অপরাজিতা

অপরাজিতা

আমি পিতামাতার বাধ্য সন্তান বলে ঘরে বাইরে আমার যথেষ্ট সুখ্যাতি ছিল।কখনো তাদের কথার অমত করেছি বলে আমার মনে পড়েনা।সেই সুখ্যাতি যে একদিন আমার সাথে এত বড় শত্রুতা করবে তা জানা থাকলে কোনদিনই আমি এই সুখ্যাতির সাথে সখ্যতা গড়ে তুলতাম না।তাতে না হয় লোকে নিন্দা করত।তবু এই কষ্ট আমাকে পেতে হত না।যারা পিতামাতার মতে অমত করে না তাদের নিজেদের মতের কোন মূল্য থাকেনা। তার প্রমাণ আমি।

বাবা আমার সাথে যার বিয়ে ঠিক করলেন সেই মেয়েটি পিতৃমাতৃহীন হয়ে মাতুলালয়ে বড় হয়েছে।
সে সুন্দরী বটে কিন্তু শিক্ষিত নয়।তবে ঘরকন্নার কাজে তার সুনাম বাড়ীর সকলের মুখে।
নাম তার আলো।আমাদের দুজনার বয়সের ব্যবধান প্রায় দশ বছর।

বয়স আর শিক্ষাকে বিয়ে ভাঙার কারণ উল্লেখ করে বাবাকে বলতেই বাবা জানালেন,তোমার মায়ের জন্মের একযুগ আগে আমি পৃথিবীতে এসেছি।আর ঘরের বউকে অফিসে পাঠাবো না। ঘরকন্নার কাজ জানলেই হবে।

বুঝলাম আমি যাকে বিয়ে ভাঙার কারণ বলে উল্লেখ করলাম বাবার কাছে তার কোন গুরুত্ব নেই।কিন্তু বাবাকে বিয়ে ভাঙার যথার্থ কারণ টাই বলতে পারলাম না।কেউ জানলো না আমার হৃদয় রাজ্য অন্য কারো দখলে।

অবশেষে বিয়ে হয়ে গেল আমাদের।হৃদয়ে একজনকে রেখে অন্যজনকে ঘরের অধিকার দেওয়া ছলনা ছাড়া আর কিছুই নয়।কিন্তু বুঝতে পারলাম না এই ছলনা কার সাথে।যার বাস হৃদয়ে তার সাথে নাকি সবাইকে সাক্ষী করে কাগজে কলমে লিখে পড়ে যার সুখ দুঃখের অংশীদারীত্ব পেলাম তার সাথে।

নব দম্পতির ফুলসজ্জা হলো কিন্তু নবপ্রণয়ে কেউ কাউকে কাছে টানতে পারলাম না।সে পারলো না লজ্জায়।আর আমি পারিনি শিক্ষায়।একজনকে হৃদয়ে রেখে আরেক জনের সাথে ভালবাসার অভিনয় করার শিক্ষা আমার ছিলনা।তাতে দেহের সুখ মেলে সত্য কিন্তু হৃদয় অপূর্ণ থেকে যায়।আমি হৃদয়ের পূর্ণতায় বিশ্বাসী।

বিয়ের সব আচার অনুষ্ঠান শেষে কর্মস্থলে ফেরার সময় নববধূকে আমার সাথে দেওয়া হলো।আমি সাথে নিতে অমত করলে বাবা বললেন,নতুন বউকে রেখে দূরে থাকবে, তা কি হয়?

আমার নাম আকাশ ইসলাম।আমার বয়স সাতাশ। আমি কলেজে পড়ায়।আমার হৃদয় রাজ্য যার দখলে ছিল তার নাম অপরাজিতা।
অপরাজিতা আমার থেকে বছর তিনেকের ছোট ছিল।
নামের সাথে তার বড় মিল ছিল।নিজেকে সকলের আড়ালে রাখতেই বেশী ভালোবাসতো।আমাদের চেনাজানা প্রায় পাঁচ বছরের।

অপরাজিতার মা ছিলনা।বাবা অবসর প্রাপ্ত সরকারী কর্মকতা।আমাদের ভালোবাসার কথা তিনি জানতেন এবং তিনি আমাকে পছন্দ করতেন।তাই অপরাজিতাদের বাড়ীতে আমার আসা যাওয়ায় বাধা ছিলনা।

অপরাজিতার বাবা আমার বাবার কাছে মেয়ের বিয়ের প্রস্তাব নিয়ে বহুবার আসতে চেয়েছে।কিন্তু মেয়ে এখনি বিয়ে করবেন না বলে তার আসা হলনা।

