ওপারে নিলয়

ওপারে নিলয়

অপারেশনের পঞ্চম রাত। আরও একটি বিনিদ্র রাতের উৎকণ্ঠিত প্রহর গুণছে শাওন। অপারেশনের পর আই সি ইউ এর প্রথম দু-রাত প্যাথেডিনের প্রতিক্রিয়ায় তেমন কিছুই বুঝতে পারেনি শাওন। সাড়ে নয় ঘন্টা পর কয়েক মূহুর্তের জন্য চোখ মেলে শুধু এক নজর দেখেছে আধুনিক চিকিৎসা বিজ্ঞানের অত্যাধুনিক কিছু এ্যাপারেটাস নিজের সারা শরীরে স্হাপন করা। যার প্রতি মূহুর্তের রিডিং নোট করতে ব্যাস্ত ডাক্তার, নার্চ। প্রথম ঘোরের মাঝে চোখ মেলে তেমন কিছু না বুঝলেও এটুকু স্পষ্ট ছিল শাওনের কাছে, তার কৃতজ্ঞতার শেষ স্বারক টুকুও বিধাতার মন বিগলিত করতে পারেনি। চির শান্তির সূদীর্ঘ একটা ঘুমের যে প্রত্যাশা নিয়ে শাওন ওটির টেবিলে শুয়ে প্যাথেডিনের ডোজ নিয়েছিল, তা থেকে বিধাতা তাকে শুধু বঞ্চিতই করেনি, লাঞ্চিতও করেছে। শাওনকে চোখ মেলতে দেখে উৎকণ্ঠিত ডাক্তার মতিন হাফ ছেড়ে শুধু বললেন–
>যাক বাঁচালে! যা ভয় পাইয়ে দিয়েছিলে—। আমরা তো ভেবেছিলাম—-
ডাঃ মতিন কথা শেষ না করলেও বাকিটা বুঝে নিতে খুব বেশী বেগ পেতে হয়নি। মনে মনে কেবল বলল–সেটাই তো চেয়েছিলাম আমি। কিন্তু—
আই সি ইউ এর প্রথম দু রাত অবচেতন শাওনের কিছুই ভাবার ছিল না। চোখ মেলে তাকাতেও কষ্ট হচ্ছিল। শরীরের নিম্নাংশ অবস। কোনো দিকে একটু নড়া চড়ারও উপায় ছিল না। কিন্তু পোষ্টঅপারেটিভ ওয়ার্ডের প্রথমরাত থেকেই শাওনের চোখ থেকে ঘুম য়েস অাবার হাওয়া হয়ে গেল। ভিজিটিং আওয়ারে মা ভাই বোন আত্মীয় স্বজন বন্ধুরা পালক্রমে এসে দেখা করে গেছে। সবাই সজল চোখে চোখে উৎসাহ দিয়েছে। অনুপ্রেরণা দিয়েছে। জীবনের এই দর্যোগ ময় মূহুর্ত কাটিয়ে উঠার জন্য অকুণ্ঠ সমর্থন জানিয়েছে। সবার কান্না বিজড়িত চোখ গুলোর দিকে তাকিয়ে কিছুই বলার ছিল না শাওনের। বুকের উপরে ঝুলন্ত সিলিং ফ্যানটার দিকে তাকিয়ে শুধু দুচোখের পাশ দিয়ে অঝরে অশ্রুু বিষর্জন দিয়েছে। পেটের বামপাশে স্হাপন করা ক্যাথেডারটার ভার ওর বুকে জগদ্বল পাথরের মতো চেপে বসেছে। কি চেয়ে কি পেল অার কি হতে কি হয়ে গেল এসব বিক্ষিপ্ত চিন্তায় দু চোখের প্লাবন যেন বাধ মানতে চায়ছিল না কিছুতেই। পোষ্ট অপারেটিভ ওয়ার্ডের দু-রাত দু মিনিটের জন্যও দু-চোখের পাতা এক করতে পারলনা শাওন। অব্যাক্ত যন্ত্রনায় নিজের অন্তরাত্মা শুধু অনুতাপ আর হাহাকারে গুমড়ে মরেছে। ভাবনা শুধু কি করে নিজের এই বিকলাঙ্গ জীবনের ভার সে বইবে? আর কি করেই বা মনিকে নিজের জীবন থেকে মুছে ফেলবে। তাতে যে নিজের হাতেই নিজের হৃৎপিন্ডটাকে জখম করতে হয়। ক্ষত বিক্ষত করতে হয়। কিন্তু এতো বড় দক্ষ সার্জন তো সে নয়।
.
