অবরুদ্ধ আবেগ

অবরুদ্ধ আবেগ

১। রোমানা গাড়িতে ওঠার আগে ফিরে ফিরে তাকায় ছেলের দিকে , একটু চুমো খায়, মাথায় হাত বুলিয়ে এলোমেলো করে দেয় রেশমি চুল। তারপরে হাত নাড়তে নাড়তে গাড়িতে গিয়ে ওঠে।ম্যাটারনিটি লিভ শেষ হয়েছে বহু আগে। তবু এতটুকু ছেলেকে রেখে এত লম্বা সময় বাইরে থাকতে তার এখনো অভ্যাস হয়ে উঠলো না। তবু কাজ তো করতেই হবে। অফিসে এসে শুকিয়ে ওঠা গলাটা পানি খেয়ে ভিজিয়ে নিলো । আজ একটা মিটিং আছে। বাইরের ক্লায়েন্ট আসবে। ভালো করে তৈরী হয়ে নিতে হবে। ফাইলপত্র খুলে বসলো, ভালো করে মন দিতে গিয়ে একবার ফোন করতে ইচ্ছা হলো, বাবু ঠিক আছে তো? প্রতিদিন ওর এক অভ্যাস, ফোনে একটু ছেলের গলা না শুনলে কাজে মন দিতে পারে না। ডায়াল টোন হচ্ছে, কেউ ধরছে না কেন? ওর বুক ঢিপ ঢিপ করতে থাকে। কোন দূর্ঘটনা হলো নাকি? এক পলকে সম্ভাব্য অসম্ভব্য সব রকম বিপদ আপদের কথা মনে পড়ে যায়। এর মাঝে লম্বা লম্বা ডায়ালটোনের পরে ওপাশ থেকে মিষ্টি রিমিঝিমি গলাটা শুনতে পাওয়া যায়। হাঁফ ছেড়ে টুকটাক কথা বলে, দুধটা শেষ করেছে কিনা, কোন দুষ্টামি করে না যেন এইসব গৎবাঁধা কথা বলে ফোন ছেড়ে দেয়। কাজ আকন্ঠ ডুবে যেতে যেতে হঠাৎ ওর হাসিও পায়, ছেলেমানুষই তো, ও কি একটু বেশী বেশী ভয় পাচ্ছে না? এত ভয় কেন ওর? মেয়ে হলেও নাহয় চিন্তার কিছু থাকতে পারতো।ছেলেদের খুব শক্তপোক্ত হয়েই বড় হতে হয়। যদিই নিজের অভিজ্ঞতায় সে জানে মেয়েদের আসল শক্তি দেহে না হলেও মনে।

২। শুভ দুধটা কোনমতে খেয়ে নামিয়ে রাখে। দুধ খেতে ওর একদমই ভালো লাগে না, তবুও খেতে হয়।কত জিনিসই তো ভালোলাগে না ,তারপরও করতে হয়। যেমন তার ইচ্ছা করে মামণিকে জড়িয়ে বসে থাকতে। মামণি হাসবে, মুখে তুলে খাইয়ে দেবে।রঙিন ছবিওয়ালা বই থেকে মজার মজার ছড়া পড়ে শোনাবে।কিন্তু মামণি ওকে মজিরুন বুয়ার কাছে দিয়ে চলে যায় রোজ। বাবানকেও ওর কাছে পেতে খুব ভালো লাগে। কিন্তু বাবানের সাথে ছুটির দিন ছাড়া কখনো দেখা হয় না। অন্যদিন বাবানের অফিস থেকে ফিরতে দেরী হয়, সে জোর করে জেগে বসে থাকে। মামণি রেগে মুজিরন বুয়াকে ডেকে ওকে শুইয়ে দিতে বলে। শুয়ে শুয়েও সে জোর করে চোখ মেলে রাখার চেষ্টা করে। তবু একসময় নিজের অজান্তেই ঘুমিয়ে পড়ে।

