সীমান্তের পথিক

সীমান্তের পথিক

> কিরে বুড়ি, কি করিস? (মিমের পাশে বসতে বসতে বললাম)
> দেখ রিয়াদ, একদম আমায় বুড়ি বলে ডাকবি না (মিম)
> কেন?
> আমি মোটেই বুড়ি নই!
> বুড়িই তো! দেখনা বাঁ পাশের গালটায় কেমন বসে গেছে ৷ এবড়ো থেবড়ো, হি হি হি
> ইসসস, ওটা মোটেই বসে যায়নি বুড়ো ৷ ওটা টোল! জানিস ছেলেরা টোল পড়া মেয়েদের বেশি পছন্দ করে?
> জানিনা, তবে তোর বুড়োর বেশ পছন্দের!
> আবার শুরু করছে! চুপ থাক
ফোন নিয়ে গেম খেলা শুরু করলো ৷ আমি ওর আরও একটু কাছে গিয়ে বললাম,
> মিম
> হুম
> শোননা
> বল, শুনছি
আমি মুখটা ওর কানের কাছে নিয়ে বললাম,
> ভালবাসি
> মাইর খাবি
> সত্যিই
> এদিকে আয়, একটা সেল্ফি তুলি
সেল্ফি তুলে ছবিটা আমার সামনে ধরে বলল
> দেখনা, একদম বেমানান, চলবে না
> আবার ফাজলামি শুরু করছিস?
> তো কি করবো?
> আমি সত্যিই বলছি
> তুই থাক তোর সত্যি নিয়ে, গেলাম আমি
মিম উঠে হনহন করে চলে গেল ৷ কিছুক্ষণ বসে বসে পুকুরে ঢিল ছুড়লাম ৷ ভাবছিলাম মিম আবার ফিরে আসবে, কিন্তু আসলো না ৷ ফোনটা হাতে নিয়ে অনেকগুলো “ভালবাসি” লিখে ওকে পাঠিয়ে দিয়ে উঠে বাড়ির পথে হাটা শুরু করলাম ৷
মেয়েটা এমন কেন? যতবারই ভালবাসার কথা বলতে যাই ফাজলামি করে এড়িয়ে যায় ৷ কিন্তু মনের মধ্যে ভালবাসাটা পুষে রাখাও অনেক কষ্টকর ৷ গৃহহীন পথিকের মত পাক খেতে থাকে ৷ নিজেও দু-দন্ড শান্ত হয়ে বসেনা, আমায়ও বসতে দেয়না ৷ দিন শেষের নীড়হারা পাখিটার মত ছটফট করতে থাকে, নীড়েই তার শান্তি ৷ সে নীড় যে মিম, সেটাই তাকে বোঝাতে পারিনি হয়তো ৷ কিন্তু যত দিন যায় আকুলতা বাড়তেই থাকে ৷ গভীর সাগরে ডুবতে থাকা মানুষটাও বাঁচার স্বপ্ন দেখে, তাইতো দু-হাতে জলের সাথে সংগ্রাম করে শেষ নিঃশ্বাস পর্যন্ত ৷ আমিও একবার শেষ চেষ্টা করতে চাই ৷ মিমকে ফোন দিয়ে পার্কে দেখা করতে বললাম…
৩০ মিনিট ধরে পার্কের বেঞ্চটায় বসে আছি ৷ মিমের আসার নামই নাই ৷ বিরক্তি লাগছে, সা রাগও হচ্ছে ৷ মিম অনেকটা বদলে গেছে বুঝতে পারছি, আমার গুরুত্বটা কমে এসেছে ৷ ওর কথা আর কাজেই সেটা বুঝতে পারি একটু একটু ৷ আরও ১০ মিনিট পরে আসলো ৷
> কিরে, হটাৎ জরুরি তলব? (মিম)
> কিছু কথা বলতে চাই ৷ জীবনের কিছু গুরুত্বপূর্ণ কথা আর দু-একটা গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্ত ৷ কোন ফাজলামি করতে পারবি না ৷
> সিরিয়াস কিছু? কি হয়েছে?
