অন্তরালে

অন্তরালে

প্রিয়ন্তি মেয়টা যে এত চঞ্চল কি করে বুঝে উঠতে পারিনা। সারাটা সময় শুধু হৈহুলোর করেই কাটায়। ঐযে আবার আর একজনের পিছনে লেগেছে। কিভাবে ছেলেদের মত করে অন্য ছেলেটাকে শাসাচ্ছে। ছেলেটাতো ভয়ে একাকার দেখে খুব হাসি পাচ্ছে আমার। অবশ্য আমার হাসা ঠিক হচ্ছে না। কারণ আমিও এর শিকার। তবে শুধু একবার না বহুবার এমন হয়েছে। আর আমার সাথে যেন সব সময় রেগেই থাকে। এখনি আমাকে চোখ রাঙ্গিয়ে দাঁত দিয়ে নিচের ঠোঁটকা কামড় দিয়ে ইশারা করে বলল, “কি কি হয়েছে হুম। খুব দাঁত বের করা হচ্ছে?” আর এখানে থাকা যাবেনা। যমের মত ভয় পাই মেয়েটাকে। একটা গুন্ডি কোথাকার। যার সাথে বিয়ে হবে তাকে প্রতি রাতে মারবে। হি হি হি ভালই হবে। বেটার বিয়ে করার শখ মিটে যাবে একদম। নাহ্ যাই একটু ক্লাশ থেকে ঘুরে আসি।
স্যার আজকে দারুণ ক্লাশ নিতেছেন। আজকে নিশ্চই তার মন ভাল আছে। বউয়ের সাথে কিছু একটা মজার হয়েছে। না হলে এত ফুরফুরে মেজাজে আজ। কাউকে বকাবকি করছেন না। বেশ না পারলেও গা মাথায় হাত রেখে বলছে, “এখন একটু পড়াশোনা করো। সামনে তো পরীক্ষা না পড়লে লিখবে কি হুম! বসো” যাহ্ বাবা এইবার মনে হয় আমার পালা,
>মিস্টার লিটন স্যার…কি করিতেছেন আপনি… (আমাকে ব্যঙ্গ করে বললেন স্যার।)
স্যারের কথা শুনে খানিকটা লজ্জা পেলাম। বললাম,
-না মানে স্যার আপনার কথাই ভাবছিলাম… (আমি)
>ওহ আচ্ছা! তা কি ভাবছিলেন আপনি বলেন একটু শুনি শুনে নিজেকে ধন্য করি…
হায় হায় বলে কি। কি করে বলব যে কি ভাবছিলাম। যদি বলি টিসি নিশ্চিত…
>কি হলো বলেন…
-হ্যাঁ হ্যাঁ
>অ্যাটেনশন প্লিজ…এখন লিটন স্যার আমাকে নিয়ে তার দামি মনে কি ভাবছিলেন তা সবাইকে শোনাবেন…সবাই মনযোগ তার দিকে দাও…
সবাই আমার দিকে অনাহারির দৃষ্টিতে তাকিয়ে আছে।
-মহা বিপদে পড়ে গেলাম নাহ্ বলতে হবে বলতে হবেই। হুম বলবই কিন্তু কি বলব…
>লিটন স্যার আপনি কি আছেন…
একটা হাসির রোল পড়ে গেল। কি অদ্ভুত প্যারায় পরলাম রে বাবা। না বলতে হবে। বলবো এবার চোখ বন্ধ করে ঠিক করে নিলাম কি বলব। কি যেন বলব। ওহ হ্যা মনে পড়েছে, “স্যার আজ বউয়ের সাথে রোমান্টি কিছু হইছে কি না” চোখ বন্ধ করে
-স্যার আপনার বন্ধুর মেয়েটাকে কেন জানি আমার ভাল লাগে। আপনি কি তার সাথে একটু কথা বলবেন…
কথাটা বলেই জিহ্বায় কামড় বসালাম। সবাই আমার দিকে ভেবলার মত চেয়ে আছে। না চাওয়ার কিছু নাই কি বলতে কি বলে ফেলেছি আর রক্ষা নেই। স্যার নিজেও একটু হেসে রাগি গলায় বললেন,
>সাইল্টে। চুপ সবাই…
