অদ্ভুত ইচ্ছেপূরণ

অদ্ভুত ইচ্ছেপূরণ

অদ্ভুতুড়ে এক কান্ড ঘটেছে সিয়ামের সাথে৷ সিয়াম তার জীবনের অন্য সব ঘটনার মতো এই ঘটনাটাও তার প্রিয় বন্ধু জাহিদকে জানাতে ব্যস্ত হয়ে পড়েছে৷ তাই সকাল সকালই কল করে সিয়াম…..
–হ্যালো জাহিদ
–হ্যাঁ বল?
–শালা তুই এখনো ঘুমাচ্ছিস? আর এইদিকে একটা কাণ্ড ঘটে গেছে।
–কি হইছে রে?
–আরে তোকে ফোনে বলতে পারবোনা, আমার বাড়িতে আয় তাড়াতাড়ি। ও হ্যাঁ, কলেজের প্রিপারেশন নিয়ে আসিস।
–ধুর শালা, হেডলাইন টা তো বল?
–আমার টেবিলের উপর কিছু টাকা পেয়েছি, কচকচে নোটে পাঁচ হাজার টাকা।
–সত্যি? আমি আসছি দাঁড়া।
–আচ্ছা আয়, রাখলাম।
.
সিয়াম বাবা-মায়ের একমাত্র ছেলে ছিলো। তবে এখন বাবা-মা ছাড়াই একমাত্র ছেলে, মানে ওর বাবা-মা কেউই নেই এখন। সিয়ামের বয়স যখন দশ বছর, তখন তার বাবা-মায়ের অতিমাত্রায় ঝগড়ার রূপ টা ডিভোর্সের দিকে সাফল্য পায় এবং সিয়ামকে তার বাবার কাছে রেখেই চলে যায় তার মা। তারপর আর কখনো দেখা তো দূরের কথা, কোনো খোজও পায়নি মায়ের। অতঃপর মা বিহীন কষ্টে দাদি, বাবা আর জাহিদ নামের এক বন্ধুকে নিয়েই তার
পৃথিবী চলতে থাকে। জাহিদের সাথে বন্ধুত্ব প্রায় দশ বছরের, একসাথেই পড়ে ক্লাস ফাইভ থেকেই। গত দুই মাস আগে একটা দুর্ঘটনায় তার বাবাও তাকে ছেড়ে চলে যায়। জাহিদই আগলে রাখে সিয়ামকে, এমনকি যেকোনো কথা কিংবা কাজে সাহস যোগায় জাহিদ।
.
–কিরে সিয়াম, ফোনে যেনো কি টাকার কথা বলছিলি?
–আরে সকালে ঘুম থেকে উঠেই দেখি কচকচে এই এক হাজার টাকার পাঁচটা নোট একসাথে টেবিলের উপরে।
–সত্যি? কে রেখেছে রে?
–সেটাই তো জানিনা, দাদিকে জিজ্ঞেস
করলাম, সেও কিছু জানেনা।
–তাহলে তোরই টাকা, আগে থেকেই
ছিলো, কিন্তু তুই দেখিসনি।
–যাহ্ শালা, টেবিলের উপরে এইভাবে টাকা থাকলে তো দেখতামই।
–তাহলে অন্য কোথাও ছিলো, বাতাসে উড়ে
এসে পড়েছে টেবিলে।
–সেটা কি করে হয়?
–আরে হয় হয়, তুই বলছিলি না তোর টাকা খুব দরকার, তাই হয়তো আল্লাহ তোর দিকে মুখ তুলে তাকাইছে।
–আল্লাহই ভালো জানে। আচ্ছা চল যাই।
.
কলেজে জাহিদ, সিয়াম ও আরো কিছু বন্ধু একসাথে আড্ডা দিচ্ছিলো। হঠাত্ তৃষাকে দেখে প্রতিদিনের মতো আজও থমকে যায় সিয়ামের চোখ। জাহিদ ব্যাপার টা জানে এবং বলেও দিয়েছিলো, কিন্তু তৃষাই ফিরিয়ে দেয়। তারপর থেকেই তৃষাকে এইভাবেই দেখে যায় সিয়াম। এইভাবেই চলতে থাকে। তিনদিন পর সকালে সিয়াম জাহিদকে ফোন করে…….
