ভালবাসা ভাল থাক

ভালবাসা ভাল থাক

“স্যার!” বীথি পর্দার কাছে এসে দাঁড়িয়েছে। ফরিদ মুখ তুলে তাকিয়ে চোখ নামিয়ে নিল। রূপবতী মেয়েদের দিকে বেশিক্ষণ তাকিয়ে থাকা যায় না। রূপবতী মেয়েদের মুখ থেকে স্যার ডাক শুনতেও ভাল লাগে না।

“বিশালের শরীরটা খারাপ। আজ ও পড়বে না।”
“ও আচ্ছা। আমি তাহলে চলে যাই।”
“বসেন। বুয়াকে চা দিতে বলেছি। চা খেয়ে যান।”

চা’টা খেয়ে যাওয়া দরকার, ফরিদ মনে মনে চিন্তা করে। এরা চায়ের সাথে ভাল নাস্তা দেয়। এরপর যে বাসায় পড়াতে যাবে, ওরা কোন নাস্তা দেয় না। সেই ছাত্রী আগামী বছর এসএসসি পরীক্ষা দেবে। ছাত্রীর বাবার টাকাপয়সা ভাল। তবে তাদের পরিবারের সদস্যদের মন বড় নয়। টাকাপয়সা বেশি থাকলে বড় মনের অধিকারী হতে হবে, এমন কথা অবশ্য কোন বইতে লেখা নেই। পড়ানোর পুরো সময়টা ছাত্রীর মা ভুরু কুঁচকে পড়ানোর টেবিল থেকে খানিকটা দূরে বসে থাকেন। যুবক শিক্ষককে তার মেয়ের সাথে প্রেম করার কোন সুযোগ দিতে তিনি রাজী নন। এমন পরিবারের মেয়ের সঙ্গে প্রেম করার কোন ইচ্ছা অবশ্য ফরিদেরও নেই। বীথি এগিয়ে এসে ফরিদের সামনের সোফাটায় বসল। বীথিকে তার মুখোমুখি বসতে দেখে ফরিদ একটা হার্টবিট মিস করে।

“আপনাকে সবসময় একই শার্ট আর প্যান্ট পরে থাকতে দেখি। আপনার কী আর কোন জামাকাপড় নেই?” ফরিদ চুপ করে থাকে। কী বলবে?

“আচ্ছা, আপনার জন্মদিন কবে?”
“জানি না।” ফরিদ জানে, কিন্তু সে কথা বীথিকে জানাতে চায় না।
“নিজের জন্মদিন নিজেই জানেন না? হাউ ফানি!”
“আসলে গ্রামে ওভাবে দিন তারিখ মনে রাখার চল ছিল না। ইদানীং অবশ্য হয়েছে।”
“ও! আচ্ছা, আপনি সবসময় এত গম্ভীর হয়ে থাকেন কেন? আপনি কী কখনও হাসেন না?”

ফরিদ আবারও চুপ করে থাকে। এবারও তার বলার মত কিছু নেই। “আপনাকে আমি কখনও হাসতে দেখিনি। বিশালের কাছে শুনেছি, টিচার হিসেবে আপনি মোটেও কড়া নন। তাহলে হাসেন না কেন?” বীথির এসব প্রশ্নের উত্তর ফরিদের কাছে নেই।

“কী হল? আচ্ছা, আপনাকে একটা কৌতুক শোনাই। দেখি আপনাকে হাসাতে পারি কিনা।”

বীথি কৌতুক বলতে শুরু করে- ‘একটা ছোট ছেলে তার ডায়েরিতে লিখেছে, আজ রাতে বড় আপুর বাচ্চা হবে। কিন্তু এখনও কেউ জানে না, ছেলে হবে নাকি মেয়ে। তাই আমিও বুঝতে পারছি না, আমি মামা হব নাকি মামী।’

কৌতুকটা কোনমতে বলা শেষ করেই বীথি হাসতে হাসতে সোফায় গড়িয়ে পড়ল। হাসতে হাসতে ওর দু’চোখের কোণে পানি চলে এসেছে। ফরিদ একটুও হাসছে না। সে এক দৃষ্টিতে তাকিয়ে বীথিকে দেখছে। এখন দেখলে কোন সমস্যা নেই। বীথি নিজের হাসি নিয়ে ব্যস্ত।

‘বীথি, তুমি কী জান আমি তোমাকে কতটা পছন্দ করি? আমারও তোমার মত করে প্রাণখুলে হাসতে খুব ইচ্ছে করে। কিন্তু আমার হাসি আসে না। তোমার গভীর কালো ওই চোখ দুটিতে ডুব দিতেও খুব ইচ্ছে হয়। কিন্তু চাইলেই তো আর ডুব দেয়া যায় না। আমার অনেক অপারগতা। সেসব তোমায় বলা যাবে না।’ ফরিদ মনে মনে বীথির সঙ্গে কথা বলে।

