ভালবাসি তোমায় আমি

ভালবাসি তোমায় আমি

-আচ্ছা সামু, এই আমি টা তো শুধু তোমার তাইনা?
.
=অবশ্যইই আমার, সন্দেহের জায়গা নেই
.
-আচ্ছা, তাহলে তো আমার সব কিছুইই তোমার, মানে, এই ধরো হাত পা মাথা, আরে ধুর কি বলছি, মনে করো আমার রক্ত গুলোও তো তোমার তাইনা??
.
=রিতা, এগুলো কেমন প্রশ্ন বলো তো, পাগলী মেয়ে, যদি মানুষ রিতা টা আমার হয় তাহলে তো তার সব কিছু আমার অস্তিত্বর অংশই হয়
.
-সেটাই তো, তাহলে কখনো কেউ যদি তোমার এই অস্তিত্বর শরীরের রক্ত গুলো কে তিলে তিলে বের করে কষ্ট দেয় তখন তুমি কি করবা তাকে??
.
=ওই, কি সমস্যা তোমার, এখন কিন্তু বাড়াবাড়ি হচ্ছে, তোমার রক্ত বের করবে কোন দুঃখে!!
.
-আরে বলোনা, যদি বের করে তখন কি করবা??
.
=কি করবো মানে, একদম পুইত্তা ফেলবো..
.
-পুইত্তা মানে, এগুলো কেমন শব্দ!!
.
=আরেহ পুইত্তা বুঝোনাই, খাটি বাংলা শব্দ, মনে করো প্রথমে করবো কি, যে তোমাকে কষ্ট দিবে তাকে ধরবো, ধরে তার চান্দি বরাবর আমাদের শীল পাটা আছেনা? ওটার বাটা টা দিয়ে ঠাশ ঠাশ করে কয়েকটা বাড়ি দিবো..
তারপর সুন্দর মতো পাটায় ওই ফালতু টা কে বেটে একদম কবরস্থানের মাটিতে পুইত্তা ফেলবো, মানে মাটি খুড়ে গেঁথে ফেলবো..
.
-ও আল্লাহ, থাক সামু, তোমার এতো ডেঞ্জারাস হতে হবেনা বাবু, তুমি শুধু ছোট্ট একটা কাজ করো এখন তাহলেই হবে..
.
=কি কাজ??
.
-সুন্দর মতো বিছানা থেকে উঠে লাইট অন করে মশারী টা টানিয়ে দাও, দেখো, উষ্ঠা খেয়োনা আবার কোথাও, কেমন বাবু??
.
=আজব তো, তোমার এই রোমান্টিক কথাবার্তারর সাথে মশারী টানানোর কি সম্পর্ক বলোতো??
.
-মশা যে একটু পর পড় কুটুস কুটুস করে কামড়ে আমার দেহ থেকে মানে তোমার অস্তিত্ব থেকে তিলে তিলে রক্ত বের করে আমাকে কষ্ট দিচ্ছে তার জন্য তুমি এতোটুকু করতে পারবেনা??
মশা তো মানুষ না তাইনা?? তাই তুমি যে বললা ধরে কি যেনো পুইত্তা না কি একটা করবা সেটা তো করতে পারবানা, সেইজন্য তো বললাম যে মশারী টানাতে, এতে তোমার কষ্ট করে মশা ধরে এতো রাতে শীল পাটায় বেটে শীতের রাতে কবরস্থানে যেতে হবেনা আবার আমাকেও মশা কামড় দিবেনা..
.
=ও, আচ্ছা আচ্ছা, এই খবর তাহলে তোমার, এইজন্যই তো বলি, এই বান্দরনীর মুখে আবার আজ এতো খৈ ফুটতেছে কিভাবে, কাহিনী তো অন্য জায়গায় দেখি, ওই আমি কেনো মশারী টানাবো, তুমি টানাবে, আমাকে কামড়াচ্ছেনা, আমি পারবোনা টানাতে..
.
-আল্লাহ, এ কেমন পল্টি নিলে তুমি সামু, তুমি না বললা কেউ আমার রক্ত নিলে তুমি কত কি করবা, আর সেই তুমি এখন সামান্য মশারী টানাতে পারবেনা??
তার মানে আমি তোমার অস্তিত্ব না, তুমি মিথ্যা বলছো..
.
=ধুর, রাখো তোমার মিথ্যা কথা, ঘুমালাম আমি, সকাল ৮টায় উঠাবা, অফিস থেকে আউটডোর প্রজেক্ট এ যেতে হবে, অনেক কাজ, আগে আগে উঠতে হবে।
গায়ে কাথা দিয়ে নাও ঠিক মতো, তাহলে আর মশা কামড় দিবেনা, নয়তো স্প্রে করো, কষ্ট করে কিছুক্ষণ স্পের সুমধুর অসাধারণ গন্ধ সহ্য করো..
.
-ভাল, খুব ভাল, এটাই তো বলার কথা ছিলো তোমার তাইনা?? মশারী তোমার টানানো লাগবেনা, কিছুই করা লাগবেনা, আমার সাথে কথাও বলতে এসোনা, নিজ দায়ীত্বে সকালে উঠবা, আমি কাউকে উঠাতে পারবোনা, বাই…..
(কথা গুলো বলেই রিতা শুয়ে পড়ে, চোখের কোণ ছল ছল করছে, রাতের অন্ধকারেও তা খুব ভাল বুঝা যাচ্ছে)..
.
=আরে ঠিকাছে বাবা রাগ করতে হবেনা, তুমি ঘুমাও, আমি তোমাকে পাহাড়া দিচ্ছি, কোনো মশা আমার বউ টার গায়ে টাচ করতে পারবেনা..
(এই বলে সামু রিতার হাতে স্পর্শ করতে যাওয়ার সাথে সাথেই রিতা হাত ঝেড়ে ফেলে দেয়)..
…………

