প্রেমিকা

প্রেমিকা
আমার বাসায় আজকে অনেক মানুষ। আমার বরের আজকে প্রমোশন হয়েছে। আত্মীয় স্বজনরা বাড়িতে গিজগিজ করছে।আমার বরের অফিসের বস, কলিগ সবাই এসেছে। সবার জন্য এটা একটা খুশির খবর। আমার কাছেও। কিন্তু আমি কেমন জানি। অদ্ভুত। সহজ হয়ে গলে হেসে পড়তে পারিনা। আমার অন্যান্য আত্মীয়রা যেভাবে স্বামী নিয়ে কথা বলতে পারে আমি পারিনা। আমি কি খারাপ? এই ত সেদিন আমার ফুফাতো বোন তয়া বলছিল ফোনে –
– জানিস তুশনি, তোর ভাই ত আমাকে চোখে হারায়। প্রেমে পাগল। সবার সামনে হাত ধরে টানাটানি করে! আমি ত লজ্জ্বায় লাল হয়ে যাই! বলতো বুড়া বয়েসে কি প্রেম!
কি অদ্ভুত ব্যাপার যে ওর বিয়ে হয়েছে মাত্র দুইমাস। আর আমার ছ’বছরের সংসার। দেখতে মোটামুটি সব ভাইবোনের চেয়ে ভালো ছিলাম বলে ইন্টার পড়তে পড়তেই বাবা বিয়ে দিয়ে দেন কিছু বলে উঠার আগেই। আর তয়ার প্রেমের সম্পর্ক। এরপর দুমাস আগে বিয়ে। আমি দীর্ঘশ্বাস ফেলে চুপ করে রই। খুব সংকোচে পড়ে যাই যে আসলে আমি এই সংসারে কি খুশি? নাকি পুরোটা ই মানিয়ে নেয়া। আমার নাম তুশনি। ভালো নাম ত্রিনিতা। বাবার আদরের সন্তান হওয়া স্বত্তেও বিয়ে ব্যাপার টা আমাকে আমার অমতেই দেয়া হয়েছে। আমি এরপর থেকে চুপ করে গিয়েছি। কারণ বলার নাই কেউই। কি বা বলব? বিয়ে করতে চাইনা? কি করতে চাই? পড়তে? সবাই ভাবত প্রেম ভালবাসা আছে। এর উত্তর কি দিব? তাই কথা বলাটাই ছেড়ে দিলাম। সবার কাছে হয়ে গেলাম কেমন জানি একজন।
ভাইবোন, আত্মীয় স্বজনরা বলাবলি করতে লাগল- বড়লোক ঘরের বউ হয়ে তুশনির অহংকারে পা মাটিতে পড়ে না! শুনে ও না শোনার ভান করে চলে গেলাম সংসার নামক জীবনে। ইন্টার পরীক্ষা দিলাম। ভালো করে পাশ করে গেলাম। বর এসে আমার ভর্তির সবকিছু নিয়ে গিয়ে ভার্সিটির ফর্ম তুলে দিল। লোকটা অদ্ভুত। ও আচ্ছা, উনার পরিচয় দেইনাই ত! আমার বর তয়ন, একজন ইঞ্জিনিয়ার। শুনেছি সসফটওয়্যার ইঞ্জিনিয়ার। আমি বিয়ের পরে কখনো জিজ্ঞেস করতে পারিনি। বিয়ের রাতে আমি যখন শাড়ি খুলছি উনি হুট করে ঢুকে ল্যাপটপ নিয়ে আবার বেরিয়ে গেলেন। আমি বাজখাঁই গলায় বলেছিলাম – ভদ্রতা টুকু শেখেন নাই? মেয়েদের ঘরে নক দিয়ে আসতে হবে!! উনি নির্লিপ্ত কণ্ঠে বললেন – তুমি ত মেয়ে না! আমার বিয়ে করা স্ত্রী। ২৮ ঘন্টা ৩৭ মিনিট আগে বিয়ে করেছি। এখানে লজ্জ্বার কিছুনাই৷ আমার বান্ধবি হলে নক করে আসতাম!! বিরক্তিকর কথা শুনে সে রাতে মেজাজ খিচিয়ে ঘুমিয়ে পড়ি।
তারপর থেকে টুকটাক কথা হত কিন্তু একসাথে এক ঘরে ঘুমাতাম না।আমি মারমুখী হয়ে অন্য ঘরে যেতাম উনি ডাকত না। এভাবে দু সপ্তাহ চলল।আমার শ্বাশুড়ি আসলেন গ্রামের বাড়ি থেকে। আমাকে খুব যত্ন করে খাইয়ে দিতেন। চুল বেঁধে দিতেন। শাড়ি পড়াটাও উনি শিখিয়ে দিয়েছেন। রান্না পারতাম না। উনি কাজ চালানোর মতো কিছু জিনিস শিখিয়ে দিলেন। গ্রাম থেকে বয়াম ভরে ভরে গুড়া মশলা ভাঙিয়ে এনে রেখে গেলেন। সাথে আমার জন্য হাতে ভাজা মুড়ি, খই, গ্রামের দই, সন্দেশ, নাড়ু, খাজা রেখে গেলেন। উনি যতদিন অব্দি ছিল আমি সত্যি বলতে খুব ভাল ছিলাম কারণ আমার সেই একলা বাসার সারাদিনের সাথি ছিলেন আমার বৃদ্ধ মা। যেদিন উনি চলে যান আমার খুব কষ্ট হতে লাগল। আমি ও জিদ করে বললাম – আমি ও গ্রামে যাব। থাকবনা ঢাকা!