একা একা শুভ কিছুক্ষণ খেলে। ওর অনেক অনেক টেডি, গাড়ি, খেলনা, বই, রংপেন্সিল। এসবের চেয়ে জ্বলজ্যান্ত প্রাণবন্ত কিছুর সাথে খেলতে ওর বেশী ইচ্ছা করে। একদিন বাইরে একটি ভিখারী এসেছিল। ঠক ঠক করে শব্দ দরজায়। দারোয়ান আছে তাও কিভাবে চোখ এড়িয়ে এসেছিল কে জানে। সম্ভবত তখন সে জায়গায় ছিল না।শুভর চেয়ে একটু বড় হবে ভিখারী ছেলেটি , এমন শীতেও খালি গা, পায়ে কিছু নেই।শুভর ইচ্ছা করছিল ওর সাথে খেলে। কিন্তু ভিতরে ডাকার আগেই মুজিরন বুয়া ধমকে তাড়িয়ে দিলো। ‘ফকিরের পোলা কোথ্থ থাইক্যা দুনিয়ার ময়লা মাইখ্যা আইসে।’গরিবের মধ্যেও শ্রেনীভেদ অতি প্রবল।

শুভ জানালা দিয়ে বাইরে দেখতে ভালোবাসে।জানালায় দেখতে হলে ওকে কিছু কসরত করতে হয়। পায়ের ভর দিয়ে উঁচু হয়, শুধু মাথাটা খোলা জায়গার সমতলে থাকে। শুভ এভাবে দাঁড়িয়ে বাইরে তাকায় । কিছু ছেলেপেলে খেলছে খোলা জায়গাটায়। ওর বয়সী একজনও আছে। একা না, সাথে একটা বড় মেয়ে।মুজিরুনের কাছে আবদার করে সেও বাইরে যেতে চায়।’ না না খালাম্মা বকবো।’নিষেধ শুনে অধীর অবাধ্য চোখে বাইরে তাকিয়ে থাকে শুভ।
ওর একটাই মুক্তির আশা সামনে আছে। মামণি বলেছে কদিন পরে ওকে স্কুলে ভর্তি করে দেয়া হবে। তখন ওর অমন অনেক বন্ধু থাকবে ,মামণি এও বলেছে ।কিছু বই এনে দিয়েছে। এ বি সি ডি, অ আ, কালো কালো অক্ষর । মামণি বাড়ি ফিরেই এসব বই নিয়ে শুভকে পড়ায়। ওর ভালো লাগে না তবু ‘ভালো করে পড়ো ,নাহলে কিন্তু স্কুল তোমাকে নেবে না’, শুনলেই বিরস বইগুলোতে সে মন লাগাতে চেষ্টা করে।

৩।
মিটিং এর ফাঁকে ফাঁকে রোমানার বার বার মনে পড়ছিলো শুভর কথা। কে জানে ছেলেটা এখন কি করছে? বড় অস্বস্তি হয়। শুভটা খুব চুপচাপ, কোন অসুবিধা হলেও বলার মত ছেলে না। তেমন হলে চিন্তা কম হতো। কত সমস্যা হতে পারে এবয়সী বাচ্চার। হয়ত পড়ে গিয়ে ব্যাথা পেল। শুভ ডানপিটে না, ব্যথা পেয়ে ও সয়ে ওর অভ্যাস নেই। চুপ করে বসে থাকবে, কষ্ট সহ্য করবে। ওদের পরিচিত এক ফ্যামিলির বাচ্চাটা আরও ছোট ছিল, বাড়ির সবাই বুয়ার কাছে রেখে বাইরে গিয়েছিল। বেকায়দায় সামলাতে গিয়ে বুয়া হাত ভেঙে ফেললো।ব্যাথায় বাচ্চাটা খুব কাঁদছিল, একসময় সবাই কাজ শেষে ফিরে এলেও বুয়া ভয়ে কাউকে বলেনি, বোধহয় বোঝেওনি কি সমস্যা। ছোট বাচ্চারাতো কেঁদেই থাকে ভেবে কেউ এ নিয়ে মাথাও ঘামায়নি।কিন্তু চিকিৎসা না হওয়ায় নরম সেই হাতে আর পুষ্টি হয়নি। এখন অনেক বড় হয়ে গিয়েছে, অন্য হাতটা স্বাভাবিক নিয়মে পুষ্ট হয়ে উঠলেও ভাঙা হাতটা লিকলিকেই রয়ে গেছে।
এ তো ওর নিজের চোখে দেখা। শুভর বেলায়ও যদি? ভাবতেও কেঁপে ওঠে রোমানা। অস্থির হাতে মুঠোফোনে নম্বর টেপে। শুভর আওয়াজ একবার আবার না শুনলে ওর এরকম দুশ্চিন্তার মুহুর্তগুলোর প্যানিক কাটে না।