এই হলো আমার প্রিয়তমা স্ত্রী রিতা। অভিমানী।
মেয়েদের তো সাধারণ অভ্যাস একটু কিছু হলেই কান্না করা, কিন্তু রিতার ক্ষেত্রে সেটা আরেকধাপ উপরে। আর যখন মেয়েটা কান্না করে তখন আমি নিজেও নিজেকে ধরে রাখতে পারিনা, মনে হয় যেনো আমার বুক চিড়ে সাগর বয়ে যায়। আমি জানি মেয়েটা এখন কাঁদছে, আমার দিক থেকে উলটো দিকে মুখ ফিরিয়ে শুয়ে থাকলেও ও যে খুব করে কান্না থামাতে চাচ্ছে তা হঠাৎ হঠাৎ ওর কেপে ওঠা দেখেই বুঝা যাচ্ছে। অন্য কোনো সময় একটু ভাল ভাবে বুঝালেই কান্না থামিয়ে দেয়, তবে আজ বেশ কয়েকবার রাগ ভাঙাতে চেষ্টা করলেও কাজ হলোনা। উলটো দিক থেকে মুখ ফিরছেনা। কি করবো বুঝতেও পারছিনা।

……..

বিয়ে টা আমাদের হয়েছে এক বছরের মতো হবে। বিয়ের আগে লম্বা সময় ধরে দুজনার মধ্যে লুকোচুরি খেলা হয়েছে। পরিচয় টা অনলাইনেই হয়েছিলো। সত্যি বলতে রিতার সাথে পরিচয়ের আগে পর্যন্ত আমি বিশ্বাস করিনি যে কোনো মেয়ের প্রেমে পড়তে পারি কখনো। নিজেকে সব সময় হার না মানা প্রতিম পুরুষ মনে হতো, প্রেমে উষ্ঠা খাওয়া তো ইম্পসিবল মনে হতো। সেই আমিই ধীরে ধীরে এই রিতার মধ্যে খুব জোরেই উষ্ঠা খেয়েছিলাম।
রাত জাগা আমার স্বভাবের মধ্যে ছিলো। একদিন খুব গভীর রাতে অযথা নিউজফিড ঘুরছিলাম, হঠাৎ চ্যাট লিখা জায়গাটায় চোখ পড়লো, চ্যাট লিখাটার পাশে ১ লিখা। মানে আমার সম্পূর্ণ ফ্রেন্ড লিষ্টে একজন অনলাইন এ আছে। খুব চাওয়ার পরেও সেরাতে ঘুম হচ্ছিলোনা। তাই আমার মতো আরেক অভাগা টা কে সেটা দেখার জন্য চ্যাট লিখাটায় ক্লিক করলাম, চোখে ধরা দিলো সবুজ আলোর পাশে নীল অক্ষরে লিখা নাম “এঞ্জেল রিতা”। নামের অবস্থা দেখে মনে মনে ধরেই নিলাম যে এটা ফেইক আইডি। ভাবলাম ঘুম যেহেতু আসছেনা, ফেইক চান্দুটার সাথে একটু আলাপ আলোচনা করে দেখি কেমন লাগে।

