প্রিয়জন

প্রিয়জন

হঠাৎ একদিন ফেইসবুকে ঢুকে দেখি শুভা আর তারিফের গায়ে হলুদের ছবি। ফেইসবুকের পাতায় ঘুরে বেড়ানো, হলুদ গাঁদায় জড়িয়ে থাকা শুভা আর সবুজ পাঞ্জাবি পরা তারিফের কাপল ছবিতে শ’য়ে শ’য়ে রিয়্যাক্ট পড়ছে; তার সাথে পাল্লা দিয়ে কমেন্ট- অভিনন্দন!

শুভকামনা জানিয়েই ক্ষান্ত হচ্ছে না কেউ কেউ। শুভার কাছে তাদের একমাত্র জানতে চাওয়া- “দোস্ত, কেমনে কি?! জানলামও না তো কিছু!” আমি ছবি গুলোতে ক্লিক করি। শুভাকে হলুদ গাঁদায় একটা হলুদ পরীর মতো লাগছে। কিন্তু তারিফ গায়ে হলুদে সবুজ পাঞ্জাবি পরেছে কেন? স্ক্রল করে পরপর ছবিগুলো দেখতে থাকি। একটা ছবিতে শুভা আর তারিফ মুখোমুখি দাঁড়িয়ে, হাসছে দু’জনেই। তারিফের বাম গালের টোলটা স্পষ্ট দেখা যাচ্ছে। থমকে যাই আমি। নিজের মধ্যে ঈর্ষার অনুভূতিটা টের পাই। ঈর্ষা হচ্ছে আমার, প্রচন্ড!

সেদিন বিকেলে টিএসসিতে বসে ছিলাম, আমি আর শুভা।দু’জনেরই হাতে চায়ের কাপ। নারীর শরীর থেকে অসাবধানী জর্জেট শাড়ীর আঁচল যেমন ঝুপ করে পড়ে যায়, ঠিক তেমনি যেন বিকেলের গা থেকে সূর্যটা খসে পড়ে সেদিন। আচমকা আমাদের সামনে অতিক্রমরত এক যুবকের পায়ে চটি ফট করে ছিঁড়ে যায়। হেসে উঠি দু’জনে, অপ্রস্তুত যুবক কিছুটা হকচকিয়ে যায়! শুভা এগিয়ে গিয়ে বলে- সরি, এভাবে হেসে উঠা ঠিক হয়নি আমাদের। -বলেই মাটিতে গড়িয়ে পড়বে এক্ষুনি, ভঙ্গিতে খিলখিল করে হেসে উঠে আবার।

সেই বিকেলে তারিফের সাথে পরিচয় হবার পর ধীরে ধীরে ও ভালো বন্ধু হয়ে উঠে আমাদের। তারিফ তখন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ইংরেজি বিভাগের চূড়ান্ত বর্ষের ছাত্র। আমি আর আমার প্রাণের চেয়ে প্রিয় বন্ধু শুভা তখন সবেমাত্র তৃতীয় বর্ষে পা রেখেছি। চারুকলার ছাত্রী হিসেবে আমি বেশ স্বাধীনচেতা, দুরন্ত স্বভাবের হলেও; শুভা বেশ শান্ত ও পর্দানশীল মেয়ে। পরিচিত অনেকেই বেশ কৌতূহল নিয়ে কৌতুকের স্বরে জানতে চাইতো- “তোমাদের বন্ধুত্ব হলো কি করে?” : বন্ধুত্ব যেভাবে হয় ! – আমি উত্তর দিতাম। শুভা হাসতো। তারিফের সাথে আড্ডা খুব জমতো আমাদের। ক্লাসের পরে টিএসসি চত্বরে কত সময় যে একসাথে কাটিয়েছি আমরা সে হিসেব শুধু পৃথিবীই জানে।

আমি আর শুভা তখন বনানীতে একটা ফ্ল্যাটে থাকতাম। তারিফ থাকতো শহীদুল্লাহ হলে। কার্জনের সিঁড়িতে গান ধরতাম আমি, শুভা বাবু হয়ে বসে হাঁটুতে চাপড় মেরে সুর তুলতো। তারিফ মাঝে মাঝে জন ডান, শেলীর কবিতা শোনাতো আমাদের। আমি মুগ্ধ হয়ে শুনতাম। মাঝে মাঝে কিঞ্চিৎ ১৮+ জোক বলতো। আমি হেসে কুটিকুটি হলেও শুভাকে দেখতাম, ও কেমন আওড়ে যেতো। সেটা দেখে তারিফও চুপ করে যেত। আমি ভাবতাম, এই মেয়েটা এমন ক্যানো !! এক্ষুনি বিয়ে হলে দু’দিন পর এসে বলবে- আমি মা হতে যাচ্ছিরে কুহু! আর এখন এই সামান্য জোক নিতে পারছে না !! ও বড় হবে কবে ? এইতো কদিন আগে ক্যাম্পাসের কে যেন একজন প্রেমপত্র লিখেছিল শুভাকে। সেটা পেয়ে সেকি হাসি ওর ! সেই পত্র শুভা পড়ে আর হেসে গড়াগড়ি খায় যেন। আবেগভরা সেই পত্র ও এখনো মাঝে মাঝে বের করে পড়ে আর আমি পত্রদাতার কথা ভেবে দীর্ঘশ্বাস ছাড়ি।

