ভালোবাসা

ভালোবাসা
আমার বউ এর বিয়ে ঠিক হয়েছে। ছেলে ইঞ্জিনিয়ার। আমার ভীষণ মন খারাপ। আম্মু আমার কাধে হাত রেখে সান্ত্বনা দিলেন। বললেন, ‘বাবারে, বউ কারো সারাজীবনের জন্য থাকে না। একদিন না একদিন তাকে বিয়ে করে আবার পরের বাড়ি যেতে হয় ই। কষ্ট হলেও সমাজের নিয়ম এটা। আমাদেরকে মেনে নিতে হয়।’
জানি আমি, বুঝিও। কিন্তু মন যে মানতে চায় না। বউএর হাসিমুখের দিকে তাকালে বুকের ভেতরটা ভেঙেচুরে যায়৷ সাড়ে চার বছরের সংসার আমাদের। সেই এক শীতে লাল বেনারসি গায়ে দিয়ে লাজুক মুখে আমার হাত ধরে গাড়ি থেকে নেমেছিলো ও। তারপর একসাথে কত স্মৃতি, কত সুখ দুঃখ, হাসি কান্না। জোসনা রাতে বেলকনিতে বসে চা খেতে খেতে রাজ্যের গল্প করা। প্রবল বৃষ্টির রাতে একই কাথার নীচে জড়াজড়ি করে শুয়ে একজন আরেকজনের উষ্ণতা অনুভব করা। উইকেন্ডে দুইজন মিলে সিনেপ্লেক্সে হাত ধরাধরি করে বসে সিনেমা দেখা। আমি আর ভাবতে পারিনা। চোখ ফেটে জল আসে। আচ্ছা, শান্তার কি একবারও কথাগুলো মনে পড়ছে না? মেয়েরা এতো নিষ্ঠুর কিভাবে হয়! শান্তা, আমার বিয়ে করা বউ। আমি তো এখনো ভালোবাসি ওকে। ও কি বাসেনা আমায়? শান্তা হাসিমুখে বিয়ের কার্ড পছন্দ করছিলো। আমার দিকে সোনালী রঙের একটা কার্ড বাড়িয়ে দিয়ে বললো, ‘দেখ তো ডিজাইন টা কেমন?’ আমি শান্ত মুখে বললাম, ‘খারাপ না, ভালোই।’ শান্তা খুশি হলো খুব। দোকানদারের দিকে চেয়ে বললো, এটাই ফাইনাল। ভেতরে লিখবেন, ‘আমার স্ত্রীর বিয়েতে অবশ্যই অবশ্যই আসবেন- ইতি, সোহাইল।’ কি, খুশি তো তুমি?
আমি অনেক কষ্টে হেসে মাথা নাড়ার চেষ্টা করলাম। না দেখেও বুঝতে পারছি, হাসিটা বড্ড ম্লান দেখিয়েছে। শান্তার চোখে কি সেটা ধরা পড়লো? খুব সম্ভবত না। নতুন বিয়ের খুশিতে ও এতোটাই আত্মহারা। আশেপাশের কিছু নজরেই পড়ছে না। কথায় আছে, মেয়েরা নাকি তাদের প্রথম বিয়ে করা বরকে ভুলতে পারে না কোনোদিন।’ এই মুহুর্তে আমি জানি এর থেকে বড় মিথ্যে আর নেই। সকালে ঘুম থেকে উঠে দেখি শান্তা ড্রেসিং টেবিলের সামনে বসে সাজুগুজু করছে। আমাকে উঠতে দেখে হাসিমুখে বললো, ‘রায়হান আসছে, ওর সাথে একটু বেরোবো।’ রায়হান ওর হবু বর। কথাটা শুনে হুট করে আমার মাথায় রক্ত উঠে গেল। কিচেনে গিয়ে রেগেমেগে আম্মুকে বললাম, ‘এসব কি, রায়হান আসছে মানে? শান্তা এখনো আমার বউ। অন্য ছেলের সাথে ঘুরতে যাবে কেন। হচ্ছেটা কি এসব!’