হাই হ্যালো বাদ দিয়ে সরাসরি ম্যাসেজ দিলাম “কিরে চান্দু, এতো রাইতে কোন পাগলে ধরছে তোরে যে নিজের আসল পরিচয় বাদ দিয়ে মেয়েদের আইডিতে এসে বসে আছিস, কাহিনী কি?? গার্ল ফ্রেন্ড ছ্যাকা দিছে বুঝি? আহারে, তোর জন্য খুব কষ্ট হচ্ছে, তোর কষ্টে আমারো ঘুম আসছেনা, কি করি বলতো?”
এস এম এস টা সেন্ড করার পর ওপাশ থেকে তথাকথিত সেই ফেইক আইডি কি রিপ্লাই দেয় সেটা ভাবতে ভাবতে তো আনন্দে আটখানা হয়ে আছি আমি। বেশ কিছুক্ষণ ওয়েট করার পরেও সিন দেখাচ্ছিলোনা, একটু পর পর পেইজ রিফ্রেশ দিচ্ছিলাম মজার কোনো রিপ্লাই পাওয়া আকাঙ্ক্ষায়। প্রায় ১৫ মিনিট পর সিন দেখালেও কোনো রিপ্লাই আসছিলোনা, মজাটা কে আরো আপগ্রেডেট লেভেলে নেওয়ার জন্য আবারো এস এম এস দিলাম,
“কিরে ভাই, খুব ব্যস্ত নাকি? বুঝছি, মেয়ে সেজে আরো অনেক ছেলেদের সাথে কথা বলছিস, আস্তে আস্তে প্রেম করবি,তারপর ছ্যাকা দিবি, গার্ল ফ্রেন্ডের থেকে খাওয়া ছ্যাকার প্রতিশোধ নিবি, বুঝি বুঝি, সব বুঝি, কেডি পাঠক আমারি ছাত্র ছিলো বুঝলি, আর সি আই ডির এস্পি কি যেনো এক বুড়া আছে না, ওইটা তো আমার ছুডু ভাই, আর তিন গোয়েন্দা লেখক কাজী দার সাথে তো কত গল্প করছি, এতো বইতো সে আমার আইডিয়া থেকেই লেখছে, আমি সব ধরতে জানি”।
এই ম্যাসেজ টা দিয়ে মনে মনে বিশাল যুদ্ধ জয়ী সৈনিকের মতো হাসতে হাসতে ফেসবুক থেকে লগ আউট হয়ে গিয়েছিলাম। বিষয় টা কে সম্পূর্ণ ভূলে গিয়েই ঘুমাতে চলে গেলাম।

