ঘৃণাভরা ভালোবাসা

ঘৃণাভরা ভালোবাসা
তিন বছরের রিলেশনের বিয়ে ছিল আমাদের। বাড়িতে না জানিয়েই দুজন বিয়ে করে নিয়েছিলাম। আমি দেখতে তেমন ভালো ছিলাম না, কিন্তু সে মাশাল্লাহ। আমার চেহারা নিয়ে নাকি তার কোন নালিশ নেই, সে আমার মনটাকে ভালবাসে। আমিও তাকে ভালবাসি। ভালবাসি বলেই পরিবারকে না জানিয়ে বিয়ে করতে সাহস পেয়েছিলাম। বিয়ের প্রায় উনিশ মাস পর ওদের পরিবার আমায় মেনে নেয়৷ সে এবং আমি ভীষণ খুশি। ভাবলাম, যাক সময় ব্যাপার না৷ দুই পরিবার যে আমাদের মেনে নিল, আমাদের ভুলকে ক্ষমা করল, এটাই আমাদের জন্য অনেক বড় পাওয়া। সব কিছু ভুলে আমরা নতুন ভাবে সুন্দর একটা জীবন শুরু করলাম।
শ্বশুর বাড়িতে গিয়ে মনে হলো এমন সুন্দর একটা পরিবার পেয়ে সত্যিই আমি ভীষণ খুশি। শ্বশুর, শাশুড়ি, তিন ননদ যদিও দুজনের বিয়ে হয়ে গেছে, তবে তারা এখানেই বেশি থাকে, এক ভাসুর ও তার স্ত্রীকে নিয়ে খুব সুন্দর দিন কাটছিল আমাদের। কখন যে দেড় বছর চলে গেল টেরই পেলাম না। এর মধ্যে আমার এক মেয়ে হলো। একদিন আমার শ্বশুর বললেন, এবার বৌমা তুমি বাপের বাড়ি থেকে একবার ঘুরে আসতে পারো। মেয়ে হওয়ার পর আর যাওয়া হয় নি বাবার বাসায়। আমার মাও তার নাতনীকে নিয়ে বেড়াতে যাওয়ার জন্য অনেক পীড়াপীড়ি করছিলেন৷ তাই আমিও রাজি হয়ে গেলাম। যেদিন আমি শ্বশুর বাড়ি থেকে বাবার বাসায় আসার জন্য ব্যাগ গুছাচ্ছিলাম, দেখলাম আমার শাশুড়ির সে কি কান্না। কিছু বুঝে উঠতে পারতেছিলাম না। আমি তো কিছুদিনের জন্য বাবার বাসায় বেড়াতে যাচ্ছি, তাও আবার শ্বশুর চাইতেছেন বাবার বাসায় কিছুদিন থেকে আসি সেজন্য। এতে শাশুড়ির এত কান্নার মানে বুঝি নাই তখন, ভাবলাম আমাকে তিনি নিজের মেয়ের মতো ভালবাসেন আর নাতনীর জন্য হয়তো উনার খারাপ লাগছে, তাই কান্না করছেন। কিন্তু আমার সকল ধারণা এতটা ভুলে পরিণত হবে ভাবি নাই। বাবার বাসায় আসার দুই দিন পর শ্বশুর কল দিয়ে বলল ৫ লক্ষ টাকা নিয়ে যেতে যাওয়ার সময়।
সঙ্গে এও বলে দিলেন, টাকা যোগাড় না করতে পারলে যেন আর ওখানে ফিরে না যায়। আমার মাথায় আকাশ ভেঙে পড়ল। এত আদিখ্যেতা করে আমায় বাবার বাসায় পাঠানোর উদ্দেশ্যে তাহলে এই ছিল। অথচ ওখানে থাকাকালীন কেউ কখনো টাকার ব্যাপারে কোন কথা বলে নি। এত টাকা কোথায় পাবো! বাবা একটা ছোট্ট ফার্মেসি দিয়ে সংসার চালায়। এখানে পাঁচ লক্ষ টাকা চাওয়া তো অসম্ভব ব্যাপার। কোন উপায় না পেয়ে আমার স্বামীকে কল দিলাম। বললাম তুমি একটু বাবাকে(শ্বশুরকে) বুঝাও, এত টাকা আমি কোথায় পাবো। সে কোন কথা বলেনি। কিছু না বলেই ফোন কেটে দিল। বুকের মধ্যে তীব্র আঘাত পেলাম আমি। একি সেই মানুষ! যে একদিন আমার কন্ঠ শুনতে না পেলে পাগলের মতো এসে বাড়ির সামনে হাজির হতো! বলতো, ভালবাসা ছাড়া আর কিছুই চাই না তোমার কাছে।