আমার বর চোখ কপালে তুলে বললেন –
– মাথা কি গেছে?
– মুখ সাম্লে কথা বলো!! আমি থাকবনা এইখানে! আমি ও যাব। ব্যাগ গুছানো শেষ আমার!! আমার শ্বাশুড়ি আমার কথা শুনে হেসে কুটিকুটি হয়ে যাচ্ছেন। আমার বর রাগ করে বলল
– বিরক্ত কম করো ত! এখন তোমার যা-ওয়া হবেনা! মানুষ শ্বাশুড়ির সাথে থাকতে চায়না আর তুমি শ্বাশুড়ির সাথে যাওয়ার জন্য পাগল হয়ে গেছো? মানে সমস্যা কি তোমার? আমি মুখ গোজ করে রইলাম! আমার শ্বাশুড়ি আমাকে ডাক দিয়ে বললেন –
 -এইই সুন্দরী এদিকে আয়!!
– কিইই?
– আমি আবার আসব রে, তুই এত্ত মান করিস না!
– মা তোমার ছেলেরে বলো তার সাথে থাকবনা আমি, যাইতে চাই তোমার সাথে।
– কি যে কস পাগল!! স্বামীর সাথে থাক, ঘর সংসার টা কর, মন দিয়া, লেহাপড়া টাও করতে হইব নাকি!!
আর শোন আমার পোলারে এক্টু সোহাগ দিয়া রাখিস। বাপ মরা পোলা! হারাজীবন মুখ ফুইট্টা কিছু কয়না, এহোনো কইবনা! কষ্টে মইরা গেলেও কইবনা! বহুত ঢেড়স এই পোলা!! বুঝলি??? আমার শ্বাশুড়ি আমাকে রেখে চলে গেল গ্রামে। আমি আবার সেই বিশাল ঘরে একলা হয়ে গেলাম খাওয়া দাওয়া সব বন্ধ করে। হুট করে একটা বিকেলে আমার বর একটা ছোট কেক নিয়ে এলো বাসায়। আমি অবাক হয়ে জিজ্ঞেস করলাম –
– কেক কেন???
– শুভ জন্মদিন তাই
-কার?
– আমার প্রেমিকার!!
আমি হতভম্ব হয়ে গেলাম। লোকটা কি বলে। উনি কেক রেখে ঘরে গেলেন ফ্রেশ হতে। আমি টেবিলের কোণে বসে পড়লাম। এটা বিয়ের ছ মাস পরের কথা। তখনও এতটা সখ্যতা না হলেও টুকটাক কথা, বন্ধুত্ব গড়ে উঠেছিল আমাদের। কিন্তু উনার প্রেমিকা ছিল কখনও বলেন নি।আমি বাবাকে কল দিয়ে বলব আমাকে নিয়ে যেতে। একটা লম্পট লোকের সাথে থাকবনা যে তার স্ত্রীর সামনে প্রেমিকার জন্য কেক নিয়ে আসে। আমি সারাটা সন্ধ্যা মুখ ভার করে শুয়ে রইলাম। লোকটাও আমার সাথে কথা বলল না। কম্পিউটারে কাজ করতে লাগল। আমি কানতে কানতে কখন ঘুমিয়ে পড়ি জানিনা। মাঝরাতে আমাকে প্রবল ঝাকুনি দিচ্ছে কে?? আমি ধড়ফড় করে উঠে বসে দেখি তয়ন সামনে বসা। আমাদের শোবার ঘরে অনেক অনেক মরিচবাতি। জোনাকির মত।আমি ঘুম থেকে উঠে কিছুই বুঝতে পারছিলাম না। তয়ন আমাকে বলল
-ফ্রেশ হয়ে এসো।
– কি এসব?
