শেষ ট্রেন

শেষ ট্রেন

স্টেশনে বসে আছি। ভোর ৬ টা।
শীতের মৌসুম যাচ্ছে। ঘন কুয়াশা অদৃশ্য প্রায় অবস্থা। দূরের কিছু খুব ক্লিয়ার ভাবে দেখা যায় না।

স্টেশনে দুই এক জন মানুষের আনাগোনা লক্ষ্য করছি। মানুষগুলো খুব নিরিবিলি চলা চল করছে। কারও মধ্যে বিন্দু মাত্র তাড়াহুড়ার চিহ্ন মাত্র নেই। অনেক সময় বসে আছি স্টেশনে। ট্রেন আশার কথা ৬:৩০ কিন্তু ৭:৩০ পার হয়ে গেছে ট্রেন আশার কোনো খবর নেই।

উত্তর দিক থেকে ট্রেন আসবে আমি উত্তর দিকেই তাকিয়ে রয়েছি। আবছায়া চোখে একটা ব্যাগের দিকে চোখ পড়লো। ব্যাগের রঙটা ছিলো সাদা হলুদ ও লালের মিশ্রে তৈরি। তার দূর থেকেও চোখে পড়েছে। একটু তাকিয়ে রইলাম।
কাছে আসছে ধীরে ধীরে। এখন ভালোভাবেই দেখলাম একটা মেয়ে হয়তো বাসায় যাবার জন্যই স্টেশনে আসছে। কিন্তু সে এখন কেন আসছে? নাকি সে আগেই জানতে যে ট্রেন আসতে খুব দেড়ি করবে? নাহ, অযথা চিন্তা করা ঠিক হবে না।

চিন্তা করতে করতেই মেয়েটা সামনে।
– আসসালামু আলাইকুম
– ওয়া আলাইকুম আস সালাম
– ট্রেনটা কি ছেড়ে গিয়েছে?
কিছু সময় আবার চিন্তা করলাম। সে যদি জানতো তাহলে খুব তারা তারিই চলে আসতো কিন্তু সে আমাকে কেন জিজ্ঞাস করবে?
– এইযে শুনছেন?
– জ্বী, হ্যাঁ হ্যাঁ।
– কি হলো, বলুন ট্রেনটা ছেড়ে গেছে নাকি?
– না না, ছেড়ে যায় নাই।
– আপনি কোথায় যাবেন?
– আমি রাজশাহী যাবো।
– রাজশাহী কোথায়?
– রাজশাহী মেইন শহর থেকে একটু দূরে।
– এখানে একটু বসবো?
– হ্যাঁ, কেন নয়! বসুন।
– আপনি দাঁড়ালেন কেন?
– ইয়ে মানে, এমনি।
– বসুন প্লিজ।
– সমস্যা নেই, আপনি বসুন।
– তাহলে আমি দাঁড়াই।
– না না, ঠিক আছে বসছি।
কিছুক্ষণ চুপ চাপ।

অচেনা কোনো মেয়ে। চিনি না জানি না। কিন্তু কথা বললো? একটু অবাক হলাম। কণ্ঠটা খুব মিষ্টি ছিলো। চোখ দুইটা ছিলো দারুণ মায়াবী। চোখের দিকে তাকালে আর চোখ ফেরানো যায় না।