পৃথিবীর সব পরিবর্তন মেনে নেওয়া যায়, কেবল ভালোবাসার মানুষটার পরিবর্তন মেনে নেওয়া যায় না। বার বার কল দেওয়ার পরও যখন সে কেন রেসপন্স করতো না। আমি অবাক হয়ে মোবাইলটার দিকে তাকিয়ে থাকতাম। ভাবতাম আর কল দিবো না। রাগ করে থাকবো৷ সে আমায় নিতে আসলেও যাবো না। তখন বুঝবে আমায় কষ্ট দেওয়ার পরিণাম। কিন্তু সে কোথায়! পনের দিন হলো সে কোনরকম কথায় বলছে না আমার সাথে। নিজে রাগ করে নিজেই রাগ ভাঙানোর জন্য গেলাম তার কাছে। শাশুড়ি আমায় দেখে কেঁদে ফেললেন, তার নাতনীকে কোলে করে নিজের রুমে নিয়ে গিয়ে অনেক আদর করলেন। আর আমি তার সামনে বসে আছি এক ভিখারীর মতো। ভালোবাসার ভিখারী, সংসার রক্ষা করার ভিখারী। কিন্তু সে যেনো পাথর। সে তো আমার আগের সেই ভালবাসার মানুষটি রইলো না। আমার শ্বশুর যখন আমায় বললেন, তুমি টাকা না দিতে পারলে দিও না। সমস্যা নাই। কিন্তু এ বাড়িতে আসতে পারবা না৷ আমি ওরে দ্বিতীয় বিয়ে করিয়ে পাঁচ লক্ষের চেয়ে আরো বেশি টাকা আদায় করতে পারবো। তুমি তার বিয়ে করা বউ৷ তাই তোমার কাছে বেশি চাই নাই। এখন তুমি যদি চাও সংসার তুমি করবে, তাইলে টাকা যোগাড় করো। নয়লে আমরা বিকল্প ব্যবস্থা করবো।
দ্বিতীয় বিয়ে! ভেতরটা মোচর দিয়ে উঠল আমার। সেকি পারবে করতে! আমি তার দিকে তাকালাম, সে নিশ্চুপ বসে আছে। তাকে জিজ্ঞেস করলাম, তোমার কি মত? তুমিও কি তাই চাও? সে তার বাবার দিকে তাকিয়ে বলল, বাবা যা বলেন তাই হবে। সেদিন রাত আমি শ্বশুর বাড়িতেই কাটালাম৷ স্বামীর রুমটায় আমার শেষ রাত। আমি সে রাতে তাকে পায়ে ধরে অনেক কান্না করলাম। যেন সে আমায় না তাড়িয়ে দেয়। বললাম, এই টাকার ব্যাপারটা ছাড়া তুমি যা বলো তাই করবো। সে কোন কথা বলে না। তাকে জড়িয়ে ধরে বললাম, থাকতে পারবে তুমি আমায় ছাড়া? সে নিরুত্তর। আমি তখন পাগলের মতো কান্না শুরু করে দিলাম। বললাম, প্লীজ, তুমি আমায় ছেড়ো না। আমি পাগল হয়ে যাবো। আমি থাকতে পারবো না তোমায় ছাড়া। এই পৃথিবীতে তুমি আর আমার মেয়েটাই সব। আমি পিছনের সমস্ত দুনিয়াকে ফেলে কেবল তোমার কাছেই থাকতে চাই। তুমিই আমাকে সুখী করতে পারো। তুমি চাইলেই সব সম্ভব। তুমি মুখ ফেরালে সত্যিই আমরা মরে যাবো। আমার বুকটা ভেঙে যাচ্ছিল কথাগুলো বলতে। কিন্তু আমার ভালোবাসা টাকার কাছে হেরে গেল। এতদিনের সমস্ত প্রেম, ভালোবাসা, বিশ্বাস সব তলিয়ে গেল টাকার কাছে। খুব অভিমান নিয়ে সেদিন রাতেই আমি আমার মেয়েকে নিয়ে শ্বশুর বাড়ি ছাড়লাম।