৪।
শুভ ইতস্তত ঘুরে বেড়াচ্ছিল। বুয়া টিভি ছেড়ে দিয়েছে। একঘেঁয়ে কোন একটা নাটক চলছে। বুয়ার পছন্দ হলো না, একের পরে এক চ্যানেল পাল্টাচ্ছে সে। কলিংবেল বাজলো। ছিদ্র পথে উঁকি দিয়ে দেখে মুখ উজ্জ্বল হয়ে উঠলো মুজিরনের। গেটের দারোয়ানটা এসেছে। শরীফ ভাই।মাঝে মাঝে এরকম আসে। চা টা খায়, গালগল্প করে। অবশ্যই যখন খালু খালাম্মা বাসায় থাকে না।জানতে পারলে খবর আছে।
শরীফকে দেখে মুজিরন যতই খুশি হোক, শুভর মুখটা কালো হয়ে যায়। শরিফ তাকে আদর করে খুব, চকলেট এনে দেয় , তারপরও একে দেখলেই সে অব্যক্ত বিরক্তিতে ভোগে। কোলে বসিয়ে অস্বস্তিকরভাবে শরীফ ওর গায়ে হাত বুলোয়। ধরার ভাবে আলতো আদরের ভঙ্গি কিন্তু অনমনীয় শক্তি। টের পেয়ে সে ছটফট করতে থাকে। একসময় ওর অস্থিরতায় বিচলিত হয়ে শরীফ ওকে ছেড়ে দেয়। শুভ কিছু বোঝে না কেন তার এই অস্বস্তি বিরক্তি। ওর এই লোকটাকে ভালোই লাগেনা শুধু এটুকুই টের পায়।
মুজিরন বুয়া কড়া হলেও তখন বরং তাকেই ওর আপন লাগে। আশেপাশে ঘুরঘুর করতে থাকে। কিন্তু শরীফ থেকে যথসম্ভব দূরত্ব বজায় রাখে ।অবচেতন ইন্দ্রিয় থেকে কিছু একটা ওর মনে সংকেত দেয় লোকটার থেকে দূরে থাকার জন্য। ছোট শুভ কার্যকারণ না জানলেও আদিম অন্তরীণ সে নিষেধবাণী মেনে চলে।
৫।
রোমানা অনেকক্ষণ মন লাগিয়ে কাজ করে। শুভর সাথে ঘন্টাখানেক আগে কথা হয়েছে। অতটুকু ছেলে সারাদিন একা থাকে, এটাই যথেষ্ট কষ্টকর লাগে ওর। কিন্তু কি আর করা?এক ঢোক পানি খায়। সামান্য মিনিট পাঁচেকের বিরতি নেবে সে। চোখ জ্বালা করছে অনবরত মনিটরের দিকে তাকিয়ে থাকতে থাকতে।আরেকবার কি ফোন করবে বাসায়? না,থাক।এত ঘনঘন ফোন করার দরকার নেই।বারবার ফোন করলে ওর ফের কাজের জগতে ফিরে আসতে সমস্যা হয়। আবার বেশীক্ষণ কথা না বলতে পারলেও বড় কষ্ট হয়, কষ্টের পরে আসে সংশয়, তারপরে আশঙ্কা। অস্থির অস্থির লাগতে থাকে।বিচিত্র এই জীবনের জটিলতা আর সঙ্কটগুলো। উপার্জন করতে হবে, জীবনে- পরিবারে স্বচ্ছলতা আনতে হবে, নিজের পায়ে দাঁড়াতে হবে,নিজের আলাদা সত্ত্বা পরিচয়, নিজের নারীত্বের আলাদা মর্যাদা কত চাহিদা এই বাস্তববাদী সমাজে। আবার এই নারীসত্ত্বারই আরেকটা দিক চায় প্রিয় আত্নজকে বুকে চেপে ঘুম পাড়াতে, হাতে তুলে খাওয়াতে, বেড়ে ওঠার প্রতিটি সুখ দুঃখের নিবিড় সাথী হয়ে থাকতে। নারীর এই টানাপোড়েন পুরুষে বুঝবেনা। রফিক কেমন সুন্দর বাসায় ফিরে পেপারটা টানে, বা খেলার কিংবা নিউজ চ্যানেলটা খুলে বসতে পারে।সে তা পারেনা ।ভাবতে ভাবতে ওর খুব দমবন্ধ ভাব হয়।এসির মাপা টেম্পারেচারের ঠান্ডা হাওয়া বদলে খোলা অনিয়মিত তাপমাত্রার ধূলাভরা বাতাসে শ্বাস নিতে ইচ্ছা হয়। উঠে একটু পায়চারী করে। সাফিয়া আপা, কালাম ভাইয়ের সাথে হাবিজাবি গসিপে মাতে।কিন্তু কিছুই ভালোলাগেনা ওর।ভালো করে শুনতেো পায়না অন্যরা কি বলছে। ডেস্কে ফিরে আসে। টেবিলের উপর থাকা ফটোফ্রেমটা হাতে নেয়। কি হাসছে ওর বাবুটা! ওর হাসিমুখ এমনিতে দূর্লভ। কারো কারো চেহারায় স্থায়ী স্বভাবকরুণ একটা আভাস থাকে । শুভরও তাই। ক্যামেরাতে ওর মুখটা সচরাচর আরও বিষণ্ণ দেখায়। কে জানে কেন?

