খুঁজে নাও ভালোবাসা

খুঁজে নাও ভালোবাসা
ডিভোর্সি মেয়েকে বিয়ে করতে চাইছিলাম মা কানে কানে বলে।
-“কি বলিস এসব।এই মেয়ে’কে বিয়ে করবি।ওর জন্য দ্বিতীয় স্বামী রোড এক্সিডেন্টে মারা গেছে” মা’র কথা গুলো শুনে হাসি চেপে রাখতে পারলাম।ঠোট বাঁকিয়ে হেসে বলি…
– এই যুগেও কুসংস্কার নিয়ে আছো আর বাঁচা-মরা সব সৃষ্টিকর্তার হাতে।মনে হয়না মেয়েটার কোনো দোষ আছে।
– কিন্তু! আমি মাকে থামিয়ে দিলাম।
– কোনো কিন্তু না।জীবনটা আমার, আমারও অধিকার আছে পছন্দ-অপছন্দের কথা বলার।ডিভোর্সি মেয়েকে বিয়ে করা কোনো পাপ কাজ নয়। এমন কাউকে বিয়ে করা অনেক ভাগ্যের ব্যাপার।আমি করতে পারলে নিজেকে অনেক ভগ্যবান মন করবো।
– আরেক বার ভেবে দেখ।নিজের এক মাত্র সন্তান’কে হারাতে চাইনা।নিজের জীবন ধ্বংস করিস না।যদি তোরও এক্সিডে…! আবারও থামিয়ে দিই মাকে।
– আগের যুগের কুসংস্কার রাখো তো।কপালে মৃত্যু লেখা থাকলে এমনেই মরতে হবে। ডিভোর্সি মেয়ে’কে নিজের বউ বানাতে চাওয়ার জন্য মা’র মুখটা ইদানিং খুব বেশিই শুকনো লাগে।আমার সাথে তেমন কথা বলে না।শুধু পাত্রী দেখে আসার পর একটা কথাই বলে ছিল “কত স্বপ্ন আর ইচ্ছা ছিল মনের মতো বউমা হবে।শেষ বয়সে একটু সুখ আসবে।বউমা’কে সংসারের চাবি তুলে দিয়ে একটু শান্তির নিঃশ্বাস ছাড়বো।তা আর হলো না” এক ফালি হাসি খেলে গেলো মুখে।শুধু বলে ছিলাম “সময় হলেই প্রমাণ পাবা বউ হিসাবে কে কেমন”। বিয়ের ঠিক পরদিন ডাইনিং টেবিলে খেতে বসেছিলাম।নতুন বউ (অর্ণিয়া নাম) পাশে চেয়ার টেনে বসতেই মা’র মুখ মলিন হয়ে গেলো।তারাহুরা করে খেতে খেতে মা বলে আমাকে…
– সমাজের মানুষ কি ভাববে? শেষে কিনা ডিভোর্সি মেয়ে’কে বউ করে মন্ডল বাড়ির মানুষ। অর্ণিয়া ইচ্ছে করেই প্লেটে অল্প পরিমাণ ভাত বেরে নিলো।নতুন শ্বাশুড়ির কটু কথায় তার পেট অনেক আগেই ভড়ে গেছে।বুক ফেটে কষ্ট বের হওয়ার চেষ্টা করছে কিন্তু পাথর পাচা দিয়ে রেখে খাচ্ছে।চটজলদি খেয়ে উঠে গেলো।মা’র দিকে রাগি চোখে তাকিয়ে বলি…
– দিলে তো মেয়েটার মন ভাঙ্গিয়ে।না জানি কত কষ্ট পাচ্ছে মনের ভেতর। অর্ণিয়ার সামনে এমন কথা না বললেও পারতে।এমন ভাবে বলছিলে মনে হয় ডিভোর্সি মেয়ে’কে বিয়ে করে উপকার করেছি।
– এখনই বউয়ের উপর এতো ভালোবাসা।কিছু দিন পর ভুলেই যাবি মা-বাবাকে।তোর কারণে তোর বাবা বাজার করতে গেলে লোকে কটু কথা বলে।শুনতে মনে হয় বেশ ভালো লাগে তোর।
– এদের কেউ ভালোবসতে বা বিয়ে করতে চায় না কেন জানো? কেননা ডিভোর্স হওয়া মেয়েদের’কে আমরা এবং আমাদের সমাজের সবাই এক দৃষ্টি-ভঙ্গীতে দেখি আর বলি সে অলক্ষী তাই তাকে কি বিয়ে করা যাবেনা।সে কি সংসার জীবনটা বুঝে না।মেয়েটি কি আর স্বামীর ভালোবাসা পাবে না।তারও অধিকার আছে।আমি দেখতে এতোটাও সুন্দর কোনো পুরুষ না, যে কেউ আমাকে বিয়ে করতে চায়বে।কত গুলো বিয়ে ভেঙ্গে গেছে কল্পনা করতে পারো।যারা কষ্ট পায়, আমার মনে হয় তাদের মত সুখে স্বামীকে কেউ রাখতে পারবে না।তারা অভিশাপ নয় তাদের ও আমাদের মত ভালোবাসা পাওয়ার ইচ্ছে আছে। আমাদের প্রয়োজন সমাজের কথা কান না দিয়ে ভালোবাসা খুঁজা।বেশির ভাগ মেয়ের ডিভোর্স ‘ হয় কেন জানো কি? বিয়ে হওয়ার পর বিভিন্ন কারণে শ্বশুর বাড়ির লোকেরা মেয়েটিকে অপছন্দ করে। ছেলে বাচ্চার জন্য চাপ দেয়। বাড়ী থেকে টাকা আনার জন্য চাপ দেয়। ঠিক এরপর থেকে ‘মেয়েটার ভুল ধরতে শুরু করে আর সমাজের কাছে সত্যি খারাপ হয়ে যায় সে’।