আম্মু বেশ কিছুক্ষণ চুপ করে থেকে বললেন, ‘আহ হা, তুই এতো রাগছিস কেন। বউমা ছেলেটার সাথে কিছুক্ষণ সময় কাটাক। দুইজন দুইজনকে ভালোভাবে জেনে বুঝে নিক। বিয়ের আগে বোঝাপড়াটা জরুরি। তাছাড়া আজ বাদে কাল রায়হানই ওর বর হচ্ছে৷ তুই বাচ্চা ছেলেদের মত করিস না। ফ্রেশ হয়ে আয়, নাস্তা দিচ্ছি।’ ব্রাশ করতে করতেই গাড়ির হর্ণ বাজলো। শান্তা হ্যান্ডব্যাগটা নিয়ে পড়িমরি করে ছুটলো দরজার দিকে। নীল রঙের যে কাতান শাড়িটা পরে আছে ওটা আমি ওকে আমাদের সেকেন্ড এনিভার্সারিতে গিফট দিয়েছিলাম। আমার সারা শরীর কাপতে লাগলো। রাগে নাকি দুঃখে বুঝলাম না। সম্ভবত এটা মিশ্র অনুভূতি।
আম্মু আমার প্লেটে আলু পরোটা উঠিয়ে দিতেই আমি প্লেট ঠেলে সরিয়ে দিলাম। তীব্র স্বরে বললাম, ‘খাবো না, খিদে নেই।’ আব্বু একবার আমার দিকে তাকালেন। কিছু বললেন না। আম্মু বললেন, ‘তুই এরকম কেন করছিস সোহাইল? মেয়েরা বউ হয়ে বাড়িতে আসেই আবার চলে যাওয়ার জন্য। এটা..!’ আম্মুর মুখের কথা কেড়ে নিলাম আমি, ‘হ্যা মা জানি। বউ কারো সারাজীবন থাকে না। এটা দুনিয়ার নিয়ম। আমাদের সাথেও একইরকম হয়েছে। ব্লা ব্লা ব্লা। সব জানি আমি। বাট আমি জাস্ট পারছিনা নিতে। আমার অসম্ভব খারাপ লাগতেছে। কেন লাগতেছে, তাও জানিনা।’ আমি হাতের উল্টোপিঠ দিয়ে চোখ মুছলাম। কিন্তু পানি থামলো না। ঝরঝর করে বেরোতেই থাকলো। দুই হাতে মুখ ঢেকে আমি ফুপিয়ে ফুপিয়ে কাঁদতে লাগলাম।
আব্বু কোমল গলায় বললেন, ‘এই খারাপ লাগা তোরই প্রথম না। সবারই লাগে। কতজনের তো ডিপ্রেশনের ঔষধ খাওয়া লাগে। সুইসাইড করে ফেলার ইতিহাসও কম নেই। আমারো লেগেছিলো যখন তোর আসল মায়ের বিয়ে হয়। তুই তখন খুব ছোটো। আমি দরজা বন্ধ করে চিৎকার দিয়ে কেঁদেছিলাম। পরে ঠিক হয়ে গেছে। সবারই ঠিক হয়ে যায়। তোরও হবে। তাছাড়া প্রথম বউএর বিয়েতে খারাপ লাগা বেশিই হয়। দেখবি তোর এর পরের বউএর যখন বিয়ে হবে তখন এর অর্ধেক খারাপও লাগবে না।’ আমি আব্বুর বাড়িয়ে ধরা টিস্যুপেপার দিয়ে চোখ মুছে বললাম, ‘খারাপ কি শুধু ছেলেদের লাগে? মেয়েদের লাগে না?’
