প্রেম

প্রেম

ছোট্ট বেলায় কোনকিছু না বোঝে চন্দ্রাকে বলে ফেলেছিলাম,’এই চন্দ্রা, তুই না আমার গার্লফ্রেন্ড।’ তখন এই কথার কী অর্থ আমিও বুঝি না,চন্দ্রাও বুঝে না। কিন্তু এখানে যে তার রেশমী দি ছিলেন তিনি শুনে জিহ্বায় কামড় দিয়ে বসলেন। তারপর আমার গাল টেনে ধরে বললেন,’ওরে বানর,এটুকুন বয়সেই এতো পেকে গেছিস!’ আমি আবার ছোট থেকেই একটু ঝগড়াটে ছিলাম। কাউকে কথা বলতে ছাড়তাম না।রেশমি দিকেও সঙ্গে সঙ্গে বলে দিয়েছিলাম,’এই দিদি, আমি কী আম কাঁঠাল নাকি যে পেকে যাবো!’

রেশমি দি আমার কথা শুনে ফিক করে হেসে উঠেন। তারপর ওখান থেকেই চেঁচিয়ে মাকে আর মাসিমাকে ডাকেন।ওরা ঘর থেকে বেরিয়ে আসলে দিদি বলেন,’পলক বাবুর তো গার্লফ্রেন্ড হয়ে গেছে গো মাসি!’ মা চোখ পাকিয়ে আমার দিকে তাকিয়ে বলেন,’কে গো তোমার গার্লফ্রেন্ড পলক সোনা?’ আমি ঝটপট বলে দিলাম,’চন্দ্রাই তো আমার গার্লফ্রেন্ড।’ শুনে মা মাসি আর রেশমী দি একে অপরের উপর হাসতে হাসতে গড়াগড়ি খান। আমি আর চন্দ্রা একে অপরের দিকে বোকার মতন তাকিয়ে থাকি। কারণ আমরা তাদের হাসির কারণ টা মোটেও বুঝতে পারি না যে!

মা,মাসি দুজনের এক স্কুলে চাকরি ছিল বলে আলাদা করে তারা বাসা নেননি। তাছাড়া বাবা-মেসোর অফিসটাও কাছাকাছি ছিল। পাশাপাশি দুটি ফ্ল্যাটেই থাকতাম আমরা। রেশমি দি সারাদিন থাকতেন ভার্সিটিতে। বাসায় থাকতাম শুধু আমরা দুজন। আমি আর চন্দ্রা। চন্দ্রা আমার দুই ক্লাস ছোট ছিল। মর্নিং শিফটে নিয়মিত ক্লাস করে সারাদিন আমরা বাসায় থাকতাম। বাসায় থেকে আমরা কখনো পুতুল বিয়ে আর কখনো রান্নাভাতী আর সংসার খেলতাম ।সংসারের কর্তা হতাম আমি আর চন্দ্রা হতো গিন্নি। আমি কেমন বড় মানুষের মতন অদ্ভুত সব কাজ কারবার করতাম। বাবার সেভ করার রেজার আর ফোম নিয়ে গালে লাগিয়ে টেনে টেনে সেভ করতাম আমি।

সেভ করার পর বাথরুমে গিয়ে স্নান করে এসে বাবার লুঙ্গিটা পড়ে আমার সেন্ডো গেঞ্জিটা গায়ে দিতাম। তারপর ড্রয়ার থেকে বাবার সিগারেটের প্যাকেট খুলে একটা সিগারেট নিয়ে লাইটার দিয়ে ধরিয়ে বিছানায় শুয়ে এক টান দিয়ে ডাকতাম চন্দ্রাকে। চন্দ্রা তখন খুব ব‍্যস্ত।সে মিছে মিছির রান্না বসিয়েছে প্লাস্টিকের হাড়ি পাতিলে। আমি বলতাম,’এতো দেরি করলে চলে গো গিন্নি!তাত্তাড়ি করো না!’ চন্দ্রা কপালের ঘাম মুছার মিছেমিছি ভান করে বলতো,’আমার কী আর শান্তি আছে বলো। সারাদিন কাজ আর কাজ!’ বলে মুখটা এমন করতো যেন সত্যি সত্যিই সে বড় সংসারি মেয়ে।যেন তার বয়স মোটেও এগারো নয়,আঠারো। আমি বলতাম,’আমার যে অফিসের টাইম চলে যাচ্ছে গো, তুমি স্নান টান করে আস তো!খাবো।’ চন্দ্রা বিরক্তি নিয়ে আমাদের মা কিংবা মাসিমার মতো বলতো,’আসছি বাবা আসছি!’

