গভীর ভালোবাসাময়

গভীর ভালোবাসাময়
মিতুকে আবার ফোন দিলাম। ধরলো না। কেটে দিলো৷ আশ্চর্য ব্যাপার! ফোন না ধরলে কীভাবে হবে? ফোন ধরলেই তো আমি তাকে কথাটা বলতে পারি। না ধরলে কীভাবে বলবো? এখান থেকে ডাক দিলে কেমন হয়? নাহ! এখান থেকে ডাক দেওয়াটা ঠিক হবে না৷ বরং ঝামেলা আরো বেড়ে যাবে৷ আশপাশের লোকজন নানান কথা বলবে৷ ওদের বাসার ভেতরে চলে যাবো নাকি? রাত প্রায় সাড়ে বারোটার বেশি বাজে৷ এতো রাতে কারো বাসায় যাওয়া ঠিক হবে? গিয়েও বা বলব কী? “আঙ্কেল, আসসালামুআলাইকুম। মিহিনের সাথে একটু কথা বলা যাবে? খুব আর্জেন্ট। প্লীজ৷” নাকি উনার কাছে বইয়ের ব্যাগটা দিয়ে বলব, “আঙ্কেল, বইটা মিতুর কাছে পৌঁছে দিবেন প্লীজ। এই মূহুর্তে বইটা না পেলে আপনার মেয়ে আমার সাথে কথা বলা বন্ধ করে দিবে৷ তার সাথে কথা না বলে থাকতে পারি না আমি। প্লীজ আঙ্কেল। এই উপকারটা করুন।”
এটা শোনার পর মিতুর বাবা কী করবেন? বোকার মতো আমার দিকে তাকিয়ে থাকবেন? নাকি রেগে গিয়ে গনধোলাই দিবেন? কে জানি! আমি মিতুদের বাড়ির সামনে অন্ধকারের আড়ালে দাঁড়িয়ে থাকলাম৷ তাকে বারবার ফোন দিতে থাকলাম। সে ফোন ধরছে না। না ধরার কারণটা বৃহৎ৷ দোষটা কিছুটা আমারই৷ কিন্তু আমার কিছুই করার ছিল না৷ আমি তো আর ইচ্ছে করে কিছু করিনি৷ এখন কী করি? এই মেয়ের তো কোনো সাড়াই পাচ্ছি না। ধ্যাত! আমি তাকে আবার কল দিলাম। আবার দিলাম। ধরলো না। বিরক্তি একদম চরম সীমানায় পৌঁছে গেছে। রাগ উঠতে থাকলো আমার। তবুও কোনো মতে নিজেকে নিয়ন্ত্রণে রাখলাম। স্থির হয়ে তাকে আবার ফোন দিলাম। যে করেই হোক! আজ তাকে ফোন তুলতেই হবে৷ এবার কল দিতেই রিসিভ করল মিতু। আমার স্বস্তি ফিরে এলো। গলা দিয়ে একটা ভারী দীর্ঘশ্বাস বেরিয়ে এলো। আমি তাড়াহুড়ো করে বললাম,
-কতোক্ষন থেকে ফোন দিচ্ছিলাম। ফোন ধরছিলে না কেন? মেয়েটা জবাব দিলো না। চুপ থাকলো৷ আমি আবারো বললাম,
-মিতু? মিতু এবারেও নিরুত্তর। বললাম,
-সেই কতোক্ষণ থেকে দাঁড়িয়ে আছি৷ আর কতো অপেক্ষা করাবে বলতো! ঠিক তখনই মিহিনের ভেজা স্বরটি ভেসে এলো,
-তুমি এখান থেকে চলে যাও প্লীজ।
-আরেহ! চলে যাবো মানে? এতো কষ্ট করলাম কী চলে যেতে?
-তোমাকে এতো কষ্ট করতে বলেছে কে হু? কে বলেছে? আমি তো বলিনি?
-তবুও। ওটা তোমার একটি ইচ্ছে ছিল। তোমার ইচ্ছের একটা দাম আছে না?
-হুহ! তা তো জানিই কেমন দাম আমার ইচ্ছের। তুমি প্লীজ চলে যাও এখান থেকে! আমার অসহ্য লাগছে।
-তুমি বললেই হবে নাকি? আমি যাবো না এখান থেকে।
-যাবে না মানে? সারারাত থাকবে নাকি?
-হ্যাঁ৷
-মানুষ দেখলে কী ভাববে?
-মানুষের ভাবনা দিয়ে আমি কী করবো?
-বেশি বাড়াবাড়ি হয়ে যাচ্ছে কিন্তু।
-তোমার জন্যে একটু আধটু বাড়াবাড়ি করাই যায়৷
-বেশ৷ এখানেই থাকো৷ তবে খবরদার, আমাকে আর ফোন দিবা না৷
-ফোন দিব…
কথাটা বলে শেষ করাই আগেই কল কাটা গেল। এই মেয়েকে নিয়ে সত্যিই আর পারা গেল না৷ সব কিছুকেই তার বাড়াবাড়ি মনে হয়৷ অথচ নিজে যে বাড়াবাড়ি করছে সেটা সে বুঝতেই চাইছে না৷ স্টুপিড!