পরদিন সকালে যখন ঘুম ভেঙে ফেসবুকের ইনবক্সে গেলাম তখন রিতা আইডি থেকে একটা রিপ্লাই আসলো, “কষ্ট করে আশুলিয়া আসতে পারবেন? এটা আমার নাম্বার ০১৯******** আসলে কল দিয়েন”। আমি ভাবলাম মেবি ফেইক আইডির ছেলেটা আমাকে থ্রেট দিচ্ছে, এই ভেবে রিপ্লাই দিলাম “ওকে, সমস্যা নাই, চইলা আসিস ভাই, ছ্যাকা থেকে বাচার জন্য উপদেশ লাগবে তাইতো? আচ্ছা ঠিকাছে, আমি ভাল ডেমো দিতে পারি, ফেসবুক ফ্রেন্ড হিসেবে ৫০% ডিসকাউন্ট এ উপদেশ দিয়ে দিবো”। বিষয় টা কে ফান হিসেবে নিলেও পরবর্তীতে সিদ্ধান্ত নিলাম যে হ্যা, আমি যাবো, আশুলিয়া অনেকদিন ঘুড়া হয়না, ঘুড়ে আসবো, আর এই ব্যাটা কেও কল করে আসতে বলে ওদের দেখলেই দৌড় দিবো। বেচারা খুজতে থাকবে রাগে ফোস ফোস করে। ভাল মজা হবে।

সেই মতো আশুলিয়া গেলাম, ঘুরলাম একা একা কিছুক্ষণ, চারোপাশে আনলিমিটেড কাপল দেখে নিজে নিজে হাসলাম উপহাসের মতো। চলে আসার কিছুক্ষণ আগে নাম্বার টায় মেসেজ দিলাম। ৩০ মিনিট পর রিপ্লাই এলো যে সে চলে এসেছে, জায়গার নাম বললো যেখানে ছিলো, আমি ভেবেই নিলাম মনেহয় দশ বারো জন লাঠি ফাঠি নিয়ে আসছে মারার জন্য, তাই তাদের একনজর দেখার জন্য সেখান টায় গেলাম।
অবাক হলাম যেখান টার নাম বললো সেখানে কোনো ছেলেদের দল দেখতে পেলাম না, অনেক্ষণ পর নজড়ে পড়লো একটা মেয়েকে, পিংক কালার একটা ড্রেস, চুল গুলো আশুলিয়ার মুক্ত বাতাসে নিজ আনন্দে উড়ছিলো, হাতা টা ছেলেরা যেমন কিছুটা উঠিয়ে রাখে হাতের অর্ধেক পর্যন্ত তেমন উঠানো। একটু পর পর চারপাশে তাকাচ্ছিলো, আমি জানিনা কেনো মনে হলো এই সেই ফেইক আইডি, আসলে যে তা ফেইক আইডি ছিলোনা সেটা মনে হচ্ছিলো, কাছে গিয়ে নাম্বার টায় কল দিতেই মেয়ে টা রিসিভ করলো, মুখ ঘুড়িয়ে আমাকে দেখতে পেয়েই বলে উঠলো, “ও, আপনি সেই লোক তাইনা??, মেয়েদের আইডি দেখলে মাথা ঠিক থাকেনা, কোনো এক ভাবে জালাতে হবেই, মিথ্যা সত্যি যা মনে চায় বলে দিতে হবে তাইনা?? এবার দেখুন, আমি সেই রিতা, কি, ফেইক লাগছে?? আমি ফেইক??” আমার মাথা কেমন যেনো চক্কর দিচ্ছিলো, মেয়েটা বক বক করে কি কি যেনো বলেই যাচ্ছিলো। হঠাৎ দেখলাম মেয়েটা চলেও গেলো, তবে যাওয়ার আগে মেয়েটার চোখে পানি দেখতে পেলাম। মেয়েটা চলে যাওয়ার পরেও কতোক্ষণ যে একই জায়গায় দাঁড়িয়েছিলাম বুঝতেই পারিনি, তবে সময় টা যে খুব লম্বা ছিলো বুঝছিলাম।

