মৃন্ময়ী সেঝুঁথি

মৃন্ময়ী সেঝুঁথি

আজ প্রায় ছ’মাস পর হটাৎ করে সেঝুঁথির কল।খুব জরুরি ভাবে সে ডেকেছে আমায় সন্ধ্যার আগেই যেতে হবে।আজকাল নিজের সংসার,চাকরি নিয়ে ব্যাস্ততার জন্য তেমন করে তার খোঁজ নিতে পারিনা।হটাৎ ফোনটা পেয়ে খু্ব খারাপ লাগতে শুরু করলো।অন্তঃসত্বা জেনেও আমি একটিবার সেঝুঁথির খবর নিই নি স্বার্থপরের মতো।আজ সে হাসপাতালে ভর্তি হতে যাবে,অবস্থা নাকি খুবই খারাপ।আমি আর সেঝুঁথি ক্লাস সিক্স থেকে একে অপরের খুব ভাল বন্ধু ছিলাম।একসাথে প্রাইভেট পড়তাম,স্কুলে যেতাম।পাশের গ্রামের হরিদাস কাকুর একমাত্র মেয়ে হলো সে।মা নেই,বাবার খুব আদুরে চোখের মনি।আমি ওকে ঝুঁথি বলেই ডাকতাম।খুব সহজ-সরল মেয়ে ছিল ও। প্রায়ই বলে উঠতো — কামরুল তোমাদের ঈদে খুব আনন্দ হয় তাই না?ঠিক আমাদের পুঁজোর মতো।

ইস,যদি আমরা একই ধর্মের হতাম একসাথে খুব মজা করে ঈদ,পুজো করতে পারতাম। আরে বোকা,আমরা ধর্ম আলাদা বলেই তো এখন বেশী আনন্দ করতে পারি।তোমাদের পুঁজোতে আমি যেতে পারি।আমাদের ঈদেও তুমি। আমার দেখা পৃথিবীর সবচেয়ে ভাল
মানুষগুলোর মধ্যে ঝুঁথি একজন।ঠিক একইভাবে এখন পৃথিবীর সবচেয়ে দুঃখী মানুষগুলোর মধ্যেও সে একজন।পোড়া কপাল। হাইয়ার সেকেন্ডারি দেবার পর হরিদাস কাকু খুব ঘটা করে মেয়ের বিয়ে দেন,একজন ব্যাবসায়ী দেখে।প্রচুর পয়সা ঝুঁথির স্বামীর।কিন্তু তাদের মনের যথেষ্ট অভাব ছিল।আর কথায় বলেনা-মন না থাকলে মানুষ হওয়া যায় না।ঠিক ঝুঁথির হাজবেন্ড ছিল একটা অমানুষ।

প্রচুর মারধর করতো তবুও সে সংসারটা টিকিয়ে রাখার চেষ্ঠা করেছিল।সব অত্যাচারে সহ্য করে শ্বশুরালয়ে থেকেছে। কিন্তু একদিন হটাৎ ওর স্বামী ঘরে নতুন বউ নিয়ে আসে! তখন দু’মাসের অন্তঃসত্বা সে।শেষমুহূর্তে অত্যাচার সহ্য করতে না পেরে এই অবস্থায় বাবার বাড়ি চলে আসে।স্বামীর সাথে ডিভোর্স হয়ে যায় পাষন্ড একবার অনাগত সন্তানটির কথাও ভাবেনি।মানুষ কতো সহজভাবে একটা সংসার ভেঙে দিতে পারে!সেই থেকে বাবার বাড়ি আছে মা হীন গৃহে,বৃদ্ধ বাবার সাথে।এই অবস্থায় কে কার কতোটুকু যত্ন নিতে পেরেছে আল্লাহই জানে।