–দোস্তো, তোকে কালকে বলছিলাম না আমার একটা এন্ড্রয়েড ফোন হলে ভালো হতো?
–হ্যাঁ, তোহ?
–আরে সকালে ঘুম থেকে উঠে একটা সিম্ফনি এন্ড্রয়েড ফোন পেলাম বালিশের পাশে।
–বলছিস কি? দাঁড়া, আসতেছি।
.
–কই, ফোন কই?
–এইযে এই ফোনটা।
–বাহ, সুন্দর তো! আমাকে দিয়ে দে না প্লিজ।
–ধুর শালা, এখনো জানিইনা ফোনটা কার। এইখানে কিভাবে এলো?
–আরে তোর দাদি অথবা ফুফুরা তোকে গিফট
করে সারপ্রাইজ দিয়ে মজা নিচ্ছে।
–দাদি তো বললো কিছুই জানেনা। তাহলে?
–নয়তো তোকে আল্লাহই রহম করেছে।
–আমার কেমন জানি ভয় করছে দোস্তো।
–ধুর ব্যাটা, যদি গাইবি ভাবেও আসে তাহলে তোর ক্ষতি নয়, পূর্ণ করতেই আসছে।
–দোস্তো তাহলে ফোনটা তুই ইউজ কর।
–আরে গাধা, ধর ফোনটা কেউ তোর আড়ালেই তোকে সারপ্রাইজ গিফট দিলো। এখন আমি ইউজ করলে সমস্যা না?
–হুম, তা অবশ্য ঠিক।
–আচ্ছা শুন, ফোনটা ব্যবহার করতে থাক।
–ওকে।
.
সিয়াম ব্যাপার টা নিয়ে ভাবতে থাকে। কি হচ্ছে তার সাথে, যা দরকার তাই সে পাচ্ছে। এইভাবেই কয়েকদিন চলে যায়। একদিন সকালে আবারো সিয়ামের ফোন…..
–জাহিদ একটু আমার বাড়িতে আয় তো তাড়াতাড়ি।
–কেনোরে?
–আরে আয় তো আগে।
–ওকে, আসছি।
.
–কিরে, ডাকছিস কেনো?
–দোস্তো আমি তো পাগল হয়ে যাবো!
–কি উল্টাপাল্টা বকছিস? কি হইছে তোর?
–এই শপিং গুলো দেখ। কি হচ্ছে এইসব আমার সাথে?
–ওরে শালা, এতো শপিং কে দিলো রে? দোস্তো এই ব্ল্যাক টি-শার্ট টা আমার খুব পছন্দ হইছে, দিয়ে দে না প্লিজ।
–এই শপিং গুলো কে দিলো, কোত্থেকে আসলো, সেটাই জানিনা এখনো।
–তার মানে ফোন আর টাকার মতো এগুলোও এখানে কেউ রেখে গেছে?
–হ্যাঁ, কিন্তু কে রাখতেছে সেটাই বুঝতে পারছিনা।
–তুই তো কালকে আমাকে বলেছিস যে তোর কিছু জামা-কাপড় দরকার। তার মানে তোর যা দরকার, তাই পাচ্ছিস।
–হ্যাঁ, কিন্তু কে দিচ্ছে?
–তুই মনে হয় অলৌকিক কোনো শক্তি পেয়েছিস, আলাদীনের প্রদীপ এর মতো কিছু একটা। শালা তোর ভাগ্য টা সবসময়ই খুব ভালো, আর আমিই কিছু পাইনা।
–কি বলছিস এইসব?
–হ্যাঁ, এই কথাগুলো খুব বেশি মানুষ কে বলা উচিত হবেনা৷
–আমার মাথায় কিছু ঢুকছে না রে। খুব ভয় করছে।
–ধুর শালা, ভয়ের কি আছে? তোর তো ক্ষতি করছেনা, ইচ্ছে পূরণ করছে৷
.