তারপর সে মায়ের শাড়িটা,লাল রঙের শায়া আর নীল রঙের ব্লাউজটা নিয়ে ঢুকে যেতো বাথরুমে। ওখান থেকে স্নান করে শরীর মুছে একেবারে কুঁচি দিয়ে শাড়ি পড়েই তবে বের হতো। তারপর ঘরে এসে রেশমী দির স্নো পাউডার নিয়ে আয়নার সামনে বসে তার মুখে,শরীরে ঘসে ঘসে লাগাতো। ঠোঁটে দিতো লাল টকটকে লিপস্টিক।ঘরে যে মাসিমার আলতা রাখা আছে ওখান থেকে আলতাও পড়তো। তারপর সোকেশের ড্রয়ারে রাখা মাসিমার সিঁদূরের কৌটা নিয়ে হাতের বুড়ো আঙুলে একটুকু সিঁদূর মাখিয়ে টেনে দিতো সিঁথি থেকে কপাল অব্দি। তারপর সম্পূর্ণ এক ঘরবৌ হয়েই আসতো আমার কাছে। তার হাতে প্লাস্টিকের প্লেট।প্লেটে মিছেমিছির খাবার,জলের গ্লাস।আমরা খেতে বসে যেতাম ঠিক মিছেমিছি। খাওয়ার সময় কতসব যে সংসারি কথা বলতাম আমরা।আর চোরা চোখে তাকাতাম ওর দিকে।

তখনও ও সম্পূর্ণ কিশোরী নয়।একটু একটু বেড়ে উঠছে শরীর। বারবার নাকটা ঘেমে উঠতো বলে ওর সৌন্দর্য বেড়ে যেতো বহুগুণ। আমি বলতাম,’চন্দ্রা, আমাদের একটা ছেলে হবে,শ্রী কৃষ্ণের মতো নীল তার চেহারা!’ চন্দ্রা লজ্জায় আড়ষ্ট হয়ে যেতে যেতে বলতো,’মেয়ে হবে।মা দূগ‍্যার মতন মেয়ে।’ তারপর ওখানেই থেমে থাকতো আমাদের খাওয়া পরা। আমি ওর একটা হাত টেনে ধরে বলতাম,’আমি যা বলেছি তা হবে।’ চন্দ্রা বলতো,’ইশ! বয়েই গেছে। আপনি আমার কে গো যে আপনার কথাই আমার শুনতে হবে?’ আমি ওর হাতটা আরো শক্ত করে ধরে ওকে আমার বুকের সাথে এনে মিশিয়ে দিতে দিতে বলতাম,’তুমি আমার কী হও এখন টের পাবে!’

বলেই চন্দ্রাকে এক টানে ফেলে দিতাম খাটের জাজিমের উপর। তারপর ওর ঠোঁটে মুখে চুমু খেতে খেতে বলতাম,’আমি তোমার কে হয় এখন টের পেয়েছো?’ চন্দ্রা আমার তলে পিষ্ট হয়ে যেতে যেতে ফিসফিসে গলায় বলতো,’ পেয়েছি।’ ‘কী টের পেয়েছো?’ ‘তুমি আমার বর হও!’ বলে লজ্জায় তার দু হাত দিয়ে নিজের চোখ মুখ চেপে ধরতো চন্দ্রা। আমি তার হাত ছাড়াতাম না। লজ্জা পেতে দিতাম তাকে। কারণ ওইটুকু বয়সেই আমি জেনে গিয়েছিলাম একমাত্র লজ্জা পেলেই মেয়েদের সবচেয়ে সুন্দর লাগে। পবিত্র লাগে।

এভাবে সারা দুপুর সংসার সংসার খেলার পর যখন আমি বাথরুমে যেতাম হাত মুখ ধুতে, তখন টের পেতাম আমার গালে আর গলার কাছে নখের লম্বা লম্বা আঁচড়।ওই আঁচড়ে আবার জমে আছে লাল টকটকে রক্ত।দেখে আমার ভয় কিংবা ব‍্যথার বদল আনন্দই লাগতো। চন্দ্রাও একদিন এনে দেখিয়েছিল ওর চোখের নিচটা। ওখানে আমার হাতের নখ লেগে কেমন চিলে গেছে জায়গাটা।মাসিমা নাকি এর জন্য ওকে বকেছে। জিজ্ঞেসও করেছিলো কীভাবে কেটেছে। চন্দ্রা মিথ্যে করে আমার নাম না বলে ওর বান্ধবীর নাম বলেছে।