৬।
শরীফ ভাই আসায় মুজিরনের মেজাজ খুশ। বেশ করে অনেকটা দুধ চিনি দিয়ে চা বানিয়ে খায়, দেশ গেরামের গল্প করে। তারপরে হঠৎ মুজিরনের মনে পড়ে বাড়িতে পান নেই। পান ওর খুব অত্যাবশ্যক জিনিস। বিশেষ করে চা-পানি খাবার পর পর একটা অন্তত খেতেই হয়। খুব অস্থির অস্থির লাগে তার, অদম্য পানের নেশা চেপেছে। না খেলেই না। সামনে একটু ঘুরে মোড়ের দোকানটায় আছে। এক দৌড়ে গিয়ে নিয়ে আসবে নাকি? শুভকে একা রেখে গেলে ব্যাপারটা খুব একটা ভালো কাজ হবে না। শুভ একেবারে দুধের শিশু না, কথাটথা বলতে কইতে পারে। এমনিতে কোন নালিস নেই, কিন্তু কোনভাবে যদি বের হয়ে যায় খাল্লাম্মার কাছে যে ওকে একা রেখে সে বাইরে গিয়েছিল , তাহলে কেয়ামত হয়ে যাবে বাসায়।
তারপর আবার ভাবে, না ,সে বেশি চিন্তা করছে। কিভাবে জানবে? সে এক দৌড় দিয়ে যাবে আর আসবে। বড়জোর আধাঘন্টা লাগতে পারে। আর তাছাড়া ঘরে শরিফ ভাই আছেনা? বড় মানুষ একজন তো রইলোই। কিছুক্ষণের জন্য বসতে বললে অবশ্যই বসবে সে।