সিয়াম জানেনা তার সাথে কি হচ্ছে। জাহিদও বুঝতে পারছেনা কি করবে, সিয়ামকে কোনোমতে শান্তনা দিয়ে যাচ্ছে। বেশ কিছুদিন কেটে যায় এইভাবেই। তারপর আবার একদিন সকালে……
–জাহিদ, কলেজ যাবিনা?
–হ্যাঁ, রেডি হয়ে আসছি।
–ওকে, তাড়াতাড়ি আয়, কথা আছে।
.
–চল যাই। লেট করলে দেরি হয়ে যাবে।
–গিটার টা কেমন রে?
–ওয়াও, অসাম। কে দিলো রে? তোর আলাদীন মামা?
–মনে হয়। কিন্তু তোর কাছে প্রকাশ করলেই শুধু পাই রে।
–মানে?
–যতোবার তোর কাছে বলছি যে আমার এটা-ওটা দরকার, তখনই পাচ্ছি।
–হয়তো আমাকে বলার পরই ও জানতে পারে।
–তাই নাহ?
–হুম, আচ্ছা চল যাই।
.
কলেজে আজও আড্ডা দিচ্ছে জাহিদ, সিয়াম এবং কয়েকটা ক্লোজ ফ্রেন্ড। সিয়াম অলরেডি তার অলৌকিক ঘটনাগুলো সবাইকে জানিয়ে দিয়েছে। তখন সবাই বুদ্ধি দিলো, তৃষাকে চাইতে পারিস তো। সিয়াম বললো….
–ঠিক বলেছিস, জাহিদ আমার তৃষাকেই চাই।
–তোর তৃষা যেই ঘাড়ত্যাড়া, আলাদীন মামাও তাকে ম্যানেজ করতে পারবে কিনা কে জানে।
–আচ্ছা দেখ আগে কি হয়।
–ওকে।
.
পরদিন সকালে সিয়াম জাহিদ কে কল করে…..
–কিরে জাহিদ, সত্যিই তো তৃষাকে ম্যানেজ করতে পারেনি আলাদীন মামা।
–ক্যামনে বুঝলি?
–আমার বেডরুমের কোথাও তো তৃষাকে পেলামনা।
–হাহাহা, তোর মামাও তৃষার কাছে ব্যর্থ। আর তাছাড়া তৃষা কি কোনো বস্তু নাকি যে তোর বেডরুমে থাকবে?
–হুম, আচ্ছা বাদ দে! এটা হবেনা জানি।
–ওকে, রাখ।
.
রাত নয়টার দিকে একটা অপরিচিত নাম্বার থেকে কল আসে সিয়ামের ফোনে…..
–হ্যালো, কে বলছেন?
–আমি তৃষা, তুমি যাকে খুব ভালবাসো।
–দাঁড়াও আমি একটু পর কল ব্যাক করছি।
.
তৃষার কলটা কেটে জাহিদকে ব্যাপারটা জানায় সিয়াম। তারপর জাহিদ আর সিয়াম দুইজনই খুব খুশি। ভালোই চলতে লাগলো সিয়াম তৃষার প্রেম। কিন্তু হঠাতই সিয়ামের জানতে ইচ্ছে হলো তৃষাকে ওর আলাদীন মামা কিভাবে কনভিন্স করেছে। তৃষা বলতে চাইছিলোনা ব্যাপারটা। সিয়ামের অনেক অনুরোধের কারণে তৃষা বলতে বাধ্য হয়……
–সেদিন জাহিদ আমাকে খুব অনুরোধ করে বলেছিলো, তুমি নাকি আমাকে খুব ভালবাসো। আমাকে ছাড়া বাঁচবেনা। আমি নাকি তোমাকে পেলে অনেক হ্যাপি হবো। ইত্যাদি……
–তাহলে আমাকে কেনো বলোনি?
–কারণ জাহিদ আমাকে নিষেধ করেছিলো। সত্যি তুমি অনেক ভালো একটা বন্ধু পেয়েছো।
–ওহ, আচ্ছা আমি তোমাকে পরে কল দিবো। রাখি……
.
তার মানে জাহিদ এইসব করছে আমার সাথে? না না, এটাতো অলৌকিক, জাহিদ কি করে হয়? কিন্তু তৃষাকে কেনো জাহিদ ঐসব বললো? মনে হয় জাহিদের রূপ নিয়ে হয়তো এমনটা করেছে। এসব ভাবতে ভাবতেই সিয়াম জাহিদকে কল করে…….