সময় খুব দ্রুত গড়িয়ে যেতে পারে।আমরা মানুষেরা কিছুতেই সময়ের সাথে তাল মিলিয়ে উঠতে পারি না। রেশমী দির বিয়ে হয়ে গেছে। আমার মাধ‍্যমিক জীবনও শেষ হয়ে যায় টুপ করে।দু বছর পর চন্দ্রারও শেষ হয়। আমি যখন বিশ্ববিদ্যালয়ে চন্দ্রা তখন কলেজে। অনেকদিন পর ছুটিতে বাড়ি ফিরি আমি। গ্রীষ্মকালীন ছুটি।ফেরার পর চন্দ্রা কেমন পর হয়ে যায় আমার। লজ্জায় আমার সামনে পরতে চায়না মোটেই। আমারও খানিক লজ্জা লাগে। তবুও আমি চাই ও এসে বারবার আমার সামনে পড়ুক।আমায় বর বলে বারবার ডাকুক। আদর করতে গিয়ে গালে খামছি কেটে দিক তার লম্বা নখের। কিন্তু না সে আমার সামনেই পরে না। আড়াল থেকে শুধু জিজ্ঞেস করে। আমিও লজ্জায় বলতে পারি না সামনে আসার কথা। আমি কেবল ভাবী।ভাবী,সেও কী আমায় এমন করে ভাবে কী না!তারও কী আমার মতন এমন ইচ্ছে করে সামনে আসার? জানি না!

মেয়েরা বড় হয়ে গেলে কী শৈশব, কৈশর ভুলে যায়?ছেলেরা তো মোটেও ভুলতে পারে না। আমার আজ অব্দি মনে আছে ওর শরীরের ঘ্রাণ, হাতের নখ, চোখের ধূসর মণি, ঠোঁটের কাঁপা অক্ষর, বুকের ধুকপুক,সব -সবকিছু। আমার আর কিছুতেই একলা কাটতে চায় না দিনগুলো।চন্দ্রাকে নিয়ে হয়তোবা মিছেমিছির সংসার পেতেছিলাম আমাদের শৈশব আর কৈশরে, কিন্তু সত‍্যিকারে তো তাকে কোনদিন বলা হয়নি যে তোকে আমি ভালোবাসি। কাউকে ভালোবাসলে তো তাকে জানাতে হয়। এবার আমি বুকে সাহস সঞ্চয় করি।মা মাসি যখন স্কুলে চলে যায় সেই ফাঁকে একবার চন্দ্রার ঘরে পা বাড়াই।ওর ঘরের দরজার কাছে এসে ঠকঠক করে ঠোকা দেই দরজায়।চন্দ্রা দরজা খুলে মিষ্টি করে হেসে মাথা নিচু করে ফেলে।

মাথা নিচু করে মৃদু হাসতে থাকা চন্দ্রাকে ঠিক দেবীর মতো লাগে। আমার চোখে হঠাৎ সেই শৈশব কিংবা কৈশরের একটি দিন ভেসে উঠে। আমি আর চন্দ্রা খাটের উপর শুয়ে আছি।আমরা একে অপরের সাথে গায়ের জামার মতো লেপ্টে আছি। আমার হাতের আঙ্গুল ছুঁয়ে দিচ্ছে ওর ঠোঁট, নরম গাল,চুলের সিঁথি। আমি কেমন অন‍্য জগতে চলে যায় যেন। হঠাৎ চন্দ্রার গলায় হুঁশ ফেরে আমার। চন্দ্রা বলে,’পলক দা বসো।’ বলে চেয়ার টেনে দেয় আমার কাছে।জীবনে এই প্রথম চন্দ্রার মুখে পলক দা ডাক শুনি।এর আগে যখন সে লজ্জা পেতো না এবং আমিও তার কাছে যেতে লজ্জা পেতাম না তখন ও আমায় পলক বলেই ডাকতো। আমার মা কিংবা মাসিমার মতো করে বলতো,’পলক সোনা।’