ডিভোর্স দিয়ে ছেলেটা আরেকটা বিয়ে করে নিলো। আর মেয়েটা হয়ে গেলো খারাপ।কেননা সবাই বলে হয়ত মেয়েটা ভালো ছিল না তাই হয়তো ছেলেটা বিয়ে করছে কিন্তু এটা জানার চেষ্টা করে না যে হয়তো পরিবারের ইচ্ছে গুলো মানতে গিয়ে মেয়েটার এই অলক্ষী উপাধি পেতে হলো। হাতের কবজি ধুয়ে উঠে দাড়িয়ে বলি কথা গুলো।গলা শুকিয়ে গেছে এতো গুলো কথা বলে।এক গ্লাস পানি দিয়ে গলা ভিজিয়ে নিলাম।রুমের জানালার কাছে অর্ণিয়া দাড়িয়ে আছে।নীল আকাশের দিকে তাকিয়ে। পিছন থেকে জড়িয়ে ধরতেই চমকে উঠে।কাঁদতে কাঁদতে চোখ লাল হয়ে গেছে।খুব বেশি কাঁদলেই চোখ লাল হয়।মধ্যে আঙ্গুল দিয়ে চোখের জল মুছে দিই…
– একি তুমি কাঁদছো।তোমার চোখে পানি দেখলে আমি ইমোশনাল হয়ে যায়।কাঁদবে না। অর্ণিয়া বুকের উপর ঝাপিয়ে পরে।নদীর শ্রোতের মতো চোখ থেকে জল চুইয়ে পরছে আমার শার্টে।মাত্র কিছু সময়েই শার্ট ভিজে গেলো।শক্ত করে বুকে জড়িয়ে ধরে বলে…
– মাঝে-মাঝে মনে হয় আমি আপনাকে ঠকিয়েছি।দুইটা বিয়ে হওয়ার পরও বিয়ে করেছেন।আমি কুমারী মেয়ে না জানার পরও।
– ভালোবাসা কুমারীত্ব দেখে হয়না..রে পাগলী।মন থেকে ভালোবাসতে হয়।ভালোবাসা অনুভব করতে হয়।সমাজের কটু কথায় কান দিবা না।অন্যর ভুল ধরা কিছু মানুষের সভাব।একদিন মা ঠিকই বুঝতে পারবে।মা’র মন জয় করার চেষ্টা করা চালিয়ে যাও। সপ্তাহ খানেক পর সকাল সকাল মা’কে জোর করে ঘুম থেকে তুলে ছাদে দাঁড় করলাম।ভ্রুকুঁচকে তাকায় মা তারপর বলে…
– সাত সকালে ছাদে আনার কারণটা কি? আঙ্গুল তুলে দেখায় সামনের বাড়িটা।রোজকার দিনের মতো আজও শ্বাশুড়ি আর ছেলে’র বউয়ের সাথে ঝগড়া চলছে।বাড়িটাতে ঝগড়া লেগেই থাকে।পাড়া-প্রতিবেশী ঝগড়ুটে পরিবার বলেই চিনে থাকে।বেশ কিছু সময় তাকিয়ে থেকে বলে মা…
– এই ঝগড়া তো প্রতি দিনই লেগে থাকে।
– আমাদের পরিবারে কোনো দিন দেখোছো এমন ঝগড়া হতে? হয়তো হবেও না।যদি তুমি অর্ণিয়াকে নিজের মেয়ে’র চোখে দেখো।এক সাথে সংসার গুছানো থেকে শুরু করে স্টার জলসার নাটক দেখবে দুজনে। অর্ণিয়ার মতো সংসারি মেয়ে হাজার খুঁজলেও পাবে না। মা’র মুখে হাসি ফুটে উঠলো।নিজের ভুল বুঝতে পেরেছে।আমার দিকে তাকিয়ে বলে…
– আজ তোর অফিসে যেতে হবেনা।বউমাকে নিয়ে শপিং করে কিছুটা সময় নিজের মধ্যে ভাগাভাগি কর। অর্ণিয়ার চোখে জল ছলছল করছে।এই কান্না শুধুই খুশির কান্না।মুখে হাসি অথচ চোখে জল।শক্ত করে হাতটা চেপে ধরে আমার।যেন ধরে রাখতে চায় অনন্তকালের জন্য।এমন কিছু মানুষের জন্যই হয়তো সমাজটা টিকে আছে।কিন্তু সবার সেই ভাগ্য হয়না।

গল্পের বিষয়:
ভালবাসা

Share This Post

আরও গল্প

সর্বাধিক পঠিত