–জাহিদ, তুই তো জানিস আমার কাছে টাকা নেই। কিন্তু কালকে নাকি তৃষার বার্থডে, একটা কিছু তো গিফট করতেই হয়।
–হুম, তোর আলাদীন মামা তো আছেই…..
.
কিছুটা পরীক্ষার জন্য এই প্ল্যান সিয়ামের। সারারাত জেগে বসে আছে, দেখবে কে দিচ্ছে এইসব। হঠাত শব্দ শুনতে পেলো কেউ তার জানালাটা খুলছে। কিছুটা ভয় পেলেও অনেকটা কৌতুহলী। জানালা খুলতেই কাউকে দেখলো, কিন্তু মুখটা অস্পষ্ট। তাই ইচ্ছে করেই ওর হাতে আঘাত করে এবং বুঝতে চেষ্টা করে সে মানুষ নাকি অন্য কিছু।
.
সকালে জাহিদকে সবকিছু জানায় এবং কথা বলতে বলতে কলেজ যাত্রা শুরু। কলেজে আড্ডার ফাঁকে সিয়াম বলতে শুরু করে…….
–নিজেকে কি ভাবিস তুই জাহিদ? মহামানব? আমাকে বোকা বানিয়ে খুব মজা তোর?
–মানে?
–মানে আমার সাথে অলৌকিক কিছু হয়নি। আমার কোনো আলাদীন মামা নেই। এইসব কিছু তুই করেছিস।
–কি বলছিস এইসব?
–তোর হাতের কনুইয়ের ব্যথা টা কালকে রাতে আমিই দিছি। তৃষাকেও তুই ম্যানেজ করেছিলি। এমনকি সবই করেছিস তুই।
–আরে নাহ, কে বললো এইসব ফাউল কথা?
–আরে শুন, সত্য কখনো চাপা থাকেনা। আমার সাথে এমনটা কেনো করলি তুই?
–আমি কই কি করলাম?
–আর নাটক না করে স্ট্রেইট উত্তর দে, নয়তো….
–আসলে তুই তো আমার কাছ থেকে কিছু
নেসনা, নিজেকে ছোট মনে হয় তোর। তাই…….
–চুপ, আর একটা কথাও বলবিনা তুই। আমি এতিম, আমার বাবা-মা নেই, তাই বলে কোনো ব্যক্তিত্বও কি নেই?
–আমি তোকে কোনো ব্যক্তি মনে করে
এইসব করিনি, বন্ধু ভেবেই করেছি। তাছাড়া
ছোটবেলা থেকেই চাইতাম আমি তোর চাইতে
তোকে বেশি ভালবাসবো, আর সেটা কাউকে
জানিয়ে নয়।
.
ততক্ষণে দুজনই চোখের অশ্রু ফলাতে শুরু করেছে দুই প্রান্তে৷ হঠাত্ই সিয়াম বিদ্যুত গতিতে এসে জাহিদকে জড়িয়ে ধরে উচ্চশব্দে কান্না শুরু করলো এবং বলতে লাগলো……
–আমি এতিম, মা নেই, বাবা নেই। কিন্তু তবুও আমি ধনী, তোর মতো একটা বন্ধু আমার আছে। তুই বলেছিলি না আমার ভাগ্য অনেক ভালো, শুধু আমার ভাগ্যেই আলাদীনের প্রদীপ আছে! হ্যাঁ, সত্যিই আমার ভাগ্যটা অনেক ভালো। আমার জাহিদ নামে একটা বন্ধু আছে, যে আলাদীনের প্রদীপের চেয়েও অনেক বেশি অলৌকিক কার্যকর। আমার বাবা-মা নেই, তাই আমি মহাদুখী। কিন্তু একটা বন্ধু আছে দুঃখগুলো মুছতে চেষ্টা করার। আমি সত্যিই
মহাভাগ্যবান………।

গল্পের বিষয়:
ভালবাসা

Share This Post

সর্বাধিক পঠিত