কিন্তু আজ হঠাৎ ওর মুখ থেকে পলকদা ডাক শুনে বুকটা কেমন কেঁপে উঠে আমার। বুকের কোথায় যেনো স্পষ্ট অথচ অদৃশ্য একটা চিনচিনে ব্যথা অনুভব করি আমি। কিন্তু ধরতে পারি না এই ব‍্যথার উৎসস্থল। আমার খুব খারাপ লাগে তখন।চন্দ্রার সাথে কী বলে কথা শুরু করবো তা খুঁজে পাই না।চন্দ্রাই বরং আমার সাথে কথা শুরু করে।বলে,’পলকদাকে খুব ভয় করে আজকাল।কত বড় হয়ে গেছো তুমি। ভার্সিটিতে পড়ো এখন!’ চন্দ্রার গলায় এমন কথা শুনে আমার বুক ঢিপঢিপ করে বাজে।নাক দিয়ে কেমন সুখের নিঃশ্বাস বয়ে যায় আমার। আনন্দে কেমন আত্মহারা হয়ে উঠি আমি।কী বলবো না বলবো খেই হারিয়ে ফেলি। ইচ্ছে করে এই এক্ষুনি বলে দেই,’চন্দ্রা, তোমায় আমি খুব ভালোবাসি।’ কিন্তু বলি না। মোলায়েম হেসে বলি,’বারে!আমি একাই কী বড় হয়েছি,তুই ও তো কত বড় হয়েছিস!কত সুন্দর হয়ে গেছিস।’

হ‍্যা চন্দ্রা আর আগের মতো নেই। কিশোরী বেলায় ও একটু হালকা পাতলা ছিল, চেহারার জৌলুস ছিল আরো প্রখঢ়। কিন্তু এখন ও খানিক মোটা হয়েছে। আর চেহারার জৌলুসও খানিকটা দমে গেছে।এই খানিক মোটা আর দমে যাওয়া চেহারার জন‍্যই মনে হয় তাকে আরো বেশি মিষ্টি লাগে।চন্দ্রা আমার কথা শুনে লজ্জায় আড়ষ্ট হয়। তারপর ঠোঁট ঈষৎ চোকা করে বলে,’যাও বাড়িয়ে বাড়িয়ে বলছো!’ এবার আমি এগিয়ে যেতে সাহস পাই। গলার স্বর একটু বড় করে বলি,’আমাকে মনে পড়ে না রে তোর চন্দ্রা?’ চন্দ্রা কথাটা শুনে ফ‍্যালফ‍্যাল করে আমার চোখের দিকে তাকায়। তারপর আবেগ ঘন গলায় বলে,’এ কী বলো পলকদা, ভাইয়ের কথা বুঝি বোনের মনে না হয়ে পারে!’

চন্দ্রার কথা শুনে আমার বুকটা ফের কেঁপে উঠে। কেন জানি মনে হয় ও ইচ্ছে করে অনেক কিছু কাটিয়ে যাচ্ছে। হঠাৎ টেবিলের উপর থাকা একটা ডায়েরি আমার চোখে পড়ে।লাল মলাটের ডায়েরি।ডায়েরির মলাটে বড় বড় করে লাভ আঁকা। লাভের ভেতর ফুল। আমার কেন জানি মনে হতে থাকে এই ডায়েরির কোথাও না কোথাও আমার থাকার কথা।চন্দ্রা যদি আমায় মনে মনে চায় তবে তার ডায়েরিতে কিছু না কিছু তো লিখবেই!

পরদিন চন্দ্রা যখন কলেজে চলে যায় আর মা মাসি,বাবা,মেসো বাবু নিজেদের কর্মস্হলে তখন চুপ করে ঢুকে যাই চন্দ্রার ঘরে। ঢুকে প্রথমেই টেবিলের উপর থেকে ডায়েরিটা হাতে নেই। তারপর ডায়েরির পাতা যখন খুলবো তখন আমার বুকে কী যে কাঁপন উঠে। আমার কেবল মনে হতে থাকে, এখানে যদি আমি আমাকে খুঁজে না পাই তখন? তখন আমি কী করবো? আমি পাতা খুলি।এক দুই তিন করে তিরিশ পাতা খুলে যাই। তারপর দেখি অন‍্য একটি নাম। আকাশ। আকাশ দেবনাথ।দেখে আমার মাথা কেমন ঘুরে যায়। শরীর ক্লান্ত হয়ে উঠে। চোখের পাতা ভিজে যায় গরম জলে। তারপর খালি বাড়িটিতে একা একলা একটি বাচ্চা ছেলের মতন কেঁদে উঠি আমি। ঘরের দরজা,জানলা,কাপ- পিরিচ, টেবিল,বই,খাতা আর লাল মলাটের ডায়েরিটি ছাড়া আর কেউ আমার কান্না শুনে না।

