গ্রাম্য প্রেম

গ্রাম্য প্রেম

গ্রামের এক কৃষকের ছেলে রফিক। দুপুর পযন্ত বাবার সাথে কৃষিক্ষেতে কাজ করছিলো। তারপর বাসায় ফিরে ফ্রেস হয়েই মোবাইলটা হাতে নিয়েই শম্মীর বাবার নাম্বারটা বের করে ৩টা মিসড কল দেয়। তারপর কিছুক্ষন পর শম্মীর বাবার নাম্বার থেকেও ৩টা মিসড কল আসে। আসলে রফিকের উদ্দেশ্য শম্মীর বাবা ছিলো না, শম্মীই ছিলো। শম্মী রফিককে বলেছিলো এইভাবে ৩টা মিসড কল দিতে যাতে সে বুঝতে পারে যে রফিক তাকে কল দিয়েছে আবার ৩টা মিসড কল ব্যাক আসলে বুঝে নিতে যে শম্মীর কাছে মোবাইলটা আছে। এটাকে নাকি লাভ কল বলে। রফিক এটা সম্পরকে শম্মীর কাছেই প্রথম শুনেছিলো।তো ৩টা মিসড কল আসার পর রফিক এবার রিয়াল কল দিলো। কল ধরতেই ওপাশ থেকে:
-হ্যালো, রফিক। কি বলবা তারাতারি বলো। আব্বা ঘরে আছে ভাত দিতেছি।
-তোমার সাথে অল্প কথায় কি আর পেট ভরে। আজকা বিকেলে আসবা?
-কই?
-কই আবার! সবসময় আমার যেখানে দেখা করি। নদীর পারে।
-আচ্ছা। এখন রাখি।
-আরে আর একটু কথা বলোনা।
.
হঠাতই শম্মীর বাবা শম্মীকে জিজ্ঞেস করে:
-কে কল দিছে মা?
-ঐ সিমের অফিস থিকা আব্বা।
.
তারাতারি শম্মী কল কেটে বাবার কাছে যায় খাবার দিতে।
.
এইদিকে রফিকের খেয়েদেয়ে যেনো আজ সময়ই যায় না। কখন বিকেল হবে,শম্মী আসবে, শম্মী আজ কি পড়ে আসবে, ওকে আরো বেশি সুন্দর লাগবে এইগুলো ভাবতে থাকে রফিক । শম্মী আর রফিকের সম্পক প্রায় ৯ বছরেরো বেশি। তারা দুজনেই এই লতিফপুর গ্রামেই থাকে। দুজনের বাবাই কৃষক। একসাথে তারা প্রাইমারী স্কুলে যেতো। তবে রফিক ক্লাস ৩ এর পর আর স্কুল মুখো হয়নি। যদিও শম্মীর লেখাপড়া করার অনেক ইচ্ছা ছিলো কিন্তু পারিবারিক ঝামেলার কারনে ক্লাস৫ এই লেখাপড়ার জীবনীর ইতি টানে।
.
দেখতে দেখতে দুপুর গড়িয়ে বিকেল। রফিক তারাতারি তার নতুন শাট আর লুঙ্গীটা পড়ে রেডি হয়ে নেয়। নদীর পারে জাওয়ার আগে মানিক মিয়ার ফুলের বাগান থেকে বেশ সুন্দর দেখতে কিছু গোলাপও নিয়ে নেয়। রফিক আর শম্মী সপ্তাহে একদিন দেখা করে এই নদীর পারেই। প্রত্যেকবার শম্মীই আগে এসে রফিকের জন্য অপেক্ষা করে আর রফিক একটু দেরী করেই আসে। তারপর অভিমানীর অভিমান ভাঙায় গোলাপ ফুল দিয়ে। তবে এবার রফিক নদীর পারে গিয়ে বেশ অবাক এখনো শম্মী আসে নাই! ওতো আজ পযন্ত কখনো দেরী করে আসেনি। রফিক কিছুটা চিন্তিত হয়ে পরে। ১ ঘন্টা পযন্ত সেখানেই বসে থাকে যদি শম্মীর অপেক্ষায়। তবে শম্মী এলোনা। অবশেষে রফিক বাধ্য হয়ে শম্মীকে কল দিলো।তবে কলটা শম্মীর বাবা ধরে । রফিক কোন কথা না বলেই কলটা কেটে দেয়। সে বুঝতে পারে কিছু একটা সমস্যাতো হয়েছেই। শম্মীর আসার সম্ভাবনা না থেকে মন খারাপ করেই বাসায় চলে যায়। রফিকের পৃথিবী যেনো এলোমেলো হয়ে গেছে। আজ রাত্রে তার আর ঘুম হবেনা। শুধু শম্মীর কথাই চিন্তা করতেছে। হঠাত রাত ১২টা রফিকের মোবাইলে শম্মীর নাম্বার ভেসে উঠে। সাথে সাথে কল রিসিভ করে:
-হ্যালো শম্মী। কই ছিলা তুমি? বিকেলে আসলানা কেন? আমি কত চিন্তায় পড়ে গিয়েছিলাম!
-আমাদের আর কোনদিনই দেখা হবে না। [প্রায় কেঁদে]
-কিন্তু কেন?
-আজ আমাকে পাত্রপক্ষ দেখতে আসছিলো। বিয়ে ঠিক হয়ে গেছে। বাবা বলছে সামনের শুক্রবার আমার বিয়ে,কোন কথাই শুনেনি।
-আরে বোকা মেয়ে কাঁদে না। শুধুতো বিয়েটাই ঠিক হয়েছে, বিয়েতে হয় নাই। আমি কালকে তোমার বাবার সাথে কথা বলবো।
-বাবা তোমার কথা শুনবে না।
-ধুর তুমি চিন্তা করো না। তোমার বিয়ে হলে শুধু আমার সাথেই হবে। এখন ঘুমাও। আর হ্যা আর যদি কান্না করছো!
.
তাদের কথা শেষ হলে রফিক ভাবতে থাকে কালকে শম্মীর বাবাকে কিভাবে রাজি করাবে। এদিকে শম্মীর বাবাও জানে রফিক আর শম্মীর সম্পরকের কথা। তবে সে চায় না তারমতই কোন কৃষকের ঘরে তার মেয়েরো বিয়ে হোক। সে জানে কৃষিকাজ করে কতো অভাবে থাকতে হয়। তাই সে চায়না তার মেয়ে বিয়ের পরো এই কষ্ট করুক। তাই সে পাশের গ্রামের চেয়ারম্যানের ছেলের সাথে তার মেয়ের বিয়ে ঠিক করে ফেলে।
.
পরেরদিন সকাল ৯টা বাজে রফিক শম্মীর বাবার সামনে গিয়ে হাজির:
-চাচা, একটু কথা ছিলো।
-এখন মেলা কাম আছে। পরে আসিস।
-চাচা, আমি আর শম্মী একে অপররে অনেক ভালোবাসি। আমি ওরে ছারা মইরা যামু।
-তুই কি পাগল হইছোস? সামনের শুক্রবার শম্মীর বিয়া। এখন তুই পাগলামি শুরু করছোস।
-চাচা, তুমি সব জানো। তাও কেন এরকম করতেছো?
-তুই বিয়ার পর বউরে খাওয়াবী কী?
-তোমার মাইয়া কি রাক্ষস। আমি যা খাই তাই খাওয়াবো। আর আমারতো বাবার দেওয়া এক বিঘা জমি আছে। সংসার চলে যাবে।
-এই কৃষিকাজ কইরা আর কয়দিন যাইবো। আমার মেয়েরে জন্মের পর থিকা এই পযন্ত কোন সুখ দিতে পারি নাই। আমি চাইনা বিয়ের পরো সে এতো কষ্ট করুক।
-চাচা, আমার দাদা কৃষিকাজ কইরা চারটা বউ পালছে, আমার বাবা আমাগো সাত ভাই বোন পালছে । আর আমি একটা বউ পালতে পারুম না? ওরে সুখ দিতে পারুম না?
-অনেক কথা কইছোস। ও যদি তোর হাত ধইড়া এই বাড়ি থিকা বের হয় তাইলে তার আগে এই বাড়ি থেকে আমার লাশ বের হইবো।
.
রফিক বুঝতে পারে ওর বাবা কিছুতেই রাজি হবে না। দুরে শম্মী দাড়িয়ে তাদের কথা শুনছিলো আর কাঁদতেছিলো। রফিক আস্তে আস্তে শম্মীর কাছে যায়। আর বলে:
-শম্মী, তোমার বাবা যার সাথে তোমার বিয়ে ঠিক করছে তুমি তারেই বিয়ে করো। আসা করি সুখী হবা।
.
এই বলেই চলে যায় রফিক। আর শম্মী ঘরে বসেই কাঁদতে থাকে আর ভাবতে থাকে রফিক এতো খারাপ।
.
দেখতে দেখতে বিয়ের দিন চলে আসলো। শম্মী বধুবেশে বসে আছে। আর কিছুক্ষন পরেই বরযাত্রী আসবে। সব রেডি হয়ে গেছে। বেশ আয়োজনের সাথেই বিয়ে হচ্ছে। চেয়ারম্যান এর ছেলের বিয়ে বলে কথা। এরই মধ্যে রফিকও চলে আসলো শম্মীর বিয়েতে। সাথে আবার একটা মেয়েকে নিয়ে এসেছে। শম্মীর সামনে দিয়েই মেয়েটার সাথে কথা বলতে বলতে প্যান্ডেলে ডুকলো রফিক। শম্মীকে দেখেও না দেখার ভান করে চলে গেলো। আজ রফিক এমনভাবে পাঞ্জাবী, প্যান্ট পড়ে এসেছে যেনো তারই বিয়ে। শম্মী