ঝুঁথিদের বাড়ি পৌছেগেলাম কিছুক্ষনের মধ্যেই।হরিদাস কাকু বারান্দায় বসে মেয়ের জন্য কাঁদছেন।অবস্থা খুবই খারাপ ওর মহিলারা বলাবলি করছেন।ঝুঁথিকে এক পলক দেখে আমি সোজা একটা ভ্যান নিয়ে আসলাম।ওকে ভ্যানে উঠানো হলো,কপালে ঘাম চিকচিক করছে।চোখের নিচে কালি পড়ে গেছে।কি অবস্থা হয়েছে ওর!একদমই যত্ন নেয় নি শরীরের।ঝুঁথির কথা বলতে খুব কষ্ট হচ্ছে তবুও বললো, – কামরুল তুমি আমার সাথে একটু হাসপাতালে আসবে? আমি যেনো লজ্বায় পড়ে গেলাম।আজ সে না বললেও তার সাথে হাসপাতালে যেতাম আমি।চোখদু’টো যেন অসহায়ের মতো আমার দিকে তাকিয়ে আছে,কি প্রতুউত্তর দেব সেটা জানতে।
-যাচ্ছিই তো।
-তোমার জন্যে একটা জিনিস
রেখেছি,আমার পুরোনো বইয়ের আলমারিতে।যাও নিয়ে এসো।
আমি সোজা ওর রুমে চলে গেলাম।বইয়ের আলমারিটা কোথায় খুব ভালো করেই
জানা আমার।আশ্চর্য!আলমারিতে কোন বই নেই শুধু ভাঁজ করা একটুকরো কাগজ ছাড়া।খুব ভালো করে খুঁজে কাগটুকুই পকেটে রাখলাম।পরে দেখা যাবে।
আমি,ঝুঁথির পরিচিত একজন মাসি ওকে নিয়ে হাসপাতালে চললাম।
ঝুঁথি এখন আর কথা বলতে পারছেনা।চোখ দিয়ে শুধু জল বেরুচ্ছে।এই মুহূর্তে ওর মায়ের খুব দরকার ছিলো!আমার বার বার মনে হচ্ছে।
ডক্টর ওকে দেখেই জরুরী বিভাগে নিয়ে গেলেন।দোয়া করতে লাগলাম অভাগীর
জন্য।হটাৎ কাগজের টুকরোটার কথা মনে হলো।পকেটে হাত দিয়ে দেখি নেই!পাগলের মতো খুঁজতে লাগলাম প্রবেশ পথের এক কোণে পরে আছে দেখলাম।তুলে নিয়ে আসলাম।আমার তখনো ধারনা হয়নি কাগজে কি লিখা থাকতে পারে।
কাগজটা মেলতেই দেখি প্রায় তিনমাস আগের লিখা,সেঝুঁথির হাতের ভাসা ভাসা
অক্ষর।চির পরিচিত। পড়তে শুরো করি-
৬/৮/২০১৫
রঞ্জনের সাথে আমার কখনোই ভাল সম্পর্ক হয়ে উঠেনি।আমার স্বামী রঞ্জন কখনোই আমাকে ভালবেসে গ্রহন করে নি।অন্য একটা মেয়ের সাথে সম্পর্ক ছিলো তার। পরিবারের চাপে পরে বিয়ে করে আমায়।আমার গর্ভের সন্তান কি রকম দুর্ভাগ্য নিয়ে পৃথিবীতে জন্ম নিতে যাচ্ছে সেটা আমি ছাড়া আর কেউই জানে না।কারণ তার বাবার পরিচয় থাকবে না।নিয়তি বোধহয় এমনই হয় মানুষের ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র চাওয়াগুলোও মাাঝেমধ্যে পূর্ণ হয় না।রঞ্জন আমাকে প্রচুর মারধর করতো চলে আসার জন্য,আমি কোথায় যাবো?মা নেই পৃথিবীতে।বৃদ্ধ বাবার কাছে?তখন বার বার মনে হয়েছিল পৃথিবীতে আমার মতো অসহায় আর কেউ নেই।কামরুল আমার খুব ভালো একজন বন্ধু।সে মুসলমান।একটা সময় ইচ্ছে হতো