তখন প্রায় সন্ধ্যা হয়ে গিয়েছে৷ আমি শাওয়ার নিয়ে প্রস্তুত হয়ে সবে বাসা থেকে বের হয়েছি। ঠিক সেই সময়েই মিতুর তৃতীয় কলটি আসে৷ ধরিনি। ঘড়ি দেখলাম। ছয়টা বেজে গিয়েছে অলরেডি। দেরি যেহেতু হয়েছে আরেকটু হোক৷ এক কাপ চা খেয়ে যাই৷ চা না খেলে মস্তিষ্ক ঠিকঠাক কাজ করবে বলে মনে হয় না৷ দোকানিকে চা দিতে বললাম। চা হাতে আসতেই মিহিনের চতুর্থ কলটি এলো। এই নিয়ে চারবার ফোন করা হয়ে গিয়েছে। একটাও ধরা হয়নি। আমি মোটামুটি নিশ্চিত আজ বেশ চমৎকার একটা ঝাড়ি শুনতে হবে মেয়েটার কাছ থেকে। খুবই চমৎকার একটা ঝাড়ি৷ চা হাতে থাকতেই তার আরেকটি কল চলে এলো। বড়ই যন্ত্রণার ব্যাপার৷ তাকে ‘দেরি হয়েছে’ এটা বলাও যাবে না৷ এখনও যে রওনাই দেইনি সেটাও বলা যাবে না৷ এটা বললেই সমস্ত প্ল্যান মাটি করে দিবে৷ বাসা থেকেই বের হবে না আর৷ আমার সাথে ফোনে কথা বলা, দেখা করা সব বন্ধ করে দিবে৷ মেয়েটা বেশ ভালো করেই জানে তার সাথে কথা না বলে আমি থাকতে পারি না৷ এ জন্যে সে ইচ্ছে করেই এমন করে। আমাকে শাস্তি দেয়। বড় অদ্ভুত এই মেয়ে৷ আমাকে নানান যন্ত্রণায় ফেলে।
তাকে নিয়ে আজ বই মেলায় যাওয়ার প্ল্যান। তার প্রিয় লেখকের একটা বই আসছে আজ৷ লেখকের নাম ‘শাকের আহমেদ।’ বইয়ের নাম ‘বৃত্ত বন্দী অন্ধকার।’ লেখক এবং তার বই দুটোর নামই বেশ অদ্ভুত ধরনের৷ আমার এইসবে তেমন বিশেষ আগ্রহ নেই। বই টই পড়ি না খুব৷ মিতুই যা পড়ে৷ আমার দায়িত্ব হচ্ছে তাকে নিয়ে মেলায় যাওয়া এবং বই কিনে দেওয়া৷ এছাড়া মেলায় তেমন যাওয়া হয় না৷ আজ যাওয়ার কথা ছিল বিকেলে। বিকেলবেলা কাজ ছিল আমার। সন্ধ্যায় যাবো বলেছিলাম। এখন সন্ধ্যার পর হয়ে গিয়েছে৷ আমি এখনও তার সামনে উপস্থিত হতেই পারিনি৷ প্রথমে তার কাছে যেতে হবে৷ তাকে সেখান থেকে নিয়ে যেতে হবে মেলার দিকে৷ বেশ সময়ের ব্যাপার৷ আশা ছিল দ্রুতই পৌঁছে যাবো৷ কিন্তু আশা করলেই কি আর সব ঠিক মতো হয়! হয় না৷ আজও হয়নি৷ তার কাছে পৌঁছাতে পৌঁছাতেই আমার সময় লেগে গিয়েছে অনেক। প্রায় আটটা বেজে গিয়েছে৷ তাদের বাসার কাছে গিয়ে ফোন দিলাম। মহারানী এক প্রকার দৌড়ে এলেন। রাগী চেহার নিয়ে দাঁতে দাঁত চেপে দ্রুত বললেন,
-এতোক্ষণ ধরে যে ফোন দিচ্ছি ধরোনি কেন? আমি মুখটা সরল করে বললাম,
-সাইলেন্ট করা ছিল৷ টের পাইনি। টুকটাক মিথ্যা কথা বলতে হয়৷ অন্তত কিছু ঝামেলা থেকে রেহাই পাওয়া যায়৷ মিতু বলল,
-এখন এটা কি টের পাচ্ছো যে আজকে বইটা না পেলে তোমার কী হাল হবে?
-ভয় দেখাচ্ছো নাকি?
-ভয় না৷ সাবধান করে দিচ্ছি৷ জলদি চলো।
-চলো। তবে এতো তাড়াহুড়োর তো কিছু নেই৷ বই অবশ্যই পেয়ে যাবো। কী বলো?
-আমার বইয়ের সাথে অটোগ্রাফও চাই৷
-সমস্যা নেই৷ তাও নেওয়া যাবে৷
-ভাইয়া রাত নয়টা পর্যন্ত মেলায় থাকবেন৷ এরপর চলে যাবেন৷
-মানে কী? নয়টা বাজে চলে যাবেন কেন?
-বিকেল তিনটে থেকে যদি তোমাকে এক জায়গায় বসিয়ে রাখা হয় তাহলে তুমি কতোক্ষণ বসে থাকতে পারবে বলোতো? আমি হাসলাম। বললাম,
-দশ মিনিটও পারবো না।
-তাহলে চিন্তা করে দেখো যে মানুষটা বিকেল তিনটা থেকে বসে বসে অটোগ্রাফ দিয়ে যাচ্ছেন, তার জন্যে তিনটা থেকে নয়টা পর্যন্ত বসে থাকাটা কতোটা পেইনফুল হবে।
-তা তো বটেই।
-দেরি কেন হলো?
-জ্যামে ছিলাম।
-সত্যি বলছো?
-আমি তোমাকে মিথ্যা বলতে পারি?
-পারবে না কেন? অবশ্যই পারো৷ তোমার মতো একজনের মানুষের দ্বারা সবই সম্ভব।
-বলছো কী?
-সত্যিই বলছি।
-বেশ রেগে আছো দেখছি!
-রাগার মতো কাজ করলে রাগবো না?
