বসন্তের আবীর

বসন্তের আবীর

রাত বাড়ছে , ঘুমহীন রাত যেন কাটতেই চায় নাহ্ । তারপর আবার হাতে কি যেন কামড় দিচ্ছে প্রতিনিয়ত । সোভার বিরক্তির সীমা বেড়েই চলছে , সোভা বিছানা ছেড়ে জানালার পাশে দাঁড়ালো । হাল্কা বাতাসে শিউরে উঠল সে । ভালোই শীত পড়েছে কিন্তু তার জানালার ধারে দাঁড়িয়ে মৃদুমন্দ বাতাস গায়ে মাখতে ভালোই লাগছে ।সোভা ভাবছে আর মনে মনে বকছে …আবীর সাহেবের বাসাটাই যেন কেমন মনমরা হয়ে আছে । কেমন যেন স্থির … আমাদের বাসায় কি সুন্দর হরদম হৈ হুল্লোড় লেগেই থাকে , হোক তা দিন অথবা রাত ! হঠাৎ সোভার মনে পড়ে এখন নাকি এই মনমরা বাড়িটাই সোভার বাসা । হ্যাঁ আজ তিনদিন হলো সোভার বিয়ের । পাত্র হলো আবীর
সাহেব , যাকে সোভা বিয়ের রাতে দেখেছে । পরদিন অফিসের কাজে শহর ছেড়ে সমুদ্রে পাড়ি জমিয়েছে সে ।আবীর সাহেব নৌ অফিসার। সোভার কোন কথা হয়নি সাহেবের সাথে সেদিন । যাবার দিন কেবল বিদায় জানিয়ে গেছে লোকটা । সোভার কোন ক্ষোভ নেই তাতে , কারণ সোভা ক্ষোভ করতে ভুলে গেছে ।। সোভার জন্ম যশোর শহরে । বেড়ে ওঠাও সেখানেই ।স্কুল – কলেজে দুষ্টমীতে মেতে থাকা সোভা আজ অনেকটাই বোবা । সময় মানুষ কে বদলে দেয় , সোভাকেও দিয়েছে । এইতো সেদিন সোভা ঘুড়ে বেড়াত শহরের আনাচে কানাচে । আর সঙ্গ দিতো নিশীথ …. যাকে সোভা নিজের থেকেও বেশী ভালো বাসে ! নিশীথ ছিলো সোভার প্রথম প্রেম , হয়তো শেষও !! নিশীথের সাথে তার পরিচয় স্কুল থেকে .. স্কুলের কালচারাল প্রোগ্রামে নিশীথ গান গাইতে এসেছিলো….. অসম্ভব সুন্দর ছিলো ছেলেটার গলা
.. ঐ দিন প্রোগ্রাম শেষে সোভা স্কুল গেটে দাঁড়িয়ে আড্ডায় মেতেছিলো । হঠাৎ চোখ পড়ে গিটার হাতে নিশীথ এর দিকে , নিশীথ বেড়িয়ে যাচ্ছে স্কুল গেট দিয়ে । গন্তব্য বোধহয় গেইট পেড়িয়ে মেইন রাস্তার দিকে .. সোভার মাথায় কি চলছে সোভা বুঝতে পারছিলোনা । আচমকা সে এক দৌড় দিয়ে নিশীথ এর সামনে যেয়ে দাড়ায় । নিশীথ হয়ত অপ্রস্তুত ছিলো এমন কিছুর জন্য , সোভা চট করে বলে ফেললো .. ‘ একটা অটোগ্রাফ পাওয়া যাবে কি ‘ নিশীথ অবাক হয়ে তাকিয়ে একটু মুচকি হাসার চেষ্টা করে । সোভার কিন্তু আজও মনে পড়ে সে হাসির কথা !! সোভার ভাষায় মারাত্মক সুন্দর ছিলো সে হাসি । নিশীথ বলে উঠে আমি অটোগ্রাফ দেওয়ার মত ওমন কেউ হয়ে উঠিনি এখনও ।ঠাট্টা করছো নাতো ?? প্রশ্ন করে নিশীথ ! সোভা কি বলবে বুঝতে পারে নাহ্ । সোভা কোন উত্তর না দিয়ে দৌড়ে ফিরে যায় । নিশীথ এবার অবাক চোখে তার ফিরে যাওয়া দেখছিলো