পঞ্চম দিন ইউরিন ক্যাথেডার খুলে আবার শাওনকে সার্জিক্যাল ওয়ার্ডের ষোল নম্বর বেডে স্হানান্তর করা হল। আরও একটি নির্ঘুম রাতের উৎকণ্ঠা। মনে মনে ভাবছিল একটা স্লিপিং পিল পেলে মন্দ হতো না। এ্যাসিস্ট্যান্ট শিহাবকে প্রস্তাবটা দিতেই তা বিনয়ের সাথে এড়িয়ে গেল শিহাব। বিবাদমান পরিস্হিতিতে এই ছোট্ট ঝুঁকিটা নিতেও শিহাবের অনিহা।
ভিজিটিং আওয়ার শেষে বিদায় নেবার মূহুর্তে মজিদ ভাই বার বার অনুরোধ করে গেছে সেল ফোনটা খোলা রাখার জন্য। যাতে রাতে প্রয়োজন মতো খোঁজ খবর নেয়া যায়। সন্ধ্যার পর থেকে কয়েকবার ফোন করে খবরও নিয়েছে। রাত্রি আনুমানিক সাড়ে এগারটা পৌনে বারটা হবে।হ্যান্ড সেটের ইনবক্স ওপেন করে মনির বিভিন্ন সময়ে পাঠানো মেসেজ গুলো দেখছিল শাওন। শরীরের যাবতীয় ব্যাথা বেদনা ভুলে বিছুটা সময় হারিয়ে গিয়েছিল নিজের ফেলে আসা অতীতটার মাঝে। ভুলে গিয়েছিল সার্জিক্যাল ওয়ার্ডের ষোল নম্বর বেডটার কথা।
এর মাঝে আবারও ফোন। মেসেজ গুলো পড়তে পড়তে চোখ ভিজে গিয়েছিল শাওনের। বাম হাতে চোখ মুছে ফোন রিসিভ করলো শাওন। ভেবেছিল মন্টু আরিফ হাই সজিব শিশিরদের কেউ হবে। কিন্তু ভাবনার সমস্ত জাল ছিন্ন ভিন্নন হয়র গেল কেমন আছ এই ছোট্ট দুটি শব্দ শুনে। সারা শরীরে যেন বিদ্যুত খেলে গেল। হৃদয় সাগরের দুকুল ছাপিয়ে উথাল পাথাল ঢেউ বয়ে গেল। রক্তের প্রতিটি কণা যেন শিহরিত হয়ে উঠলো। দুমড়ে মুচড়ে গেল ভেতরটা। তাৎক্ষণিক কোনো জবাব দিতে পারল না শাওন। অসহ্য যন্ত্রনায় চোখ বন্ধ করে ফেলল। শেষকবে এই কণ্ঠস্বর শুনেছে স্মৃতি হাতড়ে মনে করার চেষ্টা করলো শাওন–
কয়েক মূহুর্ত জবাব না পেয়ে অপর প্রান্ত থেকে ধ্বণিত হলো—
>হ্যালো শাওন , কোনো কথা বলছো না কেন? কেমন আছ–
>হ্যাঁ, ভাল।
সাবলীল কণ্ঠ মনির। যেন কিছুই হয়নি। কিন্তু অপর প্রান্তে সেই কৃত্তিম অনুভূতি কোনো পাত্তাই পেল না–
>মিথ্যে বলোনা শাওন। আমি সব শুনেছি—
> শুনেছ? কি শুনেছ?
> তুমি অসুস্হ, তোমার—
কথা শেষ করতে পারলনা মনি। শাওনের বিশ্ময়ও মাত্রা ছাড়িয়ে গেল। এতো বড় সুখবর মনির কাছে পৌঁছে দেবার মহান দায়িত্বটা কে কাঁধে তুলে নিল ভাবছে শাওন। সেখানে মেহেদীর চেয়ে যোগ্য আর কাউকে সে খুঁজে পাচ্ছে না।
>কি হয়েছে শাওন—
নিজেকে স্বাভাবিক রাখতে কষ্ট হচ্ছিল শাওনের। কোনো কথায় বেরুতে চাইছিল না মুখ দিয়ে। ফোন কেটে দেবে কিনা ভাবছিল। আবারো অনুনয় করল মনি–
>কি হয়েছে বলবেনা শাওন? বলবেনা আমাকে—
ওর প্রতি নিজের দূর্বলতা আকাশ চুম্বি হলেও সেই মূহুর্তটাই নিজের ভেতর কিছুটা অভিমান, বিদ্বেশ এর মিশ্র অনুভূতি কাজ করছিল শাওনের। সব জেনেও বিলেত জীবনের মোহে একদিন সব অতীত ধুলায় মিশিয়ে দিয়ে ও রেজার হাত ধরতে ও দ্বিধা করেনি। তাকে সর্বশান্ত, দিকভ্রান্ত করতে যার বিবেকে একটুও বাধেনি। সব কিছু নিজে হাতে শেষ করে দিয়ে আজ আবার সে কোন লজ্জায় কি হয়েছে তা জানতে চাওয়ার মতো নির্লজ্জ প্রহসন করতে পারে? যা কিছু ঘটে গেছে তার আগাম সংকেত নিজের অবস্হান থেকে পুরোটাই দিয়ে রেখেছিল শাওন। সেদিন জীবনের নির্ভরতার কাছে শাওনের বুকফাটা আর্তনাদের কোনো গুরুত্ব ছিল না মনির কাছে। সেই সব করুন আর্তি গুলো মনে করে নিজের ভেতর ক্ষোভ দানা বেধে উঠল। না, জানাবে সে কোনো কিছু—