কর্মস্থলে ফিরে পরেরদিন আমি অপরাজিতার সাথে দেখা করলাম।প্রায় দশ দিন পর অপরাজিতাকে দেখে আমার অবস্তা এমন হলো যেন বৈশাখের খরায় স্রোতহীন নদীর বুকে শ্রাবণের অঝর বর্ষণ।
আমি অপরাজিতার কাছে কোনদিন কোন কথা গোপন করনি আজও তার ব্যতিক্রম হলনা।আমার কথা শুনে অপরাজিতা কেমন যেন আকাশ থেকে পড়লো।আর চোখে জল এলো। আমি তার চোখের জল মুছিয়ে দিয়ে বললাম,খুব শীঘ্রই বিয়ের বন্ধন ছিন্ন করে তোমাকে আপন করে নেব।
অপরাজিতা শুধু বললো,বিয়ের বন্ধন বড় শক্ত তা ছিন্ন করা বড় দায়।

শুক্লাদ্বাদশীর রাত্রি।আমি বারান্দায় চেয়ারে বসে বই পড়ছিলাম।আলো আমাকে চা দিতে এলো।আমি বললাম,তোমার সাথে কিছু কথা আছে। সে মাথা নিচু করে দাড়ালো।এটাই নবদম্পতির প্রথম আলাপন।
আমি বললাম,আমি অপরাজিতাকে ভালোবাসি।আমার হৃদয়ে শুধু তার দখল।সেখানে তোমার স্থান দেবার সাধ্য আমার হবেনা।
আলো কোন কথা বললো না।আমি চেয়ে দেখলাম তার সুদীর্ঘ পল্লববিশিষ্ট আঁখি যুগলের জলধারা গন্ডদেশ গড়িয়ে মাটিতে পড়ছে।

আমি আর কোন কথা না বলে ঘর থেকে বেরিয়ে সোজা অপরাজিতাদের বাড়ীর সামনে এসে তার নাম ধরে ডাকলাম।সে দরজা খুলে বাইরে এলে আমি বললাম,আমি সকল বন্ধন ছিন্ন করে তোমার কাছে এসেছি।
অপরাজিতা কিছুই বললো না।হাসলো না কাঁদলো না।আগের মতই নিরব থাকলো।
আমি বাহুবন্ধনে তাকে বুকে জড়িয়ে বললাম,আমাকে ভিতরে যেতে বলবেনা।
সে প্রত্যুত্তর করলো,আমাকে ছাড়ো।তোমার বুকে মাথা রাখার অধিকার আমার নেই।
আমি তার কথায় অবাক হলাম।আমার বাহুবন্ধন থেকে নিজেকে মুক্ত করে সে সরে দাড়ালো।
আমি বললাম,এবুকে মাথা রাখার অধিকার কেবল তোমার।
আর কোনদিন তুমি আমার কাছে এসোনা, বলে দরজা বন্ধ করে দিল।আমি কত করাঘাত করলাম কিন্তু সে কর্ণপাত করলো না।

আমি যখন বাড়ী ফিরে এলাম তখন মধ্যরাত।

সকালে একটু দেরি করে ঘুম ভাঙলো আমার।ওঠে দেখি টেবিলের উপর একটি হলুদ খাম।তাতে নাম ঠিকানা কিছুই ছিলনা।খামের ভেতর থেকে চিঠিটা বের করলাম।তাতে লেখা ছিল,

আকাশ,
আমি জানি আমাকে তুমি খুব ভালোবাসো।আমিও তোমাকে তোমার চেয়ে কিছু কম ভালোবাসি না।আমার জীবনে তুমি ছাড়া আর কাউকেই স্থান দিতে পারবো না।তোমার কাছে আমি যে ভালোবাসা পেয়েছি তার স্মৃতি বুকে নিয়ে আমি বাকী জীবন পার করে দিতে পারব।কিন্তু যে মেয়েটা তোমার ঘরের শোভা বাড়িয়েছে আমি খোজ নিয়ে জেনেছি সে বড় অসহায়।
পৃথিবীতে তুমিই তার একমাত্র আপন।তুমিই তার পৃথিবী।আমি তোমাকে ছাড়া একা এ জীবন পার করতে পারবো কিন্তু সে একদিনও পারবে না।তাই আমার সকল অধিকার তাকে দিলাম।তুমি তার অমর্যাদা হতে দিওনা।
ইতি
অপরাজিতা।

আমি আলোকে ডাকলাম।আলো আমার কাছে এলো।আমি প্রশ্ন করলাম,কেউ এসেছিল?
সে বললো,হ্যা।চিঠিটা দিয়েই চলে গেছে।
আমি চুপ থাকলাম।
আলো আবার বললো,কে সে?
আমি বললাম, সে এসেছিল তার সকল অধিকার তোমাকে দিতে।
আলো বললো, অপরাজিতা।
আমি বললাম,ওই নাম আর নয় আজ থেকে শুধু আলো।।

গল্পের বিষয়:
ভালবাসা

Share This Post

সর্বাধিক পঠিত