লজ্জা, রাগ, অনুশোচনা বোধ একই সাথে কাজ করছিলো, বাসায় এসে রিতা আইডি টায় স্যরি বলতে গিয়ে দেখি আমি ব্লকড। লগ আউট হয়ে বের হয়ে যাওয়ার পর লাইফে ফার্স্ট নিজ ইচ্ছায় ৭ দিন ফেসবুক থেকে দূরে থাকলাম। ৭ দিন পর যখন ফেসবুকে গেলাম তখন এঞ্জেল রিতা আইডি টা থেকে নতুন এস এম এস পেলাম “স্যরি, আপনাকে মনে হয় বেশি বলে ফেলেছিলাম,আমার আসলে মন খারাপ ছিলো, তার উপর যখন আপনার ওরকম এস এম এস পেলাম তখন রাগ টা কে ধরে রাখতে পারিনি,স্যরি”। সকল রাগ, ক্ষোভ মুহুর্তেই চলে গিয়েছিলো তখন, ফর্মাল ভাবেই রিপ্লাই দিয়েছিলাম “ইটস ওকে, স্যরি টু, ভুল টা আমার ছিলো”। ওপাশ থেকে বললো “হ্যা ভূল টা আপনার ছিলো, আবার ছিলোও না, এঞ্জেল নামের আইডি কে ফেইক বলতেই পারেন, তবে হ্যা, আমি কিন্তু ফেইক না, সত্য প্রুভ করার জন্য আরেকবার দেখাও করতে পারবোনা, হা হা”।

সম্পর্কের শুরু টা এমনই ছিলো, খুব অদ্ভুদ ভাবে ঘটে গিয়েছিলো সব। এক সময়ের অযথা রাত জাগার অভ্যাস টা তখন রিতা কে ঘিরে অতি প্রয়োজনীয় রাত জাগা হয়ে উঠলো। কতো শতো কথা হতো, ফেইসবুক টা তখন আমাদের দুজনের সেকেন্ড হোম ছিলো। একদিন রিতা বলে উঠলো “আচ্ছা সামু, এতো রাত জাগো কেনো?? বিরক্ত লাগেনা??”। সেদিন হা হা রিপ্লাই দিলেও মন ঠিক জানান দিচ্ছিলো রিতার জন্য এমন রাত জাগা মৃত্যুর আগে পর্যন্ত চলতে থাকলেও ক্লান্তবোধ করবোনা।

সাধারণ বন্ধুত্ব্ব টাই যখন গভীর হচ্ছিলো, ভাবছিলাম হয়তো ছন্নছাড়া এই রাজা টা তার রাজ্যের রানী খুজে পেয়েছে ঠিক তখন একদিন রিতার ম্যাসেজ “এই সামু শুনো, তোমার জন্য সুখবর, অতি দ্রুত তুমি বিয়ের দাওয়াত খেতে পারবা, এখন থেকে পেট টা খালি করে রাখো, আর ইউটিউব এ টিউটোরিয়াল দেখে নাচ প্র্যাক্টিস করো, আমার বিয়েতে কিন্তু তোমায় অনেক নাচতে হবে, আর হ্যা আমার বিয়েতে তুমি আমায় অনেক গুলো ফুল দিবে, কেমন?? একটা মিক্সড ফুলের তোড়া দিবে”। প্রথম দিন রিতার বকাঝকা শুনে যেমন করে মাথা ঘুরাচ্ছিলো ঠিক তেমন মাথা চক্কর দিয়ে উঠলো, বেশ কিছুক্ষণ পর রিতার প্রথম রিপ্লাইয়ের মতো করে রিপ্লাই দিলাম “একটু আশুলিয়ায় আসতে পারবেন, এটা আমার নাম্বার ০১৯*********, এসে কল দিবেন”। রিতা অবাক হয়ে রিপ্লাই দিলো “আজব তো, এমন ভাবে বলছো কেনো?? আচ্ছা আসবো”।

