এক মুঠো স্বপ্ন

এক মুঠো স্বপ্ন

গ্রাজুয়েশন কমপ্লিট করার পর ভালো একটা জব করছে নীরা,অতিব সাধারন ঘরের মেয়ে।আর সাধারন ভাবে চলাফেরা করতেই বেশি পছন্দ করে।।রোজ সকাল বেলাতে অফিস যাই আবার অফিস শেষ করে সোজা বাসায় চলে এসে পরিবারের সাথে সময় কাটায়।।
প্রেম ভালোবাসার অপর নাম কষ্ট ভেবে কখনো প্রেম করার কথা মাথাতেও আনে নি।।

এভাবেই কেটে যাচ্ছিলো তার পরিবারকে নিয়ে সুখের দিনগুলো।।

রোজকার মতন সেদিন ও নীরা অফিসে যাচ্ছিলো রিক্সা না পেয়ে পায়ে হেটে পথ পাড়ি দিচ্ছিলো,এমন সময় তার চোঁখ আটকে গেলো,,
দেখলো রাস্তার ওপাশে কিছু বখাটে ছেলে একজন মুরুব্বিকে মারধর করছে।।

নীরা এসব দেখে তাৎক্ষনিক নিকটস্থ থানাতে ফোন দিয়ে পুলিশ দিয়ে বখাটেদের কে ধরিয়ে দিলো।

পুলিশ তাদেরকে নিয়ে যাওয়ার পর
দেখলো বাবার বয়সি লোকটা জখম হয়ে পড়ে আছে।নীরা লোকটিকে কষ্ট করে তুলে হাসপাতালে নিয়ে গেলো এবং নিজ দায়িত্বে চিকিৎসা করিয়ে সুস্থ্য করে তুললো।।

লোকটির কোনো মেয়ে ছিলো না তাই লোকটি নীরার এমন মহানুভবতা দেখে মেয়েটিকে খুব ভালো লেগে গেলো।

লোকটি পুরোপুরি সুস্থ্য হয়ে গেলে নীরা তার বাড়িতে দেখতে গেলো,,লোকটি আসলেই অনেক বড় লোক।।
বাড়িতে কেও নাই শুধু তার বউ ছাড়া।
তার বউটাও অনেক ভালো।।
নীরা সেদিনের ঘটনা জানতে চাইলো।।কি কারনে সেদিন তারা মারছিলো তাকে।।

লোকটি নীরার কথার উত্তরে বলতে শুরু করলো,,
ওরা আমার কাছ থেকে মোটা অংকের টাকা চেয়েছিলো আমি না করাতে আমাকে ধরে নিয়ে গিয়ে মারছিলো সেদিন তুমি পুলিশ দিয়ে না ধরিয়ে দিলে আমাকে হয়তো মেরেই ফেলতো।।কিন্তু তুমি সাবধানে থেকো মা,কারন ওরা খুব খারাপ যে কোনো সময় তোমার ক্ষতি করে দিতে পারে।।
:-আমার কিছু হবে না আংকেল আপনি নিশ্চিন্তে থাকতে পারেন।
:-কিছু না হলেই ভালো।।
:-আচ্ছা আংকেল আজকে উঠি অন্যদিন সময় করে আসবো আবার।

আংকেল আন্টির সাথে বিদায় নিয়ে চলে আসলাম,আর ভাবছি এত বড়লোক মানুষ এতো ভালো হয় কি করে।।
তারা তো মধ্যবিত্ত শ্রেনীর মানুষদের কে মানুষ বলেই মানতে চাই না।।
যাই হোক সবাই তো আর এক না।।

দেখতে দেখতে মাস দু এক পার হয়ে গেলো এরই মাঝে একটা ভালো সম্বন্ধী আসলো নীরার জন্য।।