-অবশ্যই রাগবে৷ কিন্তু আমি তো এখন রাগার মতো কিছুই করিনি। মিতু চট করেই মাঝ রাস্তায় দাঁড়িয়ে গেল। আমার দিকে কঠিন দৃষ্টিতে তাকিয়ে বলল,
-কিছুই করোনি? আমি চট করেই কিছু বলতে পারলাম না৷ দ্রুত তার হাতটা ধরে ফেললাম। বললাম,
-সরি। কাজটা করতে করতে দেরি হয়ে গিয়েছিল।
-সেটা বলো৷ আমি খানিকটা সময় চুপ থেকে বললাম,
-এখনও রাগ করে থাকবে? মিতু জবাব দিলো না। আমি কোমল স্বরে বললাম,
-শাড়ি পরতে বলেছে কে হু?
-মানে কী?
-মানে শাড়ি কেন পরেছো?
-আশ্চর্য ব্যাপার৷ মেলায় যাবো অথচ শাড়ি পরবো না?
-পরবে৷ অবশ্যই পরবে৷ তবে তোমাকে এতোটা সুন্দর লাগবে কেন? আমার নিজেরই তো হার্টবিট ফাস্ট হয়ে যাচ্ছে৷ বাকিদের কী হবে?
মিতু চট করেই জবাব দিতে পারলো না৷ চুপ করে থাকলো। হঠাৎই যেন কোত্থেকে এক ঝাক লজ্জা এসে লেপ্টে বসলো মিতুর চেহারায়৷ সেই লজ্জাটা তার রক্তিম চেহারাটাকে হঠাৎই কেমন অনিন্দ্য করে তুলল। কী এক স্নীগ্ধতা তাকে আঁকড়ে ধরলো যেন৷ আমার এতো ভালো লাগলো! ইচ্ছে করলো এই মেয়েটাকে এখনই জড়িয়ে ধরি। বুকের ভেতর লুকিয়ে রাখি৷
এতটুকু পর্যন্ত সব ঠিকই ছিল। বাসে আমরা বেশ কাছাকাছি বসে ছিলাম। মিতুর মাথাটা আমার কাঁধে ছিল। সে আমায় নতুন বইয়ের গল্প বলছিল। নতুন বইয়ের গন্ধ তাকে কেমন মুগ্ধ করে তা বোঝাচ্ছিলো। আমি আনন্দ চিত্তে শুনছিলাম৷ মেয়েটা কী ভীষণ আস্থায় তার মাথা আমার কাঁধে রেখেছে৷ আমার হাত আঁকড়ে ধরে আছে৷ আমায় মুগ্ধ করছে। আমার এতো ভালো লাগছে যা বলার মতো না৷ আমি আনন্দ অনুভব করছি৷ অবর্ণনীয় এক শীতল আনন্দ৷ সেই আনন্দে জল ফেললো রাস্তার জ্যাম। কঠিন ধরনের একটা জ্যাম ধরেছে। কখন ছাড়বে কে জানে! নয়টা বাজতে বেশি দেরি নেই৷ লেখক সাহেব কী চলে যাবেন? আজ নতুন বই এসেছে বলে কি একটু বেশি সময় থাকবেন না।
থাকতেও তো পারেন৷ আমার মোটামুটি ভালোই আশা ছিল যে তিনি থাকবেন। কিন্তু জ্যামের কারণে এতো দেরি হলো যে সে আশাটুকুও মাটি হয়ে গেল। মেলায় পৌঁছাতে পৌঁছাতে সাড়ে নয়টার বেশি বেজে গেল। গিয়ে জানা গেল লেখক সাহেব নেই। বাসায় চলে গিয়েছেন। এবার আমি সত্যিই খানিকটা ভয় পেয়ে গেলাম। মিতুর দিকে আড় চোখে তাকালাম। মেয়েটা শূন্য দৃষ্টিতে স্টলটার দিকে তাকিয়ে আছে৷ তার চোখে মৃদু জল। আশা ভঙ্গের বেদনা৷ মুখটা কেমন কালো হয়ে গেল চট করেই। ফর্সা মানুষের মন খারাপ হলে সহজেই বুঝা যায়৷ চেহারা দেখেই বলে ফেলা যায়৷ মিতুর যে মারাত্মক মন খারাপ হয়েছে সেটা আমি বেশ ভালোই বুঝতে পারছি৷ হঠাৎই দেখলাম ওর চোখ থেকে এক ফোটা জল পড়ে গেল। মেয়েটা চট করে সেটা মুছে ফেলল৷ আশ্চর্য ব্যাপার। মেয়েটা কাঁদছে নাকি? কান্না আঁটকে রাখতে চাইছে? কেন? একটা বই কিংবা অটোগ্রাফের জন্যে? মিতু আমার দিকে তাকিয়ে ভেজা স্বরে বলল,
-আমি বাসায় চলে যাবো। আমি বললাম,
-এসেছি যেহেতু বইটা নিয়ে নেই৷ কাল অটোগ্রাফ নিবো।
-লাগবে না বই৷
-কী বলো?লাগবে না? মিতু কিছু বলল না। হাঁটা শুরু করলো৷ আমি হতভম্ব হয়ে গেলাম। তার পেছন পেছন দৌড়ে গেলাম৷ বললাম,
-তুমি দেখছি সত্যি সত্যি চলে যাচ্ছো?
-তোমার কি ধারণা আমি মিথ্যা বলছি?
-আমি ভাবলাম মন খারাপ করে বলছো?
-দেখো, রাগাবা না আমাকে৷ এখানে সিনক্রিয়েট করতে ইচ্ছে করছে না আমার।
-আশ্চর্য ব্যাপার। একটা অটোগ্রাফের জন্যে তুমি এমন করছো?