– মেয়েদেরও লাগে। আরো বেশিই লাগে।
– তাহলে শান্তার কেন লাগছে না।
– লাগবে লাগবে, মাত্র বিয়ে ঠিক হলো। উত্তেজনায় বুঝতে পারছে না। বিয়ের দিন থেকেই বুঝবে। বিয়ের পরে কয়েকদিন ও তোর থেকেও বেশি কষ্ট পাবে।
আমি হতাশ ভঙ্গিতে মাথা নাড়ি, ‘তাহলে এই নিয়ম রাখার কি দরকার। সেই কয়েকশো বছর আগের মত একজনের সাথেই আজীবন সংসার করার নিয়ম থাকলেই তো ভালো হতো।’ আব্বু হাসলেন। বললেন, ‘মানুষ অনেক চিন্তাভাবনা করেই এই সিদ্ধান্ত নিয়েছে। বিয়ের কয়েক বছর পরেই আর আগের মত ভালোবাসা থাকে না। তখন শুরু হয় ঝগড়া, ঝামেলা, মন কষাকষি, একজন আরেকজনকে নানাভাবে দোষারোপ। মানুষ সুখে থাকতে পারেনা। এজন্যই চার পাঁচ বছর পরপর বর বউ চেঞ্জ করলে সবাই ই সুখী হয়। আমাদের পূর্বপুরুষদের মত এখন কোনো সংসারেই আর অশান্তি খুজে পাওয়া যায় না। পরকিয়া, ডিভোর্স, অশান্তি, ঝগড়াঝাটি নাই হয়ে গেছে। এই সমাজে সব সংসারে শুধু শান্তি আর শান্তি। আচ্ছা শান্তিই কি সব? ভালোবাসা কিছুই না?’ কথাটা বলতে গিয়েও বলতে পারিনা আমি। চুপ করে থাকি। বলে লাভ নেই। সমাজের নিয়ম এটাই। সমাজে থাকতে হলে মেনে নেয়া ছাড়া উপায় কি!
আস্তে আস্তে শান্তার বিয়ের দিন ঘনিয়ে আসে। চওড়া হতে থাকে শান্তার মুখের হাসিটাও। আমি হাল ছেড়ে দেই। বাসায় আত্মীয় স্বজন এসে ভরে যায়৷ আমার সব বাবা মা, তাদের সব ছেলে মেয়ে। আসে শান্তার সব বাবা মা রাও। সবাই খুব মজা করছে। সেদিন কে একজন আমাকে দেখে হেসে হেসে বললো, ‘তুমি কোনো কাজের ছেলে না বেটা। শান্তার মত মেয়েকে পেয়েও একটা বাচ্চা করে রাখতে পারলে না। তোমার পরের বউ এসে বলবে তুমি একটা অকর্মা।’ কথাটার মধ্যে হাসির কি ছিলো কে জানে। সবাই খুব হাসলো। আমার কিন্তু খারাপই লাগলো। কেন যেন মনে হলো, একটা বাচ্চা করে না রাখা ভুলই হয়ে গেছে। শান্তার স্মৃতিচিহ্নটা থাকতো। বউ সারাজীবন না থাকলেও ছেলেমেয়ে তো সারাজীবন ই থাকে। রাতে শান্তাকে কাছে টানতে গেলেই ও চোখমুখ শক্ত করে বললো, ‘কনডম কই?’
– ইয়ে মানে নাই তো।
ঝটকা দিয়ে সরে গেল শান্তা, ‘তোমার মতলব আমি বুঝিনা ভাবছো? আজ বাদে কাল আমার বিয়ে, এখন আমি কোনো ঝামেলা চাচ্ছি না। প্লিজ!’ আমার চোখে আবারো জল চলে আসলো। নিজের কাছে নিজেকেই খুব ছোট আর ঘৃণিত মনে হচ্ছে। সবাই এতো খুশি, আমি একা একা কেন দুঃখ পাচ্ছি। লজ্জায় অপমানে আমার কান্না আসলো। আমি শান্তার দিক থেকে উল্টো ঘুরে শুয়ে কোলবালিশে মুখ লুকালাম। শান্তা কি কিছু বুঝলো? পেছন থেকে জড়িয়ে ধরলো আমাকে। কোমল গলায় বললো, ‘দেখ সোহাইল, মানুষের জীবনই এমন। বউ আসবে আবার যাবে আবার আসবে। বউ কখনো সারাজীবন…!’
– চুপ।
– কি হলো?
