিয়ে নির্লিপ্ত গলায় বললেন, চেয়ারটা টেনে বস, কথা আছে৷
শেখর বসতে বসতে বললো, “তুমি আবার সিগারেট খাচ্ছো ? রমা জানলে আবার কেমন চেঁচামেচি করবে জানো তো ?”
কয়েকটা ধোঁয়ার রিং ছেড়ে প্রকাশ বাবু বললেন,
: তুই তো দেখছি তোর বউকে খুব ভয় পাস৷
: আর তুমি যেনো পাও না ?
এ কথায় প্রকাশ বাবু একগাল হাসলেন৷ একটু থেমে বললেন, আজ নীরুর সাথে দেখা হয়েছিলো৷

শেখর চোখ বড় বড় করে বললো, তোমার ওই কলেজ লাইফের প্রেমিকা ? কাকু ?
প্রকাশ বাবু এবারো হাসলেন তবে এবার তবে এবার আর আগের মতো চেহারায় ভাঁজ পড়লো না৷

বরং কপালের রেখাগুলো আরো গভীরতর হলো৷
শেখর আরো কি যেন বলছিলো৷ কিন্তু তার সেদিকে কান নেই৷

তিনি স্মৃতির ঝাপসা এলবামে হাতড়ে বেড়ান চার দশক আগের ল কলেজের সেই নীরুপমার মুখচ্ছবি৷
সেদিন সেই আম গাছটার নিচে বসেই তিনি বলেছিলেন, “চলো নীরু আমরা পালিয়ে বিয়ে করে নেই৷”
কিন্তু বাবা মার অবাধ্য সে কখনোই হতে পারতো না৷ তাই আনত নয়নে মাথা দুলিয়ে কেবল বলেছিলো, “সেটা সম্ভব নয় প্রকাশ৷ লোকে কি বলবে ?”
অস্থির যুবক সে কথা আশা করেনি৷

চার বছরের প্রেম শেষে যদি প্রিয়ার মুখে এ কথা শুনতে হয় তবে দিনের পর দিন কল্পনায় তীলে তীলে গড়ে তোলা জীবনটার কি হবে ?
.
তারপর কোন এক শুভ লগ্নে নীরুর বিয়ে হয়ে গেলো৷ প্রকাশ বাবু নিজের ক্যারিয়ার গড়তে মন দিলেন৷

ভাইপোর দায়িত্ব এসে পড়াতে তার আর নীরুপমা নামের কাউকে নিয়ে ভাবার সুযোগ হয়নি৷
.
তারপর শেষ তাদের দেখা হয়েছিলো পুরনো কফি হাউজটায়৷ নীরুপমা ততদিনে তার মদ্যপ স্বামীকে ডিভোর্স দিয়ে ফেলেছে৷

সেদিন সেই বিকেলে কোন ভূমিকা না করেই সে অনেক আশা নিয়ে বলেছিলো,
: প্রকাশ, আজ তো কোন বাঁধা নেই৷ তুমি আমাকে বিয়ে করবে ?
প্রকাশ কফিতে চুমুক দিল৷ কিছুক্ষন চুপ থেকে পেশাদার উকিলের মতোই দীর্ঘ বক্তৃতা শেষে প্রকাশ বললো,
: নীরু তোমার সবেমাত্র ডিভোর্স হয়েছে৷ তাছাড়া সমাজে এখন আমার একটা নামডাক আছে৷ এখনই বিয়ে করলে লোকে কি বলবে ?
নীরু সেদিন কিছু না বলেই উঠে গেলো৷ হয়ত এমন কিছু সে আশা করেনি৷
শেষে নাকি ভগ্ন হৃদয় আর একমাত্র কন্যাকে নিয়ে ঢাকার বাইরে শিফট হয়ে গিয়েছিলো৷
.
.
আর তারপর আজ আবার সেই নীরুর সাথে দেখা হলো৷ আজ আর চেহারায় সেই জ্যোতি নেই৷ কেমন যেন বিষন্নতার চাপ৷

সে পার্কে একটা মেয়ের ছবি নিয়ে বসেছিল৷ তার মেয়েটা বাড়ি ছেড়ে চলে গেছে৷ প্রকাশ বাবুকে দেখে সে অবাক হলো৷

কিন্তু তার চাইতেও বেশী অবাক হলেন প্রকাশ বাবু নিজে৷ ছবিটা রমার ছিলো৷ বড়জোর বছর তিনেক আগের৷
নিজে যতটা পারলেন শান্ত থেকে নীরুকে তার দাদার বাসায় পৌছে দিয়ে এলেন৷ আগে শেখর আর রমার সাথে কথা বলা দরকার৷
.
তবে আজও তারা ঘন্টার পর ঘন্টা কথা বললেন৷ কিন্তু কেউই আর বললো না, আর বিয়ে করোনি কেন ?
আর তাছাড়া জীবনের এ সময়ে এসে এসব কথা বলার কোন মানেই হয় না৷
কে জানে, লোকে জানলে কি বলবে ?

গল্পের বিষয়:
অন্যান্য

Share This Post

সর্বাধিক পঠিত