-একটা অটোগ্রাফের জন্যে? তোমার কি মনে হয়? আজকের এই ব্যাপারটা এটা প্রুভ করে না যে তুমি আমার প্রতি কতোটা কেয়ার করো? আমার জন্যে তুমি কতোটা ভাবো? আমি তোমার কাছে কতোটা গুরুত্বপূর্ণ? আমি আজ একটা ক্ল্যারিফিকেশন পেয়ে গেলাম যে তোমার কাছে আসলে আমার গুরুত্ব কতোটা আর তোমার কাজের গুরুত্ব কতোটা৷ আর তুমি যদি বুঝতে আজকের বই এবং অটোগ্রাফের ব্যাপারটা আমার জন্যে কতোটা গুরুত্বপূর্ণ তবে তুমি কথাটা বলতে না৷ কথাটা বলেই মিতু হাঁটতে থাকলো। আমি বললাম,
-মিতু? দাঁড়াও না! এভাবে চলে গেলে হবে? মিতু দাঁড়ালো না। দ্রুত পাঁয়ে হেঁটে চলে গেল। আমিও তার পেছন পেছন গেলাম। ভাবলাম তাকে বাসা পর্যন্ত পৌঁছে দিবো৷ কিন্তু তা করা গেল না৷ মিতু রিক্সায় উঠেই কঠিন স্বরে বলল,
-আমি একা একা বাসায় যেতে পারবো৷ তোমাকে আসতে হবে না৷
-বাসা পর্যন্ত নামিয়ে দেই?
-লাগবে না৷
-আরেহ! তুমি তো দেখছি রেগে যাচ্ছো? রাগটা একটু কমাও প্লিজ৷
-আমার রাগ কমই আছে৷ তোমার ভাগ্য ভালো যে আমি এখনও সেটা নিয়ন্ত্রণে রেখেছি৷ নিয়ন্ত্রণে না থাকলে বুঝতে আসলে কতোটা রেগে আছি আমি৷
-প্লীজ৷ মাপ করে দাও না৷
-এই একটা কথা তুমি এতোবার বলেছো যে এখন এটা শুনতেই আমার বিরক্তি লাগে৷ প্লীজ এই কথাটা আমার সামনে আর বলো না। মামা চলেন তো!
মিতু চলে গেল। আমি সেখানেই দাঁড়িয়ে থাকলাম কিছুক্ষন। মিতু মেয়েটা ভালোই রেগে গিয়েছে৷ কপালে কী আছে কে জানে! আমি মেলার দিকে গেলাম। এখানে দাঁড়িয়ে থেকে কাজ নেই৷ মেলায় যাওয়াটাই ঢের ভালো হবে৷ ততক্ষণ পর্যন্ত একটা বুদ্ধি বের করা যাক। আমি ফুটপাত ধরে হাঁটতে থাকলাম। ফ্রিলি হাঁটা যাচ্ছে না৷ মানুষের বেশ ভীড়। এতো ভীড়ের মাঝে আমার চিন্তা শক্তি যেন লোপ পেয়ে গেল। তবুও লোপ পাওয়া সেই শক্তি একটা বুদ্ধি বের করেই ফেলল। এবার সেটা কাজে দিলেই হয়৷ স্টল্র দেখলাম একটি সুন্দরী মেয়ে দাঁড়িয়ে আছে৷ আমি তার সামনে গিয়েই হাসি দিলাম। খানিকটা কোমল স্বরে বললাম,
-আসসালামু আলাইকুম।
-ওয়ালাইকুম আসসালাম।
-ভালো আছেন?
-আলহামদুলিল্লাহ। আপনি?
-আমিও ভালো আছি৷ শাকের ভাই আছেন নাকি?
-নাহ৷ উনি চলে গিয়েছেন৷ আপনি স্যারকে চিনেন? আমি খানিকটা চুপ থেকে মিথ্যা কথাটা বলেই ফেললাম,
-চিনি বলতে উনার বড়সড় একজন ফ্যান৷ উনার সাথে একটু বিজনেস নিয়ে আলোচনা ছিল। এ জন্যেই জানতে চাইলাম উনি চলে গিয়েছেন কি না।
-নাহ৷ নেই। বাসায় চলে গিয়েছেন৷
-ঠিকানাটা দেওয়া যাবে?
-আমি আসলে ঠিক জানি না৷ আপনি আমাদের প্রকাশক স্যারকে বলতে পারেন৷ উনি জানেন হয়তো৷
-আপনাদের প্রকাশক স্যার এখানে আছেন নাকি?
-হ্যাঁ৷ ওই যে লাল পাঞ্জাবী পরা লোকটা৷
-আচ্ছা৷ ধন্যবাদ।
বেশ ভীরু ভীরু ভাব নিয়ে প্রকাশক সাহেবের কাছে গিয়ে দাঁড়ালাম। ভদ্রলোক কারো সঙ্গে কথা বলছিলেন। কথা বলতে থাকা দু’জন ব্যক্তির মাঝে চট করেই ঢুকে যাওয়া যায় না। দৃষ্টিকটু লাগে। অভদ্রতাও বলা যায়। আমি উনার পাশে অল্প কিছু দূরে দাঁড়িয়ে থাকলাম। ভদ্রলোক হয়ত বুঝতে পেরেছেন আমি উনার সাথে কথা বলতেই এসেছি। উনি আমার দিকে তাকিয়ে বললেন,
-কিছু বলবেন?
-জি স্যার।
-বলুন।
-লেখক শাকের আহমেদকে একটু প্রয়োজন।
-সেক্ষেত্রে আমি কীভাবে আপনাকে সাহায্য করতে পারি?