দেখছে আর রাগে জ্বলছে। এরই মধ্যে অনেক বেলা হয়ে গেলো তাও বরযাত্রী এলোনা। শম্মীর বাবা কল করে জানতে পারে চেয়ারম্যান এর ছেলে যে পুকুরপারে গোসল করতে গেছে সেখান থেকে আর ফিরে আসে নাই। এখনো তারে খোজাখোজি চলতাছে। অনেকে সন্দেহ করে হয়তো পালাই গেছে। সারাদিনে আর তারে খুজে পাওয়া যায়নি। শম্মীর বাবাতো মেয়ে বিয়ে নিয়ে সেই চিন্তায় ছিলো। আজ যদি তার মেয়ের বিয়ে না হয় তাহলে বাকি জীবন আর বিয়ে হবে না, অপয়া অপবাদ লেগে যাবে। এইদিকে শম্মীর বাবার নজর গেলো রফিকের দিকে। ওতো জামাই সেজে বসে আছে আর ওতো শম্মীকেও ভালোবাসে। রফিকের কাছে নরম স্বরে গিয়ে বলে:
-রফিক,বাবা। তুই আমার মেয়েরে বিয়া করবি।
-ধুর। আমি কি বিয়া করতে আসছি নাকি! খাইতে আসছি।
-তুইনা শম্মীরে ভালোবাসতি। এখন ওর সম্মানের প্রশ্ন।
-দুর। বিয়ের মুড নাই। আর তোমার মেয়েরে বিয়ার পর খাওয়াবো কী!
-বাবা তোর যেটুকু জায়গা আছে সেটাতেই চলে যাইবো তোদের সংসার আর আমার যেটুকু জায়গা আছে ঐটাও তোরে দিয়া দিমু ভবিষ্যতের লাইগা সঞ্চয় করতে পারবি।
– এখন এতো তারাতারি এইগুলার জন্য মুড টা ঠিক করা অনেক কঠিন আর আমার বাবা কি রাজি হইবো?
-এই দায়িত্ব আমার তুই খালি কবুল কো!
-আচ্ছা কি আর করার যাউ কবুল।
.
এতোটা অনুরোধ করার পর অবশেষে বিয়ে করতে রাজি হলো রফিক। শম্মী সব দেখতেছিলো আর অবাক হইতেছিলো যে রফিক তার জন্য এতো পাগল ছিলো তারে আজ এতো অনুরোধ করে রাজি করানো লাগলো! যতটা অবাক হচ্ছিলো তার চেয়ে হাজার গুন রেগে ছিলো রফিকের ওপর। অবশেষে তাদের বিয়ে সম্পন্ন। বাসর ঘরে বসে আছে শম্মী। রফিক ধীরে ধীরে ঘরের দিকে এগিয়ে যাচ্ছে। তবে শম্মীর রাগ এখন আরো তিব্র হাতে একটা ছুরি নিয়েই বসে আছে। রফিককে মারার ইচ্ছা নাই তবে একটু ভয় না দেখালে আর তার রাগ কমবে না। রফিক যেই ঘরে ডুকে শম্মী বলে ডাক দিবে তখনই শম্মী ছুরী নিয়ে সোজা রফিকের সামনে:
-এতো সাহোস তোমার হয় কেমনে! তুমি আমারে বিয়ে করার এতো বড় একটা সুযোগ পাইয়াও আমার বাবার এতো অনুরোধের পর বিয়েতে রাজি হইলা! কেন! আমি এই কয়দিনে এতোই পুরান হয়ে গেছিলাম!
-তোমার কি মনে হয় আমাদের বিয়েটা কাকতালীয় ভাবে হইছে! তোমার বাবা এমনিতেই আমাদের বিয়ে মেনে নিছে! চেয়ারম্যানের ছেলে এমনিতেই উদাও হইছে!
-মানে?
-আমি এইগুলা আগে থেকেই প্লান করে রাগছিলাম। আমিই পুকুর থেকে চেয়ারম্যানের ছেলেরে কিডনাপ করে নিয়েগেছিলাম। ঐ ব্যাটা আর কালকে সকালের আগে উঠবো না। তার পরের ঘটনাটাতো তুই জানোসই!
-গ্রামের লোকেরা আর আব্বায় যদি জানতে পারে।
-জানবে না। জানলে জানবো। আসল কাজতো হয়েই গেছে।
.
.
আসলেই গ্রামের লোকেরা যতদিনে জানতে পেরেছিলো ততদিনে শম্মী আর রফিকের মেয়ে বৃষ্টি গ্রামের বাঁকা পথ দিয়ে বাবা বাবা বলে খাবার নিয়ে ছুটছিলো আর পেছনে ছুটছিলো শম্মী। আর অপেক্ষার প্রহরে বসে ছিলো রফিক।

গল্পের বিষয়:
ভালবাসা

Share This Post

সর্বাধিক পঠিত