তারা নীরাকে পছন্দ করেছে,পছন্দ না করারি বা কি আছে নীরাকে অপছন্দ করার মতন কিছুই নাই তার ভিতরে।যেই দেখবে সেই পছন্দ করবে।।
এমন ভদ্র আর সহজ মনের মেয়েকে যে কেও তার ঘরের বউ করে নিতে চাইবে।।

দু পরিবারে মত নিয়ে তাদের বিয়ের কথা পাকা হতে চললো,অবশেষে নীরার বিয়ে ঠিক হয়ে গেলো।।নীরা তার স্বপ্নের রাজকুমারকে পেয়েছে,কারন সে প্রেম করাতে বিশ্বাসি ছিলো না।তার ইচ্ছে ছিলো সে তার বর এর জন্য সব ভালোবাসা যতন করে রেখে দিবে তাই কখনো প্রেমে জড়াই নি।।

দেখতে দেখতে বিয়ের দিন ঘনিয়ে আসলো,সেদিন নীরার অফিস থেকে ফিরতে একটু রাত হয়ে গেছিলো।।
রাস্তার পাশে দাড়িয়ে গাড়ির জন্য অপেক্ষা করছিলো।কিছুক্ষন অপেক্ষা করার পর একটা গাড়ি পেলো ।।
গাড়িত চড়ে বাড়ির দিকে রওনা দিচ্ছিলো কিন্তু পথিমধ্যে হঠাৎ গাড়িটা থমকে দাড়ালো,কিছুক্ষন পর গাড়ির দরজা খুলে কিছুলোক নীরাকে গাড়ি থেকে টেনে নামাতে চাইলো।
নীরা তার সব শক্তি দিয়েও পারলো না তাদের সাথে।কিছুক্ষন পর বুৃজতে পারলো লোকগুলো তারা যাদেরকে সেদিন পুলিশ দিয়ে ধরিয়ে দিয়েছিলো।।
নীরাকে ধরে নিয়ে গেলো……

আজ ৪ দিন হলো নীরা বাড়ি ফেরে নি,এদিকে চারপাশের মানুষ গুলো কানাকানি শুরু করে দিছে নীরার না ফেরার কারন নিয়ে।সবাই নানান রকমের কথা নিয়ে কানাকানি করছে,
কেও বলছে নীরা তার বি এফ এর সাথে পালিয়ে গেছে কেও আবার বলে কেও ধরে নিয়ে গিয়ে রেফ করে মেরে ফেলেছে নয়তো বিক্রি করে দিছে।।

এদিকে এসব কথা নীরার শ্বশুর বাড়ির কানে পৌছালে তারা এ বিয়ে করবে না বলে জানিয়ে বন্ধ করে দেয়।।

নীরার পরিবার বড় ধরনের একটা আঘাত পাই।৫দিন পর নীরাকে অজ্ঞান অবস্থাতে একটা গাড়ি এসে ফেলে রেখে যাই নীরার বাড়ির গেইটের সামনে।।

নীরার এ অবস্থা দেখে চারপাশের মানুষ আরো কটুকথা বলা শুরু করে দেয়।।
নীরার পরিবার এসব শুনতে না পেরে নীরার বাবা-মা আত্মহত্যা করে।।

বাবা-মা হারিয়ে নিঃস্ব হয়ে যাই,সুখের সংসারটা মুহুর্তের ভিতরে একটা ঝড়ো হাওয়ার আঘাতে ভেঙ্গে টুকরো টুকরো হয়ে যাই।।
কূল হারিয়ে নীরা সম্পুর্ন একা হয়ে যাই।
এমন সময় তার পাশে এসে তার কাঁধে হাত রাখে সেদিনের সেই বয়স্ক মানুষটি।
কারন কেও না জানলেও বয়স্ক মানুষটি ভালোভাবেই জানতো নীরার আজকের এই অবস্থা তার কারনেই হয়েছে।।