-আমি আসলে উনার বড়সড় একজন ফ্যান। উনার সাথে কিছু ব্যক্তিগত আলোচনা ছিল। মোহাম্মদপুর থেকে এখানে উনার সাথে দেখা করতে এসেছি। জ্যামে পড়ে দেরি হয়ে গেল। এখন উনার সাথে দেখা করেই যাবো ভাবছি৷ আপনি কি উনার বাসার ঠিকানাটা দিতে পারবেন? ভদ্রলোক কিছু না বলেই ঠিকানাটা দিয়ে দিলেন। বললেন,
-দেখা করতে পারবেন না হয়তো৷ উনি খানিকটা অসুস্থ৷ আমি ভাবলাম ঠিকানাটা এতো সহজে পাওয়া যাবে না৷ কিন্তু পেয়ে গেলাম! কপাল ভালো দেখছি! সেই ঠিকানা নিয়ে আমি ভদ্রলোকের বাসার সামনে এলাম। দারোয়ান সাহেব গেটের কাছে দাঁড়িয়ে পানের রস গিলছিলেন। আমি উনার সামনে গিয়ে বললাম,
-স্যার বাসায় আছেন?
-আছেন।
-গেটটা খুলে দিন তো৷ একটু কথা আছে উনার সাথে।
-কী কথা?
-সেটা উনার সাথেই বলবো।
-জি না। যাওন যাইবো না। স্যারের শরীর খারাপ।
-আশ্চর্য ব্যাপার। উনি নিজেই তো আমাকে দেখা করতে বলেছেন। দারওয়ান মিয়া ভ্রু কুচকে বললেন,
-স্যার কইছিল?
-জি।
-কই? আমারে তো উনি বলেন নাই! আর উনি এই বাসায় আসলে কারো লগেই দেখা করেন না৷
-ভুলে গিয়েছেন হয়তো। তাছাড়া আমাকে এই ঠিকানাটাই তো দিয়েছেন৷
-বলেন কি?
-জি। এই ঠিকানাই।
-আইচ্ছা। দাঁড়ান। জিজ্ঞাইয়া আসি৷
-জিজ্ঞেস করার প্রয়োজন কী? আমাকে সঙ্গে নিয়ে গেলেই তো পারেন৷
-নাহ৷ স্যার রাগ করবো৷ উনার রাগ ঠিক বোঝন যায় না৷ দারোয়ান সাহেব ভেতরে চলে গেলেন৷ ফিরে এলেন অল্প কিছুক্ষণের মধ্যেই। বললেন,
-চলেন, স্যার ডাকছে আপনারে। আমি ভাবলাম আজ হয়তো আর অটোগ্রাফ নিতে হবে না৷ মিথ্যাটা ধরা পড়ে যাবে৷ মিথ্যা বলাটা ঠিক হয়নি৷ এই বোকামিটা না করলেও হতো৷ কিন্তু দারওয়ান মিয়া ভেতর যেতে বলল শুনে অবাকই হলাম। তার মানে মিথ্যাটা কি ধরা পড়েনি? যাক, ভালোই হলো। বসার ঘরে ঢুকতেই দেখলাম বেশ সুদর্শন এক যুবক বসে আছেন৷ আমার থেকে অবশ্য বয়সে বড় হবে৷ আমাকে দেখেই বসতে বললেন। তারপর জানতে চাইলেন,
-আপনার সাথে আমার দেখা করার কথা ছিল নাকি? আমি খানিকটা বিব্রতবোধ করলাম। কী বলব ভেবে পেলাম না। তিনি আবারও বললেন,
-কোন ব্যাপারে আলোচনার কথা ছিল? আমার অস্বস্তিবোধটা বেড়ে গেল। মিথ্যা বলে যাওয়াটা ঠিক হবে না৷ আমি বললাম,
-দুঃখিত। আমি আসলে মিথ্যা বলেছি স্যার।
-মানে?
-মানে আপনার সাথে আমার দেখা করার কথা ছিল না। ভদ্রলোক স্বাভাবিক স্বরেই বললেন,
-তাহলে? কেন এলেন?
-আসলে আমার প্রেমিকা আপনার অনেক বড় ফ্যান। আপনার এই বইটা সে আজই অটোগ্রাফ সমেত নিবে বলেছিল। আজই নিতে হবে না। কিন্তু আমার ব্যস্ততার কারণে তা হয়ে উঠেনি। আসতে দেরি হয়। এসে মেলায় আপনাকে পাইনি। না পাওয়ায় আমার ওই মানুষটা রেগে যায়৷ আপনি তো বুঝেনই। তাই একটা অটোগ্রাফের জন্যে মিথ্যা বাহানায় এখান পর্যন্ত এলাম। ভদ্রলোক কিছু সময় চুপ থেকে বললেন,
-দুটো কথা বলছি৷ কিছু মনে করবেন না৷
-জি বলুন।
-প্রথম কথা হচ্ছে যারা ব্যস্ত তাদের প্রেম করা উচিৎ নয়। যে সম্পর্কে ব্যস্ততা বেশি সেই সম্পর্ক অতি দ্রুতই ভাঙ্গে৷ আপনি কি বুঝতে পেরেছেন?
-জি।
-দ্বিতীয় কথাটি হচ্ছে, প্রেমিক হিসেবে মিথ্যে বলা যায় এবং অধিকাংশ প্রেমিকেরা মিথ্যা বলে। বলতে শিখে৷ কিন্তু ভাই আমি এসব একদমই পছন্দ করি না৷ আপনি মিথ্যা বলে আমার সময় নষ্ট করেছেন। এটা অন্যায়৷ আপনি আপাতত বিদায় হোন৷ আমি খানিকটা অনুনয় করে বললাম,
-প্লীজ স্যার! প্লীজ!
