মামাতোবোন

মামাতোবোন

দীর্ঘ ৭ বছর পর হঠাৎ আজ আমার মামাতোবোন জাহানারার সাথে দেখা। আজ ছুটির দিন। প্রায় প্রতি সপ্তাহে বন্ধুদের সাথে আড্ডা দিতে আমি পার্কে যায়। আজ হঠাৎ তার সাথে দেখা হবে ভাবতে পারিনি। এই সাত বছরে তার চেহেরা ও শারীরিক গঠন অনেকটা চেঞ্জ হয়ে গেছে। জাহানারা কে চিনতে আমার বিন্দু মাত্র ভুল হয়নি। প্রথম প্রেম কি এতো সহজে ভুলা যায়। জাহানারা তখন ক্লাস ফোরে পড়তো। আর আমি ক্লাস সেভেনে। আমাদের আর মামার বাসাটা ছিলো পাশাপাশি এলাকায়। সে সুবাদে প্রায় সময় মামার বাসায় আসা যাওয়া হতো।

সেদিন ছিলো শুক্রবার। বিকাল বেলায় আমি মামার বাসায় গেলাম। বারান্দায় গ্রীল ধরে দাঁড়িয়ে আছে জাহানারা। সপ্তাহের এই দিনটাই আমরা ঘুরতে বের হই। আর এখন আমার জন্যই অপেক্ষা করছে জাহানারা। পরনে একটা হাফপ্যান্ট আর ডোরাকাটা ফ্রগ পরিহিত। মাথায় দুইটা শিং মানে বেনুনী করা। আমাকে দেখেই একটা আনন্দের হাসি দিলো জাহানারা। সহসা বল্লাম – কিরে কি করছিস তুই?

–আপনার জন্য বসে আছি, চুলের বেনুনীতে একটা টান দিয়ে বল্লাম, মিথ্যা বলছিস কেনো তুই।

–কই মিথ্যা বললাম?

চুলের বেনুনীতে আরেকটা টান দিয়ে বললাম, তুই তো দাঁড়িয়ে আছিস তাহলে মিথ্যা বললি কেনো তুই বসে আছিস। জাহানারা রেগে গিয়ে বলল- উঁহু তুই আমার চুল টানিস কেনো কুত্তা ছেলে। আমার ব্যাথা লাগে না বুঝি? সহসা মাথায় একটা চটকনা দিয়ে বললাম- তুই আমাকে তুই করে বলছিস, আমি তোর বড় না ছোট। বারান্দার গ্রীলের সাথে বাড়ি লেগে ঠোঁট ফেটে গেছে জাহানারার। ১০০ বার বলবো তুই তুই তুই, তুই আমার সামনে থেকে যা কুত্তা ছেলে । বলেই ফ্যাল ফ্যাল করে কেঁদে দিলো।

চোখ দিয়ে জল গড়িয়ে পড়ছে তার। সেগুলা জাহানারা হাত দিয়ে মুচছে। জাহানারা সাথে আমার টম এন্ড জেরী সম্পর্ক। সারাদিন ঝগড়া লেগেই থাকে। পিঠের উপর আলতো করে একটা হাত রেখে বললাম – খুব লেগেছে বুঝি।
জাহানারা এক ঝটকায় পিঠ থেকে আমার হাতটা সরিয়ে নিলো। বুঝেছি বালিকা মনে অভিমানের ঝড় বইছে। মাথা নিচু করে অনবরত কেঁদেই চলেছে। সহসা বলে উঠলাম- দেখ জাহানারা আমি এক থেকে দশ পর্যন্ত গুনবো। এর মধ্যে তুই যদি আমার সাথে না যাস তাহলে কিন্তু আমি একাই পার্কে চলে যাবো। এক থেকে নয় গুনা শেষ। কিন্তু জাহানারার কোনো রেন্সপন্স নেই। দশ বলতে কিছুক্ষন থামলাম। জাহানারা আড়চোখে আমার দিকে একবার তাকালো। তোকে আমি শেষবারের মতো সুযোগ দিলাম- আমি পনেরো পর্যন্ত গুনবো, তুই গেলে যাবি না গেলে নাই।

সেদিন আর ঘুরতে যাওয়া হয়নি। বিকালে হঠাৎ ঝুম বৃষ্টি নামল। সারাটা বিকেল আমরা ছাদে বৃষ্টিতে ছুটাছুটি করেছি। সন্ধ্যায় কাকভেজা হয়ে বাসায় ফিরলাম। রাতে অবশ্য দুজনেরই জ্বর এসেছিলো। জাহানারা ফ্রগ ছেড়ে সালোয়ার কামিজ পরতে শুরু করছে। উঠতি বয়স শরীরটা এখনো পরিপূর্ণ নারী হয়ে উঠেনি। তবে সে এই বয়সে অনেক কিছুই বুঝতে শিখে গেছে। আমি কলেজ পেরিয়ে ভারসিটিতে উঠে গেলাম। আর জাহানারা সদ্য দশম শ্রেনীর ছাত্রী। একদিন সন্ধ্যায় জাহানারাদের বাসায় গেলাম। জাহানারা সোফায় বসে টিভি দেখছে, বাসায় কেউ নেই। আমি বললাম- কি ব্যাপার বাসায় কেউ নেই।