স্যারের মনের মধ্যে কালো মেঘ বাসা বেধেঁ নিয়েছে। স্যারের রাগ দেখে সবাই ভয়ে আতঙ্কিত। এই রুপ ধারণ করলে কারো না কারো উপর বর্ষণ হবে নিশ্চিত। জানিনা আজ কি হবে আমার।
>হুম শুনলাম আপনার কথা। এখন সুন্দর করে বলেন দেখি আমি কি বলেছি… (স্যার)
-স্যার বলেছেন, সাইল্টে। চুপ সবাই… (আমি)
স্যার আরও রেগে গেছেন। তবুও নিজের রাগ সামলে বললেন,
>তার আগে কি বলেছি…
স্যারের এমন গম্ভীর ভাব দেখে ভয়ে ভয়ে বলে ফেললাম,
-বলেছেন আপনি কথা বলবেন… (আবার কি বলতে কি বলে ফেলেছি)
>কিহ্ আবার বলো…
-না না স্যার প্লিজ স্যার ঘাড়ের উপর তিনটা বেঞ্চ চাপাবেন না। আমি কান ধরে হাই ব্রেঞ্চের উপর দাড়িয়েছি… (বেঞ্চের উপর দাড়িয়ে)
>আজ ছুটি অবধি এইভাবে থাকবে…
বলেই আবার ক্লাশ শুরু করে দিল। আর আমি ছাত্রদের বৈশিষ্ঠ অনুযায়ী স্যারকে মনে মনে খিস্তি করতে লাগলাম। একটু আগেই কত ভাল ভাল কথা ভাবলাম। পুরাই ভুল। নিশ্চই বেটা বাড়িতে বউয়ের সাথে ঝগড়া করে এসেছে। নিজের বউকে তো রাগ দেখাতে পারেনা। আমাদের উপর রাগ শুধু ঝাড়তে পারে। টুট…টুট…টুট…
পুরো ক্লাশ কান ধরেই দাড়িয়ে রইলাম। আরও দুইটা ক্লাশ আছে। মাথা পুরো খারাপ। সব চেয়ে বড় কথা হলো যে ক্লাশ শেষ হলেই জুনিয়র মেয়েগুলো আমাদের ক্লাশে আসবে আমাদের ক্লাশের বদ মেয়েগুলোর সাথে। যদি এসে দেখে আমি কান ধরে দায়িয়ে আছি তাহলে মান সম্মানের আর কিছু থাকবে না। আর সব চেয়ে বড় কথা হল প্রিয়ন্তীও আসবে। স্যার চলে গেল। নামতেও পারবো না। এই বদেরা আবার বলে দিবে স্যারকে। আর যদি শোনে তাহলে স্যার মাঠের মাঝে তিন বেঞ্চের উপর কান ধরিয়ে দাড় করিয়ে রাখবে।
আর রক্ষা নেই। সবাই একে একে চলে আসছে। আমাকে দেখে থমকে দাড়াচ্ছে আবার হেসে হেসে আড্ডাখানায় বসে যাচ্ছে। কেউ কেউ মাঝে মাঝে আড় চোখে আমার দিকে তাকাচ্ছে আর মুচকি মুচকি হাসতেছে। বুঝতে পারছি আজকের আড্ডার বিষয় আমি। এই দিকে হৃদয় স্পন্দন শুরু হয়ে গেছে। তার মানে রাক্ষসীটা এসে গেছে। হুম রুমে ঢুকল। আমার দিকে তাকিয়ে গম্ভীর দৃষ্টিতে তাকিয়ে। চোখ গুলো রাঙ্গিয়ে বললাম, “ঐ মেয়ে কি দেখ হুম। আগে কখনও ছেলে দেখনি” কিছু বলল না। চুপটি করে বসে পরল। যাক কিছু বলেনি। আচ্ছা ওমন করে তাকালো কেন? তাহলে কি আমাকে পছন্দ করে।
>এই যে মিস্টার হ্যাবলা কান্ত এভাবে বাকা হয়ে আছেন কেন… স্যারকে ডাকবো কি…
কোন মেয়ের গলা শুনেই সোজা হয়ে দাড়ালাম। আশে পাশে দেখছি কিন্তু খুজে পেলামনা কাউকে।
>এই যে নিচে তাকান…
