ভালোবাসার স্পর্শ

ভালোবাসার স্পর্শ
আমি কখনো প্রেম নামক কুসংস্কারটা বিশ্বাস করতাম না। বিশ্বাস করতাম না কোনো এক বর্ষণ মুখর দিনে আমার মনের আকাশেও অনিশ্চয়তার মেঘ কেটে গিয়ে বিদ্যুৎ চমকাতে পারে। হৃদয়ের গহীন অরণ্যে কোনো এক মায়াবতী হানা দিতে পারে এটা কখনোই কোনোদিন কল্পনা করিনি। কিন্তু যেদিন বুঝতে পারলাম আমার মনের ঘরে যুগ যুগ ধরে কোনো এক সুন্দরী অপরিমেয় ভালোবাসা নিয়ে বসতী স্থাপন করার জন্য অপেক্ষা করে আছে। সেদিন বুঝতে পারলাম প্রেম নামক কুসংস্কার টা আমাকে তাঁর মায়ায় বন্দী করে ফেলেছে।
যেদিন আমার রাজকন্যাকে প্রথম দেখলাম সেদিন আমি আমার জীবনের সবকিছুই ভুলে গিয়েছিলাম। আমার অতীত,বর্তমান,ভবিষ্যত সবকিছুই আমি ভুলে গিয়েিছলাম। আমার শুধু তখন একটা কথায় মনে হয়েছিল। এই মেয়েটার জন্মই হয়েছে আমার জন্য। বিধিতা সুনিপুণ দক্ষতায় খুব যত্ন করে আমার জন্য তাকে সৃষ্টি করেছেন। তাকে ছাড়া আমার এ জীবন অধরা,অপূর্ণ। আমি মন প্রাণ,হৃদয় দিয়ে খুব করে বিশ্বাস করি প্রথম দেখায় মানুষের মনে কারো জন্য প্রেম,ভালোবাসার তৈরি হতে পারে। যেমনটা আমার হয়েছে। আজকেই তাকে জীবনে প্রথমে দেখলাম কিন্তু তাকে দেখার পর আমার মনে হল তাকে আমি জনম জনম ধরে চিনি,যুগ যুগ ধরে দেখে আসছি,আমার পঁচিশ বছরের জীবন সংগ্রামে চলার পথে আমার সাথেই ছিলো সবসময়।
প্রথম দিন শুধু আড়চোখে চেয়ে ছিলাম কোনো কিছু বলতে পারিনি। তবে মেয়েটা আমার দিকে তাকালে আমি চোখ সরিয়ে নিতাম। মেয়েটা বুঝতে পারতো তাকে কেউ একজন দেখছে। কিন্তু আমার দেখাতে সে ব্যাখাত ঘটায়নি। হয়তো পাবলিক প্লেসে সিন ক্রিয়েট করতে চায়নি। কারণ মেয়েরা চাইলেই সবখানে সবকথা বলতে পারেনা,প্রতিবাদ করতে পারে না। বেশ কিছুদিন কেটে গেলো। অফিসের এসি মাইক্রো বাসে যাতায়াত করার থেকে লোকাল বাসে যাতায়াত করতে খুব বেশি ভালো লাগতো আমার। কারণ এই লোকাল বাসটাতেই তো আমার ছন্নছাড়া,অগোছালো জীবনের ভবিষ্যত নিহিত। কিন্তু এভাবে আর কতোদিন? আমি হয়তো রজনীগন্ধা না হতে পারি তবে ক্যাকটাস হয়েতো তাঁর মনের আকাশে মেঘ জমাতে পারবো।
তাঁর নাম জানি না,বাড়ি কোথায় সেটাও জানি না। তারঁ সাথে আজ পর্যন্ত কোনো কথাও বলা হয়নি। প্রায় একমাস হবে তাকে শুধু এই লোকাল বাসটাতেই দেখি আমি। হয়তো সেও আমাকে দেখে। তবে এতো এতো মানুষের ভীড়ে হয়তো বিশেষভাবে আমাকে মনে রাখবে না। তবে আমি যে হাজার হাজার মানুষের ভীড়েও তাকে খুঁজে নিবো সেটা হয়তো সে জানে না। শেষ বেলায় এসে সূর্য যখন পশ্চিম আকাশে হেলে পড়ে। তখন চারদিকে ঘনকালো অন্ধকার নেমে আসে। আমার জীবনেও হয়তো ভয়ংকর অন্ধকার নেমে আসবে যদি না আমি তাঁর সাথে কথা বলি। তাকে না জানাই তাঁর কেউ একজন আছে,যে প্রতিরাতে ঘুমাতে পারে না,ঠিকমতো খেতে পারে না,কোনো কিছুই ভালো লাগে না। কেউ একজন আছে যে তাকে নিয়ে অবচেতন মনে সপ্তম মহাকাশে ঘুরে বেড়ায় প্রতিনিয়ত।