— সবাই সিনেমা দেখতে গেছে মিরাজ ভাইয়া।

আপনি বসুন আমি আপনার জন্য চা করে আনছি। আমি তাকে থামিয়ে দিয়ে বললাম- তুমি যাওনি। জাহানারা- যাইনি সে তো দেখতেই পারছেন। আমি ধমক দিয়ে বললাম বড্ড পেকে গেছিস নারে। মূহুর্তেই জাহানারা মুখে আষাঢ়ের কালো মেঘ জমা হলো। একটু রাগী লুকে বলল- আপনি সবসময় আমার সাথে ধমক দিয়ে বলেন কেনো হুমমম। (মিনমিন করে বলল- আমার বাড়িতে এসে আমাকে ধমক দেয় সাহস কতো তার। ধমক দিয়ে লাভ নেই আমি আপনাকে ভয় পায় নাকি) আমি মুচকি হেসে বললাম- তা তুই যাসনি কেনো।

— এমনি ভালো লাগছে না। কেনো শরীর খারাপ নাকি? (আমি)

— না তাহলে? জাহানারা সহসা বলে উঠল- এতো প্রশ্ন করেণ কেনো আপনি। সব প্রশ্নের উত্তর দিতে পারবো না আমি। জানেন না মেয়েরা সবাই কে সব কথা বলতে পাররে না। বলেই একটা ভেংচি কাটলো। আমি আর কথা বাড়ালাম না। একা বাসায় থাকাটা ঠিক হবে না। তাই চলে যাচ্ছিলাম। জাহানারা শুধালো- চলে যাচ্ছেন।

-তো আমি কি এখানে থেকে যাওয়ার জন্য এসেছি। জাহানারা- একটু থেকে গেলেই পারেন।

আমি: তোমার সাথে আজাইরা প্যাঁচাল পারার সময় নেই আমার। এ কথা বলেই হনহন করে চলে যেতে লাগলাম। অমনি জাহানারা হুমড়ি খেয়ে আমার সামনে এসে থমকে দাঁড়ালো।

আমি ভ্রু কুঁচকে সপ্রশ্নে জিজ্ঞাসু দৃষ্টিতে তার দিকে তাকালাম। সহসা জাহানারা শুধালো- অনেকদিন ধরে ভাবছিলাম আপনাকে একটা কথা বলবো। কিন্তু কি করে বলবো বুঝতে পারছি না। চোখ চোখ ফিট ফিট করে একবার আমার দিকে তাকাচ্ছে আরেকবার নিচের দিকে তাকাচ্ছে। মনে হয় লজ্জা পাচ্ছে। লজ্জা পেলে জাহানারার নাকটা ভীষন লাল হয়ে যায়। অদ্ভুদ সুন্দর লাগে তখন জাহানারার লজ্জামাখা মুখটি। কৃষ্ণবর্ণ গায়ের রং। অতোটা আহামরী সুন্দরী না হলেও তার চোখ দুটো ছিলো নজর কাড়ার মতো দৃষ্টিনন্দন। সল্প পরিমিত হাসি আপেলের রক্তিম আভার মতো ছড়িয়ে পড়ে মুখের সর্বত্র।

সে ছোটবেলা থেকেই আমার আর জাহানারার মধ্যে খুঁনশুটি লেগেই থাকতো। কতো মারামারি করেছি তার কোনো অন্ত নেই। যদিও সে আমার হাতে মার খেয়ে ভূত হয়ে যেতো। কান্না করতে করতে বাড়ি যেতো আর প্রতিদিন আমার সাথে আড়ি কাটতো। তবে সেটা ক্ষণস্থায়ী। আর দিনশেষে তাকে কাঁদে চড়িয়ে রাগ ভাঙ্গানো হতো। অতীতের সেই স্মৃতি গুলো আজও আমায় কি রোমন্থন করে। সেসব কথা ভেবে দুজনে হেসে উঠি আনমনে। কালের বিবর্তনে দুজনের শারীরিক গঠনের পাশাপাশি পরিবর্তণ এসেছে আচার, আচরণ ও ব্যবহারে। ঘোর কাটলো জাহানারার গরম নিঃশ্বাসে। রাগী লুকে আমার দিকে তাকিয়ে শুধালো- কোথায় হারিয়ে গেলেন আপনি?

আমি: না মানে কিছু বলবি?