কামরুলের কাছে ছুটে যাই।সে আমাকে পথে ঠেলে দিবে না আপাদত।কিন্তু না তার স্ত্রী আছে।লতা ভাবী কি ভাববে?লতাকে ভালবেসে বিয়ে করেছে সে।কামরুলকে খুব ভাললাগত আমার।ভালওবাসতাম অনেকটা কিন্তু কখনোই তাকে বুঝতে দিইনি।আমরা দু’জন দু’ধর্মের।তাছাড়া সে ভালবাসি জানতে পারলে কি ভাববে আমায়?ছিঃ!সে তো আমায় খুব ভালো বন্ধু ভাবে শুধু। কামরুলের সবকিছুই ভালো লাগতো আমার। বিশেষ করে “ঝুঁথি” ডাক টা।প্রথম যেদিন শুনেছি লতাকে সে খুব পছন্দ করে,আমার ভেতরে কেমন যেন একটা চাপা
কান্না আসছিল।আমি বুঝতে দিই নি।বাড়ি এসে প্রচুর কেঁদেছি।বাবা বার বার
জিজ্ঞেস করেছিলেন কেন কাঁদছি? মাথাব্যাথা বলে বুঝিয়ে দিয়েছিলাম।
কামরুলের সাথে লতাকে দেখলে আমার একটুও সহ্য হতো না।খুব কষ্ট হতো।এটাও বু্ঝতে দিই নি।আজ আমি আর কামরুল অনেক দুরে।ওর একটা সুন্দর সংসার হয়েছে।কিন্তু লতা কখনো মা হতে পারবে না জেনে আমার খুব খারাপ লেগেছে।কেন যেন মনে হচ্ছিল,আমার গর্ভের সন্তানটা লতার গর্ভে হলে খুব ভালো হতো।ওদের জীবনটা সম্পূর্ণ হতো।বাবার জন্য খুব মায়া হয় আমার। পৃথিবীতে আমি ছাড়া ওনার কেউ নেই।
আমার বাবাকে ঈশ্বর বাঁচিয়ে রাখুক।
………. ……. ……. ………
দুই পৃষ্ঠার এই লিখাটুকু পড়ে আমার চোখ দিয়ে অনায়েসে জল গড়িয়ে পড়তে লাগলো।খুব ভালবাসতো ঝুঁথি আমাকে!আমি একবারো বুঝার চেষ্টা করি নি।লতার মাঝে আমি সবসময়ই ঝুঁথিকেই খুঁজে বেড়িয়েছি।অবচেতন মনে একবারো ভাবনা আসেনি যে সেঝুঁথিকে আমিও ভালোবাসতাম!আজ কেমন যেন একটা রিক্ত- শূন্যতা আমার বুকে ভর করেছে।আমার খুব জোড়ে সেঝুঁথিকে ডাকতে ইচ্ছে করছে।কেন আগে বলেনি সে!আমিতো সেঝুঁথিকেই খু্ঁজেছি সর্বত্র।ঘন্টা খানেক পর ডক্টর আসলেন,আমি মাসি সেঝুঁথির অবস্থা জানার জন্য চঞ্চল হয়ে উঠলাম।সেঝুঁথির মেয়ে হয়েছে!কিন্তু ঝুঁথি আমাদের ছেড়ে চলে গেছে। আমার মাথাটা যেনো কেউ চেপে ধরেছে। ঝুঁথির মৃত্যুর খবর শুনে।সোজা ওর কাছে চলে গেলাম।চিরনিদ্রায় পরম শান্তিতে ঘুমিয়ে আছে সে।আমরা সবাই হারিয়ে ফেলেছি
তাকে।সদ্য জন্ম নেয়া শিশু কন্যাটি কি করবে এখন!?সে কি বুঝতে পেরেছে তার মা আর পৃথিবীতে নেই! কি হবে এখন তার।বাবা তো বেঁচেও মৃত। হরিদাস কাকাকে কে বুঝাবে!আমিও যে সেঝুঁথিকে হারিয়ে ফেললাম চিরতরে।
হাসপাতাল থেকে মৃতদেহ ছাড়াবার ব্যাবস্তা করলাম।অনেক ভাবলাম ধর্মে কি
যায় আসে?এই মুহূর্তে জন্ম নেয়া শিশুটির তো ধর্ম সম্পর্কে বোধ নেই।

সে নিষ্পাপ,পবিত্র। সিদ্ধান্ত নিলাম আমিই হবো ঝুঁথির সন্তানের বাবা আর লতা হবে মা!সমাজকে আজ আমি পরোয়া করি না,সেঝুঁথির মতো আমি তার সন্তানকেও হারিয়ে যেতে দিব না। বাচ্চাটিকে কোলে নেয়ার সাথে সাথেই কেমন যেন একটা অনুভব হলো, এটা পূূর্বে কখনো হয় নি।আমি বাবা হয়েছি, সেঝুঁথির দেয়া উপহার!
স্বর্গে সুখে থাকুক অভাগী সেঝুঁথি!

গল্পের বিষয়:
ভালবাসা

Share This Post

সর্বাধিক পঠিত