– এই বালের থিওরি আমি জানি। আর শুনতে চাচ্ছি না। প্লিজ।
আজ শান্তার বিয়ে৷ সারা বাড়ি আলো ঝলমল করছে৷ ছোট বাচ্চারা নতুন জামাকাপড় পরে দৌড়াদৌড়ি করছে। সবার মুখে হাসি, আনন্দ, উল্লাস। বরের বাড়ি থেকে শান্তার জন্য শাড়ির সাথে সাথে আমার জন্য স্যুট পাঠিয়েছে। এটাই নিয়ম। সবাইকেই দিতে হয়। চকলেট কালারের স্যুটে আমাকে হ্যান্ডসাম লাগছে ভীষণ। সাজানো স্টেজে পাশাপাশি তিনটা চেয়ারে আমরা তিনজন বসে আছি। আমি, শান্তা আর ওর নতুন বর রায়হান। প্রথমবারের মত শান্তাকে কি একটু চিন্তিত মনে হচ্ছে? মুখের হাসিটাও নেই। আমাকে মিস করছে ও? নাকি নতুন সংসারের চিন্তা করছে? কে জানে! আম্মু আমার কানে কানে এসে বললেন, ‘শান্তার তিন নাম্বার মায়ের দ্বিতীয় পক্ষের মেজ মেয়েটাকে দেখ। শান্তার মতই দেখতে অনেকটা। তুই চাইলে কথা বলবো নাকি?’
– উফ মা, এখন আমি বিয়ের কথা ভাবছি না একদমই। যাও তো তুমি।
আমার কাছে সবকিছুই কেমন নেশা নেশা ধোঁয়া ধোঁয়া লাগছে। অন্যরকম এক ঘোরের মধ্যে আছি। লোকজন স্টেজে এসে একবার আমার আর শান্তার সাথে, আরেকবার রায়হান আর শান্তার সাথে আলাদা আলাদা ছবি তুলে নিয়ে যাচ্ছে। কারা আসছে, হাত মিলাচ্ছে, কি বলছে, কিছুই মাথায় ঢুকছে না আমার। রায়হান একবার বললো, ‘ভাইসাহেব, কাচ্চিটা খুব সুন্দর হয়েছে। খেয়েছেন নাকি? না খেলে খেয়ে আসুন। সবাই এতো এতো নিচ্ছে, ফুরিয়ে না যায় আবার।’
– হু।
– কাল রাতে খেলা দেখেছেন? বাংলাদেশ তো জিতেই যাচ্ছিলো। লাস্ট ঐ ছেলেটা ছক্কা না মারতে গিয়ে সিঙ্গেল নিলেই হতো। সাবেক প্লেয়ার মুশফিকের নাতি না ও?’
– হু।
কাজি সাহেব স্টেজে আসলেন। আইপ্যাড বের করে নোট নিতে লাগলেন। শান্তা বিভিন্ন তথ্য দিচ্ছে৷ আগের হাজবেন্টের নাম, কতদিন সংসার, বাচ্চা আছে নাকি নাই, কোনো অভিযোগ আছে কিনা৷ বিয়ের শাড়িতে শান্তাকে কি অদ্ভুত সুন্দর ই না লাগছে৷