জাহানারা উড়নাটা ঠিক করে বলল- আপনি কি কিছুই বুঝেন না, সব কথা কি মুখে বলতে হয়। আমি তার নাকটা আলতো করে টিপে চোখের সামনে আসা চুল গুলো কানে গুজে বললাম- কেনো রে, তুই বুঝিয়ে বল্লেই তো হয়। সহসা জাহানারা বলল; আমার বুঝি লজ্জা করে না। আমাকে ধাক্কা দিয়ে সরিয়ে নিজের রুমে দৌড়ে চলে গেলো। আগামি মাসে আমি লন্ডন চলে যাচ্ছি। একথা শুনার পর জাহানারা সবসময় কেমন মনমরা হয়ে থাকতো। মুখটা গোমড়া করে অভিমানী সুরে শুধালো– বিলেত(বিদেশ) যাওয়া কি খুব জরুরী।

প্রতিউত্তরে আমি কোনো জবাব দিলাম না। কালকে সন্ধ্যায় আমার ফ্লাইট। নিস্তব্ধ রাত, চারিদিকে ঝিঁ ঝিঁ পোকার ডাক শোনা যাচ্ছে। আমি আর জাহানারা মুখোমুখি দাঁড়িয়ে আছি। সহসা বলে উঠলাম আমি: কাল আমি চলে যাচ্ছি। তুমি ভালো থেকো, আর নিজের যত্ন নিও। জাহানারা অশ্রুসিক্ত নয়নে তাকিয়ে আমায় শুধালো- আমাকে কিছু বলে গেলেন না যে কথাটি একেবারে আমার হৃদয়ে গিয়ে বিঁধলো। কেমন আন্তরিকতার ছোঁয়া লেগে আছে। এমণ ভাবে বললো যেন আমি তার জনম জম্মান্তের সাথী। তার চোখের জল গুলো নিচে পড়ার আগেই আমি ঠোঁট দিয়ে চুষে নিলাম।

স্রষ্টা যদি তোমাকে আমার ভাগ্যে রাখে তাহলে আমি তোমার ই আছি, তোমারই থাকবো।(আমি) সেদিন জাহানারা আমাকে অনেকক্ষন ধরে জড়িয়ে রেখেছিলো। আমিও আমার প্রিয়সী কে বাহুডোরে আঁকড়ে নিলাম। কে জানতো এটাই হবে আমার সাথে জাহানারার শেষ দেখা। ৭ বছর পর, এই মূহুর্তে আমি আর জাহানারা বসে আছি পার্কের একটা বেঞ্চিতে। নিরবতা ভেঙ্গে আমি জিজ্ঞেস করলাম- কেমন আছো। জাহানারা একটা দীর্ঘশ্বাস ছেড়ে বলল: জল ছাড়া মাছ যেমন থাকে। রাগী স্বভাবটা গেলো না তোমার?(আমি)

–রাগ করার অধিকার কবেই হারিয়ে ফেলছি? এতো অভিমান আমার উপর।

–অভিমান করতে করতে অনুভূতিরা আজ ভীষন ক্লান্ত। এখনো ভালোবাসো?

–ভালোবাসার কি কভু মরণ হয়। বেশ প্যাঁচিয়ে কথা বলতে শিখে গেছো।

— মুখটা অন্যদিকে ঘুরিয়ে জাহানারা শুধালো-

বিলেত যাওয়ার পর কি একবারও আমার খোঁজ নেওয়ার প্রয়োজন মনে করো নি? করি নি মানে কতো খোঁজ করেছি তোমায়। পরে শুনলাম, মামা গত হওয়ার পর তোমরা বাসা চেঞ্জ করে ফেলছো। তাই তোমাকে আর খুঁজে পায়নি।

–চাইলেই পারতেন। আমাকে এভাবে একা মাঝপথে ফেলে চলে গেলেন, আমার কথা কি একবারও ভাবলেন না।

আমি: আচ্ছা এসব কথা এখন বলে আর লাভ কি? স্বামী হয়েছে, সংসার হয়েছে এখন তোমার বর্তমান নিয়ে ভাবা উচিৎ।

–বিয়ে করো নি?

আমি: হুমম এলেক্স ফ্রম লন্ডন।(মোবাইল পিক দেখিয়ে)

–জাহানারার হয়তো ভালোবাসার মানুষটির পাশে অন্য কাউকে সহ্য হয়নি। তাই বলল- এখন যে আমার একটু উঠতে হয়। এটা আমার ঠিকানা। সময় করে একদিন আসবেন। সন্ধ্যে হয়ে আসছে অন্য একদিন জমিয়ে আড্ডা দিবো নয়তো মিরার আব্বু টেনশন করবে? ওহ তোমার মেয়ের তাহলে নাম মিরা। আমার পছন্দ করা নামটিই রাখলে ?

–জাহানারা কষ্ট লুকানোর চেষ্টা করলো? হাসি মুখে শুধালো-আসি!

কিছুক্ষন তার চলে যাওয়ার দিকে চেয়ে রইলাম। আমি আর পিছু ফিরে তাকাইনি। আপসোস, যে টাকার জন্য আমি জাহানারা কে ছেড়ে বিলেত পাড়ি জমালাম, আজ আমার টাকা,বাড়ি, গাড়ি সব আছে নেই শুধু ভালোবাসার মানুষটি। আমি তোমার ভালোবাসার মূল্য দিতে পারি নি জাহানারা। আমায় ক্ষমা করো তুমি। কখনো হয়তো বলতে পারবো না- আজও ভালোবাসি তোমায়। নিমিষেই চোখ দিয়ে দুফোঁটা গরম জল গড়িয়ে পড়লো।

ইতি,

গল্পের বিষয়:
ভালবাসা

Share This Post

আরও গল্প

সর্বাধিক পঠিত