বাড়িতে এসে মাকে সব বললাম। মা বললেন, দ্বিতীয় বিয়ে করতো সে, তুই চলে আসলি কেন, তোর স্বামী সে৷ ওই ছেলে দুই বউ নিয়ে সংসার করতে পারলে তোর সমস্যা কি! তুই ফিরে যা আবার। আমাদের না জানিয়ে বিয়ে করেছিলি৷ এখন কেন সব শেষ হয়ে গেলে আমাদের কাছে ফিরে আসিস। তখন যেমন একা বিয়ে করেছিলি, আজকেও একায় সংসারের হাল ধরবি। আমাদের পছন্দমতো ছেলে বিয়ে করলে আজ তোর এই দশা হতো না।আমি জানি, মায়ের এসব রাগের কথা। মাকে না জানিয়ে বিয়ে করার জন্য এগুলো বলছে আমায়। কিন্তু আমি মাকে কি করে বুঝাবো, ভালোবাসা যেদিন মরে যায়, সংসার কি আর টিকে থাকে!
ওইদিন রাতটা আমার জীবনের সবচেয়ে ভয়ংকর রাত ছিল বলা যায়। ভালোবাসার মানুষটা আমার থেকে মুখ ফেরালো, অথচ মা আমাকে তার কাছেই চলে যেতে বলছে। রাগে ক্ষোভে সেদিন আত্মহত্যা করতে ইচ্ছে করছিল। পরে ভাবলাম, আমি মারা গেলে আমার মেয়ের কি হবে! তার জন্য আমায় বাঁচতে হবে। কিন্তু বাঁচতে গেলে তো টাকা লাগবে। চাকরী ছাড়া টাকা কোথায় পাবো! আর চাকরীই বা কোথায় পাবো! অনেক ভেবে চিন্তে একটা পথই খোলা পেলাম। মাকে গিয়ে বললাম, মা, বাবার সম্পত্তিতে ভাইদের যেমন অধিকার আছে, আমারও কিন্তু আছে। আমি কোনদিন এই সম্পত্তি চাইতাম না, যদি না আজকের মতো এমন দিন আসতো। মা ভীষণ রেগে গেলেন। বাবাকে ডেকে বললেন এমন হতভাগী মেয়ে কেন হলো আমাদের। জন্মের সময়ই কেন মেরে ফেললে না। নয়লে মেয়েরা কি কখনো বাপের বাড়ির সম্পত্তি চায়। আমি তো কোনদিন আমার বাবার কাছে সম্পত্তি চাই নাই। তুইও কোন সম্পত্তি পাবিনা৷
আমি তেড়ে বসলাম, বাবাকে বললাম, বাবা এই সম্পত্তি আমার চাইই। জীবনে কিছু করতে গেলে টাকার দরকার৷ তুমি পারবে হয়তো আমার আর আমার মেয়ের ভরণপোষণ করতে। কিন্তু আমি চাই না কারো উপর বোঝা হয়ে থাকতে। হাদিসেও আছে, মেয়েরা বাবার সম্পত্তির অংশীদার। আমাকে তুমি দিয়ে দাও আমার অংশ। আমি আমার মেয়েকে নিয়ে আলাদা থাকতে চায়। বাবা মা ভাই বোন মিলে সেদিনই আমাকে আমার সম্পত্তির অংশ দিয়ে দিলো। ভাইয়েরা সেদিন আমায় মনে মনে অনেক বদদোয়াই দিল। বোনেরা নাক ফুলিয়ে বসে আছে কেননা তাদের কোন অযুহাত নেই সম্পত্তি চাওয়ার। বাবা মাও মুখ ফিরিয়ে নিলেন। এখন আমি দুই পরিবারকেই হারালাম। কিন্তু এই ভেবে সান্ত্বনা পেলাম যে, আমার মেয়েটার একটা গতি এবার আমি করতে পারবো।