-এটা আপনার শাস্তি। অনুগ্রহ করে বিদায় হোন।
এই বলে তিনি ভেতরের ঘরে চলে গেলেন। দারোয়ান বেটা আমায় টেনে হিছড়ে বাসা থেকে বের করে দিলো৷ রাত তখন সাড়ে এগারোটা৷ আমি ওই ভদ্রলেখকের বাসার গেটের কাছে দাঁড়িয়ে আছি। আমার একটা অটোগ্রাফের প্রয়োজন। বিশেষ প্রয়োজন। তা না হলে আমার ওই মানুষটা আজ রাতে ঘুমাতে পারবে না৷ একদমই না৷ আমি দাঁড়িয়ে থাকলাম। দারোয়ান ভাইকে অনেক বুঝালাম। টাকা দিতে চাইলাম। সে নিলো না৷ তার একটাই কথা, “স্যার যেখানে না বলবেন, সেখানে না-ই। এরপরে আর কিছু নেই।” ভারাক্রান্ত হৃদয় নিয়ে পড়ে ছিলাম লেখকের দরজায়। কী করবো ভেবে পাচ্ছিলাম না৷ মন খারাপ৷ সব কিছুতেই এতোটা বেখেয়ালি হওয়া উচিৎ না৷ লেখক সাহেব হয়তো ঠিকই বলেছেন৷ ব্যস্ত মানুষের প্রেম করা উচিৎ নয়৷ মোটেও নয়৷ আমি সেখানেই দাঁড়িয়ে থাকলাম। তার ঠিক অল্প কিছু পরেই একটা অদ্ভুত ঘটনা ঘটলো৷ লেখক ভাই নিজেই বাসায় থেকে বেরিয়ে এলেন। তার হাতে দুইটি মগ। দারোয়ান সাহেব অবাক হয়ে তাকিয়ে আছেন৷ গেট দিয়ে বেরিয়ে লেখক সাহেব বললেন,
-আপনি এখনও যাননি? বলেই তিনি হেসে ফেললেন। আমি কী বলব ভেবে পেলাম না৷ তিনি আমার দিকে একটি চায়ের মগ এগিয়ে দিয়ে বললেন,
-একটা অপ্রাসঙ্গিক প্রশ্ন করে ফেললাম। বিব্রত হচ্ছেন না তো? আমি ফ্যাকাসে হাসি দিয়ে বললাম,
-জি না স্যার৷
-বড় ঝামেলার মাঝে আছি ভাই। মাথাটা ঠিক ভাবে কাজ করছে না৷ তাই অমন ব্যবহার করলাম। আপনি কি কষ্ট পেয়েছেন? আমি বললাম,
-জি না! কষ্ট কেন পাবো! অন্যায় করেছি বলেই তো এমন হয়েছে৷ মিথ্যা বলাটা ঠিক হয়নি৷
-তা ঠিক বলেছেন। আসেন। বসেন এখানে।
-আমি আপনার ছোট হবো স্যার। আমাকে তুমি করে বলবেন।
-আচ্ছা৷ আসো৷ ফুটপাতে বসে চা খাওয়া যাক। ফুটপাতে বসে চা খেতে তোমার অসুবিধে নেই তো? আমি দ্রুত মাথা নাড়লাম। কোনো অসুবিধা নেই৷ আমরা চা খেলাম। লেখকেরা সাধারণত সকলের সাথে মিশে না৷ গুটি কয়েক লোকজনে সাথে মিশে৷ কথাটা মিথ্যা নাকি? এই লোক তো আমার সাথে বসে চা খাচ্ছেন৷ তাও আবার ফুটপাতে! তিনি নিজ থেকেই বললেন,
-ফেমাস ব্যক্তিত্বরা যে সারাক্ষণ ব্যস্ত থাকেন এই কথাটি কি তুমি বিশ্বাস করেন? আমি মৃদু হেসে বললাম,
-জি। করি।
-কথাটা কিন্তু সত্য না৷ হ্যাঁ তাদের ব্যস্ততা থাকেই। তবে মাঝে মাঝে এরা ভীষণ একা হয়ে যায়৷ কথা বলার মতো একজন মানুষ পর্যন্ত খুঁজে পায় না৷ সকলেই ভাবে ব্যস্ত মানুষ, আপন মনেই ব্যস্ত আছেন৷ অথচ ভেতরেরটা কেউই জানে না৷ কেউই না।
আমি চুপ করে থাকলাম। কী বলবো ভেবে পেলাম না। আচ্ছা উনি কি আজ নিঃসঙ্গতা ভুগছেন? মাঝে মাঝেই ভোগেন? একা একা আছেন? প্রায়ই একা থাকতে হয়? উনার তো বিয়ে হয়েছে! স্যারের ওয়াইফ কি বাসায় নেই? আচ্ছা উনাদের মাঝে কি কোনো ঝামেলা চলছে? কে জানে! লেখক সাহেব সিগারেট ধরালেন৷ বললেন,
-দেখি বইটা দাও তো!