আবার একি কন্ঠ। নিচে তাকাতেই দেখতে পেলাম আমার পায়ের কাছে সাপ। ছোবল মারার জন্য রেডি। দেখেই আমার উ আ হাউ মাউ কাউ যাও হুস হাট হুরর ভ্রুমম ইয়াম্মা বাচাও তোমার ছেলেকে…টলতে টলতে পড়ে গেলাম…
*
চোখ খুলতেই দেখলাম চারিদিকটা কেমন ধোয়ায় ভরে গেছে। সামনে একটা সাদা কাপড় মোমবাতি সমেত আমার দিকে আসছে। আমি নিজেও সাদা কাপড় পরে আছি। সাদা কাপড়টা আমার হাতে মোমবাতিটা দিল। নেওয়ার সাথে সাথে…
-আউউচ…
>এই একদম চেচাবেন না ভীতুর ডিম কোথাকার। আর তখন কিসব উল্টা পাল্টা বলছিলেন।
কথাটা শুনেই চোখ খুললাম। আরে আমি তো বেচে আছি। মরিনি তাহলে। কিন্তু আমি কোথায়, দেখে মনে হয় হাসপাতাল। আবার মনে হচ্ছে না। এইটা তো বাড়ি…আর মেয়েটা প্রিয়ন্তি। কিন্তু কার বাড়িতে ভাল করে চোখ দিতেই বুঝতে পারলাম আমাদেরই বাড়ি। আর রুমটাও আমার। কিন্তু এখানে আসলাম কি করে। আমার তো ক্লাশ রুমে থাকার কথায়। ভাবতে ভাবতে মাথায় হাত দিলাম বুঝলাম আলাদা কোন কিছু মাথার মধ্যে জড়ানো। পাশে আবার ডাক্তারের মত কেউ। বললাম এখানে কি করে। পাশ থেকে প্রিয়ন্তি বলে উঠল,
>দেখেছো অবন্তী তোমার দাদার কথা। একটা খেলনা সাপ দেখে বেঞ্চের উপর থেকে পরে জ্ঞান হারাইছে আবার এখন বলছে এখানে কি করে… (প্রিয়ন্তি)
<ছাড়ো তো দাদার কথা। ওটা তো আস্ত একটা জাবরা থাবরা…চলো আমার রুমে যাই এখানে থেকে কাজ নেই। (অবন্তি)
বলেই চলে গেল দুইজনই মুখ বাকা করে। ডাক্তার মশাইও চলে গেলেন। শুয়ে আছি বেশ সময় ধরে। ফোনটা টুং টুং করে বেজে উঠল। ফোনের দিকে তাকাতেই দেখতে পেলাম এমএমএস। মনে ভাবনা আসছে কি এমন হতে পারে। ভাবতে ভাবতে ওপেন করলাম…
>আরে কি সব বলছেন… (প্রিয়ন্তি)
-বউ রাগ করে না। আমি আসলে ইচ্ছে করে কিছু করিনি… (আমি)
>আরে কি আজব কি করছেন আপনি…
-বউ বিশ্বাস করো আমি তোমাকেই শুধু ভালবাসি আর কাউকে না। সেই কলেজে তোমাকে ভয় ঠিকি পেতাম কিন্তু তার আড়ালেই তোমাকে ভালবাসতাম। তাই তো হুট হাট করে ভুল ভাল কথা বলতাম…
>আরে আরে কি করছেন কি…
-বউ তোমার শাসনটা আমাকে ভাল লাগত বলেই তো বারবার তোমার সামনে ভ্যবলার মত করে দাড়াতাম আর তোমার বকা শুনতাম। আচ্ছা তুমিও তো আমাকে ভালবসতে তবে এমন করতে কেন…
কথাটা শুনেই লজ্জায় লাল প্রিয়ন্তি। তারপর হুট করেই আমি চুপ হয়ে গেলাম। প্রায় দুই মিনিট হয়ে গেল আমি নিশ্চুপ।
*
ভিডিওটা দেখে তো মাথায় হাত দিলাম। তাই জন্য বলছিল কি যেন উল্টা পাল্টা কথা বলেছি। তবে মনে মনে ভালই লাগছে যেভাবেই হোক মনের কথাটা তো বলেছি। বিকাল হয়ে গেছে। রুম থেকে বেড়িয়ে আসলাম। দেখি কাকা বসে আছে। মা বাবাও সাথে আছে। আমাকে দেখেই কাকা বলে উঠল,