-ফ্রেশ হয়ে এসো। আমি ফ্রেশ হয়ে এসে বসলাম। দেখি সেই কেক।কেকে লেখা – শুভ জন্মদিন প্রেমিকা তয়ন আমার সামনে বসে বলল-
-তোমাকে বিয়ে করেছি কিন্তু তখন ভালবাসতাম না।ভাবিও নি ভালবাসব। গত ছয়মাস ধরে তোমাকে দেখেছি, চিনেছি,ভালো লেগেছে, প্রেমে পড়েছি, এখনও পড়ছি। সে সূত্রে ত তুমি আমার প্রেমিকাই তাইনা??
কি জানি অদ্ভুত ভালো লাগা ছিল একটা এই সামান্য কথায়, আমি মানুষ টার দিকে তাকিয়ে রইলাম। প্রেম কি তা বোঝার আগেই যেহেতু বিয়ে হয়ে যায় সে অনুযায়ী এই অনুভূতি টাই আমার জন্য প্রেম। সেদিন থেকে আমি এক্টু এক্টু করে প্রেমে পড়লাম। এরপর থেকে শুরু হলো নতুন করে সংসার।প্রেমের সংসার। টুকটাক সংসার করি আর সুযোগ পেলে প্রেম করি দুজন। এরমধ্যে আমার অনার্স এর ভর্তি পরীক্ষা দেয়া হল। আমি ভার্সিটি তে চান্স পাই।
বিয়ের গোটা তিনবছর আমরা খুব সুখী প্রেমিক দম্পতি রইলাম ৪র্থ বছর ঘুরতে না ঘুরতে আমাদের মধ্যে কি জানি হলো। আমিও ব্যস্ত হয়ে গেসি। সেও। আমরা আগের মত কেউই কাউকেসময় দিতে পারিনা।এরমধ্যে আমার সংসারের দায়িত্ব বেড়েছে। রান্না করে ঘর সামলিয়ে ক্লাস করতে হয়। সামনে পরীক্ষা। আমাদের মানসিক দুরত্বটা বেশ বেড়েছে। আমি বহুবার আমার স্বামীর কাছে এব্যাপারে কথা বলতে চেয়েছি তার একটা ই কথা,
-তুমি ত ব্যস্ত,এখন তুমি শিক্ষিত, ক্যারিয়ার সচেতন। এতকিছু ভেবে সময় গুলো নষ্ট করোনা। আমি দমে যাই কথাগুলো শুনে। আমাকে কে কি সে বুঝতে চাইছেনা নাকি পারছেনা?
আমি আবার আগের মত মানসিক ভাবে অসুখী হতে থাকি। আমি আমি অনার্স শেষ করি। একটা স্কুলে চাকরির জন্য পরীক্ষা ও দেই। আজকে তার রেজাল্ট আসছে। চাকরি টা পেয়েছি আমি। স্যালারি ও ভালো। কিন্তু তয়নকে বলার মত সাহস পাচ্ছিনা কারণ সে আগের মত নেই। তাছাড়া আজকে তার ও প্রমোশন হয়েছে। সেটা নিয়ে বাড়ির সবাই খুব খুশি। আমি ভাবলাম, এসব বলবনা। কারণ শুধু শুধু সংসারে অশান্তি করবনা। তয়ন কে নিয়ে ভাববো। সংসার টা কে ভাবব। চাকরি করে কি হবে? টাকার অভাব ত পড়েনাই। আমি এসব নিয়ে ভেবে স্থির করলাম আমার এই চাকরির খবর কাউকে জানাবোনা।বরং স্বামীর প্রমোশন এ খুশি হব। সারাদিন ব্যাস্ত হয়ে রান্না করলাম, ঘর গোছালাম। আত্মীয় স্বজনরা বাড়িতে আসল।কথা বলতে গেলাম। সুন্দর করে সেজেগুজে সবাই কে নিয়ে গল্প করছি তাও কেন জানি চাপা কষ্ট!!