মিতুদের বাসার গেট খোলার শব্দ হলো৷ আমি মোবাইলে সময় দেখলাম৷ সাড়ে বারোটা বেজে গিয়েছে। তাকে লাস্ট কল দিয়েছি আধঘন্টা আগে৷ এরপর আর দেইনি৷ সে নিজেই দিতে নিষেধ করেছিল যাতে আর ফোন না দেই৷ তাই দেইনি৷ মনে মনে ভেবে নিয়েছি সে আজ দেখা না করলে এখানেই থেকে যাবো৷ কাল সকালে দেখা হলেই বইটা দিবো৷ আমি তাকে বইটা দিতে চাই৷ এটা তার বিশেষ প্রয়োজন। কেন প্রয়োজন তা জানি না আমি। জানতেও চাই না৷ আমার কাছে তার চাওয়াটার মূল্য বেশি৷ চাওয়ার কারণটা নয়৷ মিতু এগিয়ে এলো৷ আমি ফুটপাতের উপর বসে পড়লাম। ভীষণ ক্লান্ত লাগছে৷ মিতু কাছে আসতেই দেখলাম চোখ দুটো লালচে হয়েছে৷ কেঁদেছে নাকি? আশ্চর্য ব্যাপার! মেয়েটা কেঁদেছে? এতো কান্না করেছে? একটা বইয়ের জন্যে? এতো ইমোশনাল একটা মেয়ে! মিতু এসেই বইটা হাতে নিলো৷ পৃষ্ঠা উল্টিয়ে দেখলো অটোগ্রাফ আছে কি না৷ সেটা দেখেই ফিরতি পথে হাঁটা ধরলো৷ আমি অবাক হয়ে বললাম,
-চলে যাচ্ছো? মিতু চট করেই থেমে গেল। বলল,
-আমি এখানে তোমার চেহারা দেখতে আসিনি। সময় নষ্ট করার কোনো মানেই হয় না৷
-এখনও রেগে থাকবে?
মিতু ফিরেও তাকালো না আর। চলে যেতে থাকলো। আমি বসে থাকলাম। বুকের ভেতরটা খানিক হালকা লাগছে৷ হয়তো দায়িত্বপূর্ণ করায় দায়িত্বহীনতার ভারটা চলে গিয়েছে। সেখান এখন বিন্দু বিন্দু অভিমান, দুঃখ, কষ্ট এসে জড়ো হচ্ছে৷ কেন হচ্ছে? কিসের জন্যে? এতো কষ্ট করেও মিতুর রাগ না কমাতে পারার? আমার অবদান মিতুর মনের ভেতর প্রভাব না ফেলতে পারার? নাকি মিতু একটু হেসে কথা বলেনি বলে? কিসের ব্যাথা বুকের ভেতর? কেমন শূন্যতা? মেয়েটা এভাবে চলে গেলো কেন? একটু তো হাসতে পারতো? হাসি মুখে বিদায়টুকু দিতো! রাতের ঘুমটা অন্তত ভালো হতো। আমি উঠে দাঁড়ালাম। ক্লান্ত দেহ টেন ফিরতি পথ ধরতেই পেছন থেকে কে যেন ডাকলো।
-এই? কার স্বর এতো কোমল? এতো স্নিগ্ধ? এই স্বরটা কীভাবে মনের ভেতর এতো সুক্ষ্ণভাবে নিজের অধিপত্য বিরাজ করতে পারে? কীভাবে একটি মানুষকে পেছন ফিরে তাকাতে বাধ্য করে? স্বরটা আবার শোনা গেল,
-এই? এদিকে আসো? আমি পেছন ফিরলাম। মিতুর দিকে তাকাতেই খানিকটা অবাক হই আমি। তার কান্নভেজা চেহারাটা হঠাৎই কেমন করে উজ্জ্বল হয়ে উঠল! কী এক আলো যেন তাকে আঁকড়ে ধরলো। আমি কিছুটা এগিয়ে গেলাম। মিতুও এগিয়ে এলো। বলল,
-এসো! ওখানটায় বসি৷ অন্ধকারে। আসো না৷! কী পরিষ্কার বেদনাহীন তার স্বর! মিতুর রাগ কি পড়েছে? আমরা অন্ধকারে বসলাম। এখানটায় কোন দিকের আলোই আসে না৷ গাছের ছায়ায় কোমল অন্ধকার। মিতু বলল,
-বইটা কেন এতো কিনতে চাইছি জানতে চাইবে না? আমি অন্য দিকে তাকিয়ে বললাম,
-বইটা কিংবা সেটা কেনা নয়। আমার কাছে তোমার ইচ্ছেটা গুরুত্বপূর্ণ। তোমার সকল ইচ্ছে পূরণ করার সামর্থ্য আমার নেই মিতু৷ তবে যা হাতের নাগালে তা তো করাই যায়৷ মিতু হাসলো৷ আমি তার দিকে তাকালাম একটু৷ আবছা অন্ধকারে এই চেহারাটা আমি স্পষ্ট দেখছি৷ মেয়েটা কী ঘোর লাগা দৃষ্টিতে আমায় দেখছে। তার চোখমুখ ভর্তি তীব্র প্রশান্তি। যেন তার জন্যে এই অটোগ্রাফ নিয়ে আশাটা বৃহৎ কিছু। মাউন্ট এভারেস্ট জয় করার চেয়ে বেশি কিছু। সে যেন পৃথিবীর সবচে খুশি আজ। পৃথিবীর শ্রেষ্ঠ খুশির মন্ত্রটা সে পেয়ে গেছে। তার চেহারায় কেমন বিজয়ীর ছায়া৷ মিতু বলল,
-আমার প্রতি এমন দায়িত্ববোধ কি সব সময় থাকবে? আমি বিষন্ন গলায় বললাম,
-জানি না। বয়সের ভারে অনেক কিছুই পরিবর্তন হয় মিতু। আমি তোমায় মিথ্যা আশা দিয়ে আশাহত করতে চাই না৷
মিতু কিছু বলল না। আমার আরেকটা পাশে এসে বসলো। আমার হাতটা নিজের হাতে নিলো৷ টেনে নিয়ে চুমু খেলো হাতের উল্টো পিঠে৷ বলল,
-নতুন বই প্রথম দিন কিনে প্রথম দিনেই অটোগ্রাফ নেওয়ার একটা জেদ চেপেছিলো। ব্যস! এ জন্যেই এমন করেছি। তুমি কি কষ্ট পেয়েছো? আমি হাসলাম। বললাম,
-কষ্টের পরবর্তী সময়টুকু যদি এমন মধুময় হয় তবে আমি প্রতিদিনই এমন কষ্ট পেতে চাই৷ মিতু হাসলো৷ বলল,
-প্রতিদিন নয়৷ তাহলে তিক্ততা বেড়ে যাবে৷ আমি তিক্ততা বাড়াতে চাই না৷ তবে আজ যা হয়েছে ভালোই হয়েছে।
-ভালো কীভাবে? কতো কষ্ট করেছি জানো?