>এখন আবার বিছানা থেকে নেমে আসলে কেন…একটু রেস্ট নাও যাও… (কাকা)
-তুমি চুপ করো। তোমার কোন কথাই আমি শুনতে চাইনা…তোমার জন্যই আজকে আমার এই অবস্থা… তুমি যদি আমাকে ওভাবে দাড় করিয়ে না রাখতে তাহলে আমার কিছুই হত না হু… (আমি)
>ঐ এই দিকে আয়…
বলার সঙ্গে সঙ্গে ওনার কাছে গেলাম। আর আমার কান টেনে ধরে,
>ঐ সব দোষ আমার না। ক্লাশে অমনোযোগ আর আমাকে বলিশ…কি বলবো… (কাকা)
-বলো তাতে আমার কি… (আমি)
>একটু আগে যে বললি আমার কথা শুনতে চাস না…
-হে হে এখন বলছি আর এখানে থাকতে চাইনা…
বলেই আবার রুমের দিকে পা বাড়ালাম। কানে পরল কাকা বাবা মাকে কিছু বলছে। শোনার জন্য গতি কমিয়ে দিলাম,
>হ্যাঁরে সবুজ ও কি বলেছিল তোকে… (বাবা)
<আরে আর বলোনা দাদা আমাকে বলে কি জানো….ঐ দেখো কেমন নিলজ্জের মত আবার শোনার জন্য দাড়িয়ে আছে… (কাকা)
কথাটা কানে পরতে সেকেন্ডর মধ্যে রুমে ঢুকে পরলাম। তবে ভিতরে না দরজার পাশেই রইলাম।
>হুম এখন বলো… (মা)
<বউদি ছেলেতো এখন বড় হয়ে গেছে। আমাকে বলে কি জানো আমার বন্ধুর মেয়ে মানে আমাদের প্রিয়ন্তিকে নাকি ওর ভাল লাগে আমাকে নাকি ওর বাবার সাথে কথা বলতে হবে। (কাকা)
কথাটা শুনেই ওদিকে একটা হাসির রোল পরে গেল। আর আমার জিহ্বায় কামড়।
>তাই নাকি এই কথা বলেছে ও… (বাবা)
<হুম… (কাকা)
>যাক ছেলে যখন মুখ ফুটে বলেছে তাহলে আর কি…মেয়েতো আমাদের পছন্দে…কালই প্রস্তাব নিয়ে যাও…
-কাকু তাহলে আজকে আমি আসি। দেরি হলে আবার মা চিন্তা করবে… (প্রিয়ন্তি)
<চলে যাবে মা এখনি… (মা)
-জ্বি…
বলেই হন হন করে চলে গেল। আর একটা হাসির রোল পরেগেল ওনাদের মাঝে। তবে আমি ভাবছি অন্য কথা। প্রিয়ন্তি নিশ্চই কথাগুলো শুনেছে। ভাবতেই তিন হাত উপরে লাফিয়ে উঠলাম।
*
পরেরদিন…
মাথায় ব্যান্ডেজ নিয়েই কলেজে গেলাম। মা নিষেধ করেছিল যেতে। কিন্তু বাবা মাকে বলল, “বলে লাভ নেই কৃষ্ণের বাঁশির সুরে রাধা কাজ ফেলে এসেছিল। আর আমাদের ছেলের বেলায় রাধা ডাকছে কৃষ্ণ কি করে ঘরে থাকে।”
গেটেই দাড়িয়ে রইলাম। প্রিয়ন্তির কোন দেখা নেই। ধুর ছাই যার জন্য আসলাম তারই কোন পাত্তা নেই। ভাল লাগে না। অন্য দিকে তাকাতেই দেখতে পেলাম কপোত কপোতি এই সকাল বেলাই তাদের মধুর আলাপ শুরু করেছে আর আমার জন এখনও আসার কোন খবর নেই। মন খারাপ করে ফিরে তাকাতেই দেখলাম প্রিয়ন্তি আসছে। সাদা ড্রেস পরে যা সব সময় আমার ভাল লাগে। দেখতে দেখতে কাছাকাছি চলে আসল। আমি আর এখানে থাকতে পারবো না। না হলে এক বালতি কথা শুনিয়ে চলে যাবে। তাই চলে আসলাম। ক্লাশ শেষ করে একটু রোদে বসে আছি। এই শীতে রোদে বসে