>না, এমন কিছু না—
চতুর মনি হয়তো বুঝে ফেলল ব্যাপারটা। তাই পুরোনো একটা অস্ত্র ব্যাবহার করলো–
>শাওন প্লিজ। আমায় যদি কখনো এক মূহুর্তের জন্য ভালবেসে থাক প্লিজ বলো—
এই একটি অস্ত্রে ওর কাছে শাওন ঘায়েল হয়নি এমন মূহুর্ত শাওনের জীবনে কোনোদিন আসেনি। এ ক্ষেত্রেও তার ব্যতিক্রম হলো না। দাঁতে ঠোঁট চেপে চোখ বন্ধ করে ফেলল। বুকের ভেতর আটকে থাকা দীর্ঘশ্বাস ছেড়ে বরল–
>তেমন কিছু না। শরীরের দু একটা পার্টস অকেজো হয়ে গেছিল। ওগুলো শরীর খেকে কেটে বাদ দিতে হয়েছে—
অপর প্রান্তে মনির কণ্ঠ কয়েক মূহুর্তের জন্য স্তব্ধ হয়ে গেল। শাওনের নিজেরও প্রচন্ড কষ্ট হচ্ছিল। চিৎকার করে কাঁদতে ইচ্ছা করছিল। শারীরিক যন্ত্রনা গত কয়েক মাসে অনেক সয়েছে শাওন। কিন্তু এই মূহুর্তটার যন্ত্রনা তার চেয়ে হাজারও গুন বেশী। তা বুকের মাঝেই কবর দিয়ে দিল শাওন। মনিকে নির্বাক দেখে এবার শাওন প্রশ্ন করল—
>কিন্তু তুমি এসব জানলে কি করে?
>জেনেছি কোনো ভাবে। জানার পর গত চারদিন তোমার সাথে কথা বলার চেষ্টা করছি। পারিনি। তোমার ফোন বন্ধ। তার উপর রেজা ছিল। ও আজই ইংল্যান্ড চলে গেল–
>আচ্ছা ঠিক আছে। তুমি ভাল থেক, সুখে থেক–
কান্নার আভাস টা স্পষ্ট শাওনের কণ্ঠে। মনিও বুঝে ফেলল সেটা—
>কথা বলতে কষ্ট হচ্ছে তোমার?
শাওন একবার ভাবলো যে বলে দেয় কষ্ট নয় অনিহা। কিন্তু জিহবার মাথায় এসেআটকে গেল কথাটা। অপর প্রান্ত থেকে মনি বলল–
>নিজেকে কেন এভাবে শেষ করলে শাওন। মেহেদী ভাইয়ার কাছে আমি সব শুনেছি–
>কি বলছো মনি। নিজেকে কেন শেষ করবো? আমিতো আমার প্রায়শ্চিত্ত করছি–
>আমাকে তুমি সারা দুনিয়ার কাছে অপরাধী বানিয়ে দিলে শাওন–
>না মনি আমি তোমায় অপরাধী করছি না। যা কিছু ভুল, অপরাধ সব আমার। মনি, জীবনের জন্য প্রতিষ্ঠার দরকার আছে। নিজের মঙ্গল চাওয়াটা, সুখ সমৃদ্ধি চাওয়াটা কোনো অন্যায় নয়। বরং না চাওয়াটাই অন্যায়। এই সহজ সত্যটা যে বুঝতে চায়না, সেই তো বড় নির্বোধ। তুমি আমার চোখ খুলে দিয়েছ। এ জন্য তোমাকে—
কথা শেষ হবার আগেই আর্তনাদ করে উঠল মনি–
>শাওন থামো প্লিজ—। আর বলোনা—
কণ্ঠ যথা সম্ভব নামিয়ে এবার ধীর উত্তর শাওনের–
>আমি তো থেমেই গিয়েছি মনি। পৃথিবী আমাকে খরচের খাতায় ফেলে দিয়েছে। আমি চলেছি আমার নিজের গন্তব্যে। আমার চির শান্তির আপন নিলয়ে। ওপারে। তুমি জানতে, তোমাকে ছাড়া আমি নিঃশ, একা। শুধু আমিই জানতাম না আমাকে ছাড়া তুমি এতোটা পরিপূর্ণ। তাই সুখি হবার জন্য তোমাদের দুজন কে রেখে গেলাম

গল্পের বিষয়:
ভালবাসা

Share This Post

সর্বাধিক পঠিত