আমার একটা ঘটনা মনে পড়ে গেল। দুইবছর আগের কথা। আমার সেদিন ভীষণ জ্বর ছিলো। জমে মানুষে টানাটানি অবস্থা। সারারাত না ঘুমিয়ে শান্তা আমার মাথায় জলপট্টি দিলো। সকালে আমি জ্বরের ঘোরে অজ্ঞান হয়ে গেলাম। এম্বুলেন্স এসে আমাকে হাসপাতালে নিয়ে গেল। আইসিইউতে ভর্তি করা লেগেছিলো সেবার৷ সপ্তাহখানেক বাদে সুস্থ হয়ে বাসায় ফিরে আসি। দুপুরে খাওয়ার সময় একসাথে খাবো বলে শান্তাকে ডাকলেও ও আসে না। আম্মু হেসে হেসে বলেছিলেন, ‘তোর বউ রোজা আছে। একমাস রোজা মানত করেছিলো তোর সুস্থ হওয়ার জন্য।’ আচ্ছা, রায়হান অসুস্থ হলেও কি শান্তা আবার একমাস রোজা রাখবে? আমি আর ভাবতে পারিনা। বাথরুমে যাওয়ার অজুহাত দিয়ে স্টেজ থেকে উঠে ঘরে চলে আসি। দরজা বন্ধ করে শুয়ে থাকি চুপচাপ। চোখ দিয়ে অনবরত জল গড়ায়। কতটা সময় যায় হিসাব রাখিনা। এতোক্ষণ বিয়ে পড়ানো হয়ে যাওয়ার কথা।
হঠাৎ বাইরে থেকে ভীষণ হট্টগোল ভেসে আসে। আমি ক্লান্ত পায়ে দরজা খুলে বের হয়ে দেখি সবার চোখমুখ শুকনো। কিছু একটা ঠিক নেই। কি ঠিক নেই? রায়হানের বাবা রাগি রাগি মুখে বলছেন, ‘এরকম কিছু আপনাদের থেকে আশা করিনি। আমাদেরকে আগে বলা উচিত ছিলো। কাজটা ঠিক করলেন না আপনারা। আমি এর শেষ দেখে ছাড়বো। রায়হান, বাসায় চল। এই বিয়ে সম্ভব না।’ বিয়ে ভেঙে গেছে? হোয়াট! কি হলো এমন? কে যেন পাশ থেকে বললো, ‘বউ কবুল বলার আগে বমি করেছে। বউ প্রেগন্যান্ট।’ আরেকজন বললো, ‘কতবড় শয়তান মানুষ এরা। বউএর প্রেগনেন্সি লুকায় রেখে বিয়ে দিতে চায়। সন্তানের দায়িত্ব অন্যের ঘাড়ে চাপানোর ষড়যন্ত্র। এদের শাস্তি হওয়া উচিত।’
আমি আশেপাশে তাকিয়ে কোথাও শান্তাকে দেখিনা। ও সম্ভবত ঘরে চলে গেছে। বাসার সবার ভীষণ মন খারাপ। শান্তার আসল মা খুব কান্নাকাটিও করলেন। স্বাভাবিক। এইধরনের কোনো কারণে বিয়ে ভেঙে যাওয়া ভালো কোনো বিষয় না। মেয়ের ভবিষ্যৎ জীবনে খুব বাজে প্রভাব পড়ে। রাতে আমি শান্তাকে বলি, ‘দেখ, আমি স্যরি। আমি আসলে বুঝছিনা কিভাবে কি হলো। লাস্ট যতবারই আমরা ওটা করেছি, প্রটেকশন নিয়েছিলাম। আমি কালই তোমাকে ডাক্তারের কাছে নিয়ে যাব৷ যত দ্রুত সম্ভব এবরশন করিয়ে ফেললে রায়হানকে বোঝানো যাবে হয়তো।’
– চুপ।
– কি হলো?
– ডাক্তারের কাছে যাওয়া লাগবে না।
– মানে কি, কেন? শান্তা মুচকি হেসে বললো, ‘আমি প্রেগন্যান্ট না।’
– হোয়াট! কি বলছো এসব।
– হ্যা, আমি ইচ্ছা করে বমির ভান করেছিলাম।
– কিন্তু কিন্তু মানে কি, কেন, আমি ঠিক…!