থাকতে বেশ লাগে। রোদটা যেন মিষ্টি হয় শুধু শীতেই। আর গ্রীষ্ম এলেই যেন বিষ। প্রিয়ন্তিকে দেখতে পাচ্ছি বন্ধুদের সাথে আড্ডায় মেতেছে। মাঝে মাঝে আড় চোখে দেখছে। আবার গল্প করছে। কিন্তু এবার আর রক্ষা নেই। উঠে দাড়িয়েছে। আমার কাছেই আসবে। আর আমার দিকেই আসতে শুরু করল। আমি উঠে দৌড় দেওয়ার জন্য প্রস্তুত। কিন্তু হুট করে আমাকে অবাক করে দিল। সামনের ছেলেটার কলার ধরে উঠালো। তারপর গালে কষে এক চড় দিল। আর বলল,
>ঐ তুই আরও আমার বান্ধবীর বোনকে ডিস্ট্রাব করবি। হ্যবলার মত তাকিয়ে থাকবি। জানিস না হ্যবলার মত তাকালে মেয়েটার মনের মধ্যে কেমন কেমন করে। (প্রিয়ন্তি)
<কিন্তু আপা আমিতো… (ছেলেটা)
>ঐ চুপ কোন কথা না। আর একদম ঘুরাঘুরি করবি না। বলে দিলাম। যদি সামনে পরিস তাহলে বললাম খবর খারাপ আছে…
<জ্বি আপা…
বুঝলাম কথাগুলো আমাকে বলল। মনটা একটু খারাপ আবার ভালও যে আমি তাকালে মনের মধ্যে কিছু হয়। ছেলেটা চলে যাচ্ছে ডাক দিলাম। আমার ডাক শুনে আমার কাছে আসল। বললাম,
-সরি ভাই আমাকে মাফ করে দিও। আমার জন্যই তোমাকে চড় খেতে হল… (আমি)
>আরে আপনার জন্য আমি মার খাব কেন… আমার এটা নিত্য দিনের অভ্যাস কারো না কারো হাতে মাইর খাব। এসেছিলাম একটু রোদে বসতে। গরম কাপড় কেনার সামর্থ নেই। তাই রোদ উঠলে সেখানেই দৌড়ে যাই। জায়গাটা ফাকা তাই আসলাম।
ছেলেটার কথা শুনে খারাপ লাগল। বিনা কারণে শুধু ছেলেটা মাইর খেল। গায়ের সোয়েটারটা খুলে বললাম,
-এই দিকে ঘোরোতো। হুম এবার হাত ঢুকাও। ওহ দারুণ মানিয়েছে তোমাকে…
ছেলেটা নিজেকে বিশ্বাস করতে পারছিল না। কিন্তু সত্যি বলতে কি ছেলেটাকে দারুণ মানিয়েছে। আমাকে কেমন জানি শুকনো শুকনো লাগত কিন্তু ওকে একদম হিরো দের মত লাগছে। যাক অবশেষে নিজে না হলেও একজনকে হিরো বানালাম। ছেলেটা অনেক খুশি। আমাকে বলল,
>আপনি অনেক ভাল স্যার…
বলেই চলে গেল। প্রিয়ন্তি বিষয়টা লক্ষ্য করেছে বুঝতে পারলাম। কিন্তু পাত্তা না দিয়েই চলে আসলাম সেখান থেকে। অবশ্য পরে একবার দেখলাম ও ছেলেটার সাথে কথা বলছে। বলুক তাতে আমার কি। ভালবাসি জন্য এতটা করবে। শুধু একটা নিরীহ ছেলে এই ঠান্ডায় মারবে ভাবতে পারিনি। রাগি কিন্তু এতটা আসলেই আমার বোধে আসেনি। যে নিজের রাগকে সামাল দিতে পারে না সে আমার পরিবারকে কি করে সামলবে। চলে এসেছি বাসায়।
*