> জানিনা কি হয়েছে, কিভাবে হয়েছে ৷ শুধু জানি আজীবনের জন্য কিছু শূন্যতার সৃষ্টি হয়েছে, যেটা তোকে ছাড়া পূরণ করা সম্ভব না ৷ তুই আর আমার অবসরে নেই রে, অভ্যাসে পরিণত হয়েছিস ৷ সেই অভ্যাস, যা কোনদিন ত্যাগ করা সম্ভব না ৷ তুই আমার অনুভবে নেই, অস্তিত্বে মিশে গেছিস ৷ একটাই চাওয়া, এই অস্তিত্বের সমাপ্তি যেন কোনদিন না হয় ৷ তোকে সত্যিই ভালবেসে ফেলেছি, অনেক বেশিই ভালবেসে ফেলেছি…
বলে মিমের হাতটা ধরলাম ৷ মিম আলতো করে ছাড়িয়ে নিলো ৷ ওর মুখের দিকে তাকালাম ৷ চোখদুটো ছলছল করছে, পলক পড়লেই কেঁদে দেবে ৷ মিম মুখটা ঘুরিয়ে চোখ মুছে নিলো ৷
আমি আবার ওর হাতটা ধরলাম, এবারও মিম ছাড়িয়ে নিল ৷ আমি জিজ্ঞাসু দৃষ্টিতে তাকালাম ৷ মিম না সুচক মাথা নাড়লো ৷ আমি বললাম,
> কারন?
> (নিরব)
> তুইকি কাউকে ভালবাসিস?
মিম চোখ মুছে নিজেকে স্বাভাবিক করে একটু কঠিনভাবেই বলল,
> হ্যাঁ তাই
> কাকে?
> রাহাত, আমার কাজিন
> ওহ, বলিসনিতো কখনো
> প্রয়োজন মনে করিনি তাই ৷ যাই হোক, আমি আসি, কাজ আছে, বাই
মিম উঠে দাড়াতেই আমি ওর হাতটা ধরে বললাম,
> তুই মিথ্যা বলছিস
> হাত ছাড় রিয়াদ
আমার মাথায় যেন ভুত চাপলো ৷ এক ঝটকায় মিমকে বুকে টেনে নিলাম ৷ মিমও যেন কিছুক্ষণের জন্য পাথরের মত নিশ্চল হয়ে গেল ৷ তারপর এক ধাক্কায় নিজেকে ছাড়িয়ে নিয়ে সাথে সাথে আমার গালে সজোরে একটা চড় দিয়ে চোখ মুছতে মুছতে চলে গেল ৷ ক্ষনিকের জন্য আমিও যেন স্তব্ধ হয়ে দাড়িয়ে রইলাম ৷ সম্বিত ফিরে পেয়ে মিমের যাওয়ার পথের দিকে তাকালাম ৷ কেমন যেন ঝাপসা লাগছে, চোখটা যেন কেমন জালা করছে ৷ না, ছেলেদের কাঁন্না শোভা পায়না ৷ প্রাণপনে চেষ্টা করছি চোখের জল আটকানোর…
এতদিন ভাবতাম মিমও হয়তো আমায় ভালবাসে ৷ কিন্তু কয়েক মুহুর্তেই সব এলোমেলো হয়ে গেল, সব ধারণা মুহুর্তেই যেন শতশত যুক্তিতে ভুল প্রমাণিত হলো ৷ জানি মিমের সাথে সম্পর্কটা আর মত থাকবে না ৷ মধ্যে অজানা কোন দেয়াল হটাৎ মাথা তুলে দাড়িয়ে যাবে ৷ তাই নিজেকেই ওর জীবন থেকে সরিয়ে নেওয়াই ভাল হবে ৷ হয়তো কিছুদিন মিস করবে, কিন্তু সময়ে সব ঠিক হয়ে যাবে ৷ এখন আমি এখানে থাকলে ওর ভালবাসার বাধা হয়ে থাকবো, যা আমি কখনই চাই না ৷ তাই সেদিন রাতেই গ্রামের বাড়ির উদ্দেশ্য রওনা দিলাম ৷
এক মাসের বেশি হতে চলল গ্রামের বাড়িতে আসছি ৷ এর মধ্যে একবারও কথা হয়নি মিমের সাথে ৷ যোগাযোগ করার সব মাধ্যমও নষ্ট করে দিয়েছি ৷ তবু মাঝেমাঝে খুব ইচ্ছা হয় ওর হাসিমুখটা দেখতে ৷ হাসলে টোল পড়ে মেয়েটার ৷ অপলক তাকিয়ে থাকতে ইচ্ছা করে ওর টোলটার দিকে ৷ কিন্তু সে অধিকার হারিয়েছি ৷ না, হারিয়েছি বললে ভুল হয় ৷ যা পাইনি কখনো, তা হারাবো কি করে?