আমি তখনো জানিনা যে কেনো আমি রিতা কে ডাকলাম, শুধুই এটাই মনে হচ্ছিলো হয়তো এখন ও কোনো কিছু করার বা বলার আছে, হয়তো এই মুহুর্ত টায় কিছু করতে না পারলে পুরো ভবিষ্যৎটাতে আফসোস করতে হবে।
দূর থেকে দেখা যাচ্ছিলো, রিতা খুব সুন্দর ব্লু কালার শাড়ী পড়ে এসেছিলো, মেয়েটা কে শাড়ী পড়লে অদ্ভুত সুন্দর লাগে তো, রিতা কে দেখতে দেখতে কি বলবো তাই যেনো ভূলে যাচ্ছিলাম..
সম্বিত ফিরে পেলাম যখন রিতা এসে আমার মুখের সামনে হাত নাড়িয়ে বললো “এই, কি হয়েছে তোমার?? মুখ এমন হা করে তাকিয়ে আছো কেনো?? শহরের সব মোশা রা তোমার মুখে বাসা বেধে ফেলবে তো”……
লজ্জা পেয়ে মুখ বুঝে নিয়ে চোখ বন্ধ করে কিছুক্ষণ চুপ হয়ে থাকলাম..
চোখ খুলতেইই বলা শুরু করলাম “রিতা, রিতা আমি জানি হয়তো বাসা থেকে তোমাদের পছন্দ করা ছেলের চাইতে আমি খুব খারাপ, হয়তো আমি তোমার মনের মতোও কেউ না, কিন্তু সত্যি করে বলছি, আমার এই মনের মধ্য জায়গা টা সারাক্ষণ আমাকে শুধু তোমার মধ্যে বিলীন হতে বলতে থাকে, রিতা আমি জানি হয়তো আজকের পর থেকে তুমি আমার জীবন থেকেও চলে যাবে কিন্তু শুনে রেখো যদি তুমি আমার হয়ে থাকো তবে যেমন করে ভালবাসবো তুমি চলে গেলেও তাই বাসবো,রিতা হয়তো অন্য সবার মতো তোমাকে আমি প্রতি মুহুর্তে ভালবাসি ভালবাসি বলবো না তবে জেনে রেখো প্রতিটি মুহুর্তে আমি এমন কিছু করবো যে তোমার মন বুঝে নেবে আমার মনের মধ্য জায়গাটা কতোবার তোমার ভালবাসার কাছে মাথা নত করে, রিতা বিশ্বাস করো আমি তোমাকে হাজার টা স্বপ্ন দেখাবোনা, কিন্তু যে কয়টি স্বপ্ন তুমি নিজে দেখবে সেগুলো পূরনের জন্য আমি আমার শেষ রক্ত বিন্দু টাও বাজি রাখবো,রিতা আমি জানিনা কবে থেকে তোমাকে আমি ভালবেসেছি আর কিভাবে ভালবেসেছি, হতে পারে সেই প্রথম দিন থেকে আবার হতে পারে আজকের এই দিন থেকেই তোমাকে ভালবাসছি, কিন্তু শুনো আমি এই মুহুর্ত টায় তোমায় ভালবাসি আর আমার কাছে তোমার জন্য হওয়া প্রতিটি মুহুর্তই বর্তমান হয়ে থাকে, এর মধ্যে কোনো অতীত বা ভবিষ্যৎ নেই, নিঃশ্বাস থাকা পর্যন্ত মুহুর্ত গুলো বর্তমান হয়েই থাকবে,রিতা আমি জানিনা ভালবাসার পরিচিয় ঠিক কিভাবে লিখতে হয়, আমি শুধু জানি এটা এমন কিছু যেটার মধ্যে একবার ঢুকে গেলে সেটার মধ্যে থেকেই বাকি জীবন টা শেষ করতে হয়, এটা শুধু হয়ে যায়, সময়,অবস্থা,পরিবেশ কিছু কেই এটা পাত্তা দেয়না, রিতা আমিও শুধু তোমায় ভালবেসে যেতে চাই, আর আমি তোমার ভালবাসার মধ্যে ডুবে গিয়েছি এই মুহুর্ত টায়, আজীবন এখানে থাকতে হবে এই আমায়, তবে আমি চাই না এই ভালবাসার ঘড় অন্ধকার হয়ে থাকুক, আমি একটু আলো চাই, আর আমার ভালবাসার ঘড়ের অন্ধকার শুধু তোমার ভালবাসাতেই মুক্তি পায়, হয়ে উঠে আলোক পূর্নিমায়, তবে কি ভালবাসবে এই আমায়??”