প্রতি রাতে ফরিদ মেসের তোষকবিহীন চৌকিতে শুয়ে বীথিকে নিয়ে নানারকম স্বপ্ন দেখে। বীথিকে সেই স্বপ্নগুলোর কথা কখনই বলা হয়ে উঠবে না। বললে সাথে সাথে এই টিউশনি হারাতে হবে। ফরিদ ধীরে ধীরে উঠে দাঁড়ায়।

“আমি তাহলে আজ আসি।”
“চুপ করে বসুন।” বীথির গলায় ধমকের সুর। ফরিদ আবার বসে পড়ে।

বীথি ওকে কতটা পছন্দ করে এই বুদ্ধুরামটা কখনই বুঝবে না, বীথি মনে মনে ভাবে। বাবা-মা ওর বিয়ের জন্য ছেলে দেখছেন। আমেরিকা প্রবাসী পাত্রদের অগ্রাধিকার। তিনজন আমেরিকা প্রবাসী সিরিয়ালে আছে। এখন শুধু চূড়ান্ত বাছাইয়ের অপেক্ষা। হয়ত কিছুদিনের মধ্যেই বিয়ে করে ওকে আমেরিকা পাড়ি জমাতে হবে।

এই বুদ্ধুরামটা যদি মুখ ফুটে একটিবারের জন্য ওকে ‘ভালবাসি’ কথাটা বলার সাহস করতে পারত, বীথি ওর হাত ধরে দূরে কোথাও পালিয়ে যেত। ফরিদের ভাঙা চৌকিতে শুতেও কোন আপত্তি করত না। একটু আগে নাসরিন চা দিয়ে গেছে। সাথে এক বাটি পায়েস। একটা ছোট পিরিচে কয়েক পিস মেরি বিস্কুট।

“খান। পায়েসটা আমি নিজে রেঁধেছি।” ফরিদের বেশ খিদে পেয়েছিল। বাটির পায়েসটুকু সে খুব দ্রুত শেষ করে ফেলল। তারপর পিরিচ থেকে একটা মেরি বিস্কুট তুলে নিয়ে চায়ের কাপে চুমুক দিল। বীথি খুব মনোযোগ দিয়ে ফরিদের খাওয়া দেখছে। ফরিদের খাওয়া দেখে বোঝা যাচ্ছে, সে দূপুরবেলা কিছু খায়নি। আহারে…বেচারা!

বীথির খুব ইচ্ছে, ওর বিয়ে হয়ে যাবার আগে ফরিদকে নিজের হাতে রান্না করে একবেলা খাওয়ানোর। যদিও জানে, ওর এই ইচ্ছেটা কখনও পূরণ হবে না। বীথির মা তা হতে দেবেন না।“একদিন দেখবেন হুট করে আমি আপনার মেসে গিয়ে উপস্থিত হয়েছি।” বীথির কথা শুনে ফরিদ চমকে ওঠে। হঠাৎ চমকে ওঠায় চায়ের কাপ থেকে খানিকটা চা ছলকে ওর শার্টের নিচের অংশ ভিজিয়ে দেয়।

“ভয় পাবেন না। এমনি মজা করে বললাম। চা’টা ধীরেসুস্থে শেষ করুন। আপনি চলে যাবার আগে নাসরিনকে বলবেন দরজা লাগিয়ে দিতে।” বলেই বীথি ঝট করে উঠে দাঁড়ায়। হঠাৎ করে তার কেন জানি খুব কান্না পাচ্ছে। রূপবতী মেয়েদের চোখের জল কাউকে দেখাতে নেই। সবাই তাদের রূপ দেখে মুগ্ধ হতে চায়। তাদের চোখের জল কেউ দেখতে রাজী নয়।

বীথির হঠাৎ এভাবে চলে যাবার কারণ ফরিদ ঠিক বুঝে উঠতে পারে না। বীথি কি কোন কারণে ফরিদের ওপর রেগে গেছে? ওর কৌতুক শুনে না হাসাটা বোধহয় অভদ্রতা হয়ে গেছে। নাকি চায়ের কাপ থেকে শার্টে চা ফেলায় রাগ করল?

ফরিদ পিরিচ থেকে আরেকটা মেরি বিস্কুট নিয়ে চায়ে ভেজায়। আজ সন্ধ্যায় হাশেম ভাইয়ের লন্ড্রিতে শার্টটা দিয়ে চায়ের দাগ তোলানোর ব্যবস্থা করতে হবে। চায়ে ভেজানো নরম বিস্কুট মুখে চালান করে দিয়ে মুখ নাড়াতে নাড়াতে বীথির হুট করে রেগে যাবার কারণটা মনে মনে খুঁজতে থাকে ফরিদ।

(সমাপ্ত)

গল্পের বিষয়:
ভালবাসা
DMCA.com Protection Status
loading...

Share This Post

আরও গল্প

সর্বাধিক পঠিত