আজ বাসা থেকে একটু আগেই বের হয়েছি। অপেক্ষা করছি অপরিচিত মেয়েটার জন্য। না না সে অপরিচিত হবে কেনো? হয়তো বা খাতা কলমে,বাস্তবে সে অপরিচিত। কিন্তু আমার কল্পনায় তাকে আমি শত সহস্র বছর ধরে চিনি। তাকে যখন দেখি তখন মনের ভিতর আলাদা একটা ভালো লাগা কাজ করে। মনে হয় সেতো বহুকাল বহু বছর ধরে আমারই ছিল,আমারই আছে,আমারই থাকবে। ওইতো মেয়েটা আসছে। কি আশ্চর্য! সে কি জানতো আজকে আমি তাঁর সাথে কথা বলবো। যতোদিন ধরে তাকে দেখছি কোনোদিন তাকে শাড়ি পড়তে দেখিনি। আজ কি এমন বিশেষ দিন যে শাড়ি পড়ল সে। ঘন কালো মারবেলের মতো টানা টানা চোখ দুটো যেনো আমাকে খুব করে কাছে টানছে। অমৃতের মতো ঠোঁট দুটো যেনো আমারই স্পর্শ পাবার জন্য এতো কাল ধরে যত্ন করে অপেক্ষা করছে। ছি ছি। কি ভাবছি আমি? আমি তো তাঁর দেহের স্পর্শ চাইনা,মনের স্পর্শ চাই।
দেখতে দেখতে সে বাস স্ট্যান্ডে এসে দাঁড়িয়ে গেলো আর আমি কল্পনার জগৎ থেকে বাস্তবে ফিরলাম। একটা সাদা কাগজে আমার ফোন নাম্বারটা লিখে তাঁর সামনে গিয়ে দাঁড়ালাম। এটা আমার নাম্বার,যদি কখনো সম্ভম হয় ফোন করবেন। বড্ড খুশি হবো। তাঁরপর সেখান থেকে চলে আসি। বাসায় এসে শুধু ভাবতে থাকি। কি দরকার ছিলো এসব করার? মেয়েটা কি ভাববে আমাকে নিয়ে?। এর চেয়ে প্রতিদিন তাকে দেখতাম,অনুভব করতাম এটাই ভালো ছিলো। এমন একটা কাজ করেছি যে মেয়েটার সামনে যাওয়ার মতো অবস্থা রাখিনি। মেয়েটা হয়তো ভদ্রতার খাতিরে ফোন নাম্বারটা নিয়েছিলো। কিন্তু নাম্বার নিলেইতো আর ফোন করবে না। দুদিন হয়ে গেলো কোনো ফোন আসলো না। হয়তো আমি চলে আসার পর ডাস্টবিনের ময়লা মনে করে সাদা কাগজটা ওখানেই ফেলে চলে গিয়েছে।
অনেকদিন চলে যাওয়ার পরেও যখন কোনো ফোন পেলাম না তখন সমস্ত লজ্জা ভুলে সেই বাস স্টপে যেতে লাগলাম। কিন্তু সেখানেও তাঁর দেখা পেলাম না। চাকরি করার জন্য খুব একটা সময় পেতাম না। তবে যখনই সময় পেতাম তখনই বাস স্টপে চলে যেতাম। কিন্তু তাকে পেতাম না। এভাবে অনেকটা দিন কেটে যায়। একসময় বুঝলাম আমি তাকে হারিয়ে ফেলেছি। আবার মনে হলো আমার ভালোবাসাটাতো মিথ্যা ছিলো না। হয়তো সেই আমার থেকে নিজেকে দূরে সরিয়ে নিয়েছে। দুই বছর পর বন্ধুর বিয়েতে এসেছি। আমি নাকি ইদানীং খুব মনমরা হয়ে থাকি। তাই সব বন্ধুরা মিলে নিয়ে এসেছে। একটু আনন্দ ফুর্তি করার ফলে যদি আমার মনটা সতেজ হয়। কিন্তু ওরাতো জানে না আমার মনটাকে সতেজ করতে পারবে ওই একজনই।
সবাই যখন বিয়ে বাড়িতে আনন্দ,উল্লাসে মাতোয়ারা। আমি তখন ওই অন্ধকার আকাশটার দিকে তাকিয়ে আছি। আর ভাবছি আমার অপরিচিত ভালোবাসার মানুষটাও এই আকাশের নিচেই আছে। হঠাৎ বুঝতে পারলাম পিছন থেকে আমাকে কেউ জড়িয়ে ধরে কাঁদছে। ঘুরে তাকাতেই দেখলাম আমার সেই লোকাল বাসের ভালোবাসাটা কাঁদছে। পাঠকরা বিশ্বাস করবেন কিনা জানি না। হয়তো আপনারা ভাবছেন এভাবে কেউ কাউকে ভালো করে না চিনে,না জেনে হঠাৎ করে জড়িয়ে ধরতে পারে। কিন্তু মেয়েটা আমাকে জড়িয়ে ধরেছিলো এটাই সত্য। সকল লজ্জা,ভয়,সংকোচ কে পিছনে ফেলে সে আমাকে জড়িয়ে ধরেছিলো। আমিও তাঁর চোখের জলটুকু মুছে দিয়ে পরম আদরে তাকে কাছে টেনে নেই।
পুনশ্চঃ মেয়েটার ওইদিন ভার্সিটি জীবনের শেষ দিন ছিলো এবং কিছুদিনের মাঝেই তার ফ্যামিলি বাসা পরিবর্তন করে। ওইদিন বাসায় যাওয়ার পথে তার ব্যাগটা চুরি হয়ে যায় সাথে নাম্বারটাও।

গল্পের বিষয়:
ভালবাসা

Share This Post

সর্বাধিক পঠিত