‌ভালোই হেসে-খেলে, ছবি এঁকে, গান গেয়ে কাটছিলো আমাদের। হঠাৎ একদিন বাড়ি থেকে ফোন এলো, মা পুকুর ঘাটের সিঁড়িতে পড়ে মাথা ফাটিয়েছে! আমি তড়িঘড়ি বাড়ি চলে যাই। পনেরদিন বাদে ফিরে এসে শুনি- তারিফ আর শুভা একসাথে নতুন জীবনের স্বপ্ন দেখছে। বুকের মধ্যে চিনচিনে এক অনুভূতি টের পাই। সাথে টের পাই আশেপাশের অনেক কিছু এই পনের দিনে বদলে গেছে ! আমার পিচ্চি শুভা অনেক বড় হয়ে গেছে।

‌এরপর আর আগের মতো আড্ডা জমতো না। আমি গান ধরলেও, তারিফ আর শুভা যেন চোখে চোখে কি কথা বলতো আর মিটিমিটি হাসতো। কতকদিন আমাকে থামিয়ে দিয়ে শুভা বলতো- মাথা ধরেছে কুহু, চল ফিরি আজ। তারিফ বলতো পৌঁছে দেবার কথা। ওরা দু’জন পাশাপাশি সিটে বসতো আর আমি অন্য কোন সিটে। সিট না পেলে কিছুদিন আগ অব্দি শুভা আমার হাত আঁকড়ে ধরতো, পড়ে যাবার ভয়ে। সময়ের ব্যবধানে চলন্ত বাসে শুভার পড়ে যাবার ভীতি না কমলেও তার আঁকড়ে ধরার হাত পাল্টে যায়।

একদিন শুভার জ্বর হলে তারিফ ছুটে আসে আমাদের ফ্ল্যাটে। ওদের একা সময় কাটাবার সুযোগ করে দিয়ে আমি আড়ালে চলে যাই। আড়াল থেকে দেখি, তারিফ মুখ বাড়িয়ে চুমু খায় শুভার কপালে। দু’হাতে শুভা আঁকড়ে ধরে ওকে, আর সেই চিনচিনে অনুভূতিটা আমাকে !! পারছিলাম না আর সইতে। তেল-নুনের বিবাদে আমি শুভার থেকে আলাদা হয়ে যাই। সিনিয়রদের সাথে ভালো সম্পর্ক থাকায় সিট পেয়ে যাই রোকেয়া হলে।

আজ সেই শুভার গায়ে হলুদ। হলে উঠার পর শুভা অনেকবার আমার পথ আগলে জানতে চেয়েছে, কেন এমন করছি আমি? ক্লাসে অনেকবার চিরকুট পাঠিয়েছে এর ওর হাতে। একদিন আমার রুমেও এসেছিল চিড়ার পোলাও ভর্তি টিফিন বক্স হাতে। জড়িয়ে ধরে কান্না ভেজা চোখে জানতে চেয়েছিল- আমি কেমন আছি? আমি তখন ওর গা থেকে একটা ঘ্রাণ পেয়েছি কেবল। খুব পরিচিত, আমার খুব কাঙ্ক্ষিত এক পুরুষালি ঘ্রাণ।

স্ক্রল করে নীচে নামি আমি। প্রত্যেকটি ছবি দেখতে থাকি জুম করে, খুঁটিয়ে খুঁটিয়ে। নীচে আরও একটি ছবিতে তারিফের সবগুলো দাঁত দেখা যাচ্ছে, সাথে সেই টোলটা, যে টোলকে পুকুর বলে তারিফকে চটাতে চাইতাম আমি। ও চটতো না বরং আরো জোরে শব্দ করে হাসতো। আমি মুগ্ধ চোখে দেখতাম ওকে। আমার অনুভূতিগুলো যেন মাছ হয়ে তখন সাঁতরে বেড়াতো সেই পুকুরে। চোখ ঝাপসা হয়ে আসে আমার। হঠাৎ মনে পড়ে, শুভার প্রিয় রং সবুজ!

গল্পের বিষয়:
ভালবাসা
DMCA.com Protection Status
loading...

Share This Post

আরও গল্প

সর্বাধিক পঠিত