ভাল লাগছে না কিছু। কয়েকদিন কলেজে যাইনি। প্রিয়ন্তিকে দেখতে ইচ্ছে করছে। ইচ্ছেটাকে চেপে রেখেছি কয়েকদিন থেকেই। কিন্তু আজ আর চেপে রাখতে পারলাম না। কলেজে যাওয়ার জন্য প্রস্তুতি নিলাম। হাটতে হাটতে মাথা নিচু করে কলেজে ঢুকতেছি। কন্ঠটা কানে বাজতেছে তার মানে এখানেই এছে প্রিয়ন্তি। কিন্তু মাথা তুলে দেখলাম না। দ্রুত বেগে হেটে চলে যেতে লাগলাম। ওকে দূর থেকেই দেখতে চাই। কাছে আসলেই কেমন জানি চেন্জ হয়ে যাই। কিন্তু সেটা হলনা। সামনে তাকাতেই দেখতে পেলাম কেউ একজন হাত বেধে আমার সামনে দাড়িয়ে। চোখ উপরে তুলেই নিচে নামিয়ে নিলাম। তাকিয়ে থাকার সাহস নেই আমার ঐ চোখে। আলতো করে বললাম,
-পথ ছাড়ুন আমাকে যেতে দিন… (আমি)
>তো যান আপনাকে বারন করছে কে… (প্রিয়ন্তি)
-হ্যাঁ তাই তো…
বলেই পাশ কেটে চলে যেতে লাগলাম। কয়েক হাত যাওয়ার সঙ্গে সঙ্গে পিছন থেকে আওয়াজ আসল,
>ঐ নিজেকে কি মনে করিস তুই… যা মন চাবে তাই করবি… আর এক পা সামনে বাড়ালে পা ভেঙ্গে ফেলে রাখব…
কথাটা শুনে থমকে দাড়ালাম। এই মেয়ের বিশ্বাস নেই। বললাম,
-আপনার সাথে আমার কোন কথা নেই…
>কেন আমি কি করছি হুম…
-সেটা আমি জানিনা। তবে আপনি আমাকে আপনার সামনে আসতে নিষেধ করেছেন…
>তাই বলে আর আপনি আসবেন না…
-না আসবো না…আপনি একটা গুন্ডি সেদিন ঐ ছেলেটাকে কিভাবে মেরেছেন আমি দেখেছি। আমি মাইর খেতে পারবো না…
বলেই হন হন করে চলা শুরু করলাম। পিছন থেকে রাগী গলায় চিৎকার দিয়ে বলা শুরু করল,
>ঐ তুই যদি সামনে না আসিস তবে মেরে ঠ্যাং ভেঙ্গে আমার সামনে শুইয়ে রাখব। চাইলেও যেতে পারবি না…
হি হি হি কেমন লাগে এখন। বেশ খুশি খুশি লাগছে। ক্লাশ শেষ করে রাস্তায় কিছু শয়তানি ভুত চাপিয়ে বাসায় ফিরলাম। আরও কয়েকদিন কলেজে যাব না। দেখি সে কি করতে পারে। যা করার করে নেবে। কলেজে অবশ্য বেশ কিছু কথা শুনলাম। ও নাকি দুস্থদের মাঝে শীতের কাপড় দেওয়ার চেষ্টা করছে। ওর কযেকজন বন্ধু আর কলেজের কিছু বড় ভাই আপুও আছে সাথে। আমিও পরোক্ষভাবে জড়িয়ে পরলাম। কিন্তু সবাইকে বলে দিয়েছি যেন প্রিয়ন্তি জানতে না পারে। বাসায় এসেই ঘুম।
*
কয়েকদিন পর…
হঠ্যাৎ করেই ঘরে অবন্তি চলে আসল। এসেই কিছু ফটো দেখাতে লাগল আমাকে। প্রিয়ন্তিসহ আরও কয়েকজনের শীতের পোষাক বিতরণের ফটো। দেখে ভাল লাগছে। নিজের প্রতি আবার নতুন করে বিশ্বাস জাগ্রত হয়েছে নাহ্ আমি কোন ভুল মানুষকে ভালবাসিনী। ওকে সরি বলা দরকার…
>দাদা…দাদা…এই দাদা… (আমাকে ধাক্কা দিয়ে)
-কে কে… ও তুই… (আতঙ্কিত ভাবে)
>কিরে কি ব্যপার… হুম
-আরে না কিছু না… বল কত চাই…
>মানে…
-এই নে ৫০০ টাকা না ১০০০ ই নে…
খানিকটা অবাক হয়ে বলল,
>কিরে দাদা কি হয়েছে তোর আজকে মেঘ না চাইতেই বৃষ্টি…
-তুই তো এই জন্যই আসিস। পেয়েছিস এখন যা..