বিকেল বেলা খুব সাধারণ ভাবেই এসে আমার সাথে মিশতে চাইলো চন্দ্রা। আমি তখন উদাস হয়ে বসে আছি ছাদের উপর।এই সময় চন্দ্রা আমার কাছে এলো। এসে পাশে অনেক্ষণ দাঁড়িয়ে থেকে বললো,’এ মা, কাউকে ভাবছো নাকি?’
আমি চমকে উঠে ওর দিকে তাকিয়ে কেমন ভ‍্যাবাচেকা খেলাম।শাড়ি পড়ে এসেছে চন্দ্রা।লাল শাড়ির মাঝে সবুজ লতাপাতাওয়ালা আঁচল।হলুদ রঙের ব্লাউজ। কপালে সরু নীল টিপ আর চোখ ভরা কাজল।কী মনে করে যেন পায়ের দিকে তাকালাম, দেখি পা ভরা আলতা।উপরে তাকিয়ে দেখলাম অবাধ্য চুলেদের ওড়াওড়ি। খানিক সময়ের জন্য কেন জানি চন্দ্রা কে আমার মানুষ মনে হলো না। আমার মনে হলো পরী টরি কিছু এসে গেছে। এসে আমায় বিভ্রান্ত করছে।নাকি আমার ওই ডায়েরিতে দেখা নামটা ভুল ছিল! আকাশ টাকাশ বলে কেউ নেই ওর জীবনে।ও আজ আমায় বলতে এসেছে এই কথা।বলতে এসেছে ,’ভালোবাসি।’ আমাকে অমন করে তাকিয়ে থাকতে দেখে চন্দ্রা ফিক করে হেসে ফেললো। হেসে বললো,’কিছু জিজ্ঞেস করেছিলাম!’

আমি গলা খাঁকারি দিয়ে বললাম,’কিছু না।ওই ফুলগুলোর কথা ভাবছিলাম।’ বলে ছাদের টবের সদ‍্য ফোঁটা গোলাপ গুলো দেখালাম ওকে। চন্দ্রা গোলাপগুলোর দিকে তাকিয়ে বললো,’কী ভাবছিলে ওদের নিয়ে?’ ‘ভাবছিলাম,কত সুন্দর ফুলগুলো, কিন্তু এর একটিও আমার নয়।’ শুনে আরেকবা ফিক করে হাসলো চন্দ্রা। হেসে বললো,’তোমার নয় কেনো, ছিঁড়ে পকেটে পুরে রাখলেই তো হয়।’ ‘হয়না।ফুল ছিঁড়ে ফেললে খানিক পর তা শুকিয়ে যায়।শুকনো ফুল দিয়ে কী আর প্রেম হয়!’ প্রেমের কথা শুনে চন্দ্রার মুখ আরেকটু উজ্জ্বল হয়।সে আমার পাশে খানিক এগিয়ে এসে বলে,’প্রেম করছো তবে?’ আমি হু হু করে হেসে উঠে আঙুলে চুল চিরুনি করি। তারপর ওর দিকে তাকিয়ে বলি,’প্রেম হওয়ার আগেই তো প্রেম ভেঙে গেলো!’

চন্দ্রা যেন একটু অবাক হয়।ওর চোখ দুটিও কেমন বড় হয়।কাজল মাখা চোখ বড় হলে কী যে সুন্দর লাগে! চন্দ্রা বললো,’এটা কেমন ধরনের কথা? প্রেম হওয়ার আগে আবার কী করে প্রেম ভেঙে যায়?’ আমি হেসে বললাম,’যেভাবে ফুল ফোটার আগেই কলিটি ঝরে যায়।’ চন্দ্রার মুখ যেন একটু তমসা হয়। সে গলার স্বর একটু বড় করে বলে,’কাকে ভালোবাসতে তুমি বলবে আমায়!’ আমি বললাম,’যা হলোনা তা বলে আর লাভ কী?’ তোমরা ছেলেরা শুধু লাভ লাভ করো কেন অত?’ করুন স্বরে কথাটা বলে চন্দ্রা। আমি বলি,’আরো কেউ লাভ লাভ করে নাকি?’ ও ঈষৎ লজ্জায় পড়ে যায়। মুখ আর খুলতে চায় না। আমি হেসে বলি,’কতদিন ধরে তোরা একে অপরকে ভালোবাসিস চন্দ্রা?’ চন্দ্রা চুপ থাকে।বলতে চায় না কিছু।’