মিতু হাসলো৷ মৃদু শব্দ করে হাসা৷ বলল,
-আজকে যে অটোগ্রাফটা পেয়েছি সেটা আমার জীবনের শ্রেষ্ঠ অটোগ্রাফ। এমনকি এমন অটোগ্রাফ আর কেউ পেয়েছে কি না সন্দেহ!
-বিশেষ কী আছে এতে?
-দাঁড়াও৷ পড়ে শোনাই।
মিতু বইটা খুলল। তারপর পড়তে শুরু করলো, “পাঠিকা, আপনার এই মানুষটিকে আগলে রাখবেন। এমন মানুষ পৃথিবীতে আছে বলে মনে হয় না। এই মানুষটাকে হারিয়েছেন তো আপনি আপনার মূল্যাবার কিছু হারিয়েছেন৷ যা আর চাইলেও ফিরে পাওয়া যাবে না৷ ভালোবাসার অভেদ্য আবরণে আগলে থাকুক আপনাদের প্রেম, ভালোবাসা।” মিতুর পড়া শেষ৷ সে চুপচাপ আমার পাশে বসে আছে৷ আমি কিছু বলতে পারছি না৷ মুখ দিয়ে কথা আসছে না। কেমন জানি লাগছে৷ অদ্ভুত অনুভূতি হচ্ছে। মিতু বলল,
-শুনো? মিতুর স্বরটা কেমন ভেজা লাগলো। মেয়েটা কাঁদছে নাকি? বললাম,
-বলো। মিতু আমার সাথে মিশে গেল। বলল,
-আমার রাগটা একটু বেশিই। চামড়া ফাটা রাগ৷
-জানা আছে।
-বাকি জীবনটা সহ্য করে যেতে পারবে?
-চার বছর ধরে তো সহ্য করে আসছি৷ বাকিটাও পারবো৷ কী বলো? পারবো না? মিতু কিছুটা সময় চুপ থাকলো৷ বলল,
-আমার ভয় হয়৷ যদি হারিয়ে ফেলি?
-আমাকে ছাড়া থাকতে পারবে না? মিতু কিছুই বলল না৷ আমার হাতটা শক্ত করে চেপে ধরলো কেবল। আমি বললাম,
-কী? পারবে না? মিতু আমার একটা হাত নিজের কোলের উপর নিয়ে বলল,
-কথাটা ভাবতেই কেমন গা শিউরে উঠছে আমার৷ আমি হাসলাম। মিতু কিছু বলল না৷ চুপচাপ বসে থাকলো। আমি তার দিকে তাকালাম। তার মাথাটা উঁচু করে নিজের দিকে ফেরালাম। অবাধ্য চুল গুলো কানের পাশে গুঁজে দিয়ে বললাম,
-এই দুটো চোখ এবং তার ভেতর অস্পর্শী মায়ার টান, এসব উপেক্ষা করে থাকা যাবে? কে জানি! আমি হয়তো পারবো না। মিতু আমার দিকে তাকিয়ে বলল,
-হয়তো?
-নির্ভর করতে পারছো না? মিতু স্মিত হাসলো। বলল,
-নির্ভর না করেই কি চার বছর চলে এসেছি?
-ভালোই কথা শিখেছো দেখছি।
-তোমার থেকেই তো শেখা।
-তাহলে তো ওটাও এতো দিনে শিখে যাওয়ার কথা!
মিতু কথাটা যেন চট করেই বুঝতে পারলো। আচমাক কেমন জানি লজ্জা পেয়ে গেল। মাথাটা নিচু হয়ে এলো ক্রমেই। আমি বললাম,
-দেখি? এদিকে তাকাও তো? মিতু একটু স্থির হলো। তার নিঃশ্বাস কেমন জানি ভারী হয়ে এলো। আমি বললাম,
-তাকাও না? মিতু আমার দিকে তাকালো। আমি বললাম,
-আমার চোখে চোখ রাখো৷ ভালো করে তাকাও।
মিতু তাকালো এবং তাকিয়েই থাকলো। আমি এবার খানিকটা এগিয়ে গেলাম। মিতু চট করে নিজের চোখ দুটো বন্ধ করে নিলো। তার নিঃশ্বাস ভারী হচ্ছে ধীরে ধীরে৷ যেন তার সমস্ত কিছুই সপে দিয়েছে আমায়৷ আমি তার দিকে আরেকটু এগিয়ে গেলাম। নিজের পারিশ্রমিকটা আজ আদায় না করলেই নয়৷ মাঝে মাঝে এমন পারিশ্রমিকের জন্যে হলেও প্রতিবেলা কষ্ট করা যায়৷ অবশ্যই যায়৷ চারপাশে অন্ধকার। এই অন্ধকারটাও যেন ভীষণ গভীর ভালোবাসাময়৷ কিছু একটার টান যেন এতে মিশে আছে৷ গভীর ভাবে মিশে আছে।

গল্পের বিষয়:
ভালবাসা

Share This Post

সর্বাধিক পঠিত