রোমানা বেল টিপে একটা চা দিতে বললো। তারপরেই ওর মনে হলো, ভুল হয়েছে। এখন ওর মাথা ধরেছে, বেশ করে বড় এক গ্লাস ঠান্ডা পানি আর একটা প্যাপাসিটামল ওর দরকার, গরম পানীয় না। অন্যদিন চা চাইলে মাঝে মাঝে দেরী হয়, আজকেও আশা করছিলো তাই হবে- তাই যেন হয়। কিন্তু কেন যেন আজকেই একেবারে তাড়াতাড়ি বানিয়ে নিয়ে আসলো ছেলেটা। থাকগে, ফেলা যাক। সে ঔষুধ আর পানি খেয়ে চোখ বুজে সিটে কিছুক্ষণ হেলান দেয়। শুভের কথা ভাবে। এত ছোট ছেলেটা কি করে সারাদিন , কিভাবে একা একা থাকে এতটা বেলা? তার ছোটকালে এভাবে একা থাকার সুযোগ আর ভাগ্য কোনটাই হয়নি। যৌথ পরিবার ঠিক না হলেও ওদের বাড়িতে মানুষের আনাগোনা লেগেই থাকতো। একাকীত্ব কি জানিস সে জানতে পায়নি। আজকাল কারোর তো মুখ দেখাদেখিরই সুযোগ নেই, সবাই ব্যস্ত।যে বাচ্চার কাছে সে থাকতে পারছে না, তা ক্ষতি কি শুধু কন্ঠ দ্বারা পূরণ করা যায়? তাও সে চেষ্টা করে , প্রতি দুতিন ঘন্টা পরে পরে একটা ফোন টোন করে। অনেকক্ষণ করা হয়নি। একটা করাই যায় এখন। সিদ্ধান্তটা নিয়ে সে নম্বর টিপতে লাগলো।

৭।
শরিফ শুভকে বেশ করে জাপটে রেখেছে।ওর শরীরে জামা প্যান্ট হেঁচকা টানে নামিয়ে দিয়েছে।ছোট শরীরে বড় অসুবিধাজনকভাবে হেঁটে বেড়াচ্ছে ওর হাত। শুভ কাতরে ওঠে।ভালো লাগছে না, কিছু ভালো লাগছে না। বড় চঞ্চলতা ওর মনে, শরীরে। বার বার হাত ছাড়িয়ে সে ছুটে যাবার চেষ্টা করছে। অস্থির হয়ে শরীর মোচড়াচ্ছে। গোঁড়াতে চিৎকার দিতে গিয়েছিল। মুখ জোরে চেপে দিয়েছে শরিফ। সজোরে কান্না গিলে ফেলেছে সে।এখন ফোঁপাচ্ছে।খুব ব্যাথা হচ্ছে চোয়ালে। ওর নরম চামড়ায় কঠিন হয়ে পড়েছে শরীফের পাঁচ আঙ্গুল। অসুস্থ উন্নাদনায় শরীফের কোন কিছু খেয়াল নেই। কি ভীষণ তুলতুলে নধর এই বড়লোকের পোলাপানের শরীরগুলো। …..কতদিন পরে আজ একটা ভালো সুযোগ পাওয়া গিয়েছে…..। শুভ ছটফট করতে থাকে, কিন্তু ওর ছোট চার বছরের শরীরে আর কতটুকু জোর বছর পঁয়তিরিশের মধ্যবয়স্ক মানুষের তুলনায়?