>বুঝি বুঝি সব বুঝি…
-তুই পাকা বুড়ি না তুই তো সব বুঝবি যা এখন…
>হুম যাচ্ছি… শোন আজকে ওরা সবাই ……. (জায়গাটার নাম গোপন রাখলাম) যাবে। আর ভিডিওটা দেখে নিস…
বলতে বলতে চলে গেল। আর আমার ফোনে টুং টুং টুং শব্দ শুরু। ভিডিওটা ওপেন করলাম,
>আমি একটা বলদকে ভালবাসি। শুধু কি বলদ নাম্বার ওয়ান বলদ। সামনে দাড়ালেই তার কাপাকাপি শুরু হয়ে যায়। কিন্তু এই কাপাকাপি করে যে কখন আমার মনের কাপাকাপি তুলে দিয়েছে বুঝিনি। একটা কথাও বোঝে না সে। আমাকে যেন যমের মত ভয় পায়। ভেবেছিলাম হয়তো শুধু আমাকেই ভয় পায়। কিন্তু ভাবিনি এতটা ভীতু একটা সামান্য প্লাস্টিকের সাপ দেখে অজ্ঞান হয়ে যায়। আর আমাকে কিনা বলে বউ। সাহস কত। আর এক ধমকে নয় দিন কলেজে আসেনি। এই অবন্তি আমার কথা শুনতে পাচ্ছো আজকে তোমার দাদাকে পাঠিয়ে দিবে। প্লিজ পাঠিয়ে দিও। প্লিজ প্লিজ প্লিজ… (প্রিয়ন্তি)
নাহ্ আর এভাবে থাকা যায়না। আজকে যেতেই হবে……
*
বাইরে বের হতেই বুঝতে পারলাম ঠান্ডার প্রকোপ অনেক বেড়ে গেছে। শীত তো আছেই সাথে শরীর জমিয়ে দেওয়ার মত শির শির করা ঠান্ডা বাতাস। এই অবস্থায় যাওয়া যাবে না। রুমে ঢুকে চাদর নিলাম ক্যালেন্ডারে হুট করেই চোখ চলে গেল। পৌষের সাতাশ তারিখ। ঠান্ডা তো লাগবেই। বেড়িয়ে পরলাম রাস্তায়। হাটতে হাটতে যাচ্ছি। পৌষের মৃদু হাওয়া চুলগুলোকে আঘাত হানছে। কোন ফাক খুজে পেলেই সেখান দিয়ে ঢুকে শরীরে কাঁপুনি তুলে দিচ্ছে। কাপাকাপি করতে করতে পৌছে গেলাম। ঘড়িতে হাত দিতেই চোখ কপালে সাড়ে চারটা বাজে। শেষ বেলায়ও সূয্যিমামার কোন দেখা নেই। বিতরণী চলছে। দুর থেকেই দেখছি। মেয়েটার মুখে আলতো হাসি। আমার দিকে চোখ দিতেই চাদর দিয়ে মুখটা ঢেকে নিলাম। ঠোটের কোণে মৃদু হাসি নিয়ে আবার নিজের কাজে মনযোগ দিল। কিছুক্ষণের মধ্যে ওদরে বিতরণী শুরু হয়ে গেল। সবাই গাড়িতে উঠে পরল। ভেবেছিলাম ও উঠবে না। কিন্তু আমার ধারণা ভূল প্রমাণ করে গাড়িতে গিয়ে বসল। শুধু চেয়ে চেয়ে দেখলাম। মনটা খারাপ করে দিল। ভাল লাগছে না। সামনে একটা পার্ক আছে ঐখানটায় কিছুটা সময় ব্যয় করে বাসায় ফিরে যাব…
*
বসে আছি একটা বেঞ্চে। প্রায় সাড়ে পাঁচটা বেজে গেছে। পার্কটা একদম ফাকা। অথচ গরম হলে এই সময় কত যে কপোত কপোতি আসতো জানা নেই। পুকুরের জলগুলো বাষ্প হয়ে একটা ধোয়ার মত পরিবেশ সৃষ্টি করেছে। চারিদিকটা ঘিরে নিয়েছে সেই আবছায়া। মনের মধ্যেও জমে গেছে এমন ধোয়া। ছেয়ে গেছে আমার মনে। যদি আমার সাথে এমনটাই করবি তাহলে ওভাবে ম্যাসেজ করার কোন দরকার ছিল। ভেবেছিলাম মনের মধ্যে জায়গা দিব কিন্তু আর না। দরকার নেই তোর…