কিছুদিন পর নিশীথ কে আবার দেখে সোভা , সোভাদের স্কুলে মেয়েদের আর ছেলেদের শিফট আলাদা ছিলো । সোভাদের ছুটির পর ছেলেদের শিফট শুরু হতো ।সেদিন ছুটির পর নিশীথ কে দেখে স্কুল ইউনিফর্মে দাড়িয়ে , সোভা পাশ কেটে হেঁটে চলে যায় … এরপর স্কুল এ আর কোনোদিন তাদের দেখা হয়নি । সোভা স্কুল পেড়িয়ে তখন কলেজে , বিকেলে বাসা থেকে বের হয় কোচিং এ যাবার জন্য । রিকশার জন্য অপেক্ষা করছিলো সে , একটি রিকশা তখন পাশ কেটে যায় তার । সোভা যখনই ডাকতে গেলো চোখ পড়ল রিকশায় মানুষ রয়েছে । সোভা পিছন ফিরতে যেয়ে দেখে একটি খাম আর সাথে কিছু ছবি নিচে পড়ে আছে । সোভা খাম টা তোলার জন্য নিচু হতেই যেন ঝাটকা খেলো , এতো তার ছবি.! এতো ছবি কোথা থেকে এলো তাও আবার রাস্তার ধারে । ভাবতে ভাবতে খাম খোলে সোভা , রিকশা নিয়ে অপেক্ষা করছি রাস্তার ওপারে চলে এসো সব বলবো … নিশীথ (অটোগ্রাফ ওয়ালা ) শেষের শব্দ দুটো যেন সোভার হাসি ফোটানোর জন্যই লেখা ছিলো । সোভা রাস্তা পার হয়ে দাঁড়ানো রিকশার সামনে যায় নিশীথ আজ মুচকি হাসিতে নয় পুরো হাসিতে সোভাকে বলে .. অটোগ্রাফ দেওয়ার যোগ্য না থাকুক বন্ধু হওয়ার যোগ্যতা কিন্তু আছে । তারপর থেকে শুরু হয় সোভা আর নিশীথ এর বন্ধুত্বের নতুন পথচলা । সেই বন্ধুত্ব কবে যে প্রেম এর রুপ ধারণ করে তা হয়তো সোভার জানা ছিলোনা , তবে নিশীথ খুব ভালো করেই বুঝতো সেই প্রেম !! নিশীথ বলতো সবসময় তুইতো বউ ,নিশীথের বন্ধু বউ !! শুনেই অট্টহাসিতে মেতে পড়তো সোভা । সেই হাসির শব্দ যেন পুরো ইউনিভার্সিটি তে ছড়িয়ে পড়তো । আজ সে হাসি ভুলে গেছে সোভা …. আজ একা একা অন্যের বাড়িতে সব কথা বারবার মনে পড়ছে সোভার … সোভা ভাবছে আর খুব অনুভব করছে সেই সময় টাকে কিন্তু সময় তো বদলে যায় । কাছের মানুষ গুলো সবসময় থাকে নাহ্ ,সোভাদের মতো সোভাদেরকে আগলে রাখার জন্য । সোভা খেয়াল করল তার চোখ থেকে পানি ঝড়ছে । সোভা জানালা বন্ধ করে বিছানায় পা এলিয়ে বসে , পিছন দিকে অর্ধশায়িত হয়ে আলতো করে চোখ বন্ধ করে থাকে । তার
ভাবনায় ফিরে আসে নিশীথ … ইউনিভার্সিটির প্রতিটি প্রোগ্রামে গান গাইছে নিশীথ। সোভাও আছে নিশীথের সাথে । মুগ্ধ হয়ে শুনছে সে নিশীথের গান । বসন্তবরণ
উৎসবে নিশীথ সোভাকে অটোগ্রাফ দেয় , জীবনের প্রথম অটোগ্রাফ আর তার সাক্ষী ছিলো সারা ক্যাম্পাস । সেদিন সোভাও বুঝে ফেলে এতো শুধু বন্ধুত্ব নয় । মনে মনে স্থির করে সোভা ১৪ই ফেব্রুয়ারিতেই জানিয়ে দেবে নিশীথকে তার ভালবাসার কথা । সেদিন সকালে নিশীথকে সকাল সকাল ক্যাম্পাসে আসতে বলে সোভা । সোভাও বেড়িয়ে পড়ে তার বাসা থেকে ।সোভা পৌঁছে দেখে তখনও পৌঁছেনি নিশীথ । রাস্তার ধারে বসেই অপেক্ষা করছে সোভা । রাস্তা ক্রস করে সোভার কাছে আসছে নিশীথ ,সাথে আছে সোভার দেওয়া গীটার । সোভা হাসি মুখে তাকিয়ে নিশীথের মুখেও হাসি । হঠাৎ সে হাসিমাখা মুখের একটি ম্লান হয়ে তাকিয়ে থাকে আরেকটি মুখ যেন নিস্তেজ হয়ে পড়ে গেল রাস্তায় ।  