আমি তার মুখ খোলাই। বলি,’আমি তো আর তাকে নিয়ে নিবো না,বল।কী নাম ওর।’ চন্দ্রা আস্তে করে শাড়ির আঁচল সামলিয়ে নিয়ে বলে,’আকাশ।কারো কাছে বলবে না কিন্তু প্লিজ!’ আমার গলার স্বর একটু নেমে আসে। নেমে আসা স্বরকে কৃত্রিম ভাবে আমি আরো সুন্দর করি। তারপর বলি,’নিজের ভালোবাসার কথাটাই যখন প্রেমিকার কাছে বলতে পারলাম না তবে অন‍্যের টা কী করে বলবো! আচ্ছা,ক’বছর ধরে তোরা সম্পর্ক করছিস রে?’ দু বছর।’ ‘মাত্র দু’বছর।’ ‘দু বছর কী কম দিন? আমার কাছে তো এই দু বছর কে দুশো বছর মনে হয়!’ শুনে আমিও বলে উঠি ,’আমরাও তো সংসার খেলেছিলাম পাঁচ বছর।ওখানেও তো প্রেম ছিল। তাহলে ওটা কী এর চেয়ে বেশি দিনের নয়।’ এই কথাটা আমি মনে মনে বলি। চন্দ্রা আমার দিকে তাকায়। তাকিয়ে বলে,’একটা অনুরোধ করবো রাখবে প্লিজ!’ আমি আস্তে করে বলি,’রাখবো।’

ও বললো,’ আকাশ আমার সাথে দেখা করতে এসেছে।ওর সাথে একটু দেখা করতে চাই আমি। কিন্তু মা মাসির জন্য পারছি না।একটু হেল্প করবে আমায়!’ ‘কীভাবে হেল্প করতে পারি?’ ‘মার কাছে আমি বলেছি তুমি আমায় নিয়ে ঘুরতে যাবে। প্লিজ না করবে না কিন্তু!’ আমি কোন কিছু না ভেবেই বলি ঠিক আছে। তারপর ঘরে ফিরে চোখে মুখে জল ছিটিয়ে নীল রঙের পাঞ্জাবি টা গায়ে জড়িয়ে মাকে বলে ওকে নিয়ে বেরিয়ে পড়লাম। বাইরে এসে রিক্সায় উঠলাম দুজন।ওর সাথে বসে আমার কী যে অস্বস্তি লাগতে লাগলো!অথচ ওর এই শরীরটা থেকেই কত ঘ্রান নিয়েছি আমি।কত কত দিন ওর সাথে গায়ের জামার মতো করে লেপ্টে থেকেছি।

রিক্সা ছুটছে। বাংলাদেশ কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ের বোটানিক্যাল গার্ডেনে যাবে। আমি ওর পাশে বসা।আড় চোখে বারবার তাকিয়ে দেখছি ওর কাজল চোখ। চোখের নিচে একটা কাঁটা দাগ আজো আছে।মন না চাইলেও চন্দ্রাকে বললাম,’তোর চোখের নিচে ওই কাঁটা দাগটা কিসের রে চন্দ্রা?’ চন্দ্রা হঠাৎ যেন কেমন হয়ে উঠে।ওর চোখ মুখ কেমন লাল হয়ে যায়।অন‍্য দিকে তাকিয়ে সে বলে,’ওটা শৈশব।’ আমি আর কথা বলি না। নিস্তব্ধ রাতের মতো চুপ হয়ে থাকি। আমরা কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ের গেট পেরিয়ে ভেতরে এসে গেছি। মিনিট দুয়েক গেলেই পরে বোটানিক্যাল গার্ডেন।গার্ডেনের গেটে দাঁড়িয়ে আছে ওর প্রেমিক। এখন ওর সাথে কথা না বললেই ওর মঙ্গল।

গল্পের বিষয়:
ভালবাসা
DMCA.com Protection Status
loading...

Share This Post

আরও গল্প

সর্বাধিক পঠিত