রিতা তখন চুপ করে আমার দিকে কিছু মুহুর্ত তাকিয়ে থেকে চলে যায়, সেই প্রথম দিনের মতো আমিও ওর চলে যাওয়ার দিকে তাকিয়ে থেকে দাঁড়িয়ে রই।
বাসায় যেতে যেতে মনের অবস্থা কেমন হচ্ছিলো বলে বুঝানোর মতোনা, ঠিক যেনো ডগবগ করে ফুটতে থাকা গরম পানির মতো, যেই পানির ফুটতে থাকা আওয়াজ টা খুব সুন্দর হলেও ছুঁয়ে দেয়া টা অসম্ভব। বাসায় যেয়ে ফেসবুকে বসে সবার আগে ইনবক্সে ক্লিক করে রিতার রিপ্লাই দেখে সেটা পড়তে থাকলাম “এমন ভয় পেতে হবেনা পাগল, আমি তোমার রিয়েকশন দেখার জন্য বিয়ে ঠিকের কথা বলেছিলাম, সত্যি বলতে এখন ও কোনো বিয়ে ঠিক হয়নি, তবে হ্যা, কথা চলছে, কিছু প্রপোজাল এসেছে, যদি কেউ চায় তবে যেনো আজকের মতো করে বাসায় প্রপোজাল নিয়ে এসে সবার সামনে প্রপোজ করে, দেরি করলে কিন্তু অন্য কিছুও ঘটতে পারে”।

হা হা, এভাবেই আমাদের সব কিছু হয়ে গিয়েছিলো, আর হ্যা, রিতার চাওয়া তিন টা কাজ ই আমি করেছিলাম, বিয়ে টা আমার ই হয়েছিলো কিন্তু সেই বিয়েতে সবচেয়ে বেশি খাবার মনে হয় আমি ই খেয়েছিলাম, কারন ওই যে রিতা বলেছিলো বিয়ের আগে না খেয়ে পেট খালি করতে, আমি তাই সত্যিই কয়েকদিন শুধু বেচে থাকার জন্য খাদ্য যেটাকে বলে সেটা খেয়ে খেয়ে পেট খালি করেছিলাম, বিয়ের আগে ইউটিউব থেকে টিউটোরিয়াল দেখে বিয়ের দিন স্টেজ এ এমন নাচ দিয়েঁছি যে মাইকেল জ্যাকসন বেচে থাকলে বলতো,” ভ্রাতা,আমার ভাত কেনো মেরে দিচ্ছো!!”
আর হ্যা, আমাদের ফুলশয্যার রাতে রিতার চাওয়া সেই ফুলের তোড়া টা ওকে উপহার দিয়েছিলাম, যেখানে জানা অজানা কতোগুলো ফুল ছিলো তা এখন মনে পড়ছেনা, তবে সেরাতে প্রতিটি ফুল আলাদা আলাদা করে দুজন মিলে গুনেছিলাম।

………..
কথা গুলো ভাবতে ভাবতে রিতার দিকে ভালভাবে তাকিয়ে বুঝলাম মেয়ে টা ঘুমিয়ে আছে, কানের উপর থেকে চুল গুলো সরিয়ে দিলাম, গায়ের উপর কাঁথা টা টেনে দিয়ে বুঝতে পারলাম যে কে যেনো আমার গালের উপর সুচালো কিছু বসাচ্ছে, মশা ছাড়া আর কি হবে, আচমকা ঠাস করে নিজের গালে নিজে থাপ্পড় দিয়ে বুঝলাম বাহহ, মশি টা ভারি দুষ্টু তো, একবার আমার রিতা কে কামড় দিলো, তারপর সেই মশারি নিয়ে ঝগড়া বাধালো, আর তারপর শুরুর দিকের কথা গুলো মনে করিয়ে সেই সুযোগে আমার থেকেও রক্ত বের করে নিলো। এ হতে পারেনাহ, আমার আর রিতার মাঝে তৃতীয় কারো জায়গা নেই, হা হা, তাই মশারি টা টানিয়ে দিলাম।