রোমানা ফোনটা ধরে আছে অনন্তকাল, একবার দুইবার তিনবার ডায়াল করে। ওর কেমন যেন লাগছে। এতক্ষণ ধরে ফোন ধরে না কেন? শুভ হয়ত বাথরুমে, হতে পারে। তাহলেও, মুজিরন কি করছে? সেও তো ধরতে পারে? বাথরুমে শুভ গিয়ে থাকলে পা পিছলে পড়ে যায়নি তো? হয়ত বুয়া সেখানে।এমন আগে একবার হয়েছে। নাকি খাটের কোনায় ব্যাথা পেয়েছে? একবার কোনায় পড়ে ভুঁরু কেটে গিয়েছিল, অনেক রক্ত দেখে সে প্রায় ভিমড়ি খাচ্ছিলো, তারপরে শুভর বাবা অফিসে ছুটি নিয়ে এসে পড়ে। হাসপাতালে নিয়ে যাবার পরে পাঁচটা স্টিচ লেগেছিল। তেমন কিছু এবারও হয়নি তো? সম্ভব অসম্ভব দুশ্চিন্তা খলবলিয়ে ওঠে রোমানার মধ্যে। পেপারওয়েট অস্থির হাতে নাড়াচাড়া করতে করতে ভাবে, হয়তো সে বেশী বেশী ভাবছে। প্রতিদিনই কি আর দূর্ঘটনা হয় নাকি? হয়ত শুভ বাথরুমে, হয়ত শুভ কার্টুনে মগ্ন বা জানালা দিয়ে উদাস বাইরে তাকিয়ে আছে। মোবাইলটা অন্য রুমে তাই শুনতে পাচ্ছে না। হয়ত বুয়া ঘুমাচ্ছে।ওর খুব ঘুমানোর বাতিক আছে। যখন তখন ঘুমিয়ে পড়তে পারে।ঘুমালে আবার সহজে ওঠানোও যায় না।নিজেই নিজেকে নানা প্রবোধ দিতে
ওর অশান্ত মন একটু শান্ত হয়।
৮।
আহ! আরেকটা কর্মক্লান্ত দিনের শেষ। রোমানা আর রফিকের জন্য অপেক্ষা করেনা। সচরাচর ওরা একসাথেই ফেরে। যার কাজ আগে শেষ হয় সে অন্যজনকে অফিস থেকে তুলে নেয়। এলোমেলো ব্যবস্থাও চলে মাঝে মাঝে। আজকে রফিকের দেরী হবে। থাক ও নিজে নিজে চলে আসবে, গাড়িতে উঠে রোমানা রওনা দেয় তাড়াতাড়ি। আজ দিনটা বেশ টেনশনে কেটেছে ওর, আর নিতে পারছে না। ফিরে গিয়ে শুভর মুখ দেখতে পেলেই তবেই এই ভাবটা কাটবে।

ঠিক গেটের মুখে বাঁকটা ঘুরতে ঘুরতে গাড়ি লম্বা একটা হর্ণ দেয়।। রোমানার চোখ চলে যায় উপরে। প্রতিদিন এই হর্ণের আওয়াজ শুনলেই শুভ যেখানেই থাক ছুটে চলে আসে। ওর একটা কান মনে হয় এদিকে পাতা থাকে। আজকে কেউ নেই। কেন নেই? দুপুর থেকে ওকে ফোনে পাওয়া যাচ্ছেনা। এখন রোজকার অভ্যস্ত জায়গাতেও সে নেই। কি হলো, কি হয়েছে? একদিকে আশঙ্কা আরেকদিকে নিজেই নিজেকে বুঝ দেয়া আশ্বস্ততার দোলাচল কাজ করে মনে। কিছুই হয়নি, হয়তো খামোখাই…হয়তো হয়তো অনেক অনেক হয়তো কাজ করতে থাকে রোমানার মনে।সিড়ি ভাঙতে থাকে কাঁপা কাঁপা মাপা মাপা পদক্ষেপে। দরজার সামনে দাঁড়ায়। বেল বাজায়। টিং টিং করে খুব মিষ্টি একটা সুর আছে বেলের কিন্তু আজ ওর আর সেসব কিছুই ভালো লাগছে না। দরজা খুলছেনা কেন,আরেকটা বেল বাজায়। আরেকটা..।

গল্পের বিষয়:
ভালবাসা
DMCA.com Protection Status
loading...

Share This Post

আরও গল্প

সর্বাধিক পঠিত