বিয়ে যখন করি, তখন আমি অনার্স থার্ড ইয়ারে ছিলাম। বিয়ের পর পড়া কনটিনিউ করিনি৷ তাই ভালো একটা চাকরির জন্য পড়াশোনা চালিয়ে নেওয়ায় ছিল আমার প্রথম কাজ। তাই বাবা থেকে নেওয়া সম্পত্তির অর্ধেক অংশ আমি বিক্রি করে দিলাম। তা দিয়ে আমার মেয়ের খরচ, আর আমার পড়াশোনার খরচ চালাতে লাগলাম। মাস্টার্সে উঠার পর নিজের এ্যাকাডেমিক প্লাস চাকরির পড়াশোনার চাপ বেড়ে গেলে মেয়ের দেখাশোনার জন্য একজন কাজের বোয়াও রাখলাম। তখন বাকি অর্ধেক সম্পত্তিও আমায় বিক্রি করতে হলো। দুয়েকটা টিউশনিও করাতাম যেন মেয়ে কোনদিক থেকে অভাব টের না পায়৷ সিঙ্গেল মাদার হয়ে জীবন কাটানো একটা সহজ কাজ নয়৷ অনেক কাঠখড় পোড়াতে হয়েছে। বহুকষ্ট, বহুধকল, বহুসাধনার পর অবশেষে আলহামদুলিল্লাহ, একটা ভালো জব পেয়ে গেলাম।
আর আমাকে ছেড়ে দেওয়া সেই কাপুরুষটার কথা কি বলবো! শুনলাম সে নাকি তিন লক্ষ টাকা যৌতুক নিয়ে দ্বিতীয় বিয়ে করে। একটি ছেলেও হয়েছে তার। কিন্তু আমার শ্বশুরমশায় নাকি পাঁচ লক্ষ টাকার জন্য তাকে তৃতীয় বিয়ে করানোর জন্য বউ খুঁজতেছে। হয়তো তাও করে নিবে। তাতে আমার কি! সে দশ দশটা বিয়ে করুক, আমার পিছন ফিরে তাকানোর সময় নেই। তাকে ভীষণ ভালোবেসেছিলাম। তাই ডিভোর্স দেওয়ার সাহস করে উঠতে পারি নাই। কিন্তু আমাদের মধ্যে কোন প্রকার যোগাযোগ নেই। এই পৃথিবীতে সম্পূর্ণ অচেনা দুটি প্রাণী হিসেবে দুজন দুইদিকে বাস করছি। তাকে আমি ঘৃণা করি, আবার তাকে আমি ভালোওবাসি। বলা যেতে পারে, ঘৃণাভরে ভালোবাসি।
আমার মেয়েটাকে আমি সম্পূর্ণ নিজের মতো করে গড়ে তুললাম। আমার বাবার স্বপ্ন ছিল আমাকে ডাক্তার বানাবে৷ সেই স্বপ্ন আমি আমার মেয়ের মাধ্যমে বাস্তবায়িত করলাম। আমার মেয়ে বড় ডাক্তার হয়েছে ঠিকই, কিন্তু তার মধ্যে কোনরকম অহংকারবোধ কাজ করতো না। একদম সাধাসিধে জীবন যাপন করতো। প্রতি সপ্তাহে আমার মেয়ে আর তার টিম বিভিন্ন গ্রাম ঘুরে ঘুরে গরীবদের ফ্রিতে চিকিৎসা সেবা প্রদান করতো। তাকে দেখলে গর্বে বুকটা ভরে যায়৷ একজন ভালো সন্তান আমি হতে পারিনি, ভালো স্ত্রী হতে পারিনি, ভালো পুত্রবধু হতে পারিনি৷ কিন্তু একজন ভালো মা হতে পেরেছি। এটিই আমার জীবনের সবচেয়ে বড় পাওয়া। সবচেয়ে মূল্যবান সম্পদ।
গল্পের বিষয়:
ভালবাসা
loading...

Share This Post

আরও গল্প

সর্বাধিক পঠিত