সকালে ঘুম ভাঙলো রিতার ডাকে..
.
-এই যে বিজিওয়ালা, উঠেন উঠেন, ৮টা বাজে, আপনার তো কত কাজ, উঠেন..
.
এই বলে রিতা চলে যেতে নিচ্ছিলো আর পিছন থেকে ওর হাত টা টেনে কাছে নিয়ে এলাম, রিতা কিছুটা লজ্জা পেয়ে চোখ নামিয়ে নিলো..
আমি বললাম “জ্বি, আমি খুব বিজি, তোমার মনের গভীরে সাতার কাটায় আমি অনেক বিজি, ডিস্টার্ব করবানা একদম, ওকে?? রেডি হয়ে নাও, আমরা বের হবো,”……
রিতা অবাক হয়ে তাকিয়ে আছে, স্বর্গের সকল সৌন্দর্য যেনো রিতার কাছে কুর্নিশ করছে।
মেয়েদের সৌন্দর্য সবচেয়ে বেশি প্রকাশ পায় তিন সময়ে, যখন সে ঘুমায়, যখন সে খুব মনোযোগ দিয়ে কিছু দেখে অথবা করে, আর যখন সে খুশিতে খুব অবাক হয়ে থাকে..

রিতা আর আমি এখন ঠিক সেই জায়গাটায় এসেছি যেখান টায় আমাদের সূত্রপাত, অনেকদিন পর এলাম আশুলিয়ার এই জায়গা টায়, শীতের ঠান্ডা বাতাস ঘিরে আছে চারিপাশ, এই শীতের মধ্যেও রিতা দু হাত দুদিকে ছড়িয়ে বিভিন্ন কথা বলছে, মনের আনন্দ প্রকাশ করছে, আর আমি শুধু দেখছি রিতা কে, রিতার খুশি গুলো কে।
-এই, তুমি এমন ভাবে কি দেখো তাকিয়ে??
.
=স্বর্গ দেখি..
.
-আল্লাহ তুমি মনে হয় পাগল হয়ে গেছো, পৃথিবী তে বসে স্বর্গ দেখো..
.
রিতা কে আর কিছু বলার সুযোগ দিলাম না, কাছে টেনে নিয়ে কোমড় আলতো স্পর্শে ধরে শুকনো ঠোট দুটোর দিকে তাকিয়ে বললাম..
.
=শীতের দিন বাহিরে বের হওয়ার আগে লিপজেল দিতে হয়, দাওনি যে, ঠোট শুকিয়ে আছে তো..
.
-জানি, শীত অনেক বেশি পড়েছে তো, লিপজেল এ কাজ হয়না..
.
=আচ্ছা, তাহলে কি দিয়ে কাজ হবে শুনি..
.
রিতা হাসছে চোখ বন্ধ করে, ওর মুচকি দুষ্টো হাসি তে তাকিয়ে থেকে ছোট একটা চিরকুট ওর হাতে গুজে দিয়ে আলতো ছোঁয়া তে মিষ্টি স্পর্শ এঁকে দিলাম দু ঠোঁটে..
.
-এই ফাজিল, যদি কেউ দেখে ফেলতো..
.
এবার আমি মুচকি হেসে উঠলাম, রিতা চিরকুট টা খুলে তাকালো, চিরকুটের লেখাটা পড়ে ও শক্ত করে আমার কাধ ধরে জুতো খুলে পায়ের উপর পা দিয়ে আমার দিকে তাকালো, শীতের ঠান্ডা বাতাসের মধ্যেও আমার নাকের অগ্রভাগে উষ্ণ ছোঁয়া পাচ্ছি, ঠোট দুটো হয়তো আরেকবার ভিজে যাবে……
চিরকুট টায় লেখা ছিলো, খুব অল্প কিছু শব্দ, কিন্তু এর মর্ম?
অনেক গভীর..
“ভালবাসি তোমায় আমি, খুব ভালোবাসি”………

গল্পের বিষয়:
ভালবাসা

Share This Post

আরও গল্প

সর্বাধিক পঠিত