বয়স্ক লোকটি নীরাকে তাদের বাসায় নিয়ে গিয়ে রাখে।।
নীরা সব সময় চুপ চাপ থাকতো কারো সাথে তেমন কোনো কথা বলতো না।তার সাথি বলতে ছিলো কেবল মাত্র তার চোখের পানি।।
অনেক চেষ্টার পর নীরা আসতে আসতে স্বাভাবিক হতে লাগলো।।
ধিরে ধিরে বয়স্ক লোকটিকে নিজের বাবার আসনে বসালো তাদের সংসারটিকে নিজের মতন করে সাজাতে লাগলো।।
তারাও নীরার আচরনে মুগ্ধ হয়ে যেতো।।
সবার সামনে হাসি খুশি থাকলেও একাকি নির্জনে চোখের জ্বল ফেলতো পূর্বের স্মৃতি গুলো মনে করে।।
এরই মাঝে বয়স্ক লোকটির ছেলে বাইরে থেকে দেশে ফিরেছে।।

তার নাম রাহাত।।

রাহাত এর সাথে নীরা কখনো কথা বলতো না,১ম ১ম রাহাত কথা না বললেও নীরার এমন সুন্দর ব্যবহার আর কেয়ারিং দেখে মুগ্ধ হয়ে কথা না বলে থাকতে পারলো না।।

:-আপনি কি সব সময় এমন গম্ভির হয়ে থাকেন?
:-কেন?
:-না এমনিতেই বেশ কিছুদিন হলো এসেছি আমি তো তারপর থেকে তো দেখছি আপনি কখনো হাসেন না,হাসলে কিন্তু আপনাকে অনেক সুন্দরি লাগবে।
:-ওহ্ আচ্ছা।
বলেই নীরা রাহাতকে এড়িয়ে চলে গেলো।
কিন্তু রাহাত পারলো না,কারন নীরার অস্বাভাবিক আচরন তাকে দিনে দিনে আরো দুর্বল করে দিলো।।
রাহাত নিজের অজান্তেই নীরাকে ভালোবেসে ফেললো।।

রাহাত তার ভালোবাসার কথা নীরাকে জানাবে কিন্তু তার আগে নীরার সাথে বন্ধুত্ব করতে হবে।।

শেষমেষ রাহাত সফল হলো,সে নীরার সাথে বন্ধুত্ব করে ফেললো।।
এখন নীরা আবার আগের মতন করে হাসে প্রান খুলে হাসে আর রাহাত অবাক দৃষ্টিতে সেই হাসি দেখতে থাকে আর ভাবে একটা মেয়ে এতটা সুন্দর হয় কি করে।
উপরওয়ালা যেন সব গুন গুলো দিয়ে পাঠিয়েছে তাকে।।

সুযোগ বুঝে একদিন রাহাত নীরাকে তার ভালোবাসার কথাটা বলেই ফেললো সাহস করে।
কিন্তু নীরা রাহাত কে না করে দিলো।।
রাহাত জানতে চাইলো বি এফ আছে কি না।
:-না নাই।
:-তাহলে আমাকে ভালোবাসলে কি সমস্যা নাকি আমাকে তোমার পছন্দ না।
:-তোমাকে যে কোনো মেয়ে পছন্দ করবে,তুমি অনেক সুন্দর।
:-যে কোনো মেয়েকে তো চাই নি আমি তোমাকে চেয়েছি।
:-না আমি পারবো না।
:-কেন পারবে না।
:-বলতে পারবো না।
:-না বলতে হবে

অবশেষে রাহাতের জোরাজোরিতে নীরা বলা শুরু করলো সেদিনের রাতের সেই ঘটনা যেটা আজ পর্যন্ত কাওকে বলে নি মনের গভিরে পুষে রেখেছিলো।।

সেদিন রাতে কিছু খারাপ ছেলে আমাকে তুলে নিয়ে গেছিলো,আর তুলে নিয়ে গিয়ে আমাকে রেফ করেছিলো আর ৪দিন আটকিয়ে রাখার পর তারপর বাসার সামনে আমাকে জ্ঞানহীন অবস্থাতে ফেলে দিয়ে গেছিলো যার জন্য আমার বিয়ে ভেঙ্গে গেছে আমার পরিবার ও লজ্জাতে মুখ দেখাতে না পেরে আত্মহত্যা করেছিলো।