– এই যে।
– জ্বী বলুন।
– কি এতো ভাবেন?
– কই? কিছু নাতো।
– চোখের দিকে তাকিয়ে কেউ মিথ্যা বলতে পারে না। আমার চোখের দিকে তাকিয়ে বলুনতো কিছু ভাবেননি?
– হুম ভেবেছি।
– আমি জানি কি ভেবেছেন।
আমি আবারো অবাক হয়ে গেলাম কিভাবে সে জানবে? অপরিচিত কোনো ছেলের সাথে এতো কথা বলা ঠিক হচ্ছে নাকি মেয়েটার?
– আচ্ছা বলুণ তো কি ভেবেছি আমি?
– আপনি ভেবেছে, ” অচেনা মেয়ে কেন কথা বলতেছে? কণ্ঠ খুব ভালো, চোখের দিকে তাকালে তাকিয়েই থাকতে ইচ্ছা করে! এই গুলোই তো ভেবেছেন?
খুব বড় ধাক্কা খেলাম।
কিভাবে সম্ভব এটা? কিভাবে জানলো? ভাবতে ভাবতে ট্রেনের হর্ণ শোনা গেল। মেয়েটা নিজেই বলছে। যাক অতঃপর ট্রেনের দেখা পেলাম

ট্রেন এলো। উঠে পড়লাম ট্রেনে। আমার ছিট থেকে দূরে বসে আছে মেয়েটি। এখন মনে হচ্ছে তার মধ্যে কোনো তাড়াহুড়ো নেই। চুপ চাপ বসে আছে। মাঝে মাঝে অনিচ্ছাকৃত ভাবেই চোখ চলে যায় তার মায়াবী চোখের দিকে। কিভাবে যে নিয়ন্ত্রণ করি বুঝতে পাড়ছিনা।
মেয়েটা ছিট থেকে উঠে এলো। আমার সামনে একটা ছিট ছিলো সেখানে আপাতত বসলো।
– আচ্ছা আপনি বার বার আমার দিকে তাকাচ্ছেন কেন?
– কই তাকাচ্ছিনাতো!
– তাহলে কি আপনার চোখের সমস্যা আছে?
– না, সমস্যা নেই।
– তাহলে তাকাচ্ছেন কেন?
– আপনিও তাহলে তাকাচ্ছেন আমার দিকে।
– হুম, আমি তো তাকাচ্ছি।
– কেন তাকাচ্ছে?
– এমনি তাকাচ্ছি।
– তাহলে আমিও এমনি তাকাচ্ছি।
কথা বলতে বলতে এক পর্যায়ে ট্রেনের ভেতরেই বন্ধুত্ব করলাম সেও করলো। মেয়েটার নাম জিজ্ঞাস করলাম, সে উত্তর দিয়ে বললো,
– আমার নাম সামিহাতুল ফাইযা রিয়া।
– বাহ অনেক সুন্দর এবং বড় নাম।
– হুম, আপনার নাম কি?
– আমার নাম মেহেদী হাসান মামুন।
– আমার নামের মতই আপনার নামটাও বড়।
– হ্যাঁ।
চুপচাপ কিছু সময়।
হঠাৎ করেই আবার প্রশ্ন।

– আচ্ছা আপনি বাসায় যাচ্ছেন কেন?(রিয়া)
– বাবা মা বিয়ে ঠিক করেছে। সে জন্যই।
– ওয়াও, ইনভাইট করলেন নাতো আমাকে।
– করার সুযোগ দিলেন কই?
– হিহিহি, আচ্ছা ইনভাইট করা লাগবে না এড্রেস দিন, এমনি যাবো।
– দিলাম পূর্ণ এড্রেস। আপনি বাসায় যাচ্ছেন কেন?
– এইযে আপনার বিয়েতে যাবার জন্য।
– দুষ্টামি না করে বলুন।
– আমারো বিয়ে, তাই বাসায় যাচ্ছি, আসলে লেখা পড়া শেষ। তাই এখন জীবনকে সাজাতে চলেছি। আর হ্যাঁ, আপনাকে আমার বিয়েতে যেন দেখি, ওকে?
– জ্বী, ইনশাহ আল্লাহ্‌।

সারা পথ কথা বলতে বলতে এলাম দুজন। কিন্তু কেউ কারো ফোন নাম্বার নেইনি।
বাড়ি ফেরার পরে মনে পড়লো নাম্বার নেওয়া কথা। ইস কি ভুল করলাম। ধুর বোকামি করছি।
নিজের উপর নিজেরই রাগ হচ্ছে।
বন্ধুর নাম্বার তাও নিলাম না।