কিন্তু আমি কেমন জানি। অদ্ভুত। সহজ হয়ে গলে হেসে পড়তে পারিনা। আমার অন্যান্য আত্মীয়রা যেভাবে স্বামী নিয়ে কথা বলতে পারে আমি পারিনা। আমি কি খারাপ?আমি এ সংসারে অসুখী? কিন্তু আমি ত আমাদের সংসার কে ভালবাসি৷ আমার স্বামী কেও ভালবাসি৷ আমার স্বামী ও ভালবাসে তবে কেন এমন হচ্ছে?????????? আমার স্বামী তয়ন সবাই কে কি জানি বলছে। আমি সব ভাবনা করা বাদ দিয়ে ওর কথা শুনতে সামনে গেলাম। “সবাই আমার শুভেচ্ছা নেবেন।আমার কলিগ, আমার বস, আমার মা, আমার শ্বশুর বাড়ির সবাই, সকল আত্মীয় স্বজন ও৷ আমার বন্ধুবান্ধব দের কে অসংখ্য ধন্যবাদ আমার নিমন্ত্রণ গ্রহণ করার জন্য। আমার প্রমোশন হয়েছে এটা আমার জন্য একটা আনন্দের আনন্দের। আপনারা সবাই খুশি আমার আমার সাফল্যের জন্য। আর আমি এইমুহুর্তে খুশি আমার স্ত্রীর সাফল্যের জন্য। কারণ সে একটা স্কুলে প্রভাষক হিসেবে যুক্ত হতে যাচ্ছেন। সবার মধ্যে একটা গুঞ্জন!! আমি হতভম্ব হয়ে গেলাম।৷
আপনারা আমার জন্য কথা বলছেন কিন্তু আমাকে সাজিয়ে গুছিয়ে যিনি প্রতিনিয়ত এই প্রমোশন এর জন্য প্রস্তুত করেছেন তাকে অভিনন্দন জানাবেন। আমি খুব বাচ্চা একটা মেয়েকে বিয়ে করে একটা অসার সংসার নাম এই ফ্ল্যাট দিয়েছিলাম গত ছ বছর আগে। আমার স্ত্রী গত ছ বছর নিজের সবটা দিয়ে এই সংসার টা কে এত সুন্দর করে তুলেছে। আর আজকে আপনারা নিজেরা আমার ফ্ল্যাট, আমার সাফল্যের গল্প শুনে অভিনন্দিত করছেন। সে সংসার করেছে,পড়াশুনা ও এখন চাকরি ও করবে যদি সে চায়। আর আমি শুধু চাকরি করে সাফল্য অর্জন করেছি।আমি সবার কাছে খুব রুঢ় একজন কিন্তু এই মেয়েটার কাছে হতে পারিনি। কারণ সে খুব নরম একটা মানুষ। আর এইজন্য তাকে আমি প্রেমিকা ও স্ত্রী দুভাবেই অর্জন করতে পেরেছি।
বলতে পারেন এটা আমার একটা সাফল্য যার জন্য আমাকে অভিনন্দিত করতে পারেন। আজকে সবাই কে ডাকার কারণ আমার স্ত্রী ও আমার দুজনের নতুন জীবনের জন্য আপনাদের প্রার্থনা চাই। আর আমি যে আমার স্ত্রী কে অর্জন করতে পেরেছি তার জন্য আমি একটা অনিন্দ্য সুন্দর সময় পার করতে চাই বলে ই আপনাদের সাথে এত খুশির আয়োজন ভাগ করে নিলাম। আমাদের জন্য দোয়া করবেন।সবাই হৈচৈ করে উঠল খুশিতে। দেখছি মাথার উপরে ফ্যান থেকে সাদা বেলি ফুলের পাপড়ি পড়ছে আমার উপর। আমি কাঁদছি। লোকটা র উপর অভিমান করতে করতে ভালবেসে এখন কাঁদতে হচ্ছে!! খারাপ একটা লোক।!!! তয়ন এসে আমাকে জড়িয়ে ধরে বলল
– অভিনন্দন আমার প্রেমিকা আমি বলতে পারছিনা কিছু!! আমি ওর বুকে মুখ গুঁজে ভেউভেউ করে কাঁদছি!!!

গল্পের বিষয়:
ভালবাসা

Share This Post

সর্বাধিক পঠিত