বাড়িতে থাকতে ভাল লাগেনা ৷ মা বারবার জিগ্গেস করতে থাকে কি হয়েছে আমার, এমন মনমরা হয়ে থাকি কেন? সেদিন সন্ধ্যায় তো কেঁদেই দিয়েছিল ৷ আমারও ইচ্ছা করে মাকে জড়িয়ে ধরে কাঁদতে, মনের মধ্যে জমা কষ্টগুলো বলতে ৷ কিন্তু ছেলে যে, কাঁন্না আমার শোভা পায়না ৷ কষ্টগুলো বুকের মধ্যে চেপে ধরে রাখি, নাহলে ওরা যে আমায় কাপুরুষ বলবে ৷
আমার জীবনের গল্পটা এভাবেই শেষ হলেও পারতো ৷ নিজেকে অনেকটা সামলেও নিয়েছি ৷ কিন্তু আবার সবকিছু এলোমেলো করে দিল মিমের একটা চিঠি ৷ সেদিন নদীর পাড়ে বসেছিলাম, ছোট বন এসে বলল,
> শহর থেকে তোর চিঠি এসেছে
বলে চিঠিটা আমার হাতে দিয়ে চলে গেল ৷ ততক্ষণে সন্ধ্যা নামার উপক্রম ৷ পাখিরা সব নীড়ে ফিরছে ৷ আশেপাশের বাড়িগুলোতে সন্ধ্যা প্রদিপ জ্বালানো শুরু হয়েছে ৷ আবছা আলোয় চিঠিটা পড়তে শুরু করলাম
“কেমন আছিস রিয়াদ? সেদিন তোর খুব লেগেছিল নারে? কি করবো বল, আমার যে আর কিছু করার ছিল না ৷ ক্ষনিকের ভালবাসায় জড়িয়ে তোকে কষ্ট দিতে চাইনি ৷ চিঠিটা যখন পাবি তখন হয়তো আমি আর এই পৃথিবীতে নেই, আকাশের তারা হয়ে গেছি ৷ আচ্ছা, এই হাজার তারার ভিতর খুজবি আমায়?
কত স্বপ্ন বুনেছিলাম তোকে নিয়ে ৷ তুই, আমি আর আমাদের ছোট্ট একটা সংসার, দুষ্টুমি আর ভালবাসায় ভরা ৷ কিন্তু স্বপ্ন ভেঙে গেল, যেদিন ডাক্তার আমার ছয় মাসের জীবনসীমা বেঁধে দিল ৷ তুই যেদিন আমায় প্রথম ভালবাসি বলেছিলি, তার তিনদিন আগেই জানতে পারি সেটা ৷ সেদিন সারারাত কেঁদেছিলাম ৷ দুদিন তোর সামনেও যাইনি ৷
তুই জানিস, তুই আমাকে ১৩৪ বার “ভালবাসি” বলেছিস, আর মেসেজে “ভালবাসি” বলেছিস ৪০৭৩ বার ৷ কেউ হয়তো সারাজীবনেও একবার শুনতে পারে না এই শব্দটা ৷
তোর হাতটা ধরতে ইচ্ছা করছে খুব ৷ লিখতেও কষ্ট হচ্ছে অনেক ৷ হাতটায় খুব ব্যথা ৷ তোকে আঘাত করার শাস্তি দিয়েছি ৷ কিন্তু তা না করলে যে তুই আমায় ছাড়া চলতে শিখতিস না ৷ পারলে ক্ষমা করে দিস, আর একটু ভালবাসা রাখিস আমার জন্য ৷ দেখিস, পরের জন্মে অনেক সময় নিয়ে আসবো তোকে ভালবাসার জন্য ৷ কাঁদবিনা একদম, আমি কিন্তু দেখবো আকাশ থেকে ৷ ভাল থাকিস…
…………..ইতি তোর বুড়ি
শেষের লাইনগুলো পড়তে পড়তে বুঝলাম আমি কাঁদছি ৷ আজ আর চোখের জল আটকাতে ইচ্ছা হচ্ছে না, চিৎকার করে কাঁদতে ইচ্ছা করছে ৷
ঝাপসা দৃষ্টিতে হাটা শুরু করলাম নদীর পাড় ধরে ৷ চারপাশের অন্ধকারটাও ক্রমশ গভীর হয়ে আসছে ৷ সেই অন্ধকারের বুক চিরে মেঠো পথটা ধরে হাটছি আমি ৷ জানিনা এ পথের শেষ কোথায় ৷ হয়তো এই পথের শেষে দাড়িয়ে আছে মিম, আমার বুড়ি ৷ দাড়িয়ে আছে তার ভালবাসা নিয়ে, অধীর অপেক্ষায়…

গল্পের বিষয়:
ভালবাসা

Share This Post

আরও গল্প

সর্বাধিক পঠিত