আব্বু আম্মুর সাথে কথা বললাম। মেয়েকে দেখার জন্য বললো। কিন্তু আব্বু আম্মুর পছন্দই আমার পছন্দ তাই আর দেখতে চাইনি। ১২-১২-১৬ দিনে বিয়ে দিন ধার্য্য করা হলো। হাতে আছে মাত্র ৫ দিন সময়। বন্ধুদের সব গুলোকেই অগ্রিম বলে রাখা হইছে। একটাও লেট করবে না জানি। তার পরেও আবার ফোন করে সব গুলোক বাসায় নিয়েলাম। ওদের সাথে আড্ডাবাজতে ৫ দিনের সমাপ্তি। সকাল হলেই বিয়ে। বুকের ভেতর ভয়ের সৃষ্টি। কি জন্য যে এইই ভয় ঢুকে গেলো, নিজেও বুঝতে পাড়ছি না। কিন্তু বুকের ভেতর সব সময় ধুকপুকানি কমছে না।
তৈরি হচ্ছি। মেয়ের বাড়িতে যাবার জন্য। কিন্তু আমি যাকে ইনভাইট করলাম সে তো এলোনা?
হয়তো সে ব্যস্ত আছে, তাই আসেনাই।
বেশি চিন্তা না করেই বেড়িয়ে পড়লাম। বিয়ের যাবতীয় কাজ শেষ করে। সন্ধায় বাসায় এলাম। কিন্তু আমি একাকা আসিনি আমার সাথে এলো একটা মেয়ে। আমার বউ হয়ে।
বউ কে ঘরে একা রেখে আমি বাইরে আড্ডা দিচ্ছি বন্ধুদের নিয়ে। অতঃপর সালারা তাড়াতাড়ি করে ঘরে পাঠিয়ে দিলো।
কি আর করার, ফিরে এলাম ঘরে।
সে আমাকে সালাম দিলো।
– আসসালামু আলাইকুম।
হকচকিয়ে উঠলাম, কিন্তু বুঝতে দিলাম না। কন্ঠটা খুব পরিচিত ছিলো।
– ওয়া আলাইকুমুস সালাম।
– বসুন।
– জ্বী বসি।
– আপনার বিয়েতে আসতে পাড়িনি। তার জন্য দুঃখিত।
– অবাক দৃষ্টিতে তাকিয়ে রইলাম
– কি হলো?
– কই? কিছু না।
– আপনি এতোই অবাক হয়েছেন যে আমাকে দেখার খুব ইচ্ছা করছে তাইনা?
– জ্বী, হ্যাঁ হ্যাঁ।
ঘোমটা সরিয়ে দিলো। আমি তার দিকে তাকিয়ে আর চোখ ফেরাতে পাড়ছি না।
– এইযে, এতো অবাক হওয়ার দরকার নেই।
আমি জানি আপনি আমাদের ট্রেনের সব কথা আপনার বন্ধুদের বলবেন। তারা এসে আমাকে নিয়ে একটু মজা করবেন, খুব ভাল লাগবে।
– আপনি তো খুব বুদ্ধিমতী।
– হুম, জানি, আম্মু বলতেন।
– আচ্ছা, ঘুম পাচ্ছে ঘুমতে হবে।
– কি? মার খাবেন?
– বিয়ের রাতেই স্বামীকে মাড়বেন? আচ্ছা মাড়ুন তাও আমাকে ঘুমতে দেন।
– উফ লোকটা পাঁজি। এইযে ঘুমিয়ে গেছেন?
একটু প্রেম করবো তা নয়, উনি ঘুমিয়েছে। ধুর ভাল লাগেনা।

গল্পের বিষয়:
ভালবাসা

Share This Post

আরও গল্প

সর্বাধিক পঠিত