শান্তা আমার ঠোটে আঙুল দিয়ে চুপ করিয়ে দেয়। আস্তে আস্তে বলে, ‘মনে আছে একদিন রাত দেড়টার দিক আমি মজা করে বলেছিলাম, আমার ভীষণ ফুচকা খেতে ইচ্ছা করছে। তারপর আমি ঘুমিয়ে গেলে তুমি সেই রাতে ফুচকাওয়ালার বাসায় গিয়ে তাকে জোর করে টাকাপয়সা দিয়ে নিয়ে আসো। রাত তিনটার দিকে আমি ঘুম থেকে উঠে দেখি আমার বিছানার পাশে টেবিলে একশোটা ফুচকা রাখা। সেদিনই আমি ডিসিশন নিয়েছিলাম, যা ই হোক না কেন, আমি সারাজীবন তোমার সাথে থাকবো। সেই একশো বছর আগের মতন। আমরা একসাথে বুড়ো হবো।’
আমি ভীষণ অবাক হই, ‘তাহলে এইযে এতো বিয়ের নাটক কেন করলে। কার্ড পছন্দ, শপিং, সাজুগুজু।’
– হিহি, তোমাকে পরীক্ষা করলাম। দেখলাম, আসলেই আমাকে ভালোবাসো কিনা। তোমার অবস্থা দেখে আমার এতো হাসি পাচ্ছিল কি বলব। ছেলেমানুষ এতো ভেঙে পড়ে কখনো! আমি আবার চোখ মুছি। বলি, আমি তোমাকে অসম্ভব ভালোবাসি শান্তা।
– থাক, আবার কান্না করা লাগবে না। ঢং। এতোই যখন ভালোবাসো তাহলে বলোনি কেন। ঠিকই তো বিয়ে হয়ে যাচ্ছিল আমার। একবার অন্তত বলতে যে, যেওনা। একবার বলে দেখতে।
– ভেবেছি শুধু শুধু বলে লাভ কি। এটাই তো দুনিয়া নিয়ম। হাসে শান্তা, ‘নিয়ম হলে কি হবে। নিয়ম চেঞ্জ হতে পারে না? মানুষের সুখের চাইতে সমাজের বানানো নিয়ম কি বেশি জরুরি? মানুষ চাইলেই নিয়ম চেঞ্জ হবে। একটা সময় নিয়ম ছিলো বর মরলে বউকেও পুড়িয়ে ফেলা হবে। আরো পরে নিয়ম ছিলো বিধবাদের কোনোদিন বিয়ে হবে না। এরকম কত নিয়মই তো ছিলো সমাজে। চেঞ্জ হয়েছে না? আমি হঠাৎ শান্তার হাত ধরে ভয়ে ভয়ে বলি, ‘আমরা সারাজীবন একসাথে থাকবো এটা শুনলে সবাই খুব ক্ষেপে যাবে। জনগন মেনে নেবে না। ওদের বিবাহানুভূতিতে আঘাত লাগবে। আমাদেরকে মেরেও ফেলতে পারে।’
– জানি আমি, শান্তার চোখেমুখে অদ্ভুত প্রশান্তি। তুমি আমার সাথে থাকলে আমি সবার সাথে লড়তে পারি৷ তুমি থাকবা আমার পাশে।
– হ্যা থাকবো। সারাজীবন।
পরিশিষ্টঃ (চল্লিশ বছর পর)
আমাদেরকে বাসা থেকে বের করে দেয়া হয়েছিলো। পুলিশ ওয়ারেন্ট বের হয়েছিলো। ধরতে পারলে যাবজ্জীবন হতো। মেরে ফেলার জন্যও খুজছিলো উগ্র সমাজবাদীরা। আমি আর শান্তা কোনোমতে পালিয়ে বান্দরবন চলে আসি। এখানে কেউ চেনেনা আমাদের। পাহাড়ের পাশে ছোট্ট একটা ঘর বানিয়ে থাকি আমরা। আমাদের প্রায় প্রায় ই ভীষণ ঝগড়া হয়। শান্তা রাগ করে বলে, ‘তোমার সাথে সংসার করাই আমার ভুল হয়েছে। আমি বলে পারলাম, অন্য কেউ তোমাকে এতোদিন সহ্য করতে পারত না।’
আমি রাগ করে বলি, ‘তুমি আমার জীবনটা ধ্বংস করে দিলে।’ তারপর কোনো এক রাতে আকাশে বিশাল চাঁদ উঠলে আমাদের কাঠের বারান্দায় দুইকাপ চা নিয়ে পাশাপাশি বসি আমি আর শান্তা। শান্তা আমার কাধে মাথা রাখে। আমি আলতো করে ওকে জড়িয়ে রাখি। রাতজাগা একটা পাখির ডাক শুনতে শুনতে তখন মনে হয় আমাদের যেন ঠিক গতকালই বিয়ে হয়েছে। হ্যা, অন্যদের মত আমাদের সংসারে বিশাল শান্তি হয়তো নেই। কিন্তু, ভালোবাসা তো আছে!

গল্পের বিষয়:
ভালবাসা

Share This Post

আরও গল্প

সর্বাধিক পঠিত