এতক্ষনে রাহাত নীরার কথা গুলো মন দিয়ে শুনছিলো আর নীরার দিকে তাকিয়ে ছিলো অবাক দৃষ্টিতে।।একটা মেয়ে এতো কষ্ট বুকে চেপে রেখেও আমার সাথে সব সময় হাসি খুৃশি থাকতো কখনো বুঝতেও দেয় নি।।
নীরা কথা গুলো বলছে আর দুচোখ দিয়ে অঝোর ধারাতে পানি গড়িয়ে পড়ছে।।
:-নীরা আমি তোমাকে কিছু বলতে চাই।
:-হুম বলো(চোখের পানি মুছতে মুছতে)
:-আমি তোমার কষ্টের ভাগ নিতে চাই,আমি যদি তোমাকে বিয়ে করতে চাই তাহলে কি তোমার কোনো আপত্তি আছে।
:-তুমি আমার মতন মেয়েকে বিয়ে করবে কেন,আমার আর কিছু দেওয়ার নাই আমার সব থেকে বড় জিনিস টা আমি হারিয়ে ফেলেছি।।
:-তুমি কিছুই হারাও নি,ওটা একটা দুঃস্বপ্ন ছিলো তোমার জীবনে আর তুমি চাইলে আমার কাছে এগুলো লুকিয়ে রেখে আমার সাথে প্রেম করতে পারতে কিন্তু সেটা করো নি,তুমি সব সত্যি কথা বলেছো আর তার জন্য আমি অনেক হ্যাপি।
আর তুমি যেটা করেছো সেটা আর দশ জন মেয়ে পারে না।।
আর কে বলেছে তোমার সব কিছু হারিয়েছো তুমি,তোমার কিছু হারায় নি।।
তোমার এখনো একটা সুন্দর আর পবিত্র মন আছে একটা মায়াভরা মুখ যেটার দিকে তাকালে পৃথিবীর সব কষ্ট নিমিষে দুর হয়ে যাবে।
আমি তোমাকে বিয়ে করবো।।

রাহাতের কথা শুনে নীরার কান্না আরো বেড়ে গেলো।
:-এই পাগলি কাঁদছো কেন?
:-জানি না তবে সেদিন আমার বিয়েটা হয়তো এই জন্য ভেঙ্গেছিলো যাতে তোমার মতন একজন মহৎ ব্যাক্তির আগমন ঘটে আমার জীবনে।
:-হুমম আর আমিও আজকে অনেক হ্যাপি কারন তোমার মতন একজনকে পেয়েছি।।

নীরা কাঁদতে কাঁদতে রাহাতের বু্কে মাথা দিলো,,অজানা এক সুখের পরশ হাতছানি দিয়ে ডাকছে নীরাকে।।
রাহাতের বুকে মাথা দিয়ে নীরা তার অতিতের সব দুঃখ কষ্টকে ভুলে যেতে চাই।।
আবার নতুন করে বাঁচতে চাই রাহাত আর পরিবারকে নিয়ে।।

সব হারিয়ে ফেলার পরেও নীরা আজকে একমুঠো স্বপ্নের দেখা পেয়েছে।আর সেই স্বপ্নের দিশারী আর কেও না নীরা এখন যার বুকে মাথা দিয়ে দাড়িয়ে আছে সেই রাহাত।।

বেঁচে থাকুক নীরা আর রাহাতের ভালোবাসা সারাজীবন,অটুট বন্ধনে আবদ্ধ হোউক এক সুখি ফ্রেমে দু জনের রঙ্গিন স্বপ্ন গুলি।।

গল্পের বিষয়:
ভালবাসা
DMCA.com Protection Status
loading...

Share This Post

সর্বাধিক পঠিত