>স্যার আমাকে একটা চাদর দিবেন স্যার খুব ঠান্ডা স্যার জমে যাচ্ছি একদম। শুনেছি আপনি নাকি শীতের কাপড় বিতরণ করেন আমাকে একটা চাদর দিবেন…
কোন একটা মেয়ে কন্ঠ কাপা কাপা গলায় কথাটা বলল। কথাটা শুনেই চাদরটা খুলতে খুলতে বাড়িয়ে দিলাম তার হাতের দিকে। সে নিয়ে গায়ে জড়িয়ে নিল। কিন্তু মুখটা দেখে আমি একদম অবাক। প্রিয়ন্তি। শুধু মাত্র একটা সেলোয়ার কামিজ পড়ে এসেছে। মেয়েটাকি পাগল নাকি। চাদরটা পযন্ত ভাল ভাবে গায়ে দিতে পারছে না। তাই জড়িয়ে দিলাম বেশ করে। শুধু তাকিয়ে আছি কি করে এই ঠান্ডায় আছে। আমার তাকিয়ে থাকা দেখে তুরি মেরে বলল,
>ও হ্যালো…কি দেখছেন এমন করে…
-না কিছু না।
বলেই মুখ ঘুড়িয়ে নিলাম। বুঝতে পারলাম বেঞ্চের অন্য মাথায় কেউ একজন বসেছে। চুপচাপ আছি দুজনই। কারো কোন কথা নেই মুখে। সময় ধীরে ধীরে চলে যাচ্ছে। ঠান্ডার প্রকোপটাও বেশ বাড়তে শুরু করেছে। পুকুর থেকে ঠান্ডা বাতাস বইতে শুরু করেছে একটু বেশি বেগেই। আমাকেও বেশ ঠান্ডা লাগছে। বাইর থেকে বোঝা না গেলেও আমি ঠিকই বুঝতেছি। আড়চোখে দেখলাম প্রিয়ন্তি কি করছে। আমি পুরাই অবাক তার ঠোটের কোণায় মৃদু হাসির ছাপ। একটু ভাল লাগল সেটা দেখে। কিন্তু ঠান্ডায় আর হচ্ছে না। হঠ্যাৎ আমাকে অবাক করে দিয়ে আমার পাশে এসে বসল। নিজের গায়ের চাদরের অর্ধেক পরিমাণ আমার গায়ে জড়িয়ে দিল। ওর বাহুতে লেগে আছে আমার বাহু। অনুভূতি চরম শিকরে পৌছে গেছে। কিন্তু হুট করেই মুখ দিয়ে বেরিয়ে গেল…
-একি আপনি কি করলেন এটা… (আমি)
>একা একা ঠান্ডা লাগছিল তাই আপনার কাছে আসলাম। এখন বেশ গরম লাগছে… (প্রিয়ন্তি)
কি বলবো বুঝতে পারছি না। তবুও বললাম,
-আপনার বয়ফ্রেন্ডের সাথে গিযে এভাবে বসুন। আমার পাশে কেন…
>ঐটা একটা আস্ত ভীতুর ডিম…
-ঐ আমি মোটেও ভীতু না…
>আমি কি আপনাকে বলেছি নাকি… আজব
-হ্যাঁ তাই তো…তাহলে আমি এখানে কি করি। যান আপনার বয়ফ্রেন্ডের পাশে গিয়ে বসেন…
বলেই চাদর থেকে বেরিয়ে আসলাম। হাত দুটো একখানে করে বসে রইলাম। আবারও নিরাবতা বিরাজমান। কিন্তু পরক্ষণই আমার গায়ে চাদর জড়িয়ে দিয়ে ডান হাতটা শক্ত করে ধরে কাধে মাথা রেখে বলল,
>এই যে আমার বয়ফ্রেন্ড…
আমি চুপ। একটু পর বললাম,
-আগে বলনি কেন…
>তুমি বলতে পারনি…আমি মেয়ে মানুষ আমি কি করে বলব…
-এখন কি করে বললে…
>কি আর করবো যখন একটা বলদকে ভালবেসে ফেলেছি বলতে তো হবেই…
-আমি সারা জীবন এরকমই বলদ থাকতে চাই….
>আমিও এমন করে তোমার ভালবাসা চাই…
অতঃপর ভালবাসার বলয় ঘিরে নিল আবার নতুন একজোড়া কপোত কপোতিকে।

গল্পের বিষয়:
ভালবাসা

Share This Post

সর্বাধিক পঠিত