সোভা ছুটে যায় বাড়তে থাকা ভিড়ের মাঝে আর জড়িয়ে ধরে নিশীথকে কিন্তু সোভা কিছু বলছে নাহ্ । নিশীথ হাত বাড়িয়ে গীটারের দিকে ইশারা করছে ভিড়ে থাকা একজন গীটারটা দিতে দিতে হসপিটালে নেওয়ার কথা বলে , ইশারায় না করে নিশীথ । নিজেকে সোভার কাছে সমর্পণ করে দিয়ে গীটারটা হাতে নিয়ে পরপারে যায় সোভার বন্ধু নিশীথ। সোভা অনেক কেঁদেছে তারপরে কিন্তু কেউ নিশীথকে ফিরিয়ে দেয়নি । এখনো পানি ঝড়ছে সোভার চোখ থেকে । সোভা চোখ খুলে তাকিয়ে দেখে ভোর হয়ে গেছে । বিকেলে বেলকনিতে হাটাহাটি করছে সোভা আর ছাদভর্তি ফুল গাছের সৌন্দর্য দেখছে সে । এমন সময় সোভার মোবাইলফোন বেজে উঠে । রিসিভ করে সোভা , ওপাশ থেকে কেউ বলছে কোথায় তুমি ? আমি ফিরে এসেছিতো ।। সোভা এক মুহূর্তের জন্য ভাবে নিশীথ নয়তো!! পরক্ষণেই নিজেকে সামলে ঘরে ফিরে যায় । সোভা দেখে আবীর সাহেব এসেছেন । বুঝতে পারে আবীর সাহেব ফোন করেছেন , মৃদু হেসে একপাশে বসে থাকে সোভা ! আবীর সাহেব পাশে এসে বসে সোভার । সোভা একটু নড়ে বসে । আবীর সাহেব হাসতে থাকে ..কেমন জানি অদ্ভুত লাগে সে হাসি সোভার কাছে !! আবীর সাহেব উঠে একটি গিফট বক্স সোভার দিক এগিয়ে দেয় । কিছু বলতে যেয়েও আবীর সাহেব কিছু না বলেই ওয়াসরুমে ঢুকে পড়ে । সোভা বক্সটি খুলে … বক্স ভর্তি নীল রেশমী চুড়ি এনেছেন আবীর সাহেব । না চাইতেও সোভার মুখে আনন্দের হাসি । আবীর সাহেব দূর থেকেই দাড়িয়ে দেখছেন । সোভা আবীর সাহেবকে দেখে উঠতে চাইলেই থামিয়ে দেন আবীর সাহেব .. কিছু কথা বলবো তোমাকে । আমি নিশীথকে দেখিনি কিন্তু আমি নিশীথ কে অনুভব করেছি । সোভা অবাক চোখে তাকায় । আবীর মৃদু হেসে বলে .. তোমার মামা আমাকে সব বলেছেন । আমি কথাগুলো শোনার পর ভেবেছি তখন তোমার সাথে কথা বলি কিন্তু মনে হল সময় তো শেষ হয়ে যায়নি । তখন বললে হয়তো আজকে এই সময়টা থাকতো নাহ আমার কাছে । আমি জানি তুমি সেদিন যা ফিল করেছো তা আমি ফিল করতে পারিনি , ভালো গান গাইতে জানি নাহ, তোমার বন্ধুও নই আমি । তবে আমি সত্যিই নিশীথ এর মত করে ভাবার চেষ্টা করছি । প্রমাণ হলো তোমার জন্য কেনা ঐ রেশমী চুড়ি গুলো । আমি পারতাম দামী উপহার আনতে কিন্তু ভেবেছি এমন কিছু দেবো যাতে সোভা নিশীথ এর ভাবনাটাকে ফিরে পায় । আমি কখনও তোমার নিশীথ হতে চাবো নাহ সোভা, তবে নিশীথের মত ভেবে তোমার হাসি দেখতে চাইবো । খুব ভালো বন্ধু না হই , খুব ভালো সঙ্গ দিবো তোমাকে । তুমি আমার মাঝে নিশীথকে খুঁজো দেখবে পেয়ে গেছো । আচ্ছা আমাকে একটা গীটার কিনে দিবে ? শিখার       চেষ্টা করতে সমস্যা কোথায় । সোভা এবার আবীরকে জড়িয়ে ধরে ডুকড়ে কাঁদতে লাগলো…….. আবীর সোভাকে বলে চলো ছাদে যেয়ে বসন্তবরণ করি । এভাবেই শুরু হলো ,এক নতুন
বন্ধুত্বের । এবারের শুরুটা হয়তো বন্ধু বউ-এর নয় । এবারের শুরুটা বউ বন্ধুর ।

……………………………………সমাপ্ত…………………………………

গল্পের বিষয়:
ভালবাসা

Share This Post

আরও গল্প

সর্বাধিক পঠিত